আলো নেই

লেখক:

মোহাম্মদ ইরফান

ছাত্রাবাস থেকে বাসস্ট্যান্ড পর্যন্ত হেঁটে এসে ক্লান্ত ছেলেটি বাসে উঠেই ধপাস করে বসে পড়ে তার জানালার ধারের সিটে। কাঁধের ব্যাগটি কোলের ওপর নামিয়ে রাখে আপাতত। ছেলেটি বসে যেতেই হন্তদন্ত হয়ে পাশের আসনে এসে বসে একজন ভদ্রলোক।

বসার সঙ্গে সঙ্গেই আবার উঠে পড়ে ভদ্রলোক। ছেলেটির কোল থেকে হাতব্যাগটি তুলে নেয়। বিস্মিত ছেলেটিকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে মাথার ওপরের মালামালের তাকে তুলে দেয় ব্যাগটি। লটবহরে ঠাসাঠাসি র‌্যাকে হালকা-পাতলা ব্যাগটি ঢোকাতেও বেশ কসরত করতে হয় ভদ্রলোককে। কাছাকাছি সিটগুলোর লোকজন তাকিয়ে থাকে তার দিকে, সন্দেহভরা চোখে।

ভদ্রলোক ব্যাগ রেখে বসতেই ছেলেটির মনে পড়ে যায় তার মিউজিক প্লেয়ারটি রয়ে গেছে ব্যাগের সাইড পকেটে। অযাচিত উপকারের জন্য কৃতজ্ঞ না হয়ে বিরক্ত হয় ছেলেটি – দেড়শো মাইলের লম্বা পথ গান না শুনে থাকতে হবে এ-কথা চিন্তা করে। একটা ফোক ব্যান্ডের নতুন সিডি ভেঙে কটি গান ভরে দিয়েছে এক বন্ধু হল থেকে বেরোনোর আগে আগে, বলেছে বেশ মজার গান।

শেষ পর্যন্ত লজ্জার মাথা খেয়ে সিটের সামনে উঠে দাঁড়ায় ছেলেটি। মালামালের তাকের জন্য ঘাড় কিছুটা গুঁজো করে দাঁড়াতে হয়। না তাকিয়ে কেবল বাঁ-হাত দিয়ে হাতড়ে ব্যাগটিকে নামিয়ে নিজের কাছে নিয়ে আসে সে, আশ্চর্য দক্ষতায়। পার্শ্ববর্তীর বিস্ফারিত দৃষ্টির তোয়াক্কা না করে ব্যাগের পকেট থেকে প্লেয়ার বের করে নিয়ে ব্যাগটিকে অবলীলায় ঠেলে দেয় সিটের নিচে।

প্রতিদানের প্রকারে দৃশ্যত মর্মাহত উপচিকীর্ষু সহযাত্রী সঙ্গে সঙ্গেই বলে ওঠে, ‘ওপর থেকে নিয়া গেলে তো সবাই দেখবে, বাবা। নিচের থেকে টান মারলে কেউ টের পাবে না, তুমিও না।’

সহৃদয় সাবধানবাণী ছাপিয়ে ভদ্রলোকের আরোপিত জ্যেষ্ঠতা হয়তো বা আবারো অসন্তুষ্ট করে ছেলেটিকে। ‘জি, আববাজান’ বলে ভদ্রলোকের দিকে হাসি হাসি মুখ করে তাকায় সে।

আহত হয় ভদ্রলোক। ছেলেটির ওপর থেকে দৃষ্টি সরিয়ে জানালা দিয়ে বাইরে তাকায়। বোঝার চেষ্টা করে আর কতদূর দেরি যাত্রা শুরুর।

বাস চলতে শুরু করলেই আরাম করে বসার চেষ্টা করে ছেলেটি। হাতে ধরা প্লেয়ারের শব্দ কিছুটা বাড়িয়ে দিয়ে কানের হেডফোন ঠিকঠাক করে। গুনগুন করে গলা মেলায় যন্ত্রের সঙ্গে। চোখ বন্ধ করে ঘুমানোর চেষ্টা করে। ঘুমে ঘুমে রাত পার হয়ে গেলে পথের ধকল গায়ে লাগে না ততটা। গাড়ির দুলুনিতে ঝিমুনি এসেও যায় দ্রুত।

সহযাত্রীর আগ্রাসন থেকে আসন রক্ষায় তৎপর হয় এবারে ছেলেটির পাশের ভদ্রলোক। বুকের কাছে দুই হাত উঠিয়ে আস্তে আস্তে বাঁয়ে ঘোরায় শরীরের ঊর্ধ্বাংশ। যেন মল্লযুদ্ধে নামার আগে শরীরের গাঁটগুলো সচল করে নিচ্ছে কোনো পাকা কুস্তিগির। ডানের মোচড়ে প্রয়োজনের চেয়ে কিছুটা বেশি চলে যায় তার কনুই। আঘাত হানে পার্শ্বযাত্রীর তরুণ পাঁজরে।

জেগে ওঠে ছেলেটি। পাঁজরের ব্যথা, চটকা ভেঙে যাওয়ার বিরক্তি সব মিলে খেঁকিয়ে ওঠে পাশের দিকে তাকিয়ে, ‘ওই তোমার গায়ে তেল হইছে?’

অর্ধেক বয়সী কারো কাছ থেকে এ-ধরনের সম্বোধন শুনে হতবাক হয়ে যায় ভদ্রলোক। অপমান লুকানোর প্রয়াসে অবোধ্যতার আড়াল খোঁজে শুরুতে, ‘কী হইছে বাবা? কার তেল হইছে?’

‘আমার বামের ভামের তেল হইছে?’ বাসভর্তি লোকের কথা মাথায় রেখে যুযুধান যুবক অস্ত্র ছুড়ে তীর্যকভাবে।

অমর্যাদার মাত্রাবৃদ্ধিতে নিরুপায় বোধ করে ভদ্রলোক। আশপাশের যাত্রীদের দিকে তাকায়, সমর্থন-সহানুভূতি-সহযোগিতার প্রত্যাশায়। সাড়া মেলে না খুব একটা। মনে হয় কেউ যেন শুনতেই পায়নি কিছু। সামনের সিটে বসা দম্পতির মাঝখান থেকে পেছন দিকে মুখ বের করে রাখা ছোট্ট শিশুটি কেবল ভেংচি কাটে, দাঁত বের করে।

‘এই বাইচ্চা, ঘুমাও না কেন?’ নিরীহ শিশুর ওপর রাগ ঝাড়তে পেরে কিছুটা স্বস্তি বোধ করে ভদ্রলোক।

অচেনা লোকের ধমক খেয়ে ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে যায় ছোট শিশু। মায়ের ঘাড়ে মুখ লুকিয়ে কেদে ওঠে ভ্যাঁ করে। শিশুটির বাবা সিটের ওপর দিয়ে ঘাড় ঘুরিয়ে পেছনে তাকায়। আত্মজের অসন্তুষ্টির হেতু অনুসন্ধানের ব্যস্ততা, জায়ার তুষ্টি সাধনের ত্রস্ততা ফুটে ওঠা বাবার চেহারা দেখে বিচলিত বোধ করে পেছনের ভদ্রলোক। চোখ বন্ধ করে ঘুমের ভান করে গোলমাল এড়াতে। ঘাড় এলিয়ে দেয় বাঁয়ের শত্রুর দিকে। হালকা হাইও তোলে।

শিশুর বাবা কিছু বুঝতে পারে না। একবার ঘুমন্ত ভদ্রলোকের মুখের দিকে তাকায়, আবার যুবক যাত্রীর দিকে।

‘অ্যানি প্রবলেম, ব্রাদার?’ বলে ওঠে ছেলেটি, যথেষ্ট জোরে, যেন শিশুর পরিবারের সবাই বুঝতে পারে তার উদ্বেগ।

শিশুর বাবার সঙ্গে কথা বললেও ছেলেটির দৃষ্টি ঘুরে ঘুরে যায় সামনের দুই সিটের মাঝখানের ফাঁকে।

বিব্রত হয় শিশুর বাবা, ‘না, না। কোনো প্রবলেম না।’ তাড়াতাড়ি বলে ওঠে সে।

‘প্রবলেম হইলে পিছন ফিরা জাস্ট একটু আওয়াজ দিবেন ব্রাদার।’ আরো একবার জানিয়ে দেয় ছেলেটি।

‘আচ্ছা’ বলেই একটি দীর্ঘশ্বাস চেপে দ্রুত বসে পড়ে শিশুর বাবা। ছেলেটির অভয়বাণীতে আশ্বস্ত হলো, না শংকিত হলো, সে ঠিক বোঝা যায় না।

দুই

‘স্যার, ওঠেন। উইঠা পড়েন।’

ঘুম ভেঙে জেগে উঠে ছেলেটি দেখতে পায় সারাবাসে সে একাই বসে আছে। চালকের সহযোগী তার সামনে দাঁড়িয়ে বিনয়ের সঙ্গে তাকে ওঠানোর চেষ্টা করছে।

বিরক্ত হয় ছেলেটি। মাঝরাতে কাঁচা ঘুম ভেঙে খাওয়া-দাওয়া করার ব্যাপারটি ঠিক পছন্দ নয় তার। বরঞ্চ সকালে বাস থেকে নেমে বাসস্ট্যান্ডের পাশের ঝুপড়িতে পরোটা-চা নিয়ে বসে সে। চায়ে ডুবানো পরোটা বাসি মুখে তুলে দিতে দিতে উপভোগ করে বাক্স-পেঁটরা, কাচ্চা-বাচ্চা নিয়ে লোকজনের হুজ্জত-হাঙ্গামা। নিজেকে বেশ মুক্ত, বেশি সুখী মনে হয়, সে-সময়টায়।

‘স্যার, আপনে খাইবেন না। সবাইর খাওয়া পেরায় শেষ। এই ওস্তাদ আবার হেবি টাইট। ঠিক সময়মতো গাড়ি ছাইড়া দেবে।’

পুনরুক্তিতে উত্ত্যক্ত হয় না ছেলেটি। বরঞ্চ দ্বিতীয়বারের মতো সাহেবি ডাক শুনে নিজেকে কিছুটা গুরুত্বপূর্ণ মনে হয় তার। মনোযোগ দিয়ে লক্ষ করে সে চালকের সহযোগীকে। বোঝার চেষ্টা করে তার সমস্যা, সমাধানের উপায়।

কোম্পানির দেওয়া জামার জমিনে কালি-ঝুলির অনুপস্থিতি, লুঙ্গির বদলে ঢলঢলে প্যান্ট, আর গামছার সরু টাই বাসের হেলপারের ভোল পালটে তাকে সহযোগীতে উন্নীত করলেও মালিক-চালক-শ্রমিকের শ্রমবিভাগে তার অবস্থানের যে মৌলিক কোনো পরিবর্তন হয়নি ওপরওয়ালাকে ‘ওস্তাদ’ সম্বোধনই তার প্রমাণ।

ছেলেটি একসময়ে শুনেছিল তার সহপাঠীদের কেউ কেউ আন্তঃজেলা বাসে এই কাজ নিচ্ছে। এক রাতে গিয়ে পরের রাতে চলে আসলে ক্লাস ছুটে যায় না, পয়সা যা আসে তাতে এক-দুটো পড়ানোর কাজ ছেড়ে দিলেও হয়। ছেলেটিও ভেবেছিল করবে, তবে, আজকাল আর পাওয়া যাচ্ছে না। বাস মালিকেরা এতদিনে নিশ্চয় শহরের বাড়িওয়ালাদের মতোই বুঝে গেছে, দেয়ালে রং করেই ভাড়া বাড়ানো যায়। গুণগত মানের সঙ্গে মুনাফার সম্পর্কে আজো বিশ্বাসী কেবল কমার্স ফ্যাকাল্টির স্যারেরাই।

স্যার শব্দটি মাথায় আসতেই আবার প্রসন্ন হয়ে যায় ছেলেটির মন। সামনে দাঁড়ানো মানুষটিকে বাসের হেলপারদের মতো ঠিক তুই-তোকারি করতে মন সায় দেয় না তার –

‘আচ্ছা, আপনে যান। আমি আইজকা আর নামব না।’

‘ইয়েস বস।’ বলে রীতিমতো ছেলেটিকে স্যালুট ঠুকে হাসিমুখে বিদায় নেয় চালক-সহযোগী।

হেসে জানালা দিয়ে বাইরে তাকায় ছেলেটি। দেখতে পায় গাড়িচালক আলাপ করছে কয়েকজন লোকের সঙ্গে। গাড়িতে ওঠার সময় তাড়াহুড়ায় চালকের চেহারা দেখা হয়নি ছেলেটির। তবে কোম্পানির পোশাকপরা ঘন গোঁফের চালককে চিনে নিতে কষ্ট হয় না তার। এসব কোম্পানির গাড়িচালকরা সাধারণত কিছুটা দূরত্ব বজায় রাখে যাত্রীদের সঙ্গে। কোম্পানিরই মনে হয় নির্দেশনা – পাছে বেশি মেলামেশায় চালকদের তৈরি করা হাসি হাসি মুখের আড়ালের রাগী, অভাবী, অশীল চেহারারটা বেরিয়ে পড়ে। ছেলেটি তাই কিছুটা অবাকই হয় এই মাঝরাতে যাত্রীদের সঙ্গে চালককে খোশগল্প করতে দেখে। কিছুটা সন্দেহও জাগে মনে। আজকাল প্রায়ই চালকের সঙ্গে দুর্বৃত্তদের যোগসাজশের কথা শোনা যায়। তেমন কিছু নয় তো?

ছেলেটি এসব ভাবতে ভাবতেই লোকগুলোর কাছ থেকে একটু সরে গিয়ে একটি সিগারেট ধরায় চালক।

গাড়ির সামনের দিকে অদৃশ্য হয়ে যায় লোকগুলো। প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই উদয় হয় ওরা গাড়ির দরজায়। ততক্ষণে অন্য যাত্রীরাও উঠতে শুরু করেছে গাড়িতে।

গাড়িতে উঠতে থাকা লোকদের সবচেয়ে সামনে থাকা লম্বা লোকটির সঙ্গে ধাক্কা লাগে অন্য একজন যাত্রীর।

‘উহ্’ কাতরে ওঠে যাত্রীটি। মুখের বিকৃতি দেখে মনে হয় ধাক্কায় হাতে ধরা খিলাল ঢুকে গেছে দাঁতের মাড়িতে।

এত তাড়াহুড়া করে এই লোকদের গাড়িতে উঠতে দেখে সন্দেহ কিছুটা বাড়ে ছেলেটির। সোজা হয়ে বসে সজাগ চোখে তাকায় লোকদের দিকে। কান থেকে হেডফোন খুলে মিউজিক প্লেয়ার আর হেডফোন দ্রুত চালান করে দেয় প্যান্টের পকেটে।

‘স্যরি ভাই, লাগছে খুব। লাগছে খুব।’ ধাক্কাওয়ালার বিগলিত গলা শুনে যুগপৎ বিস্মিত হয় ছেলেটি।

‘লাগছে না তো কী?’ ব্যথিত বিরক্ত জবাব ধাক্কা খাওয়া যাত্রীর।

‘আরে ভাই, ও একটা বলদা। দেইখা চলতে পারে না।’ লোকদের আরেকজন এগিয়ে এসে আহত যাত্রীকে সান্ত্বনা দেয়।

‘ঠিক আছে ভাই। ঠিক আছে।’ ব্যথায় বিকৃত মুখে কোনোমতে হাসি ফোটায় আহত যাত্রী।

ছেলেটি নিজের ভুল বুঝতে পারে। এরা নিতান্তই ভদ্রলোক। হয়তো ব্যবসা-বাণিজ্যের কাজে একসঙ্গে ভ্রমণ করছে। রাত-বিরেতে পথের মাঝে একজন যাত্রীকে একা পেয়ে অপদস্থ করার মতো বাজে লোক এরা নয়।

মিটমাট হয়ে যেতেই আবার সবাই এগোতে থাকে যার যার আসনের দিকে। ছেলেটির পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় মৃদু হাসে লোকদের একজন, ‘কী ভাই, খিদা লাগে নাই?’

লোকটির আন্তরিকতার জবাব দেয় ছেলেটি মৃদু হেসে। ছেলেটির আসনের পেছনের সারিতেই গিয়ে বসে তারা।

নিজের ওপর আবারো বিরক্ত হয় ছেলেটি, এই লোকদের নিয়ে বাজে চিন্তা মাথায় আসায়। নিশ্চিন্ত মনে পকেট থেকে প্লেয়ার বের করে। গান বদলে দেয়  – ‘সাদা সাদা মেঘ তুমি/ উড়ে উড়ে যাও  -’।

 

তিন

চলন্ত বাসে ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে স্বপ্ন দেখে ছেলেটি। স্বপ্নে উড়ছে সে শহরের ওপর দিয়ে। ওড়ার স্বপ্ন প্রায়ই দেখে ছেলেটি। শুধু ওড়ার পরিপ্রেক্ষিত আর নিচের জায়গাটা ভিন্ন থাকে এক স্বপ্ন থেকে আরেক স্বপ্নে। একই স্বপ্ন, ওড়ার স্বপ্ন বারবার কেন দেখে তার ব্যাখ্যা জানতে চেয়েছিল সে আত্মীয়-বন্ধুদের কাছে। বিমানচালক হওয়া থেকে তীব্র উচ্চাকাঙ্ক্ষা পর্যন্ত নানান ব্যাখ্যা দিয়েছে লোকজন। এর কোনো কোনোটি মিলেও গেছে ছেলেটির মনের কোনো গোপন ইচ্ছার সঙ্গে। সবচেয়ে ভয়ের ব্যাখ্যা দিয়েছেন ছেলেটির এক মামি। তিনি ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন, কোনো একদিন চলার শক্তি হারিয়ে ফেলবে ছেলেটি। কেন তার এমনটা মনে হয় জিজ্ঞাসা করেছে ছেলেটি। উত্তরে শুধুই পেয়েছে মনোচিকিৎসক মামির মনোহরণ হাসি।

আজ রাতের স্বপ্নে ছেলেটি দেখে গাড়িতে করে ঘুরে বেড়াচ্ছে সে শহরে। হঠাৎ বন্যার পানি ঢুকে পড়ে শহরে। পানির তোড়ে ভেসে যায় গাড়ি, ডোবে না যদিও। গাড়ির ছাদে উঠে পড়ে ছেলেটি। ঢেউয়ের পর ঢেউ এসে ভাসিয়ে দেয় গাড়ির ছাদও। ভাসিয়ে নিতে চায় ছেলেটিকে। শেষ মুহূর্তে পায়ের পাতায় ভর দিয়ে দুই হাত নাড়াতে গাড়ির ছাদ ছেড়ে আকাশে উঠে যায় সে। উড়ে উড়ে বেড়াতে থাকে শহরের বিভিন্ন অলিগলির ওপর দিয়ে। ওপর থেকে দেখে, বন্যার পানি থেকে বাঁচতে বাড়িঘরের ছাদে উঠে এসেছে লোকজন। নিচ থেকেই অনেকেই তাকে হাত দিয়ে ডাকছে। আহবান করছে এই দুর্যোগ থেকে তাদের উদ্ধার করার জন্য। ছেলেটি চেষ্টা করে নিচে নেমে আসার। হাত নাড়ানো কমায় গতি কমানোর জন্যে। ওড়ার গতি কমে না তার। নিচে নামে না সে। দূরে একটা উঁচু দালান দেখে সেদিকে যাওয়ার চেষ্টা করে। দালানের গায়ে শরীর আটকে দিয়ে যদি নেমে আসা যায় অন্যদের কাছাকাছি, কাজে লাগা যায় সবার।

দালানের পাশ দিয়ে উড়ে যাওয়ার সময় হাত বাড়িয়ে দালানের একটা জানালার গ্রিল ধরে ফেলে সে স্বপ্নে। গতির জড়তায় ভেসে যেতে চায় তার শরীর। যেতও। জানালার ভেতর থেকে কেউ হাত বাড়িয়ে ধরে ফেলে তার একটি পা।

অনেক লোক একসঙ্গে চিৎকার দিয়ে উৎসাহ দেয় হাতের মালিককে। আরো জোরে টানে হাতের মালিক। ছেলেটির পায়ের ওপর চাপ বাড়ে ধীরে ধীরে।

 

চার

ঘুম ভাঙতেই ছেলেটি বুঝতে পারে, তার পায়ের সঙ্গে ফিতে জড়িয়ে রাখা ব্যাগটি ধরে টান দিচ্ছে কে যেন। কিছু বুঝে ওঠার আগেই ছেলেটির কাঁধে জোরে ধাক্কা দেয় কেউ। জোরে বলে ওঠে, ‘মাদারচোৎ, সোনার মইদ্যে হান্দায়া রাখছছ মাল। ছাড়।’

মুহূর্তে সচেতন হয় ছেলেটি। দ্রুত বুঝে নেয় সে, কী হচ্ছে তার আশেপাশে। ডাকাত পড়েছে বাসে। ডাকাতের দল দ্রুত কেড়ে নিচ্ছে লোকজনের মালামাল। ডাকাতদের দাবিমতো তাদের হাতে সব তুলে দিচ্ছে সবাই। ভয়ে চিৎকার করছে কেউ কেউ। উচ্চৈঃস্বরে দোয়া-দরুদ পড়ছে ছেলেটির সহযাত্রী ভদ্রলোক। ভদ্রলোকের সাবধানবাণী পুরোপুরি উপেক্ষা করেনি ছেলেটি। সিটের নিচে ব্যাগ রেখে ব্যাগের ফিতা আর ব্যাগের মাঝখানে ঢুকিয়ে রেখেছিল এক-পা।

ডাকাতদলের লোকটি আবার টান দেওয়ার আগেই দ্রুত পা সরিয়ে ব্যাগটি আলগা করে দেয় ছেলেটি। হাসি ফুটে ওঠে ডাকাতের মুখে। হাসিটি চেনা চেনা লাগে ছেলেটির। চলন্ত যানের অন্ধকার অভ্যন্তরে ঠাহর করে উঠতে পারে না ঠিক।

সব ব্যাগ-সুটকেস জড়ো করার পর মেয়েদের গায়ের গয়না খুলে দিতে বলে এবারে ডাকাতরা। যারা ইতস্তত করে তাদের গা থেকে একরকম জোর করেই অলঙ্কারাদি ছিনিয়ে নেয় ডাকাতরা। তাদের কেউ কেউ গয়না খোলার ছলে হাতড়ে দেয় মেয়েদের শরীর। বাসভর্তি লোকজন শুধুই তাকিয়ে দেখে। কিছুই বলে না। বলার সাহস করে না।

ছেলেটির সামনের সিটে বসা শিশুটি তখনো অঘোরে ঘুমাচ্ছে মায়ের কোলে। শিশুর মা আরো জোরে আঁকড়ে ধরে কোলের সন্তানকে। বাৎসল্যের মায়া সঞ্চার করে দিতে চায় যেন শত্রুর পাষাণ বুকেও। কাজও হয় এতে কিছুটা। ডাকাতদের দুজন মহিলার সামনে দিয়ে ঘুরে গেলেও কিছুই বলে না তাকে।

ডাকাতদের সর্দার নিজেই এবার এগিয়ে আসে। লম্বা শরীরের ডাকাত সর্দারকে কোনো অশরীরী প্রেতাত্মার মতো মনে হয় ছেলেটির। ভয়ে চোখ বন্ধ করে ফেলে সে। নীরবে উচ্চারণ করতে থাকে সহযাত্রীর মুখে শোনা দোয়া-দরুদ।

শিশুটির মায়ের কাছে এসে থেমে যায় সর্দার। মায়ের কোল থেকে ঘুমন্ত শিশুটিকে তুলে ছুড়ে দেয় শিশুর বাবার কোলে। এক ঝটকায় খুলে নেয় মহিলার গলায় থাকা হার। টেনে ছিঁড়ে আনতে চায় তার কানের দুল। ব্যথায় চিৎকার করে ওঠে মহিলা। সজোরে চপেটাঘাত করে ডাকাত-সর্দার মহিলার গালে।

চপেটাঘাত আর কান্নার আওয়াজে নিজের অজান্তেই চোখ খুলে যায় ছেলেটির। খোলা চোখ সোজা গিয়ে আটকে যায় সর্দারের চোখে। কিছুক্ষণ আগে দেখা বলদটিকে চিনতে এবার আর বাকি থাকে না ছেলেটির।

‘প্রবলেম, ব্রাদার?’ গম্ভীর ভরাট কণ্ঠে বলে ওঠে সর্দার।

‘নো, না স্যার। স্যরি স্যার।’ কোনোমতে বলেই তাড়াতাড়ি জানালার দিকে মুখ ফিরিয়ে নেয় ছেলেটি। বাইরে তখন গাঢ় অন্ধকার।

সোশ্যাল মিডিয়া

নিউসলেটার