উদ্গত অথবা অচরিতার্থ

লেখক:

সাগুফতা শারমীন তানিয়া

‘জেলখানায় কাজ করতে আসবার পর ঠিক কোন সময় থেকে আমার মনে নেই, আমার একরকম আরামের বোধ শুরু হলো। কড়া চেহারার লাইব্রেরিয়ান যেমন ধূসর কাপড় পরে পটভূমিতে বিলীয়মান হতে চায়, আমুর টাইগার যেমন মাঞ্চুরিয়ান পর্বতমালায় – ইঁদুরশ্রেণির প্রাণী যেমন শীতনিদ্রায়… জেলখানার নিশিছদ্র বেষ্টন আমাকে একরকম আরাম দিতে থাকলো – যেন আমার অসংলগ্ন মন নিয়ে আমি সেখানে লোকচক্ষুর অন্তরালে একান্ত নিরাপদ (যেন আগের জন্মে আমি হাল্কগুলিতে বন্দি ছিলাম, মাসের পর মাস মেড-নদীতে নোঙর করে রাখা জাহাজি-জেলখানায় পচেছি আর সেদ্ধ ষাঁড়ের সস্তা ছাঁটের মাংস খেয়েছি আর অপেক্ষা করেছি দ্বীপান্তরের)। সেলগুলির মন্থর সময় সহ্য করতে না পেরে কত লোকে আত্মহত্যা করতে চেষ্টা করে, একটু বেচাল দশা দেখলেই আমরা রিপোর্ট করে দিই যে, এই কয়েদি নিজের ক্ষতি করতে পারে – সেই জেলখানাতেই কি আমোদ, নৈঃশব্দ্য ঠেলে ভরাট গলায় প্রায় হুংকার দিয়ে নাইজেরীয়রা গেয়ে ওঠে – ‘কিলোঞ্চশালে/ কিলোঞ্চশালে’… হুংকার দিয়ে আমার কুশল জিজ্ঞেস করছে কেউ তাতে আমার রক্ত দুলে ওঠে, করিডোর দিয়ে যেতে যেতে হঠাৎ শুনবো – ধর্মেন্দ্রর গলা নকল করে জি উইংয়ের সিং সাহাবদের কেউ চিৎকার করে উঠছে – ‘কুত্তে! ম্যায় তুঝে জানসে মার দুঙ্গা!’

আমরা একদল মিসফিট যেন এখানে এসেছি, এখানে আমাদের বড় বেশ জায়গা হয়।

আজ এতটুকুই। টিনটিনের ওষুধ আনতে ভুলো না। বাসায় চা-পাতা ফুরিয়েছে।

চুমু সর্বত্র,

রীনা’

রীনা প্রিজনে কাজ করতো, প্রথমদিকে সে ভয় পেয়েছিল কাজে যেতে, আমারও শংকার কারণ ছিল – যে-রীনা রাতের বেলা টয়লেটে যাওয়ার সময় আমাকে ডেকে তোলে, সে কিনা যাবে কারাগারের ভেতরে, খুনি-ধর্ষক-শঠদের সঙ্গে তার দৈনিক যোগাযোগ থাকবে, কেমন করে সম্ভব? পরে রীনা মজা পেয়ে গেছিল কাজের, সেখানকার গল্প ফুরাতে চাইতো না তার। একসময় আমাকে বলতো, পরে শিবুকে।

গলায় তসবি, পায়ে গোলাপি নাইকি ট্রেইনার্স, নাক-ভাঙা নাবিল মুনাসারের গল্প বলতো।

গালে বিছার উল্কি, দুই হাতের আট আঙুলে রবার্ট মিচামের মতন। I-o-v-e আর h-a-t-e উল্কি (‘নাইট অব দ্য হান্টার্স’-এ) করা ম্যাথিউয়ের গল্প বলতো।

ছত্রপ্রিত সিংয়ের গল্প বলতো। ‘তেত্রিশ বছর বয়েস, অমৃতসরে ক্ষেতি করে খেতো, চালের ক্ষেত ছিল তার। বাড়ির বড় ছেলে। ২০০১-এ রাশিয়া গেছে সে। রাশিয়ার মস্কো থেকে হেঁটে প্রাগ। প্রাগ থেকে হেঁটে অস্ট্রিয়া। অস্ট্রিয়া থেকে হেঁটে জার্মানি। জার্মানি থেকে ফ্রান্স। ফ্রান্স থেকে বেলজিয়াম। সেমিট্রেইলারে করে ফেরি পার হয়ে ইউনাইটেড কিংডমের বার্মিংহাম। জানো, যখনই জিজ্ঞেস করি, ওখান থেকে ওখানে কী করে গেলে? সে বলে – পায়দল। যা-ই জিজ্ঞেস করি – পায়দল। ছত্রপ্রিত সিং বিক্রি হয়েছে অন্তত দশবার। এখনো মানুষ মানুষকে বেচে আর কেনে? এখনো বরফ ভেঙে মাইলের পর মাইল হেঁটে মানুষ ভাগ্যের কাছে যেতে চেষ্টা করে।’ ধরা পড়ে জেলে এসেছিল ছত্রপ্রিত সিং, রীনা বলতো তার চেহারা ব্রিটিশরাজের আমলের টেরোরিস্ট সূর্য সেনের মতন। খোঁচা খোঁচা চুল-দাড়ি, আয়ত চোখ, চোখে অনিবার্য জল, মাথা নেড়ে বলতো – ‘জেলখানার একটা ঘণ্টা একটা দিনের সমান গো মিস!’

তুর্কি এক কয়েদির সাক্ষাৎকার নেবে বলে দাঁড়িয়ে আছে একদিন – রীনার ম্যানেজার চট করে ঘুরে নিচু গলায় বলে – ‘ওই যে ছেলেটা (লিউইস) গোসলখানা থেকে বের হলো, ও ১২ বছরের ভাইকে রেপ করেছে।’ একদঙ্গল ছেলে পুল টেবিলের পাশে দাঁড়িয়ে খেলছে, গল্প করছে – এদের মধ্যে একজনের কাঁধে ভেজা সবুজ তোয়ালে। মাথায় লম্বা সে অন্যদের চেয়ে। তার সদ্যস্নান করা শরীরের গন্ধে পুরো জায়গাটা ভুরভুর করছে। রীনার ম্যানেজার গলা আরো নিচু করে বলে – ‘আমরা যাকে দেখতে এসেছি সেই তুর্কি ছেলেটা এখন গোসলে ঢুকেছে, লিউইসের সঙ্গে কেউ বারোয়ারি গোসলখানায় ঢুকতে চায় না সেজন্যে এই উইংয়ে আজ কারো গোসল হয়নি।’ লিউইস ঘুরে দাঁড়ায় আর রীনার পা কাঁপতে থাকে – এইরকম চেহারা শুধু দেবদূতদের হয়, সে প্রাণপণ ভাবতে চেষ্টা করে ওর গায়ে এখনো বিষ্ঠার গন্ধ… লাভ হয় না। অ্যালাবাস্টারের কাঁধ-ঘাড় আর চিবুক, তার কপাল দেবতাদের মতো নিটোল, হালকা গোঁফদাড়ি। লিউইসের সঙ্গে মিটিং ছিল অন্য অফিসারদের, সে মিটিংয়ে বসে জড়তাহীন হেসে গেল, কথা বলে গেল, কাঁচের দেয়ালের এপাশে দাঁড়িয়ে রীনা দেখলো –  তার পা কেঁপে গেল – অদ্ভুত যন্ত্রণায় তার গলা বন্ধ হয়ে এলো – ইনস্টিংক্ট আর ইন্টেলিজেন্স যে একে অন্যের থেকে কত দূরে বাস করে – পরে রীনা ছটফটিয়ে বলেছিল আমাকে – ‘আমি টের পাচ্ছি আমার মাথা আর শরীর আলাদা হয়ে যাচ্ছে – শরীর বলছে আমার মাথার দরকার নেই, মাথা শরীরের সজ্ঞান ছেলেমানুষিতে মরমে মরে যাচ্ছে।’

লিউইস আড়াই বছর জেল খেটেছে তখন, বের হয়ে যাবে, একটা বারো বছরের ধর্ষিত বালকের নির্মল মুখ রীনাকে কয়েকদিন ঘুমাতে দেয়নি, সে জিজ্ঞেস করেছিল, ‘ভাইয়ের জীবন ধ্বংস করে দেওয়ার দাম মাত্র আড়াই বছর?’ পরে সে শিখেছিল, নারী-ধর্ষণ আর পুরুষ-ধর্ষণ একরকম অপরাধ নয়, এবং সেই পুরুষ যদি তার ভাই হয়, এধরনের অসম্ভব অপরাধ শুধু যৌন-অপরাধ নয়, এর শেকড় আরো অতলে। এসব অপরাধ হঠাৎ চাইলেই মানুষ করতে পারে না। চাইল্ড মলেস্টররা প্রায় সবসময়ই নিজের শৈশবে দুঃসহ যৌন অপরাধের শিকার। তাই লিউইসের কেসটা স্পেশাল।

রীনা আমাকে জিজ্ঞেস করেছিল – ‘আমি রীতিমতো সুখী মানুষ, আমি আমার বাড়িতে ফিরে আসা ভালোবাসি, আমি আমার জীবনসঙ্গীকে ভালোবাসি – এর ভেতরেও আমি আর কারো প্রতি আকৃষ্ট হতে পারি এবং সেখানে মন-টন এইসব হাবিজাবি কিছু নেই?’ আমি তাকে সান্ত্বনা দিয়েছিলাম – যেসব মেয়ে এইসব লোকের গার্লফ্রেন্ড, তাদের দেখেছো কী পীড়ন সহ্য করার পরেও তারা এদের সঙ্গেই লেপ্টে থাকে? আর আমরা চেঁচাই আহাম্মক মেয়েছেলে, তুই করিস কী! এটা সেইরকম। সবকিছু বুদ্ধির বেড়ের ভেতরের জিনিস না। হিতাহিত বোধ দিয়ে এইসব আকর্ষণ রদ করে দেওয়া যায় না… ইত্যাদি। আর বলেছিলাম – ‘তোমার তো দেখি ভ্যান গঘের মতন দশা হবে, কাছ থেকে এইসব দেখতে গিয়ে মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে বসবে! হাঁসের পিঠের মতন হতে পার না? যাতে সব জল গড়িয়ে ঝরে যায়, কিছুই গায়ে না লাগে?’

রীনা হেসে বলেছিল – ‘আমি হাঁস হলেও হবো পেপিয়ার ম্যাশের হাঁস, যশুয়া!’

 

হু চুজেথ মি, মাস্ট গিভ অ্যান্ড হ্যাজার্ড অল হি হ্যাথ…

ভেপোরেত্তোর জানালা দিয়ে আস্তে আস্তে দৃশ্যমান হলো দুলন্ত শহর। টেরাকোটা রঙের একটা শহর ঢেউয়ের দোলনার ওপর দুলছে, ঝিমোচ্ছে, গুনগুন করছে। গ্র্যান্ড ক্যানালের ছলাত্ ছলাত্ শব্দ। পান্নাসবুজ অ্যাড্রিয়াটিকের পানি। ঘণ্টার ঢং ঢং। তিনখানা করে গাছের গুঁড়ি বেঁধে তৈয়ার করা জলসড়কের নিশানা। কাঁচের লেই দিয়ে হীরা-চুনি-মরকত বানানোর ‘মুরানো’ গ্রাম, অটোমানদের ভয়ে পালিয়ে আসা কারিগরদের পাড়া। দীর্ঘশ্বাসের সেতু।          শ-চারেক ব্রিজ। ভেনিস।

ঘাটে অনেক রাত অবধি বিয়ারক্যান হাতে করে বসে থাকে ট্যুরিস্টরা। কেউ অপেক্ষা করে জলচর বাস ‘ভেপোরেত্তো’র। কেউ চুপচাপ মদ গেলে – মাংস চিবায়। কেউ কাছে ভিড়ে আসা আলজেরীয় দালালদের সঙ্গে শ্লথ কথোপকথন চালায় – একপর্যায়ে পাশে এসে ঠেসে বসে ভাসমান পতিতা। সরু গলুইয়ের গন্ডোলায় ওঠার জন্যে মাঝিরা ডাকতে থাকে বারংবার। রাতের ট্রেন হুইসেল দিতে দিতে এসে যায় তার চেনা স্টেশনে। ঘাটে শুয়ে শুয়ে আমি রাতের শহর দেখি। আকাশের দিকে সস্তা চীনা খেলনা ছুড়ে দিচ্ছে এশীয়রা, খেলনাটা ঘুরতে ঘুরতে শূন্যে উঠে যায়, আলো জ্বলে লাল-নীল-বেগুনি, তারপর নেমে আসে, খেলনার আলোতে চোখে পড়ে নিচে দাঁড়িয়ে থাকা এশীয় বিক্রেতার আলোহীন মুখ। যেখানেই সন্ধ্যার জোনাকির আগুনের মতন আকাশে ছুড়ে দেওয়া উড়ন্ত খেলনা দেখতে পাই, জানি সেই আলোর খেলনার অধোগমন অনুসরণ করলেই দেখবো অভুক্ত এশীয় মুখ। রাত বাড়ে, ক্লান্ত লাগে। মনে হয় আর্ক-অ্যাঞ্জেল ইসরাফেলের মতন একখানা ট্রাম্পেট হাতে করে অনন্তকাল ধরে বসে আছি শেষদিনের আশায়। হোটেলে এসে বেঘোরে ঘুম দিই।

এই নিয়ে তৃতীয়বার আমি ভেনিস এলাম। রীনাকে খুঁজতে। নিষ্ফল খোঁজাখুঁজি যদিও। প্রথমদিকের পাগলের মতন খুঁজে ফেরার উদ্যম ফুরিয়ে আসছে, পুলিশ-পুলিশের চর-গোয়েন্দা পুলিশ এইসবে ধরনা দিতে দিতে আমি এখন ক্লান্তবোধ করি, আমাকে ক্লান্ত করে ভাঙা ভাঙা ইংরেজিতে খেঁকিয়ে কথা বলা রীনার কাকার ওভারসিজ কল। কিন্তু কম্পাসহারা নাবিকের মতন এ-গলি সে-গলি ঘুরতে থাকি, গলিগুলিতে ঘুরতে ঘুরতেই হঠাৎ রীনার হাসিমুখ দেখে দৌড় দেব, এরকম একটা দারুণ আশা আমাকে ছাড়তে চায় না। আমাকে অহর্নিশ তাড়িত করে। কত কীই তো বিশ্বাস করে লোকে, কুইন্সল্যান্ডের কালোরা বিশ্বাস করতো মাছপোড়া আগুনে তাপ পোহালে মেয়েলোকের গর্ভ হয়, পাপুয়া নিউগিনির লোকে বিশ্বাস করতো পোসামের মাংস খেলে পুরুষলোকের গর্ভ হয় – আমার প্রত্যয় তো সে তুলনায় হ্রস্ব এবং খর্ব।

দিবারাত্র রীনার সংসারের চুল্লিতে আগুন জ্বালিয়ে রেখেছি গত একটি বছর। যেন রীনা এসেই দেখবে তার লাল কেতলিতে টগবগিয়ে ফুটছে চায়ের পানি, একটা নতুন ক্যানভাসে অ্যাক্রিলিক প্রাইমার চড়িয়েছি মাত্র। স্টিললাইফ অাঁকবো বলে।

 

দ্য চিজ স্ট্যান্ডস অ্যালোন…

আমার গায়ে নীলচে বেগুনি সব শিরা-উপশিরা, আমার নাম যশুয়া। খাবার টেবিলে হলুদ লেনটিল স্যুপে সবুজ মাইনাস চিহ্নের মতন যা ভাসছে তার নাম সজিনা। আমার স্ত্রীর নাম রীনা (রেগে গেলে ক্যাসোয়ারিনা ডাকতাম আমি)। আর ও-ঘরে যে-ঘামের গন্ধে সবকিছু গুমোট করে ঘুমাচ্ছে, ভারী নিঃশ্বাস পড়ছে, তিনদিন দাড়ি কামায়নি, ক্যাসিয়া গাছের ছালের মতন বাদামি, ওর নাম শিবু। রীনা শিবুকে ভালোবাসে। এই সিনপসিস লিখে রেখেছি কবে? রীনা দেখলে তুলকালাম করতো। আশ্চর্য, রীনার জন্যে এখানে কোনো রং নেই। রীনা কি রঙের? আমি এটা ভাবতে গিয়ে বর্ণান্ধ হয়ে যাই। আমার আনারসের আলো-আলো রঙ মনে হয়, তরমুজের গভীর লাল অন্ধকার মনে হয়। প্রচন্ড আলোতে চোখ বন্ধ করে ফেললে যেমন করে বন্ধ চোখের ভেতরে রঙের খেলা চলতে থাকে, সেইরকম। বরাবরই।

সজিনার নাম মনে আছে দেখলে রীনা খুশি হতো। প্রথম যখন সজিনা খেতে গিয়ে বললাম, ‘এটা তো রিভার রিড, একটু নাড়া দিলে এর আড়ালে মোজেসের ঝুড়ি দেখা যাবে!’ সে খুব রাগ করেছিল, শিবুর সঙ্গে চোখাচোখি হয়েছিল ওর, ওরা রাগের তরল বিনিময় করেছিল চোখের পেয়ালায় ঠোকাঠুকি করে। ওরা সজিনা ভালোবাসে, সজিনা আর লেনটিল স্যুপ দিয়ে মেখে ভাত খায়। পাঁচফোড়ন (আমি এই গন্ধ চিনি) আর টমেটো দেওয়া সেই স্যুপ আমি সইতে শিখছিলাম। বলতে শিখেছিলাম – আমি ভাত খাই, ডাল খাই, সজিনা খাই, কিন্তু রীনার ধৈর্য ছিল না। ও সহসা আমার কাছে মুখোমুখি বসে ভাত মেখে খাওয়ার গভীর বাঙালিয়ানা যাঞ্চা করতে শুরু করেছিল। বহিরঙ্গে। অন্তরঙ্গে ক্যাসিয়া গাছের ছাল চাইতে শুরু করেছিল সে। আমি টের পেতে শুরু করেছিলাম।

এখন এইসব বলে লাভ কী। সবই অভিযোগের মতন শোনায়। আমি অভিযোগ করতে পারি না, অন্তত সশব্দে করতে পারি না। আমি চাইতেও পারি না, শখের পদ খেতে চাইতে পারি না, একান্ত নারীকে বন্যবরাহের মতন চাইতে পারি না। আমি একটা স্ফটিকের পাত্রের মতন যে কোনো আধেয়র রং ধারণ করি কেবল, পানি হলে জলীয়, কপার সালফেট হলে নীল।

আমি রীনার গায়ে আনারস কিংবা তরমুজের ঘ্রাণ খুঁজতাম, আলোকরশ্মির মতন ফল, সরস, টইটম্বুর, শুধু আলো, শুধু হাসি। যেসব দেশে রোদ চাইতে হয় না, যেসব দেশে ছায়া মানেও উত্তাপ, সেসব দেশ খামে করে ‘রীনা’ হয়ে এসেছিল আমার কাছে।

আকাট গাড়লের মতন আমি জিজ্ঞেস করতাম – ‘তোমাদের দেশের বিয়েতে ‘মনসুন ওয়েডিং’ মুভিটার মতন বৃষ্টিতে নাচানাচি হয়?’

রীনা ফট করে খেপে যেত, বলতো, ‘হয়, হয়, হাতির পিঠে হাওদায় করে বর আসে, বরের পাশে মিতবর আসে একটা সাপুড়ে আর একটা রোপ-ট্রিক দেখানো ম্যাজিশিয়ান!’

আচ্ছা, ভারতবর্ষ মানে ক্যামডেন টাউনের হিপ্পিদের শখ করে জ্বালানো আগরবাতি আর বাটিকের বিছানার চাদর, ভারতবর্ষ মানে রায়ট-রেড টিক্কা মাসালা বা ম্যাড্রাজি কারি, ভারতবর্ষ মানে বড়জোর রানি ভিক্টোরিয়ার মুনশিজি, বাংলাদেশের নামই আমি জানতাম না, আমার ভেতরে সজিনা ঢুকিয়ে দিতে চাইলে হবে?

– ‘তুমি কী খেতে ভালোবাসো যশুয়া?’

– ‘টোড ইন দ্য হোল।’

– ‘সে কি? কুনোব্যাঙ গর্তে ডুবিয়ে খাওয়া?’

– ‘না না, সসেজ বেশ করে ডিম আর আটার কাঁইয়ে ডুবিয়ে বেক করে…’ এইটুকুন বলতে বলতে দেখি রীনা টোড ইন দ্য হোল নামটায় যৌন কৌতুক খুঁজে পেয়ে ছিটকে উঠেছে, হাসতে হাসতে শুয়ে পড়েছে সে।

পিঠের ব্যথায় কাতর রীনাকে হয়তো এগিয়ে এসে বলেছি – ‘শ্যাল আই রাব ইওর ব্যাক?’ ও চোখ আধ-খোলা করে বলেছে – ‘নো, রাব মাই ফ্রন্ট!’ আমাদের আসলে আর কিছু ছিল না। নাম – দেশ-ফুল-ফল-কররেখা-জন্মদাগহীন পৃথিবীতে যাওয়ার ওই একটিমাত্র সেতু, চীনা রূপকথার সেই হাজার হাজার দোয়েলের ডানা জুড়ে বানানো সেতু, তার একমাত্র নাম – শরীর। সেখানে আমাদের ভালো নাম ছিল না, পৈতৃক পদবি ছিল না, ভিটেমাটি ছিল না, ন্যাশনাল আইডি ছিল না। এবং সজিনা ছিল না। অন্তত প্রথমদিকে তো নয়ই।

আচ্ছা, রীনাকে শুধু সজিনা-লেনটিল স্যুপ-ভাত রাঁধা মানুষ ভাবলে অবিচার করা হবে। রীনা লেখালেখি করতো, তার ছদ্মনাম ছিল ‘ইশতার’, আমার তেত্রিশ বছর বয়সের ওপরে একটা ফালক্রাম, তাতে রীনা কিংবা ইশতার বসা, কালোর ওপরে ভার্মিলিয়ন রঙা মাছ অাঁকা শাড়ি পরা। (এই শাড়িটাতে আমি তাকে প্রথম দেখি), আমার কোলে বসে টসটস করে চোখের পানি ফেলতে ফেলতে ডেথ ইন ভেনিস দেখছে (আমাদের একত্রে দেখা প্রথম মুভি)! আর কে-ই বা আমার মায়ের পোষা মোরগের নাম রাখবে ‘জ্যার্ক’, মিলিত হওয়ার ক্লান্তিতে ঝরে পড়তে পড়তে কে-ই বা ইয়েটসের ‘থিংস ফল অ্যাপার্ট, দ্য সেন্টার ক্যান্নট হোল্ড’ বলবে আর হিহি করে হাসবে? কে আর ‘ইউ শ্যাল নট ওয়াশ ডিশেস অর ফিড দ্য সোয়াইন’ বলতে বলতে বাসন মাজবে?

আগেই বলেছি, রীনা চট করে রেগে উঠতো, কিন্তু এমনিতে সে ছিল স্যানাটোরিয়ামের মতন, অতিথিপরায়ণ-পরিচ্ছন্ন-হাসিখুশি – এরকম আগলাভাব তাকে কখনো আপন হতে দিত না – আকারের চেয়ে তাকে দীর্ঘ দেখাত, গালের হনু একটু উঁচু ছিল তার, ঠোঁট ঢেউ খেলানো আর পুরু, চুলগুলি কুচকুচে কালো আর উর্মিল।

ওইরকমই ছিল সে, আপাতসরল, হ্রদের মতন শান্ত চোখ, (রুটির কোন পিঠে মাখন লাগনো তাই বোঝে না এমন) তারপর অাঁরি রুশোর ছবির মতোই বড় বড় পাতাময় জঙ্গল থেকে কেঁদো বাঘ বের হতো হঠাৎ। হাসি-রাগ-কান্না-উচ্ছলতা-মায়া। মাঝে মাঝে মনে হতো মানুষের সঙ্গে নয়, আমি চলেছি ল্যান্ডমাইন সংকুল কোনো প্রান্তরের ওপর দিয়ে, কখন বিস্ফোরিত হবে কি, কেউ জানে না।

 

অ্যাশেজ, অ্যাশেজ উই অল ফল ডাউন…

রীনার মতনই রীনার মেইল কিংবা টেক্সট, কখনো সোডালাইম গ্লাস কখনো বেরোসিলিকেট গ্লাস – নরম কিংবা শক্ত যা-ই হোক, স্বচ্ছ আর ভঙ্গুর। আমার খুলে রাখা ল্যাপটপে ভেনিস থেকে পাঠানো রীনার মেইলগুলি, যে কোনো একটা খুলে পড়তে বসে যাই প্রতিদিন।

‘সকালে আমার ঘুম ভাঙালো আলো ঝলসানো ভেনিস।

তার খালের জলে ঝপ করে ঝাঁপ দেয় শিকারি গাঙচিল।

জলের পাড় ধরে পচতে থাকে কবেকার বাড়িঘরের অব্যবহৃত সদরদরজা, পরিত্যক্ত খিড়কি। এইসব দরজা একদিন পসারীদের বেসাত কেনার জন্যে খুলে যেত নিশ্চয়ই।

গির্জার বাঁধাই চত্বরে ভনভন করে মাছি। কাগজের মোড়ক খুলে বাসি রুটি খেতে থাকে কোনো বুড়ি। কানাগলিতে এসে চমকায় গৈরিক রোদ।

জানালায় জানালায় সিঁদুর লাল ফুল আর সাদা-নীল ডোরাকাটা পর্দা। শ্যাওলারঙা শার্সি।

মরচেরঙা দেয়াল। সোনালি ম্যুরালে বাঁক দেওয়া মোরগ।

ঝাউগাছে ঘুণ্টির আকারের ফল, ফলের রং ধূসর পাউডার মাখা নীল মার্বেলের মতন।

ভিলাগুলির চাতালে ফুটেছে ম্যাজেন্টা বাগানবিলাস।

আমার সঙ্গে ঘুরতে থাকে চাপড়া চাপড়া রং – পান্নাসবুজ-সিঁদুরে টেরাকোটা-সাদা-নীল-শ্যাওলা-মরচে। আমার সঙ্গে ঘুরতে থাকে থেমে থাকা সময়ের তাবত অনুষঙ্গ – কনস্ট্যান্টিনোপলের ব্রোঞ্জের ঘোড়া-পাদুয়ার রিফিউজি-মুরদের সাদা গোলাপের মতন ফুটে উঠতে থাকা প্রাসাদ-ব্ল্যাক ডেথে মরে যাওয়া মানুষ।

যশুয়া, সেইন্ট মার্কের প্লাজায় দাঁড়িয়ে গতকাল ঝিঁঝিঁ-সবুজ সন্ধ্যাবেলা আমার মনে হলো – আমার বয়েস নেই, আমি অন্তহীন, স্থির। আমি ক্ষুধাবোধ করি না। ঘুম আর জাগরণের পার্থক্য করতে পারি না। আমি রতিক্রিয়ার জন্যে অতিশয় প্রাচীন। আমি শমে পৌঁছে গেছি কবে।

তারপরেই আকাশে দেখি উড়ন্ত চীনা খেলনা, এশিয়ার ফেরিওয়ালারা ছুড়ে দিচ্ছে আর লুফে নিচ্ছে। আমার নিজেকে সেইরকম মনে হতে থাকে, আকাশের দিকে নিক্ষেপ করার সময়টুকুতে আমি জ্বলেছি, তারপর মাটি স্পর্শ করামাত্র আমার বাতি ফুরিয়ে যাবে – হঠাৎ করেই আমার ছোট কাকার কথা মনে পড়ে। ইতালিতে এসে দীর্ঘদিন ভাগ্যবদলের চেষ্টা করেছিল আমার ছোট কাকা, অজ্ঞাতবাসে থেকেছে, জেল খেটেছে, জেল পালিয়েছে, ভাগ্য বদলাতে না পারার শোকে পাগল হয়ে গেছে একদিন, তারপর মরে গেছে। কে বলে মানুষ ধ্বংস হয় তবু পরাজিত হয় না, মানুষ আমূল পরাজিত-দলিত-পিষ্ট হয়, নিশ্চিহ্ন হয়। এই শহরের কোথাও এই অসুখী এশীয় ফেরিওয়ালাদের মতোই কি ছোট কাকা চত্বরগুলিতে ফেরি করে ফিরতেন? পুলিশের তাড়া খেয়ে লুকাতেন গলিতে গলিতে? তারপর টহল-পুলিশ চলে গেলেই একগাল হেসে পসার সাজিয়ে বসতেন? জীবন বদলাবার অনির্বাণ তৃষ্ণায় পাগল মানুষগুলির জন্যে আমার ভেতর ফেটে যেতে থাকে, চেহারা ভুলে যাওয়া ছোট কাকার জন্যে আমি শোকার্ত হই।

যশুয়া, সান মার্কো আজকে আমাকে কাঁদিয়েছে।’

পরদিন শুধু লেখা একটা উদ্ধৃতি –

‘ইতালি, ইতালি এত রূপ তুমি কেন ধরেছিলে হায়/ অনন্ত ক্লেশ লেখা ও ললাটে নিরাশার কালিমায়…’

তার পরদিন –

‘ওহঃ, আমি আজকে দুপুরে কালো ক্যাটলফিশ খেয়েছি, তার কালি দেওয়া ঝোলে ভাসছিল হলুদ পোলেন্টার চাঙড়, দেখতে যত বিচ্ছিরি খেতে ততো না। তবে ক্যাটলফিশের গায়ের গন্ধ কেমন যেন, পুরুষ মানুষের গায়ে যেমন নিজস্ব গন্ধ থাকে, একটা আফটারটেস্ট থাকে, সেইরকম।’

তার পরের দিন দুপুরে –

‘আমার গুরু অস্কার ওয়াইল্ডের অগ্রগণ্য অপরাধ হিসেবে লোকে সমকামিতাকেই দেখলো, তাঁর সবচেয়ে বড় অপরাধ ছিল এই বয়ান করা যে – সামনের দিনগুলোতে লোকে কেবল সবকিছুর দর জানবে, কিছুর মূল্য জানবে না, এতবড় সত্য বলার অপরাধটা কেউ দেখলো না। এখানে ক্যানালগুলিতে ভাসি আর মনে মনে ভাবি, এইরকম করে কোনো ডাইনি দন্ডাদেশ দিয়ে ভেনিসের সময়কে থামিয়ে দিয়েছে, সেই ডাইনিকে আমাদের ঢাকা শহরে নিয়ে যাওয়া যেত না? কেমন হতো পুরনো ঢাকার চেহারা তখন? অজস্র খাল, খালগুলোয় বেদেবহর, খালগুলির পাড় তালগুঁড়ির পৈঠা দেওয়া। কোথাও অজস্র কাশবন। কোথাও সুপারিবাগান। কোথাও চাটাইঘেরা দোকানে চাল-ডাল-তেল-নুনের দোকান। নদীতীরে রূপলাল হাউস। পুরনো বাঁধ।

যশুয়া, গতকাল সন্ধ্যাবেলা আমি ওই ফেরিওয়ালাদের সঙ্গে কথা বলেছি, সময় কাটিয়েছি, আজকে তাদের বাড়িতে খেতে বলেছে আমাকে।’

রীনার শেষ টেক্সট ফোনে যখন এসেছিল আমি সেটা মুছে ফেলেছিলাম, মেইল বক্স, উপচে উঠছিল বলে ফেলে দিয়েছিলাম, কে জানতো এটা তার শেষ টেক্সট, আমি তো ভেবেছি এইরকম কত এসেছে, এইরকম আরো কত আসবে, টেক্সট পাওয়ার জন্যে আর পড়ার জন্যে আগামী একজীবন পড়ে আছে।

অনর্গল কথা বলতো সে, তার মেইলগুলিও ছিল উচ্ছ্বসিত, সারা সকাল ধোয়া কাপড় রোদে দিতে দিতে সে গাইতো, শেকলের মতন – লহরীর মতন পেঁচানো সুর। রীনার কথা বলার বিষয়ও ছিল বিচিত্র। কথা বলছি একটা বিষয় নিয়ে, সেটা আচমকা ঘুরে যাবে আরেকদিকে। তার কথোপকথনে প্রায়ই ছিটকে উঠতো বাংলা শব্দ, ‘একদম’ (মানে কমপ্লিটলি), ‘আচ্ছা’ (মানে ওকে), ‘শালা’ (মানে আমি তোমার বোনকে অশোভনার্থে বিয়ে করি)। আজকে আমি বিশদ করে রীনা-তর্পণে মেতেছি, এতদিন রেস্তোরাঁতে ন্যাপকিনের ফুলটার মোচা ভেঙে যেমন অনায়াসে কোলে পেতে নিয়েছি তেমন অনায়াসেই রীনার ভাঁজ ভেঙেছি, তার সঙ্গে ব্যবহারিক জীবনযাপন করেছি – কেউ যদি আমাকে জিজ্ঞেস করে রীনা কোন ফ্লেভারের আইসক্রিম খেয়ে ওয়াক থুঃ বলে, সে আমি নির্দ্বিধায় বলে দিতে পারি – স্ট্রবেরি, কিন্তু তাকে কতদূর চিনেছিলাম তা আমি বলতে পারব না।

রীনা হয়তো জিজ্ঞেস করবে – ‘তুমি আমার কোন তিলটা ভালোবাসো?’ আমি অবাক হয়ে ভেবেছি – তিল তো তিল, গরমকালে আলোয় উড়ন্ত পোকার মতন রাশি রাশি টফিরঙা তিলে আমার নিজেরই মুখ আর শরীর ভরে যেত – রীনার তিল নিয়ে আমার আদিখ্যেতা করার কিছু তো ছিল না! রীনার মুখ অন্ধকার হয়ে যেত আমাকে নিরুত্তর দেখে।

কেন সে কেঁদেছিল প্রথম যেদিন আমি সবিস্ময়ে জিজ্ঞেস করেছি – পিউবিক হেয়ার শেভ করার দরকার কি, কেন এই পরিচর্যা? ও কি ভেবেছিল ওকে আমি বেজাত কোনো স্পেসিমেন ধরে নিচ্ছি? কিংবা ওর হয়তো মনে পড়ে গিয়ে থাকবে আমার আগের প্রেমিকাদের সঙ্গে সরল শারীরিক সখ্যের কথা। আবার একদিন ছুটির দুপুরে অথৈ নৈঃশব্দ্য সাঁতরে ভেসে উঠে আনমনা রীনা বলেছিল – ‘জানো, ক্রুসেডের শেষে যোদ্ধারা যখন নিজের শহরে ঢুকতো, তখন তাদের প্রফেট বলেছিলেন দিনে না প্রবেশ করে নিজ নিজ শহরে রাতে প্রবেশ করতে, যেন তাদের নারীরা এতদিনের বিরহবেশ কাটিয়ে কেশবিন্যাস করতে পারে, বস্তিদেশের রোমরাজি উন্মূল করতে পারে।’

একা একা বসে খাওয়া মানুষ দেখলে কেন তার চোখে পানি আসতো – তার এইসব ভাবালুতায় আমার রীতিমতো অসহায় লাগতো – একা খেতে বসা মানুষ মানেই তো অনিকেত মানুষ নয়। (‘আমি হাঁস হলেও হবো পেপিয়ার ম্যাশের হাঁস, যশুয়া!’) আমাকেও সে প্রথম আবিষ্কার করেছিল ক্যান্টিনে, কোণের দিকে বসে এক সোমবারে গোগ্রাসে সেদ্ধ পাস্তা গিলছি। মঙ্গলবারেও তাই। বুধবারেও তাই। শনিবার নাগাদ রীনা আমার প্রেমে পড়ে গেল আর ছলছল চোখে তার লাঞ্চবক্সের ডালা খুলে বের করলো রেঁধে আনা খাবার। লাঞ্চবক্সকে সে ডাকতো – টিফিনবক্স। হেসেছিলাম বলে রাগ করেছিল সে। ‘উইকেড’, ‘ক্লেভার’ এই শব্দগুলি যে ধনাত্মক অর্থে ব্যবহৃত হতে পারে, সেটা সে জানতো না। এসব বহুকাল আগের কথা, শিবু তখনো আমাদের জীবনে ফ্লাডগেট খুলে ঢুকে পড়েনি।

 

দ্য ডিশ র‌্যান আওয়ে উইথ দ্য স্পুন…

প্রথমদিকে আমার আর রীনার মেইলের সূত্র ধরে ইতালির পুলিশ অনেক এশীয় ফেরিওয়ালাকে হেনস্তা করেছে। আটকে রেখেছে, জবানবন্দি নিয়েছে, বাড়ির খানাতল্লাশি করেছে। কারা তাকে নিমন্ত্রণ করেছিল, সে নিমন্ত্রণ রীনা রক্ষা করেছিল কি না সেসবের কোনো ক্লু মেলেনি। রীনা কয়েকটা দিন ভেনিসের পথঘাট চষে বেড়িয়ে শহরটার অস্থিমজ্জা শুষে নিয়ে কর্পূরের মতন উবে গেছে যেন।

আমি অস্বীকার করবো না, সিন্দবাদের একচোখো দানবের মতন আমার প্রথম চোখ পড়েছিল শিবুর ওপর। রীনার পরম মিত্র ছিল শিবু। রীনা বেড়াতে যাওয়ার পুরো সময়টা শিবু ছিল না এদেশে –  কোথায় ছিল সে? দুশ্চিন্তায় উন্মাদ আমি পুলিশকে আমার সন্দেহের কথা বলে ফেলেছিলাম। শিবনাথ বুদ্ধিহীন চোখে আমার দিকে অনেকক্ষণ তাকিয়ে ছিল থানা থেকে ফিরে এসে। কিন্তু কাপড়চোপড় গুছিয়ে এ-বাড়ি থেকে চলে যায়নি। চলে গেলে আমি তার পিছু নিতাম। পেছন পেছন গিয়ে দেখে আসতাম অন্য কোথাও অন্য কোনোখানে রীনা আর শিবু নিজেদের করে সংসার পেতেছে কিনা। তার অপার দয়া, সে আমাকে কোনো প্রশ্ন করেনি, অবশ্য কী প্রশ্ন করতো সে? জিজ্ঞেস করতো – ‘যশুয়া তুমি আমাকে সন্দেহ করো? আমাকে?’ কেমন হাস্যকর শোনাতো সেটা? হাস্যকর কিছু শিবনাথ করেনি।

শিবুকে যা টেনেছিল রীনার দিকে, সম্ভবত আমাকেও একই জিনিস টেনেছিল। রীনা, রীনার বাড়িভর্তি পোষা বেড়াল-কুকুর-পাখি-হ্যামস্টার, রীনার বাচ্চা টিনটিন, রীনার অবিরাম চষে যাওয়া একফালি সবজি বাগান – এই একবার তার বেড়াল হ্যামস্টারদের ঘরে ঢুকে গণহত্যা চালিয়ে আসছে, এই তার কুকুর মাত্র ফলতে শুরু করা স্ট্রবেরির টুকরিসুদ্ধ খেয়ে ফেলছে, টিনটিন শসার চাকতিতে কামড় দিয়ে আধখানা চাঁদ বানিয়ে তার মাকে দিচ্ছে – ‘মুউন, মা দিস ইজ মুউন!’ তো লালাসিক্ত শসার চাঁদ খেতে পেয়ে রীনাকে কৃতার্থভাব করতে হতো, মাঝেমাঝে তাতে তার আগ্রহ থাকতো, সময় সময় বিরক্ত হয়ে উঠতো। ঠাসঠাস হাত চালিয়ে দিত। রীনার একটাই বাচ্চা, ছটফটে মোটাসোটা আদুরে বাচ্চা মেয়ে, বয়েসের তুলনায় বড্ড পাকা, আমরা তাকে টিনটিন ডাকতাম। এক-দুবার গেলেই বাড়িটা কেমন যেন পাকিয়ে পাকিয়ে বেঁধে ফেলতো কোনো অদৃশ্য স্কুইডের মতন, আশপাশে ঢেলে দিত স্কুইডের কালির আরক, আর কিছু চোখে পড়তো না, শুধু একটা জড়িয়ে যাওয়ার পেঁচিয়ে যাওয়ার অনুভূতি।

পুলিশ আমাকেও ছেড়ে কথা কয়নি। এশিয়ান মুসলিম নারীদের রক্ষক সংগঠনগুলি আমার পেছনে উঠেপড়ে লেগেছিল, কেন হঠাৎ রীনা একাই ভেনিস বেড়াতে গেল? কেন আমি তার সঙ্গে যাইনি? কেন তাকে আমি যথেষ্ট ভরণপোষণ করতাম না? আমি কি তাকে আঘাত করতাম বা তাকে আঘাত করার জন্যে তার কুকুর-বেড়ালকে আঘাত করতাম? যেন আর একটু তাড়না করলেই বাড়ির পেছনের বাগান থেকে মৃত রীনার লাশ পাওয়া যাবে।

মাঝে মাঝে ইচ্ছা হয় শিবুকে ডেকে রীনার গল্প করি, কেন তাকে একবার নিজ থেকে হাতের পাতায় এসে বসা প্রজাপতির মতন পেতাম, আরেকবার তার অধিকার এমন করে হারাতাম যেন আমরা কোনোদিন একে অপরের সঙ্গে অন্তরঙ্গ জীবন কাটাইনি? এইসব প্রশ্ন করেই বা লাভ কি? আমি তো বলেইছি আমি অভিযোগ করতে পারি না। একা আর কত প্রলাপ বকবো, টিনটিনও তো এখন ঘুমের ভেতর মা-মা করে কেঁদে ওঠে না আর। শিবু অবশ্য এইরকম স্মরণসভা করবে না আমার সঙ্গে, গনগনে চোখে তাকিয়ে চলে যাবে কাজে, তার সময় কই?

হয়তো ছত্রপ্রিত সিংয়ের মতনই রীনা নিরাসক্ত পায়ে হেঁটে ঘুরে বেড়াচ্ছে দেশ থেকে দেশে, সে ভুলেই গেছে তার প্রিয় লাল কেতলিতে ফুটতে থাকা চায়ের পানি, একজিমাগ্রস্ত শিশুকন্যাকে। কোনো পরিত্যক্ত স্কাউট হাটে কেউ তাকে গলা মুচড়ে মেরে রেখে গেছে – কোনো কানাগলিতে রীনা অপরিচিত নিমন্ত্রণের বলি হয়েছে – এইসব ভাবতে আমার ভালো লাগে না। আমি ভাবতে চাই, রীনা লুসি গ্রের মতন তুষারঝড়ে আটকা পড়েছে কোথাও। আর নয়তো ছত্রপ্রিত সিংয়ের মতন চলেছে। পায়দল।

শেয়ার করুন

Leave a Reply