আড়াল

লেখক:

কাজী রাফি
কুকুরের একটানা অদ্ভুত ডাকে অনেক ভোরে ঘুম ভাঙল দীপ্তির। মাইকে ভিন্ন ভিন্ন মসজিদ থেকে একের পর এক আজানের শ্রুতিমধুর স্বর ভেসে আসছিল। ঢাকা শহরের বৈশাখি বাতাসে কোনো ঘ্রাণ না থাকলেও ঝিরঝির পাতলা বাতাস বারান্দায় দাঁড়ানো দীপ্তিকে অদ্ভুতভাবে ছোট্টবেলায় নিয়ে গেল। এমনি ফাল্গুন মাসে গ্রামের পথঘাট আর প্রান্তর ভরে থাকত আম-মুকুলের গন্ধে। দীপ্তির ফ্ল্যাটের সামনে গুলশান লেক। আকাশে দু-একটি মিটিমিটি তারা তখনো জ্বলছিল জ্বলজ্বল। লেকের কটু গন্ধ ভোরের উঠে আসা আলো আর রাতের মিলিয়ে যাওয়া অাঁধারের ভেতরে যেন চুপটি করে ঝিম মেরে আছে। দীপ্তি ভাবল জোরে বাতাস বইলে অথবা বৃষ্টি হলে এই কটু গন্ধ, খুঁজে বেড়াবে গিজগিজ করে বসবাসরত ঢাকার মানব নাসারন্ধ্র। কিন্তু আজ সবকিছুই ভিন্ন। নির্মল ভোর দীপ্তিকে
নিয়ে গেছে গ্রামে কাটানো শৈশব-কৈশোরের আম-মুকুলের গন্ধে মাতানো দিনগুলোতে। মসজিদে-মসজিদে আজান শেষ হয়। কী এক আবেশি ঘোর প্রায় বেনামাজি দীপ্তিকে অনুপ্রেরণায় ধুয়ে দেয়। ব্রাশ করে ওজু করে দীপ্তি নামাজের জন্য জায়নামাজে দাঁড়িয়ে পড়ে। শেষ রাকাতের ছালাম ফেরানোর পর অদ্ভুত এক গন্ধ এসে দীপ্তির নাসারন্ধ্রকে আপ্লুত করল। দীপ্তি যেন ওর চারপাশে বেলি ফুলের গন্ধ পেল। শীতের মধ্যে দীর্ঘদিন দীপ্তির সর্দি ছিল। সে ধরেই নিল আজ সেই সর্দি পরিপূর্ণভাবে চলে গেছে। দীপ্তি অবাক হয়ে ভাবল; বয়স প্রায় পঞ্চাশের কাছাকাছি এসে কেন তার নাসারন্ধ্রের এই উন্মীলন! নাকি এটা ধর্ম-কর্মের প্রতি নতুন করে অনুরাগ? ঘটনা যাই হোক, দীপ্তি মনে মনে পণ করল এখন থেকে সে ভোরে উঠবে এবং নামাজ পড়বে। মনে মনে পণ শেষ করামাত্র দীপ্তির রাতে দেখা স্বপ্নের কথা মনে পড়ল। একটা বেলিফুলের গাছ। কিন্তু বেলি ফুলগাছ তো এত বিশালাকৃতির নয়। কাঞ্চন গাছের মতো বিস্তৃত গাছটা সাদা ফুলে ভর্তি। সেই সাদা-সাদা ফুলভর্তি গাছে পাতা নেই বললেই চলে। তারই একটা মোটা ডালে একটা নিকষ কালো ঘোড়া। যেন আকাশ থেকে লাফিয়ে পড়ে মারা গেছে। মৃত অবস্থায় ঘোড়াটির দুই পা এমন অবস্থানে ঝুলানো যে, দীপ্তির মনে হচ্ছিল ঘোড়াটি এখনই বেগবান দৌড়ে মুখরিত করে তুলবে চারপাশ।
স্বপ্নটার কথা মনে পড়ামাত্র দীপ্তির গা ছমছম করে উঠল। আর সঙ্গে সঙ্গে তীব্র হয়ে উঠল নাকে জেগে-ওঠা বেলিফুলের গন্ধ। দীপ্তি প্রায় পঞ্চাশ বছর জীবনে এমন বিমূর্ত অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হয়নি। প্রাণভরে সে খোদার কাছে তার নিরাপত্তার জন্য দোয়া চাইল। জায়নামাজটা গুটিয়ে নেওয়ার সময় বাইরে কাকের ডাকগুলোর ভেতরে যখন একটা অন্য পাখির চিকন গলা শুনতে পেল সেটাও দীপ্তির কাছে রহস্যময় শুনাল। ঢাকায় চিকন গলার পাখি?! নিজের এমন প্রশ্নের উত্তর নিজের ভেতর খুঁজে পেল না দীপ্তি। আর মোনাজাতের সময় সবকিছু ছাপিয়ে কেন শুধু তার মুখ থেকে বের হলো এমন অদ্ভুত মোনাজাত –
‘খোদা সকল বিপদ থেকে তুমি আমাদের নিরাপদ রেখো। চোর-ডাকাত-মলম পার্টি এবং চাঁদাবাজদের খপ্পর থেকে নিরাপদে রেখো। মামলা-মোকাদ্দমার ত্রিসীমানা থেকে নিরাপদ দূরত্বে রেখো। ভূমিকম্প হলেও – বলেই থেমে গেল সে। এরপর ঠিক কী বলা উচিত – প্রার্থনায় অনভ্যস্ত দীপ্তি ভেবে পেল না। শুধু একটু থেমে সে তার বাক্যটুকু শেষ করল – ঢাকা শহরকে তুমি ভূমিকম্প থেকে রক্ষা করো।
কুকুরের ঘেউ-ঘেউ শব্দে ঘুম থেকে জেগে ওঠা এবং তারপর প্রার্থনায় পুলিশ, চোর-ডাকাত এবং আদালতের সঙ্গে ভূমিকম্প শব্দটার ঠিক মিল খুঁজে পেল না দীপ্তি। ঠিক তেমনি স্বপ্নে দেখা একটা মৃত ঘোড়ার সঙ্গে বেলিফুলের তীব্র গন্ধের অনুভব – কিছুই যখন দীপ্তির সাদামাটা জীবনের সমীকরণে মিলছিল না, তখন ভোরের আলো প্রায় ফুটছে। এরই মধ্যে লেকের সেতুর ওপর দিয়ে একটা সিএনজি ঢাকার নীরবতা ভাঙছে। নীরবতা-ভাঙা শুরু হওয়া মাত্র দীপ্তির মনে হলো সবকিছু এলোমেলো হয়ে গেল। কী একটা প্রশ্ন মনের কোণে উঁকি দিয়েও যেন ঠিক স্পষ্ট হচ্ছে না। সে একটু ভয় পেয়েই তার ঘুমন্ত স্বামীকে ডাকল – সাকেব, ওঠো। বয়স তো কম হলো না, জীবনে সকাল দেখলে না; নামাজও পড়লে না। ওঠো, নামাজ পড়ো। ভোঁস-ভোঁস করে আর কত ঘুমাবে?
‘নামাজ দীপ্তির জীবনে প্রায় অচর্চিত। তাই এ-শব্দটা শুনে সাকেবের ঘুমের আবেশ কেটে গেল। প্রায় সারারাত এপাশ-ওপাশ করে রাত ৩টার পর সাকেবের ঘুম এসেছিল। সেই গভীর ঘুম ভাঙার বিরক্তি আর দ্বিধা নিয়ে হুতোম পেঁচার মতো পিটপিট করে সে দীপ্তির অবয়বের দিকে তাকিয়ে সন্দেহের কণ্ঠে বলল, নামাজ! তুমি আজ নামাজ পড়েছ নাকি?
হ্যাঁ পড়েছি। বলে দীপ্তি রাতের স্বপ্ন আর সকাল থেকে নাসারন্ধ্রে জেগে-থাকা বেলিফুলের গন্ধসহ তার অদ্ভুত সব অনুভূতির কথা বর্ণনা করল। দীপ্তির স্বরে এক ধরনের শান্ততা ছিল। সেজন্যই হয়তো সাকেবের ভেতরটা ছমছম করে উঠল। কণ্ঠনালী দ্রুত শুকিয়ে এলো এবং সারাজীবন ধরে যে-নারীকে সে আদর-ভালোবাসায় সিক্ত করে এসেছে, তাকে ভয় পেতে শুরু করল। ঢাকা শহরের পথঘাটে এবং পার্টিতে আড্ডায় সাকেব অফুরান প্রাণ-অনুপ্রেরণায় ভেসে যেত। খাঁচাসম সেই ঢাকার জন্য কোনো জড়ত্বধরা প্রাণ নিজ সত্তার ওপর ‘ভর করেছে এমন অবশ অনুভূতি সাকেবের কণ্ঠনালী থেকে একটাও শব্দ বের হতে দিলো না। আপ্রাণ চেষ্টায় সে ধড়মড় উঠে খাটের একপাশে কাঁথা-মুড়ি জড়িয়ে দীপ্তির মুখের দিকে তাকিয়ে থাকল।
দিনের আলো ফুটলে সকালের কথা মনে পড়ে সাকেবের হাসিই পেল। নাস্তা শেষে লেকপাশের বরান্দায় বসে চা খেতে খেতে সে দীপ্তিকে বলল,
আজ হঠাৎ তোমার সকালে ওঠার ইচ্ছা হলো কেন?
ইচ্ছে করে উঠিনি। তোমাকে তো বললাম! অনেকগুলো কুকুরের একটানা ঘেউ-ঘেউ শব্দে ঘুম ভেঙে গেল। মনে হচ্ছিল কোথাও কোনো খুন, চুরি-ডাকাতি অথবা দুর্ঘটনা ঘটছে।
দীপ্তির এ-কথায় সাকেবের সকালের সেই গা-ছমছম ভাবটা ফিরে এলো। ‘এটা নির্জন কোনো গ্রামের নির্জন কোনো জঙ্গলের নিরিবিলি কোনো বাড়ি নয়, এটা ঢাকা শহর; কিন্তু সাকেবের নিজকে বলা নিজের কথাটুকুই নিজের সঙ্গে ব্যঙ্গ করল। তারপর ফাল্গুনের আরো কয়েকটা দিন অতিবাহিত হলো।
এরই মাঝে দীপ্তি একদিন এক জ্যোতিষীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে বিষণ্ণমনে বাসায় ফিরল। পরপর দুদিন দীপ্তি প্রায় কোনো কথাই বলল না। তৃতীয় দিন বিকেলে চা খেতে বসে আনমনা হয়ে সাকেবকে বলল –
জানো? জ্যোতিষী সব শুনে অদ্ভুত এক কথা বলল।
কী?
সারাক্ষণ নাকে সুঘ্রাণ-লাগা ভয়াবহ খারাপ লক্ষণ।
তুমি কি গন্ধটা এখনো পাও?
হুম; সারাক্ষণ! মাঝে মাঝে গন্ধটা বেশি স্পষ্ট হয়।
তা তোমার জ্যোতিষী কী বলল? সারাক্ষণ সুঘ্রাণ লাগা কিসের ভয়াবহ লক্ষণ?
স্পষ্ট করে বলেনি; বলা নাকি নিষেধ। তবে এর প্রতিকার হিসেবে পোখরাজ এবং মুক্তার আংটি ডান হাতের দুই অনামিকায় পরতে বলল।
হো-হো করে হাসল সাকেব। জ্যোতিষীর ভন্ডামি ধরা পড়ায় যেন দীপ্তিকে নিয়ে কয়েকদিন তৈরি হওয়া সাকেবের মনের অযথা ভীতি কেটে গেল। সাকেবের হাসিকে মোটেও পাত্তা না দিয়ে কণ্ঠস্বরে ভয় জড়িয়ে দীপ্তি বলল –
জ্যোতিষী আমার বাসার ঠিকানা দেখে জিজ্ঞাসা করল – আমাদের বাসার বাউন্ডারি ওয়ালের গ্রিলে, খাল থেকে রাতের অাঁধারে কাঁকড়া ওঠে কি-না?
খুব অদ্ভুত প্রশ্ন। তারপর?
আমি মধ্যরাতে পরপর দুরাত এ-বারান্দায় এসে বসে দেখার চেষ্টা করেছি, লেক থেকে সত্যিই কোনো কাঁকড়া উঠে আসে কি-না!
হঠাৎই সাকেবের মুখ থেকে হাসি উধাও হয়ে গেল। তারপরের বাক্যটুকু সাকেবের কণ্ঠে খসখসে শুকনা শুনাল।
কাঁকড়া ওঠে কি-না তা দেখার জন্য তুমি রাতে একা একা এই বারান্দায় বসে থাকলে? তোমার ভয় লাগল না?
অদ্ভুত ব্যাপার কী জানো? লেকের পাশে আমাদের যে-ছোট্টবাগান, তার চারপাশঘেরা দেওয়া গ্রিলগুলো ধরে কাঁকড়াগুলো সত্যি সত্যিই রাতে উঠে আসে।
সাকেবের ইচ্ছা হলো একলাফে সে চেয়ার ছেড়ে দীপ্তির কোলের মধ্যে গিয়ে লুকায়; কিন্তু যার কাছে সে আশ্রয় খুঁজবে সে-ই এখন এক মূর্তিমান আতঙ্ক। এই দীপ্তিকে তার হঠাৎই অচেনা লাগছে। সাকেবকে নিশ্চুপ এবং হা হয়ে বসে থাকতে দেখে দীপ্তি বলল।
বিশ্বাস না হলে আজ রাতে আমার সঙ্গে তুমিও বারান্দায় বসে কাঁকড়াগুলোর উঠে আসা দেখতে পারো। কী অদ্ভুত জ্যোতিষী!
দীপ্তির প্রস্তাবে সাকেবের শরীরের ভেতরের সব শিরা-উপশিরা একসঙ্গে বিদ্রোহ করে উঠল।
কী সব আবোল-তাবোল বকছ!
আরে আবোল-তাবোল নয়, ছোট্টবেলায় বাবা বলতেন, সাগরে ভূমিকম্পের প্রধান লক্ষণ হলো ঝাঁক-ঝাঁক কাঁকড়ার তীরে এসে …
সাকেব দীপ্তির কথা শেষ হতে দিলো না। তাচ্ছিল্যের স্বরে বলল –
ওই ব্যাটা জ্যোতিষী একটা বাজে লোক। তোমার স্বপ্নে দেখা মরা ঘোড়া, নাকে সারাক্ষণ লেগে থাকা বেলিফুলের গন্ধ, এসবের সঙ্গে আরো একটা ফালতু বিষয় ছাগলটা যোগ করে দিয়েছে। কাঁকড়া! হাউ ফানি!
এই যে এখন থেকে বাঁ-বাহুতে এ-তাবিজটা পরবে আর তাড়াতাড়ি আমার জন্য পঁয়ষট্টি হাজার টাকা জোগাড় করবে।
বলেই দীপ্তি তাবিজটা সাকেবের চোখের সামনে ধরল। নিজের বাঁ-বাহুতে পরা তাবিজটাও দেখাল।
টাকা কি গাছের পাতা? মাত্র কয়েকদিন হলো তোমাকে দামি একটা গলার হার উপহার দিলাম।
সত্যিই ব্যাপারটা আমার জন্য বিরাট বিস্ময়! তুমি আমাকে হীরার হার গিফট করবে – তাও এ-বয়সে; ভাবতেও পারিনি।
আবেগাপ্লুত হয়ে গলার চেইন ধরে হারটা ওপরে তুলে পরম তৃপ্তিতে দীপ্তি সেটার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকল। আগ্রহভরে হারটার দিকে সাকেবও তাকিয়ে থাকল। হৃদয়-অঙ্কিত একটা ছোট্ট ফাঁপাকৃতির হার। দীপ্তি গলার যথাস্থানে যত্ন করে হারটা রেখে দিলো এবং পুনরায় তাবিজটা কোল থেকে তুলে নিয়ে সাকেবের বাঁ-বাহুতে পরিয়ে দিতে দিতে বলল –
তুমি কিন্তু হারটা কেনার ক্যাশমেমো এখনো আনলে না। এত দামি জিনিস কিনে কেউ কি ক্যাশমেমো ভুলে ফেলে আসতে পারে? তুমি যে কি!
তাবিজ বাঁ-বাহুতে পরিয়ে দেওয়া শেষ হতেই দীপ্তি বিরক্তি সহকারে ভৎর্সনা চালিয়ে গেল।
না হলে কোন দোকান থেকে হারটা কিনেছ তার নাম বলো, আমিই গিয়ে ক্যাশমেমো নিয়ে আসছি –
সাকেব পড়ল বিরাট ফাঁপড়ে। হার কেনা নিয়ে ইনিয়ে-বিনিয়ে অনেক গল্পই সে শুনিয়েছে দীপ্তিকে আর সাকেবের সেসব বানানো গল্পে বারবার দীপ্তি নতুন করে প্রেমে পড়েছে সাকেবের। আজো সাকেব মিনতিভরা গলায় আদর এনে বলল –
তোমার এসব ঝামেলায় জড়ানোর কী প্রয়োজন? এটাও তোমার জন্য একটা সারপ্রাইজ হয়ে থাক না। সত্যি কথা বলতে কী, আমি চাই না হারটা কত টাকায় কেনা সেটা তুমি এত তাড়াতাড়ি জানো।
জানলে কী হবে?
তোমার চোখ কপালে উঠবে এবং হঠাৎ এত টাকা খরচ করার জন্য আমাকে হয়তো বকাবকি করবে। ক্যাশমেমোর ব্যাপারটা থাক না দীপ্তি!
এটুকু বলেই সাকেবের মনে হলো, সে একের পর একটা ভুল করে চলছে। মিথ্যা কথাগুলো তার পাপের সঙ্গে যোগ হয়ে পাপটাই আসলে বিস্তৃত হয়ে যাচ্ছে। তখনই তার নিজেকে বোকা মনে হলো। কয়েকদিন আগে বিদেশ থেকে সে ঘুরে এসেছে। দীপ্তিকে হারটা বিদেশ থেকে আনার কথা বললেই ল্যাঠা চুকে যেত। এসব ভাবনার মাঝেই সিন্থিয়া নামের মেয়েটির মুখ সাকেবের চোখের সামনে ভেসে উঠল। অত দামি হারটা কৌশলে নিয়ে নেওয়ার পর সিন্থিয়ার সঙ্গে দেখা হলে সে নিশ্চয়ই তাকে ফাঁসিয়ে দেবে। এতদিনে নিশ্চয়ই সে হন্যে হয়ে হীরার হারটা খুঁজছে। মধ্যপ্রাচ্যের এক শেখ খুশি হয়ে সিন্থিয়াকে হারটা নাকি উপহার দিয়েছিল। সাকেব সিন্থিয়ার মুখ থেকেই গল্পটি শুনেছিল।
‘নাহ্। সাকেব নিজকেই নিজে বলল – সিন্থিয়ার হারটা হস্তগত করা তার জীবনের ভীষণ বাজে কাজগুলির একটি। এটি নিয়ে সে বরং ব্যক্তিগতভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সিন্থিয়ার সান্নিধ্য পাওয়া জীবনে আর সম্ভব নয়। ভাগ্যিস সিন্থিয়া তার সত্যিকার ঠিকানা অথবা মোবাইল নম্বর জানে না। আহ্! বেচারি; ভুল ঠিকানা এবং ফোন নম্বরে কতবার যে তাকে খুঁজছে! সাকেব জানে সিন্থিয়া তার টিকিটির খোঁজ পেলে সাকেব নামের এক মানুষকে আস্ত গায়েব করার ক্ষমতা রাখে। আদুরে, পোষা বেড়ালের মতো আচরণ করলেও যে-কোনো সিংহ-পুরুষের চেয়েও ভয়ংকর হতে পারে সিন্থিয়া। তার একটা ফোন প্রশাসনের প্রভাবশালী যে-কোনো কারো চেয়ে যে-কোনো গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির কাছে কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। বউকে খুশি করার জন্যও ওরকম একজন মানবীর হীরার হার চুরি করেনি সে শুধু মনের জেদ অথবা ক্ষোভের কারণেই; হারটা নিয়ে এসে সে বরং জীবনে উদ্বেগ আর উৎকণ্ঠা টেনে এসেছে। সাকেব চায়নি সিন্থিয়া অন্য কারো সঙ্গে -। সুতরাং সিন্থিয়া তার ডিমান্ড বাড়িয়ে দিয়েছিল। প্রতি মাসে সিন্থিয়ার জন্য কাঁড়ি-কাঁড়ি টাকা খরচ করেও তাকে বশে আনতে পারেনি সাকেব। সাকেবের মনে পড়ল, সিন্থিয়া ওকে একদিন বলেছিল –
তুমি যে কয় পয়সা আমার জন্য খরচ করো, তা দিয়ে আমার কয়েকদিনের হাতখরচও হয় না! দয়া করে পানসে ভালোবাসা দেখিয়ে মূল্য পরিশোধ করছ… এমন ভাব দেখিও না।
সিন্থিয়ার মন্তব্য সে-রাতে সাকেবের শরীরে যেন জ্বালা ধরাল। তারপর এক দুর্বল মুহূর্তে সাকেব সন্তর্পণে খুলে নিয়েছিল হারটা এবং বিছানার চাদরের একপ্রান্ত তুলে তার নিচে লুকিয়ে রেখেছিল সেটা। সিন্থিয়া বাথরুমে ঢোকার মুহূর্তে নিচ থেকে ফল কিনে আনার কথা বলে সাকেব সেদিন কাপুরুষের মতো পালিয়ে এসেছিল।

কী ভাবছ? বুঝতে পেরেছি, পঁয়ষট্টি হাজার টাকা দেবে না এইতো? তোমার মতো হারকিপ্টের কাছ থেকে এ-হারটা যে কীভাবে আমার গলায় জুটল! মাসে বাসাভাড়া পাও দুলাখ টাকা; কী করো এত টাকা দিয়ে?
দীপ্তির কথায় যতক্ষণে সাকেবের সম্বিৎ ফিরল, ততক্ষণ দীপ্তি উঠে চলে গেছে এবং আশ্চর্যজনকভাবে, ঠিক তখন সাকেব তার চারপাশে বেলিফুলের গন্ধ পেল। চোখ বন্ধ করে দীর্ঘশ্বাস নিল সাকেব। নাসারন্ধ্র হয়ে সুতীক্ষ্ণ সে-ঘ্রাণ সাকেবের ফুসফুসকে বেলিফুলের সুবাসে ভরে তুলল। সিন্থিয়ার ত্বক, চুল এবং রোমকূপের রন্ধ্রে-রন্ধ্রে লুকানো সে-ঘ্রাণ! সিন্থিয়ার সংস্পর্শে যে-ঘ্রাণ পাগল করে তুলত সাকেবকে। হারিয়ে ফেলা মূল্যবান সম্পদের মতো সেই নারীর জন্য হৃদয় ব্যথিত হয়ে উঠলেও আবার গা-ছমছম অনুভূতি পেয়ে বসল সাকেবকে। সিন্থিয়া ভীতির চেয়েও দীপ্তিভীতি এ-মুহূর্তে অস্থির করে তুলল তাকে। মনের ভুল ভেবে সে আবার লম্বা করে শ্বাস নিল – নাহ্, গন্ধটা আগের মতো স্পষ্ট নয়। তার মানে গন্ধটা বাস্তব। কিন্তু রহস্যটা কী? ভেবে পেল না সাকেব। বারান্দা থেকে উঠে সে দীপ্তির কাছে গেল। পেছনে থেকে দীপ্তিকে জড়িয়ে ধরে আদুরে ভঙ্গিতে বলল –
আমি টাকাটা অবশ্যই তোমাকে দেব। তবে কয়েকটা দিন সময় দিতে হবে।
কথা বলতে বলতেই সাকেব দীপ্তির চুলে-গলায় গন্ধটা খুঁজল এবং সে অবাক হয়ে লক্ষ করল চুলের ভেতরের চেয়েও দীপ্তির গলার কাছে গন্ধটা প্রবল। দীপ্তি বিরক্তি সহকারে সাকেবের প্রস্তাব প্রত্যাখান করল।
তোমার টাকার আশায় বসে থাকতে থাকতে আমার কোনো দুর্ঘটনা হোক আমি চাই না। তোমার কী ধারণা? মাত্র পঁয়ষট্টি হাজার টাকা জোগাড় করার সামর্থ্য আমার নেই?
বিয়ের সময় সাকেবের দেওয়া কয়েক ভরি ওজনের সোনার প্রিয় হারটা বিক্রির সিদ্ধান্ত নিল দীপ্তি। এ-বয়সে মোটা সোনার সেকেলে হারটা পরে কোথাও যাওয়া বেমানান দেখায়। দীপ্তির কোনো মেয়েও নেই। একমাত্র সন্তান অস্ট্রেলিয়ার নাগরিকত্ব পেয়ে অস্ট্রেলিয়ান নারীকে বিয়ে করেছে। তাছাড়া সাকেবের দেওয়া হীরার হারটা পাওয়ার পর থেকে বিয়ের সময় উপহার পাওয়া সোনার হারকে দীপ্তির আর পরম সম্পদ বলে মনেও হয় না।
বেশ তো, তোমার থেকে আপাতত খরচ করো। আগামী মাসেই আমি তোমাকে টাকাটা দিয়ে দেব। আর বিপদ বা দুর্ঘটনা শুধু তোমার কেন একা হবে? জ্যোতিষী কি তাই বলেছে?
বিপদটা আমার একা হলে তো তুমি বেঁচে যাও তাই না? আমি মরে গেলে আরো ভালো হয় -। কিন্তু তোমাকে বলে রাখি – গন্ধটা তুমি না পেলেও; ভূমিকম্পে ভেঙে পড়া দালান শুধু আমার গায়ে একা পড়বে না; বুঝেছ?
দীপ্তি… ; জানো, আজকাল আমিও গন্ধটা পাচ্ছি?
বেলিফুলের গন্ধ?
বেলিফুল কি না জানি না – তবে গন্ধটার সঙ্গে আমার পরিচয় তোমার চেয়ে আরো আগে।
কবে? কোথায়? দীপ্তি প্রায় ফিসফিস করে প্রশ্নটা করল। দীপ্তির প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে আমতা আমতা করল সাকেব।
নাহ্ – ঠিক মনে পড়ছে না – কবে এবং কোথায়? তবে…
দীপ্তি নিজের চোখের দৃষ্টিকে আরো তীক্ষ্ণ করল এবং সাকেবের একেবারে কানের কাছে প্রায় চুপিচুপি স্বরে বলল –
আমি শুধু একা নই দেখেছ! গন্ধটা এখন তুমিও পাচ্ছ এবং রাতে নিশ্চয়ই স্বপ্নও দেখছ?
হ্যাঁ দেখছি।
কী স্বপ্ন দেখেছ বলো? প্রশ্নটা করেই দীপ্তির মনে হলো সাকেবও হয়তো একই স্বপ্ন দেখছে। সে বলল –
একটা বিশাল বেলিফুলের গাছ, সেই গাছটাতে –
সাকেব দীপ্তির বাকি কথাগুলো শুনতে চাইল না। দীপ্তির স্বপ্নে দেখা মরা ঘোড়াটা যেন সে নিজেই! তাড়া খেয়ে আকাশ থেকে লাফিয়ে পড়েছিল ভুল জায়গায়। দীপ্তিকে থামিয়ে দিয়ে আনমনা স্বরে সাকেব বলল –
না। আমার স্বপ্নগুলো ঠিক তোমার স্বপ্নের মতো নয়। ওগুলো একটু ভিন্নরকম।
কী রকম?
মাঝে মাঝে স্বপ্নে দেখি, একটা লিফটে আমি আটকা পড়েছি। কিন্তু লিফটটা কোনো দালানের নয়। একেবারে শূন্যে স্থাপিত। আকাশের নিচে কোনো ভিত্তি অথবা খুঁটির সমর্থন ছাড়াই লিফটটা ঝুলে আছে শূন্যে। নিচ থেকে হাজার হাজার মানুষ আমার শূন্যে স্থির লিফটটার দিকে তাকিয়ে আছে। নখ উঁচিয়ে আমাকে নির্দেশ করছে একটা মেয়ে। মেয়েটার পাশে একদল পুলিশ সদস্য। মেয়েটার মেরুণ রঙের নেইলপলিশ-করা সুন্দর নখটা একদম মাটি থেকে আমার লিফটটা পর্যন্ত লম্বা। পানিতে নখ রাখলে নখের মাথাটা যেমন মোটা দেখা যায়, মেয়েটার নেইলপলিশ-করা সুন্দর নখটি ঠিক তেমনি… দীপ্তি প্রশ্নবোধক চোখে সাকেবের দিকে তাকাল এবং সাকেবকে পা থেকে মাথা পর্যন্ত ভালোভাবে দেখে নিল।
তুমি কি নারী সংক্রান্ত কোনো ঝামেলায় জড়িয়েছ! সাকেব -?
কী যে বলো না! তুমি কি তাহলে ঘোড়া সংক্রান্ত -? শুধু কি তাই? আমি স্বপ্নে আরো দেখি, যানজটে আটকে আছি ঘণ্টার পর ঘণ্টা। আমার একজনের সঙ্গে দেখা করার কথা, কিন্তু…
এটুকু বলেই থামল সাকেব। স্বপ্নে দেখা বাকি অংশটুকু ওর মনে অস্থিরতা তৈরি করল। কোনো এক স্টার হোটেলে সিন্থিয়াকে নিয়ে ওঠার কথা। সিন্থিয়ার আসার কথা বিকেল ৫টায়। বিকেল ৫টা বেজে গেছে কিন্তু সাকেব যানজটে আটকাই পড়ে আছে। অস্থিরতা আর উদ্বেগে ওর কপালে জমেছে বিন্দু-বিন্দু ঘাম। সাকেব মনের অস্থিরতাকে যথাসম্ভব নিয়ন্ত্রণে এনে দীপ্তিকে বলল – অথবা কোনো সভায় উপস্থিত থাকার কথা; সভার সময় হয়ে এলেও আমি যানজটে আটকাই পড়ে আছি। মাঝে মাঝে স্বপ্নে আরো দেখি পানির ট্যাপ দিয়ে পানির বদলে রক্ত আসছে – ঢাকা শহরের নিদারুণ পানিশূন্যতা! অথচ আমার ভেতরে তখন প্রাণান্ত পিপাসা।
দীপ্তি সাকেবের চোখে স্থির তাকাল, যেন সাকেব রোগী আর সে নার্স অথবা ডাক্তার। তারপর খুব মগ্নতার সঙ্গে বলল –
তাহলে তুমিও আমার সঙ্গে জ্যোতিষীর কাছে চলো।
কেন?
তোমার স্বপ্নগুলোরও একটা কারণ আছে। নিশ্চয়ই তিনি বলতে পারবেন এখন আসলে আমাদের কী করা উচিত।
দীপ্তির প্রস্তাব শুনে অাঁতকে উঠল সাকেব। যে-ব্যাটা জ্যোতিষী মধ্যরাতে খাল থেকে কাঁকড়া ওঠার খবর বলতে পারে, সে- সাকেবকে দেখেই হয়তো সিন্থিয়ার সঙ্গে তার সম্পর্ক ধরে ফেলবে। নাহ্ জ্যোতিষীর কাছে গেলে সিন্থিয়া রহস্য জেনে যাবে দীপ্তি; সে ভাবল। বলল –
যারা নামাজ পড়ে, তাদের তো জ্যোতিষীর কাছে যাওয়ার কথা নয়।
তুমি তো নামাজ পড়ো না।
আমার কথা বলছি না। নামাজটা তুমিই শুরু করেছ। আমি জ্যোতিষশাস্ত্রে বিশ্বাস করি না। তাছাড়া আমার মনে হয় শিক্ষিত মানুষ হয়ে –
ঢাকা শহরে শিক্ষার কোনো মূল্য আছে নাকি?
মানে?
মানে এখানে কখন ভূমিকম্প হবে অথবা সত্যি-সত্যি কখন নলকা দিয়ে পানির বদলে রক্ত অথবা যাত্রাপথে সন্ত্রাসীর আগুনে গাড়ির মধ্যেই –
এগুলোর সঙ্গে শিক্ষার কী সম্পর্ক?
শিক্ষা দিয়ে তোমার আমার তো আর চাকরি করে পেটের ভাত জোটাতে হচ্ছে না। অথচ জীবন বলো, গাড়ি-বাড়ি বলো এসব রক্ষার জন্য জ্যোতিষীর পরামর্শ নিতেই হচ্ছে।
ওহ্!
এরপর থেকে বসন্ত পেরিয়ে বৈশাখ আসা পর্যন্ত দীপ্তি সাকেবের চা-বিকেল অথবা কোনো কোনো রাতে বেলিফুলের সে-গন্ধটা তীব্র হয়ে উঠলেই দুজনেই সারারাত ভয়ংকর সব এলোমেলো স্বপ্ন দেখতে শুরু করল। দীপ্তি পঁয়ষট্টি হাজার টাকা খরচ করে মধ্যমা এবং অনামিকায় ভিন্ন রঙের আংটি ওঠাল। দীর্ঘ আটাশ বছরের বিবাহিত জীবনে কোনোদিন মুহূর্তের জন্য বাগদান-আংটিটা সামান্যক্ষণের জন্য না খুললেও দীপ্তির সুন্দর হাতের সে-স্থানটি দখল করে বসল পোখরাজ, মুক্তা ইত্যাদি নামের প্রতারণার চিহ্ন। অনুপ্রেরণা আর উজ্জ্বলতায় ভরে থাকা দীপ্তি দিন দিন বিষণ্ণতায় ভরা দীপ্তিহীন এক নারী-প্রতীক হয়ে উঠল।
একুশে এপ্রিল সন্ধ্যা ৮টার সময় দীপ্তি-সাকেবের বাসার খাবার স্থানের টেবিল-চেয়ারের ওপরে বসানো ঝালর বাতি হঠাৎ কাঁপতে শুরু করল। দুজনেই অনুভব করল ওদের দালানটা দুলছে এবং সঙ্গে সঙ্গে একসঙ্গে অনেক মানুষের সিঁড়ি ভাঙার শব্দ শুনল তারা। ‘ভূমিকম্প’, ‘ভূমিকম্প’ বলে একজন কিশোর চিৎকার করছিল। বাকি সবার চোখমুখে নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য লুকিয়ে ছিল আকুল আকুতি। শিশুরা বাবা-মায়ের কোলে তারস্বরে কাঁদছিল। সাকেব যখন দীপ্তিকেও তাড়াতাড়ি বাসা ছেড়ে নিচে নামার জন্য বলছে, তখন ৫ দশমিক ৬ মাত্রার ভূকম্পনটি থেমে গেছে। তবু সাকেব বাঁচার আশায় দ্রুত বাড়ির দরজা খুলে অন্যান্য মানুষের সঙ্গে সিঁড়ি ভাঙার শব্দে যোগ দিলো। দালানের বড়-বড় এক একটা অংশ ভেঙে পড়ছে মাথায় এবং শরীরে, এমন কাল্পনিক অস্থিরতায় এবং উদ্বিগ্নতায় সে দীপ্তির কথা ভুলেই গেল। নিচে গিয়ে যখন বুঝল তারা বাড়ি থেকে বের হওয়ার আগেই ভূকম্পনটি থেমে গেছে, তখন লুঙিপরা লম্বা-চওড়া এক সুদর্শন যুবক জ্ঞানদীপ্ত ভঙ্গিতে বলে উঠল –
আরে ভাই, আমি আমার স্ত্রীকে বলছিলাম ছোট্ট একটা প্লেটের চ্যুতিমাত্র! স্বল্পমাত্রার ভূকম্পনে কিছুই হবে না। কে শোনে, কার কথা…
ভদ্রলোকের স্ত্রীকেও যেন তীব্র ভাষায় প্রতিবাদের অনুপ্রেরণা পেয়ে বসল –
অ্যাই! বাজে বকবে না। তুমিই তো লুঙিপরা অবস্থায় বাসা ছেড়ে সবার আগে দৌড় শুরু করলে…
আরেকজন বলল, ‘এটা আর এমন কী! লস অ্যাঞ্জেলসে আমার বাসাটা ভূমিকম্পে একবার ডানে, একবার বাঁয়ে কাত হয়ে যেত। আমি হাসতে হাসতে বাসাটার ডান-বাঁয়ের দোলনির তালে তালে পেন্ডুলামের মতো নাচতে-নাচতে দৌড়ে বাইরে যেতাম। তবে ভাই এ-বিল্ডিংয়ের এক্সিট তো একটা সিঁড়ি আর একটামাত্র লিফট। খুবই টেনশনের ব্যাপার!’
অন্যজনের কণ্ঠ আর জনাদশকের কণ্ঠকে ছাপিয়ে গেল –
গ্লাসের পানির ভেতরে পুকুর-জলের ঢেউয়ের মতো কম্পন দেখেই আমার স্ত্রীকে বলছিলাম, ভূমিকম্প হচ্ছে – সে তো ভাই বিশ্বাসই করে না -।
তার স্ত্রী তাকে ধমক দিলো –
থামো। সবকিছুতে সাহিত্য ঝারার পন্ডিতি রাখো তোমার। তুমি তো জলের মতো থরথর কাঁপছিলে – ‘দ্যাখো স্বর্ণা, দ্যাখো। এসব কী হচ্ছে?
‘স্বর্ণা!? তাহলে দীপ্তি কোথায়?’ সাকেবের মনে প্রশ্নটা আসামাত্র সে দীপ্তিকে খুঁজল। তারপর প্রায় দৌড়ের ভঙ্গিতে ওপরে উঠল।

সাকেবের সঙ্গে বাইরে যাওয়ার জন্য দরজার দিকে পা বাড়াতেই মাথা চক্কর দিয়ে উঠেছিল দীপ্তির। সাকেব বাঁচার জন্য তাকে একা রেখেই দৌড়ে নিচে গেছে এ-ভাবনায় দানাবাঁধা অভিমান দীপ্তিকে আর বাসা থেকে বের হতে দেয়নি। একটা চেয়ার টেনে সে দরজার পাশে বুকসেলফে হেলান দিয়ে বসেছিল। বুকসেলফে একপ্রান্তে যত্ন করে কোরআন শরিফ রেখেছিল দীপ্তি এবং ওর মনে হয়েছিল মরে যাওয়ার জন্য এ-স্থানটি উত্তম। ক্ষণিকের জন্য সাকেবের প্রতি তীব্র ঘৃণা মনে জেগে উঠলেও জীবনের হয়তো বা এটাই শেষ মুহূর্ত ভেবে দীপ্তি সাকেবের সঙ্গে কাটানো জীবনের প্রিয়তম মুহূর্তের কথা স্মরণ করার চেষ্টা করছিল। বিয়ের লগ্ন, লজ্জামাখা বাসররাত, সাকেবের চোখে চোখ রাখার প্রথম কাঁচা অনুভূতি, সাকেবের তরুণ মুখ সবকিছুকে দীপ্তির এত প্রিয় মনে হলো! সে ফিরে যেতে চাইল তার অতীতে। দুজনের একসঙ্গে কাটানো অসংখ্য প্রিয় স্মৃতি মনের কোণে ভিড় করল। সঙ্গে সঙ্গে দীপ্তির চোখের সামনে লাল-লাল রঙের ফোয়ারা খেলা করল। দীপ্তি আরো কিছুক্ষণ তার স্মৃতিগুলোর ভেতরে মাত্র কৈশোর-উত্তীর্ণ তারুণ্যের কাঁচা অনুভূতিকে প্রাণপণে আলিঙ্গনের চেষ্টা করল। কিন্তু তার মুখের ডানপাশটা যেন অনুভূতিশূন্য হয়ে গেল এবং মাথার বাঁ-পাশে বন্যাধারার মতো এক শীতল জলের স্রোত বয়ে গেল। তারপর সুতীক্ষ্ণ ব্যথার তীব্র ভাষায় কুঁকড়ে গেল দীপ্তি। সাকেবের জন্য একতাল মায়া উথলে উঠল দীপ্তির হৃদয়ে। লুকিয়ে লুকিয়ে সারাজীবন টাকা বাঁচিয়ে সাকেব তার জন্য হীরার হার কিনেছে এর ভেতরের সত্য আর মাধুর্য যেন মাত্র দীপ্তির কাছে স্পষ্ট হলো!
সাকেবের ভালোবাসার গভীরতা বোঝার মতো মন, খোদা তাকে কেন দিলো না – সেজন্য সে নিজেকে ভৎর্সনা করে সাকেবকে দেখার জন্য ব্যাকুল হয়ে উঠল। সাকেবকে দেখার অনন্ত পিপাসায় দীপ্তির ভেতরটা হাহাকার করে উঠল। দীপ্তি অনুভব করল মাথার ভেতরের সেই শীতল জলের স্রোত গলগল রক্তের উষ্ণ প্রবাহের তীব্র যন্ত্রণা হয়ে ছড়িয়ে পড়ছে তার সমগ্র অস্তিত্বে। দীপ্তির চোখের আলো যেন নিভে এলো। দীপ্তির মনে হলো দালানটা হয়তো ভেঙে পড়েছে। সে হয়তো ধ্বংসস্তূপের ভেতরে প্রাণ খুঁজেফেরা এক পতঙ্গ। এ মুহূর্তে তার জীবনের একমাত্র প্রিয় বস্ত্ত সাকেবের দেওয়া হীরার হারটা রক্ষা করতে পারলে তার স্বপ্নস্মৃতির সময়গুলো বেঁচে থাকবে – এমন ভাবনায় অনেক কষ্টে প্রায় অবশ হাতদুটো টেনে গলার কাছে আনল দীপ্তি এবং আলতো করে হারটা খুলে ডানহাতের মুঠোর মধ্যে শক্ত করে অাঁকড়ে ধরল, যেন শক্ত করে হারটা ধরতে পারলেই তার প্রিয় সব অনুভূতি আর সাকেবের সঙ্গে কাটানো জীবনের প্রিয় স্মৃতিগুলো বেঁচে যাবে। দীপ্তি ধরেই নিল, দালানের বাইরে সাকেব নিরাপদ আছে এবং ধ্বংসস্তূপের ভেতর থেকে তার গলিত লাশ বের হলে সাকেব দীপ্তির হাতের মুঠোর মধ্যে শক্ত করে ধরা হারটা খুঁজে পাবে। ‘সাকেব যেন হারটা পায়!’; সে মনে মনে শেষবার প্রার্থনা করল। দীপ্তি মনে মনে, হীরার হার হয়ে সাকেবের কাছে বেঁচে থাকতে চাইল। চাওয়া যত বাড়ল অজান্তেই দীপ্তির হাতের মুঠো তত শক্ত হলো।
দীপ্তি! দীপ্তি!
সাকেব দ্রুত দরজা খুলেই দীপ্তিকে চোখ বন্ধ করে বসে থাকতে দেখে ব্যঙ্গ করে বলতে গেল –
তোমার জ্যোতিষীকে দেওয়া পঁয়ষট্টি হাজার টাকা…
তারপর থেমে গেল সাকেব। ধীরে হাঁটুগেড়ে বসল সে দীপ্তির সামনে। একপাশে ঝুঁকেপড়া দীপ্তির মাথাটার সোজা করিয়ে দিতে দিতে ডাকল কয়েকবার –
দীপ্তি !… দুঃখিত দীপ্তি – তোমাকে একা রেখে ওভাবে দৌড়ে যাওয়া আমার মোটেও উচিত হয়নি -। দীপ্তি !… ?

ডানহাতের মুঠির মধ্যে শক্ত করে হীরার হারটা ধরতে পারায় দীপ্তির ঠোঁটের কোণে শেষমুহূর্তে যেন সাকেবকেই কাছে পাওয়ার তৃপ্তিময় অদ্ভুত এক হাসি লুকিয়ে ছিল।
তারপর অ্যাম্বুলেন্স… হাসপাতাল… মিথ্যা ছোটাছুটি। সময়ের সঙ্গে দূরত্ব বাড়িয়ে ‘দীপ্তি’ ক্রমেই একটা শব্দ হয়ে গেল।

অনন্ত নিঃসঙ্গতার এক বিকেলে সাকেব হেঁটে-হেঁটে কফি হাউজে পৌঁছাল। ইচ্ছা না করলেও আশপাশের কণ্ঠস্বরে ঝরে-পড়া গল্প-হাসিগুলো সাকেবের কানে দূর থেকে ভেসে আসা অশ্রুত শব্দের মতো শুনাল। পাশের টেবিলে বসা এক ভদ্রলোক বলছেন –
ব্যাটা ভন্ড জ্যোতিষী! আমার বাসা গুলশান লেকের পাশে শুনে আমাকে অবাক করার জন্য বলল, ‘আপনার সামনে মহাবিপদ, কারণ আমি দেখতে পাচ্ছি আপনার বাসায়, পাশের লেক থেকে রাতে কাঁকড়া উঠে আসে।’
পাশের বন্ধু ভদ্রলোক জিজ্ঞাসা করল –
তারপর?
আরে কাঁকড়া না ছাই। বৈশাখ মাসে গাছে ঝিনুক উঠতেই পারে। এত বড় খালের আশপাশে কিছু ঝিনুকও থাকতে পারে। ঢাকা শহরে গাছ না থাকায় ঝিনুকগুলো দেওয়ালে অথবা গ্রিলে উঠে আসে। ছাগলটা ঝিনুকও চেনে না। ওর মতো অন্যদের গর্দভ ভেবে…
অতি মানুষের ভিড়ে মানুষ প্রকৃতির সুন্দর ব্যাপারগুলো নিয়ে অতিলৌকিকতার আড়াল তুলে ব্যবসার ফন্দি করছে। শুধু ঢাকা নয়; হয়তো সমগ্র পৃথিবীজুড়ে।
সাকেবের সেখানে বসে থাকতে আর ইচ্ছা করল না। মৃত্যুর সময় দীপ্তির ঠোঁটের কোণে লুকানো মিষ্টি হাসির রেখা এসে আলতো করে যেন সাকেবকে দেখে নিল।

বাসায় এসে আনমনে বারান্দায়, ড্রয়িং-ডাইনিং রুমে পায়চারি করল সে। মনে মনে চাইল দীপ্তি এসে দুষ্টুমি করে পেছন থেকে ওর চোখদুটো ঢেকে দিক। কিছুই হলো না। দীপ্তি কোথাও নেই। বেডরুমে সযত্নে রাখা হীরার হারটা হাতে তুলে নিয়ে সে নাড়াচাড়া করল কিছুক্ষণ। আবার নাকে লাগল সেই বেলিফুলের গন্ধ। সাকেব যেন আর সহ্য করতে পারল না। সে হারটা ছুড়ে ফেলে দিল লেকের উদ্দেশে। হারটা লোহার গ্রিলে ধাক্কা খেয়ে সজোরে পেঁচিয়ে ফেলল একটা গ্রিল। সাকেব কাছে গিয়ে দেখল হৃদয়াকৃতির হারটা দুভাগ হয়ে মাঝখান থেকে খুলে গেছে। হারের ভেতরে সূক্ষ্ণ ফাঁপা অংশটায় অতিসূক্ষ্ণ এক টিউব। একটা মাইক্রোচিপস রিমোট কন্ট্রোল হিসেবে বসানো। ওল্টে-পাল্টে সাকেব দেখল নখের তালুর স্পর্শ পেলেই হারটার পেটের মধ্যে সযত্নে বসানো টিউব থেকে বাষ্পাকারে বেলিফুলের গন্ধ ছড়িয়ে যায়।
নাহ্, সাকেব সিন্থিয়াকে মনে করতে চায় না। ওই গন্ধটুকু পেতে থাকলে সে জানে সিন্থিয়া তাকে অমোঘ আকর্ষণে টানতেই থাকবে। সিন্থিয়াকে সে জীবন থেকে ছুড়ে ফেলতে চাইল সারাজীবনের জন্য। আজ থেকে সে দীপ্তির একান্ত মানুষ হয়ে জীবনের বাকি দিনগুলো কাটাতে চাইল। হারটা ঘৃণাভরে সে খালের জলে ফেলে দিতে চাইল। কিন্তু হাতটা গ্রিলের বাইরে নিয়ে সাকেব শেষবারের মতো হারটা খালের মধ্যে ছুড়ে ফেলে দিতে গিয়েও নিজের মুঠোর মধ্যে আবার শক্ত করে ধরে ফেলল। বেলিফুলের গন্ধ আর সিন্থিয়ার অমোঘ আকর্ষণ সাকেবকে টানতেই থাকল। সিন্থিয়ার ঘোরে আবিষ্ট সাকেবের মনে পড়ল দীপ্তি ওকে একদিন বলেছিল –
ঢাকা শহরে শিক্ষার কোনো মূল্য আছে নাকি?

জ্যোতিষীর ভয়ংকর শিক্ষাটাই এখানে হয়তো বেশি কার্যকর। দীপ্তি ঠিকই বলেছিল। তবে নিজের এ-বোধকে অনুভবের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে পারেনি দীপ্তি। হয়তো পারছে না ঢাকা শহরে বসবাসরত কেউই; সাকেব মনে মনে হাসল। তার চারপাশে কত মানুষ; তাদের সবার ভেতরে সাকেবের মতো ছোট্ট এক রহস্য! একটা পাপ। পাপ- পুণ্যের বিস্তৃতিতে বিস্তৃত কোনো এককালের জলাভূমি ভরাট হয়ে দালান-কোঠার ফাঁকে মুখ লুকিয়ে আছে হয়তো গর্জে ওঠার জন্য।
একটা কফির মগ বরান্দায় বসানো টেবিলের ওপর তখনো সযত্নে রাখা। দীপ্তি এ-মগে কফি খেতে পছন্দ করত। দীপ্তির সুন্দর নখগুলোতে বয়স উড়ে এসে জুড়ে বসেছিল। মগের পরতে পরতে জেগে থাকা তবু অসাধারণ সে-নখগুলোর অস্তিত্ব বিষণ্ণ সাকেবকে অস্থির করে তুলল। সাকেব প্রাণপণে দীপ্তির নখগুলোর অস্তিত্বকে অনুভব করতে চাইল। প্রাণপণ অস্থিরতা সাকেবের আবেগকে চাড়িয়ে তুলল। ঝাপসা অশ্রুসজল চোখে সে মগটা মুখের সামনে তুলে ধরল। যেন দীপ্তিকেই বলল –
তুমি হারিয়ে গিয়ে আরো স্পষ্ট হয়েছ। আর আমি অনেক আগেই আড়ালে চলে গিয়েছি। দীপ্তি! তোমার সাকেব যেদিন এ-বাড়ির ভিত্তিতে প্রথম ইট গেঁথেছিল, সেদিন থেকে সে ইটের ফাঁকে ফাঁকে অর্থ উপার্জনের স্বপ্নের সঙ্গে নিজেকে গেঁথে ফেলেছিল। লাখ লাখ সাকেবের অন্তরাত্মা ঢাকা শহরের ইট-সিমেন্টের ভেতরে প্রোথিত হয়ে কবেই আড়াল হয়ে গেছে! আমরা ঢাকার মতো প্রকৃতিহীন বাড়িময় আত্মাহীন মানুষ হয়ে গেছি। সিন্থিয়ারা আমাদের অমোঘ আকর্ষণে টানতেই থাকে।
হাতে রাখা মগ থেকে দৃষ্টি সরিয়ে সাকেব নির্মোহ মানুষগুলোর মতোই নির্মোহ ভঙ্গিতে খালটায় চোখ রাখল।
টুপ করে একটা শব্দ শুধু। তারপর অসীম নীরবতা। অতি মানুষ এবং তাদের অর্থ উপার্জনের ‘পদ্ধতি’র ভারে ভারাক্রান্ত ঢাকা শহর যদি তার পাপ ওমন ‘টুপ’ শব্দে আড়াল করতে পারত! 

সোশ্যাল মিডিয়া

নিউসলেটার