আমার শিক্ষক শিল্পগুরু

লেখক:

আনিসুজ্জামান আনিস

সদ্যপ্রয়াত সফিউদ্দীন আহমেদ ’৪৭-উত্তর পূর্ববাংলায় চারু ও কারুকলা আন্দোলনে শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের অন্যতম সহযোদ্ধা ছিলেন। এদেশের শিল্প-আন্দোলনে অত্যন্ত নিবিড়ভাবে জড়িয়ে ছিলেন প্রায় ছয় দশক। প্রধানত ছাপচিত্রী হলেও তৈলচিত্রেও তিনি সৃজনশীলতার সাক্ষর রেখেছেন। দীর্ঘ সময় নিয়ে অাঁকা তাঁর একেকটি তৈলচিত্র বিষয় ও কম্পোজিশনে একেবারেই ভিন্নমাত্রার। মননশীলতার সঙ্গে আপস করেননি তিনি।
আশির দশকের শেষদিকে আমরা যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউটে ভর্তি হই সফিউদ্দীন স্যারকে তখন শিক্ষক হিসেবে পেয়েছিলাম। প্রাক-ডিগ্রি প্রথম ও দ্বিতীয় বর্ষে আমাদের উডকাট বিষয়ে দুটি সাবসিডিয়ারি ক্লাস ছিল। উডকাটের কিংবদন্তি শিল্পী সফিউদ্দীন স্যার ক্লাস দুটো দেখতেন। আমাদের শ্রেণিশিক্ষক নিসার হোসেন স্যার একদিন বললেন যে, প্রাক-ডিগ্রি ক্লাসে করা আমার একটি still-life (জড় জীবন) স্যারের খুব পছন্দ হয়েছে।
প্রাক-ডিগ্রি শেষ করে নিসার স্যার ও শিশির স্যারের পরামর্শে আমি ছাপচিত্র বিভাগে ভর্তি হলাম বিএফএ প্রথম বর্ষে। এখানে আমি সফিউদ্দীন স্যারকে চার বছর পেয়েছিলাম শিক্ষক হিসেবে। প্রাক-ডিগ্রিতে থাকার সময় উডকাটের প্রতি আমার যে গভীর ভালোবাসা জন্মেছিল, সেটা আরো তীব্রতর হলো বিএফএতে ভর্তি হওয়ার পর। সফিউদ্দীন স্যার উড-এনগ্রেফিং এবং উডকাটের ক্লাসগুলো নিতেন। স্যারের মায়াবী কম্পোজিশনগুলো দেখে আমি বিমোহিত হই। সেই সঙ্গে পশ্চিম বাংলার কালজয়ী শিল্পী হরেন দাসের কাজের সঙ্গে পরিচিত হই। এই দুই কীর্তিমান শিল্পী আমার মানস গঠনে বিপুল ভূমিকা রেখেছেন। উডকাটের দিগন্ত পালটে দিয়েছেন তাঁরা এ-অঞ্চলে।
সফিউদ্দীন স্যারকে শিক্ষক হিসেবে পাওয়া আমার জীবনের এক বিপুল অভিজ্ঞতা। স্বল্পবাক মানুষ। অত্যন্ত রুচিশীল পোশাক পরিধান করতেন তিনি। দীর্ঘদেহী আমাদের প্রিয় শিক্ষকের শিক্ষকতার স্টাইলটিও ছিল ভিন্ন। তিনি বলতেন, ‘সবসময় দুটি টোনে কাজ করবে। সাদার বিপরীতে কালো। কালোর বিপরীতে সাদা। কনট্রাস্ট সৃষ্টি করতে হবে।’ তিনি সবসময় দুটি টোনে প্রিন্ট নিতে বলতেন। তারপর টুলস দিয়ে ব্লকটিতে আরো কাজ করে সূক্ষ্ম সূক্ষ্ম টেক্সচার সৃষ্টি করার পর প্রিন্ট নেওয়ার তাগিদ দিতেন। সাদা-কালো উডকাটের প্রতি স্যারের বিশেষ আগ্রহ লক্ষ করেছি। তেমনটি রঙিন ছাপাই ছবির বেলায় প্রযোজ্য নয়। স্যারের নির্দেশমতো কাজ করার পর আমি তাঁকে শ্রেণিকক্ষে অথবা অফিসরুমে কাজ দেখিয়েছি। প্রয়োজনীয় উপদেশ দিতেন। কোথায় কোথায় আরো কাজ করার দরকার ছিল বা কোথায় কোথায় ওভার-ওয়ার্ক হয়েছে, সেটা তিনি বলে দিতেন বিশেষ মমতায়। স্যারের উডকাট যেমন এক গভীর মমতার প্রতিচ্ছবি, তেমনি তিনি চাইতেন আমি যেন এই মাধ্যমে বিশেষ যত্নবান হই। কোনো কোনোদিন স্যার প্রাণ খুলে প্রশংসা করতেন। কোনো কোনোদিন কোনো মন্তব্য করতেন না। আমি বুঝে নিতাম যে আমাকে আরো দীর্ঘ বন্ধুর পথ পাড়ি দিতে হবে।
এখন একটি কথা মনে পড়ছে। স্যার বলতেন, প্রতিদিন ১০-১২ ঘণ্টা কাজ করতে হবে। একজন শিল্পী তার কাজের মাধ্যমেই বেঁচে থাকবেন। যেমন কবি কবিতার মাধ্যমে। ভালো কাজগুলোই ইতিহাসে টিকে থাকবে। তাই বিরতিহীন কাজ করে যেতে হবে। বলতেন, কাজ না করলে এই জগৎ থেকে হারিয়ে যেতে হবে। ইতিহাস শুধু কালজয়ীদের কথাই বলে। স্যারের উপদেশ আমি পালন করেছিলাম। বিএফএতে আমি দিনরাত মন-প্রাণ ঢেলে কাজ করেছি। এরপর এমএফএ করার জন্য ভারত সরকারের বৃত্তি নিয়ে পশ্চিমবঙ্গের রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হই। সেখান থেকে ফিরে এসে ২০০১ সালে আমার প্রিয় বিভাগে প্রভাষক হিসেবে যোগ দিই।
আমি নিজেকে ধন্য মনে করি যে, আমার প্রিয় দুই শিক্ষক সফিউদ্দীন স্যার এবং কিবরিয়া স্যারের সহকর্মী হিসেবে কাজ করতে পেরেছিলাম। তাঁদের ছায়াতলে থেকে ছাপচিত্রকলার যে শিক্ষা আমি গ্রহণ করেছিলাম, তা আজ আমার ছাত্রছাত্রীদের মাঝে বিলিয়ে দিতে পারছি।
সফিউদ্দীন স্যারের কাছে আমার ঋণের শেষ নেই। শিক্ষক হিসেবে আমার যোগদানের কয়েকদিন পরই তিনি আমাকে স্মরণ করিয়ে দিলেন শিক্ষকের ভূমিকা কী হওয়া উচিত। ঢাকা চারুকলার ছাপচিত্র বিভাগের ঐতিহ্যের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বললেন, কীভাবে শিক্ষাদান করতে হবে। ছাত্রদের দুর্বলতাগুলোকে কোমলভাবে ধরিয়ে দিতে হবে। extraordinary ছাত্রদের যেমন খেয়াল রাখতে হবে। তেমনি general standard ছাত্রদেরও দক্ষতা বাড়াতে হবে। অর্থাৎ, প্রত্যেককে কাজের প্রতি মনোযোগী করে তুলতে হবে।
২০০৭ সালের শেষদিক থেকে স্যার আর চারুকলায় আসেননি। দীর্ঘদিন শয্যাশায়ী ছিলেন। তবে সবার খোঁজখবর নিতেন। আমার কোনো প্রদর্শনী হলেই আমি ক্যাটালগ নিয়ে দেখাতাম। তবে original print দেখাতে পারিনি। স্যার খোঁজ নিতেন তাঁর ছেলে শিল্পী আহমেদ নাজির খোকনের কাছ থেকে। উডকাট এবং উড-ব্লকপ্রিন্টের কিংবদন্তি এই শিল্পী আমার কাজের বিষয়বস্ত্ত এবং বিবর্তন দেখে খুবই আশাবাদী ছিলেন। তাঁর শুভকামনার কথা আমাকে জানিয়েছিলেন।
সফিউদ্দীন স্যারের কথা এই স্বল্প পরিসরে লিখে শেষ করার মতো নয়। তিনি মিতভাষী ছিলেন, ছিলেন উন্নত জীবনবোধের জীবন্ত উদাহরণ। তাঁর জীবনযাপন, শিল্পবোধ যে কোনো তরুণ শিল্পীর আদর্শ হতে পারে। বাংলাদেশে উডকাটকে যাঁরা বাঁচিয়ে রেখেছেন তাঁদের সবার আদর্শ শিল্পগুরু সফিউদ্দীন আহমেদ স্যার। 

শেয়ার করুন

Leave a Reply