আদিবাসী জীবনকেন্দ্রিক উপন্যাসে কবির বৃত্তান্ত

লেখক:

 

বদরুন নাহার

বাংলা সাহিত্যে মহাশ্বেতা দেবীকে ব্যতিক্রমী লেখক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়ে থাকে, যে-ক্ষেত্রটির জন্য তাঁকে এ-আখ্যা দেওয়া হয়ে থাকে, তা হলো তাঁর আদিবাসী জীবনকেন্দ্রিক উপন্যাস রচনা। পঞ্চাশের দশকে লিখতে শুরু করেন তিনি। ষাটের দশকের মাঝামাঝি এবং পরবর্তী দশকগুলোতে প্রান্তিকজন-আশ্রিত উপন্যাস রচনায় ব্যাপ্ত থেকেছেন মহাশ্বেতা। সম্ভবত সর্বাধিক আদিবাসী জীবনকেন্দ্রিক উপন্যাস তিনিই রচনা করেছেন। এ-ধারার সব উপন্যাসই যে সমান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে তা বলা যাবে না। তবে সব উপন্যাসেরই কিছু বিশিষ্টতা রয়েছে। সবচেয়ে বড় বিষয়, বাংলা সাহিত্যে তাঁর মতো করে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবনবৃত্ত নিয়ে সাহিত্য রচনায় মগ্ন আর কেউ থাকেননি। তিনি এই মূল স্রোতের বাইরের জীবনকে উপন্যাসের আখ্যানে নিয়ে এসে নিজের সাহিত্য সৃষ্টিতেও পরিবর্তন ঘটিয়েছেন। এ-প্রসঙ্গে সুমিতা চক্রবর্তীর একটি বিশ্লেষণ স্মরণ করছি –

বাংলা সাহিত্যে এই মুহূর্তে যতজন সাহিত্যিক আছেন তাঁদের মধ্যে সমরেশ বসু চলে যাবার পর, মহাশ্বেতা সম্ভবত সেই ঔপন্যাসিক যিনি বারবার পর্বে পর্বে নিজেকে ভেঙ্গে আবার গড়েছেন। পথ চলতে চলতে নিজেকে বদলেছেন, বদলেছেন নিজের শিল্পরূপ। কোনো বাইরের চাপে নয়, কোনো প্রতিষ্ঠানের চাপে নয়, সম্পূর্ণ নিজের হৃদয়ের তাপে নিজের সচেতন ইচ্ছায় এবং সমস্ত সৃষ্টি প্রবাহটিই রেখেছেন আত্মনিয়ন্ত্রণে।… তিনি লিখে যান উদ্দেশ্যমূলকভাবে, দায়বোধ থেকে, যত পারেন ছড়িয়ে দিতে চান তাঁর লেখাগুলোকে।১

নতুন স্বাদের উপন্যাস হিসেবে প্রথম প্রকাশিত হয় কবি বন্দ্যঘটী গাঞির জীবন ও মৃত্যু। বলা যায়, এই উপন্যাসের মাধ্যমেই মহাশ্বেতা দেবীর আখ্যানের কেন্দ্রীয় অবস্থানে চলে আসে আদিবাসী জনমানুষ। এ-উপন্যাস রচনার ক্ষেত্রে তাঁর ইতিহাসের প্রতি আগ্রহের জায়গাটা বোঝা যায়। বিস্তারিত আলোচনায় বিষয়টি স্পষ্ট হবে।

পরবর্তীকালে তিনি আদিবাসী জনজীবনকে বেছে নিয়েছিলেন, সে-উপন্যাসগুলো প্রধানত দুটি ধারায় প্রবাহিত হতে দেখা যায়।  প্রথমত, ইতিহাস-আশ্রিত বীরের বিনির্মাণ; দ্বিতীয়ত, স্বাধীন ভারতের রাষ্ট্রযন্ত্রের সঙ্গে সংশিস্নষ্ট মানুষজনের দ্বারা আদিবাসীদের শাসিত ও বঞ্চিত হওয়ার পরিপ্রেক্ষিতসমেত আদিবাসী সমাজের চালচিত্র নির্মাণ। দুটি ধারার উপন্যাস রচনায় লেখক যে-বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়েছেন তা হলো শ্রেণিসংগ্রাম। উল্লিখিত দুটি ধারার বাইরে অন্য এক অবস্থান থেকে নির্মিত কবি বন্দ্যঘটী গাঞির জীবন ও মৃত্যু উপন্যাস। তবে লেখক মহাশ্বেতার মূল অনুসন্ধানের দুটি বিষয়ই এ-উপন্যাসে বর্তমান, তা হলো, ইতিহাসকে আশ্রয় করে প্রেক্ষাপট নির্মাণ এবং শ্রেণিসংগ্রাম। এ-উপন্যাসে শ্রেণিসংগ্রাম এসেছে ইতিহাসের বর্ণাশ্রিত ধর্মের বিভাজনকে সামনে রেখে। যখন ধর্মের শ্রেণিবিন্যাসের কেন্দ্রটি নানা রকম প্রতিকূল এবং বিপরীত স্রোতের ধাক্কায় দোদুল্যমান, ধর্মীয় বর্ণবাদীরা শঙ্কিত, সেই সময়টিতে ধর্মকে ব্যবচ্ছেদ করে তৈরি করা হয়েছে শ্রেণিবৈষম্যের সংজ্ঞার্থ। সেই রূপ বর্ণাশ্রম ধর্মকে আশ্রয় করে রাঢ় বাংলার মেদিনীভূমের সমাজব্যবস্থা গড়ে উঠেছিল, আর সেই সমাজেই মহাশ্বেতা দেবী দলিত সমাজের এক অরণ্য চোয়াড় যুবককে কবি খ্যাতিতে স্থাপনে উদ্যোগী হয়ে ওঠেন কবি বন্দ্যঘটী গাঞির জীবন ও মৃত্যু উপন্যাসে। এ-আখ্যানে কবির জীবন ও মৃত্যুকে অনন্য এক শিল্পের জন্ম আর মৃত্যুর আলোকে উপস্থাপন লেখকের শিল্পনির্মাণের উচ্চমার্গীয় দক্ষতা। সেই শিল্পিত উপস্থাপনে তিনি তাঁর কবির করুণ পরিণতি সভ্যসমাজের কাছে তুলে আনেন।

উপন্যাস পাঠে যে-বিষয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে তা হলো, ষোড়শ শতকের কাব্যসাহিত্যের বিষয়, বিশদ বর্ণনা ও ভাষার বৈচিত্র্যে বিস্মিত ও অনুপ্রাণিত ছিলেন মহাশ্বেতা। সেই প্রাচীন বিশ্বাসের মুগ্ধতা আর মধ্যযুগের কাব্যের বহুমাত্রিকতাকে ধারণ করে উপন্যাসে তিনি কবিকে বিনির্মাণ করেছেন। কবি মুকুন্দরামের কথা মাথায় রেখেছিলেন, মহাশ্বেতা দেবী নিজেই বলেছেন যে, ষোড়শ শতকের রাঢ় বাংলার ইতিহাস তাঁকে আকৃষ্ট করেছিল। তিনি এ-কথাও উল্লেখ করেন, মেদিনীপুরের অবস্থিতি কলিঙ্গ সীমান্তে হওয়ার দরুন, চৈতন্য প্রভাবে সেখানকার নিম্নবর্গের জাতির মধ্যে মানুষ হিসেবে নিজেকে জানার ও জানানোর একটি প্রয়াস নিশ্চয় দেখা দিয়েছিল। এই চেতনার প্রমাণ কাব্য, পাঞ্চালি, গাথা, গীতি, পোটো নাচের ভেতর দিয়ে আমাদের কাছে পৌঁছেছে। কবি বন্দ্যঘটী গাঞির জীবন ও মৃত্যু উপন্যাসের ভূমিকাংশে তা উল্লেখ্য। অতএব দেখা যাচ্ছে, সেই বিপুল বৈচিত্রের ভেতর থেকে মহাশ্বেতা প্রথম মানুষ হওয়ার অধিকারকাঙিক্ষত এক কবির সন্ধান দিতে চেয়েছেন পাঠককে।

মধ্যযুগের যে-পটভূমিতে উপন্যাসটি রচিত হয়েছে, তা এক বিশিষ্ট সময়ের। বাংলা সাহিত্যের বিভিন্ন পর্বে পরিভ্রমণ করে লেখক অন্ত্যজ শ্রেণির কথা লিখেছেন এ-উপন্যাসে। বাংলা সাহিত্যের আদি আখ্যানরীতিকে সঙ্গে নিয়ে ইউরোপীয় উপন্যাস সাহিত্যধারাকে পাশ কাটিয়ে লেখক উপন্যাসটি লিখেছেন বলেই এর বিশিষ্টতা বিশেষভাবে চোখে পড়ে। মহাশ্বেতার সব আদিবাসী জীবনকেন্দ্রিক উপন্যাসের মধ্যে এ-উপন্যাস ব্যতিক্রমী হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে, কেননা এ-উপন্যাসে শুধু বাঁচার জন্য, ক্ষুধার জন্য, অধিকার আদায়ের সংগ্রাম নয়। জীবনের ন্যূনতম চাহিদা আর আদিবাসী অসিত্মত্ব রক্ষার কাহিনি এটা নয়, এখানে জীবনের চেয়ে শিল্পের দাম অনেক বেশি। এখানে ব্যক্তিসত্তার অধিকার, মানুষ হওয়ার স্বাধীনতার বিষয়টি অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

মহাশ্বেতা দেবীর উপন্যাস কবি বন্দ্যঘটী গাঞির জীবন ও মৃত্যুকে অনুধাবন করতে সাহিত্যের যুগবিশ্লেষণকে মাথায় রাখতে হবে। সাহিত্যের যুগ বিভাজনে ও মধ্যযুগ নানা দিক থেকে বিশিষ্ট। এ-প্রসঙ্গে সুহৃদকুমার ভৌমিকের আদিবাসীদের ভাষা ও বাঙলা গ্রন্থের উদ্ধৃতি উল্লেখ্য –

সাহিত্যের যুগ-বিভাজনে মধ্যযুগ পর্যন্ত বাংলা সাহিত্য বিশেষ ছন্দোবন্ধনে গড়ে-ওঠা পদ্যকে ভিত্তি করে বিকশিত হয়েছে। সাহিত্য যেমন জীবনের প্রতিচ্ছবি, তেমনি কাব্যছন্দের নির্মাণও নির্ভর করে মানুষের স্বাভাবিক উচ্চারণভঙ্গির ওপর। আর বাংলা ভাষার উচ্চারণভঙ্গি এসেছে অস্ট্রিক ভাষাগোষ্ঠীর সাঁওতাল, মুণ্ডা, হো-দের কাছ থেকে। বাঙালির উচ্চারণ অসংস্কৃত তাই বাংলা ছন্দ মুক্তি পেয়েছে সংস্কৃত ছন্দ নয় সাঁওতাল ছন্দের ঘরানায়। আর বাঙালির উচ্চারণ অসংস্কৃত তাই বাঙালি ভাবপ্রকাশভঙ্গি বা বাক্য যৌবনদীপ্ত সতেজ হয় সংস্কৃত ব্যাকরণের বিভক্তি কারকের পোশাক পরে নয়, সাঁওতাল ব্যাকরণের খালি পায়ে চলার তালে।২

এই বিশ্লেষণে বাংলা-ভাষা সাহিত্যে এসব দলিত শ্রেণির অবস্থানের স্বীকৃতি মেলে, যা হয়তো উপন্যাসটি রচনার পূর্বেই লেখকের মননে গেঁথেছিল। অন্যদিকে মহাশ্বেতা দেবী উপন্যাস সম্পর্কে উল্লেখ করেন যে, ‘কাব্যের বয়স গদ্যের চেয়ে অনেক প্রাচীন’৩। তিনি একথা লেখেন তা কাব্যের বয়সের চেয়েও অনেক পরে, পোস্ট-কলোনিয়াল সময়ে এসে। মধ্যযুগের কাব্যাশ্রিত আখ্যানকে ভিত্তি করে রচিত কবি বন্দ্যঘটী গাঞির জীবন ও মৃত্যু উপন্যাসটি উত্তরাধুনিক বলা যেতে পারে, যা সাবঅলটার্ন ভাবধারায় উপস্থাপিত। যদিও লেখক তাঁর কবিকে আধুনিক বলেছেন, বিষয়টি উল্লেখ্য –

কবিকঙ্কণ সম্পর্কে প্রথম কৌতূহলের সূচনা রবীন্দ্রনাথ সম্পাদিত আধুনিক বাংলা কবিতার সঙ্কলন পাঠে শুরু। ‘গ্রন্থোৎপত্তির বিবরণ’ তাতে ছিল। মুকুন্দরামের দামিন্যা ত্যাগের কারণ তো নয়া শাসকের জুলুম জবরদসিত্ম। কিন্তু দেশ ছেড়ে আরড়ায় গিয়ে তিনি বাঁকুড়া রায়ের সভায় কবিখ্যাতি পান। এই কবি হয়ে ওঠার কাহিনীই আমি ‘কবি বন্দ্যঘটী গাঞির জীবন ও মৃত্যু’-তে লিখেছি। আমার কবি আধুনিক। কেননা সে অরণ্যজীবন ত্যাগ করেছিল। ভীমাদল নগরীতে কবিখ্যাতি অর্জন করেছিল। মৃত্যুর পরে নয়, জীবনকালেই তাঁর জন্মান্তর ঘটেছিল। আর ‘বন্দ্যঘটী গাঞি’ অথবা বন্দ্যোপাধ্যায় পদবিধারী ব্রাহ্মণ হিসেবে সে ইচ্ছে করেই মিথ্যা পরিচয় দেয়। কেননা আরণ্যচুয়াড়ের বিদ্যার্জন সেদিনের সমাজ ক্ষমা করত না। সে সময়ে চৈতন্যের প্রবল প্রভাবে নির্যাতিত জাতিগুলি বৈষ্ণব হয়ে ব্রাহ্মণ্যশাসনের নির্দেশিত সীমারেখা মানছে না, এতেও রাজন্যকুল এবং উচ্চবর্ণীয়রা অস্বসিত্মতে ছিলেন। কবি জন্মসূত্রে-লব্ধ জীবন ত্যাগ করে এক নতুন জীবন অর্জন করতে চান। পরিণামে দুটি জীবনই তাঁকে ত্যাগ করে।৪

লেখক তাঁর কবিকে আধুনিক বলে যে-ব্যাখ্যা উপস্থাপন করলেন, তা ভিন্নভাবে ব্যাখ্যার দাবি রাখে, সে-প্রসঙ্গে যাওয়ার আগে আধুনিকতা বিষয়টা স্পষ্ট হওয়া জরুরি। আধুনিকতা প্রসঙ্গে সুবিমল মিশ্র বলেন – ‘প্রকৃত আধুনিকতা শিল্প-সম্মত ভাষায় ধ্বংসসাধন করে এবং শিল্পকে তথাকথিত মানবিকতা থেকে মুক্ত করে বলে আমার বিশ্বাস।’৫ অর্থাৎ এই আধুনিকতা ব্যক্তিচেতনার উন্মেষ ঘটায়। আধুনিক মতবাদটাই আমাদের মাঝে এনেছে ইউরোপ। বাংলা উপন্যাস সাহিত্যে যে-আধুনিকতা বঙ্কিমচন্দ্রের হাত ধরে প্রতিষ্ঠা পায়, তা ছিল ইউরোপীয় ভাবাচ্ছাদিত। এ প্রসঙ্গে দেবেশ রায়ের দৃষ্টিকোণ উল্লেখ্য, তিনি আধুনিকতার বৈশ্বিক চরিত্র বিশ্লেষণ করেছেন – ‘ইউরোপেরই প্রয়োজনে সমগ্র বিশ্বে ‘আধুনিকতা’ নামক ধারণাটি নির্মাণ করেছে ইউরোপ নিজেই। আর ইউরোপসৃষ্ট এই বিশ্ববীক্ষা বা মানদ- দিয়ে ঔপনিবেশিক বাংলা উপন্যাসের জন্মবীজ।’৬

কিন্তু প্রাচীন আখ্যানকাব্যকে আশ্রিত করে মহাশ্বেতার কবি বন্দ্যঘটী গাঞির জীবন ও মৃত্যু উপন্যাসটিতে অন্ত্যজ শ্রেণির কবি হয়ে-ওঠার পেছনের যন্ত্রণা এবং তাঁর করুণ পরিণতি-সংবলিত উপন্যাস, যা প্রকৃতপক্ষে আধুনিক নয়, উত্তরাধুনিক সাহিত্যকর্ম হয়ে ওঠে বলেই পাঠক হিসেবে আমার ধারণা। যদিও নিজে তাঁর কবিকে আধুনিক বলে উল্লেখ করেছেন। কিন্তু সাহিত্যের তত্ত্ব বিশ্লেষণকে মাথায় রেখেই আমরা এই উপন্যাসকে উত্তরাধুনিক পর্বের সাব-অলটার্ন ধারার অংশ হিসেবে বিশ্লেষণ করতে পারি।

অরণ্যজীবন থেকে সভ্য জগতে এসে কবি হওয়াকে মহাশ্বেতা দেবী আধুনিক বলতেই পারেন, কিন্তু তিনি যখন অন্ত্যজ শ্রেণি থেকে তাঁর কবিকে বিনির্মাণ করেন, দ্বিতীয় জন্ম দেন, তখন তা আর আধুনিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি, তা হয়ে উঠেছে উত্তরাধুনিক। আধুনিকতা যখন ঔপনিবেশিক শ্রেণিভুক্ত হয়ে মানবমুক্তির পথে উলটো দমনের কৌশল হয়ে পড়ে তখনই ঘটে বিনির্মাণ, সৃষ্টি হয় উত্তরাধুনিক প্রক্রিয়া। মহাশ্বেতা তাঁর ‘কবি বন্দ্যঘটী গাঞি’কে বিনির্মাণ করেছেন, তা মুকুন্দরামের ছায়ায়।

এ প্রসঙ্গে মলয় রায়চৌধুরীর উত্তর-ঔপনিবেশিকতা প্রবন্ধের ব্যাখ্যাংশ স্মরণ করা যেতে পারে – ‘পোস্টমডার্নিজম বা আধুনান্তিকতা, আধুনিকতার মহানতায় বিশ্বাস করে না, কেননা আধুনিকতা মূলত উদ্গত হয়েছিল সাম্রাজ্যবাদী ইউরোপে… কাল বিভাজনের দিক থেকে ১৯৪৭-পরবর্তী সাহিত্য ও সংস্কৃতিকে ভাবুকরা বলছেন পোস্টকলোনিয়াল বা উত্তর-ঔপনিবেশিক।’৭

আমাদের উপন্যাস সাহিত্য ইউরোপীয় হাত ছেড়ে যখন থেকে এদেশীয় হয়ে উঠেছে, তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় (১৮৯৮-১৯৭১), সতীনাথ ভাদুড়ী (১৯০৬-৬৫), মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় (১৯০৮-৫৬), মহাশ্বেতা দেবী (১৯২৬-২০১৬) এবং দেবেশ রায় (১৯৩৬), সেই দেশীয় হয়ে-ওঠা উপন্যাসের অন্যতম নির্মাতা। মহাশ্বেতা দেশীয় উপন্যাসের রচনার ক্ষেত্রে যে-ভূমিকা রেখেছেন, তার মধ্যে কবি বন্দ্যঘটী গাঞির জীবন ও মৃত্যু উপন্যাসটি উল্লেখ্য, কেননা এখানে তিনি লোকবাংলার আখ্যানরীতির অবতারণা করেছেন। আমাদের প্রাচীন সাহিত্যের আখ্যানরীতি মূলত বিবরণমূলক। যেখানে গুরুত্বের সঙ্গে উপস্থাপন করা হয় স্থান, কাল, ঘটনা, প্রকৃতি ও চরিত্রকে। আখ্যানকাব্য, মঙ্গলকাব্য প্রভৃতি ধারায় এই বিষয়গুলো লক্ষণীয়। তেমনি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উপস্থাপিত হয় আখ্যানের স্থানপট, চরিত্রের আকার-প্রকৃতি-খাদ্যাভ্যাস-পরিচ্ছদ, লোকাচার প্রভৃতি। কবি বন্দ্যঘটী গাঞির জীবন ও মৃত্যু উপন্যাসটি পাঠান্তে আখ্যানবিন্যাসে এসব বৈশিষ্ট্য পরিদৃষ্ট হয়।

বিভিন্ন যুগ নানা সম্প্রদায়ের আচার-আচরণ, সংস্কার-সংস্কৃতি ও ধর্মবিশ্বাসের ওপর প্রতিষ্ঠিত হয়ে ওঠে। এমনি বাংলা সাহিত্যের মধ্যযুগের চেতনায় যখন কবি মুকুন্দরাম চক্রবর্তীর জীবন ও কাব্যের প্রতি অনুরক্ত মহাশ্বেতা, সেই কবিকে মাথায় রেখে তাঁর কবিকে বিনির্মাণ করেন, তখন তা যেন প্রান্তবর্তী সমাজজীবনের বৃত্তায়নে চিত্রিত হয়ে ওঠে।

মহাশ্বেতা দেবী-রচিত কবিচরিত্রটি এক বন্ধুর পথ অতিক্রম করে কবি খ্যাতি পায়; কিন্তু শেষ পর্যন্ত ঔপন্যাসিক কবিকে নির্মম পরিণতির ভেতরে নিয়ে যান। স্ব-জাতি ছেড়ে আসা কবি কলম ধরার অপরাধে বর্ণশাসিত সমাজের কাছে শাসিত্মপ্রাপ্ত। অন্যদিকে কবি নিজের স্ব-জাতির ডাকে সাড়া দিয়ে ফিরে যেতে চান না, চুয়াড়দের রাজা হওয়ার আহবান প্রত্যাখ্যান করেন। কবি বনদেবী অভয়ার বন্দনাগীত রচনা করেন, যে অভয়া স্বপ্নে তাঁকে নিয়ে পাঞ্চালী লিখতে বলল, সেই অভয়ার কাছেও তাঁর শেষ আশ্রয় মেলে না। কবি রক্তাক্ত হয়ে আকুতি জানায় ‘মায়ের লাড়ীর মধ্যে যাব’৮  বলে – কিন্তু আশ্রয় মেলে না। ফলে যন্ত্রণার মাঝ দিয়ে নির্মিত কবির জীবন আবার রক্তাক্ত পরিণতির দিকে গেল। আর ঘটনার এমন পরিপ্রেক্ষিত উপন্যাসে প্রান্তজনের স্বরের এরূপ উপস্থাপনা পাঠককে ভিন্ন স্বাদে আচ্ছন্ন করে, যাকে উত্তরাধুনিক ধারার সাহিত্য হিসেবে চিহ্নিত করতে পারি। এই ধারায় দলিত শ্রেণির কণ্ঠ এরূপ নির্মাণকে সাব-অলটার্ন বলা যেতে পারে। লেখক কবিকঙ্কণ মুকুন্দরাম চক্রবর্তীর মতো উচ্চবর্ণের কবির ছায়ায় তাঁর কবিকে নিয়ে আসেন, প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর থেকে কবি তথা শিল্পী সত্তা নির্মাণে প্রথাগত থেকে বাইরের উপন্যাস সৃষ্টিতে ব্যাপ্ত হয়ে ওঠেন, তেমনি প্রান্তিক কণ্ঠস্বরকে তুলে এনেছেন মূল স্রোতের মানুষের সাহিত্যে, যা নিচের দিক থেকে ইতিহাসকে দেখার ইঙ্গিত বহন করে। ওপরের দিক থেকে নয়, যা সাব-অলটার্ন স্টাডিজের অংশ হয়ে দেখা দেয়। আর সাব-অলটার্ন উত্তরাধুনিকতারই এক স্টাডিজ। সেক্ষেত্রে বলা যায়, পোস্ট-মডার্নিজমের ক্ষেত্রে সাব-অলটার্ন আসার আগে থেকেই মহাশ্বেতা তাঁর নিজের মতো করে সাব-অলটার্ন চর্চা করেছেন। কারণ সাব-অলটার্ন স্টাডিজ সংকলন প্রথম প্রকাশিত হয় ‘১৯৮২’ সালে৯। এ পর্যায়ে উত্তর-আধুনিকতাবাদ প্রসঙ্গে তরুণ আলোচক রহমান জর্জির বক্তব্য উল্লেখযোগ্য –

আধুনিকের পক্ষপাত রয়েছে ইতিহাসের মহাবয়ান এবং জ্ঞানের অখ-তার ওপর। এর বিশ্বাস রয়েছে মিথ ও সামাজিক-সাংস্কৃতিক ঐক্য এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অগ্রগতির ওপর। অন্যদিকে, উত্তরাধুনিকতা এসবকে সন্দেহ করে, প্রত্যাখ্যান করে। মহাবয়ানকে সে irony-র মাধ্যমে অবিনির্মাণ করে, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বহুত্বে বিশ্বাস করে, প্রযুক্তির সংশয় দেখায়।১০

আমরা মহাশ্বেতা দেবীর কবি বন্দ্যঘটী গাঞির জীবন ও মৃত্যু উপন্যাসের বিশ্লেষণে এরূপ প্রত্যাখ্যান আর সন্দেহের মাঝে বহু সংস্কৃতির সমাগমে কাহিনির বিস্তার এবং irony-ক ভাবে কবির বিনির্মাণ দেখতে পাই। তাই এ-উপন্যাসকে আধুনিক না বলে উত্তরাধুনিক বলা শ্রেয় মনে করছি। বিষয়টি উপন্যাসের বিস্তারিত আলোচনার মাধ্যমে আরো স্পষ্ট হয়ে উঠবে।

মহাশ্বেতা দেবী আদিবাসী জীবনের প্রতি যে-দায়বদ্ধতার জায়গা থেকে উৎসারিত হয়ে রচনা করেছেন অরণ্যের অধিকার, চোট্টি মুণ্ডা এবং তার তীর, টেরোড্যাকটিল, পূরণসহায় ও পিরথা, সুরজ গাগরাই, ক্ষুধা প্রভৃতি উপন্যাস। কবি বন্দ্যঘটী গাঞির জীবন ও মৃত্যু উপন্যাসটি সেভাবে বা সেই মানসে রচিত হয়েছে বলা যাবে না; কিন্তু এ-উপন্যাসের ক্ষেত্রেও লেখকের ইতিহাস-চেতনা সর্বদা জাগ্রত ছিল, যা পূর্বেই উল্লেখ করেছি। ইতিহাসের প্রচ্ছায়ায় ও ঘটনাপ্রবাহ অবলম্বন করে লেখকের মনোজগৎসৃষ্ট আখ্যান। এ-প্রসঙ্গে লেখক নিজেই ভূমিকায় বলেছেন –

সবকিছুর পরে বলি, ইতিহাস এ গল্পের পটভূমিকা, কিন্তু আসলে কবির জন্ম ও মৃত্যুর রক্তাক্ত ইতিহাস একেবারেই লেখকের মানসাশ্রিত।… শেষ পর্যন্ত যেহেতু গল্পই বলতে চেয়েছি সেহেতু এ কাহিনিতে যাঁরা ইতিহাস খুঁজবেন এবং খুঁজবেন না তাঁদের কারো কাছেই আমার বলবার কিছু নেই।১১

লেখকের এই মন্তব্য তাত্ত্বিক এবং আক্ষরিক অর্থে সত্য। কেননা উপন্যাস কোনো ইতিহাসের বই নয়, ইতিহাস লিখতে হলে ঘটনার সার্বিক উপস্থাপন যেমন জরুরি, তেমনি ইতিহাসকে সত্য হতে হয়; কিন্তু উপন্যাসের ক্ষেত্রে সে-দায় নেই বললেই চলে। সে যতই ইতিহাস-আশ্রিত উপন্যাস হোক না কেন, তা লেখকের কল্পনার মিশ্রণে সৃষ্ট। ফিকশন বলতে আমরা এটাকে বুঝি।

কিন্তু যখন মহাশ্বেতা দেবী নিজেই আবার বলেন, ‘মুকুন্দরামের দামিন্যা ত্যাগের কারণ তো নয়া শাসকের জুলুম জবরদসিত্ম। কিন্তু দেশ ছেড়ে আরড়ায় গিয়ে তিনি বাঁকুড়া রায়ের সভায় কবিখ্যাতি পান। এই কবি হয়ে ওঠার কাহিনিই আমি ‘কবি বন্দ্যঘটী গাঞির জীবন ও মৃত্যু’-তে লিখেছি।’১২

আসলে লেখকের ভাবনায় যে-অনুভব প্রতিষ্ঠা পায়, সৃষ্টিকর্মের সেই ভাবটি সবসময় লেখক ব্যাখ্যা করেন না বা তা জরুরিও নয়।

কবিকঙ্কণ মুকুন্দরামের এই কবি হয়ে ওঠার কাহিনিই তিনি কবি বন্দ্যঘটী গাঞির জীবন ও মৃত্যুতে লিখেছেন, তাই এ-উপন্যাসকে ঐতিহাসিক উপন্যাস বলতে পারি। তবে সেক্ষেত্রে এই সত্য তো বিদ্যমানই থাকে যে, তা ঐতিহাসিক উপন্যাস মাত্র, ইতিহাস নয়। সমাজবিজ্ঞানের বিশ্লেষণে গবেষকরা অনেক বিষয়েই ইতিহাস ও গল্প-উপন্যাসকে মাথায় রেখে তথ্য অনুসন্ধান চালিয়ে সামাজিক চরিত্র বিশ্লেষণ করেন, আর এই বিশ্লেষণ পদ্ধতি এখন পর্যন্ত গ্রহণযোগ্যতার ক্ষেত্রে শ্রেয় অবস্থানে রয়েছে।

কবিকঙ্কণ মুকুন্দরামের এই কবি হয়ে-ওঠার কাহিনিই তিনি কবি বন্দ্যঘটী গাঞির জীবন ও মৃত্যুতে লিখেছেন, লেখক নিজে বলেছেন বলেই নয়; বরং উপন্যাসটি পাঠের মাধ্যমে মধ্যযুগের ও পৌরাণিক আখ্যানের ভেতর দিয়ে রোমান্টিক উপন্যাসের শরীর নির্মাণে আমরা তা দেখতে পাই, যা ঐতিহাসিক ট্র্যাজেডি। তিনি উপন্যাসে মধ্যযুগের ভাষা ব্যবহার করেছেন, যেমন – আইয়ত, ঢেমসা, লাচাড়ী, লৈকা এরূপ শব্দের খোঁজ মেলে উপন্যাস জুড়ে। উপন্যাস শেষে এই উপন্যাসে ব্যবহৃত দেশজ শব্দাবলির একটা তালিকাও তিনি উল্লেখ করেছেন। তিনি অভয়ামঙ্গল রচনার নিমিত্তে যে-পদগুলো ব্যবহার করেছেন, তা মঙ্গলকাব্যের আদলে নির্মিত হয়ে বাস্তবতার স্বরূপ হয়ে ওঠে। উপন্যাস থেকে বিশেষভাবে উল্লেখ্য –

আ গো বনের হংস আমার পত্র লৈয়া যাও।

চঞ্চুতে লৈয়া যাও চঞ্চুতে লৈয়া যাও চঞ্চুতে লৈয়া যাও!

এই আকাশ আমার তুলট কাগজ, পত্র লৈয়া যাও!

এই নলবন আমার লেখনী, পত্র লৈয়া যাও!

এই রূপনারায়ণ আমার মসীপাত্র, লৈয়া যাও \১৩

মঙ্গলকাব্যের পরতে-পরতে এরূপ কাব্যময়তা আমরা দেখতে পাই। কাব্যরস থেকে গঠন প্রক্রিয়ায় মহাশ্বেতার এই নির্মাণে সাদৃশ্য বিদ্যমান। উদাহরণ উল্লেখ্য খুব জরুরি নয়, তবু বলা যায়, মনসামঙ্গল কাব্যে অনিরুদ্ধ ও ঊষা অগ্নিকু– ঝাঁপ দিয়ে আত্মত্যাগ করলে, তখন –

সোনার পুতুলি দুটি ছাই হঞা গেল।

ভ্রমর-ভ্রমরী দুটি উড়িতে লাগিল \ – (বিষ্ণু পাল)১৪

(বাংলা মঙ্গলকাব্যের ইতিহাস, পৃ ১২৩)

অন্যদিকে ড. অসিতকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাংলা সাহিত্যের সম্পূর্ণ ইতিবৃত্ত গ্রন্থটি থেকে আমরা যে-তথ্য পাই, তা মহাশ্বেতা দেবীর উপন্যাস আলোচনার জন্য স্মরণযোগ্য –

তাঁর কাব্য সাধারণত অভয়ামঙ্গল নামে পরিচিত।… আত্মপরিচয়ে দেখা যাচ্ছে মুঘল-পাঠানের বিরোধের সময় পরিণত বয়সে তিনি ঘর ছেড়েছিলেন।… সপরিবারে বহু কষ্ট ভোগ করে তিনি মেদিনীপুরের ব্রাহ্মণভূমির জমিদার বাঁকুড়া রায়ের আশ্রয় পেলেন। ইতিপূর্বে একদিন দেবী চ–কা কবিকে, স্বপ্নে আবির্ভূত হয়ে, তাঁর মহিমাবিষয়ক কাব্য লিখতে নির্দেশ দিয়েছিলেন।… তাঁর ছাত্র জমিদার হয়ে তাঁকে চ-ীকাব্য লিখিবার জন্য অনুরোধ করতে লাগলেন। এই সময় গৌড়বঙ্গে মুঘল সুবাদার মানসিংহের সুশাসনে শান্তি ফিরে আসছিল। তখন আত্মীয়-বন্ধু এবং ছাত্রের অনুরোধে এবং দেবীর পূর্বস্বপ্নাদেশ স্মরণ করে মুকুন্দরাম অভয়ামঙ্গল বা চ-ীমঙ্গল কাব্য রচনায় প্রস্ত্তত হলেন। এই আত্মকথাসংক্রান্ত বৃত্তান্তটি বাস্তব জীবনরসে ভরপুর, ঐতিহাসিক তাৎপর্যে অর্থবহ এবং কাব্যগুণে অতিশয় প্রশংসনীয়।১৫

কবি বন্দ্যঘটী গাঞির জীবন ও মৃত্যু উপন্যাসে কবি বন্দ্যঘটী গাঞিকে দেখা যায় দেবীর স্বপ্নাদেশ পেয়ে অভয়ামঙ্গল রচনা করতে এবং যার মাধ্যমে তিনি কবিখ্যাতি অর্জন করেন। উপন্যাসের নায়িকা ফুল্লরা নামটি মঙ্গলকাব্য থেকে নেওয়া ভাবাই যেতে পারে। মুকুন্দরাম চক্রবর্তীর কালকেতু উপাখ্যানে আমরা ফুল্লরা নামের চরিত্রের উপস্থিতি দেখেছি। এ প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘ঐতিহাসিক উপন্যাস’ প্রবন্ধ থেকে – ‘রসের সৃজনটাই উদ্দেশ্য, অতএব সেজন্য ঐতিহাসিক উপকরণ যে পরিমাণে যতটুকু সাহায্য করে সে পরিমাণে ততটুকু লইতে কবি কুণ্ঠিত হন না।’১৬

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের উল্লেখ্য বক্তব্যকে সামনে রেখে বিজিত কুমার দত্ত একটি ব্যাখ্যা দেন। তা হচ্ছে –

ঔপন্যাসিককে ঐতিহাসিক বিবেকের প্রতি বিশ্বস্ত হতে হবে এটা ঠিক। কিন্তু তাঁর ঐতিহাসিক বিবেক – পাত্রপাত্রী নির্বাচনে, ঘটনা নির্মাণে, আবেগ-অনুভূতির প্রকাশে, চরিত্রচিত্রণে শিল্পী সত্তাকে গুরুত্ব দিতে হবে। তবেই রবীন্দ্রনাথের কথিত ঐতিহাসিক রসের স্বরূপ উপলব্ধি হবে, অতীত জীবন্ত হয়ে উঠবে।১৭

কবি বন্দ্যঘটী গাঞির জীবন ও মৃত্যু উপন্যাসটিও মধ্যযুগের মঙ্গলকাব্য ও তৎকালীন সময়কে নিয়ে লিখিত। মহাশ্বেতা দেবী উপন্যাসের চরিত্র-চিত্রণ এবং সামাজিক প্রেক্ষাপট নির্মাণে সেই সময়কে তাৎপর্যপূর্ণ করে তুলে ধরেছেন উপন্যাসটিতে। লেখক নিজেই উপন্যাসে ইতিহাসের ব্যবহার প্রসঙ্গে বলেন –

ইতিহাসের মুখ্য কাজই হচ্ছে মানুষের অন্তর্মুখী পুরুষার্থকে বাইরের গোলমাল, সংগ্রাম ও সমারোহের আবর্জনা এবং ধ্বংসসত্মূপ সরিয়ে সরিয়ে অন্বেষণ করা, অর্থ ও তাৎপর্য দেওয়া। আর তখনই এই ভিতরপানে চোখমেলার দরুনই অনিবার্যভাবে বেরিয়ে আসে সমাজনীতি ও অর্থনীতি; বেরিয়ে আসতে বাধ্য।… এই সমাজনীতি ও অর্থনীতির মানে হল লোকাচার, লোক সংস্কৃতি, লৌকিক জীবনব্যবস্থা।১৮

তিনি তাঁর এই উপন্যাসকে পূর্বে উল্লিখিত ‘লেখকের মানসাশ্রিত’১৯  বলে উল্লেখ করলেও আমরা উপন্যাসের পট নির্মাণে ইতিহাসের রস খুঁজে পাই, এবং লেখক বেশ ভালোভাবেই উপন্যাসটিতে মধ্যযুগের মানুষ, মানবিকতা এবং সমাজচিত্রকে তুলে ধরেছেন। তবে তা ইতিহাসের রোমান্সসমৃদ্ধ ভাবে। যদিও লেখক বলেন, ‘ইতিহাসের রোমান্স আমাকে আর আকৃষ্ট করছিল না’।২০ তবু এই উপন্যাসে ইতিহাসের সঙ্গে রোমান্স যেমন খুঁজে পাওয়া যায়, তেমনি লেখকের মনোজগৎ-সৃষ্ট উপন্যাস হলেও ষোড়শ শতকের বাংলারই শিল্পিত আখ্যান কবি বন্দ্যঘটী গাঞির জীবন ও মৃত্যু উপন্যাসটি। ঐতিহাসিক সময়কে কেন্দ্র করে বা সেই প্রেক্ষাপটকে উপন্যাসে নিয়ে আসার বিষয়টি বাংলা সাহিত্যে পূর্বেও ছিল। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপ্যাধ্যায় (১৮৩৮-৯৪) এরূপ ইতিহাসে রোমান্স ও কল্পনা মিশিয়ে উপন্যাস রচনা করেছেন। সেগুলো বিশুদ্ধ ঐতিহাসিক উপন্যাস হিসেবে সমালোচকের বিরোধ থাকলেও শিল্পবস্ত্ত হিসেবে সেসব উপন্যাস সব যুগেই স্বীকৃত। তাঁর দুর্গেশনন্দিনী (১৮৬৫), কপালকু-লায় (১৮৬৬) এরূপ রোমান্সের দেখা মেলে। ইতিহাসকে নতুন দৃষ্টিকোণ থেকে সাধারণ মানুষের চিন্তা-চেতনায় অভিষিক্ত হয়ে ঐতিহাসিক উপন্যাস রচনার ধারাটি সম্ভবত শুরু করেন প্রমথনাথ বিশী (১৯০১-৮৫) ও নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায় (১৯১৮-৭০)। প্রমথনাথ বিশীর জোড়াদীঘির চৌধুরী পরিবার (১৯৩৮) এবং নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের তিন খ–র উপন্যাস উপনিবেশ (১৯৪৪) এ প্রসঙ্গে উল্লেখ্য। তবে ভূদেব মুখোপাধ্যায়ের (১৮২৭-৯৪) ১৮৫৭ সালে প্রকাশিত উপন্যাস অঙ্গুরীও বিনিময় ও সফল স্বপ্নকে এই ধারার প্রথম উপন্যাস হিসেবে ধরা হয়ে থাকে। তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের (১৮৯৮-১৯৭১) রাধা ও গন্না বেগম। পরবর্তীকালে এ-ধারায় লেখা উপন্যাসের মধ্যে অমিয়ভূষণ মজুমদারের (১৯১৮-২০০১) চাঁদবেনে (১৯৯৩ সালে গ্রন্থাকারে প্রকাশ), শওকত ওসমানের (১৯১৭-৯৮) ক্রীতদাসের হাসি (১৯৬২) ও রাজা উপাখ্যান (১৯৭১), সৈয়দ শামসুল হকের (১৯৩৫-২০১৬) আয়নাবিবির পালা, সত্যেন সেনের অভিশপ্ত নগরী (১৯৬৮), বিদ্রোহী কৈবর্ত (১৯৬৯) প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য। সেলিনা হোসেনের নীল ময়ূরের যৌবন (১৯৮২), চাঁদবেনে (১৯৮৪), কালকেতু ও ফুল্লরা (১৯৯২) প্রভৃতি উল্লেখ্য। বাংলা উপন্যাসে ঐতিহাসিক সময়কালকে উপন্যাসের ঘটনাকাল হিসেবে বিবেচনা করে উপন্যাস লেখার বিষয়ে বহু ঔপন্যাসিকের উপন্যাসের সন্ধান বাংলা সাহিত্যে পাওয়া যাবে। যাঁরা ইতিহাস থেকে মিথ ও ঐতিহ্যকে অন্বেষণ করে উপন্যাস রচনা করেছেন, কখনো-বা সেই উপন্যাসের চরিত্ররা বর্তমান সমাজের প্রতিনিধিও বটে। মহাশ্বেতা দেবী নিজেই ইতিহাস আশ্রয় করে বহু উপন্যাস লিখেছেন। কিন্তু তিনি ইতিহাসকে দেখেছেন ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গিতে, ফলে তাঁর উপন্যাসে তিনি রাজ-রাজড়াদের ইতিহাসকে কেন্দ্র করে আখ্যান নির্মাণে ব্যাপ্ত না হয়ে, দলিত শ্রেণিকে ইতিহাসের আলোকে তুলে এনেছেন, যাকে অন্ত্যজ স্বর বলা যেতে পারে। এ প্রসঙ্গে গায়ত্রী চক্রবর্তী বলেছেন, ‘voice from the margin’।২১ দলিতরা কি কথা বলতে পারে? বা গ্রামশি যখন বলেন, কৃষকের পক্ষে কলম ধরবেন কোনো বুদ্ধিজীবীই, তখন আমরা এই উপন্যাসের চিত্রটি আবার ভেবে দেখতে পারি। মহাশ্বেতা দেবীর কবি বন্দ্যঘটী গাঞির জীবন ও মৃত্যু উপন্যাটিতেও ইতিহাস-আশ্রিত রোমান্সের সেই প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কণ্ঠস্বরই স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এ-প্রসঙ্গে পার্থপ্রতিম বন্দ্যোপাধ্যায়ের বক্তব্য প্রণিধানযোগ্য –

মনে পড়ছে, মহাশ্বেতা দেবী, তাঁর এই উপন্যাসটিকে রোমান্টিক বলেছিলেন। ‘রোমান্টিক’ শব্দটি মহাশ্বেতার সমগ্র উপন্যাস জগৎ সম্পর্কে তাৎপর্যপূর্ণ। দুঃসহ বাস্তবের ছবি আঁকার অন্তরালে একটা রোমান্টিক প্রতিবাদ, একটা রোমান্টিক স্বপ্ন মহাশ্বেতার উপন্যাসে জড়িয়ে থাকে, তাই তাঁর অসাধারণ ও সাধারণ নায়ক-নায়িকারা আপাত পরাজয়ের মধ্যেও অন্য মাত্রায় কালোত্তরের সঙ্গী হয়। কথাটা বোধহয় জাঁ পল সার্ত্রে বলেছিলেন, সোশ্যালিস্ট রিয়্যালিজম নয়, দরকার সোশ্যালিস্ট রোমান্টিসিজম। মহাশ্বেতার উপন্যাসে, সেটাই পাই – বাস্তব ও স্বপ্নের, ইতিহাসে, সমূহের সত্য ও ব্যক্তি, উপন্যাসের শৈল্পিক দ্বন্দ্বময় নির্মাণ ক্রিয়ায় তাঁর তাৎপর্যপূর্ণ উপন্যাসগুলি যেন এক রোমান্টিক জাগরণ। কবি বন্দ্যঘটী তারই এক প্রত্ন-প্রতিমা।২২

কবি বন্দ্যঘটী গাঞির জীবন ও মৃত্যু উপন্যাটিতেও ইতিহাস-আশ্রিত রোমান্সের দেখাই শুধু মেলে না, আদি অরণ্যবাসী সমাজের মিথ, ট্যাবু আর টোটেম মিলে রূপক হয়ে ওঠে সমগ্র উপন্যাসে। এখানে মহাশ্বেতা আখ্যান রচনা করেন বিবরণমূলক ভঙ্গিতে; কিন্তু ঘটনা পরম্পরা সুবিন্যস্ত নয়। কাহিনির ধারাবাহিকতা এখানে দেখা যায় না। কাহিনি প্রতিনিয়ত বর্তমান ও অতীতের মধ্যে ডুবে যায়। উপন্যাসের শুরু হয় ভীমাদল রাজ্যের এক শুঁড়িখানার মালিকের   কথকতায়। গোলকশুঁড়ি নামক শুঁড়িখানার লোকটি আর তার মাতঙ্গী যে-মহাদুর্যোগের কথা বলে, তার মাধ্যমে পাঠক জানতে পারেন প্রাচীন বাণিজ্যনগরীর লোকবৃত্তের ইতিহাস। কবি বন্দ্যঘটী গাঞির জীবন ও মৃত্যু তখন ইতিহাসের গল্প হয়ে ফিরে আসে। লেখক আমাদের যে-সময় আর নগরীর কথা বলেন তা ষোড়শ শতাব্দীর। আকবর বাদশার রাজত্বকালে দিল্লির ছত্রচ্ছায়ায় বাংলা এমনকি সারা ভারতে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা করদ সামন্তরাজ্যের কথা। বর্তমানে যাকে মেদিনীপুর জেলা বলা হয়, মধ্যযুগে সামন্ততান্ত্রিক রেওয়াজে সেখানে পাঁচ-ছয়টি রাজ্য ছিল। উপন্যাসে উল্লিখিত রাজা গর্গ বল্লভের ভীমাদল রাজ্যটি ছিল উড়িষ্যার সীমান্তবর্তী এলাকা। যেখানে ভীমাদল ও উড়িষ্যার বোলাঙ্গির অঞ্চলের মধ্যবর্তীতে রয়েছে বিরাট নিদয়া অরণ্য। বন্যপশু আর অন্ত্যজ চুয়াড় জাতি ছাড়া কেউ সেখানে বাস করতে পারে না। এসব অরণ্যবাসী চুয়াড়দের আদিপুরুষ হাতিদের রক্ষাকর্তা এক মুনির সন্তান। তারা অরণ্য ছেড়ে আসে না, যদি কেউ অরণ্য ছাড়তে চায় তবে সে হাতির পায়ে পিষ্ট হয়ে মারা যায়। এইসব অরণ্য চুয়াড় ভীমাদল রাজ্যের রাজার হয়ে যুদ্ধ করতে আসে এবং যুদ্ধশেষে আবার অরণ্যে ফিরে যায়। তারা অরণ্যে স্বাধীনভাবে বাস করে। খুব সমস্যায় না পড়লে রাজার কাছে আসে না। এখানে লেখক বাণিজ্যনগরীর শিল্পায়িত জীবনের সঙ্গে অরণ্যের অধিবাসী আদিম গোষ্ঠীর আখ্যান তুলে আনেন। ক্ষুদ্র হলেও ভীমাদল রাজ্য রূপনারায়ণ নদীবন্দর একটি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যকেন্দ্র হওয়ার ফলে এখানের জনগোষ্ঠী ধনী ও প্রভাবশালী। আর এই সমৃদ্ধির আওতায় আসে রাজার অনুগ্রহভাজন উচ্চবর্গের মানুষজন। সেই সমাজে রাজা হওয়া যতটা সহজ, ব্রাহ্মণ হওয়া ততটা সহজ নয়। সেখানে রাজা গর্গের স্থির বিশ্বাস, বর্ণাশ্রম ধর্মের নড়চড় হলে তার সিংহাসন থাকবে না। এভাবেই ঘটনা সমৃদ্ধ করে মহাশ্বেতা দেবী কবি বন্দ্যঘটী গাঞির জীবন ও মৃত্যু বাংলা সাহিত্যের মধ্যযুগের আখ্যান উপন্যাসে নিয়ে আসেন, যা বাংলা উপন্যাসের ধারায় অপেক্ষাকৃত নতুন সংযোজন। উপন্যাসের এ-ধারাটি সম্পর্কে দেবেশ রায়ের উপন্যাসে নতুন ধরনের খোঁজের একটি বিশ্লেষণ উল্লেখ্য –

ব্রতকথা, পাঁচালি, কথকতা, কীর্তনে আমাদের একটা কাহিনীর ধরন তো ছিল। এগুলোর ছক ছিল বাঁধাছক কিন্তু প্রত্যেকবার প্রত্যেক ব্রতকথা বা পাঁচালিকার বা কথকঠাকুর বা কীর্তনিয়ায় বলার সঙ্গে-সঙ্গে এই কাহিনীগুলি অদ্ভুতভাবে বদলে যেত। এই কাহিনী ভিন্ন কথকের গলায়-ভাষায় ভিন্ন ভিন্ন কাহিনী হয়ে যেত। একই বাঁধা ছকের কাহিনী এমনই অব্যর্থতায় কাহিনীকারের ব্যক্তিত্বের ছাঁচে আরো একবার ঢালাই হয়ে যেত।২৩

মহাশ্বেতার এই উপন্যাসে তেমনি কাহিনিকারের ব্যক্তিত্বের নতুন ছাঁচ পাঠকের মাঝে পরিদৃষ্ট হবে।

উপন্যাসতাত্ত্বিক মিখাইল বাখতিন উপন্যাসের ভাষার খোঁজ করেছেন বহুস্বারিকতার মাধ্যমে বহু চরিত্রের বহু ধরনের ভাষা-সংলাপ লেখকের নিজস্ব বিবরণের সমন্বয়ে। এ-প্রসঙ্গটিকে অনুসরণ করে দেবেশ রায় ব্যক্ত করেছেন, বহু স্বর ও বহু মানুষের মহাসমাগম ঘটিয়েই উপন্যাসের আয়োজন; তিনি বলেন – ‘একই সমাজের বহুস্তরের বাস্তবতাকে কখনো আভাসে, কখনো স্পষ্টতায়, কখনো ইঙ্গিতে, কখনো সংলাপে, কখনো বিবরণে স্পষ্ট করে তুলতেই উপন্যাসের বিশেষ ফর্মের প্রয়োজন হয়েছিল। উপন্যাস কখনো এক স্তর নিয়ে সম্পূর্ণ হয় না, উপন্যাসে মূল ঘটনা শুধু মূল ঘটনায় আটকে থাকতে পারে না।’২৪ দেবেশ রায়ের উপন্যাসবিষয়ক এই ব্যাখ্যার সঙ্গে মহাশ্বেতার কবি বন্দ্যঘটী গাঞির জীবন ও মৃত্যু উপন্যাসটির ঘটনাবিন্যাস ও পট নির্মাণে সাদৃশ্য লক্ষণীয়। মহাশ্বেতা মূলত মঙ্গলকাব্যের প্রতিষ্ঠিত পৌরাণিক কাহিনি, তাদের লোকাচার আর মিথকে নিজস্ব ভঙ্গিমায় উপস্থাপন করে উপন্যাসে নতুন মাত্রা সংযুক্ত করেছেন। লেখক সমগ্র উপন্যাসের শরীর জুড়ে যে লৌকিক বিশ্বাসের ব্যবহারে প্রেক্ষাপট তৈরি করেন। তার কিছু নমুনা তুলে ধরা যাক –

১. কচ্ছপ ডাঙায় ওঠে, ও এমন ঝড়ে শ্মশানের ধর্মঠাকুরের প্রেতসহচররা মুখে আগুন নিয়ে দাপাদাপি করে। এমন ঝড় প্রকৃতির রাজ্যে যখন আকস্মিক কিছু ঘটে, সাধারণত অনেক আগে থেকে তার কোনো কোনো সংকেত কোথাও কোথাও থাকে। যেমন, যে-বছর সুদূর নবদ্বীপে শুভ দোলপূর্ণিমায় গোরাচাঁদ জন্মাবেন, সে-বৎসর ভীমাদল নগরীর গোলকশুঁড়ির পিতামহ এক আশ্চর্য দৃশ্য দেখেছিল। সে একশত চার বৎসর আগের কথা। এখন পনেরো শত এগারো শকাব্দ, তখন চৌদ্দশ’ সাত শকাব্দ। গোলকশুঁড়ি তার শুঁড়িখানায় বসে এখনও গল্প ক’রে থাকে ‘কর্তাদাদা মৈষদল হতে হাঁটাপথে আসতে আসতে স্পষ্ট দেখেছিল, … লীলবন্ন কমল যেন দ’জুড়ে ফুটে রঁইছে। দেখেই তিনি সেথোদের বললে লোনাদহে লীলকমল, ইঁবার জানবি ভোবনে দেবতা উদয় হঁইছে।… এ-কথা বলে গোলক সগর্বে চারদিকে চায় ও বলে, ‘তিনমাস যেতে না যেতে গোরাচাঁদ জন্ম ল্যিলেন।’২৫

২. এ ‘সমুদ্দুরে’ ঝড়কে ভীমাদলের মানুষ বড়োই ভয় পায়।… এমন ঝড় তুফানে চাঁদসদাগরের সপ্তডিঙা রসাতলে যায়। নদীতীরের জালুক পলি­ নিমেষে বিজুবন হয়। জলের কামড়ে বানিয়াজাতির সর্বনাশ। বেনে নৌকা প্রায় ফেরে না ও বেনেবউ ভোররাতে কুস্বপ্ন দেখে জানতে পারে তার আইয়ত আর নেই।২৬

৩. অরণ্যরক্ষয়িত্রী দেবীর সচল প্রহরী তারা, অরণ্যবাসী আদিম চুয়াড় জাতি ছাড়া কেউ হসত্মীবিদ্যা জানে না। চুয়াড়রা হাতি ও নাগ পূজা করে, তাই তারা নির্ভয়ে অরণ্যে বাস করে।২৭

৪. ‘তখন সত্যযুগ ছিল গ’, দেবতার মাহাত্ম্য ছিল কত’ভীমাদলের লোক বলে। এখন নাকি ঘোর কলি। ওদিকে শ্রীচৈতন্য, এদিকে আকবর বাদশাহের প্রভাবে ধন্য ইসলাম, দুই ধর্মই সকল অজাতকে কোল দিয়ে রেখেছে, তাই ব্রহ্মাণ্যধর্মের প্রতাপ কিছু ক্ষুণ্ণ। এখন চাঁড়াল, শবর, সকলেই ইচ্ছে হলেই মাথা মুড়িয়ে বৈষ্ণব হতে পারে, নয়তো কলমা পড়ে মুসলমান, ভীমাদলের লোক বলে ‘এ ঘোর কলি যদি না হবে তবে আর কাকে কলি বুল্যে গ’।২৮

ঔপন্যাসিক উপন্যাসের ভীমাদলের মানুষের বিশ্বাস, লোকাচার এবং ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গির বিনির্মাণের মাধ্যমে পাঠককে রূপনারায়ণ নদের তীরবর্তী লোকবৃত্তের মাঝে টেনে নিয়ে যান। সেইসঙ্গে তাঁর কবির জন্ম বা তাঁর কবির আবির্ভাবের পূর্ব আবহাওয়া তৈরি করেন, যা মূলত কবি বন্দ্যঘটী গাঞির জীবন ও মৃত্যুর অনেক পরে, পুরনো লোককথা হয়ে ফিরে আসে। মহাশ্বেতা দেবী এই আখ্যান নির্মাণে যে-লৌকিক কাহিনি শুঁড়িখানার মধ্যে দিয়ে নিয়ে আসেন সেখানে থাকে চাঁদবণিকের আখ্যান, বর্ণাশ্রিত ধর্মের বিপরীতে বৈষ্ণব ধর্ম ও ইসলাম ধর্মের মাধ্যমে যে-ধর্মীয় গোঁড়ামির প্রতি আঘাত, সেসব কথা যেমন স্পষ্ট; তেমনি ফুটে ওঠে অরণ্যবাসী চুয়াড় সম্প্রদায়ের অবস্থান ও ধর্মবিশ্বাসের মিথ। বাণিজ্যনগরী ভীমাদলের লোকের কাছে রূপনারায়ণ নদের ভয়ংকর রূপটি যেভাবে দেখা দেয় অরণ্যবাসী আদিবাসী সমাজের কাছে তা ভিন্ন আখ্যান হয়ে দেখা দেয়। উপন্যাস থেকেই তা উল্লেখ করা যেতে পারে –

শবর ও অন্যান্য অন্ত্যজ জাত, যারা অরণ্যে থাকে, শিকার আদি আরণ্য বৃত্তি করে বাঁচে, তারা মাতৃকাপূজার রাতে দেবদেবী, নদনদী, পাহাড় পর্বতের বিয়ে, ভাব, ভালবাসা, প্রণয়, প্রতিহিংসা নিয়ে গল্প করে, গান গায়। তাদের কাছে, একমাত্র তাদের কাছে, শিলাবতী নদী ও রূপনারায়ণ নদ প্রণয় ও প্রতিহিংসার ক্রীতদাস জীবন্ত পুরুষ রমণী।২৯

রূপনারায়ণের তীরে ভীমাদল রাজ্যের এমনি নানা বিচিত্র লোককথার মাধ্যমে উপন্যাসের পট নির্মিত। মিথের ব্যবহার, ধর্মের প্রকট উপস্থিতি, আর্থ-সামাজিক চিত্র, চরিত্র-চিত্রণে বিশিষ্টতায় ভীমাদলের লোকবৃত্তের কথকতায় বিচিত্র সমন্বয় এবং সেই সঙ্গে তৎকালীন নারীসমাজের অবস্থান বিশিষ্ট হয়ে ওঠে।

মিথের ও লৌকিকতা নিয়ে নৃ-বিজ্ঞানী জেমস জর্জ ফ্রেজার গ্রন্থ রচনা করে নতুন দিক উন্মোচন করেন, আদিবাসী সমাজের এই মিথ এবং লৌকিকতা নিয়ে এর অতিকথা, লোককথা, লোকাচার-সম্পর্কিত তথ্য ও কাহিনি সংকলন দ্য গোল্ডেন বাও বইটিতে। এটি প্রথম প্রকাশিত হয় ১৮৯০ খ্রিষ্টাব্দে। মিথ আর ম্যাজিকের সুগভীর সমাজ-মানস-সম্ভুত ব্যাখ্যা অনেক সংস্কারের মনস্তাত্ত্বিক দিকটির দরজা খুলে দিয়েছে। মানবচরিত্রের মনের রহস্যের আরো বহুতর দিক যেন আলোয় চলে এল তার ফলে। কবি বন্দ্যঘটী গাঞির জীবন ও মৃত্যু উপন্যাসের ভূমিকায় লেখক উল্লেখ করেছেন যে তিনি –

রাঢ়বাংলার মেদিনীভূমের সাধারণ মানুষের জীবনের এই বিপুল বর্ণাঢ্যতা আমাকে আকৃষ্ট করেছিল। অন্যদিকে, বর্ণশাসিত সমাজের বাইরে যে-অরণ্যবাসী আদিবাসী সমাজ মেদিনীপুরে অনন্তকাল ধরে বাস করছে, যারা ভারতের আদিমতম অধিবাসী তাদের সম্পূর্ণ পৃথক অসিত্মত্ব, দেবোপাসনা, তাদের totem ও taboo, বিশ্বাস-প্রথা-ব্যবহার, চান্দ্রবৎসর গণনা, মাতৃকা আরাধনা, তাদের কথা আমার মনে ছিল।৩০

উপন্যাসসাহিত্যে মিথ একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কারণ মিথ মূলত একটা সমাজের বা সম্প্রদায়ের দীর্ঘদিনের মিশে থাকা লোকাচার বা জীবনবোধের দ্বারা সৃষ্ট উপকথা, আর উপন্যাসে সামাজিকভাবেই ব্যক্তিসত্তাকে উপস্থাপন করা হয়। এ-প্রসঙ্গে জোসেফ ক্যাম্পবেলের মিথবিষয়ক কিছু কথা উল্লেখযোগ্য –

মিথের মূল চিন্তা একই, এবং সবসময় তা একই ছিল। আপনি যদি নিজের মিথতত্ত্ব জানতে চান তাহলে প্রথমে জানতে হবে আপনি কোন সমাজের লোক। প্রত্যেক মিথ বিশেষ জনগোষ্ঠীর বেড়া দেওয়া ক্ষেতে জন্মেছে। এরপর বড় হয়ে তারা অন্য মিথের সঙ্গে মিশতে থাকে, সম্পর্ক হয়, মিশেও যায়, এবং শেষে জটিলতর এক মিথের জন্ম হয়।৩১ তিনি মিথ সম্পর্কে ইউরোপের মিথের যে-কথা বলেন তা এখানে স্মরণযোগ্য –

অভিধান খুললে দেখবেন লেখা আছে মিথ হলো দেবদেবীর গল্প।… দেবতা হলো মানবজীবনের তথা ব্রহ্মা–র এক চলিষ্ণুশক্তি বা নৈতিক মূল্যবোধ। আপনার নিজের শরীর এবং প্রকৃতির নিজস্ব শক্তি। মানুষের জীবনে মিথ হলো আধ্যাত্মিক শক্তির রূপক প্রকাশ। আমাদের জীবনকে যে-শক্তি প্রাণ দেয়, সেই একই শক্তি প্রাণ দান করে বিশ্বের জীবনেও। অবশ্য বিশেষ বিশেষ জনগোষ্ঠীর বিশেষ বিশেষ মিথ আছে, আছে নির্দিষ্ট সংখ্যক উপদেষ্টা দেবদেবীও। অন্য কথায়, ইতিহাসে দুটো সম্পূর্ণ বিপরীত ধারার মিথতত্ত্বের পরিচয় মেলে। একদিকে আছে সেই পুরাণ যা আপনাকে আপনার প্রকৃতি এবং আপনি যার অংশ সেই প্রাকৃতিক জগতের সঙ্গে সম্পর্কিত করে, অন্যদিকে সেই পুরাণ যা একেবারে কাঠখোট্টারকম সমাজতাত্ত্বিক, যা কোনো বিশেষ সমাজের সঙ্গে আপনাকে সম্পৃক্ত করে। আপনি যে শুধু প্রাকৃতিক একজন মানুষ তা তো নন, আপনি এক বিশেষ সম্প্রদায়েরও। এই দুই ধারার যোগাযোগ লক্ষ্য করতে পারেন ইউরোপের মিথতত্ত্বে।৩২

অতএব মিথ যেহেতু ধর্মীয় ও সমাজ সম্প্রদায়ে প্রাকৃতিকভাবে সংরক্ষিত হয়ে সৃষ্টি হয়ে থাকে, তাই মধ্যযুগের ধর্ম-আশ্রিত আখ্যান মঙ্গলকাব্য ও সামাজিক লোকাচার নিয়ে মহাশ্বেতার উপন্যাসে উল্লিখিত আখ্যানগুলোকে মধ্যযুগের মিথ হিসেবেই ধরে নিচ্ছি। উপন্যাসে মহাশ্বেতা দেবী যে টোটেম এবং ট্যাবুর ভেতর দিয়ে আমাদের নিয়ে যান। তেমনি কিছু মিথের কথা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য –

১. এই চুয়াড়রা একলব্যের স্বজাতীয়, বংশপরম্পরায় ধানুকি। ধনুক তাদের একমাত্র অস্ত্র আর এখনো এদের দলপতি হাতের বুড়ো আঙুল কেটে ফেলে। যারা কাটে না তারাও তীর ছোঁড়বার সময়ে ডানহাতের অন্য চার আঙুল মাত্র ব্যবহার করে।৩৩

২. সেই পালকাপ্য মুনির কথা, যিনি হাতিদের সঙ্গে থাকতে থাকতে হাতিদের একজন হয়ে গিয়েছিলেন। একেবারে প্রথমে হাতিরা বুঝি তাঁকে কাছে আসতে দিত না, মানুষের গন্ধকে ভয় পেত, ঘেন্না করত। পালকাপ্য মুনি সর্ব অঙ্গে হাতির মল মেখে থাকতেন, তার থেকে তাঁর গন্ধ আর হাতির গন্ধ এক হয়ে গেল। তাঁর গন্ধ আর হাতির গন্ধ এক হয়ে গেল, হাতিরা তাঁকে ক্রমে সব দেখতে দিল। তাদের মিথুন, তাদের শাবক জন্মদান, তাদের যুদ্ধ, তাদের মৃত্যু।

৩. এক সময়ে ছিল, সব ছিল। মানুষের নখ, দাঁত, বলশালী বাহু, অতিকায় শরীর। বুঝি-বা, যে আদিম মুনিপুত্র হাতিদের রক্ষাকর্তা, তাঁর আকৃতিও সেরকমই ছিল। হিমবাহ ও সাগরের মধ্যবর্তী ভূ-খ– তিনি হাতিদের সঙ্গে বাস করতেন। হাতিরা তাঁকে ঠাকুর বলে জানত এবং নিজ ভাষায় ‘আমাদের ছেড়ে যেও না’ বলে তাঁর অঙ্গে শুঁড় বুলিয়ে কতই মিনতি জানাত। তখন হাতিতে মানুষে প্রেম হতো, প্রণয় হতো, সন্তান হতো। ক্রমে, সভ্য হবার প্রয়োজনে মানুষ তার নখ, দাঁত, হাত, লোম, সিংহের মতো মাথা, সব বিসর্জন দিয়ে বর্তমানে যেমনটি দেখা যায় তেমনি আকৃতি চেয়ে নিল। বনবাশুলী তাকে সব দিলেন, শুধু বললেন ‘এখন হতে তোতে তার পশুতে ভাব-ভালবাসা রইবে না। উ মারবে, তু মরবি। তু মারবি, উ মরবে।’৩৪

৪. হাতিদের সঙ্গে তাদের বহুদিনের মেলবন্ধন। সেইজন্যে এ রাজ্যে নিয়ম, চুয়াড়দল যখনি অরণ্য ত্যেজে আসবে, রাজা গর্গবল­ভকে তাদের অভিযোগ শুনতে হবে। চুয়াড়দল ঘণ্টা, প্রহর, সময়, সুবিধা কিছুই বিবেচনা করে না। আর এক কথা আছে। চুয়াড়দলের কেউ যদি জাত ত্যেজে অরণ্য ছেড়ে আসে, তার মরণ কোনো-না-কোনোভাবে হাতির হাতে।৩৫

মহাশ্বেতা দেবীর আদিবাসী জীবনকেন্দ্রিক উপন্যাসে মিথ সবসময়ই গুরুত্বপূর্ণভাবে ব্যবহৃত হয়েছে। কবি বন্দ্যঘটী গাঞির জীবন ও মৃত্যু উপন্যাসটির ক্ষেত্রেও এই মিথের মাধ্যমে আখ্যানের বয়ান, যে-মিথে হাতির ব্যবহার থেকে সমাজতাত্ত্বিক ইতিহাস বিচারে তা এই ভূ-খ- থেকে উৎসারিত মিথ। ধর্ম ও প্রকৃতির ব্যবহারে এ লোকসংস্কৃতির প্রকাশই স্পষ্ট।

বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে গীতিভঙ্গির বা পাঁচালী নির্মাণ অনেক প্রাচীন আমল থেকেই চলে আসছে, যা সামাজিক আখ্যানের মাধ্যমে নির্মিত হলেও প্রচুর মিথ-মিশ্রিত হয়ে ওঠে সেই আখ্যানসমূহে। তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় কবি উপন্যাসে অন্ত্যজ নেতাইচরণের কণ্ঠে বীণার ঝংকার দেখিয়েছেন, সেখানেও পৌরাণিক মিথের ব্যবহার হয়েছে। আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের খোয়াবনামা উপন্যাসে কাৎলাহার বিলের মুন্সী বয়তুলস্নার মিথকে কাব্যিক ঢঙে উপস্থাপন করা হয়েছে। অভিজিৎ সেনের রহু চণ্ডালের হাড় উপন্যাসে বাজিকরগোষ্ঠীর জীবিকানির্ভর গানে লৌকিকতা আর মিথের ব্যবহার পরিলক্ষিত হয়েছে। দেবেশ রায়ের শিল্পায়নের প্রতিবেদন উপন্যাসের শুরুতেই আমরা মিথের সন্ধান পাই। এইসব অন্ত্যজ শ্রেণির আখ্যান। অন্যদিকে মহাশ্বেতা দেবীর হাজার চুরাশির মা কিংবা ঘরে ফেরাসহ বহু উপন্যাসে মিথের এরূপ ব্যবহার পরিদৃষ্ট নয়। এইসব রাজনৈতিক উপন্যাসের থেকে অন্ত্যজ জনজীবন রচনার ক্ষেত্রে মহাশ্বেতা অনেক বেশি মিথ এবং গীতভঙ্গিমায় আখ্যানকে নিয়ে গিয়েছেন।

তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় রচিত কবি উপন্যাসে আমরা এক নিচু জাতির ডোম থেকে কবি হয়ে-ওঠার কাহিনি পাই। সেখানে পুরাণের কথা উল্লেখ করা হয়, তা নিম্নরূপ –

শুধু দস্ত্তরমত একটা বিস্ময়কর ঘটনাই নয়, রীতিমতো এক সংঘটন। চোর ডাকাত বংশের ছেলে হঠাৎ কবি হইয়া গেল। নজির অবশ্য আছে বটে, – দৈত্যকুলে প্রহ্লাদ। কিন্তু সেটা ভগবৎ – লীলার অঙ্গ। মূককে যিনি বাচালে পরিণত করেন, পঙ্গু যাঁহার ইচ্ছায় গিরি লঙ্ঘন করিতে পারে, সেই পরমানন্দ মাধবের ইচ্ছায় দৈত্যকুলে প্রহ্লাদের জন্ম সম্ভবপর হইয়াছিল; রামায়ণের কবি বাল্মীকি ডাকাত ছিলেন বটে, তবে তিনি ছিলেন ব্রাহ্মণের ছেলে। সেও ভগবৎ-লীলা। কিন্তু কুখ্যাত অপরাধপ্রবণ ডোমবংশজাত সন্তানের অকস্মাৎ কবিরূপে আত্মপ্রকাশকে ভগবৎ-লীলা বলা যায় কি না। সে-বিষয়ে কোনো শাস্ত্রীয় নজির নাই।৩৬

অভিজিৎ সেনের রহু চণ্ডালের হাড় উপন্যাসে অসম যুদ্ধে পরাভূত সাঁওতাল বাজিকরদের আদি পুরুষ ‘রহু’। যার পরাজয়ের গস্নানি থেকে মিথের জন্ম, যা যাযাবর বাজিকরগোষ্ঠীর আত্মবিশ্বাসকে দৃঢ় করে –

রহুর ক্ষত থেকে জলস্তম্ভের মতো উচ্ছৃত হতে লাগলো রক্ত এবং সেই রক্তে প্রবল বন্যায় নদী উঠল ফেঁপে। সেই রক্তের নদী বহিরাগতদের নগরী, দলত্যাগীদের ভূখ- সব গ্রাস করে ধ্বংস করলো। কেবল রহুর অনুগামীরা তার দেহকে আশ্রয় করে ভেসে যেতে থাকে দূর-দূরান্তে। তারা রহুর দেহের অস্থি কয়খানি আশ্রয় করে নতুন পথে পা বাড়ায়।৩৭

তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়-রচিত কবি, অভিজিৎ সেনের রহু চণ্ডালের হাড় এবং দেবেশ রায়ের শিল্পায়নের প্রতিবেদনে মিথের উপস্থিতি আমরা পেয়েছি। তবে তা লেখকের ভাষায় বর্ণিত এই সকল মিথকে কেন্দ্র করেই সমগ্র উপন্যাস আবর্তিত হয়নি। কিন্তু মহাশ্বেতা দেবীর কবি বন্দ্যঘটী গাঞির জীবন ও মৃত্যু উপন্যাসটি জুড়ে মিথের উপস্থিতি দ্বারা আখ্যান পরিচালিত হয়েছে। রাঢ় বাংলার মিথের বৈচিত্র্য সম্পর্কে আমরা ইতিহাসভিত্তিক গবেষণা থেকেও জানতে পারি ওই অঞ্চলের ধর্ম-সংস্কৃতির বৈচিত্র্য সম্পর্কে। গবেষক সোমা মুখোপাধ্যায়ের গ্রন্থ রাঢ়বঙ্গের লোকমাতৃকা থেকে উল্লেখ করা যেতে পারে –

রাঢ় বাংলার মাটি, মানুষ ও সংস্কৃতির সঙ্গে জড়িয়ে আছে মাতৃকা উপাসনা।… তাঁদের সাধারণভাবে তিনটি ভাগে বিভক্ত করা যায়। (১) উর্বরতা ও প্রজনন শক্তির অধিষ্ঠাত্রী দেবী (২) হিংস্র বন্য জন্তুর অধিষ্ঠাত্রী দেবী ও (৩) রোগনিবারণকারী দেবী। এই বিভাগের বাইরেও রয়েছে এমন অনেক দেবী, যাঁরা গ্রামের রক্ষাকর্ত্রীর ভূমিকা পালন করে থাকেন অথবা এমন কিছু অতিপ্রাকৃত শক্তির অধিকারী যাঁদের ঠিকমত তুষ্ট না করতে পারলে বা তাঁরা রুষ্ট হলে ধ্বংস অনিবার্য। আবার অনেক সময় এটাও লক্ষ্য করা গেছে যে, একজন দেবীকে একাধারে উর্বরতা, প্রজনন ও রোগ নিবারণের জন্য পুজো করা হচ্ছে। প্রত্নমানুষের সৃজিত এই দেবীদের নিয়ে বারো মাসে তেরো পার্বণে মাতে রাঢ়ের মানুষ।… রাঢ়ের সর্বাপেক্ষা জনপ্রিয় লৌকিক দেবী মনসা।৩৮

রাঢ়বঙ্গের লোকমাতৃকায় গবেষণালব্ধ এইসব বর্ণাঢ্যের আত্মস্থকরণের একটা প্রতিফলন মহাশ্বেতা দেবীর কবি বন্দ্যঘটী গাঞির জীবন ও মৃত্যু উপন্যাসজুড়ে; কিন্তু তা ঔপন্যাসিকের শিল্প-দক্ষতায় এমন জীবনমুখী আখ্যান হয়ে ওঠে যে, ঘটনা পাঠককে তাৎক্ষণিক বর্তমান হিসেবে চুম্বকের মতো টেনে নিয়ে যাবে শুরু থেকে শেষ অবধি।

যে-কারণেও উপন্যাসটি ব্যতিক্রমী সৃষ্টি। তিনি মধ্যযুগের সেই সাধারণ মানুষের বর্ণাঢ্য জীবন, সেই সঙ্গে বর্ণশাসিত সমাজের বাইরে থাকা অরণ্যবাসী আদিবাসীর সম্পূর্ণ পৃথক অসিত্মত্ব, দেবোপাসনা, তাদের টোটেম ও ট্যাবু, বিশ্বাস-প্রথা-ব্যবহার, চান্দ্রবৎসর গণনা, মাতৃকা আরাধনা, একই ভূখ– পৃথক ধ্যানধারণার জগৎকে জেনে মহাশ্বেতা মুগ্ধ হয়েছিলেন অষ্টম শতকের মাতৃশক্তির শাস্ত্রীয় পূজার আসন পাওয়ার ঘটনায়। তবে তা মধ্যযুগের কাব্য তথা মঙ্গলকাব্যের বিবরণমূলক বৈশিষ্ট্যের দ্বারা আবিষ্ট হয়ে অন্ত্যজ শ্রেণি ও এদেশীয় বর্ণশাসিত সমাজের লোকমানুষের কাহিনি তিনি লিখলেন। এ-প্রসঙ্গে লেখকের বক্তব্য –

ইতিহাসের সময় ও সমাজ পুনর্নির্মিতিতে আমি সহজ ও স্বচ্ছন্দ বোধ করি। বাংলার ইতিহাসের বিভিন্ন সময় নিয়ে কতই তো লিখলাম। চর্যাপদের কাল নিয়ে লিখিনি, কিন্তু অষ্টম শতক থেকে ঊনবিংশ শতকের সমাজ ও মানুষকে নিয়ে অনেক গল্প, কিছু উপন্যাস তো লিখলাম। লোকবৃত্তেই আমার আগ্রহ মূলত কেন্দ্রিত থাকে।৩৯

এ-কথা ঠিক যে, তিনি এই উপন্যাসে লোকবৃত্তকে ভালমতোই উপস্থাপন করেছেন। মিথ আর লৌকিকতার সমন্বয়ে তাঁর চরিত্র নির্মিত। উপন্যাসে রাঢ় বাংলার মিথের উপস্থিতির স্বতন্ত্রতায় পূর্বে উল্লিখিত উপন্যাসে ব্যবহৃত মিথের উদাহরণের আলোকে বাংলা সাহিত্যে মহাশ্বেতা দেবীর মিথের ব্যবহারে বিশিষ্টতা চিহ্নিত করা যেতে পারে। ট্যাবু হচ্ছে একধরনের অলৌকিক নিষেধাজ্ঞা, যা লঙ্ঘন করলে শাসিত্ম হিসেবে মৃত্যুদ- বা কৌম জীবন থেকে নির্বাসন দেওয়া হতো। টোটেম আর ট্যাবু অনেক সময় একসঙ্গে জড়িত থাকে। উত্তর আমেরিকার আদিবাসীদের টোটেম হচ্ছে নেকড়ে। চুয়াড়দের টোটেম এক অর্থে সাপ ও হাতি। এছাড়া মঙ্গলকাব্যে ওই অঞ্চলের আরো ধর্মীয় দেব-দেবীর বৈচিত্র্য উপস্থাপনের সন্ধান মেলে। যেমন মনসার মিথ, একলব্যের মিথকে মহাশ্বেতা ব্যবহার করেছেন এই উপন্যাসে। এই দুটি মিথই পৌরাণিক মিথ। সুধীরচন্দ্র সরকার-সংকলিত পৌরাণিক অভিধানে এর সন্ধান মেলে। যেমন – ‘একলব্য প্রফুল্লমুখে অকাতরে উক্ত অঙ্গুলী (দক্ষিণ হসেত্মর বৃদ্ধাঙ্গুলী) ছেদন করে দ্রোণকে উপহার দেন।… অর্জুন তাঁর ব্যক্তিগত স্বার্থের জন্য এবং দ্রোণাচার্য আর্য-শ্রেষ্ঠত্বের আদর্শ অক্ষুণ্ণ রাখার জন্য অনার্য একলব্যের প্রতিভার বিনাশসাধন করেছিলেন।’৪০

উপন্যাসে উল্লিখিত চুয়াড়দের রাজাকে এখনো দক্ষিণ হসেত্মর বৃদ্ধাঙ্গুলী ছেদন করতে হয়। অরণ্যবাসী আদিবাসীর সম্পূর্ণ পৃথক অসিত্মত্ব, দেবোপাসনা, তাদের টোটেম ও ট্যাবু, বিশ্বাস-প্রথা-ব্যবহার, চান্দ্রবৎসর গণনা, মাতৃকা আরাধনা, একই ভূখ– পৃথক ধ্যান-ধারণার জগৎকে জেনে মহাশ্বেতা উপন্যাসে যথার্থ ব্যবহার করেছেন। আমরা ক্ষেত্রগুপ্তের লোকসৃষ্টির নন্দনতত্ত্ব বইটিতে দেখতে পাই, তিনি লৌকিক-অলৌকিক অর্থে প্রাচীন মিথ আর লোকসৃষ্টির সমন্বয়ের কথা বলেন –

‍‍‍‍‍লোকসৃষ্টির আশ্রয় যে বিষয়গুলি তার মধ্যে প্রাচীন মিথ, সংস্কৃত পুরাণগত ঐতিহ্য, লৌকিক পুরাণ অর্থাৎ মঙ্গলকাব্য বিশেষ স্থান করে নিয়েছে। লোকউৎস যেমন মধ্যযুগের শিষ্ট সাহিত্য-শিল্পকে পুষ্ট করেছে, তেমনি লিখিত সেই সাহিত্য থেকে লোকসৃষ্টি গ্রহণও করেছে প্রচুর।… বিভিন্ন ব্রত ও অন্যান্য সামাজিক আচারের সঙ্গে জড়িয়ে লোকসৃষ্টির বিচিত্র রূপ আমরা লক্ষ্য করেছি। সেগুলি প্রাচীন প্রথা, জাদু, টোটেম, বিশ্বাস প্রভৃতির অবশেষ।৪১

অতএব সেই মধ্যযুগের প্রেক্ষাপটে টোটেম আর ট্যাবুর মাধ্যমে রচিত মহাশ্বেতা দেবীর উপন্যাসটির প্রধান চরিত্র কবি বন্দ্যঘটী গাঞি, যার অন্য পরিচয় কল্হণ। এছাড়া বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র আমরা উপন্যাসটিতে দেখতে পাই, এরা হলো – গোলকশুঁড়ি, রাজা গর্গবল্লভ, মন্ত্রী সুধন্য দত্ত ওরফে হরিশ রায়া, সভাপ–ত মাধবাচার্য ও ফুল্লরা। এছাড়া বেশকিছু অপ্রধান হলেও গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রের মধ্যে অন্যতম মাধবাচার্যের উপপত্নী গুণা, অভয়ামঙ্গলখ্যাত সুলভা চরিত্রটি প্রকৃতি দেবী আর প্রেমিকা ফুল্লরার ছায়ায় নির্মিত হয়ে বেশ বৈচিত্র্যম–ত। এছাড়া উপন্যাসে ভীমাদলবাসী নামে সামগ্রিক সামাজিক চরিত্র্যের সরব উপস্থিতি রয়েছে। মহাশ্বেতা কবি বন্দ্যঘটী গাঞি জীবন ও মৃত্যু উপন্যাসে মিথ এবং লৌকিকতার উপাখ্যান তুলে আনেন চরিত্রের ভেতর দিয়ে সংলাপের মাধ্যমে, গল্পের ছলে। ফলে তা ভিন্নমাত্রায় লোকাচারের আবর্তনে নির্মিত হতে দেখা যায়, যা প্রকৃত অর্থে লোকবৃত্তের কথা। যেখানে উপন্যাসে সাধারণ মানুষের মুখেই লেগে থাকে রসিকতার স্বর, উপন্যাস থেকে উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে – ‘যারা বয়সে তরুণ ও স্বভাবে নকুল, তারা চেঁচিয়ে বলছে, ‘মাসি মাজা হেলিও না গ, মেসো লাই, বিথা হ’লে কে মালিস কব্যে?’৪২

শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত আমরা যার গল্পের মাধ্যমে রোমাঞ্চকর আখ্যানে ডুবে যাই, সে হচ্ছে গোলকশুঁড়ি। সে তার শুঁড়িখানায় যে-মহাদুর্যোগের ঘনঘটায় মদ্যপ নগরবাসীকে একশ চার বৎসর আগের কথা বলতে থাকেন, তা লৌকিকতা আর মিথের প্রাচুর্যতায় বর্ণিত হয়ে ওঠে, সেইসঙ্গে আমরা ভীমাদল রাজ্যের একটি অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটেরও ছবি পেয়ে যাই। বাণিজ্যনগরী ভীমাদলে শুঁড়িখানার ব্যবসা এবং বনিতাদের উপস্থিতি অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির ইঙ্গিত বহন করে। যেখানে গোলকের ছেলে বারবনিতার ঘরের আঙিনায় প্রণয় প্রতিদ্বন্দ্বীর হাতে প্রাণ হারায়। সামাজিক ব্যবস্থাপনা বেশ বিশৃঙ্খলিত। গোলকশুঁড়ি নিজেও মাতঙ্গী নিয়ে বাস করেন। তার ব্যবসার প্রসারের জন্য বারবনিতাকে ব্যবহার করে সমৃদ্ধি বাড়ান। মদ খাইয়ে ব্যবসায়ীদের গেঁজের কড়ি বের করে গোলকের পিতামহ অনেক ধন সঞ্চয় করেছিল। যার অবস্থার সঙ্গে-সঙ্গে ভীমাদলের নগরীর শ্রীবৃদ্ধি পেয়েছিল, সেই পিতামহের শিক্ষায় প্রশিক্ষিত ছিল গোলক। গোলকের চরিত্রের কিছু দিক সম্পর্কে উল্লেখ্য –

‍ইচ্ছে করে তাদের এখানে নিয়ে আসে, মদ খাইয়ে বিবশ করে সোনা রূপো যা পায় কেড়ে-কুড়ে নেয়। ভাঁটিখানায়, মশালের আলোয়, অচৈতন্য বিদেশিকে উলঙ্গ করে কাপড় ঝেড়ে যা পায় কেড়ে নিতে ইচ্ছে করল। একসময়ে গোলক, এক আরাকানি মগ ও তার হাবশি সঙ্গীকে পেটে ছুরি মেরে রূপনারায়ণে ভাসিয়ে দিয়েছিল। …মুখ আকাশের দিকে তুলে কফ বসা গলায় গোলক হা-হা করে কাঁদে। দুশ্চরিত্র, বেশ্যাদের ভাড়া করা উপপতি, প্রিয়দর্শন ছেলের কথা ভাবলে তার বুক ফেটে যায়, পাঁজরায়-পাঁজরায় তুফান বয়ে যায়, মনে হয় হাড়ের খাঁচার মাঝখানটি মাঠের মধ্যে পরিত্যক্ত শ্মশানের চালাঘর যেন। গোলকের এ-শোক সত্যি, কিন্তু আরো সত্যি তার অর্থপিপাসা। বিপন্ন মানুষকে অসহায় করে নিঃস্ব করে নেবার অভ্যাস তার পিতামহ তার রক্তে পুঁতে দিয়েছে।… এ ঝড়ের রাতে তার মুণ্ডাঘাটে গিয়ে বিপন্ন বণিকের সন্ধান করতে ইচ্ছে হল।৪৩

এরূপ অর্থপিপাসু এবং নৃশংস গোপালের মাধ্যমে মহাশ্বেতা আমাদের আরো নিষ্ঠুর এক চরিত্রের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন। ‘গর্গরাজার চেয়ে হরিশ রায়া অধিক নিষ্ঠুর’৪৪। তার মানে রাজা গর্গ যে নিষ্ঠুর সেই সাথে তার মন্ত্রী হরিশ রায়া আরো নিষ্ঠুর, তা লেখক আমাদের চরিত্র-পরম্পরায় উপস্থাপন করেন। রাজ চণ্ডাল হরিশচন্দ্র থেকে এই নাম। বর্ণমিশ্রিত হবার ইঙ্গিত এখানে মেলে। তার নিষ্ঠুরতার সঙ্গে পরবর্তী সময়ে কবি বন্দ্যঘটীর চুয়াড় পরিচয় প্রকাশ এবং শাসিত্ম বিধানের ক্ষেত্রে হরিশ রায়ার মধ্যে এক অস্থিরতার আবির্ভাব ঘটিয়ে মহাশ্বেতা চরিত্রটিকে রহস্যময় করে তোলেন। উপন্যাসের ভাষায়, ‘এখন হরিশ রায়ার বুকে যেন বাতাস আটকে যেতে থাকল। হায় মা কালীকে! এমন অপরাধীকে দেখে বুক ফাটে কেন?…’ হরিশ রায়া বললেন, ‘আমার হাতে ক্ষমতা থাকলে আমি জঙ্গলে খেদা করতাম, মারতাম না!’৪৫ এখানে হরিশ রায়ার চরিত্রে দ্বৈতসত্তার বিকাশ ঘটিয়েছেন ঔপন্যাসিক। তা বোধকরি সে চণ্ডাল বলেই লেখক অবচেতন সহমর্মিতার রেশ নিয়ে এসে অন্ত্যজ শ্রেণির একাত্মবোধের একটা লক্ষণ পরিস্ফুটিত করে তোলেন। কিন্তু গর্গরাজের স্থির বিশ্বাস ছিল, বর্ণাশ্রম ধর্ম এতটুকু এদিক-ওদিক হলে তাঁর সিংহাসন টলে যাবে। সমাজব্যবস্থা রসাতলে যাবে, রাজার শাসন সুদৃঢ় থাকবে না। রাজার মনে পড়ে স্থানীয় এক ভূস্বামী কালী খাঁর দৃষ্টান্ত। অন্ত্যজ জাতিকে আপন করে ভাই বলে ডেকে, শেষে তাদের হাতেই প্রাণ দিয়েছিল। তাই রাজা গর্গ যথেষ্ট সচেতন, বর্ণাশ্রম ধর্মব্যবস্থা রক্ষা করতে। রাজার রাজ্যে সব আছে, কিন্তু রাজার দুঃখ তাঁর রাজ্যে কোনো কবি নেই। মহাশ্বেতা খুব স্বাভাবিকভঙ্গিতেই রাজার এই দুঃখের প্রকাশ ঘটান। উপন্যাসের প্রেক্ষাপটে মধ্যযুগ। যে-সময় বাংলা কাব্যের স্বর্ণযুগ। বৈষ্ণব পদাবলী, চৈতন্য চরিতামৃত, মঙ্গলকাব্য, মৈমনসিং গীতিকা ইত্যাদির যুগ। চ-ীদাস, কৃষ্ণদাস কবিরাজ, এমনকি কবিকঙ্কণ মুকুন্দরাম প্রমুখের নামের সঙ্গে সঙ্গে তাঁদের রাজাদের
কথাও ঘুরে ফেরে। নিজের কৃতিত্বকর্ম বা রাজ্যের কথা প্রচারের কোনো কবি দেশে নাই। তাই এক দুর্যোগের রাতে ঈশ্বরের আশীর্বাদে কবি বন্দ্যঘটী গাঞি ভীমাদলে এলে রাজা তাকে পুত্রাধিক স্নেহ করলেন। অল্প কিছুদিনের মধ্যেই কবি অভয়ামঙ্গল রচনা করে সাড়া ফেলে দিল। রাজা তাকে সর্বোচ্চ সম্মান দিতে প্রস্ত্তত, তখনই ঘটল অঘটন। সে-বিষয়ে যাওয়ার আগে উপন্যাসের অন্যতম চরিত্র মাধাচার্যকে আরো একটু জানার দরকার। যাকে আমরা দেখতে পাই রাজার প্রকৃত সহযোগী হিসেবে। শেষ পর্যন্ত সে নিষ্ঠুরতায় হরিশ রায়ার চেয়েও ভয়ঙ্কর প্রমাণিত হয়। সেই মাধাচার্য, অনেক বছর আগে দুর্ভিক্ষের কালে নিঃস্ব অবস্থায় সপরিবারের ভীমাদলে এসেছিলেন। তারপর বর্ণাশ্রিত ধর্মকে আরো অমানবিকতার পক্ষে ধর্মীয় বিধান দিয়ে রাজার প্রিয় হয়ে ওঠেন। প্রভাব, প্রতিপত্তি, ধন-সম্পদ করে ভীমাদলের ক্ষমতাধর ব্যক্তি তিনি। উপন্যাসের ভাষায় তাঁর এই অবস্থানটিকে যেভাবে তুলে ধরা হয় তা বিশেষভাবে উল্লেখ্য – ‘দুর্ভিক্ষের কুকুর যেমন মরা খেয়ে মোটা হয়, মাধবও তেমনি ক্ষমতা-প্রতিপত্তির মাদক পান করে স্ফীত হতে থাকলেন।’৪৬ পাপীকে শাসিত্ম দিতে তিনি রাজা ও হরিশ রায়ার চেয়েও তৎপর ছিলেন। সে-প্রয়োজনে নিজের মেয়ের হত্যাকারীও হতে পারেন। মহাশ্বেতা উপন্যাসের চরিত্র-পরম্পরায় যে-প্রেক্ষাপট নির্মাণ করেন, তা ঘটনার ঘনঘটায় পরিপূর্ণ হয় চরিত্রদের মাধ্যমে। আর সেই বিসত্মৃতিময় আখ্যানের বুক জুড়ে মিথ আর লোককথার বুননে একেবারেই ভিন্নতর আখ্যান হয়ে ওঠে। উপন্যাসের নায়ক তথা উপন্যাসে যাকে নিয়ে ঘটনার সমস্ত বিস্তার, সেই কবি বন্দ্যঘটীর চরিত্রটি নানাভাবে ফুটিয়ে তোলেন মহাশ্বেতা দেবী। বাংলা সাহিত্যে কবির আখ্যান নিয়ে অনেক উপন্যাস রচিত হয়েছে। এগুলোর মধ্যে তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের কবি (১৯৪৪), হুমায়ূন আহমেদের কবি (১৯৯৬) এবং হুমায়ুন আজাদের কবি কিংবা দ–ত অপুরুষ (১৯৯৯)। কবি উপন্যাস রচনা প্রসঙ্গে হুমায়ুন আজাদ বলেন, ‘বাংলা সাহিত্যে প্রকৃত কবিদের নিয়ে উপন্যাস শুধু আমিই লিখেছি, অন্যরা লিখেছে কবিয়ালকে নিয়ে।’

উপন্যাসে কবি প্রসঙ্গে বিস্তারিত এবং তুলনামূলক আলোচনা পরবর্তীকালে বিশদভাবে করার আছে, তা হয়ত এই উপন্যাস আলোচনায় সম্ভব নয়। তবে হুমায়ুন আজাদের এই বক্তব্যের খানিকটা সত্যি বলে উল্লেখ করা যায়। যেমন তারাশঙ্করের কবি নিতাই চরণ এবং মহাশ্বেতার কবি বন্দ্যঘটী গাঞি দুজনকেই কবিয়াল বললে ভুল হবে না। অন্যদিকে হুমায়ূন আহমেদের কবির কবি-স্বীকৃতি ঔপনাসিক নিজেই প্রতিষ্ঠিত করেননি। তবে হুমায়ূন আহমেদের ‘কবি’ ও হুমায়ুন আজাদের ‘কবি’ দুজনই ইতিহাস থেকে উৎসারিত নয়, বর্তমান সময়ের কবির ছায়া তাদের মধ্যে প্রকট। এরা মধ্যবিত্ত জনগোষ্ঠীর মানুষ এবং শহুরে। অন্যদিকে আমরা অন্ত্যজ শ্রেণির কবি হওয়ার কাহিনি দেখতে পাই তারাশঙ্করের কবি উপন্যাসে। সেলিনা হোসেনের নীল ময়ূরের যৌবন উপন্যাসে চর্যাগীতিকার কবিদের তুলে আনতে দেখা যায়। অষ্টম থেকে দশম শতাব্দীর মধ্যে চর্যাগীতিকার পটভূমিতে নির্মিত নীল ময়ূরের যৌবন উপন্যাসে অন্ত্যজ শ্রেণির কবি কাহ্নুপাদ স্বপ্ন দেখত স্বাধীন ভূখণ্ডের, যেখানে ব্রাহ্মণদের প্রবল নিপীড়ন থাকবে না, তার মুখের ভাষা হবে রাজদরবারের ভাষা। সে অত্যাচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী হয়, ফলে তার দুহাত কেটে নেওয়া হয়। প্রেমিকা ডোম্বিকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে রাখা হয়। তাদের পল্লিতে আগুন লাগানো হয়। সবাই পাহাড়ের পাদদেশে পালিয়ে যায়। যেখানে উপন্যাসের শেষে সেলিনা হোসেন কবি কাহ্নুপাদের স্বপ্নকে তুলে ধরেন নিম্নরূপে –

কাহ্নুপাদ দম নিয়ে আবার বলে, একটা ছোট্ট ভূখন্ড আমাদের দরকার। সে-ভূখ-টুকু সবুজ, শ্যামল আর পলিমাটি ভরা হলেই হয়। সে-ভূখণ্ডের দক্ষিণে থাকবে একটা সুন্দর বিরাট বন আর তার পাশ দিয়ে বয়ে যাবে সাগর। কাহ্নুপাদ থামতেই দেশাখ চেঁচিয়ে ওঠে, আহ্ কানুদা কেমন করে যে মনের কথা বলো। তুমি না থাকলে আমরা স্বপ্ন দেখতেই পারি না। তখুনি চামড়া-পোড়া গন্ধটা বাতাসের প্রবল ঝাপটায় ওদের সবার নাকেমুখে গলগলিয়ে ঢোকে। সে-গন্ধ প্রাণভরে বুকে টেনে হো হো করে হেসে ওঠে ভুসুক, কাহ্নিলা রে আজি ভুসুক বঙ্গালী ভইলী।৪৭

সেলিনা হোসেনের কবি এবং মহাশ্বেতার কবি দুই কবি-চরিত্র সৃষ্টির ক্ষেত্রে মঙ্গলকাব্য ও পৌরাণিক কাহিনির ব্যবহার দেখতে পাওয়া যায়। অন্যদিকে তারাশঙ্করের কবি উপন্যাসে কবি নিতাইচরণ ডোম শ্রেণি থেকে উঠে এসে কবিয়াল হওয়ার স্বপ্ন দেখে এবং ঘটনাচক্রে সে কবি ও কবিয়াল হয়ে যায়। নিতাইয়ের বংশগত চোর-ডাকাতের পেশাকে সে গ্রহণ করে না, ফলে তাকে তার সমাজ ছেড়ে আসতে হয়। কবি নিতাই চারণ কবি হয়ে-ওঠার সঙ্গে-সঙ্গে প্রেমিকও হয়ে যায়। তাঁর প্রথম প্রেম ঠাকুরঝি যে তার কবিতার পঙ্ক্তির উৎসদাত্রীও বটে, কিন্তু ঠাকুরঝি অন্যের বউ বিধায় নিতাই তাকে কাছে টানতে পারে না। বিরহের সময় সে যুক্ত হয় ঝুমুর দলের সঙ্গে। সেখানে বসন্ত নামের বনিতার সঙ্গে তাঁর প্রেম হয়। সেইসঙ্গে বাড়তে থাকে কবিখ্যাতি। কিন্তু নিতাইচরণ কবি হয়েও প্রেমের কাছে পরাজিত এক পুরুষ হয়ে দেখা দেয়। কবি উপন্যাসের শেষে তাই কবি নিতাইচরণের কণ্ঠে আমরা শুনতে পাই সেই গান –

এই খেদ আমার মনে –

ভালবেসে মিটল না সাধ, কুলাল না এ জীবনে!

হায় – জীবন এত ছোট কেনে?

এ ভুবনে?৪৮

সেলিনা হোসেনের নীল ময়ূরের যৌবন উপন্যাসের কবিও বর্ণাশ্রম ধর্মের দ্বারা নির্যাতিত, নিজস্ব ভাষা রক্ষা ও ভূখ–র জন্য প্রতিবাদী হয়ে করুণ পরিণতি লাভ করে। ঔপন্যাসিক এখানে কবি কাহ্নুপাদ ও ভুসুকুর মধ্যে কবিখ্যাতির চেয়েও দেশ-জাতির প্রতি আবেগ বেশি প্রকাশ করেছেন। কবি আখ্যানের মাধ্যমে সেলিনা হোসেন বাংলাদেশের ভূখ–র চিত্র আঁকেন, ভাষা আর ভূমির অধিকারের স্বরের ভেতর দিয়ে। অন্যদিকে তারাশঙ্করের অন্ত্যজ শ্রেণির নিতাইচরণ কবিখ্যাতি পেয়েও নিজ ভূখ– ফিরে আসে প্রেমের টানে। তার জীবনবোধে ফুটে ওঠে মানুষের জীবনের ক্ষণস্থায়িত্বের আক্ষেপ, তবে তা কবিখ্যাতি অর্জনের জন্য নয়, প্রেমিকা হারানোর বেদনায়। মহাশ্বেতা তাঁর কবিকে তুলে আনলেন স্বজাতি, স্বভূমি ত্যাগ করে কবি হতে এসেছে এবং সে নিজেই স্বঘোষিতভাবে দ্বিতীয় জন্মগ্রহণ করেন। এক্ষেত্রে তারাশঙ্করের কবির সঙ্গে মহাশ্বেতার কবির শিল্পাকাঙক্ষার মিল অনেক বেশি। এবং এই দুই কবিই কবি হওয়ার অপরাধে স্বজাতির কাছে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত। তারা উচ্চাকাঙক্ষীও বটে। সেলিনা হোসেন, তারাশঙ্কর ও মহাশ্বেতা – তিন কবিই সেই অন্ত্যজ শ্রেণির থেকে কবি হয়ে-ওঠার সংগ্রামে ব্যাপ্ত থেকেছে এবং তাদের করুণ পরিণতি ঘটে।

মহাশ্বেতা দেবীর কবি বন্দ্যঘটীর মধ্যে বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর যেমন ফুটে ওঠে, তেমনি উচ্চ-আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে ফুটে ওঠে কবি ও প্রেমিক সত্তা। অন্যদিকে তাঁর-রচিত কবি অরণ্যচারী একেবারেই প্রান্তিক মানুষ। যে বন্দ্যঘটী গাঞি এক দুর্যোগের রাতে স্বপ্নদ্রষ্ট হয়ে পাঞ্চালী রচতে হাঁটতে-হাঁটতে ভীমাদলে আসে। যে-কবি জানায় সরস্বতীর পূজাতে কোনো সম্পদ লাগে না, তাই সে দীনদরিদ্র কবি বন্দ্যঘটী গাঞি হিসেবে নিজের পরিচয় দেয়। এবং সে জানায়, ওই নামে তাকে পাঞ্চালী রচনা করতে হবে। মহাশ্বেতা দেবী এখানে অন্ত্যজ চুয়াড় যুবক থেকে একেবারেই শিল্পী নির্মাণের লক্ষ্যে তাঁর কবিকে উপস্থাপন করেন। যার মাঝে লেখক সেই সমাজের শ্রেণিবৈষম্যকে চিত্রিত করেন, উপন্যাসের কবির ভাষায় সংলাপে তা ফুটে ওঠে – ‘যুবক বলেছিল ‘জন্মকালে সভের মত আমিও রক্তের দলা মাত্র ছিলাম। সে অবস্থায় নাম আসে না। নাম আসে পরে। ঈশ্বর মানুষ সির্জায়, মানুষ নাম সির্জায়। নাম বস্ত্রের মত, আভরণ অলঙ্কারের মত হে, অঙ্গে তুললে তবে ওঠে। অধম এ নাম সে ভাবে নিয়েছে, মহাজন হে, অবধান কর।’৪৯ রাজা তাকে রাজকবি বলে মানসম্মান দেবেন। কত ভূমি, কত সোনা, কত গাইবলদ, কবির সর্বাঙ্গে সোনার গহনা। সুখসমৃদ্ধির আশা এমনই কুহকিনী হয়ে কবির অঙ্গে নাচন তুললেও মহাশ্বেতা তাঁর ভেতরের কবির অহঙ্কারও সমভাবে তুলে ধরেন। তাই তো কবির প্রেমিকার মুখে শোনা কথা – ‘লিখবেন তিনি, অজস্র পুঁথি লিখবেন! দামুন্যার মুকুন্দরামের কী আর ক্ষমতা! কৃষ্ণদাস কবিরাজের কী বা খ্যাতি! চ-ীদাস প্রেমের কথা কী লিখতে পারে। কবি বন্দ্যঘটী গাঞি তাদের চেয়ে, তাদের সকলের চেয়ে বড়ো হবেন।’৫০

কবি যখন তার স্বপ্নে কাছাকাছি কুহকাচ্ছন্ন তখনই ঘটে বিনা মেঘে বজ্রাঘাত। একদল অরণ্যবাসী, অন্ত্যজ চুয়াড় সভায় এসে কবিকে নিজেদের লোক বলে দাবি করে। চুয়াড়দের রাজা মারা গেছে, কবির আসল নাম হচ্ছে কলহন। সে চুয়াড়দের শ্রেষ্ঠ পুরুষ, তারা তাকে রাজা বানাতে ফিরিয়ে নিতে এসেছে। অন্যদিকে ভীমাদল রাজ্যে শুরু হয় কবির এই আত্মপরিচয় গোপন করে কবিখ্যাতি পাওয়ার বিষয়ে তোলপাড়। শূদ্র হয়ে কলম হাতে নেওয়ার জন্য কবির মৃত্যুদ- স্থির হয়। এদিকে রাজা না হলে চুয়াড়রা কবিকে হাতির পায়ের তলায় পিষ্ট করে মারতে চায়; অন্যদিকে মিথ্যা ব্রাহ্মণ হওয়ায় জন্য রাজদরবারে ফাঁসির আদেশ। তারাশঙ্করের কবি উপন্যাসে আমরা দেখতে পাই যেদিন নিতাইচরণ প্রথম কবিয়াল হয়ে ওঠে, সেদিনও নিতাইয়ের ডোমপাড়ার ভেতর দিয়ে যাওয়ার সময় নিজের ঘরের দিকে তাকিয়ে যখন আস্তানার উদ্দেশে পা বাড়িয়েছিল, স্বজাতির ক্রোধের মুখে পড়তে হয় তাকে। সেখানকার বর্তমান কুলাধিপতি নিতাইয়ের মামা যে নৈশাভিযানের দলপতি, সে অতর্কিতে এসে নিতাইয়ের টুঁটি চেপে ধরেছিল। বিষয়টি উল্লেখ্য –

তোর বাবাকে দাদাকে গাল খাওয়ালি, খাওয়ালি – আমার বাবাকে দাদাকে গাল-খাওয়ালি ক্যানে আসরের মধ্যেখানে? শুয়োরের বাচ্চা শুয়ার!… কিন্তু সে কবিগান করিলেও মামারই ভাগিনেয়, ওই বংশরই সন্তান। দেহে শক্তি তাহারও কম নয়। তার ওপর প্রথম জোয়ান বয়স। সে দুই হাত দিয়া মামার হাত খানা টানিয়া ধরিল। পরমুহূর্তে রাজন আগাইয়া আসিল – ছোড়ো -! আমার হত্যা করিবার সংকল্প ছিল না। ইচ্ছা ছিল শাসনের। তাই নিতাইয়ের গলা ছাড়িয়া দিয়া কথা বলিল – যাঃ! আর এ-পাড়ার পথ মাড়াবি না। মহাদেব কবিয়াল ওই একটা কথা ঠিক বলেছে। আঁস্তাকুড়ের অঁটো (এঁটো) পাতার স্বগগে যাবার আশা গো! – বলিয়া সে যেমন অতর্কিতে আসিয়াছিল, তেমনিই চকিতে ছাড়িয়া দিয়া চলিয়া গেল।৫১

কিন্তু মহাশ্বেতার কবি বন্দ্যঘটী বর্ণাশ্রিত ধর্ম শাসনের দ্বারা পরিবেষ্টিত সমাজে নিজেকে কবি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছে। তার পরিণতি ভয়ংকর হওয়ারই কথা। কারণ রাজার মনে ভয়, সভাসদের মনে ভয় এই যে, অন্ত্যজ শ্রেণি তখন আর ব্রাহ্মণদের মানবে না, নিজেদের অসিত্মত্বের ভয়ের কারণেও তারা কবিকে শাসিত্ম দিতে উদ্যোগী হয়ে ওঠেন। ঔপন্যাসিক যেভাবে বিষয়টি উপস্থাপন হয় – ‘ইতর জেত মাথায় চড়বে, অধমজাত বোলবে আমাদের সমাজের মানুষ যদি পুঁথি পাঞ্চালী লিখে তাহলে আমাদের চেয়ে তোমরা বড় কিসে? ই থেকে সর্বনাশ হবে হরিশ রায়া, প্রজা ত্যাখন রাজা চাইবে। তিওর কেওট বেবসা করতে যাবে, হাড়ীমুচি পাঞ্চালী লিখতে যাবে, সমাজের সে মহাসর্বনাশ হবে হে!’৫২

এইসব অভিযোগ আর অবিচারের বিরুদ্ধে মহাশ্বেতা দাঁড় করান তাঁর নায়ককে। কবি বন্দ্যঘটীর দ্বিতীয় জন্মকে ঔপন্যাসিক মানুষের মানবিকতা এবং শ্রেণিকরণের বিরুদ্ধে উচ্চারিত করে তোলেন। চুয়াড় সমাজ থেকে কবি বন্দ্যঘটী গাঞি হওয়ার জন্যে তাঁকে অনেক পথ হাঁটতে হয়েছে। গোষ্ঠীপতির ভাইপো কলহনকে কত বঙ্কিম, পিছল পথ হেঁটে আসতে হয়েছে। বত্রিশ নাড়ির বাঁধন খুলতে কত কষ্ট করতে হয়েছে, তাকে কেউ জানে না। এসব কষ্ট পেরিয়েই সে কবি বন্দ্যঘটী গাঞি হয়েছিল; কিন্তু তার সে-যুদ্ধের শেষ হয় না। এমন কবিদের যুদ্ধ, বঙ্কিম পথ সেলিনা হোসেন নীল ময়ূরের যৌবন উপন্যাসে দেখিয়েছিলেন, কাহ্নুপাদ আর ভুসুকুর মাঝে। ‘স্বজাতির চামড়া-পোড়া গন্ধ প্রাণভরে বুকে টেনে হো হো করে হেসে ওঠে ভুসুক, কাহ্নিলা এও আজি ভুসুকু বাঙ্গালী ভইলী।’৫৩

এমনকি খ্রিষ্টীয় ষোড়শ শতাব্দীতে লিখিত মুকুন্দরাম চক্রবর্তীর চ-ীমঙ্গল কাব্যে ব্যাধ কালকেতু নিজের সম্বন্ধে এই প্রকার পরিচয় দিয়েছিল –

অতি নীচ কুলে জন্ম জাতিতে চোয়াড়।

কেহ না পরশ করে লোকে বলে রাঢ়।৫৪

কিন্তু মহাশ্বেতার কবি বন্দ্যঘটী স্বজাতিকে ত্যাগ করে, নতুন জন্ম নেয়। তাই রাজদরবারের একজন কবির আত্মপক্ষ বিশ্লেষণ হয়ে ওঠে এভাবেই –

হ্যাঁ, একদিন আমি ওদের কল্হন ছিলাম। ভুবনে আমার স্থান খুঁজতে যাই বোলে চলে এসেছিলাম। কিন্তু আমি মানুষের সমাজে কোন দোষে দোষী হলাম সেইটি বোল মহারাজ।… তোমরা যত শুধালে নাম বোল, ধাম বোল, পিত্তিপুরুষের পরিচয় বোল, আমি বোলি নাই এ নামে আমাকে অভয়া পাঞ্চালী রচতে হবে, তা বিনে আমার মুক্তি নাই?… মিথ্যা আমি বোলি নাই হে রাজা। আমি জন্মসূত্রে ব্রাহ্মণ নই বোলে দেবী মিথ্যা? স্বপ্নাদেশ মিথ্যা? আমার অভয়ামঙ্গল মিথ্যা?… আমি তবে আপনাদের সবাইকে শুধাই, জন্ম পাঁকে হলে মানুষ পাঁকে পড়ে থাকবে?… পৈতে পরালে তোমার পৌত্রের দ্বিতীয় জন্ম হয় সে দ্বিজ হয়। দ্বিজ সে-ই যার দুবার জন্ম হয়। পাখ্-পক্ষীকে, নাগ-নাগিনীকে ত তোমরা প্রথমে ডিম হয়ে জন্মায় বোলে দুষ না? মুক্তাকে শুধাও না আগে কেন ঝিনুক হয়ে জন্মালি? আমি চুয়াড় নই, আমি কবি বন্দ্যঘটী গাঞি, অভয়াসেবক, এ পরিচয় আমার দ্বিতীয় জন্ম, সেটি কি তোমরা কেড়ে নিতে পার?… ধনজন মাঙ্গি নাই হে! অন্য জন্মে যাব, অন্যরকম হব, সেই আকাঙ্ক্ষায় আমি ভীমাদলে আসি। …মাতংবুঢ়া, তুমাদের উ সমাজে আমি ফির‌্যে যেতে লারব।… বিধাতা আমায় চুয়াড়দের কুণকের মাপে গড়ে নাই,… তোমাদের কুণকের মাপে গঢ়ে নাই। তখন মনে জানলাম আমার মত মানুষই সময়ে আসবে হে রাজো! সবচেয়ে মানুষ সত্য, ই কথা শুন নাই?৫৫

মানবতার পক্ষে বুদ্ধিদীপ্ত যুক্তি খ-নের পরও কবি বন্দ্যঘটী গাঞির মুক্তি মেলে না। ঔপন্যাসিক কবির প্রতি নিষ্ঠুর হলেও তৎকালীন সমাজব্যবস্থার স্বচ্ছতা বজায় রেখেছিলেন বলা যায়। ভীমাদলের মানুষজনের যে-চিত্র আমরা পাই, তার কিছু উদাহরণ নিম্নে উপস্থাপন করা হলো –

সকলে উলস্নাসে অস্থির হয়ে উঠেছিল। মানুষ, যত দুঃখে, যত দুরবস্থায় থাকুক না কেন, অপরের নির্যাতন দেখে নিজের অবস্থা ভুলে যায়। উন্মুক্ত রাজপথে অপরাধীর মু-চ্ছেদ দেখতে সবাই বড়ো ভালবাসে। কালীপূজার শতাধিক মহিষ বলির বীভৎসতা দেখে উলস্নাসে নাচে। তাই চোয়াড় বালকের আর্তনাদে কেউই বিচলিত হয়নি। বরঞ্চ আনন্দ করে বলেছিল ‘অজন্মার সনে’ কতজন না খেঞে মর‌্যে, তু বেটা সগ্যে যেঞে উঠবি, চিলস্নাস কেনী?৫৬

এমন নিষ্ঠুরতাকে এই সমাজের মানুষ এত সহজে সংস্কারে বেঁধে নিয়েছে। কবিচোখে এ-সমাজের মানুষের যে-চিত্র মহাশ্বেতা দেবী তুলে ধরেন –

তিনি দেখলেন সভার মানুষ সবাই নির্বোধ, নির্বিকার। তারা শুধু বোঝে শূদ্রের এতোবড়ো স্পর্ধা? এর শাসিত্ম দিতেই হবে। দেখলেন এদের কাছে কবির কাব্য, প্রেমিকের প্রেম, কিছুই কিছু না। এরা সব কিছু থেকে তামাশাটুকু বেছে নেয়। কবি যখন কাব্য লিখলেন তাতেও এরা মজা পেল। কবির প্রাণদ- হয়, তাতেও এরা মজা পাবে। কবি আর ফুল্লরার প্রেম, তা দেখেও এরা মজা পেত। সেই প্রেম যে ধুলোয় লুটোয়, তাতেও এরা মজা পাবে। এই সব মানুষকেই তিনি তাঁর কাব্যে অমর করেছেন! এই সব নির্বোধ, বর্বর, অজ্ঞ মানুষকে?৫৭

এই নির্বোধ আর বর্বর জাতির কথা কবি অভয়ামঙ্গলে লিখেছেন। কিন্তু নিজের জাতির কথা লেখেননি, এই না লেখার পেছনেও লেখক উপস্থাপন করেন কিছু সংস্কারের চিত্র। যদিও এরাই শেষ পর্যন্ত কবিকে কিংবদন্তি করে তোলে, কবির দ্বিতীয় জন্ম দেয় কিন্তু তা কবি দেখতে বা শুনতে পায় না। সে বিষয়ে যাওয়ার আগে চুয়াড় ও ভীমাদল রাজ্যের আরো কিছু বিষয় উপন্যাসের নির্মম পরিণতির সঙ্গে যুক্ত হয়। প্রথমত কবি বন্দ্যঘটী গাঞির এই স্বজাতি বিরাগ হয়েও ভিন্ন এক চিত্র মহাশ্বেতা আমাদের জানান। উপন্যাসের ভাষায় – ‘দুঃস্বপ্ন দেখে ছুটে গিয়েছিলেন, গুণা আয়িকে দেখে ঘেন্না করেছিলেন। এখন বুঝতে পারছেন গুণা তাঁকে চুয়াড়জীবনের কথা অহরহ মনে করিয়ে দিত তাই এই ঘেন্না। কিংবা ঘেন্নার ছদ্মবেশে সে এক প্রবল আকর্ষণ। রক্তের আকর্ষণ। গুণা চুয়াড় জাতীয়া বুড়ি, তিনিও জাতে চুয়াড়। তবে কি ভীমাদল নগরীতে গুণাই তাঁর সবচেয়ে কাছের মানুষ ছিল?’৫৮

যেদিন দুঃস্বপ্ন দেখে কবি প্রেমিকা ফুল্লরার কাছে ছুটে গেল, সেদিন ঔপন্যাসিক কবির সঙ্গে গুণার সাক্ষাৎ ঘটিয়েছেন, তা আত্মিক টান তৈরির একটা প্রচেষ্টা বলা যায়। কিন্তু এই সমাজে চুয়াড় রমণী উপপত্নী রাখা যায় কিন্তু চুয়াড় যুবকের সঙ্গে ব্রাহ্মণের কন্যার বিয়ে দেওয়া সম্ভব নয়। গুণার মনে প্রশ্ন জাগলেও এই বুড়ো বয়সে সে- আশ্রয় হারাতে চায় না, তাই সে কবিকে ভীষণ অভিসম্পাত দেয়। উপন্যাসে নারীদের যে-চিত্র আমরা দেখতে পাই তাতে গুণার এই মনোভঙ্গি অর্বাচীন নয়। যে-সমাজে স্বামীদের উপপত্নী রাখার ব্যবস্থা আছে, সেই সমাজে নারীরা স্বামীকে ঘরে রাখতে তন্ত্রমন্ত্রের আশ্রয় নেয়। মাধবাচার্যের মতো ক্ষমতাধর লোকের স্ত্রীকে উপপত্নী গুণাকে ভয় পেতে দেখা যায়, আবার সেই ফুল্লরার মাকে বলতে শোনা যায় –

ছেলেরা বোলে মা! দুষ্ট গরু আর দুষ্ট বউ একই কথা। তাড়িয়ে না দিলে শান্তি নাই। আমি বললাম বাবা সকল! ওশি ছাড়তে দেখেছ, এবার রশি টানতে দাও। তাতেও যদি না শুধরায় তবে ঝাড়ু মেরে বিদেয় কর‌্য বাপ সকল।… চুল না বান্ধলে মারতাম, ছেলে কাঁদালে মারতাম, বাসনে জল থাকলে মারতাম! মেরে মেরে বজ্জাতের জাতকে মুঠোয় এনেছি বোন! এখন দেখ যেয়্যে? রান্ধে, ছেলে দেখে, ধান ভানে, ঘর নিকোয়, বড়ি দেয়, ঘুঁটে গোবর করে… আমার ঘরে বোন! তিন তিনটা মেয়্যা! বিয়্যে করিয়েছি, জামাই নেয় না। তারা আমার গলাতেই থাকে! কিন্তু ঘরের কুটা তাদের পা দিয়ে লাড়তে দিই না বোন। বউ থাকতে ঝি খাটবে কেনী বোল?৫৯

যেই সমাজে নারীরাই নারীদের নির্যাতন করে, সমাজ নারীর জীবনকে যে-গ–র মধ্যে আবদ্ধ করে তা সামাজিক জীবনের অঙ্গ হয়ে যায়। সেই সমাজে গুণা বুড়ির অবস্থান থেকে কবির পক্ষে যাওয়া সম্ভব নয়। সমাজপতি বা সমাজের মাথা তো সেই পুরুষই, নারীকে স্বজাতি সহানুভবতার বাইরে রাখতে পারলে সেই পুরুষেরই জয় নিশ্চিত হয়। আর সেই আবৃত্তেই উপন্যাসে মূলত সংস্কারের জয় হয় বলা যায়।

মহাশ্বেতা দেবী কবি বন্দ্যঘটীকে রাজকবি এবং ব্রাহ্মণ করে তুলতে চেয়েছিলেন। তিনি মধ্যযুগের কাব্যের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে কবিসত্তার স্বরূপ তুলে ধরতে চেয়েছেন। মধ্যযুগের চ-ীমঙ্গলের এক কাহিনিতে দেবী ব্যাধ কালকেতুকে রাজসিংহাসন দিয়েছেন। ঔপন্যাসিকের চিন্তার খোরাক যে মঙ্গলকাব্য থেকে এসেছে, তা পূর্বেই উল্লিখিত। আমরা কাহিনিচিত্রেও যার ছায়া খুঁজে এ-পর্যন্ত এসেছি। মধ্যযুগের কাব্যের প্রভাবে নারী-পুরুষের প্রেমের বৈচিত্র্য চিত্রণে মহাশ্বেতা দেবী তৎপর হন এই উপন্যাসটিতে। কবি ফুল্লরাকে চিন্তা করে অভয়ামঙ্গলে সুলভা চরিত্র নির্মাণ করেন। সুলভাকে তৈরি করেছেন ফুল্লরার ছায়ায়। মানসকন্যা আর প্রেমিকা একাকার হয়ে যায় কবি বন্দ্যঘটী গাঞির কাছে। তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর কবি গ্রন্থে কবি নিতাইচরণকে ঠাকুরঝির ছায়ায় পদ রচনা করিয়েছেন। কবিদের প্রেম আর সৃষ্টির সঙ্গে যেন এক অদৃশ্য সেতু উপন্যাসে বারবার ফিরে আসে। যেমন ভীষণ দুঃস্বপ্ন দেখে কবি বন্দ্যঘটী ফুল্লরার কাছে ছুটে যান, তেমনি নীল ময়ূরের যৌবন উপন্যাসে কাহ্নুপাদ রাজদরবার থেকে অপমানিত হয়ে ছুটে যান প্রেমিকা ডোম্বির কাছে। নিতাইচরণ ছুটে যান ঠাকুরঝির কাছে, বসন্তের কাছে। এখানে ঔপন্যাসিককে কবির চোখকে শিল্পিত করে প্রেমিকার রূপ বর্ণনা বা প্রেমের উন্মত্ততা চিত্রিত করতে দেখা যায়। মহাশ্বেতা দেবী যেভাবে শিল্পিত করে কবির চোখে ফুল্লরার চরিত্র উপস্থাপন করেন –

দেয়ালের গায়ে হেলান দিয়ে ফুল্লরা দেবমন্দিরে ইটের গায়ে খোদিত কোনো কিন্নরী-মূর্তির মতো দাঁড়িয়েছিল। তার পায়ে তিনলহরা নূপুর, পরনের শাড়ি গাঢ় লাল, রক্তের মতো, যেন কামনার প্রস্ফুট কুসুম, যে কুসুম বসন্ত সমাগমে নির্লজ্জ প্রসাধনের ভ্রমরদের আহবান করে। তার গায়ে কাঁচুলি, পরনে রত্নালঙ্কার। প্রবাল, মুক্তা ও মরকতমণির অতি বিচিত্র অলঙ্কার, তার উপর একছড়া জবাফুলের মালা। প্রতিটি অলঙ্কারের মধ্যমণিতে এক সকু-লী নাগ-খচিত। ফুল্লরাকে দেখে কবির মনে হল মোহনীবেশে স্বয়ং মনসা এ-রাত্রে মাধবাচার্যের ঘরে উপস্থিত, যেন কোনো সাধকের ধ্যানে তুষ্ট হয়ে বরদানের ইচ্ছায় দাঁড়িয়ে।৬০

এখানে লেখক তাঁর কবির চোখকে শিল্পিত করতে গিয়ে আখ্যান থেকে সরে যাননি, বরং প্রেক্ষাপটকে আরো স্পষ্ট করে তোলেন উপমা ব্যবহারের মাধ্যমে। ফুল্লরার রূপের বর্ণনায় কিন্নরী-মূর্তি ও মনসার সঙ্গে তুলনীয় করে মহাশ্বেতা তৎকালীন দেব-দেবীর বিশ্বাসের বাস্তবতা তুলে আনেন, তেমনি কবির বৈশিষ্ট্যে বিশিষ্ট হয়ে দেখা দেয় কবি বন্দ্যঘটীর মানসজগৎ। যেমন – আমরা কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যের (১৯২৬-৪৭) কণ্ঠে চাঁদকে কাব্য হয়ে উঠতে দেখি ঝলসানো রুটি হয়ে, সেই কবির কবিত্বে কবি বন্দ্যঘটীর মাঝেও ফুল্লরার রূপের বর্ণনায় বিন্যস্ত হয়ে ওঠে। কিন্তু মহাশ্বেতা দেবীর ফুল্লরা শেষ পর্যন্ত কবি বন্দ্যঘটীর মানসকন্যা সুলভা হয়ে উঠতে পারে না। এ-প্রসঙ্গে সুদেষ্ণা চক্রবর্তীর প্রবন্ধ থেকে বিশেষভাবে উল্লেখ্য –

ষোড়শ শতাব্দীর বাংলা কাব্যজগতে ভিন্ন বর্গ ও বর্ণের নারী- পুরুষের মধ্যে প্রেম, অনুলোম বা প্রতিলোম মিলন বিরল ছিল না। বৈষ্ণব পদাবলীর রচয়িতা চ-ীদাস ও তাঁর সম্বন্ধে নানা কিংবদন্তির প্রসঙ্গ উপন্যাসে একাধিকবার দেখা দিয়েছে। রাজকিনী রামীর সঙ্গে কবির প্রেম, কবির মৃত্যুদ-। এদিক থেকে তিনি বন্দ্যঘটীর সঙ্গে তুলনীয়। মৈমনসিং গীতিকায় দেখি, জমিদারের ছেলে নদের চাঁদ আর বেদেনী মহুয়া, রাজপুত্র আর ধোপার মেয়ে কাঞ্চনমালা, (রজকিনী রামীর মত) জমিদারপুত্র শ্যাম রায় আর ডোমনী, রাজকন্যা রূপমতী আর রাজবাড়ির এক ভৃত্য, আর এক রাজকন্যা আর আঁধা বঁধু, অন্ধ গায়ক। এসব কাহিনির পরিণতি মর্মান্তিক, কিন্তু প্রেমের মর্যাদা ক্ষুণ্ণ হয়নি।৬১

কাব্য আর বাস্তবঘনিষ্ঠ হয়ে ওঠা উপন্যাসের পার্থক্য যেন এটা। ফুল্লরা শেষ পর্যন্ত সুলভা হয়ে কবিকে সাড়া দিতে পারেনি। যদিও সে কবিকে সত্যি ভালোবেসেছিল, রোমান্টিক স্বপ্নে আচ্ছন্ন হয়েছিল। এমনকি কবির বিচারকার্য চলার সময়ও সে গোপনে হরিশ রায়ার সঙ্গে দেখা করেছে কবির মুক্তির জন্য। কিন্তু আয়রনি হলেও সত্যি যে, শেষ পর্যন্ত কবি যখন পালিয়ে ফুল্লরার কাছে ছুটে এলো তখন প্রেমের চেয়ে ব্রাহ্মণকন্যার সংস্কার বড় হয়ে ওঠে। নিদারুণ নিষ্ঠুর ভঙ্গিতে, কঠোর ভাষায় তিনি কবিকে প্রত্যাখ্যান করলেন, ‘জেত ভাঁড়িয়ে এসেছিলি, চুয়াড়।’৬২

ভয়ংকর সেই উচ্চারণে প্রেমের চেয়ে সংস্কার জয়ী হয়ে যায়। কিন্তু এখানেই ফুল্লরার সবটুকু স্বরূপ উন্মোচন করেন না মহাশ্বেতা দেবী। পরক্ষণেই ফুল্লরা, ‘মা গোঁ কি বললাম, বলে মেঝেতে মূর্ছা যায়।’৬৩

তার মানে অনুতপ্ত এক স্বর ঔপন্যাসিক ফুটিয়ে তোলেন। এক্ষেত্রে আমাদের রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের (১৮৬১-১৯৪১) বিখ্যাত ছোটগল্প ‘রবিবারে’র (আশ্বিন, ১৩৪৩) কথা তুলনীয় হয়ে ওঠে।  ‘রবিবারে’র অভীক আর বিভার প্রেমের ভেতরের প্রধান দেয়ালটিই ছিল এই সংস্কার। অভীক নাসিত্মক, কিন্তু অভীক বিলেত যাওয়ার আগে যে-চিঠি দিয়ে যায় বিভাকে, তা পাঠ করে বিভার মনেও এমন অনুতপ্ত ভাবের প্রকাশ ঘটিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ। ইঙ্গিত ছিল অভীক ফিরে এলে তাকে মেনে নেওয়ার। কিন্তু মহাশ্বেতার উপন্যাসে এই সংস্কারাচ্ছন্ন কথাটি হাতের তীরের মতো কবির বুকে গিয়ে লাগে। যদিও ফুল্লরা সুলভা হয়ে উঠলেও কবির ভাগ্য পরিবর্তন হতো না বলা যায়, কারণ সমাজব্যবস্থার কাছে কবির পরাজয় হতো। কবি অভয়ার জঙ্গলে ছুটে গিয়েও আশ্রয় পাননি দেবী অভয়ার কাছে। কিন্তু তবু ফুল্লরা যদি সুলভা হয়ে উঠত তবে উপন্যাসে প্রেমের জয় দেখানো যেত, যদিও তা ছাড়াই এই কাহিনি ভীমাদলে কিংবদন্তিতে রূপ নেয়, কবি আর ফুলস্নার প্রেম, যদি এটা সত্যি যে কবি তার মানস প্রেম আর শিল্পসৃষ্ট প্রেমের দেবী কারো কাছেই আশ্রয় পায়নি। তাই হয় তো গোলকশুঁড়ি আজ সে-আখ্যান বলতে থাকে, তাতে এই প্রেম বেশ গুরুত্বের সঙ্গে উপস্থাপিত হয়। অপ্রাপ্তি শক্তি প্রাপ্তির চেয়ে প্রকট, প্রেমে এ-কথার জয় সাহিত্যে সারাবিশ্বেই সত্য হয়ে আছে। সেইভাবে কবির সঙ্গে ফুল্লরার প্রেম অমর হয়ে ভীমাদলে কথিত আছে এখনো।

মহাশ্বেতা দেবী কবি বন্দ্যঘটী গাঞির জীবন ও মৃত্যু উপন্যাসটি ব্যতিক্রমীভাবে ফুটিয়ে তোলেন চরিত্রকে বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে। যেখানে ফুল্লরার রূপের বর্ণনার পাশে উপস্থাপন করেন কুৎসিত গুণার রূপকে শ্মশানের প্রেতিনীর মতো ভয়ংকর রূপে। উপন্যাসে লেখিকা উদ্দেশ্যমূলকভাবে কবির দ্বিতীয় জন্মকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে বা ফ্যান্টাসির জগতের সঙ্গে পাশাপাশি বাস্তবতার দৃশ্যকল্প নির্মিত করে আখ্যানকেই সেখানে ব্যতিক্রমী করে তোলেন। উপন্যাসের ভাষায় –

১. এ কলিতে মানুষের আর দেবীতে বিশ্বাস নেই, প্রেমিকরা দেহ-স্পর্শেই সে নতুন বল পায়। মানুষ এখন ক্রমেই দেবতা ছেড়ে, অনায়ত্ত অলৌকিক ছেড়ে মাটির দিকে ধায়, মাটির দিকে যায়।৬৪

২. মনের চোখে পালকাপ্য মুনি আর পৃথিবীর সেই আদিম হাতির দলকে দেখতে কবি আর তাঁর রক্তমাংস কেঁপে কেঁপে ওঠে। ওদের কথা তিনি লিখেন নি, অথচ ওদের কথাই লেখা উচিত ছিল।৬৫

ভূমিবর্তী চিন্তায় আবর্তিত করেন উপন্যাসের আখ্যানকে, আখ্যানসৃষ্ট কবিকে। এক ভিন্ন ব্যাখ্যায় উপস্থিত হয় কবি, যে-কবি দ্বিতীয় জন্ম নিতে স্ব-জাতি ছেড়ে এসেছে। যে-কবির ভাষায় মহাশ্বেতা তুলে দিয়েছেন যেন অমোঘ এক সত্যবাণী ‘কুথাও ক্ষমা নাই’, কবি নিষ্ফল ক্ষোভে বললেন। নগরে তার ক্ষমা হয়নি, তিনি ‘যোগ্যতা যার পৃথিবী তার’ এই মনে করে নতুন জীবন খুঁজতে গিয়েছিলেন।’৬৬

মহাশ্বেতা দেবীর উপন্যাসসৃষ্ট কবির মাঝে এই দ্বৈতসত্তার জাগরণ পাঠককে নতুন ভাবনার খোরাক জোগায়। যেখানে গর্গের মতো ‘কংস রাজা’, হরিশ রায়ার মতো নির্মম নির্দয় মানুষও বলে, ক্ষমতা থাকলে না মেরে জঙ্গলে খেদা করতেন। রাজা নিজে নিষ্ঠুর বিচার করলেও রাজার বিকল্প চিন্তার অবকাশ ঘটিয়েছেন মহাশ্বেতা দেবী। উপন্যাসের ভাষায় – ‘আর্তকণ্ঠে বললেন ‘যদি শূদ্র হয়ে মসীজীবী হতে ইচ্ছে হয়েছিল তবে বোষ্টম হলে না কেন, তাদের সমাজ ভেদাভেদ নাই।’ রাজার কণ্ঠে অনুশোচনা ছিল।’৬৭

যেখানে ভীমাদলের লোকজন কবিকে প্রত্যাখ্যান করছে, সেখানে নির্দয় রাজা-মন্ত্রীর মধ্যে মহাশ্বেতা দেবী এই স্নেহপ্রবণতার আভাস দিয়ে কী বোঝাতে চেয়েছেন, বিষয়টি ততটা স্পষ্ট নয়। আমাদের এক্ষেত্রে অধ্যাপক দামোদর ধর্মদাস কোসাম্বির (১৯০৭-৬৬) মিথ অ্যান্ড রিয়ালিটি : স্টাডিজ ইন দি ফরমেশন অফ ইন্ডিয়ান কালচার গ্রন্থে একটি প্রসঙ্গ বিশেষভাবে স্মর্তব্য –

গীতা এমন এক পা-ুলিপি যার সহায়তায় কোনো হিংসা না ছড়িয়ে ব্রাহ্মণ্য ব্যবস্থা অবিকৃত রাখা যায়। শাসক শ্রেণির পছন্দ হবে না এমন কিছু সামাজিক পুনর্গঠনের উদ্যোগ, অনুপ্রেরণা ও যাথার্থ্য এই গ্রন্থ থেকে সংগ্রহ করা যায়। গীতায় কৃষ্ণের মুখ দিয়েই বর্ণাশ্রমের পক্ষে সওয়াল করা হয়েছে। কৃষ্ণ বলেছেন, ‘যারা আমার কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করে, তারা নারী, বৈশ্য ও শূদ্রদের মত পাপী হলেও… ইত্যাদি ইত্যাদি।’ যাঁরা সমাজে শ্রমদান করে সম্পদ তৈরি করেন, জন্মসূত্রেই তাঁদের অবজ্ঞাত ঘোষণা করা হয়েছে।৬৮

মহাভারতপুরাণ উভয় পা-ুলিপিই বারবার পরিবর্তিত হয়েছে ব্রাহ্মণ্যবাদ রক্ষার খাতিরে এবং তা কোন-কোন আমলে ঘটে – কোসাম্বি তথ্যসমৃদ্ধভাবে তা উপস্থাপন করেছেন। মধ্যযুগের দেব-দেবী-আশ্রিত উপাখ্যান এবং বর্ণাশ্রম ধর্মের প্রেক্ষাপটে মহাশ্বেতা দেবীর কবির ভাগ্য নির্ধারণ যে এমনই সামাজিক আখ্যায় পৌরাণিক বিচার হয়ে ওঠে, তা আমরা অনুধাবন করতে পারি কোসাম্বির কথা স্মরণ করে। তবু এসব কিছুর মধ্যে দিয়ে মহাশ্বেতা দেবী কবিকে পুনর্জন্ম দিয়েছেন বলা যায়। তবে তাঁর কবি নির্মাণের ক্ষেত্রে শ্রেণিবৈষম্যকেন্দ্রিক সামাজিক বৃত্তে আদিবাসীকে যেমন গোত্রহীন করেই চিহ্নিত করেছেন, তেমনি তিনি একধরনের শ্রেণিকরণও করেছেন উপন্যাসের চরিত্র নির্বাচনের ক্ষেত্রে। সেই গোত্রহীন সমাজের নায়ক কলহনকে তিনি নিয়েছেন সেই গোত্রহীন, অরণ্যবাসী আদিবাসী চুয়াড়দের মধ্য থেকে হলেও তাদের শ্রেষ্ঠ পুরুষটিই ছিল এই কবি! তারাশঙ্করের কবি নির্মাণের ক্ষেত্রেও আমরা লক্ষ করি, নিশাচর বাহিনীর প্রধানের ভাগ্নে, অর্থাৎ ডোম সমাজের ক্ষমতাবান ঘর থেকেই তিনি কবি নিতাইচরণকে নির্বাচন করেছেন। তেমনি মহাশ্বেতা দেবীর কবি বন্দ্যঘটী গাঞিও তাদের গোত্রহীন সমাজের উচ্চবর্গীয় ব্যক্তি কলহনকে নির্ধারণ করেছেন কবি নির্মাণের জন্য। উপন্যাস থেকে উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে – ‘উর তুল্য পুরুষ সমাজে লাই, উটিকে দাও আমরা রাজা করব।’৬৯

এই ক্ষেত্রে ঔপন্যাসিক মহাশ্বেতা দেবী আদিবাসী সমাজের ঘরের লোক হলেও উপন্যাসের চরিত্র নির্বাচনের ক্ষেত্রে হেজিমনি শ্রেণির মানসিকতার ছাপ রেখেই গ্রন্থ রচনা করেছেন বলা যায়; এবং গোত্রহীন জাতির উচ্চবর্গের মানুষ কলহনকে কবি বিনির্মাণ করেন লেখক এবং আমাদের বর্ণাশ্রম সমাজের মানুষের কাছে তাকে কিংবদন্তির নায়ক বানাতে সমর্থ হন। উপন্যাসে ভীমাদলের মানুষের মধ্যে এই বিশ্বাস জন্মে যে, কবি ও ফুল্লরার মায়ার জগতে মিলন হয়েছে। উপন্যাসের গল্পকথক গোলকশুঁড়ির কাছেই কবি বন্দ্যঘটী দুই রূপে উপস্থিত হয়। উপন্যাসের ভাষায় বিষয়টি উপস্থাপিত হলে তা সহজেই তুলনীয় হয়ে উঠবে –

এক বর্ষ হতে যায় কিছু কাল হয়, এমনই এক বর্ষার সময়ে, গোলকশুঁড়িখানার সম্মুখ বাটে এসে এক দরিদ্র, পথচারী যুবক  এসে ‘ভীমাদলে অন্নসত্র নাই?’ জিজ্ঞাসা করেছিল। যুবকের শুকনো মুখ দেখে গোলকের দয়া হয়েছিল। সে নিজে ডাব কেটে এনে দেয় ও নারকেলখ-, বাতাসা পেয়ে সে যুবক গোগ্রাসে খেয়েছিল। যুবকের চেহারা বলিষ্ঠ, কিন্তু রুক্ষ চুলগুলি কোন শানিত অস্ত্রেও সাহায্যে ছেদন করা, তাই অসমান দেখায়। যুবকের পায়ের গোড়ালিতে একটি বড়ো ক্ষত ছিল। গোলক সে দূর্বাঘাস ছেঁচে রসের প্রলেপ দিয়েছিল। তখন তার সন্তান সবে মরেছে, তাই বয়সের ছেলে দেখলে তার মমতা হতো।৭০

এই হচ্ছে ভীমাদলে আগন্তুক কবি বন্দ্যঘটীর প্রথম দর্শনে গোলকের ভাবনায় ঔপন্যাসিকের চরিত্র উপস্থাপন ক্ষুধার্ত, বিধ্বস্ত এক যুবক হিসেবে, এখানে কবির উপস্থাপন ঘটেছে। কিন্তু এতদিন বাদে ঝড়ের রাতে কুহক হয়ে গোলকের শুঁড়িখানায় একটা লাঠির খোঁজে উপস্থিত হওয়া কবির বর্ণনা যেন কিংবদন্তির কোনো নায়ক। এই প্রসঙ্গে লেখক যেভাবে কবিকে উপস্থাপন করেন তা –

‘আমি কবি বটি হে, কবি বন্দ্যঘটী’… যুবকের কণ্ঠ শুকনো, রুক্ষ, গম্ভীর ‘আমি বড় কু-স্বপ্ন দেখলাম।’ বলতে বলতে যুবক অন্যমনস্ক হলেন। উন্নত শরীর। যত দীঘল তত দেখায় না, কেননা তিনি সিংহস্কন্ধ, কবি অতিরিক্ত চওড়া। তরুণ শালগাছের মতো সবল ও সতেজ চেহারা। ঘন কালো, সামান্য ঢেউ-খেলানো চুল কাঁধে ছড়ানো। লোকশ্রম্নতি, গৌরাঙ্গ নবদ্বীপলীলার তেমনই চুল রাখতেন ও যুবক মাত্রেই সেভাবে চুল প্রসাধন করে। কানে সোনার কুন্দল, গলায় সোনার কণ্ঠি। গলা, হাত, কাঁধের পেশি দেখলে মনে হয় যুবক একসময় তিরাভ্যাস করেছেন। পরনের বহুমূল্য চওড়া পাড় বিষ্ণুপরী ধুতি ও কাঁধে কাঞ্চীপুরম রেশমের উত্তরীয় থেকে জল গড়িয়ে পড়ে গোলকের ঘরের মেঝে কর্দমাক্ত হতে লাগল।… গোলক এখন ভয়ে গর্তের কেঁচো, পাদুকার নীচে পিষ্ট পিঁপড়ে, কেননা তার সামনে এখন কবি বন্ধ্যঘটী গাঞি দাঁড়িয়ে। নগরকবি, রাজকবি, মাধবাচর্যের মেয়ে ফুল্লরার বাগ্দত্ত প্রণয়ী, রাজা গর্গবল্লভের পরম প্রীতিপাত্র কবি।৭১

গোলকশুঁড়ি যখন ঝড়ের রাত্রে নানা কাহিনি শোনাতে ব্যস্ত, তখন কবির এই উপস্থিতি এক কিংবদন্তির নায়করূপে। এই ঘটে যাওয়া ট্র্যাজেডির নায়কের আবির্ভাবের ভেতর দিয়ে মহাশ্বেতা যেমন তাঁর উপন্যাসের মূল আখ্যানে চলে যান, সেই আখ্যান শুরুই করেন কবিকে মানুষের মনে দ্বিতীয় জন্মের নায়ক রূপায়ণের মাধ্যমে। সর্বোপরি একটি কালের আখ্যানে কবি প্রতীক হয়ে উঠেছে যেমন, তেমনি উপন্যাসটি পেয়েছে ব্যতিক্রমী উপাধা।

মহাশ্বেতা দেবীর ভাষাগুণে উপন্যাসের চরিত্ররা অনেকটাই জীবন্ত। ঐতিহাসিক উপন্যাসের ক্ষেত্রে প্রেক্ষাপট তৈরি করার যে-সমস্যা, তার মধ্যে ভাষা অন্যতম। মহাশ্বেতা দেবী না পুরো এ-যুগের ভাষা, না পুরো অতীতের একটি মিশ্রণ ভাষার মাধ্যমে উপন্যাসটি নির্মিত করে বেশ বৈচিত্র্যের ছাপ ফেলেছেন। তাতে পাঠকের বুঝতেও অসুবিধা হলো না, আবার আখ্যানের আমেজে ভেসে থাকল মধ্যযুগের আবহাওয়া। ভাষা, মিথ ও ইতিহাসের মাধ্যমে লৌকিক জীবনবৃত্তের চিত্র বিনির্মাণে বৃহৎ সামাজিক ও কৌম জীবনের চিত্রের সমাগম। যৌনতা মিশ্রিত বারবনিতাদের উপস্থিতি, দুর্ভিক্ষ, জীবনের টানাপড়েনে মর্মান্তিক পরিণতির মধ্য দিয়ে উপন্যাসের শেষ হয়। সেখানেই যেন ঔপন্যাসিকের সফলতা।

এ-কথা সত্য, দেশীয় আখ্যানের প্রেক্ষাপটকে বিচিত্রতার মাধ্যমেই তুলে আনা হল কবির জীবনকেন্দ্রিক ঘটনাবৃত্তে। উপন্যাসের বিষয়বস্ত্ত হয়ে সেই বৃত্তবদ্ধ জীবনের উপাখ্যান রচিত হল এক নতুন বার্তাবহে, যা বাংলা উপন্যাস সাহিত্যে অন্ত্যজ শ্রেণির শিল্পসত্তার প্রকাশের মাধ্যমে শ্রেণির চরিত্রের রূপকে অন্য এক আলোয় উপস্থাপিত হতে দেখা গেল, যেই উপলব্ধি কেবল ভাত-কাপড়ে বেঁচে থাকার সংগ্রামের নয়, যে-সংগ্রামই মহাশ্বেতা দেবী তাঁর আদিবাসী জীবনকেন্দ্রিক বেশিরভাগ উপন্যাসে মুখ্য করে তোলেন, সেই অবস্থানের বাইরের স্বাদে নির্মিত এ-আখ্যান। কবি বন্দ্যঘটী গাঞির জীবন ও মৃত্যু উপন্যাসটি তাই শিল্পের নতুন স্বাদযুক্ত উপন্যাসের লক্ষ্য বহন করছে।

 

তথ্যসূত্র

১. শম্পা সরকার, ‘উলগুলানের শেষ নাই, বিরসার মরণ নাই’, মরাল, উপন্যাস প্রসঙ্গ সংখ্যা (সম্পাদনা : হোসেনউদ্দীন হোসেন), দ্বিতীয় বর্ষ, দ্বিতীয় সংখ্যা, আগস্ট ২০০৯, ঢাকা, পৃ ৮৯।

২. সুহৃদকুমার ভৌমিক, আদিবাসীদের ভাষা ও বাঙলা, মারাংবুরু প্রেস, কলকাতা, ১৯৯৯, পৃ ৩৯।

৩. মহাশ্বেতা দেবী, ‘লেখকের কথা’, কবি বন্দ্যঘটী গাঞির জীবন ও মৃত্যু, মহাশ্বেতা দেবীর রচনাসমগ্র, ষষ্ঠ খ- (সম্পাদনা : অজয় গুপ্ত), দে’জ পাবলিশিং, কলকাতা, নভেম্বর ২০০২।

৪. প্রাগুক্ত, পৃ ৪৯০।

৫. সুবিমল মিশ্র, সুবিমলের বিরুদ্ধে সুবিমল এবং উস্কানিমূলক অনেককিছুই, আপাতভাবে, বাণীশিল্প, ডিসেম্বর ১৯৮৮, পৃ ৭৯।

৬. সুমন সাজ্জাদ, ‘উপন্যাসের ‘উন্নয়ন’ দেবেশ রায়ের উপন্যাস’  প্রকৃতি, প্রান্তিকতা ও জাতিসত্তার সাহিত্য, আবহমান প্রকাশনী, ২০১১, পৃ ৪৩।

৭. মলয় রায়চৌধুরী, ‘উত্তর ঔপনিবেশিকতা তত্ত্ব’, পোস্টকলোনিয়ালিজম : উত্তর ঔপনিবেশিকতা (সম্পাদনা : সমীর রায়চৌধুরী), কল্যাণী প্রিন্টার্স, কলকাতা, ১৯৯৬, পৃ ২০-৫৮।

৮. মহাশ্বেতা দেবী, কবি বন্দ্যঘটী গাঞির জীবন ও মৃত্যু, পৃ ১০৩।

৯. মামুন আর রশীদ, ‘নিম্নবর্গ নিয়ে প্রাথমিক কথা, ভারতীয় সাহিত্যে নিম্নবর্গ’, বাংলা উপন্যাসে নিম্নবর্গ, শুদ্ধস্বর, ঢাকা, ২০১০, পৃ ১৬।

১০. রহমান জজি, ‘উত্তর আধুনিকতাবাদ’, ক্রিটিক্যাল তত্ত্বচিন্তা, (সম্পাদনা : মাসউদ ইমরান), মওলা ব্রাদার্স, ঢাকা, ২০১০,

পৃ ২৭১।

১১. মহাশ্বেতা দেবী, ‘লেখকের কথা’, কবি বন্দ্যঘটী গাঞির জীবন ও মৃত্যু, পৃ ২২।

১২. প্রাগুক্ত, পৃ ৪৯০।

১৩. প্রাগুক্ত, পৃ ৫৫।

১৪. অসিতকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়, বাংলা সাহিত্যের সম্পূর্ণ ইতিবৃত্ত, মডার্ন বুক এজেন্সি প্রাইভেট লিমিটেড, কলকাতা, ১৯৯৮-৯৯,       পৃ ৭৩-৭৪।

১৫. রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, ‘ঐতিহাসিক উপন্যাস’, রবীন্দ্র রচনাবলী, চতুর্থ খ-, সুলভ সংস্করণ, বিশ্বভারতী, কলকাতা, পুনমুর্দ্রণ ১৪০৬, পৃ ৬৮৭।

১৬. বিজিতকুমার দত্ত, বাংলা সাহিত্যে ঐতিহাসিক উপন্যাস, কলকাতা, ১৩৯৩, পৃ ৮-৯।

১৭. মহাশ্বেতা দেবী, ‘লেখকের কথা’, কবি বন্দ্যঘটী গাঞির জীবন ও মৃত্যু।

১৮. প্রাগুক্ত, পৃ ২২।

১৯. প্রাগুক্ত, ‘লেখকের কথা’।

২০. তপোধীর ভট্টাচার্য, ‘ঔপনিবেশিক মূল্যবোধ : একটি প্রস্তাবনা’, পোস্টকলোনিয়ালিজম : উত্তর ঔপনিবেশিকতা, (সম্পাদনা : সমীর রায়চৌধুরী) কল্যাণী প্রিন্টার্স, কলকাতা, ১৯৯৬, পৃ ৯৯।

২১. মহাশ্বেতা দেবী, ‘গ্রন্থপ্রসঙ্গ’, কবি বন্দ্যঘটী গাঞির জীবন ও মৃত্যু, পৃ ৪৯১।

২২. দেবেশ রায়, ‘উপন্যাসের নতুন ধরনের খোঁজে’, উপন্যাসের নতুন ধরনের খোঁজে, প্রথম বর্ধিত দে’জ সংস্করণ, দে’জ পাবলিশিং, কলকাতা, পৃ ১৬।

২৩. প্রাগুক্ত, পৃ ৩৩।

২৪. মহাশ্বেতা দেবী, কবি বন্দ্যঘটী গাঞির জীবন ও মৃত্যু।

২৫. প্রাগুক্ত, পৃ ২৪।

২৬. প্রাগুক্ত, পৃ ২৪।

২৭. প্রাগুক্ত, পৃ ২।

২৮. প্রাগুক্ত, পৃ ২।

২৯. প্রাগুক্ত।

৩০. জোসেফ ক্যাম্পবেল, মিথের শক্তি, বিল ময়ার্সের সঙ্গে কথোপকথন, (অনুবাদ : খালিকুজ্জামান ইলিয়াস), বাংলা একাডেমি, ঢাকা, ১৯৯৫, পৃ ২৭।

৩১. প্রাগুক্ত, পৃ ২৮।

৩২. মহাশ্বেতা দেবী, কবি বন্দ্যঘটী গাঞির জীবন ও মৃত্যু, পৃ ৬৭।

৩৩. প্রাগুক্ত, পৃ ৬৭।

৩৪. প্রাগুক্ত, পৃ ৩৮।

৩৫. প্রাগুক্ত, পৃ ৩৮।

৩৬. তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়, কবি, নাইম বুকস ইন্টারন্যাশনাল, ঢাকা, ২০০৮, পৃ ৭।

৩৭. অভিজিৎ সেন, রহু চণ্ডালের হাড়, সুবর্ণরেখা, কলকাতা, তৃতীয় সংস্করণ, ১৪০৭, পৃ ৭১।

৩৮. সোমা মুখোপাধ্যায়, রাঢ়বঙ্গের লোকমাতৃকা, লোকসংস্কৃতি ও আদিবাসী সংস্কৃতি কেন্দ্র, তথ্য ও সংস্কৃতি বিভাগ, পশ্চিমবঙ্গ সরকার, ২০০৪, পৃ ২২-২৩।

৩৯. মহাশ্বেতা দেবী, ‘গ্রন্থপ্রসঙ্গ’, কবি বন্দ্যঘটী গাঞির জীবন ও মৃত্যু, পৃ ৪৯৪।

৪০. পৌরাণিক অভিধান, সুধীরচন্দ্র সরকার-সংকলিত, এম. সি. সরকার অ্যান্ড সন্স প্রা. লি., কলকাতা, ষষ্ঠ সংস্করণ, ১৪০৪,

পৃ ৭৬।

৪১. ক্ষেত্র গুপ্ত, ‘দ্বাদশ নয়ন : লৌকিক-অলৌকিক’, লোকসৃষ্টির নন্দনতত্ত্ব, লোকসংস্কৃতি গবেষণা পরিষদ, পশ্চিমবঙ্গ, কলকাতা, ২০০২, পৃ ৮৮-৮৯।

৪২. মহাশ্বেতা দেবী, কবি বন্দ্যঘটী গাঞির জীবন ও মৃত্যু, পৃ ৬৫।

৪৩. প্রাগুক্ত, পৃ ২৬-২৭।

৪৪. প্রাগুক্ত, পৃ ৩২।

৪৫. প্রাগুক্ত, পৃ ৮৬-৮৭।

৪৬. প্রাগুক্ত, পৃ ৪৫।

৪৭. সেলিনা হোসেন, নীল ময়ূরের যৌবন, ঐতিহ্য প্রকাশ, ঢাকা, ২০০০, পৃ ১৪৪।

৪৮. তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়, কবি, পৃ ১১২।

৪৯. মহাশ্বেতা দেবী, কবি বন্দ্যঘটী গাঞির জীবন ও মৃত্যু, পৃ ৩৬।

৫০. প্রাগুক্ত, পৃ ৫৭।

৫১. তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়, কবি, পৃ ২০।

৫২. মহাশ্বেতা দেবী, কবি বন্দ্যঘটী গাঞির জীবন ও মৃত্যু, পৃ ৭৪।

৫৩. সেলিনা হোসেন, নীল ময়ূরের যৌবন, পৃ ১৪৪।

৫৪.  পশুপতি মাহাতো, ‘মুণ্ডা গণসংগ্রাম’, বাংলার দলিত আন্দোলনের ইতিবৃত্ত, (সম্পাদনা : চিত্ত ম-ল ও প্রথমা রায়ম-ল) অন্নপূর্ণা প্রকাশনী, কলকাতা, ২০০৩, পৃ ৯১।

৫৫. মহাশ্বেতা দেবী, কবি বন্দ্যঘটী গাঞির জীবন ও মৃত্যু, পৃ ৭৩-৭৪।

৫৬. প্রাগুক্ত, পৃ ৪৫।

৫৭. প্রাগুক্ত, পৃ ৭৭।

৫৮. প্রাগুক্ত, পৃ ৮০।

৫৯. প্রাগুক্ত, পৃ ৬৩।

৬০. প্রাগুক্ত, পৃ ৪৬।

৬১. প্রাগুক্ত, পৃ ৪৯৯।

৬২. প্রাগুক্ত, পৃ ৯১।

৬৩. প্রাগুক্ত, পৃ ৯১।

৬৪. প্রাগুক্ত, পৃ ৪৬।

৬৫. প্রাগুক্ত, পৃ ৮৫।

৬৬. প্রাগুক্ত, পৃ ১০২।

৬৭. প্রাগুক্ত, পৃ ৭৫।

৬৮. শ্যামল চক্রবর্তী, ‘মিথ অ্যান্ড রিয়ালিটি – কোসাম্বিও সতর্কবার্তা’, পরিচয়, সমালোচনা সংখ্যা, ১৪১৬, কলকাতা,

পৃ ৩৪-৩৫।

৬৯. মহাশ্বেতা দেবী, কবি বন্দ্যঘটী গাঞির জীবন ও মৃত্যু, পৃ ৬৯।

৭০. প্রাগুক্ত, পৃ ৩৪।

৭১. প্রাগুক্ত, পৃ ৩১-৩২। 

শেয়ার করুন

Leave a Reply