আফ্রিকান-আমেরিকান লোককাব্য এবং হারলেম রেনেসাঁস

লেখক:

মুনীর সিরাজ

আফ্রিকান-আমেরিকান লোককাব্য কেমন করে ক্রমান্বয়ে কালো আমেরিকানদের আধুনিক কাব্য-সাহিত্য-শিল্প সৃষ্টির অনুপ্রেরণা হয়ে দাঁড়াল, বিশ্বসাহিত্যে স্থান করে নেওয়া কালো আমেরিকানদের সাহিত্যের এই রূপান্তর এক বিস্ময়কর ইতিহাস। নিজস্ব সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য এবং পরিচিতি প্রতিষ্ঠার জন্য পুরো অষ্টাদশ এবং ঊনবিংশ শতাব্দী জুড়ে কালো কবিরা বিশেষ করে সাদা মানুষের সাহিত্যজগৎ এবং ঐতিহ্য ব্যবচ্ছেদ করেছেন। কিন্তু তাঁদের দিশা ঠিক করতে সময় লেগেছে, নিজস্ব সাহিত্য-কাব্য-ঐতিহ্য প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে অবশেষে তাঁরা খুঁজে পেয়েছেন তাঁদের নিজস্ব ভাষা এবং সংস্কৃতি। অষ্টাদশ এবং ঊনবিংশ শতাব্দী জুড়ে প্রমিত ইংরেজি ভাষা এবং শ্বেতাঙ্গদের অ্যাংলো-আমেরিকান সাহিত্যের ঐতিহ্যের ধারাতেই কালো আমেরিকানরা তাঁদের কাব্য এবং সাহিত্য সৃষ্টির প্রয়াস পেয়েছেন। সেই ধ্রম্নপদী ধারাতেই আফ্রিকান-আমেরিকান কবিরা তাঁদের চিন্তা ও চেতনার মুক্তি খুঁজে পাওয়ার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু ক্রমান্বয়ে আফ্রিকান-আমেরিকান কবিরা বুঝতে পারলেন যে, শ্বেতাঙ্গ সাহিত্যের অভিষিক্ত ধারায় প্রবাহিত হয়ে কোনোদিনই তাঁদের জাতিগত ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা পাবে না। তাই তখন থেকেই তাঁরা খুঁজতে থাকেন তাঁদের কবিতা-সাহিত্য-শিল্প প্রকাশের ভাষা ও ঐতিহ্য। এ অনেকটা যেন কবি মধুসূদন দত্তের বিদেশি ভাষায় সাহিত্য সৃষ্টির প্রয়াসের সময় সম্বিত ফিরে পাওয়ার ঘটনা – ‘যারা ফিরে অজ্ঞান তুই যারে ফিরি ঘরে’। তবে বিষয়টি বিচ্ছিন্ন ঘটনামাত্র নয়। আফ্রিকা মহাদেশ থেকে বিচ্ছিন্ন পুরো একটি মানবগোষ্ঠী যা আমেরিকায় স্থানান্তরিত হয়েছিল, বিভিন্ন ধরনের কলাকৌশলে তারা আফ্রিকার বিভিন্ন দেশ থেকে স্থানান্তরিত হলেও আমেরিকায় এসে পরিণত হয় দ্বিতীয় এক জাতিসত্তায়, যারা কালো, নিগ্রো থেকে ক্রমশ পরিণত হয়েছে আফ্রিকান-আমেরিকান বলে, তারা শেষ পর্যন্ত তাদের আফ্রিকান ঐতিহ্যের সূত্র ধরেই ইংরেজি ভাষাকে দুমড়ে-মুচড়ে নিজস্ব উচ্চারণ পদ্ধতি সৃষ্টি করেছিল এবং সৃষ্টি করেছিল নানা রূপকথা, উপকথা, ছড়া এবং পদ্য এবং শেষ পর্যন্ত সেই সমসন্ত সৃষ্টিই পরিণতি পায় আফ্রিকান-আমেরিকান লোককাব্যে। আফ্রিকান-আমেরিকান লোককাব্যের প্রতিষ্ঠা আজ ইংরেজি সাহিত্যের ইতিহাসে একটি অবধারিত সত্য বটে।

নির্যাতিত কালো মানুষের জীবনের বিষাদময় কাহিনিগুলোই প্রধানত কালো আমেরিকানদের লোককাব্যের বিষয়। এই সমসন্ত ছড়া, পদ্যসমূহ অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং নির্যাতিত মানুষের ধারাবাহিকভাবে শত শত বর্ষ ধরে রচিত কাব্যসাহিত্যের তুলনা পৃথিবীতে আর কোথাও আছে বলে আমার জানা নেই। মানুষের জীবনের নিগৃহীত হওয়ার বেদনাদায়ক এমনসব ঘটনার প্রকাশ মানুষকে বিচলিত না করে পারে না। সেই আফ্রিকান-আমেরিকান লোককবিতা নিয়েই কিছু আলোচনা বক্ষ্যমাণ নিবন্ধটি।

 

হারলেম রেনেসাঁস

হারলেম রেনেসাঁস আফ্রিকান-আমেরিকান সংস্কৃতি, সামাজিক পরিচয় এবং শিল্পের সেই উজ্জীবনের প্রবন্ধন, যা সমসন্ত কালো আমেরিকানের জাতিসত্তার পরিচয় প্রতিষ্ঠার সঙ্গে সঙ্গে তাঁদের সাহিত্য এবং সংস্কৃতির আন্তমর্যাদা এবং বিশ্বাসকে সুনিশ্চিত দিকদর্শন হিসেবে প্রতিষ্ঠা প্রদান করে। হারলেম রেনেসাঁসের এই আন্দোলনের মূল ঘটনাগুলো ঘটেছিল নিউইয়র্কের হারলেম নামক স্থানে এবং সে-কারণেই একে হারলেম রেনেসাঁস বলা হয়। হারলেম রেনেসাঁসের সূত্রপাত হয়েছিল ১৯২০ সালে। ১৯২৫ সালে এলেইন লকের সংকলনের নামকরণ অনুযায়ী হারলেম রেনেসাঁস আন্দোলন (নিউ নিগ্রো মুভমেন্ট) ‘নতুন নিগ্রো আন্দোলন’ নামে পরিচিতি লাভ করে। এই আন্দোলন আমেরিকায় আফ্রিকা থেকে আগত বিরাটসংখ্যক কালো মানুষের (great migration) দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিল এবং হারলেমই ছিল এই দেশান্তরি কালো মানুষের কেন্দ্রস্থল। তবে মোটামুটি একটি দীর্ঘ সময়ই হারলেম রেনেসাঁসের আন্দোলন চলেছিল এবং ১৯৩০ সাল পর্যন্ত স্থায়ী হয়েছিল। হারলেম রেনেসাঁস অভিযান আমেরিকান সাহিত্য-শিল্প-সংস্কৃতিকে পুনরুর্জীবন দান করে। যদিও এই আন্দোলনের কেন্দ্রস্থল ছিল হারলেম এবং নিউইয়র্কের ম্যানহাটনের পৌর এলাকা, তবে হারলেম রেনেসাঁসের এই আন্দোলন কানাডার দক্ষিণাঞ্চলের কালো লেখক এবং প্যারিসে অবস্থানকারী ক্যারিবীয় দ্বীপাঞ্চলের লেখকদেরও প্রভাবিত করেছিল। আফ্রিকান-আমেরিকানদের সাহিত্য-সংস্কৃতির এই পুনরুজ্জীবনের মূল প্রেরণাশক্তি ছিল তাঁদের লোককাব্য এবং লোকসাহিত্য। হারলেম আন্দোলনে আফ্রিকান-আমেরিকান লেখকরা পুনরায় আবিষ্কার করেন যে, তাঁদের সাহিত্য এবং কাব্য নির্মাণের মূল প্রেরণা হচ্ছে আফ্রিকান-আমেরিকানদের উচ্চারণ-পদ্ধতি, তাঁদের লেখক-উপাদান এবং প্রবাদসমূহ। নতুন নিগ্রো প্রজন্মের মানুষেরা ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষের দিক থেকেই রাজনীতি-সচেতন হয়ে ওঠে। তারা তাদের ইতিহাস লিখতে শুরু করেই জার্নাল প্রকাশ করে, কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়ন শুরু করে এবং নাগরিক অধিকারসমূহ সম্বন্ধে সচেতন হয়ে ওঠে। তারা তাদের আফ্রিকান, আফ্রো-ক্যারিবিয়ান এবং আফ্রিকান-আমেরিকান অসিন্তত্বের শিকড়-সন্ধানী হয়ে ওঠে এবং তা নথিভুক্ত করা শুরু করে। তারা এটাও অনুধাবন করে যে, আফ্রিকান-আমেরিকান লোকসাহিত্যেই তাদের সাহিত্য-সংস্কৃতির প্রধান উপজীব্য বিষয় এবং তারই আশ্রয়ে সাহিত্য-সংস্কৃতির সৃষ্টিতেই তারা মানবিক মুক্তি লাভ করতে পারে। দরিদ্র আফ্রিকান শ্রমিকরা তাদের জীবনধারণের জন্য যেসব আসবাব ব্যবহার করতো, তাদের দৈনন্দিন জীবনাচার, কথোপকথন, সংগীত, ছড়া, পদ্য, কবিতা রূপকথা, উপকথা, খ্রিষ্টবাদ সম্বন্ধীয় মূলত অসাম্প্রদায়িক যন্ত্রসংগীত ও গান এবং শিশুদের জন্য রচিত ছড়া, পদ্য ইত্যাদি, এর বহুলাংশই ছিল উপদেশমূলক এবং খ্রিষ্টবাদের মানবিক মূল্যবোধের প্রকাশ। বস্নুজ এবং জাজ যন্ত্রসংগীত ইত্যাদি দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিল তরুণ নতুন নিগ্রো জনপদ। এই লোকসাহিত্যে প্রকাশ পেয়েছিল মানবিক ইতিহাসের সবচেয়ে বড় নির্যাতনের উদাহরণ হিসেবে এবং এই সামাজিক অন্যায়-নির্যাতনের বিরুদ্ধে আফ্রিকান-আমেরিকান লোকসাহিত্যের সেসব বীরত্বগাথাই উদ্বুদ্ধ করেছিল নতুন নিগ্রো জনপদের মানুষকে। সেই আন্তবিশ্বাসী লড়াকু কালো মানুষেরা তাদের ঐতিহ্য আশ্রয় করে সৃষ্টি করেছিল বিংশ শতাব্দীর নতুন সাহিত্য, যা অসংকোচে বিশ্বসাহিত্যের আসরে তাদের স্থান করে দিয়েছে। সেই নিগ্রো লোকসাহিত্য থেকে কিছু উদাহরণ তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে নিচের পঙ্ক্তিসমূহে।

 

 

আফ্রিকান-আমেরিকান লোককাব্য

আন্তর্জাগতিক লোককাব্য বা spirituals ছিল ধর্মীয় প্রভাবের দ্বারা প্রভাবিত লোককাব্য, যা ছিল আধ্যাত্মিক জগতের উচ্চারণ, যাকে negro spiritual বলা হতো। আমেরিকার দক্ষিণাঞ্চলের নিগ্রো দাসদের মধ্যেই এই অধ্যান্তবাদী লোককাব্যের সৃষ্টি হয়। দক্ষিণের এই অধ্যান্তবাদী লোককাব্যের অনুপ্রেরণা ছিল কিং জেমসের অনূদিত বাইবেল (ephesian 5.19)। দক্ষিণে নিগ্রো দাস শ্রমিকেরা একত্রিত হতো এমন কোনো স্থানে, যাকে তারা প্রশংসিত স্থান বা praise house বলে অভিহিত করত। কখনো তারা তরুলতা পরিবৃত নিকুঞ্জে মিলিত হতো এবং কখনো কখনো তাদের গোপনেই মিলিত হতে হতো। এই গোপন মিটিংগুলো ছিল প্রকৃত অর্থে চার্চ মিটিংয়ের নামান্তর। আমেরিকার আফ্রিকান অধিবাসীদের সপ্তদশ শতাব্দীতে খ্রিষ্টধর্মে দীক্ষা দেওয়া হয়। প্রথম দিকে এই ধর্মান্তর ছিল ধীরগতি। কিন্তু যখন আফ্রিকান দাস শ্রমিকেরা বাইবেলের ব্যাখ্যাসমূহে তাদেরই মতো মানুষের ওপর নির্যাতন এবং মুক্তির সমান্তরাল প্রকাশ অনুধাবন করল, তখন সেই চেতনা অবলম্বন করেই আমেরিকার দক্ষিণের আফ্রিকান অধিবাসীরা নিগ্রোদের আধ্যাত্মিক চেতনাসমৃদ্ধ এমনসব লোককাব্য সৃষ্টি করতে থাকেন, যাতে ছিল তাদের বাসন্তব জীবনের দুঃখ, বেদনা এবং মুক্তির আকাঙক্ষার প্রকাশ। উত্তর আমেরিকার শ্বেতাঙ্গ অধিবাসীরা কালো মানুষদের খ্রিষ্টধর্মকে তাদের বাসন্তব জীবনের নিরিখে পালন করার এই পরিবর্তনশীলতা ভালো চোখে দেখেনি। কেননা, আফ্রিকানদের এই খ্রিষ্টধর্ম পালনের মধ্যে ছিল মানবমুক্তির বাণী, প্রতিবাদ এবং নির্যাতিত কালো মানুষের বীরত্বগাথার প্রকাশ। তাই কখনো কখনো বনের ভেতরের ক্যাম্প মিটিংগুলো নিষিদ্ধ করা হতো। তখন এই ক্যাম্প মিটিংয়ে অংশগ্রহণকারী নিগ্রো জনগণ গান করত, নাচে অংশগ্রহণ করতো এবং কখনো কখনো নৃত্যরত তারা পরমানন্দে দৈবাক্রান্ত অজ্ঞান অবস্থায় সম্বিতহারা হয়ে উঠত। ঘটনাটি যেন বাউলগন্ধময়। মানবতাবাদী অসাম্প্রদায়িক বাউলেরা যেমন গান এবং নৃত্য করতে করতে সম্বিতহারা হয়ে পড়তেন, আফ্রিকান-আমেরিকানদের ক্যাম্প মিটিংয়ের এই অধ্যান্তবাদী আচরণও তেমন বাউলিয়ানার সঙ্গে তুলনীয় বলে মনে হয়। এই অধ্যান্তবাদী লোককাব্য এবং গানগুলো যেমন ছিল দুঃখবোধের, তেমনি ছিল নিগ্রো দাসদের জীবনযুদ্ধের এবং কখনো তা ন্যায়-অন্যায় বোধের প্রকাশ। আফ্রিকান-আমেরিকান অধ্যান্তবাদী লোকসংগীতের মধ্যে সবচেয়ে বেশি সমাদৃত একটি গান হচ্ছে ‘এক সাথে চলো সব শিশু’ (Walk together children)। আমেরিকার দাসপ্রথা চালু থাকার সময় এই গানটি ছিল আফ্রিকানদের সম্মিলিত অভিব্যক্তির প্রকাশ। এই গানটিতে সেই ক্যাম্প মিটিংয়ে যোগদানের বাণী আছে যে-সভা হবে তাদের কাঙিক্ষত মুক্তি পাওয়ার অঞ্চলে। অর্থাৎ আমেরিকার যেসব অঞ্চলে দাসরা মুক্তিপ্রাপ্ত হয়েছিল (promised land), তেমনি স্থানে এই সম্মেলনের কথা বলা হয়েছে।

একসাথে হাঁটো সব শিশু

হয়ে পড়ো নাকো ক্লান্ত।

একসাথে চলো সব শিশু

হয়ে পড়ো নাকো ক্লান্ত।

আহা, একসাথে

বলো কথা সব শিশু

হয়ে পড়ো নাকো ক্লান্ত।

প্রতিশ্রম্নত মুক্তভূমিতেই

আমরা যে হবো সমবেত।

আমেরিকার দক্ষিণের আফ্রিকান অধিবাসীদের এই অন্তর্জাগতিক গান এবং কাব্য প্রচ-ভাবে উদ্বুদ্ধ করেছিল। অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষের দিকের কয়েক যুগব্যাপী এই আন্দোলন তীব্র আকার ধারণ করে। পরিণতিতে ১৮৬০ সালে আমেরিকার নিগ্রো দাসপ্রথা বিলুপ্ত হয়।

আফ্রিকান-আমেরিকান ক্রীতদাস কবি ফ্রেডারিক ডগলাসের জন্ম ১৮১৮ সালের ফেব্রম্নয়ারি মাসে এবং মৃত্যু ১৮৯৫ সালে। ফ্রেডারিক ডগলাসের কবিতা আফ্রিকান-আমেরিকান লোককাব্যের অংশ। লেখক, কবি, সম্পাদক, রাজনীতিক, দাসপ্রথাবিরোধী ফ্রেডারিক বেশ কয়েকটি আন্তজীবনীমূলক গ্রন্থ রচনা করেন। তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে আমার বন্ধন এবং আমার মুক্তি (My Bondage and My Freedom)। তাঁর সর্বশেষ আন্তজীবনীমূলক গ্রন্থে আমেরিকান গৃহযুদ্ধের পূর্ব ও পরের অবস্থা বর্ণিত হয়েছে। সুবক্তা ফ্রেডারিক ডগলাসের বক্তৃতা শুনে অনেকেই অবাক হতেন যে, একজন ক্রীতদাস কেমন করে এত ভালো বক্তৃতা করতে পারেন। ম্যারিল্যান্ডে দাস অবস্থা থেকে পলায়নের পর ফ্রেডারিক তাঁর বক্তৃতা এবং লেখার মাধ্যমে এতোটাই সুপরিচিত হয়ে ওঠেন যে, তিনিই প্রথম কৃষ্ণ আমেরিকান যিনি প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী ভিক্টোরিয়া উঠহলের সাথে উপ-রাষ্ট্রপতির পদে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেছিলেন। ফ্রেডারিক ডগলাসের লেখা লোককাব্যের একটি উদাহরণ :

আমরা গম উৎপাদন করি

ওরা আমাদের ভাঙা শস্যকণা খেতে দেয়।

আমরা পাউরুটি তৈরি করি

ওরা আমাদের পাউরুটির পোড়ানো পিঠ খেতে দেয়।

আমরা চালুনি দিয়ে শস্য ঝেড়ে দিই

ওরা আমাদের কুড়ো খেতে দেয়।

আমরা মাংসের চামড়া ছাড়িয়ে দিই

ওরা আমাদের মাংসের পর্দা খেতে দেয়।

এমনই ওরা হীন

আমাদের খাটায় রাত্রি-দিন।

আমরা দুধের ননি তুলে দিই

আমাদের শুধু তলানিটুকু জোটে

ওরা বলে চটে

নিগ্রোদের জন্য ওইটুকুই যথেষ্ট বটে।

(১৮৫৩) ক্রীতদাসগণ যাতে পালিয়ে যেতে না পারে সেজন্য ১৭০৪ সালে দক্ষিণ ক্যারোলিনায় প্রথম ক্রীতদাস-পাহারা বাহিনীর (slave patrol) সৃষ্টি হয়। আফ্রিকান-আমেরিকান দাসদের সংখ্যা অনেক বেড়ে যাওয়ার সাথে তাদের পালিয়ে যাওয়ার এবং তাদের মধ্যে বিদ্রোহের সূত্রপাত হওয়ার আশংকা বেড়ে যায়। বিশেষ করে যেখানে শস্যের আবাদ বেশি হতো সেখানে ক্রীতদাসদের সংখ্যাও ছিল বহুলাংশে বেশি। তাই তাদের পালিয়ে যাওয়া এবং বিদ্রোহ থেকে বিরত রাখার জন্য নিয়মিত সশস্ত্র পাহারার ব্যবস্থা করা হয়। এই সশস্ত্র বাহিনীর কাছে থাকত চাবুক এবং বন্দুক। পালিয়ে যাওয়ার সময় ধরা পড়লে অথবা কোনো ক্রীতদাস তাদের পরিচয়পত্র ছাড়া ধরা পড়লে তাদের মালিকের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হতো। এই আইন ভঙ্গকারী ক্রীতদাসদের ওপর মালিক যদি বিরক্ত হয়ে উঠত তখন তাদের বাজারে নিয়ে বিক্রি করে দেওয়া হতো। এই ক্রীতদাসরা তখন চিরকালের জন্য তার নিকটাত্মীয়দের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যেত, অবশ্য আমেরিকার গৃহযুদ্ধের পর এই ক্রীতদাসদের ওপর নিয়ন্ত্রণ অনেকটা শিথিল হয়ে পড়ে এবং তখন তাদের পক্ষে পালিয়ে যাওয়া অনেকটা সহজ হয়ে যায়। এমনই পলায়নপর একটি লোককাব্য :

পালারে নিগ্রো পালা

দাস-পুলিশেরা ধরে যে ফেলবে তোকে

পালারে নিগ্রো পালা

আঁধার পেরুলে ধরা পড়ে যাবি

তুই যে রে ঊষালোকে।

…   …   …

 

নিগ্রো ছুটেছে যেন সে ঘূর্ণিঝড়

কিংবা দারুণ ঘূর্ণায়মান চাকা

শস্যের ক্ষেত তছনছ করে দিয়ে

উধাও নিগ্রো, চারদিক শুধু ফাঁকা।

(১৮৫১)

বাইবেলের নির্যাতিত নিগৃহীত মানুষদের কাহিনিসমূহ দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে নিগ্রো ক্রীতদাসরা আন্তর্জাতিক বা অধ্যান্তবাদী গান, কবিতা রচনা করেন। বস্ত্তত যেসব কবিতা-গান ছিল বর্ণবাদবিরোধী অসাম্প্রদায়িক এবং আমেরিকান-আফ্রিকানদের নাগরিক অধিকার (civil rights) প্রতিষ্ঠার পক্ষে আন্দোলনের অংশবিশেষ। এই কবিতা এবং গানসমূহকে spiritual বলে চিহ্নিত করা হতো, কারণ এসব অধ্যান্তবাদী কবিতা-গান ছিল বাইবেলে বর্ণিত কাহিনিসমূহের (gospel) সমান্তরাল তুলনামূলক ঘটনার বর্ণনা। যদিও অধ্যান্তবাদী কবিতা-গান বলেই এদের পরিচিতি তথাপি বৃহদার্থে এগুলো মূলত ছিল আফ্রিকান-আমেরিকান লোককাব্য বা লোকসংগীতের অংশবিশেষ। মুক্তির বার্তা নিয়ে এসেছে এক রেলগাড়ি। অল্প ভাড়ায় সব শিশুই উঠতে পারবে তাতে এবং তারা সকলে মিলে এমন স্থানে যেতে পারবে যেখানে সকলেই মুক্ত এবং স্বাধীন এই রেলগাড়িতে ছোট-বড় ধনী-গরিবের ভেদাভেদ নেই, এবং সকল শিশুরই স্থান হবে এই রেলগাড়িতে। মুক্তির এমনই বার্তা একটি কবিতা বা গান, যা নিউ হ্যাম্পশায়ারের baptist minister জন চেম্বারলেইন লিখেছিলেন বলে ধারণা করা হয়। ১৮৬৩ সালের ২৬ এপ্রিল জন চেম্বারলেইন একটি গির্জায় রোববারের প্রার্থনা সভায় এই গান গেয়েছিলেন, যা ঐতিহাসিক ক্যাপ্টেন সাশা ডাবিস্নউ বাটলেট নথিভুক্ত করে গেছেন। ১৯৫০ এবং ’৬০-এর দশকে আমেরিকায় এটি আফ্রিকান-আমেরিকানদের নাগরিক অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে নিয়মিত গাওয়া হতো।

 

উঠে পড় ছোট শিশু রেলগাড়িতে

উঠে পড় ছোট শিশু রেলগাড়িতে

উঠে পড় ছোট শিশু রেলগাড়িতে

সবারই জায়গা হবে এই গাড়িতে।

 

মুক্তির রেলগাড়ি এসে গেছে ওই

খুব কাছে এসে গেছে রেলগাড়ি ওই

চাকার শব্দ শুনি দেখি গাড়ি ওই

ঘড়ঘড় শব্দ করে ছোটে গাড়ি ওই।

(১৮৭২)

নিগ্রো লোককবিতার সবচেয়ে বিখ্যাত কবিতা হচ্ছে – ‘জন হেনরি’। এ-কবিতার ভাবানুবাদ অনুযায়ী হেমাঙ্গ বিশ্বাস একটি গান রচনা করেন। তবে এ-কবিতা বেশ কয়েকটি ইংরেজি লোকগানের সুরে পরিবেশনাও আছে। এ-ইংরেজি গানের সুর এবং হেমাঙ্গ বিশ্বাসের করা সুরে যে উজ্জীবিত এবং উদ্বুদ্ধকরণের অনুপ্রেরণা আছে তা কোনোটার চেয়ে কোনোটা কম নয়। হাতুড়ির আঘাতে পাহাড় কেটে দীর্ঘ সুড়ঙ্গপথ তৈরি করার প্রতিজ্ঞায় জন হেনরি বাষ্পচালিত ড্রিল মেশিন পরাজিত করেন। ড্রিল মেশিন পরাজিত করে এক হাজার শ্রমিকের সঙ্গে জন হেনরি ড্রিল মেশিনের আগেই হাতুড়ির আঘাতে সুড়ঙ্গপথ তৈরি করে ফেলেন। জন হেনরি যেন ছিলেন এক জীবন্ত ইঞ্জিন। কিন্তু অত্যন্ত ক্লান্ত জন হেনরি রেলপথ তৈরি হওয়ার পরপরই বিশাল হাতুড়িতে আঘাতপ্রাপ্ত হয়ে রক্তক্ষরণে অবসন্ন হয়ে পড়ে মৃত্যুবরণ করেন। এই লোককাব্য এবং গানে রূপান্তরিত কবিতার কাহিনি ইংরেজি ballad শব্দের সমার্থক। এই কবিতা এবং গান শ্রমিকদের আন্তর্জাতিক কবিতা ‘আমরা করবো জয়ে’র মতোই জনপ্রিয়।

জীবনবাসন্তবতার এই সত্যকাহিনি চিরকালীন হয়ে গেছে মানুষের সংগ্রাম এবং জীবনযুদ্ধের ইতিহাসে। প্রস্ত্ততকৃত সুড়ঙ্গপথের কাছে গ্রেট বিয়ার নদীর বাঁকের কারণে স্থানটির নামকরণ করা হয়েছিল ‘বিগ বেন্ড টানেল’। এখানে  জন হেনরিকে স্মরণ রাখার জন্য স্থাপিত হয়েছে তাঁর ভাস্কর্য এবং ইতিহাসবিধৃত ফলক। আর পৃথিবীব্যাপী সমাদৃত শ্রমিক শ্রেণির সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে এবং মে দিবসের গানে ‘জন হেনরি’ একটি অনিবার্য উপস্থাপনা।

জন হেনরি বলে – হে ক্যাপ্টেন

আমি শহর ছাড়ার আগে, তিমির হাড়ের হাতল লাগানো

বার পাউন্ডের হাতুড়িটা চাই হাতে

হাতুড়ির ঘায়ে ছিটকে পড়বে ইঞ্জিন ড্রাইভার।

অষ্টাদশ, ঊনবিংশ এবং বিংশ শতাব্দীব্যাপী আমেরিকার আফ্রিকান কবি-শিল্পীদের মূল প্রেরণা ছিল তাঁদের জীবন থেকে উঠে আসা এমনসব গান এবং কবিতা। তাঁদের মুখে মুখে এসব কবিতা-গান কালো মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ত আমেরিকার এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রাস্তে। তাঁদের সংহতি, সহমর্মিতা এবং সাহস প্রদর্শনের এর চেয়ে উত্তম উপায় আর কিছুই ছিল না। বিশ্বসাহিত্যের ইতিহাস মানুষের জীবনকে অনুপ্রাণিত করে এমন লোককবিতা এবং সংগীতের তুলনামূলক উদাহরণ আর কোনো আছে বলে আমাদের জানা নেই। এমনই অসংখ্য গান, কবিতা, যন্ত্রবাদ্য, নৃত্য, তার কতটাই বা নথিভুক্ত হতে পেরেছে?

বিংশ শতাব্দীর দোরগোড়ায় যখন ভিক্টোরিয়ান যুগের ইংরেজি কবিতাকে পাশ কাটিয়ে নতুন সাহিত্য সৃষ্টির পালা, যখন নতুন শিল্পের সৃষ্টিশীলতা পৃথিবীব্যাপী, যখন প্যারিস-লন্ডন-নিউইয়র্কে এই পাশ্চাত্য সাহিত্যের নবযুগ সৃষ্টির মাতম, তখন সেই ১৯২০ সালের সময়ই আফ্রিকান-আমেরিকান কবিরা তাঁদের অসিন্তত্ব, সাহিত্য, শিল্প, ভাষা খুঁজতে গিয়ে আবিষ্কার করলেন যে, তাঁদের শিকড় আফ্রিকান-আমেরিকান লোককাব্য এবং লোকগানের মধ্যেই প্রোথিত। সেই বিশাল অনুভূতি থেকেই আফ্রিকান-আমেরিকান কবি-সাহিত্যিকদের মুক্তির দিশা সৃষ্টি হয় এবং ১৯২০ থেকে ১৯৩০ সালের মধ্যে ম্যানহাটনের হারলেমের সেই বিশাল উচ্চারণ সমসন্ত আফ্রিকান-আমেরিকানকে সম্বিত ফিরিয়ে দিয়েছিল। আফ্রিকান-আমেরিকানদের লোককাব্য লোকশিল্পের পথ ধরেই হারলেম রেনেসাঁসের সূত্রপাত হয়েছিল।

 

তথ্যসূচি

১.     ডুডলি র‌্যান্ডাল-সম্পাদিত, The Black Poets, Bantam Books, New York, April, 1985.

২.     মিতুল আহমেদ, ‘মে দিবসের গান; নাম তার ছিলো জন হেনরি’, https//www.priyo.com  01/05/2015.

৩.    Slave patrol, from the Wikipedia, (In reference to the free encyclopedia, ‘Run Nigger Run’), Collection Papers 1891-1951.

৪.     Thomas Washington Taley, ‘I will wear me a Cotton Dress’, Fisk University, USA, https://wikipidia.org/wiki/Thomas_w_Taller.

৫.     Frederick Douglass, My Bondage My Freedom (In Reference to ‘We Raise the Wheat’), https://www.org/wiki/Frederic_Douglass.

৬.    Harlem Reniaisance, https://em.wikipedia. org/wiki/Harlem_Renaissance.

৭.     African American Spirituals, The Library of Congress, https:// www.loc.gov/ item/ihas, 200197495/ .

৮.    Mark A. Sanders, African American Folk roots and Harlem Renaissance poetry, Cambridge University Online @ Cambridge University Press 2007.

৯.             Sterling Brown, The Spirituals ‘Negro Fock Expression; and Spirituals, Seculars, Ballads and Work Songs, Modern American Poetry’, Atlanta University 1953. r

শেয়ার করুন