আলো

লেখক: শাহরিনা রহমান এ্যালানা

১.
পায়ের শব্দ পেয়ে দ্রুত বুকশেলফ থেকে সরে গিয়ে ঘর থেকে বেরোতেই অংশুর সাথে ধাক্কা খেলাম। গত সাতদিনে এটা নতুন কিছু নয়। তবু অভ্যস্ত হতে সময় লাগছে। অংশুর এক চোখ অন্ধ। দুর্ঘটনায় বাঁ চোখের দৃষ্টি হারিয়েছে বহুদিন আগে। অন্য চোখটায় মাত্র ৫% দেখতে পায়। অন্ধ একটা ছেলের সাথে বিয়ে দেওয়া হয়েছে বলে বাবা-মার সাথে গত এক মাস ধরে আমার কোনো কথা হয় না। আমাকে জেনেশুনে ‘অন্ধকূপে’ফেলে দেবার অভিমানটা কাটাতে পারিনি বিয়ে হয়ে যাবার পরেও।

‘স্যরি,দেখতে পাইনি’

কথাটা শুনে থেমে গিয়ে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালাম।

‘আমি তো জানি,তুমি দেখতে পাও না। এতে বারবার স্যরি বলার কি আছে? কিছু হলেই স্যরি, স্যরি!’

অংশু শব্দ করে হাসল। অস্বীকার করি না,অংশুর হাসিটা সুন্দর। প্রাণখোলা, সরল একটা হাসি।

‘আসলে, তুমি যেমন এখনও ধাক্কা খাওয়ায় ঠিক অভ্যস্ত হতে পারোনি, আমিও নতুন একটা মানুষকে ধাক্কা দিয়ে অভ্যস্ত হতে পারছি না। সমস্যা নেই। আস্তে আস্তে দুইজনই অভ্যস্ত হয়ে যাব।’

মা’র কথা ছিল, আমাকেই বা কে বিয়ে করবে? চোখের কাছে বিশাল একটা ক্ষত আমার। বাস দুর্ঘটনায় কোণাকুনিভাবে ওখানে ছিঁড়ে গেছিল আমার। সে ক্ষতটা ঠিকমত সারেনি কোনোদিন। দাগটা রয়েই গেছিল। অংশু সে হিসেবে ভালো পাত্র। ছোট একটা বইয়ের দোকান চালায়। আমি একটা স্কুলে পড়াই। আমাদের দিন চলে “যাবার কথা”।

মাত্র সাতদিন। আমি জানি না,সাত মাসও,মা’র ভাষায়,‘চলে যাবে’কি না। তনয়কে আমি ভালোবাসতাম। আমাদের বিয়ে করার কথা ছিল গ্রাজুয়েশানের পর। বাস দুর্ঘটনার পরেও তনয় বহুদিন ছিল আমার সাথে। তারপর যখন ইউনিভার্সিটিতে এডমিশন নিলাম,তনয় জানালো,তার বাসায় মানবে না।

-তোমার কি এই ক্ষত নিয়ে কোনো আপত্তি আছে?
-না,কিন্তু আমার বাসায় যদি তোমাকে পছন্দ না করে?

আমি হেসে তার হাতে ছোট্ট একটা স্পর্শ দিয়ে সেদিন রবীন্দ্র সরোবর থেকে কল্যাণপুর পর্যন্ত হেঁটে হেঁটে বাসায় এসেছিলাম। তার সাথে আমার সম্পর্ক ছিল প্রায় দশ বছর। সম্পর্ক শেষ হতে লাগল দশ মিনিট।

অংশুর অবশ্য এই ক্ষত নিয়ে অভিযোগ ছিল না। প্রথম দেখার দিন,কিংবা বিয়ে থেকে এই সাতদিন- কখনই না। দুটো বিষয় হতে পারে,এক,সে কোনোদিন এই ক্ষতটা ভালো করে খেয়াল করেনি; দুই,তার নিজের ঘাটতিটুকু সে এড়িয়ে যাবার চেষ্টা করেছে এ নিয়ে অভিযোগ না করে।

২.
-দেখো কিন্তু। এখানে একটু নিচু।
-ঠিক আছে।
-সাবধানে। হাত ধরো আমার।

বসন্তোৎসবে এসেছি আমরা। আমাকে কলাপাতা সবুজ একটা শাড়ি উপহার দিয়েছে অংশু। সে কিনেছে সান্ধ্য নীল একটা পাঞ্জাবি। চারুকলার পাশ দিয়ে যাচ্ছিলাম। হাত ধরে। আমার হাত ভর্তি বেলি ফুলের মালা জড়ানো। আমরা হাত ধরেই হাঁটি সবসময়। ওর সুবিধা হয়। অবশ্য একা একাও সে ভালোই চলাফেরা করতে পারে। তবে এদিক সেদিক ধাক্কা খায় কিংবা উঁচু নিচু বুঝতে না পেরে হোঁচট খায়- এই যা!

তনয়ের অবশ্য সেসব ছিল না। তার সাথে আমার দেখাই হত বছরে একবার কি দু’বার। হাত ধরাধরি তো দূরের কথা।

-আচ্ছা,তনয়কে খুব বেশি ভালোবাসতে তুমি? আমার চেয়ে বেশি?

-অতীত অতীতই, অংশু। তনয় একটা নিভে যাওয়া প্রদীপ। একটা ছিঁড়ে ফেলা পৃষ্ঠা। সেটা টেনে তো লাভ নেই। আর মাত্র সাতদিন হল আমাদের..

-কিন্তু এই যে, তনয়ের কথা বলতেই তোমার চোখে পানি চিকচিক করছে। তনয় যে অতীত, তোমার চোখ তো তা বলে না।

আমি বিস্ময়ে অংশুর দিকে ফিরে তাকাই। তার তো এতটা দেখতে পাবার কথা নয়।

-হয়তো চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় আমার দৃষ্টিশক্তি মাত্র পাঁচ ভাগ। কিন্তু,বলতে পারো অন্তরা, ভালোবাসা দেখতে কতটুকু দৃষ্টিশক্তি লাগে? তোমার তো শুধু চোখ ভিজে আসেনি। কণ্ঠটাও সিক্ত হয়ে গেছে। এদিকে,রাস্তাটা একটু রুক্ষ হলেই তুমি শক্ত করে আমার হাত চেপে ধরো। এই যে,সেদিন লুকিয়ে বুকশেলফ থেকে আমার পুরনো ডায়েরী পড়লে। ডায়েরীটা জায়গামতো রাখতে ভুলে গিয়েছিলে। ওতে লেখা ছিল,আমি রূপার ঝুমকো আর কাজল টানা চোখ ভালোবাসি। তোমার রূপার ঝুমকো নেই দেখে পাশের বাসার মেয়েটার থেকে ধার করে আনলে। গাঢ় করে কাজল দিলে। ভালোবাসো বলে?

আমি স্তব্ধ হয়ে রই।

-অংশু নামের অর্থ জানো, অন্তরা?

আমি বিড়বিড় করে বলি, “আলো!”

 

শেয়ার করুন

Leave a Reply