অনুবাদে আগুনপাখি

লেখক:

সনৎকুমার সাহা

 

The Firebird | হাসান আজিজুল হক

অনুবাদ : আলী আহমেদ

অক্ষর-পত্র | কলকাতা | ২০১৫ | ৪০০ টাকা

 

আগেই জেনেছিলাম, আলী আহমদ হাসান আজিজুল হকের আগুনপাখি ইংরেজিতে অনুবাদ করেছেন। এখন দেখছি, তা ছেপে বেরিয়েছে। এখান থেকেই। অবাকও হয়েছি। আলী আহমদের যোগ্যতা নিয়ে যে কোনো সংশয় আছে তা নয়। তাঁর পড়াশোনার বিসত্মার আমাকে অভিভূত করে। বিদেশি সাহিত্য তাঁর এত পড়া, কোনো কূল-কিনারা পাই না। মেধায় ও আগ্রহে সাহিত্যের মূল জায়গা যে তিনি ঠিক-ঠিক চিনে নেন, তা তাঁর লেখা পড়লেই বুঝি। তার পরেও আগুনপাখির অনুবাদ, আমার মনে হয়েছে, একটা বিরাট চ্যালেঞ্জ। ইংরেজি তিনি ভালোই জানেন। প্রকাশ-ক্ষমতায় কোনো ঘাটতি নেই। যদি তিনি হাসানের বিশেষ কিছু ছোটগল্প, অথবা এমনকি, উপন্যাস, সাবিত্রী উপাখ্যান, অনুবাদের জন্য বেছে নিতেন, তবে তাতে আমি সাগ্রহে সায় দিতাম। কিন্তু আগুনপাখির ব্যক্তিমায়া, এবং ব্যক্তিত্বমায়া এমনভাবে তাঁর ভাষায় জড়ানো, – যে-ভাষা হাসানের আয়ত্তে প্রতিভার উৎসে তাঁর হয়ে-ওঠার অভিজ্ঞতার দৈব অধিকারে, – যে তাদের সপ্রাণ সঞ্চারণ অন্য কোনো ভিন্ন সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যে লালিত ভাষার মাধ্যমে কতটুকু করা সম্ভব, এবং সম্ভাবনার সীমা কতটুকু হবে সারবান ও জ্যোতিষ্মান, চেতনায় কতটা তার প্রেরণা প্রসারিত হতে চায় ভবিষ্যতে, এসব নিয়ে প্রশ্নগুলো আপনা থেকেই মনের কোণে জেগে উঠছিল। সাহিত্য নির্মাণে এদের কথা যে অবশ্যই ভাবতে হবে – অনুবাদ ও নির্মাণকলাই – তা নিশ্চয় নয়। কিন্তু হাসানের এই বইয়ের বেলায় তাদের উপেক্ষা করাও যায় না।

আগুনপাখি আমাদের কথাসাহিত্যে স্বয়ং এক স্মারকচিহ্ন হয়ে উঠেছে, যা মাথা তোলে একক-মহিমায় তালগাছের মতো আকাশে। ‘দিকচিহ্ন’ বলছি না। কারণ, এর অনুসরণে আর কেউ অগ্রসর হয়ে আপন প্রতিভার স্বাক্ষর রাখবেন, এমনটি দুঃসাধ্যই মনে হয়। এর মৌলিক উপাদান এক ভাষার জগৎ, যা এর কথকতাকে রূপ দেয়, প্রাণের গৌরবে পূর্ণ করে, ঘটনাপ্রবাহের সচিত্র চলমানতা দেখায়। এখানে প্রতিটি শব্দ জীবন্ত, প্রতিটি বাক্য অদ্বৈত এবং কথামালার প্রতিটি খ- অনিবার্য। তারাই গড়ে তোলে সামগ্রিক প্রতিমা, আহবান ও আবেদন, যার প্রাকৃতে ও ঊর্ধ্বাকাশে। ভিন্ন মাধ্যমে, ভিন্ন আকারে এর যথাযথ সম্পূর্ণতা কতটা অক্ষয় থাকে, তার উত্তর নিশ্চয় অ-প্রয়াসে মিলবে না। আলী আহমদের প্রয়াস তাই আমাদের কাছে সংশয়দীর্ণ হলেও স্বাগত।

অনুবাদে আর একটা ব্যাপার ঘটাও অসম্ভব নয়। মূল লেখায় এমন কোনো বিষয় লেখকের অবচেতনে থাকতে পারে, অথবা না-ও থাকতে পারে, কিন্তু তাঁর কল্পসৃষ্টি স্বয়ং তার বীজ নিজের ভেতর বয়ে চলে, যা অনুবাদক সচেতনভাবে হোক, বা না হোক, ভিন্ন ভাষার প্রকাশ কুশলতার বাধ্যবাধকতায় অংকুরিত করে ফেলেন, এমনকি তাতে অর্থ-সংযোজনও ধরে ফেলতে পারেন। পাঠক বাড়তি কিছু পেতে পারেন, আবার একই কারণে মূলের কিছু হারাতেও পারেন। দুটো ভাষাতেই যাঁদের অনায়াস দক্ষতা আছে, এবং যাঁদের সাহিত্যিক অনুভূতি প্রখর, তাঁরাই হয়তো বিষয়টি বুঝবেন। অন্যথায় কী পেলেন, আর কী হারালেন, তার অনেকটাই মালুম করা আয়ত্তের বাইরে থেকে যাবে। দুধের বদলে কখনো দুধই পাই, যদিও একই স্বাদের নাও হতে পারে, আবার কখনো কখনো দুধের স্বাদ ঘোলে মেটাই। তার আকর্ষণও উপেক্ষার নয়, যদি তাতে মূলের সঠিক প্রতিধ্বনির চরিত্রলক্ষণ ফুটে ওঠে। তেমন না হলেও পাঠক মজতে পারেন, যদি তার অভিঘাত তাঁর বোধের জগতে সহৃদয় অনুরণন জাগায়। মূল বক্তব্যের অনুধাবন ও অনুসরণ অবশ্য থাকা চাই। ওমর খৈয়ামের অনুবাদ কামিত্ম ঘোষ ও নরেন দেব, দুজনই করেছেন। শুনেছি, কামিত্ম ঘোষ বেশি মূলানুসারী, কিন্তু নরেন দেব বেশি জনপ্রিয়। আমার শোনা কথাটাই বলছি। কারণ মূলভাষা আমার জানা নেই। যাদের জন্য অনুবাদ, তাদের গ্রহণক্ষমতা যে হিসাবের বাইরে থাকে না, এটাও বিবেচনায় চলে আসে। যে-লেখা অ্যাকাডেমিক, প্রতিটি শব্দের যথাযথ অবস্থান ও অর্থ-সংযোজন যেখানে গুরুত্বপূর্ণ, সেখানে এতসব না ভাবলেও চলে। মূলের প্রতি শতভাগ বিশ্বস্ত থাকা তাতে অবশ্যকর্তব্য। কিন্তু যেখানে ভাষার বিনিময়ে কল্পনা ও মননের সমন্বিত রূপ নতুন নিবাসে অবিকল থাকতে চায়, এমনকি তার সঙ্গে নতুন মূল্যের বা লাবণ্যের বিকাশ ঘটলেও তা অবিধেয় নয়, সেখানেই এসব বিষয় নিয়ে মাথা ঘামানো জরুরি হয়ে পড়ে।

 

দুই

আগুনপাখি হাসানের পর্যবেক্ষণক্ষমতার ও নিরাসক্ত তদাত্মিক বর্ণনা-প্রতিভার এক প্রকৃষ্ট উদাহরণ। একই সঙ্গে জীবন-যাপনে শ্রেয়তর মূল্যের সন্ধানে অবিচল থেকেছেন তিনি। আপস বা পক্ষপাত এতটুকু ছায়া ফেলেনি। তাঁর ভাব-কল্পনার আধার এক নারী, যিনি আত্মস্বরূপে স্বয়ংনিষ্ঠ, যদিও সে-স্বরূপ ক্রমাগত নির্মীয়মাণ। বাইরের ঘাত-প্রতিঘাত তাঁকে গড়ে-পিটে তাঁর আন্তর সত্তাকে জাগিয়ে তুলতে থাকে। তিনি সেই জাগরণের পথে অনাড়ম্বর স্বাভাবিকতায় অবিচল থেকেছেন। এবং তা তাঁর আপন ভূমিতে অখ্যাত, নিরহংকার ও নির্বিশেষ থেকেই। আটপৌরে জীবনের পরিপার্শ্বের বাইরে তিনি নন। বরং ওই পারিপার্শ্বই তাঁর অবলম্বন। এমনকি চৈতন্যে এক পা-এক পা করে সিঁড়ি ভাঙাও। হাসানের কৃতিত্ব তিনি ওই নারীকে তাঁর আপন জগৎ থেকে তুলে এনেছেন একেবারে তাঁর মতো করে। বাড়তি রং বা মসলার মিশেল নেই এতটুকু। অনাবিল সরলতা পূর্বাপর অটুট থাকে। কিন্তু আশ্চর্য! হতে না চেয়েও শিল্প হয়ে ওঠে। জীবন স্বয়ং তা গড়ে তোলে। কথামালাও ওই জীবনেরই। কৃত্রিমতা সচেতনভাবে এড়িয়েছেন হাসান। গ্রামীণ জনপদের বাইরে এক পা না ফেলেও এই নারী বিশ্ব-মাতৃকার আদল পায়। এবং মনে রাখি, এই জনপদ আজকের নয়, যখন তথ্য-প্রযুক্তি-বিপস্নবে ঘর-বার একাকার। গ্রাম মানে তখন আদি কল্পনার গ্রামই। গরুর গাড়ি-মোষের গাড়িতে যদ্দূর যায়, তদ্দূর এই নারীর আসা-যাওয়ার সীমা। গৃহকর্তা ঘোড়ায় চড়েন, এটা তাঁর আভিজাত্য। সফলতাও। অবশ্য ছেলেমেয়েরা শহরে যায়। পড়াশোনা করে। দূরের বাঁশি শোনা যায়। সরীসৃপের মতো ভাবনার নানা মুখ গ্রামেও ঢোকে। কিলবিল শুরু করে। এক সময়ে আঘাত হানে এই নারীর ওপরেও। মর্মামিত্মক আঘাত। তাঁর আত্মস্থ নির্মাল্য কিন্তু অটুট থাকে। সংবিৎ তিনি এতটুকু হারান না। পুরাণে পড়েছি, দেবী দুর্গার এক কাহিনি। দুই ছেলে কার্তিক-গণেশের ভেতর প্রতিযোগিতা – কে পারে দশদিক সম্পূর্ণ ঘুরে আগে ফিরে আসতে। ময়ূর-বাহনে ছুটে চলেন কার্তিক। জানেন, তিনিই জিতবেন। গণেশ তো স্থূলোদর। বাহন ইঁদুর জানে শুধু গর্তের সন্ধান। কিন্তু জিত্ হয় গণেশের। তিনি শুধু তাঁর মাকে প্রদক্ষেণ করেন, যিনি নিজেই জগন্মাতা। বাইরের সবকিছুই যে তাঁর আত্মস্থ! আগুনপাখির এই নারী যেন তেমনই। হাসানের অসামান্য শিল্পদৃষ্টি তাঁকে তাঁর পূর্ণতায় সংস্থিতা করেছে। এতটুকু কমবেশি নেই। আরো একটা বিষয়, পড়ার সময় একদম খেয়াল হয় না, পড়ার পরেও কোনো ঘাটতি আছে, টের পাই না এবং সত্যিই তা নেই, তা হলো, গোটা উপন্যাসে কোনো নাম বিশেষত নেই। একটা যে আছে, তা প্রকৃতপক্ষে ঘটনার বিশেস্নষণ। আগুন লেগে অর্ধেক গ্রাম পুড়ে ছারখার হলে এক ভট্চাজ মশাই তাঁর নবজাত ছেলের নাম রেখেছেন ‘ভু-ুল’ এইটে জানিয়ে যান। মাত্র ওইটুকুই। এছাড়া তার কোনো ভূমিকা নেই। কাহিনির বিসত্মার সবটা ওই নারীর স্বগতোক্তি। সংলাপ যা আছে সবই তাঁর রোমন্থন। কথায় বাবা, মা আছে, ‘কত্তা’ আছে, গিন্নি আছে, খোকা-খুকি আছে, ভাই-বোন আছে, রায়, ভট্চাজ, এরাও আছে; কিন্তু কেউ স্বনামে নেই। তেমন থাকলেই বুঝি এই কথকতার মৌলিক শুদ্ধতা ক্ষুণ্ণ হতো। ভাষাকে হতে হয়েছে পুরোপুরি সত্যনিষ্ঠ। সেভাবেই শিল্প-সাধনায় তার সিদ্ধি। তাতে আত্যমিত্মকভাবে বিশিষ্ট এই ভাষার বর্ণ-ও-বর্ণনা ভঙ্গি-ভাবের কাঙিক্ষত ও যথার্থ প্রকাশে অনন্য ও অবিচ্ছেদ্য হয়ে উঠেছে। এতটুকু অদল-বদলও কি এর সহ্য হবে? সমগ্রের রসরূপে কি তাল কেটে যাবে না? ছন্দপতন ঘটবে না? অবশ্য লেখক স্বয়ং যদি এই কল্পনা-কাঠামো অবিচল রেখে ঘটনার রূপ নির্মাণে কোনো পরিমার্জনা ঘটান, তবে তা ভিন্ন কথা। কিন্তু সেখানেও শিল্পের প্রাণবস্ত্তর নিষেধ তিনি মানতে বাধ্য।

আলী আহমদের অনুবাদকর্মটি পড়ার আগে আপনা থেকে এই কথাগুলো মনে আসে। তা অনুবাদকের অতি উচ্চমার্গের দক্ষতার পরিচয় জানা থাকা সত্ত্বেও। আগুনপাখির ‘সত্য’ কি অনুবাদযোগ্য? কিছু পারা গেলেও সবটুকু কি সম্ভব? ‘নিত্যের জ্যোতি দুর্যোগের মায়ার আড়ালে’ ঢাকা পড়ে যাওয়ার আশঙ্কা কি অমূলক? অস্বীকার করব না, এই সংশয়গুলো মাথায় নিয়েই অনুবাদটি পড়ায় মন দিই। তবে এ-বিষয়ে কিছু বলার আগে বইটির ভাববস্ত্ত আরো একটু বিশদ করা বোধহয় জরুরি। নইলে ‘মাথা নেই, তার মাথাব্যথা’ – এমন ‘Reductio ad absurdum’-এর অভিযোগ কেউ সহজেই তুলতে পারেন।

সামনের মলাটের ভাঁজে ভেতরদিকে বইটি নিয়ে যে ধারণাচুম্বক দেওয়া আছে, তা থেকে একটু পড়ি ‘… রাঢ়বঙ্গের এই ধূলিধূসরিত জনপদের এক নারীর জবানীতে উঠে এসেছে জীবন মন্থনের অমৃত ও গরল যা সমষ্টির নিজেরই বিষয়। গড়িয়ে আসা বিবিধ রাজনৈতিক তরঙ্গ উপলব্ধি ও জাগরণ, বিশ্বযুদ্ধের অসহ্য তাপ, মানবতালাঞ্ছিত মন্বন্তর, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা শেষাবধি দেশভাগ ঝলসে দেয় কোটি কোটি হৃদয়। মাটি-লগ্ন এক নারীর বসতভিটে আগলে দেশভাগে অস্বীকার প্রকাশ করে ভ্রান্ত রাজনীতির ভেদনীতি, অসার দেশভাগ ও লড়াকু জীবন।…’

সবই যথাযথ। অনুবাদেও এদের সরল রূপান্তর কতটা হলো, তা দেখতে চাওয়াই স্বাভাবিক। কিন্তু এ যথেষ্ট কি? ‘জনপদ’, ‘নারী’ ও ‘জবানী’, এই তিনকে উপন্যাসটিতে আলাদা করি কীভাবে? এদের সমন্বয়ে জারিত, মুকুলিত, বিকশিত যে-সত্তা আঘাতে, পুলকে, অনুরাগে, বিরাগে কালের প্রসারমান ধূম্রজালের ভেতর থেকে হয়ে উঠতে থাকে, হয়ে ওঠে, হাসান যাকে সমস্তটা নিয়ে প্রাণময়ী করে তোলেন, তাদের মর্মার্থিক প্রকাশের স্বাদই কি একে বিশিষ্ট করে তোলে না? অনুবাদের ভূমি যদি নিরপেক্ষ হয়, তবে সেখানে কি একে বোনা যায়? বোনা গেলেও তাতে কি পাতা গজায়? ফুল ফোটে? অথবা, এমনকি, ফণীমনসার কাঁটাও? হাসানের শিল্পসিদ্ধি কিন্তু এইখানেই। অনুবাদ পড়ার আগে তা মন থেকে তাড়াতে পারি না। কোনো অপ্রত্যাশিতের দেখা পাওয়ার সম্ভাবনাতেও উন্মুখ থাকি।

এবার আলী আহমদের অনুবাদের দিকে নজর দিই। আমাকে সত্যি-সত্যি মুগ্ধ করেছে, কী যত্ন নিয়ে কাজটি তিনি করেছেন। ফাঁকি নেই কোথাও। পড়তে শুরু করলে তরতর করে তা এগোয়। টুকটাক একটু-আধটু খটকা যে কোথাও লাগে না, তা নয়। হতে পারে, আমারই ভুল। আমি ইংরেজি তেমন জানি না। তবে অনুমান, ইংরেজি যাদের প্রথম ভাষা, তাদের সরাসরি বোধগম্যতার ওপর গুরুত্ব দেওয়ার ব্যাপারে তিনি সচেতন ছিলেন। মূলের অনুসরণে যাতে কোথাও কিছু বাদ না পড়ে সেদিকেও দৃষ্টি ছিল তাঁর। মনে হয়, তিনি সফল। অবশ্য এ-বিষয়ে শেষ কথা বলার আমি কেউ নই। যাঁদের অধিকার প্রকৃতিগত, অথবা মেধার কর্ষণায়, আমি তাঁদের দলে পড়ি না। তবে সর্বসাধারণের ইংরেজি ভাষা ও মাটির গন্ধমাখা বিশেষ এক অঞ্চলের বাংলা ভাষা, যাকে হাসান এখানে শুধু পরীক্ষামূলকভাবে নেননি, বিষয়-বিষয়ীর সমীকরণে শিল্পসিদ্ধির, তাঁর বিবেচনায়, সর্বোত্তম উপায় হিসেবেও নিয়েছেন বলে আমার ধারণা, এই দুটোকে একই তরঙ্গদৈর্ঘ্যে মেলানো আদৌ যায় কি না, সে নিয়ে সংশয় কিন্তু আমার রয়েই যায়। হাসানের রচনায় এখানে শব্দেরা সব ছবি আঁকে, ছবি স্থান-কালের মাত্রায় তাদের স্বরূপ ফোটায়, স্বরূপ মানব-মানবীর সত্তায় মেশে। আমাদের আকর্ষণকেও পথ দেখায়। ইংরেজি অনুবাদে সহজ-সরলতাকে চিনে নিতে ভুল হয় না। কিন্তু বাস্তবের প্রাণরূপের বড় জোর ইঙ্গিতটুকুই বুঝি পাই। আমি তো অন্য ভাষা জানি না। হয়তো অনুবাদে যা পড়ি, সবের বেলাতেই এমন ঘটে।

প্রায় একশ বছর আগে রাঢ়-বাংলার এক গ্রামে আগুনপাখি এই নারীর জীবনকথা শুরু। হাসান গ্রামের কোনো নাম দেননি। না বাপের বাড়ির, না শ্বশুরবাড়ির। আমার মনে হয়েছে, লেখক ভেবেচিমেত্মই এমন করেছেন। আর কে নারায়ণের মালগুড়ি, বিভূতিভূষণের নিশ্চিন্দিপুর অথবা মার্কেজের ম্যাকোন্দো, নামেই এরা একরকম কিংবদমিত্ম হয়ে উঠেছে। বিশেষ তো বটেই। হাসানের গ্রাম যে নির্বিশেষ, এইটিই বুঝি তিনি বলতে চান। কিন্তু তার রুক্ষ মাটি, চাষ-বাস, রোদ-বৃষ্টি, জল-হাওয়া, গাছ-পালা, ঘর-বাড়ি, লোকালয়-লোকজন, এসবের অনুপুঙ্খ বর্ণনায় কোনো খুঁত নেই, ক্লামিত্মও নেই। তবে ফটোগ্রাফি নয়, নিশ্চেতন নয়, বাস্তবের প্রাণই যেন উছলে পড়ে। ভ্যান গঘের অথবা আমাদের জয়নুল আবেদিনের ছবির মতো। যদিও হাসানের নিজস্ব ছাপ অভ্রান্ত। কলকাতা-বর্ধমানে যাতায়াতের খবর অবশ্য আছে। তাতে গ্রাম থেকে কেন্দ্রাতিগ ছক একটা মেলে। এও কোনো ব্যতিক্রম নয়। সব গ্রামেরই ছবি এমন।

তবে ওই নারীর সংসার-যাপনের কালেই বাইরের ঘটনাস্রোতের গ্রামে ঢোকা শুরু। তা দ্বন্দ্বমুখর। গ্রামে অভাবিতপূর্ব। পরিণামে সব অনাসৃষ্টি-অঘটন। মহামারি ও মন্বন্তরও আঘাত হানে। পারস্পরিক সাম্প্রদায়িক অবিশ্বাসের বীজ গ্রামেও ছড়ায়। হানা দেয় অস্থিরতা, অনিশ্চয়তা, এমনকি জাগে নতুন স্বপ্নের আশা। স্থিতিশীল জীবনের মূল শুদ্ধ উপড়ে আসে। এসবই আত্মস্থ করেন ওই নারী। এবং সঙ্গে সঙ্গে নিজেও প্রকাশমান হতে থাকেন। আমি বলব না, তিনি বিবর্তিত হয়েছেন। তাঁর অমত্মঃস্থ বোধ কেবল পরিস্থিতির ঘাত-প্রতিঘাত সামলে নিজের স্বরূপ উন্মোচন করে চলেছে। হাসানের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাকে এর সঙ্গে গুলিয়ে ফেলা ঠিক হবে না। বরং বলা যায়, দিব্য চক্ষুতে ওই সময়ের কোনো নারীকে অন্তরে-বাইরে নিবিড় পর্যবেক্ষণের পরিণাম এই আগুনপাখি

আলী আহমদের অনুবাদ, আগেই বলেছি, কুশলী ও আন্তরিক। মূলের সঙ্গে মিলিয়ে কটি নমুনা দিই। তাঁর সফলতার পরিমাপ, অনুমান করি, তাতে ধরা পড়বে –

১.  আমার মায়ের য্যাকন মিত্যু হলো আমার বয়েস ত্যাকন আট-ল বছর হবে। ভাইটোর বয়েস দেড়-দু বছর। এই দুই ভাই-বুনকে অকূলে ভাসিয়ে মা আমার চোখ বুজল। ত্যাকনকার দিনে কে যে কিসে মরত ধরবার বাগ ছিল না। এত রোগের নামও ত্যাকন জানত না লোকে। ডাক্তার-বদ্যিও ছিল না তেমন। মরবার আগে মুখে যেদি ওষুধ পড়ত, তাই কতো! পেরায় পিতিবছর কলেরা-বসমেত্মই কতো যি লোক মরত, তার সীমা সংখ্যা নাই। আমার মা যি কলেরা-বসমেত্ম না মরে অজানা কি একটা রোগে মারা গেল তাই কতো ভাগ্যি!

অনুবাদ : I was eight or nine when my mother died. And my brother was one or one-and-a half year old. She closed her eyes setting the two of us adrift. There was no knowing who died of what in those days. People also did not know the names of so many diseases. And there were no doctors or medicinemen worth their names. There was no counting of how many men or women died almost every year of cholera or small-pox. It was no small luck that my mother died of an unknown disease instead of cholera or small-pox!

২. শেষতক বাপজিকে আবার বিয়ে করতে হলো। লতুন মা এল ঘরে। পাতলা কালো মেয়ে, আমার চেয়ে ছ-সাত বছর বড়ো হবে। মাথায় লম্বা কালো চুল, হেঁটোর নিচে পড়ছে। বড়ো বড়ো চোখ দুটিতে ভারি মায়া। নিজের মা গেলে কি আর মা পাওয়া যায়! সি কথা সত্যি বটে। মা ফিরে প্যালমনা ঠিকই, তবে মায়েরই মতুন আর সেই সাথে সখির মতুন একজনাকে প্যালম। সংসারে আবার ছিরি ফিরল।

অনুবাদ : My father had at last to marry again. A new mother came to our house. A dark, slim girl about six or seven years’ older then I was then. She had long dark hair extending down to her knees. Her two large eyes were full of affection. It’s true there is no getting back the mother once one’s own mother departs from this earth! True, I did not get my mother back, but got someone like a mother and, along with that, someone like a friend. The household again found its lost grace.

৩. আমিও কি মনে করে মায়ের পেচু পেচু আসছেলম। দরজা পয্যন্ত এয়েচি, কানে এল বাপজি বলছে, আমার ভেঙে আমারই ছেলেকে যখন সে পর করে দিলে, ওর ছেলেকেও আর বেশি দিন স্কুলে যেতে হবে না –

হায় কি বললে, হায় কি বললে, ওগো, হায় কি বললে – দড়াম করে  আমি মাটিতে আছড়ে পড়লম, হায় ইকি বললে? কই, আমার মানিকরা কই, আমার জাদুরা কই! ওমা আমি এখুনি বাড়ি যাব, আমার বুকের ধন মানিকদের নিয়ে এখুনি বাড়ি যাব। ই বাড়িতে আর এক দ- নয়। এই রেতেই যাব।

৩. Thinking of what I do not remember, I also followed my mother. When I had reached the door, I heard my father saying, since he has caused estrangement of my own son from me, his son would also not be required to go to school for long –

Alas! What has he said! Oh, what has he said! – O-h-! I crumbled down to the ground with a thud. Oh, what is this he has said? Oh, where are my darlings, where are the apples of my eyes? Oh my god, I’ll go back home right now, right now with my darlings, my hearts! Not a moment more in this house. I’ll go back this very night.

৪. আমি কি ঠিক করলম? আমি কি ঠিক বোঝলম? সোয়ামির কথা শোনলম না, ছেলের কথা শোনলম না, মেয়ের কথা শোনলম না। ই সবই কি বিত্তি-বাইরে হয়ে গেল না? মানুষ কিছুর লেগে কিছু ছাড়ে, কিছু একটা পাবার লেগে কিছু একটো ছেড়ে দেয়। আমি কিসের লেগে কি ছাড়লম? অনেক ভাবলম। শ্যাষে একটি কথা মনে হলো, আমি আমাকে পাবার লেগেই এত কিছু ছেড়েছি। আমি জেদ করিনাই, কারুর কথার অবাধ্য হইনাই। আমি সবকিছু শুদু নিজে বুঝে নিতে চেয়েছি। আমাকে কেউ বোঝাইতে পারলে না ক্যানে আলেদা একটো দ্যাশ হয়েছে গোঁজামিল দিয়ে যিখ্যানে শুদু মোসলমানরা থাকবে কিন্তুক হিঁদু কেরেসত্মানও আবার থাকতে পারবে। তাইলে আলেদা কিসের? আমাকে কেউ বোঝাইতে পারলে না যি সেই দ্যাশটো আমি মোসলমান বলেই আমার দ্যাশ আর এই দ্যাশটি আমার লয়। আমাকে আরো বোঝাইতে পারলে না যি ছেলেমেয়ে আর জায়গায় গেয়েছে বলে আমাকেও সিখানে যেতে হবে। আমার সোয়ামি গেলে আমি আর কি করব? আমি আর আমার সোয়ামি তো একটি মানুষ লয়, আলেদা মানুষ। খুবই আপন মানুষ, জানের মানুষ, কিন্তুক আলেদা মানুষ।

৪. Did I do the right thing? Could I understand it properly? I did not listen to the entreaties of my husband, my son and my daughter. Have they all not been out of the ordinary? People give up something in order of gain something in return. What do I gain in return for what? I pondered deeply over the mother. I finally came to the conclusion that I gave up so much only in order to get myself back. I was not obstinate, nor did I disobey anyone. I only wanted myself to understand everything. None could convince me why a separate country had to be created ostensibly for the Muslims, but where through an unconvincing manipulation, Hindus and Christians could also live! What separateness, then, is that? No one could also convince me that the other country is mine just because I happen to be a Muslim, whereas this one is not. Nor could anyone convince me, further, that I have also to go to the other place simply because my children have gone there. What else would I do if my husband goes? My husband and I are not one person. We are two different individuals. He is, no doubt, very close to me, closer indeed to my heart than many, but he is also a different person.

[শেষ উদ্ধৃতিতে হাসানের সক্রেটিস রচনার প্রেরণার উৎস কোথায় তা কি বোঝা যায় না? বই পড়ে নয়, বাস্তবে ব্যক্তি ও সমষ্টির মুখোমুখি হয়ে এক নারীর শ্রেয়বোধের জাগরণে?]

যে কেউ খেয়াল করবেন, আলী আহমদ মূল থেকে একেবারেই সরে আসেননি। অনুবাদে কোনো আড়ষ্টতাও নেই। কিন্তু তারপরেও আগুনপাখির স্থান-কাল-পাত্রের মুক্তধারা এখানে বুঝি অনুবাদেই আটকে থাকে। যদি সীমাবদ্ধতা তেমন থেকে যায়, তবে তার জন্যে আলী আহমদকে আমি বিন্দুমাত্র দায়ী করি না। দায়ী তাঁর ভাষার ঐতিহ্য ও সমাজগত চারিত্র্য-বেশিষ্ট্য। আগুনপাখির প্রাণৈশ্বর্য সবটা তাতে ফোটে কি?

তবে এই অনুবাদ পড়তে গিয়েই অন্য কটি সংযোগরেখা আমি যেন দেখতে পাই, যা আমি নিশ্চিত, লেখার সময় হাসানের একবারও চোখে পড়েনি। আসলে এই রেখাগুলো দেবোত্তর সম্পত্তির মতো। তারা থেকে যায়। এবং থেকেই যায়। আগুনপাখির ভাষার সরলতার দীপান্বিতায় তারা আলোর নিচে অন্ধকারের মতো আড়ালে থাকে। অনুবাদে বুঝি ধরা যায়। অবশ্য যদি সত্যিই তা হয়। আমার ভুল বিচিত্র নয়।

আমি যা দেখি, তা হলো, উপন্যাসে শুরুর বেশ কিছুটাতে বঙ্কিমের ইন্দিরার মেজাজের ছায়াপাত, যদিও প্রেক্ষাপট ও বলার কথা, একটা থেকে অন্যটায় যোজন-যোজন দূর। দ্বিতীয় যে-বিষয়টি মনে আঁচড় কাটে, তা মাঝখানটাতে লালবিহারী দে-র The Bengal Peasant life-এর দূরাগত প্রতিধ্বনির কিঞ্চিৎ মিশ্রণ। বিষয়ভূমির মিল ছাড়া এতে বাড়তি আর কোনো কিছুই বলার নেই। তৃতীয় কথাটি আমি অবশ্য আগুনপাখি পড়ে আগেও বলেছি। এখানে আবার বলি। আগুনপাখির নারী অমিত্মমে রবীন্দ্রনাথের গোরার আনন্দময়ীর স্মৃতি জাগান, যদিও দুজনের কালিক ও সামাজিক অবস্থান ঘটনাপ্রবাহের দুই ভিন্ন বৃত্তে। অনুবাদ পড়ার আগেই আমার এ-কথাটা মনে আসে। পরেও তা মস্নান হয় না।

এবার একটা মৃদু আপত্তির কথা জানিয়ে শেষ করি। বইয়ের নামকরণে আলী আহমদ আগুনপাখির আক্ষরিক অনুবাদ করেছেন, The Firebird। এতে কি আগুনপাখির মর্মার্থ ঠিক-ঠিক ফুটল? আমি ইংরেজি জানি না, তা আবার বলি। তার পরও কটি বিকল্পের কথা মাথায় আসে। দুর্বিনয়ের অভিযোগ উঠলেও চেপে রাখতে পারি না। বলেই ফেলি :

১. The Bird of Light in Her Nest ২. Alone Against the Tide (হাসানের বাড়ির নাম, উজান), ৩. The White Flame in Her Soul (সার্ত্রের Iron in the Soul মনে করে)। কোনোটিই হয়তো উপযুক্ত নয়। তবে The Firebird আমাকে সন্তুষ্ট করে না।

বইটি সামনে রেখে আরো একটি কথা যোগ করি। তবে এর সঙ্গে এই বই নিয়ে আলোচনার কোনো সম্পর্ক নেই। বাংলা ভাষাভাষী এই সমগ্র ভূখ– গোটা আঠারো শতক যত দুর্যোগে পরিকীর্ণ ছিল, তার তুলনা খুব কমই মেলে। মুর্শিদকুলী খানের রাজস্ব-নীতি কোনো স্বাধীন রাষ্ট্রের ছিল না। এ-অঞ্চল দিলিস্নর সম্রাটের উপনিবেশই ছিল। রাজ্য শাসনের সঙ্গে প্রজা-পালনের যোগ সামান্যই ছিল। চলিস্নশের দশক থেকে বর্গির হাঙ্গামায় পূর্ববঙ্গ পর্যন্ত সন্ত্রস্ত হয়ে উঠেছিল। নবাব আলীবর্দি খানকেও উড়িষ্যার বিসত্মীর্ণ অঞ্চল তাদের ভেট দিয়ে তুষ্ট করতে হয়। গোলাম হোসেন তবাতয়ীর শিয়ারউল মুতাক্ষরীণের বিবরণ অনুযায়ী সিরাজউদ্দোলার অসংযমী দুর্বৃত্তপনায় কোনো সীমা ছিল না। প্রজাকুল ভীতসন্ত্রস্ত থাকত। ১৭৫৭-র পর ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির দাপটের শুরু লুণ্ঠন দিয়ে। ১১৭৬-এর (১৭৭০ খ্রিষ্টাব্দে) মন্বন্তরের মতো এত বড় দুর্ভিক্ষ এদেশে আর কখনো ঘটেছে বলে জানি না। মোট জনসংখ্যার এক-তৃতীয়াংশ মারা যায়। উচ্ছন্নে যায় আরো কত। বঙ্কিমের পদচিহ্ন গ্রামের বর্ণনায় অতিরঞ্জন নেই। পরে ফকির বা সন্ন্যাসীরাও উৎপাত কম করেনি। উনিশ শতকের দ্বিতীয় ভাগ তুলনায় শান্ত, তবে আদৌ মানব-কল্যাণমুখী নয়। ‘ছায়াসুনিবিড় শামিত্মর নীড় ছোট-ছোট গেহ’গুলির কথা হয়তো তখন বাস্তব মনে হয়। তবে এক গ্রামেই সাত পুরুষের বাস, এমন পরিবার খুব কমই মেলে। চলাচল সমতলীয়ই থাকে, আলম্ব হবার কোনো সুযোগই সৃষ্টি হয় না। বিশ শতকের কথা এখনও অনেকের অভিজ্ঞতায় তাজা। কাজেই তা নিয়ে কিছু বলা নিষ্প্রয়োজন। শুধু এটা মনে রাখি, এই উপমহাদেশে জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, এসবের ধ্যান-ধারণা তার আগে ছিল না। বিশেষ করে জাতীয়তাবাদের প্রয়োগের দ্বান্দ্বিক প্রকাশ ঘটে এই সময়ে। সুফল যা মিলেছে, তা পেয়েছি অতি চড়া দাম দিয়ে। তেমন চড়া দাম দিতে হয়েছে, দিতে হচ্ছে পৃথিবীতে অন্যত্র আর সবাইকেও। প্রশ্ন হলো, আমরা কি তা সত্ত্বেও এগোতে পারছি?

শেয়ার করুন

Leave a Reply