অনন্য স্মৃতিগদ্যগুচ্ছ

পিয়াস মজিদ
প্রবাদতুল্য সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বে’র বিশেষণ সন্জীদা খাতুনের (১৯৩৩) প্রাবন্ধিক-গবেষকসত্তাকে প্রায়শই আড়াল করে রাখে। অথচ রবীন্দ্রসংগীতের ভাবসম্পদ, রবীন্দ্রসংগীত : মননে লালনে, রবীন্দ্রনাথ : তাঁর আকাশভরা কোলে, স্বাধীনতার অভিযাত্রা, ধ্বনি থেকে কবিতা, সংস্কৃতির বৃক্ষছায়া থেকে সাম্প্রতিকতম রবীন্দ্রবিশ্বাসে মানব-অভ্যুদয়ের মতো গ্রন্থ আমাদের কাছে ভাস্বর করে তাঁর গুণী গদ্যের মুহুর্মুহু রূপছায়া। পাশাপাশি অতীত দিনের স্মৃতি, সহজ-কঠিন দ্বন্দ্বে ছন্দে, প্রভাতবেলার মেঘ ও রৌদ্রের মতো আত্মজৈবনিক গ্রন্থেও তিনি গদ্যের এক গহন দরোজা খুলে দেন পাঠকের সমুখে।

সন্জীদা খাতুনের মর্মমধুর গদ্যপরম্পরার অধুনান্তন প্রকাশ স্মৃতিপটে গুণীজন। আমাদের জাতীয় সাংস্কৃতিক জীবনের অনন্য এই গুণী তাঁর চোখের আলোয় প্রয়াত গুণীদের কী করে দেখেছেন – তা অনুধাবনের বিষয় বইকি। উনিশ গুণী মানুষকে তিনি স্মরণ করেছেন পঁচিশটি গদ্যে। এর মধ্যে লেখকের প্রণম্য পিতা, বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলনের নেতা কাজী মোতাহার হোসেন যেমন আছেন তেমনি আছেন জননী-সাহসিকা সুফিয়া কামাল, সংগীতজন – পঙ্কজকুমার মলিস্নক, দেবব্রত বিশ্বাস, আবদুল আহাদ, সোহ্রাব হোসেন, ফিরোজা বেগম, রামকানাই দাশ, নীলুফার ইয়াসমীন, মমতাজ আলী খান, মৃদুলকান্তি চক্রবর্তী, সুবল দত্ত, আলমাস আলী, আবৃত্তি ও সংস্কৃতিজন গোলাম মুস্তাফা, হাসান ইমাম, চিত্রশিল্পী কামরুল হাসান, সাংবাদিক-সংগঠক আহমেদুর রহমান, ঋষিপ্রতিম লেখক রণেশ দাশগুপ্ত এবং সত্যেন সেন।

সুফিয়া কামালকে তিনি দেখেছেন মৌলবাদমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠার অনন্য অগ্রচারী হিসেবে। বুঝেছেন রবীন্দ্রবীক্ষাই কবি সুফিয়াকে প্রাণিত করেছে অন্ধত্বের অচলায়তন ভেঙে মানবতন্ত্রের মহিমা কীর্তনে। তাঁর মুক্তদৃষ্টিতে সুফিয়া কামাল বিধৃত হয়েছেন এভাবে-

নিষ্ঠার সঙ্গে আপন ধর্ম পালন করলেও সাংস্কৃতিক পরিবেশনার রস গ্রহণে তাঁর কোনও দ্বিধা ছিল না। দুয়ের ভিতরে কোনও বিরোধ আছে মনে হয়নি তাঁর। এমন সর্বাঙ্গসুন্দর খাঁটি মানুষ তাই ‘ছায়ানট’ আর ‘জাতীয় রবীন্দ্রসঙ্গীত সম্মিলন পরিষদে’র সভাপতি হিসাবে বাঙালিকে যথাযথ পথনির্দেশনা দিতে পেরেছেন যোগ্যভাবে। যথার্থ মানুষ হবার আজীবন সাধনায় পথের সঙ্গী করেছিলেন তিনি আমাদের।   (পৃ ১৫)

পঙ্কজকুমার মলিস্নকের গায়ন-প্রসঙ্গে লেখক প্রারম্ভেই গান ও ফুলের তুলনায় নশ্বর পৃথিবীতে সুন্দরের স্থায়িত্বভেদ নিয়ে যে-কথা বিস্তার করেন তা ভাবনাযোগ্য। এই নিদারুণ রজতনির্ভর সমাজে, বিপণি-শাসিত পৃথিবীতে গানও যখন প্রায় হয়ে উঠেছে প্রতিযোগিতা ও প্রদর্শনপ্রবল তখন সন্জীদা খাতুনের এ-মতো বক্তব্য শিক্ষাযোগ্য –

গান গাওয়া শেষ হলে কিছুক্ষণ তার রেশ থাকলেও তারপরে সে-গানের সেখানেই শেষ। অর্থাৎ হলো আর ফুরিয়ে গেল। যেমন বাগানের ফোটা ফুলটি, ফুটল আর ঝরে গেল। ব্যস, শেষ! ফুলের তো তাও একটা চেহারা আছে, কিছু ফুলের সুগন্ধও আছে, তাকে ছুঁতেও পাওয়া যায়। কিন্তু গানের তো চেহারা নেই কোনো! না দেখা যায়, না ছোঁয়া যায়। গান শুনে মনে নানা ভাবের আলপনা আঁকা হলে অবশ্য তার ছাপ মনে থেকে যায়। তেমন করে শুনতে জানলে মনে নানা ছবি ফুটে উঠতে পারে, এমনকী আশ্চর্য সব গন্ধও পাওয়া যায়। (পৃ ১৬)

রবীন্দ্রনাথের উদ্দীপক গানে দেবব্রত বিশ্বাসের মুন্শিয়ানা নিয়ে লেখক বিশদ বলেছেন তাঁর স্মৃতিসূত্রে। বলেছেন, হাটে-মাঠে-ঘাটে, জনতার বিসত্মৃত ময়দানে রবীন্দ্রনাথের গান গেয়ে তাঁকে লোকগম্য করে দেবব্রতের মতো শিল্পী প্রমাণ করেছেন রবীন্দ্রসংগীত শুধু একাকী গায়কের নির্জন সাধনবস্ত্ত নয়, বরং শিল্পীর হৃদয়বেদী প্রকাশগুণে তার রস গ্রহণে সমর্থ হয় গণমানুষও।

অনেক অজানা তথ্যের ভেতর লেখক এই গ্রন্থে আবদুল আহাদের যে অন্তরালের পরিচিতি তুলে ধরেন তা পরিস্থিতির শিকার এক শিল্পীর অন্তর্গত সুকোমল সত্তার সঙ্গে পাঠকের যোগাযোগ ঘটায়। রবীন্দ্রবিরোধী পাকিস্তানি তৎপরতার সেই দুষ্কালে সরকারি চাকুরে আবদুল আহাদের ভূমিকাটি সন্জীদা এমনভাবে তুলে ধরেছেন যেখানে একজন মানুষকে অকারণে ছোট বা বড় করার প্রবণতার চেয়ে বেশি পাওয়া যায় তার প্রাণের পরিচয়-

…রাত্রি এগারোটার পরে বাতি নিভিয়ে ঘুমাতে যাব এমন সময়ে দরজায় সন্তর্পণ টোকা পড়লো। দুয়ার খুলে দেখি আহাদ সাহেব দাঁড়িয়ে রয়েছেন! চট করে ঘরে ঢুকে পড়ে বললেন – ‘শোনো – ওরা সবার সই নিয়ে কাগজে ঘোষণা দিতে যাচ্ছে যে, রবীন্দ্রনাথ আমাদের সংস্কৃতির কেউ নন। কি করবে করো তোমরা। বেশি রাত্রে লুকিয়ে আসতে হলো –  কে কোথায় দেখে ফেলবে আবার!’ ওঁর স্বভাব-ভীরুতার সঙ্গে মিশে ছিল ভিতরের দুঃসহ অস্থিরতা। (পৃ ২৪)

সোহ্রাব হোসেনকে নিয়ে দুটো লেখা ‘আমার শিক্ষক সোহ্রাব ভাই’ আর ‘অনন্য প্রতিভা সোহ্রাব হোসেন।’ এই প্রাণস্ফূর্তিময় শিল্পীকে তাঁর দৃঢ় ব্যক্তিত্ব আর কোমল হৃদয়ের আভায় জাজ্বল্য করেন সন্জীদা খাতুন। একটি লেখা শিল্পীর জীবদ্দশায় লেখা অন্যটি মৃত্যু-উত্তর, তবে দুটোতেই অভিন্নভাবে ফুটে ওঠে আজীবন অনবচ্ছিন্ন সংগীতসাধনায় ব্যাপৃত এক মহৎপ্রাণ শিল্পীর সত্তাসামগ্র্য।

‘অনন্য গুণী ফিরোজা বেগম’ সন্জীদা খাতুনের বিশেষ শ্রদ্ধার্ঘ্য; নিষ্ঠ গবেষকের অনুসন্ধিৎসায় সুধন্যা শিল্পী ফিরোজা বেগম-কৃত স্বরলিপি সংগ্রহ নজরুল গীতিমালা সম্পর্কিত তথ্য-উপাত্ত জড়ো করেছেন তিনি। গেল শতকের ষাটের দশকে স্বল্প সময়ের জন্য বাংলা একাডেমির কর্মকর্তা সন্জীদা খাতুনই একাডেমির তৎকালীন পরিচালক সৈয়দ আলী আহসানকে অনুরোধ করেন ফিরোজা বেগমের শ্রমসাধনার ফসল নজরুল গীতিমালা প্রকাশ বিষয়ে। ফিরোজা বেগমের প্রয়াণের পর ব্যাপক অনুসন্ধানে সন্জীদা বিলুপ্তপ্রায় এই স্বরলিপি সংগ্রহের দুটো খ- উদ্ধার করেছেন এবং অনুমান করছেন মোট ছটি খণ্ড তা প্রকাশিত হয়েছিল। তিনি ফিরোজার লেখা ভূমিকা এবং কিছু নমুনা উদ্ধৃত করে পাঠকের ঔৎসুক্য আরো বাড়িয়ে দিয়েছেন। তাঁর মতো আমাদেরও আশা, এই গুরুত্বপূর্ণ স্বরলিপি সংগ্রহের সবগুলো খ- উদ্ধারপূর্বক পুনর্মুদ্রিত হবে।

রামকানাই দাশ নিয়ে দুটো লেখা ‘রামকানাই দাশের জীবনসাধনা’ এবং ‘গুণী শিল্পী রামকানাই দাশ’। রামকানাইয়ের আত্মকথা সংগীত ও আমার জীবনের সূত্রে এবং ব্যক্তিগত স্মৃতি ও পর্যবেক্ষণের আলোকে মাটিলগ্ন শিল্পী রামকানাইয়ের সুরেলা অঙ্গীকারের স্পষ্ট হয়। নিয়মানুগ, স্থিতধী এবং লোকপ্রজ্ঞায় স্নাত রামকানাই দাশের সদা শিক্ষাগ্রহিষ্ণু মানস-পরিচয় পরিস্ফুট হয় সন্জীদা খাতুনের স্মৃতিরেখার তুলিটানে-

রামকানাই বাবুর গানের স্কুলে এক সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হিসেবে একবার সিলেটে গিয়েছিলাম। মহাব্যস্ততার ভেতরেও রামকানাই বাবু একখানি স্বরবিতান এনে আমাকে বললেন, ‘দিদি, এই যে একমাত্রায় চারটি স্বর গাইবার নির্দেশ রয়েছে, এ কীভাবে পাওয়া যায়’? কোন গান নিয়ে প্রশ্ন, সে কথা মনে নেই। আমি গেয়ে দেখালাম। (এখন ভাবি, তাঁর সামনে ঠিক ঠিক গাইতে পেরেছিলাম তো!) বললাম, ‘আপনার এত কৌতূহল!’ বললেন, ‘দিদি শিখবার সুযোগ হারাতে চাই না। একটা মেথরও যদি কিছু জানে, আমি তার কাছ থেকে জেনে নিতে দ্বিধা করি না। আমি জানতে চাই।’ অবাক লেগেছিল তাঁর এ রকম অনুসন্ধিৎসায়।

(পৃ ৪৮)

নীলুফার ইয়াসমীনকে নিয়ে লিখতে গিয়ে তাঁর নজরুলসাধনার সমান্তরালে বিনয়ী ব্যক্তিসত্তার যে উলেস্নখ আমরা পাই তা শিল্পীর অনন্য অন্তর্লোককে সামনে নিয়ে আসে –

নীলুফারের চরিত্রে যথার্থ শিল্পীসুলভ নম্রতা আর বিনয় দেখে বারবার বিস্ময় মেনেছি। প্রার্থনা করতে ইচ্ছে হয়, জীবিত সকল জনের ওই মহৎ বিনয়নম্রতায় মতি হোক।     (পৃ ৫৫)

অকালে প্রয়াত গুণী সংগীতজন মৃদুলকান্তি চক্রবর্তীর সংগীত-গবেষণার আদ্যোপান্ত তুলে ধরেছেন লেখক। বিশ্লেষণ করেছেন কী করে ধীরে ধীরে নিজেকে গড়ে তুলেছেন মৃদুল; শিক্ষকতা ও গবেষণার দ্বিবিধ দায়িত্ব পালনে কতটা দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন।

সংগীত সন্জীদার আপন ভুবন। এই ভুবনের খ্যাতনামা কৃতবিদ্যদের নিয়ে যেমন তিনি লেখেছেন তেমনি এর নেপথ্যে যুক্ত যন্ত্রীদের নিয়েও কলম ধরতে ভোলেননি। অবশ্য এ কোনো আকস্মিকের খেলা নয়, বরং সত্যেন সেন, রণেশ দাশগুপ্তদের মতো সর্বমানবহিতে নিবেদিত ব্যক্তিদের কাছ থেকে পাওয়া লেখকের উদার-নির্মল জীবনাভিজ্ঞানেরই স্মারক। আলমাস আলীকে নিয়ে লেখার উদ্ধৃতিতে বিষয়টি স্পষ্ট হয় –

রবীন্দ্রনাথের সার্ধশততম জন্মবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে বাজিয়ে শিল্পকলা থেকে অন্য কোথাও বাজাবার জন্যে ছুটছিল আলমাস। টাকা রোজগার করতেই হবে। দেখে মনে হলো, আজ তার বিষাদ যেন সীমা ছাড়িয়ে গেছে। থমকে থেমে জিজ্ঞেস করলাম, কি হয়েছে বলেন তো? নির্বিকারভাবে জবাব দিল, ‘কিছু না। আমার মেয়েটার ম্যাট্রিক পরীক্ষার রেজাল্ট বেরিয়েছে, পাশ করেনি। তো মেয়ে তাই গলায় দড়ি দিয়েছে।’ স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম। আলমাসের জীবনসত্যটা যেন আমার চোখের সামনে বত্রিশপাটি দাঁত বার করে কঙ্কালের মতো হাসতে থাকল।    (পৃ ৬৪)

কামরুল হাসানকে স্মরণ করে লেখা গদ্যে চলনে-বলনে সাদাসিধে মানুষটির ভেতরে শিল্পের যে বারুদ ছিল তার কথা এসেছে নানা সময়ে নেওয়া তাঁর সাহসী ভূমিকার উলেস্নখে। আহমেদুর রহমান স্মারণিক রচনায় শুধু ব্যক্তি আহমেদুর তো উঠে আসেন না, একই সঙ্গে ১৯৬৪-র সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা প্রতিরোধ আন্দোলন, বাঙালির জাগরণমূলক সাংস্কৃতিক কৃত্যাদি এবং তৎকালীন সাংবাদিকতাজগতেরও বিসত্মৃত পরিচয় পাওয়া যায়।

পিতা কাজী মোতাহার হোসেনকে নিয়ে এ-বইয়ে আছে চারটি রচনা; কেবল পিতা বলেই নয়, তাঁর বহুমুখী জীবনকর্মের মূল্যায়নসূত্রেও বটে। পিতাকে যে কতভাবে দেখেছেন লেখক! তাঁর জ্ঞানচর্চা, ক্রীড়ানৈপুণ্য, বন্ধুবৎসলতা, সম্প্রদায়নিরপেক্ষ মনোভাব, আত্মভোলা স্বভাব ইত্যাদি নানাভাবে ব্যাখ্যাত এখানে। লেখক ইতিহাস ঘেঁটে এই জরুরি সত্য উপস্থাপন করেন – ১৯৪৭ সালেই সওগাত পত্রিকায় প্রকাশিত ‘রাষ্ট্রভাষা ও পাকিস্তানের ভাষা-সমস্যা’ প্রবন্ধে কাজী মোতাহার হোসেন বলেছিলেন, ‘পূর্ব-পাকিস্তানের রাজভাষা বা রাষ্ট্রভাষা বাঙলাই হওয়াই স্বাভাবিক এবং সমীচীন।’ পাশাপাশি পারিবারিক খুঁটিনাটি ঘটনাপ্রবাহে কাজী মোতাহার হোসেন নামক জ্ঞানবৃক্ষ যেন এক বহতা নদীর মতো দৃশ্যমান হন পাঠকের দৃষ্টিতে। যে-পিতা অনায়াসে তাঁর কন্যার সঙ্গে চ্যালেঞ্জ করে ছাত্রী হলের মাঠে গিয়ে ব্যাডমিন্টন খেলায় অংশ নিতে পারেন, সে-পিতাকেই কন্যা আবার এমন এক মানুষ হিসেবে আবির্ভূত হতে দেখেন যার ভেতর থাকে পিতার সংবেদন এবং শিক্ষকের কর্তব্যবোধ উভয়ের মিলিত রসায়ন –

…আমার সেই আববু, যিনি সেজদির লাশ বাসায় রেখে বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে নিজের ক্লাসটি নিয়ে তারপরে এসে জানাজায় দাঁড়িয়েছিলেন।            (পৃ ৮১)

পিতার প্রয়াণকে নৈর্ব্যক্তিক দূরত্বে দাঁড়িয়ে সন্জীদা খাতুন যেভাবে বলতে চেয়েছেন তা যথাপ্রযুক্ত হয়েও নিঃশব্দে পাঠকের চোখকে করে তুলে শোকজল-টলমল – ‘বুদ্ধির মুক্তি যাঁর আন্দোলনের বিষয় ছিল, কাল তাঁর সর্বচেতনা হরণ করল।’

রণেশ দাশগুপ্ত আর সত্যেন সেন এ-দুজন লেখকের কাছে আদর্শস্থানীয়। কলকাতা-প্রবাসেও তিনি তাঁর ‘রণেশ’দার ভেতর দেখেছেন নিত্য স্বদেশ তেমনি প্রগতিশীল রাজনীতির সঙ্গে সংস্কৃতিকর্মীর যোগাযোগের আবশ্যকতার কথা বলে রণেশ দাশগুপ্ত যে আসলে মানবমুক্তির কথাই বলেছেন ফিরে ফিরে – সে-সত্য লেখক বিধৃত করেন তাঁর আন্তরিক স্মৃতিবয়ানে।

সাহিত্য-সংস্কৃতি-রাজনীতিতে সত্যেন সেনের দৃপ্ত পদপাত সন্জীদা খাতুনের আগ্রহের বিষয়। বিশেষ করে তিনি নিজে যখন এই অনাড়ম্বর মানুষটির নিবিড় সান্নিধ্যে এসেছেন – দেখেছেন শত দুঃখ-কষ্ট উজিয়ে বুকের ভেতর সত্যেন সেন কী করে আদর্শের আগুন জ্বালিয়ে রেখেছিলেন – গানের ভাষায় বলতে গেলে ‘আগুন নিভাইব কে রে/ এ আগুন নেভে নেভে নেভে না’। সত্যেন সেনকে অনুধাবনে লেখক তাঁরই বই থেকে উদাহরণ নিয়ে তাঁকে যে দিকভোলা পাখির সঙ্গে তুলনা করেছেন তা খুবই যথাযথ যেন; সেই পাখি যে দিগন্তের সব রুদ্ধদ্বার ভেদ করে সন্ধান করে মুক্তপ্রাণের –

সত্যেন সেনের লেখা ‘পাতাবাহার’ বইতে এক বালকের কথা আছে, সে ছেলেটি গাছের ডালে মাচা বেঁধে সেখানে বসবাস করবার আনন্দে ডগোমগো হয়েছিল। কাঠকুঠো জুটিয়ে দড়ি দিয়ে বেঁধে রীতিমতো চিরকেলে ব্যবস্থা! একা একা কি পারা যায়? সঙ্গে দাদাটিও ছিলেন যে… বোধকরি দু-এক বেলার সুখের পরেই ঝড়ে উড়িয়ে নিয়ে গিয়েছিল সেই পাখির বাসা। তবু সেই বাসা-বাঁধার আনন্দের পরিসীমা কোথায়! সেই পাখিদের একটি ছিলেন আমাদের সত্যেনদা। কল্পনার পাখায় ভর করে মেঘের ভেলার পাশে পাশে ভেসে বেড়ানো মানুষটি। সত্যেনদার এই মনটিকেই বড় করে দেখতে পেয়েছিলাম আমি তাঁর সঙ্গে পরিচয়ের পরে। (পৃ ১০০)

এভাবে সন্জীদা খাতুনের স্মৃতিপটে গুণীজন স্মরণার্ঘের বৃত্ত ছাপিয়ে অনন্য এক গদ্যগ্রন্থের মহিমা পায়। যেখানে চোখের দেখায়-প্রাণের কথায় শুধু নয়, একই সঙ্গে বিশ্লেষণে-সংশ্লেষণে আলোচনাবদ্ধ হয়েছে আমাদের সাহিত্য-সংস্কৃতি ও সামাজিক জীবনের প্রয়াত গুণীজনেরা। গদ্যের লাবণ্য আর বক্তব্য-প্রসঙ্গের অনুষঙ্গী সূত্র-প্রতিসূত্র নিশ্চিত করেছে রচনাসমুদয়ের প্রামাণিকতা। স্মৃতি ও সত্তার এই যুগলবন্দি গ্রন্থ বিরল গুণীদের জীবনপ্রেরণায় আমাদের জাগিয়ে দিয়ে যায়, জ্বালিয়ে দিয়ে যায় অনন্ত আলোর দীপ। r

শেয়ার করুন

Leave a Reply