আবেগ ও সংবেদনার অনুরণন

লেখক:

এস এম সাইফুল ইসলাম

মহান রুশশিল্পী ভাসিলি কান্দিনিস্কি একবার লিখেছেন – একটি বিন্দু থেকেই সবকিছুর সূত্রপাত। জীবন ও শিল্প প্রসঙ্গে এর চেয়ে সহজ ও সুন্দর দর্শন আর হয় না। বিন্দু থেকে সিন্ধু যেমন বিবেচ্য, একই সঙ্গে বিন্দুতেই সবকিছুর প্রত্যাবর্তন অনিবার্য। মহাশূন্যে বিলীন হওয়ার মধ্য দিয়েই সবকিছুর সমাপ্তি। জীবনের স্বরূপ, গভীর উপলব্ধি, সময় ও বোধের প্রতিফলনেই রচিত হয় প্রকৃত শিল্প। প্রতিটি শিল্পধারা সৃষ্টির নেপথ্যে রয়েছে সেই সময়ের সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক অবস্থার গভীর প্রভাব ও যোগসূত্র। প্রতিটি বিষয় যেন একই শেকলে বাঁধা। ঊনবিংশ শতাব্দীর চল্লিশের দশকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে নাগরিক জীবনে নেমে আসে চরম নৈরাশ্য, বিচ্ছিন্নতাবোধ, অবিশ্বাস, নৈতিক-অবক্ষয়সহ নানাবিধ সংকট। এই সংকটকালেই সৃষ্টি হয় অ্যাবস্ট্র্যাক্ট এক্সপ্রেশনিজম বা বিমূর্ত প্রকাশবাদ শিল্পধারা। এই শিল্পধারার অনুসারী শিল্পী মোহাম্মদ কিবরিয়া ও শিল্পী আমিনুল ইসলাম এদেশে বিমূর্ত চিত্রকলা চর্চা ও বিকাশে পথিকৃতের ভূমিকা রেখে গেছেন। প্রসঙ্গত উল্লেখ প্রয়োজন যে, কিবরিয়া স্কুলের অনুসারী অসংখ্য চিত্রকর থাকা সত্ত্বেও তাঁদের মধ্যে সমর্থ শিল্পীর সংখ্যা বস্ত্তত অপ্রতুল। বোধকরি, বিমূর্ত চিত্রকলার মাঠে অন্য কোনো আভাঁগার্দ শিল্পীর জন্য আমাদের বহু বছর প্রতীক্ষায় থাকতে হবে।
সম্প্রতি বেঙ্গল আর্ট লাউঞ্জে হয়ে গেল তরুণ শিল্পী এম এম ময়েজউদ্দীন ও এ এস এম মোস্তফা জামিল আকবর শামীমের ‘টাইটেল আনটাইটেলড’ শীর্ষক একটি যৌথ চিত্রপ্রদর্শনী। এটি অনুষ্ঠিত হয় ৪ থেকে ১৩ মার্চ পর্যন্ত। তাঁরা দুজনই বিমূর্ত প্রকাশবাদী ধারায় ছবি অাঁকেন।
ময়েজউদ্দীনের চিত্রকর্মে একটি ধ্যানমগ্ন চৈতন্যের জগৎ ও সংবেদনময় ব্যঞ্জনার প্রতিভাস আছে, যা তাঁর শিল্পের সুষ্ঠু ধারাবাহিকতাও অনেকাংশে চিহ্নিত করে। তিনি বাস্তবানুগ চিত্র থেকে ক্রমশ বিমূর্ত শিল্পের পথে অগ্রসরমান। তাঁর সাম্প্রতিক কাজে বিমূর্ত-প্রকাশবাদ শিল্পরীতির আদর্শে রচিত অনুভূতি ও আবেগের যেরকম প্রকাশ দেখি, তা যুগপৎ জাগতিক এবং মনোজাগতিক। একজন শিল্পীর জন্ম, বেড়ে ওঠা এবং বিবিধ স্মৃতি ও অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে বিকশিত হওয়ার বিভিন্ন ধাপ তাঁর সৃজনে প্রায়শ সামগ্রিকভাবে বা খন্ডিতরূপে ছায়া ফেলে। ময়েজের ক্ষেত্রেও এটা সত্য। তিনি ব্যক্তিজীবনের আবেগ, অনুভূতি, সুখ, দুঃখ, প্রেম, নৈঃসঙ্গ্য ইত্যাদি মনস্তাত্ত্বিক অনুষঙ্গের আবেশে চিত্রের জমিন তৈরি করেছেন। দৃশ্যত তা অনেকটা প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন এবং শিল্পী রোকেয়া সুলতানার শিল্পের মায়াবী জগতের সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ। কালো, বাদামি, সোনালি, রুপালি, ধূসর নীল, ক্ষয়িষ্ণু সাদা ও হলুদাভ কমলার মিশ্রণে নির্মিত চিত্রতলে বিন্যস্ত রেখা, বর্ণের পরতে পরতে কোথাও উদ্ভাসিত এবং কোথাও বিলীয়মান। ওই ধরা ও অধরার বৈপরীত্যে বিভাজিত স্পেস ঘোরলাগা নৈঃসঙ্গ্যের  যে-অনুভব তৈরি করে, বোধ করি ময়েজের প্রধান লক্ষ্য তা-ই। তাঁর ‘ইনার স্পেস’ শীর্ষক সিরিজ চিত্রকর্মগুলোর রং, রেখা ও ফর্ম দৃষ্টিনন্দন ঐক্য তৈরি করেছে। ময়েজ ছবির জমিনে বা পিকটোরিয়াল ইমেজে চিন্তাযোগ্য কিছু অনুষঙ্গের প্রয়োগে ভিন্নতর একটি মাত্রা তৈরি করতে পারেন। এদিকে তাঁর নিরীক্ষার সুযোগ আছে।
শিল্পী জামিল আকবর শামীমের বিশেষ ঝোঁক আছে প্রকৃতি ও অনুষঙ্গের বিমূর্ত বা অন্তর্নিহিত সত্য অনুধাবনে। তাঁর সাম্প্রতিক কাজে একপ্রকার শূন্যতার বোধ ও ব্যক্তিজীবনের বিক্ষিপ্ত চিন্তা ও মনোজাগতিক বাস্তবতার প্রতিফলন ঘটেছে। চিত্রে অসংখ্য খন্ডিত ও ভগ্নরেখা, গড়িয়ে পড়া রঙের ধারা, বিন্দু এবং বিবিধ অপরিণত ফর্মের দেখা মেলে। ছবির বিন্যাসে এসব অনুষঙ্গ অনেকাংশে ঐক্য ধরে রাখতে পারেনি। বিমূর্ত চিত্রকলায় কিছু প্রাথমিক ও মৌলিক গুণ থাকা জরুরি। যেমন – রঙের যথাযথ প্রয়োগ, রেখা, ফর্ম ও স্পেসের সুষ্ঠু বিন্যাস, সামগ্রিক কম্পোজিশনে ঐক্য ইত্যাদি। এসবের জন্য শিল্পীর প্রয়োজনীয় দক্ষতা ও নিষ্ঠার বিষয়টি এসে যায়। বিমূর্ত চিত্রকলা যেহেতু বাস্তবানুগ কোনো বস্ত্ত বা অনুষঙ্গ সরাসরি প্রকাশ করে না, ফলে তা প্রধানত চিত্রের অন্তর্নিহিত সুষমা এবং রং, রেখা, ফর্ম ও স্পেসের শক্তিমান বিন্যাসের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। শিল্পীর পরিমিতিবোধ ও আবেগের রসায়ন সুষ্ঠু না হলে বিমূর্ত চিত্র অনেক সময় প্রত্যাশিত লক্ষ্যে পৌঁছতে পারে না।
শামীম তাঁর ‘আনটাইটেলড’ শীর্ষক সিরিজ চিত্রসমূহে কালো, বাদামি, ধূসর, ক্ষয়িষ্ণু হলুদ ও সাদা রঙের প্রাধান্য রেখে একপ্রকার বিমর্ষ আবহ তৈরির চেষ্টা করেছেন। প্রকৃতিই শিল্পের আধার। সময়, আবহাওয়া এবং ঋতুবৈচিত্র্যের মধ্য দিয়ে প্রকৃতি স্ব-নিয়মে তার বিবিধ অভিব্যক্তি ও মেজাজ প্রকাশ করে। শামীম নিসর্গের অস্থির রূপে আচ্ছন্ন। ওই বিশেষ রূপ ও ব্যক্তিমনের অনুভবের রসায়নে রচিত হয় তাঁর যাবতীয় রং ও রেখা।
দর্শকের মনে প্রশ্ন আসতে পারে যে, শিল্পী রং ও রেখায় চিত্রিত বিমর্ষ আবহের মাধ্যমে কোনো সুনির্দিষ্ট, সুষ্ঠু ও স্থায়ী অভিভাষণ রাখতে পেরেছেন কি? বিমূর্ত চিত্রকলায় ক্র্যাফটসম্যানশিপ বা কলাকুশলতার বিষয়টি বাস্তবানুগ চিত্র থেকে যদিও ভিন্নতর, তবু চিত্রভাষা, ডিসকোর্স, মনোমুগ্ধকর রঙের ব্যাঞ্জনা, শক্তিমান রেখা, বিশ্বস্ত ফর্ম, সুবিন্যস্ত স্পেস এবং সামগ্রিক উৎকৃষ্ট কম্পোজিশনের গুণে প্রতিভাত হয় শিল্পীর দক্ষতা, পরিমিতিবোধ ও অভিজ্ঞতা। ‘বিক্ষিপ্ত চিত্ত’ শিল্পের বিষয় হিসেবে চমৎকার কিন্তু শিল্পের যুক্তিতে ওই বিষয় ও আবেগ প্রকাশে শিল্পীর প্রায়োগিক দক্ষতা, পরিমিতিবোধ ও সঠিক পরিশীলন দরকার।
শামীমের কাজে মনিরুল ইসলাম, ওয়াকিলুর রহমান, মোহাম্মদ ফখরুল ইসলাম, রশীদ আমিন প্রমুখ শিল্পীর চিত্রভাষার নির্যাসের দেখা মেলে। তাঁর ছবির যে জগৎ বা পিকটোরিয়াল ইমেজ তা সম্ভাবনাময়। তবে এজন্য শিল্পীর স্বাতন্ত্র্যবোধ, নিজস্ব চিত্রভাষা ও সঠিক পরিশীলন থাকা জরুরি।
শিল্পী এম এম ময়েজউদ্দীন ও জামিল আকবর শামীমের কাজ নিয়ে কোনো স্থায়ী সিদ্ধান্তে না যাওয়াটাই যৌক্তিক। তবে আশাবাদ এই, তাঁরা দুজনেই নিজ নিজ চিত্রভাষা নির্মাণের মধ্যে দিয়ে শিল্পের পথে এগোবেন।

শেয়ার করুন

Leave a Reply