উইয়ের পাখনা

লেখক:

কাদের মাহমুদ

Uoyer Pakhna

জামান স্যারের পড়ানোটা এমন যে কখনো কখনো সুখময় ঘোর লেগে যায়। পড়ানোর ফাঁকে ফাঁকে কখনোবা পাঠ্যবইয়ের বাইরের এক অজানা মহাজগতে মনকে ডুবিয়ে দেন স্যার।

আজ স্টিফেন হকিংয়ের গল্প পাড়লেন। বললেন, হয়তো জানো, দেহ তাঁর অচল, বিকল। কখনো টিভিতে দেখা যায় তাঁকে। হুইলচেয়ারে বসে আছেন। মাথা তাঁর এক পাশে কাত, প্রায় নিশ্চল। মুখাবয়বে না সুখ না দুঃখ না কষ্ট-অহংকার – মনে হবে অভিব্যক্তিশূন্য অথবা নির্বিকার। চশমার কাচের স্বচ্ছতা ভেদ করে তাঁর দুচোখ দিয়ে বুদ্ধির বিভা উপচে উপচে পড়ে। নির্বাক তিনি, ঠোঁট তার নিশ্চল। তবু কথা বলেন। জৈব কণ্ঠের বদলে অদৃশ্য এক কম্পিউটারে; যান্ত্রিক ধাতব স্বরে, সেই স্বর যেন অপার্থিব। বিজ্ঞানরহস্য ছায়াছবির কোনো অজাগতিক চরিত্র যেন তিনি। অথচ এ-জগতের একালের সেরা এক পদার্থবিজ্ঞানী। তাঁর কথা শোনার জন্য পৃথিবী উদ্গ্রীব থাকে। না জানি কখন কী এক ধ্রুব তত্ত্ব দেবেন। মহাকালের কথা বলবেন। শুনে চমকিত, রোমাঞ্চিত হতে হবে। গল্প বলতে বলতে জামান স্যার পদার্থবিদ্যা থেকে চলে গেলেন জ্যোতির্লোক বিদ্যার জগতে। হকিং বলেন, মানুষ একদিন পৃথিবী ছেড়ে গিয়ে বসতি গড়ে তুলবে মহাশূন্যে আরেকটি গ্রহে!

ওয়াও! এ-ও কল্পনা করা যায়! আহা! পলাশ ক্লাস থেকে বের হতেই বৃষ্টিতে পেল। বৃষ্টি পলাশের মনকে ভিজিয়ে দেয়। তবে এই রকম ঝুপঝুপে বর্ষণটা এখন একেবারে পছন্দ করতে পারছে না। বাসায় ফিরতে হবে। টিএসসিতে গিয়ে ব্রতার সঙ্গে গল্প করার ইচ্ছা ছিল, গতরাত থেকে। কিন্তু সকালে মা বাসায় ফিরতে বলে দিয়েছেন, ক্লাস শেষ হলেই। কোনো কারণ বলেননি। এমনি বলেন, কখনো-সখনো। কারণ জানতে চাইলে, মেকি রাগ দেখিয়ে বলেন, ছেলের কাছে মায়ের আবার কারণ দেখাতে হবে নাকি রে? তবে আড়ালে-আবডালে কোনো না-কোনো একটা ঘটনা থাকে, কারণ রয়ে যায়। মায়ের কথা মানলে তবেই সেটা দেখা যায়। তুচ্ছ বা বড়। হয়তো গাঁয়ের বাড়ি থেকে পাঠানো গুড় দিয়ে মিহি পায়েস করেছেন। সবার আগে পলাশকে সেটা খেয়ে দেখতে হবে। বলতে হবে স্বাদু হয়েছে কিনা। গুড়ের গন্ধটা ম-ম করছে কিনা। মায়ের ধারণা, তাঁর ছেলেমেয়েদের মধ্যে পলাশের রসনাই সবচেয়ে সূক্ষ্ম। সেই ছোটবেলাতেই শুরু হয়েছিল; রান্নাঘর থেকে মা কখনো ডাকতেন, পলাশ! এদিকে আয় তো, তরকারির নুনটা একটু চেখে দেখবি? আজো হয়তো কিছু একটা করে মা পলাশের জন্য অপেক্ষা করছেন; আজ অফিস থেকে তার ছুটি।

বৃষ্টি থামার অপেক্ষা করছে, আরো কয়েকজন ছেলেমেয়ে, – ছাত্রছাত্রীই বলা ভালো, সবাই তো প্রাপ্তবয়সী। কারোর হাতেই ছাতা নেই। রোদ ও বর্ষায় খুব উপকারী হলেও ছাতার বালাই কেউই আজকাল তেমন করে না, ভাবে গেঁয়ো একটা আচার, যেমন            কৃষকদের মাথায় থাকে মাথলা। সবেধন নীলমণি একটা রিকশা মাছের মতো ভিজতে ভিজতে এসে ভিড়ে, একজন যাত্রী নামাতে না-নামাতেই, পলাশের মুখচেনা অপেক্ষমাণ একজন ছাত্রী ঝট করে প্লাস্টিকটা আগলে ধরে নিয়ে হুডের মধ্যে ঢুকে সিটে বসে গেল। যেন বাহনটা তার জন্য আগে থেকে সংরক্ষিত ছিল, – অন্যরা নীরব হয়ে দেখল; দুর্যোগে সবাই হয়তো স্বার্থপরের মতো এমনি করে; সুযোগ লুফে নেয়। পলাশ অবশ্যি রিকশা নয়, হেঁটে যাওয়ার কথাই ভাবছিল। কতই বা দূর; হাঁটতে ওর ভালোই লাগে। রিকশাচালকরা আবার বৃষ্টি-বাদলের সময়, কড়া রোদের সময়ের মতো, ভাড়াটা বেশ বেশিই হাঁকে। রিকশাচালকদের কষ্ট ও সুযোগের কথা ভাবতে চায় না আরোহীরা বরং তাদের বিরুদ্ধে অনেক নালিশের মধ্যে, এটি একটি, সকালে তো অর্ধেক ভাড়ায় এলাম। এখন এতো চাও কেন?

অনবরত বৃষ্টি। ঠায় দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে পলাশের মনের বাসায় নানান কথার পাখি ফিরে আসে।

 

দুই

বড়আপা গত সপ্তাহে অস্ট্রেলিয়া গেল। স্কলারশিপ পেয়ে সিডনিতে বায়ো-কেমিস্ট্রিতে পিএইচ-ডি করতে গেছে। ছোটআপাও আগামী বছর যাবে। মানে যাওয়ার প্রস্তুতি করছে। ও ঠিক যেতে পারবে। বড় আপার মতোই সবসময় ফার্স্ট হয়ে আসছে। আইটির বুদ্ধিতে ওর মাথা গজগজ করে। সারাক্ষণ কম্পিউটার নিয়ে পড়ে থাকে। খেতে ভুলে যায় – মা ডেকে খাওয়ান, ঘুমাতেও ভুলে যায় – মা শাসন করে শুতে বলেন। ছোটভাই উই-ও ব্রিলিয়ান্ট ছাত্র, একবার কিছু পড়লে ভোলে না, গড়গড় করে বলে দিতে পারে। খাটুয়াও বটে। এমন নিঃশব্দ খাটুয়া যে, ছোটবেলা থেকেই বাড়িতে ভাইবোনরা ওকে উই ডাকে। বাবা কিন্তু এই ডাকনামটা জেনে যেতে পারেননি। ওর যখন ছমাস তখন বাবা চলে যান। একটা কোর্স করতে গিয়েছিলেন কানাডায়। সেখানে এক বন্ধুর সঙ্গে গাড়িতে চড়ে কোথায় যেন যাচ্ছিলেন। দারুণ শীতের কাল। তুষার আর বরফঢাকা নিসর্গ। কিন্তু পথে ঘটে যায় অভাবিত ভয়ানক দুর্ঘটনা। তুষারপাত হচ্ছিল, এরি মধ্যে একটা আর্টিকুলেটেড লরি বেমক্কা ধাক্কা দেয়; পাশের গহিন খাদে পড়ে যায় গাড়িটা। পাঁচজন যাত্রীসমেত। শিলায় শিলায় গড়িয়ে গড়িয়ে পড়তে পড়তে শেষে, প্রায় খ- গাড়িটায় আগুন ধরে যায়। দাউ দাউ করে জ্বলে গিয়েছিল। উদ্ধারকারীরা যখন পৌঁছায় তখন তারা নাকি আস্ত তেমন কিছু উদ্ধার করতে পারেনি। তদন্ত হয়েছিল, মায় সুরতহাল। বছরখানেক বাদে বাবার পোড়া কঙ্কাল দেশে এসেছিল। বড়রা কেউ কফিন খুলে দেখার সাহসও পাননি। পাছে অসহ্যবিভৎস কিছু দেখতে হয়। পলাশের এসব কিছুই মনে নেই, থাকার কথাও নয়। মায়ের কাছ থেকেই সব শোনা। আপারাই তখন বালিকা, পলাশ ছোট ও অবুঝ। আড়াই বছরের ছোট উই তখন সবার কাছেই বাবু – তখনো উই নাম পায়নি। মায়ের শোয়ার ঘরের দেয়ালে, ফ্রেমে বাঁধানো বাবার একটা ছবি আছে। বাবার পছন্দের কিছু বইও আছে, আর কিছু নেই। মা রাখেননি। ওসব দেখলেই মায়ের বুক ফেটে কান্না আসত। আপারাও কাঁদত।

বাবার কবর হওয়ার পর, ওরা কিছুদিন গ্রামের বাড়িতে গিয়ে থেকেছিল। দাদা-দাদির আদরের শেষ ছিল না, গ্রামের সব মানুষই আদর করত। দাদা-দাদি ওখানেই থেকে যেতে বলেছিলেন। সম্পন্ন বাড়ি। ক্ষেতের প্রচুর ফসল। ফলের গাছঘেরা বসতবাড়ি। চৌচালা ঘর তিনটা। বড় ঘরের পাকা দেয়াল। বিশাল দহলিজ। বাড়ির সামনে দিঘি, প্রচুর মাছ। গ্রামে স্কুলও আছে। দরস উল্লাহর বড় ছেলে তরুণ বয়সে কে জানে কেন স্কুল পালিয়ে সেই যে বাড়ি থেকে চলে গিয়েছিলেন, কয়েক বছর তার কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি। মুক্তিযুদ্ধের পর, হুট করে আমেরিকা থেকে একবার বাংলাদেশ এসেছিলেন। দিনকয়েক থাকার পর ফিরেও গিয়েছিলেন

ফেলে-আসা বউ-বাচ্চার কাছে। মায়ের চোখের পানি তাকে আটকাতে পারেনি। ফিরিয়েও আনতে পারেনি আর কখনো। দরস উল্লাহর চার মেয়ের প্রত্যেকে দেশের চারটি শহরে সুখে-স্বচ্ছন্দে স্বামীর সংসার করছে। দরস উল্লাহর বাড়ি বহুদিন থেকে একপ্রকার উল্লাসবিহীন; না শিশু, না তারুণ্য। তবু মুখে হাসি মেখে বলেছিলেন, এখানেই থেকে যাও, মা মঞ্জু। ঢাকায় গিয়ে কী করবে? আশফাক নেই, একা একা ওখানে তো তোমাকে বেজায় কষ্টের মধ্যে পড়তে হবে। অভাবে কি সামলাতে পারবে?

ছেলেমেয়েদের দেখিয়ে শান্ত-দৃঢ় স্বরে মঞ্জু বলেছিল, ওদের ভালো লেখাপড়া করানোটাই আমার আসল দায়, আব্বা। গ্রামে      থাকলে এটা হবে না। এজন্য কষ্ট হবে। হলেও, সে কষ্টকে ভয় করতে পারি না। বলুন, পারি কি?

তখন দাদির চোখে অমানিশা। হোক বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি-পাওয়া, তবু তো মুসলমান বাড়ির বিধবা বউ, এখনো শরীর কচি, লেলিহার যৌবন, চাকরি করে সংসার চালাবে, এও কি হয়! জাহেদা জানতে চেয়েছিলেন, কী করে চলবে তবে, বউ? তোমার শ্বশুর কি কিছু পাঠাবেন?

খানিকক্ষণ নীরব হয়ে থেকে মঞ্জু অপরাধী মুখে বলেছিলেন, কথাটা আপনাদের আমি আগে বলতে পারিনি। তবে এখানে আসার আগে আশফাকের অফিসের ডাইরেক্টর বেলাল কাজী নিজে থেকে আমাকে একটা আশা দিয়েছিলেন। বলতে পারেন এখনো মুখের কথাই বটে। তবে আশফাকের মুখে শুনেছিলাম, ভদ্রলোকের কথা সহজে নড়চড় হয় না।

জাহেদা অশ্রুসজল চোখ আঁচলে আড়াল করেছিলেন, আর রা-টি করেননি। হাত-চাপা বুক থেকে ছোট দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিচু ফ্যাসফেসে স্বরে দরস উল্লাহ বলেছিলেন, মা, তোমার বাসনাটি পূরণ হোক – এ তো আমরাও চাই। আশফাকও নিশ্চয়ই চাইত। পরম করুণাময় তোমার সহায় হোন!

ঢাকায় এসে, পলাশরা আজিমপুরে নানা-নানির ছোট্ট বাড়িতে উঠেছিল – দারুণ ঠাসাঠাসি হতো।

তবে মাসখানেকের মধ্যে, আশা-দেওয়া চাকরিটা মঞ্জু ঠিকই পেয়েছিলেন। শুধু স্বামীর অপমৃত্যুর বদলা হিসেবে নয়। প্রবল একটা ইন্টারভিউ বোর্ডের মুখোমুখি হতে হয়েছিল তাঁকে। ওঁদের কাছে মঞ্জু প্রমাণ করেছিলেন, আশফাকের সঙ্গে সংসার ঠেলার আগে, ইংরেজির যে দামি ডিগ্রিটা ওর অর্জন ছিল সেটা ছাড়াও, ওঁর যথেষ্ট যোগ্যতা ছিল – বিশেষ করে বলায় ও লেখায়। কেবল আগে এসব কখনো প্রমাণ করার দরকার পড়েনি; সুযোগের কথা ছিল অবান্তর।

মা আজিমপুরেই দুই আপাকে গার্লস স্কুলে ভর্তি করিয়ে দেন। হাঁটাপথ বলে ওরা নিজেরাই যেতে-আসতে পারত, যদিও বাসায় ফেরা না পর্যন্ত বড়দের উদ্বেগের অবধি থাকত না। আর উই থাকত নানির কাছে, পলাশও ভর্তি হওয়ার আগ পর্যন্ত।

চাকরি থেকে অবসর নিতে নানা সাহেবের তখনো কয়েক বছর বাকি ছিল। সেই দিনগুলোয় মায়ের যে কী কষ্ট হতো তা বোঝার বয়স পলাশের আরো কয়েকটা বছর পরে হয়েছিল। এর পরে মায়ের কয়েকটা পদোন্নতি হয়, আয়ও বেড়ে যায় বেশ। নিজের ভাড়াবাসায়ও ওঠে যান মা। পলাশ তো বটেই, উইও স্কুলে যেতে শুরু করে। মায়ের চাকরি করার জন্য, বড় কথা, বাসাটার ব্যবস্থাপনা ছিল বুয়া মালেকা বিবির হাতে। মালেকা বিবিকে গ্রাম থেকে দাদা পাঠিয়েছিলেন। গ্রাম-সম্পর্কে দরিদ্র আত্মীয়া, বিধবা ও নিঃসন্তান। মা তাকে চাচি ডাকেন। বড়আপা কেন যেন তাঁকে একবার বিবি-দাদি ডেকে ফেলেছিল। সেই থেকে ছোটদের কাছে তিনি

বিবি-দাদি। কখনোই বুয়া নন, স্বজন তো। বিবি-দাদির সব গুণের বড় গুণ, তার হাতের রান্না। বাংলার গ্রামের স্বাদে-গন্ধে মাখা। তার সেই হাতের রান্না করা খাবার টেবিলে সাজালে, সবার সঙ্গে তারও পাত পড়ে। প্রথম দিনই মঞ্জু এই ব্যবস্থাটা করেছিলেন, চাচি! তুমিও আমাদের সঙ্গে খাবে। স্বল্পবাক মালেকা বিবির কাছে মঞ্জু বউয়ের কথা শিরোধার্য।

আশফাক ছিল বছরদুয়েকের বড়, ও বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকতে থাকতেই মঞ্জু ঢুকেছিল। বিভাগ ভিন্ন, তবে পাবলিক লাইব্রেরির পাঠাগারে দুজনারই নিয়মিত গতায়াত ছিল। সেখানেই প্রথম দূর থেকে দেখা, খেয়াল না করার মতো। তারপর একদিন মঞ্জু মাখন-টোস্ট আর টি-পটের চা খেতে এক সহপাঠীর সঙ্গে লাগোয়া শরীফ মিয়ার ক্যান্টিনে গিয়েছিলেন, তখন ওখানে এসে আশফাক একজনের সঙ্গে জেনারেল জিয়ার খুন হওয়া নিয়ে কী সব উত্তেজিত আলাপ করছিলেন। পাশ থেকে শুনে মঞ্জু প্রায় বিড়বিড় করে বলে ফেলেছিলেন, রাজনীতি কপচাতে পারলে বাঙালি মুখের খাবারও গিলতে যেন ভুলে যায়! কথাটা আশফাক কী করে যেন শুনে ফেলেছিলেন। তারই খেই ধরে, শেষ পর্যন্ত দুজনার পরিচয় হয়। এরপর দেখাদেখি। নৈকট্য। বাকিটা ইতিহাস।

তবে সংসার করতে গিয়ে দুজনায় একটা কথা বুঝেশুনে মেনে নিয়েছিলেন। মনের কথা মনে চেপে রাখলে, মানে গোপন করে রাখলে, হয় জমাট বেঁধে তা পাথর হয়ে যায়, না-হয় বেমক্কা ফোঁস করে বের হয়ে হুলুস্থূল ঘটায়। এর কোনোটাই সুগতিক নয়। অতএব কথা কও, আর কথা শোনও। ফলটা ভালোই হয়েছিল। তর্ক আর মান-অভিমান তো ছিলই, -­ সেসব জীবনের অঙ্গ। কিন্তু ওদের দুজনার মধ্যে কোনো তিক্ততা হয়নি। আর সংসারের এই খোলা হাওয়ায় জন্মেছিল চারটি সন্তান। নিজেদের মধ্যে তো বটেই, বাবা-মায়ের সঙ্গেও একটা নিঃশঙ্কভাবে আলাপ করতে পারত নিশিতা ও প্রিয়তা। পলাশ সেই পরিবেশই পেয়েছিল। কৌতূহল বা ঔৎসুক্য যা-ই হতো, তা সহজে প্রকাশ করতে পারত। আশফাকের অবর্তমানে, বড় মেয়ে নিশিতা আর ছোট মেয়ে প্রিয়তার পরে পলাশ ও পরাগ ওরফে উইকেও ছোটবেলা থেকেই বাড়ির সবার সঙ্গে সবসময় সব বিষয়ে সব কথা খোলামনে বলতে পারার পরিবেশটা মঞ্জু দিয়ে এসেছেন। কথা বলার জন্য কাউকে ধমক দেননি, শাসন করেননি, বকুনি দেননি। কোনো বিষয় নিয়ে তর্ক হলে, নানা পক্ষের কথায় বাড়িময় হইহই রইরই। যেন মতামতের উৎসব। সবাই সবার কথা শুনত। বলারও একটা নিজস্ব ভঙ্গি। নিশিতা… প্রথমত, দ্বিতীয়ত, তৃতীয়ত, … এভাবে কথা বলে। প্রিয়তা… যদি ওটা-সেটা ঠিক হয় তবে আমার মতে এটা হবে… এভাবে কথা বলে। পলাশের কথায় বিস্ময় আর আবেগ থাকে বেশি। সবার কথা চুপ করে শুনে শুনে উহ-হুঁ-হুঁ করে বলে, তোমরা সবাই ভুল বলেছ। এবার সঠিক কথাটা আমার কাছ থেকে শোন। শোনে বটে কিন্তু বাকিরা সবাই হাসে। গোল বাধলে মাকে রেফারি মানা হয়। তবে তাতেও সুরাহা না হলে, বিবি-দাদির রায় সবাই মেনে নেয়। নিত্যদিন। হালকা বিষয়ে যেমন-তেমন গুরুতর ব্যাপারেও। কোনো কথা গোপন থাকে না। সবাই সবার কথা জানে।

সবাই মিলে খুনসুটি-মজাও করে বাসায়। বিশেষ করে বেড়াতে গিয়ে। ঢাকায় নানার বাসায় যায় নিয়মিত, ঢাকায় কখনো ঝন্টু মামা ও অঞ্জু খালার বাসায় যায়; বরিশাল, সিলেট, খুলনা ও চট্টগ্রামে চার ফুফুর বাড়ি যায়। চা-বাগানে পাহাড়ে বন্দরে সৈকতে বেড়ায়। আর দাদার বাড়ি তো যায়-ই, আম-কাঁঠালের সময়। তখনো আরো ফুর্তি করে। প্রিয়তা আবার ছড়া কাটতে পারে। পত্রিকায়ও ছাপায়। একবার দেশের বাড়িতে গিয়ে, উইয়ের একটা ঢিবি দেখে মুখে মুখে ছড়া বানিয়ে ফেলল।

উই ওরে উই!

কোন সে তলে ভুঁই

কোথায় লুকাস তুই?

করিস না তো রা-টি,

চাপুস চুপুস কাটি

লালায় মেখে মাটি

বানাস যত ঢিবি।

একটা আমায় দিবি?

আজ হবে না জোছনা,

মেলবি সাঁজে পাখনা?

শুনে সব্বাই রইরই করে উঠেছিল। মা বলেন, বেশ মজার হয়েছে রে, পরাগ! উইয়ের মুখ লাল হয়ে উঠেছিল, কেন তা সে কেবল ও-ই জানে। তবে প্রিয়তাকে বুকে জড়িয়ে বলেছিল, ‘তুমি একটা প্রতিভা! একদিন সুকুমার রায় হয়ো ছোটআপা!’

 

তিন

একদিন নিউমার্কেটের বইয়ের দোকানপাড়ায় একটা বই খুঁজছিল পলাশ।

চোখে মোটা কাচের চশমা-পরা একটি ছেলে প্রায় হাতড়ে হাতড়ে যাচ্ছিল; পলাশকে সামনে পেয়ে বলল, আরে! আপনি পরাগের বড়ভাই না?

হ্যাঁ। পলাশ।

আমি জালাল। ওর ছোটবেলার বন্ধু। আমায় মনে আছে?

আরে কেন থাকবে না, জালাল? তবে তোমাকে তো বহুদিন দেখি না।

প্রায় বছর হতে চলল, আমরা অন্য পাড়ায় বাসা নিয়েছি কিনা, তাই।

ও!

আচ্ছা, পরাগ কেমন আছে?

প্রশ্নটা অত্যন্ত সহজ-সরল ও স্বাভাবিক হলেও, পলাশ বিস্মিত হয় তো বটেই, চমকেও ওঠে যেন। উইকে নিয়ে এমন জিজ্ঞাসা সে যেন আর কোনোদিন শোনেনি। তাৎক্ষণিক তার মনেও পড়তে চায় না, উই কেমন আছে, কোথায় আছে বা কী করে। রাতে বাসায় দেখা হয়, তারপর সকালেও হয়, ও কলেজেও যায় নিয়মিত, কিন্তু ছুটির সময়গুলো ও কোথায় থাকে তা চট করে মনে পড়ছে না, ধুত্তোরি মনটা যে কী! পলকের ঘোর কাটতেই বলে, ভালো। বাসায় এসো, জালাল। ওর সঙ্গে দেখা হবে। আগের মতো ক্যারমও খেলো।

পরাগ এখনো ক্যারম খেলে! মহাবিস্ময় জালালের স্বরে।

হেসে ফেলে পলাশ। বলে, হয়তো না। অনেকদিন হলো খেলতে দেখিনি।

কী জানেন, আমরা ও-পাড়ায় থাকতেই ওর শখ বদলে যাচ্ছিল।

খবরটা পলাশের কাছে আনকোরা মনে হয়। আবারো চমকে ওঠে ও। এ কেমন কথা উইয়ের শখ অন্তত এক বছর আগে থেকে বদলে যাচ্ছে, এতো বড় খবরটা পলাশ জানে না, অথচ তখনই জানত ওর পাড়ার বন্ধু! কেমন ভাই পলাশ! খবরটা সত্যি হলে, ভাই হিসেবে এটা পলাশের ব্যর্থতা। এমনকি ওদের পুরো পরিবারের। উইয়ের কী কী শখ বদলে যাচ্ছিল, সেটা এ-মুহূর্তে জেনে নেওয়াটা জরুরি কর্তব্য মনে হলো। তবে জালালকে জিজ্ঞাসা করতে গেল না পলাশ, পাছে তার নিজের ভাই – অজ্ঞতা ফাঁস হয়ে পড়ে, এই আশঙ্কায়।

বরং দার্শনিকের মতো স্বর তুলে বলে, মানুষ মাত্রেরই শখ বদলায়, তাই না, জালাল?

যাই তবে! বলে মুখে কেন যেন একটা রহস্যময় হাসি খেলিয়ে, জালাল মাথা নিচু করে চলে গেল।

আর নিউমার্কেট থেকে বের হয়ে, টিএসসিতে ফিরতে ফিরতেই, এই ঘটনাটি পলাশ বেমালুম বিস্মৃত হয়ে গিয়েছিল, মনটা যে কী!

 

আজ বৃষ্টি থামার পর, সতেজ হাওয়ায় হেঁটে হেঁটে বাসায় ফেরার পথে এই তুচ্ছ ঘটনাটির কথাও হঠাৎ মনে পড়ল। কেন? মনের যে কত খেয়াল হয়, সে কি মানুষ জানে! খেয়ালে খেয়ালে মানুষ কত কিছুই না করে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের এ-জায়গাগুলো দিয়ে কোনোদিকে কোনো যাত্রীবাস যাতায়াত করে না, শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের স্টাফ বাস চলে। রিকশা, সিএনজি আর গাড়ির রাজত্ব। হাঁটার জন্য দুধারে উঁচু ও বড় ফুটপাতও আছে, তবে অসমান বলে একমনে চললে হোঁচট খেতে হয়। টিএসসি-ছাত্র-শিক্ষক মিলনকেন্দ্র। ইউনিভার্সিটি লাইব্রেরি, -­ মায়েদের আমলে ওটা ছিল নাকি পাবলিক লাইব্রেরি। লোকে বলে, ছাত্রীদের নিবাস, আসল নাম -­ রোকেয়া হল। ভাষা ইনস্টিটিউট, -­ এ আবার কী, এখানে কী হয়! গুরুদুয়ারা ঝকঝকে সাদা, ঢাকায় তো কোনো লাল পাগড়ি-পরা শিখ দেখি না, কারা যায় এ-প্রার্থনালয়ে; একদিন খোঁজ করতে হবে। কলাভবন,  -­ একেবারে সাদামাটা বাক্সের মতো দালানটি, সামনে কিছু গাছপালা নিয়ে এখন নিরালা হয়ে বসে আছে, কখন যে এর চত্বর কোন আন্দোলন হট্টগোলোর বহুবিধ আওয়াজে ফেটে পড়বে, বিসুভিয়াস হয়ে উঠবে, তা আঁচ করা যাচ্ছে না -­ যখন হয় তখন বিশ্ববিদ্যলয়ের বাইরে থেকেই রিকশাচালকরা টের পায়, আসতেও চায় না, যারা ভেতরে থাকে তারা ভোঁ ভোঁ করে পালায়। সশস্ত্র পুলিশে ছেয়ে যায়। ভাইস চ্যান্সেলরের বাড়ি, বরাবরের মতোই উঁচু ঘেরাটোপের ভেতরে ব্রিটিশ আমল থেকে গ্যাঁট হয়ে বসে আছে।

পথটিতে অনেক দেয়াল, দেয়ালে দেয়ালে বড় বড় হরফে ঢের সেøাগান লেখা। প্রতিবাদ, দাবি ও শপথের নানারকম বৈপ্লবী সেøøাগান। ছাত্র-স্বার্থ আর দেশ-উদ্ধার। কর্তৃপক্ষ চুনকাম করিয়ে এক পরত মুছতে না মুছতেই আরেকটা পরত লেখা হয়ে যায়, কে লেখে কেউ তা দেখে না, সাধারণজনের কাছে খানিকটা যেন ভুতুড়ে ব্যাপার। যারা লেখে তাদের কয়েকজনকে পলাশ চেনে। একবার তারও শখ চেপে ছিল কিন্তু রাতের অন্ধকারের যে একটা ভয় ছোটবেলা থেকেই তার ভেতরে ঢুকে পড়েছিল, সেটিই ওকে বারণ করে দেয়। এই কারণটা পলাশ বন্ধুদের বলেনি, পাছে তারা ওকে ভিতু ভাবে। বরং বলেছিল, জানিস তো রাতেরবেলা আমায় বাসায় থাকতেই হয়। সেই বাবা মারা যাওয়ার পর থেকে। বলেই মনে মনে বলেছিল, ডাহা মিথ্যুক! ফুলার রোডের উত্তরের তেমাথায় স্মৃতিসৌধ… খাড়া গঠনে ওপরে কিছু নামের তালিকা -­ খুব কম জনাই ‘তিষ্ঠ ক্ষণকাল এ-সমাধিস্থলে’ হয়ে চোখ বুলায়, বেশিরভাগ তোয়াক্কা করে না।

হা-ই প-লা-শ! মোটর সাইকেল ছুটিয়ে যেতে যেতে হাত তুলে গেল সহপাঠী গোলাম মল্লিক। ওর কোমর জড়িয়ে ধরে পেছন সিটে বসে যাচ্ছে একটি মেয়ে; -­ যুবতী বলাই ভালো। ছাত্রীও হতে পারে।

ফার্স্ট ইয়ারের যে গোলাম মল্লিক এ সে নয়; একই মানুষ, তবে দুটো ভিন্ন চরিত্র। তখন ও ছিল সুবোধ, শ্লথ, সংশয়ী বা ভিতু, স্বল্পবাক; চলায়-বলায় জামা-পাজামায় ধরা পড়ত ও কেবল বিশ্ববিদ্যালয়েই নয়, নগরেও নবাগত -­ কেউ কেউ তাচ্ছিল্য করে বলত, গাঁইয়া। তবে লম্বা-চওড়া, পেটানো গতর; আর চোখ তুলে তাকালে বুদ্ধি ধরা দেয়। স্টার পাওয়া ছেলে। স্যাররা ওকে নিজের ছেলের মতো আদর করতেন। পলাশ ছিল ওর একমাত্র সঙ্গী। তারপর কটা মাস যেতে না-যেতেই হঠাৎ ভোল একেবারে পালটে গেল। পলাশ এসব গল্পে পড়ে, সিনেমা-নাটকে দেখে, এবার নিজেই দেখতে পেল। আলাপে, ফ্যাশনে, আড্ডায় তুখোড় চৌকস গোলাম মল্লিক; হাঁটায় ছোটে, লাফিয়ে সিঁড়ি ভাঙে, পরনের জিন্স-টিশার্ট ঝিলিক দেয়। মৌমাছির মতো কিছু ছাত্রছাত্রী ঘিরে থাকে ওকে; ডাকে, ওস্তাদ! পলাশ ওর নাগাল পায় না, অন্যদের মুখে ওর নানা কীর্তির কথা শুনতে পায়, তখন ওর কাছে ঘেঁষতেও মন চায় না। একদিন টিএসসির সামনের হাঁটা-বারান্দায় বসেছিল সদলবলে গোলাম মল্লিক। পলাশকে দেখে নিজেই কাছে এসে বলে, কী রে, ভালো ছেলে! ভালো আছিস? কেমন পড়ছিস? -­ তুমি থেকে কেমন করে তুইয়ে নেমে গেছে, তা সে-ই জানে।

পলাশ কথায় উত্তর দেয় না; বিনম্র হাসে। ভদ্রতা করে উলটো প্রশ্নও করে না, তুমি কেমন আছো?

গোলাম মল্লিকও হাসে, কেমন বাঁকা কিসিমে। বলে, আমি কেমন আছি জানতে চাইলি না?

পলাশ শুধু গলা খাঁকারি দেয়। কিছু বলে না।

বুঝেছিস, আমি গোল্লায় আছি। তাই না? পকেট থেকে দামি প্যাকেট বের করে, একটা সিগারেট নিয়ে, লাইটার দিয়ে ধরিয়ে মুখ থেকে ধোঁয়া ছেড়ে গোলাম মল্লিক বলে, আরে বাবা! আমাদের মতো ছেলেদের পড়াশোনা, ডিগ্রি নেওয়ার অর্থ কী? একটা চাকরি পাওয়া, তাই না? আর চাকরি পাওয়া মানেই তো পয়সা বানানো। তাই না? আরে আমি তো এখনই বানাচ্ছি। তোর মতো পড়াশোনা করলে বানাতে পারতাম?

পলাশ অবাক হয় না। তার মনের মধ্যে কোনো বিদ্বেষ, ঘৃণা কিছুই জন্মায় না। নিজের চারদিকে ওপরে-তলায় তাকিয়ে তাকিয়ে সে ভালো করেই জানে, গোলাম মল্লিক একা নয়, সংখ্যায় ওরা বেশুমার। তবে বুকের ভেতরে কষ্ট পায়। নিজের জন্য, না গোলাম মল্লিকের জন্য, না দেশের জন্য তা টের পায় না।

দুজনে হাঁটে। যেন আনমনে। মল্লিকের মোবাইল ক্ষণে ক্ষণে বাজে; কখনো মিস কল আসে; এক-একবার পরখ করে ও; তবে কোনোটাই ধরে না। বোঝা গেল পলাশের সঙ্গে আলাপে ব্যাঘাত সে চায় না। পাশাপাশি হেঁটে হেঁটে মেয়েদের হলের সমুখ দিয়ে রাস্তা পার হয়ে লাইব্রেরির চত্বরে ঢোকে দুজনে, পাকা পথের দুপাশে অসংলগ্ন কিছু গাছপালা। ফেব্রুয়ারিতে দুদিন এখানে রঙিন মঞ্চে বসে ঢের লোক মহাসমারোহে আধুনিক বাংলা শ্লোক পড়ে। বলা হয়, জাতীয় কবিতা উৎসব। কোনো এক উর্দিপরা বন্দুকের নলের মুখে রাষ্ট্রপতিত্বটা বগলদাবা করেছিল; পরে সে-ই বসংবদসমেত ‘কবি’ হওয়ার খায়েশ করেছিল। এরি বিরুদ্ধে প্রতিরোধ খাড়া করেছিল উৎসবটি; এর পর থেকে বছরে বছরে হয়। বিশাল রঙিন শামিয়ানার নিচে ও ফুলেল মঞ্চের সমুখে দর্শকের সারিসারি চেয়ারের ফাঁকে ফাঁকে অপুষ্ট মলিন শরীর গলিয়ে দিয়ে হেঁটে হেঁটে দীন-মলিন শিশুরা ইনিয়ে-বিনিয়ে ফুল ও চিনাবাদাম ফেরি করে। এখন সব ফাঁকা। রেলিঙের লাগোয়া দোকান একটা শিঙাড়ার মতো ভাজার সঙ্গে চা বিক্রি করে। আরো ভেতরে গাছের ছায়ায়-তলায় আরো পাকা দুটো খাবারের দোকান। ভাজাপোড়া, কোক-চা ছাড়াও, ছোট থালায় খিচুড়ি-বিরিয়ানি বেচে। ক্লাস করা আর পাঠাগারে পড়ার ফাঁকে অভুক্ত ছাত্রছাত্রীরা এসবের ভক্ত; বসার চেয়ার-টেবিল নেই, মাটিতে যে বসবে তেমন ঘাস নেই, কেউ কেউ পাঠাগারের দালানের হাঁটাপথে বা গাছের গুঁড়িতে পাকা পাটাতনে বসে; বাকি সবাই দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে খায়। গল্প করতে করতে। হয়তো প্রেমালাপও করে। এখন দুপুরের ভিড়। তবে ওরা দুজন কাছে ভিড়তেই, পলাশ টের পায় কেউ কেউ আলগোছে নিরাপদ দূরতে সরে গেল। মল্লিক তোয়াক্কা করল না; মনে মনে বিব্রত হলো পলাশ। মল্লিক দোকানিকে হেঁকে বলে, অউ! দুটো বিরিয়ানি! বলেই, ঘাড় ফিরিয়ে জানতে চায়, কি রে পলাশ! খাবি তো, -­ হারাম পয়সার কেনা?

পলাশের মুখে কাঁচুমাচু হাসি, খাবো। পেট অনেকক্ষণ চোঁ চোঁ করছে। প্রাণ বাঁচানো ফরজ।

তোর ওই কথাটাই আমারও কথা। প্রাণ বাঁচাতে মানে টিকে থাকার জন্য হারামেও নিষেধ নেই, -­ হালাল হয়ে যায়। ছোটবেলায় পড়েছিলাম। বুঝলি, আমার ছিল টিকে থাকার প্রশ্ন। ভর্তি হওয়ার কমাস পরেই, বাড়ি থেকে টাকা আসা বন্ধ হয়ে যায়। মফস্বল শহরে বাবার ছোটখাটো ব্যবসা ছিল। নানারকম ধান্ধাও করত বাবা। কী না কী করে একদিন অ্যারেস্ট হয়ে যায়। কারবারের ঝাঁপি বন্ধ হয়ে যায়। সংসারের আয়ও বন্ধ। দুই বড়ভাই, ওরা কানা পয়সাও আমাকে দেবে না। সাফ বলে, বাপজানের মামলায় বস্তায় বস্তায় টাকা ঢেলে ফতুর। তখন কী করি আমি! চোখে প্রগাঢ় অন্ধকার। হলের রুমমেট হাসানভাই ফিসফিসিয়ে বললেন, ব্যাটা মল্লিক, পার্টি ধর! বেঁচে যাবি। কিন্তু খুঁজতে গিয়ে দেখি, পার্টি এন্তার। এই দল সেই দল। -­ আদি দল, ছুট দল, ভাঙা দল, নেতাসর্বস্ব দল, পকেটে-গোঁজা দল। সবই দেশের বড় বড় দলের অঙ্গদল, ছায়াদল, মায়াদল বা এমনতর কিছু। সরকারি সমর্থক, বিরোধী, বিপ্লবী, নাশক, সন্ত্রাসী, ইসলামি। সবই নামমাত্র। কেউ আদর্শ ধুয়ে খায় না। সবই নাটক নাটক; যে জীবন্ত নাটকে বিবেক অবর্তমান। ভিলেনরাই হিরো। যত সভা মিছিল বিক্ষোভ সেøাগান পোস্টার চিকামারা বা দেয়াল-লিখন সবকিছুর পেছনে টাকা,… লাশ ফেলায় বিগ মানি, বস্তায় ভরে দিতে হয়। যারা ঢালে তাদের কাজটাই হয়, যেমন চায় তেমনি। আবার, ভর্তি-বাণিজ্য, হলের সিট-বাণিজ্য তো আছেই, নেশার মালও আছে। কোনটা নেবে? আবার চাইলেই তো পাবে না। বখরার নখরা আছে। দারুণ কমপিটিশন, ভয়ানক রিস্কও। কে জানে কাকে ধরে কোন লাইন নিলে কোন গর্তে গিয়ে পড়ে যাব রে বাবা! আবার লাইন নিলেই হবে না। ওপরে তাকালে নিচে নজর রাখতে হয়। বাঁপাশে তাকালে ডান পাশের খবর রাখতে হয়। সামনে হাঁটলে পেছনে চোখ রাখতে হয়। ঘুমের মধ্যেও সজাগ থাকতে হয়। অতর্কিতে কে কোন দিকে খুলি উড়িয়ে দেবে টেরটি পাবে না। পুলিশ আইবি ডিবি তো বটেই, মিলিটারি গোয়েন্দারাও নাটাই ধরে রাখে। এ-খেলায় ছাত্র-শিক্ষক সব কিসিম আছে। আমার মতো গাঁইয়ারা যেমন থাকে, ধানম-ি গুলশান বনানীর পোলারাও থাকে, দেখিস তো! গরিব-ধনীর ফারাক নেই। সবার একই ধান্ধা।

ওস্তাদ! দুজন সুবেশী ছেলে, তরুণ বলাই ভালো, -­ ছাত্র হতে পারে, আবার না-ও হতে পারে, ছুটে এসে খাড়া হয়। দম চেপে হাঁপায়, চলো! চলো ওস্তাদ!

গোলাম মল্লিক গল্পটা শেষ না করেই তড়াক করে উঠে বার্তাবাহকদের সঙ্গে দ্রুত ছুট দিলো।

মধ্যাহ্নভোজনকারীদের মধ্যে অদৃশ্য বিজলির মতো একটা ত্রাসের শিহরণ বয়ে গেল।

পলাশ লাইব্রেরি চত্বর ছেড়ে দ্রুতপায়ে সড়কে বের হতে পারার আগেই, টিএসসি চত্বর থেকে বিকট চিৎকার-হল্লা ছড়াল দিগি¦দিক, তার সঙ্গে ভীতসন্ত্রস্ত মানুষ-লোক। মায় রিকশাচালকরা। ছিটকে পড়তে লাগল। যেন বোমা পড়েছে।

অনেকের সঙ্গে পলাশও হুড়মুড় করে লাইব্রেরির ভেতরে আশ্রয় নিল। সঙ্গে সঙ্গে দরজা, ফটক বন্ধ।

 

চার

হাতিরপুল মানে সেতু, ছিল ভূতপূর্ব রেললাইনের ওপরে, -­ তারও বহু আগে আরো পশ্চিমে মোগল আমলে ছিল পিলখানা মানে হাতিখানা -­ তখন হয়তো মেঠোপথ হেঁটে যেত হাতি; সেই হাতি বিস্মৃত, রেললাইন সরে যাওয়ার পর, সেতুও উচ্ছেদ হয়; এখন বিস্মৃত; সড়কে টিকে আছে হাতি নামটা, ইংরেজিতে, এলিফ্যান্ট রোড। এর দুপাশে বহুতল কয়েকটি দালান এখন। ইস্পাত বা লোহার গ্রিল লাগানো ফটকে ফটকে দারোয়ান, রিসিপশন আছে; আগন্তুক এলে, আসসালামু আলাইকুম! কার কাছে যাবেন? জেরার পর, নিজের নাম ও মোবাইল ফোন নম্বর লিখতে হয়; তারপর রিসিপশন থেকে ফোন করে নির্দিষ্ট ফ্ল্যাটবাসীর অনুমতি পাওয়া গেলে, আগন্তুককে যথা বাসায় যেতে দেওয়া হয়। চুরি-ডাকাতির প্রাচীন ভয় তো ছিলই, গত কয়েক দশকে উঠতিদের নতুন নতুন ত্রাস-সন্ত্রাস ছড়িয়েছে, নতুন মধ্যবিত্তদের অট্টালিকা-নিবাসে নিরাপত্তার দুর্গ রচনা অপরিহার্য হয়ে পড়েছে। যদিও শান্তির ধর্মের আহ্বান দিনের পাঁচবার সরবে উচ্চারিত হয়েই চলেছে। যদিও অট্টালিকার আশপাশে বস্তিগুলো কোনোরকমে টিকে আছে। আলোর নিচে অন্ধকারের মতো।

পলাশদের ফ্ল্যাটটা বাংলা দশমতলায়, ইংরেজিতে নবম। এক এক তলায় করিডর দিয়ে এ বি সি ডি আক্ষরিক বিভাজন। সিঁড়ি বা লিফটে যত ওপরে ওঠা যায়, পায়ের নিচ থেকে মাটি যত সরে যায়, কোলাহল ধুলো ধোঁয়া আবর্জনা থেকে ততই দূরে থাকা যায়। সেখানে গাছপালাও নাগাল পায় না। ধারে-কাছে অবশ্যি ওসব নেই। সবুজ নির্বাসিত। লাখ লাখ লোক গাছতলায় তো থাকবে না, সবাই চায় ঘর, চায় আশ্রয়, চায় চলাচলের পথ-সড়ক। গাছপালা তো উপড়ে ফেলতেই হয়। সরল অঙ্ক। কয়েক দশক আগে তল্লাটজুড়ে ছিল ধানক্ষেত, সাক্ষী ধানম-ি নাম!

এসব নিয়ে পলাশ ভাবছে না, কখনোই তেমন ভাবে না; এ-নগরের সব সুবিধা ভোগ করতে চেয়েও প্রকৃতিবাদী হওয়ার ভাবনাটা নিছক ভ-ামি, এটা সে ভালো টের পায়। কিন্তু জালালের সেই কথাটি আবারো ঘুরে এলো। উইয়ের শখ বদলে যাচ্ছে। তাহলে আগে যেসব শখ ছিল সেগুলো থাকছে না, বা নেই। নতুন নতুন শখ আসছে, বা এসেছে। আচ্ছা, আগে কী কী শখ ছিল উইয়ের! অনেক ভাবে পলাশ। স্পষ্ট কিছুই মনে পড়ে না; তার কেবল মনে হয়, যা মা ভাবেন, যা বড়আপা ভাবেন, যা ছোটআপা ভাবেন, যা সে ভাবে, এমনকি বিবি-দাদি যা ভাবেন, তা তো উইয়েরও ভাবার কথা। লেখাপড়া করো। ভালো ডিগ্রি নাও, দেশ-বিদেশ দেখো। ভালো চাকরি-বাকরি করো… এই তো। এ-ই তো উই ভাববে, তাই না? এছাড়া আর কী হতে পারে? ভেবে পায় না পলাশ। সে মনেই করতে পারে না অন্য কোনো কিছুর শখ উইয়ের কখনোই ছিল অথবা আছে। বাসায় সবাই তো নিজ নিজ মনের কথা বলে। খোলামেলা। বলাটাই বাড়ির প্রথা। মা তো বলেন, কথা মনে চেপে রাখলে, মানে গোপন রাখলে, হয় জমাট বেঁধে তা পাথর হয়ে যায়, না হয় বেমক্কা ফোঁস করে বের হয়ে হুলুস্থূল ঘটায়। তবে? হয়তো উইয়ের ভিন্ন কিছু গোপন শখ আছে! তাই কি পলাশ বা বাড়ির অন্য কেউ তা জানে না! কী এমন শখ যে উই বাড়িতে বলতে পারে না! আর ওর সমবয়সী জালাল তা জানে! অদ্ভুত! বাড়ির লোকের চেয়ে জালাল কি উইয়ের বেশি আপন? পেটের মধ্যে ফাঁপা ভাব মন্থন করে পলাশের। বাউলুরি বায়ুর মতো। বুকের মধ্যে অস্বস্তি খচখচ করে। কীসের শখ উইয়ের? উই কি প্রেম করে! ও হ্যাঁ, তা তো হতে পারে। আরে হ্যাঁ, বড়আপাও একবার একজনের প্রেমে পড়েছিল। লুকিয়ে লুকিয়ে। পরে ছ্যাঁকা খেয়ে, কেঁদেকেটে সবার সামনে নিজেই সব ফাঁস করে দিয়েছিল। তখন সামনে তো উইও ছিল। উই কি বড়আপার পথে গেছে? আসলে ওটা খারাপ নয়। ভালো প্রেম ভালো করে। মা ও বাবা প্রেম করেছিল। ব্রতা ফর্সা নয়, তামাটে গায়ের রং। গড়নটা বাঁশের কঞ্চির মতো। নাচে নিপুণ। তখন নূপুরের ছন্দে ওর দেহটা থরো থরো কেঁপে ঢেউ হয়ে ওঠে। তবে আরো চৌকস ওর মেধা। অসাধারণ স্মৃতিশক্তি। ওর পাশে বসলে পলাশের শরীরে শিরা-উপশিরায় শিহরণ খেলে যায়। এই তো প্রেম। কিন্তু উই গোপন করে কেন? তবে কি ঘটনা ভিন্ন? উই কি সিগারেট-ফিগারেট খায়? অনেক ভাবে পলাশ। ধুতে দেওয়ার আগে বিবি-দাদি সবার জামাকাপড় দেখেন, পকেট দেখেন -­ মায়ের নির্দেশ। কাগুজে টাকা, ধাতুপয়সা, কাগজপত্র, চিঠি পান। সিগারেট, ম্যাচ-ফ্যাচ কখনো পেয়েছেন বলে তো বলেননি!… তবে ড্রাগ-ফাগ ধরেছে কি উই?… হায়! কী সর্বনাশ! মা শুনতে পেলে কী করবে ভাবতে পারে না পলাশ; কিন্তু এখন তারই বুক ফেটে যাচ্ছে।

পলাশের দুই বন্ধু পিন্টু আর সন্টু একসময় ড্রাগে পড়েছিল। ডাগ-নেশা করলে কিছু আলামত দেখা যায়। নেশা কিনতে প্রচুর টাকা-পয়সা লাগে। কিছু লোকের সঙ্গে গোপন জায়গায় দেখা করতে হয় বলে বাসা থেকে ক্ষণে ক্ষণে বেলা-অবেলায় হাওয়া হতে হয়। উই কি ছেড়ে ছেড়ে বাসা থেকে হাওয়া হয়ে যায়? কলেজ ছাড়াও, অন্য কোথাও যায়? তা পলাশ জানে না। কিন্তু মা যে উইকে আলাদা করে টাকা দেয়, তা তো মা বলে না! তবে? পলাশকে তো দিতে হয় না। ভেবে কোনো কূল-কিনারা করতে পারে না পলাশ। নিজেকে হাঁদারামের মতো মনে হয়। কিছু একটা আছে নিশ্চিতই, চোখের সামনেই জ্বলজ্বল করছে কিন্তু মনে হচ্ছে চোখের সামনে যা আছে তা-ই সে হয়তো দেখতে পারছে না। ভাইবোনদের মতোই উইয়ের একহারা পাতলা গড়ন। গোলগাল মুখে সারল্যের ছাপ, চেহারা দেখে কেউ খারাপ কিছু ভাবতে পারে না। মা বলেন, তোরা সবাই পেয়েছিস বাবার বেবি-ফেস। আমার কিচ্ছু না! আমার পেটে হলি কেমন করে! বলে দুষ্টু হাসেন। খাটোখোটো মানুষ মা, ওর চেহারাটা ঘোড়ার মতো লম্বাটে। হঠাৎ মনে পড়ল, কিছুদিন ধরে উইয়ের মুখে দাড়ি-গোঁফ গজাচ্ছে। ওর বয়সে পলাশের গজায়নি। একদিন নতুন দাড়ি-গোঁফ নিয়ে বেশ তর্ক হয়েছিল; দাড়ি-গোঁফে উইকে মানাবে কিনা, এ-নিয়ে এক-একজনের এক-এক মত। মা বলেছিলেন, ঠিক আছে, পরাগ। শখ যখন হয়েছে এখন কদিন রাখ। কদিন পর কেটে ফেলিস। উই বলেছিল, উঁ হুঁ! উঁ হুঁ! তা হবে না। এ আমার ব্যক্তিগত নাগরিক অধিকার। এ-ব্যাপারে কারো নাক গলানো চলবে না। সেদিনই টেলিভিশনে একজন আলেম ধর্মে দাড়ি রাখার গুরুত্বের বিবরণ দিচ্ছিলেন। উই বলে, হুঁ হুঁ! এবার শুনলে তো তোমরা সবাই? উইয়ের কথাটা এতই হালকা ছিল যে, কেউ-ই পাত্তা দেয়নি।

এমন আরো হয়েছিল, যেমন হয়। একবার হরতাল ছিল। সব্বাই ছিল বাসায় আটক। সকালে ঘুম থেকে উঠেই ছোটআপা ঘোষণা করেছিল, শোন! আজ কিন্তু হরতাল! বড়আপা বলে, কারা ডেকেছে রে হরতাল? ছোটআপা বলে, এ আবার একটা প্রশ্ন হলো? কেউ না-কেউ ডেকেছে নিশ্চয়ই। কাল রাতে টেলিভিশনে ছিল, দেখোনি? বড়আপা বলে, আরে বাব্বা, টিভিফিভি দেখার সময় কোথায় আমার? নাশতার টেবিলে বসে মা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন, সবাই কি আর সবসময় হরতাল চায়? চায় না। তবু হরতাল হয়ই। একটা দল ডাক দিলেই হলো, অমুক দিন হরতাল! সঙ্গে সঙ্গে টেলিভিশনের পর্দা, বেতারের স্বরে, দৈনিকে দৈনিকে খবর হয়, হরতাল হবে, হরতাল হবে। ব্যস! বড়আপা বলে, আহূত দিনে মোটরগাড়ি নাবে না, বাস নাবে না, সিএনজি নাবতে চায় না। শুধু কিছু রিকশা দেখা যায়, ছোটআপা তির্যক হেসে বলে, দিনে-খেটে-দিনে খাওয়া মজুর বলে রিকশাচালকদের মধ্যবিত্তের রাজনীতি করুণা দেখায়। মা বলেন, হাজিরা না দিলে যাদের চাকরি থাকবে না, তারা পায়দলে পিঁপড়ের মতো ফাঁকা সড়ক ধরে হাঁটে। কোথাও কোথাও কাঁচাবাজার বসলেও, দোকানপাটের ঝাঁপি তোলা হয় না। মানুষ ঘরে-পাড়ায় বসে থাকলে নগরীকে বিরান দেখায়। ওই শোনো! পলাশ বলে, অ্যাম্বুলেন্সের গাড়ি পঁই পঁই চিৎকার তুলে ছুটছে। উই বলে, নাকি লাশ নিয়ে আঞ্জুমানে মুফিদুল ইসলামের গাড়ি? ছোটআপা বলে, আরে না, ও গাড়ি শব্দ করে না। সাংবাদিকের বাহনের মতো সাইনবোর্ড লাগিয়ে চলে যায়, সচরাচর কেউ ছুঁতে চায় না। মা বলেন, আসলে হলো কী, আমরা সবাই ভয় পাই। যার বিদেশি গাড়ি আছে সে চায় না তার দামি গাড়ির কাচ কারো ইটপাটকেলে চুরমার হয়ে যাক, চাকা পাংচার হোক; বাসমালিক বলি কি সিএনজি মালিক বলি তাদেরও একই হাল। বড়আপা বলে, দোকানদাররাই কি আর সাহসী। কেউই চায় না না-হক হামলার শিকার হোক। হু-হু হেসে উই বলে, হরতালের দিনে তোমরা সবাই তো ঘরে বন্দি থাকো। রাস্তায় নামো না, নামলে দেখতে ধুকপুক বুকে হাজার হাজার মানুষ কাজেকর্মে যাচ্ছে। কিন্তু এদিকে চোখ, ওদিকে চোখ, এদিকে খাড়া ওদিকে খাড়া কান। কখন কে জানে কোন দিক থেকে হরতাল-সমর্থকরা সশস্ত্র খ- মিছিল নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়বে। বড়আপা বলে, আসলে ভয় সংক্রামক। প্রাণভয় আরো সংক্রামক। পলাশ বলে, টিভিতে নেচার প্রোগ্রামে দেখায় না, শিয়ালের মতো ছোটখাটো একটি কি দুটি হায়েনা ধাওয়া করে। আর অমনি মোষের মতো ধামরা হাজার হাজার উইল্ডাবিস্ট হরিণ প্রাণভয়ে দলে দলে পালায়। ওরা রুখে দাঁড়ালে কিন্তু গল্প উলটে যেত। মা বলেন, আমাদেরও সে-অবস্থা। তবে, উই বলে, হরতালের খারাপ দিক তো আছেই, ভালোও আছে। শুনে আর সবাই যেন ভড়কায়। আক্কেলগুড়–ম বড়আপা বলে, বলিস কী! হু-হু করে উই বলে, ধরো যে-লোকটা ডান্ডা দিয়ে দেশকে ঠান্ডা করে রাখে, যেমন এরশাদ রেখেছিল, রাখেনি? তাকে হটাতে হরতাল তো লেগেই ছিল। বলো, লাগেনি? উইয়ের প্রশ্নে অন্যদের মুখে ছিপি আটকে গিয়েছিল, বলে কি পিচ্চিটা! বিবি-দাদি হেসে হেসে ধীরে ধীরে বলেন, আমার তো ভালোই লাগছে। তোমরা সবাই আজ দিনের এ-বেলায় একসঙ্গে বাড়ি আছো। অহরহ কি তা হয়? হয় না। এখন বলো, তোমরা আজ বিশেষ কী খেতে চাও? মুড়িঘণ্ট করি, কেমন? সঙ্গে মাছভাজা? মাংসের দোপিঁয়াজি? আর শুকনা বড়ই দিয়ে লাউ? এসবই তো তোমাদের প্রিয়।

সবাই উল্লাসে হইহই করে ওঠে। সবার অলক্ষে উই ফ্ল্যাট থেকে কখন বের হয়ে গিয়েছিল, আর ফিরেও এসেছিল, কেউ তা খেয়াল করেনি।

দুপুরের খাবার টেবিলে বসে টিভির পর্দায় নগরে আর মফস্বল শহরে শহরে খ-যুদ্ধের ভিডিওচিত্র সবাই দেখতে পায়। গতবারের হরতালের চেয়েও এবার বেশি মারমুখো, বেশি জঙ্গি, বেশি শিউরে-ওঠানো। পুলিশ বাহিনী বনাম হরতাল সমর্থক দল তো বটেই, হরতাল সমর্থক বনাম হরতালবিরোধীদের সংঘাতও। হাতে হাতে লাঠিসোটা, ইটপাটকেল। সশস্ত্র খ-যুদ্ধ। পথ-সড়ক রণক্ষেত্র। কোথাও গাছপালা উপড়ে ফেলা ব্যারিকেড। ইটপাটকেলের ছড়াছড়ি। হল্লা, সেøাগান। কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপের শব্দ, কুয়াশার মতো গ্যাসের ধোঁয়া, গুলির আওয়াজ। হাসপাতালে লাশ আর জখমি; পলাশ লাশ সহ্য করতে পারে না। দু-এক জায়গায় দাউ দাউ করে জ্বলছে আগুন। সামলাতে পারছে না পুলিশ; হটছে। হুঁ-হুঁ করে উই বলে, বেশ হয়েছে! বেশ হয়েছে! টেলিভিশনের শব্দ উপচিয়ে উইয়ের কণ্ঠস্বর যেন অন্যদের কানে পৌঁছেনি।

মনটা যে কী! পলাশের মন সেই কথাটা আজ পলাশের কানে পৌঁছে দিলো।

সেদিনের হরতালটি ছিল কয়েকটি ধর্মীয় দলের ডাকা। সে- খবরটাও টিভির খবরে ছিল। কিন্তু পলাশ কি অন্য কেউ সেদিন যোগটি দেখতে পারেনি, পর্যুদস্ত পুলিশ দেখে কেন উই হুঁ-হুঁ করে বলেছিল, বেশ হয়েছে! যোগাযোগটা এখন স্পষ্ট হতেই, পলাশের শরীর বিবশ হয়ে যেতে চাইল। এ-ও কি সম্ভব! না। না না না। শত না। উই এমনটা হতে পারে না। উই আমার ভাই। নিশিতার ভাই। প্রিয়তার ভাই। মঞ্জুর ছেলে। উই কিছুতেই আমাদের মতো না হয়ে পারে না। না, না; শত না। পলাশ মুখ বন্ধ করে নাক দিয়ে লম্বা এক শ্বাসে একদলা বায়ু পাঁজরের ভেতরে টেনে নেয়। সেই বায়ু দম বন্ধ করে খানিকক্ষণ ধরে রেখে ফের বল ফিরে পায় ও।

এলিফ্যান্ট রোডে পলাশ সচরাচর কোনো চেনামুখ পায় না। মিরপুর রোডের ওপর থেকে নিউমার্কেটের কাঁচাবাজার থেকে যে হাঁটা-ব্রিজ তার তলায় তলায়, আর এদিকে একপাশে একতলা… আর পাশে আরো উঁচু দালানের তলায় তলায়, নিচে ফুটপাতে, তারপর পুবদিকে যতই রাস্তা আসে, রাস্তার দুপাশে কেবল দোকান আর দোকান, বাঙালি কারবারিদের রাজত্ব; এই রাজত্বে সারা রাজ্যের খরিদ্দারদের নিত্য আনাগোনা, -­ কে তাদের চিনতে যায়! আবার আছে ফ্ল্যাটবাড়ির দালান, সেখানে যারা থাকে তারা একে অপরকে যতটা চেনে, তার চেয়ে ঢেল বেশি পরস্পরের কাছে আগন্তুক। যদিও কখনো মসজিদে বা আর কোথাও কাকতালীয়ভাবে কোনো দুজনার দেখা হয়ে যায় তবে একজন, খান সাহেব, সবিস্ময়ে বলেন, ও! আপনিও বুঝি এই রাস্তায়ই থাকেন! অপরজন, চৌধুরী সাহেব, বলেন, হ্যাঁ, হ্যাঁ। কয়েক বছর ধরেই তো আছি। কিন্তু আপনাকে তো এ-রাস্তায় কখনো দেখিনি! আসলে এলিফ্যান্ট রোড হয়তো কোনো পাড়া নয়, যে-অর্থে পাড়া একটি বসতি যেখানে মানুষ সুদিনে দুর্দিনে নৈকট্য বোধ করে। একজন আরেকজনের ঘরে মিলাদ পড়তে আসে, বিয়ের সময় দাওয়াত পায়, মরে গেলে কাঁধে লাশ বয়। পলাশ এমন সব ঘটনায় খুবই কম গেছে, হয়তো যায়ইনি। সে তো এমন বাড়ির ছেলে যেখানে কোনো সাহেব নেই, বিবি সাহেব আছেন। পাড়া বলতে তো পুরুষদের রাজত্ব, সেখানে মায়ের চল নেই। পলাশ পুরুষ হলেও, এ-পাড়ায় তার কোনো বন্ধু-দোস্ত হয়নি; যে দেখলেই বলবে, কী রে পলাশ কেমন আছিস। চল, বসে চা খাই। তবে উইয়ের ছিল, ছোটবেলা থেকেই, জালালের মতো কয়েকজন বন্ধু ছিল, ওরা বাসাতেও আসত। এখনো হয়তো কোনো কোনো বন্ধু আছে, ওদের সবাইকে পলাশ আজকাল দেখতে পায় না। কিছুদিন হয় পলাশকে দেখলে পাড়ার কোনো কোনো দোকানদার হাত তোলে, মুখে হাসি ফোটায়, যেন তাকে চেনে; কেউ কেউ বলে, কেমন আছেন পলাশভাই? বলেই জানতে চায়, পরাগ ভাই ভালো তো! পলাশ মুখে অনির্দেশ্য হাসি ফুটিয়ে আপন ভাবনায় নিজের পথ ধরে। আজ পলাশের দিকে কেউ -­ চোখ তুলে তাকাল না।

 

কী রে পলাশ! তোর মুখখানা অমন ছাইমাখা লাগছে কেন রে?

পলাশ ফ্ল্যাটের ভেতরে পা রাখতেই ওর দিকে তাকিয়ে মা বিস্ময়ে বলেন।

মাকে এখন ঝকঝকে লাগছে। পরিপাটি, পাটভাঙা ঢাকাইশাড়ি। পিঠে তার ঝুলে আছে দীর্ঘ কালো চুল। পাশে লালপাড়। কপালে টিপ।

তাই! পলাশের কণ্ঠস্বরে ঝড়ো বিস্ময় ঝরে। জানি না তো, মা!

খুব বুঝি ভাবনায় পড়েছিস কোনো?

ভাবনা তো অহরহই ভাবতে হয় মা। তবে খুব ভাবনায় পড়ব কেন?

পলাশ মাকে সত্য বলা এড়িয়ে গেল। উইয়ের শখ বদলানো নিয়ে ওর মনের মধ্যে সন্দেহের যে ওলটপালট হচ্ছে, তা সে বলল না। না, বলতে সাহস করল না। জালাল নামে উইয়ের এক বন্ধু বছরখানেক আগে উইয়ের শখে কিনা কী নজর করেছিল, সেটা সঠিক না বেঠিক না জেনেই তো পলাশ একা একা উতলা। সেই সন্দেহের পোকাটা মায়ের মনে ঢুকিয়ে দেওয়াটা হবে ছেলেমি, দায়িত্বহীন কাজ। মা ওদের জন্য কী-ই না করছেন, কতই না করছেন। নিজের সাধ-আহ্লাদ বলে কিছুই কি তাঁর আছে? বাপহারা চারটি সন্তানের আশ্রয়-আহার পরিধান, স্বাস্থ্যশিক্ষার রসদ জোগাড় করতেই তো জীবনপাত করে চলেছেন। সর্বাবয়বের অকাল বৈধব্যের শোক লুকিয়ে রেখে অমিয় মুখে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। ঘর থাকতেও ঘর করতে পারছেন না, স্ত্রীর সুখ চেনেন না। বন্ধুবান্ধব চেনেন না, মুখে পান চিবিয়ে তাদের সঙ্গে আড্ডা-আনন্দ চেনেন না, পার্টি চেনেন না। শুধু ছেলেমেয়ে আর ছেলেমেয়ে! আর তাদের জন্যই তার সব ধ্যান আর সাধনা। এমন মায়ের মনে পলাশ কীভাবে সন্দেহের একটা পোকা সংক্রমিত করতে পারে?

বেশ তো! চিরহাসি মুখে মা বলেন। আয়!

আসছি, মা। বাথরুম থেকে হাত-মুখটা ধুয়ে আসি। বাইরের বাতাসে মনে হয় বেশ ধুলো-ময়লা। বলে আগে মিথ্যে বলার অপরাধবোধটা আপনমনে ঢাকার চেষ্টা করে।

সাবান মেখে ধুয়ে, তোয়ালেতে হাত-মুখ মুছে, ঝরঝরে হয়ে বাথরুম থেকে বের হয়ে আসতেই, পলাশের নাকে একটা সুগন্ধ সুরুৎ করে ঢুকে গেল। এ-গন্ধ খুব চেনা ওর। রজনিগন্ধার সুবাস। আজ নিশ্চয়ই বাসায় কয়েক গুচ্ছ রজনিগন্ধা রাখা হয়েছে। আজ বাবার জন্মদিন। বাবার মৃত্যুদিন কখনো পালন করা হয় না। বাবা নেই, এ-কথাটা মা কখনো বলেন না, কেউ তাঁর সামনে বলুক তা-ও তিনি চান না। না চাইলে কী হবে, লোকে তো বলেই। তাই যারা বলে, মা তাদের এড়িয়ে চলেন। মা কখনো সাদা শাড়ি পরেননি। আগে যেমন রঙিন পরতেন তেমনই পরেন। মায়ের হাতে বিয়ের আংটিটি এখনো অটুট। বাবার জন্মদিনে মা রজনিগন্ধা দিয়ে বাসার হাওয়া বদলে দেন। এদিন মা পারতপক্ষে বাসায় থাকেন। সচরাচর নিজের শোবার ঘরে। একসময় দেয়ালে টানানো বাবার ছবির ফ্রেমটা নাবিয়ে ফেলেন। ওটা মোছেন। তারপর আবার টানিয়ে রাখেন। বাবার বইগুলো, বইয়ের ছোট আলমারিটা মোছেন। মা এসব অন্য কাউকে করতে দেন না। বার্ষিক এসব করতে করতে গুনগুন করে গান করেন। তুমি সুন্দর, তাই চেয়ে থাকি প্রিয়, এ কি মোর অপরাধ! মা চান এদিন সবাই বাসায় থাকুক। যে নেই তার অভাবটা যেন কেউ অনুভব করতে না পারে। কোনো বাধ্যবাধকতা নয়, শুধু তাঁর প্রত্যাশা। জরুরি কিছু থাকলে, বাইরে যাও, নইলে বাসাতেই থাকো। কাউকে কিছু করতে হবে না। শুধু প্রত্যেকে বাসায় থাকো। মা নিজে পাট-ভাঙা শাড়ি পরেন। তিনি চান, আর সবাই ভালো জামা-কাপড় পরে থাকবে। কোনো কাজে নয়। কোনো ব্যতিব্যস্ততায় নয়। কেবল আয়াসে কাটাবে। খাবে-দাবে। বই পড়বে। গান শুনবে। গল্পগুজব করবে তবে তর্কে যাবে না। হাসিখুশি থাকবে। তামাশা করবে। দিনটা কাটবে নিপাট। বড়আপা রবীন্দ্রসংগীতে তালিম নেওয়ার পর, বাবার এক জন্মদিনে আপনমনে হারমোনিয়াম বাজিয়ে গান করেছিল। মার মনে ধরেছিল। পরের বছর সেটা যোগ হয়েছিল। এবার তো বড়আপা কুমেরুর কাছাকাছি। সেখানে কী করছে কে জানে! হয়তো নীরবে চোখের পানি মুছছে।

ছোটআপা কি বাসায় নেই? উঁকি দিয়ে দেখল, নিজের ঘরে কম্পিউটারের সামনে বসে আছে। লিখছে। হয়তো কাউকে ই-মেইল করছে। বড়আপাকেও করতে পারে। ছোটআপা বলে, বাংলাদেশে ই-মেইল করতে অনেক সময় লাগে। সকালে ছোটআপা ওর আগে বের হয়ে গিয়েছিল, দেখা হয়নি। মনে হয় বাবার জন্মদিনের কথাটা মনে রেখেছিল। তাই ফিরেও এসেছে। পলাশের এক্কেবারে মনে ছিল না। মা বলে না দিলে হয়তো এ-সময় ফিরত না। টিএসসিতে ব্রতার সঙ্গে থাকত। পলাশের মনটা যে কী! বাসার সবাই জানে। মা বেশি জানেন। তাই হয়তো বেখেয়াল সন্তানের ওপর তাঁর বাড়তি নজর। উইও নিশ্চয়ই বাসায় আছে। ওর ঘরে যায় পলাশ। ঘরটা ওরও। দুভাইয়ের। একটা ঘর যেমন বড়আপা আর ছোটআপার। ঘরে ঢুকে দেখে উই নেই। বসবার ঘরে গিয়ে দেখে সেখানে শুধু বিবি-দাদি কোরান শরিফ পড়ছেন। উই ওখানে নেই। তবে কি মায়ের ঘরে আছে! কিন্তু এদিন তো কেউ মায়ের ঘরে যায় না! নিজের ঘরে মা একা থাকেন।

তবে? কোথায় উই!

 

পাঁচ

উই সকালে কলেজের ফটকে ঢুকছিল। তখন কাছেই ছিল একটা অপেক্ষমাণ সিএনজি, সাবেক বেবিট্যাক্সি। এর ভেতর থেকেই কে একজন চাপা গলায় জোরে ডাক দিলো, পরাগ! ওই পরাগ! এদিকে!

লোকটার দিকে একবার তাকাল; তারপর তার দিকেই ছুটে গেল উই।

উঠে পড়! উঠে পড়! উত্তেজিত চাপা আহ্বান।

আর কোনো কথা নেই। উই টুপ করে নিজেই উঠে গেল বাহনটিতে। তারপর ভোঁ ভোঁ করে উত্তরদিকে ছুটতে লাগল, বাহনটি যেন রাস্তার অন্য সব সিএনজি, কার ও বাসের ওপর দিয়ে উড়ে চলে যাবে। ভোঁ ভোঁ!

 

ছয়

ছোটআপা, জানো কি উই কোথায়?

এখনো ফেরেনি?

দেখছি না তো!

সকালে আমার সঙ্গে দেখা হয়নি।

আমিও তোমার পরেই বের হয়ে যাই। তখন তো ও শুয়েই ছিল।

হয়তো কলেজেই আছে। ওই যে মা! মা জানতে পারে।

মা! উই কোথায়?

মা হাসেন। বলেন, আমি কি আর এখন তোদের সবার সব খবর রাখি? স্কুলে পড়ার সময় পরাগ বলে যেত। কলেজে যাওয়ার পর আর বলেকয়ে যায় না। তোরা তো জানিস, আমিও জিজ্ঞেস করি না। কারণ ও তো এখন সাবালক হয়েছে। নিজের দায়দায়িত্ব নিজেই নেবে। দরকার মনে করলে, আমাকে না হোক, চাচিকে বলে যাবে।

বিবি-দাদি হাজির হয়ে বলেন, কী হলো? পরাগবাবুর খোঁজ পড়েছে নাকি?

না, এই দেখো না, ছোটভাইয়ের জন্য আমার ভুলোমন ছেলের দারুণ উদ্বেগ হচ্ছে।

না, তা নয় মা। পলাশ বিব্রত হয়। বলে, আজ বাবার জন্মদিনে ও এখনো বাসায় নেই, তাই জানতে চাইছি।

বিবি-দাদি হাসতে হাসতে বলেন, ওর তো অনেক বন্ধু! ওদের কোনো একটা মেলাতেই হয়তো আটকে পড়েছে।

উইয়ের অনেক বন্ধু! আপনমনে ভ্রƒ কুঁচকে ওঠে পলাশের।

অন্যরা কিছু ভাবতে পারার আগেই বাসার ফোন বাজল। নিচের রিসিপশন থেকে। হাত বাড়িয়ে ধরল প্রিয়তা, হ্যালো! কে বললেন? ও! হ্যাঁ, হ্যাঁ পাঠিয়ে দেন।

কে! মা বলেন, কে এলো রে, প্রিয়তা?

ঝন্টুমামা! প্রিয়তা কিছুটা অবাক হয়ে তাকায় মায়ের দিকে, মামার আসার কথা ছিল নাকি, মা?

না তো! তবে মায়ের মুখ আনন্দে উজ্জ্বল। সংসার সমরাঙ্গনে সবাই বিচ্ছিন্ন হয়ে আছে। ভাইয়ের সঙ্গে সহসা তাঁর দেখা হয় না। খুব ব্যস্ত মানুষ ভাই। হয়তো কাছে-ধারে কোথাও কাজ পড়েছে। তাই এক ফাঁকে বোনকে দেখতে এসেছেন। ভাবি-বাচ্চা সঙ্গে         থাকলে তো আগে থেকেই জানাতেন।

পলাশ দরজার দিকে যেতে যেতে বলে, যাই, আমি মামাকে এগিয়ে নিয়ে আসি।

 

পলাশের পেছন পেছন ঢুকলেন ঝন্টুমামা। ছফুটের বেশি, বেশ লম্বা মানুষ, ছিপছিপেও। ঘোড়ার মতো মুখ। মাথাভরা কোঁকড়ানো কালো চুল। পরনে হালকা খাকি রঙের সফরি-স্যুট। বুক-পকেটে এক জোড়া কালো চশমা। ঢুকেই তিনি বললেন, মঞ্জু! তোদের

বাথরুমটা যেন কোন দিকে?

ওই দরজাটা। মঞ্জু হাত দিয়ে ইশারা করেন এবং নিজেই দরজাটা আলগা করে উঁকি মেরে ভেতরটা যাচাই করে বলেন, যাও। পানি, বদনা, সাবান, তোয়ালে সব তৈরি আছে।

ঝন্টুমামা সোজা ঢুকে গেলেন বাথরুমে। মায়ের পাশে প্রিয়তা আর পলাশ প্রতীক্ষা করে। বিবি-দাদি রান্নাঘরে।

তারা কেউ কেউ হয়তোবা ভাবে, এ নগরীর পথেঘাটে সরকারি পায়খানা নেই; প্রকৃতির ডাক পড়লে কতজনার কী না বিপদ হয়; পুরুষের তো বটেই বিশেষ করে মেয়েদের। পুরনো ঢাকায় নর্দমাই অকুস্থল হয়। তবে তারা খবর রাখে না যে, আড়াই হাজার বছর আগেকার মহেঞ্জোদারো শহরে সরকারি পায়খানা ছিল।

বাথরুম থেকে বের হয়ে এসে, মামা প্রথমেই চট করে হাতের ঘড়ি দেখলেন। স্নিগ্ধ চোখে প্রিয়তাকে বললেন, কী রে হুইজ কিড! তুইও নাকি নিশিতার মতো বিদেশ যাবি?

কম্পিউটার-পাগল প্রিয়তা কেন যেন বিব্রত হয়, ‘মামা!’ বলে তাঁকে জড়িয়ে ধরে। মামা তার মাথায় সস্নেহে হাত বুলান। বলেন, লজ্জা পাস নে। বুঝলি, সত্যি জ্ঞান অর্জনে বাহাদুরি আছে। মেয়েদের জন্য আরো বেশি। সবিনয়ে গর্ব করবি। জানিস তো তোর মা আমাদের পরিবারের প্রথম মেয়ে, যে বিএ অনার্স নিয়ে পাশ করেছে!

মঞ্জুও যেন বিব্রত হন। বলেন, ভাই, এসো বসবে।

মামা যেন টের পান। মুচকি হেসে, প্রিয়তাকে বগলদাবা করে মঞ্জুর পেছনে পেছনে যান। বসার ঘরে গিয়ে, মঞ্জু বলেন, কী মনে করে না জানিয়ে এদিকে? কোনো কাজ ছিল বুঝি?

মামা জবাব দেবেন কিনা হয়তো ভাবছিলেন। এই ফাঁকে রেকাবিতে চা আর পাপড় ভাজা নিয়ে হাজির হলেন চাচি। তাঁকে দেখে ঝন্টু বলেন, কেমন আছেন, চাচি।

আল্লাহ যেমন রেখেছেন। ভালোই আছি, বাবা। চাচি বলেন, নাও, তুমি তো চাউলের আটার পাপড় খুব পছন্দ করো। দেখো, মচমচে হয়েছে কিনা।

একটা পাপড় মুখে পুরে নিয়ে মচমচ করে খেতে শুরু করলেন ঝন্টু। চাচির দিকে তাকিয়ে হাসলেন। তারপর চায়ের পেয়ালায় চুমুক দিলেন। দ্বিতীয়বার ঘড়িতে সময় দেখলেন। ৪টা ৪৩ মিনিট।

মঞ্জু বলেন, যাওয়ার তাড়া আছে বুঝি, ভাই?

মামা বলেন, আমার যা চাকরি, তাতে সবসময় খাড়া থাকতে হয়। ১০টা-৫টার অফিস তো নয়। হাঁক পড়লেই কাজ।

ঝন্টু সরকারের বড় গোয়েন্দা। বেশ ওপরের তলার লোক। চোখে পড়ার মতো একটা দৈহিক উপস্থিতি থাকলেও, তিনি চাতুর্যের সঙ্গে অলক্ষণীয় হয়ে চলাফেরা করেন। তাই আপনজনদের মেলাতেও তিনি অধরা থাকার কৌশল জানেন। অনেকেই জানে না তিনি আসলে কী চাকরি করেন। তবে মঞ্জু তো জানেন। তিনি মুচকি হাসলেন।

তখনি ঝন্টুর পকেটের মোবাইল ফোন বেজে উঠল। ফোনটা পকেট থেকে বের করতে করতে সোফা থেকে উঠে, তিনি লম্বা কদমে চলে গেলেন বাথরুমের দরজা তক। সেখানে গিয়ে, বললেন, হ্যালো! এরপর তার স্বর এমন অস্ফুট হলো যে, বসার ঘর থেকে তা স্পষ্ট শোনা গেল না।

মিনিটদুয়েক পরে, ঝন্টু বসার ঘরে ফিরে এলেন। ঝড়ের মতো। তখন তিনি আর ভাই নেই, মামা নেই, -­ বোন-ভাগ্নি-ভাগ্নে সব তাঁর কাছে অচেনা; -­ তিনি নিরেট সরকারি একজন বড় গোয়েন্দা। তাঁর বড় বড় চোখ দুটো সন্দেহে কুঁচকে উঠেছে। সেই চোখে তিনি তাকাচ্ছেন। তার ঘোড়া-মুখ নির্মম। তার গলার স্বর খড়খড়ে। এই চরিত্রটির সঙ্গে এ-বাড়ির কারো পরিচয় নেই। সবাই আঁতকে উঠল। কে এই আগন্তুক!

পরাগ, পরাগ কোথায়! তিনি গর্জে উঠলেন। তবে সে-গর্জনটা কেমন খকখকে।

ঘরটায় যেন বাজ পড়েছে। সবাই বোবা, নিথর হয়ে গেছে। কেবল পলাশের ভেতরে ভূকম্পন হচ্ছে।

মঞ্জু! তোর পরাগ কোথায়?… এই পলাশ, তোরা নাকি ওকে উই ডাকিস? কী করে এই নাম দিলি? ও তো সত্যিকার একটা উইপোকা। যে-পোকা ওপর থেকে দেখা যায় না। বাইরে থেকে দেখা যায় না। তলে তলে আর ভেতরে ভেতরে কেটে কেটে খেয়ে খেয়ে ক্ষয় ধরায়।…

তার পর হন্যে হয়ে তিনি ফ্ল্যাটের প্রতিটি ঘর, আনাচ-কানাচ তন্নতন্ন করে খুঁজে বেড়ালেন। ফিরে এসে বিড়বিড় করে হতাশ স্বরে বললেন, না, এখানে নেই।

ভাই! ভাই! এতক্ষণে মঞ্জু সম্বিত ফিরে পেয়েছেন, তার সাধের সংসারে সর্বনাশা কিছু ঘটে গেছে আঁচ করতে পারছেন। না হলে তার আপন ভাই এমন করবেন কেন, তিনি দুহাত তুলে, ভাইয়ের দিকে ছুটে যান। আকুল কণ্ঠে বলেন, ভাই, কী হয়েছে তা তো বলবে একবার? পরাগকে যে খুঁজছো, হতভাগাটা কী করেছে?

ঝন্টু এমনভাবে তাকান যেন মঞ্জু পুড়ে খাক হয়ে যাবেন।

যা-ই করে থাকুক, ও তো তোমারই ভাগ্নে, আমার পেটের সন্তান।

গোয়েন্দা অফিসার যেন খামোশ হলেন।

বসো মামা, বসো। প্রিয়তা এগিয়ে গিয়ে হাত ধরে তাঁকে টেনে নিয়ে সোফায় বসাল। বলল, তুমি তো জানো না মামা। তুমি আসার আগে, আমরাই উই মানে পরাগকে খুঁজছিলাম। সত্যি বলতে, পলাশ জানতে চাইছিল, পরাগ এখনো বাসায় ফেরেনি কেন। বাবার জন্মদিন আজ। এদিন আমরা পারতপক্ষে বাসায় থাকি। বাইরে গেলেও দিনে দিনে ফিরে আসি। মায়ের সঙ্গে থাকি।

আরেকটা কারণ ছিল, মামা। ক্ষীণভাবে গলা খাঁকারি দিয়ে বলে পলাশ। বেশ কিছুদিন আগে, জালাল নামে একটি ছেলে, পরাগের বয়সী ও বন্ধু, এপাড়ায় থাকত। নিউমার্কেটে হঠাৎ আমার সঙ্গে দেখা হয়েছিল। ও বলেছিল, আরো বছরখানেক আগে পরাগের শখ বদলে যাচ্ছিল। কী সব শখ বলার আগেই কেমন রহস্যময় হাসি দিয়ে জালাল চলে গিয়েছিল। এরপর থেকে পরাগ বাসার বাইরে কী করে, এ-নিয়ে আমি মাঝেমধ্যে নানা আজগুবি কথা ভাবছিলাম।

যেমন?

যেমন -­ ও ধূমপান করে কিনা, ড্রাগ ধরেছে কিনা, প্রেমে পড়েছে কিনা…

থাম! থাম! ধমক দিয়ে মা বলেন, এসব কথা তুই আমাদের আগে বলিসনি কেন, পলাশ?

কী করে বলি তোমায়, মা? আমি তো ভেবেছি জালালের উটকো কথা নিয়ে এগুলো আমার মনের খামখেয়ালিপনা। কোনো প্রমাণ তো নেই।

ব্যস হয়েছে। মামা বললেন, বুঝলি উইটা এই বাসায় তোদের কোলে কোলে থেকেও তোদের সবার চোখে ধুলো দিয়ে এসেছে।

কেমন! বলে প্রিয়তা। কেমন ধুলো মামা!

আয় তোরা! আমি তোদের দেখাই।

সবাই ঝন্টুর পেছন পেছন উপস্থিত হলো পলাশ-পরাগের ঘরে। ঘরটা বেশ অগোছাল। ছেলেদের এ-ঘরে মেয়েদের প্রবেশ নিষেধ, এমনকি বিবি-দাদিও অবাঞ্ছিত। এ-ঘর কবে সাফসুতরো হয় কেউ বলতে পারে না। পলাশ মাঝেমধ্যে নিজের পাশটা গুছিয়ে রাখার চেষ্টা করে।

মামা বললেন, দেখ তোরা, এসব কী! আমি পরাগের বিছানার তলা থেকে একটু আগে এগুলো বের করলাম। কিছু ধর্মীয় বইপত্র! কিছু ধর্মীয় ইশতেহার। বাংলা, ইংরেজি আর উর্দু-আরবি হরফে লেখা আর ছাপানো।

চাচি বলেন, এ তো ভালো কথা বাবা। পরাগবাবু আল্লাহর পথ ধরেছে। একদিন আমায় বলেছিল, বিবি-দাদি, তুমি তো

নামাজ-রোজা করো। তুমিই বলো, আল্লাহর কাজ করলে, বেহেশতে যাওয়া যায়, তাই না?

ঝন্টু মামা বিকটভাবে হেসে উঠলেন। বিছানার ওপর ছড়ানো কাগজের স্তূপে হাত গলিয়ে, একটা পুস্তিকার মতো বের করলেন। ওটা দেখিয়ে বললেন, কিন্তু এটা কী তা জানেন, চাচি? এটা হলো, সন্ত্রাসী কর্মের নির্দেশনামা!  কী করে গুলি চালাতে হয়, কীভাবে বোমা মারতে হয়, তার ফিরিস্তি। মানুষ মারার ফতোয়া।

ভাই! আমার বুক হিম হয়ে গেছে, ভাই। কিন্তু… কিন্তু এর বেশি তো কিছু নয় নিশ্চয়ই?

চল, বসে বলি।

সবাই বের হয়ে গেলে, মামা নিজে ঘরের দরজাটা আটকে দিলেন। যেন বিনা অনুমতিতে এ-ঘরে আর কেউ প্রবেশ করতে না পারে।

সবাই এখন বসার ঘরে।

মামা! প্রিয়তা কাঁদো-কাঁদো স্বরে বলল, তুমি কি ভয়ংকর কিছু বলবে? তবে আমি নিজের ঘরে যাই। ওসব আমি সইতে পারব না।

থমথমে মুখে মামা বললেন, যেতে চাস যা।

প্রিয়তার পেছন পেছন, ঘর থেকে বের হয়ে, নির্বাক পলাশ আশ্রয় নিল গিয়ে মায়ের ঘরে।

 

সাত

সাভারে প্রবেশ করেই, সিএনজিটা ইতিউতি তাকায়। হয়তো কোনো একটা গলি খোঁজে। এদিক-ওদিক করে একটা সরু গলির মধ্যে ঢুকে পড়ে। একটা মামুলি ঘর, ওপরে টিনের ছাদ। সামনে ধর্মশিক্ষার একটি নামফলক। এর সমুখেই থমকে পড়ে বাহনটি। ঘ্যাঁচ করে।

উইকে প্রায় পাঁজাকোল করে সঙ্গী-আরোহী গিয়ে টোকা দিলো ঘরটির ফটকে; ফটক থেকে একটা মুখ উঁকি দিলো। সঙ্গে সঙ্গে উইকে নিয়ে সঙ্গী-আরোহী ঢুকে গেল এই আশ্রয়ে। সিএনজি পলকে উধাও। সুনসান অপরাহ্ণ। কিছু বৃষ্টি।

আট

মঞ্জু, তুই আমার বোন। তোকে লেকচার দেওয়ার রুচি আমার নেই। আবার আমি জানি তুইও ইতিহাসটা জানিস। এর মধ্যেই তো আমরা বেড়ে উঠেছি। আমাদের বাপ-চাচাদের বুঝিয়েছিল মুসলমানের একটা দেশ হবে। কিন্তু সেখানেই শাসকরা আমাদের বাপ-চাচাদের বলল, ব্যাটারা বাংলা বলিস, না? হিন্দু কোথাকার! তোরা আধেক মুসলমান, বুঝলি। উর্দু শিখে মুসলমান হ।…

বুঝেছি, তারপর বলো।

ছয় দফা। গণঅভ্যুত্থান। ভোটের নামে ষড়যন্ত্র। গোলটেবিলের ছদ্মবেশে অস্ত্র-সৈন্য আমদানি। ইসলামের নামে গণগত্যা। গণধর্ষণ। বাঙালি নিধনযজ্ঞ।…

তারপর মুক্তিযুদ্ধ।

ঠিক। ওদের আমরা হারিয়ে দিলাম। কিন্তু কথায় বলে না, আগুন আর শত্রুর শেষ রাখতে নেই, সেটাই হলো। আমরা রাখিনি। ঘরের শত্রু বিভীষণ। ওরাই ডিম পাড়ল। তলে তলে। বেশুমার। উইয়ের ডিম।

পরাগ! আমার যে পেটের সন্তান!

উইও কারো না কারো পেট থেকে বের হয়।

তাই বলে কি মাকে খায়? বাবাকে খায়?

খায়। খায়। নজর না রাখলে খায়।

পরাগ? ও যে আমার পেটের সন্তান!

ওই যে কদিন আগে বোমা পড়ল, মনে পড়ে, একটা ভুয়া মাজারের কাছে, প্রাণ গেল, রক্ত ছেয়ে গেল জনসভা?

মনে আছে। হ্যাঁ, মনে আছে। কিন্তু পরাগ? ও কী করেছিল?

ওইসব বোমা যারা বুকের জামার মধ্যে লুকিয়ে পৌঁছে দিয়েছিল, সেই উইদের একজন ছিল তোর ছেলে, মঞ্জু।

কী করে বিশ্বাস করি?

দেশ-বিদেশ থেকে যেসব উই বোমার টাকা দেয়, যেসব উই  বোমার রসদ জোগায়, যেসব উই বোমা তৈরি করে, যেসব উই বোমা পৌঁছে দেয়, যেসব উই বোমা ছুড়ে মারে তাদের নাড়ি-নক্ষত্র আমরা পেয়েছি। দুদিন আগে পরাগের টিকি ধরা পড়ে। আজ ওকে ধরার ফাঁদ ফেলা হয়। ওই ফাঁদে পা দেয় ওর ওস্তাদজিরা। একজন ওস্তাদজি আজ সকালে কলেজগেট থেকে পরাগকে উঠিয়ে একটা সিএনজিতে চড়িয়ে নিয়ে যায় সাভারের এক আশ্রয়ে।

বলো কি! কী করে জানলে?

জানব না, বোকা কোথাকার! সিএনজির চালক তো আমাদেরই লোক।

দুই ভাই আর বোনের মশগুল কথার মাঝে কেউ খেয়াল করেননি কখন প্রিয়তা আর পলাশ এ-ঘরে ফিরে এসেছে।

মঞ্জু বলেন, এখন কী করবে তোমরা, ভাই?

ফাঁদে আটক বগার যা হয়। ধরব। চালান দেব।

না! ভাই, না! মঞ্জুর গলার স্বর সহসা রুক্ষ ও শানিত হয়ে ওঠে। অনেকটা ভাইয়ের মতো। আমি তোমাদের চালান-টালান বুঝি না।

তবে?

উইকে মানুষ যেমন মারে, মঞ্জুর স্বর আরো তীক্ষè আরো সুতীব্র, তেমনি পিষে মেরে ফেলো! পায়ের নিচে ফেলে দলে দলে।

বলে উঠে দাঁড়ান মঞ্জু।

মা! মা! বলে আর্তচিৎকার করে ছুটে এসে মঞ্জুকে জাপটে ধরে প্রিয়তা।

অশ্রুসজল পলাশ বলে, অমন কথা তুমি বলতে পারলে, মা!

আমার পেটের উই, আমি যা বলি তা করি, তাতে তোদের কী বলার আছে রে?

বিবি-দাদি কোরআন শরিফ পড়েন; তাঁর স্বর বিলাপের মতো সারা বাসা ঘুরে বেড়ায়।

সোশ্যাল মিডিয়া

নিউসলেটার

নতুন কলম

শতবর্ষী

আহমাদ ইশতিয়াক শতবর্ষী গগন শিরিষ গাছের তলে রোদ ঢাকা ছাতির নিচে উবু দৃষ্টিতে নিথর পাথরের মতো চলন্ত দুটো হাত...