ইতিহাসনিষ্ঠ কানাডীয় লেখক শার্লট গ্রের কথা

লেখক: সুব্রত কুমার দাস

১৯১৫ সালে সারা কানাডায় গাড়ির সংখ্যা ছিল এক লাখের কাছাকাছি। ট্রাফিক সিগন্যালগুলোতে বাতি ছিল না। কানাডায় কোনো কোনো প্রদেশে তখনো ব্রিটিশ নিয়মে রাস্তার বাঁদিক দিয়ে গাড়ি চালানো হতো। কোনো কোনো প্রদেশে আমেরিকান নিয়মে গাড়ি চলত ডানদিক দিয়ে। এসব বিষয় মূর্তরূপে পাওয়া যায় ২০১৪ সালে টরন্টো থেকে প্রকাশিত গ্রন্থ The Massey Murder-এ। শার্লট গ্রে (জন্ম ১৯৪৮ সালে) রচিত এ-গ্রন্থটি সে-বছর পনেরো হাজার ডলার মূল্যের টরন্টো বুক অ্যাওয়ার্ড লাভ করেছিল।

মেসি হত্যাকাণ্ড গ্রন্থের বিষয় হলো, ১৯১৫ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি টরন্টোর নির্জন এলাকায় অবস্থিত ওয়ালমার রোডের নিজ বাড়ির দরজায় শহরের খ্যাতিমান ও ধনবান মেসি পরিবারের বিশিষ্ট সদস্য ৩২ বছর বয়স্ক চার্লস অ্যালবার্ট মেসির হত্যাকাণ্ড। অ্যালবার্টের বন্ধুরা তাকে ডাকতেন ‘বার্ট’ বলে। আর হত্যাকাণ্ডটি ঘটে বার্টের বাড়ির পরিচারিকা ক্যারি ডেভিসের হাতে। অফিসশেষে বিকেলে বার্ট বাড়িতে ঢোকার মুখে আঠারো বছরের ক্যারি তাকে বার্টের পিস্তল দিয়ে গুলি করে হত্যা করে। ফোনে ঘটনা জানার সঙ্গে সঙ্গে পুলিশ এসে উপস্থিত হয় বার্টের বাড়িতে। পুলিশের হাতে নিজেকে সমর্পণ করে ক্যারি জানায়, বার্ট তার শ্লীলতাহানির চেষ্টা করেছেন। ব্রিটিশ এই পরিচারিকা কর্তৃক সংঘটিত হত্যাকাণ্ডটি পুরো ইউরোপ ও আমেরিকায় সংবাদপত্রের শিরোনাম হয়ে যায়। টরন্টো ডেইলি স্টার পত্রিকার ৯ ফেব্রুয়ারি সংখ্যায় ক্যারি ডেভিস এবং বার্টের ছবি দিয়ে লিড নিউজ হয় ঘটনাটি। আলোচ্য গ্রন্থের বিষয় কিন্তু এ-হত্যাকাণ্ড নয়, মূল বিষয় হলো কোর্টে ক্যারির মুক্তি। আর এর ভেতর দিয়েই শার্লট প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরুর সময়কার টরন্টো এবং কানাডার সামাজিক চিত্র তুলে ধরেছেন। অনেকেই মনে করেন কানাডার স্বাতন্ত্র্য তৈরিতে এমনসব ঘটনা ব্যাপক ভূমিকা রেখেছিল।

ব্রিটিশ বংশোদ্ভূত কানাডীয় লেখক ও ইতিহাসবিদ শার্লট গ্রের জন্ম ১৯৪৮ সালে, ইংল্যান্ডে। ১৯৭৯ সালে তিনি কানাডায় চলে আসেন। গ্লোব অ্যান্ড মেইল, ন্যাশনাল পোস্টঅটোয়া সিটিজেন পত্রিকার নিয়মিত লেখক শার্লটের বিশেষ খ্যাতি জীবনী রচনায়। ১৯৯৭ সালে প্রকাশিত হয় ইসাবেলা ম্যাকেঞ্জি কিংকে নিয়ে তাঁর প্রথম বই মিসেস কিং। এরপর উনবিংশ শতাব্দীর দুই ব্রিটিশ লেখক ভগ্নিদ্বয় সুজানা মোদি এবং ক্যাথেরিন পার ট্রেইলকে নিয়ে তিনি প্রকাশ করেন সিস্টার্স ইন দ্য ওয়াইল্ডারনেস। ১৯৯৯ সালে প্রকাশিত সে-গ্রন্থের আধেয় যে দুই বোন তাঁরা দুজনেই দীর্ঘকাল কানাডায় ছিলেন এবং কানাডার অভিজ্ঞতা নিয়ে বই লিখেছেন। শার্লট-রচিত জীবনীগ্রন্থের তালিকায় আরো আছে, Flint & Feather : The Life & Times of E. Pauline Johnson (২০০২), Reluctant Genius : The Passionate Life & Inventive Mind of Alexander Graham Bell (২০০৬), Extraordinary Canadians : Nellie McClung (২০০৮) ইত্যাদি। এছাড়া Canada : A Portrait in Letters (২০০৩), The Museum Called Canada (২০০৪), The Promise of Canada (২০১৬) বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

তবে উল্লেখ করতেই হবে, শার্লট সবচেয়ে বেশি নন্দিত হয়েছেন ২০১০ সালে প্রকাশিত গ্রন্থ গোল্ড ডিগার্সের জন্য। কানাডার উত্তর-পশ্চিমের টেরিটরি ইউকনের ক্লোনডাইক অঞ্চলে ১৮৯৬ থেকে ১৯০০ সাল পর্যন্ত সোনার সন্ধানে মানুষদের আগমনকে কেন্দ্র করে গোল্ড ডিগার্স রচিত। রীতিমতো শীতে জর্জরিত ক্লোনডাইকের দিকে ওই কবছরে আমেরিকার সিয়াটল এবং সানফ্রান্সিসকো থেকে বিপুলসংখ্যক মানুষ ধাবিত হয়। ধারণা করা হয়, সব মিলিয়ে লক্ষাধিক মানুষ সে-সময়ে ওই অঞ্চলে সোনা খুঁজতে ধাবিত হয়েছিল। অল্প কয়েকটি চরিত্রকে প্রধান করে শার্লট সে-সময়টিকে মূর্ত করেছেন তাঁর গ্রন্থে। ঐতিহাসিক এবং সমালোচকরা মনে করেন, ‘ক্লোনডাইক গোল্ড রাশ’ নিয়ে যতগুলো বই লেখা হয়েছে শার্লটের গোল্ড ডিগার্স তাদের মধ্যে অল্প কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণের একটি। সৎ ইতিহাসমনস্কতার যে-পরিচয় শার্লট তাঁর আগের গ্রন্থগুলোতে রাখতে সমর্থ হয়েছেন, সেটি মেসি হত্যাকাণ্ডে বর্তমান। এটিতে তাঁর সাফল্য এই যে, তিনি পুরো বিষয়টিকে উপস্থাপন করেছেন কাহিনির আড়ালে এবং সে-কাহিনিতে তিনি জীবন্ত করে তুলেছেন শতবর্ষ পূর্বের টরন্টো শহরের অনেক মানুষকে। শার্লটের অসামান্যতায় শতবর্ষ পূর্বের টরন্টোকে যেন পাঠক চোখের সামনে দেখতে সমর্থ হন।

ক্যারি তখন লন্ডনে। পঙ্গু বাবা যখন মারা যান ক্যারির বয়স তখন ষোলো। সে-সময়ে বিংশ শতাব্দীর ঠিক শুরুর দিকে কানাডা সরকার বিভিন্ন সংস্থার মাধ্যমে দেশে অবিবাহিত কর্মজীবী নারীদের আনার উদ্যোগ নেয়। কারণটি প্রধানত ছিল দেশে গৃহকর্মীর অভাব। যাদের আনা হচ্ছিল তাদের যোগ্যতামাপক শব্দগুলো ছিল, ‘young, respectable, trustworthy and chaste unmarried.’ কেভিন প্লামার Torontoist পত্রিকায় তাঁর ‘Historicist : A Massey Family Murder’ নিবন্ধে  এই শব্দগুলোই ব্যবহার করেছেন। সে-সময়ে যে-নারীদের আনা হয় তাদেরই একজন ক্যারি ডেভিস। ক্যারি দেশে থাকা প্রায়-অন্ধ মা এবং তিন ছোট বোনের জন্য প্রতি মাসে পাঁচ-দশ ডলার পাঠানোর প্রত্যয়ে স্থিত থাকত বলে নিজের জন্য কোনো পয়সাই খরচ করত না। গৃহপরিচারিকার কাজটি সেকালে কলকারখানা বা দোকানের কাজের চেয়ে বেশি সম্মানজনক মনে করা হতো মেয়েদের জন্য। কিন্তু দুর্ভাগ্য যে, ক্যারি এসে পড়ে ধনবান এবং খানিকটা উচ্ছন্নে যাওয়া বার্ট মেসির হাতে। যেদিন হত্যাকাণ্ডটি ঘটে সেই সময় বার্টের স্ত্রী রোডা কানেকটিকাটে বেড়াতে গিয়েছিলেন। ঘটনার আগের রাতে বার্টের চৌদ্দ বছর বয়সী ছেলেটি রাতের খাবারের পর বাইরে ঘুরতে যায়। আর তেমন একটি নির্জন সময়ে ঘটনাটি ঘটে।

বার্ট প্রথমে ক্যারিকে একটি আংটি উপহার দিতে চায়। দেওয়ার সময় ছোট মেয়েদের ব্যাপারে তার আগ্রহও প্রকাশ করে। সে-সময় বার্ট ক্যারিকে জড়িয়ে ধরে এবং চুমুও খায়। জোর করে তাকে খাটে শুইয়ে জোরজবরদিস্ত করতে শুরু করে। ক্যারি নিজের চেষ্টায় বেরিয়ে যায় ওই ঘর থেকে। পালিয়ে চলে যায় কাছাকাছি ক্যাবেজটাউনের আরেকটি বাড়িতে, যে-বাড়িতে থাকত কানাডায় ওর একমাত্র আত্মীয় – ওর বোন আর জামাইবাবু। তাঁরা সব শোনেন। পরামর্শ দেন সাবধানতার সঙ্গে চাকরিটি রক্ষা করার। তবে পুলিশে খবর দেওয়ার ব্যাপারে কোনো উৎসাহ দেখাননি তাঁরা। সে-সময় ওদের তিনজনেরই ধারণা হয়েছিল, মেসি পরিবারের মতো ক্ষমতাশালী একটি পরিবারের বিরুদ্ধে আইনি লড়াইয়ে যাওয়া কিছুতেই সম্ভব হবে না। এ-প্রসঙ্গে উল্লেখ করে রাখা যেতে পারে, উনবিংশ শতাব্দীর শেষ দশক এবং বিংশ শতাব্দীর শুরুর দশকগুলোতে এটিই যেন টরন্টোর রীতি হয়ে দাঁড়িয়েছিল যে, গৃহপরিচারিকাকে তাঁর গৃহস্বামী ভোগ করবেন। পরিচারিকা তার গৃহস্বামীর মনোবাঞ্ছা পূর্ণ না করাতে চাকরি থেকে অব্যাহতি পেয়েছে এমনটিও অস্বাভাবিক ছিল না।

দিদি ও জামাইবাবুর সঙ্গে কথা সেরে ক্যারি ফিরে আসে রাত ১১টা ২০ মিনিটে। সকালে উঠে সে বার্টকে নাশতাও বানিয়ে দেয়। তবে নিজেকে আড়াল করে রাখে সবসময়। আগের রাতের ঘটনা তাকে দগ্ধ করছিল ভীষণভাবে। সারাদিন ধরে দগ্ধ হতে হতে তার শুধুই মনে হচ্ছিল বার্ট তার সতীত্বহানি করতে চায়। এবং সে এটা কিছুতেই মেনে মিতে পারছিল না। এরপর যখন সে বার্টকে রাস্তা দিয়ে হেঁটে আসতে দেখে, সে নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে। বার্টের ছেলের ঘরে ঝোলানো পিস্তলটা দৌড়ে নিয়ে আসে এবং দরজা খুলেই গুলি করে বার্টকে লক্ষ্য করে।

ক্যারির পক্ষে যে-আইনজীবী লড়াই করেন তার যুক্তি ছিল, ‘যে মেয়েরা এদেশে কাজ করতে এসেছে, আমরা তাদের রক্ষাকারী এবং অভিভাবকের দায়িত্বে আছি।’ আইনজীবী আরো যে-কাজটি করেন সেটি হলো : সেকালের বিবেচনায় একজন ডাক্তার ডেকে ক্যারির সতীত্ব পরীক্ষা করানো এবং আদালতে যুক্তি দেন একটি সম্ভ্রান্ত ব্রিটিশ পরিবারের একজন সতী নারী এক কানাডীয় বর্বর দ্বারা আক্রান্ত হয়েছিল। তাই কোর্ট যখন ক্যারিকে মানুষ হত্যায় দোষীসাব্যস্ত করতে চাইছিল, ক্যারির আইনজীবী বারবার যুক্তি দিয়েছেন এই বলে যে, ক্যারি কোনো মানুষকে হত্যা করেনি – একটি বর্বরকে হত্যা করেছে মাত্র।

পত্রপত্রিকায় জেলে থাকা ক্যারিকে নিয়ে এত বেশি প্রতিবেদন ছাপা হচ্ছিল যে, বিভিন্ন প্রদেশ থেকে মানুষ আইনজীবীদের খরচ মেটানোর জন্য টাকা পাঠাতে শুরু করেন। কয়েকদিনের মধ্যে ১১০০ ডলার উঠে যায়। (বর্তমান বাজারমূল্যে প্রায় পাঁচ লাখ ডলার)। আটচল্লিশ দিনের মাথায় কোর্টে চূড়ান্ত রায় হয়। ত্রিশ মিনিটের সওয়াল-জবাবের পর কোর্ট ক্যারিকে বেকসুর খালাস দেয়।

মেসি হত্যাকাণ্ড ঘটনার শতবার্ষিকীতে সিবিসি নিউজ ওয়েবসাইটে ২০১৫ সালের ৮ ফেব্রুয়ারিতে ‘The Massey Murder : 100 years later, the tabloid tale still fascinates’ নামে একটি প্রতিবেদন ছাপা হয়েছিল। সেখানে ক্যারি ডেভিসের দুই নাতনির সাক্ষাৎকার আছে। তাঁদের দিদিমাকে তাঁরা একজন অসমসাহসী নারী হিসেবে উল্লেখ করে গর্ব প্রকাশ করেছেন সেখানে।

শার্লট তাঁর গ্রন্থের শুরুতে ঘটনার পাত্রপাত্রীদের একটি ছোট পরিচয় দিয়ে রেখেছেন, যাতে শতবর্ষ পূর্বের ঘটনাকে অনুধাবন করতে পাঠকের অসুবিধা না হয়। গ্রন্থটি মোট বারোটি পর্বে বিভক্ত। পর্বগুলোর নাম এমন : গল্পটি, আইন, বিচার, পরিসমাপ্তি ইত্যাদি। মোট ১৮টি অধ্যায় আছে চার পর্বে। আর বইয়ের শুরুতে আছে লেখকের একটি উপক্রমণিকা। সেই উপক্রমণিকায় লেখক অভিমত ব্যক্ত করেছেন, কেন তিনি এই হত্যাকাণ্ড নিয়ে বই লিখতে গেলেন। শার্লটের ভাষ্য এই যে, ক্যারি ডেভিসের এ-ঘটনা প্রকৃতপক্ষে ভবিষ্যৎ কানাডার ইঙ্গিতবাহী – যে-কানাডায় বিচার হবে সবার জন্য সমান – যে-কানাডায় সমাজের প্রতিটি স্তরে ন্যায় প্রতিষ্ঠিত হবে।

এই লেখা শেষ করার আগে শার্লট গ্রের অন্য তিনটি গ্রন্থের ওপর সামান্য আলোকপাত করে রাখতে চাই। একজন ঐতিহাসিক শার্লটকে বুঝতে, তাঁর চেতনার গভীরতাকে স্পর্শ করতে বই তিনটি ব্যাপক ভূমিকা রাখবে। প্রথমটি হলো ২০১৬ সালে প্রকাশিত  The Promise of Canada এবং অন্য দুটি Canada : A Portrait in Letters (২০০৩) এবং The Museum Called Canada (২০০৪)।

২০১৭ সালে কানাডার সার্ধশতজন্মবার্ষিকী পালনের ঠিক আগে আগে ক্রাউন সাইজে সাড়ে তিনশো পৃষ্ঠার বই The Promise of Canada একটি অসাধারণ প্রকাশনা। বইয়ের মূল অংশটি তিনটি ভাগে বিন্যস্ত : ‘Laying the Foundation’, ‘Different Kind of Country’ এবং ‘Straining at the Seams’। বইটিতে শার্লট আসলে নয় কানাডীয়কে নিয়ে আলোকপাত করেছেন, যাঁরা বিভিন্ন সময়ে কানাডাকে, চেতনাগতভাবে যে-কানাডাকে বর্তমানে আমরা পাই সেই কানাডা নির্মাণে ভূমিকা রেখেছেন।

এই বইয়ের পুরো শিরোনাম বেশ দীর্ঘ।  ‘The Promise of Canada : 150 Years – People and Ideas that have Shaped our Country।’ শার্লট বিশ্বাস করেন, কিছু ব্যক্তিমানুষের চিন্তা-চেতনা ও কর্মকাণ্ড বৃহত্তর সমাজের পরিবর্তনে ব্যাপক প্রভাব ফেলে এবং সেগুলো সামগ্রিকভাবে একটি জাতীয় স্বকীয়তা বিনির্মাণে ব্যাপক ভূমিকা রাখে।

জর্জ এতিয়েন কার্তিয়ার (১৮১৪-৭৩) বা এমেলি কার (১৮৭১-১৯৪৫) থেকে শুরু করে টমি ডগলাস (১৯০৪-৮৪), মার্গারেট অ্যাটউড (জন্ম ১৯৩৯) বা এলিজা হারপার (১৯৪৯-২০১৩) – তাঁদের সবারই একটিই প্রধান পরিচয়। আর সেটি হলো ‘কানাডা’ নির্মাণে তাঁদের শক্তিশালী ভূমিকা। শার্লটের নির্বাচিত এ-মানুষেরা কেউ রাজনীতিক বা লেখক, পুলিশ বা আইনজীবী। কিন্তু তাঁদের অবদান প্রশংসার দাবিদার। কেউ কানাডা কনফেডারেশন গঠনের পিতৃপুরুষদের অন্যতম, আবার কেউ মাত্র পঁয়ত্রিশ বছরের সংগীতশিল্পী।

১৮০০ থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত লেখা বিভিন্নজনের মোট ২১৭টি চিঠির সংকলন Canada : A Portrait in Letters। খ্যাত-অখ্যাত মানুষদের লেখা সে-চিঠিগুলো চারটি ভাগে বিন্যস্ত করা হয়েছে এ-গ্রন্থে। সালের হিসাবে পঞ্চাশ বছর করে। ১৮০০ থেকে ১৮৫০, ১৮৫০ থেকে ১৯০০, ১৯০০ থেকে ১৯৫০ এবং ১৯৫০ থেকে ২০০০। শার্লট সেগুলোর নাম দিয়েছেন : ‘A Serge of Settlers’, ‘A Nation takes Shape’, ‘A Half Century of Battles’ এবং ‘Hurling towards the Millennium’। ইতিহাসবিদ শার্লট তাঁর গবেষণা ও অধ্যয়নের কালে খুঁজে পাওয়া এই চিঠিগুলো সাজিয়েছেন এই গ্রন্থে – তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন কানাডার ক্রমঅগ্রসরণ এবং বিবর্তন-চেতনাগতভাবে কানাডার পরিবর্তন ও পরিবর্ধনকে।

প্রথম চিঠিটি লেখা হয়েছে ১৮০০ সালের জানুয়ারিতে। আর সবশেষটি হলো ১৯৯৯ সালে লেখা একটি ই-মেইল। খ্যাতনামা পত্রলেখকদের মধ্যে রয়েছেন উইনস্টন চার্চিল, রবার্টসন ডেভিস, ম্যাকেঞ্জি কিং, মার্গারেট লরেন্স, জন এ ম্যাকডোনাল্ড, এল এম মন্টগোমারি, সুজানা মোদি প্রমুখ। এই চিঠির সংকলনের মধ্য দিয়ে শার্লট আসলে তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন একটি বিবর্তন। কীভাবে দুই শতাব্দী ধরে কানাডা আজকের কানাডায় উপনীত হলো সেটিকে ধারণ করার চেষ্টা করেছেন লেখক। তবে বলে রাখা প্রয়োজন, শার্লট এই চিঠিগুলোর সঙ্গে বর্তমান গ্রন্থে দিয়েছেন বিপুলসংখ্যক দলিল-দস্তাবেজ, মানচিত্র এবং ছবি, যা গ্রন্থটিকে অধিকতর মর্যাদাবান করেছে। বইয়ের ভূমিকায় শার্লট আরো জানিয়েছেন কানাডায় ডাকব্যবস্থার বিবর্তনের ইতিহাস। ভূমিকায় লেখক আরো জানিয়েছেন টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ের রবার্টস লাইব্রেরি থেকে প্রথম আড়াই হাজার চিঠি নির্বাচন করা হয় কাজের জন্য। সেগুলো নিয়ে তিনি ঐতিহাসিকদের সঙ্গে মত ও পত্র বিনিময় করেন। পরে টরন্টোর গ্লোব অ্যান্ড মেইল এবং রাজধানীর অটোয়া সিটিজেন পত্রিকায় তিনি পাঠকদের কাছে সহযোগিতার আহবান জানান এবং ধীরে ধীরে তৈরি হতে থাকে বর্তমান সংকলন। শার্লট স্বীকার করেছেন, ফার্স্ট নেশনের মানুষদের লেখা চিঠি প্রত্যাশিতভাবে জোগাড় করা সম্ভব হয়নি। লেখকদের লেখা পাওয়া গেলেও বিজ্ঞানী এবং শরীরচর্চাকারীদের লেখাও বেশি সংগৃহীত হয়নি। তবে মানতেই হবে কানাডাকে বুঝতে, কানাডার বিবর্তনকে ধারণ করতে শার্লট গ্রের এই পত্রসংকলন অসামান্য এক আয়োজন।

ইতিহাসের প্রতি প্রচণ্ডভাবে ঘনিষ্ঠ লেখক শার্লট গ্রেকে নিয়ে বর্তমান আলোচনাটি শেষ করতে চাই The Museum Called Canada-র ওপর আলোকপাত করে। বইটির উপশিরোনাম ‘25 Rooms of Wonder’। বইটিতে মোট পঁচিশটি অধ্যায় রয়েছে। ‘প্রবেশ’-এর ছোট্ট ভূমিকাটি পার হতেই এলিভেটরের দরজায় দেখা দেয় ‘Fossil Foyer : 2.1 Billion years ago to 65 million years ago।’ শার্লটের এলিভেটর এভাবেই কানাডার ভূখণ্ডের বিভিন্ন যুগকে অতিক্রম করার চেষ্টা করেছে। পরের যুগগুলো এমন : 80,000 years ago to 10,000 years ago; 3500 years ago to 1878 ইত্যাদি। কিন্তু বলে রাখা প্রয়োজন যে, এই বই যতখানি না ইতিহাস নিয়ে রচিত, তার চেয়ে বেশি করে যেন ইতিহাসের উপস্থাপন নিয়ে প্রদর্শিত। সে-সময়কে ইতিহাসের যে-প্রকোষ্ঠ রূপে লেখক চিহ্নিত করেছেন সে-প্রকোষ্ঠ ভরে উঠেছে সমকালের প্রতিনিধিত্বকারী অনেকগুলো ছবি দিয়ে। ছবিগুলোর সজ্জায় রয়েছে গভীর অভিনিবেশ এবং শিল্পনৈপুণ্যের ছাপ। মোট সাতশো পৃষ্ঠার বেশি এ-বইটি সুদূর অতীত থেকে ১৯৯৭ সাল পর্যন্ত কালে কানাডার চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য মূর্ত করেছে দুই মলাটে।

অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রিধারী এই ইতিহাসবিদ কানাডায় অভিবাসী হয়েছেন ৩১ বছর বয়সে – ১৯৭৯ সালে। ২০০৭ সালে সম্মানসূচক ‘মেম্বার অব দ্য অর্ডার অব কানাডা’ পদেও অভিষিক্ত হন পরিশ্রমী ও মেধাবী এ-ইতিহাসকার ও লেখক।

শেয়ার করুন

Leave a Reply