উত্তল আকাশ

লেখক:

Uttal-Akash

ইমরান খান

রাত তেপ্রহরের চায়ের দোকান

আকাশবিহীন মেঘরঙের একটি পর্দা কেঁপে উঠতে দেখে ঘুম ভাঙল, নাকি ঘুম ভেঙে আকাশবিহীন মেঘরঙের একটি পর্দা দুলে উঠতে দেখেছিল, ভাবতে শুরু করার আগেই রশিদ আলি বুঝতে পারল তার ঘুম ভেঙেছে আর ঘুম ভেঙে স্বপ্ন দেখা যায় না বিধায় সে চুপচাপ পড়ে রইল। তার উপলব্ধি হলো, সে এখনো ঘুমিয়ে আছে। ঘুম ভেঙে তার এই অনুভূতি কখনো হয়নি যে, ঘুম ভাঙেনি। হাত-পা অসাড়, নিশ্বাস চলছে অতি ধীরে, যেন মগজ আর নাকের মাঝে দম ধরা পড়েছে। বোবায় ধরেছে কিনা সে বোঝার চেষ্টা করল। পায়ের কাছে শেকলের আওয়াজ হলো। কেউ একজন মাথার কাছে গলা খাঁকারি দিলো, যেন তাকে চেতনায় ফেরাতে চায় বলেই। যেহেতু রশিদ আলি জানে যে, সে চেতনায় আছে, কাজেই সে মাথা ঘুরিয়ে খাঁকারি দেওয়া কণ্ঠের অধিকারীকে দেখতে গেল না। দাদা পাশের ঘর থেকে হয়তো গলা খাঁকারি দিয়ে থাকবে।

তবে রশিদ আলি এটুকু বুঝল, আজ ঘুম ভেঙে তার অন্যরকম লাগছে, এরকম লাগে না কখনো। ঘুম ভাঙায় ঘুম ভাঙায় তফাৎ আছে। পরিবেশ কেমন থম মেরে আছে, কোথাও কিছু নড়ছে না যেন। চারপাশের কিছু একটা বুঝি মরে গেছে – বাতাস হয়তো। শেকলের শব্দটা আবার হলো। আরো একবার খাঁকরে উঠল সেই কণ্ঠ। এবার রশিদ আলি বালিশে লেগে-থাকা মাথাটা ঘুরিয়ে দেখতে গিয়ে মাথা ঘোরানো যাচ্ছে না বুঝে বোবার উপস্থিতি সম্পর্কে মোটামুটি নিশ্চিত হলো। বোঝা যাচ্ছে, পাশে শুয়ে থাকা স্ত্রী এবং সন্তানের উপস্থিতিও টের পাওয়া যাবে না। অপেক্ষা করা ছাড়া পথ নেই, বোবায় ধরলে বোবাই ভরসা।

একসময় রশিদ আলির উপলব্ধি হলো, চারপাশ নয়, মরে গেছে তার শরীর। শরীরের কোনো অস্তিত্ব সে টের পাচ্ছে না। অসাড় অনুভূতিও নয়। অথচ শারীরবৃত্তীয় কর্মকা-ের সাড়া পাচ্ছে। তার নাক ডাকছে। নাক আছে বলে তার মনে হচ্ছে না; কিন্তু নাকের ডাকাডাকি শোনা যাচ্ছে। শব্দটা আসলেই ভয়াবহ, তার স্ত্রীর দীর্ঘদিনের অভিযোগে কোনো বাড়াবাড়ি নেই। এই শব্দে ছেলের চমকে জেগে উঠে কান্নাকাটি শুরু করা অযৌক্তিক নয়। জাগুক, ছেলে জাগলে  ছেলের মাও জাগবে। তখন সে রশিদ আলিকে একটা বিরক্তি-সমৃদ্ধ ধাক্কা মারবে। ধাক্কা খেলে বোবা চলে যাবে। জীবনে প্রথম নিজের নাকডাকা শুনে নিজের প্রতিই বিরক্তি বোধ করল সে; কিন্তু এই বিরক্তি তাকে বিরক্ত করল না। ‘যত গর্জে তত বর্ষে না’ ধরনের মেঘের মতোই সামান্য চকিত করে দিয়ে চলে গেল। শিশু জাগল না। তার ঠান্ডা লেগেছে বলে তাকে টোফেন খাওয়ানো হয়েছে। আর মা না খেলে শিশু খাবে না বলে মাও খেয়েছে এক চামচ। টোফেনে ঘুম-উসকানি উপাদান আছে।

হঠাৎ করেই রশিদ আলিকে বোবা ছেড়ে গেল আর সঙ্গে-সঙ্গে সে নিজের শরীর সম্পর্কে সচেতন হয়ে উঠল। শরীরের উহ্যতায় তাহলে এতক্ষণ সে কী নিয়ে সচেতন ছিল ভাবতেই টের পেল, গ্রীষ্মের গুমোটে তার হাত-পা শীতল হয়ে গেছে অথচ গলার ভাঁজে ঘাম। বোবা ছেড়ে যাওয়া মাত্র শেকলের শব্দটা আবার হলো। বোবা চলে যাওয়ার শব্দ নাকি? প্রচ- চায়ের তৃষ্ণা নিয়ে রশিদ আলি উঠে বসল। বহনযোগ্য দূরালাপনির আলো জ্বালানো মাত্র ঘড়িতে তিনটা উনচল্লিশ বাজল। রাত তেপ্রহরে রশিদ আলির বউয়ের ধাক্কা না খেলে ঘুম ভাঙে না, বোবায় ধরলেও না। এই সময়ে চা খেতে ইচ্ছা করা তাই একটা অদ্ভুত আলামত। বেশি ভাবনাচিন্তা না করে রশিদ আলি উঠে লুঙ্গির গেরোটা আরেকটু কষে নিয়ে জামা গায়ে চড়াল। প্যান্ট পরার কথা অভ্যাসবশত মাথায় এলেও রাতের অর্ধসমাপ্ত প্রহরে প্যান্ট পরে চা খেতে যাওয়ার পেছনে কোনো কারণ দেখল না সে। জামার সঙ্গে-সঙ্গে এক সপ্তাহ আগের সুগন্ধিটা আবারো স্থান করে নিল তার বাহুমূলে। একেই বোধহয় বলে আমেরিকান সুগন্ধি, এক সপ্তাহ পরেও বগলে থেকে যায় – ভাবতেই প্রথমবারের মতো সুগন্ধিটা তার নি¤œাঙ্গে মাখতে ইচ্ছা করল। অনেক হিসাব করে মানিব্যাগ থেকে দুটো দশ টাকার নোট আর একটা দুই টাকার মুদ্রা বুকপকেটে ভরে সে নিঃশব্দে দরজা খুলে বৈঠকখানায় এলো। দাদাকে শবাসনে শুয়ে থাকতে দেখে রশিদ আলির মনে হলো, বুড়োটাকেও বোবায় ধরেছে। এই বোবায় ধরা রোগ দাদার কাছ থেকে পেয়েছে বলেই রশিদ আলি শুনেছে। ধাক্কা দেবে ভেবেও দিলো না সে। দাদার শরীর এমনিতেই অচল, বোবায় ধরা না ধরায় কিছু যায় আসে না। বৈঠকখানা এখন বৃদ্ধাশ্রম, একটি মাত্র বৃদ্ধ সেখানকার রাজা। বয়স একশ দুই – মতান্তরে একশ বারো; সাড়ে এগারো বছর যাবৎ বিছানায় পড়ে আছে, সকল চিকিৎসার ঊর্ধ্বে, কিন্তু মরছে না। গিরায়-গিরায় ব্যথায় রাতভর ঘুমায় না। শরীরের সব কলকব্জা বিকল হয়ে গেছে, শুধু বাতাস যাতায়াত বন্ধ হয়নি। বায়ুম-লের প্রাণদায়ী উপাদান তাকে করুণা করেনি আজো, চোখের জলও শুকায়নি। মানবীয় আবেগ আজো বুড়োকে কাঁদায়, শুধু কী আবেগে কাঁদছে প্রায়ই বোঝা যায় না। বুড়ো এত শক্তিশালী ফুসফুস  পেয়েছে কোথায় ভাবতেই রশিদ আলির ধূমপান করতে ইচ্ছা হলো।

সদর দরজা যথাসম্ভব নিঃশব্দে খুলে সিঁড়িতে এক পা দিয়েই বহনযোগ্য দূরালাপনির আলোয় চোখ পড়ল বেলিগাছটার ওপর। শখের গাছটার দিকে খানিকক্ষণ চেয়ে থেকে রশিদ আলির মনে হলো একটা মরিচগাছ লাগালে বরং ভালো হতো, ধানি মরিচগাছ। এই অসময়ে বিক্রি করে কিছু পয়সা আসত হয়তো। বাজারে মরিচের দাম শুনলে মরিচের ঝাল ম্লান হয়ে যায়। এই ঝালময় সময়টাকে কাজে লাগানো যেত মরিচগাছ থাকলে। মরিচগাছের প্রয়োজন আছে সত্যি, কিন্তু বেলিগাছটার গায়েও একটু হাত না বুলিয়ে রশিদ আলি পারল না। আলো যাতায়াতের ঘুলঘুলি দিয়ে লাগোয়া দালানটা দেখা যায়, আলো আর আসে না। রাতে আসে সিঁড়িঘরের বৈদ্যুতিক বাতির আভাস। সেই আভাসে কুঁড়িধরা বেলিগাছের ডালটায় হাত রাখল রশিদ আলি। এই ডালটা বেশি লম্বা হয়ে ঘুলঘুলির আভাসের দিকে রওনা দিয়েছে। রশিদ আলি কয়েকবার ডালটা ছেঁটে ছোট করার কথা ভেবেছে। যেই ডালটা ছোট করার কথা ভেবেছে, তখনি সেই ডালেই কুঁড়ি ধরে বসে আছে। কুঁড়ির বাহারে শোভিত হয়ে বিচ্ছিরি রকমের লম্বা ডালটা আভাসের দিকে এগোচ্ছে।

বসত ভবনের বাইরে এসেই রশিদ আলি বুঝতে পারল, রাত প্রায় তিনটার দিকে পাড়া-মহল্লার চায়ের দোকান খোলা থাকার কথা নয়। এই সময় চা পেতে হলে কোনো সরকারি হাসপাতালের সামনে যেতে হবে, অথবা বাস টার্মিনালে কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ের হলের সামনে, যার কোনোটাই তার এই ঘিঞ্জি গলির কাছাকাছি নেই। রশিদ আলির চেহারাটা অসহায়ের মতো হয়ে গেল। চায়ের পিপাসায় তার গলা শুকিয়ে আসছে। খানিক দোনামোনা করে সে ডানদিকে হাঁটা আরম্ভ করল। ফরিদভাইয়ের চায়ের টং-দোকানটা ভৌতিক লাগছে। তালা দেওয়া কপাটের সামনে মাটিতে গাঁড়া শূন্য ন্যায়াসনদুটো যেন ভূতের বিছানা। একবার ওখানে বসবে ভেবেও বসল না রশিদ আলি, হাঁটতে লাগল। দু-একটা অলিগলিতে ঢুকেও ঘুরে এলো। রাস্তায় আজ নিশীথপ্রহরীও নেই, আকাশের আমাবস্যা  বোধহয় এ-মহল্লায় নেমে এসেছে আজ। কেড়ে নিয়ে পালানোর জায়গা নেই বলে এ-মহল্লায় ছিনতাইও বলতে গেলে হয় না। বাসার বারান্দা থেকেও একটা গলি চোখে পড়ে, সেখানে বসে থাকা গঞ্জিকা-সেবনরত রিকশা-ঠেলাওয়ালাদেরও দেখা যায়। তাদের সঙ্গে এই মহল্লার নিশীথপ্রহরীও জাগে, আজ তারাও নেই। ছেলের শিশুবিদ্যালয়টা পার হয়ে যে-কানাগলিটা এলাকার মানুষের ময়লা ফেলার স্থান হিসেবে ব্যবহৃত হয়, সেটা অতিক্রম করার মুহূর্তে রশিদ আলির চোখের কোণে কিছু একটা ঝলকে উঠল। সে একপা পিছিয়ে আবার কানাগলির ভেতরে তাকিয়ে বোবার দেখানো আকাশবিহীন মেঘরঙের পর্দাটা একবার দুলেই অদৃশ্য হয়ে যেতে দেখে থতমত খেয়ে দাঁড়িয়ে জাগ্রত অবস্থায়ও বোবা ধরে কিনা ভাবতে লাগল আর ভাবতে-ভাবতেই সেই পর্দা আবার দোলায়মান হলো আর ফাঁক-ফোকর দিয়ে সামান্য ধোঁয়াও উড়তে দেখে রশিদ আলি ভাবল, বোধহয় দিনের বেলা পৌরসভার লোকজন জমে থাকা ময়লায় আগুন দিয়েছিল যে ধোঁয়া এখনো উড়ছে। সে সেই রাতে ওই গলিতে কখনো ঢুকত না, যদি না চায়ের পেয়ালায় চামচ নাড়ার শব্দ শোনা যেত। গোড়ালি-ডোবানো আবর্জনা পেরিয়ে কানাগলির যে-মোড়টা পেরোলে মূল রাস্তাটা চোখে পড়ার কথা নয়, সেখানে উপস্থিত হওয়ার পর সে আকাশবিহীন মেঘের রঙের উৎস হিসেবে কোনো পর্দার বদলে একটা তৈলাক্ত কাগজের তেরপল আবিষ্কার করে। খানিকক্ষণ চেয়ে থেকে মনে হলো, তেরপল হলেও পর্দার চেয়ে রঙের উজ্জ্বলতা কম নয় বরং বেশি, যে-উজ্জ্বলতা রংকে দৃশ্যপটের কেন্দ্রবিন্দুতে এনে পর্দাকে অদৃশ্যপ্রায় করে দেয়। তবে পর্দার আড়ালে যে একটা চায়ের দোকান আছে তাতে রশিদ আলির সন্দেহ রইল না। হালকা জ¦ালানি তেলের গন্ধ আর আগুনের আভাসের সঙ্গে মিশে থাকা চামচের নূপুরসশ্রুত ঝংকার তৃষ্ণা নিবৃত্তির আভাস দিচ্ছে। আঙুল দিয়ে পর্দাটা সরিয়ে প্রদীপের আলোয় দাদাকে কেটলির ফুটন্ত জলে চা-পাতা ঢালতে দেখে খুব একটা হকচকিত না হয়ে চা হবে কিনা জিজ্ঞেস করলে দাদা তাকে একমাত্র ন্যায়াসন ইশারায় দেখিয়ে দিলে বিন্দুমাত্র দ্বিধা না করে বসে পড়ল রশিদ আলি। তার এখন চা দরকার, সেটা দাদাই দিক বা সদরুদ্দিনই দিক কিন্তু সিগারেট কে দেবে? বাসার প্যাকেটে দুটো সিগারেট ছিল কিন্তু আনা হয়নি ভেবে এবং এই ভাঙাচোরা দৃশ্যত এককালীন দোকানটায় সিগারেট থাকার কথা না জ্ঞান করে সময়টাই পানসে হয়ে গেল রশিদ আলির। চা দেরি হবে কিনা জিজ্ঞেস করাতে দাদা হেসে ‘না’ বলে পেয়ালায় চিনি দিয়ে লিকার ঢালা শুরু করা মাত্র রশিদ আলি এই গলির আবর্জনার গন্ধ না পাওয়ার কারণ খুঁজতে থাকে। এলাকার রাজনৈতিক নেতা ময়লার আশ্রয় এই নির্জন গলিটাও সাপ্তাহিক উশুলে ভাড়া দিয়েছে কিনা ভাবতে-ভাবতেই তার সামনে চায়ের পেয়ালা চলে আসে, যার ফলে একটা কাঁচা গন্ধ তার নাকে ধাক্কা দেওয়ায় সে নিজের হাতে এক পেয়ালা রং-চা দেখে দুধ-চা দাবি করে দুধ নেই বলে প্রত্যাখ্যাত হয়ে দুধের স্বাদ বাদ দিয়ে শুধু ক্যাফেইনের নেশার ওপরই আশ্রয় করার সিদ্ধান্ত নেয়। পেয়ালার ওজন অনুভব করে মাত্রাতিরিক্ত চা দিয়ে ফেলেছে বলে প্রথমে সন্দেহ হলেও কাঁসার পেয়ালায় চা দিয়েছে বুঝতে দেরি হওয়ার পেছনে তেল-প্রদীপের অনভ্যস্ত আলোকেই দায়ী করে প্রথম চুমুকেই দুধের কথা ভুলে গিয়ে রশিদ আলি নির্ভেজাল ক্যাফেইনের নেশায় নিমগ্ন হয়ে সিগারেটের নেশায় তাড়িত বোধ করে নিরাশার সঙ্গে সিগারেট আছে কিনা জিজ্ঞেস করলে ‘পাতার বিড়ি আছে, চলে?’ উত্তরপ্রাপ্ত হয়ে বিড়িই গ্রহণ করে একটান দিয়েই বুঝতে পারে তার নেশাটা সিগারেটের নয়, তামাকের। পরিশোধকবর্জিত কড়া তামাকের সঙ্গে নির্দুধ ক্যাফেইন এবং এই দুইয়ের সঙ্গে পর্যায়সারণির পঞ্চাশতম মৌলিক পদার্থ আর উনত্রিশ পারমাণবিক ক্রমাঙ্ক মিলে রশিদ আলির মস্তিষ্কে এক ধরনের নেশাজাতীয় উত্তেজনার জন্ম দিলে স্থায়ীভাবে বোবার শিকার দাদার সঙ্গে চা-বিক্রেতা দাদার সামঞ্জস্যের কাকতালীয়তার মাত্রা আবিষ্কারের কৌতূহল কমে গিয়ে এই দাদা কেবল একজন প্রান্তিক বৃদ্ধ হিসেবে রশিদ আলির মগজে পরিগণিত হয়। ক্যাফেইন আর নিকোটিন রশিদ আলির মস্তিষ্কের প্রথম ধাক্কাটা সামলে ওঠার পর এই ময়লার ভাগাড়ে চায়ের দোকান স্থাপনের তাৎপর্য অনুসন্ধানের তাড়না বোধ করে রশিদ আলি ভাবে, অন্ধকারে আলোর আভাস দেখে সে এই প্রায় ভোররাতে চায়ের টং-দোকানটা খুঁজে নিয়েছে কিন্তু দিনের আলোয় কে এই চায়ের দোকান চিনবে আর চিনলেই বা ময়লার ভাগাড় মাড়িয়ে এই দোকানে চা খেতে আসবে কেন চিন্তা করে সে নাকের ময়লায় আঙুল চালিয়ে বলে, ‘এহানে চায়ের দোকান দিছেন ক্যা দাদা? দোকান চলব? কেউ চিনে এহানে চায়ের দোকান আছে?’

দাদা হেসে বলে, ‘এহানে এহন দোকান না থাকলে আফনে এই রাইতে চা পাইতেন কই?’

‘আফনে আমার লাইগা নি দোকান দিছেন এহানে!’ কটাক্ষ করে রশিদ আলি।

‘মজা কইরা চা-ডা খাইয়া এহন শুরু করছেন জবাবদিহি। চা খাওনের আগ তো জিগান নাই। এহন যাওনের আগে দুইডা কতা হুনাইয়া যাইবেন। পশ্চিমের মানুষ আপনে আর কী!’

‘জবাবাদিহি না দাদা। আগ্রহ।’

‘এলাকাত একবিন্দু জাগা খালি আছে নি দেহেন তো। যেডুক খালি আছে তাও পিচ মারা রাস্তা। এহানে দেহেন না, মাটির উফরে খাড়ায়া রইছি। এহানে না দিয়া কই দিমু? আর নেতা-ফেতাগো চান্দা দেওনের পয়সা আমার নাই। কাইল আবার আফনের মতো আরেকজন যে ভোর রাইতে বাইরোইবো না চা খুঁজতে কেডা কইতে পারে?’

‘আপনে জানতেন আমি আমু?’

‘না, তয় আইতেও তো পারেন।’

‘ভোররাইতে কেডা কহন চা খাইতে আইবো এই ভরসায় আপনে দোকান খুইল্লা বয়া রইছেন? আইজ তো মনে হয় আমি একলাই আইছি। ছয়-সাত টাকা রোজগার। সংসার চলব?’

‘আমগো সংসার নাই। নিজের কথা ভাবেন।’

উত্তর দিতে গিয়ে রশিদ আলি চা-ওয়ালা দাদার একবচন থেকে বহুবচনে উত্তীর্ণের বিষয়টা খেয়াল করে এবং থমকে দাদার কাছে  ছোটবেলায় শোনা নানা জিন-ভূতের গল্পের কথা ভাবতেই দাদার বলা উপকারি জিনের গল্প মনে পড়ল। এই রাতে তাহলে উপকারি জিনই কি তাকে কুকাফ নগরের চা-বিড়ি খাওয়াল? অন্যমনস্ক বৃদ্ধের দিকে আড়চোখে তাকিয়ে উবু হয়ে বিড়ির উচ্ছিষ্টাংশটা তুলে নিয়ে প্রস্তুতকারকের নাম খুঁজল এবং দুর্বোধ্য ভাষায় প্রায় অস্পষ্ট কিছু আঁকিবুঁকি দেখে উস্কানো সন্দেহ নিয়ে হিমায়িত শরীরে বসে থেকে পরক্ষণেই মনে এক ধরনের আশার সঞ্চার বোধ করে – হয়তো তার সমস্যার সমাধান এই উপকারি জিনই করে দিতে পারবে জ্ঞান করে বলল, ‘আপনারে ভুল বুঝছি, কিছু মনে রাইখেন না।’

‘তেল মাইরেন না, তেলানোর অভ্যাস বাদ দেন, শান্তি পাইবেন। আমারে তেলাইয়া লাভ নাই, আমার কাছে আফনেরে দেওনের মতো কিছু নাই।’

এই দোকান থেকে দ্রুতই চলে যেতে হবে বলে রশিদ আলি অপমানবোধ না করে বাড়তি ভয় নিয়ে বলে, ‘আপনারা কারা?’

‘আমরা ভোররাইতের চা-দোকানদার।’

নিতান্ত কোণঠাসা সমর্পিত কয়েদির মতো রশিদ আলি বলে বসে, ‘আপনে দেখতে একদম আমার দাদার মতো। কিছু বুজতে পারতাছি না। আপনে জিন হয়া থাকলে কন কী করন লাগব, ক্যান আমারে দেহা দিছেন।’

‘চা দিতাছি, চা খান’, বুড়োর প্রায় অদৃশ্য হাতে চামচের টুংটাং শোনা গেল, ‘দাদার মতো একজনরে দেইখাই নেতায়া গেলেন? আপনের বাপের মতো কাউরে কোনোদিন দ্যাখছেন?’

‘না।’

‘আপনের দাদার বাপের মতো?’

‘দাদার বাপরে আমি দেখি নাই।’

‘ছবিও নাই?’

‘না।’

‘ছবি থাকলে কম অইলেও বিশজন দ্যাখতেন।’

‘মানে? কী হইতাছে এইসব?’

‘আর হ্যার বাপেরে যদি একবার দ্যাখবার পারেন, হেইলে পঞ্চাশ জন তো অইবই। অ্যামনে যত উফরে যাইবেন, তত দেখবেন। যত নিচে আইবেন তত কম পাইবেন। ভবিষ্যতে আপনের নিজের মতো একজনও দ্যাখবেন না, নিজেরেও না।’

‘ক্যাডা আফনে?’

‘আফনে যা দ্যাকতাছেন আমি তাই। চা-ওয়ালা। কৃষি কইরা খাই।’

‘কৃষক অইলে চা বেচেন ক্যা?’

‘একটা মন্দির, একটা চইরা বেড়ানোর জমি আর একটা বাঁশি যার আছে, সেই চাষা। চা ব্যাচলেও চাষা।’

রশিদ আলি ঠিক বুঝতে পারছে না কী হচ্ছে, পুরো দৃশ্যটাই যেন বোবায় ধরা, ‘সেইগুলা কই আপনের?’

‘লাঙল ধইরা গরু খাটাইয়া মাটি খুঁচলেই কৃষি অয় না। আর জমি কই? আপনের যদি একটা গরু থাকেও, সেইডারে চরাইবেন কই? দ্যাশ অইলে না জাগা থাকত, বিদেশে জাগা পাইবেন কই?’

‘বিদেশ! এইডা বাংলাদেশ না! কুকাফ নাকি?’

‘খ্যাক! ঢাকা শহরে চইরা বেড়ান, তার পরও কইতাছেন এইডা বাংলাদেশ! আর কুকাফ-মুকাফ কী কন? আমি জিন না। জিন থাকে পুব-পশ্চিমের মাজখানে। আমি মানুষ অইতে পারি। আবার বেতালও অইতে পারি।’

‘বেতাল আবার কী?’

‘আপনে তো দেহি দেশি ভূতের ইতিহাসই জানেন না। আপনের পঙ্গু দাদারে জিগায়েন। কইতে পারবো। বেতাল মরা – অচল মানুষের কান্ধে বইসা তারে যীবন দিতে পারে।’

অসহায়ত্বের প্রান্তদেশে পৌঁছে রশিদ আলি বলে ফেলল, ‘আমার না সামনের মাস থেইকা চাকরি নাই। বাসার কেউ জানে না। কী করি কিছুই বুঝতাছি না।’

‘লন চা-বিড়ি খান, তারপরে যান গা।’

‘আপনে ব্যাচেন চা। চা কারা দিছিল জানেন? ব্রিটিশরা। আপনে কি বাংলাদেশি ইংরেজ চাষা?’

বুড়ো অগ্নিময়ী চোখে তাকাল আর প্রদীপের জ্বালানি যেন মুহূর্তেই সেখানে ভর করলে প্রদীপ ম্লান হয়ে এলো, ‘সবসময় চায়ের দিকে তাকাইলে অয় না। কিসে কইরা চা খাইতাছেন সেইডাও দেখা দরকার। খান। আইজ এই আপনের শ্যাষ চা।’

রশিদ আলি তার সামনে আরেক দফা রং-চা এবং বেনামি বিড়ির আবির্ভাবকে গ্রহণ করে ভাবল, বুড়ো উলটো কথা বলছে। আজীবন জেনে এসেছে, মাটির মালসায় বিরানি দিলেও সেটা বিরানি অথচ বৃদ্ধ বলছে মালসার দিকে তাকাতে। তবে কাঁসার পেয়ালা চায়ের ওজন বাড়িয়ে দিয়েছে, তাও ঠিক, ভেবে দিশাহারার মতো আকাশের দিকে তাকিয়ে আকাশের কেন্দ্রভাগটাকে খানিকটা অবনত অবস্থায় দেখতে পেল। চারপাশের দালানের সংকীর্ণতায় আকাশটা ভারাক্রান্ত মেঘের নিম্নমুখী চাপে খানিকটা নিচের দিকে বেলুনের মতো ফুলে নেমে এসেছে বলে মনে হলে রশিদ আলির বোধ হলো আকাশের ওপারেও মেঘদল আছে যাদের বৃষ্টি আকাশের ছাদে পড়ে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি করে ওজনদার হয়ে আকাশটাকে স্থিতিস্থাপক- অস্বচ্ছ রাবারের পাতের মতো নিচের দিকে ঠেলে বর্ধিত করছে যার দৃশ্যমান উলটোপিঠে তারকাসজ্জিত করে দর্শককে আকাশের দুরবস্থা সম্পর্কে অজ্ঞ রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে। রশিদ আলি মোহময় বিভ্রান্ত অবস্থায় চা-বিড়ি ফেলে মেঘহীন আকাশরঙের পর্দাটা ঠেলে ওখান থেকে উঠে চলে এলো এবং কেউ তাকে পেছন থেকে পাওনার তাগাদা দিলো না।

বাসার প্রবেশপথে পৌঁছে আরেকবার ওপরে তাকিয়ে অসমান দালানগুলোর বেরিয়ে থাকা কোনায় বিদ্ধ একটু আগে দেখা আকাশটা একটা সরু রেখা হয়ে গেলে তার মনে হলো, খাবলা- খাবলা করে খাওয়া একটা একবক্ররেখা গলির এ-প্রান্ত থেকে ও-প্রান্তে ছড়িয়ে পড়েছে, যাকে মানসিক অস্থিরতার রাতে ভ্রান্তদর্শন জ্ঞান করে দু-আঙুলে চোখ চেপে ধরে রশিদ আলি বাসায় ঢুকল। দাদা এখনো আগের মতোই বোবায় ধরা অবস্থায় চোখ মেলে পড়ে আছে। পাঁজরের নিম্নভাগের মৃদু ওঠানামা তাকে মেয়াদোত্তীর্ণ আসবাব থেকে আলাদা করেছে।

 

দিগন্তানুসন্ধান

সকালে আকাশ দেখে দিগন্ত এবার বিলুপ্ত হয়ে গেছে অনুভূত হওয়াতে ছুটির দিনে বাজার না করেই দিগন্ত অনুসন্ধানের প্রতিজ্ঞা নিয়ে রশিদ আলি বেরিয়ে পড়ল। আকাশ এখনো অবতল হয়নি, যান্ত্রিক বাহনের চালক পেছনের পুরো দৃশ্যকে সংক্ষেপে একনজরে দেখার জন্য যে উত্তল কাচের দিকে তাকায়, আকাশটা হয়েছে সেরকম – তার শুরু হয়েছে যেন উঁচুতে, শেষও উঁচুতে – মাঝখানটা কেবল পর্বতমালার উপত্যকার মতো ঢলে পড়েছে যেন, এমন হলে দিগন্ত গেল কোথায়? একটি বেলা কেবল দিগন্ত খুঁজে কাটাল রশিদ আলি। পয়সা খরচের ভয়ে বেশিদূর না গিয়ে তালাবদ্ধ চাকরিস্থলের আশপাশের ছোট-বড় রাস্তাগুলোতে দিগন্ত খুঁজে-খুঁজে যেদিকে যায় দালানে দৃষ্টি আটকে যায় বিধায় দিগন্ত খোঁজার পরিবেশ পেল না। আর দিগন্ত আছে বলেও মনে হচ্ছে না কারণ যতদূর চোখ যায় আকাশ ক্রমেই উঁচুতে উঠেছে আর যত কাছে চোখ আসে তত আকাশ উত্তল, আবার পেছনে তাকালে আকাশ উঠে গেছে আকাশে। উত্তল আকাশকে এখন তার মনে হচ্ছে প্রণয়ীর বুকে ঝুঁকে থাকা কুমারী তরুণীর কামনাকাতর স্তনের মতো। বর্ষার বাঁজা মেঘগুলো ক্রমশ উত্তল আকাশের গা বেয়ে-বেয়ে ওপরের দিকে গিয়ে হয় অদৃশ্য হচ্ছে নতুবা দালানের এর আড়ালে হারাচ্ছে দেখে রশিদ আলির মনে হলো আকাশটা বোধহয় মসৃণ-গোলাকার-আকাশি স্ফটিক বলের রূপ নিয়েছে। কোনো আদিগন্ত খোলা মাঠে গিয়ে দাঁড়ালে এখন কি দেখা যাবে ভেবে ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে রশিদ আলির মনে হলো, নিরেট গোলক আর শূন্য গোলক মুখোমুখি হওয়াতে মাঠের প্রান্তে নিশ্চই কৃষ্ণগহ্বর দেখা যাবে। রশিদ আলির পেটের গহ্বর থেকে নাড়িভুঁড়ি এবং পাকস্থলি গায়েব হয়ে গেছে বলে বোধ হলো আর সেখানে স্থায়ী অবস্থান নিলো মহাশূন্যতা। কতই না শান্তি ছিল যখন মাঠের প্রান্তে দিগন্ত নেমে আসত ভাবতে-ভাবতেই রশিদ আলি দেখল পথের গাড়িগুলো যথারীতি ছুটছে, এরা যেন জানেই না আকাশ ক্রমেই নেমে আসছে। গণপরিবহনে উঠে মানিকগঞ্জের দিকে খোলা জায়গার সন্ধানে গেলে কেমন হয় মনে করেই কৃষ্ণগহ্বরের মুখোমুখি হওয়ার ভয়ে সে-পরিকল্পনা বাতিল করে দিলো। দিগন্ত দেখা যতটা রোমাঞ্চকর এবং স্বপ্নিল, কৃষ্ণগহ্বর তার দ্বিগুণ বিভীষিকাময় কারণ সে উত্তলও নয়, অবতলও নয়, সে শুধু সুগভীর গহ্বর।

বিকেলে রশিদ আলি তার স্ত্রী ও ছেলেকে দিনাজপুরের বাসে উঠিয়ে দিলো। ছেলের স্কুল গ্রীষ্মের ছুটি, বেড়িয়ে আসুক নানাবাড়ি আর এদিকে রশিদ আলির খরচ আর অভিনয় একটু কমুক। দাদাকেও কোথাও পাঠাতে পারলে হতো, বাবা-মা মরে গিয়ে দাদা বেঁচে আছে, বিষয়টা কেমন যেন গায়ে শুঁয়োপোকা লাগার মতো।  সে খরচ কমানোর সিদ্ধান্ত নিল। খাবার খরচ কমানো কঠিন নয় কারণ দাদা এখন তরল ছাড়া তেমন কিছুই খেতে পারে না আর সে নিজের খাবার হোটেলেই খেতে পারবে। যে কদিন চাকরি আছে দুপুরের খাবারের ভাতাটা পাবে। এদিক দিয়ে তার চাকরিদাতা তাকে করুণা করেছেন। হাজার হোক আট বছর তার সেবা নিয়েছে প্রতিষ্ঠান। আগে গোসল করত তিনজন, এখন হবে একজন। গরমে আবার প্রত্যেকেই দু-তিনবার করে গোসল করে। রশিদ আলি সিদ্ধান্ত নিল, এই এক মাসে সে একবার করে গোসল করবে; রান্নাবান্নাতেও পানি লাগে, ঘর মুছতে পানি লাগে, মানুষ বেশি তো পানি খাওয়াও বেশি। এই এক মাস ঘর মুছবে না বলে রশিদ আলি ঠিক করল। বউ-ছেলে আসার আগের দিন মুছেটুছে রাখলেই হবে, কে জানে এতে পানির বিল কতটাই বা কম আসবে! দুইশো টাকাই এখন রশিদ আলির কাছে দুই হাজারের মতো। বাসা ভাড়া তো আর কমানো যাবে না, কাজেই ওটা ভেবে লাভ নেই। তবে আরেকটা বড় খরচ হচ্ছে বিদ্যুৎ খরচ, সুতরাং ওটা কমানোর সিদ্ধান্ত নিল রশিদ আলি। দাদার ঘরের পাখাটা সার্বক্ষণিক চলতে থাকে, রশিদ আলি ঠিক করল নিজেদের ঘরের ছাদপাখাটা সে হিসাব করে চালাবে। দাদাকেও কোথাও পাঠিয়ে দিতে পারলে ভালো হতো; কিন্তু তার দায় নেওয়ার মানুষ নেই। চাকরিটা শীতকালে গেলে খরচ কমানো সহজ হতো চিন্তা করেই লজ্জিত বোধ করল রশিদ আলি। চাকরি যাওয়াটাকে সে তাহলে অজান্তেই মেনে নিয়ে চাকরিবিহীন অবস্থায় কী করে প্রাণ ধারণ করা যায় সে-প্রস্তুতিও নিতে শুরু করেছে ভেবে দ্বিধান্বিত হওয়ার পরমুহূর্তেই আবার নিজেকে সান্ত¡না দেয় সে – নাহ, তা না, যতদিন অন্য ব্যবস্থা না হচ্ছে ততদিন একটু বেশি হিসাব করে চলা আর কি! যে টাকা বাঁচবে সেটা দিয়ে ছেলের মুখে খাবার অন্তত দেওয়া যাবে।

আষাঢ়ের প্রখর গ্রীষ্ম। সাতকন্যা এখনো দেখা দেয়নি বলে ঢাকার অসবুজ প্রকৃতিতে এখনো মমতার ছোঁয়া লাগেনি। রশিদ আলির অতি অপছন্দের সময়, তীব্র শীত সহ্য হয় কিন্তু গ্রীষ্মে তার প্রাণ শুকিয়ে আসে। গ্রীষ্মবিষয়ক পরীক্ষার প্রথম দিনে সকাল আটটায় ঘুম ভেঙেই পাখা বন্ধ করে দিয়ে দাদাকে তরল খাইয়ে বাইরে থেকে নাশতা সেরে একটা খবরের কাগজ আর গোল্ড লিফ থেকে স্টার লাইটে নেমে এলে সিগারেটের খরচ প্রায় অর্ধেক কমে যাচ্ছে বিধায় সঙ্গে পাঁচটা স্টার লাইট সিগারেট কিনে ঘরে এলো রশিদ আলি। সকাল নটা থেকে দুপুর একটা – এর মধ্যে পাখা বা বাতি চালানো যাবে না, হাতপাখাও না। দুপুরে গোসল সেরে পাখা ছেড়ে খানিক বিশ্রাম নিয়েই বাইরে দুপুরের খাবার খেয়ে ফরিদ ভাইয়ের চায়ের দোকানে ঘণ্টাদুয়েক কাটিয়ে বাসায় ফিরে হাতপাখা দিয়ে হাওয়া। বৈদ্যুতিক পাখা আবার চলবে সন্ধ্যার পর। বৃষ্টি হলে পরীক্ষায় পাশ করা সহজ হতো তার। আবহাওয়ার পূর্বাভাস বলছে যদিও বর্ষাকাল, সপ্তাহখানেকের মধ্যে বৃষ্টির সম্ভাবনা নেই। মৌসুমিবায়ু এ-শহরের বাতাসেই ঘোরাফেরা করছে কিন্তু যথেষ্ট শক্তিশালী না হওয়ায় বৃষ্টি হয়ে ঝরছে না। মেঝেতে পুরনো খবরের কাগজ বিছিয়ে বসে রশিদ আলি সিগারেট ধরিয়ে নতুন কাগজ পড়া শুরু করল। অতি দ্রুতই কানের পাশে ঘামের সুড়সুড়ি অনুভব করে হঠাৎ রোদ থেকে এসেই পরীক্ষায় বসা ঠিক হয়নি জ্ঞান করে পাখাটা একটু ছেড়ে খানিক ঠান্ডা হয়ে পরীক্ষায় বসলে কেমন হয় ভেবে একবার পাখার বোতামে হাত দিয়েই সরিয়ে নিয়ে নিজেকে, ‘শালার ব্যাটা, পালানোর পথ খুঁজতাছ!’ বলে গালি দিয়ে আবার খবরের কাগজে বসামাত্র তীব্র দুর্গন্ধে ঘর ভরে গেলে দাদা বিছানা নষ্ট করেছে বুঝতে পেরে স্ত্রীর অনুপস্থিতি উপলব্ধি করল রশিদ আলি। দাদা বিছানা নষ্ট করার আগেই কীভাবে যেন সে বুঝে ব্যবস্থা নিত। যা হোক, রশিদ আলি দাদার নোংরা পরিষ্কার করে সারা শরীর অচল হওয়ার পরও বুড়োর পায়খানা-পেশাব কেন বন্ধ হচ্ছে না এবং শুধু তরল খাওয়া সত্ত্বেও কীভাবে বুড়োর কোষ্ঠ এত কঠিন ভাবতে- ভাবতে আবার খবরের কাগজের আসনে ফিরে এসে আধাঘণ্টা কাগজ পড়ার পর বসার কাগজ তার হাতে আর হাতের কাগজে সে বসে আছে আবিষ্কার করে দুটি কাগজ মিলিয়ে শুধু তারিখ ছাড়া কোনো তফাৎ খুঁজে না পেয়ে বসার কাগজেই চোখ বোলাতে- বোলাতে কী করে কাগজদুটো জায়গা বদল করল ভাবতে গিয়ে তার অনুপস্থিতিতে ঘরে হানা দেওয়া কোনো চকিত-বিরল হাওয়াকে দায়ী করে ভোররাতের দাদাসদৃশ চা-বিক্রেতার কথা মাথায় এলো; কেন মাথায় এলো চিন্তা করে বসার কাগজ হাতে চলে আসার পেছনে সেই দাদার অলৌকিক হাত থাকতে পারে মনে করে পুরো কাগজ খুঁটিয়ে পড়েও তাৎপর্যময় কিছুর সন্ধান না পেয়ে রশিদ আলি হতভম্ব হয়ে একবার বারান্দায় গিয়ে উত্তল আকাশের দিকে তাকিয়েই বিরসমুখে আবার খবরের কাগজে ফিরে এসে আরেকটা সিগারেট ধরালে বোঝা গেল আকাশ এখনো উত্তলই আছে। আকাশের উত্তলতা শুধু সে-ই দেখতে পাচ্ছে কিনা সেটা আবিষ্কারের কোনো ইচ্ছাও রশিদ আলির মধ্যে দেখা গেল না; হয়তো একাই উত্তল আকাশের অধিকারী হওয়ায় এক ধরনের শ্লাঘাও বোধ করে সে যদিও আকাশের হঠাৎ লারেলাপ্পার মতো ঝুঁকে আসার কোনো উপযুক্ত কারণ সে খুঁজে পাচ্ছে না। খবরের কাগজের বিজ্ঞান এবং বিশ্বসংবাদ পাতায় আকাশ নেমে আসা সংক্রান্ত কোনো বিপর্যয়ের সংবাদ না পেয়ে এবং পারমাণবিক সহিংসতার ওপর একটা পা-িত্যময় লেখা অতিকষ্টে পড়ে সাহিত্য-সাময়িকীতে যাওয়ার পর সময়ের সঙ্গে-সঙ্গে গরম বেড়ে যেতে থাকলে সে বিকল্প বাতাসের দিকে না গিয়ে বদ্ধ গরমেই বসে আছে ভেবে ঘর্মাক্ত অবস্থার এক পর্যায়ে সে এ-সময়টা কোনো নাগরিক বিশ্রামোদ্যানে কাটালেও তো পারে অথবা দাদার ঘরের পাখা যেহেতু চলে, সেখানেই সে মেঝেতে খবরের কাগজের আসন পাততে পারত ভেবে রশিদ আলির নিজেকে বোকা মনে হলো। তবে অতিদ্রুত সে নিজের বোকামি অস্বীকার করে, কারণ কাছাকাছি বিশ্রামোদ্যান না থাকায় তাকে পঞ্চাশ টাকা রিকশা ভাড়া না হোক দশ টাকা গণপরিবহন ভাড়া দিয়ে বিশ্রামোদ্যানে যেতে হলেও একমাসে বহু টাকা উঠে যাবে যা দিয়ে ঘরের পাখার বিদ্যুৎ বিল দেওয়া যায় এবং তদুপরি দাদার আশপাশে গেলেই কেমন যেন শ্যেনদৃষ্টিতে চেয়ে থাকে, যে-দৃষ্টি সহ্য করে চুপচাপ বসে থাকা তার পক্ষে সম্ভব নয়। সে বিকল্প প্রাকৃতিক বাতাসের সন্ধানে আশপাশে তাকাল এবং কোনো পথ দেখতে পেল না কারণ ঘিঞ্জি এ-এলাকার দালানগুলো গায়ে-গায়ে হওয়াতে জানালা খুললেও পাশের বাড়ির নিরেট-স্যাঁদলাপড়া দেয়াল ছাড়া কিছু চোখে পড়ে না এবং বারান্দায় গিয়ে তাকালেও আট ফুট রাস্তার ওপারের সদ্য গজানো বাণিজ্যিক বাসভবনটি কটাক্ষ করতে থাকে বলে বাতাস আসার পথ নেই, তেমন আর সেইসঙ্গে ঘরের ঘুলঘুলিতে মাকড়সার সযত্ন সংসার যা ভাঙার জন্য এখন শরীর খাটানো মোটেই বুদ্ধিমানের কাজ নয়। উত্তল আকাশকে আরেকবার দর্শন দিয়ে খবরের কাগজে বসে বহনযোগ্য দূরালাপনিতে খানিকক্ষণ বিমূর্ত খেলাধুলা করার পর গরম ক্রমেই অসহ্য হয়ে উঠলে সে অনুমান করে তাপমাত্রা কমপক্ষে বিয়াল্লিশ তাপাঙ্ক হবে আজ। আরো খানিকক্ষণ পর ঘড়ির দিকে সহজে তাকাবে না ভেবেও একবার তাকিয়ে বারোটা বেজে ষোলো মিনিট দেখে রশিদ আলি অনুমান করল, গরম এ-বছর সব মহাবৈশ্বিক রেকর্ড ছাড়িয়ে যাবে কারণ মধ্যাকাশ তো ঝুলে নিচে নেমে এসেছে আর তখন সূর্য যদি মধ্যগগনে থাকে তো তাপ বিকিরণ করবে বর্গমাত্রায়। গরমে অস্থির হয়ে এক পর্যায়ে উঠে গিয়ে ঘণ্টাখানেক গোসলখানার ঝরনার নিচে দাঁড়িয়ে থাকার পর পূর্ণগতিতে পাখা ছেড়ে দিয়ে তুলনামূলক ঠান্ডা মেঝেতে শুয়ে পড়ার লোভ অতিকষ্টে সামলানোর পর একটা সময় এলো, যখন রশিদ আলির প্রতিটি চুলের এবং প্রতিটি লোমকূপের আগাগোড়া ঘামে বন্ধ হয়ে গেল এবং আবারো তার চা-ওয়ালা দাদার নিজেকে কৃষক দাবি করার কথা স্মৃতিতে নড়েচড়ে উঠল – এর মানে কী হতে পারে ভাবতেই রশিদ আলির মনে পড়ল, তার দাদার বাপও কৃষক ছিলেন বলেই শুনেছে সে, তার উত্তরাধিকার – রশিদ আলির পক্ষাঘাতগ্রস্ত আপাত-অমর দাদাও কৃষক ছিলেন বটে। পেশা বদলেছে তার বাবার সময় থেকে। বাবা আধা কৃষক আধা চাকরিজীবী। কৃষিকাজ করে পড়াশোনার খরচ চালানোর পর চাকরি পেয়ে পৈতৃক পেশা ত্যাগ করে। এরপর রশিদ আলি পুরো চাকরিজীবী, তার ছেলেও তাই হবে যেহেতু বাবার জমিদারি নেই। একইভাবে কি চা-ওয়ালা দাদাও চাষা থেকে চা-বিক্রেতা হয়ে গেছে? কিন্তু সে তো নিজেকে এখনো কৃষক দাবি করে! মন্দির! বিচরণভূমি! বাঁশি! দুই দাদার অতীত একই, বর্তমানও তাই। চুলের জঙ্গল মাথার ঘামকে ধারণ করতে ব্যর্থ হওয়ায় ঘামের স্রোত ভ্রুতে কিছুক্ষণ বাধাপ্রাপ্ত হওয়ার পর ভ্রুও ব্যর্থ হলো আর চোখের পাঁপড়ির শেষ চেষ্টাকে ব্যর্থ করে দিয়ে ঘর্মাক্ত রাতে চোখের মণিকে আক্রমণ করতেই রশিদ আলির মনে হলো, তার চোখে আক্ষরিক অর্থেই ধাঁধা লেগে আছে কারণ চোখের পানি এমনিতেই লোণা অথচ ঘামের বহিরাগত নোনাকে সে সইতে না পেরে জ্বলে উঠছে কাজেই লোনায়-নোনায় তফাৎ কত এবং কেন ভাবতে-ভাবতেই দুপুর সাড়ে বারোটার দিকে গরম শুধু আর গরম রইল না, এই প্রায় বদ্ধ ঘরে গরম ঘনীভূত হয়ে পাশ্চাত্যের কৃত্রিম সবুজ বাড়ির মতো তাপ জমে ঘরের কোণগুলো ভেপে উঠল আর  সেই ভাপ ক্রমেই ঘরের কেন্দ্রে বসে থাকা রশিদ আলির দিকে ধাবিত হতে থাকলে ধাবমান গ্রীষ্মকে রশিদ আলি যেন ঘামে- অশ্রুতে সিক্ত-বন্ধ চোখে পরিষ্কার দেখতে পেল আর সঙ্গে-সঙ্গেই তার নিজেকে পাশ্চাত্যের সবুজ বাড়ির একটি শস্যদানা মাত্র মনে হওয়ার পরলহমায় চায়ের পেয়ালায় চামচ নাড়া আহ্বান কানে বেজে উঠল। সঙ্গে-সঙ্গে সে তার বন্ধ দুই চোখে দুই দাদাকে দেখতে পেল যাদের একজন কড়াপড়া হাতে লাঙল কষছে আর আরেকজন চা বানাচ্ছে আর তখনি ঘামের জ্বালায় বন্ধ চোখে রশিদ আলির সামনে তার দাদার শতোর্ধ্ব বয়সেও মরে না যাওয়ার রহস্য উন্মোচিত হলে  সে বিশ্বাস করার সিদ্ধান্ত নিল – দাদা আসলে উপযুক্ত উত্তরাধিকার পায়নি, কাজেই মরে কী করে! রশিদ আলি চোখ মুছে চোখ খুলতে পারলেও সে তা করল না, গরম সহ্য করার নেশায় পেয়েছে তাকে যেন আর তার শরীরের অস্তিত্বের অনুভূতি বিলীন হয়ে গিয়ে আবারো তার ক্রমবর্ধমান বোবায় ধরা অনুভূতি হতে থাকলে কানের ছিদ্রের ভেতরে এক ধরনের শীতল ভাব অনুভূত হয় যাকে রশিদ আলির কাছে তাপাক্রমণের প্রাথমিক আভাস বলে মনে হলেও পরমুহূর্তে তার ঘোর লেগে যায় এবং ঘোর লাগার কোন পর্যায়ে কতক্ষণ পরে রশিদ আলি জানে না – সে আবার সেই প্রায় ভোররাতের বোবায় ধরা মুহূর্তে ফিরে যায় এবং তখন থেকেই আকাশ নামতে শুরু করেছে বলে ওই লগ্নটিকে অভিশপ্ত জ্ঞান করা মাত্র ওই মুহূর্তটির বিশেষত্ব বুঝতে পারে – গতকাল রাতে বিগত আট বছরের মধ্যে প্রথমবারের মতো প্রাকৃতিকভাবে তার ঘুম ভেঙেছিল – হঠাৎ এই উপলব্ধি হতেই রশিদ আলির চোখ একবার দপ করে খুলেই আবার বন্ধ হয়ে যাওয়ার আগেই আরো খানিকটা ঘাম তার চোখে প্রবেশ করার প্রয়াস পেল। রশিদ আলি বেশ ঠান্ডা মাথায় আবার ভাবল, ঠান্ডা মাথায় ভাবা বেশ কঠিন এই গরমে, লুঙ্গি ভিজে চুপচুপে হয়ে গেছে বলে রশিদ আলি টের পাচ্ছে, একমাত্র ভরসা কর্ণকুহরে রহস্যময় শীতলতা। প্রথমে নিজেকে তার একখ- বরফজ্ঞান হলো যে, ঢাকা শহরের কৃত্রিম তাপজর্জর দুপুরে বেশ তরতরিয়ে গলে যাচ্ছে; কিন্তু খুব দ্রুত ঘোরের মাত্রা বেড়ে গেলে রশিদ আলির মনে হলো এদেশে উষ্ণ-তুষার যুগ এসে গেছে, গরমে বরফ জমাট বেঁধে ক্রমেই ঠান্ডা হওয়ার যুগ আর বেশি দূরে নেই কারণ নিজেকে তার উষ্ণ-বরফ মনে হচ্ছে, যে কিনা পুরোপুরি জমাট বাঁধলেই মহাকালীন শীতলতায় অবগাহিত হবে। এ পর্যন্ত ভাবতে না ভাবতেই রশিদ আলি উপলব্ধি করল, সে কিছুই ভাবছে না বরং ভাবনাই তাকে নিয়ন্ত্রণ করছে যা পাগলামির লক্ষণ কিনা রশিদ আলি ভাবতে চাইল না। কারণ ভাবতে তার ভালো লাগছে আর তখনই যেন আরো বেশি ঘনায়মান ঘোর তাকে গ্রাস করলে ঘোরলাগা বন্ধ চোখের জ¦লুনি কমে আসার সঙ্গে-সঙ্গে ঘোরতর গ্রীষ্মে হঠাৎ তার শীতলতা অনুভূত হলে অন্ধ রাহুর মতো বিগত আট বছরের নিদ্রার ইতিহাস তার সামনে দিয়ে প্রবাহিত হলো – ঘুম ভেঙেছিল সন্তানের কান্নায়, ঘুম ভেঙেছিল বহনযোগ্য দূরালাপনীর সতর্কধ্বনিতে, ঘুম ভেঙেছিল চাকরিদাতার তাগাদায়। প্রবহমান ঘাম মাথা থেকে পা পর্যন্ত সুড়সুড়ি দিচ্ছে। এক চিলতেও বাতাস প্রবাহিত হচ্ছে না। সে ঘুমাল, আশপাশে কোনো শব্দ হলো না কিংবা হলেও তার ঘুম ভাঙল না, ঘুম পূর্ণ হয়ে একসময় ধীরগতিতে আলস্যের সঙ্গে সে চোখ খুলে এক পেয়ালা চা খাবার কথা ভাবল। স্থির বহনযোগ্য দূরালাপনির সতর্কধ্বনি, ছেলের চিৎকার, স্ত্রীর ডাকাডাকি, সময়মতো চাকরিস্থলে পৌঁছানোর দুশ্চিন্তার বাইরে গিয়ে যখন প্রকৃতির ঘুম ভাঙানোর সময় আসে, তখন তার ফল তো অন্যরকমই হবে। সতর্কধ্বনিতে ঘুম ভাঙার ফল হলো কর্তব্যে ছোটা, প্রকৃতি এবং পূর্বপুরুষ যখন ঘুম ভাঙায় তার পরিণতি বেশ রহস্যময়ই হওয়ার কথা আর এ-কারণেই দাদার অনুলিপি এক চা-ওয়ালার সঙ্গে সাক্ষাৎ। চাকরি যাওয়ার সঙ্গে এই সাক্ষাতের কোনো সম্পর্ক নেই, সম্পর্ক আছে এখনো চাকরি থাকার সঙ্গে। ঘরের ছাদের ছায়ায় বসে থাকা তাপদগ্ধ রশিদ আলি জ¦ালাধরা বন্ধ চোখে তার বর্তমান প্রতিষ্ঠানে চাকরি থাকার শেষ কটি দিন দেখল যেখানে চাকরি থাকবে না জেনেও সে আনুষ্ঠানিক পোশাক পরে রোজ যথাসময়ে চাকরিস্থলে যাচ্ছে, হাসাহাসিও করছে বুঝি চাকরি যাওয়াটা তার কাছে তেমন কিছু নয় এবং বহু প্রতিষ্ঠানই  যেন তাকে চাকরি দেওয়ার জন্য বসে আছে, সে প্রাতিষ্ঠানিক বনভোজনেও গিয়েছিল এবং সব খেলায় অংশ নিয়ে তিনটি পুরস্কারও জিতেছে, সময়মতো কাগজপত্র জমাও দিচ্ছে এবং ঊর্ধ্বতন কারো সঙ্গে দেখা হলে বিনয়ের সঙ্গে তার শান্তি কামনা করছে, যেন তার চাকরি খেয়ে কর্তৃপক্ষ তাকে কৃতজ্ঞতাপাশে আবদ্ধ করেছে। কেন? জ্বালাধরা চোখের পাতা চারটে অক্ষিপটের ওপর আরো জোরে চেপে বসল; কেন? একমাসের বেতনের লোভে? নিঃসন্দেহে। আবার হতে পারে মনের কোণে ক্ষীণ আশা জেগে আছে হয়তো চাকরিটা থাকবে শেষ মুহূর্তে, হয়তো তার দরখাস্তটা গৃহীত হবে। কিন্তু কেনর চেয়ে বড় প্রশ্ন এখন কী। শুধুই বেঁচে থাকার জন্য চাকরি থাকবে না জেনেও আনুগত্য দেখানোই শেষ কথা নয় বরং শেষ কথা হলো সে সবকিছুই করে যাচ্ছে কিন্তু কোনো সংযুক্তি ছাড়া – এই অনুভব হতেই চাকরির শেষ আশাটুকু তাকে ত্যাগ করল এবং উত্তল আকাশটা পুরুষের ভোগ্য থেকে শিশুখাদ্যে পরিণত হলেই ঝুঁকে পড়া আকাশের সঙ্গে তার সংযুক্তি স্থাপিত হলো। এতদিন এই প্রতিষ্ঠান থেকে তার পদোন্নতি-বেতন বৃদ্ধি-সম্মান-পুরস্কার ধরনের কামনা ছিল আর এখন বর্তমান কর্মস্থল বর্তমান থাকতেই অতীত হয়ে গেছে যেন বেঁচে থাকতেই সে জানে যে, সে বাঁচবে না অথচ খাওয়া-পরা-যৌনতা সবই চলছে ভাবতে-ভাবতেই সে ঘোরের মধ্যেই যেন মৃত বাবা-মা এবং জরাগ্রস্ত অমর দাদার প্রতিচ্ছবি দেখতে পেল আর তৎক্ষণাৎ তার রহস্যময় শীতল কানের গহ্বরে শুনতে পেল চায়ের পেয়ালায় চামচ নাড়ার শব্দ। শীতল ঘোরলাগা অবস্থায় রশিদ আলি ঝাঁপি-লাগানো চোখে উত্তল আকাশের নিচে বহুদূরে দিগন্ত দেখল। আকাশ নেমে আসেনি সেখানে মাটিতে, উত্তল পৃথিবী ভয়ানক অবতল হয়ে দূরে যেতে-যেতে উঠে গেছে আকাশের দিকে আর কোনো এক ক্রান্তিসীমায় তাদের সঙ্গমে দিগন্ত জন্মেছে জেনে অজাগতিক বিভীষিকায় বিদ্যুৎস্পৃষ্টের মতো শিউরে উঠল – এ কী দেখল সে! মাটির জড় পৃথিবী তাহলে আলিঙ্গন করেছে মহাশূন্যকে? চোখ খুলে এবার পাখার হাওয়া তার প্রাপ্য ভেবে বোতাম টিপেই বিদ্যুৎ না থাকাতে তাৎক্ষণিক বিদ্যুৎ সরবরাহের যন্ত্র চালু হয়েছে বুঝতে পেরে সে দাদার পাখার গতি ঠিক রাখার জন্য পৃথিবীর সঙ্গে নিজের সম্পর্কের স্বরূপ উপলব্ধ হয়েছে উপলব্ধি করে নিজেকে প্রাপ্য থেকে বঞ্চিত করল এবং খবরের কাগজের কাছে ফিরে এসে দেখল সে আসলে আজকের কাগজকেই মেয়াদোত্তীর্ণ ভেবেছিল।

 

পতনের সুখ

রশিদ আলির সঙ্গে নিয়াজের যখন চায়ের দোকানে দেখা হলো, ততক্ষণে উত্তল আকাশ আরো মেঘমুক্ত হয়েছে – পাহাড়ের তীক্ষ্ণ চূড়ায় যেমন বরফ দাঁড়ায় না, তেমনি। দোকানিকে চা দিতে বলে নিয়াজ শুরু করল, ‘কোনো খোঁজ নাই কেন রশিদভাই?’

‘কীসের খোঁজ?’

‘আগে প্রায়ই ফোন করে অফিসের খবর নিতেন, চাকরি থাকার যেটুকু সম্ভাবনা আছে তাও চলে গেছে কিনা জিজ্ঞেস করতেন, সপ্তাহখানেক হয়ে গেল আপনি ফোনই করেন নাই।’

‘ভাবলাম শুধু শুধু আপনাকে বিরক্ত করে কী হবে? নতুন খবর কিছু থাকলে তো আপনি জানাবেনই।’

‘আমি খুবই দুঃখ পেয়েছি রশিদভাই। অথরিটি এরকম একটা ডিসিশন নেবে ভাবিনাই। আমি মনে করছিলাম এমনিই হুমকি দিসে।’

‘বাদ দেন।’ পেয়ালার সস্তা কাচকে ভুলে কাঁসা জ্ঞান করাতে চা প্রায় ছলকে পড়ছিল।

‘আমি কিছুতেই ভুলতে পারতেছি না। আপনি থাকবেন না কেমন কথা? এতদিন একসঙ্গে কাজ করতেছি।’

‘আছি তো এই মাস। ছেলের অসুস্থতার জন্য ছুটি নিছিলাম। কাল থেকে আবার একমাসের জন্য জয়েন। আর কেউই কোথাও চিরকাল থাকে না। পৃথিবীতেও না। কাজেই দুঃখের কিছু নেই।’

‘আপনি খুব ভেঙে পড়ছেন বুঝি। আপনার চোখের নিচে কালি পড়ছে।’

‘রাতে ঘুম হচ্ছে না বলেই এ-অবস্থা।’

‘এই তো, ইনস্টিটিউশন কত ভয়ানক দেখছেন? আপনার পারসোনাল লাইফ ও হ্যাম্পার করছে। বেডরুমেও নিশ্চিন্তে থাকতে দেবে না আপনারে। কোনোরকমে যদি বেডরুমে ঢুকে সব ভুলেও যান, আপনার চাকরিটা গপ করে খেয়ে দেবে, আপনার ঘুম শ্যাষ, ইনস্টিটিউশন আপনার বেডরুমে।’

‘ঘুম হচ্ছে না অন্য কারণে। আমার রাতের ঘুম হারাম করার সাধ্য এদের আর নাই। রাতের ঘুম কেড়ে নেওয়ার আরো বড়-বড় কারণ আছে। চাকরি যাওয়া তার কাছে কিছু না।’

অদ্ভুত কোনো কারণে এই কথাগুলো নিয়াজের কানেই ঢুকল না যেন, ‘তবে আপনি একা না, মোট তিনজন রিস্কে আছে।’

‘ভালো সান্ত্বনা।’

‘সময়টা খারাপ, বুঝলেন রশিদভাই। আপনাদের তিনজনের আরেকটু সাবধানে চলা দরকার ছিল। আপনার গেল মৌলবাদী সন্দেহে, কামরুলের গেল ক্লায়েন্টের অভাবে, আসলে তারা আপনাদের রাখবে না বুঝছেন! না রাখার অজুহাতের অভাব হয় না। আবার সেকেন্দারের চাকরি কেন গেল কেউ জানে না। অথরিটি সম্ভবত তিন সংখ্যাটারে তাদের জন্য শুভ মনে করে। দেখেন না, এদের ব্র্যাঞ্চ তিনটা, মালিকপক্ষের শেয়ার তিনজনের, বিল্ডিং তিনতলা।’

‘বাদ দেন।’

‘চিন্তা করবেন না, এখনো তো ফাইনাল ডিসিশন নেয় নাই। সাতাশ তারিখে স্পোর্টস ডে, তারপর আটাশ তারিখে মিটিং; সেখানে ডিসিশন হবে।’

‘আলাদা করে স্পোর্টস ডের আর কী দরকার!’

নিয়াজ রসিকতার সূক্ষ্মতা ধরতে পারল না, ‘স্পোর্টসের সরঞ্জাম বিক্রি করা এদের অন্যতম ব্যবসা, নিজেদের কোম্পানির জার্সি পরে আমরা খেলব, সেটার বিজ্ঞাপন হবে, বুঝলেন না!’

‘নিজেদের কোম্পানি! আপনি সত্যি বিশ্বাস করেন, এটা আপনার কোম্পানি?’

‘ওই কথার কথা আর কী। আপনার চাকরি গেছে, আমার আছে কেন? জাস্ট অ্যা ম্যাটার অফ চান্স। যাক, স্পোর্টস ডে-তে কিন্তু আপনি পার্টিসিপেট করবেন। হারুণের দলে খেলেন, তার এখন দলভারি। কেশব একটু চাপের মধ্যে আছে। আমি আপনার নাম লেখায়ে রাখছি অলরেডি। আপনি হানড্রেড মিটার দৌড়ে পার্টিসিপেট করবেন।’

‘এই খেলা আগেও একবার হইছিল। দৌড়কে আমার প্রায়ই দড়ি মনে হয়। মনে হয়, মাটি থেকে দশ ফুট ওপরের একটা দড়িতে আমি হাঁটতেসি; কিন্তু জানি না, ক্যামনে ব্যালান্স রাখতে হয়।’

‘হ্যাঁ। মাত্র তো একশ মিটার। একশ ফুট যদি সবার আগে যেতে পারেন, হারুন খুশি। আমরা তো আর সার্কাসের শোম্যান না।’

‘আপনি শিওর!’

‘হ্যাঁ-হ্যাঁ। আপনি পারেনও। আসবেন কিন্তু।’

‘না।’

‘বলেন কী! চাকরি বাঁচানোর শেষ সুযোগ এটা।’

‘আগেরবার পঁচিশ মিটার গেছিলাম, বাসায় প্র্যাকটিসও করছি। লাভ কী হইসে?’

‘আরে, আপনি তো দুই পক্ষের দলাদলির শিকার। হারুনও প্রেশারে ছিল, পার্টনারশিপ থাকে কিনা। এখন হারুন গুছায়ে আনছে। সে একদিন আপনার কথা জিজ্ঞাসও করছে। আপনারে সে পছন্দ করে মোটামুটি। একবার আপনি তার পক্ষে রিপোর্ট দিছিলেন।’

‘নিয়াজভাই, আপনি কি আসলে বোকা, না ভাব ধরেন? আপনার কি মনে হয় আমরা এইখানে সত্যি রিপোর্ট দিতে পারি? কী রিপোর্ট দেব সেইটাও ওরাই ঠিক করে। মুখে কিছু না বললেও আমরা বুঝি তারা কী রিপোর্ট চাইতাসে। লিখিত আইনের চেয়ে ইশারার আইন বেশি শক্ত। হারুনের পছন্দের কথা বললেন? আপনি যে-হটপটে খাবার আনেন, সেই পটের ওপরে কিন্তু আপনার মায়া নাই। আপনার মায়া ভাত-তরকারিতে। যে-পট আপনার খানা গরম রাখতে পারবে, সে-পটই আপনি নেবেন।’ হারুনের পছন্দবিষয়ক শেষের বাক্য কটি বলা মাত্র চা-ওয়ালা দাদার চায়ের চেয়ে পাত্রকে বেশি গুরুত্ব দেওয়ার বিষয়টা আবার রশিদ আলির মনে পড়ল।

‘আমি বোকা না ভাই। যে দল ভারি, সেই পক্ষেই আপনি রিপোর্ট দিছেন। তাও কিন্তু দেখবেন, তিন পক্ষের মধ্যেই এক রকম ভয় আছে। তারা ভয় পায় বইলাই আমগোরে ভয় দেখায়। যদি বাইচান্স রিপোর্ট সঠিক দিয়া ফেলেন, তাইলে কী হবে ভাইভা ভয় পায়। এই দৌড় প্রতিযোগিতাকে আপনার কাছে তো দড়ি মনে হয়। আমার মনে হয় পুলসিরাত। বাইরের কেউ কল্পনাও করতে পারবে না এই  রেসের ওপরে আমাদের প্রমোশন, ইনক্রিমেন্ট নির্ভর করে। ইভেন চাকরি থাকা না থাকাও নির্ভর করে। সবাই মনে করে এমপ্লয়িদের জন্য কোম্পানি ইনোসেন্ট এন্টারটেইনমেন্টের আয়োজন করছে।’

‘না, আপনি বোকা না।’

‘যে-কারণেই হোক, রিপোর্ট আপনি হারুনের পক্ষে দিছেন। ওই রিপোর্টের ওপরে কিন্তু বহু কিছু ডিপেন্ড করত তখন। কাজেই সে চায় আপনি থাকেন। ভবিষ্যতে আবারো রিপোর্টের দরকার হইতে পারে সে জানে। আর এইবার অলিম্পিকের একশ মিটার দৌড়ে বাংলাদেশের জার্সি ডিজাইনের টেন্ডার আমরাই পাইছি। এই প্রজেক্টের সুপারভাইজার কে হবে এই নিয়া হারুন আর কেশবের মধ্যে কোল্ড ওয়ার চলতেছে। দৌড়ে জেতার ওপরে বহু কিছু ডিপেন্ড করতাছে।’

‘আপনি তো ভেতরের বহুত খবর রাখেন, এই জন্যেই আপনার চাকরি যায় না। হবে না ভাই, ইচ্ছা করতাছে না। দালালি আর কত!’

‘পরিবারের কথা ভাবেন। আরেকটা চাকরি জোগাড় কইরা পরে সুইচ কইরেন। পরিবারের কথা ভাবেন ভাই।’

‘না। এই দেশে আর থাকব না।’

‘কই যাবেন? মালয়েশিয়া চেষ্টা করেন। শ্রমিক ভিসায় যাওয়ার চান্স বেশি।’

‘এইখানে থাকব। এই দেশ ছেড়ে দেব।’

 

‘না’ বললেও নয়দিন পর রশিদ আলিকে ঠিকই খেলাদিবসে দেখা গেল। অত্যন্ত প্রশান্তমুখে সে-দড়িতে পা রাখার জন্য প্রস্তুত। জার্সি পরার প্রাক্কালে হারুন তাকে কাছে ডেকে বলেছে, ‘কার প্লেয়ার জেতে তার ওপর নির্ভর করছে আগামী বছরের স্পোর্টস প্রোডাক্টস পলিসির ম্যানেজমেন্ট কার হাতে যাবে আর কার শেয়ার বেশি হবে। আমার বেশি হলে তো আপনারও বেশি, নাকি?’

কোনো উত্তর না দিয়ে রশিদ আলি সিঁড়ি বেয়ে উঠে টানটান করে বাঁধা দড়ির গোড়ায় দাঁড়িয়ে নিচে তাকাল এবং দেখল গত বছরের সঙ্গে কোনো তফাৎ নেই বরং নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরো জোরদার করা হয়েছে – নিচে একটার বদলে দুইটা জাল আর সেই জালগুলোর রং আকাশবিহীন মেঘরঙের সেই পর্দার মতো। রশিদ আলির মনে হচ্ছে সে অনেক ওপরে দাঁড়িয়ে আছে ফলে জালের ছিদ্রগুলো দেখা যাচ্ছে না, সে ছিদ্রানুসন্ধান করলও না বরং তার ভাবতে ভালো লাগল নিচে আকাশহীন মেঘরঙের স্থিতিস্থাপক পর্দাই পাতা আছে। পুরো অনুষ্ঠানটাকে একটা ফুর্তি-ফুর্তি রূপ দিয়ে নেহাত বিনোদন বলে প্রতিপন্ন করা হয়েছে। সেকেন্দার আর কামরুলকে নিজের পাশের আরম্ভরেখার ওপরেই দেখতে পেল রশিদ আলি। বহুদিন যাদের সঙ্গে চা খেয়েছে, আড্ডা দিয়েছে, নিজের ব্যক্তিগত জীবন যাদের কাছে প্রকাশ করেছে তারা এ-মুহূর্তে একশ মিটার ওপাশে গন্তব্যবিন্দুর দিকে চেয়ে আছে আর অনিয়মিত বিরতিতে প্রতিযোগীসুলভ চোখে রশিদ আলির দিকে তাকাচ্ছে। দড়ির ওপারে চাকরির সম্ভাবনা আর নিচে আকাশহীন মেঘরং দেখে নিয়ে ওপরে তাকিয়ে রশিদ আলি দেখল মেঘহীন আকাশের রাঙা কেন্দ্র অবশেষে তার মাথার তালুতে আঘাত করেছে, মনে হচ্ছে একটা লাটিমরূপী আসমানিরঙা ঘূর্ণিবাতাস নিম্নচাপে আক্রান্ত উপকূলীয় অঞ্চলের মতোই তাকে অতিক্রম করছে।

বাঁশি বাজা মাত্র অন্য সহকর্মী-প্রতিযোগীদের এগিয়ে যেতে দিয়ে রশিদ আলি এক পা ও দড়িতে না রেখে জাল বরাবর লাফিয়ে পড়লে তার মাথার তালু ছুঁয়ে ঘূর্ণায়মান আকাশচূড়াও মাটি বরাবর নেমে এলো আর রশিদ আলি জানল জালে আটকে গিয়ে আকাশের আর মাটিতে নামা হবে না যদিও সে মাইকে হারুনের গলা শুনল, ‘রশিদ, হারি আপ, চিয়ার আপ, রান ম্যান রান, ডোন্ট ফরগেট ইওয়ার ফিউচার। ইট ইজ জাস্ট হানড্রেড মিটার। ইউ ক্যান ডু ইট। রান। হোয়াট দ্য হেল ইজ গোয়িং অন? লোকটা দাঁড়িয়ে আছে কেন? একে বিশ্বাস করা ভুল হয়েছে। শুকনো মাটিতে দৌড়াতে পারছে না।’চা-ওয়ালা দাদার সঙ্গে আরেকবার দেখা হবে কিনা ভাবতেই রশিদ আলি নিশ্চিত হলো, সে আর কখনো চায়ের সন্ধানে ওই গলিতে ঢুকবে না। সে আরো জানল আজই তার দাদার জীবনের শেষ দিন। বাসায় গিয়ে দাদার পা ধরে কেঁদে

ফেলে বলবে, ‘দাদা, দেখো কতবড় মাঠ। এখানে গরু আছে, জোয়াল আছে, জোয়ালের ভারও আছে কিন্তু এখানে ফসল ফলে না। শুধু দৌড় প্রতিযোগিতা হয়। ওদের মাঠ আর ক্ষেত হয়ে ওঠে না। এই মাঠে আমি পড়ে গেছি দাদা, দাঁড়িয়ে থাকতে পারিনি।’ সে জানে – ওই মুহূর্তে দাদা বোবামুক্ত হয়ে হাসিচোখে বিদায় নেবে।

শেয়ার করুন

Leave a Reply