আলোক সরকার : কবি ও কবতিা

লেখক:

আলোক সরকার ও সমকাল

সদ্যপ্রয়াত কবি আলোক সরকারকে নিয়ে লেখার সূচনা হতে পারে তাঁর মৃত্যুতে এলিজি লেখাটির মধ্য দিয়ে, যার রচয়িতা কবির পৌত্র অভীক। অন্তিমে কিশোর অভীক কবিজনোচিত প্রজ্ঞায় লিখেছে, ‘ÔI know/ that death is only/ a comma/ in the sentence of your life’। এই কবিবাক্যটিকে শিরোধার্য করে আমরা কবি আলোক সরকারের কবিসত্তা উন্মোচনে নিয়োজিত হব।
পাঁচের দশকের প্রমুখ কবির অন্যতম আলোক সরকার (২৩.৩.১৯৩১-১৮.১১.২০১৬)। সদ্য স্বাধীন দেশের একটি বিশেষ চারিত্র্যলক্ষণ হলো, শিল্পসাহিত্য, বিজ্ঞান-প্রযুক্তিতে গতিজাড্য সঞ্চারিত হয়েছিল সে-সময়। তাই স্বাধীনতার এক দশকের মধ্যেই আমরা নাটকে যেমন শম্ভু মিত্র-উৎপল দত্ত-অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায়কে পাই, চলচ্চিত্রে সত্যজিৎ-ঋত্বিক-মৃণাল ও ক্ষণস্থায়ী নিমাই ঘোষকে (তাঁর একমাত্র বাংলা ছবি ছিন্নমূল ১৯৫১-তে মুক্তি পায়), তেমনি চিত্রশিল্পে ক্যালকাটা গ্রুপ, কবিতার জগতে সুনীল-শক্তি প্রমুখ আত্মপ্রকাশ করেন। আলোক সরকার সেই প্রবুদ্ধ সময়ের কবি। পাঁচের দশকে যেসব কবির আবির্ভাব, তাঁদের মধ্যে সবচেয়ে আগে কবিতাগ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছিল তাঁর, ১৯৫০-এ। মাত্রই উনিশ বছর বয়সে। বইটির নাম উতল নির্জন। এবং ঠিক তার পরের বছর, অর্থাৎ ১৯৫১ থেকে প্রকাশিত হয় শতভিষা কবিতা পত্রিকা, তাঁর-ই সম্পাদনায়। সহযোগী ছিলেন আলোক-সুহৃদ দীপঙ্কর দাশগুপ্ত। সুনীল-আনন্দ-দীপক মজুমদারের কৃত্তিবাস তাই শতভিষার দুবছরের অনুজ (কৃত্তিবাস বেরোয় ১৯৫৩-তে)। শতভিষা দীর্ঘস্থায়ী হয়নি, তবে ক্ষণকালের ছন্দ, তারপর মিলিয়ে যাওয়াতেই পত্রিকাটির গৌরব।
উতল নির্জন পাঠ করে জীবনানন্দ দাশ তাঁকে যে-পোস্টকার্ড পাঠিয়েছিলেন, সেখানেই নিহিত হয়ে আছে একদিকে কবি জীবনানন্দের কাব্যদর্শন, অন্যদিকে আলোক সরকারের পক্ষে একান্ত অনুস্মর্তব্য কাব্যদীক্ষা। আলোক সরকার জানাচ্ছেন এ-প্রসঙ্গে, তরুণ এই কবি যেন অতিরিক্ত আবেগ বর্জন করেন তাঁর কবিতায়। ‘এটা আমার কাছে খুব বড় মূল্য, হাজার প্রশংসার চাইতেও অনেক বড় পাওয়া’, এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন তিনি।
উনিশ বছর বয়সে কাব্যগ্রন্থ প্রকাশের মধ্যে বাহাদুরি রয়েছে, তবে সে-বয়সে সুকান্ত বা সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের কাব্যসিদ্ধির কথা যদি বিবেচনায় আনি, তবে তাকে অভাবিত বলা যাবে না। উনিশে নয়, কুড়িতে তো রবীন্দ্রনাথও লিখেছিলেন, ‘আজ তোমারে দেখতে এলেম অনেকদিনের পরে।’ আমরা তবু প্রতিতুলনাকে আরো খানিক ব্যাপ্তি দিয়ে বলতে পারি, তাঁর একই পরিবারে তাঁর দশ বছরের অগ্রজ অরুণকুমার সরকার (৩০.১০.১৯২১-১৩.১.১৯৮০) কাব্যগ্রন্থকার হন ১৯৫২-তে, অনুজের দুবছর পর। ‘আরো কবিতা পড়–ন’ আন্দোলনের পথিকৃৎ, একাধিক পত্রিকা যেমন দ্বন্দ্ব, সমকালীন, গাঙ্গেয়, উচ্চারণ, কালপুরুষ ইত্যাদি বিভিন্ন সময়ে সম্পাদনার সঙ্গে যুক্ত অরুণকুমার বুদ্ধদেব বসুর কবিতা পত্রিকার নিয়মিত লেখক, অধিকন্তু রিপন কলেজে স্বয়ং বুদ্ধদেব বসুর ছাত্রও ছিলেন অরুণকুমার। প্রসঙ্গত, বুদ্ধদেব বসু তাঁর আধুনিক বাংলা কবিতা সংকলনগ্রন্থে অরুণ সরকারের চারটি এবং আলোক সরকারের দুটি কবিতা স্থান দিয়েছেন। অন্যদিকে বিষ্ণু দে-সম্পাদিত একালের কবিতা অগ্রজের দুটি আর অনুজের একটি কবিতা রেখেছে। দুই সম্পাদক দুজন কবির কবিতা নির্বাচনেও স্বতন্ত্র। বুদ্ধদেব আলোক সরকারের যে-দুটি কবিতা স্থান দিয়েছেন সে-দুটি হলো ‘অন্তরালে’ ও ‘হৈমন্ত’। অন্যদিকে বিষ্ণু দে বিবেচনাযোগ্য মনে করেছেন আলোক সরকারের ‘কিশোর কবি’। দুই সংকলনেই আলোক সরকারের জন্মসাল নিয়ে ভ্রান্তি রয়েছে। ১৯৩২ নয়, হবে ১৯৩১।
আজকাল পত্রিকায় ১৯.১১.২০১৬-তে আলোক সরকারের যে মৃত্যুসংবাদ প্রকাশিত হয়, সেখানে কবিজায়া আলোকের জন্মসাল ১৯৩১ বলেই জানান। তিনি সেখানে এমনও জানিয়েছেন, ‘কবির খাতায় কলমে জন্ম ১৯৩৩-এ হলেও তাঁর প্রকৃত জন্মসাল ১৯৩১-এর ২৩ শে মার্চ,’ কালীঘাটে। পঁচাশি বছর আয়ু খুব কম নয়। তাঁর কাব্যকৃচ্ছ্রতা তাই সম্ভ্রম আদায় করে আমাদের।
হ্যাঁ, একে কৃচ্ছ্রতাই তো বলব। পঁয়ষট্টি বছরের সারস্বত সাধনায় তাঁর কবিতার বই কুড়িটিরও কম। কবিতা ছাড়াও তাঁর অনুবাদগ্রন্থ রয়েছে, আছে কাব্যনাট্য, আত্মকথা, এমনকি একাধিক উপন্যাস। রয়েছে প্রবন্ধগ্রন্থ, সমালোচনাত্মক লেখাও বেশ কিছু। তবু সব মিলিয়ে তাঁর যে রচনাসম্পুট, তাতে কখনোই তাঁকে বহুপ্রজ বলা যাবে না। মিতকায় অথচ সম্ভ্রান্ত চমৎকৃতি রয়েছে তাঁর প্রায় প্রতিটি রচনার অবয়বে।
উনিশ বছর বয়সে কাব্যগ্রন্থ প্রকাশ করেছেন যেমন, অত্যাগসহন বন্ধু অলোকরঞ্জন দাশগুপ্তের প্রথম বই প্রকাশের সঙ্গেও অন্বিত তিনি। অলোকরঞ্জন কাব্যযাত্রা শুরু করেন অনুবাদ কবিতার বই প্রকাশের মধ্য দিয়ে। ভিনদেশী ফুল নামীয় যে-বইটির কথা উল্লেখ করছি, তা ছিল অলোক ও আলোকের যৌথ অনুবাদ প্রকল্প, এবং সবই ফরাসি কবিদের কবিতার অনুবাদ। ষোলোটি কবিতা নিয়ে বেরোয় এ-বই, যেখানে এঁদের দুজনেরই সমসংখ্যক কবিতার অনুবাদ ছিল। এর আগে বুদ্ধদেব বসুর অনুবাদে বাংলা অনুবাদ কবিতার জগৎ খুলে গেছে (অনুবাদ, ফরাসি-বাংলা, তো রবীন্দ্রনাথও করেছেন), আর মন্ত্রতাড়িতের মতো এই দুই কবি একের পর এক অনুবাদ করলেন, পিয়ের দ্য রঁসার, পল ভের্লেন, আঁদ্রে সেনিয়ের, দেবরদে ভালমোর, ল্যা কোঁত দ্য লিল, অঁরি দ্য রেগনিয়র, পল ভালেরি, লেয় দুবেল, স্তেফান ম্যালার্মে, বোদলেয়ার, ঝসিম দুবেলে। কবিদের কেউ পঞ্চদশ শতকের আবার কেউবা বিশ শতকের। বুদ্ধদেব বসু বাংলায় বোদলেয়ার-অনুবাদক হিসেবে যে উন্মুক্ত করে দিয়েছিলেন ফরাসি কবিচিত্ত, পরবর্তী সময়ে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় অন্যদেশের কবিতা দিয়ে পাশ্চাত্য কবিদের অর্গল খুলে দেবেন, তারই মধ্যবর্তী পর্যায় অলোক-আলোকের এই সান্দ্র আয়োজন। বাংলা কবিতার ইতিহাস অনুবাদ প্রসঙ্গটি প্রায়শ এড়িয়ে চলে বলে বাঙালি কবিদের অনুবাদক-চারিত্র্যটি আমাদের কাছে পুরোপুরি অজানা না হলেও অস্বচ্ছ তো বটেই। অথচ একজন কবির চেতনার সামূহিক জগৎ তাঁর অনুবাদ কর্ম ও আরো বিশেষ করে অনুবাদ-অন্বীক্ষার নেপথ্য বিধানে বিশেষায়িত। একজন শামসুর রাহমান কেন শেক্সপিয়র এবং যুগপৎ রবার্ট ফ্রস্টের অনুবাদে প্রোৎসাহিত হন, বা সুভাষ মুখোপাধ্যায় নাজিম হিকমত আর অমরুশতকে তাড়িত-কৌতূহলী, শক্তি চট্টোপাধ্যায় ওমর খৈয়ামে, কবিদের এই নিজস্ব প্রবণতা বনাম তাঁদের স্বভাষায় নিজস্ব নির্মাণ, এই আন্তঃসম্পর্কটির অবহিতি অপেক্ষিত হয়ে আছে। একই সঙ্গে আমাদের জানা হয়ে ওঠেনি সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত, বুদ্ধদেব বসু আর আলোক সরকারের বোদলেয়ার-অনুবাদের প্রকল্প ও সিদ্ধির সৌকর্য, কিংবা একই হুইটম্যানকে কীভাবে অনুবাদে এনেছেন রবীন্দ্রনাথ, সুধীন্দ্রনাথ দত্ত এবং আমাদের আলোচ্য কবি আলোক সরকার।
বিষয়টি উপলক্ষ করে আরেকটু অনুসন্ধানী হওয়া যাক। আলোক সরকারের অনুবাদ-এষণা সম্ভবত অলোকরঞ্জনের সঙ্গে তাঁর প্রথম যৌবনের সখ্যসঞ্জাত। দুজনের সম্পর্ক নির্মিত হয়েছিল অনতি-উনিশে, এবং অলোকরঞ্জন তাঁর দৈব-নির্দেশনায় সেই বয়স থেকেই অনুবাদমনস্ক অনুবাদতন্নিষ্ঠ, বা এমনকি অনুবাদ-অন্তঃপ্রাণ। অলোকরঞ্জন-শঙ্খ ঘোষের যুগ্ম সম্পাদনায় মাঘ, ১৩৬৯-এ (১৯৬২) যে সপ্তসিন্ধু দশদিগন্ত নামে জলধিপ্রতিম অনুবাদগ্রন্থটি বেরোবে, তারই মাঘ, ১৪১৬-এর পুনর্মুদ্রণের ভূমিকায় শঙ্খ ঘোষ অলোকরঞ্জনের অনুবাদমগ্নতার কথা জানাচ্ছেন এভাবে : ‘অবিশ্বাস্য ক্ষিপ্রতায় প্রায় যন্ত্রচালিতের মতো অলোক একাই অনুবাদ করে চলেছে একটার পর একটা।’ বইটিতে অলোকরঞ্জনের স্বনামে অনূদিত কবিতার সংখ্যা ৪৫, সুপর্ণা সেন ছদ্মনামে ১৬টি। (‘বেশ কয়েকটি কবিতার সাবলীল অনুবাদ করেছেন এই সুপর্ণা সেন। কে তিনি? এতদিন পরে আজ কবুল করতে বাধা নেই যে, ওটা ছিল অলোকেরই দ্রুত-গড়ে নেওয়া এক ছদ্মনাম’ – শঙ্খ ঘোষ, দ্বিতীয় সংস্করণের ভূমিকা)
সপ্তসিন্ধু দশদিগন্ততে আলোক সরকারের অনূদিত কবিতার সংখ্যা ১৭টি। ভিনদেশী ফুল গ্রন্থের কবিতাগুলো ছিল তার মধ্যে। দেখা যাচ্ছে, এরপরেও অনুবাদের প্রতি আগ্রহ কমেনি তাঁর, এবং এই বীপ্সা তাঁর বজায় ছিল আজীবন। এজন্যই তাঁর হাত দিয়ে আমরা কালিদাসের কুমারসম্ভব কাব্যের অনুবাদ পেয়েছি যেমন (১৪১৩/ ২০১৬), তেমনি পেয়েছি বিশ্বকবিতার সংকলন (১৩ আশ্বিন, ১৪১৭/ সেপ্টেম্বর ৩০, ২০১০)। বইটিতে আছে শেক্সপিয়র, জন ডান, টেনিসন থেকে শুরু করে ষাটজন মার্কিন, ইংরেজ, জার্মান, ফরাসি, স্প্যানিশ ও আফ্রিকীয় কবির কবিতার অনুবাদ। অর্থাৎ আজীবন তিনি অনুবাদচর্চাকে ব্রত পালনের নিষ্ঠায় মান্য করে গিয়েছেন। এই গতিজাড্য, আমাদের বিশ্বাস, তিনি পেয়েছিলেন অলোকরঞ্জনের সঙ্গে বন্ধুতার সূত্রে। একটু বিস্তৃতির প্রয়োজন এখানে।
শতভিষা আর কৃত্তিবাস সমসাময়িক হলেও এ-দুই কবিতাকেন্দ্রিক পত্রিকার দর্শনপ্রস্থান ছিল স্বতন্ত্র। কৃত্তিবাস নিজেদের একটি কবিগোষ্ঠী তৈরি করে নিয়েছিল, যে-কারণে সুনীল-শঙ্খ-অলোকরঞ্জন-শরৎ-বিজয়া-সমরেন্দ্র প্রমুখ কৃত্তিবাসের কবি বলে পরিচিত। অন্যদিকে শতভিষার চালিকাশক্তি ছিল আদর্শগত। তিরিশের কবিদের থেকে বেরিয়ে আসার আন্তর এষণা থেকেই পত্রিকাটি সম্পাদিত হতো। এমন নয় যে, পত্রিকা দুটির সঙ্গে অমৈত্রী ছিল; প্রায় সব কবিই উভয় পত্রিকায় স্থান পেতেন, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের আলোক সরকার প্রশস্তিমূলক রচনাও পাচ্ছি আমরা। তারাপদ রায় তাঁর আসন্নপ্রসবা স্ত্রীকে এমনকি এরকম আশ্বাসও দিয়ে রেখেছিলেন যে, কন্যা জন্মালে শতভিষা নাম রাখা হবে, আর পুত্র হলে কৃত্তিবাস। (তারাপদ তবু সংশয়ী ছিলেন। সজনীকান্ত দাস সে সংশয়কে নস্যাৎ করে ধরেই নিলেন, তাঁর স্ত্রী পুত্রসন্তানের জন্ম দিতে চলেছেন। প্রকাশনা খুলবেন সজনীকান্ত, প্রাক্-জাতপুত্র ও প্রকাশনার নাম দেওয়া হলো ‘রঞ্জন’।)
অলোকরঞ্জন ছিলেন এ-দুই পত্রিকার মধ্যে প্রবল সেতু, আর স্বভাবত লাজুক আলোক সরকারের সঙ্গে নির্ভয় ও নির্ভার সখ্য ছিল তাঁর। অলোকরঞ্জনের সঙ্গেই বন্ধুত্বে তিনি ছিলেন নিবিড় ও সহজ, যার স্বীকৃতি রয়েছে আলোক সরকারের লেখায়। ‘অলোকের সান্নিধ্যে আসার ফলে আমার জীবন প্রায় ঘুরে গিয়েছিল।’ কীরকম ঘুরে যাওয়া? অলোকরঞ্জনের মাঙ্গলিক প্রযোজনায় আলোক সরকার বাংলায় এম.এ. দেন। আর তারপর ‘আমি এম. এ. পাশ করলাম। কলেজের একটা চাকরি চাই। এটা অলোক খুব ভালো করেই জানত। একদিন বিকেলের দিকে এক ভদ্রলোক আমার কাছে এলেন, বললেন – অলোক পাঠিয়েছে। তিনি শ্যামসুন্দর কলেজে পড়ান, ওখান থেকে রিলিজ চান অন্যত্র যাবেন বলে। কিন্তু উপযুক্ত কাউকে না দিতে পারলে প্রিন্সিপাল রিলিজ অর্ডার দিচ্ছেন না। আমি কি সেই ভার নিতে পারব? আমি সেখানে চলে গেলাম সঙ্গে-সঙ্গে। পরদিনই আমি বর্ধমানের ওই কলেজের কাজে যোগ দিলাম। সেই চাকরি পাওয়ার পেছনে অলোকের অবদান যে অনেকটাই, সে তো বলাই বাহুল্য। এভাবে আমার শিক্ষকজীবন শুরু হয়েছিল অলোকের হাত ধরেই।’ দুজনের সখ্যের পরিচয় আরো আছে।
দুজনেই প্রথম জীবনে কাব্যনাট্য লিখেছেন। এবং দুজনের দুটি কাব্যনাট্য, অর্থাৎ অলোকরঞ্জনের উত্তরমেরু আর আলোকের অশ্বত্থগাছ অভিনীতও হয়েছিল, মূলত অলোকরঞ্জনের উৎসাহে।
স্বভাবলাজুক আলোক সরকার কবি-সাহিত্যিকদের সঙ্গে অন্তরঙ্গ হতে পারতেন না। সমসময়ের কবিদের মধ্যে প্রণবেন্দু দাশগুপ্তের সঙ্গে তাঁর খানিকটা সহজ সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল, এবং তাও সম্ভবত অলোকরঞ্জন-পরিবাহিত হয়ে। এরই ফলশ্রুতিতে প্রণবেন্দুর মারফত যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় সমাচার, বিশেষ করে তুলনামূলক সাহিত্যের অধ্যাপক বুদ্ধদেব বসু, সুধীন্দ্রনাথ দত্ত, ফাদার ফাঁলো এবং তাঁদের পাঠদান পদ্ধতি-প্রকরণ নিয়ে আলোক সরকারের অবহিতি ঘটত। এর মধ্য দিয়েই প্রণবেন্দুবাহিত ম্যালার্মে, রিলকে, বোদলেয়ার প্রমুখ কবি অধিগত হন। অন্যদিকে অলোকরঞ্জনের সঙ্গে ক্যারম খেলা চলছে, হিন্দি সিনেমা দেখতে গিয়ে একপর্যায়ে অসহনীয় মনে হওয়ায় দুজনেরই হল ছেড়ে বেরিয়ে আসার কথা আলোক সরকার তাঁর অলোকরঞ্জন-সম্পর্কীয় এক লেখায় জানিয়েছেন (অহর্নিশ, অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত বিশেষ সম্মাননা সংখ্যা, ২০১৪)। তবে এসবের চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো অলোক-আলোকের মিলিত অনুবাদে ফরাসি কবিদের বাংলা অনুবাদে পাওয়া, যার কথা এর আগে বলেছি আমরা।
অনুবাদের এক বহতা সময় সেটা। সুধীন্দ্রনাথের অনুবাদে শেক্সপিয়র ও ম্যালার্মে পেয়েছি এ-পর্বে। ১৯৫০-এর ডিসেম্বরের কবিতা প্রকাশ করল ১৯ জন মার্কিন কবির কবিতার অনুবাদ। বিষ্ণু দে একের পর এক প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য কবিদের কবিতা অনুবাদ করে চলেছেন। কবিতা-অনুবাদের সুবাদে, ভাবলে শিহরিত হতে হয়, নেরুদা কলকাতায় এলে তাঁর গৃহে অতিথি হন, মাও সে তুং চিঠি লেখেন তাঁকে ১৯৫৭-তে। তাঁর আটটি কবিতা অনুবাদ করেছিলেন বিষ্ণু দে। কেবল অনুবাদকর্মই এঁদের করে তুলল আন্তর্জাতিক!
আলোক সরকারের এই পর্যায়ে অর্জন অন্তত দুটি। দুটি-ই শ্লাঘ্য অর্জন, এবং দুটি-ই তিনি পেয়েছিলেন বুদ্ধদেব বসুর কাছ থেকে। শতভিষার আবির্ভাবকে অভিনন্দন জানিয়েছিলেন বুদ্ধদেব কবিতা পত্রিকায়, ‘ইতিমধ্যে কবিতার পত্রিকা বা সংকলনও নতুন বেরিয়েছে। একটি নয়, দুটি নয়, পর পর একেবারে তিনটি। শতভিষা, কবিতাপত্র, তারপর সব শেষের কবিতা।… বাংলা কবিতার পাঠকসংখ্যা যে বাড়ছে, তার একটি নিশ্চিত প্রমাণ এতে পাওয়া গেল। প্রসঙ্গত, অন্য দুটি পত্রিকার নাম পরিবর্তনের পরামর্শ দেন বুদ্ধদেব, শতভিষা নামটি অতএব সমর্থিত ছিল তাঁর। ‘সব শেষের নামটি খুব কু-নির্বাচিত হয়েছে – কবিতার কি কোনো শেষ আছে? আর কবিতাপত্র নামটিতে আপত্তি করি অন্য কারণে, কবিতা আর কবিতাপত্রে তফাত খুব স্পষ্ট নয় বলে।’
আলোক সরকারের অন্য অর্জনটি হলো, ১৯৬৩-তে বুদ্ধদেব বসু-সম্পাদিত আধুনিক বাংলা কবিতার তৃতীয় সংস্করণটিতে তাঁর স্থান লাভ। ১৯৫৬-তে এর দ্বিতীয় সংস্করণ বেরোয়, বুদ্ধদেবের সম্পাদনায়। (আদি সংস্করণটি ১৯৪০-এর, যার সম্পাদনায় ছিলেন আবু সয়ীদ আইয়ুব এবং হীরেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়।) প্রতিটি সংস্করণে কবি ও কবিতা নির্বাচনে রদবদল ঘটাতেন বুদ্ধদেব। ১৯৫৬, ১৯৫৯, ১৯৬৩ ও ১৯৭৩, এবং পূর্বতন ১৯৪০ ধরে মোট পাঁচটি সংস্করণ বেরিয়েছিল আধুনিক বাংলা কবিতা গ্রন্থটির। ১৯৬৩-তে আলোক সরকারের সে-সংকলনে স্থান পাওয়া এ কারণেই ঈর্ষণীয় ছিল যে, তাঁর সমসাময়িক কবি শঙ্খ ঘোষ, বিনয় মজুমদার বা শক্তি চট্টোপাধ্যায় বুদ্ধদেব বসুর বিবেচনাযোগ্য হন দশ বছর পরে প্রকাশিত (১৯৭৩) বুদ্ধদেবের জীবিতকালে প্রকাশিত শেষ সংস্করণটিতে। হ্যাঁ, এমনকি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ও, যিনি ছিলেন কৃত্তিবাস-সম্পাদক এবং মীনাক্ষী-জ্যোতির্ময়ের (বুদ্ধদেবের কন্যা ও জামাতা) অতিনিকটজন। ১৯৬৩-সংস্করণে, হ্যাঁ, ছিলেন অলোকরঞ্জনও।
ঈর্ষণীয়, কিন্তু ঈর্ষাহীন সুনীল তাঁর আত্মজীবনীতে কৃত্তিবাস পত্রিকায় আলোক সরকারের অন্তর্ভুক্তি বিষয়ে আনন্দিত ও সাবলীল। শতভিষা ও কৃত্তিবাস সহযোগিতা-প্রতিদ্বন্দ্বিতার মধ্য দিয়ে এগোয়নি। শতভিষা তিন-এ পড়তে বেরোল কৃত্তিবাস। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় ছাড়াও দুই সহযোগী ছিলেন সে-পত্রিকার, – আনন্দ বাগচী এবং দীপক মজুমদার। কৃত্তিবাসের এষণা ছিল তরুণ কবিদের মুখপত্র হয়ে ওঠার। সেজন্য এ-পত্রিকা তরুণোত্তর কবিদের কবিতা ছাপেনি। যদিও প্রবীণদের প্রবন্ধকে প্রশ্রয় দেওয়া হতো সেখানে। শতভিষা কিন্তু তিন ও চার দশকের মুখ্য কবিদের কবিতা নিয়মিতই ছেপেছে, – বুদ্ধদেব বসু, বিষ্ণু দে, জীবনানন্দ। এরকম কিছু পার্থক্য ছিল পত্রিকা দুটির।
আলোক সরকার কৃত্তিবাসের সূচনা সংখ্যাতেই উপস্থিত। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় তাঁর আত্মজীবনী অর্ধেক জীবনে জানাচ্ছেন, ‘দক্ষিণ কলকাতা নিবাসী আরো দুজন কবি (অলোকরঞ্জন-ব্যতিরেকে) আলোক সরকার এবং অরবিন্দ গুহ তরুণদের মধ্যে সুপরিচিত, তাঁরাও আমাদের অনুরোধে সাড়া দেন। আলোক সরকার দুটি কবিতা পাঠালেন।’ সুনীল, শক্তি, শংকর ও শঙ্খ উত্তর কলকাতার, অন্যদিকে অলোকরঞ্জন, অরবিন্দ গুহ, আলোক সরকার ও দীপঙ্কর দাশগুপ্ত দক্ষিণের। দক্ষিণ কলকাতার দেশপ্রিয় পার্কে
‘সুতৃপ্তি’ ছিল উত্তর আর দক্ষিণের কবিদের মিলনস্থল। সুনীল লিখছেন তাঁর আত্মজীবনীতে, ‘সুতৃপ্তি নামে চায়ের দোকানে রবিবার সকালের আড্ডায় মাঝে মাঝে যোগ দিয়ে আলাপ হয় অরবিন্দ গুহ, আলোক সরকার, দীপঙ্কর দাশগুপ্ত প্রমুখের সঙ্গে।’
আগেই বলেছি, শতভিষা একটি কাব্যধারণাকে পুরোধা করে এগিয়েছে। একদিকে সুনীল, শক্তি, শরৎ ও উৎপলের বেপরোয়ামি, মধ্যরাতে ফুটপাত বদলের অন্তর্গূঢ় তন্ত্রাচার, অন্যদিকে শুদ্ধ কবিতায় সংস্থিতি, এই দুই প্রবহমানতা পত্রিকা দুটির বৈশিষ্ট্য। তা ছাড়া কৃত্তিবাস পেয়েছে সিগনেট প্রেসের স্বত্বাধিকারী দিলীপকুমার গুপ্তের বরাভয় ও অর্থানুকূল্য। পত্রিকার প্রথম সংখ্যাটি তাই হতে পেরেছিল চল্লিশ পৃষ্ঠার, যেখানে শতভিষা অত্যন্ত তন্বী, মাত্রই ষোলো পৃষ্ঠার। আর কেবল বহবায়তনেই নয়, ‘মূল্যবান কাগজ, মুদ্রণও বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত, প্রত্যেক পৃষ্ঠায় ওপরে-নিচে দুটি করে ঢেউ খেলানো রুল দিয়ে এর আগে কোনো কবিতা পত্রিকা ছাপা হয়নি’। (সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, অর্ধেক জীবন, পৃ ১৪১)।
যাহোক, শতভিষা, কৃত্তিবাস, একক, ধ্রুপদী, কবি ও কবিতা, কবিপত্র, এসব বরেণ্য কবিতাপত্রিকা বাংলা কবিতাকে নিঃসন্দেহে পুষ্ট ও সমৃদ্ধ করেছে। তালিকায় আরো অসংখ্য নাম আসতে পারে। জিগীষা, কবিকৃতি, কবিসম্মেলন, এ-মাসের কবিতা, চিত্রক, পরমা। স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলা কবিতার কথা যখন লেখা হবে তখন দেখব আলোক সরকার তাঁর পত্রিকার মাধ্যমে যেমন সে-সময়কার কাব্যধারাকে প্রশ্রয় দিয়ে গেছেন, পাশাপাশি তাঁর সময়কার এবং পরবর্তী সময় পর্যন্ত যেসব কবিতাকেন্দ্রিক পত্রিকা প্রকাশিত হয়েছে, এবং তাছাড়াও সাধারণভাবে যে-কোনো সাহিত্য পত্রিকাই তাঁর কবিসত্তাকে জাগরূক রাখার ব্রত পালন করে গেছে। তরুণ প্রজন্মের সঙ্গে তাঁর নিত্য সংযোগ তাঁকে নির্মিতি দিয়েছে, অধুনার সঙ্গে যুক্ত রেখেছে তাঁকে অবিরত। ২০ আশ্বিন, ১৩৯৮-এ তিনি অলোকরঞ্জনকে যে-চিঠিটি লিখেছিলেন, আমাদের বক্তব্যের পাথুরে প্রমাণ হিসেবে সেটি গণ্য হতে পারে। ‘কত তরুণ কবি এখন যে কত ভালো কবিতা লিখছে – এইসব অভিজ্ঞতা আমাকে আরো কিছুদিন বেঁচে থাকতে উৎসাহ দেয়।’ তাঁর সঙ্গে ব্যক্তিগত সম্পর্ক যে বিপুলসংখ্যক কবির, তাঁরা আরো ভালো করে তথ্যটি উপলব্ধি করতে পারবেন। সুখে-দুঃখে এমন একটি দিনও যায়নি, যেদিন তাঁর লেখার টেবিলটিতে এসে নতমুখ হয়ে বসেননি। কিছু না কিছু না লিখে প্রবোধ লাভ করতে পারেননি। ব্যক্তি মানুষ ছেড়ে কবি আলোক সরকারের কাব্যকৃতির গভীরে ঢুকব আমরা এবার। দেখার ও জানার চেষ্টা করব পাঁচের দশকের কবি হিসেবে কোথায় স্বাতন্ত্র্যচিহ্নিত তিনি। এবং এর পাশাপাশি আধুনিক বাংলা কবিতার বিশ্বে তথা আবহমান বাংলা কবিতার পরিপ্রেক্ষিতে তাঁর সঠিক অবস্থান।

কবি আলোক সরকার
১৯৫০ থেকে ২০১৬, এই সময়কাল জুড়ে কবি আলোক সরকারের কাব্যচর্চা ও কাব্য-ভাবনা। তিনি পাঁচের দশকের কবি হিসেবে চিহ্নিত। দশকটি নিরালম্ব আর একরৈখিক আর এক দশকের গ-িতে সীমাবদ্ধ নয় আদৌ। একরৈখিক নয়, তা আমরা বুঝতে পারি বিনয় মজুমদারের ফিরে এসো চাকা (১৯৬২) আর শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের হে প্রেম হে নৈঃশব্দ্য – ভাষা, আঙ্গিক, বিষয়বস্তু এবং গঠন-সৌকর্যের দিক দিয়ে আলাদা কত। আমরা যদি বাংলা কবিতার বলয়কে আরো প্রসারিত করে দেখি, বরাক উপত্যকা, সমগ্র আসাম এবং ত্রিপুরা জুড়ে এ-সময় যে-কবি সমাহার, সেই শক্তিপদ ব্রহ্মচারী, উদয়ন ঘোষ, ঊর্দ্ধেন্দু দাশ, বীরেন্দ্রনাথ রক্ষিত, সমাচার চক্রবর্তী, সলিলকৃষ্ণ দেববর্মন, অপরাজিতা রায়, কবরী দেববর্মন; তাহলে তো বাংলা কবিতার বহুমুখিনতা অন্তহীন! সেই আনন্ত্যকে অধিক বর্ণিল, মেধাবী,
ক্রম-প্রসার্যমাণ, প্রায়-অনিঃশেষ আর সম্ভ্রান্ত মনে হবে, যদি তার সঙ্গে যুক্ত করে নিই তৎকালীন পূর্ববঙ্গের (১৯৫৬-পরবর্তীতে যে ভূখ-ের নাম হয় পূর্ব পাকিস্তান এবং ১৯৭১-পরবর্তীতে বাংলাদেশ) কবিকুলকে, একমাত্র তখনই পাঁচের দশকে বাংলা কবিতার অঙ্গসংস্থানটি যথার্থ রূপ ধরবে। এই তালিকায় অতএব আমরা যুক্ত করে নেব হাসান হাফিজুর রহমান, আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ, শামসুর রাহমান, আলাউদ্দিন আল আজাদ, দিলওয়ার, মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান প্রমুখ নাম। এখানে আরো স্মর্তব্য, শতভিষা অথবা কৃত্তিবাসই নয়, কেবল আগরতলা আর ঢাকা থেকে প্রকাশিত কবিতা-পত্রিকা, যেমন কবিকণ্ঠ (শামসুর রাহমান-ফজল শাহাবুদ্দীন), স্বপ্নিল (১৯৫৭-তে আসামের হাইলাকান্দি থেকে প্রকাশিত প্রথম কবিতা-পত্রিকা। তরুণ দুই কবি করুণাসিন্ধু দে এবং ত্রিদিব মালাকার ছিলেন এ-পত্রিকার সম্পাদক)। বুদ্ধদেব বসু তাঁর কবিতা পত্রিকায় স্থান দিচ্ছেন যেমন পাঁচের দশকে জায়মান কলকাতার কবিদের তেমনি ঢাকার শামসুর রাহমান, শহীদ কাদরী, আল মাহমুদকে, করিমগঞ্জের রণেন্দ্র দেব, অশোকবিজয় রাহা আর মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় (শেষের দুজন পরবর্তীকালে চলে আসেন শান্তিনিকেতন ও কলকাতায়। অনুবাদক হিসেবে মানবেন্দ্র আজ কিংবদন্তিপ্রতিম)। আগরতলা থেকে প্রকাশিত হয়ে স্বপন সেনগুপ্তের নান্দীমুখ দীর্ঘ পঁচিশ বছরের ওপর চলেছিল, কবিতা পত্রিকার আয়ুষ্কালকে একক গরিমা দেওয়ার আগে বাংলা সাহিত্য-সংস্কৃতির কেন্দ্রাতিগ অঞ্চলের পত্রপত্রিকার সনিষ্ঠ প্রয়াসকে যেন আমরা কণ্ঠস্থ করে রাখি।
এই বৃহৎ ক্যানভাসে আলোক সরকারকে দাঁড় করাতে চাই আমরা। দ্বন্দ্ব ও বৈপরীত্য, ভূগোলের ব্যাপ্তি আর স্বাতন্ত্র্য, বনাম আলোক সরকারের কবিতা। স্বাতন্ত্র্য, তবু সহসা কলকাতা-আসাম কখনো-কখনো তুল্যমূল্যও কিন্তু হয়ে যায়। যেমন ‘মনের মধ্যে খুঁজলে পাবে আমার লেখা চিঠিপত্র’ যখন লিখছেন শক্তি চট্টোপাধ্যায়, উদয়ন ঘোষের রচনাতেও পাই অনুরূপ ভঙ্গিমার সুপরামর্শ, – ‘বুকের ভেতর তাকালে সই এখনো ঠিক দেখতে পেতে সেই পুরনো যাদুর বাঁশী বৃষ্টিমুখর কাম্বেবন।’
আলোক সরকার সুনীল-শক্তি-শঙ্খ-অলোকরঞ্জনের ঘরানার নন, শামসুর-শহীদ কাদরী কিংবা শক্তিপদ-উদয়নের চেয়ে অনায়াসেই স্বাতন্ত্র্য চিহ্নিত তাঁর কবিতাকায়া। বরং পূর্ববর্তী দশকের সিদ্ধেশ্বর সেন আর অরুণ মিত্রের সঙ্গে তাঁর কাব্যকৃতির মিল আবিষ্কার সম্ভব, অথবা ‘ব্রহ্ম ও পুঁতির মউরি’র রমেন্দ্রকুমার আচার্য চৌধুরী আর নীল পাথরের আকাশের মণীন্দ্র গুপ্তর মেজাজের সঙ্গে মেলেন তিনি। পরাবাস্তবতা এবং বরফের নিচের শৈত্য যেন তাঁর কবিতাকে পাঠকের চেতনার অন্তঃস্থ দিয়ে বয়ে চলে। ‘মলিন অন্ধকারের ভিতর সাদা একটা বেলফুল – আমি স্পষ্ট শুনতে পেলুম। ওরা সবাই চলে গেছে ওরা সবাই ঘরে ফিরে গেছে। উঠোনের প্রান্তসীমায় একটি মাত্র বেলফুল – ওরা সবাই ঘরে ফিরে গেছে’ (অবসান, অমূলসম্ভব রাত্রি থেকে)। এখানে যে নিরুত্তাপের ঘন প্রহর, তা এলিয়টকে মনে না করিয়ে পারে না, ‘evening as a patient etherized upon the table’ Ges ‘the dog creeping like a cat’, এর দ্বৈত সংরাগ ভেসে আসে এসব পঙ্ক্তিতে। আবার, ওই ১৯৭৮-এ-ই, অমূলসম্ভব রাত্রি বেরোয় যে-বছর, প্রকাশিত হয় অরুণ মিত্রের শুধু রাতের শব্দ নয়। কী অসম্ভব সমরৈখিক সে-গ্রন্থের পুরনো নতুনের টানে গদ্যপদ্যের এই অংশটি, – ‘কোন রাস্তা যে কোথায় যায় এখন/ বোঝা যায় না, কিসের আশায় আশায়/ মাচায় পোড়ে হলুদ ফুল, উঠোন/ টেমির আলোর ছায়ার মেলা বসায়।’ এলিয়ট, আমাদের মনে হচ্ছে এই পর্বে এজরা পাউন্ডের সঙ্গে সখ্যের সূত্রে যে প্রথম বিশ্বযুদ্ধপরবর্তী লন্ডনে অবস্থিত বুধজনদের সান্নিধ্য সাহচর্যে নিজেকে ঋদ্ধ ও সাহিত্যবোধের প্রতি তীক্ষন, বিধিবদ্ধ আর তন্ময় করে নিচ্ছিলেন এবং তাঁর জীবনের আরো আদিতে তাঁর হার্ভার্ডে অধ্যয়ন, সদ্গুরুর দাক্ষিণ্যে ভারতীয় সাহিত্য ও দর্শনে আগ্রহী হয়ে ওঠা, আলোক সরকারেও বর্তেছিল। আরভিং ব্যাবিট ছিলেন সরাসরি শিক্ষক এলিয়টের, অন্যদিকে আলোক বুদ্ধদেব বসুর ভাবশিষ্য। এলিয়টের কাছে গীতা আর উপনিষদ হয়ে দাঁড়াল আলোক সরকারের কাছে শেক্সপিয়র, গ্যেটে, বোদলেয়ার।
কবিতা কবিভেদে নানা সংজ্ঞায় সংজ্ঞায়িত হয়। পাশ্চাত্য ও প্রাচ্য – বহু কবিই নিজস্ব চেতনায় কবিতার স্বরূপ কী তা বোঝাতে চেষ্টা করেছেন। আবার বহু কবি তা করেনওনি, সম্ভবত কবিতাকে নিঃসঙ্গ বলে মনে হয়েছে তাঁদের। আলোক সরকার কবিতার স্বরূপ ব্যক্ত করেন এভাবে – ‘একথা আমরা সবাই জানি যে একটি কবিতাকে সম্পূর্ণ গ্রহণ করার প্রয়োজনে যেমন সংবেদনী সহৃদয়ের আবশ্যক হয়, ঠিক সেই রকম সচেতন পরিশ্রমী বিদ্যাবত্তার। কবিতার রসগ্রহণ শ্রমসাপেক্ষ, তার প্রতিটি শব্দকে হৃদয়ের সঙ্গে সঙ্গে প্রজ্ঞা-মেধা দিয়েও উপলব্ধি করতে হয়, প্রয়োজনের ক্ষেত্রে একটি শব্দের অর্থ, তাৎপর্য বুঝবার জন্য অভিধান, পুরাণ অথবা যথাযোগ্য স্থানে অনলস অন্বেষণ করতে হয়।’
হ্যাঁ, অন্বেষণ, নিয়ত অন্বেষণ। রৌদ্রময় অনুপস্থিত, স্তব্ধলোক মেঘনিবেশ, অর্থহীন অর্থহীনতা, ঘাস রঙের আলো তালকুঞ্জ নারিকেল বীথি যে-কবির কাব্যগ্রন্থগুলোর নাম, যাঁর কবিতাকায়া নির্মিত এহেন ধূসর পঙ্ক্তিতে, ‘পূজামণ্ডপ/ গ্রাস করছে আকাশ। পূজামণ্ডপ/ গ্রাস করছে সমুদ্র, আনন্দপবন।’ অথবা ‘একটা সম্ভবের মধ্যে আরেকটা সম্ভব/ একটা হওয়া/ প্রলম্বিত আরেকটা হওয়া।’
বর্তমান লেখকের সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে আলোক সরকার জানিয়েছিলেন, মৌলিক কোনো রঙের ওপরে তাঁর বিন্দুমাত্র প্রিয়তা নেই, তিনি একাধিক বর্ণের সমন্বয়ে যৌথ উদ্ভাস চাক্ষুষ করে নন্দিত হন। এই প্রমিত ও ঋজুরেখ স্বীকারোক্তি তাঁর স্বকীয় কবিসত্তার চাবিকাঠি, এবং কবিতা থেকে কবিতান্তরে তাঁর বর্ণিকাভঙ্গ সত্য হয়ে ওঠে। প্রাক্তন থেকে তাঁর স্বরকে তিনি স্বতন্ত্র করে নেন এভাবে। যেমন নিয়েছিলেন বিনয় মজুমদার। কালিদাস থেকে রবীন্দ্রনাথ পর্যন্ত সমুদ্র বর্ণনার যে মিথ, তার দর্শনপ্রস্থান পালটে গেল বিনয়ের এহেন মায়াহীন মতিভ্রমহীন বাস্তবতার মেধাবী ছোঁয়াতে, সমুদ্রের জল ‘দৃশ্যত সুনীল কিন্তু প্রকৃত প্রস্তাবে স্বচ্ছ জল’ হয়ে উদ্ভাবিত হলো তাঁর কবিতায়। হ্যাঁ, এ-ও একপ্রকারের উদ্ভাবন, বস্তুর স্বরূপ যখন Poetic license-এ বিসদৃশ করে তোলে সদৃশকে। আলোক সরকারও বিনির্মাণ ঘটান বুদ্ধদেব বসুর আর্ষ কবিবাক্যটির – ‘শুধু তা-ই পবিত্র যা ব্যক্তিগত।’ আলোকের কবিতায় এর বিনির্মাণ, বা নবনির্মাণ যা-ই বলি না কেন, এরকম, ‘যা কিছু উদ্গ্রীব তার আন্তরিকতার প্রশ্নাতীত।’ এবং এর পরই তাঁর কবিতাকন্দুক নিয়ে ধন্দে ফেলে দেন পাঠককে, ‘যা কিছু উদ্গ্রীব তা কখনই ক্রমান্বয় নয়।’ এখানে ‘কখনও’ শব্দটি ব্যবহারে তাঁর নিষ্ঠা লক্ষ করে ভাবতে বসতে হয় পাঠককে, হ্যাঁ, সত্যি বটে কথাটা। আসন্নপ্রসবা তাঁর অত্যাসন্ন সন্তান-আকাক্সক্ষায় উদ্গ্রীব, কিন্তু এ-সময় তাঁর চিন্তার হয়তো পরম্পরা নেই। একবার হয়তো মনে হচ্ছে শিশুমুখটি কতক্ষণে দেখবেন, পরক্ষণেই হয়তো নার্সিং হোমের সবুজ পর্দায় কৈশোরে গাছে ঝাঁকি দিয়ে কুল পাড়বার স্মৃতিতে তিনি তন্ময়। Stream of consciousness, সে কেবল আধুনিক সাহিত্যেরই যে কুললক্ষণ, তা কিন্তু নয়, তার ঠিকুজি তো উপনিষদে মনকে অশ্ব কল্পনা করার মধ্য দিয়েই প্রতিভাত।
‘তুমি যুবক কবে হবে কিশোর কবি?’ এই পঙ্ক্তিতে হয়তো নিজের আকুতি ব্যক্ত করেছেন আলোক। জিজ্ঞাসাটিতে কোনো তুমুল আততি নেই, নেই কোনোরূপ ব্যঞ্জনা। কিন্তু এই কবি-ই দীর্ঘ, সুদীর্ঘ দিন বাদে ‘জীবনযাত্রা’ কবিতায় যখন লেখেন, ‘বোবা নিঃঝুম পরিত্যাগ/ আজও উঁচু-নিচু জীবনযাপন’, তখন ওই ‘নিঃঝুম’ শব্দে এসে আমরা থমকে যাই। আগে তো ‘বোবা’ শব্দটি ছিলই, আবার তবে প্রায়-সমার্থক শব্দটির অনিবার্যতা কোথায়? কবিতাটির সূচনায় পেয়েছি, ‘ওই চড়–ই পাখিগুলো/ ওদের সঙ্গে আমার সম্পর্ক ঠিক কোথায়?’ এরপরই তিনি জানাচ্ছেন, ‘আমার জন্য কেউ সাজগোজ করে না’, আর তারপরই তার পাশাপাশি, খানিকটা তির্যক বিপ্রতীপে দাঁড় করালেন তিনি চড়–ইকে ‘রোদ্দুর সোনালী হয়েছে আর/ খেলায় মেতে উঠেছে চড়–ই পাখিরা।’ চড়–ই পাখিদের খেলার জন্য এই যে আয়োজন রোদ্দুরের, এই সাজগোজ, কবির জন্য নয়। চড়–ইটি একবার বারান্দার রেলিংয়ে এসে বসে, পরক্ষণেই নিমগাছের ডালে, যেন ওই রোদ্দুরের আহ্লাদী প্রশ্রয়, সাহচর্য, অনুকূলতায়। এই সাহচর্যহীনতাই কবির কাছে প্রতীকিত হয়েছে এভাবে, ‘কত নিঃসীম এই পরিত্যাগ/ কত বোবা আর শব্দ-গন্ধহীন।’ এখন এই যে নিঃসীম শব্দগন্ধহীনতা, নিঃঝুম ও বোবা শব্দগুলোর বিষণœ বৈভবে সেজে উঠল কবিতাটি, তাতে চড়–ইয়ের সঙ্গে সর্বাঙ্গীণ সম্পর্কটি জানা হয়ে গেল, সঙ্গ ও নিঃসঙ্গতার মধ্যে যে ব্যবধান, ভূমা ও অকিঞ্চনের মধ্যে, চড়–ই ও কবির মধ্যেও তাই।
এখানে এসে রবীন্দ্রোত্তর আধুনিক বাংলা কবিতায় দুর্বোধ্যতা নিয়ে খানিক আলোচনা জরুরি। কবিতাকে দুরূহতার পোশাক পরানোকে প্রত্যবায় মনে করেছেন আবু সয়ীদ আইয়ুবের মতো প্রাজ্ঞ বুধজন। এঁরা যেন ওয়ার্ডসওয়ার্থ-কথিত কবিতার সংজ্ঞাকেই লোপাট করে দিতে চান, ‘Poetry is passion, it is the history of Ôscience of feelings.’ আইয়ুব বলছেন, দুরূহতা কবিদের নিতান্ত আরোপিত, কবিতার শ্রেষ্ঠত্ব ও স্বাতন্ত্র্য দেখানোর অছিলা। নৈরাশ্য আর দুর্বোধ্যতা আধুনিক কবিতার দুই রিপু, আইয়ুবের মতে। আমরা তাঁর সপক্ষে এই পঙ্ক্তিগুলো দাঁড় করাতে চাই –
১. ‘…যেকালে নিরুদ্দেশযাত্রার সংজ্ঞায় হেন/ দুরবস্থা শুধু সম্ভাব্যই নয়, অবশ্যম্ভাবীও’ (সুধীন্দ্রনাথ দত্ত, ‘যযাতি’)।
২. ‘তোমার বিপুল জাগরণ/ আনন্দরূপমমতেম্/ অয়শ্চক্রে প্রদক্ষিণের পর, উত্তরাবর্ত কক্ষে/ অনুসুর, বিন্দু/ যদ্বিভাতি/ দিঙ্ম-ল প্রসারিত, প্রসারিত, ঘূর্ণিত বাষ্পমেঘে/ যদ্বিভাতি’ (সিদ্ধেশ্বর সেন, ‘উত্তর অয়শ্চক্রে, প্রদক্ষিণ’)।
৩. ‘উদাসীন চোখে দীর্ঘ পক্ষ্ম ভিড়ে/ কার যাতায়াত? চিরকাল উদ্ভ্রান্তি!/ চেনা-অচেনায় চেতনার কোথা শান্তি?/ উভবলী ঐ হৃদয়ে উষ্ণ নীড়ে/ সে কোন্ আকাশ বাসা বেঁধে পায় শান্তি?’ (বিষ্ণু দে, ‘চ-ীদাস বা দান্তে’)।
৪. ‘মুসাফির! দূরদেশী খোশ আম্দেদ জানাই তোমাকে।/ একবার করে যে পুরা সাখাওতি করে যে জাহানে/ সঠিক জবাব যার, তায়ী-পুত্র-সে দারাজ দিল/ হাতেমের দেশ থেকে এসে যদি; দোস্তের ডেরায়/ দাওয়াতে কবুল করো’ (ফররুখ আহমদ, নৌফেল ও হাতেম)।
৫. ‘বাঞ্ছারাম আর বেণীবাবু; মোতিরাম, তার বাবা,/ বৈদ্যবাটীর চিনে জোঁকটি, ঠক চাচা, আর হাবা/ সাঙ্গোপাঙ্গো আজো বেড়ায়; ব্লাকিয়র দেয় থাবা/ তাদের কিন্তু জোর বংশবর, ভালো সেটাও ভাবা’ (অমিয় চক্রবর্তী, ‘মূল্য বদল’)।
এসব কাব্য পঙ্ক্তির পাশাপাশি জন টেলরকে ১৮১৮-এর ২৭ ফেব্রুয়ারিতে লেখা জন কিটসের চিঠির অংশবিশেষ কতই না বিপরীত মেরুতে মনে হয়, ‘If poetry comes not as naturally as the leaves to a tree, it had better not come at all.’ কিটসের নিদান মানতে বাধ্য নন বিশ্বের কোনো দেশের কবি, মানা গেল। তবু কি একথা সত্য নয়, যা সুধীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন রবীন্দ্রনাথকে ২৫.৪.১৯৩৯-এর চিঠিতে।
‘… অব্যাখ্যার সাহায্যেই আমাদের অন্যায় কার্যকলাপের (এক্ষেত্রে কবিতার) অর্থ অংশত বুঝি।’ এরই পরিপূরক হিসেবে বুদ্ধদেব বসুকে লেখা রবীন্দ্রনাথের পত্রাংশটুকু পেশ করা যাক (২৬.৯.১৯৩৩), ‘কথাবার্তায় এরকম কৃত্রিম ঢংটাতে রসভঙ্গ হয়, কেননা তাতে সমস্ত জিনিসটার সত্যতাকে দাগী করে দেয়।’
এখানেই দুই আলোক সরকারে সংঘাত, কবি আলোক সরকার এবং অনুবাদক আলোক সরকার। কয়েকটি তুলনা দেওয়া যেতে পারে :
১. ‘কিন্তু স্রোত চেয়েছিলে তুমি,/ ভালোলাগা তবু অন্য দ্বিতীয় যন্ত্রণায়/ অপর ক্লান্ত দুচোখ মেলো’ (‘কিশোর কবি’)।
২. ‘যখন শিশুর কণ্ঠ শোনা যায় সবুজ প্রান্তরে/ গুঞ্জনে গুঞ্জনে ভরে গিরিতল/ আমার কিশোরবেলা মনে পড়ে সতেজ সুন্দর – / আনন্দে প্রফুল্ল মুখ, বেদনা-বিহ্বল।’ (‘ধাত্রীর গান’, উইলিয়াম ব্লেক/ আলোক সরকার)।
৩. ‘সকল অভিসারের অন্তর্নিহিত অমান্যতা/ অন্ধকার এই নিয়তি হিম অচঞ্চল সঙ্গতি/ মধ্যাহ্নের তাপিত নৈঃশব্দ্য, অশ্বত্থগাছের অবগাঢ়তা’ (‘যাত্রাকাহিনী’)।
৪. ‘উঠোনে দাঁড়িয়ে ছিল ছোট তালগাছ/ এত ছোট ভাবতে পারবে না -­/ যেহেতু রয়েছে বেড়া চারদিক ঘিরে/ কেউ তাকে মাড়িয়ে যাবে না’ (‘তালগাছ’, ব্রেখট/ আলোক সরকার)।
বিশ্বকবিতার সংকলনে আলোক সরকারের অনুবাদগ্রন্থটিতে মোট যে-বাষট্টিজন কবির কবিতার অনুবাদ (মোট ১৯০টি) রয়েছে সেসব কবিতার সহজবোধ্যতা বনাম তাঁর নিজ কবিতার দুরূহতা কৌতুকপ্রদ।
আরো কৌতুক লক্ষযোগ্য অরুণ ও আলোক, এই দুই সহোদরের কবিতার মিল-অমিলের প্রতিতুলনায়। সাধারণভাবে দুজনের জগৎ আলাদা। একই ছাদের তলায় বাস করতেন যখন, তখনো কবিতা তথা সাহিত্য নিয়ে খুব যে মতবিনিময় হতো দুজনের মধ্যে, তা নয়। এই প্রতিবেদকের সঙ্গে সাক্ষাৎকারে আলোক সরকার বলেছেনও সে-কথা। পাশাপাশি দুজনের সম্পর্ক কিন্তু যথার্থ ভ্রাতৃপ্রতিমই ছিল। ১৯৭৪-এ ‘ভারবি’-প্রকাশিত অরুণকুমার সরকারের শ্রেষ্ঠ কবিতায় কবি জানাচ্ছেন তাঁর সুমিত ভূমিকাতে, ‘এই বইটি প্রকাশের ব্যাপারে সব থেকে আমাকে সাহায্য করেছেন অনুজ কবি শ্রী আলোক সরকার।’ দুজনের কবিতার আকাশ ভিন্ন, তবু কখনো-কখনো যেন ছুঁয়ে যান একে অপরকে। অরুণকুমার ঘোষিতভাবে প্রেমের কবি। তাঁর কবিতাসমগ্রের ভূমিকায় কবি নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী জানান, ‘অরুণকুমারকে… যে ‘ভালবাসার কবি’ বলতে প্রলুব্ধ হচ্ছি আমরা, তার কারণ, নানাবিধ পরিচয়ের ভিতর থেকে তাঁর ওই পরিচয়টাই শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে বড় হয়ে তাঁর পাঠকের সামনে এসে দাঁড়িয়ে যায়।’ দুই সহোদরের প্রেমের কবিতা একটু দেখে নিলে কেমন হয়? প্রথমে অরুণকুমার।
১. সে কোন নারীকে আমি ভালোবেসে ক্ষয়ে যেতে পারি/ কঠিন অসুখে ভুগে? (‘শান্তিনিকেতন থেকে’)
২. তোমাকে চাই আমি, তোমাকে চাই/ তোমাকে ছাড়া নেই, শান্তি নেই,/ রক্তকিংশুকে জ্বালিয়ে দাও/ আমার বৈশাখী রাত্রিদিন’ (‘বৈশাখী’)।
৩. ‘সিন্দুক নেই; ঋণ আনিনি,/ এনেছি ভিক্ষালব্ধ ধান্য।/ ও দুটি চোখের তাৎক্ষণিকের/ পাব কি পরশ যৎসামান্য?’
এরই বিপ্রতীপে দাঁড়িয়ে মেদুর, অরুন্তুদ আর মেঘার্ত গান্ধর্ববর্ণমালা আলোক সরকারের –
১. ভালোবাসা জানাইনি কোনোদিন। গোলাপের তোড়া হাতে/ যাইনি তোমার কাছে।/ আজ সারাবেলা/ মেঘের প্রণতি; দেখো, গোলাপ আমার বিছানাতে/ এলোমেলো ছড়ানো রয়েছে’ (‘গোলাপ’)।
২. ‘জোনাকি জ্বলছে, রান্নাঘরের উনুন, অনভিযোজিত উপহার/ বেলফুল এনেছে মালতী জ্বালিয়েছে জুঁই-চামেলীর নির্জন।/ অন্যমন পদক্ষেপে উঠোন অতিক্রান্ত অনায়াস আনন্দের/ অসম্পৃক্ত ছন্দ দেখায় কালো চুল প্রস্তুত নিবেদন।/ আমার অন্তরালে তোমার প্রস্তুতি বহুদিবসের’ (‘প্রস্তুতি’)।
৩. ‘অথচ সবার আগে তোমাকে রাখবো।/ সবাই দেখুক/ কিন্তু ভয়ে মরি/ কেউ যদি নিতে চায় তোমাকেই, যদি দিতে চায়/ হাজার মোহর – আমি কখনো দেবো না/ আমি স্বপ্নের কুমকুম/ এনে রোজ সাজাবো তোমাকে’ (কাব্যনাট্য মায়াকাননের ফুল)।
দেখা গেল অরুণ ও আলোক যে সহোদর দ্বিজেন্দ্রনাথ-রবীন্দ্রনাথের মতো তা সংবাদমাত্র। তার বেশি কিছু ভাবতে গেলে বিভ্রান্ত হবো আমরা।
কাব্যনাট্য লেখেননি অরুণকুমার। অন্যদিকে আলোক সরকার লিখেছেন অন্তত দশটি। অনুবাদে আলোক বহুপ্রজ, অরুণকুমার অনুবাদ করেছেন মাত্র-ই দশ-এগারোটি। তবে দুজনেই গ্যেটে, হাইনে অনুবাদ করেছেন। ছোটদের জন্য কিছু ছড়া আছে জ্যেষ্ঠের, কনিষ্ঠের নেই। মাত্রই ৫৮ বছরের আয়ু ছিল অরুণ সরকারের, অন্যদিকে আলোক বেঁচেছিলেন ৮৫ বছর বয়স পর্যন্ত।
আমরা অবশেষে তাঁর অনুবাদে কালিদাসের কুমারসম্ভব এবং তাঁর কাব্যনাট্যগুলো নিয়ে আলোচনা করব।
কাব্য, কাব্যনাট্য, নাট্যকাব্য, এসব কচকচানি খুব পুরনো। মোদ্দাকথা, রবীন্দ্রনাথেই সম্ভবত এর শুরু। বুদ্ধদেব বসুতে কাব্যনাট্য শিখরে উঠেছে। পরবর্তীকালে চার (মণীন্দ্র রায়, রাম বসু) আর পাঁচের দশকে প্রায় মহামারির আকারে দেখা দিতে থাকে কাব্যনাট্য। মহাকালের বিচারে এসব আয়োজনে শাশ্বতির পরিমাণ সংশয়াত্মক। বুদ্ধদেবের পূর্বী উত্তরসূরি সৈয়দ শামসুল হক আর পশ্চিমে অলোকরঞ্জন অবিশ্যি কাব্যনাট্যকার হিসেবে স্থায়ী আসন পেয়ে গেছেন। অলোকরঞ্জনের কাব্যনাট্য বিষয়বস্তু নিয়েও দুঃসাহসিক। বিবেকানন্দ নিবেদিতাকে পাত্রপাত্রীরূপে পাচ্ছি (হে মহাজীবন হে মহামরণ), একটিতে সালিম আলী এবং স্বয়ং অলোকরঞ্জন কুশীলব)।
অলোকরঞ্জন এবং আলোক সরকারের কাব্যনাট্য রচনার কথা আমরা গোড়ায় জেনেছি। মোট দশটি কাব্যনাট্য রয়েছে আলোক সরকারের। আলোকের কাছে ‘ডাকঘর বিষয়ভরা কাব্যময় উপস্থাপন, তাকে নিশ্চিন্তে নাটক বলা যাবে কিনা সন্দেহ হয়’ (ভূমিকা আলোক সরকারের সমগ্র কাব্যনাটক গ্রন্থের) পাঠের পর আলোকসখা অলোকরঞ্জনের কাছে প্রশ্ন রাখব, প্রাচীন কথিত ‘কাব্যেষু নাটকম্ শ্রেষ্ঠম্’ কথাটি কতখানি প্রশ্রয়যোগ্য?
যাহোক, আলোক সরকারের কাব্যনাট্যগুলো সাধারণভাবে মানুষে মানুষে দ্বন্দ্ব, স্বপ্ন ও বাস্তবের কোলাজে যে তৃতীয় ভুবন গড়ে ওঠে, সেসবের কথা বলে। মুখের ভাষার সহজিয়ানা তাঁর সংলাপের মুদ্রা। আলোছায়ার বিন্যাস, পাপবোধ, পুণ্যবোধ, অহমিকা, ক্বচিৎ ঈর্ষাও প্রায়শ এক অজানা সুন্দরের আভা এসে লাগে যে চরাচরের বিচিত্র মানুষের মধ্যে, তারই সুরভিত নির্যাস তাঁর কাব্যনাট্যে সংলাপিকা হয়ে ঝরে পড়ে।
কুমারসম্ভব অনুবাদে (অষ্টম সর্গ পর্যন্তই এ-কাব্যের পরিধি, এমন বিশ্বাস তাঁর) তাঁর নিষ্ঠা, শ্রম, সৌন্দর্য-চেতনাকে কুর্নিশ জানাতে হয়। এ-কাব্যের ভাবগাম্ভীর্য, আদি ও হাস্যরসকে যথার্থ অনুবাদে ধরেছেন তিনি। বুদ্ধদেব বসুর মেঘদূতের পরে নচিকেতা ভরদ্বাজকৃত পবনদূত, সুকুমারী ভট্টাচার্যের মৃচ্ছকটিক এবং আলোক সরকারের কুমারসম্ভব উজ্জ্বল সংযোজন। কুমারসম্ভব্ল এর আগেও অনূদিত হয়েছে রঙ্গলাল বন্দ্যোপাধ্যায়, নরেন্দ্র দেব, কালিদাস রায়, যতীন্দ্রনাথ সেনগুপ্তের হাতে। আলোক সরকার তবু অনন্য। অন্তিমে তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা।

সোশ্যাল মিডিয়া

নিউসলেটার