অমীমাংসিত

লেখক:

মণিকা চক্রবর্তী

গতকাল বিকেলে ঢাকা এয়ারপোর্টে বিমান থেকে নামার পর থেকেই মামুনের চারপাশটা ক্রমেই একপাল মানুষের ভিড়ে ভরে উঠছে। নিজের মুখটাও ভালো করে দেখার সময় হচ্ছে না। অথচ ভেতরে ভেতরে চিন্তাটা লুকিয়ে থাকা নখের চিমটির মতো একটু পরপরই চিমটি কেটে যাচ্ছে। মহসিন ওরফে মতির বাসায়ই সে সরাসরি উঠেছে। মতির বাসা যাত্রাবাড়ী। পুরনো আমলের একতলা বাড়িতে স্যাঁতসেঁতে দুটি ঘর। আলো কম। মতির তিনটি বোন, এক ভাই। বোনদের জামাই আর বাচ্চাকাচ্চা মিলে দশ-বারোজন। মতির ছোট ভাই আর বোনের জামাইরা মিলে মাইক্রোবাস নিয়ে এয়ারপোর্টে গিয়েছিল মতিকে আনার জন্য। সাত বছর

পর মতি মালয়েশিয়া থেকে ফিরল। সাত বছর! কম কথা! তবে মতি না থাকলে মামুনের ফেরাই হতো না। মতির ভাগ্য তো তার মতো না! সে তো আসছে একেবারে খালি হাতে! মতির ছিল বনায়নের ভিসা। তাই যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই চাকরি হয়েছিল। আর মামুন গেল অবৈধভাবে। পাঁচ বছর আগে। পাঁচটি বছর ধরে কাজ নেই, খাবার নেই। পুলিশের কাছে ধরা পড়লে নানা হেনস্তা। তবু শেষ পর্যন্ত মতিই উকিল ধরে,    টাকা-পয়সা দিয়ে মামুনের দেশে ফিরাটা নিশ্চিত করল। এমন বন্ধু-ভাগ্যইবা কজনের হয়! মতিকে তো সে সব কথাই বলেছে। মতির কাছে জীবনের কোনো কথাই সে গোপন করেনি। কিন্তু গত কয়েকটি বছর ধরে যে, সে আয়নায় তার চেহারাটা উলটো দেখছে, সে-কথাটা সে কাউকে বলতে পারছে না এখন পর্যন্ত!

প্রথম যেদিন নিজের চেহারাটা আয়নায় দেখল উলটো, তার বিশ্বাস হচ্ছিল না। আয়নার ভেতরটা গলে গিয়ে যেন জলের মতো আর তার মধ্যে তার অস্পষ্ট বাঁকাচোরা চেহারা। তখন সে মালয়েশিয়ায় একঘর বেকার বাংলাদেশিদের সঙ্গে  শুয়েবসে দুশ্চিন্তায় দিন কাটাচ্ছিল। কাজ নেই, খাবার নেই। দেশ থেকে আনা টাকা ফুরিয়ে গেছে। ব্যাগের ভেতর থেকে আয়নাটা প্রতিদিন একবার করে দেখে দেখে নিজেকে মানুষ হিসেবে নিশ্চিত করতে চাইত সে। দুই চোখে দেখা, দুই কানে শোনা আর নাক দিয়ে নিশ্বাস নেওয়ার পরও তার নিজেকে বড়ই অচেনা মনে হতো। চুল কাটার পয়সাও নেই। সারা মুখভর্তি দাঁড়ি-গোফ! হাতের তালু, পায়ের তালু ঘেমে প্যাচপ্যাচে। বদ্ধঘরের চারদিকে দুর্গন্ধ ছড়ানো। এরই মধ্যে ভয়াবহ হয়ে উঠেছিল সেই আয়নাটা! অাঁতকে উঠেছিল সে! কেউ যেন পেছনদিক থেকে ছুরি বসিয়ে দিয়েছিল! তাৎক্ষণিকভাবে মরে গিয়েছিল সে। শরীরের সব রক্ত যেন মরা মানুষের! ভয়ে ভয়ে আয়নাটা যথাস্থানে রেখে দিয়েছিল সে।

তবে মরার চেষ্টা কি সে করেনি?      দু-দুবার রেললাইনে মাথা পেতে দিয়েছিল সে। অন্যের ওপর প্রতিশোধ নিতে গিয়ে, ন্যায়বিচার না পেয়ে, নিজের নিয়তিকে ক্ষমা করতে না পেরে শরীর থেকে নিজের জীবনটাকে বের করে দিতে চেয়েছিল। তবু শেষ পর্যন্ত দুই পাড় দিয়ে যখন রেলগাড়িটা চলে যাচ্ছিল, থমকে দাঁড়িয়ে গিয়েছিল। মাটির ওপর মুখ থুবরে পড়ে মাটির গন্ধ নিতে নিতে নিজের দিকে ঘুরে দাঁড়িয়েছিল সে। রেলগাড়ির শব্দ ছড়িয়ে পড়তে পড়তে সে নিজেকে আবিষ্কার করেছিল ফাঁকা অন্ধকারে একা। সে-সময় দুই পাঞ্জার ভেতরে নিজের জীবনটাকে আরেকবার অনুভব করেছিল তীব্রভাবে। একলা, ঘুটঘুটে অন্ধকারে, নিজের ছায়াটুকুও তখন নেই। মালয়েশিয়ার সেই বদ্ধঘরটিতে হইচইয়ের ভেতরে বা নিঃশব্দে, রেলগাড়ির চলে যাওয়ার সে-শব্দটা প্রায়ই হানা দিত। অথবা ঠিক তখনই যখন আয়নার ভেতরটা গলে গিয়ে জল, কেঁপে-কেঁপে তার উলটো চেহারাটা ধরা পড়ছে আর মগজের ভেতর অসংখ্য কিলবিলের সঙ্গে মিলিয়ে যাচ্ছে রেলগাড়ির চলে যাওয়ার শব্দ। উলটো মুখের ভেতর উলটানো চোখ, একটির ওপর আরেকটি উঠানো, হাঁ-করা মুখ, ঝুলে থাকা শীর্ণ চোয়াল। আয়নার ভেতরে অসমর্থ সেই চোখের দিকে সে নিবিড়ভাবে ঝুঁকে থাকত কিছুটা সময়। তখন আলো-অাঁধারির স্মৃতির সিঁড়ি বেয়ে উঠে আসত অতীতের অনুভব। আর  কবেকার সেই একলা চলা নদীটিও। নিরিবিলি স্বপ্নের ভেতর নিঃশব্দে সেই নদী মাথার ভেতর বয়ে যেত। জলে পা ডুবিয়ে বসে থাকার একটা শীতল অনুভব শরীরটাকে এলিয়ে দিত। জল, ছায়া, অন্ধকার মাথার ভেতর পাক খেতে খেতে এক নিরাসক্ত ঢেউয়ে ভাসিয়ে নিয়ে চলত দূর থেকে দূরে।

দুই

সেই শমসেরপুর গ্রামের বিকেল বেলার শনিবারের হাট। হাটের দিনে সবজি বেঁচে সন্ধ্যার পর হাঁটতে হাঁটতে বাড়ি ফেরা। আকাশে তখন একলা চাঁদ। সেও হাঁটতে থাকে আর মাথার ওপর চাঁদও তার সঙ্গে সঙ্গে এগোতে থাকে। ভারি মজা লাগে তার। মাঠের ভেতর কৃষ্ণচূড়া গাছের পাশ দিয়ে এগিয়ে যেতে যেতে সেই চাঁদ পাতার আড়ালে লুকোচুরি খেলে। এমন লুকোচুরি খেলা তার সঙ্গে আরেকজনও খেলতে শুরু করেছে তখন। তার নাম রীতা। রীতাকে দেখার আগে তিতপুঁটির ঝাঁক ভেসে বেড়ানো ছোট্ট নদীটিই ছিল তার ইচ্ছেমতো খেলার সঙ্গী। ডুব দিয়ে জলের নিচে নিজেকে ছড়িয়ে দিতে দারুণ ভালো লাগে তার। দুচোখ আরামে বুজে আসে।

গত বছর আম-কাঁঠালের দিনে সে তখন রীতাদের বাড়িতে কাঠের মিস্ত্রির কাজ করতে গিয়েছিল। বাপ মরে যাওয়ার পর এ-কাজটি সেই করত। কাঠের ওপরে তার নকশা ছিল অসাধারণ। পনেরো বছর বয়স থেকেই উত্তরাধিকারসূত্রে এ-পেশাটিতেই অভ্যস্ত হয়ে উঠেছিল সে। ক্লাস এইট পর্যন্ত গ্রামের স্কুলে যাওয়ার পর আর পড়াশোনা হলো না। কালো চকচকে কাঠের ওপর কারুকাজের অনিবার্য রেখাগুলো টানতে টানতে নিঃশব্দে সে ডুবে থাকত। রেখাগুলো নীরবে হয়ে ওঠে পঙ্খিরাজ, পদ্মফুল। গরমে ঘামের ভেতর ডুবে যেতে যেতে একদিন হঠাৎ দেখল সুগন্ধ বাতাসের মতো রীতার মুখ। ভেতর ঘর থেকে এক গ্লাস জল আর এক ঝাঁকা মুড়ি দিতে এসেছিল সে। তারপর ওর কারুকাজের ওপর চোখ পড়তেই চোখ বড় বড় করে বলেছিল, ‘এত সুন্দর কইরা অাঁকেন আপনে? আমার দুইটা নতুন জামায় ফুল আর্ট কইরা দেবেন?’ সে মুখ নিচু করে বলে, ‘দিমু না কেন? অবশ্যই দিমু।’

কাঠের কাজ শেষ হয়ে যাওয়ার পরও সে রীতাদের বাড়িতে আসে। ক্রমেই ঘনিষ্ঠ হয়ে ওঠে রীতাদের বাড়ির সদস্যদের সঙ্গে। রীতারা অবস্থাপন্ন। কিন্তু তার বড় ভাইটি কেমন করে যেন ভিড়ে যায় সর্বহারাদের দলে। বাড়িতে এটা নিয়ে অশান্তি লেগেই থাকত। ঘরের ভেতর অস্ত্র এনে রাখত। রীতার কথায় এসব টের পাওয়া যেত। ভালোবাসায় সবুজ হয়ে থাকা সময়টা কোনো এক দ্বিধাগ্রস্ততায় তছনছ হয়ে যেতে চাইত। রীতা সবেমাত্র কিশোরী, গোলাপি শরীরে চাঁদপনা মুখ, পাতলা শরীর। ভাইটির কারণে এক নিরাপত্তাহীনতার বোধ তাকে সবসময় বিষণ্ণ করে রাখে। তবু তার উড়বার সাধ হয়। মামুনের দারিদ্র্যকে সে এড়িয়ে যায়। বরং মামুনের মধ্যে সে দেখতে পায়  ঋজু ও স্পষ্ট এক সরল একনিষ্ঠ মানুষ, যার হাত ধরে নিশ্চিন্তে হাঁটা যায়।

রীতাদের বাড়িতে পৌঁছতে পার হতে হয় ছোট্ট নদীটি। দিনের বেলায় ভাইটি বাড়িতে থাকে। তাই রীতা মামুনকে আসতে বলে রাত ১২টায়। তখন চারপাশে কোনো জনমানুষ নেই। ভাইটিও কোথায় যেন চলে যায় সন্ধ্যার পর। সাহস করে কোষা নৌকাটি নিয়ে বেরিয়ে পড়ে মামুন। থির থির বাতাসে কাঁপে নদীর জল। সঙ্গে তার পরানও কাঁপে ডরে-ভয়ে। তবু রীতাকে কিছুতেই বলা যায় না এই ভয়ের কথা। সে তো সব ভার তার ওপর ছেড়ে দিয়ে নিশ্চিন্ত হয়ে আছে। অন্ধকারে আকাশের তারাগুলো মিটমিটিয়ে জ্বলে। সেদিকে তাকিয়ে সে ভাবে এই জটিল সম্পর্কের কথা। যদি জানাজানি হয় তাহলে আর রক্ষা নাই। নদীর পাড়ে যজ্ঞডুমুর গাছের গায়ে মিশে থাকা অন্ধকারের ভেতর থেকে, অনন্ত প্রতীক্ষার ভেতর থেকে আসে রীতার সংকেত। মেঘ, তারা আর হাওয়াকে সঙ্গী করে জলের দোলায় ভাসে দুজনে। কথার ভাঁজে ভাঁজে বাতাস ছড়িয়ে দেয় জলের ছিটে। কোনো এক পাখি হঠাৎ ডেকে ওঠে বাঁশবনের অন্ধকারে। কোন দূর থেকে ভেসে আসে পেয়ারা ফুলের গন্ধ। শিরীষ গাছের মাথায় মুচকি হাসে চাঁদ। আর সেই আলোতে মামুন দেখতে পায় এক গভীর আর সহজ ভালোবাসার আবেগে কেঁপে উঠছে রীতার নীল ওড়না।

এভাবে একদিন-দুদিন-অনেকদিন, প্রায় এক বছর হতে চলল। সে-রাতে শিংওয়ালা অন্ধকারের ভেতর আর নিরিবিলিতে কাটানো সময়ের ভেতর নৌকাটা আগের মতোই অল্প অল্প দুলছিল। আর তাদের অলক্ষে গাছের কোটর থেকে জ্বলজ্বলে চোখে তাদের দিকে তাকিয়েছিল হয়তো প্যাঁচা অথবা প্যাঁচার মতোই সন্দেহের চোখ নিয়ে কোনো মানুষ। কথাটা গ্রামের ভেতর পাঁচকান হতে দেরি হয়নি। তার দুদিন পরই এক সন্ধ্যায় চারজন অচেনা লোক এলো তার ছোট্ট ভিটিতে। টেনেহিঁচড়ে ঘর থেকে বাইরের উঠোনে ছুড়ে ফেলল তাকে। মাটিতে শুইয়ে তার জিভ টেনে ছিঁড়ে ফেলার চেষ্টা করেছিল তারা। তার শরীর ধনুকের মতো বেঁ

কে গিয়েছিল। আর ছেঁড়াখোঁড়া ঠোঁট বেয়ে হড়হড় করে পেটের ভেতর থেকে বের হয়ে আসছিল বমি। তবু রাত গভীর হলে সবার চোখ ফাঁকি দিয়ে  এক অদ্ভুত নেশার টানে সে নদী সাঁতরে যজ্ঞডুমুর গাছের তলে এসে অপেক্ষা করেছিল। রীতা আর আসে না। কিছুক্ষণ অপেক্ষার পর ক্ষুধাহীন, তৃষ্ণাহীন মামুনের ম

ন হলো তীব্র অন্ধকারের ভেতর কেউ যেন ফুঁপিয়ে কাঁদছে! অন্ধকারটাই কি কাঁদছিল! নাকি তার প্রিয় নদীটিও! কি জানি? মাথার ভেতরে রীতার অসংখ্য কথা চুপিচুপি ছটফট করছিল তখন। সেসব কথার ভার মাথার ভেতর নিয়ে এক ডানা ভাঙা পাখির মতো ফিরে এসেছিল সে।

পরদিন সকালেই রীতার লাশটা ঝুলতে দেখা গেল নদীর পারের বিশাল অশ্বত্থ গাছের ডালে। গ্রামের সব মানুষ একত্র হয়ে ছুটল সে দিকে। সেদিন হতবিমূঢ় মামুন একজোড়া ভারী পা নিয়ে, মাথার ভেতরে অনেকগুলো কথা বহনের দায় নিয়ে, সবকিছু হারিয়ে ফেলার যন্ত্রণা নিয়ে, গ্রাম ছেড়ে বেরিয়ে পড়েছিল।

 

তিন

দীর্ঘ ছয় বছর পর গ্রামে ফিরেছে মামুন। মতিকেও সঙ্গে নিয়ে এসেছে সে। একদিন হঠাৎ যেমন নিখোঁজ সংবাদ হয়ে গিয়েছিল, তেমনিভাবেই হঠাৎ এসে বৃদ্ধা মা আর প্রতিবেশীদের চমকে দিয়েছে অনেকটা। সে জানে, ফেলে আসা দিনের কিছুই সে খুঁজে পাবে না, তবু মাথার ভেতর অসংখ্য স্মৃতিচিহ্ন নিয়ে সে নদীটিকে খোঁজে। পুব থেকে পশ্চিমের দিকে এঁকেবেঁকে চলে যাওয়া নদীটিকে। সেই অশ্বত্থ গাছ, নীল ওড়না, ছোট্ট কোষা নৌকাটিকে। কিন্তু কোথায় সেই নদী আর চেনা গাঁও। দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে পড়ে সে। নদীর পাশের ধানক্ষেত আর মাঠটুকুও নেই। সমস্ত অস্তিত্ব নিয়ে যা কিছু ছিল তার সবই হারিয়ে গেছে। নদীর জল শুকিয়ে সেখানে এখন মানুষের পায়ে হাঁটাপথ। চারপাশে নতুন সব বাড়ি, দোকান আর অনেক মানুষ। স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে থেকে মামুন আর কিছু ভাবতে পারে না। আয়নার সামনের সেই উলটো চেহারাটা মনে আসে। উলটো, ছিন্নভিন্ন হয়ে যাওয়া তার শান্ত মুখ, চোখ, শরীর। বুকের মধ্যে এক নিঃশব্দ বিলাপ নিয়ে মতির পাশাপাশি হাঁটতে থাকে সে, নদীর ভেতরের নতুন পায়ে হাঁটাপথে।

শেয়ার করুন

Leave a Reply