এইচএসবিসি-কালি ও কলম তরুণ কবি ও লেখক পুরস্কার ২০১৩ তোরা সব জয়ধ্বনি কর

লেখক:

আবসার জামিল

 চৈত্রের বিকেল। তবে গত কয়েকদিনের মতো রোদের তেজ তেমন ছিল না। কারণ আগের দিন রাতেই একপশলা শিলাবৃষ্টি আর ঝড় কমিয়ে দিয়েছিল উত্তাপ। শহুরে বাতাসে ছুটির আমেজ। দিনটি ছিল সাপ্তাহিক ছুটির দিন। শুক্রবার। এমন দিনে এক জমকালো আয়োজনে ষষ্ঠবারের মতো নবীন কবি ও লেখকদের পুরস্কৃত করে সাহিত্যবিষয়ক মাসিক পত্রিকা কালি ও কলম এবং এইচএসবিসি ব্যাংক।

গত ৪ এপ্রিল বাংলা একাডেমির আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ মিলনায়তনটি সাজানো হয়েছিল শৈল্পিকভাবে। সুদৃশ্য মঞ্চের পেছনে ব্যানারে লেখা ছিল – ‘তরুণ কবি ও লেখক পুরস্কার ২০১৩’। আলোকোজ্জ্বল মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন দেশবরেণ্য লেখক ও গুণীজন এবং সামনের দর্শকসারিতে শিল্প-সাহিত্য সংশ্লিষ্ট নবীন-প্রবীণদের প্রাণোচ্ছল সম্মিলন। দর্শক-শ্রোতাদের তুমুল করতালি ও প্রশংসাসুধায় ভাসলেন পাঁচ প্রতিভাবান লেখক ও লেখিকা। এবার দুটি নতুন সংযোজন ঘটল এ পুরস্কারের ক্ষেত্রে – প্রথম কোনো নারীর এ পুরস্কার অর্জন, যদিও লেখিকা যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী হওয়ায় পুরস্কার নিতে আসতে পারেননি এবং দ্বিতীয়ত শিশু ও কিশোর শাখায় পুরস্কারপ্রদান। ২০১০ সাল থেকে শিশু ও কিশোর সাহিত্য বিভাগে পুরস্কার দেওয়ার অবিপ্রায় ঘোষণা করা হয় কিন্তু মানসম্মত বই জমা না পড়ায় তা দেওয়া হয়ে ওঠেনি। এবার সে বন্ধ্যাত্বও ঘুচল। সাহিত্য শিল্প ও সংস্কৃতি বিষয়ক মাসিক পত্রিকা কালি ও কলম ২০০৮ সাল থেকে প্রতিবছর এইচএসবিসি ব্যাংকের পৃষ্ঠপোষকতায় দেশসেরা তরুণ কবি ও লেখকদের এ-পুরস্কার প্রদান করে আসছে।

এবার পুরস্কারপ্রাপ্ত কবি ও লেখকদের মধ্যে ছিলেন – কবিতায় একাকী জমিন গ্রন্থের জন্য মাসুদ পথিক, কথাসাহিত্যে বিতংস গ্রন্থের জন্যে ওয়াহিদা নূর আফজা, প্রবন্ধ ও গবেষণায় সমকাল পত্রিকার সাহিত্যিক ও সাংস্কৃতিক ভূমিকা গ্রন্থের জন্য ড. রবিউল হোসেন, মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক সাহিত্যে একাত্তরে মুজিবনগর : দলিল ও ইতিহাস গ্রন্থের জন্য রাজিব আহমেদ এবং শিশু ও কিশোর সাহিত্য বিভাগে বিলু কালু আর গিলুর রোমাঞ্চকর অভিযান গ্রন্থের জন্য মাশুদুল হক।

নবীন কবি ও লেখকদের সাহিত্যচর্চা ও সাধনাকে গতিময় এবং বাংলাদেশের তরুণদের সৃজনধারাকে সঞ্জীবিত করার লক্ষ্যে এইচএসবিসি ও কালি ও কলম ২০০৮ সাল থেকে তরুণ কবি ও লেখক পুরস্কার প্রবর্তন করেছে। সে-বছর দুটি শাখায় দেওয়া হয়েছিল পুরস্কার। সাহিত্যের সব শাখাকে অন্তর্ভুক্ত করার লক্ষ্যে ২০০৯ সাল থেকে পুরস্কার দেওয়া হয় তিনটি শাখায়। পরের বছর যোগ করা হয় আরো দুটি শাখা। মুক্তিযুদ্ধ এবং শিশু ও কিশোর সাহিত্য। ফলে পুরস্কার প্রদানের বিভাগ দাঁড়ায় মোট পাঁচটি।

পাঁচজন কবি ও লেখকের প্রত্যেককে এক লাখ টাকা, একটি মেমেন্টো ও শংসাবচন প্রদান করা হয়। এছাড়া প্রত্যেককে দুই বছরের জন্য কালি ও কলমের সৌজন্য গ্রাহক করে নেওয়া হয়। বিজয়ীদের হাতে এ-পুরস্কার তুলে দেন প্রধান অতিথি সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর ও বিশেষ অতিথি বাংলাভাষার বিশিষ্ট কবি নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন কালি ও কলম পত্রিকার সম্পাদকমন্ডলীর সভাপতি অধ্যাপক আনিসুজ্জামান। বিচারকমন্ডলীর পক্ষে সভাপতি অধ্যাপক জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী পুরস্কারপ্রাপ্তদের নাম ঘোষণা করেন। মঞ্চে উপবিষ্ট অন্যদের মধ্যে ছিলেন বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান এবং কালি ও কলমের প্রকাশক বিশিষ্ট শিল্পানুরাগী আবুল খায়ের, এইচএসবিসির করপোরেট ব্যাংকিং প্রধান মো. মাহবুব-উর-রহমান এবং কালি ও কলম সম্পাদক আবুল হাসনাত। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন কালি ও কলমের সম্পাদকমন্ডলীর সদস্য লুভা নাহিদ চৌধুরী।

অনুষ্ঠানের সূচনায় শুভেচ্ছা জানিয়ে বক্তব্য রাখেন লুভা নাহিদ চৌধুরী। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের তরুণ কবি এবং লেখকদের সৃজনধারা ও সাহিত্যকর্মকে আরো গতিশীল করার লক্ষ্যে ২০০৮ সাল থেকে বিশ্বের স্থানীয় ব্যাংক এইচএসবিসি ও মাসিক সাহিত্য পত্রিকা কালি ও কলম তরুণ কবি ও লেখক পুরস্কার প্রবর্তন করেছে। আগেরবারের তুলনায় ২০১৩ সালে আমরা তরুণ লেখকদের অধিক সাড়া পেয়েছি। বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকেও বই জমা পড়েছিল। আমরা বিশ্বাস করি, বাংলাদেশের তরুণ কবি ও লেখকদের সাহিত্যচর্চা ও সাধনার মধ্যেই নিহিত আছে এদেশের সাহিত্যের বিকাশ প্রক্রিয়া। বাংলাদেশের সাহিত্য-আন্দোলনকে আরো গতিশীল করার লক্ষ্য নিয়ে আমরা দীর্ঘ এগারো বছর ধরে কাজ করে যাচ্ছি।’

জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী এইচএসবিসি-কালি ও কলম তরুণ কবি ও লেখক ২০১৩-এর পুরস্কার বিজয়ীদের নাম ঘোষণা করেন। এরপর নবীনের সৃজনকর্মের ওপর লেখা শংসাবচন পাঠ করেন অধ্যাপক বিশ্বজিৎ ঘোষ ও অধ্যাপক মাহবুব সাদিক। এতে মাসুদ পথিকের সৃজনকর্ম নিয়ে বিচারকরা বলেন, ‘বাংলাদেশের গ্রামীণ জীবন, ক্ষয়ে আসা পুরনো মূল্যবোধ, প্রণয় আর প্রতারণা আর গোপন সব চেতনা মাসুদ পথিকের কবিতায় নিজস্ব ঢঙে চমৎকারভাবে চিত্রিত হয়। মাসুদ পথিকের কবিতায় থাকে দর্শনের ছোঁয়া।’ ওয়াহিদা নূর আফজা ও তাঁর রচনা প্রসঙ্গে বিচারকরা বলেন, ‘সামাজিক বিতংস নারীকে কীভাবে বন্দি করে, কীভাবে নষ্ট করে দেয় তার ব্যক্তিক অস্তিত্ব, …         সে-কথাই যেন ব্যক্ত করেছেন ওয়াহিদা নূর আফজা বক্ষ্যমাণ উপন্যাসে। এ-উপন্যাস নারীর চোখ দিয়ে পৃথিবী দর্শনের অনুপম এক শিল্পযাত্রা। এ-উপন্যাসে বাংলাদেশের হাজার-লক্ষ নারী যেন ভিড় করেছে তাদের না-বলা কথা বলতে।’ ড. রবিউল হোসেন প্রসঙ্গে বলেন, ‘পরিশ্রম, প্রযত্ন ও নিষ্ঠার এক অনুপম স্বাক্ষর রবিউল হোসেনের সমকাল পত্রিকার সাহিত্যিক ও সাংস্কৃতিক ভূমিকা।’ রাজিব আহমেদ ও তাঁর গ্রন্থ সম্পর্কে বিচারকদের মূল্যায়ন, ‘শিকড়-সন্ধানী গবেষক রাজিব আহমেদের গবেষণায় উঠে এসেছে মুজিবনগর সরকার সম্পর্কে জানা-না-জানা অনেক তথ্য। এ বই হয়ে উঠেছে মুজিবনগর সরকার সম্পর্কে ঐতিহাসিক এক দলিল।’ সবশেষে মাশুদুল হকের রচনাশৈলী সম্পর্কে বিচারকরা বলেন, ‘মাশুদুল হক নবীন লেখক – প্রধানত কাজ করছেন শিশুদের নিয়ে। তাঁর লেখার ভুবন শিশু-কিশোরদের রোমাঞ্চকর সব অভিযানে পূর্ণ, যা শিশুদের করে তোলে স্বপ্নমুখী সূর্যমুখী রক্তমুখী।’

শুভেচ্ছা বক্তব্যে এইচএসবিসির করপোরেট ব্যাংকিং প্রধান মো. মাহবুব-উর-রহমান প্রথমেই এই আয়োজনের জন্য কালি ও কলমকে ধন্যবাদ জানান। এবারই প্রথম পাঁচটি বিভাগে পুরস্কার প্রদান করতে পারায় তিনি উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে বলেন, ‘গতবার শিশু ও কিশোর সাহিত্যে পুরস্কার প্রদান করতে না পারায় আমি বলেছিলাম, এদেশে শিশু ও কিশোরদের নিয়ে তেমন কোনো সাহিত্য হচ্ছে না। কিন্তু এবার সব বিভাগে পুরস্কার প্রদান করতে পারায় আমরা অত্যন্ত আনন্দিত।’ তিনি এ-পুরস্কারের ধারা অব্যাহত রাখার প্রত্যয় এবং একই সঙ্গে তরুণ কবি ও লেখকদের পরিচর্যায় কালি ও কলম পরিব্যাপ্ত থাকবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

বিশেষ অতিথি বাংলাভাষার বিশিষ্ট কবি নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী তাঁর বক্তব্যের শুরুতেই পথে দেরি হয়ে যাওয়ায় সবার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করেন। এইচএসবিসি ও কালি ও কলমকে তরুণ কবি ও লেখক পুরস্কার প্রদানের জন্য ধন্যবাদ জানিয়ে তিনি বলেন, ‘এ পুরস্কার প্রদানের মাধ্যমে কালি ও কলম নতুনদের নয়, নিজেদেরই সম্মানিত করছে।’  তিনি হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন, ‘নতুন কবি ও লেখকদের নতুন ধারায় লিখতে হবে। পুরনোদের পথে হাঁটলে চলবে না। আমরা একটি বিদেশি কবিতার অনুবাদ পড়েছি, যা এরকম – ‘মহাজ্ঞানী মহাজন যে পথে ক’রে গমন হয়েছেন প্রাতঃস্মরণীয়/ সেই পথ লক্ষ্য ক’রে স্বীয়কীর্তিধ্বজা ধ’রে আমরাও হব বরণীয়।’ অর্থাৎ মহাজ্ঞানীরা যে-পথে চলে গেছেন, আমাদের সে-পথেই যেতে হবে। তবে এটা ঠিক নয়। কারণ যে-পথে অসংখ্যবার যাওয়া হয়েছে, সে-পথে না গিয়ে নতুন পথের সন্ধান করলেই নতুন কিছু লেখা ও করা সম্ভব।’ তিনি নবীনদের তাদের সাহিত্যচর্চা অব্যাহত রাখার আহবান জানান। এরপর পুরস্কারপ্রাপ্ত লেখকরা উপস্থিত দর্শক ও গুণীজনদের শোনান সাহিত্য নিয়ে তাঁদের নিজস্ব ভাবনাকথা।

সম্মাননাপ্রাপ্ত তরুণ কবি-লেখকদের পর অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর তাঁর বক্তব্য তুলে ধরেন। তিনি কবি নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীকে শ্রদ্ধা জানিয়ে বলেন, ‘মঞ্চে তাঁর মতো একজন বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব থাকার পরও আমাকে প্রধান অতিথি করায় আমি বিব্রতবোধ করছি।’ সংস্কৃতিমন্ত্রী কালি ও কলম এবং এইচএসবিসির এ-প্রয়াসকে সাধুবাদ জানিয়ে এ-কর্মধারা অব্যাহত থাকবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন। পুরস্কারপ্রাপ্ত নবীন কবি ও লেখকদের অভিনন্দন জানিয়ে তিনি সবার প্রতি গণতান্ত্রিক, অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ বিনির্মাণে ব্যাপ্ত থাকার আহবান           জানান।

অনুষ্ঠানের সভাপতি আনিসুজ্জামান পুরস্কারপ্রাপ্তদের অভিনন্দন জানিয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করেন যে, ‘এ-পুরস্কার তরুণদের উৎসাহিত করবে।’ সংস্কৃতিমন্ত্রীর বক্তব্যের সুর ধরে তিনি বলেন, ‘সংস্কৃতি-মন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূরকে যখন মানুষ ভুলে যাবে, সংস্কৃতি-কর্মী আসাদুজ্জামান নূরকে তখনো মানুষ মনে রাখবে।’ এরপর তিনি কালি ও কলমের পথচলা এবং নবীনদের প্রযত্নের ধারা অব্যাহত থাকবে বলে উল্লেখ করেন।

সবশেষে সবাইকে ধন্যবাদ জানিয়ে বক্তব্য রাখেন কালি ও কলম সম্পাদক আবুল হাসনাত।

অনুষ্ঠানে আয়োজকরা জানান, সব শাখায় সাহিত্যগুণসম্পন্ন বেশকিছু জমা-পড়া বই থেকে চার সদস্যের বিচারকমন্ডলী প্রাথমিক বাছাই করেন। এই বিচারকমন্ডলীর সদস্য ছিলেন – প্রফেসর বিশ্বজিৎ ঘোষ, লেখক সুব্রত বড়ুয়া, অধ্যাপক ও কবি দিলারা হাফিজ এবং কবি ও অধ্যাপক মাহবুব সাদিক। তারপর প্রফেসর জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী, কথাসাহিত্যিক হাসান আজিজুল হক, প্রফেসর হায়াৎ মামুদ, কথাসাহিত্যিক রিজিয়া রহমান ও বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক শামসুজ্জামান খান চূড়ান্তভাবে ফলাফল স্থির করেন।  উল্লেখ্য, এই বিচার প্রক্রিয়ায় এইচএসবিসি এবং কালি ও কলমের কেউ কোনোভাবেই যুক্ত ছিলেন না।

শেষ পর্বে পুরস্কার প্রদান অন্তে জনপ্রিয় সংগীতশিল্পী কৃষ্ণকলি ও তাঁর দল সংগীত পরিবেশন করে। তাঁদের সুরমূর্ছনায় আবিষ্ট দর্শককুলের যখন ঘোর ভাঙে তখন ঘড়ির কাঁটা ৯টা ছুঁইছুঁই।

সোশ্যাল মিডিয়া

নিউসলেটার