অমর্ত্য সেনের ন্যায়-ভাবনা

লেখক:

সনৎকুমার সাহা
অমর্ত্য সেন এই সময়ের সেরা চিন্তাবিদদের একজন। তাঁর যে কোনো বই  পৃথিবীর নানা প্রান্তে মনীষীমণ্ডলীতে আলোড়ন জাগায়। শুধু পাণ্ডিত্যের জন্যে নয়, যদিও তাঁর পাণ্ডিত্যের গভীরতা ও বিস্তার বিস্ময়কর কেবল তার ঝলকেই অভিভূত হতে হয় বারবার, সঙ্গে যোগ হয় তাঁর চিন্তার সৃষ্টিশীলতাও। ধ্যান-ধারণার জগৎকে তা প্রসারিত করে, নতুন পথে চালিতও করে। অর্থনীতিবিদ হিসেবে তাঁর খ্যাতি বিশ্বজোড়া। কিন্তু বিদ্যাশৃঙ্খলার এই বৃত্তেই শুধু ঘোরাফেরা তাঁর নয়। তার সীমা ছাড়িয়ে অনায়াসে তিনি চলে আসেন মানববিদ্যার অন্যান্য পরিমণ্ডলে। এবং সেসবেও তাঁর দৃষ্টি একই রকম অন্তর্ভেদী। জ্ঞানের অভিযান এমন এক জায়গায় পৌঁছোয়, যেখানে বিবিধ বিদ্যার চূড়ান্ত প্রশ্ন সব একাকার হয়ে যায়। তিনি তাদের মুষ্টিবদ্ধ করেন। সংগতি ও সংহতিও তাদের খুঁজে দেখতে চান। আবেগের চূড়ায় উঠে নয়, নিরাসক্ত তার্কিকের যুক্তিবুদ্ধি দিয়ে পথ কেটে কেটে। তাঁর অর্থনীতি এতে যেমন নতুন ভূখণ্ডে পা রাখে, তেমনি অন্যান্য বিদ্যাও নড়েচড়ে বসে। নিজেদের দিকে তাকাতে তারা বাধ্য হয়।
তবে নিষ্কাম শূন্যতা অথবা তারই অন্যতম যৌক্তিক পরিণামফল, নির্বিকার বিনষ্টি, কিংবা তার বিপরীতে স্বকাম স্বার্থ-তাড়নায় অশক্ত অযোগ্য অসহায়কে পেছনে ফেলে সর্বোত্তম লাভের পেছনে ছোটা, এগুলো তাঁর প্রশ্রয় পায় না। যে মানবভূমিতে তাঁর উদ্ভব, এবং যার সময়টাকে তিনি মনে করেন তাঁর ভাবনার বিষয়, তারই ন্যায়সংগত বিকাশের পথ-সমুদয় তিনি খোঁজেন। এই ন্যায় উপেক্ষা করে না অসমর্থকে, কেড়ে নিতে চায় না কারো সত্যিকারের সামর্থ্যকে; বরং করার এবং হবার ক্ষমতা যাতে সবার ভেতরে ছড়ায়, এটিই তার প্রাথমিক লক্ষ্য। এই লক্ষ্য সামনে রেখে মানব-উন্নয়নের সূচক রচনায় তিনিই দেন নেতৃত্ব। হয়তো এখনো তা আমাদের চিন্তায় প্রধান নিয়ামক হয়ে ওঠেনি। কিন্তু সব দেশেই মানুষের সমাজভাবনায় তা একটু-একটু করে বেশ খানিকটা ঢুকে পড়েছে। একে আর উপেক্ষা করা চলে না। যদিও জানি, সমাজের সমস্তটার চাল-চলনের পেছনে রয়েছে অসংখ্য তাগিদ, অনেকগুলো আবার পরস্পরবিরোধী এবং জীবনানন্দ যাকে অন্য প্রসঙ্গে বলেছেন, ‘ভিড়ের হৃদয় পরিবর্তন’, সেই ভিড়ের হৃদয়েরও এ মুখাপেক্ষী। অতএব, প্রেক্ষাপটের এবং কর্মতৎপরতার সবটাই তার আয়ত্তাধীন নয়। তবু তাঁর লক্ষ্য থেকে তিনি সরে আসেন না। যেটুকু তাঁর সাধ্য, তা তিনি ঢেলে দেন।
এরই প্রকাশ আবার দেখি তাঁর অন্যতম সাম্প্রতিক বই The Idea of Justice-এ। ২০০৯-এ প্রথম ছেপে বেরোয়। তাঁকে নিয়ে যাঁদের কৌতূহল আছে তাঁরা জানেন, হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি ছাড়াও তিনি একই সঙ্গে দর্শন ও অঙ্কশাস্ত্রের অধ্যাপক। এখনো। বিলেতে কেমব্রিজ, অক্সফোর্ড ও লন্ডন স্কুল অফ ইকোনমিকসেও তিনি পড়িয়ে এসেছেন। সৃষ্টিশীল বিদ্যাচর্চায় তার প্রভাব গভীরভাবে পড়েছে সেসব জায়গাতেও। এবং তা আগ্রহ জাগিয়েছে বিশ্বের সর্বত্র। আমরা তাই অবাক হই না, যখন দেখি, অর্থনীতির বাঁধা সড়ক থেকে সরে এসে তিনি ন্যায়-অন্যায়ের তত্ত্বগত ও প্রায়োগিক ভাবনা নিয়ে মাথা ঘামাচ্ছেন এবং সেখানেও তাঁর মৌলিক চিন্তা অতি বিশিষ্ট বলে বিবেচিত হচ্ছে। একমত না হলেও – বিদ্যার এই শাখায় সর্বতোভাবে একমত হওয়া দুরূহ – কেউ তাঁকে উপেক্ষায়-অবহেলায় দূরে ঠেলে দিতে পারছেন না। বরং চিন্তার কেন্দ্রভূমিতেই তিনি থেকে যাচ্ছেন।
এটাও জানিয়ে রাখি, অর্থনীতির বিভিন্ন শাখাতে তাঁর স্বচ্ছন্দ বিচরণ। উন্নয়ন-অর্থনীতি যখন আলাদা করে গুরুত্ব পেতে শুরু করেছে তখন অতি নবীন গবেষক হিসেবে The Choice of Technique লিখে বিদ্বৎ-সমাজের সর্বোচ্চ স্তরেও তিনি সাড়া জাগান। হিকস, ক্যালডর, এঁদের মতো মহারথীরাও তাঁর চিন্তাকে বিশেষ মূল্যবান মনে করেন। অর্থনীতির পদ্ধতি-প্রকরণে তখন অঙ্কশাস্ত্রের উচ্চতর প্রণালির প্রয়োগ ঘটতে শুরু করেছে। এতেও তাঁর সিদ্ধি সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করে। অবশ্য নিও-ক্ল্যাসিক্যাল তত্ত্বচর্চায় হাতসাফাইয়ের কাজে গাণিতিক প্রমাণের সূত্র ও শর্তের ব্যবহারের দিকটা তিনি সহজেই ধরে ফেলেন। ওই পথ থেকে সরেও আসেন। তাই বলে অঙ্ককে বিদায় দিয়ে নয়। বরং তাকে আরো উন্মুক্ত ও প্রশস্ত প্রেক্ষাপটে ব্যবহারের জন্য তার ক্ষেত্রকে নতুনতর ও বিকল্প পরিস্থিতির অধিকতর সম্ভাবনার দিকে প্রসারিত করে। শুধুই আর্থিক উন্নয়ন নয়, ন্যায়সংগত মানবিক উন্নয়নের যৌক্তিক পথরেখা তিনি খোঁজেন। বিষয় আর গতানুগতিক অর্থনীতিতে সীমাবদ্ধ থাকে না। ন্যায়-অন্যায়ের বিচার-বিশ্লেষণও তাতে ঢুকে পড়ে। অথবা বলা যায, সমাজের চলমান বাস্তবতায় প্রথাসিদ্ধ অবিচার ও অন্যায় থেকে ভুক্তভোগী মানব-মানবীর মুক্তির ধারণা তাঁর কাছে বেশি প্রাসঙ্গিক মনে হয়।
এতে দৃষ্টিভঙ্গি যেমন বদলে যায, তেমনি কাক্সিক্ষত সমাধানসূচিও আমাদের চেনা চেহারায় আর থাকে না; ভিন্নভাবে আমরা তাকে রচনা করায় উৎসাহী হই। অর্থনীতির অভ্যস্ত পাঠে এখনো এই প্রত্যয় প্রায় অবিসংবাদিত যে, সীমিত সাধ্যের ভিতরে প্রত্যেকে তার উপযোগ বা তৃপ্তি – ইংরেজিতে যাকে বলি ইউটিলিটি, সর্বাধিক করার তাগিদ থেকে বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে লিপ্ত; সমাজের লক্ষ্যও সব মিলিয়ে তাই। কিন্তু মৌলিক সমস্যা এইখানে যে, ইচ্ছামতো সহায়-সম্বল বাড়ানো যায় না, এবং সুনির্দিষ্ট সম্পদের ভাগ-বাটোয়ারায় একজন বেশি পেলে কেউ না কেউ অবশ্যই কম পায়। একইভাবে একজন তার কেনাকাটায় কোনো জিনিস বেশি পেতে চাইলে অন্য কোনোটা অবশ্যই কম কিনতে বাধ্য হয়। তার যদি সঞ্চয়ের সামর্থ্য থাকে, তবে সঞ্চয়ের পরিমাণটাও এখানে একটা বিবেচ্য দ্রব্যের তালিকায় এসে পড়ে। উপযোগ পরিমাণের হিসাবে সেটাও গণ্য হয়। সঞ্চয়ের ভবিষ্যৎ ব্যবহারে সম্ভাব্য ফল লাভের ধারণা সেখানে বিবেচনায় এসে যায়।
এখন সমস্যা হলো, এই উপযোগ একজনের বেলায় বেশি কিংবা কম হলো এটা যদিও তার কাছ থেকে জেনে নেওয়া সম্ভব বলে ধরে নেওয়া যায়, তার ওই উপযোগের পরিমাণ ঠিক কত, তা কিন্তু সংখ্যা দিয়ে সর্বজনগ্রাহ্য একটা আকারে এনে তুলে ধরা যায় না। এটা সম্পূর্ণত ব্যক্তিগত এবং আত্মগত; তাই একজনের তৃপ্তি-অতৃপ্তি শুধুমাত্র তার নিজের। অন্য কারোটার সঙ্গে তার তুলনা চলে না। যোগ-বিয়োগের ফল-নির্ণয়ও করা যায় না। তাহলে একটা সমাজে সার্বিক কর্মকাণ্ডে উপযোগের হিসাব আমরা বের করি কী করে? অথচ সর্বাধিক মানুষের সর্বাধিক উপযোগের – এবং সেই সূত্রে গোটা সমাজের সর্বোত্তম বৈষয়িক অবস্থার লক্ষ্য সামনে রেখেই পরিচালিত হচ্ছে আধুনিক সমাজ-অর্থনীতির চর্চা।
উপযোগ-পরিমাপের দিকে না গিয়ে প্রত্যক্ষবাদের বৃত্তে থেকে প্রাপ্তিযোগ্য দ্রব্যরাশির বিভিন্ন সমাহার সাজিয়ে তা থেকে মানুষের পছন্দক্রমের ধারণা একটা খাড়া করেন স্যামুয়েলসন। শর্ত দেন শুধু, এই ক্রম ধারাবাহিকভাবে গতিশীল (ট্রানসিটিভ) ও অপরিবর্তনীয় (কনসিসটেন্ট); এবং তা থেকে প্রতিটি মানুষ যে তার সহায়-সম্বলের পুরো ব্যবহার ঘটিয়ে তার সর্বোত্তম পছন্দ বেছে নিতে পারে, তা নিশ্চিত করেন। উপযোগের পরিমাপ না করলেও সেইখানে তার উপযোগেরও ওই পরিস্থিতিতে সর্বোচ্চকরণ। এইরকম সব মানুষের আচরণ একত্র করে আমরা পাই সমাজের সবচেয়ে পছন্দের অবস্থান। এবং সময়ের যে-কোনো নির্ধারিত বিন্দুতে তার অস্তিত্ব প্রকাশমান। তেমনটি ঘটে বলেই সবাই পারস্পরিক যোগাযোগে নির্বিবাদে তাদের ব্যবহারিক কাজকর্ম করে চলে। একটা স্থিতিশীলতা ও ধারাবাহিকতা বজায় থাকে।
কিন্তু আমরা ধরে নিই সমাজ-সংসারে সম্পদের বিলি-বণ্টনের একটা পূর্বনির্ধারিত ছক। সম্পদের পরিমাণ শুরুতে অপরিবর্তিত থাকলেও ওই ছক তো উলটে-পালটে করা যায় অসংখ্য। বাস্তবেও তা স্থির থাকবে, এমনটি আশা করা যায় না। স্থির থাকা যে কাম্য, এটিও সবসময় বলা যায় না। তাহলে একটা পরিস্থিতিতে সবাই তাদের পছন্দের আশানুরূপ প্রকাশ ঘটিয়ে প্রত্যাশিত ফল পাচ্ছে, এটা জেনে আমরা নিশ্চিন্ত থাকি কী করে? ওই ছকটাই তো বদলে দেওয়া সম্ভব। তাতে সবার অবস্থার পরিবর্তন হতে পারে। প্রত্যেকেই হতে পারে আগের চেয়ে খুশি, অথবা এমনও হতে পারে কেউ বেশি খুশি হলো, কেউ বা অখুশি। তেমন হলে সবমিলিয়ে ভালো-মন্দের বিচারে কোনো সিদ্ধান্তে কি নিশ্চিতভাবে আসতে পারি? নাকি সবটাই ছেড়ে দিই ঘটনার নিজস্ব গতির ওপর? ইতালীয় চিন্তাবিদ পারেটো (১৮৪৮-১৯২৩) এই সিদ্ধান্তে আসেন, সমাজের সর্বোত্তম অবস্থা সেইটি, যেখানে কারো ভালো করতে হলে অন্তত একজনকেও ক্ষতিস্বীকার করতে হবে। সম্পদের পূর্ণ সদ্ব্যবহার এতে নিশ্চিত হয়। বিশ্বসেরা অর্থনীতিবিদরা পরে এটা প্রমাণ করেন, একটি পূর্ণ প্রতিযোগিতামূলক বাজার ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করে; এবং এই ভারসাম্য পারেটো-উত্তমায়নের শর্ত পূরণ করে। বাজারের প্রতিযোগিতা কর্মতৎপরতা অব্যাহত রাখে। প্রত্যেকে নিজের-নিজের সাধ্যের ভেতর আপন-আপন চাহিদা মিটিয়ে সর্বোচ্চ পরিতৃপ্তি পেতে চায়, নিজের যোগ্যতারও পূর্ণ সদ্ব্যবহার করে সর্বোচ্চ দাম পাবার চেষ্টা করে। পারেটোর শর্ত মেনে দুটোতেই সে সফল হয়। সমাজ তার কাম্যাবস্থায় পৌঁছোয়। এবং তা বজায় থাকে। প্রত্যেকের পছন্দের মুক্তপ্রকাশ ঘটে। প্রত্যেকে তার নিজের ভালো – এবং নিজের ভালোই – সবচেয়ে বেশি পেতে চায়। সর্বতোভাবে মুক্তবাজার পারস্পরিক স্বার্থের সামঞ্জস্য ঘটিয়ে তার সুষ্ঠু সমাধান দেয়। সংখ্যা দিয়ে ব্যক্তিগত তৃপ্তির কোনো পরিমাপ করা না গেলেও এই পরিস্থিতিতে কারো ক্ষতি না করে তা যেমন আর বাড়ানো যায় না, তেমনি সমাজে সম্পদের সদ্ব্যবহারেও কোনো অপূর্ণতা থাকে না। প্রত্যেকের ইচ্ছার মুক্তি, সামাজিক কর্মকাণ্ডের স্বয়ংক্রিয়তা ও উৎপাদনে সর্বোত্তম দক্ষতা এক বিন্দুতে এসে মেলে।
তবে এই সর্বোত্তম বিন্দু আবশ্যিকভাবে বৈষম্য ঘোচায় না। প্রতিযোগিতায় কেউ জেতে, কেউ হারে। বাজারের অনিশ্চয়তা তার সাধারণ লক্ষণ। এবং কেউ কোনো কারচুপি না করলেও সবাই সমান সুযোগ-সুবিধা নিয়ে শুধু করে না, একই প্রান্তরেখায় সবাই একইভাবে পৌঁছোয় না। যদিও পারেটো-শর্ত বজায় থাকে ঠিকই। তৃপ্তির কোনো সংখ্যাগত পরিমাপ নেই। তবু ক্যালডর, হিকস ও স্কিটভস্কি এক কাল্পনিক পুনর্বণ্টন ব্যবস্থার সম্ভাবনা সামনে এনে পারেটো উত্তমায়নের অনির্দিষ্টতাকে সংকুচিত করার চেষ্টা করেন। উদ্দেশ্য, বাজার-ব্যবস্থায় হস্তক্ষেপ না করে বৈষম্যের বিস্তার হ্রাস করার সরকারি নীতিমালা – কর অথবা ভর্তুকিতে – নির্দেশ করে তার যৌক্তিকতা তুলে ধরা। কিন্তু কোনো সন্তোষজনক কার্যকর পন্থার রূপরেখা এ থেকে বেরিয়ে আসে না।
সবাই মিলে তাদের আপন-আপন উপযোগের ক্রম অক্ষুণœ রেখে মতামতে সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে একটি গ্রহণযোগ্য সিদ্ধান্তে পৌঁছুবে, এমনটি ভাবা যায়। কিন্তু কেনেথ অ্যারো তাঁর বিখ্যাত বিধ্বংসী কাজ, Social Choice and Individual Values ঠধষঁবং (১৯৫১) বইতে, এটা নিশ্চিতভাবে প্রমাণ করে ছাড়েন যে, ব্যক্তির পছন্দ-অপছন্দের পুরোপুরি যুক্তিসংগত, সুষ্ঠু ও সাধারণভাবে অবিতর্কিত ক্রম সবার বেলায় সমানভাবে প্রযোজ্য ধরে নিয়ে অগ্রসর হলেও সামষ্টিক সিদ্ধান্ত শেষ পর্যন্ত স্ববিরোধে আটকে যায়। যে ব্যবস্থাই নিতে চাই না কেন, তা একনায়কোচিত হয়ে পড়ে। গোটা সমাজের সার্বিক আকাক্সক্ষার প্রতিফলনে অথবা জনগণের ইচ্ছানুযায়ী তার সর্বাধিক কল্যাণসাধনে এতদিন ধরে মৌরসি পাট্টায় রাজত্ব করে চলা উপযোগ তত্ত্ব কোনো কাজে আসে না।
উপযোগ-তত্ত্বের ভাঙা দুর্গে এই পোড়ো জমির ওপর দাঁড়িয়েই অমর্ত্য সেনের নতুন পথ খোঁজা। অবশ্য কেনেথ অ্যারোর প্রেরণা ও শিক্ষা আত্মস্থ করে। তিনি প্রথমেই খারিজ করেন প্রচলিত উপযোগ- তত্ত্বের প্রাথমিক প্রত্যয়রাশিকে। প্রত্যেকের পছন্দক্রম আবশ্যিকভাবে একমুখী ও অবাধ, এটা তিনি বিবেচনায় আনেন না। পারস্পরিক-তৃপ্তির-মাত্রার-তুলনা কোনো হিসাবে নেওয়া যাবে না, এটাও তিনি মানেন না। বস্তুগত সীমার ভেতরে মানুষের বসবাস। সেখানে তার কল্পনার ঘুড়ি ইচ্ছামতো আকাশে ওড়ানোর প্রয়োজন নেই। ওই কল্পনার ঘুড়িও তার চেতনার সীমাতে বন্দি। এবং ওই চেতনার সীমা ব্যক্তির বাস্তব অবস্থার সৃষ্টি। তার চাওয়া-পাওয়ায় এর মূল্য আছে ঠিকই। কিন্তু একেই সার্বভৌম ও অখণ্ডনীয় ধরে এগোলে শুরুতেই বৈষম্যের স্বীকৃতি একটা জুটে যায়। উচ্চবিত্ত কারো পছন্দক্রম ও কোনো দিনমজুরের পছন্দক্রমকে সমান গুরুত্ব দিয়ে সমাজনীতি রচনা করতে চাইলে এই সমস্যার মুখোমুখি হতেই হয়। পারেটো-উত্তমায়নের শর্ত লঙ্ঘিত হয় না যদিও। দ্বিতীয়ত, পছন্দ ও পছন্দ-পরিণামের ভেতরে সম্পর্ক সুনির্দিষ্ট ও সুনিশ্চিত, এটা ধরে নিলে তাতে অতিসরলীকরণের অভিযোগ তোলা যায়। ‘যাহা চাই, তাহা ভুল করে চাই, যাহা পাই, তাহা চাই না’ – এটা নিছক কাব্যকথা নয়, আমাদের প্রতিদিনের বাস্তব অভিজ্ঞতার নির্যাসও কিছু এতে ফুটে বেরোয়। তাকে পুরোপুরি উপেক্ষা করা অন্যায়। পাশাপাশি, তার পছন্দক্রমের আংশিক, কিন্তু অতি আবশ্যিক, মৌলখণ্ড একটা বেছে নেওয়া অসম্ভব নয়। স্ব-বিরোধিতার জালও তাতে এড়ানো যায়। কিন্তু সমষ্টি-ভাবনায় প্রত্যেকের তৃপ্তি-অতৃপ্তির পুরো ছবি মাথায় নিয়ে তাদের যোগফল কোথায় সর্বাধিক তা নির্ধারণ করায়, অথবা ওই সর্বাধিকের চলমান রেখা বা অবস্থান খোঁজায় মনোনিবেশ তাঁর কাছে অনর্থক মনে হয়।
কে কত আয় করে, অথবা, কার কত সম্পদ, এর গণনাও তাদের ভালোমন্দ-অবস্থার বিবেচনায় তিনি যথার্থ মনে করেন না। কারণ সব মানুষের প্রয়োজন একরকম নয়। অসুস্থ, দুর্বল বা অক্ষম যে, ভালো থাকার জন্যে খরচের দরকার তার বেশি। সুস্থ ও অসুস্থ দুজন মানুষের আর্থিক সংগতি সমান হলেও তারা একইরকম থাকে না। সমাজের সার্বিক কল্যাণ, অথবা তার শ্রীবৃদ্ধি যদি কাম্য হয়, তবে যে দুর্বল, তার দিকে বেশি নজর দেওয়া যৌক্তিক ও আবশ্যিক হয়ে পড়ে। আপেক্ষিক ভালোমন্দর হিসাব সামাজিক ন্যায়বিচারের বাইরে রাখা যায় না। পারেটো-উত্তমায়নকে প্রাধান্য দিলে এটা কিন্তু আড়ালেই থেকে যায়।
আমাদের সামাজিক কল্যাণভাবনা যখন এইভাবে একটা বৃত্তে ঘুরপাক খেতে থাকে, তখন অমর্ত্য সেন নতুন কিছু ধ্যান-ধারণা নিয়ে এসে সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। এই অভিমত তিনি ব্যক্ত করেন, ব্যক্তি বা সমষ্টির উপযোগ নয়, আয় বা সম্পদ নয়, বরং নানা কাজে নানা হয়ে ওঠায় তার সক্ষমতার (কেপেবিলিটিজ) বিকাশই তার আপেক্ষিক অধিকার নির্দেশ করে। মনোজগতের খবর নেওয়ার এতে প্রয়োজন পড়ে না। তার বাস্তব ক্রিয়াকর্মে এবং ক্রিয়াকর্মে মূল্যমান-সংযোজনের যোগ্যতার ওপর তা নির্ভর করে। প্রত্যক্ষের পরিমাপে তাকে আনা যায়। সবমিলিয়ে সূচকের নির্মাণে কমবেশিও তুলনা করা যায়। তবে সমাজের ন্যায় সবার বেলায় নিরপেক্ষ, এই শর্ত অচল হয়ে পড়ে। অক্ষমকে সক্ষম করে তোলা, অথবা তার সক্ষমতা বাড়ানো অধিকতর গুরুত্ব পায়। কারণ পরিণামে এতে গোটা সমাজেরই সক্ষমতার মান বাড়ে। মানুষের করা এবং হওয়ার ক্ষেত্রে বৈচিত্র্য আসে। তা প্রসারিত হয়। মানুষের এই সমৃদ্ধতর ও ব্যাপকতর বিকাশই উন্নয়ন। এবং এই উন্নয়নই তার বস্তুজগতে মুক্তির উপায়।
সক্ষমতাকে বস্তুগ্রাহ্য করতে চাই গণমানুসের পুষ্টি, চাই সুস্বাস্থ্য ও ‘আনন্দ-উজ্জ্বল-পরমায়ু’। আরো চাই জাত-ধর্ম-বর্ণ-নির্বিশেষে সমতা ও নিরাপত্তা, চাই ক্রিয়াকর্মে সচলতা ও মতপ্রকাশের অধিকার। দারিদ্র্য বা বঞ্চনা, সমাজে নারীর অধিকার-হরণ, নিরক্ষরতা বা কুসংস্কারে আচ্ছন্নতা, এগুলো সবই সক্ষমতার পথে অন্তরায়। মানুষের কল্যাণকে তারা বাধাগ্রস্ত করে। আরো বলবার, এসবই প্রত্যক্ষ জগতের বিষয়। এবং এদের সংখ্যা গণনায় আনা সম্ভব। তবে একজনের সন্তুষ্টির সঙ্গে অন্যজনের সন্তুষ্টি তুলনীয় নয়, প্রথাসিদ্ধ এই ধারণাকে শুরুতেই বাতিল বলে গণ্য করতে হয়। কাউকে অখুশি করে বহুজনের উপকার সামাজিক ন্যায়বিচারের আওতার বাইরে থাকে না। শুধু দেখার ব্যক্তির সঙ্গে সমষ্টির আপেক্ষিক সক্ষমতা এবং সেইসঙ্গে সমাজে ক্রিয়াকর্মে তাদের মূল্য-সংযোজনের সুযোগ সংখ্যায় ও গুণগত মানে বাড়লো, কি বাড়লো না।
এই জায়গায় দাঁড়িয়ে The Idea of Justice বইতে অমর্ত্য সেন তাঁর ন্যায়-ভাবনার সুসম্বন্ধ প্রকাশ ঘটান। তবে তিনি শুরু করেন তর্কের পথ ধরে। এ বিষয়ে তাঁর দক্ষতা প্রশ্নাতীত। এবং জ্ঞানের গভীরতা বিস্ময়কর। অ্যারোর অসাধারণ কীর্তির পর সামাজিক ন্যায়বিচার নিয়ে আবার নতুন করে চিন্তার দরজা খুলে যায়। তবে তা উপযোগের ও পারেটো-তত্ত্বের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে। এরই অতি প্রসিদ্ধ পরিণাম, ১৯৭১-এ, জন রউল্সের (John Rawls) A Theory of Justice| ৩০০ বছরের ইউরোপীয় কল্যাণভাবনার ধারাকে তিনি অস্বীকার করেন না। তবে তাকে পুনর্নির্মাণ করেন। ন্যায়ের আদর্শ এক পরিপূর্ণ রূপ পায়। অশেষ শ্রদ্ধা ও সহমর্মিতা নিয়ে অমর্ত্য সেন রউল্সের বক্তব্যকে এখানে তাঁর চিন্তার প্রাথমিক ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করেন। তবে তা করেন তাঁর দ্বিমত প্রকাশের জন্যেই। এবং এই দ্বিমতেরই জোরালো যুক্তিক্রমে রচনা তাঁর The Idea of Justice| আমরা জানি, জ্ঞানের ঐতিহ্য সারবান ও প্রাণবান থাকে মুক্তচিন্তায় তর্কের এই ধারায়। কোনো মতবাদ খণ্ডিত হলে তার প্রতি কোনো অসম্মান জানানো হয় না। বরং তাকে যে তর্কের বিষয় করা হয়, এতে তার গুরুত্বই বাড়ে। অমর্ত্য সেনের এই বই পড়লেও এটা বোঝা যায়। তিনি আবার তাঁর চিন্তাধারায় ইউরোপলগ্নই শুধু থাকেননি। প্রাচ্য-পাশ্চাত্য সব সূত্র থেকেই তাঁর জ্ঞান তিনি আহরণ করেছেন। মোক্ষম যুক্তি খাড়া করে তিনি তর্কে মেতেছেন। বইটির আলোচনায় এই কথাটি আমরা মনে রাখি। তাঁর The Argumentative Indian-এর কথাও মনে হয়। আমরা অনুপ্রাণিত বোধ করি।
একটা কথা এখানে বলে রাখি। সামাজিক ন্যায়ের ভাবনা-কাঠামো রচনায় অমর্ত্য সেন উপযোগ-তত্ত্বের অসারতা বোঝাতে তাঁর যুক্তি খাড়া করেছেন। কিন্তু প্রশ্ন জাগে, বাজারের কর্মকাণ্ডের ব্যাখ্যায় চাহিদার দিকটি দেখতে চাইলে তার পেছনে ব্যক্তির উপযোগের গুরুত্ব কি পুরোপুরি অস্বীকার করা যায়? ক্রিয়াকর্মের সক্ষমতা বাড়বে, এই লক্ষ্য। কিন্তু কেন ক্রিয়াকর্ম? কেন তা মূল্য পাবে? ব্যক্তি, এবং ব্যক্তির সমষ্টিতে সমাজ যদি তা না চায়, তবে সবটাই কি অর্থহীন নয়? বাজারের ভারসাম্য খুঁজতে গেলে, তা সে প্রতিযোগিতার যে-কোনো মাত্রাতেই হোক, চাহিদার দিকটি এবং তার পেছনে পছন্দের বিষয়টি এড়ানো যায় না। কী চাই আমরা, এটাও নৈর্ব্যক্তিকভাবে জানা হয় না। মানুষের সক্ষমতা তাহলে তাদের খেয়ে-পরে বাঁচার পর্যায় পর্যন্ত হয়তো স্থির করা যাবে,          কিন্তু তারপর যৌক্তিক মান কিছু দাঁড় করানো মুশকিলই। ক্ল্যাসিক্যাল চিন্তাবিদরা উৎপাদনের খরচের ভিত্তিতে দামের হিসাব কষতেন। মার্কসও ক্ল্যাসিক্যাল ছিলেন। সাম্প্রতিককালে আমরা কিন্তু দেখেছি, সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থায় যে বড় ধরনের বিপর্যয় তার একটা প্রধান কারণ ছিল, মানুষের পছন্দ-অপছন্দকে আদৌ বিবেচনার ভেতরে না-আনা।
তবে ব্যক্তিস্বার্থের ভিত্তিতে পছন্দের যে সংজ্ঞা, এইখানে কিছু ভাবার আছে। হয়তো এতে চটজলদি সিদ্ধান্তে আসা যায়, যাকে বলে অবান্তর বিষয় থেকে চোখ সরিয়ে রাখা (Independence of irrelevant alternatives)তাকে কাজে খাটানো যায়, কিন্তু  পুরোপুরি বাস্তবসম্মত হয় না। এমনকি পরিসংখ্যানেও তাৎপর্য নেই বলে একে খারিজ করা যায় না। নিছক আপন-স্বার্থ ছাড়া পরার্থপরতাও ব্যক্তির অন্যতম বৃত্তি। অবশ্যই সবার একরকম নয়। কিন্তু এর অস্তিত্বের নিশ্চিত বৈজ্ঞানিক প্রমাণ এখন মানতেই হয়। ব্যক্তিমানুষের পছন্দ-অপছন্দে তা অন্তর্ভুক্তি দাবি করে। বাজারের তত্ত্বে কৌশলগত দিক না হলেও ভাবনার দিক তাতে প্রসারিত হয়। সমাজকল্যাণের প্রেক্ষাপটও বোধহয় বস্তুসামগ্রীর বিষয়-বৈচিত্র্যে হওয়া সম্ভব। এবং তা অনন্যনির্ভর থাকে না, যদিও চাওয়া-পাওয়ার পেছনে প্রত্যেকে নিজের নিজের মতো ছোটে। বাজার তাকে মান্য করে। এবার The Idea of Justice বইটির ভেতরে ঢোকার চেষ্টা করি। পৃথিবীর সেরা পণ্ডিত যাঁরা, যেমন হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের হিলারি পুটনাম, অক্সফোর্ডের জি এ কোহেন (এখন পরলোকে), স্টানফোর্ডের কেনেথ অ্যারো ও লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিলিপ্পে ভ্যান পারিজ, এঁরা সবাই একবাক্যে বইটির প্রকাশনায় তাঁদের সাধুবাদ জানিয়েছেন। তাঁরা সবাই মনে করেছেন, সমাজ-মানুষের ন্যায়-ভাবনার গভীর অনুশীলন ঘটেছে এখানে। লেখকের মননে নি-িদ্র যুক্তি ও মানবিক দায়বোধ একই সঙ্গে কাজ করে। এঁদের সবার মন্তব্যের উদ্ধতি আছে বইয়ের পেছনে। কেনেথ অ্যারো জানান, এর চেয়ে ভালোভাবে আমি বুঝিয়ে বলতে পারবো না, তাই উদ্ধৃতি  দিচ্ছি – In view of his intellectual depth and breadth, it is not surprising that Sen’s analysis of the concept of justice is a major critical analysis and synthesis. The variety of viewpoints precisely reflects his inclusive approach, transcending the many important scholars and viewpoints that he analyzes. Add to this the depth of empirically relevant knowledge and analytic capability, and we are presented with a set of considerations on justice of importance to both the academic community and the world of policy formation. বইটি নিয়ে কথা বলতে গিয়ে আমি শুধু আর একটু যোগ করি, অনেক কথা আমি ইংরেজি শব্দ দিয়েই বোঝাতে বাধ্য হবো। তাদের বাংলা করা যে অসম্ভব, তা নিশ্চয় নয়। তবে ইংরেজি শব্দগুলোর ব্যঞ্জনা আমাদের কাছে বেশি পরিচিত। তাদের প্রয়োগেও বিদ্বৎ সমাজ বেশি অভ্যস্ত। পারলে বাংলায় তাদের বোঝাবার চেষ্টা অবশ্য সাধ্যমতো করবো।

দুই
আমরা বলেছি, জন রউল্সের A Theory of Justice কে ভিত্তিভূমি ধরে অমর্ত্য সেন তাঁর নিজস্ব চিন্তাকে ভিন্নখাতে প্রবাহিত করেন। রউল্সের বক্তব্য তাই এখানে তিনি অনুপুঙ্খ বিচার করে সেখান থেকে তাঁর প্রতিপাদ্য রচনায় অগ্রসর হন। খেয়াল রাখেন, যেন কোনো আতিশয্য কোথাও হানা না দেয়। এবং একই সঙ্গে রউল্সের অবিসংবাদিত মর্যাদাও যেন কোথাও ক্ষুণœ না হয়। দার্শনিক বিতর্কের সর্বোচ্চ মান তিনি বজায় রাখেন। বিষয়-ভাবনা স্বয়ং গতি পায়। এবং নিজেরও কিছু তিনি তাতে যোগ করেন।
রউল্সের সর্বজনমান্য প্রবন্ধ ‘Justice as Fairness’ ১৯৫৮-য় প্রথম প্রকাশিত হয়।  Theory of Justice-এ তার মূল কথাগুলো চলে এসেছে। ‘Justice as Fairness’ বলতে কী বুঝি? ন্যায়, যা সংগত, তাই? তা হলে good বা right কী good হলেই কি তা right? অথবা right মানেই good? তা তো নয়। বাংলায় তফাৎগুলো নিয়ে আসা, আমার কাছে বেশ গোলমেলেই ঠেকে। ভাষার ও অভিজ্ঞতার নিজস্ব ধারা, বোধহয়, একটা কাজ করে। এ বিষয়ে কথা বলার কোনো যোগ্যতা আমি দাবি করি না। আপাতত ‘সংগত’, এই শব্দ দিয়ে fairness- এর ধারণা দেওয়ার চেষ্টা করি।
প্রথমেই যা বলার, তা হলো, এই ‘ন্যায়’ একজনের, বা, কতিপয়ের নয়। বহু রকমের বহু মানুষের – হতে পারে জাত, ধর্ম, বর্ণ, বিষয়-আশয়, কর্মকুশলতা, একেক জনের একেক রকম – মিলিত জীবনযাপনে পারস্পরিক সংযোগ-সহযোগ, সমন্বয় ও সমুন্নয় যে স্বাভাবিক সম্মতির ভিত্তিতে পরিচালিত হয় বা হতে পারে, তাকেই বলা যেতে পারে ‘সংগত’। এবং একত্রিত, কিন্তু বহু-বিচিত্র এই জীবনচর্চায় যা ‘ন্যায়’, তা ‘সংগত’। আপাতসরল মনে হলেও বিষয়টি সর্বজনস্বীকৃত, এই হিসেবে সহজসাধ্য নয়। আবার অবাস্তবও নয়। পছন্দ-অপছন্দ একেকজনের একেক রকম। চিন্তা-ভাবনার বৃত্তও সবার এক নয়। তাদের মান্য করেই ন্যায়-ভাবনার প্রতিষ্ঠা খোঁজা। এবং বাস্তবে এই ন্যায়ের প্রয়োগ ঘটানো। তার নির্মাণকলাও তাই বিবেচনায় আসে।
রউল্স এই পরিস্থিতিতে এক কাল্পনিক বাস্তবতার প্রস্তাব করেছেন। তিনি চান, প্রত্যেকে ভুলে যাক তার সামাজিক অবস্থান, তার চাওয়া-পাওয়া, তার কায়েমি স্বার্থ। নৈর্ব্যক্তিকভাবে প্রত্যেকে যদি কোনো বিষয়ের মুখোমুখি হয়ে সার্বিক বিচারে সর্বোত্তম সমাধানের লক্ষ্যে একত্রে নিষ্পত্তি খোঁজে, তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত যাতে পৌঁছোনো যাবে তাকে বলা যেতে পারে ন্যায়সংগত। অবশ্যই সহজ নয়। পরস্পরবিরোধী বহু লক্ষ্য একই সঙ্গে সামনে এসে দাঁড়াতে পারে। সবগুলোই হতে পারে জরুরি। এবং সাধ্যের সীমায় সবগুলোর উদ্ধার দুঃসাধ্য। কারো, অথবা, কোনো কোনোটির আপেক্ষিক ক্ষতি তাই মেনে নিতেই হয়। সবাই কাল্পনিক নিরপেক্ষ অবস্থান থেকে একত্রে বসে পাওয়া-না-পাওয়ার মূল্য বিচার করে গোটা সমাজের জন্যে ন্যায়ের কাঠামো একটা তৈরি করবে, অথবা, ন্যায়ের সংগত লক্ষ্য স্থির করে দেবে।
এরই ভিত্তিতে রউল্সের ন্যায়বিচার প্রথমেই নিশ্চিত করে সবার জন্যে সমান অধিকার। তা একজনের বেলায় যেমন, আরেকজনের বেলাতেও তেমন। এই অধিকার চলাফেরায়, চিন্তা-ভাবনায়, কথা বলায়, এবং দল গড়াতেও। ব্যক্তিগত বিষয়-আশয়ও এই অধিকারের আওতায় পড়ে। আপন আপন যোগ্যতায় তা বাড়াবার সুযোগও, মেনে নেওয়া হয়, প্রত্যেকের সমান। তবে ব্যক্তিগতভাবে কেউ উৎপাদনের উপায়গুলো দখল করে অন্যদের ওপর কর্তৃত্ব করবে, এটা তিনি শুরুতেই তাঁর ন্যায়ভূমিতে খারিজ করে দেন। সেটা মানলে সর্বজনীন মৌলিক অধিকারের প্রাথমিক শর্তই খণ্ডিত হয়। অবশ্য সমান সুযোগ-সুবিধা থাকলেও মেধা কর্মকুশলতা ও পরিবেশের বিভিন্নতায় কেউ বেশি বা কেউ কম সফল হবে, এটা তিনি উপেক্ষা করেন না। তাঁর ন্যায়বিচার একে গুরুত্বের সঙ্গেই মূল্য দেয়।
তবে সবার জন্যে সমান সুযোগ চাওয়ার কারণেই তিনি আরো জুড়ে দেন আর্থ-সামাজিক বিষম বণ্টনের শর্ত। এই বৈষম্য তিনি তৈরি করতে চান যারা বঞ্চিত ও অবহেলিত, তাদের অনুকূলে। তিনি চান, নিু সুবিধাভোগী মানুষেরা যেন বিকল্প যে কোনো অবস্থা থেকে বেশি ভালো থাকে। দয়া-দক্ষিণ্য দিয়ে নয়, তাদের রোজগারের ক্ষমতা বাড়িয়ে। এতে একটি মুক্তসমাজ ব্যবস্থায় তারাও নিজেদের পায়ে দাঁড়িয়ে আরো ভালো থাকার কথা ভাবতে পারবে, আরো নতুন সম্ভাবনায় সমতার ভিত্তিতে প্রতিযোগিতায় নামতে পারার যোগ্য হয়ে উঠতে থাকবে। গণতন্ত্র তাহলে সত্যিকারের অর্থবহ হবে। বিষয়-সম্পদের মালিক হওয়ার সুযোগ থাকবে সবারই।
তাহলে একদিকে মনসা-কর্মনা-বাচা সবার সমান অধিকার এবং তা অবাধ ও বস্তুর সীমায় ক্রমসম্প্রসারমান, আর তারই সঙ্গে সামাজিক বণ্টন-ব্যবস্থায় নিুতর আয়ের জনসমুদয়ের পক্ষে সচেতন ও সুবিন্যস্ত বৈষম্য রচনা, এই হলো রউল্সের ন্যায়তত্ত্বের মূল প্রতিপাদ্য। প্রথম অংশটুকুর মূল লক্ষ্য অভাবনীয় নয়। প্রতিটি মানুষের আকাক্সক্ষার চরিতার্থতার কথা, তার তৃপ্তি সর্বোচ্চ করার স্বাধীনতার কথা, এবং তারই পরিণামে সমাজে মোট তৃপ্তি বা উপযোগ সর্বাধিক করার কথা আমরা শুনে আসছি প্রায় অপ্রতিহতভাবেই যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতা, ফরাসি বিপ্লব ও ইউরোপীয়, বিশেষ করে ইংল্যান্ডের, শিল্প বিপ্লবের কাল থেকেই। প্রয়োগকলায় অবশ্য রউল্স অ্যারোর অসামান্য কীর্তির পর নিরপেক্ষ-যৌক্তিক-ভূমির নতুনত্ব এনেছেন। তবে আরো বেশি মনোযোগ আকর্ষণ করে তাঁর ডিফারেন্স প্রিন্সিপ্ল – বৈষম্যের প্রস্তাবনা। সব মিলিয়ে সমাজে সার্বিক সমন্বিত ন্যায়ের একটি গ্রহণযোগ্য তত্ত্বই তিনি উপস্থাপন করেছেন। বলা যেতে পারে, এ এক আদর্শ ব্যবস্থা – সোশ্যাল কনট্রাক্ট। এই সোশ্যাল কনট্রাক্টের ধারণা অবশ্য নতুন নয়। হবস (১৫৮৮-১৬৭৯), লক (১৬৩২-১৭০৪), হিউম (১৭১১-৭৬), কান্ট (১৭২৪-১৮০৪) – ইউরোপীয় ভাবনাবিশ্বে একটা পর্যায়ে তাঁরা প্রত্যেকে এইভাবে সমাজনির্মাণের কথা ভেবেছেন। মানুষের সমাজ। সে কারণে দায় মানুষেরই। কিন্তু বিধিবিধান যেহেতু ঈশ্বরের কল্পিত চিরায়ত নির্দেশের বিকল্প, তাই তা স্বয়ং দাবি করতে চায় এক ধরনের সমগ্রতা ও চিরকালীনতা। ফলে গুরুত্ব পায় এমন কনট্রাক্ট যা দল-মত-ব্যক্তি-নিরপেক্ষ সক্রিয়তার ও স্থিতিশীলতার প্রকাশ ঘটাতে পারে। সাম্প্রতিককালে এই ধারাকেই পরিবর্তিত প্রেক্ষাপটে পুষ্ট করেন জন রউল্স।
অমর্ত্য সেন শুরু করেন জন রউল্সের চিত্তভূমি এবং চিন্তাভূমির বিকশিত দৃশ্যপটের ওপর গভীরভাবে দৃষ্টি নিবদ্ধ করে। বলা যেতে পারে, তিনি রউল্সীয় তত্ত্বের অনুরাগী সমালোচক। তত্ত্বের অখণ্ডতাকে ও তার বক্তব্যের যথার্থতাকে তিনি অস্বীকার করেন না। কিন্তু প্রশ্ন তোলেন বাস্তবে তাদের প্রাসঙ্গিকতা নিয়ে। ন্যায়ের পূর্ণাঙ্গ আদর্শ তারা তুলে ধরে, সেই আদর্শে কীভাবে পৌঁছুতে পারি, তা তারা বলে না। সোশ্যাল কনট্রাক্টের ধারণা সমৃদ্ধ হয় যদিও। মানুষের পার্থিব জীবনে প্রত্যক্ষ চয়ন ও গঠনকলা অসংখ্য হ্যাঁ-না-এ ভরা। সেইখানে প্রশ্ন ওঠে, কী ন্যায়, আর, কী তা নয়। জানিই বা তা কী করে? এবং জানাই যথেষ্ট নয়। প্রয়োগসিদ্ধিও তার বিবেচনায় আসে। এখানে এক আদর্শ-প্রস্তাবনা, যতই যৌক্তিক, সার্বিক ও সুসংহত হোক, যতই তাতে মন সাগ্রহে সায় দিক, তা কার্যত বিফলে যায়। প্রয়োজনীয় বা পর্যাপ্ত, কোনোটাই তা হয় না। বাস্তবকে তা প্রত্যাখ্যান করে না ঠিকই, কিন্তু বাস্তবকে অতিক্রম করে যায় – ‘ট্রানসেনডেন্টাল’ (transcendental) ভাবনাবিশ্ব একটা রচনা করে। যাপিত জীবনে প্রশ্ন মীমাংসার খোঁজ তাতে মেলে না।
কিন্তু ইউরোপীয় এনলাইটেনমেন্টেরই অন্য এক ধারা বাস্তবের মুখোমুখি সরাসরি দাঁড়ায়। সমস্যার সবটুকু দেখে; এবং সেখানে ন্যায়ের পথ বাতলাতে চেষ্টা চালায়। অ্যাডাম স্মিথের The Theory of Moral Sentiments, অমর্ত্য সেনের বিবেচনায়, ওই ধারায় সর্বাগ্রগণ্য স্মরণীয় ও অনুসরণীয় উদাহরণ। আরো আসেন পরে জন স্টুয়ার্ট মিল, কাল মার্কস, এঁরা। আসেন আঠারো শতকেই মুক্তমনা নারী চিন্তাবিদ মেরি উলস্টোনক্রাফট। তাঁরা কোনো ন্যায়রাজ্যের পরাকাষ্ঠা দেখাতে চান না; বরং ভালোমন্দ, উচিত-অনুচিতে মেশানো এই জগৎসংসারে কীভাবে কতটা ন্যায়ের পথে এগোনো যায়, তাই নিয়ে ভাবেন, সমাজব্যবস্থায় প্রথাশাসিত বা অভ্যাসলালিত অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হন। যেমন উলস্টোন- ক্রাফট। তাঁর ঞযব The Vindication of the Rights of Men (1790) I The Vindication of the Rights of Women (1792)  আজো আমাদের চিন্তার মুক্তির পথ দেখায়, ন্যায়কে সর্বাত্মক করার জোরালো দাবি তোলে। প্রথমটিতে আমেরিকার স্বাধীনতার প্রেক্ষাপটে তিনি প্রশ্ন তোলেন ওই স্বাধীনতা কেন ক্রীতদাসদের মুক্তি দেয় না, আর দ্বিতীয়টিতে, এখন যা নারীমুক্তির ভাবনা-কাঠামোয় প্রথম ও প্রধান সুসম্বন্ধ তাগিদ, তিনি জানতে চান, নারীরা কেন পুরুষের সমান অধিকার পায় না। অমর্ত্য সেন এঁদের কথাই শুধু বলেন না, নিজেও এঁদেরই সার্বিক দৃষ্টিভঙ্গি অনুসরণ করেন। ন্যায়ের আদর্শ কল্পরাজ্য-নির্মাণে তিনি মাথা ঘামাতে চান না। কারণ, তা অনায়ত্তই থেকে যায়। কী করে বাস্তব তার জটিল কুটিল বিন্যাসে, তার বহুমাত্রিক মিত্রভেদে ও মিত্রপ্রাপ্তিতে কম দুঃসহ হয়, কী করে অন্যায়ের পরিসর সংকুচিত করা যায়, দ্বন্দ্বের নিরসনে যুক্তিতে ও ঘটনায় তাল মিলিয়ে সুবিচার-সমঝোতার আবহ পারস্পরিক আলোচনায়, আর বোঝাপড়ায় রচনা করা যায়, তার যুক্তিসিদ্ধ পথের সন্ধানই তিনি করেন। প্রত্যক্ষবাদ (Positivism)  থেকে তিনি সরে আসেন না। কেবল তার প্রয়োগ-ভাবনাকে আরো ঘটনার বিস্তারের সঙ্গে যুক্ত করেন। The Idea of Justice-এ জন রউল্সকে সশ্রদ্ধ নমস্কার জানিয়েই তিনি তাঁর আদর্শ সমাধান থেকে দৃষ্টি সরিয়ে কার্যকর সমাধানের পন্থা-পদ্ধতি বেছে নিতে আপনার যুক্তি-বুদ্ধির অসামান্য রীতিসিদ্ধ প্রয়োগ ঘটান। যোগ হয় তার সঙ্গে চোখ-ধাঁধানো পাণ্ডিত্য ও অত্যন্ত স্বাদু কিন্তু শক্তিশালী গদ্য। কোনোক্রমেই একে আমরা অবহেলা করতে পারি না। তবে ইউরোপীয় এনলাইটেনমেন্টের ঐতিহ্যে প্রবলভাবে থাকলেও গোটা বিশ্বের, বিশেষ করে প্রাচ্যের মননশীল প্রশ্ন-মীমাংসার, অথবা অমীমাংসার ধারা থেকেও তিনি তাঁর প্রয়োজনীয় সমিধ আহরণ করেন। তাঁর ন্যায়-ভাবনার প্রেক্ষাপটের সঙ্গে তা খাপ খেয়ে যায়।
জোর দেন তিনি ন্যায়কে সর্বজনীন করার ওপর, এবং ওই সর্বজনীনতার পেছনে কর্তা-কর্ম সম্পর্ক-সম্বন্ধ ও তার পরিণাম- ফলের ওপর। কিন্তু কার চোখে? কীভাবে? বিচার যে নিরপেক্ষ, এটা দাবি করি কী করে? আবার বিচারধারা যদি এক ও অনন্য হয়, এবং তার নির্ধারণ যদি লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায়, তবে কি ঘুরপথে আবার সোশ্যাল কন্ট্রাক্টই ফিরে আসে না? এই সমস্যা থেকে পার পেতে তিনি বেশ খানিকটা অ্যাডাম স্মিথের স্মরণ নেন। তাঁর থিয়োরি অফ মর‌্যাল সেন্টিমেন্টসে তিনি যে নিরপেক্ষ দর্শকের (Impartial spectator) কথা বলেছেন, তার ধারণাকে তিনি সামনে আনেন। হতে পারে সে যে-কোনো দেশের যে-কোনো সংস্কৃতির। হতে পারে বহুবাচনিক। নিজেকে বিচ্ছিন্ন করে নিরাসক্ত দৃষ্টিতে সে বাস্তবের বিকল্প সম্ভাবনাগুলো যাচাই করে দেখবে। এটা যে সরলরৈখিক, তা নয়। স্থান ও কালের বৃত্তে তার ভালোমন্দের ক্রমবিন্যাস। আরোপিত নয়। অতুলনীয়ও নয়। পরিস্থিতির পরিবর্তনে তাতেও পরিবর্তন ঘটা সম্ভব। কিন্তু তার নিরপেক্ষতা অপরিহার্য। এইখানে অমর্ত্য সেন তাঁর সোশ্যাল চয়েস তত্ত্বের পদ্ধতি-প্রকরণের আশ্রয় নেন। ব্যক্তিগত লাভ-ক্ষতি নয়, পছন্দ-অপছন্দ নয়, বিভিন্ন বিষয়ে সামাজিক অগ্রাধিকারের যৌক্তিক মানদণ্ডের ভিত্তিতে তিনি তাদের মূল্যবিচারের কথা বলেন। এবং তারই পরিণতিতে নির্মাণ করতে চান সামাজিক ন্যায়ের সূচক। সংখ্যা দিয়ে তা বোঝানো চলে। বাড়া-কমাও তাতে দেখানো যায়।
জন রউল্সের ‘প্রাথমিক অবস্থানেও’ নিরপেক্ষতার কথা বলা আছে। তবে তা কোনো সমাজ বা রাষ্ট্রের সব মানুষের বেলায় ধরে নেওয়া। বাইরের কারো কথা এখানে আসে না। ওই আত্মস্বার্থ-বিস্মৃত অবস্থায় সার্বিক ক্রিয়াকর্মে পারস্পরিক যোগসূত্রের স্পষ্ট ধারণা নিয়ে তারা কেবল নিজেদের জন্যেই প্রস্তাবিত শর্ত মেনে একক সর্বোত্তম সমাধান নির্দেশ করে। অ্যাডাম স্মিথের নিরপেক্ষ দর্শক খোলা চোখে-খোলা মনে যে কোনো জায়গা থেকে সব কিছু দেখে। এবং সে এক নয়, বহু। অন্তত প্রায়োগিক দিক থেকে তাই। কোনো শাশ্বত সমাধান সে খোঁজে না। প্রত্যক্ষ বাস্তবের সীমাতেই তার চোখ। ন্যায় সেখানে ধারণামাত্র নয়; ওই নির্ধারিত প্রেক্ষাপটে তা কর্মসূচিতে রূপায়ণযোগ্য। এই কারণেই থাকতে পারে তার বিবিধ বিকল্প। অমর্ত্য সেনের মতে, এটা কোনো ত্রুটি নয়, বরং গুণ। ন্যায় তাহলে এক সংকীর্ণ সুড়ঙ্গে আটকা পড়ে থাকে না। এবং নানা দিক থেকে নানা পরিণামের কথা ভেবে তার মূল্যায়নের সুযোগ থাকে। তবে দৃষ্টির স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা অপরিহার্য। তা নইলে বহু মানুষের বার্তা-বিনিময় নিরর্থক, এমন কি, ক্ষতিকারক হয়ে পড়তে পারে।
কিন্তু লক্ষ্য-নির্ধারণ জরুরি। অমর্ত্য সেন এই জায়গায় রউল্সের শর্তাবলি উপেক্ষা বা অস্বীকার না করে তাদের নিশ্চিতভাবে বস্তুমুখী করে তোলেন। আগেই দেখেছি সক্ষমতার ধারণাকে তিনি মানুষের ভালোমন্দের বিবেচনায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বলে সামনে নিয়ে এসেছেন। তৃপ্তি বা উপযোগের মাত্রা মেপে, আয় বা সম্পদের হিসাব নিয়ে বা কে কত খরচ করলো, তা জেনে তার প্রকৃত অবস্থার সঠিক ছবি আমরা পাই না। সে কী হতে পারে, আর কী করতে পারে, তাই দিয়ে বরং তার স্বাধীনতা এবং ওই স্বাধীনতার সীমাকে আমরা অনেক বেশি স্পষ্ট করে ফুটিয়ে তুলতে পারি। কারো অনেক রোজগার কিন্তু চিকিৎসা-খরচে চলে যায় তার আয়ের বিপুল অংশ, তাকে যথেষ্ট সক্ষম বলা চলে না। আয় বা অর্থ ব্যয়, কোনোটিই তার সচ্ছলতা বা জীবনক্ষমতা নির্দেশ করে না। লেখাপড়া যারা জানে না, কাজের সুযোগ তাদের সীমিত। ফলে এক সংকীর্ণ গণ্ডির ভেতরে তাদের সারাটা জীবন কেটে যায়। তারাও পড়ে তুলনায় দুর্বল ও অক্ষমের দলে। এইভাবে সক্ষমতার বিবেচনা মানুষের সক্রিয় জীবনটাকেই সরাসরি দেখায়। তার ভিত্তিতে জানা যায়, আপন আপন কাজের নির্বাচনে কোথায় মানুষ কত বেশি, অথবা, কতটুকু স্বাধীন। সামাজিক ন্যায়ের মাত্রাও ফুটে ওঠে তাতে। যেখানে ঘাটতি, সেখানে তা মেটানোর চেষ্টা করা যায়। এবং তা সমাজে সব মানুষের চলমান জীবনের সমগ্রতায় প্রতিটি সৃষ্টিশীল উদ্যমের কথা মনে রেখে।
কিন্তু চিন্তার কোন পরিবেশে? রাষ্ট্র ও সমাজ-ব্যবস্থার কোন কাঠামোয়? অমর্ত্য সেন মনে করেন, এখানে গণতন্ত্রের ও মুক্ত আলোচনার চেয়ে ভালো কোনো বিকল্প নেই। কর্তা ও কর্মের সংযোগসাধনের প্রতিটি পর্বে এরা প্রাসঙ্গিক। প্রকৃতপক্ষে ন্যায়বিচারে আস্থা ধরে রাখার জন্যেই এদের প্রয়োজন। সবার বোধের জগতে এটা স্থিতি পায়, নশ্বর জীবনেও মানুষের ক্রমবিকাশ আছে, এবং তার কারিগর তারাই, দায়ও তাদের। সেখান থেকেই আসে সক্ষমতার বাস্তব রূপকাঠামো নির্মাণের তাগিদ। তা কোনো চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত নয়। পরিবর্তনশীল বাস্তবের সঙ্গে তাল মিলিয়ে নিরপেক্ষ দর্শকের অবস্থান থেকে যুক্তিতর্ক বিচার-বিবেচনার খোলা পথে অগ্রসর হতে হতে নিজেদের সিদ্ধান্তকেই নিজেরা তারা ক্রমাগত পরিবর্তন, পরিবর্ধন ও পরিমার্জন করে চলবে। ব্যক্তিগত ও সামষ্টিক স্বাধীনতাও তাতে অর্থবহ থাকবে। দারিদ্র্য ও দুর্ভিক্ষ নিয়ে অমর্ত্য সেনের কাজ জগদ্বিখ্যাত। বিদ্বৎ-সমাজেই শুধু নয়, নীতিনির্ধারকদের ভেতরেও তা আলোড়ন জাগিয়েছিল। তাতে তিনি দেখিয়েছিলেন, দুর্ভিক্ষের মোকাবিলায় গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা তুলনায় বেশি সফল। এখানেও তিনি তার পুনরুক্তি করেন। গণসচেতনতা ও নীতিনির্ধারণে বিভিন্ন অবস্থান থেকে মানুষের মতপ্রকাশের অধিকার ও তার প্রতি যথোচিত গুরুত্ব আরোপের প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা কার্যকর গণতন্ত্রের অর্থবহ হয়ে ওঠার প্রাথমিক শর্ত।
তবে চিন্তারও থাকা চাই যুক্তির শাসন। আপাতদৃষ্টে কথাটা খুবই সংগত। কার্যতও তাই। কিন্তু প্রশ্ন ওঠে যুক্তির প্রেক্ষাপট নিয়ে। তার পথ ও লক্ষ্য স্থির করা নিয়ে। স্বয়ং নির্গুণ হলেও, যেমন গণিতের মূল সত্য, আধার ও আধেয় পরস্পরকে প্রভাবিত করে। যুক্তিও আপেক্ষিক হয়ে যায়। অমর্ত্য সেন অন্যত্র রামায়ণে তাঁর প্রিয় জাবালি-আখ্যান আমাদের শুনিয়েছেন। জাবালি রামকে বলেছিলেন, ‘…চতুর লোকের রচিত শাস্ত্রগ্রন্থে আছে – যজ্ঞ কর, দান কর, তপস্যা কর, ত্যাগ কর ইত্যাদি। এর উদ্দেশ্য কেবল জনসাধারণকে বশীভূত করা। …যা প্রত্যক্ষ তার জন্যই উদ্যোগী হও, যা পরোক্ষ তা পরিহার কর। তুমি সর্বসম্মত সদ্যুক্তি অনুসারে ভরতের সমর্পিত রাজ্য গ্রহণ কর।’ (রাজশেখর বসুর অনুবাদ) রাম এতে রাগ করলে তিনি তখন অজুহাত দেখান, তিনি সময় বুঝে আস্তিক বা নাস্তিক হন। রামকে বনবাস থেকে নিবৃত্ত করার জন্যেই তিনি অমন বলেছিলেন। ঠান্ডা মাথায় চিন্তা করলে জাবালির যুক্তি ফেলনা মনে হয় না। তবে উদ্দেশ্য-অনুযায়ী যুক্তি যে বহুরূপী হতে পারে, এই কথাটাই এখানে বোঝানোর চেষ্টা।
উদ্দেশ্যটাকে অমর্ত্য সেন তাঁর ন্যায়ের বৃত্তে নিয়ে এসেছেন। অবশ্যই তা নির্গুণ নয়। আমরা দেখেছি, অবিচার কণ্টকিত, বাস্তব- এমনটি ধরে নিয়েই তিনি তাকে কম দুঃসহ ও বেশি নিরাপদ, নিশ্চিন্ত ও বাসযোগ্য করার কথাই বেশি ভেবেছেন। ন্যায়ের সর্বোত্তম রূপের আদর্শ সামনে রেখে তার পেছনে ছোটেননি। সেই অনুযায়ী যুক্তিও তাঁর আকার পেয়েছে। কার কী করণীয়, তার ছবি ফুটে উঠেছে। ন্যায়ের আয়ত্তযোগ্য লক্ষ্যের অভিমুখী তাদের করা হয়েছে। ফলে সবটাই চলে এসেছে দায় ও দায়িত্বের সীমানায়। সক্ষমতা ও স্বাধীনতার সমৃদ্ধি ও বিস্তারই যে অভীষ্ট ন্যায়, তা যে আপনাতে আপনি সম্পূর্ণ কোনো দূরের স্বপ্নমাত্র নয়, আবার বলি, এটা মেনে নিয়েই তাঁর যুক্তি-শৃঙ্খলার বিস্তার। তবে লক্ষ্যের প্রস্তাব একটা খাড়া করলেও তা অর্জনের যুক্তিপথ যে হতে পারে একাধিক (Plurality of impartial reasons), এটা তিনি উপেক্ষা করতে পারেন না। এইসব যুক্তিপথের মারামারি নয়, তিনি চান তাদের অর্থবহ যোগাযোগ। এবং মনে করেন, তা সম্ভব। অবশ্য তার জন্যে চাই আবেগতাড়িত নয়, যুক্তিসংগত আচরণ। এবং তাতে সদিচ্ছা ও সৎবুদ্ধি নিয়ে আপন-আপন অবস্থান থেকে Impartial spectators অংশগ্রহণ করতে পারেন যে কোনো জনই। ‘নান্যঃ পন্থা বিদ্যতে অয়নায়’ – এ কথা তিনি বলেন না। বহু পথের সমন্বয়ও হতে পারে কাক্সিক্ষত সমাধান। আবশ্যিকভাবে সবসময়ের জন্যে নয়। প্রতিটি বাস্তব তার ন্যায়ের ক্ষেত্র রচনা করে। পরিণাম নতুন ন্যায়ের সম্ভাবনা জাগায়। কর্তব্যের ডাক তাই কখনো ফুরোয় না। লক্ষ্য নির্ধারণ করে যুক্তিবুদ্ধিতে শান দেবার প্রয়োজনও নিঃশেষ হয় না।
এই প্রসঙ্গে তিনি গীতায় কৃষ্ণ-অর্জুন সংলাপের প্রতিপাদ্য বিষয়টি টেনে এনেছেন। প্রশ্ন তুলেছেন, ন্যায়ের লক্ষ্যে পরিণামবাদ – Consequentialism – কি অবান্তর? অর্জুনের ‘মোহ’ – যুদ্ধে তাঁর যোগ দেবার ফলে বিপুল যে ধ্বংসযজ্ঞ, তাতে বিচলিত হওয়া এই কাণ্ডে আপন ভূমিকায় নিজেকে অপরাধী ভাবা, এবং আত্মীয়স্বজন বন্ধুবর্গের বিনাশে নিস্পৃহ থাকতে না পারা – এগুলো কি মানবজীবনের উদ্বোধনের সঙ্গে, তার হয়ে ওঠায় ইতিবাচক গুণাবলির কাক্সিক্ষত চর্চার সঙ্গে, সংগতিপূর্ণ নয়? কৃষ্ণের নৈরাত্মিক নিরাসক্তিতে – deontology – যা কিছু ঘটুক না কেন একাগ্রচিত্তে কেবল নিজের কাজ করে যাওয়া, কারণ জীবন ও জগৎ-সংসার অনিত্য কর্মণ্যে ব্যধিকারস্তে মা ফলেষু কদাচন, এই উপদেশ কি মানুষকে গভীরভাবে জীবন থেকে দূরে ঠেলে না? মানুষের মুক্তি যদি অঙ্কিত হতে থাকে তার করাতে এবং হওয়াতে অধিকারের বিস্তারে এবং ওই অধিকার যদি দাবি করে একক নয়, মিলিত উদ্যোগ, এবং ধ্বংসে উদাসীন থাকা নয়, সৃষ্টিতে অন্যদের নিয়ে পরিকল্পিত পথে অগ্রসর হওয়া, তবে কৃষ্ণের বৈরাগ্যবাণী কি তার অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায় না? পরিণাম ফলকে তাই উপেক্ষা করা সমীচীন নয়। ঘটনায় কর্তার লক্ষ্য ও পথ নির্ণয়ও প্রাথমিক বিবেচনা দাবি করে। যুক্তির রূপ-প্রকল্প গড়ে তুলতে – যুক্তিশীল হয়ে যুক্তির প্রয়োগ ঘটাতে – অমর্ত্য সেন আগে এই ক্ষেত্রবিচারের দিকে নজর দেন। তাঁর ন্যায়ভাবনা তার ওপরেই দাঁড়ায়।
তবে এটাও তিনি জানিয়ে দেন ন্যায়সংগত হবার জন্যে পরিণামবাদী হওয়াই যথেষ্ট নয়। পরিণামের ন্যায়কেও বিচারের আওতায় আনতে হবে। তৃপ্তি বা উপযোগকে যাঁরা সর্বোচ্চ করার কথা বলেন, তারাও পরিণামবাদী। কিন্তু তিনি তাদের প্রত্যাখ্যান করেন। কারণ, তাঁদের লক্ষ্য সামাজিক বণ্টনে বৈষম্যের অন্যায়কে পাশ কাটিয়ে যায়, অথবা তাকে সামাল দিতে পারে না। অথচ পরিণামে এইটির কুফলের সুরাহা বিবেচনায় আনাও তাঁর কাছে গুরুত্বপূর্ণ। ডি-অন্টোলজি নীতি নির্দেশ করে, তার প্রতি বিশ্বস্ত থাকতে বলে, যেমন সোশ্যাল-কনট্রাক্ট ধারণাসমূহ; কিন্তু প্রত্যক্ষের ভালো-মন্দ নিয়ে আর মাথা ঘামায় না, তা অনিবার্য বলে ধরে নিতে বলে, এবং কনট্রাক্টেই যে চূড়ান্ত সমাধান, এই কথাটার ওপরও জোর দেয়। দেখায় তরঙ্গদৈর্য্যে তফাত একটা হয় বই কি! এটা অমর্ত্য সেনের ইচ্ছাকৃত। কারণ, বাস্তবে ‘ফলেন পরিচিয়তে’ – এই বিবেচনাই ব্যক্তির ও জনসমুদয়ের জীবনযাপনে উন্নতি ও অবনতি, দুটোই প্রতিটি মুহূর্তে বিচ্ছিন্ন ও ধারাবাহিকভাবে আমাদের চিনিয়ে দেয়।
অমর্ত্য সেনের এই যে ন্যায়-ভাবনা, অবশ্যই তা বৃথা যায় না। বিদ্যাচর্চার কেন্দ্রভূমিতেই আলোড়ন জাগায়। পৃথিবীতে মানব-মানবীরা কীভাবে বাঁচে, কী নিয়ে বাঁচে, এমনসব প্রশ্ন যাদের চিন্তার জগতে বারবার হানা দেয় তারা বইটি থেকে উত্তর-প্রত্যুত্তরে সাড়া পাবার ও সাড়া দেবার মতো উপকরণ পাবে অনেক। উদ্বোধিতও হবে। মুক্তির ন্যায় তার কাছে নতুন মাত্রা নিয়ে ফুটে উঠবে। কিন্তু তারপরেও আমরা একে তর্কাতীত মহিমায় প্রতিষ্ঠা দিতে পারি না। তেমন করাটাই বরং তাকে যথোচিত সম্মান না জানানো। সজীব চিন্তার যে-ধারায় তিনি নিজেকে নিয়োজিত রেখেছেন, তাতে শেষ কথা বলে কিছু নেই। কারণ মানবজীবনে সম্ভাবনা বহুমুখী এবং তা অশেষ। বড়জোর ভাবনা-কল্পনায় নিজের কথাটুকু আপন বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে জুড়ে দেওয়া যায়। অমর্ত্য সেন তাই-করেন। আলোচনা-সমালোচনাও ফলে অনিবার্য। অশ্রদ্ধায় নয়, তার অপরিসীম বিশেষ মূল্য স্বীকার করে নিয়েই। তর্কের এই পথে এবার আমরাও এগোনোর চেষ্টা করি।

তিন
অমর্ত্য সেন ধারণাগতভাবে, এবং কার্যতও, অতি যথার্থই নিরপেক্ষ বিচারের ওপর জোর দিয়েছেন। দৃষ্টির নিরপেক্ষতা নিশ্চিত না হলে সিদ্ধান্তের ‘ন্যায়’ প্রশ্নবিদ্ধ থেকে যায়। অ্যাডাম স্মিথের ইর্ম্পাশিয়াল স্পেক্টেটরের সক্রিয় ভূমিকার ওপর এখানে তিনি নির্ভর করেন। এও বলেন, সে হতে পারে দূরের, বা কাছের, প্রয়োজন আছে দুটোরই। তবে নির্বিকার নিরাসক্তির আদর্শ কখনো কখনো বাইরের মূল্য বিচারেই ফুটে ওঠে বেশি। যুক্তির                  খাস-কামরায় আর-সবকিছু বের করে দিয়ে দেখাকে যদি নির্মল করা যায়, তবে অবশ্যই উত্তম। কিন্তু প্রশ্ন দেখা দেয়, যুক্তি তবে তৈরি হয় কীভাবে? তার কামরাটাই বা দাঁড়ায় কীসের ওপর? ‘ফ্যালাসি অফ আন্ডিস্ট্রিবিউটেড্ ‘মিডল্’ বলে একটা ভ্রান্তির কথা আমার পরিচিত দর্শনের ছাত্রদের মুখে হরহামেশা শুনি। এখানে কি তার অনুপ্রবেশ ঘটে না? রউলস বোধহয় সমস্যাটি এড়াবার জন্যে তাঁর প্রাসঙ্গিক বাস্তবতার বাইরে থেকে বিষয়টি দেখতে, বা দেখাতে চাননি।
সামাজিক ন্যায়ের বিচারে যুক্তির পদগুলো কি গণিতের সংখ্যার মতো, এবং সংখ্যার মিশ্রণে উদ্ভূত সংখ্যার মতো, স্বয়ংসম্পূর্ণ ও স্বয়ংসিদ্ধ? না কি তারা নিজেরাও কখনো কখনো পরাশ্রয়ী? তাদের অর্থের বহুলতা ও ব্যঞ্জনায় বিভিন্ন ছায়াপাত অমর্ত্য সেনও স্বীকার করে নিয়েছেন। শুধু তাই নয়, এটাকে তিনি মুক্তচিন্তার একটা সুযোগ বলেও মনে করেছেন। কিন্তু এতে তাঁর নিরপেক্ষ দর্শক তার সকল সদিচ্ছা নিয়েও কি আমাদের কাছে কোনো সুনির্দিষ্ট বার্তা পৌঁছে দিতে পারে? মানব-মানবী কেউই শূন্য থেকে জেগে ওঠে না; শূন্যচারীও নয়। প্রত্যেকের বাস্তব ভূমি আছে, ভূমির ঐতিহ্য আছে, পরিবেশের নিজস্ব বৈশিষ্ট্য আছে, সামাজিক-সাংস্কৃতিক বিকাশের ধারা আছে, তাতে অচলতা বা অতিসচলতা, তাও আছে। এইসব থেকে যে অস্তিত্বের প্রকাশ তার চৈতন্য কি নিরঙ্কুশ শুদ্ধ অনন্বয়ী থাকে? নাকি তা থাকাটাই কাম্য? দৃষ্টির নিরপেক্ষতা ও নিরপেক্ষতার সমজাতিয়তা তা হলে প্রতিষ্ঠিত হয় কীভাবে? যদি তা না হয়, তবে ন্যায়ের যৌক্তিক ভূমি কি শুরুতেই এলোমেলো হয়ে যায় না? অথচ এই এলোমেলো হয়ে যাওয়াটাকেই অমর্ত্য সেন স্বাগত জানান। ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে এতে তিনি দেখেন ন্যায়ের ভিত্তি বৈচিত্র্যের সমাহারে সমৃদ্ধ হওয়া, সঠিক সামঞ্জস্য ঘটলে তা মজবুত হওয়া। অবশ্যই তা অযথার্থ নয়। কিন্তু স্থান ও কালের মাত্রায় তাতে নতুন নতুন উপাদান কি যুক্ত হয় না? সবটাই কি তা থাকে যুক্তিসিদ্ধি নির্ভর? নাকি ঘটনাই নিয়ন্ত্রণ করে যুক্তির পথরেখা? এবং ঘটনার কার্যকারণ দাবি করে আরো অসংখ্য উপাদানের সমাবেশ, যার সামনে ব্যক্তিচৈতন্য অসহায়। সমষ্টিও জানে না কোন সম্ভাবনা আকার নেবে বাস্তবে, যদিও ব্যক্তি ও সমষ্টি, উভয়েই তার অনিবার্য ভুক্তভোগী। অ্যাডাম স্মিথের নিরপেক্ষ দর্শকের ধারণা তাই আমাদের চিন্তাকে প্রাণিত করে, কিন্তু তাকে – এবং তাদের – রক্ত-মাংসের শরীরে খাড়া করে এক জায়গায় দেখতে গেলেই বিপাকে পড়তে হয়। অমর্ত্য সেন অবশ্য এতে দমেন না। কারণ, তাঁর লক্ষ্য ন্যায়ের একমেবাদ্বিতীয়ম, সমাধান সূত্র রচনা করা নয়, ন্যায়ের বিবিধ গন্তব্যের কোনো একটির দিকে যাওয়া;  ভালোয়-মন্দয় মেশানো কর্মকাণ্ডের ভেতরে আরো ভালো ও কম মন্দ যে সম্ভাব্য পরিণামরাশি, তার কোনোটির দিকে অগ্রসর হওয়া। গন্তব্য অনির্দিষ্ট হয়ে পড়লে পথের যৌক্তিক নির্মাণ কি খেই হারিয়ে ফেলে না?
আমরা জানি, অ্যাডাম স্মিথ তাঁর An Inquiry into the Nature and Causes of the Wealth of Nations-এ বাজারের অদৃশ্য হাতের (invisible hand of the market) পক্ষে জোর সওয়াল করেছেন। এই অদৃশ্য হাতের যৌক্তিক সুরাহার সঙ্গে Theory of  Moral Sentiment-এ নিরপেক্ষ দর্শকের ভূমিকার কি কোনো যোগসূত্র আছে? অমর্ত্য সেন বিষয়টি এভাবে দেখেননি। বরং তাঁর ন্যায়ভাবনা বাজারের স্বয়ংক্রিয় দক্ষ বণ্টনে আস্থা রাখতে পারে না বলেই নিরপেক্ষ বিচারের জন্যে তৃতীয় পক্ষের – ঘরের বা বাইরের অথবা উভয়ের – নির্দেশনার কথা তুলেছেন; এবং তা ওই অ্যাডাম স্মিথকেই ভিন্ন প্রেক্ষাপটে অনুসরণ করে। কিন্তু একটু চিন্তা করলে কি এটা চোখে পড়ে না, পূর্ণ প্রতিযোগিতা যদি পুরোদমে চালু থাকে; তবে বাজারের অদৃশ্য হাতই, প্রত্যেকে আত্মস্বার্থ সর্বোচ্চ করার তাগিদে পরস্পর যে রফায় আসে, তাকে কার্যকর করে সার্বিক ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা ঘটায়। এবং এই একই ন্যায় অ্যাডাম স্মিথ সমান্তরালে নিরপেক্ষ দর্শকের মাধ্যমে বিভিন্ন জনের ও বিভিন্ন দেশের সম্পর্কের সামঞ্জস্যের চেহারায় প্রকাশ করার কথা বলেন।
আমরা জানি, পরে ওয়ালরা (১৮৩৪-১৯১০) শুধু একটি কারবারে নয়, গোটা বাজারে চাহিদা জোগানে একই সঙ্গে সমতার ফলে যে সার্বিক ভারসাম্য –  কোথাও টাল খায় না, সুস্থির থাকে, এবং সচল থাকে – তার ধারণার পূর্ণ রূপ ফুটিয়ে তুলেছেন; তার ব্যাখ্যাও দিয়েছেন। অ্যারো ও ডেব্রো (১৯৫৪) গাণিতিক যুক্তিক্রমে পূর্ণ প্রতিযোগিতার পরিমণ্ডলে এই সাধারণ ভারসাম্যের অস্তিত্ব প্রমাণ করে দেখিয়েছেন (Existence of an equilibrium for a competitive economy)| সেটা যে বাস্তব সম্পর্ক- সম্বন্ধ নির্ভর, কালোত্তীর্ণ ও ন্যায়সংগত, এমন ধারণারও তত্ত্বসিদ্ধি ঘটে। তবে তত্ত্ব দাঁড়ায় স্বাভাবিকভাবে গ্রহণযোগ্য আপাত সরল কিছু প্রত্যয়ের (assumptions) ওপর। এদের একটু এদিক-ওদিক হলে তত্ত্বেরও ভিত নড়ে যায়। আমরা কিন্তু সাধারণত সেদিকে খেয়াল করি না। বাজারের যৌক্তিকতা, কার্যকারিতা, সার্বভৌমত্ব ও ন্যায়-সংগতি প্রমাণ করে দেখিয়ে দেওয়া গেছে, এটিই সবাইকে জানাতে ব্যস্ত থাকি। কিন্তু এখানেই কি কুযুক্তি গুড়ি মেরে গুটিসুটি এসে ঘাপটি মেরে বসে থাকার সুযোগ পায় না? এটা ধরে নেওয়া হয়, বাজারের হালচাল সবাই সব জানে। আরো বলি, ইচ্ছা করলে যে কেউ যে কোনো কাজে হাত লাগাতে পারে, কেউ তাকে বাধা দেয় না, তার পছন্দক্রমে ওলটপালট হয় না, উৎপাদনে প্রান্তসীমায় ক্রমহ্রাসমান বৃদ্ধির হার বজায় থাকে। এসবই চেনাজগতের ক্রিয়াকর্ম থেকে ছেঁকে তোলা। কাজেই মেনে নিই। অথবা বলা যায়, সংগত বলে স্বীকার করি। কিন্তু তা কি যথার্থ? বাজার কি একচেটিয়া কারবারের অথবা তার ভিন্ন-ভিন্ন অবতারের প্রবল পদচারণায় প্রকম্পিত নয়? সব ভোক্তার সমানে-সমানে বাজারে আসা, অথবা ভোক্তার ও উৎপাদকের সমানে-সমানে মুখোমুখি হওয়া কি নিতান্তই স্বপ্নবিলাস মনে হয় না? তেমন হলে বাজারের সার্বিক ভারসাম্য অনর্থক হয়ে যায়। অ্যারো ডেব্রো তারই ইঙ্গিত দেন। বাজারের অদৃশ্য হাত যে সমাধান দেবে বলে আশা করি, তা আমরা পাই না। বরং তা যে দুর্লভ, এটিই ওই তত্ত্ব-সন্ধানে সার কথা বলে আমাদের দৃষ্টি-আকর্ষণ করতে চায়। অথচ আমরা পরশপাথর পেয়ে গেছি, বাজারের স্বাভাবিকতা ও সংগতি প্রমাণিত হয়েছে, এটি প্রচারেই বেশি ব্যস্ত হয়ে পড়ি। যদিও তার অদৃশ্য হাত যথাযথ পরিবেশে যে তার ন্যায়ের প্রকাশ ঘটায়, এটাও অস্বীকার করতে পারি না। আর বাজার যেখানে সর্বাঙ্গীণ নয়, অনেক ক্রিয়াকর্ম ঘটে সামাজিক বসবাসের ও দেওয়া-নেওয়ার প্রথাশাসিত রীতিনীতির আওতায়, সেখানে এই অসম্পূর্ণতা তার ব্যাপারে কোনো যৌক্তিক সিদ্ধান্তকেই, তা সৎবুদ্ধি চালিত হলেও, প্রয়োগিক যথার্থতা দেয় না। আমরাও তা খালি চোখেই দেখে এসেছি বহুদিন থেকে। বাজারের সম্প্রসারণ যে ‘অদৃশ্য হাতের’ তোয়াক্কা না করে সুযোগসন্ধানীদের দখলে চলে যেতে থাকে, এও আমরা দেখে আসছি।
‘নিরপেক্ষ দর্শক’ও একই রকম সবাই সমজাতীয় বাস্তবভূমি থেকে উঠে আসে না। ফলে তাদের নিরপেক্ষতা একশভাগ সৎ হলেও তাদের লক্ষ্যপথ ভিন্ন ভিন্ন হয়ে পড়া সম্ভব। প্রত্যক্ষেও তা ক্রিয়াশীল। প্রকৃতি-পরিবেশ-ইতিহাস, এসবই নিরপেক্ষতায় মেশে, এমনকি সমাজ-সংগঠনে কে কীভাবে বড় হয়, তাও। এতে বাজারের অদৃশ্য হাতের সমাধানের মতো সব নিরপেক্ষতাকে এক বিন্দুতে মেলানো বেশ দুষ্কর এবং নিরপেক্ষ বিচারেও ছোট-বড়র সমাবেশে বড়র প্রাধান্যই সূচিত হয় বেশি। ন্যায়ের তত্ত্বভূমি যদি অক্ষুণœ থাকে, তবু। এটাও আমাদের কাছে অপরিচিত নয়। বিশ্বব্যাংক, আন্তর্জাতিক মুদ্রা ভাণ্ডার বা অনুরূপ সংস্থাগুলোর কাজ-কারবার ধারাবাহিক নিরীক্ষণ করলে তা ধরা পড়ে সহজেই। শুধুই সদিচ্ছায় নিরপেক্ষতা ‘নিরপেক্ষ’ থাকে না। যদিও অমর্ত্য সেন যে একে প্রাথমিকতা দেন, তা যথার্থ বলেই মেনে নিই।
অমর্ত্য সেন যুক্তির সঙ্গে ভাব-নিরপেক্ষতার (reason and objectivity) ঐকিক সংযোগের প্রয়োজনের কথা বলেছেন। আমরা প্রকৃতি-পরিবেশ-ইতিহাসের ধারার কথা তুলেছি। এ-দুটোকে এক বিন্দুতে মেলাই কী করে? ফুকো বলেন, ফরাসি যুক্তিবাদ ইরানে অচল। সেখানে ধর্মীয় মৌলবাদই যথার্থ। এটা  কি হতে পারে ন্যায়ের নিদর্শন? তাহলে সব জায়গায় নারী-পুরুষের সমান অধিকারকে তার এক সাধারণ লক্ষ্য হিসেবে গুরুত্ব দেওয়া কি ঠিক হয়। যদি না দিই, তবে অনন্যপরতার (liberty) আদর্শ কি শুরুতেই খণ্ডিত হয়ে যায় না? যখন-যেমন তখন-তেমন, যেখানে-যেমন সেখানে-তেমন, এই যদি ভাবনার কেন্দ্রে ঢুকে বসে থাকে, তবে ন্যায়ের সর্বজনগ্রাহ্যতা প্রতিষ্ঠিত হয় কী করে? অন্যদিকে স্বাধীনতা বা মুক্তিও (freedom) অনন্যপরতার সঙ্গে সবসময়ে খাপ খায় না।  উত্তর – আধুনিকতা চায়, গুহাবাসী যারা, তারা গুহাবাসী থাক, জঙ্গলের অধিকার থাক জঙ্গলে যাদের যুগযুগ ধরে অবিচ্ছেদ্য বসবাস, তাদের হাতে। এতে নিশ্চিত হয় তাদের সামষ্টিক ইচ্ছার অধিকার – তাদের স্বাধীনতা। কিন্তু মানব-মানবীর অনন্যপরতার আদর্শের সঙ্গে তা কি সবসময়ে খাপ খায়? উৎপাদনব্যবস্থা অতীতের এক খোপে আটকে থাকলে তার সঙ্গে তা মেলে না। চিন্তার মুক্তি ঘটে না। অনিশ্চয়তায় ভরা ‘পতন-অভ্যুদয়-বন্ধুর পন্থা’ও চোখে পড়ে না। পরস্পরবিরোধী লক্ষ্যের সামনে আমরা কি অসহায় হয়ে পড়ি না? অমর্ত্য সেন জনমতের (public reason) ভিত্তিতে কোনো সিদ্ধান্তে আসার ওপর জোর দেন। অনেক সম্ভাবনার অনেক সিদ্ধান্তের তা একটি। নিরপেক্ষ দর্শকের প্রত্যয় ভূমি থেকে উঠে এলে তার যৌক্তিকতার ধারণা একটা খাড়া করা যায়। কিন্তু বাস্তব তো তেমন নয়। বিশ্ববিদ্যালয়-এনজিও-নাগরিক সমাজ এদের ওপর ন্যায়-বিচারের যথার্থতায় কতটুকু নির্ভর করা চলে? তারা কেউই স্বয়ংক্রিয় ভাবনার প্রতিনিধিত্ব করে না। প্রত্যেকটি প্রতিনিধির পেছনে কাজ করে তার হয়ে ওঠার পরিমণ্ডল, তার স্বার্থবাহী বৃত্তের হালচাল; নিজস্ব তরক্কির ফন্দি-ফিকির-  ফিচলেমিও ঢুকে যায় তাদের সঙ্গে। আস্তিনের তলায় গোপন অদৃশ্য ছুরি কথার ফাঁকে-ফাঁকে উঁকি দেয় অনেকের। আমরাও এর ভুক্তভোগী এবং অনিশ্চয়তায় বিপন্ন। এমন পরিস্থিতিতে ন্যায়দণ্ডের নিরপেক্ষতাও কি বিচলিত হয় না?
লিবার্টি বা অনন্যপরতাকে আমরা বিভিন্ন মাত্রায় দেখতে পারি – ব্যক্তির, পরিবারের, সমাজের, রাষ্ট্রের। যার দৃষ্টিকোণ থেকেই দেখি, তাকে তার সামনে উদ্দেশ্যপূরণের একটি ক্ষেত্রের মুখোমুখি হতে হয়। সেখানে অনুরূপ প্রত্যেকের, ও একে অন্যের – বিভিন্ন অবস্থান থেকেও – অনন্যপরতায় যোগাযোগ বা কাটাকাটির ন্যায়-সংগতি নির্ণয় করি কীভাবে? এখানেও কি সদিচ্ছার সঙ্গে সৎকর্মের একান্তিক সংযোগ অনেক সময় আয়ত্তের বাইরে চলে যায় না? ধরা যাক, ক ও খ স্বামী-স্ত্রী। গ তাদের নাবালক সন্তান। ক ও খ ভালোবেসে বিয়ে করলেও একসময় তাদের ভেতর দূরত্ব বাড়ে। স্বেচ্ছায় তারা আলাদা হয়ে গিয়ে নিজের নিজের পছন্দমতো নতুন নতুন সঙ্গী/ সঙ্গিনী জুটিয়ে আবার ঘরসংসার শুরু করে। লিবার্টি তাদের অক্ষুণœ থাকে। কিন্তু গ চেয়েছিল, বাবা-মায়ের কাছে থেকে তাদের আদরে বড় হবে। তা হয় না। সে জানতে শেখে, তার জীবন একান্তই তার, কোনো পিছুটান তার নেই। এও লিবার্টি। কিন্তু এ কি ন্যায়? সমাজে একে অন্যের সম্পর্কে বা রাষ্ট্রে-রাষ্ট্রে বহুপক্ষীয় সম্পর্কেও এমন বাস্তবতার প্রতিফলন চোখে পড়ে। এই পরিস্থিতির সুচারু সংগত সমাধান কী, অথবা তা আদৌ মেলে কি না, অমর্ত্য সেনের বিচার-বিশ্লেষণে তার হদিস মেলে না।
তিনি অবশ্য উদাহরণ টেনেছেন গৌতম বুদ্ধের সুণ্ড-নিপাত থেকে, যাতে বলা হয়েছে মা সন্তানের এবং মানুষ পশুপাখির যতœ নেবে। সেটা এই কারণে যে, সন্তান মায়ের কাছে ও পশুপাখি মানুষের কাছে তুলনায় দুর্বল, এবং এই দুর্বলের প্রতি সবলের নৈতিক দায়িত্ব একটা আছে। এটা অনন্যপরতার মৌলিক এবং নৈতিক প্রশ্নের অতিরিক্ত এবং উদাহরণ হিসেবেও আজকের প্রেক্ষাপটে যথেষ্ট সরল। অসংখ্য বন্ধন ও ইচ্ছার মুক্তির সমন্বয়ে উত্তম কোনো ন্যায়ের পথ এই বইতে আমরা সেভাবে সুনির্দিষ্ট হতে দেখি না। শেষ পর্যন্ত তা মহৎ আপ্তবাক্যেই পরিসমাপ্ত হয়।
সবল ও দুর্বলের সম্পর্ক নিয়ে একাধিক মনোগ্রাহী গল্প আছে উপেন্দ্র কিশোর রায় চৌধুরীর টুনটুনির বইতে। যেটা লক্ষ করার, সম্পর্ক এখানে আবশ্যিকভাবে স্থির নয়। অবস্থার পরিবর্তন আচরণের ন্যায়েও পরিবর্তন আনে। একটা গল্পে পড়ি, এক বিড়াল টুনটুনির ছানাদের খাবে বলে রোজ গাছের নিচে এসে দাঁড়ায়। ছানারা তখনো উড়তে শেখেনি। টুনটুনি বিড়ালকে আসতে দেখলেই প্রতিদিন মাথা নইয়ে কুর্নিশ করে, আর বলে, পেনাম হই বিড়াল ঠাকরুণ। বিড়াল এতে খুশি হয়ে তার ছানা খাওয়ার মতলব বাদ দিয়ে গাছের তলা থেকে ফিরে যায়। একদিন টুনটুনি বাচ্চাদের বলে, ‘বাচ্চারা তোরা উড়তে পারিস?’ বাচ্চারা বলে, ‘হ্যাঁ মা, পারি।’ পরদিন বিড়াল আসতেই টুনটুনি পা দিয়ে তাকে লাথি দেখিয়ে বলে, ‘দূর হ, লক্ষ্মীছাড়া বিড়ালনী।’ বিড়াল রাগে গরগর করে গাছে লাফ দিয়ে উঠতেই টুনটুনি তার বাচ্চাদের নিয়ে ফুরুৎ করে উড়ে পালায়। অবস্থার পরিবর্তনে আচরণের ন্যায়ও যে বদলে যায়, এ-বিষয়টি অমর্ত্য সেন তাঁর আলোচনায় আনেননি।
আরো একটি বিষয়ের প্রতি তিনি তেমন গুরুত্ব দেননি। তা হলো, জ্ঞানের ও জ্ঞানের প্রয়োগক্ষমতার অধিকারের সঙ্গে তাঁর ন্যায়-ভাবনার সম্পর্ক। ‘নিরপেক্ষ দর্শক’ সবাই যে একভাবে চিন্তা করবে না, এটা তিনি সানন্দে মেনে নিয়েছেন। তাদের জানার ও জানার ভিত্তিতে ধারণা নির্মাণে বৈচিত্র্য তাঁর কাছে ন্যায়বিচারের এক গ্রহণযোগ্য উপাদান। সবাই তারা গণতান্ত্রিক পরিবেশে তাদের বিচার-বুদ্ধি খাটিয়ে ন্যায়ের সংগত সিদ্ধান্তে এসে পৌঁছুবে, যেখানে বিভিন্ন বিষয়ে অগ্রাধিকারের সূচিকল্পনাও তারাই করে দেবে এবং তা হবে ওই সময়ের প্রেক্ষাপটে সামাজিকভাবে স্বীকৃত, এই কথাগুলো তিনি তাঁর যুক্তি-শৃঙ্খলায় সবিশেষ মূল্যবান বলে ধরে নেন। কিন্তু প্রশ্ন হলো, জানার সীমা যদি একেক জনের একেক রকম হয়, এবং অধিকাংশের বেলায় যদি হয় তা নিচু মানের আর অন্ধ বিশ্বাস ও কুসংস্কার যদি সেখানে জাঁকিয়ে রাজত্ব করে, তবে নিরপেক্ষ হলেও বিচার হতে পারে ভ্রান্ত, অন্যায়ই ন্যায়ের টুঁটি চেপে ধরতে পারে। ব্র“নোকে পুড়িয়ে মারা, গ্যালিরিওর বিচার, ইব্্ন্ রুশ্দের লাঞ্ছনা, এগুলো তাঁদের নিজ নিজ সময়ে নিজ নিজ বাস্তব পরিবেশে কোনো প্রবল বিক্ষোভের সৃষ্টি করেনি। কোনো গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা ছিল না, সত্য, কিন্তু সমাজ তাঁদের দুর্ভোগকেই অনুমোদন করে এসেছে। আজকেও অনেক দেশে অধিকাংশ মানুষের বিরোধিতার অথবা মৌন বিরূপতার কারণেই মুক্তচিন্তা প্রশ্রয় পায় না। ভ্রান্তি বহাল-তবিয়তে বলবৎ থাকে। গণতন্ত্র তাকে সমর্থন জোগায়, অথবা তার সঙ্গে আপস করে। এরকম যাদের মুখ পেছনদিকে ফেরানো, তারা সংখ্যালঘু নয়। তাহলে তাদের হাতে অথবা তাদের প্রতিনিধিদের হাতে বিচারের ভার যদি বেশি থাকে, কিংবা তাকে দোর্দণ্ড প্রতাপে যদি তারা প্রভাবিত করে চলে, তবে ন্যায় সেখানে প্রকৃত বাস্তবের ওপর প্রতিষ্ঠিত হবে কীভাবে? অথচ গণতন্ত্রকে বাদ দেওয়াও বিরাট অবিমৃষ্যকারিতা। মানুষের চিন্তায় অগ্রগতির পেছনে তার ভূমিকা কম নয়। যদিও সব বিষয়ে শ্রেষ্ঠ সমাধান তাৎক্ষণিকভাবে তা নাও দিতে পারে। এই উভয়-সংকটের সামনে আমাদের করণীয় কী, অমর্ত্য সেনের এ-বই তার কোনো সন্তোষজনক উত্তর খাড়া করতে পারে বলে অন্তত আমার মনে হয়নি।
আমাদের করার এবং হওয়ার পেছনে কাজ করে কী করি, কীভাবে করি, জ্ঞানকাণ্ডের কোন পথে হাঁটি, কারা তাতে শামিল হয়, এসব। জ্ঞান-প্রযুক্তি তার নিজস্ব প্রকৃতিতে কাউকে কাছে টানে, কাউকে দূরে ঠেলে। যারা কাছে আসে, তারা সুবিধা পায়, যারা দূরে সরে, তারা অবান্তর হয়ে পড়তে থাকে। উৎপাদনের উপাদানগুলোর হাতবদল ঘটে চলে। রূপান্তরও হয়। এই প্রক্রিয়ায় সমাজ মানুষের অবস্থারও ওলটপালট হয়। তাদের সামর্থ্যরে চেহারা বদলে যায়। সুযোগ যারা হাতে পায়, অথবা যারা তা ছিনিয়ে নেয়, তারা বেশি লাভবান হয়। অন্যদিকে পুরনো ব্যবস্থা থেকে বেরিয়ে আসতে না পারায় অনেকে পথে বসে। যদি উৎপাদনে প্রবৃদ্ধি আসে, এবং তা অব্যাহত থাকে, তবে হয়তো ভবিষ্যতে সবারই অবস্থা ফেরে। কিন্তু শুরুতে নতুন বৈষম্য সৃষ্টি হওয়া, এবং তা তীব্রতর হওয়া অনিবার্য হয়ে পড়তে পারে। এটা কি ন্যায়? যদি ন্যায় হয় – সক্ষমতার সৃষ্টি ও তার ব্যবহারে মানুষের অধিকার সম্প্রসারিত হওয়ার প্রেক্ষাপটে তেমনটিই যৌক্তিক – তবে তা প্রথম পর্বে অনেক মানুষের অশ্র“ দিয়ে কেনা। সেই অশ্র“তে মিশে থাকে অনেক বঞ্চনার বেদনা। অথচ এই পরিবর্তন না ঘটলে মেনে নিতে হয় অনিবার্য পশ্চাৎপদতা, কপালে লেখা থাকে আরো বেশি সার্বিক দারিদ্র্য। কোনো দাম না দিয়ে সমাজে কিছু মেলে না। এই দাম কাউকে না-কাউকে দিতেই হয়। তা এড়ানো যায় না। পরিবর্তন-প্রতিরোধে জনপ্রিয়তা বাড়লেও, না। যেমন পশ্চিমবঙ্গের সিঙ্গুরে। এমন পরিস্থিতিতে ন্যায়বিচার আমরা কীভাবে করি? বর্তমানের কষ্ট দিয়ে ভবিষ্যতের স্বপ্নপূরণ কি অন্যায়? তেমন হলেও মানব সভ্যতাই তার মূল্য হারায়। এই প্রশ্নের মুখে অমর্ত্য সেন আমাদের ফেলেননি। কিন্তু ন্যায়বিচারের প্রেক্ষাপট রচনায় একে উপেক্ষা করা যথার্থ হয় না।
কালের মাত্রা আরেকভাবে প্রকাশ পায় গীতায় কৃষ্ণার্জুন সংবাদে। এখানে কালের প্রবাহ থাকে সামনে। পা থাকে বর্তমানে। ঘটনার তাৎপর্য প্রসারিত হয় চেতনায়, দিগন্ত থেকে দিগন্তে। ফলে রূপ মিশে যায় রূপকে (allegory),  রূপক নির্দেশ পাঠায় কর্মে। এখানে স্থির রঙ্গমঞ্চে ঘটনার দুই পাত্রকে স্থান-কালে বেঁধে রেখে তাদের কথার আক্ষরিক অর্থের পেছনে ছুটে যুক্তির ধাপ পার হতে চাইলে তাতে প্রেক্ষাপটের সমস্তটা আলোকিত না হওয়ার সম্ভাবনা থেকে যায় বলে মনে হয়। অমর্ত্য সেন দেখছেন, অর্জুন পরিণামবাদী -consequentialist; কৃষ্ণ নির্বিকার নৈরাত্মিক- deontologist| কিন্তু কৃষ্ণের কথার শুরু তো পরিণামের ছবি দিয়েই – যখন-যখন ধর্মে গ্লানি জমে, তখন-তখন তার আগমন। আগমন কেন? পরিত্রাণায় সাধুনাং বিনাশায় চ দুষ্কৃতাং/ধর্ম সংস্থাপনার্থায় সম্ভবামি যুগে যুগে। অতএব ঘটনা এক জায়গায় আটকে থাকে না। যুগ থেকে যুুগান্তরে তা হতে হতে চলে। এও পরিণামমুখী। খণ্ডচিত্রের তাৎক্ষণিক ব্যাখ্যা দিয়ে কৃষ্ণের যুক্তিজালকে deontological argument বলে খাড়া করা কি তাহলে সংগত? স্থান ও কালের মুক্তধারায় ফেলে তার বিচার করলে সেটিই কি যথোচিত হতো না? যদিও এমন বলায় এটা বোঝাতে চাই না, ওই যুক্তিক্রমই যথার্থ। সাধু-অসাধু, এরকম দ্বিমাত্রিক বিভাজন বাস্তবসম্মত নয়। পার্থিব জীবন হ্যাঁ-নায় (সত্য-মিথ্যাও বলা যায়; কিন্তু সেখানে সত্য-মিথ্যার পরিচয় নির্ণয় আর একটা অমীমাংসেয় প্রশ্নের মুখে আমাদের ঠেলে দেয়) নিবিড়ভাবে জড়ানো। সেখানে তাদের দুই দলে ভাগ করা বোধগম্য সিদ্ধান্তকে সহজ করতে পারে, কিন্তু বাস্তবের প্রকৃত স্বরূপ উন্মোচন করে চলার পথ সবসময় ঠিক-ঠিক দেখিয়ে দিতে পারে বলে মনে হয় না। অমর্ত্য সেনের কাছে অবশ্য এটা প্রাসঙ্গিক নয়। আমরাও এদিকে আর নজর দিতে চাইছি না।
আরেকটা কথা বলে নেওয়া প্রয়োজন। মহাভারতে বা গীতায়, ধর্ম শব্দটি বারবার উচ্চারিত হয়েছে। এই ‘ধর্ম’ বলতে কিন্তু আজকের যুযুধান সাম্প্রদায়িক ধর্মব্যবস্থাকে বোঝানো হয়নি। তখনো তা বাস্তব হয়ে ওঠেনি। যদিও জীবনযাপনে বিভিন্ন মতবাদের অনুসরণ তখনকার মানব-সংস্থানেও চালু ছিল। আসলে ‘ধর্ম’ বলতে তখন বোঝাতো অমর্ত্য সেন আজ যাকে Justice বা ন্যায় বলেন, তা-ই। গান্ধারী কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের প্রাক্-মুহূর্তে পুত্র দুর্যোধনকে বলেন, যেখানে ধর্ম সেখানে জয়। রবীন্দ্রনাথও ‘গান্ধারীর আবেদনে’ শোনান, ‘ধর্মেই ধর্মের শেষ।’ এখানেও তার অর্থ ‘ন্যায়’ এবং তার প্রাসঙ্গিকতা নশ্বর জীবনেই অর্থ আরোপের আকুলতায়। সোশ্যাল কন্ট্রাক্টের মতো সমাজ সংগঠনের ধারণা তখনো চিন্তায় আসেনি। ধর্ম বা ন্যায়কেই তাই গুরুত্ব দেওয়া। অমর্ত্য সেনও ন্যায়েরই প্রতিষ্ঠা চান। তবে তা সোশ্যাল কন্ট্রাক্টের ছাড়িয়ে। জন রউল্সের ন্যায়তত্ত্ব তাই তাঁর কাছে শ্রদ্ধেয় হলেও অপ্রয়োজনীয়।
তারপরও সোশ্যাল কন্ট্রাক্টের আদর্শ স্থাপনাকে কিন্তু উপেক্ষা করা যায় না। সামাজিক ন্যায়ের ভিত্তি হিসেবে তার একটা না-একটা রূপ কাঠামো এখনো প্রেরণা জোগায়। তার প্রয়োগমূল্য কম নয়। সমাজ-বিকাশের ধারাই তাকে প্রাসঙ্গিক করে তুলেছে। তার ওপর ভরসা রাখাটাও জরুরি হয়ে পড়ে। এই মানুষি জীবনের ইহজাগতিক শৃঙ্খলা ও সমন্বিত উন্নয়নের কারণেই। সবচেয়ে পরিচিত ও সবচেয়ে মান্য যে বৌদ্ধ-মন্ত্র তার প্রথম চরণ : ‘বুদ্ধং শরণং গচ্ছামি।’ বুদ্ধের চৈতন্য-রূপ কোনো ব্যক্তি-প্রতিমা নয়, তা পরিশুদ্ধ জ্ঞান। ইংরেজিতে যা এনলাইটেনমেন্ট, তাই। অমর্ত্য সেনও এদিকে আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। কিন্তু জ্ঞান তো নির্গুণ ও নিরপেক্ষ। ভালোমন্দ বিচারের তা ঊর্ধ্বে। তার নির্বিকার নিরাসক্তির সামনে মর্ত্য-মানুষ অসহায়। তাই প্রয়োজন পড়ে ধর্মের আবাহন – ‘ধম্মং শরণং গচ্ছামি।’ এই ধম্ম অন্য কিছু নয়। আগেই বলেছি, তা ন্যায়। তারও দাঁড়াবার জায়গা চাই, আধার চাই। আধার আধেয়র সমন্বয় সমীকরণ চাই। এরই জন্যে দরকার সংঘ চেতনা – ইন্স্টিটিউশনের সংগত নির্মাণ। প্রকৃত অর্থে সোশ্যাল কন্ট্রাক্টের আদর্শ বিধিবিধান। সমাজে মানুষকে তা আত্মসম্মান বজায় রেখে উচিত-অনুচিতের পথ দেখিয়ে পরিচালিত করে। তাই মহামন্ত্রের শেষ চরণ – সংঘং শরণং গচ্ছামি। সমাজ এই মন্ত্রকে অপরিহার্য করে তুলেছে। তার নিজেরই শুভ কামনায়। এই কামনার আকুতি এখনো ফুরিয়ে যায়নি। হজরত মুহাম্মদের বিদায় হজের বাণীও সোশ্যাল কন্ট্রাক্টের এক আদি আদর্শ রূপ। মধ্যপ্রাচ্যের ইতিহাস যদি তা যথাযথ অনুসরণে ব্যর্থ হয়ে থাকে, তবে সে-অনুপাতে ওই ইতিহাসের ধারা মূল্য হারিয়েছে। আমাদের ’৭২-এর সংবিধানও ছিল মানবমুক্তির এক পরিপূর্ণ নির্দেশনা। দেশের সবাই যে তার সঙ্গে একাত্ম ছিল, এমন ভাবলে তা অতিসরলীকরণ হবে। কিন্তু তাদের সম্ভাবনার-ন্যায় তাতে আকার পেয়েছিল। ঘটনা পরে তাকে বিপর্যস্ত করেছে। আমরা সেখান থেকে বিচ্যুত হয়েছি। বিচ্যুতি-উত্তর বাস্তবতায় প্রতিটি মুহূর্তের যৌক্তিক আয়োজন, যা অধিকাংশ মানুষের পছন্দের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ, তা আমাদের বাহাত্তরের সংবিধানে ফিরিয়ে নিয়ে যায় না, অথচ তা হতে পারে অমর্ত্য সেনের non-transcendental ন্যায়-ভাবনার যথার্থ প্রতিনিধি। এটা কি কাম্য? এটা কি কোনো শ্রেয়র সম্ভাবনাকে উজ্জ্বলতর করে?
এতকিছু বলার পরও আমরা তাঁর মনন-শাসিত অনুশীলনকে উপেক্ষা করতে পারি না। সোশ্যাল কন্ট্রাকটের ধ্যান-ধারণা ইউরোপীয় বাস্তবতায় গড়ে উঠেছে গত তিনশো-চারশো বছর ধরে। আজ তার মূলভাবনা অনুমোদন পায় এই বিশ্বের সব প্রান্তেই। কিন্তু পুঁজি ও প্রযুক্তি আরো বিস্তার চায়। গোটা পৃথিবী হয়ে উঠছে একটি কার্যকর একক। যোগাযোগ-বিপ্লব বাস্তবে ট্রান্সেন্ড করার অচেনা জায়গা বুঝি আর কিছু রাখছে না। তেমন পরিস্থিতিতে ভবিষ্যতে এক গণ্ডিবদ্ধ  নিশ্চিত পটভূমিতে আদর্শ সমাজ নির্মাণের সাধনা আর প্রাসঙ্গিক নাও থাকতে পারে। ‘ভূগোলের মায়াগণ্ডি’ পেরিয়ে এক মানববিশ্বের স্বপ্ন দেখেছিলেন রবীন্দ্রনাথ। অনুধ্যানে ও অধ্যবসায়ে তা যদি সর্বজনীন হয়ে ওঠে, তবে প্রত্যক্ষের বাস্তবতা পেরিয়ে আর কিছুর পেছনে আর কোথাও ছোটা নিরর্থক হয়ে পড়া অসম্ভব নয়। তখন প্রতিদিনের অন্যায়-অবিচারকে সরাসরি বোঝা, কম বাসযোগ্য থেকে বেশি বাসযোগ্য এক সমাজবিশ্ব খোঁজা হয়ে উঠতে পারে মানুষের প্রধান ভাবনার বিষয়। পথের দিশা দেখাতে সেখানে অমর্ত্য সেনের The Idea of Justice-এর প্রয়োজন হতে পারে, যেমন আজো আমরা হব্স্, হিউম, লক বা কান্টের সোশ্যাল কন্ট্রাক্টের আদর্শকে অনুসরণ করি – জেনে, অথবা না জেনে।
হয়তো আরো-আরো শতাব্দী পেরিয়ে যাবে। এবং যে-মানুষের ওপর রবীন্দ্রনাথ বিশ্বাস হারাননি, সেই মানুষের সভ্যতা তখনো টিকে থাকবে, আরো বিকশিত হবে। তবে বিপরীতের বিচিত্র সমাহারও সম্ভব। জনসংখ্যার চাপ ও সুযোগরাশির নতুন নতুন বিন্যাস প্রকৃতির নিঃস্বকরণ প্রক্রিয়াকে আরো ভয়াবহ করে তুলতে পারে। এবং তা তাৎক্ষণিক বিচারের পরিণামবাদী ন্যায়সূত্র মান্য করেই। এই আপেক্ষিক ক্ষতিকে ভিত্তি ধরে সমূহ সদিচ্ছা নিয়ে অগ্রসর হলেও আশার আলো জ্বালিয়ে রাখা সহজ হবে না। অমর্ত্য সেনের প্রদর্শিত পথে অগ্রসর হয়ে ওপর ওপর কিছু সুফল আশা করা অযৌক্তিক নয়। কিন্তু পায়ের তলায় সোশ্যাল কন্ট্রাক্টের শক্ত জমি না থাকলে তা অনিশ্চিতই থেকে যাবে। সেটা কোনো শ্রেয় সমাধানের আশা উজ্জ্বলতর করে না।
আরো একটা প্রশ্ন প্রাসঙ্গিক মনে হয়। মানুষের সামর্থ্য বাড়ানো আমাদের লক্ষ্য। ভালো থাকা ও বহুমুখী সুযোগের সদ্ব্যবহার করা এর ফলে তার জন্যে সহজতর হয়। কিন্তু এই সামর্থ্যরে স্বয়ং-নির্ভর পূর্ণ বয়ান কি আমরা রচনা করতে পারি? পারিপার্শ্বিক কি তার ওপর খবরদারি করে না? সাক্ষরতা তার এক মৌলিক উপাদান নিশ্চয়। কিন্তু তা কি প্রত্যক্ষে জীবনের প্রয়োজন মেটায়? উৎপাদনের ধরন ও তার কর্মকুশলতার চাহিদা কি সেখানে ছায়া ফেলে না? মেধার যথোপযুক্ত মূল্যায়নই বা করি কী করে? এখন ছেলেমেয়েদের বেশি তারিফ করি, যদি তারা প্রকৌশলী হওয়ার বা চিকিৎসক হওয়ার সুযোগ পায়। তাতেই তাদের ভবিষ্যতে বেশি বেশি শখ-আহ্লাদ মেটানোর স্বপ্ন। আগে এই স্বপ্নটার দরকার ছিল না। বৃত্তি ছিল বংশানুক্রমিক। দক্ষতার চর্চাও তাই। সাক্ষরতা বা নিরক্ষরতা আলাদা কোনো মাত্রা যোগ করতো না। উৎপাদন কুশলতা যত বদলায়, সামর্থ্যরে ধারণাও তত পালটায়। স্বয়ং তা মৌল নির্ণায়ক থাকে কি? সামাজিক ন্যায়কে তাহলে দেখতে হয় পরিবর্তনশীল বাস্তবতায়, যেখানে সক্ষমতা বা কেপেবিলিটি নিজেই একটি পরিণাম। এই পরিণামকে ধারণ করে যে ইন্স্টিটিউশন, তার যৌক্তিক কাঠামোর সাবলীল রূপান্তর যোগ্যতা ও অবিরাম গ্রহণযোগ্যতা ওই ন্যায়ের বিচারে অবান্তর থাকে না।
এটি মেনে নিয়ে ঘটমান বর্তমানে – যে-কোনো বর্তমানে – যদি ন্যায়ের সার্বিক কার্যকর রূপ আমরা বিবেচনায় আনি, তবে অমর্ত্য সেনের The Idea of Justice  যে আমাদের চিন্তাকে উদ্দীপিত করে, ভাবনার জগৎকে ঢেলে সাজায়, তা কিন্তু আমরা অস্বীকার করতে পারি না। তার মর্মার্থ থেকে, এবং শুধু কাগজে-কলমে মাত্রা বিচার করে নয়, বাস্তবে সামাজিক কর্মকাণ্ডে তার নির্দেশনার ফলপ্রসূ প্রয়োগ ঘটিয়ে আমরা জীবনচর্চায় উন্নতর প্রকাশের আশা করতে পারি। তবে সোশ্যাল কন্ট্রাক্ট্কে তার অন্তর্জাত ইন্স্টিটিউশনগুলোর কার্যকর ভূমিকাকে বাদ দিয়ে নয়। যদিও তারাও হতে পারে কালের যাত্রায় গতিশীল ও পরিবর্তনশীল। সেখানে জ্ঞানের বিকাশ ও প্রযুক্তির রূপান্তর মানবসমাজের ধারণার ওপর, এবং মানুষে-মানুষে সম্পর্ক-সম্বন্ধের ওপর অবিরাম ছাপ ফেলে চলে। আমাদের ন্যায়-ভাবনা যদি তার সঙ্গে তাল মেলাতে না পারে, তবে স্বয়ং তা জুলুমকে  প্রশ্রয় দেবে, এমন আশঙ্কা জাগায়। সমাজের বৃহত্তর অংশের স্বতঃস্ফূর্ত অনুমোদন থাকলেও তার পরিণতি সম্ভাব্য ন্যায়কেই সংকুচিত করে।

সোশ্যাল মিডিয়া

নিউসলেটার