অস্তিত্ব

লেখক:

মনি হায়দার

 

এগারোজন মানুষ আগুনের নীরবতায় একে অপরকে সহ্য করছে।

তিনজন নারী, বাকি আটজন পুরম্নষ। আটজন পুরম্নষের মধ্যে পাঁচজন সৈন্য। দুজন বেসামরিক নাগরিক। পাঁচজন সৈন্যের একজন ক্যাপ্টেন দিদার। সুন্দর গোলগাল মুখ। নাকের নিচে হালকা কালো গোঁফ। ছিমছাম পেটানো শরীর। হাতে একটা ছোট্ট কিন্তু সুদৃশ্য লাঠি। মাঝে মাঝে হাতের লাঠিটি নাড়ানোয় নিঃশব্দ ক্ষমতার একটা দাপট প্রকাশ পাচ্ছে। চারজন সৈন্যের দুজন রম্নমের ভেতরে রাইফেল তাক করে দাঁড়িয়ে। অন্য দুজন রম্নমের বাইরে অপেক্ষা করছে। বলাই যায়, তারাও প্রস্ত্তত যে-কোনো অ্যাকশনের জন্য।

বেসামরিক নারী-পুরম্নষের কেউ কথা বলছে না। বলছে না মানে বলতে পারছে না। প্রত্যেকের জিহবা আড়ষ্ট। বিশেষ করে বাড়ির কাজের লোক খাদেম লুঙ্গি ভিজিয়ে দিয়েছে। প্রস্রাবের টাটকা গন্ধ সারাটা রম্নমে স্যাঁতসেঁতে শ্বেত আতঙ্ক ঢুকিয়ে  দিয়েছে। বাড়ির কর্তা খবিরউদ্দিন বসে আছেন স্ত্রী আনোয়ারা বেগমের পাশে, সোফায়। দুজনেই কাঁপছেন। বারবার জিহবা দিয়ে ঠোঁট চেটে ভেজানোর চেষ্টা করছেন আনোয়ারা বেগম। আনোয়ারার পাশে বসেছে কায়েস। নবম শ্রেণির ছাত্র। নাকের নিচে গোঁফের রেখা হালকাভাবে দেখা দিয়েছে। কায়েস বারবার মেজর দিদারের দিকে তাকায়, ঠিক দিদারের দিকে নয়, দিদারের হাতের লাঠিটার দিকে। লাঠিটা সুন্দর… চকচকে।

আর মাত্র পাঁচ মিনিট – মেজর দিদারের ভরাট গলা। দরজায় দাঁড়িয়ে সিগারেট ধরিয়ে বেশ আয়েশ করে টানতে টানতে রম্নমের মধ্যে একটা চক্কর দিয়ে দাঁড়ায় লায়লা আর নায়লার সামনে। মুখের ধোঁয়া উগরে দেয় দুই বোনের মুখের ওপর। সিগারেটের ধোঁয়া একদম সহ্য করতে পারে না নায়লা। খুকখুক কাশতে থাকে। কাশতে কাশতে চোখে পানি আসে ওর। ওড়না দিয়ে মোছে চোখ। মৃদু হেসে মেজর দিদার একটু সরে দাঁড়ায় দরজার দিকে, চোখ রাখে খবিরউদ্দিনের ওপর – তুমি বলছ তোমার ছেলে বাহার কোথায় জানো না?

ঘাড় নাড়েন খবিরউদ্দিন, অফিসার সত্যি বলছি আপনাকে। আমি সরকারের একজন কর্মকর্তা। পড়াই কলেজে। আপনিও সরকারের লোক –

তুমি কেমন বাপ? কথা থামিয়ে কর্কশ গলায় বলে দিদার – নিজের ছেলের খবর রাখো না? ছেলে জন্ম দেওয়া যেমন ফরজ, তেমন তাদের খবর রাখাও ফরজ; কিন্তু আমি জানি তুমি সত্যি বলছ না।

ভেঙে পড়ে খবিরউদ্দিন, আপনাকে সত্যি বলছি।

আবার মিথ্যা কথা? পলকে ঘুরে এসে খবিরউদ্দিনের গালে প্রচ- শক্তিতে চড় মারে দিদার। মনে হলো পুরো কক্ষটার ভেতরে একটা বজ্রপাত হলো। আনোয়ারা বেগম দুহাতে জড়িয়ে ধরলেন খবিরউদ্দিনকে। কায়েস উঠে বাবার কাছে আসতে চাইলে দিদারের ইঙ্গিতে একজন সৈন্য ওর চুল ধরে আগের জায়গায় বসিয়ে দেয়। নায়লা আর লায়লা দাঁড়িয়ে কাঁদছে। দিদার দুজনের সামনে একেবারে বুকের ওপর দাঁড়ায় প্রায়, ওরা দুহাতে মুখ ঢেকে সোফায় বসে। মেজর দিদারের মুখে জামত্মব হাসি। সিগারেট ধরিয়ে টানতে থাকে। টানতে টানতে রম্নমের মধ্যে হাঁটছে। হাঁটায় বুটের ধাতব শব্দে পুরোটা কক্ষ কেঁপে উঠছে। প্রচুর ধোঁয়া ছাড়ে মুখ থেকে। মনে হচ্ছে, এটা তার একটা খেলা। ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে আবার দাঁড়ায় খবিরউদ্দিনের সামনে, সাচ বাতাও – কোথায় তোমার ছেলে?

মেজরের দিকে খবিরউদ্দিন একবার তাকিয়ে মাথা নিচু করে রাখেন। ভয়ে বিবর্ণ তিনি। তিরতির ঠোঁট কাঁপছে। কয়েক মাস ধরে এদের অত্যাচার শুনে আসছেন, পথে পথে লাশ পড়ে থাকতে দেখেছেন। আজ সেই আতঙ্ক তার ঘরে? তার মুখের ওপর?

বুঝতে পারছি, তুমি সত্যি বলবে না। কিন্তু আমরা জানি, তোমার ছেলে বাহার ভারতে ট্রেনিং নিয়েছে। এখন যুদ্ধ করছে কুমিলস্নায়। গত মাসের আটাশ তারিখে বাসায় এসেছিল ভিখেরি সেজে। মি. খবিরউদ্দিন, কী আমি ঠিক বলেছি না মিথ্যা বলেছি?

খবিরউদ্দিন, আনোয়ারা বেগম, লায়লা, নায়লা, কায়েস – বুঝে গেছে বাড়িটার ওপর নজর ছিল ওদের আগে থেকেই।  কিন্তু এখন কী করবে? খবিরউদ্দিন অনেকদিন পর ছেলেকে পেয়ে খুব খুশি হয়েছিলেন। কলিংবেল টিপলে দরজা খুলে দিলে সামনে দাঁড়ানো দাড়ি-গোঁফে ঠাসা মুখ দেখে বাহারকে চিনতে পারেননি। পরনে ময়লা জামা। ছেঁড়া প্যান্ট। কাঁধে ততোধিক ছেঁড়া ব্যাগ। ব্যাগের ভিতরে ছিল স্টেনগান। খবিরউদ্দিন দরজা বন্ধ করতে গেলে বাহার হাসে, বাবা আমি।

হাসি দেখে এবং কণ্ঠ শুনে বুঝতে পারে, সামনে দাঁড়ানো ভিক্ষুক নয়, বাহার। বাহারউদ্দিন ধানম– ছাত্রলীগের সভাপতি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেমিস্ট্রির শেষ বর্ষের ছাত্র। গত দুটি বছর ক্লাস করার চেয়ে মিছিল আর মিটিং নিয়ে ব্যসত্ম ছিল। এসব নিয়ে বাসায় প্রায় প্রতিদিন ঝগড়া হতো। কিন্তু বাসার সবাই বাহারকে সাপোর্ট করত। তিনিও করেন, এ-সময়ে সাপোর্ট না করে থাকতে পারে কোনো বাঙালি? কিন্তু তিনি শিক্ষক মানুষ। সারাজীবন ছাত্র পড়িয়ে চলেছেন। খবিরউদ্দিন চান, আগে লেখাপড়া পরে আন্দোলন, পিকেটিং, হরতাল, সেস্নাগান, মিছিল। কিন্তু বাহারের বেলায় ঘটনা ঘটেছে উলটো। আগে মিছিল, মিটিং, সেস্নাগান, পরে লেখাপড়া। মিছিল, মিটিং, সেস্নাগানের ফলাফলে নেমে এলো কেয়ামত, পাকিসত্মানি জামত্মার অপারেশন সার্চলাইট।

জামত্মার অপারেশন সার্চলাইটের মাত্র মাসখানেকের মাথায় বাহার হাওয়া। বুঝতে পেরেছেন খবিরউদ্দিন, ছেলে যুদ্ধে গেছে। একদিকে গর্ব, বিপরীত পিঠে ভয়, ভয় আর ভয়। বাড়িটা ধানম–র তিন নম্বর রোডে। পিলখানার নাকের ডগায়। তিনতলা বাড়ি করেছেন। রিটায়ার্ড করেছেন বছরতিনেক আগে। রিটায়ার্ডের টাকায় বাড়িটা কোনোভাবে করতে পেরেছেন। বাহার পাশ করে চাকরিতে ঢুকলে আর চিমত্মা নেই। ভাবনা মেয়েদুটিকে নিয়ে। বড় মেয়ে লায়লা বিএ পড়ছে। আর কয়েক মাস পর ফাইনাল পরীক্ষা। বিয়ের প্রসত্মাব আসছে। আনোয়ারা বেগমের একটাই কথা, মেয়ের বিএ পরীক্ষার আগে বিয়ে নিয়ে কোনো কথা নয়।

খবিরউদ্দিনও প্রসত্মাবটাকে যথার্থ মনে করে চুপ করে আছেন। বন্ধু, একই কলেজের ইংরেজির শিক্ষক শফিউর রহমান তার ছেলের জন্য প্রসত্মাব দিয়েছেন। ছেলেটা সিএসপি অফিসার। সবই ঠিক আছে তবে ছেলেটা একটু খাটো। মানে লায়লার প্রায় সমান; কিন্তু দেখতে সুন্দর। আনোয়ারা বেগমের এখানেই একটু আপত্তি।

মেয়ের চেয়ে জামাই ছোট হলে কেমন লাগবে দেখতে?

আরে ছোট না, সমান সমান – বোঝানোর চেষ্টা করেন খবিরউদ্দিন।

ছেলের চেয়ে মেয়ে একটু খাটো হয়, কিন্তু এখানে একেবারে উলটো – দুজনকে একসঙ্গে দেখতে ভালো লাগবে না।

আচ্ছা, সে পরে হবে। আগে তো লায়লা বিএ পরীক্ষা দিক – আপাতত লায়লার বিয়ের ব্যাপারটাকে চাপা দিয়ে রাখলেও এখন আর কিছুই চাপা দিয়ে রাখতে পারছেন না। চারদিকে দগদগে আগুন জ্বলছে। খবিরউদ্দিন সহজ-সরল মানুষ। তিনি ছেলের সঙ্গে অনেক দিন তর্ক করেছেন, তোরা এমন করে জ্বালানো-পোড়ানো শুরম্ন করলি কেন?

মানে? বাহার অবাক চোখে তাকায়।

এই যে মিছিল-মিটিং করছিস, পাকিসত্মান রাষ্ট্রের বিরম্নদ্ধে কথা বলছিস, এটা কি ঠিক হচ্ছে?

তুমি আমাকে ঘর থেকে বের হতে দেবে না, আমার মুখের  গ্রাস কেড়ে নেবে আর আমি বসে থাকব? বসে বসে মার খাব?

বসে থাকবি কেন? অন্যায় হলে নিশ্চয়ই প্রতিবাদ করবি। কিন্তু এই রাষ্ট্রটার জন্য তো আমরা লড়াই করেছি। আমি কলকাতার ইসলামিয়া কলেজের ছাত্র ছিলাম, পাকিসত্মানের জন্য আমি মিছিল করেছি না? কেবল আমি একা? আমার মতো অনেক বাঙালি মুসলমান দিন-রাত মিছিল-মিটিং করেছে। মাত্র কয়েক বছরের মধ্যে সেই রাষ্ট্রের বিরম্নদ্ধে –

তোমার কষ্ট বুঝি বাবা। কিন্তু নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা কি আমরা পাইনি?

চশমার কাচ মুছতে মুছতে জবাব দেন খবিরউদ্দিন, হ্যাঁ। ওদের মানে পশ্চিম পাকিসত্মানের উচিত শেখ মুজিবের হাতে ক্ষমতা দেওয়া।

কিন্তু সেটা ওরা কোনোদিনও দেবে না। আর যদি না দেয়, ভাঙন অনিবার্য।

অাঁতকে ওঠেন খবিরউদ্দিন, বলিস কি তুই?

হাসে বাহার, বাঙালি এখন এর চেয়ে কম কোনো কিছুতে থামবে না বাবা। কিন্তু তার জন্য আমাদের প্রাণ বিসর্জনসহ অনেক ত্যাগ স্বীকারের জন্য প্রস্ত্তত থাকতে হবে।

এখানে প্রাণ বিসর্জন দেওয়ার প্রসঙ্গ কেন আসছে?

ওরা কি এমনি এমনি ছেড়ে দেবে মনে করছ? মোটেই না, পশ্চিম পাকিসত্মান থেকে বিমান বোঝাই করে সৈন্য আর অস্ত্র আসছে কি শামিত্মর পতাকা ওড়াতে? মোটেই না – ওরা আমাদের ম্যাসাকার করবে।

এইটা তোদের বাড়াবাড়ি বাহার। পাকিসত্মান – পূর্ব আর পশ্চিম মিলে একটি রাষ্ট্র। আমরা একই দেশের নাগরিক, আমাদের ওরা মারবে কেন?

মারবে এই কারণে, আমরা যে স্বাধীনতা চাইছি।

ক্ষেপে ওঠেন খবিরউদ্দিন, কিসের স্বাধীনতা? শেখ মুজিব কি স্বাধীনতা চাইছেন?

তুমি ইংরেজি সাহিত্যের তুখোড় অধ্যাপক, সাহিত্য বোঝো কিন্তু পলিটিক্স বোঝো না। বঙ্গবন্ধুর ছয় দফা বোঝো?

বুঝব না কেন?

না, একদমই বোঝো না। তোমাকে একটি দফার সম্পর্কে বলি, ছয় দফার একটা দফা হচ্ছে পাকিসত্মানের দুই অংশের মধ্যে আলাদা আলাদা কারেন্সি মানে টাকা থাকবে। অর্থাৎ একটি রাষ্ট্রের মধ্যে দুই ধরনের টাকা। একটি রাষ্ট্রের দুই ধরনের টাকা থাকে, শুনেছ কোনো রাষ্ট্রব্যবস্থায়?

খবিরউদ্দিন বিভ্রামত্ম চোখে চেয়ে থাকেন ছেলের দিকে, কী বলছে বাহার? সত্যিই তো, একটি রাষ্ট্রে দুই ধরনের টাকা থাকে কী করে? দুই ধরনের টাকা থাকা মানে – দুটি রাষ্ট্র!

বিড়বিড় করেন খবিরউদ্দিন, কী ভয়ানক পরিস্থিতি!

বঙ্গবন্ধু বিপস্নবী নেতা, একই সঙ্গে নিয়মতান্ত্রিক নেতা। ধীরে ধীরে পথ তৈরি করেছেন স্বাধীনতার। এখন চলছে অসহযোগ আন্দোলন। স্বাধীনতা অনিবার্য। তবে হ্যাঁ, তার জন্য জীবন দিতে হতে পারে। ইতিহাস সাক্ষী দেয় – স্বাধীনতা রক্ত চায়। রক্তপানের ভেতর দিয়ে স্বাধীনতা পূর্ণতা অর্জন করে।

আমি বিশ্বাস করি না, পাকিসত্মানের নেতারা এমন করতে পারে।

বাবা, তোমাকে একটা কথা বলি, পাকিসত্মান মানে বিশ্বাসঘাতক।

চায়ের ট্রে-হাতে ঢোকেন আনোয়ারা বেগম, তুই তোর বাবাকে বুঝিয়ে পারবি না। সে আছে তার কলকাতার মিছিল নিয়ে। নে, চা খা। বাইরে যাবি নাকি?

হ্যাঁ, আমার বন্ধুরা আসছে। ওরা দুপুরে খাবে। বিকেলে বটতলায় মিটিং। আজ স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা ওড়ানো হবে।

তোদের মাথা খারাপ হয়ে গেছে, চিৎকার করতে গিয়ে গলাটা হঠাৎ ভেঙে যায় খবিরউদ্দিনের। কিসের স্বাধীনতার পতাকা!

স্বাধীনতার পতাকা মানে স্বাধীনতার পতাকা – হাসতে হাসতে জবাব দেয় বাহার। কথার মাঝখানে ঢোকে লায়লা।

জানো বাবা, আজকে আমরা ট্রেনিং নেব।

কিসের ট্রেনিং?

রাইফেল চালানোর।

কোথায় পাবি রাইফেল?

বাবা, তুমি চিমত্মা করো না। বাহার চায়ে চুমুক দেয়, আজ পল্টন ময়দানে আমাদের মেয়েরা কাঠের ডামি রাইফেল দিয়ে প্রশিক্ষণ নেবে।

মা যাই! লায়লা চোখে-মুখে প্রচ- উচ্ছ্বাস নিয়ে চলে যায়। খবিরউদ্দিনের সামনে ধূমায়িত চা। আনোয়ারা ঢোকেন রান্নাঘরে, রান্নার আয়োজনে। ছেলের মিছিলের বন্ধুরা আসবে। যা পরিশ্রম করে ওরা, ভালো খাবারের আয়োজন করা দরকার। চা ঠান্ডা হয়ে গেছে। রম্নমে একা খবিরউদ্দিন। তিনি কোনো হিসাব মেলাতে পারেন না। দেখতে পাচ্ছেন, আকাশ বাতাস মাঠ ঘাট পথ প্রামত্মর পার হয়ে আসছে আগুন, আগুনের তীব্র দাহ। তিনি পুড়েযাচ্ছেন। চিৎকার করে আগুন বন্ধ করতে বলছেন, কিন্তু কেউ শুনছে না। বরং আরও উৎসাহের সঙ্গে আগুনের লেলিহান শিখা তাকে গ্রাস করছে। তিনি টেবিলে রাখা জগ থেকে পরপর দু-গস্নাস পানি পান করলেন। কিন্তু পানি তাকে আগুনের অাঁচ থেকে রক্ষা করতে পারল না, ঘরের ভেতরে পাকিসত্মানি সৈন্য। যে-পাকিসত্মানের জন্য তিনি মিছিল করেছিলেন ত্রিশ বছর আগে কলকাতার রাসত্মায়, সেই পাকিসত্মানের সৈন্য তাকে থাপ্পড় মারছে; তারই ঘরের ড্রয়িংরম্নমে। তিনি কিছু করতে পারছেন না। দাঁতে দাঁত চেপে সহ্য করছেন নগ্ন অপমান।

বাসায় বাহার মাত্র কয়েক ঘণ্টা ছিল। সবাই ওকে জড়িয়ে ধরেছে; কেঁদেছে। বাহার হাসতে হাসতে ফিসফিসিয়ে বলেছে, বাবা আমি বলেছিলাম না, স্বাধীনতা রক্ত চায়। এবার আমাদের রক্ত দেওয়ার পালা। কেবল কি রক্ত? অনেক অপমান, অনেক যন্ত্রণা আমাদের সহ্য করতে হবে, তোমরা সাবধানে থেকো। আর একটা কথা, কাউকে বিশ্বাস করবে না এখন। সব জায়গায় ওদের এজেন্ট আছে –

দ্রম্নত কিছু খাবার দেয় আনোয়ারা বেগম, খেয়ে মা এবং বাবার পায়ে চুমু খেয়ে বোনদুটি আর ভাইকে আদর করে চলে যায়। খবর পেয়ে বাসায় চলে আসে জলস্নাদ। জলস্নাদের হাতে মার খেয়েও মনে মনে খুশি খবিরউদ্দিন, বাহারকে পায়নি ওরা।

শোনো, মেজর  দিদারের গলা – আমি ইচ্ছে করলে এখনই তোমাদের মেরে ফেলতে পারি। কিন্তু মেরে ফেললে আমার আর পাকিসত্মানি বাহিনীর লড়াই কে দেখবে? তাই তোমাদের বাঁচিয়ে রাখব। আমরা পশ্চিম পাকিসত্মান থেকে এখানে এসেছি, আমাদের বিবি রয়ে গেছে দেশে। কওমের মানুষ হিসেবে আমাদের চাহিদা পূরণ করা তোমাদের দায়িত্ব, শুধু দায়িত্ব নয়, ফরজ। এখন বলো, কোন কন্যা যাবে আমার সঙ্গে? যেন রসালো কোনো কথা বলছে মেজর, মুখে মৃদু হাসি ধরে রেখে দিদার তাকায় খবিরউদ্দিনের দিকে, তুমি পিতা। জন্ম দিয়েছ, পালন করছ, তোমার কাছ থেকে মিনিমাম একটা অনুমতি তো নিতেই হয়। কী বলো তোমরা?

মেজর তাকায় ওর সঙ্গের সৈন্যদের দিকে। প্রত্যেকের চৌকো-মুখে খাদকের হাসি বিসত্মার করে।

দেখো আমরা কত ভদ্র, তোমার মেয়েকে নিয়ে যাচ্ছি তোমার অনুমতি নিয়ে। অথচ ভারতসহ তামাম দুনিয়ার সংবাদপত্র রেডিও আমাদের বদনাম করছে, আমরা নাকি ধর্ষণ করছি! ছি! তাকায় কোনায় দাঁড়ানো সৈন্যের দিকে – আমি ঠিক বলেছি?

আলবত স্যার – পাথরমুখো জবাব দেয় চটপট।

রাইট, তাকায় খবিরউদ্দিনের দিকে, কী হলো অধ্যাপক, তুমিই সিদ্ধামত্ম দাও। কাকে নেব?

জিহবা দিয়ে একটা কুৎসিৎ শব্দ করে দিদার। তাকায় লায়লা আর নায়লার দিকে কদাকার কামনার কুতকুতে চোখে। মনে হচ্ছে চোখ নয়, লাভার কু-লী।

লায়লা বুঝে ফেলে, কী ঘটনা ঘটতে যাচ্ছে। শরীর হিম হয়ে আসে। ডান হাতে খামছে ধরে নায়লার হাত। খবিরউদ্দিন বোবা চোখে তাকিয়ে আছেন। সেই দৃষ্টিতে প্রিয় পাকিসত্মানের জন্য হাজার হাজার মানুষের মধ্যে নিজেকে দেখতে পাচ্ছেন, আকাশের দিকে মুষ্টিবদ্ধ হাত তুলে বলছেন, লড়কে লেঙ্গে পাকিসত্মান…। সেই পাকিসত্মানের সৈন্য তার ঘরে, তার মুষ্টিবদ্ধ হাত নামিয়ে আনছে।

হাতে সময় নেই, হুঙ্কার দেয় দিদার। কাকে নেব? শোনো অধ্যাপক, পাকিসত্মানের সৈন্যরা কোনো বেইনসাফি কাজ করে না। তোমার কন্যাকে নিয়ে শাদি করব। শাদি করার পর… চিমত্মার কিছু নেই, আমাদের ক্যাম্পে নতুন শাড়ি চুড়ি গহনা সব আছে। আমাদের মাওলানা আছে – সে-ই শাদি পড়াবে, বলো, কাকে নেব?

খবিরউদ্দিনের ড্রয়িংরম্নমে অনেক মানুষ কিন্তু নেমে এসেছে পাথরের নীরবতা। মনে হচ্ছে, কেউ মানুষ নয়, পাথর। কারো কোনো মানুষের অভিব্যক্তি নেই। শ্বাস-প্রশ্বাসের শব্দ নেই। দূরে ঠা-ঠা-ঠা… রাইফেলের শব্দ ভেসে আসে। সঙ্গে সঙ্গে মেজর দিদারের মধ্যে এক ধরনের চাঞ্চল্য আসে। তাকায় নিজের সৈন্যদের দিকে – মুহূর্ত মাত্র দাঁড়ায়, নবম শ্রেণি পড়ুয়া নায়লার সামনে, এক ঝটকায় হাত ধরে টেনে তোলে, এই লাড়কি, তুমি চলো আমার সাথ।

কী যে হয় লায়লার, নিমিষে দাঁড়ায় দিদারের সামনে, ওকে নয়। আমাকে নিন। ও ছোট। সহ্য করতে পারবে না।

গোঁফের নিচে চকচকে ধারালো দাঁত বের হয় দিদারের, মনে হয় এরকম এক নাটকীয় মুহূর্তের জন্য অপেক্ষা করছিল সে। নায়লার হাত ছেড়ে ধরে লায়লার হাত, বহুত খুব। চলো…।

লায়লাকে এক প্রকার উড়িয়ে নিয়ে রম্নম থেকে বের হয়ে যায় পাকিসত্মানি মেজর দিদার। পেছনে পেছনে যায় রম্নমের অন্য সৈন্যরা উদ্যত সঙ্গিন হাতে। সিঁড়িতে শোনা যায় ভারী বুটের কর্কশ শব্দ। খবিরউদ্দিন, আনোয়ারা বেগম, কায়েস, নায়লাদের মনে হয়, এতক্ষণ একটা নাটকের মহড়া দেখেছে। মহড়ার অংশ হিসেবে লায়লা ক ক্ষের বাইরে গেছে। এখনই ফিরে আসবে হাসতে হাসতে…। বলবে, নাটকে যা ঝক্কি…। কিন্তু কিছুক্ষণ পরে সবাই শুনল নিচে একটা গাড়ির স্টার্টের শব্দ। জলপাই রং গাড়িটি সন্ধ্যার কিছু পরে খবিরউদ্দিনের বাড়ির সামনে এসে দাঁড়িয়েছিল। দূরে গাড়ির শব্দ মিলিয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে একে অপরকে জড়িয়ে ধরে বুভুক্ষু কান্নায় ভেঙে পড়ে ত্রিশ বছর আগে কলকাতার রাসত্মায় মিছিলের মানুষ খবিরউদ্দিন, আনোয়ারা বেগম, নায়লা আর কায়েস।

সেই কান্নার হাহাকার এখনো ছড়িয়ে আছে গোটা বাংলায়, সাড়ে ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইলের অসিত্মত্বে।

শেয়ার করুন

Leave a Reply