আবদুল মতিনের ছয় পর্ব

মনি হায়দার

আবদুল মতিন বরাবরই ব্যতিক্রম। অথবা বলা যায় ব্যতিক্রম হওয়া, ব্যতিক্রম থাকাটাই পছন্দ, ওর হবি। প্রসঙ্গক্রমে মতিন বলে – সমাজের আর পাঁচজন মানুষের চেয়ে একটু আলাদা থাকা ভালো। তর্কে তর্ক বাড়ে। সে-পথে না গিয়ে বন্ধুরা ওর যুক্তি মেনে নেয়।

যেমন মেনে নিয়েছে মিতা।

মতিন সাইকোলজিতে মাস্টার্স শেষ বর্ষে। অর্থনীতিতে অনার্স দ্বিতীয় বর্ষে মিতা। দুজনার প্রথম পরিচয় বাসে। ইউনিভার্সিটির বাসে ওরা আসা-যাওয়া করত। আনন্দ বাস সার্ভিসের রুট বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস-শাহবাগ-বাংলামটর-মালিবাগ-রামপুরা-বাড্ডা পর্যন্ত। মতিন উঠত বাড্ডা থেকে। মতিনের ওঠার পর বাসে আর বসার সিট থাকত না। পরে যারাই উঠত দাঁড়িয়েই থাকতে হতো। পরের স্টপেজ থেকে উঠত মিতা! কয়েকবারমতিন দাঁড়িয়ে থেকে মিতাকে বসতে দিয়েছে।

সম্পর্কে সূত্র নির্মাণ হয়ে যায়। মতিন আর মিতার মধ্যে প্রায়ই দেখা হতে লাগল ক্যাম্পাসে, করিডোরে। খুচরো আলাপের সূত্রপাত হলো। মাসদুয়েকের মধ্যে মতিন আর মিতা একে অপরকে অনেকটা চিনে নেয়। খনন করল দুজনকে নিজস্ব বিন্যাস ও রঙে। মিতা মুগ্ধ আবদুল মতিনের নির্ভেজাল সরলতায়। সম্পর্কের তিন-চার বছরে মতিন দারুণ ধৈর্যের পরিচয় দিয়েছে। মাত্র কয়েকবারই মিতার হাত, চিবুক স্পর্শ করেছে। কারণ মিতাকে কতটুকু, কখন, কীভাবে স্পর্শ করবে তারও একটা ব্যতিক্রমী ধারণা আছে মতিনের। নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের সমত্মান আবদুল মতিন। একটা মূল্যবোধ… ওর ভেতর ক্রিয়াশীল। সমাজ ভাঙা কিংবা যৌবনের উন্মাতাল উত্তেজনাকে মতিন শক্ত হাতে লাগাম টেনে ধরে। ঢাকায় থাকে দূরসম্পর্কের এক মামার বাসায়। মামার দু-ছেলেমেয়েকে পড়িয়ে অন্ন এবং থাকার জায়গা জোগাড় করেছে। শুরুতে মিতার প্রতিক্রিয়া বুঝতে পেরে মতিন বলেছে – মিতা, আমার ওপর তোমার কিছুটা ভুল ধারণা আছে।

যেমন?

যেমন সমাজের আর কজন থেকে আমি ভিন্নরকম। আমার চিমত্মায় কিছুটা সেকেলে ধারণা আমি নিষ্ঠার সঙ্গে লালন করি। সেটাকে হীনমন্যতাবোধ বা অসহায় অবস্থা ভেবো না আবার।

মতিন, ভালো বিষয় সব সময়ই ভালো। সেকেলে বলে কোনো ব্যাপার আমি মানি না, প্রত্যুত্তর মিতার।

ঠিক সেকেলে নয় – বলতে পারো এক ধরনের মূল্যবোধের।

সে তো আরো ভালো। মূল্যবোধ মানেই শাশ্বত একটা বিষয়। যে-মানুষের ভেতর শাশ্বত সত্য নেই, সে তো মানুষই নয়।

চমৎকার মিতা – তুমি আমাকে পাঠ করতে পেরেছ।

তাই?

হ্যাঁ। তোমার কাছে এতদিনে পরিষ্কার যে, আমাদের গভীর থেকে গভীরে মেলামেশায় আমি মাত্র কয়েকবারই তোমার হাত বা চিবুক স্পর্শ করেছি। যদিও যথেষ্ট সুযোগ ছিল তোমাকে আরো নিবিড় করে পাওয়ার। তোমার কি মনে হয় না, এই সময়ে, যখন হাতের মুঠোয় মোবাইল, নেট আর কত বিচিত্র সুযোগ… আমি সব জানি; কিন্তু…

আসল কথা বলো, মিতা নির্মল হাসে।

তোমার মনে প্রশ্ন উঠতে পারে, আমার মতো একজন তরুণের পক্ষে এতখানি স্বায়ত্তশাসন সম্ভব কিনা? বিশেষ করে শারীরিক সংরাগ… আর কারো কথা বলতে পারি না, আমার কথা বলছি – আমি তোমাকে সম্পূর্ণ আমার করে পেতে চাই। যখন আমি জানি তুমি আমার, তখন তোমাকে কষ্ট দেবো কেন? একদিন সব অপেক্ষার অবসান শেষে আমি তুমি –

মিতা হাত ধরে মতিনের। থেমে যায় মতিন। দুজন নির্বাক। সব কথা শেষ বুঝি! মতিন?

বলো মিতা।

বিশ্বাস করো, তোমার মতো ছেলে এ-যুগে পাওয়া সত্যি ভাগ্যের ব্যাপার। জানো, মানুষের নষ্ট হতে সময় লাগে না। কিন্তু নিজেকে তৈরি করতে, হারানো গৌরব পুনরুদ্ধার করতে অনেক সময় লাগে। কখনো এমন হয় যা, সামান্য সময়ের মৌতাতে হারিয়ে যায়, কখনো সেটা ফিরে আসে না। ফিরিয়ে আনাও সম্ভব নয়। আজকাল আমাদের চারপাশে কত বিচিত্র মানুষ দেখি, একজনের সঙ্গে একজনের সম্পর্ক গড়ে উঠতে না উঠতেই ভেঙে যায়। সেখানে আমরা দুজনে নিঃশব্দে বয়ে চলেছি একে অপরের হাত ধরে, নির্মল আর সুন্দরের পথে…।

আজ তোমাকে খুব ভালো লাগল আমার, আবেগের সঙ্গে বলে মতিন।

এটা আমার প্রতি তোমার ভালোবাসাই নয়, নারী হিসেবে আমাকে যে-সম্মান দিলে তার তুলনা হয় না।

মতিন আলতোভাবে আঙুল ছোঁয়ায় মিতার ওষ্ঠে – আমাকে কখনো ভুলে যেও না। ভুল বুঝো না। আমি খুব সাধারণ মানুষ। তোমাকে ভালোবেসে আমি সাধারণ অসাধারণ হতে চাই।

আমিও…। মতিন আর মিতা ক্যাম্পাসের ঘাসের ওপর উলস্ন­vসে আর বিভঙ্গে হাসিতে ফেটে পড়ে।

 

মিতা অসম্ভব সুন্দরী।

ওর দিকে অনেকেরই দৃষ্টি ছিল। যারা সবদিক দিয়ে যোগ্যতরও বটে। অথচ মতিন সবাইকে টেক্কা দিয়ে মিতাকে নিজের করে নিয়েছে। অন্যরা ভেবে পায় না, কী এমন আছে মতিনের, যা দেখে মিতা ওর দিকে ঝুঁকল? ভাবনা পর্যন্তই সার। আসল রহস্য কেউ উদ্ঘাটন করতে পারে না। মানুষ কখন, কাকে, কীভাবে কোথায় আবিষ্কার করে ভাবা মুশকিল।

মতিনের পরীক্ষা শেষ। ওরা এখন নিয়মিত আড্ডা দেয় ক্যাম্পাসে বন্ধুদের সঙ্গে। ক্লাসশেষে মিতা বেরিয়ে এলে আড্ডা বসে কেবল ওদের দুজনের। ঘণ্টার পর ঘণ্টা আড্ডা। বন্ধুরা ভেবে পায় না – দিনের পর দিন কী এত কথা বলে মতিন আর মিতা? কথার মধ্যে অনেক বিষয়ই থাকে। রাজনীতি, অর্থনীতি, সমাজনীতি, সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি থেকে আরম্ভ করে ভবিষ্যতে কীভাবে সাজাবে সংসার, সেই স্বপ্ন পর্যন্ত ছবি আঁকে। প্রতি সপ্তাহে মতিন কমপক্ষে তিন-চারটি চাকরির আবেদনপত্র ছাড়ে ডাকে নয়তো ই-মেইলে। ছাড়ার পর স্বপ্নের জাল বোনে আরো তীব্রতায়। অংশীদার মিতা। মাঝেমধ্যে দু-একটা চাকরির ইন্টারভিউ দেয়। ইন্টারভিউ দিতে দিতে মতিনের একটা চাকরি সত্যি সত্যি হয়ে যায়।

বন্ধুরা সেলিব্রেট করে। মিতা আত্মহারা। এতদিনে স্বপ্নের ভালোবাসায় ফুল ফোটার আয়োজন হচ্ছে। মতিন বাকহারা। চাকরি পাওয়া আজকাল স্বর্গে আরোহণ করার মতো একটা ব্যাপার। এখন মতিন একটি স্বর্গের অধিপতি। মিতা এবং মতিন আবার পরিকল্পনা সাজায়।

মিতার মাস্টার্স পরীক্ষা হতে বছরদেড়েক বাকি। এখনই কি ওরা বিয়ে করবে? বিয়ে করার আগে মিতার মা-বাবাকে জানাতে হবে। বাবা-মা মতিনকে কীভাবে নেবেন সে-বিষয়ে স্থির নয় মিতা। মতিন এখনো চাকরিতে যোগ দেয়নি। মতিনের একটাই কথা – বিয়ে হলে তোমাকে ছাড়া একমুহূর্তও থাকতে পারব না। এমনিতেই অসম্ভব কষ্টে আছি।

আমার কষ্ট নেই? ভারি কণ্ঠ মিতার।

জানি, মিতা জানি। মিতার ডান হাতের তালুতে ওষ্ঠ ছোঁয়ায় মতিন।

কেঁপে ওঠে মিতা। কাঁপে কাঁঠাল পাতা। মাঠের ঘাস কাঁপে। শরীরের গোপন সুড়ঙ্গে ওঠে ঝড়।

মিতা?

বলো।

বিয়ে আপাতত থাক। ধরো তোমার-আমার বিয়ে হলো। তুমি রইলে এখানে আর আমি ওপারে। কষ্ট কেবল বাড়বে। কারণ তখন বাড়বে মাংস ও রক্তের স্বাদ –

দুষ্টুমি করো না পিস্ন­জ, আমি সইতে পারব না।

থাক তাহলে। আমি আগে জয়েন করি। দেখি পরিবেশ কেমন? তাছাড়া চাকরি করতে হবে ঢাকার বাইরে। তোমাকে ছেড়ে দূরে, ঢাকার বাইরে কেমন করে থাকব ভাবতেই পারছি না।

বাধা দেয় মিতা – এভাবে বলো না। কত কষ্টের পর একটা চাকরি পেলে! যাও জয়েন করো। প্রতি সপ্তাহে তো একবার ঢাকায় আসছ?

অবশ্যই! তোমাকে না দেখে থাকব কী করে?

আর কথা নয়। তুমি জয়েন করো। এই ফাঁকে কিছু টাকা জমাও। সংসারে অনেক খরচ। নিজের সিদ্ধান্ত জানায় মিতা।

সংসারের খরচের সংবাদ সংসার না করে কীভাবে বুঝলে?

মাকে দেখে।

মতিন ঢাকার বাইরে চাকরিতে যোগ দেয়। ওর জীবনে অন্যদিকের জানালা খুলে যায়। বেসরকারি অফিস। অনেক কাজ। সকাল নটায় শুরু হয় অফিস। শেষ হয় সন্ধ্যা সাড়ে ছটায়। মাঝখানে এক ঘণ্টা লাঞ্চের ছুটি। অফিসের এক কলিগের সঙ্গে আপাতত থাকছে মতিন। সামনের মাসে নতুন মেসে উঠবে। অফিসে কাজের শেষ নেই। কাজের ভিড়ে ডুবে থাকলেও মতিন ক্যাম্পাসে ফেলে আসা মিতাকে ভুলতে পারছে না। মতিন ভেবেছিল ছুটির দিনগুলোতে ঢাকায় এসে মিতাকে কাছে পাবে, তাও হচ্ছে না। ছুটির দিনেও কাজ থাকছে। অবশ্য ওভারটাইমের টাকা পাবে। মতিন গভীর রাতে চিঠি লেখে মিতাকে। সব চিঠি পোস্ট করে না। কিছু কিছু করে। অযথা মেয়েটাকে পাগল বানাবার প্রয়োজন নেই। চিঠি আসে মিতার। দুজনার চিঠিতে কেবল আকুতি।

 

পর্ব দুই

মাসছয়েক পর মিতার চিঠি আসা একেবারে বন্ধ। ফেসবুকেও নেই। নেটে নেই।

কিংকর্তব্যবিমূঢ় মতিন। অনেক কষ্টে সে ছুটি ম্যানেজ করে ঢাকায় আসে। ক্যাম্পাসে এসে বন্ধুদের কাছে জানতে পায়, মিতার বিয়ে হয়েছে। মতিন পরদিনই ফিরে যায় মফস্বলে, চাকরিস্থলে।

 

পর্ব তিন

মানুষের পক্ষে সবকিছু করা সম্ভব। যেমন করেছে মিতা। আক্ষেপ করে প্রচুর কষ্ট উপভোগ করেছে মতিন। মানুষ সব কষ্টকে যেভাবে হজম করে, মতিন ছয়-সাত মাসের মধ্যে স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় স্বাভাবিক হয় এবং একসময় ভুলে যায় মিতা নামের এক মেয়েকে। যাকে সে ভালোবেসেছিল নিজের নিঃশব্দ নিশ্বাসের মতো পরম অহঙ্কারে।

পারিবারিকভাবে মতিনরা সামান্য স্বাচ্ছন্দ্য অর্জন করেছে। মতিন এখন ঢাকায় থাকে। আর একটি ব্যাংকে চাকরি করছে। আগের চেয়ে বেতন অনেক বেশি। জীবনকে নতুনভাবে আবিষ্কার করার চেষ্টা করছে মতিন। গ্রামে মা-বাবা বেশ কয়েকবার বিয়ের জন্য প্রস্তাব পাঠিয়েছে। মেয়ে দেখা হচ্ছে মতিনের জন্য।

আমার বিয়ে করার সময় হয়নি, মতিন জানিয়েছে।

না, মতিনের ভেতর ওই জাতীয় কোনো ভাবালুতা কিংবা পবিত্র থাকার বা রাখার প্রাচীনত্ব এখন একেবারে নেই। নগদ প্রাপ্তিতে একশভাগ বিশ্বাস এখন আবদুল মতিনের। বন্ধুদের সঙ্গে হঠাৎ  কোথাও দেখা হলে ক্যাম্পাস নিয়ে রোমন্থন হয়। কেউ কেউ মিতা প্রসঙ্গ তুলতে চাইলে মতিন জানায়, যা গেছে তাকে যেতে দে। ওসব নিয়ে ভাবি না একদম।

তিন বছর পর হঠাৎ একদিন বিকেলে মতিন আবিষ্কার করে, ওর সামনে মিতা। মতিন মার্কেটিংয়ে গিয়েছিল। সামনের একটা পরের দোকানে মিতা। সঙ্গে একজন ভদ্রলোক। দেখে মনে হয় বনেদি পুরুষ। স্বাস্থ্যবান। উজ্জ্বল চেহারা। হাতে দামি ঘড়ি। মিতা আগের চেয়ে আরো সুন্দর হয়েছে। অলংকারের ভারে দুলছে ও। কী একটা জিনিসের দাম করতে করতে মিতা হাসছে। দুলে দুলে পড়ছে ভদ্রলোকের শরীরে। কী নিবিড় তন্ময় ওদের! আর মতিন?

 

পর্ব চার

মতিনের করোটিতে তীব্র ক্রোধ উছলে ওঠে। হারিয়ে যাওয়া দিনগুলোর প্রতিবিম্ব চোখের সামনে দাউ দাউ জ্বলছে লেলিহান শিখায়। মতিনের আপাতনিরীহ ভালো মানুষের ভেতর লুকানো লোলুপ পাষ- প্রবৃত্তি বেরিয়ে পড়ে। সামনে অনিন্দ্যসুন্দর মিতাকে  দেখে নিজেকে মানবিক মানুষ ভাবতে পারে না। প্রতিশোধের এক হলাহল ওকে আক্রমণ করে পৈশাচিক উলস্ন­vসে। এখনো কতখানি শুচিশুভ্র আর পবিত্র আছে মিতা? সেই সুরম্য পবিত্রতাটুকু দেখার দারুণ ইচ্ছা হয়। মতিনের করোটির ভেতর আর একজন মতিন দাঁড়িয়ে যায়। মতিনের প্রতিপক্ষ আর একজন দানব মতিন, যে বাইরের মতিনের প্রবল প্রতিপক্ষ ন্যায়বোধকে পানকৌড়ির সুস্বাদু মাংসের মতো চিবিয়ে খায়। টাটকা তাজা মাংসের স্বাদ মতিনকে এই মানচিত্র থেকে অন্য বীভৎস এক মানচিত্রে নিয়ে যায়।

 

পর্ব পাঁচ

মিতার স্বামী ভদ্রলোকের নাম ইরফান আলি। ব্যবসায়ী মানুষ। প্রচুর টাকা। টাকার দামে মতিনের কাছ থেকে কেড়ে নিয়েছে মিতাকে। বিশাল মার্কেটে ঘুরতে ঘুরতে ইরফানের প্রস্রাবের বেগ পায়। মিতাকে অপেক্ষা করতে বলে ইফরান বাথরুমে যায়। মিতা একা দাঁড়িয়ে মানুষ-গাড়ির আসা-যাওয়া দেখছে।

কেমন আছ মিতা?

কে? চমকে পেছনে ফেরে মিতা। তুমি? থরথর ঠোঁট কাঁপে উত্তেজনায়।

চিনতে পেরেছ তাহলে? মৃদু হাসে মতিন। আমি তো ভেবেছিলাম তুমি চিনতেই পারবে না।

মিতার দুচোখে ভয়ের কালো সাপ দাঁড় বায়। ইরফান যেদিকে গেছে সেদিকে বারবার তাকায়। মতিন বুঝতে পারে, মুখোমুখি হোক দুই প্রতিদ্বন্দ্বী – চায় না মিতা। এই সুযোগটা গ্রহণ করে মতিন।

তোমার সঙ্গে আমার কিছু কথা ছিল মিতা।

এখন না বললেই নয়? আমি ফোন নম্বর দিচ্ছি। তুমি পরে আমার সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করো।

না, আমার সামান্য কথা এখনই বলতে চাই। তোমার অসুবিধা হলে চলো – একটু আড়ালে যাই।

অনিচ্ছা সত্ত্বেও রাজি হয় মিতা, চলো। পিস্ন­জ একটু তাড়াতাড়ি কথা সারো। আবার ও এক্ষুনি এসে পড়বে।

মিতাকে আড়ালে রাস্তার কিনারে নিয়ে যায় মতিন। আগে থেকে ঠিক করা গাড়িতে এক ঝটকায় তুলে ফেলে মিতাকে। ড্রাইভার চোখের পলকে স্টার্ট দিয়ে অনেক দূরে চলে আসে। মিতা প্রথমে হতবাক পরে চিৎকার দিয়ে উঠলে মতিন শরীরের সমস্ত শক্তি দিয়ে থাপ্পড় মারে গালে। মতিনকে অবিশ্বাস্য দৃষ্টিতে দেখে মিতা।  দেখতে দেখতে হু হু চাপাকান্নায় ভেঙে পড়ে। মজার বিষয় হলো, মিতার এই অসহায় কান্না, কান্নার শব্দ, শরীরের কেঁপে-ওঠা দারুণভাবে উপভোগ করে মতিন। কোনো নারীর কান্নায় এত থইথই আনন্দ থাকতে পারে জানা ছিল না। মিতার কান্নার থইথই সুর হারানো দিনের প্রিয় গানের মতো লাগে।

মিতাকে নিজের কক্ষে ঢোকায়। দাঁড়ায় মুখোমুখি। মিতা নিজেকে এ-অবস্থায় দেখবে কখনো ভাবেনি। এ-মুহূর্তে অসহায় একজন মানুষ। ওর এই অসহায়ত্ব দারুণভাবে উপভোগ করে মতিন।

কী চাও তুমি? মিতা বুঝতে পারে, আজকের দিনটি নিজের জন্য স্মরণীয় এক দুঃস্বপ্ন।

তোমাকে।

আমাকে?

হ্যাঁ, তোমাকে আর তোমার পবিত্রতাকে।

কেঁপে ওঠে আবার মিতা, তুমি? তুমি আমাকে নষ্ট করবে? তুমি তো এমন ছিলে না মতিন?

মুখোমুখি দাঁড়ায় মতিন। পেছনে হাঁটে মিতা – ছিলাম না ঠিক; কিন্তু এখন হয়েছি। আর আমার পরিবর্তনের অনুঘটক তুমি। একমাত্র তুমি মিতা।

মতিন, আমি জানতাম আমাকে একদিন তোমার মুখোমুখি হতে হবে; কিন্তু এরকম পরিবেশে –

মিতা, আমি তোমাকে বেশিক্ষণ রাখব না। আমি কেবল সেই সুষমা মাধুর্যটুকু উপভোগ করব, যা তোমার শরীরের কোষে কোষে আমি জমা রেখেছিলাম। আমি আর পাঁচটা রাক্ষুসে ছেলে ছিলাম না। অন্যদের মতো যদি তোমাকে, তোমার নারীত্বকে কুকুরের মতো চেটেপুটে খেয়ে কলার ছোবড়ার মতো ডাস্টবিনে ফেলে দিতাম –  তুমি আমার সঙ্গে প্রতারণা করতে পারতে না। আমার সরলতা, আমার মানবিকতা, তোমার প্রতি আমার সম্মানকে এভাবে ভূলুণ্ঠিত করতে পারতে না।

মতিন আমার কথা শোনো –

আজ আমার কথা শোনার সময় নেই। এখন আমি তোমার ভেতরে অবগাহন করব। আমার দীর্ঘদিনের বাসনাকে আজ চরমভাবে উপভোগ করব – মতিন ক্ষিপ্রগতিতে মিতার আঁচল ধরে টান দেয়। পুরো শাড়িটা মতিনের হাতে।

মিতার শরীরে পেটিকোট, সিস্নভলেস বস্ন­vউজ। গ্রীবা আর বস্নাউজের হাতার ফাঁকে কালো ব্রার ফিতে কামড়ে ধরেছে ধবধবে দুধসাদা ফর্সা মাংস। নাভির প্রায় ছয় আঙুল নিচে বাঁধা পেটিকোট। বস্ন­vউজ আর ব্রা আটকে রেখেছে সুস্পষ্ট স্তনজোড়া। বাকিসব উদারভাবে উন্মুক্ত মতিনের সামনে। বুভুক্ষু মতিন এত সৌন্দর্য দেখে চমকিত। চোখ ঝলসে যাচ্ছে, পুড়ে যাচ্ছে দৃষ্টি। হঠাৎ সৌন্দর্যের এমন নান্দনিক উদ্ভাসে বিভ্রান্ত একজন আবদুল মতিন। কত বছর পর, যৌবনের পস্ন­vবন আসার পর, এই প্রথম সে কোনো নারীকে অমনভাবে দেখার…। ওর চোখ সইতে পারছে না মিতার শরীরের অলৌকিক সৌন্দর্যসম্ভার।

মিতা দুহাতে কাঁধ ঢেকে পেছনে ফিরে দাঁড়ায়। দুচোখে অবিরল জল। কষ্টে ফাটছে বুকের ছাতি।

মতিন পেছন থেকে আলতোভাবে জড়িয়ে ধরে মিতাকে – কেমন আছো সোনা? চুমু খায় ঠোঁটে। সঙ্গে সঙ্গে এক কামড়
বসায় গালে। তীব্র চিৎকারে নেতিয়ে পড়ে মিতা। বস্ন­vউজের বোতাম খোলে মতিন।

আমাকে ক্ষমা করো মতিন, পিস্ন­জ, ক্ষমা করো। মতিনের বাহুপাশ থেকে নিজেকে মুক্ত করে মিতা সামান্য দূরে দাঁড়ায়। আমি খুউব ভালোভাবে জানি, আমাকে নষ্ট করার অধিকার আছে তোমার। তুমি কেবল আমার বাইরের রূপটাই দেখলে। এই দেখো আমার হাতে পাঁচ বছর আগে তোমার পরিয়ে দেওয়া আংটি।
আমি আজো খুলিনি। আর খুলব না কোনোদিন। কারণ আমায় ভালোবেসে একদিন তুমি এই আংটি পরিয়েছিলে। আমার বিয়ে হয়েছে, আমি সংসার করছি সবই সত্য। কিন্তু এটাও সত্য, আমি তোমাকে আজো ভালোবাসি। কারণ ভালোবেসে তুমি আমাকে যে-সম্মান, যে অপূর্ব ভালোবাসা দিয়েছিলে তা মানুষ হিসেবে কখনো ভুলে থাকা যায় না।

কিন্তু ভালোবাসাকে অস্বীকার করে অন্য পুরুষকে বিয়ে তো করা যায়! শেস্ন­ষ মতিনের কণ্ঠে। প্রতিশ্রম্নতি বেমালুম ভুলে গিয়ে, আমাকে নির্বাসনে পাঠিয়ে দিয়েছ।

নিরুত্তর মিতা।

এমন কথা কি ছিল আমাদের? প্রশ্ন করে মতিন। ঢাকার বাইরে যাওয়ার আগে তোমার সঙ্গে সব বিষয়ে আমার আলোচনা হয়েছিল। তোমাকে ঠিকানা দিয়েছিলাম। বলেছিলাম, যে-কোনো সমস্যা হলে সরাসরি যোগাযোগ করবে। আমি চলে আসব। অথবা তুমি চলে যাবে। তুমি সব কথা মেনে নাওনি?

নিয়েছিলাম, স্বীকার করে মিতা।

কেন আমাকে না জানিয়ে বিয়ে করলে? আমাকে পছন্দ না হলে তুমি জানিয়ে দিতে। কেন প্রতারণা করলে? আমার সারাজীবনের শারীরিক কামনাকে অবদমন করে তোমাকে রক্ষা করেছি। অথচ মিতা – কত সুযোগ এসেছিল, তোমাকে উচ্ছিষ্ট বানিয়ে পথে ফেলে রাখতে পারতাম।

মতিন?

বলো।

তোমার সব কথাই সত্যি। আমি আমার অবস্থান ধরে রাখতে পারিনি। আমি পরাজিত। আমি লোভ ও স্বার্থের কাছে হেরে গেছি। তুমি ঢাকা ত্যাগের পর আমার বিয়ের প্রস্তাব আসে। পরিবার থেকে আমাকে বোঝানো হলো – তুমি নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের মানুষ। জীবনে আমি তোমার সংসারে সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য পাব না। এক ভয়াবহ কষ্টের ভেতর আমার জীবন কাটবে।

আর তুমি সবকিছু ভুলে স্বার্থপরের পরাকাষ্ঠা দেখিয়ে মেনে নিলে? মতিনের কণ্ঠে ক্ষোভ।

মতিন, স্বার্থপরতাই তো মানুষের ধর্ম, মানুষের কর্ম। তাছাড়া পারিবারিকভাবে অবস্থা এমন চূড়ান্তে পৌঁছে যে, আমার কিছু করার ছিল না।

তবে তাই হোক। তুমি তোমার স্বার্থ দেখছ। এখন আমার স্বার্থ দেখার সময়। নিশ্চয় তুমি আমাকে সহায়তা করবে – মতিনের লোলুপ চোখের দিকে তাকায় মিতা। চোখের ভয়ংকর দৃষ্টির আগুনে প্রতিশোধের হলাহল দেখে মিতা বিভ্রান্ত। অসহায়। মতিনের  ভেতরের শ্বাপদ পশুকে দেখতে পারছে না মতিন। অচেনা মতিন আজ চেনা আবদুল মতিনকে ছাপিয়ে গেছে। স্থির প্রতিজ্ঞাবদ্ধ, কোনোভাবেই আজ মিতাকে ছাড়বে না। রক্ত-মাংসের টাটকা স্বাদের নেশায় অচেনা মতিন বাঘের মতোই ক্ষিপ্ত, ব্যাগ্র।

মতিন!

বলো লক্ষ্মীটি –

আমি স্বার্থপর, নীচ, অমানুষ। আমার সমান তুমি হয়ো না। তুমি আমার কাছে অনেক বড় একজন মানুষের প্রতিকৃতি। আমার স্বামী অনেকবার এই আংটি সম্পর্কে জানতে চেয়েছে। আমি তাকে বলেছি –

কী বলেছ মিতা? মতিনের ঠোঁটে শেয়ালের ধূর্ত হাসি।

বলেছি, এই আংটিটি একজন মহৎ মানুষের স্মৃতি। এটা কোনো সাধারণ আংটি নয়। এটা আমার জন্য আশীর্বাদও।

ব্রার হুকে হাত রাখে মতিন, ওসব ন্যাকামার্কা কথা তোমার স্বামীকে শুনিয়ো। আমাকে শুনিয়ে কোনো লাভ নেই। বুকের সঙ্গে লেপ্টে ধরে আদিম শীৎকারে মেনে ওঠে মতিন।

পিস্ন­জ, মতিন আমার একটা কথা শুনো পিস্ন­জ।

বলো। মিতাকে বুক থেকে নামায়। খাঁ খাঁ নগ্ন কাঁধে মতিনের ডান হাত।

আমার পেটে বাচ্চা –

তাতে আমার কী?

আমাকে দয়া করো। আমি তোমার কাছে দয়া প্রার্থনা করছি। আমার সংসার ভেঙে কী লাভ তোমার? নিষ্পাপ শিশুটিকে বাঁচতে দাও – মতিনের দুটি পায়ের ওপর আছড়ে পড়ে মিতা – আমি যদি তোমার বোন হতাম –

মিতা, পায়ের ওপর থেকে তোলে বাহুর ওপর মতিন, তোমার সর্বশেষ অস্ত্র প্রয়োগ – শেষ। আমি আমার সিদ্ধান্তে অনড়। এসো এতদিন পর তোমার শরীরের গোপন সুড়ঙ্গে প্রবেশ করি। মিতার সারাশরীর কাঁপে ভয়ে-বেদনায় ভবিষ্যৎ সর্বনাশের আতঙ্কিত আশঙ্কায়। মতিন সাক্ষাৎ জানোয়ার। মিতা চিৎকার দিয়ে জ্ঞান হারায়। মতিন মিতাকে অপলক চোখে দেখতে থাকে।

 

পর্ব ছয়

প্রিয় পাঠক, আপনার কি মনে হয়েছে, এই গ্রহের নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের একজন আবদুল মতিনের পক্ষে বিশিষ্ট ধনাঢ্য ব্যক্তি ইরফান আলির স্ত্রীকে তুলে আনা সম্ভব? তুলে এনে নিজের বাসায় মিতাকে নিয়ে লাটাই খেলা? আপনারা বাস্তবতার আলোকে দেখেছেন, এভাবে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা যায় না। আবদুল মতিনের ছয় পর্বের এই গল্পে মতিনের সঙ্গে চতুর্থ পর্ব পর্যন্ত ঘটনার বিন্যাস ঘটেছে ঠিকই। কিন্তু পাঁচ পর্বে ঘটে যাওয়া ঘটনাটি আবদুল মতিনের মতো অসহায় ক্ষমতাহীন মানুষের কল্পনায় প্রতিশোধ নেওয়া ছাড়া বিকল্প থাকে না। আর এভাবে কল্পনায় পরাজয়ের প্রতিশোধ নিতে পারে বলেই আবদুল মতিনরা টিকে থাকে। r

শেয়ার করুন

Leave a Reply