আমাদের বাসায় কয়েক ঘণ্টা পানির কল বন্ধ আছে

লেখক:

মাহবুব তালুকদার

 ভোরবেলা মাওলানা ফজলে খোদা অজু করতে গিয়ে কল ছেড়ে দেখলেন এক ফোঁটাও পানি আসছে না। মাঝেমধ্যে এমন হয়। রাতে যে-গার্ড সিকিউরিটির দায়িত্ব পালন করে, শেষরাতে মেশিন ছেড়ে ওপরের ট্যাংকে তারই পানি তোলার কথা। নিশ্চয়ই সে ওই সময়ে ঘুমিয়েছিল এবং পরে পানির মেশিন ছাড়তে ভুলে গেছে। মেজাজ বিগড়ে গেলেও নিজেকে একটু শান্ত রাখার চেষ্টা করলেন তিনি। ইন্টারকমে রিসেপশনে গার্ড রবিউল আকনকে পাওয়া গেল। তাকে জিজ্ঞাসা করলেন, কী ব্যাপার! পানির মেশিন ছাড়ছ না কেন?

পানির মেশিন ছাড়তে সভাপতি সাহেব মানা করে দিয়েছেন।

সভাপতি এমন উলটোপালটা মানা করলেই হলো? এখন অজু করার সময়।

চারতলায় পানির লাইনে সমস্যা দেখা দিয়েছে। ওখানকার কলের লাইন ফেটে পানিতে সয়লাব হয়ে গেছে। তিনি তাই পানি বন্ধ রাখতে বলেছেন।

সে-কথা আগে বলবে তো? কখন ঘটল এই ঘটনা?

মাঝরাতে। রবিউল আকন বলল, ওই ফল্যাটের মালিক নিজেই লাইন মেরামতের চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত লাইন মেরামত করা গেল না।

লাইন মেরামত করা গেল না কেন?

আমি স্যার অত জানি না। চারতলার সাহেব ইন্টারকমে আমাকে বলেছেন, পাইপ জোড়া দিতে দুটো পার্টস লাগবে। সে-দুটো দোকান থেকে কিনে আনতে হবে। আজ আবার হরতাল। দোকান খুলবে কি না, কে জানে! ওদিকে ওয়াসার কাজ হচ্ছে বলে পানির লাইন বন্ধ রেখেছে। আল্লাই মালুম, কী যে হবে!

মওলানা ফজলে খোদা আর কথা বাড়ালেন না। পাড়ার মসজিদে অজুর ব্যবস্থা আছে। সেদিকে ধাবিত হলেন।

এই ছয়তলা ফ্ল্যাটবাড়িতে সভাপতি বলতে যাকে বোঝায়, সে আমি। তবে এটি কোনো নির্বাচিত পদ নয়, মনোনীত পদ। এখানে একটি কমিটি থাকলেও তা সমবায় অধিদপ্তর বা সমাজকল্যাণ অধিদপ্তরের অধিভুক্ত নয়। কমিটিতে ছয়জন মালিকই অন্তর্ভুক্ত। আমাদের কোনো লিখিত সংবিধান বা গঠনতন্ত্র নেই। এ পর্যন্ত তেমন ঝামেলায় পড়তে হয়নি আমাদের। সবাই ঠিক করে নিয়েছি, প্রতি বছর পর্যায়ক্রমে সভাপতি পরিবর্তিত হবে। সভাপতি সার্বিক দায়িত্ব পালন করবে ও হিসাব সংরক্ষণ করবে। এ ব্যাপারে কেয়ারটেকার সাহায্য করবে তাকে।

ইমরতের পানি নিয়ে যে সমস্যা হয়েছে, তা একমুখী নয়, বহুমুখী। চারতলার বাহারুল ইসলামের ফ্ল্যাটে যে সমস্যা হয়েছে, তা তিনতলা পর্যন্ত গড়াতে পারে। সেটা পানিতে সয়লাব হয়ে যাওয়ার সমস্যা। কিন্তু তারচেয়েও বড় সমস্যা হচ্ছে নিচের রিজার্ভারে পানি না আসা। একই সঙ্গে দুই বিপরীতমুখী সমস্যার কবলে পতিত হওয়া অবিশ্বাস্য। কিন্তু বাস্তবের ঘটনা অনেক সময় বিশ্বাসযোগ্যতাকে অতিক্রম করে যায়। ওয়াসার পানির লাইনে কী সমস্যা হয়েছে মাঝরাত থেকে সেজন্য কাজ হচ্ছে, কতক্ষণে পানি পাওয়া যাবে, কে জানে। কথাটা আগে আমাকে কেউ জানায়নি। কেয়ারটেকার নিজেও সম্ভবত জানত না। রাতের কর্তব্যরত গার্ড বুদ্ধি করে ছাদের ট্যাংক ভর্তি করে রেখেছিল, কিন্তু তার পরিণতি ভালো হয়নি।

সকালেই দোতলার ফ্ল্যাটের মালিক মনিরুল হক মনি ইন্টারকমে ডাকলেন আমাকে। মাঝরাতে বাহারুল ইসলাম একবার পানির লাইনের সমস্যা নিয়ে ঘুম থেকে তুলেছেন। ইনিও যে পানির বিপর্যয়ের কথা বলবেন, তা বুঝতে অসুবিধা হয় না। কিন্তু এরা পেয়েছেনটা কী? সভাপতি হয়েছি বলে সবাই আমার মাথা কিনে নিয়েছেন নাকি? রাতেই আমি পানির লাইন বন্ধ রাখতে গার্ডকে বলে দিয়েছি। ওর সঙ্গে কথা বললেই তো সব খবর জানা যাবে। সাত সকালে আমাকে ঘুম থেকে তোলা কেন?

তালুকদারভাই! আমরা দেখছি মহাবিপদে পড়ে গেলাম। ভোরবেলা পানির অভাবে বাথরুমের কমোডে ফ্লাশ হচ্ছে না। কী করি বলুন তো?

বলতে ইচ্ছা করছিল, বাথরুমে যাবেন না। কিন্তু ঘুমকাতুরে অবস্থায় নিজেকে সামলে নিলাম। চুপ করে থাকলাম।

মনিরুল হক মনি আবার বললেন, গার্ডের কাছে শুনলাম আজ নাকি সারাদিন ওয়াসার লাইন বন্ধ থাকবে।

কথাটা আমাকে কেউ জানায়নি।

আবার অন্যদিকে শুনলাম, চারতলায় পানির লাইন ফেটে ওখানে নাকি বন্যা হয়ে গেছে।

সেটা আমি জানি।

ভাগ্যিস আমি দোতলায় থাকি আর আপনি একতলায়। আমরা দুজনেই ভাই বন্যার হাত থেকে বেঁচে গেলাম।

কথাটা শুনতে ভালো লাগল না। চুপ করে থাকলাম আমি।

আপনি সভাপতি মানুষ। দেখবেন, চারতলার পানির লাইনটা যেন তাড়াতাড়ি ঠিক করা হয়। নইলে আমরা পানি পাব না। উনার পানির লাইনের ফল্ট। তার জন্য আমরা কেন সাফার করব?

বললাম, ফ্ল্যাটবাড়ি তো কারো একক বাড়ি নয়, কমিউনিটি লিভিংয়ের ব্যাপারটা আলাদা। এর ভালোমন্দ উভয় দিকই সবাইকে শেয়ার করতে হয়।

মনিরুল হক মনি আমার কথার প্রত্যুত্তরে গল্প জুড়ে দিলেন, ফ্ল্যাটটা কেনার সময় আমার স্ত্রীকে বলেছিলাম, এখানে ফ্ল্যাট না কেনাই ভালো। ডেভেলপার বা জায়গা, কোনোটাই আমার পছন্দ হয়নি। কিন্তু আমার স্ত্রী আমার কথা গায়েই মাখল না। তার এক কথা, বোনের বাসার কাছে থাকতে হবে। তাহলে দুবোন একসঙ্গে মিলে সবসময় গল্প করা যাবে। মনি বিদ্রূপ করে বললেন, এখন যাও! বোনের বাসা থেকে বালতি ভরে পানি আনার ব্যবস্থা করো।

পানি আনার ব্যবস্থা অবশ্য আমাদের করতে হবে। ওয়াসা থেকে একগাড়ি পানি আপাতত আনতে হবে। আমি বললাম।

সেটা কখন আনতে পারবেন, তার কি নিশ্চয়তা আছে?

সকালে অফিস খুললে ওদের সঙ্গে যোগাযোগ করব।

দেখেন তালুকদারভাই, পানি আনার কী করতে পারেন। মনিরুল হক মনি ইন্টারকম ছেড়ে দিলেন।

আমি ইন্টারকমের রিসিভার নামিয়ে রেখে দেখি আমার স্ত্রী নাওশেবা পাশে দাঁড়িয়ে আছেন। বললেন, কী? পানির কি কিছু করলে?

কী করব বুঝতে পারছি না। অফিস বা দোকান খুলতে এখনো অনেক সময় বাকি।

আমি পরের পানির ব্যবস্থার কথা বলছি না। এখনকার পানির ব্যবস্থার কথা বলছি।

এখনকার পানির ব্যবস্থা!

নিজে তো বাথরুম নষ্ট করেছ। কমোড ফ্লাশ করোনি। সেটার কী হবে? ওদিকে কাজের বুয়া বাসনকোসন মেজে বসে আছে। পানির অভাবে ধুতে পারছে না।

এখন পানি কোথায় পাব?

কোথায় পাবে মানে! পাশের বাড়ি থেকে দু-তিন বালতি পানি আনার ব্যবস্থা করো।

ওদের কাউকে আমি চিনি না।

তুমি চিনতে না পারো, গার্ডরা নিশ্চয়ই চেনে। ওদের পাঠাও। আর একটা কথা।

কী?

রাতে ফিল্টারে পানি ভরে রাখা হয়নি। পাড়ার দোকান থেকে এখন দুবোতল খাবার পানি কিনে নিয়ে এসো।

আমি আনব?

নইলে কি আমি আনব? নাওশেবা চলে যেতে যেতে বললেন, পানির বোতল না আনলে এখন নাশতা করা হবে না।

বাড়ির ব্যাপার নিয়ে নাওশেবা সবসময় আমার ওপর ক্ষুব্ধ। ওর ধারণা, আমি এই ইমারতের সভাপতি হয়ে সর্বদাই অন্য সবার ভালোমন্দ নিয়ে মহাব্যস্ত। নিজের পরিবারের ভালোমন্দ দেখার সময় আমার নেই। বিদ্যুৎ, গ্যাস আর টেলিফোনের বিল যথাসময়ে পরিশোধের চিন্তা নাওশেবাকেই মাথায় রাখতে হয়। ওসব বিষয়ে আমার কোনো মাথাব্যথা নাকি নেই। অফিসে যাওয়ার পথে আমাদের একমাত্র সন্তান বাবুকে স্কুলে দিয়ে আসার ব্যাপারটা আমার তেমন কাজই নয়, কারণ রাস্তাঘাট তখন ফাঁকা থাকে। কিন্তু দুপুরবেলা যানজট পেরিয়ে ছেলেকে বাসায় আনা রীতিমতো ঝক্কির ব্যাপার। তাছাড়া এ-এলাকায় অনেক সময় বুয়া পাওয়া যায় না। তখন রানণা করা ছাড়াও ঘরদোর পরিষ্কারের সব কাজ নাওশেবাকে নিজে করতে হয়।

আমাদের এই ফ্ল্যাটটির বিষয়ে স্ত্রীর অভিযোগ সবচেয়ে বেশি। আমি একজন বিচক্ষণ মানুষ হয়ে কীভাবে একতলায় ফ্ল্যাট কিনলাম, এজন্য তার আক্ষেপের শেষ নেই। কেনার সময় অন্যদের চেয়ে আমাকে দু-লাখ টাকা কম দিতে হয়েছিল। সেটা আমার বিশেষ বিবেচনার বিষয় ছিল। কিন্তু এর মাজেজা তখন টের পাইনি। এখন হাড়ে হাড়ে তা টের পাচ্ছি কিংবা নাওশেবাই টের পাওয়াচ্ছেন আমাকে। বিদ্যুৎ, চলে গেলে এখানে জেনারেটরের বিকট আওয়াজ হয়, কারণ জেনারেটর রুম আমাদের ফ্ল্যাটের পাশে। এই দুঃখ নাওশেবা কোনোদিন ভুলতে পারবেন বলে মনে হয় না।

তুমি একতলায় কেন ফ্ল্যাট কিনলে? লোডশেডিং শুরু হলেই নাওশেবা এ-প্রশ্ন করেন।

ভেবেছিলাম লিফট না থাকলেও অসুবিধা হবে না।

তাতে কী লাভ হলো? আমরা লিফট ব্যবহার না করলেও সার্ভিস চার্জ তো সবার সমানই দিতে হচ্ছে।

আরেকটা বিষয় ভেবেছিলাম। ভূমিকম্প হলে আমরা তাড়াতাড়ি বেরিয়ে যেতে পারব।

কবে ভূমিকম্প হবে, আদৌ হবে কিনা – বলতে গিয়ে থেমে গেলেন নাওশেবা। বললেন, এখন লোডশেডিংয়ের সময় বসে বসে জেনারেটরের গান শোনো।

 

দুই

পাঁচতলায় সিকদার আলী নওয়াজ তার নাতি হীরককে বাংলা পড়াচ্ছিলেন। ওর পরীক্ষায় নাকি রচনা আসবে ‘পানিই জীবন’। সিকদার হীরককে জিজ্ঞাসা করলেন, পানিকে কেন জীবন বলা হয়েছে?

আমরা পানি খাই বলে। নাতি উত্তর দিলো।

এটা কি কোনো উত্তর হলো? তুমি বলতে পারতে, আমরা পানি খেয়ে জীবন ধারণ করি বলে পানি জীবনের সমতুল্য।

নানা, সমতুল্য মানে কী?

সমতুল্য মানে হচ্ছে সমান তুলনীয়।

আগের কথার চেয়ে পরেরটা আরো কঠিন মনে হলো হীরকের কাছে। প্রশ্ন করল, তাহলে সমান তুলনীয় অর্থ কী?

একটার সঙ্গে আরেকটার তুলনা করা যায়, এমন কিছু।

নাতিটার ইংলিশ মিডিয়ামে পড়া নিয়ে সিকদার আলী নওয়াজ খুবই হতাশ। সে ফটফটিয়ে ইংরেজি বলতে পারে বা লিখতেও পারে, কিন্তু বাংলা পড়তে গেলে তার গায়ে জ্বর আসে। নিজে তিনি কলেজে বাংলার অধ্যাপক ছিলেন বলে নাতির বাংলা পড়াশোনা মেরামতের দায়িত্ব যেচে নিয়েছিলেন। কিন্তু দিনে দিনে তার হতাশা কেবল বাড়ছে।

সিকদার আলী নওয়াজ বললেন, আজ সকাল থেকে আমাদের ফ্ল্যাটে পানি নেই। আমাদের রান্নাবান্না, খাওয়া-দাওয়া, গোছল-টোছল সবকিছুই আটকে গেছে। এতেই বুঝতে পার পানি আমাদের কাছে কত গুরুত্বপূর্ণ। পানি শুধু জীবন নয়, জীবনের সর্বক্ষেত্রে পানি অপরিহার্য।

নানা, অপরিহার্য মানে কী?

অপরিহার্য মানে হচ্ছে যা পরিহার করা যায় না।

পরিহার মানে?

পরিহার মানে পরিত্যাগ।

পরিত্যাগ মানে?

মানে বর্জন করা, মানে বাদ দেওয়া।

হীরকের মুখের দিকে তাকিয়ে মনে হলো বাদ দেওয়া কথাটা বলায় সে কিছুটা বুঝতে পেরেছে। সিকদার আলী নওয়াজ আবার পানির বিষয়ের অবতারণা করলেন, বললেন, পৃথিবীর তিন ভাগ স্থল আর এক ভাগ জল। তাহলে জলের পরিমাণ কত বেশি, তা বুঝতে পারো।

নানা, পানিপথের যুদ্ধে কি জাহাজ ছিল?

পানিপথ হচ্ছে একটা জায়গার নাম। ওটার সঙ্গে পানির কোনো সম্পর্ক নেই। মানুষের সঙ্গে পানির সম্পর্ক সর্বজনীন।

সর্বজনীন মানে কী?

সর্বজনীন হচ্ছে সর্বহিতকর।

নানা, তুমি শুধু কঠিন কঠিন বাংলা বলো। আমি বুঝতে পারি না।

কোনটা বুঝতে পারোনি?

হিতকর মানে।

হিতকর মানে হচ্ছে উপকারী। যাক, যে-কথাটা বলছিলাম। ‘পানিই জীবন’ বলতে বোঝা যায়, পানি ছাড়া মানুষ বাঁচে না। মানুষের শরীরের মধ্যেও পানি আছে।

আমরা টয়লেটে গিয়ে সেই পানি ছাড়ি। ঠিক না নানা?

কথাটা নানা বোধহয় শুনতে পাননি। বললেন, আমাদের শরীরের রক্তও একধরনের পানি। মানে রক্তে পানির পরিমাণই বেশি।

তাহলে আমাদের সর্দি-কাশিতেও পানি থাকে।

থাকে। যে-কথাটা আমি তোমাকে বলতে চাচ্ছি, খুব মনোযোগ দিয়ে শুনবে।

কী?

ভবিষ্যতে যে বিশ্বযুদ্ধ হবে, তা হবে শুধু পানির জন্য। পানির অভাবে লোকে যুদ্ধ করবে। কারণ খাওয়ার পানি পাওয়া যাবে না।

কেন? যার যার পানি কলসিতে ভরে রাখলেই তো হয়।

সেই পানিও তখন পাওয়া যাবে না। দেশে দেশে পানির হাহাকার পড়ে যাবে। পানির সেই বিশ্বযুদ্ধে কোটি কোটি মানুষ মারা যাবে।

নানা, আমরা তখন কী করব? আমরাও কি যুদ্ধ করব?

আমরা তখন কোথায় থাকব, কী করব জানি না। আসলে সেই ভয়াবহ যুদ্ধের কথা আমরা কল্পনাও করতে পারি না। তুমি নিশ্চয়ই কারবালা যুদ্ধের কথা জানো।

হ্যাঁ, নানা। আমার বইয়ে আছে।

সেটাও হয়েছিল পানির জন্য। তবে বিশ্বযুদ্ধ তো আর কারবালা যুদ্ধের মতো হবে না। এই যুদ্ধ হবে দেশে দেশে। কে জানে তা শেষ পর্যন্ত আণবিক যুদ্ধে রূপ নেবে কিনা!

আণবিক যুদ্ধ কী নানা?

সেটা তোমাকে আরেকদিন বুঝিয়ে বলব। আজকের আলোচনা পানি নিয়েই থাক।

এ পর্যায়ে হীরকের মা রাশেদা কাছে এগিয়ে এলো। বলল, পানি নিয়ে আলোচনা করে কী লাভ?

পানির গুরুত্ব ওকে বোঝাতে হবে না?

বাবা! ওর প্রয়োজন ‘পানিই জীবন’ নামে একটা রচনা। ওকে এই নামে একটা রচনা লিখে দিলে ল্যাঠা চুকে যায়। হীরক সেটা মুখস্থ করে নেবে।

হীরক বলল, নানা খুব কঠিন কঠিন বাংলা বলে মা।

কঠিন বাংলা তোমাকে কিছু কিছু শিখতে হবে। তবে বাবা! ওর রচনাটা তুমি সহজ করে লিখে দিও।

আমরা এখন নাশতা খাবো না মা? হীরক প্রশ্ন করল।

নাশতা বানাতে আরো দেরি হবে। সকাল থেকে যে বাসায় পানি নেই, সে-কথা বলেছি। দু-চার ঘণ্টার মধ্যে পানি পাওয়ার কোনো সম্ভাবনাও নেই।

অন্যঘরে টেলিফোন বাজছিল! রাশেদা গিয়ে রিসিভার তুলল। একটু পরে ফিরে এসে বলল, বাবা! তোমাকে শাহেদা ডাকছে।

এত সকালে তার আবার কী হলো?

তুমি কথা বলে দেখো।

টেলিফোন ধরতে শাহেদা বলল, তোমরা সবাই এখন আমাদের এখানে চলে এসো।

তোমার ওখানে যেতে হবে কেন?

বা রে! তোমাদের বাসায় পানি নেই। রাশেদা আপা সকালে ফোন করে জানিয়েছিল। আমাকে বলেছিল ড্রাইভারকে দিয়ে  দু-বালতি পানি পাঠাতে। কিন্তু দু-বালতি পানিতে পাঁচজনের সকালের প্রয়োজন মিটবে কীভাবে? তোমার জামাই ঢাকার বাইরে থেকে ফোন করে বলল, বাবাকে বলো সবাইকে নিয়ে আমাদের বাসায় চলে আসতে। সে এর মধ্যে তোমাদের আনতে ড্রাইভার পাঠিয়ে দিতে বলেছে। আমিও তোমাদের জন্য সকালের নাস্তা বানিয়ে ফেলেছি।

তোমাদের এতকিছু করার প্রয়োজন কী ছিল?

বাবা! আমি তোমার মেয়ে নই? তুমি তো আমার বাসায়ও থাকতে পারতে।

তা পারতাম। কিন্তু –

আর কিন্তু নয়। হ্যাঁ, শোনো। আমার বাসায় এসেই চলে যেতে পারবে না। দুপুরবেলা এখানে খেয়ে বিকালে চা-নাশতার পর ড্রাইভার তোমাদের পৌঁছে দিয়ে আসবে।

এতসব ঝামেলা না করলে কি চলত না? আজ তো হরতাল।

আমার কোনো ঝামেলা নয়। আজ হরতাল হলেও আমাদের সরকারি গাড়ি চলাচলে কোনো অসুবিধা নেই। হীরকেরও স্কুলে যাওয়ার ব্যাপার নেই। তোমার জামাই ঢাকার বাইরে না থাকলে সে নিজেই গিয়ে তোমাদের নিয়ে আসত। আচ্ছা, তুমি আপাকে ফোনটা দাও। আমি তাকে সব বলে দিচ্ছি।

আজ সকালটা সিকদার আলী নওয়াজের খুব অস্বস্তিতে কেটেছে। বাথরুমের বালতিতে কিছুটা পানি ছিল। তার অর্ধেকটা অন্যদের জন্য রেখে বাকিটুকু দিয়ে নিজের সকালের কাজ সারতে হয়েছে। পানি যখন থাকে না কিংবা কম থাকে তখনই পানির প্রয়োজন বেশি অনুভূত হয়। দুপুর পর্যন্ত পানি না এলে অবস্থা বোধহয় কারবালার মতোই দাঁড়াবে।

খালার বাড়িতে যাবে বলে সবচেয়ে খুশি হীরক নিজেই। ওর খালাতো বোন মিতির সঙ্গে ভিডিও গেম খেলা যাবে। আগের দিন পোকেমন ব্ল্যাক নিয়ে খেলছিল ওরা। দারুণ মজার খেলা। অবশ্য হীরক ওর ডিএসআইটাও সঙ্গে নিল।

ওরা সবাই যখন লিফটের কাছে গেছে, তখন ওদের ফ্লোরে ভুল করে লিফট থেকে নেমে পড়েছেন ছয়তলার মওলানা ফজলে খোদা। সিকদার আলী নওয়াজ সালাম বিনিময়ের পর তাকে জিজ্ঞাসা করলেন, কেমন আছেন? এত সকালে কোথায় গিয়েছিলেন?

মসজিদে নামাজ পড়তে গিয়েছিলাম। তারপর হাতিরঝিলের নতুন রাস্তা ধরে অনেকক্ষণ হাঁটলাম। আপনারা দলবেঁধে কোথায় যাচ্ছেন?

ছোট মেয়ের বাড়িতে। এখানে পানি নেই বলে ছোট মেয়ে আমাদের নিয়ে যেতে ড্রাইভার পাঠিয়ে দিয়েছে।

পানির কথা আর বলবেন না। ভোরবেলা অজু পর্যন্ত করতে পারলাম না। মসজিদে গিয়ে অজু করতে হলো। কখন যে পানি পাওয়া যাবে, তা আল্লাহই মালুম।

 

তিন

চারতলার বাহারুল ইসলাম পানির দুর্ঘটনার প্রধান ভিকটিম। এই ইমারতে তার অবস্থাই সবচেয়ে সঙ্গিন। বাথরুমে পুশ শাওয়ারের জয়েন্টে একটা সমস্যা আগে থেকেই ছিল। স্ক্রুডাইভার ও রেঞ্জ নিয়ে নিজেই ঠিক করার ব্যবস্থা নিয়েছিলেন তিনি। ব্যর্থ হয়ে ভেবেছিলেন, পরদিন মিস্ত্রি ডেকে ঠিক করাবেন। কিন্তু পাইপ আলগা হয়ে এক রাতের মধ্যে সারা ফ্ল্যাট যে পানিতে সয়লাব হয়ে যাবে, তা ভাবতে পারেননি। ঘরের মেঝেতে যা-কিছু জিনিসপত্র ছিল, সবকিছুই ভিজে একাকার। জিনিসপত্র যা নষ্ট হয়েছে, তা না-হয় টাকা খরচ করে পুষিয়ে নেওয়া যাবে। কিন্তু মান-সম্মান তো আর টাকা দিয়ে মেরামত করা যাবে না।

ভোরবেলা আমিরাই দরজা ধাক্কিয়ে ডেকে তুলল তাকে। বলল, আববু! সর্বনাশ হয়ে গেছে।

কী সর্বনাশ হয়েছে? ঘুমকাতর চোখে তিনি বললেন।

আমাদের সারাবাড়িতে পানি উঠেছে।

তাই তো! সবদিকেই পানি ছড়িয়ে পড়েছে দেখছি।

পানির চেয়ে বড় কথা হচ্ছে মান-সম্মান। তোমাদের জামাই তো একটু নার্ভাস প্রকৃতির। সে ভীষণ ভেঙে পড়েছে।

সে ভেঙে পড়ল কেন?

আমি ওকে বিয়ের শেরোয়ানিটা পরতে বলেছিলাম। বউভাতের অনুষ্ঠানে সে তাই পরেছিল। রাতে ওটা মেঝেতে পড়ে ছিল। নতুন বিয়ের শেরোয়ানি পানিতে ভিজে একাকার। সেই সঙ্গে ওর পাজামা-পাঞ্জাবি আর আমার শাড়িও গেছে।

ঘরে তো কাপড় ঝুলিয়ে রাখার ব্যবস্থা আছে। ওসব মেঝেতে গেল কী করে?

আমিরা কথা বলল না। মাথা নিচু করে রইল।

গত পরশু আমিরার বিয়ে হয়েছে। কাল বউভাতের অনুষ্ঠান ছিল। বউভাত মানে মেয়েজামাইকে বাসায় নিয়ে আসা। বাহারুল ইসলাম বিয়ের অনুষ্ঠানে কোনো কার্পণ্য করেননি। শেয়ারের টাকা ভেঙে তিনি জামাইকে গাড়ি পর্যন্ত কিনে দিয়েছেন। জামাই নিজেই রিকন্ডিশন্ড গাড়ির ব্যবসা করে। ওর দোকান থেকেই কেনা হয়েছে গাড়িটা। কেবল টাকাটা তিনি তুলে দিয়েছেন জামাইয়ের হাতে। অন্য জায়গা থেকে কিনলে হয়তো দু-লাখ টাকা কমে পাওয়া যেত। কিন্তু জামাইয়ের শোরুম থাকতে, অন্য দোকান থেকে গাড়ি কেনা ভালো দেখায় না।

আববু! আবেদ রাজা খুব একটা খারাপ কথা বলেছে।

আবেদ রাজা কে?

তোমাদের জামাইয়ের নাম।

ওর নাম না কিসলু?

কিসলু ওর ডাকনাম। কিন্তু নামটা বড় বাজে। তাই আমি ওটা বাদ দিতে বলেছি। এখন থেকে সবাই তাকে আবেদ রাজা ডাকবে। সে একটা খারাপ কথা বলেছে।

স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে খারাপ-ভালো সবরকম কথাই হতে পারে। সেসব অন্য কারো সঙ্গে শেয়ার করা উচিত নয়।

ওসব কথা নয়।

তাহলে?

সে বলেছে, ফিরানির রাতে বিয়ের পোশাক-পরিচছদ পানিতে নষ্ট হওয়া নাকি খুব খারাপ ব্যাপার।

খারাপ তো বটেই।

শুধু খারাপ নয়, এটা নাকি অশুভ ব্যাপার।

এটা কি কোনো কথা হলো? পানির লাইন নষ্ট হয়ে ঘর ভেসে গেছে, এতে অশুভের কী আছে?

আববু! এসব বিষয় ও খুব মানে। আমিরা বলল, সেবার ওর বাবা হাইওয়েতে ঢাকার বাইরে যাচ্ছিলেন। পথে দেখলেন একটা বড় গাছ আড়াআড়িভাবে পড়ে আছে। গাছটা যেন তাকে যেতে দিতে চাচ্ছে না। তিনি লোকজন ডেকে গাছটাকে রাস্তা থেকে সরিয়ে দিলেন। তারপর পথে যেতে যা হওয়ার, তাই হলো। উনি রোড অ্যাক্সিডেন্টে মারা গেলেন। বলতে গিয়ে আমিরার গলা ধরে এলো, এ-ঘটনার পর থেকে ওদের বাড়ির সবাই সংস্কার মেনে চলে।

ঘটনাটা আমি জানতাম না। বাহারুল ইসলাম বললেন, তবে এটাও একটা কুসংস্কার। হাইওয়েতে রোড অ্যাক্সিডেন্ট যখন-তখন হচ্ছে। রাস্তায় গাছ পড়ে থাকা নিতান্ত কাকতালীয় ব্যাপার।

তুমি হয়তো এসব মানো না, কিন্তু আবেদ রাজা খুব মানে। ওদের বাড়িতে যদি জানে বরের ফিরানির রাতে তার বিয়ের শেরোয়ানি পানিতে জবজবে হয়ে গেছে, তাহলে সাংঘাতিক ব্যাপার হবে।

কী সাংঘাতিক ব্যাপার হবে?

আমাদের বিয়ের সম্পর্ক এমনি পানিতে ভেসে যাবে কিনা, তা কে বলতে পারে? এটা হয়তো একটা অশুভ ঘটনার পূর্বলক্ষণ।

এসব কথা কে বলেছে?

রাজাই বলেছে। আমারও কিন্তু মনে হয় –

যত সব কুসংস্কার! বাধা দিয়ে বললেন বাহারুল ইসলাম।

কুসংস্কার একটা ব্যাধি। বাহারুল ইসলাম মনে মনে ভাবলেন। শিক্ষিত ও আধুনিক মানুষ কী করে এই ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়, ভেবে পেলেন না তিনি। কিন্তু অনেক গ্রামের সাধারণ অশিক্ষিত মানুষকে তিনি দেখেছেন, যারা মোটেই কুসংস্কারাচ্ছন্ন নন। এর মানে দাঁড়াচ্ছে, কুসংস্কারের সঙ্গে শিক্ষা-অশিক্ষার কোনো সম্পর্ক নেই। শিক্ষা যে মানুষকে আলোকিত করার জন্য, অন্ধকার থেকে মুক্তিদানের জন্য, এসব কথা কি তাহলে ভুয়া? নাকি, কেবল কথার কথা!

কিছুক্ষণ পরে জামাইয়ের মা নাসরিন বেগম ফোন করলেন তাকে, ভাইসাহেব! খবর কী আপনাদের?

বাহারুল ইসলাম লক্ষ করলেন, মহিলা সর্বদা তাকে বেয়াই সাহেব বলে সম্বোধন করেন। আজ কী কারণে তাকে ভাইসাহেব বলে সম্বোধন করছেন? ব্যাপারটা ভালো লাগল না তার কাছে। বললেন, ভালোই আছি।

শুনলাম, আপনাদের বাসাবাড়ি নাকি বন্যার পানিতে ভেসে গেছে।

বন্যার পানিতে নয়, কলের পানিতে।

ওই এক কথাই হলো। পানি মানে পানি, সে যেখানকার পানিই হোক। নাসরিন বেগম বললেন, আমার মনে হয় কি ভাইসাহেব, আপনার বাড়িতে খারাপ বাতাস ঢুকেছে।

খারাপ বাতাস মানে?

খারাপ বাতাস মানে খারাপ বাতাস। কেউ কুফরি কালাম করেছে। আপনার কোনো শত্রু পীর-ফকিরকে দিয়ে –

আমি এসব বিশ্বাস করি না।

আপনি বিশ্বাস না করলে কী হবে? কিন্তু অনেকগুলো বিষয় আছে, যা বিশ্বাস করতেই হয়। যেমন ধরুন, কাউকে রুমাল উপহার দিলে তার সঙ্গে সম্পর্ক নষ্ট হয়ে যায়। হাত থেকে চিরুনি পড়ে গেলে –

আপনি কি আমাকে এজন্য টেলিফোন করেছেন?

না। আমার ছেলে বলছিল, সে আসলে ও বাড়ি থেকে এখনই চলে আসতে চায়।

কথাটা আমাকে বললেই পারত।

লজ্জা করে হয়তো বলেনি।

আর লজ্জার প্রয়োজন নেই। ঠিক আছে, আমি আমিরাকে বলে দেবো।

আমিরাকে বলার প্রয়োজন হলো না। একটু পরে আমিরা নিজেই এলো তার কাছে। প্রশ্ন করল, আববু! আমার শাশুড়ি কি তোমাকে ফোন করেছিলেন?

হ্যাঁ।

তুমি নাকি তার সঙ্গে ভালো ব্যবহার করোনি।

আমি তার সঙ্গে খারাপ ব্যবহারও করিনি।

কথাবার্তা হয়তো খারাপ ছিল না। কিন্তু তোমার গলার টোনে তিনি খুব মাইন্ড করেছেন।

গলার টোন নিয়ে মাইন্ড করলে আমি কী করতে পারি?

উনি তোমার মেয়ের শাশুড়ি। প্রয়োজনে তাকে একটু তোয়াজ করে চললে ক্ষতি কী? উনি সবসময় তোয়াজ পছন্দ করেন।

মেয়ের কথায় তিনি কী প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করবেন ভেবে পেলেন না। একবার মনে হয়েছিল আমিরাকে বলে দেবেন যে, তিনি কাউকে অকারণে তোয়াজ করা পছন্দ করেন না। এমনকি নিজের মেয়ের শাশুড়ি হলেও না। তবে কথাটা এসময়ে না বলাই সংগত মনে হলো।

তাকে চুপ থাকতে দেখে আমিরা বলল, রাজা এখন চলে যেতে চাচ্ছে।

আনমনে তিনি বললেন, রাজা কে?

রাজা, মানে আবেদ রাজা, তোমার জামাই। ওর ডাকনাম কিসলু। তুমি কিছুই মনে রাখো না।

হুঁ।

ওর ধারণা, আমাকে কেউ বশ করার জন্য কুফরি কালাম দিয়ে বাড়িটাকে বন্ধ করা হয়েছে। মসজিদের হুজুরকে ডেকে মিলাদ শরিফ পড়ালেই সব ঠিক হয়ে যাবে।

 

চার

এ-বাড়িতে একজন মাত্র মহিলা মালিক রয়েছেন। তিনি থাকেন তিনতলায়। তার স্বামী দুবাইয়ে চাকরি করেন। তবে আজ পর্যন্ত তার স্বামীকে এ-বাড়িতে দেখা যায়নি। মহিলা দেখতে সুন্দরী এবং তার এক ভাইকে নিয়ে এখানে থাকেন বলে নানারকম কানাঘুষা আছে। তিনি একটা ফার্মে ব্যবসার অংশীদার। কী ধরনের ব্যবসা তা কারো জানা নেই। তবে মাঝে মাঝে অফিসে যান। তার সাজগোজ ও চলাফেরা নিয়ে বাসিন্দাদের মধ্যে মুখরোচক আলোচনা চলে। তবে এসব কিছুই গায়ে মাখেন না নাসিমা হাসান।

সকালবেলা তিনি ফোন করলেন আমাকে। বললেন, আমি বোধহয় এ-বাড়িতে থাকতে পারব না।

বললাম, কেন? কী হয়েছে?

আপনারা সমিতি করেছেন, ভালো কথা। কিন্তু আমাদের সুখ-দুঃখের ব্যাপারে তো একটু নজর দেবেন। সার্ভিস চার্জ কিছু কম দিচ্ছি না।

আমাদের সমিতি একটি স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠান। আপনি ইচ্ছা করলে নিজে দায়িত্ব নিতে পারেন। পর্যায়ক্রমে তা নিতেও হবে।

আমার এসব করার সময় কোথায়?

সবাই একই কথাই বলেন। সবাই সমালোচনা করেন, কিন্তু কেউই দায়িত্ব নিতে চান না। আমার ওপর জোর করে তা চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। তবু আমি আন্তরিকভাবে দায়িত্ব পালনের চেষ্টা করছি। আপনার বোধহয় কলের পানি বন্ধ আছে! নাকি আপনার ফ্ল্যাট ওপরতলার পানিতে ভেসে গেছে?

আমার বাসায় এক ফোঁটা পানি নেই। আর আপনি বলছেন আমার বাসা পানিতে ভেসে গেছে কি না! রসিকতা করছেন নাকি?

মোটেই রসিকতা করছি না। চারতলার পানির পাইপ খুলে গিয়ে মেঝে পানিতে সয়লাব হয়ে গেছে। আপনার ফ্ল্যাট পর্যন্ত যে পানি পৌঁছায়নি, সেটাই রক্ষা।

পানি না পেলে আর রক্ষা পেলাম কী করে?

পানির পাইপ মেরামতের জন্য কলের লাইন সাময়িকভাবে বন্ধ আছে। অন্যদিকে ওয়াসার কাজের জন্য তারা পানির লাইন বন্ধ রেখেছে। আমাদের এখন উভয় সংকট। পাইপ মেরামত হলেও ওয়াসার লাইনে পানি না ছাড়া পর্যন্ত পানি পাওয়া যাবে না।

তাহলে? কখন পানি পাওয়া যাবে?

সময় নির্দিষ্ট করে বলতে পারছি না। আমি অবশ্য ওয়াসা থেকে পানির গাড়ি আনার চেষ্টা করছি।

যা-ই করেন, তাড়াতাড়ি ব্যবস্থা করুন। পানি ছাড়া কি জীবন বাঁচে?

নাসিমা হাসান ফোন ছেড়ে দিলেন।

সকাল ৯টার কিছুক্ষণ পর আমাদের বাড়ির কেয়ারটেকার মেহেদী হাসান মোবাইলে ফোন করল। মেহেদীকে ওয়াসা অফিসে পানির গাড়ি আনার জন্য পাঠিয়েছিলাম। ছেলেটি মোটামুটি করিৎকর্মা। সে কাজটি করে আসতে পারবে বলে আমার ধারণা। কাজের অগ্রগতি সম্পর্কে রিপোর্ট দিতে আমি বলে দিয়েছিলাম। মেহেদী জানাল, ওরা সবাই ঘুষ চাচ্ছে স্যার!

ওরা মানে?

মানে এখানকার লোকজন। গাড়ির পানি পাওয়া যাবে, কিন্তু কখন পাওয়া যাবে, তা নিশ্চিত করে কেউ বলতে পারছে না। টাকা দিলে জানা যাবে কখন পানি পাওয়া যাবে। গাড়ির ড্রাইভারকে একশ টাকা দিতে হবে, এটা নাকি রেওয়াজ। যে-লোক পাইপ দিয়ে গাড়িতে পানি ভরবে, তাকে ঘুষ না দিলে অর্ধেক পানি গাড়িতে তুলবে কি না, তা সন্দেহ। এছাড়া অফিসে কিছু খরচপাতি আছে।

যা টাকা লাগে, তা দিয়েই পানি আনতে হবে। তোমার কাছে তো টাকা আছেই।

তা আছে স্যার! তবে আপনার হুকুম ছাড়া আমি কাউকে ঘুষ দিতে পারি না।

মেহেদীর সঙ্গে কথা বলার পর মনটা হালকা হয়ে গেল। ওয়াসার এক গাড়ি পানি আনা এখন খুবই দরকার। আপাতত সেভাবে সামাল দিতে পারলে লাইন মেরামতের কিছুটা সময় পাওয়া যাবে।

আজ আমার অফিসে অনেকগুলো কাজ করার দরকার ছিল। বেসরকারি কোম্পানিতে প্রতিদিন হাজার ঝামেলা। হরতাল হয়ে সবকিছু ওলট-পালট হয়ে গেল। এদিকে পানির সমাধান করা জরুরি ব্যাপার, অন্যদিকে অফিসে জরুরি কাজগুলো মুখ থুবড়ে পড়ে থাকবে। অফিসে যাব কি না, তাই বুঝতে পারছি না। গেলে কী হবে, আর না গেলে কী হবে না, তার হিসাব কষতে থাকলাম। অবশ্য মনে মনে।

আমি একতলায় থাকি বলে গার্ডদের কাজকর্মের তদারকি, লিফটে ভারি মালামাল তোলা হচ্ছে কিনা তা লক্ষ রাখা এবং গ্যারেজের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা খেয়াল রাখতে আমার সুবিধাই হয়। আজ কদিন ধরে লিফটটা রীতিমতো ভোগাচ্ছে। মাঝে মাঝেই ওর দুটো পাল্লা আটকে যায়, বন্ধ হতে চায় না। সমিতির ফান্ড তেমন তেজি নয় যে এখনই কাজটা করিয়ে ফেলতে পারি। তবু কী মনে করে লিফটের কাছে গিয়ে দাঁড়ালাম। লিফটের দরজা খুলতেই পাঁচতলার সিকদার আলী নওয়াজ সপরিবারের বেরিয়ে এলেন। মুরুবিব মানুষ। তাকে সালাম দিয়ে জিজ্ঞাসা করলাম, সপরিবারের কোথায় যাচ্ছেন?

ছোট মেয়ের বাড়িতে। আমাদের বাসায় পানি নেই বলে ছোট মেয়ে তার বাসায় যেতে পাগল করে তুলেছে। ঘনঘন ফোন করছে। জামাইও ঢাকায় নেই। ভাবলাম, এই সুযোগে মেয়ের বাসা থেকে বেড়িয়ে আসা যাক। সিকদার আলী নওয়াজ বললেন।

ভালোই তো। আমি বললাম।

পানি বন্ধের ব্যাপারটা সবাই নেগেটিভভাবে নিলেও আমি কিন্তু পজেটিভভাবে নিয়েছি।

তাই নাকি!

আজ সকাল থেকে নাতিকে পানির ব্যাপারে বিস্তারিত শেখালাম। পানি-সংকটের কারণেই যে আগামীতে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ হবে, এটা সবারই জানা থাকা উচিত।

আপনি ঠিকই বলেছেন।

চলি ভাই। ওরা সবাই দাঁড়িয়ে আছে। রাতে ফিরে এসে নাতিকে রচনা লিখে দিতে হবে ‘পানিই জীবন’। আমার লেখা রচনা সে পরীক্ষায় মুখস্থ লিখতে পারলে –

সিকদার আলী নওয়াজের কথা শেষ না হতেই তার মেয়ে এসে তার হাত ধরে টানল। বলল, চলো বাবা। আমাদের দেরি হয়ে যাচ্ছে।

ভদ্রলোক চলে যেতে কিঞ্চিৎ স্বস্তি বোধ করলাম। তিনি কোনো বিষয়ে কথা শুরু করলে সহজে থামতে পারেন না। কলেজের অধ্যাপকদের অনেকের এটা হয়। প্রায় এক ঘণ্টা তাদের ক্লাসে লেকচার দিতে হয় বলে, অনেক সময় সেটা অভ্যাসে পরিণত হয়। এজন্য অবশ্য কাউকে দোষ দেওয়া যায় না।

মেহেদী হাসান এসময় ফোন করল। আমাকে জানাল, সে শিগগিরই ফিরছে, আমি যেন কোথাও না যাই। ওর মোবাইলে চার্জ নেই বলে আর কথা বলতে পারল না। আমি নিজেই বার দুয়েক ওর সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে ব্যর্থ হলাম। কথা না বলতে পেরে মনের মধ্যে একধরনের টেনশন পীড়া দিচ্ছে। কাজটা হলো কি হলো না, এক সেকেন্ডের মধ্যে কথাটা জানাতে পারত সে। আসলে মেহেদী হাসানের চাকরি পার্মানেন্ট করতে পানির গাড়ি আনার কাজটা ওর জন্য একটা পরীক্ষা। সে-কথা আজ ওকে স্পষ্ট বলে দিয়েছি। মাত্র পনেরো দিন আগে কেয়ারটেকার হিসেবে অস্থায়ীভাবে নিয়োগ পেয়েছে সে। স্থায়ী হওয়ার পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারলে তবেই তো স্থায়ী হওয়া।

কিছুক্ষণের মধ্যেই মেহেদী হাসান ফিরে এলো। ওর ঘর্মাক্ত কলেবর ও মুখের চেহারা দেখে বোঝা গেল না, কাজটা করতে পেরেছে কি না!

আমি ওকে জিজ্ঞাসা করলাম, পানির গাড়ি কি ঠিক করেছ?

না স্যার!

ওরা কি ঘুষ খুব বেশি চাচ্ছে?

না স্যার। ওদেরকে ঘুষ দেওয়ার চিন্তা বাদ দিয়েছি।

এটা কী করলে তুমি? ছয়টা ফ্ল্যাটের পানির সমস্যা, কতটা গুরুত্বপূর্ণ তা কি বুঝতে পারো তুমি! পানি আনার ব্যাপারে ব্যর্থ হলে তুমি কিন্তু চাকরি হারাবে, তা তোমাকে আগেই বলে দিয়েছি।

আমি পানির ব্যবস্থা করেছি স্যার!

গাড়ি ছাড়া পানির ব্যবস্থা করলে কীভাবে? এ তো দু-চার বালতি পানির ব্যাপার নয়।

পানি যা লাগবে, তা-ই পাওয়া যাবে। ওয়াসার লাইনও এরই মধ্যে ঠিক হয়ে গেছে। আপনি এ নিয়ে কোনো টেনশন করবেন না।

টেনশন করতে মানা করলেই তো আর টেনশন থেকে মুক্তি পাওয়া যায় না। বললাম, কী ব্যবস্থা করলে, তাই বলো।

আমাদের বিল্ডিংয়ের ওপাশে যে ওয়াসার পাম্প হাউস আছে, তার অপারেটরের সঙ্গে যোগসাজশ করছি। আমাদের বিল্ডিংয়ে যা পানি লাগবে, সে তা-ই দিতে পারবে। এখন আমাদের একটা দীর্ঘ রাবারের পাইপ কিনে নিতে হবে।

কিন্তু ঘুষ?

সেটা ওয়াসার পানির গাড়ি আনার চেয়ে কমই পড়বে স্যার। মেহেদী হাসান বলল, তবে আমাদের ডিসিশন নিতে হবে আমরা বিল্ডিংয়ের পানির পাইপ আদৌ মেরামত করব, নাকি মাসিক চুক্তিতে ওর কাছ থেকে পানি নেব।

সোশ্যাল মিডিয়া

নিউসলেটার