উজানি মাছেদের বউজীবন

লেখক:

পাপড়ি রহমান

বাদলার মরশুম এলেই ঘোড়াউত্রার জলে যেন কী এক রহস্য খেলে যায়! এমনিতেই বছর-কাবারি তার ভাব-সাবের তেমন অদল-বদল নাই। আর দশটা নদ-নদী যেভাবে চলে-ফিরে, ঘাড় ঘুরিয়ে, কোমর বাঁকিয়ে অন্যপথে ধায় – ঘোড়াউত্রাও তেমনি চলে। সারা বৎসর তার তেমন চেত-বেধ নাই, শুধু বাদলার মরশুম এলেই ভিন্ন কথা। তখন আষাঢ়ে-জলধর আসমানে সামান্য উড়লো কী, তার ছায়া গাঙের জলে পড়লো কী – ঘোড়াউত্রায় তখন শুরু হয়ে যায় নানান কিসিম। ঘোড়াউত্রার এই রকম-সকম দেখে তারাকান্দার মানুষগুলান কেমন এক ভুলভুলাইয়াতে পড়ে। তারা তখন আসমানের এন্তার মেঘ দেখবে না – ঘোড়াউত্রার জল দেখবে, ঘোড়াউত্রার জল দেখবে না আসমানের এন্তার মেঘ দেখবে – এই দোটানায় দুলতে দুলতে মতিবিভ্রমে পড়ে। তখন তাদের অস্থিরমতির ভেতরে পূর্বের কাহিনি মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে এবং তাদের দিব্যি মনে পড়ে যায় রাহেলা বেগমের কথা। রাহেলা বেগমের দুই ছাওয়াল করমালি-রহমালির কথাও তাদের মনে পড়ে। তারাকান্দার মানুষগুলার স্মৃতির বাক্সের ঢাকনা খুলে বেরিয়ে পড়ে বিস্মৃত যত কাহিনি।

আগুনে পুড়ে যাওয়া রাহেলার কয়লা-কয়লা দেহটির কথাও তখন তাদের মনে পড়ে। এমনকি জ্বলন্ত রাহেলার ঘোড়াউত্রার জলে ঝাঁপ দিয়ে পড়ার দৃশ্যটিও তারা স্থির দেখতে পায়। পলকেই চক্ষের পর্দায় বিস্তর দৃশ্যের তালগোলে তাদের মনমরা হয়ে পড়া ছাড়া আর কোনো গত্যন্তর থাকে না। তাবৎ বিষণ্ণতার ভেতর তারা রাহেলা এবং তার ছাওয়াল দুইটাকেই কেবল দেখতে থাকে।

এত দৃশ্যরাজির সঙ্গে ঘোড়াউত্রাও একেবারে কলকল করে মিলিত হয়। অবশ্য ঘোড়াউত্রা তখন আর টানের মরশুমের ঘোড়াউত্রা থাকে না। তার উদরের ভেতর জল খলবলিয়ে গহীন হতে থাকে। আর সেই জলে বড় বড় ঢেউ ওঠে। ঢেউ ওঠে পরমুহূর্তেই তা ভেঙে পড়ে। ফের ঢেউ ওঠে। ফের ভাঙে। ঢেউয়ের ক্রমাগত ওঠা-নামায় জলের ওপর শুভ্র ফেনার স্তূপ জমে। ঢেউয়ের মাথায় মাথায় তখন শুভ্র ফেনার রাশি। যেন সমুদ্দুর হঠাৎ করে ঢুকে পড়েছে ঘোড়াউত্রার পেটে। আর তপ্ত বালুতে অজস্র খই ভেজে ভাসিয়ে দিয়েছে জলের ওপর। এই খই-ভাসা-ঢেউ রোয়াব দেখিয়ে প্রচন্ড বেগে ফুলে ওঠে। বেড়ে যায় ঘোড়াউত্রার জলের গভীরতা। দ্রুত বদলাতে থাকে নদীর রং-সুরত। রোষে রোষে সে যেন সব তলিয়ে দিতে চায়! জলের এই রকম উন্মত্ততায় তারাকান্দার মানুষগুলো ফের নতুন করে বিভ্রমে ঢুকে পড়ে। এবং তাদের এই বিভ্রমের সুযোগে সত্যি-সত্যিই বাদলার মরশুম এসে পড়ে। তারাকান্দার মানুষগুলা সত্যি-সত্যিই কূল নাই-কিনার নাই অবস্থার ভেতর পতিত হয়। কিন্তু গাঙের কি এইসবে ভ্রূক্ষেপ থাকে নাকি? সে তখন আপন খেলায় মত্ত। প্রচন্ড রাগে উন্মত্ত। দেহের ভেতর ক্রোধের বিষভান্ড জমিয়ে গোখরা সাপের মতো ফণা তোলে সে। অতঃপর ধেয়ে আসে তীরে। মাটিতে বিষ ঢেলে মুহূর্তে ছুটে যায় মধ্যনদীতে। ফের সে-দেহে বিষ সঞ্চয় করে এবং ছুটে আসে পাড়ে। জলের তীক্ষ্ণ ছোবলে বিষময় হতে হতে একসময় মাটিতে ধস নামে। বড় বড় চাঙর ভেঙে মিশে যায় জলস্রোতে।

এক্ষণে তারাকান্দার মানুষগুলো যেন হুঁশে ফেরে। নিজেদের ভিটে-মাটি বাঁচানোর দুশ্চিন্তায় কাতর হয়ে পড়ে। তারা তো জানে ঘোড়াউত্রার থাবা তো আর যেই-সেই থাবা নয়, দানোর মতো বিশাল সেই থাবা। এক-একটা থাবায় পাড়ের মাটি ভেঙেচুরে গুলিয়ে যায় জলের সঙ্গে। তখন গাঙের জল হয়ে ওঠে দধির মতো ঘন ও ঘোলাটে। কাদাগোলানো জল দেখে কে বলবে বাদল নামার পূর্বে এই জলই ছিল স্বচ্ছ-টলটলে। একেবারে ডালিমের দানার মতো। তখন তুমি যদি সামান্য ঝুঁকে পড়ো ঘোড়াউত্রার বুকে, তোমার বদলখানি দিব্যি ফুটে উঠবে ওই জলের আয়নায়। অথচ দেখ, বাদল নামলো কি জল একেবারে ভোল পাল্টে দধিবর্ণ হয়ে উঠলো। তখন তুমি শতবার ঝুঁকে পড়লেই কী? তোমার সুরত তখন আবছা। ঘোড়াউত্রার নিজের চেহারাও তখন আবছা। আবছা নয়তো কী? কূল নাই কিনার নাই অবস্থার ভেতর তুমি কিইবা ঠাহর করতে পারবে? নিজের সুরত নাকি ঘোড়াউত্রার সুরত?

আদতে এই মরার আষাঢ় না শ্রাবণে নদীর জোয়ানকি যত স্পষ্ট হয়, ততই ভজঘট ঘটে। কারণ এই মরার আষাঢ় না শ্রাবণেই তারাকান্দার জোয়ান-মরদেরা নাও ভাসিয়ে চলে যায় দূর-দূরান্তে। নিজ গেরামের কইন্যাদের চেহারা-ছবি তাদের কাছে পানসে হয়ে ওঠে। তারা তখন চায় দীঘল চুলের কইন্যা। চায় বাঁশির মতো সুচিক্কন নাক-নকশার ঘরণী। চায় রইদ পড়লে কাঞ্চনের তো চিকচিকিয়ে উঠবে যার গতর, সেই রকম বিয়ার পাত্রী। উইল্যা মাসে এইসব হবার নয়। তখন তো পায়ে-হাঁটা পথ। মাটির অমসৃণ দাঁতের ওপর পা ফেলে যাতায়াত করতে করতে তারা ঘেমে নেয়ে ওঠে। অথবা ধুলায় ধুলাকার হয়ে ওঠে তাদের ব্যসন-বসন। ফলে বাইস্যা মাসেই তারা ভরসা পায়। বাইস্যা মাস এলেই তারা ঘটক পাঠায় দূর-দূর-গেরামে। বৈঠা মেরে জলের ঘুঙুর বাজিয়ে তারা রাঙাবউ নিয়ে ঘরে ফেরে। ছইওয়ালা নাওগুলা তখন ঘেরা থাকে শাড়ির পর্দায়। আমাদের মিজানমিয়াও নাওয়ে শাড়ির পর্দার ঘের দিয়েই বউ এনেছিল। আর আলেকান্দার কইন্যা রাহেলা ছিল বেজায় খুব সুরুত। রাহেলার ছিল দীঘল কেশরাজি। সোনালি গাত্রবর্ণ আর বাঁশির মতো সুচিক্কন নাক-নকশা। মিজান মিয়ার সৌষ্ঠবের বউ দেখার জন্য তারাকান্দার মানুষগুলা দল বেঁধে এসেছিল।

আর ওই বছরই পরথম তারা ভুলভুলাইয়ার ভেতর পড়েছিল। ঘোড়াউত্রার মতিগতি তাদের বেদিশা করে দিয়েছিল। ওইবারই প্রথমবারের মতো চিরচেনা গাঙ বিষেঢেউ ভাসিয়ে দিয়েছিল। আর ফণা তুলে আঘাত করেছিল নদীপাড়ের জমিনের ওপর। এতে করে তারাকান্দার বেশ কিছু ঘরবাড়ি নদীগর্ভে নিশ্চিহ্ন হয়ে গিয়েছিল। ওদিকে ঘোড়াউত্রা লেজ আছড়িয়ে সরে পড়েছিল অন্য এক অচেনা পথে। তবে ঘোড়াউত্রার এতসব কারসাজি মিজানমিয়ার সদ্য দাম্পত্যে অাঁচড় কাটতে পারে নাই। ঘোড়াউত্রা বিফল হলেও মিজানমিয়ার মা হালিমা বেগম বিফল হয় নাই। বিফল হয় নাই কইতরি বেগমও। তারা তক্কে তক্কে ছিল রাহেলা বেগমকে ক্ষতিগ্রস্ত করার। রাহেলা বেগমের পিছু লাগা ছাড়া তাদের আর করারও কিছু ছিল না। কইতরি বেগমের স্বামী সেজানমিয়ার বহুদিন কোনো খবরাখবর ছিল না। ঢাকা শহরে কাজের ধান্ধায় গিয়ে সে নিরুদ্দেশ হয়েছিল। কইতরি বেগমও বসে থাকার পাত্রী নয়। সেজানমিয়ার পেছনে লোক লাগিয়ে খবর এনেছিল শহুরে-ছলাকলাজানা এক মাইয়া লোক সেজানমিয়ার চক্ষে ভেলকি লাগিয়েছে। এবং বলা বাহুল্য, সেজানমিয়া কইতরি বেগমকে ভুলে গেছে। কিন্তু কইতরি বেগম তো নিজ স্বামীকে ভুলতে পারে নাই। ফলে সে হয়ে উঠেছিল ভয়াবহ ঈর্ষাপর এক নারী, যা তারাকান্দার মানুষগুলো ভালো চক্ষে দেখে নাই।

কইতরি বেগমের তীব্র ঈর্ষার ভেতর থেকেও মিজান মিয়া আর রাহেলা বেগমের মিলন হলো। আর জন্ম নিল করমালি। কইতরির নিজের ছাওয়াল নাই, অন্যের ছাওয়াল তাকে দুঃখী করবে এটাই স্বাভাবিক। ফলে কইতরি বেগম এইবার দুঃখী হলো। ওদিকে রাহেলা বেগম পুত্রের মুখ দেখে ভাবলো – আর কিইবা লাগে এই দুনিয়াদারিতে?

কিন্তু দুনিয়াদারি করতে গেলে ম্যালা কিছুই লাগে। রাহেলা বেগম তখনো বুঝতে পারে নাই দুনিয়াদারির উদর হইল আ-মাপা। এই আমাপা উদর ভরতে ম্যালা কিছুই লাগে। রাহেলা বেগম এটা বুঝতে পারে যখন দ্বিতীয় ছাওয়াল রহমালি জন্ম নেয়। আর সংসারে বাড়তে থাকে অভাব। মিজান মিয়া রাতদিন পরিশ্রম করে। জমি বর্গা করে, ক্ষেত নিড়িয়ে, মাটি কেটেও সাত পুষ্যির পেট সে ভরাতে পারে না। তখন কী আর করা? বড়ভাই সেজান মিয়ার পথ ধরে মিজান মিয়াও শহরমুখী হয়। আর মোটামুটি মজুরিতে গার্মেন্টসের মজুর বনে যায়।

এদিকে তারাকান্দার রাহেলা বেগমের অস্থির সময় কাটে। মিজান মিয়াকে সে সত্যিই বড় ভালোবাসে। ফলে খুব দ্রুতই হালিমা বেগম, কইতরি বেগম আর আলতাফ মিয়ার চক্ষুশূল হয় সে!

 

দুই

ঘোড়াউত্রার রহস্য বোঝা সত্যি মুশকিল হয়ে পড়ে। বর্ষা-শীতের ধন্দ ঘোড়াউত্রাকে একেবারে আছন্ন করে ফেলে। আষাঢ়ে জল ঝরলো কি তুখাস্রোতে ভাসতে থাকে তারাকান্দার মানুষগুলা। আর মাছেরা সাঁতার কাটতে কাটতে ভেসে ওঠে জলের উপরে। আবার টানের মরশুমেই কিনা মাছেরা লুকিয়ে পড়ে জল-কাদার গভীরে। ঘোড়াউত্রার বালু কিরকিরে পাড়ে তখন তাদের আনাগোনা এক্কেবারে নাই। কমে-যাওয়া থুম-ধরা-জলে বুরবুরি তুলে আর লেজ নাচিয়ে তারা ভালোই কাটিয়ে দেয় শীতাচ্ছন্ন-কাল। তারাকান্দার মিজান মিয়া শহরবাসী হওয়ার পর রাহেলা সংসারের কাজে আরো নিমগ্ন হয়। হাড়ভাঙা খাটুনি খেটে শ্বশুর-শাশুড়ির মন জোগানোর চেষ্টা করে; কিন্তু সে কিছুতেই তাদের তুষ্ট করতে পারে না। তাদের দেওয়া গঞ্জনা থেকে রাহেলা বেগমের যেন কোনো পরিত্রাণ নেই। ফলে সামান্য ক্ষণের জন্য আড়াল খুঁজতে সে এসে বসে ঘোড়াউত্রার পাড়ে। মাঝগাঙের ঢেউ তখন আরো উত্তাল হয়। একলা হয়ে রাহেলা গাঙের কাছে দুঃখের কথা কইবে – এমন উপায় তার নেই। মাকে খুঁজতে খুঁজতে করমালি আর রহমালিও গাঙের পাড়ে উপস্থিত হয়। ততক্ষণে পাড়ে আসা ঢেউগুলা ফিরে গেছে মধ্য নদীতে। ঘোড়াউত্রাকে তখন খুব শান্ত আর করুণ দেখায়! করমালি আর রহমালি ছিপ ফেলে বসে যায় শান্ত জলের ধারে। দুই-চারটা পুঁটি-ইচা-কই তাদের বড়শির আধার গিলে আটকা পড়ে। একটা কই টানে তুলেই ছাওয়ালরা উল্লাসে চিৎকার করে –

‘মা গো, দেখছুনি – মাছ পড়ছে বড়শিতে।’

‘হ, দেখছি।’

‘আইজ তাইলে কইমাছের সালুন রাইন্ধ্যা দিবা।’

‘আইচ্ছা দিমুনে।’

বলেই রাহেলা আনমনা হয়ে যায়। হয়তো মিজান মিয়ার কথা তার মনে পড়ে। মিজান মিয়ার চলে যাওয়ার ক্ষণটি তার চোখে ভাসে। রাহেলার কাছে সোয়ামি হইল বটবিরিক্ষি। তার ছায়া মাথার উপরে থাকলে জগতের কেউ-ই আর উপ্তাকথা কইতে পারে না। মিজান মিয়ার শহরবাসের পর শ্বশুর-শাশুড়ি আর বড়জায়ের দেওয়া লাঞ্ছনা-গঞ্জনায় সে প্রায় পাগলদশায় পৌঁছেছে। ওইসব কটুকথা আর অপমান ভুলতেই রাহেলা ঘনঘন গাঙের পাড়ে আসে। গাঙের জলখেলা তার ভাল লাগে। মন জুড়ায়। ঢেউ আসে আর যায়। যায় আর আসে। ঢেউয়ের আসা-যাওয়া দেখতে দেখতেই রাহেলা আপন মনে গুনগুন করে-

দূরে চাকরিতে প্রাণবন্ধু যাইও না-রে

তুমি গেলা দূর দেশে বন্ধু

আমারে ছাড়িয়া

যাইবার কালে নিষ্ঠুর বন্ধু

না-চাইল রে ফিরিয়া রে…।

 

রাহেলার সুর ছড়িয়ে পড়ে গাঙের জলের ওপর। তখন ঘোড়াউত্রা কিনা হঠাৎ ক্ষেপে ওঠে। ক্ষেপতে ক্ষেপতে জলের স্তম্ভ বানিয়ে ফেলে। একসময় তা ভেঙে পড়লে বিশাল ঢেউ পাড়ে এসে আছড়ে পড়ে। তখন সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসে। সামান্য আলো নিয়ে  রাতের আকাশে জেগে ওঠে দু-চারটা তারা। আর রাহেলা বিষণ্ণ মন নিয়ে বাড়ি ফেরে।

এমনই এক বিষণ্ণ সন্ধ্যা মাথায় নিয়ে বাড়ি ফিরলে রাহেলা ক্লান্ত বোধ করে। তার চোখ জ্বালা করে ঝাঁপিয়ে জ্বর আসে। প্রচন্ড তাপে মাথায় যন্ত্রণা শুরু হয়। প্রকট যন্ত্রণার ভেতর রাহেলা স্বপ্ন দেখে, মিজান মিয়া বাড়ি ফিরে এসেছে। রাহেলার জন্য কিনে এনেছে চওড়া পাড়ের ঢাকাই শাড়ি। করমালি-রহমালির জন্য খেলনাগাড়ি। স্বাদের বিস্কুট।

শাড়ি দেখে হালিমা বেগম ছেলের ওপর রেগে ওঠে!

‘হুদাই ট্যাকা-পয়সা ভাঙছস। শাড়ি আননের কাম কী? হের পিন্ধনের কি শাড়ি নাই?’

মিজান মিয়া নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে থাকে। হালিমা বেগম আরো রেগে ওঠে। তখন অন্ধকার আরো গাঢ় হয়। ঘরে কেউ আলো জ্বালে না।

হালিমা বেগম তখন কুৎসিত ভাষায় গালাগালি শুরু করে –

‘নবাবের বেটি, সুযোগ পাইলেই হুইয়া-বইসা খাইবার চায়। সন্ধ্যা পারায়া গেছে কুন সমুয় বাত্তিডাও হে দিয়ার পারে না?’

হালিমা বেগমের এমত চিলচিৎকারে রাহেলার জ্বরঘোর উবে যায়। সে অন্ধকারেই চোখ মেলে তাকাতে চেষ্টা করে। হালিমা বেগমের সঙ্গে কইতরি বেগমও গলা মেলায়। আলতাফ মিয়াও ব্যাপক হম্বিতম্বি শুরু করে।

করমালি-রহমালিও মায়ের সঙ্গে ঘুমিয়ে পড়েছিল। প্রচন্ড হাউকাউয়ের জন্য তারাও জেগে ওঠে!

হালিমা বেগম ততক্ষণে বড় বোতল ভরে কেরোসিন তেল নিয়ে আসে। হয়তো সে আলো জ্বালানোর চেষ্টা করে। কারণ রাহেলা বেগমের ঘরে অন্ধকার থইথই করে। আর হালিমা বেগম কেরোসিন তেল ঢেলে দেয় রাহেলার শরীরে। হয়তো অন্ধকারের ভুলভুলাইয়ার ভেতর পড়ে হালিমা বেগম এই কাজ করে। দেশলাইয়ের কাঠিতে আগুন জ্বলে উঠলে তা রাহেলা বেগমকে পেঁচিয়ে ধরে। আগুন আর তেল রাহেলার শরীরে তা-থই তা-থই নৃত্য করে। পুড়ে কয়লা হতে হতে রাহেলা চিৎকার দিয়ে কাঁদে; কিন্তু আগুন নেভানোর চেষ্টায় কেউ এগিয়ে আসে না। তখন সে ঘোড়াউত্রার দিকে দৌড়ায়। রাহেলা বেগম দৌড় শুরু করলেই জোর হাওয়া বয়। রাহেলা জ্ঞানশূন্য হয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে ঘোড়াউত্রার জলে। তখন প্রচন্ড ঢেউ এসে তাকে ভাসিয়ে নিয়ে যায়। দূরে ভেসে যায় রাহেলা। বহু দূরে।

হয়তো বা আলেকান্দা হয়ে তার শরীর ভেসে যেতে থাকে। অতঃপর কয়লা-হয়ে-যাওয়া রাহেলার পোড়া দেহ তারাকান্দার মানুষগুলোর চক্ষের আড়াল হয়ে যায়!

 

তিন

ঘোড়াউত্রা নদীতে রাহেলার পোড়া দেহ নিরুদ্দেশ হওয়ার পর তেমন কিছুই আর ঘটে না। শুধু তারাকান্দার মানুষগুলো আহারে-বিহারে করে সারাবছর কাটিয়ে দেয়।

ততদিনে আসমানে ফের আষাঢ়ে-জলধর ঘনায়মান হয়। দুই-এক-ফোঁটা জল ঘোড়াউত্রায় ঝরে পড়ে কি পড়ে না। অথচ গাঙ তখনই ফুঁসে ওঠে। ফুঁসতে ফুঁসতে জলস্তম্ভের আকার পায়। আর পরক্ষণই তা ভেঙে পড়ে। ভেঙে পড়েই ঢেউ হয়ে ছুটে আসে তীরে। তখন মাটির বড়-বড়-চাঙর ভেঙে মিশতে থাকে জলস্রোতে। আর তারাকান্দার মানুষগুলোর অবাক চোখের সম্মুখে ঘোড়াউত্রার জল ফের ঘোলা হতে থাকে। সেই ঘোলা জলের ওপর ভুস করে ভেসে ওঠে এক অতিকায় মাছ! আগুনরাঙা আগুনের মাছ! বিশাল শরীর, কাঁটাওয়ালা দীঘল ল্যাঞ্জা আর উড়োজাহাজের ডানার মতো পাখনা। সে তার অগ্নিরঙা দেহ নিয়ে ঘোড়াউত্রার গভীর জলে ডুব দেয়। ফের ভেসে ওঠে। তখন জলের ওপর আগুনে-হল্কা দেখা দেয়। আগুনমাছ পরক্ষণই জলের তলায় তলিয়ে যায়। হয়তো তখন তার ডাঙার  ঘর-সংসারের কথা মনে পড়ে। বহু দূরে শহরে থাকা সোয়ামির কথা মনে পড়ে। ভাটির পথ তার কাছে অচেনা মনে হয়। বিপদসঙ্কুল মনে হয়। ফলে সেই আগুনেমাছ উপ্তাপথে ছুটতে শুরু করে। এই উপ্তাপথ উজানের পথ। এই পথের হদিস জানা নেই। এই পথ দুর্গম। বন্ধুর। আগুনমাছ এই উপ্তাপথেই ছুটতে শুরু করে। তার কাঁটাওয়ালা ল্যাঞ্জার আঘাতে জলে রুপালি ঝিলিক ওঠে। আগুনমাছের পিছু পিছু গাঙের সমস্ত মাছ ছুটতে শুরু করে। এরা সকলেই বেপথু হয়। ঝাঁক ঝাঁক মাছ উজানমুখী ছুটতে ছুটতে আর কোনো কিছুরই তোয়াক্কা করে না। তারা ছুটে যায় নদীর উৎসমূল অভিমুখে। পাহাড়ের বুক চিরে যেখানে জন্ম হয়েছে নদীর, সেখানে পৌঁছে খুশিতে উল্লাস করে ওঠে অগ্নিরঙা আগুনমাছ। তারপর ডিম দেয়। আর মরে যায়। সেই ডিম থেকে জন্ম নেওয়া মাছগুলো ফের স্রোতের টানে ভেসে ভেসে ভাটিতে আসে। এই ভাটিতে বাস করে তারাকান্দার মানুষগুলা, যারা বাদলার মরশুম এলেই আগুনমাছের ছুটে যাওয়া দেখে। দেখে মূক-বধির হয়ে যায়। তবু তারা বৃষ্টি নামলেই ওই আগুনমাছের অপেক্ষা করে। আগুনমাছের আগুন ছড়িয়ে ছুটে যাওয়া দেখতে তারা ভালোবাসে। হয়তো তারা মনে মনে ভাবে – ওই আগুনরঙা মাছ, যার নাম রাহেলা। শাশুড়ির অত্যাচারে জ্বলন্ত দেহ নিয়ে ঝাঁপ দিয়েছিল ঘোড়াউত্রার জলে। অতঃপর নিরুদ্দেশ হয়ে গিয়েছিল।

প্রতিবছরই বানের জল আসা মাত্রই সে জ্বলন্ত শরীর নিয়ে ভেসে ওঠে গাঙে। আর ঘোড়াউত্রার জলকাদায় ভুলভুলাইয়া মিশিয়ে দিয়ে উজানমুখী হয়। আগুনেমাছের পিছু পিছু গাঙের মাছেরা বেপথু হয়। এই বেপথু মাছেরা কখনো তাদের জন্মমাটি খুঁজে পায় কিনা কে জানে?

জলমগ্ন হতে হতে বউজীবনের কথা তাদের মনে পড়ে। হয়তো ওই কথা মনে করেই তারা অগ্নিরাঙা হয়ে ওঠে।

আগুনেমাছদের এসব কিসসা-কাহিনি নিয়ে ঘোড়াউত্রা নিরন্তর বয়ে চলে। তবে ঘোড়াউত্রার গন্তব্য ঠাহর করা যায় না। উজান না ভাটি? ভাটি না উজান? তারাকান্দার মানুষগুলা ঘোড়াউত্রার ভুলভুলাইয়ার ভেতর ক্রমাগত দুলতে থাকে…!

শেয়ার করুন

Leave a Reply