‘ইমপ্রিন্ট’ : বিবিধ অনুভবের রেখায়ন

লেখক:

মাহবুব তালুকদার

গত ৪ জুন এজ, দ্য ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে গুলশানের বেস্নজ এজওয়াটারের এজ গ্যালারিতে বাংলাদেশের সাতজন বরেণ্য চিত্রশিল্পীর পক্ষকালব্যাপী এক ছাপচিত্র প্রদর্শনীর উদ্বোধন করা হয়। প্রদর্শনীটির নাম দেওয়া হয়েছিল ‘ইমপ্রিন্ট’। উলিস্নখিত সাতজন চিত্রকর হলেন – মুর্তজা বশীর, রফিকুন নবী, মনিরুল ইসলাম, শাহাবুদ্দিন আহমেদ, রোকেয়া সুলতানা, শহিদ কবীর ও আনিসুজ্জামান। এজ গ্যালারি প্রদর্শনীর শিল্পীদের জীবনবৃত্তান্তসহ ছবিগুলোর একটি দৃষ্টিনন্দন ক্যাটালগও প্রকাশ করে। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ফ্রান্স, দক্ষেণ কোরিয়া ও মিশরের রাষ্ট্রদূত ছাড়াও শিল্পী মুর্তজা বশীর এবং বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান আবুল খায়েরসহ অনেক বিশিষ্ট চিত্রশিল্পী, শিল্পবোদ্ধা ও চিত্ররসিক উপস্থিত ছিলেন।

অনুষ্ঠানের প্রারম্ভে এজ, দ্য ফাউন্ডেশনের কর্ণধার ইফতেখার আহমেদ খান অতিথিদের স্বাগত জানিয়ে বলেন, ফাউন্ডেশন একটি অলাভজনক প্রতিষ্ঠান। এজ গ্যালারির প্রদর্শনী ও শিল্পীদের ছবি বিক্রি করে যা আয় হয়, তা বিভিন্ন সেবামূলক ও শিল্পীদের কল্যাণমুখী কাজে ব্যয় হয়। অনুষ্ঠানে একমাত্র বক্তা চিত্র-সংগ্রাহক ও চিত্রশিল্পীদের সৃজনশীল আয়োজনের বিশিষ্ট উদ্যোক্তা আবুল খায়ের বলেন, এজ গ্যালারি ছবির প্রদর্শনী ও চিত্ররসিকদের উপভোগের জন্য অত্যন্ত মনোরম স্থান। শুধু গুলশানে নয়, সারাদেশেই এমন একটা গ্যালারি খুঁজে পাওয়া ভার।

প্রদর্শিত চিত্রকর্মের খ্যাতিমান শিল্পীদের প্রায় সবাই দেশে-বিদেশে চারুকলায় শিক্ষালাভ করেছেন। অনেকে দীর্ঘকাল বিদেশে অবস্থান করে তাঁদের চর্চার সীমান্ত সুদূরপ্রসারী করেছেন। অনেকেই অর্জন করেছেন আন্তর্জাতিক খ্যাতি। প্রদর্শনীতে তাঁদের মোট ৩১টি চিত্রকর্ম স্থান পেয়েছে। এর মধ্যে মুর্তজা বশীরের পাঁচটি, মনিরুল ইসলামের পাঁচটি, শাহাবুদ্দিন আহমেদের পাঁচটি, রোকেয়া সুলতানার পাঁচটি, শহিদ কবীরের পাঁচটি এবং রফিকুন নবীর একটি ছাপচিত্র প্রদর্শিত হয়। আধুনিক চিত্রকলার চার পথিকৃৎ – শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন, সফিউদ্দীন আহমেদ, কামরুল হাসান ও মোহাম্মদ কিবরিয়ার স্মরণে প্রদর্শনীটি উৎসর্গ করা হয়।

‘ইমপ্রিন্ট’ প্রদর্শনীটির একটি বৈশিষ্ট্য আছে। ইতিপূর্বে দেশের প্রথমসারির চিত্রকরদের ছাপচিত্রের প্রদর্শনী হলেও সমকালীন ও বর্তমান চিত্রশিল্পীদের সিরিজ ছাপচিত্রের এরূপ বিরল সমাহার বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। ছবিগুলোতে শিল্পীদের নিজস্ব বৈশিষ্ট্য প্রতিভাত হয়েছে। আবার প্রত্যেক শিল্পীর চিত্রকর্মগুলো একত্রিত করলে এর একটি সামগ্রিক রূপ লক্ষ করা যায়। এতে আপন-আপন সৃজনে সমুজ্জ্বল হয়েও শিল্পীরা পরস্পর মানসবন্ধনে একে অপরের পরিপূরক হয়ে ওঠেন। প্রদর্শনীটিতে বাংলাদেশের সমকালীন ছাপচিত্রের একটি মানচিত্র ও পরিচিতি ফুটে উঠেছে।

দেশের  প্রবীণতম ও প্রধান চিত্রশিল্পী মুর্তজা বশীর শিক্ষাগ্রহণ করেছেন ঢাকা, কলকাতা, ইতালি ও ফ্রান্সে। ৮৪ বছর বয়স্ক এই শিল্পী অদ্যাবধি তাঁর সৃজনশীলতার চর্চা অব্যাহত রেখেছেন। জীবনব্যাপী চিত্রকলার দুর্গম ও রহস্যময় পথে বিচরণ করেছেন। একাধারে বিশিষ্ট সাহিত্যিক, গবেষক ও চিত্রকর তিনি। অন্যদিকে মুর্তজা বশীর শুধু চিত্রশিল্পী নন, জীবনশিল্পীও বটে। বলেছেন, ‘জীবনকে তিনি শান্ত হ্রদের মতো উপভোগ করতে চান না, বরং তিনি চান জীবন হবে বহমান নদীর মতো, যার অবারিত আকাঙক্ষা হবে সাগর-সঙ্গমে অবগাহন।’

মুর্তজা বশীরের যে-পাঁচটি ছাপচিত্র প্রদর্শনীতে উপস্থাপিত হয়েছে, তার প্রতিটি এচিং অ্যাকুয়াটিন্ট। ছাপচিত্রে তিনি ধাতবপেস্নট ব্যবহার করেছেন। এ-সিরিজচিত্রের নাম দেওয়া হয়েছে ‘মেটাফর’। ‘ইমেজ-৭’ ছাপচিত্রটিতে তিনি নতুন পৃথিবী সৃষ্টির ভূমিষ্ঠলগ্নটিকে তুলে ধরার প্রয়াস পেয়েছেন। এর উপরিভাগে ভাসমান অন্ধকারাচ্ছন্ন আকাশ এবং মাটিতে অজস্র প্রাণের উদ্গম। অন্য ছবি ‘এপিটাফে’ দেখা যাচ্ছে সন্নিহিত মৃত্যুমুহূর্তে আত্মা দেহত্যাগ করছে। মৃত্যু, স্মরণ ও শোক – এসব অভিজ্ঞতা ও অনুভবকে বর্ণপরতের মাধ্যমে অনুমেয় করে তুলতে চেয়েছেন শিল্পী। বৃত্তাকার প্রস্তরখ-দুটিতে অমিত্মমকালের বিদায় স্মারক খোদিত রয়েছে। পাথরের গড়নের অভ্যন্তরের রহস্য ধরা পড়েছে তাঁর দৃষ্টিতে। তৃতীয় ছবি ‘গার্ল উইথ বাস’। এতে দেখা যায়, মেয়েটির জ্যামিতিক মুখ সুখ-দুঃখের প্রচ্ছন্ন অনুভূতিতে আবরিত। দূরে দৃশ্যমান বাসটি যেন যান্ত্রিক ঘড়ঘড় শব্দ করে ব্রেকের ভয়ার্ত ধ্বনিতে অগ্রসরমান। শিল্পীর পরবর্তী ছবি ‘প্রিন্ট-১’। এতে তিনি একটি কৌতুককর দৃশ্যপট রচনা করেছেন। দস্যুরা কাগজের মুকুট পরে যেন রাজসিংহাসনে সমাসীন। এখানে বাস্তবের অভিঘাত ফ্যান্টাসিতে পর্যবসিত। শিল্পীর সর্বশেষ ছবির নাম ‘প্রিন্ট-৩’। বর্ণ, ফর্ম, কম্পোজিশন বিবেচনায় ছবিটি অনবদ্য। প্রথম দৃষ্টিতে রং চোখের মণিতে পড়ে মসিত্মষ্কে খবর পাঠায়। এতে সবুজ পুরোভূমি আর ওপরের সাদা ও ধূসর অঞ্চল এবং মাঝখানে গ্রহের মতো ফর্ম ক্যালিগ্রাফিক রেখার বিনুনিতে পরিস্ফুট। এ-ছবিতে শিল্পী জীবনের রহস্যময়তাকে সত্যান্বেষণের তাগিদে আধ্যাত্মিকভাবে তুলে ধরেছেন।

মুর্তজা বশীর বিভিন্ন সময়ে ‘এপিটাফ’, ‘দেয়াল’, ‘প্রজাপতি’ – প্রতিটি সিরিজ গ্রন্থনায় ফর্ম বা রূপবন্ধের এক মোহময় জগৎ সৃষ্টি করেছেন। তবে বর্তমান ছাপচিত্রগুলো অনুসরণ করলে বোঝা যায়, প্রতিটি ছবিতেই একটি গল্প বা কথকতা রয়েছে। সৃষ্টির জন্মলগ্ন থেকে মৃত্যুমুহূর্তের অনুভূতি ও অমিত্মম জিজ্ঞাসার মাঝখানে ‘বাস ও মেয়েটি’ স্থাপন করলে মনে হবে বাস্তব, সত্য, অলৌকিকতা ও আধ্যাত্মচেতনার নির্যাস মুর্তজা বশীরের ছাপচিত্রে অভেদ কল্পনায় সন্নিবেশিত হয়েছে, যাকে তিনি অভিহিত করেছেন ‘মেটাফর’ বা রূপকালঙ্কার হিসেবে।

বাংলাদেশের ছাপচিত্রের আরেক মাস্টার মনিরুল ইসলামের পাঁচটি চিত্রের সংঘবদ্ধ নাম দেওয়া হয়েছে ‘টেম্পোরাল রিয়ালিটি’। সবকটি ছাপচিত্রের মাধ্যম এচিং। মানবীয় অন্তরপ্রবাহে কীভাবে নিসর্গ ও বিশ্বচরাচর প্রতিফলিত হয়, তাই এ-চিত্রকর্মগুলোতে উঠে এসেছে। এই বোধ জেমস জয়েসের ‘স্ট্রিম অব কনশাসনেস’ মনে করিয়ে দেয় কি? প্রদর্শনীতে শিল্পীর প্রথম ছবি ‘ওয়ে টু গ্লোরি’ – আক্ষরিক অনুবাদ না করে বাংলায় বলা যায় ‘গৌরবযাত্রা’। এ-ছবিতে যে-উপাদান ব্যবহার করা হয়েছে তা সম্ভবত মনিরের হাতে তৈরি তুলট কাগজ। এ-তুলোট কাগজের সমতা ও উচ্চতার বিন্যাসই এক ধরনের শিল্পকর্ম। অসমতল কাগজে তিনি ছাপচিত্রে জলরঙের পরশ দিয়ে গৌরবযাত্রার উদ্ভাস রচনা করেছেন। তাঁর অন্য ছবি ‘হোপ কামস অ্যান্ড গোজ অ্যাওয়ে’ বা ‘আশা আসে, চলে যায়’। ছবির বক্তব্য স্পষ্ট – সূর্যালোকে স্নাত হয়ে আশার আবির্ভাব ঘটে, চতুর্দিকে বিস্ময়, সম্মোহন ও আনন্দ একীভূত। রাত্রির অবগাহনে সেই আশা মস্নান হতে-হতে অন্তর্হিত হয়। তারপর আবার পরবর্তী দিনের জন্য নতুন আশার সঞ্চার। শিল্পীর পরবর্তী ছবির শিরোনাম ‘প্যাপিরাস’। প্যাপিরাস কাগজে অতীতের কত রহস্যঘন উপাখ্যান, কত উলস্নসিত কাহিনি সুপ্ত রয়েছে এবং তা হচ্ছে ভবিষ্যতের আগমনীবার্তা। মনিরুল ইসলামের চতুর্থ ছবির নাম ‘পেয়ার’ বা যুগল। দৃষ্টিনন্দন এই ছবি চিরন্তন যুগলের সম্পর্ক উদ্ঘাটনের বর্ণনা, – ঘটনাক্রম যাদের কাছে এনেছে, কিন্তু মিলনরেখা কি তাদের বিচ্ছিন্ন রাখবে? সত্যিকার অর্থে ছবিটি বিরহের বিষণ্ণ সম্মিলন ধারণ করে আছে। মনিরের শেষ ছবির নাম ‘টানেল অব টাইম’ বা সময়ের সুড়ঙ্গ। এ-চিত্রকর্মে অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যতে আদিঅন্তহীন সময়ের সুড়ঙ্গে আটকা পড়েছে। এ যেন মহাকালকে উদ্ঘাটনের প্রচেষ্টা। সময়ের এই অসীম সুড়ঙ্গটি উন্মীলন করে শিল্পী বোঝাতে চেয়েছেন, আদিতে কী ছিল, বর্তমানে কী আছে এবং ভবিষ্যতে কী ঘটতে পারে? সময় কি ঘটনাপ্রবাহ ছাড়া আর কিছু?

তিন দশকের অধিককাল ধরে স্পেন-প্রবাসী মনিরুল ইসলাম শিল্পকলায় আন্তর্জাতিক খ্যাতি লাভ করেছেন। ছাপচিত্র নিয়ে তিনি নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে এর রূপভঙ্গে ও প্রকাশবৈচিত্র্যে নতুন ভূখ- আবিষ্কার করেছেন। একটি ছাপচিত্রের বস্নকে বহুবর্ণ ব্যবহাররীতি এখন এ-ধারার শিল্পীদের অনুসরণীয় পন্থা। তাঁর শিল্পকর্মে স্পর্শাতীত দুরধিগম্যতা এবং বৈষয়িক বাস্তবতার মেলবন্ধন লক্ষ করা যায়।

বাংলাদেশের আরেকজন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন চিত্রকর শাহাবুদ্দিন আহমেদ। দীর্ঘকাল প্যারিসে অবস্থান করে স্বীয় সৃজনশীলতায় তিনি তারকাশিল্পীদের অন্তর্ভুক্ত হয়েছেন। তাঁর কাজে মানবদেহের অঙ্গপ্রত্যঙ্গের অন্তর্নিহিত গতি বা শক্তির উলস্নম্ফন লক্ষ করা যায়। অন্যদিকে সাদার বিপরীতে লালের অবস্থিতি, ফিনকি দিয়ে রক্ত বেরোনোর মতো রং ছড়িয়েছেন তাঁর চিত্রতলে। সুলতান তাঁর চিত্রকর্মে পেশিশক্তির বাহুল্যে দেহের অমিত বিক্রম প্রকাশ করতে চেয়েছেন। শাহাবুদ্দিন প্রায় একই শক্তির জাগৃতি দেখেছেন তীব্র গতির আলেখ্যে। প্রদর্শনীতে রক্ষেত শাহাবুদ্দিনের পাঁচটি চিত্রকর্মের সম্মিলিত নামকরণ হয়েছে ‘ফিগারস’। ছবিগুলোর মাধ্যমে লিথোগ্রাফ। প্রায় প্রতিটি ছবিতে শিল্পী ফিগারকে কেন্দ্র করে গতির উন্মত্ততা প্রকাশ করেছেন। শাহাবুদ্দিনের ছবিতে শিল্পীর আবেগ সর্বদাই বেগবান। তাঁর তুলি শক্তি, গতি, বেগ, শৌর্য – যা-কিছুই ধারণ করুক না কেন, তা দেহবাদের এক আধ্যাত্মিকতায় পর্যবসিত।

শিল্পীর প্রথম ছবি ‘অশ্বগুলো’। শক্তি ও গতির একত্র উদ্বোধন অশ্ব ছাড়া আর কী হতে পারে? বায়ুবেগে ধাবমান এই ঘোড়া স্থির হয়ে আছে শিল্পীর ক্যানভাসে। দ্বিতীয় ছবির নাম ‘রান’। এ যেন মৃত্যুভীতি থেকে সর্বশক্তিতে পলায়নপর দুটি মানবদেহ। তবে দেহ এখানে আর দেহ থাকেনি, রুদ্ধশ্বাসে ছুটে চলা ক্ষেপ্রতার প্রতিমূর্তি হয়ে উঠেছে। শাহাবুদ্দিনের তৃতীয় ছবি ‘অশ্ব’। শক্তিমদমত্ততায় এই অশ্বের অপরূপ প্রকৃতি ও আকৃতি ধরা পড়েছে। পরবর্তী ছবির নাম ‘ফ্রিডম’। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় ভাস্বর শাহাবুদ্দিন যেন সচেতন মন থেকে একজন মুক্তিযোদ্ধার স্বাধীনতার প্রথম আস্বাদ অভিব্যক্ত করেছেন। মুক্তির আনন্দে দুহাত প্রসারিত করে লাফিয়ে ওঠা মানুষটির উদ্দাম উল্লাসে সময় যেন মুহূর্তের জন্য স্থির হয়ে আছে এখানে। শিল্পীর সর্বশেষ ছবির নাম ‘স্পিড’ বা গতি। গতি তির্যক, ওপর থেকে নিচে কিংবা নিচ থেকে ওপরে দিগন্তরেখার সমবর্তী হয়ে যায়। মানবদেহের অত্যাশ্চর্য পেশির আন্দোলনে ধাবমান মুহূর্ত বুঝি আর ফিগারের মধ্যে আবদ্ধ থাকে না, তাঁর অবয়ব গতিবাদের নবসূত্র রচনা করে। মূলত শাহাবুদ্দিনের পাঁচটি ছাপচিত্র ‘ফিগারস’ নামাঙ্কিত হলেও ফিগার তাঁর ভাষ্য নয়, এর মধ্য দিয়ে তিনি আরেক গতিতত্ত্বের সোনার হরিণকে ধরতে চেয়েছেন।

শিল্পী রোকেয়া সুলতানা বরাবরই ছাপচিত্রের ছাত্রী, ঢাকা ও বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এ-বিষয়ে ডিগ্রি নিয়েছেন এবং বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের প্রিন্ট মেকিং বিভাগের অধ্যাপক। তাঁর যে-পাঁচটি চিত্রকর্ম প্রদর্শনীতে স্থান পেয়েছে, সেগুলো ‘এচিং অ্যাকুয়াটিন্ট’ ও ‘ইউনিক প্রেসার’ মাধ্যমে আঁকা। একজন শিল্পীকে তাঁর শিল্পকর্ম পৃথকভাবে চিনিয়ে দেয় – রোকেয়া সুলতানার অনুশীলন সে-সাফল্য অর্জন করেছে। তাঁর শিল্পকর্মের সিরিজ নাম হচ্ছে – ‘ফ্যান্টেজমাগোরিয়া’, বাংলায় যার আভিধানিক অর্থ – ‘স্বপ্নের ভেতর বা মোহাবিষ্ট নয়নে দৃষ্ট ছায়ামূর্তি বা কল্পিত মূর্তির ধারাপ্রবাহ’। নারীচৈতন্য বা নারীর মনোজগতান্ত্রিক ফ্যান্টাসির মধ্য দিয়ে রোকেয়া সুলতানা যেন আত্মোদ্ভাসনের পথ খুঁজে পেয়েছেন।

শিল্পীর প্রথম চিত্রকর্ম ‘ফরেস্ট গডেস-১’ বা বনদেবী। নিসর্গের অনুধ্যানে মগ্ন বনদেবীর মাথায় বসে আছে একটি পাখি আর তার কোলে বিছানো রয়েছে সূর্যমুখী ফুল। পরবর্তী চিত্রকর্ম ‘ফরেস্ট গডেস-২’-এ পাখি উড়ে এসেছে দেবীর কাঁধে এবং সূর্যমুখী তার মাথার মুকুট হয়ে উঠেছে। দুই ছবিতেই বনদেবী তার নিসর্গের রাজ্যপাটে আসীন। পরবর্তী দুটি চিত্রকর্ম ‘ফাটা মরগানা-১’ ও ‘ফাটা মরগানা-২’ অর্থাৎ বিশেষ ধরনের মরীচিকা প্রথমটিতে হলুদ বর্ণের পটভূমিতে সকালের সমুজ্জ্বল রৌদ্রপাত বিচিত্র চিত্রণে মুগ্ধ আবহ তৈরি করেছে। পরের ছবিটিতে অন্ধকারে নিমজ্জিত নারী নৈরাশ্য-আক্রান্ত। কিছু জোনাকির প্রেক্ষাপণ বোধহয় আঁধারকেই ঘনীভূত করে তুলেছে। অন্তর প্রতীক্ষায় উদ্বেল কিন্তু দৃষ্টি কিছুই খুঁজে পায় না, অনিবার্য বিভ্রম ও অন্তর্দাহ তাই এই শিল্পকর্মের মূলকথা। রোকেয়া সুলতানার সর্বশেষ উপস্থাপনা ‘অফ টাইম অ্যান্ড স্টারস-৩’ উজ্জ্বল লাল রঙের পটভূমিতে এটি যেন শিল্পীর সর্বাধিক উচ্চকিত উচ্চারণ। বহু আলোকবর্ষ পূর্বে কল্পনাতীতকালে তাদের আবির্ভাব যা অপরিমাপ্য কিন্তু এখন আমরা তাদের সহচর – এটাই ছবিটির গূঢ় অর্থ। বিষয় অতিক্রম করে বিষয়াতীত প্রতীকী মোটিভে নিজের শিল্পভাষ্য কাব্যাকারে লিখে এক অজানিত পৃথিবীর অভিবাসী রোকেয়া সুলতানা।

নিজের চিত্রকর্ম সম্পর্কে বিশেষ কোনো উক্তি করতে চান না শহিদ কবীর। তাঁর চিত্র সিরিজকে ‘মেমোয়ারস’ নামে আখ্যায়িত করা হয়েছে। শিল্পী মূলত ‘এচিং অ্যান্ড সুগার লিফট’ মাধ্যমে কাজ করেছেন। তাঁর ছবিতে চমকপ্রদ রঙের বিন্যাস যেমন আছে, তেমনই আছে কোনো-কোনো ক্ষেত্রে কল্পিত কাহিনি। তাঁর প্রথম দুটি চিত্রকর্ম নামে ভিন্ন হলেও এ-দুটোই হচ্ছে ফুলদানিতে ফুল। দুটি ছবি দুই ভিন্ন মাধ্যমে আঁকা। প্রথম ফুলদানিতে বর্ণময় ফুল ও পাতা বর্ণিত হয়েছে আবেগের উচ্ছলতায়। দ্বিতীয় ফুলদানিতে চারটি ফুল পৃথক-পৃথক ভঙ্গিমায় প্রস্ফুটিত, যাতে আনন্দ ও বিষাদ একত্রীভূত। শহিদ কবীরের পরবর্তী চিত্রকর্ম ‘দ্য স্ট্রিট সার্কাস’। বিষয়-বৈচিত্র্যের কারণে এটি সহজে দৃষ্টি আকর্ষণ করে। দীর্ঘদিন পূর্বে আঁকা এই কৌতুককর ছবিতে দেখা যায় অনেক উঁচুতে একটি নৃত্যরত ছাগলের সামনে দাঁড়িয়ে বাঁশি বাজাচ্ছে কোনো বাঁশিওয়ালা। রঙে ও রেখায় এদের ভারসাম্য রক্ষেত হয়েছে অনবদ্য দক্ষতায়। অবশ্যই এটি একটি কাহিনির খ-চিত্র। শিল্পীর পরবর্তী ছবি ‘মেক্সিকান লিলি’। এতে ডাঁটাসহ ছিন্ন ফুল নিহত সৌন্দর্যের বেদনামাখা আর্তি নিয়ে মুখ থুবড়ে পড়ে আছে। কালো রঙের পশ্চাদভূমি সেই আর্তি নিবিড় করে তুলেছে। শিল্পীর সর্বশেষ ছবি ‘হাইওয়ে’। মহাসড়কে চলার পথে যেন কারো আকস্মিক দৃষ্টিপাত। দূরের বস্ত্ত স্পষ্ট দেখা যায়, কিন্তু নিকটবর্তী স্থান অস্পষ্ট। মুহূর্তের জন্য থমকে দাঁড়ানোর বিমূঢ় অনুভূতি ব্যক্ত হয়েছে এ-চিত্রকর্মের পরিসরে।

শহিদ কবীর আবেগের বশবর্তী শুধু নন, প্রবল আবেগে কম্পমান। বিষয়বস্ত্ত বা বস্ত্ত, যা তাঁর সৃষ্টির অনুপ্রেরণা, তা স্পর্শ করে, তার সঙ্গে আত্মিক সম্পর্ক স্থাপন করে তিনি আবেগ ঢেলে দিতে চান ক্যানভাসে। মানুষজন, তুচ্ছ বস্ত্ত বা অবস্ত্ত অথবা প্রকৃতি – সবকিছুকে ভালোবাসার বন্ধনে আবদ্ধ করে সেই ভালোবাসার চিত্ররূপ ফুটিয়ে তোলেন তিনি। দীর্ঘকাল স্পেনে থেকে একসময়ে তিনি বলেছিলেন, ‘বাংলাদেশ ও স্পেন দুটোই আমার দেশ।’ এখনো কি তা-ই বলেন?

প্রদর্শনীর সর্বকনিষ্ঠ শিল্পী আনিসুজ্জামান, স্বাধীন বাংলাদেশে তাঁর জন্ম। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাক্ষেত্রে অত্যন্ত মেধাবী এই শিল্পী ঢাকা, শামিত্মনিকেতন, লন্ডন ও টোকিওতে প্রিন্ট মেকিং সম্পর্কে শিক্ষালাভ করেছেন। শিল্পীর চিত্র সিরিজের নাম ‘কলাইডাসস্কোপিক কমপেস্নক্সসিটি’। প্রতিটি ছবির একই নাম, পৃথক-পৃথক সংখ্যায় পরিচিত। তাঁর প্রতিটি ছবিই উডকাট মাধ্যমের ছাপচিত্র। নগরজীবনের দ্রম্নত পরিবর্তনশীল অবস্থা, এর বহুমুখী জটিলতা এবং সর্বোপরি নগরনির্মাণের মনস্তাত্ত্বিক স্ববিরোধিতা আনিসুজ্জামানের ছাপচিত্রের ধারক। কাঠখোদাই তাঁর ছাপচিত্রের প্রধান মাধ্যম। তবে আনিসুজ্জামানের সূক্ষ্ম কারুকাজ, নাগরিকতা-বিপর্যস্ত পরিপার্শ্বভাবনা শিল্পীর চিত্রকর্মকে পৃথক অভিধায় চিহ্নিত করেছে। তাঁর কাজ অবশ্যই তাঁকে আপন ভুবন নির্মাণে সিদ্ধহস্ত বলে অভিহিত করবে। আনিসুজ্জামান স্বীকার করেছেন, স্থপতি লুই কান তাঁর অনুপ্রেরণা। সেই অনুপ্রেরণা কীভাবে তাঁকে বিপরীত স্রোতে টেনে নিল, তা পরম জিজ্ঞাসা। লুই কানের স্থাপত্যে ফর্মের যে-ভারসাম্য এবং পরিণামে যে-মহাকাব্যিক প্রকাশ রয়েছে, আনিসুজ্জামানের ছবি তার অনুগামী নয়। চিত্রকলা ও স্থাপত্যচিমত্মা আনিসুজ্জামানের জাদুর বাক্সটিকে নানা অভিনবত্বে পরিপূর্ণ করে তুলেছে। বলার অপেক্ষা রাখে না তাঁর চিত্রযাত্রা সুদূরপ্রসারী হবে।

এ সময়ের সর্বাধিক জনপ্রিয় শিল্পীদের অন্যতম রফিকুন নবী। বিস্মিত হতে হয় তিনি একাধারে ধ্রম্নপদী চিত্রকলার ও হালকা মেজাজের কার্টুন কীভাবে আঁকেন! তিনি গ্রিক সরকারের বৃত্তি নিয়ে ছাপচিত্রে শিক্ষাগ্রহণ করেছিলেন চার দশকেরও পূর্বে। এই প্রদর্শনীতে শিল্পীর একটি মাত্র ছাপচিত্র স্থান লাভ করেছে, যার নাম ‘অটাম’ বা শরৎকাল। হৈমমত্মী ও শারদীয় সুরের বার্তাই এ-ছবির উপজীব্য। গ্রীষ্মের তাপদগ্ধতা ও শীতের হিমশীতল কষাঘাতের মাঝখানে শরতের স্নিগ্ধ সমাহিত রূপটি উঠে এসেছে এই শিল্পকর্মে। এর অনুষঙ্গ যেন আলো ও শব্দের মিলিত সৌরভ, যা প্রকৃতির ঐকতানে সমন্বিত হয়েছে।

প্রসঙ্গত বলা প্রয়োজন, প্রদর্শিত চিত্রকর্মের শৈল্পিক বিবেচনা বা সমালোচনা আমার অভীষ্ট নয়। আমি ছবির বিষয়বস্ত্ত, আঙ্গিক, প্রকরণ, রূপকল্প, বিমূর্ততা, এক্সপ্রেশনিজম কিংবা ছাপচিত্রের কলাকৌশল ইত্যাদি নিয়ে সমালোচনাসুলভ বক্তব্য পেশ করতে চাইনি। একজন সাধারণ দর্শক ও চিত্রশিল্পপ্রেমী হিসেবে প্রদর্শিত বিষয়ে আমার ধারণা ও অনুভূতি ব্যক্ত করতে চেয়েছি।

পরিশেষে ‘এজ, দ্য ফাউন্ডেশন’কে এমন একটি উচ্চমার্গের ছাপচিত্র প্রদর্শনীর আয়োজন করার জন্য অকুণ্ঠ ধন্যবাদ জানাই। গুলশান লেকের ধারে প্রকৃতির মোহময় পরিবেশে প্রদর্শনীর পরিবেশনা ছিল অনন্যসাধারণ। ‘এজ গ্যালারি’র এহেন উদ্যম ভবিষ্যতে এদেশের শিল্পী, শিল্পবোদ্ধা ও শিল্পরসিকদের মনে এক নবতরঙ্গের সৃষ্টি করবে বলে আমার বিশ্বাস।

শেয়ার করুন

Leave a Reply