আমার বন্ধু আবদুল আলী

লেখক:

আনিসুজ্জামান

এ জেড এম আবদুল আলীর সঙ্গে আমার যোগাযোগের একটা কৌতূহলোদ্দীপক পারম্পর্য আছে। সে-কথাটা বলেই আরম্ভ করি।

স্থায়ীভাবে বসবাস করতে আমরা ঢাকায় আসি ১৯৪৮ সালের ডিসেম্বরে। আমাদের বাসস্থান নির্ণীত হয় শামিত্মনগরে – পরে সে-বাড়িটি শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের বাসভবনরূপে সুপরিচিত হয়। দক্ষিণ দিকে, তখনকার রামকৃষ্ণপুর (এখন নয়া পল্টন) ও শামিত্মনগরের সীমান্তে, ছিল গাজী শাহাবুদ্দীনদের বাড়ি। মনু আমার তিন ক্লাস নিচে পড়ত, কিন্তু সহজেই আমাদের প্রগাঢ় বন্ধুত্ব হয়ে গেল। সে একদিন বলল, তারা যখন ভৈরবে ছিল, তখন আবদুল হাই নামে একজনের সঙ্গে তার খুব ঘনিষ্ঠতা হয়েছিল। তার ইচ্ছে, চিঠিপত্রের মাধ্যমে হাই ও আমার যোগাযোগ হোক।

তাই হলো। হাই পরে এ টি এম আবদুল হাই নামে সাংবাদিকতা জগতে এবং উত্তর-দা নামে চিত্রালীর পাঠকসমাজে সুপরিচিত হয়েছিল। যে-রসিকতার জন্য চিত্রালীর পাঠকদের সে মন কেড়েছিল, আমার সঙ্গে চিঠিপত্রেও তার ভূরি ভূরি নিদর্শন থাকত। তাছাড়া, আমরা উভয়েই নতুন শব্দ উদ্ভাবন করে পরস্পরকে চমৎকৃত করে দিতাম।

হাই আমার এক বছর ওপরে পড়ত। ১৯৫০ সালে ভৈরব থেকে ম্যাট্রিক পাশ করে সে রংপুরের কারমাইকেল কলেজে আইএ পড়তে গেল। সেখানেই সহপাঠী এ জেড এম আবদুল আলীর সঙ্গে তার বন্ধুত্ব হয়। মনু যেভাবে হাইয়ের সঙ্গে আমার পরিচয় করিয়ে দিয়েছিল, অবিকল সেভাবেই হাই আমার সঙ্গে আলী ওরফে খোকনের পরিচয় করিয়ে দিলো। খোকন ও আমার চিঠির অনেকটা জুড়েই থাকত বাংলা সাহিত্যপাঠের অভিজ্ঞতার বর্ণনা – তাতে পড়া-হয়নি, এমন অনেক বইয়ের প্রতি আমাদের আগ্রহ জাগত।

আইএ পরীক্ষা দিয়ে খোকন ঢাকায় এলে আমাদের চাক্ষুষ পরিচয় হয়। আবদুল হাইয়ের মতো খোকনও গান গাইত, উপরন্তু হাওয়াইন গিটার বাজাত। গানের বদৌলতে হাই ও খোকন আমাদের বাড়িসুদ্ধ সবার সমাদরভাগী ছিল।

আমার বড় দুলাভাই ১৯৫২ থেকে তিন বছর রংপুরে সরকারি কর্ম করেছেন। আমি তাঁদের ওখানে গেলে খোকনদের ধাপের
বাড়িতে যেতাম। আমার সূত্রে ওই দুই পরিবার পরস্পর ঘনিষ্ঠ হয়। বড়বু-দুলাভাই খোকনের একমাত্র বোন বীনুর বিয়ের ঘটকালি করেন দুলাভাইয়ের সহকর্মী মজহার খানের সঙ্গে। এঁদেরই জ্যেষ্ঠ সমত্মান রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যা।

আইএ পাশ করে খোকন খুলনার দৌলতপুরে ব্রজলাল কলেজে বিএ পড়তে গেল। এক বছর পর আবার ফিরে গেল কারমাইকেল কলেজে। সেখান থেকে বিএ পাশ করে এলো ঢাকায়। ভর্তি হলো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে দর্শন বিভাগের এমএ ক্লাসে। তখন সে থাকত মামাবাড়ি খাজে দেওয়ানে। তার উলটোদিকের বাড়িতে সে খুঁজে পেয়েছিল দয়িতা মাসুদা আলম চৌধুরী ওরফে লীলুকে। আমরা
যত-না আড্ডা দিতাম খোকনের মামাবাড়িতে, তার চেয়ে অনেক বেশি দিতাম লীলু আপাদের বাড়িতে। সেখানে তাঁর আম্মা এবং প্রায় সকল ভাইবোনের সঙ্গে আমাদের স্নেহ-ভালোবাসার সম্পর্ক গড়ে ওঠে। লীলু আপার বড় বোন হেলু আপার বিয়ে হয়েছিল অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাকের অনুজ আবদুল খালেকের সঙ্গে – আবুল খায়ের লিটু তাঁদেরই জ্যেষ্ঠ সমত্মান।

১৯৫৬ সালে এমএ পাশ করে খোকন ব্রিটিশ কাউনসিল লাইব্রেরিতে চাকরি নিলো। তার পাঠস্পৃহা নিবারণের যোগ্য ক্ষেত্র সে এখানে পেয়েছিল। বছরখানেক বা তার কিছু বেশিদিন সেখানে থাকার পরে সে কেন্দ্রীয় সুপিরিয়র সার্ভিস পরীক্ষা দিয়ে রেলওয়ে অ্যাকাউন্টসে যোগ দেয়। তবে কর্মজীবন তার সুকুমার কলাচর্চার অমত্মরায় হয়নি। যদিও সে গিটার বাজানো ছেড়ে দিলো, কিন্তু গান আর গ্রন্থপাঠে কিছুমাত্র বিরতি দেয়নি। অফিস থেকে ফিরে জামাকাপড় পালটে, কখনো বা না-পালটেই, সে বই নিয়ে বসে পড়ত। নাহলে, সঙ্গী কাউকে পেলে হারমোনিয়াম নিয়ে বসে যেত।

১৯৬২ সালে খোকনদের বিয়ে হয়। কয়েক বছর পর জন্ম হয় তাদের কন্যা দিশার। একসময়ে সে চট্টগ্রামে বদলি হয়, সরকারি বাসা পায় বাটালি পাহাড়ে। তার বড়ভাই এ জেড এম আবদুল আলিমও তখন চট্টগ্রামে বদলি হয়ে আসেন এবং সপরিবারে খোকনের বাসায়ই থাকতে আরম্ভ করেন। এর মধ্যে ১৯৬৯ সালে আমি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দিই। স্ত্রী বেবী ও কন্যা রুচিকে নিয়ে আমিও আশ্রয় নিই খোকনের সরকারি বাড়িতেই। আমার ছোট মেয়ে শুচির জন্ম চট্টগ্রামে। হাসপাতাল থেকে তাকে নিয়ে বেবী ও আমার শাশুড়ি জায়গা নেন খোকনের ওপর তলায়, রেলওয়ের আরেক কর্মকর্তা মীর মোজাম্মেল হোসেনের কোয়ার্টারে। তবে বেশির ভাগ ঝক্কি যায় খোকনের ওপর দিয়ে।

১৯৭১-এর ২২ মার্চ খোকনের পুত্র তীব্র আলীর জন্ম হয় রেলওয়ে হাসপাতালে। তখন অসহযোগ আন্দোলন চলছে পুরোদমে। আলিম ভাইরা ফিরে গেছেন ঢাকায়। ২৪ তারিখে আমরা নবজাতককে দেখে পোলো গ্রাউন্ডে প্রতিবাদ সভা করতে যাই। সেনাবাহিনীর চলাফেরা ব্যাহত করার উদ্দেশ্যে জনসাধারণ প্রতিবন্ধক স্থাপন করছে, এ-কথা শুনতে পেয়ে আমরা দ্রম্নত ক্যাম্পাসে ফিরে আসি। ২৬ মার্চ কন্যাকে নিয়ে খোকন বাটালি পাহাড়ে, পুত্রকে নিয়ে লীলু আপা হাসপাতালে। কেউ কারো কাছে যেতে পারছেন না। তাদের পুনর্মিলিত হতে অনেক দুঃসহ সময় পার করতে হয়।

২৬ মার্চের পর চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে আমরাও প্রতিরোধ-যুদ্ধে অংশ নেওয়ার প্রয়াস পাই। তা ব্যর্থ হলে ৩০ মার্চ ক্যাম্পাসের সবাইকে দুই পথে নিরাপদ স্থানে পাঠিয়ে পরদিন আমরাও ক্যাম্পাস ছেড়ে দিই। একরাত কু–শ্বরী বালিকা বিদ্যালয়ের হস্টেলে কাটিয়ে আমি আশ্রয় নিই কাটিরহাটে। আমার খবর পেয়ে খোকনের মেজভাই এ জেড এম আবদুল আউয়াল ওরফে সুবা – তখন রামগড় টি এস্টেটের ম্যানেজার – সেখানে এসে উপস্থিত হন। বলেন, চলো, খোকনদের উদ্ধার করার চেষ্টা করি। আমরা কিছুদূর গেলে গাড়ির সামনে পাকিসত্মানি সেনাদের ছোড়া গুলি এসে পড়তে থাকে। অভিযান পরিত্যাগ করে আমরা ফিরে আসি কাটিরহাটে। আমার ও আমার শ্যালক আজিজের পরিবারকে নিয়ে সুবা ভাই চলে আসেন রামগড়ে। পরে সেখান থেকে আমরা সবাই আগরতলায় চলে যাই।

স্বাধীনতার পরে খোকন কিছুকাল ফিশারিজ ডেভেলপমেন্ট করপোরেশনের অর্থ বিভাগে এবং বেশ কিছুকাল বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের সচিব হিসেবে প্রেষণে দায়িত্ব পালন করে। পরে রেলওয়ের অর্থ-উপদেষ্টা ও প্রধান হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা নিযুক্ত হয়। তার অবসরে যাওয়ার আগে ও পরে সে রেলওয়ে-সংক্রামত্ম কানাডিয়ান একটি প্রকল্পে কাজ করে – এ-কাজ তার খুব পছন্দসই হয়েছিল। ওই দায়িত্বের শেষেই সে প্রকৃত অবসর নেয়।

ততদিনে উত্তরায় বাড়ি বানিয়ে সেখানেই চলে আসে। তখন সে বাংলাদেশ জাতিসংঘ সমিতির নানা লেখালিখির কাজে সম্পৃক্ত হয়। এই সময়েই তার কলাম লেখার সূচনা। প্রথমে সংবাদে এবং পরে প্রথম আলোয়।  তার কলামে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা যেমন প্রকাশ পেত, তেমনি পেত মানবাধিকার সম্পর্কে তার সচেতনতা। ভাষার ওপর তার স্বাভাবিক অধিকারেরও পরিচয় থাকত এসব লেখায়। তার কলামের দুটি সংগ্রহ আগামী প্রকাশনী থেকে গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়। ২০১০ সালে সে কালি ও কলমে যোগ দেয় সম্পাদকম-লীর সদস্য হিসেবে। সপ্তাহে দুটি দিন আমরা একই ঘরে বসে কাজ করতাম। পা-ুলিপি-সম্পাদনায় তার স্বাভাবিক দক্ষতা ছিল। আকস্মিক অসুস্থতার জন্যে তার পক্ষে আর শেষ পর্যমত্ম এ-কাজ করা সম্ভবপর হয়নি।

অসুস্থতা যে দুরারোগ্য হবে তা আমাদের মনে হয়নি। প্রধানমন্ত্রীর অর্থানুকূল্যে সিঙ্গাপুরে গিয়েও সে চিকিৎসা নিয়েছিল। কিন্তু তা ফলপ্রসূ হয়নি। ধীরে-ধীরে তার চলচ্ছক্তি ব্যাহত হলো, কথা অস্পষ্ট হয়ে গেল, শ্রবণশক্তি দুর্বল হয়ে পড়ল এবং একপর্যায়ে পড়ারও বিঘ্ন ঘটল। যখন সে আর পড়তে পারছে না, তখনো বইয়ের দোকানে গিয়ে বইয়ের নাম দেখে সে কয়েক হাজার টাকার বই কিনেছে। এমন গ্রন্থপ্রেমিক সচরাচর দেখা যায় না।

খোকনের বন্ধুবাৎসল্য ও মানবিক গুণের কথা তার পরিচিতজনেরা চিরকাল মনে রাখবে বলে আমার বিশ্বাস।

সোশ্যাল মিডিয়া

নিউসলেটার