একজন হেরে যাওয়া ডাক্তার

লেখক: স্বপ্নময় চক্রবর্তী

এই গল্পটা জীবককে শোনাতে হবে। ঢোঁড়া সাপ কী করে বিষহীন হয়ে গেল।

ঢোঁড়া সাপের একসময় খুব বিষ ছিল। বিষের কারণে ও অহংকারী হয়ে উঠেছিল। মনসা ঠাকুরাণকে ও তেমন পাত্তা দিচ্ছিল না। মনসা ভাবলেন – দাঁড়া, মজা দেখাচ্ছি।

ঢোঁড়া ছিল খুব লোভী। সেটা মনসা ঠাকুরাণী জানতেন। একদিন এক পুকুরপাড়ে ঢোঁড়া সাপ শুয়ে আছে। একটা ব্যাঙ ঝম্প দিয়ে একটা নদীতে পড়ল। ঢোঁড়াও ব্যাঙকে খাবার জন্য জলে ঝম্প দিলো, ব্যাঙকে খেয়ে নিল। তাতে সাপের তৃপ্তি হলো না। মনসা ঠাকুরাণী তখন কতগুলো মায়ামৎস্য সৃষ্টি করলেন। ঢোঁড়া সাপ মাছের পেছনে ছুটল। কিন্তু মাছ ছুটছে তিরের মতো। মাছকে খেতে পারছে না ঢোঁড়া। ঢোঁড়া ভাবল, একটু ভার কমাতে পারলে খুব দ্রম্নত ছুটতে পারবে। বিষের ভারে জোরে ছুটতে পারছে না। ঢোঁড়ার সামনে দিয়ে আরো মাছ ছুটছে। সব মায়ামৎস্য। ঢোঁড়া করল কি, একটা পদ্মপাতায় বিষের থলি রেখে মাছের পেছনে ছুটল। ইতোমধ্যে ঢোঁড়ার বিষ লুট হয়ে গেল। ভীমরুল, বোলতা, বিছে সবাই যে-যা পারল লুট করে নিয়ে গেল। ঢোঁড়া কিছুক্ষণ পর ফিরে এসে দেখল – পদ্মপাতায় একটুও বিষ নেই। বিষের থলি খালি। সেই থেকে ঢোঁড়া বিষহীন। ঢোঁড়াকে কেউ পাত্তা দেয় না। কেউ সমীহ করে না। ঢোঁড়াকে দেখলে মানুষ ভয় পায় না। লাথি মারে।

কিন্তু জীবকের এখন তো আর গল্প শোনার বয়স নেই। একটা সময় ছিল, যখন জীবককে গল্প শোনাতেন দেবকিঙ্কর। এখন কখন শোনাবেন! জীবক তো সবসময় ব্যস্ত। একটা নার্সিং হোমের সঙ্গে যুক্ত, দুটো পলি ক্লিনিকে যায়, একটা ওষুধের দোকানে বসে। বসে যে বাপে-পুত্রে গল্পস্বল্প করবেন তার উপায় কোথায়। যতক্ষণ বাড়িতে থাকে, কানে ফোন।

দেবকিঙ্কর সেনের পরিবারের একটা ঐতিহ্য আছে। পিতামহ এবং পিতা দুজনেই ছিলেন আয়ুর্বেদাচার্য্য। সাধারণ মানুষ বলে কবিরাজ। দেবকিঙ্কর পাশ্চাত্য ডাক্তারিবিদ্যা পড়েছিলেন। এমবিবিএস। পূবপুরুষের কাছে অর্জিত নাড়ি পরীক্ষা, জিহবা পরীক্ষা, ত্বক ও নখ পরীক্ষা, এমনকি শরীর-নির্গত বায়ুর ঘ্রাণ পরীক্ষা ইত্যাদিতে পারদর্শী। খুব দরকার হলেই ল্যাবরেটরিতে রক্ত-মূত্রাদি পরীক্ষার জন্য পাঠান। গরিব রোগীরা ভিড় করে এখানে। ফি-ও খুব কম। কিন্তু দেবকিঙ্করের পুত্র এই আদর্শে বিশ্বাসী নয়। ও দেবকিঙ্করকে ভাবে বোকা লোক। দেবকিঙ্কর ছেলের নাম রেখেছিলেন জীবক। জীবক ছিলেন প্রাচীন ভারতের বিরাট চিকিৎসক। কায়চিকিৎসা এবং অস্ত্রচিকিৎসায় সমান পটু ছিলেন। জীবক কিন্তু ‘জয়েন্ট’ পরীক্ষায় ভালো ফল করতে পারেনি। ফলে সরকারি মেডিক্যাল কলেজে হয়নি। ডাক্তার পরিবারের ছেলে ডাক্তার হবে না?  – এসব ভাবনা কাজ করল, দেবকিঙ্করের স্ত্রী চিন্ময়ীও প্রায় পীড়াপীড়ির পর্যায়ে গেলেন। ফলে বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজ – তথা প্রাইভেট মেডিক্যাল কলেজে একগাদা টাকা খরচ করে এমবিবিএস হয়েছে জীবক। দেবকিঙ্কর বলেছিলেন – তুমি কিছু এডুকেশন লোন নাও, রোজগার করে শোধ করবে। লাখছয়েক টাকা লোন নিতে বাধ্য করেছিলেন, বাকিটা নিজেই দিয়েছিলেন। ছেলে এখন টাকা উশুলের খেলায় মেতেছে। নানাভাবে টাকা রোজগার করে চলেছে। একটা ডাক্তার এই ব্যবস্থায় নানাভাবে টাকা রোজগার করতে পারে।
প্যাথলজির কমিশন, মিথ্যা সার্টিফিকেট, অপ্রয়োজনীয় ওষুধের প্রমোশন – এরকম নানাবিধ। জীবক এসব প্রলোভনের ফাঁদে পড়েছেন। দেবকিঙ্কর এটা চাননি।

দেবকিঙ্করের সামনে একটা কাগজ। একটা তালিকা করছেন –  কী কী কাজ করা দরকার। টু. ডু. কিংবা টাস্ক।

এক নম্বরেই এই গল্পটা। ঢোঁড়ার গল্পটা। কীভাবে বলা যায়। কখন বলা যায়, এসব নিয়ে ভাবেননি। এই গল্পে কাজ হবে কিনা তাও জানা নেই। কাজ হবে না। এসব ওষুধে এই প্রজন্ম ‘ইমিউন্ড’ হয়ে গেছে। বেহুলাপালায় এই অংশটার গান এখনো মনে গেঁথে আছে দেবকিঙ্করের।

তাঁকিয়া বাঁকিয়া ঢোঁড়া গাং পার হয়

মনসা ঠাকুরাণী কৌশল করায়

সিরজিলেন মায়ামৎস্য ঢোঁড়ার সমুখে

মাছের ঝাঁক দেখ্যে ঢোঁড়ার লোলা আসে মুখে

বিষদন্ত খুলে ঢোঁড়া পদ্মপাত্রে রাখে

তারপর ছুট্যে গেল মাছের সম্মুখে

বেশি গিলে খাবে বলে হাঁ করে মুখে

মায়ামৎস্য নাই হায় ঢোঁড়ার সমুখে।

তারপর ফিরে এসেছিল ঢোঁড়া। যে-পদ্মপাত্রে

বিষদাঁত রেখেছিল – সেখানে গিয়ে দেখে

বোলতা ভীমরুল চেলা ও পিঁপড়ি

মৌমাছি কাঁকড়া বিছা নিছে লুট করি।

দেবকিঙ্কর তো এই কবিগান গেয়ে শোনাতে পারেন না আর। কিন্তু এই ভাবনা কী করে ঢোকাবেন জীবকের মনে! কোন ইনজেকশনে? জানেন না। তবে এটা টাস্ক, করতেই হবে।

তালিকার দু-নম্বরে হাড়িভাঙ্গা গ্রামের চপলা হাড়ির হাসপাতাল পরিদর্শনে যাওয়া। অনেকদিন যাওয়া হচ্ছে না। এক গরিব মহিলা এক অদ্ভুত মনোবলে একটা হাসপাতাল তৈরি করছে। ওরা জাতে হাড়ি। ওর ছেলেটি ডাক্তার হয়েছে। কিছু অর্থ সাহায্য করেছেন দেবকিঙ্কর। চাঁদাও তুলে দিয়েছেন কিছু। কতদূর হলো, কেমন হলো দেখতে ইচ্ছা হয়। তিন নম্বরে ইঁদুর লিখলেন। ইঁদুরের বড্ড উপদ্রব। ডায়েরির পুরনো পাতাগুলো খেয়ে নিয়েছে। বাবার লেখা চিঠিও। মারতেই হবে। সামান্য ব্যাপার। ইঁদুরের কল না বিষ, স্থির করা হয়নি। বিষে মরে থাকলে কোথায় মরবে – পচা গন্ধ হবে। মৃতের মাংসের পচা গন্ধ হয় বড়। মৃত আদর্শের? চার নম্বরে সনাতন। এর বাবার এইচআইভি ছিল। সেখান থেকে ওর মা পেয়েছিল এই রোগ। দেবকিঙ্করের রোগী। সনাতন পড়াশুনোয় তুখোড়। ও আমেরিকা গেছে। সনাতনের মাকে দেবকিঙ্কর নিজের বাড়িতেই রেখেছেন। কাজ করে। সনাতন একটা মেল করেছে অনেকদিন। উত্তর দেওয়া হয়নি। সনাতন লিখলেই মনে পড়বে। সেসঙ্গে লীলাবতীকেও পরে চিঠি লিখবেন। চিঠি তো নয়, মেল। লীলাও তো বিদেশে যাবে। লীলাবতী দেবকিঙ্করের মেয়ে। অঙ্কে বড় ভালো মাথা ছিল। ও আবহাওয়াবিজ্ঞান নিয়ে গবেষণা করে। ওর বিষয় ঘূর্ণি। টারবুলেনস। এরপর টাস্ক লিস্টে লিখলেন – চিন্ময়ী। চিন্ময়ী দেবকিঙ্করের স্ত্রী।

চিন্ময়ী লিখে কেটে দিলেন। এ আবার লেখার কী আছে। ওর ব্যাপারটা নিয়েই তো সর্বক্ষণের ভাবনা। কিডনি কাজ করছে না ওর। কিছু তো একটা করতে হবে। এটা লিস্টে রাখার দরকার নেই। আরো কতগুলো ব্যাপার মনে পড়ল। লুডো।

চিন্ময়ী আর সনাতনের মা খেলবে। তোয়ালে। গাড়ির সিটে তোয়ালে নেই বহুদিন। কোথায় গেল কে জানে? কাসুন্দি।

বহুদিন ধরে ইচ্ছা হচ্ছে কুমড়োফুলের বড়া কাসুন্দি দিয়ে…। কুমড়োফুল পাওয়া যায় মাঝেমধ্যে, কিন্তু কাসুন্দি নেই। এরপর লিখলেন – রং।

চেম্বারটায় বহুদিন রং করা হয়নি। ভালো দেখাচ্ছে না।

দেবকিঙ্করকে লাইফগার্ড ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানির রিজিওনাল ম্যানেজার বলল – স্যার, আপনার চেম্বারটা বড্ড শ্যাবি, ইফ ইউ ডোন্ট মাইন্ড, আমরা একটু রেগোভেট করে দেব? আসলে স্যার, আমাদের কোম্পানি নোটিশ করেছে যে, অনেক ডাক্তারবাবু আছেন, যাঁরা একটু আপনভোলা টাইপের, চেম্বারের লুক-টুক নিয়ে অত ভাবেন না, বা ভাবার সময় নেই। আমাদের একটা ফান্ড আছে, আমরা একটা পেশেন্ট-ফ্রেইন্ডলি লুক এনে দি। রং করাটা দেবকিঙ্করের লিস্টে ছিল। করা হয়ে ওঠেনি।
পেশেন্ট-ফ্রেন্ডলি লুক মানে? দেবকিঙ্কর একটু কপাল কুঁচকে জিজ্ঞাসা করলেন, মানে – একটু সুদিং কালার করে দেব ওয়ালে, কাঠের পুরনো বেঞ্চিগুলো পালটে পস্নাস্টিকের হালকা…।

– আর দেয়ালে আপনাদের কোম্পানির প্রোডাক্টের নাম লিখে রাখবেন, তাই তো? দেবকিঙ্কর একটু উঁচু গলাতেই বললেন, তখন ছোট্ট করে জিভ কাটল টাই এবং টাক সমৃদ্ধ ম্যানেজার। একদম না। এটা প্রোডাক্ট প্রমোশনের মধ্যে নয়, এটা বলতে পারেন কোম্পানির সোশ্যাল সার্ভিস।

– তো সোশ্যাল সার্ভিসটা আমার চেম্বারে কেন? দেয়াল চুনকাম-সামর্থ্য আমার তো আছে।

– নিশ্চয়ই আছে স্যার। ডোন্ট টেক ইট আদার সেন্স। আপনি খুব বিজি ডাক্তার, কমিটেড। আমাদের রিপ্রেজেনটেটিভদের কাছ থেকে খবর-টবর পাই। আমাদের একটা ওয়েলফেয়ার ফান্ড আছে। নানারকম সোশ্যাল অ্যাকটিভিটি করে।

– যেমন?

– যেমন, ধরুন কোনো সি-বিচ কিংবা ফরেস্টে গিয়ে ডাক্তারবাবুদের একটা গেট টুগেদার করিয়ে দেয়, হয়তো ডায়াবেটিস বা কার্ডিয়াক প্রবলেম নিয়ে ডাক্তাররা নিজেদের এক্সপেরিয়েন্স শেয়ার করে, কোনো চ্যারিটেবল ডিসপেনসারিকে গ্রান্ট দি…।

দেবকিঙ্কর এ-কথার প্রবাহটা থামিয়ে দিয়ে হঠাৎ সুর নরম করে বলেন, চ্যারিটেবল ডিসপেনসারির ফান্ডিং আছে আপনাদের? রিয়েলি?

অফিসারমশাই বললেন – হ্যাঁ, আছে তো। আপনি এরকম কোনো অর্গানাইজেশনকে রেকমেন্ড করছেন নাকি?

দেবকিঙ্কর এবার কী বলবেন? চপলার ওই হাড়িভাঙ্গার হাসপাতালটার কথা বলবেন নাকি? ওরা টাকা দিলে নিশ্চয়ই হাসপাতালের গায়ে ওদের প্রোডাক্টের নাম লিখে দেবে। তা দিকগে থাক। লিখুক না। নাকি এক্স-রে মেশিনের গায়ে লিখে দেবে ওদের কোম্পানির নাম লাইফগার্ড…। ওরা কি এক্স-রে মেশিন দেবে! না – না -, এত দেবে না। দেবকিঙ্কর আবার জিজ্ঞাসা করেন – আপনারা যে গ্রান্ট দেন বলছেন, তার অ্যামাউন্টটা কেমন?

– এটা ডিপেন্ড করে স্যার। দশ হাজার থেকে দশ লাখও হতে পারে। ভারত সেবাশ্রম সংঘকে একটা এক্স-রে মেশিন দিলো তো সেদিন।

ভারত সেবাশ্রম, রামকৃষ্ণ মিশন – এদের কথাই আলাদা। ওরা ওদের দেবে। হাড়িভাঙ্গা গ্রামে দিতে যাবে কেন?

– আপনি কি কোনো এরকম ডিসপেনসারিকে রেকমেন্ড করছেন স্যার?

দেবকিঙ্কর এদিক-ওদিক তাকালেন। যেন গোপন কথা… বললেন। – হ্যাঁ, ওরকম একটা ভেঞ্চারের কথা জানি, একটা গ্রামের ভেতর একজন মহিলা একটা হাসপাতাল করার চেষ্টা করছেন। আমি বলেছিলাম ওদের যা পারি সাহায্য করব।

ঢোঁড়া সাপটা কিলবিল করে দেবকিঙ্করের কাছে আসে। নিজের বিষ হারানোর গল্পটা ও নিজের পিঠে বয়ে এনেছে। মনসা ঢোঁড়া সাপকে টোপ দিয়ে বিষ নষ্ট করে দিয়েছিল। দেবকিঙ্কর বললেন –   এখন থাক। বলছি না ওদের ডোনেট করুন। বলতে চাইছিলাম –  আমার চেম্বারটার জন্য ভাবতে হবে না কিছু। ও আমি মেরামত করে নেব। আমি তো খেয়ালই করিনি এটা, পয়েন্ট আউট করিয়ে দেওয়ার জন্য ধন্যবাদ।

করপোরেট অফিসার বললেন – আপনার চেম্বারটার সঙ্গে ওটাকে কানেক্ট করছেন কেন স্যার। ওই ডিসপেনসারিটার ডিটেল্স জানিয়ে দিতে বলবেন, আমাদের লোক একবার একটা ইন্সপেকশন করবে। কিন্তু এই কাজটা আমাদের করতে দিন, আমরাই অবলাইজড হবো।

দেবকিঙ্করের মনে হলো, আমি দেবকিঙ্কর সেন। আমার চেম্বারে এতক্ষণ এসব প্যানপ্যানানি অ্যালাউ করিনি কখনো। অনেক আগেই বলে দেওয়া যেত নমস্কার, এবার আসুন। কিন্তু বলা যাচ্ছে না। ঢোঁড়া-সিনড্রোমে আক্রান্ত হচ্ছি নাকি? ঢোঁড়া সাপ হয়ে যাচ্ছি ক্রমশ? পর্দাটা সরালেন দেবকিঙ্কর। পর্দে রহনে দো… পর্দে না ওঠাও…। সবুজ পর্দাটা সত্যিই নোংরা হয়েছে। হারাধনটা যে কী করে…। দেয়ালগুলোও নোংরা। চল্টা উঠেছে, এক জায়গায় পানের পিকও। ইস্। এত নোংরা? না – না -, নোংরা নয়, মলিন। সর্ব অঙ্গে মাখা মলিনতা, তা নিয়ে এতদিন তো ব্যথা ছিল না কোনো…। মনে পড়ল – এটা তো রবীন্দ্রনাথের কোনো গান থেকে ভেসে আসা কথা। কী গান যেন… কী গান… দয়া, দয়া দিয়ে হবে গো মোর চরণ ধুতে। ওই গানটায় কী ছিল – তোমায় দিতে পূজার ডালি বেরিয়ে পড়ে সকল কালি…। কী যে সব কথা, গা শিরশির করে। কে এই তুমি? কার পুজো? ভগবানে বিশ্বাস নেই। তবু কেন এমন হয়?

দেবকিঙ্কর বললেন – আমার পেশেন্টরা অপেক্ষা করছে, আর আপনাকে সময় দিতে পারব না। আমার চেম্বার নিয়ে আপনাদের ভাবতে হবে না, ওটা আমি করে নেব। আপনাদের ধন্যবাদ। আপনাদের ওষুধ আমি লিখি। অ্যামোক্সিসিলিনটা, ফলিক অ্যাসিডটা।

– হ্যাঁ স্যার, লেখেন, অস্বীকার করছি না, কিন্তু এনজাইমটা একদম লেখেন না, ব্রোমোহেক্সেন দেওয়া কফ সিরাপটা, যেটার নাম একজিট নাইনটি, একদম লেখেন না…।

– না, লিখি না তো। কলমটা একবার টেবিলে ঠুকে নিলেন দেবকিঙ্কর। লিখি না কারণ আমার পেশেন্টদের কথা ভাবি। কেন বৃথা ওষুধ দেব। এনজাইমে কিছু হয় না। আর ওই অ্যাকটিভ চারকোল? আপনারা বোঝান ওই চারকোল গ্যাস শুষে নেয়। কেন বাজে কথা বলেন। কফ সিরাপে এতটাই সেডেটিভ আছে, যা খেলেই ঘুম পায়। আমার পেশেন্টরা খেটে খায়। ড্রাউজি থাকার বিলাসিতা ওদের চলে না।

– না স্যার, ওষুধ লেখার কোনো রিকোয়েস্ট রাখছি না আজ। সে আপনি যা ভালো মনে করেন তাই করবেন। আমরা শুধু একটা রাত্তির চাই। একটা স্যাটারডে নাইট। রাত্তিরেই কাজ শুরু করিয়ে দেবো। সানডে তো চেম্বার বন্ধই রাখেন, সেদিনই সব কমপিস্নট হয়ে যাবে। কোনো রিটার্ন চাই না স্যার, আপনাদের মতো ডাক্তারদের সেবা করে কোম্পানির পুণ্যের ঘরে কয়েকটা পয়েন্ট ক্রেডিট হবে, – এটুকুই। ভদ্রলোক টাই মুচড়ে হাসলেন। দেবকিঙ্করও হাসলেন। হাসতে হাসতেই বললেন – হ্যাঁ, সোমবার দিন চেম্বারে এসে দেখব সব ঝকঝক করছে। দেয়ালে লিখে রাখা হিপোক্রেতিস আর স্টুয়ার্ট মিলের কথা দুটো দিয়ে পস্নাস্টিক পেইন্টে ঢেকে গেছে। বাবার ছবিটা নিচে নামানো, আলো ঝলকাচ্ছে, আর ওই আলোর ক্রমাগত চুলকানি আমাকে কেবল অস্বসিত্মতে ফেলতে থাকবে। মানসিক চাপ দিতে থাকবে, বলবে, ওদের থেকে সুবিধে নিয়েছিস, ওদের ঋণ শোধ কর, ওদের বিজনেস দে।

– ওই কোটেশনগুলো দেয়ালে লিখিয়ে রেখেছিলেন কেন? ওগুলো কম্পিউটারে লিখিয়ে বাঁধিয়ে দেওয়া যাবে… ওজন্য ভাববেন না। আর আবার বলি, বিজনেস ইজ নট আওয়ার… ডান হাতের আঙুল পাঁচটা সংলগ্ন করে সামনে এগিয়ে ধরলেন দেবকিঙ্কর। মানে – এবার থামো। গলার স্বর পালটে গেল। বললেন, সরি। সিম্পলি নো। আমি রাজি নই। ডাক্তারের কাজ ওষুধ কোম্পানিকে বিজনেস দেওয়া নয়, রোগীকে সার্ভিস দেওয়া, আর কোনো কথা নয়। নমস্কার।

 

প্রতি শনিবারের মতোই – জীবক এসেছে। চিন্ময়ী ওর জন্য নারকোল-পোস্ত বাটা দিয়ে হাঁসের ডিম রান্না করেছেন। বেচারা ছেলেটা হাঁসের ডিম এত ভালোবাসে, ও পায় না। যখন দিলিস্ন-টিলিস্নর দিকে ছিল, তখনো পেত না, এখনো পায় না। কলকাতার ফ্ল্যাটে বেচারা একা থাকে। একটা মেয়েটেয়ে দেখার কথা কতবার বলেছেন চিন্ময়ী, জীবকের বাবা কোনোরকম উৎসাহ দেখান না, বলেন – বড় হয়েছে, ডাক্তার হয়েছে, নিজে দেখেশুনে নিক। বাড়ি বাড়ি ঘুরে লুচি-মিষ্টি খেয়ে মেয়ে দেখে বেড়ানো পোষাবে না আমার। চিন্ময়ী বলেন, শুনেছি আজকাল নাকি ঘটকগিরির কোম্পানি হয়েছে। কম্পিউটারে পাত্রপাত্রীর ছবি দেখিয়ে দেয়। কী করে, কোথায় থাকে – সব লেখা থাকে, আগে বেছে নাও, পরে চোখে দেখো, কথা বলো। দেবকিঙ্কর বলেন, তোমার জীবুকেই বলো না কেন, এরকম একটা কোম্পানিতে নাম লিখিয়ে দিতে, তারপর দুজনে মিলে ঠিক করে নাও। চিন্ময়ী বলেন – ‘তোমার জীবু তোমার জীবু’ করো কেন সবসময়? জীবু কি তোমারও নয়? তুমি ওর জন্মদাতা নও? তোমার কি দায়িত্ব নেই? চতুর্দিকের সমস্যা মাথায় নিচ্ছ, কার এড্স না এইচআইভি কী যেন হয়েছে, তাকে নিজের সংসারে নিয়ে এসেছো – কত দায়িত্ব…। নিজের ছেলেবউয়ের দায়িত্বটা মনে থাকে না…।

দেবকিঙ্কর শুনলেন। কিছু বলা মানে ঝগড়া। এ-সময় মেয়েরা একটু খিটখিটে হয়। ক্রিয়েটেনিন বেড়েছে রক্তে, পা দুটোও ফুলছে। শরীরটা তো ভালো নয়। ও জানে ওর কিডনি ভালো কাজ করছে না। ও জানে বাকি কাজগুলো গুছিয়ে নিতে হবে এবার। নিশ্চয়ই মনে মনে বাকি কাজগুলোর একটা লিস্ট তৈরি করেছে। এর মধ্যে প্রথম কাজ ছেলেমেয়েদের বিয়ে দেওয়া।

লীলাই তো বড়। ও বলে দিয়েছে, আমার বিয়ের ভাবনা তোমাদের করতে হবে না। যখন বুঝব, বিয়ে করব। যদি নিজে পছন্দ করতে না পারি তখন বলব। আমেরিকা প্রবাসী মহাকাশ বিজ্ঞানী, ফর্সা পাত্রীর পাত্রের অভাব হবে না। চিন্ময়ী বলেছিলেন – তা তো হবে না জানাই কথা। তবে বিয়েটা করেই যা,  আমার চোখদুটো জুড়োক।

লীলা বলেছিল, ভালোই বললে মা। তা তোমার জামাই কোথায় থাকবে? এখানে, আর আমি ওখানে? চিন্ময়ী বলেছেন – আমেরিকা আমেরিকা করিস কেন তোরা? ইন্ডিয়া তো মঙ্গলগ্রহে যাচ্ছে, কত কী করছে। বিদেশ থেকেও এখানে পড়তে আসছে। কলকাতা দরকার নেই, ইন্ডিয়াতেই থাক না। তোর ব্যাঙ্গালোর… হায়দ্রাবাদ… কী বলে – পুনা না পুনে। লীলা বলেছে, ওদেশে গবেষণার অনেক বেশি সুযোগ মা… জানি তুমি বলবে জগদীশচন্দ্র বসু এদেশের একটা ছোট্ট ঘরে বসে… সিভি রমণ সাধারণ যন্ত্রপাতি দিয়ে… ওসব দিন এখন নেই মা, ওরা ফাউন্ডেশনগুলো করে গেছেন। ভিত গড়েছেন। যন্ত্রের চেয়ে তখন মাথার ভূমিকা ছিল বড়। এখন মাথার সঙ্গে যন্ত্রও চাই। টিমওয়ার্ক চাই। সেসব পরিকাঠামো ও-দেশে অনেক ভালো। দেবকিঙ্কর ওদের সিদ্ধান্ত মেনে নিয়েছেন – যেমন মেনে নিতে হয়েছে ছেলের প্রাইভেট মেডিক্যাল কলেজে ডাক্তারি করার সিদ্ধান্ত। জীবককে অনেকবার বলেছেন, পাশ যখন করে গেছ, ডাক্তার হয়ে গেছ, রেজিস্ট্রেশন নম্বর পেয়ে গেছ, এবার সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে অ্যাপস্নাই করো। দেশে ডাক্তারের অভাব। কয়েক বছর অভিজ্ঞতা হয়ে গেছে যখন, চাকরি হয়ে যাবে। এখানেই কাজটা শিখবে। জীবক বলেছে – ওসব চাকরি করবে না। কোন আজপাড়াগাঁয় পোস্টিং দেবে ঠিক নেই। তাছাড়া এখন ভালো রোজগার হচ্ছে। দিব্যি আছি। থাক তাহলে, দিব্যিই থাক। জোর তো করা যাবে না।

লীলার কাগজপত্র রেডি হয়ে গেছে। হয়তো মাসতিনেকের মধ্যেই যাবে, অস্টিন ইউনিভার্সিটি। ম্যাপে দেখা হয়ে গেছে জায়গাটা। আমেরিকার দক্ষেণে। ৩১ ডিগ্রি নর্থ। প্রায় মেক্সিকো বর্ডার। ভালোই হলো, ঠান্ডার জায়গা নয়। মেয়েটা ঠান্ডা সহ্য করতে পারে না একদম। কলকাতা কত? ২৩ ডিগ্রি নর্থ। চ-ীগড় বা জলন্ধর ওরকম ল্যাটিচিউডে অস্টিন। আমেরিকা বিরাট দেশ। ২৫ থেকে ৫২-৫৩ ডিগ্রি পর্যন্ত। ফ্লোরিডা, অস্টিন এসব জায়গায় আবহাওয়া ভারতের মতোই প্রায়। ওখানে কি আম খেতে পাবে? বটগাছ আছে, বটগাছ! সনাতনের ইউনিভার্সিটি নিউ অর্লিন্স। বোধহয় তিনশো কিলোমিটার দূরে।

চিন্ময়ী বলেছেন – নিজে বিয়ে করবি বলছিস, তাড়াতাড়ি ব্যাপারটা সেরে ফেলিস। যদি ইন্ডিয়ায় কেউ থাকে, ঠিক করেছিস যদি, একসঙ্গে বিদেশ যাবি, তবে, জামাইটাকে দেখিয়ে যাস মা, শান্তি পাই।

লীলা বলে, কিছু ঠিক করিনি মা। বিয়ের কথা ভাবছিই না। মাথাতেই নেই। এখন বিয়েটিয়ে করলে সব ক্যাওস হয়ে যাবে মা, কতগুলো টারবুলেন্স তৈরি হবে, বিচ্ছিরি কয়েকটা প্রেশার জোন…।

চিন্ময়ীও বোঝেন – এসবই ওর গবেষণার বিষয়। জল নিয়ে শুরু করেছিল, এখন হাওয়ার দিকে গেছে। জল আর হাওয়ার প্রায় একইরকম স্বভাব। জলকে চোখে দেখা যায়, হাওয়াকে দেখা যায় না। চিন্ময়ী বলেন – আমার একটা নাতি-নাতনি দেখে যাওয়ার ইচ্ছা ছিল খুব…।

লীলা বলে – জীবুকে বলো বিয়ে করতে। ও তো সেটল্ড হয়ে গেছে। লীলা এখন পুনেতে আছে। ভারতীয় আবহাওয়া বিভাগের একটা প্রজেক্টে। মৌসুমি বায়ুপ্রবাহের গতিপ্রকৃতি নিয়ে ছ-সাতটা দেশ মিলে একসঙ্গে কাজ করছে। দেবকিঙ্কর এতসব বোঝেন না। বাবার কাছে শুনতেন শরীর-অভ্যন্তরীণ বায়ুর কথা। আয়ুর্বেদ অন্তর্গত বায়ুকে খুব গুরুত্ব দেয়। পাশ্চাত্য চিকিৎসাশাস্ত্রে প্রাণ-অপান-সমান-উদান-ব্যান বায়ুর কথা নেই। বায়ু, রক্ত, পিত্ত, মূত্র সবই তো ফ্লুয়িড। ফ্লুয়িড বড় আশ্চর্য পদার্থ। ফ্লো শব্দটা কি ফ্লুয়িড থেকেই এসেছে?

আজ একসঙ্গেই খেতে বসা হলো। বাপ-ছেলেতে কথা হলো। হাঁসের ডিম বিষয় থেকে হাঁসের মাংস, হাঁস-সম্পর্কিত মিথ – যেমন হাঁস জল-মেশানো দুধ থেকে দুধটুকু আলাদা করে নিতে পারে কিনা ইত্যাদি। সাপ আদৌ দুধ খায় কিনা…। ছেলের বিয়ের কথা তো ওঠানোই হচ্ছে না। চিন্ময়ী নিজেই কথাটা তুললেন।

হ্যাঁ রে জীবু। বলি শোন। দেখছিস তো আমার শরীরের গতিক সুবিধের নয়। লীলা এখন বে-থা বসবে না। তুই এবার করে ফেল। তোকে আগেও বলেছি। তোর বাবাকেও বলেছি। যা করার তাড়াতাড়ি কর। আমি কিন্তু জোর দিয়ে বলছি। সিরিয়াসলি বলছি।

দেবকিঙ্কর এবার বললেন – মায়ের কথাটা মাথায় রেখো। আমাকে কী করতে হবে বলো। বিকেলে তোমার সঙ্গে কথা আছে। আমার ঘরে এসো।

এখন শীত শীত ভাব। বেলা চারটেই প্রকৃষ্ট বিকেল। জীবককে নিশ্চয়ই জিজ্ঞাসা করা হবে কেউ আছে কিনা।

জীবক জানে কেউ নেই। ওর কোনো প্রেমিকা নেই। স্বসিত্মকা ভাদুড়ি কি ওর প্রেমিকা? হতে পারে, কিন্তু জীবক স্বসিত্মকার প্রেমিক নয়। ওরকম মেয়েকে ঘরের বউ করা যায় না। ঘরের বউ অত চিপ হবে কেন? সেক্সি হোক ক্ষতি নেই, অ্যাকটিভ হোক ক্ষতি নেই কিন্তু সারিডন ব্যানাড্রিল ক্যালপলের মতো ও.টি.সি হবে না। ওভার দি কাউন্টার। চাইলেই পাওয়া যাবে কেন? ঘরের বউ হবে কোকেটিন, ফসফোমাইসিন। প্রেসক্রিপশন ছাড়া মেলে না। নেগোসিয়েশন ম্যারেজে অনেক অপশন থাকে, অনেক বেছেটেছে নেওয়া যায়। এখন তো সেদিন নেই যে, লুচি-সন্দেশ খেতে খেতে মেয়ে দেখার পর ফাইনাল হলে এক্কেবারে শুভদৃষ্টির সময় দেখা…। মাঝখানে মিট করা হয়, কোলাকুলি হয়, তখন ভালো না লাগলে ব্যাপারটা ডিলিট করে দিয়ে আবার নতুন ফাইল খোলা যায়।

যদি বাবা জিজ্ঞাসা করে – কী রকম মেয়ে চাও… ‘মেয়ে’ তো বলবে না, পাত্রী বলবে, পাত্রী, কিংবা ব্রাইড। জীবক বলবে – তোমরা যা ভালো বোঝো। তারপর বলবে, মায়ের থেকে জেনে নিও। অত ফর্সাটর্সার দিকে ঝোঁক নেই। ফর্সা মেয়েদের খুব ইয়ে হয় – দেমাক। একটু শ্যামলা মেয়েদের বেশ তাঁবে রাখা যায়।

বিকেলে বাবার কাছে গেল। দেবকিঙ্কর বললেন, বোসো। ডাক্তার মৈত্র বেশ ভালো ডাক্তার বুঝলে, তোমার মায়ের কিডনিটা মোটামুটি ভালোই রেখেছেন, বুঝলে, আসলে নেফ্রন তো রিপেয়ারেবল নয়, জানো নিশ্চয়… দশ-বারো লাখ নেফ্রন থাকে একটা কিডনিতে…।

বাবাটা ভেবেছে কি – এসব একেবারে বেসিক ব্যাপারটাও প্রাইভেট কলেজেপড়া পুত্র জানে না ভাবছে নাকি?

জীবক বলতে থাকে – এসব নতুন করে বলতে হবে না বাবা। দিনে ওয়ান সেভেনটি টু ওয়ান এইটি লিটার বস্নাড ট্রিট করে এই নেফ্রন বাই অসমোসিস। নেফ্রন সেল ইউনিটগুলোর সেমিপারমিয়াবিলিটি নষ্ট হয়ে গেলে সেলগুলো অকেজো হয়ে যায়। তখন বস্নাড থেকে রিফিউজলি ম্যাটেরিয়ালগুলো ছেঁকে ইউরিনে দিতে পারে না, তখন…

দেবকিঙ্কর বললেন – হ্যাঁ, হ্যাঁ, ঠিক আছে জীবু, তুমি জানো ব্যাপারটা। ড্যামেজ অফ দি নেফ্রন ইউনিট্স রিভার্সেবল প্রসেস নয়। ফলে সিম্পটমেটিক ম্যানেজমেন্টটাই জরুরি। জীবক মুখের কথা কেড়ে নিয়ে বলতে থাকে, স্পেশালি বস্নাডপ্রেসারটা নরমাল রাখা, পটাসিয়াম লেভেলটা অপটিমাম রাখা, খাবার জলের ইনটেকটা অপটিমাম রাখা, ঠিকমতো আয়রন পিল দেওয়া, এসিই ইনহেবিটর দেওয়া, রেনিন ইনহেবিটর…

দেবকিঙ্করের মুখের পেশিগুলোর অবস্থান বদলে গেল। স্পষ্টতই খুশি খুশি লাগছে। ছেলেটা তাহলে কিছু জানে। নাকি মায়ের কিডনিটার গ-গোলের কারণে এ-বিষয়ে একটু পড়াশুনোটা করে নিয়েছে। দেবকিঙ্কর বললেন – মেডিসিনগুলো সিলেক্ট করাটাই হলো আসল ব্যাপার। আমার নিজের দ্বারা হতো না। একটা মাল্টিডিসিপিস্ননারি ট্রিটমেন্ট। নেফ্রোলজিস্টরা সবগুলো ফ্যাক্টর কো-অর্ডিনেট করে। তোমাদের ম্যাডোনার সুধীর মৈত্র বেশ এফিসিয়েন্ট। ক্রিয়েটেনিন টু পয়েন্ট ফোর ছিল, এখন টু পয়েন্ট ওয়ান। ইউরিয়া ফোরটিসিক্স… নট ব্যাড। পায়ের ফুলোটা অনেকটা কম। বমি ভাবটাও কমেছে। আমি কিন্তু পুনর্নবা শাক আনছি, বুঝলি জীবু, সমেত্মাষের মাকে বলেছি, ও ঠিক খুঁজে পেতে নিয়ে আসে। দেবকিঙ্কর আগে তুই করেই বলতেন। জয়েন্টে ডাক্তারিতে চান্স না পেয়ে যখন দিলিস্নতে কোচিং নিতে গেল, তখন থেকেই তুই-এর বদলে তুমি বলতে থাকেন। কখনো কখনো তুই হয়ে যায়। ‘তুই’ হতে পারলে, ‘জীবু’ হতে পারলে জীবকের ভালো লাগে। পুনর্নবার পাতাটা কিডনিকে ভালো রাখে। বাবা বলতেন, বৃক্কাচ্ছাদনম পুনর্নবাঃ। বৃক্কের আচ্ছাদন। কিডনিকে সংস্কৃতে বৃক্ক বলে। গোঙুর চূর্ণও দিচ্ছি।

জীবক বোঝে ওর বাবা পুরো কৃতিত্বটা ডাক্তার মৈত্রকে দিতে চান না, নিজেও কিছুটা। জীবক বলে – হ্যাঁ, তাই তো, মনিটরিংটা তো তুমিই করছ। সুধীরদা আর কদিন দেখেছেন…। জীবক ‘সুধীরদা’ শব্দটা তাসের টেক্কার মতোই ফেলল। একজন বড় নেফ্রোলজিস্টকে দাদা বানানো। সত্যজিৎ রায়কে যেমন মানিকদা, অপর্ণা সেনকে যেমন রীনাদি…। জীবক বলল – সুধীরদার সঙ্গে কথা হয়তো। বলেন তো এখন ভালো ভালো ওষুধ বেরিয়ে গেছে, যা কিডনিকে ফারদার ড্যামেজ থেকে বাঁচায়। পারফেনিডোন। খুব এফেকটিভ। তাছাড়া মডার্ন ডিউরেটিক্স বেরিয়ে গেছে। জল না খেয়েও জলের কাজ করে। এমনি কথায় বলে ওয়াটার পিল। তোমার সঙ্গে কথা বলে নেবেন তিনি।

ডাক্তার মৈত্রের সঙ্গে দেবকিঙ্করই কথা বলেন। দেবকিঙ্করের মনে হলো, এই দায়িত্বটা জীবককেই দেওয়া যেতে পারে। এবং এই সিদ্ধান্তে পৌঁছতে পেরে প্রচ- তেষ্টার মধ্যে একটা সবুজবরণ ভাব হাতে পেলেন যেন। দেবকিঙ্কর বললেন – এবার থেকে তুই এই ব্যাপারটা দেখ জীবু। কখন কী পরীক্ষা করাতে হবে বলবি, কনসাল্ট করে ওষুধ লিখিয়ে নিবি। আমি খালি ডায়েটটা দেখব। সনাতনের মা আছে, ও পুনর্নবা, তেলাকুচ এসবের পাতাগুলো বেছে দেয়, গোঙুর গুঁড়ো করে দেয়।

সনাতন দেশ ছেড়ে আমেরিকা পাড়ি দিয়েছে মাসতিনেক হলো। এয়ারপোর্টে গিয়েছিল সবাই। সনাতনের মাকে একটা নতুন শাড়ি কিনে দিয়েছিল সনাতন। সবুজপেড়ে গরদ। বিধবা বলে লাল পরতে নেই, কালো শুভযাত্রায় অশুভ রং। সনাতন মাকে জড়িয়ে ধরে বিমানবন্দরের সাজানো বড়লোকি লাউঞ্জে ওর চোখ ঘোরাল। চোখের জলের পর্দার ভেতর দিয়ে দেখল এবার ইন্ডিয়া-ডোমিনো কে.এফ.সি-ইমপিরিয়াল বস্নু-রেমন্ড কাঁপছে। একটা মুচির ব্যাটার হাতেও উড়ে আসছে কে.এফ.সি-রেমন্ড কোকাকোলা। এইচআইভি পজিটিভ মুচির বউকে জড়িয়ে ধরে বায়োপলিমার বিজ্ঞানী মুচির পো। দেবকিঙ্কর পুষ্পবৃষ্টি দেখেন চরাচরে। কাঁদেন। মনে মনে বলেন – সোভিয়েত রাশিয়া ভেঙেছে তো কী হয়েছে। এটাও তো দেখলাম লেনিন। লেনিন কেন? বিদ্যাসাগর। বিদ্যাসাগর হে, আমার চোখ দিয়েই তুমি দেখো। সনাতন প্রণাম করেছিল চিন্ময়ীকে, দেবকিঙ্করকে। ওর ঠোঁট নড়ছিল। কী বলতে চাইছিল দেবকিঙ্কর শোনেননি।

সনাতন যোগাযোগ রাখে। ফোন করে প্রতি রোববার সকালে। ওদের সেটা শনিবার। ফোনটা সনাতনের মাকে ধরিয়ে দেয় মাঝে মাঝে। সনাতনের মা ফোনের কাছাকাছি মুখ রাখে না। সনাতন কতটুকু শোনে, কতটুকু বোঝে কে জানে। কথাশেষে কাপড়টার আঁচলে ফোনটা মুছে চিন্ময়ীর হাতে দেয়। চিন্ময়ী ওর শাড়িতে আরো একবার মোছে। সনাতন ফোন করে প্রথমেই জেঠিমার কথা জিজ্ঞাসা করে। জেঠিমা মানে চিন্ময়ী। লীলার জন্য যেমন পিতৃগর্ব হয়, সনাতনের জন্যও হয়। সনাতনের মা কি নিজেকে রত্নগর্ভা মনে করে?

একদিন সনাতনের সঙ্গে ফোনে কথা বলতে বলতে জিভ কেটে ঘোমটা টেনে দিলো, লজ্জা পেলে যেমন করে। দেবকিঙ্করের সঙ্গে চিন্ময়ীও লক্ষ করেছিল ব্যাপারটা। চিন্ময়ী জিজ্ঞাসা করেছিলেন – কী গো, কী বলছে সনাতন? সনাতনের মা ফিসফিস করে, কী সব বাজে কথা বলে। – তোমায় এখানে নে আসপো, ঠ্যাং তুলে সোফায় বসে থাকবে, মেমসাহেব তোমার চুল বেন্ধে দেবে…।

মেমসাহেব কেন বলেছিল? গিয়েই কি মেম জুটিয়েছে নাকি একটা? অবশ্য হেয়ার ড্রেসারও হতে পারে। চিন্ময়ী ভাবেন। সেই ছবিটা মনে পড়ে, চোখের তলা ফ্যাকাশে। হিমোগেস্নাবিন আর্ট, গালভাঙা, ম্যাল নিউট্রেটেড। মাকে নিয়ে স্বপ্ন দেখছে। গ্রেট। ওর বিয়েটা কোথায় হবে? ও-দেশে, নাকি এ-দেশে? ওর গ্রামে, যেখানে ওর মায়ের এইচআইভি আছে বলে গ্রামের পুকুরে স্নান করতে দিত না ওদের ওখানে? দেখুক পাড়াপড়শিতে। গরদের শাড়ি পরে সনাতনের মা…।

কথা হবার কথা তো জীবকের বিয়ে নিয়ে। জীবককে তো এজন্যই আসতে বলা এখানে। জীবক বসে আছে চুপচাপ।

দেবকিঙ্কর বলেন – হ্যাঁ, যা বলছিলাম, তোর মা চাইছে তুই ঘরে একটা বউ নিয়ে আয়। মায়ের প্রগনোসিসটা জানিস তো? টিবি ভালো হয়ে যায়। লাং ম্যালফাংশন ভালো হয়, কিন্তু কিডনি ভালো হয় না। ডক্টর মৈত্র সব পরীক্ষাই করিয়েছিলেন, ওনার মত হলো – রাইট কিডনি সেভেনটি পার্সেন্ট আর লেফট কিডনি নাইনটি পার্সেন্ট  ড্যামেজ হয়ে গেছে। সুতরাং আমাদের ডায়ালিসিসের দিকেই যেতে হবে। তখন আমাদের কলকাতায় থাকতে হবে। তুমি তখন একটা বড় ফ্ল্যাট দেখে নিও। তোমার দিদিকে এত কিছু বলিনি। এসব দুর্ভাবনা ওর মাথায় চাপিয়ে দিতে চাইনি। ও আকাশ-বাতাসের অঙ্গন নিয়ে থাকুক। কিডনি-স্টমাক-লাং নিয়ে আমরা তো আছি, কী বলিস জীবু?

ওর বাবা এত অন্তরঙ্গ বহুকাল হয়নি ওর সঙ্গে। ‘আমরা’ শব্দটা কী যে ভালো লাগল। বাবা ওকেও তাহলে নিজের সঙ্গে জুড়ল। ঢাক বাজল দুম্দুম্। দুন্দুভি বেজে ওঠে ডিম্ ডিম্ রবে। বাবা তাহলে গণ্য করছেন ওকে?

এবারে উপসংহার টানলেন দেবকিঙ্কর – ‘এটাই কথা ছিল।’

যাববাবা। বিয়ে সম্পর্কে তো একটা বাক্যের হাফ বলা হলো মাত্র। ব্যস? নিজে কোনো উৎসাহ দেখাবে না জীবক। ধুস! বিয়ে মানে তো বাইন্ডিং। নানারকম ঝুট-ঝামেলা। গয়লা থাকতে কেউ গরু পোষে? গয়লাও পুরনো ধারণা। মাদারডেয়ারি, মেট্রোডেয়ারি, একেবারে প্যাকেটবন্দি! ফুলক্রিম, হাফক্রিম, টোন্ড…।

 

হংকংয়ের সুনতাক্ জেটিঘাট থেকে সাদা ধবধবে ওয়াটার জেট ছাড়ল। সমুদ্রে আরো এরকম জেট লঞ্চ। সাদাগুলোকে মনে হচ্ছে রাজহাঁস। হংকংয়ের দ্বীপগুলো আবছা হয়ে গেল।

আন্দামানটাই যাওয়া হলো না এখনো, তার আগেই ম্যাকাউ। আগামী মার্চের আগেই বলছে পাতেয়া-ব্যাংকক-ফুকেট নিয়ে যাবে। সেটা আবার আর-একটা কোম্পানি। তবে টার্গেটটা রিচ করতে হবে। হাতে আইসক্রিম। রাম আইসক্রিম। ওটাই বেছে নিয়েছে। রামানুজদা বললেন, – ওটা নাও। রামানুজ মানে বোধহয় লক্ষ্মণ। রামের অনুজ। লক্ষ্মণ ছাড়াও তো আরো ভাই আছে রামের। রামের ভাইরা সবাই রামভক্ত। রামানুজ বরাট ও রামভক্ত। ভালো স্কচ
থাকলেও রামই খান। এখন সকাল দশটা। সমুদ্রের ওপর দিয়ে চলছে। শীতকাল, কিন্তু শীত বোঝা যাচ্ছে না। কুড়ি ডিগ্রি টেম্পারেচার করা আছে। সামনের দুটো মেয়ে একটা বার আইসক্রিম খাচ্ছে। শেপটা একদম একটা আখাম্বা পেনিস। পেনিসের মাথাটা, মানে গস্নান্স, একটু লাল। খাচ্ছে আর দুষ্টু দুষ্টু চোখে এদিকে তাকাচ্ছে। ওরা চাইনিজ না জাপানিজ, না কোরিয়ান কে জানে? ওরা সবাই একইরকম দেখতে। ওদের খুদে খুদে চোখে কী দুষ্টুমি। ওরা কি প্রভোক করছে? ওরা কি এই ওয়াটার জেট থেকেই খদ্দের ফিট করতে চায়? নাকি এটা জাস্ট ফান? ডক্টর বাসু, ডক্টর লোধ ওরা বলতে পারবে। ওরা এসব ট্রিপে বহুবার এসেছে কিনা…।

এই ট্রিপটা স্পন্সর করছে হিলিং ফার্মাসিউটিক্যাল। ওদের রিপ্রেজেনটেটিভদের ডাক্তাররা ইয়ারকি-ফাজলামো করে বলে কিলিং ফার্মাসিউটিক্যালস। সিপলার মতো কোম্পানিকেও তো বলে ঘাপলা। হিলিং ফার্মাসিউটিক্যাল, মানে এইচপি, ষোলোজন ডাক্তারকে ম্যাকাউ নিয়ে যাচ্ছে সেমিনার করাতে। রোল অব ভিটামিন-ই অ্যাজ অ্যান্টি অক্সিড্যান্ট, আর একদিন ক্যালসিয়াম ফিকসেশন নিয়ে। এই কোম্পানির ভিটামিন-ইর সঙ্গে মেশানো জিংক সেলিনিয়াম এসব রেয়ার মেটাল-মেশানো ট্যাবলেট আছে, যৌবন ধরে রাখার লোভ দেখিয়ে এই ওষুধ গছানো হয়। ক্যালসিট্রল আছে – উইথ ভিটামিন ডি। এটাও খুব দামি। কোনো চলিস্নশ বছর বয়স হয়ে যাওয়া মহিলা দেখলেই – হাঁটুব্যথার ভয় দেখিয়ে ওটা গছাতে হয়। মেনোপজের পর মেয়েদের ক্যালসিয়াম ক্ষয় তো হয়, এবং সাপলিমেন্ট করার জন্য হাজার কোম্পানির ক্যালসিয়াম-লড়াই আছে। কোন কোম্পানির ওষুধ বেশি বিক্রি হবে সেটা ওষুধের গুণের ওপর নির্ভর করে না। ডাক্তাররা নিজেও জানে না কোনটা বেশি ভালো। সেই ওষুধই বেশি লেখা, যে-ওষুধ বেশি সামনে আসে। আর সামনে আনানোর জন্য কোম্পানিগুলো নানারকম ফন্দিফিকির করে। মেয়েদুটো জিভ দিয়ে আসেত্ম আসেত্ম আইসক্রিমের মু– চাটছে। পুরো আইসক্রিমটা মুখের ভেতর ঢুকিয়ে নিল, গালটা ফুলে গেল, আবার বার করে নিল। মুখের লালা, আইসক্রিমটির ফেনা মিলেমিশে এক্কেবারে থ্রি এক্স। ছোট্ট করে দাঁত দিয়ে কামড়ালো। বাৎসায়নে একে দংশনাবিষ্টন না কী যেন বলে। মেয়েদুটো ভালোই বুঝতে পারছে, জীবক ওকে ঝাড়ি করছে। একটা মেয়ে কি চোখ মারল! ছোট্ট চোখ, তাতেও কত খেলা। বাইরে তরঙ্গমালা। আকাশে একটু মেঘমালা। একটা কালো ছেলে, জিন্স-গেঞ্জি, ছ-ফুট, আফ্রিকান, মেয়েদুটোর কাছে গেল। কথা বলছে। ওই তো কাঁধে হাত দিলো। যা ভাবা গেছিল তাই। আফ্রিকানটা দুটোকেই নেবে নাকি? এই জেটে চলিস্নশটার মতো সিট। দুটো দুটো করে দুদিকে সিট। সিটগুলো মুখোমুখি। জীবকের উলটো দিকেই মেয়েদুটো। জীবকের পাশে রামানুজদা। রামানুজদা বয়সে অনেক বড়। আফ্রিকান ছেলেটার সঙ্গে মেয়েদুটো উঠে গেল। সামনের কাউন্টার থেকে ওয়াইন নিল। জীবক রামানুজদার চোখের দিকে তাকাল। চোখের ভাষা পড়ে নিল রামানুজদা। বলল – ম্যাকাউতে অনেক পাবি। আগে কবার গেছেন ম্যাকাউ? – জীবক জিজ্ঞাসা করে। রামানুজদা বলে, ম্যাকাউ প্রথম, তবে পাতেয়া-ফুকেট এসব গেছি দু-তিনবার। পাটেয়ার জবাব নেই। তোরও হবে। এই তো শুরু হলো।

যাত্রা শুরু হয়েছিল সকাল দশটায়। হংকং থেকে ম্যাকাউ সত্তর  কিলোমিটার পথ। এক ঘণ্টা দশ মিনিট। দেখতে দেখতে সময় কেটে গেল। সাদা সাদা পাখি আকাশজুড়ে। এগুলো সি-গাল? কোম্পানির করপোরেট কমিউনিকেশন ম্যানেজার মনোজ বাজাজ একটা অ্যাড্রেস করল – অল মাই অনারেবল গেস্ট…, স্যার, আই অন বিহাফ অব মাই জি.এম. আই লাইক টু কনভে গ্র্যাটিচিউড্স ফর কাইন্ড প্রেজেনস… ইত্যাদি দু-মিনিট। মুখস্থই। এয়ার হোস্টেসরা যেমন বলে – যেন মেশিন বলে। মাইকে বলল, আর পাঁচ মিনিটের মধ্যে ম্যাকাউ পৌঁছে যাব। ম্যাকাউকে পরিচালনা করে চীন আর হংকং। ওখানে আমাদের ট্যুর ম্যানেজার থাকবেন অমুক। যারা যারা ভেজিটেরিয়ান, ওরা ওদের নাম দিয়ে দেবেন। তিন রাত ম্যাকাউ থাকবে। দুটো সেমিনার দিনের বেলাতেই সেরে নেব।  সন্ধেগুলো একান্তভাবে আপনাদের। এনজয় করবেন। কোম্পানিও কিছুটা প্রোগ্রাম রেখেছে। আপনাদের ম্যাকাউ ঘোরাবে। শেরাটন হোটেলে রাখা হলো। দুই ড্রাগনের তলা দিয়ে ঢোকার গেট। লাউঞ্জের একধারে ক্যাসিনো। ড্রাম ঘুরছে। ড্রামের গায়ে সংখ্যা। সংখ্যা ঘুরছে। সেই কেষ্টনগরের বারদোলের মেলার মাঠে লটারি বসত, কাঁটা ঘোরাতে হতো, যে-নম্বরে থামবে, সেই নম্বরে যা প্রাইজ তাই পাবে। জীবক চিরুনি, লজেনস আর পস্নাস্টিকের বাঁশির বেশি কিছু পায়নি কোনোদিন। কিন্তু তাকের ওপর থরে থরে সাজানো থাকত ঘড়ি, ক্যামেরা… জলের বালতিও থাকত, পেলে যা খুশি হতো।

ক্যাসিনোয় আরো নানারকম জুয়া। ক্যারমের মতো টেবিলে পকেটে বল ফেলা, ঝোলায় হাত ঢুকিয়ে কিছু নম্বর বার করা…। হিউম্যান ব্যাগও আছে। যুবতী নারী। জ্যান্ত। ওর কোমরে দড়ি বাঁধা। পেটের ওপরে জমা নম্বর বসানো চাকতি। ওর পোশাকের ভেতরে হাত ঢুকিয়ে একটা চাকতি বার করে আনতে হবে।

দুপুরে খাওয়া-দাওয়ার পর রেস্ট। ম্যাকাউ পর্তুগাল কলোনি ছিল। ১৯৯০ সালে স্বাধীন হয়েছে। পর্তুগাল আর চাইনিজ ফিউশন ফুড খেল জীবক। আনারস আর চিজ দিয়ে ভেড়ার মাংস। বিন্স সেদ্ধ। জানালা দিয়ে সমুদ্র দেখা যাচ্ছে। ঘরে টিভি। সার্ফ করতে থাকে। কিছু কিছু পর্নো ছবি একটুখানি দেখিয়েই বন্ধ করে দেয়। তারপর বলে এটা পে-চ্যানেল। দেখলে পয়সা লাগবে, হোটেল বিলে যোগ হবে। জীবক ভাবে, থাকগে। স্ক্রিনে দেখে কী হবে। বিকেলে দু-তিনটে দল হয়ে গেল। জীবক রামানুজ বরাট ছাড়া কাউকে চেনে না। রামানুজদা ম্যাডোনায় আছেন। মেডিসিনের ডাক্তার। সুধীর মৈত্রকেও বলেছিল, উনি আসেননি। তাই বলে মহৎ আদর্শের খাতিরে আসেননি – এমন নয়। ম্যাকাউ একবার হয়ে গেছেন – তাই আসেননি।

জীবক রামানুজদার সঙ্গে। একটা পাবে ঢোকা হলো। সারা পৃথিবীর মদ আছে। রামানুজদা জিজ্ঞাসা করলেন, কোথাকার রাম আছে? বলল – জ্যামাইকা, ত্রিনিদাদ, কিউবা, ইন্ডিয়া, সাউথ আফ্রিকা। কোনটা ভালো? উত্তর – কেউ বলে ইন্ডিয়া, কেউ বলে জ্যামাইকা। রামানুজদা বললেন – দ্যান সকল দেশের সেরা সে যে আমার জন্মভূমির রাম। আমার দেশেই তো রামরাজ্য।

রাস্তার দুদিকে ঝলমলানো দোকান। গয়না, পোশাক, ক্রিস্টাল, ইলেকট্রনিকস – সব আলোর রোশনাই হাতছানি দিচ্ছে। একটা কমপেস্নক্সে ঢুকল ওরা। এ কী রে বাবা, সময়টা পালটে গেল নাকি? এখন তো রাত আটটা, কিন্তু মনে হচ্ছে যেন এই মাত্র সন্ধে হলো। আবার ঘড়ি দেখল জীবক। আটটা দশ। অথচ আকাশে
আলো-অন্ধকার, একদিকে যেন একটু আগে সূর্য ডুবেছে, পশ্চিম দিকই হবে ওটা, ওদিকের লাল ভাবটা মিলিয়ে যায়নি এখনো। একটুকরো মেঘে সামান্য রং লেগে আছে। উলটোদিকের আকাশ একটু বেশি অন্ধকার। একটা-দুটা তারা ফুটেছে। পুরো আকাশটাই আর্টিফিসিয়াল? কত গাছ। গাছ বেয়ে লতা। কোনটা আসল কোনটা নকল বোঝা যায় না। দোকানের সামনে মেয়েরা। কেউ গয়না, কেউ পোশাক, আন্ডারগার্মেন্টস পরাও অনেকে। ছেলেরাও আছে। সত্যিকারের? নাকি আর্টিফিসিয়াল? ম্যানিকুইন? একটা ম্যানিকুইনকে ধরতে গেল জীবক, ম্যানিকুইন স্মাইল দিলো, ভ্রম্ন নাচাল। এক জায়গায় জল, জলে ফোয়ারা। ফোয়ারার ধারে রেসেত্মারাঁ। সারি সারি ম্যাসাজ পার্লার। রামানুজদা বললেন, টাকা এনেছ? ঘাড় নাড়ায় জীবক। ওরা প্রথমেই দুশো ডলার দিয়েছিল। আমি আরো দুশো এনেছি।

রামানুজ বরাট বলল, বড্ড কম দেয়। দুশো ডলার মানে বারো হাজার টাকা। আমার একবেলার চেম্বারে কামাই। এখানে চারদিন, মানে ধরো ছদিন চেম্বার খুলব না। অনেক লস্। বিনে পয়সায় মদ খেতেও আসি না। আমি তো রাম খাই, সস্তার মদ। তবু আসি। ফর আ চেঞ্চ। তোমাদের মতো ইয়াং জেনারেশনের সঙ্গে আড্ডা হয়। এসব কোম্পানি ব্যাকডেটেড। খালি ব্যাটা ছেলেগুলোকে নিয়ে আসে। মেডুলা-ফেডুলার মতো কোম্পানিগুলো মেয়ে ডাক্তারগুলোকেও নিয়ে আসে। একবার গেছিলাম লাস ভেগাস। কেরালার দুটো মেয়ে কী মদ খেল। একটা পাঞ্জাবি মেয়ে বলল, ডক্টর বরাট, ইট লুক্স অ-সাম অ-সাম, আই লাইক টু বি হাগ্ড্। মদ খেয়েছিলাম, আমি শুনলাম ফাক্ড। শুনেই আমার ইরেকশন হয়ে গেল। আমি ভাবছি ইচ্ছুক মেয়েদের ফেরাতে নেই – কিন্তু কোথায় ওসব করা? একটা মাঝারি হলে পার্টি চলছে। ভাবছি বলব কিনা রাতে আমার রুমে এসো, এদিকে আমরা শেয়ারিং রুমে থাকি, আমার সঙ্গে ছিল ডক্টর কৃষ্ণমূর্তি। একেবারে নিরামিষ লোক। ও এসেছিল বিনে পয়সায় ওর ছেলের সঙ্গে দেখা করবে বলে। ওর ছেলে ফিনিকসে থাকে, লাগ ভেসাস থেকে তিন ঘণ্টার ড্রাইভ। ছেলেই বাপের সঙ্গে দেখা করতে এসেছিল। ভাবতে ভাবতে সময় চলে গেল, তখন মেয়েটা বলল – ওহ্! ইউ গাই সো শাই টু হাগ মি বলে অন্য গাইয়ের কাছে হাগতে, মানে হাগ খেতে চলে গেল।

রামানুজ বরাট তিন পেগ মতো রাম খেয়েছিল। জীবক একটা। জীবকের আর একটু খেতে ইচ্ছা করছিল। সামনেই লেখা ফ্রি ওয়েলকাম ড্রিংকস। ওটা একটা ম্যাসাজ পার্লার।

চোখের ইশারা করল রামানুজদা। ঢুকে গেল। কাউন্টারে একটা যুবতী। পাশের সোফায় পাঁচ-ছজন কমবয়সী মেয়ে। খুব ছোট পোশাক। ওপর থেকে ঝিলিক ঝিলিক আলো। একটা কার্ড ধরিয়ে দিলো রিসেপশনের মেয়েটা। হ্যান্ড ম্যাসাজ 120 HD, ফুট ম্যাসাজ 130 HD, ফুল বডি 300 HD। HD মানে হংকং ডলার। এক ইউএস ডলারে আট হংকং ডলার। মানে এক হংকং ডলার সমান আট টাকা। ফুল বডি ম্যাসাজ মানে তিনশো হংকং ডলার সমান সমান চবিবশশো টাকার মতো। সস্তাই তো! একশ ইউএস ডলার ভাঙিয়ে আটশো কুড়ি সিঙ্গাপুরি ডলার পেয়েছিল। তাই থেকে তিনশো ডলার দিয়ে দেওয়া যাবে। রিসেপশনিস্ট বলল, চুজ ইউর চিক্স। রামানুজদা বললেন – যাও, কাকে পছন্দ। রামানুজদা একজন মোটা থলথলে পছন্দ করল। বোধহয় চাইনিজ নয়। বড় চোখ, নীল। রাশিয়ান? জীবকের ফ্যাটি অভিজ্ঞতা আছে। ও ছোট চেহারার সিস্নম নিল। নাম জিজ্ঞাসা করল। জেসমিন। বলল ফিলিপিনো।

কাঠের সিঁড়ি, ওপরে গেল। মেঝেতে ম্যাট্রেস। পাশের ঘরে রামানুজদা। বাংলায় বলল – সবকিছু হবে না হয়তো। যদি এক্সট্রা কিছু দিয়ে হয় করিয়ে নিতে পারো। কিন্তু ভাই, কনডম মাস্ট। এনজয়।

ম্যাসাজের জন্য আলাদা পোশাক আছে। ঢিলেঢালা। জাঙ্গিয়াটা পরাই ছিল। জেসমিন ওর গায়ের ওপরের আবরণ খুলল। শুধু অন্তর্বাস। জিজ্ঞাসা করল, হোয়ার ইউ ফ্রম? জীবক বলল, ইনডিয়া। ইনদিয়া! চোখে প্রশংসা যেন। মেরা ভারত মহান। ইনডিয়া আগে বাড়তা হ্যায়। জেসমিন জীবকের ডান হাতটা টেনে নিয়ে একটা মৃদু চুমু দিলো। জয় হে… জয় হে… জয় হে…। তখন জীবক দু-হাতে ওকে টেনে নিয়ে ওর শরীরে জড়াতে চাইল। মেয়েটা বলল, ওহ্ – নো ম্যান, সরি। অনলি ম্যাসাজ। জীবক ভাবল, অনলি ম্যাসাজ তো খালি ছোট ছোট দুটো ফালি কেন বডিতে? বুকে দুটো আপেল বসানো যেন।

মেয়েটা প্রথমে ওর আঙুলগুলো ভাঙল। হাতের পাতা থেকে কনুই, তারপর কনুই থেকে কাঁধ। দু-হাত, তারপর দু-পা। শরীরে বিদ্যুৎ। হাঁটু, ঊরু। ঊরুতে তরঙ্গ। এইচপি ফার্মা। ফলিসিড। বায়ো ডি। সফিরল পস্নাস। ইকোভিট। ভিটামিন-ই উইথ জিংক অ্যান্ড সেলেনিয়াম। এসব প্রেসক্রিপশন করতে হবে। আর পারা যাচ্ছে না… জীবকের হাতের প্রতিটি আঙুল লক্লক্ করছে, মেয়েটা ক্ষেপ্র সর্পিনীর মতো দেহটা সরিয়ে নিল। মেয়েটা ওর গায়ের ওপর বসেছে। ওর দু-পায়ের মাঝখানে জীবকের একটা হাঁটু। হাঁটু মানে প্যাটেলার হাড়, টেন্ডন, ওখানেও গরম লাগছে, হাড় গলে যাবে। প্যান্টি এবং ওর দুই ঊরু চেপে রেখেছে। খাবলে ধরতে চায় প্যান্টির ইলাস্টিক। তড়িৎ সরে যায়, উঠে যায় ওর পেলভিক রিজিয়ন। জীবক বলে, আই উইল পে ইট হ্যানড্রেড মোর বাক্স। মেয়েটা বলে, ওহ্ ডোন্ট বি নটি ম্যান… অনলি ম্যাসাজ…। একটা চোখ টিপল যেন। মেয়েটা জীবকের হাতদুটো ওর কাঁধে নিয়ে নিল। হাতের খেলা। রক্তের চলাচল টের পাচ্ছে জীবক। বুঝতে পারে, ওর পাল্স রেট বেড়ে গেছে। শরীরে নাগিনী নাচছে, যোগিনী নাচছে, দুটো হাত মাথার দুপাশে নিয়ে হাঁটুতে চেপে ধরেছে এই মেয়ে। এই ছলনাময়ী হাতদুটো হাঁটুতে চেপে মাথাটা ঝুঁকিয়েছে জীবকের মুখের সামনে, ওর হাতদুটো খেলা করছে জীবকের গায়ে। বুকের দুপাশে, রিবস্-পাঁজরার হাড়গুলো বেজে উঠছে পাগলা পিয়ানোর মতো, বুকদুটো চোখের ওপরে নাচে। বুব্স! বুব্স। জীবকের হাঁটুতে চেপে  রাখা হাতদুটো আকুলি-বিকুলি করে। জীবক বলে, পিস্নস জেসমিন… পিস্নজ…। জেসমিন বলে, থ্রি হানড্রেড দোলার দেন… ওকে? জীবক বলে, থ্রি হানড্রেড? ওকে ওকে…। মেয়েটি বলে, গুডবয়। জীবকের গায়ে লুটিয়ে পড়ে।

বাইরের সোফায় অপেক্ষা করছিল রামানুজ বরাট। ঘড়ি দেখছিল। ঘর থেকে বেরিয়ে এলো জীবক। জীবকের একটু লজ্জা লজ্জা লাগছিল। রামানুজদা ফিফটি আপ। রামানুজদাই তো প্রভোক করল। রামানুজ বলল – এনজয়েড? ঘাড় নাড়ল জীবক। যেন বাসরঘর থেকে কনে বেরোবার পর কনের বউদির প্রশ্নের উত্তর দিলো ঘাড় নাড়িয়ে। একটু বোকা বোকা লাগল।

ওরা বেরোল। রাস্তার আলো ঝলমলাচ্ছে। রামানুজ জিজ্ঞাসা করল – প্রিকোশনটা নিয়েছিলে তো? আবার ঘাড় নাড়ল জীবক। কত খসাল? – এক্সট্রা?

তিনশো এইচ.ডি.। আটশো কুড়ি ছিল, ছশো এখানেই বেরিয়ে গেল। আরে ডোন্ট থিংক ইট সেকেন্ড টাইম। এরকম কত তিনশো আসবে, কত তিনশো খসবে। একটা সময় মনে হবে কি জানো, টাকা-পয়সা হলো দাঁতের পস্নাক। দাঁতের গোড়ায় এমনি এমনিই জমে যায়। ডেন্টিস্টের কাছে গিয়ে স্কেলিং করে ছাড়াতে হয়। এই তো সবে ক্যারিয়ার শুরু করলে। দশ-বারো বছর পর দেখো। চৌবাচ্চার ইনপুট পাইপগুলো ক্লিয়ার রেখো।

জল ঢুকবে। বাইরের পাইপ দিয়ে কত বেরোবে? যদি বাংলাদেশের পেশেন্ট আসতে থাকে, তোমায় কে দেখে? ওরা লক্ষ্মী। আমার কাছে এখন অনেক আসে।

– আপনি কতক্ষণ অপেক্ষা করছিলেন রামানুজদা? জীবক জিজ্ঞাসা করল।

– বেশি না। মিনিট পনেরো হবে। আমি তো ওসব পর্যন্ত যাইনি। শুধু ম্যাসাজ। ম্যাসাজটা এরা ভালো করে। আরো ভালো করে থাই মেয়েরা। ব্যাংকক, পাতেয়া…। সারাশরীর চাঙ্গা করে দেয়। ভালো বস্নাড সার্কুলেশন হয় বুঝলে…।

পরদিন সকালে ব্রেকফাস্টের পর ট্যুর ম্যানেজার ম্যাকাউ দেখাতে নিয়ে গেল। একটা বাস এসেছিল। এসি। ওয়াইন মিউজিয়াম। হাজার হাজার ব্র্যান্ডের ওয়াইন সাজানো।
একশ-দুশো-তিনশো বছরের পুরনো। আঙুরের, আনারসের… এমনকি পেয়ারা থেকে তৈরি গুয়াভা ওয়াইন। কত রকমের বোতল। নিচে ওয়াইন কাউন্টার। সবাই খেল। গুয়াভা ওয়াইন টেস্ট করল জীবক। জীবকের মনে হলো, ওর আয়ুর্বেদাচার্য্য পিতামহ কি জানতেন পেয়ারা থেকেও সুরা বানানো যায়…। পর্তুগিজদের তৈরি একটা পুরনো গির্জা দেখা হলো।

বিকেলে ন্যাশনাল প্রমোশনাল ম্যানেজার এলেন। জি.ডি গোয়েল। তিনি ওয়েলকাম স্পিচ দিলেন, আর সেমিনার শুরুর আগে কয়েকজন ডাক্তারকে এইচপি অ্যাওয়ার্ড দিলেন ফর দেয়ার ওয়ান্ডারফুল কন্ট্রিবিউশন টু পাবলিক হেলথ। কিন্তু বুঝতে কারো অসুবিধা হচ্ছিল না – ওয়ান্ডারফুল মাল বেচানোর জন্যই এই ধানাইপানাই। তিনজন অর্থোপেডিক এই অ্যাওয়ার্ড পেল। সুন্দর মেমেন্টো। দুটো হাত। একটা H অক্ষর, অন্য হাত P অক্ষর ধরে রেখেছে।

মিস্টার গোয়েল বললেন, ইনডিয়াতে এখন শুধু বাংলাদেশ-পাকিস্তান-আফ্রিকান দেশগুলো থেকেই মানুষ আসছে চিকিৎসা করাতে তাই নয়, ইউরোপ থেকেও আসছে – শুধু সস্তার খোঁজে নয়, একসিলেন্সের জন্য। ভারতের ডাক্তাররা গর্ব করার মতো। এরকম ডাক্তারদের হাতে পুরস্কার তুলে দিতে পেরে তিনি ধন্য হলেন।

প্রকৃত সত্যটা সবাই জানে – এরা একচেটিয়া ওদের ওষুধ লিখে গেছেন। একজন মেডিসিনের ডাক্তার পেলেন। রামানুজ বরাট সামনের সারিতে ছিল। জীবক পেছনের দিকে। জীবকও ওদের প্রচুর ওষুধ লেখে। রামানুজদা পরে জীবককে বলেছিল – ওই আয়রন ফিকসেশনের নামে ফলিক অ্যাসিডের সঙ্গে এটা-ওটা হাবিজাবি মিশিয়ে দাম বেশি বানানো ফালতু ওষুধ লিখি না। আমাকে প্রাইজ দেবে কেন? তবে আমি ওদের মেডিসিন কিছু তো লিখি। কিছু তো ভালো আছে। আসলে HP লেখা মেমেন্টোটা বড় কথা নয়। এর সঙ্গে যে ছোট্ট বাক্সটা দেওয়া হচ্ছিল সেটাই বড় কথা। বিহাইন্ড এভরি সাকসেসফুল ম্যান, দেয়ার ইজ আ উয়োম্যান। হিরে বসানো কানের দুল ছিল সেই প্রেরণাদাত্রীর জন্য।

তিন-চারজন বক্তৃতা করল। মানে সেমিনার কিনা। পাওয়ার পয়েন্টে একজন দেখাল অ্যাকটিভ অক্সিজেন কীভাবে তৈরি হয়, কীভাবে অক্সিডাইজ করে, বয়সের ছাপ কীভাবে পড়ে…। নতুন কথা কিছু নয়, প্রায় সবারই জানা কথা। বেশিরভাগ ডাক্তারবাবুই তখন গল্প করছিল, কেউ মোবাইলে টেপাটিপি করছিল। সন্ধের পর লাইভ শো দেখতে যাওয়া হলো দলবেঁধে। পেট-নাচানো নাচ ছিল, একে বলে বেলি ড্যান্স। ইউটিউবে দেখেছে জীবক। প্রথম লাইভ দেখল। সেক্স ম্যাজিকও ছিল ওই শোয়ে।

যেমন একটি মেয়ে তার যোনিদেশে… যোনি বললে অশস্নীল লাগে – ভ্যাজাইনায় একটা লম্বা লাঠি ঢুকিয়ে দিলো, কিংবা একটা ব্যাটা ছেলে ওর পেনিসটা কুকুরের ল্যাজের মতো নাড়াতে লাগল – এসব।

রাতে ককটেল ডিনার। হাতে গস্নাস নিয়ে কেউ বলছিল, এখানে আর কী। দেখেছিলাম লাস ভেগাসে।

কেউ আবার আমস্টারডামের অভিজ্ঞতা বলল। এভাবে বিশেষজ্ঞ ডাক্তারদের সেমিনারের দ্বিতীয় রাত শেষ হলো।
তৃতীয় রাতটাও অনেকটা এরকমই। যারা ছিল না এই ট্যুরে, ওদের নিন্দে-মন্দ হলো। একটু কালচারাল প্রোগ্রামও হলো। ডাক্তার মুরারি ঘোষ ভালো টপ্পা গাইতে পারেন। শোনালেন। হাই হয়ে গিয়ে একটা খ্যামটা টপ্পা – ‘আনা আনা বেদানা, কে নিবি বেদানায় বেদনা, বড় নিজ ঘরে লাউ ফলে, বেদানা-বিল্বফলে হিংসাতে বুক জ্বলে! বেদানা গাছের দিকে চাহিব না আর…’ গানটা গাইবার সময় বেদানা, বিল্বফল ইত্যাদির আকার সম্পর্কে শ্রোতাদের ধারণা দান করছিল টপ্পাগায়ক ডাক্তার। শেষ রাত্তিরটা একটু একা একা ঘুরছিল জীবক। একটা উঁচু টাওয়ার থেকে আলো ঝলকাচ্ছে। ওটা ম্যাকাউ টাওয়ার। ওখান থেকে সারাটা শহর দেখা যায়। ওখানে ওঠা হয়নি। কত কিছুই তো দেখা হলো না। এটুকু যে হলো সেই-বা কম কি। বাবা তো জীবনে কোনো ফরেন ট্যুরই করেননি, এমনকি
নেপাল-ভুটানও নয়। আদর্শর নামে এসব সুযোগ ছাড়াটা কি বোকামি নয়? শোনো বাবা, কম্প্রোমাইজ তো সবসময় করতে হচ্ছে কিছু না কিছু। ওই যে কৃষ্ণনগরের ডাক্তার বর্ধন, হাসপাতাল থেকে নার্সিং হোমে রোগী চালান করে, ডিউটি ফাঁকি দিয়ে চেম্বারে বসে থাকে, বলে ছিলে তো ওর নামে কমপেস্নন করবে…। কিচ্ছু করোনি। বরং মায়ের যখন বস্ন্যাকআউট হলো, বর্ধনের নার্সিং হোমেই তো ছুটে গেলে। আমাদের ম্যাডোনার মৈত্রকে তখন কোথায় পাবে? বর্ধন ল্যাগিক্সের ডোজ কমিয়ে দিলো। তারপর থেকে তো কিছু প্রবলেম হলে বর্ধনের সঙ্গেই কথা বলো। সনাতনের মায়ের প্রতি তোমার এত দরদ কেন? আরো তো গরিব ছেলে আছে দুনিয়ায়। সনাতনের মায়ের শরীরটা এখনো যথেষ্ট ইয়ে। মায়ের এ-নিয়ে একটু  গ্রিভান্স আছে। পৃথিবীতে কেউ এক্কেবারে ধোয়া তুলসী নয়। সবার মধ্যে বস্ন্যাক অ্যান্ড হোয়াইট আছে। তোমার মধ্যেও আছে বাবা, সবসময় এত আদর্শ কপচিও না। একটু খুব সুন্দর ম্যাগনিফাইং গস্নাস বিক্রি হচ্ছে রাস্তায়। কারুকাজ করা হাতল। বাবা মাঝে মাঝেই বইপত্র খোলেন। ছোট লেখা দেখতে অসুবিধে হয় বলে একটা আদ্যিকালের আতশ কাচ ব্যবহার করেন। চলিস্নশ হংকং ডলার চাইল। বেশি না।  ওরা পকেটমানি বাবদ যা দিয়েছিল তার বেশির ভাগটাই তো চলে গেল ফুর্তিফার্তায়।

বড় বড় দোকানে ঢুকতে ভয় করে। পকেটে মালকড়ি তো বেশি নেই, রাস্তার ধারের ছোট ছোট দোকানই ভালো।

টাই ঝুলছে। দুটো কিনল। বুচুনদাকে একটা দেবে, একটা ওর নিজের। টাইয়ে কিউট ড্রাগন এমবোর্স করা। ড্রাগনও কিউট হয়, হয়তো। প্যান্টি পরা নারী। ম্যানিকুইন। দুই ঊরুর ফাঁকে প্রজাপতি বসে আছে। মানানসই ব্রা ও বুকের কাপদুটো প্রজাপতির পাখনার রঙে ম্যাচিং। কত দাম?

নাইনটি নাইন এইচ.ডি. ক্যালকুলেটারে চটপট। নাইনটি নাইন ইন টু এইট পয়েন্ট টু এইট হানড্রেড ইলেভেন রুপিজ। সস্তাই তো। পাওয়া যাবে কলকাতায়? স্বসিত্মকা ভাববে অনেক দামি। ওরকমই একটা ইমপ্রেশন দেওয়া হবে। আর মুনমুনের জন্য কিছু? বুচুনদার মাসতুতো বোন? থাক। সবে তো আলাপ… আচ্ছা একটা পার্স। দেখতে মাছের মতো, পেটে টাকাপয়সা রাখা যায়। মায়ের জন্য কী নেওয়া যায়? নানারকম রান্নার সামগ্রী আছে। ননস্টিক প্যান। আবার রান্না? কত রকম শুকনো মাছ। কত রকম নাটস। মায়ের বাদাম খাওয়া মানা। কত রকম প্রসেস করা মাংস। মায়ের এসব কিচ্ছু চলে না। বালিশের ঢাকনা। চাইনিজ ভাষায় কী যেন লেখা। তিনটে অক্ষর। যা লেখা আছে এর মানে জিজ্ঞাসা করতে সেলসগার্ল ভাঙা ইংরেজিতে বলল, হ্যাভ হ্যাপি শিস্নপ। বলল, মায়েরা অ্যামব্রয়ডারি করে দিত সমত্মানের বালিশের ঢাকনায়। এখন তো ইন্ডাস্ট্রিয়ালি হয়। হি হি। জীবককেও দিয়েছিল ওর মা, যখন হোস্টেলে ছিল। বালিশের ঢাকনায় সুখ-স্বপ্ন। রুমালে সুখে থাকো। একটা
বালিশ-ঢাকনা কিনল। সেলসগার্ল বলল, এগুলো হলো লাকি ওয়ার্ড। একটা বুদ্ধমূর্তি কিনল। একটা খুব সুন্দর রাইটিংপ্যাড। প্রতিটি পাতায় খুব হালকা করে ছবি ছাপা। পদ্মফুলে ঢাকা সরোবর, বাঁশবন, ছোট ছোট টিলার ওপর কুঁড়েঘর, মোষের ওপর বসে থাকা মাথায় টোকা পরা বালক – এসব নিয়ে পাতাজুড়ে ছবি। যেন স্বপ্নের দেশ। প্রতিটা পৃষ্ঠায় আলাদা ছবি। ছবির তলায় কিছুটা জায়গায় লাইন টানা। ওখানে লেখা যায়। জীবক বলবেন, মা, এখানে মনের কথা লিখে রেখো। যাহ্, দিদির জন্য কিছু কেনা হলো না।

 

লীলা জীবককে বলল, ল্যাপটপে স্কাইপ লাগিয়ে নিস। আমি প্রত্যেক রোববার তোদের সবাইকে দেখব। কথা বলব।

চিন্ময়ীর আড়ালে দেবকিঙ্করকে জিজ্ঞাসা করল লীলা – সত্যি করে বলো তো, মা ঠিক আছে তো? ভালো হয়ে যাবে তো? জীবক ওখানে ছিল। কপাল কুঁচকে ওর দিদিকে দেখছিল। ন্যাকা! যেন কিছু বোঝে না। খুব তোমার আইকিউ, ব্রিলিয়ান্ট, ম্যাথ্সের বাইরে কিচ্ছু বোঝে না, এটা তোমার জাস্ট ভড়ং। তুই হলি এক নম্বর ক্যারিয়ারিস্ট। স্বার্থপর। নিজেকে ছাড়া কিচ্ছু বুঝিস না তুই।

দেবকিঙ্কর বললেন, এখন তো স্টেবলই আছে। ও নিয়ে ভাবিস না। এখানে থেকেই-বা কী করবি।

মাথা নাড়ল লীলা। যেন বলছে, হ্যাঁ ঠিকই তো। লীলার জন্য চিন্ময়ী স্পেশাল রান্না করেছেন। পটোলের ভেতর চিংড়ি মাছ পুর দিয়ে, ছানা পুর দিয়ে। আলু পোস্ত হচ্ছে। এখন এক সপ্তাহ বাড়িতেই থাকবে লীলা। আর কী কী খাওয়াবে জীবক তো আর দেখতে যাচ্ছে না। আগামী শুক্রবার রাত্তিরে পেস্নন। পেস্ননে উঠিয়ে এয়ারপোর্টের কাছে কোনো হোটেলে থেকে সকালবেলায় সবাই ফিরবে। জীবক ওর বাসুইহাদির ফ্ল্যাট থেকেই এয়ারপোর্ট চলে যাবে, সি অফ করে আবার ফিরে যাবে। মা-বাবাকে রাখতে পারলে তো ভালোই হতো, কিন্তু এখনো তো ব্যবস্থা নেই, কী করা যাবে।

সোমবার ভোরবেলা জীবক ব্যাগ নিয়ে বেরোল। লীলাকে বলল, তোর সঙ্গে আর দেখা হবে না – একদম সেই এয়ারপোর্টে। লীলা বলল, বেশিদিন থাকব না ও-দেশে। আমি থাকতে থাকতে মা-বাবাকে ঘুরিয়ে আনব। আচ্ছা, আচ্ছা, সব করবি বলে দিদির মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছেন চিন্ময়ী। জীবক ভাবে, কই, আমি যখন দিলিস্ন গেলাম, পাঞ্জাব গেলাম, আমাকে তো হাত বুলিয়ে দেয়নি…। রেজাল্ট খারাপ ছিল বলে এতটা ফারাক?

জীবক ভাবে, তুই আমেরিকা যাচ্ছিস তো, আমিও ফরেন ঘুরছি। হংকং-ম্যাকাউ হলো। থাইল্যান্ড যাব শিগগিরই, তারপর আমস্টারডাম, সুইজারল্যান্ডও ঘুরব – দেখে নিস দিদি।

চিন্ময়ী লীলাবতীর গা ঘেঁষে থাকছে। কী কী ওষুধ খায় দেবকিঙ্করের কাছ থেকে জেনে নিয়েছে লীলা। দেবকিঙ্কর একটা খোপখোপ বাক্সে ওষুধগুলো রেখে দেয়। খোপের ওপরে লেখা সকাল নটা, খাবার পর, বেলা একটা, খাবার আগে, রাত দশটা ঘুমের আগে ইত্যাদি। মাঝে মাঝে চিন্ময়ীর চোখে জল আসে। সনাতনের মা বলে, কান্না করছ কেন দিদি, আমার সনাতনও তো সেই সাতসাগর পাড়ের দেশেই গেছে। কথাটা চিন্ময়ীর খুব একটা ভালো লাগে না। সনাতনের মা সব এক করে ফেলেছে। ও যে দয়ায় আছে, কৃপায় আছে, মনে থাকে না সবসময়। সনাতন পারত আমেরিকা যেতে, যদি সনাতনের মায়ের দায়িত্বটা উনি এভাবে না নিতেন, এই মেয়েছেলের যে একটা খারাপ অসুখ আছে, এটা এ-ধারের কেউ জানে না। এই মহিলাও ভুলে যায় বোধহয়। শুক্রবার এলো। রিকশা করে মেয়েকে নিয়ে সিদ্ধেশ্বরী মন্দিরে গেলেন চিন্ময়ী। দই আনলেন। বেরোনোর সময় দইয়ের ফোঁটা। দেবকিঙ্করকে চিন্ময়ী বললেন, আজ অন্তত দুর্গা-দুর্গা বলো। দেবকিঙ্কর বললেন।

এয়ারপোর্টে মেয়ের মাথায় হাত রেখে দেবকিঙ্কর বললেন – লীলাবতী নামটা তাহলে সার্থক হলো।

জীবকের মনে হলো – জীবক নামটা তাহলে সার্থক করতে পারেনি ও।

 

গুরুপদ মিত্র এলেন একটা রোববার। বললেন, বউঠানকে দেখতে আসব আসব করছি বহুদিন ধরে – আসা হচ্ছিল না, তোমায় তো আবার ফোন করে, অ্যাপয়েনমেন্ট করে আসতে হয়। গত দুটো রবিবার তোমাকে পাইনি। হাড়িভাঙ্গা না কড়াইভাঙ্গা ওখানে গিয়ে হাসপাতাল বানাচ্ছ…। আমি ভাই নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছি অনেক। তোমার মতো গাদাগাদা পেশেন্ট দেখি না। অবশ্য আমার কাছে অত পেশেন্ট আসেও না। যৌবন বয়সে কবিতা রিসাইটেশন করতাম – আমি কবি যত ইতরের। কামার আর চামারের… ঠিক মনে নেই আর। তুমি হলে ওরকম। খালি কবির বদলে ডাক্তার বসাতে হবে। আমি ফিটাও বাড়িয়ে দিয়েছি। দিনে পাঁচ-সাতটা রোগী দেখি, ব্যস। আগে একটা ব্যাপার ছিল বামপন্থী লোকগুলো সব বামপন্থী ডাক্তারের চেম্বারেই যেত, বামপন্থী উকিলের কাছে যেত। তারপর একটা যুগ এসে গেল যখন বাড়িওয়ালা বামপন্থী, ভাড়াটিয়াও বামপন্থী। শ্রমিক বামপন্থী তো মালিকও বামপন্থী। জোতদারও বামপন্থী হয়ে গেল, বর্গাদার তো বামপন্থী বটেই। মুশকিল হয়ে গেল যখন চোরও বামপন্থী, আবার দারোগাও বামপন্থী হয়ে গেল। সবাই তো বলছে ইনকিলাব জিন্দাবাদ। আর এখন? কতদিন ধরে এই সেস্নাগানটাই শুনি না। লাস্ট কবে শুনেছ দেবু?

দেবকিঙ্কর কোনো মন্তব্য করেন না, মাথা নাড়ান শুধু।

আমরা যারা ১৯৫০-এর আশপাশে জন্মেছি, আমরা ভালোই ছিলাম, বলো? একটা তো স্বপ্ন ছিল, একটা তো লক্ষ্য ছিল, বলো? আমরা ভাইবোনেরা একসঙ্গে মামাবাড়ি যেতাম, মানুষ বন্ধু ছিল, অদৃশ্য ফেসবুক বন্ধু নয়, কলের জল খেতাম আঁজলা পেতে, সেই জলে অসুখ করত না, নিজেরাই ডা-া-গুলি বানিয়ে খেলতাম, পাড়ার মেয়েদের বিয়ে হয়ে গেলে মনে কষ্ট হলেও গামছা বেঁধে পরিবেশন করে দিতাম, হাতদুটো জামার মধ্যে ঢুকিয়ে দিয়ে বলতাম, আমার হাত নেই, ভাইজি-ভাগ্নেদের হাউমাউখাউ বলে ভয় দেখাতাম মনে আছে? নবযৌবন মনে আছে দেবু, ইন্টারন্যাশনাল গাওয়া, সমাজতন্ত্রের অতন্দ্রপ্রহরী সোভিয়েত ইউনিয়ন… তুমিও কি ভাবোনি বিপস্নবের পর দেশ গড়তে যে ডাক্তার লাগবে তার একজন হবো আমি। দেবকিঙ্কর বলেন, বিপস্নব না হলেও দেশ গড়তে ডাক্তার তো লাগে। তার একজন হওয়ার চেষ্টা তো করেছি গুরুদা, আপনিও করেছেন।

হ্যাঁ, করেছি কিছুটা। এখন আর বলতে পারব না করছি। সব ছেড়ে দিয়েছি। ছেলের কাছে গিয়ে কদিন থাকব। নাতনিটা খুব সুইট হয়েছে। ও একটা বড় আকর্ষণ। ওই জন্যই আজ তোমাদের সঙ্গে দেখা করতে এলাম। তোমার বউদি তো ওখানেই গত এক মাস। ডেলিভারির পর বউমা ওর বাপের বাড়ি ছিল প্রায় ছমাস। এখন এসেছে। ফলে তোমার বউদি ওখানে আয়াগিরি করতে চলে গেছে। চিন্ময়ী বললেন, এরকম ভাবছেন কেন দাদা। নিজের নাতনির টানটাই আলাদা। ওকে নিয়ে থাকতে তো বউদির ভালোই লাগবে। আমার কি বরাতে নাতি-নাতনি দেখা হবে? কে জানে। মেয়েটা তো ওসব ভাবনাতেই আনে না। জীবকের একটা বিয়েটিয়ে দিয়ে দিন। এটাই ঠিক টাইম। আমার ছেলের বিয়েটা একটু দেরি করেই হলো। আমি কী করব? ছেলেই টালবাহানা করল। যাকগে। দেরিতে হলেও বউমা কিন্তু ভালোই হয়েছে। আর্টিস্ট মেয়ে। খুব সাজিয়ে-গুছিয়ে রাখে ফ্ল্যাটটা।

মেয়েটা বিউটিশিয়ান কোর্স ছাড়াও ফুল সাজানোর কোর্স, তারপর অ্যারোমা থেরাপি এসব হাবিজাবি কোর্স করেছে – এরকমই জীবকের মুখে শুনেছেন দেবকিঙ্কর। ওদের নার্সিং হোমের ফুল সাজানোটা ও করে। ও মানে ওর লোক। ওর একটা কোম্পানি আছে ‘তপোবন’। ওদের পার্লার, অ্যারোমা থেরাপি সেন্টার, স্পা, কনে সাজানো, ফুল সাজানো এসব হয়। চিন্ময়ী বলেন, দেখুন না আমার জীবুর জন্য। মোটামুটি বুদ্ধিমতী হলেই চলবে। আর একটু মুখশ্রীটা…। লেখাপড়াটা…। অসবর্ণ হলেও অসুবিধে নেই। গুরুপদ বলেন, মুসলমান হলে? যদি মুসলমান হয়?

চিন্ময়ী বলেন – যতই বলি না কেন, ওটা সায় দেয় না মন।

গুরুপদ বললেন, এত বড় বড় কথা বলেছি, অথচ এই সংস্কারটা আমাদের গেল না। আমায় যখন প্রথম বুচুন বলল বিয়ের ব্যাপারটা তোমাদের ভাবতে হবে না। আমি ঠিক করে রেখেছি। কিন্তু মেয়েটা হিন্দু নয়। আমি আঁতকে উঠেছিলাম। মুসলমান? ও বলল, না, বৌদ্ধ। ওরা বড়ুয়া। যেন জ্বর ছাড়ল। বললাম, আরে বৌদ্ধ তো হিন্দুই। ঠিক আছে। যদি দেশভাগটা না হতো, মুসলমানরা নিজেদের আলাদা বলে যদি ভারত ভেঙে আর একটা দেশ না আদায় করে নিত, তাহলে বোধহয় আমাদের মনের মধ্যে এই বস্ন্যাকস্পটটা আর থাকত না। কী বলো হে দেবু!

দেবকিঙ্কর বলেন, আমি এসব ভাবি না গুরুদা, ভেবে কোনো কূলকিনারা পাই না। কিন্তু পাকিস্তান হলো বলেই বাংলাদেশ হলো আর বাংলাদেশ হলো বলেই বাংলা ভাষাটা টিকে গেল। নইলে –

– ছেড়ে দাও, এসব উলটোপালটা ভাবনাচিমত্মা ছেড়ে দাও। এবার বলো বউঠান কেমন আছেন। বুচুন বলছিল ডাক্তার মৈত্র খুব ভালো নেফ্রোলজিস্ট। মৈত্রর সঙ্গে ট্রাক রাখে ও। বলো, প্রেশার ঠিকঠাক তো? ক্রিয়েটিনিন কত? দেবকিঙ্কর বললেন, ক্রিয়েটিনিনটা দুই-আড়াইয়ের মধ্যেই তো ছিল এতদিন, লাস্ট যে স্যাম্পলটা করালাম, টু পয়েন্ট নাইন।

– অ্যালবুমিন যাচ্ছে না তো?

দেবকিঙ্কর তখন চিন্ময়ীর চোখের দিকে তাকালেন। ঠিক সেই সময়েই চিন্ময়ীও দেবকিঙ্করের দিকে তাকিয়েছিলেন, চোখের কোনায় কিশোরী-লজ্জা ফুটতেই চোখ নামালেন চিন্ময়ী। বললেন, চায়ের জল চাপাতে বলি গে, যাই।

দেবকিঙ্কর বললেন, ও ইচ্ছা করেই চলে গেল। বুঝলে না? আমি ওকে বলতাম তুমি কমোডে হিসি করো, আমি একটু দেখব। ও বলত এ আবার কী রকম ভীমরতি? বলতাম, আরে হিসিতে ফেনা হয় কিনা দেখব। হিসিটা কমোডে পড়লে ফেনা হলে বুঝতে হবে অ্যালবুমিন যাচ্ছে। যেটা ঠিক না। ও তখন বলল, হ্যাঁ ফেনামতো হয় তো, সে তো সবারই হয়। আমি বলি ‘ফেনামতো’ নয়, অ্যালবুমিন থাকলে যেটা হয় সেটা ফেনা। সেটাই তো দেখতে চাই। পরদিন বলল, লক্ষ করে দেখেছে ফেনাটা যেন বেশি বেশি। বললাম, আমি দেখব। গত হপ্তার কথা বলছি। রাত্রে বাথরুম গেল, বললাম ফ্ল্যাশ টেনো না, দেখলাম। পরদিনই অ্যালবুমিনটা করালাম।

– তোমার পৈতৃক সম্পত্তি এখনো চালাচ্ছো? কোবরেজ পিতার দেওয়া শিক্ষা। তা বেশ। তো কত দেখলে আলবুমিন?

– সিক্সটি ফাইভ।

– খুব বেশি না, তবে অ্যালার্মিং। ড. মৈত্রকে জানিয়েছ?

– হ্যাঁ, জানিয়েছি। একটা ওষুধ দিলেন। প্রোটিন খাওয়াটা আরো কমালেন। ছেলে একটা ডায়টিশিয়ানের সঙ্গে পরামর্শ করে একটা ডায়েট চার্ট বানিয়ে এনেছে – সেটাই ফলো করছি।

– হ্যাঁ। স্বসিত্মকা ভাদুড়ি-টাদুড়ি কী যেন। ভালো। ওই ম্যাডোনাতেই বসে। জীবক তো ভালোই কাজটাজ করছে। শুনি তো বুচুনের কাছে। বুচুনটা কলকাতায় এলো বলে তোমার ছেলেটাও আসতে পারল। প্রতি হপ্তায় সমত্মানের সঙ্গ পাওয়া যাচ্ছে।

দেবকিঙ্কর জানেন, ওর ঘাড় নাড়িয়ে সায় দেওয়ার সময় কফ সিরাপের ভেতরে কমলালেবুর এসেন্সের মতো সামান্য কৃতজ্ঞতাও মেশানো উচিত। সেটাই করল।

অ্যালবুমিনটা তো চিমত্মায় ফেলে দিলো। শেষ অবধি হয়তো ডায়ালিসিসের দিকে যেতেই হতে পারে আমাদের… দেবকিঙ্কর বলেন, হয়তো। তাই…।

আগে তো কলকাতা নিয়ে যেতে হতো। এখন তো কল্যাণীতেই ভালো ব্যবস্থা। এই কেশনগরেও বোধহয় হালে চালু হয়ে গেছে একটা। বুচুন বলছিল একটা ডায়াগনস্টিক সেন্টার খুলবে। প্রথমেই যা ইনভেস্টমেন্ট, তারপর হেভি প্রফিট। একটা সুগার বা ইউরিয়া টেস্ট করতে পাঁচ টাকার রি-এজেন্ট খরচ, একশ টাকা চার্জ করা হয়। বুচুন বলছিল ব্যাংক লোন নিয়ে একটা করবে – যদি আমি অ্যাকটিভলি হেল্প করি। আমি বললাম, রক্ষে করো বাবা, এসবের মধ্যে আমি আর নেই। প্রাইভেট ডায়াগনস্টিক বলো, হাসপাতাল বলো – সব নোংরামি। বুচুনের কাছে কিছু কিছু শুনি তো, কীভাবে পসিবল নরমাল ডেলিভারি কেসগুলোকে সিজারিয়ান করে দিতে হয়। কীভাবে অযথা স্টেন্টস্ বসাতে হয়। পেসমেকার কোম্পানির দালালদের সঙ্গে কার্ডিওলজিস্টদের সব নেক্সাস। আরে প্রাইভেট হসপিটাল ছেড়ে দাও। পিজির মতো হাসপাতালের অবস্থা দেখেছ দেবু? কুকুরের ডায়ালিসিস হতে যাচ্ছিল? আরে স্টেট মেডিক্যাল কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট তুই, কী করে সুপারকে রিকোয়েস্ট করলি কুকুরের ডায়ালিসিস করে দিতে?

দেবকিঙ্কর বললেন, কাগজে তো পড়লাম কদিন আগে।

গুরুপদ বলে যাচ্ছেন, কুকুরটা কিন্তু ওর নয়। ওর বাপের। মানে যারা ওকে ওই পোস্টে বসিয়েছে ওদের কোনো বড় নেতার। কেমন ব্যাকবোনলেস ইনভার্টিব্রেট পিজির নেফ্রোলজির হেড, সেও রাজি হয়ে গেল? দেবকিঙ্কর বললেন, কিন্তু ডিউটি স্টাফদের কেউ কেউ রুখে দাঁড়াল। যার ওপর ডায়ালিসিস করানোর দায়িত্ব ছিল, সে তো করল না। অর্পিতা চ্যাটার্জি বোধহয় ওর নাম, তাই না? এখনো তো এরকম কেউ কেউ আছে। হারাধনের মা ট্রে রেখে গেল। চা, কুঁচো নিমকি। গুরুপদ হারাধনের মায়ের ব্যাপারে কিছু জানেন না।

সিজার ডেলিভারি নিয়ে গুরুপদ যখন বলছিলেন, তখন চপলার অভিজ্ঞতার কথা মনে পড়ে যাচ্ছিল গুরুপদর। চপলা বলেছিল, গরু ছাগল কুকুর বিড়ালের সিজার ডিলিভারি হয় শুনেছেন স্যার কখুনো? মানুষেরও আগে হতো না। নিজে নিজে হওয়াই পেকিতির নিয়ম স্যার। কিন্তু আজকাল ডিলিভারি যা করি, আমিই করি। পোয়াতি মেয়ে এলেই ডাক্তারবাবুর হাত চুলকোয় কখন কাজ সেরে বাড়ি যাবে। আর বাড়ি তো শহরে। গাঁয়ে থাকবেন কেন তারা, এর কদিন পরেই একটা হেলথ জার্নালে একটা রিপোর্ট ছিল – ওখানে বলছে, পঁচিশ থেকে তিরিশ বছর বয়সে যে-মেয়েরা প্রথম সমত্মান প্রসব করে, তাদের মধ্যে শতকরা কুড়িজনের সিজারিয়ান হওয়াটা স্বাভাবিক বলে মেনে নিয়েছে ওয়ার্ল্ড হেলথ অর্গানাইজেশন। তিরিশ থেকে পঁয়ত্রিশ বছরের মেয়েদের শতকরা সাতাশ, কিন্তু কুড়ি থেকে পঁচিশ বছরের মেয়েদের ক্ষেত্রে শতকরা দশের কম। ইনডিয়ান স্ট্যাটিসটিক্যাল ইনস্টিটিউটের কয়েকজন গবেষক পশ্চিম বাংলার নার্সিং হোম এবং সরকারি হাসপাতালগুলোতে সিজারিয়ান ডেলিভারি নিয়ে একটা অবাক হওয়ার মতো তথ্য দিয়েছেন। মোট কুড়ি হাজার স্যাম্পল সাইজ। শহর আট হাজার, গ্রাম বারো হাজার। পশ্চিমবঙ্গে গড় সিজারিয়ান শতকরা পঁয়তালিস্নশ। পঁচিশ বছরের কম এবং পঁচিশ বছরের বেশি মেয়েদের মধ্যেও তেমন তফাৎ নেই। শহরের নার্সিং হোম এবং বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে সরকারি হাসপাতালগুলোর তুলনায় সিজারিয়ান অনেক বেশি। সরকারি হাসপাতালে একুশ পার্সেন্ট হলে বেসরকারি হাসপাতালে একাত্তর পার্সেন্টের একটা কারণ না হয় বোঝা গেল। সিজারিয়ান করে দিতে পারলেই গাদাখানেক টাকা আদায় করে নেওয়া যায়। কিন্তু অবাক করার মতো তথ্য হলো, গ্রামীণ সরকারি হাসপাতালগুলোতে সিজারিয়ান ডেলিভারির অনুপাত শহরের হাসপাতালের দ্বিগুণ! অথচ কুড়ি থেকে পঁচিশ বছরে প্রথম মা হতে আসা মেয়েরা গ্রামাঞ্চলেই বেশি। এই তথ্য প্রথমে অবাক করে দিয়েছিল গবেষকদের। তারপর কারণ খুঁজতে গিয়ে দেখল, গ্রামীণ হাসপাতালের চিকিৎসকরা থাকেন অধিকাংশ শহরেই। গ্রামের হাসপাতালে সপ্তাহে দুদিন বা তিনদিন থেকে বাড়ি চলে যান। সুতরাং প্রসবের জন্য আসা গর্ভিণীদের সিজারিয়ান অপারেশন করে দিয়ে, ল্যাঠা চুকিয়ে লাল সাবানে হাত ধুয়ে সোজা বাড়ি। স্বাভাবিক প্রসবের জন্য তো একটু অপেক্ষা দরকার হয়। প্রসবযন্ত্রণা দরকার হয়। সময় কোথায়? আইনক্স-পিভিআর-ডলবি সাউন্ড ডোমিনোজ ডাকে আয় আয়, আলোর ত্রিফলা ডাকে, ডাকে পলি ক্লিনিক। তাই ছুটে যেতে হয়।

আর কী আশ্চর্য, সমাজতাত্ত্বিক, পরিসংখ্যানবিদরা যা বলেছিলেন গবেষণা করে, সেটাই তো বলে দিয়েছিল এক স্বল্পশিক্ষিতা ধাই চপলা হাড়ি। এটা এখন আর গুরুপদকে বলে লাভ নেই। কথায় কথা বাড়ে। গুরুপদদা এমনিতেই একটু বেশি কথা বলেন। এ-কথাটা তুললেই কেঁচোর মতো কথারা কিলবিল করে উঠবে।

গুরুপদ বলেই চলেছিল, কমবয়সী ডাক্তারগুলো কীরকম ডিগবাজি খেয়ে গেছে। গুরুপদও কি ইচ্ছা করলে ওদের দলে
ভিড়তে পারত না? অফার তো দিয়েছিল। মিউনিসিপ্যালিটির চেয়ারম্যান করে দিত ওরা। কিন্তু ক্ষমতা, পদ, টাকা, কিচ্ছুর লোভ নেই। তারপর বললেন, যাই বলো, বাংলার মাটিতে ধান হয়, সুপারিগাছ হয়, বড়জোর জ্যোতি বসু হয়; কিন্তু একটা ফিদেল কাস্ত্রো হয় না।

দেবকিঙ্কর চুপচাপই ছিলেন। গুরুপদ বললেন, এবার উঠব। বউঠানের খোঁজ নেওয়া ছাড়া আরো দুটো কথা নিয়ে তোমার কাছে এসেছিলাম দেবু। আমার নাতনির মুখে ভাত দেব। আগামী ১৮ তারিখ। কোনো বাড়ি ভাড়া করছি না, বাড়ির ছাতে প্যান্ডেল খাটিয়ে, আগেকার দিনের মতো – রান্নার ঠাকুর ডেকে, ভিয়েন বসিয়ে…। মিষ্টিটা খালি অধরের দোকানে অর্ডার। আর একটা কথা আছে, বউঠানকে ডাকো, তবে বলব।

বারান্দায় গিয়ে চিন্ময়ীকে ডাকলেন দেবকিঙ্কর।

গুরুপদ বললেন, বউঠান আসার আগে বলি, ওর তো ক্রনিক কিডনি ফেলিওর, প্রগনোসিস কি তুমিও জানো, আমিও জানি। ছেলের বিয়েটা করিয়ে দাও। ভালো মেয়ে আছে, তোমার ছেলে তো এখন এস্টাবলিশ্ড, ভালো রোজগারপাতি করছে যা হোক। বুচুনও চেষ্টা করেই যাচ্ছে ওর জন্য। পাত্রীর ছবি এনেছি। জীবুকেও ডাকো, রবিবার, ও তো আছে বাড়িতে। ওর সামনেই কথাটা পাড়ি।

জীবক ছিল না। গেছে কোথাও। চিন্ময়ী এলেন। গুরুপদ বললেন, বসুন বউঠান, কথা আছে। আগে নাতনির মুখে ভাতের কার্ড বের করলেন। ‘খুকুমণি ভাতু খাবে’। কার্ডের গায়ে লেখা। বউঠান, দেবু আমার চেয়ে বয়সে বছর তিন-চার ছোট, কিন্তু আমার পরম বন্ধু। বহুদিনের বন্ধু। রক্তের আত্মীয়র চেয়ে বেশি আপনারা। সবাই মিলে সকাল থেকে যাবেন।

তারপর একটা খাম। খাম থেকে একটা পোস্টকার্ড সাইজের ছবি। দেখুন তো বউঠান, মেয়েটিকে কেমন লাগে? আমার ছোট শালির বড় মেয়ে। খুবই সুন্দরী। গ্র্যাজুয়েট হওয়ার পর একটা খুব ভালো লাইনে গেছে। রেইকি শিখেছিল, এখন বেশ নাম করেছে। টিভিতে আসে।

ভ্রম্ন তুলে বিস্ময় প্রকাশ করলেন দেবকিঙ্কর, কী ওটা?

রেইকি! রেইকি বোধহয় একটা জাপানি চিকিৎসা-পদ্ধতি। ওই যেমন চাইনিজ আকুপাংচার আর কি। তবে সুচটুচ ইউজ করে না, আঙুলের কী সব কায়দা করে। টিভিতে আপনাদের স্বসিত্মকা চ্যানেল আসে না? হাবুলের কেবল লাইন নিয়েছেন তো, ওখানে চারশো দশে স্বসিত্মকা। প্রতি রবিবার রাত আটটা থেকে ওর প্রোগ্রাম থাকে। দেখবেন। খুব স্মার্ট মেয়ে। আমার ভায়রা বলছিল মেয়ে তো প্রেমট্রেম করতে পারল না, একটা ভালো ছেলের খোঁজ দাও। প্রথমেই জীবুর কথা মনে এলো। বুচুন বলছিল, মুনমুন ওর সাইনাসের প্রবলেমের জন্য এসেছিল, তখন জীবকের সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিয়েছে। ওদের মধ্যে বোধহয় একটু ফ্রেন্ডশিপ আছে। মেয়েটা ভালো। ছোটবেলা থেকে দেখছি তো, তোমরাও হয়তো দেখেছ বুচুনের বিয়েতে। মনে করতে পারছ না হয়তো…। আজ দেখে নিও চারশো দশ নম্বর চ্যানেলে। প্রতি রোববারই পাবে, রাত আটটা। আর মুখে ভাতে তো আসছেই। সেদিনই দেখতে পাবে, কথা বলো।

কী নাম রাখলেন নাতনির? চিন্ময়ী জিজ্ঞাসা করলেন।

মুচকি হেসে গুরুপদ বললেন, মালালা। নামটা আমিই রেখেছি। চিন্ময়ী বললেন, আর একটু আধুনিক নাম রাখতে পারলেন না দাদা, মালা তো আমাদের আমলের নাম… গুরুপদ বললেন – মালা নয়, মালালা। মালালা ইউসুফজাই আছে না, পাকিস্তানের বিদ্রোহী মেয়েটা, যে তালিবানদের ফতোয়া অগ্রাহ্য করে লেখাপড়া করতে গিয়েছিল… নোবেল পাওয়া মেয়ে…। আসলে বউঠান, আমাদের মাইন্ডসেটটা পালটায়নি। বউমা বলল বাপি, তুমিই নামটা ঠিক করে দাও। আমি বললাম, একদিন ভাবি। তিনটে নাম মনে এলো। ফ্লোরেন্স, মানে ফ্লোরেন্স নাইটিংগেল, সেই সেবাপরায়ণা নার্স, আনা কারেনিনা, টলস্টয়ের উপন্যাসের, আর মালালা ইউসুফজাই। ফ্লোরেন্স নামটা সবসময় উচ্চারণ করা কঠিন। কারেনিনা ঠিকই ছিল, তবে মালালা নামটার মধ্যে ইন্টারন্যাশনালিটিও আছে, বাঙালি বাঙালি ভাবও আছে। আরো বড় কথা, শুনতে একদম সেক্যুলার। কুলীন কায়েতের ঘরে এরকম নাম রাখতে গেলে একটা ডিফারেন্ট মাইন্ডসেট লাগে। কী বলো হে দেবু? মমতাজ নামটা, শাকিলা নামটা যতই ভালো শুনতে লাগুক, এসব নাম রাখতে পারতে এখনো দেরি আছে। খবরটবর ছাড়া আর টিভি দেখা হয় কই? আগে খেলাটেলা
একটু-আধটু দেখা হতো। এখন ইচ্ছা করে না। বিকেলের দিকে বাড়িতে একটু বইপত্র, ম্যাগাজিন উলটোনো হয়। সন্ধের পর তো চেম্বার। রবিবার চেম্বার নেই, কেউ ডাকলে, গুরুত্ব বুঝে কলে যান দেবকিঙ্কর। অসুখ-বিসুখ তো ক্যালেন্ডার মেনে হয় না। রবিবারে সন্ধ্যাগুলো সাধারণত খুব ভালো কাটে না দেবকিঙ্করের। কখনো র‌্যাক থেকে বের করে একটু শরৎচন্দ্র, একটু ইভান তুর্গেনিভ, কখনো-বা সুস্বাস্থ্য কিংবা পাবলিক হেল্থ জার্নালের পৃষ্ঠা ওলটানো,
কখনো-বা বড় ঘরটায় গিয়ে কিছুক্ষণ টিভির দিকে তাকিয়ে থাকা, ওরা সিরিয়াল দেখে। সিরিয়ালে সব মহিলা সেজেগুজে থাকে, গায়ে প্রচুর গয়না। সব একান্নবর্তী পরিবার, ভাইয়েরা সব এক হাঁড়িতে খায়, যদিও রান্নাঘর নামে কিছু আছে বোঝা যায় না। মেয়েদের কোনো কাজ নেই, কেবল চক্রান্ত করে। বাড়ির কর্তা সবসময় ইজিচেয়ারে আধাশোয়া থাকেন, একদম টিপটপ। কখনো শুধু গেঞ্জিতেও দেখা যায় না। সবগুলোই একই মনে হয় – সাদা ভেড়াদের মতো। প্রত্যেকটা ভেড়া আলাদা ব্যক্তিত্ব, কিন্তু চেনা যায় না।

আটটার আগে থেকেই টিভি চলছিল। হারাধনের মা মেঝেতে বসে আছে, খাটে চিন্ময়ী। হারাধন যদি মেম বিয়ে করে, মেমসাহেবের মাথায় তো মুচি-মেথর-চ-াল, বামুন-কুলীন নেই। ওর কাছে মাদার ইন ’ল। কেমন হবে যখন লনে বসে আছে ওরা, গোলটেবিল, বাইরে আপেল গাছ, টি-পট থেকে চা ঢালছে মেমবউ, ধোঁয়া বেরোচ্ছে, টেবিলে সাজানো কেক, ওমলেট, ব্রেড, বাটিতে মাখন, হারাধনের মায়ের মুখটা কল্পনায় আসে দেবকিঙ্করের। ছবি। এটা তো কেবলই ছবি, শুধু ছবি নয়, সত্যি হবে। ছবিটা হয়েই আছে, সত্যি হওয়ার জন্য অপেক্ষা করছে শুধু। আচ্ছা, মেম কেন, লীলা যদি হয়? হারাধনের সঙ্গে তো বন্ধুত্বই আছে। ওখানে তো ওরা মাত্র এক-দেড় ঘণ্টার ড্রাইভ দূরত্বে থাকে। ধুর। বেশি ভাবা হয়ে যাচ্ছে।

রিমোটে আঙুল টিপছিল। কত চ্যানেল। এসব তো দেখা হয়নি কখনো। চারশো চার নম্বরে স্যুট-টাই পরা একটা লোক, দর্শকের ফোনের উত্তর দিচ্ছে।

– আপনার রান্নাঘর কোথায়?

– ফ্ল্যাটে, ডাইনিংয়ের সঙ্গে অ্যাটাচ্ড।

– আরে না, কোনদিকে, উত্তর-দক্ষিণ-পূর্ব…

– পুবদিক ঘেঁষে। কোনদিক…।

– টয়লেট?

– রান্নাঘরের পাশে।

– আপনার বিজনেস ডাউন হবে না তো কার হবে? পুবে রান্নাঘর? ছি ছি। রান্নাঘরের পাশে টয়লেট করেন? যত নেগেটিভ এনার্জি, পল্যুটেড এনার্জি আপনার খাবারের সঙ্গে আপনার বাড়িতে ঢুকছে। বাস্ত্ত একটা সায়েন্স। বাস্ত্ত যদি আনসায়েন্টিফিক হয় আপনার সব গ-গোল হয়ে যাবে। আপনার ফ্ল্যাট একটু
রি-অ্যারেঞ্জমেন্ট করতে হবে।

– সিভিল ইঞ্জিনিয়ারের সঙ্গে তাহলে…

– কোনো সিভিল ইঞ্জিনিয়ার পারবে না। কারণ ওদের সিলেবাসে বাস্ত্ত থাকে না। আজকাল জার্মানি, জাপান, চায়না, এসব জায়গার কিছু ইউনিভার্সিটিতে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের সিলেবাসে বাস্ত্ত রেখেছে। বাস্ত্ত বিজ্ঞান হলো প্রাচীন বিজ্ঞান। চীন, জাপান, কোরিয়ায় গিয়েছিল ভারতের বৌদ্ধধর্মের সঙ্গে। জার্মানিতে চর্চা হয় – কারণ ওরা ইন্ডোলজির চর্চা করে। মুসলমান আমলে এই বিজ্ঞান নষ্ট হয়, আর ব্রিটিশ সিলেবাসে আমাদের দেশে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ানো হয় তাই বাস্ত্ত উপেক্ষেত। আমাকে বললে আমি যাব। আমি গিয়ে দেখিয়ে দেবো রান্নাঘরটা কোথায় সরাতে হবে। যদি সম্ভব না হয়, তবে প্রতিকারের ব্যবস্থা করতে হবে। নেগেটিভ এনার্জি শুষে নেওয়ার জন্য কিছু জিনিস আছে। কিছু জিওমেট্রিক্যাল স্ট্রাকচার আছে, যা স্থাপন করা যায়, সেটা করে দেব। এক ধরনের বাঁশগাছ আছে, চীনা ভাষায় বলে লুচুংছাক, সেটা ঈশান কোণে রাখা যায়। মাছের অ্যাকুয়ারিয়ামও অনেক সময় কাজ দেয়, তবে বিশেষ জায়গায় স্থাপন করতে হবে। স্ক্রিনে ফোন নম্বর যাচ্ছে, নোট করে নিন…

চারশো পাঁচ নম্বরে দাড়িওয়ালা একটা লোক, খালি গা, গলায় কয়েকটা রুদ্রাক্ষের মালা। পাশে বসে আছে এক যুবতী, উগ্রসুন্দরী, বলে যাচ্ছেন বশিষ্ঠ বাবা কবে-কোথায় বসছেন। শিলিগুড়ি থেকে ডায়মন্ড হারবার অনেকগুলো শহরের নাম শুনল। এর মধ্যে কৃষ্ণনগরও আছে। মেয়েটি বলছে, আগে থাকতে বুকিং করে নেবেন। অন্তত একমাস অপেক্ষা করতে হবে। কারণ সবাই বাবাকে চায়, বাবা এত সময় দিতে পারেন না। কার বিয়ে আটকে যাচ্ছে, কার প্রমোশন আটকে যাচ্ছে, কোন বাড়িওয়ালা ভাড়াটে ওঠাতে পারছে না, কোন স্ত্রী তার স্বামীকে অযথা সন্দেহ করছে, সব সমাধান করে দেন। বাবা মন পালটে দিতে পারেন। বাবা এবার বাঁ-হাতটা মেয়েটির সামনে রেখে এমন একটা মুদ্রা করলেন – যার মানে হচ্ছে, থামো। মেয়েটি থামল।

বাবা বশিষ্ঠ বলছেন, এই যে সন্দেহ বাতিকের কথা বললে, ওটা একটা অসুখ। সাইকোলজি শাস্ত্রে এর নাম প্যারানইয়া। যারা সন্দেহ বাতিকগ্রস্ত, ওদের বলে প্যারানয়েড। আমি খালি তন্ত্রশাস্ত্র-জ্যোতিষশাস্ত্র নিয়ে পড়াশুনো করেছি তা নয়। সাইকোলজি শাস্ত্র, কেমিস্ট্রি শাস্ত্র, পদার্থ শাস্ত্র, মহাকাশ শাস্ত্র তো জানতেই হয়েছে, গ্রহ-নক্ষত্র নিয়ে আমাদের কারবার – সামুদ্রিক শাস্ত্রও জানি। আমার নামের সঙ্গে আমার উপাধিগুলো ইসকিরিনে যাচ্ছে, সেখানে দেখো লেখা আছে সামুদ্রিক রত্ন। আমি যে সম্মোহন করি, বশীকরণ করি, সেটা সম্পূর্ণ বিজ্ঞানসম্মত উপায়ে। ওয়েভ। ওয়েভ। বিশ্বব্রহ্মা- চলছে ওয়েভের ওপর। যেখানে যাবা সেখানেই ওয়েভ পাবা। এই যে মোবাইল, রেডিও তার নেই, কীভাবে কথা যাচ্ছে ওয়েভ। ওয়েভের ভেতর কথা ঢোকানো আছে, কানে শোনা যাচ্ছে না। মানুষের বেরেন থেকেও ওয়েভ পাঠানো যায়। বড় বড় বৈজ্ঞানিকরা বলেছেন, থটওয়েভ আছে। কিন্তু এখনো ফর্মুলা দিতে পারেনি; পারবে, তবে টাইম লাগবে। রেডিও সেন্টারে ওয়েভ তৈরি হয়, সেটা টাওয়ারের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। তাই তো? আমিও তন্ত্রবলে আমার চৈতন্যে বিভিন্ন রকমের ওয়েভ তৈরি করতে পারি। মানসিক রোগীর চিকিৎসা করতে গেলে ইলেকট্রিক কারেন্ট দেওয়া হয়, আমি ওয়েভ চিকিৎসা করি। যে-শাশুড়ি কেবল বউকে অত্যেচার করেই যাচ্ছে, আমার কাছে আসো, সেই শাশুড়ির নাম গোত্র ছবি দাও কেবল, আমার কাছে ধরে আসতে হবে না, আমি আমার মন্দিরে বসে মেন্টাল ওয়েভ পাঠাব। আমি জানি কোন ফিরিকোয়েন্সিতে কী কাজ হয়। মাইন্ড পালটে দেব।

এবার মেয়েটি ভ্রম্ন-ভঙ্গি সহকারে মুখ খুলল। কিন্তু একটা কথা, বশিষ্ঠ বাবা কিন্তু সব কাজ করেন না। বুঝে, বেছে কাজ করেন। কোন ফেরার অপরাধ যদি বলে অমুক পুলিশ অফিসার আমাকে ধরার চেষ্টা করছে, ওকে থামিয়ে দিন কিম্বা…

কথা কেড়ে নিলেন বাবা বশিষ্ঠ। কেউ যদি বলে অমুকের বউকে বড় মনে ধরেছে। সে খুব পতিব্রতা, ওর মন চেঞ্চ করে আমার কাছে এনে দাও। সরি, ক্ষমা করবেন। পাঁচ লাখ টাকা দিলেও তন্ত্রশক্তির অপপ্রয়োগ করবো না। পদার্থের ভিতরে শক্তি আছে, এটা কে আবিষ্কার করেছিল? আইনেস্টাইন। কিন্তু অ্যাটম বোম হলো এর অপপ্রয়োগ। আমি সেরকম করতে পারবো না ক্ষমা করবেন। দেয়ালঘড়িতে আটটা বাজতে পাঁচ। চারশো দশ নম্বর চ্যানেলে গেল। স্বসিত্মকা চ্যানেল। সেখানে তখন টেবিলে ল্যাপটপ রেখে মাথায় ফেট্টি পরে গায়ে রঙিন জোববা পরে একজন বলে উঠল, জয় মাতাদি। জয়াদি রত্নাদি বুলুদি বোঝা যায়। মাতা আবার দিদি হয় নাকি? জোববাপরা সুদর্শন লোকটা, সম্ভবত সিল্কের, আলোয় ঝলকাচ্ছে। কাউকে বোধহয় বলছে – শ্রীযন্ত্রম এনে ঘরের মাঝামাঝি জায়গায় রাখুন। সমস্ত নেগেটিভ এনার্জি অ্যাবসর্ভ করে নিয়ে ঘরটাকে পিউরিফাই করে দেবে।

একটা কাচের থাক থাক পিরামিডের মতো একটা জ্যামিতিক বস্ত্র হাতে তুলল লোকটা। বলছে, অনেক শ্রীযন্ত্রম পাবেন এক দেড় হাজার টাকায়। পাঁচশোতেও পাবেন, কিন্তু ওসব কাচের। আমার কাছে পাবেন পিওর ক্রিস্টালের – মানে স্ফটিকের। স্ফটিক হলো স্বচ্ছ পাথর। এই পাথরই শুষে নিতে পারে। নীলকণ্ঠ পাথর দেখেছেন? সাপে দংশন করলে দংশনস্থলে লাগিয়ে রাখলে বিষ টেনে নেয়। পাথরের এমন ক্ষমতা। কিন্তু সেই পাথর বেশি পাওয়া যায় না। খুব রেয়ার। কিন্তু এই পাথর হলো অনলি ফর সিঙ্গল ইউজ। একবার বিষ টেনে নিলে সাদা পাথরের রং নীল হয়ে যায়। সেই পাথর কয়েকটা আমার কাছে আছে। অনেক কষ্টে সংগ্রহ করেছি। চাইলে দু-একটা দিতে পারি, তবে খরচ-খরচা বেশি পড়বে। পাথরের যে শোষণ ক্ষমতা আছে, সেটা ভারতের মুনি-ঋষিরা অনেক আগেই বলে গেছেন। পাশ্চাত্যের বৈজ্ঞানিকরা সবে গবেষণা শুরু করেছেন। ওদের জানতে এখনো বাকি আছে। এই মহাব্যোম শক্তির উৎস আমাদের মুনি-ঋষিরা আগেই বলে গেছেন। হাল আমলে বলা হচ্ছে কসমিক রে, আলট্রাভায়োলেট রে অমুক রে তমুক রে আসছে – ওরে, আমরা এসব রে-কে পোষ মানানোর সায়েন্স অনেক আগেই রপ্ত করেছি।

…বেশ রগড় তো, শুনতে মজাই তো লাগে বেশ…। জোববা পরা বিদায় নিলেন, বিদায়বেলায় জয় মাতাদি বললেন আবার।

মিউজিক বেজে উঠল। পর্দায় ভেসে উঠল রেইকি কুইন মুনমুন পাইন। এবার গান –

শরীর খারাপ, মন ভালো নেই তাই কি?

একটা সতেজ সুখের জীবন চাই কি?

তবে রেইকি… রেইকি… রেইকি।

এবার একটি মুখ। চোখে কাজল। চোখের পাতায় কী একটা রং। সহাস্য মুখ। বলল, নমস্কার। আমি মুনমুন। ব্রহ্মা- জুড়ে চলছে শক্তির খেলা। শক্তির তরঙ্গ ঘুরে বেড়াচ্ছে। রবীন্দ্রনাথ বুঝেছিলেন, তাই গান লিখেছিলেন, বিপুল তরঙ্গরে…। মেয়েটা গেয়েও দিলো দু-কলি। আলোকে উজ্জ্বল জীবনে চঞ্চল একি আনন্দ তরঙ্গ…। পাত্রী তাহলে গানও জানে। চিন্ময়ীর সঙ্গে চোখাচোখি হলো দেবকিঙ্করের। বেশ সুরেই গাইল।

এই তরঙ্গ শক্তিকে আত্মস্থ করা, নিজের মধ্যে গ্রহণ করা এবং সেই শক্তি বা এনার্জি অন্যের মধ্যে ট্রান্সপোর্ট করার যে সায়েন্স, সেটাই রেইকি। বন্ধুরা, আমি এক বছরের ওপর হয়ে গেল এই চ্যানেলে আসছি, বয়স নির্বিশেষে অনেকে আমার চেম্বারে এসে রেইকি নিয়েছেন। যদি এমন কেউ থাকেন, উপকার পাননি, ফোন করুন। স্ক্রিনে ফোন নম্বর যাচ্ছে। এই যে আমার হাত, এই হাত দিয়ে স্পর্শ করে রেইকি চিকিৎসা করি আমি।

হাতদুটো দেখাল। আঙুলগুলো বেশ। এই আঙুলকেই তো চাঁপাকলি বলত আগে। আবার চিন্ময়ীর সঙ্গে চোখাচোখি হয় দেবকিঙ্করের।

এজন্য রেইকিকে বলে স্পর্শ চিকিৎসা। রেইকি হলো জাপানি হিলিং মেথড। রেই মিনস ইউনিভার্স। বিশ্বব্রহ্মা-। কি মানে লাইফ ফোর্স। মানুষের বডিতে সাতটা পয়েন্ট আছে। ওই পয়েন্টগুলো স্পর্শ করে আমরা রেইকি দি। সেই পয়েন্টগুলো থেকে শরীরের এন্ডোক্রিন গস্ন্যান্ডগুলোতে এনার্জি যায়, ফলে এন্ডোক্রিন গস্ন্যান্ডস মোর অ্যাকটিভ হয়। যাদের প্যাংক্রিয়াস থেকে ঠিকমতো ইনসুলিন বেরোচ্ছে না, ওদের ডায়াবেটিস হয়। আমি রেইকি দিয়ে প্যাংক্রিয়াসকে চাঙ্গা করে ডায়াবেটিস সারিয়ে দি। যাদের থাইরয়েড গস্ন্যান্ড থেকে ঠিকমতো থাইরক্সিন বেরোচ্ছে না, ফলে হাইপো বা হাইপার থাইরয়েডিজমে ভুগছেন, আমি গলার দুপাশে রেইকি দিয়ে থাইরয়েডের প্রপার ফাংশন করিয়ে দি। মানসিক অবসাদ, মন ভালো থাকে না, মনে ফুর্তি নেই? নিশ্চয়ই পিটুইটারিটা কাজ করছে না। অথচ রবীন্দ্রনাথ লিখে গেছেন আনন্দধারা বহিছে ভুবনে… দিন রজনী কত অমৃত রস উথলি যায় অনন্ত গগনে। আবার দু-কলি।

আমি রেইকি দিয়ে পিটুইটারি চাঙ্গা করি, ওই গস্ন্যান্ড থেকে এন্ডোরফিন, অকসিটোসিন সিক্রিয়েট করিয়ে দি। এই যে কসমিক পাওয়ার, এটা প্রথমে আমি শরীরে ধারণ করি, তারপর এই হাতের পাতা এবং আঙুল দিয়ে ট্রান্সফার করি। যেমন ব্যাটারি চার্জ করিয়ে নিচ্ছি, তারপর সেই দিয়ে মোবাইল ব্যবহার করছি, ঠিক সেরকম। রেইকি একটা পুরোপুরি সায়েন্টিফিক ব্যাপার। ফোনে কে আছেন? হ্যালো…। এই দশ-পনেরো মিনিট দেবকিঙ্করের এক আশ্চর্য অভিজ্ঞতা। এতগুলো চ্যানেলে এসব হচ্ছে। সবাই বলছে সায়েন্টিফিক। সবাই কিছু কিছু জার্গন জেনে রেখেছে। যেমন ইলেকট্রো ম্যাগনেট, ম্যাগনেটিক ফিল্ড, কসমিক রে, এসব। রেইকির মেয়েটা তো আবার কতগুলো গস্ন্যান্ডের নাম বলে দিলো। সব বুজরুকি। সবাই বাজে কথা বলছে। নেগেটিভ এনার্জিটা কী ব্যাপার? পজিটিভ এনার্জিটাই বা কি? এসব তো আইনস্টাইনও ভাবতে পারেননি। নেগেটিভ এনার্জি রিফ্লেক্টার অ্যাবজর্ভার বিক্রি করছে তিন হাজার টাকায়। কীভাবে লোক ঠকাচ্ছে…। দেখার কেউ নেই? এতগুলো চ্যানেলে এই কারবার চলছে? মুনমুন গোটাদশ ফোন নিল, এদের মধ্যে কেউ জানাল রেইকি করিয়ে সুগার কমে গেছে, কেউ জানাল অস্টিও আর্থারাইটিস ভালো হয়ে গেছে। দেবকিঙ্কর যেন বুঝেই গেলেন এসব ফোন গটআপ। নিশ্চয়ই বাঁধা কিছু লোক ফোন করে। ওরা বোধহয় টাকা পায়। সাড়ে আটটায় রেইকি কুইন নমস্কার করে জানাল আগামী রবিবার আবার দেখা হবে। এবার জীবন সুধা। কত স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক ভেঙে যায় দুর্বল পুরুষত্বের…। মিউট করে দেওয়া হলো টিভি। স্বল্প বসনা যুবতীর ঠোঁট নড়ছে। চিন্ময়ী বললেন, কী, কেমন দেখলে পাত্রী? দেবকিঙ্কর বললেন, তুমি কেমন দেখলে তাই বলো।

দুজনেই চুপ করে রইলেন। টিভিতে একটা ওষুধের প্যাকেট, গায়ে খাজুরাহোর মিথুন মূর্তি। তিরিশটা বড়ির একটা কৌটো দাম ৩০০০, গায়ে কাটাকুটি চিহ্ন দিয়ে ১৪৯৯ করা হয়েছে।

ওইদিকে চোখ ছিল দেবকিঙ্করের। চিন্ময়ী বললেন – এমনিতে সুন্দরী। স্মার্ট। বলিয়ে-কইয়ে। গানও জানে। তুমি কী ভাবছ?

দেবকিঙ্কর প্রেসার কুকারের বাষ্প বেরোনোর শব্দের মতো বললেন, প্রশ্নই ওঠে না… যত্তসব… চিটিংবাজ…।

 

গুরুপদর বাড়িতে যেতেই হলো। সবাই মিলেই গেল। হারাধনের মাকে নিয়ে গেল না। মুগডাল, ডাঁটিওয়ালা বেগুনি, তেলকই, পাবদার ঝাল…। দই সরপুরিয়া তো ছিলই। একেবারে বাঙালি খাবার। গুরুপদ বললেন, ওসব আইসক্রিম-ফাইসক্রিমে আমি বিশ্বাসী নই। চিন্ময়ীর জন্য আলাদা রান্না হয়েছিল। ওর যা খাওয়া উচিত।

মেয়েটাকে দেখতে কিন্তু বেশ। উগ্র সাজপোশাক নয়। শাড়ি পরেই এসেছিল। ওরা বোধহয় বলে রেখেছিল, মেয়েটা গুরুপদ এবং চিন্ময়ীকে প্রণাম করল। গুরুপদর স্ত্রীর কি একটা সেকেলে নাম আছে। গুরুপদ ওকে সুকু বলে ডাকে। এটা কিন্তু সুকুমারীর সংক্ষিপ্তকরণ নয়। বিয়ের পরপর খুব মিষ্টি বোঝাতে স্যাকারিনের সংক্ষিপ্ত সুভাষণ। সুকু চিন্ময়ীর দিকে খেয়াল রাখছিল। কানে কানে বলল, নিজের বোনঝি বলে বলছি না, মেয়েটা সত্যিই ভালো।

দেবকিঙ্কর মেয়েটার দিকে বারবার তাকাচ্ছিলেন। বেশ নিচুগলায় কথা বলছে। তার মানে মেয়েটি অভিনয় করাও জানে। মেয়েটির সঙ্গে কথা বলতে চাইলেন দেবকিঙ্কর। বললেন, তোমার রেইকি অনুষ্ঠানটা দেখলাম। মেয়েটি বলে – তাই নাকি? আপনাদের মতো ব্যস্ত ডাক্তাররা, এসব দেখেন?

দেবকিঙ্কর বললেন, গুরুপদ বলেছিল, তাই…। মেয়েটিকে পরীক্ষা করতে চাইলেন দেবকিঙ্কর। বললেন – আচ্ছা, তুমি রেইকি দিয়ে কিডনি ভালো করতে পারো?

– কিডনির কী হয়েছে?

– ধরো ক্রনিক কিডনি ফেলিওর…

মেয়েটা দাঁতে ঠোঁট কামড়াল। দেখতে বেশ লাগল এই ভঙ্গি। তারপর বলল – মিথ্যে কেন বলব।

– এটা কি সারার অসুখ? আসলে রেইকি করলে কিছু কিছু শারীরিক সমস্যার উপকার হয়, যেমন মাথাধরা, বস্নাডপ্রেসার, গাঁটে ব্যথা, হয়তো ফোঁড়া, গলবস্নাডার স্টোন…।

– তাই? ওগুলো সেরে যায়, এটা সারে না কেন?

– ওগুলো সেরে যায় বলিনি স্যার, উপকার হয় বলেছি। আসলে হয়তো পস্নাসিবো। পেশেন্টের মনে বিশ্বাসটা ঢুকিয়ে দিতে পারলে শরীর নিজেই হিল করে। মনে জোর আসে বিশ্বাস থেকে। বলে না, বিশ্বাসে মিলায় কৃষ্ণ… এই যে পেশেন্টকে শুইয়ে কানের দুপাশে, গলায়, ঘাড়ে একটা হালকা আলোয় কিছুক্ষণ ছুঁয়ে থাকা, একধরনের রিলাক্স তো আছেই, আর পেশেন্ট ভাবছে একটা এনার্জি ঢুকছে ওর শরীরে। এই ভাবনাটাই ওর অসুখ সারায়। হতে পারে হোমিওপ্যাথিও পস্নাসিবো। বিস্মিত হন দেবকিঙ্কর।

এই যে বলি কসমিক রে টেনে নিচ্ছি, এটা কি সম্ভব? আর স্যার লাইফ ফোর্স বা জীবনীশক্তি নামে কিছু একটা আছে নিশ্চয়ই, যেটা ভেজা ছোলার শরীরে অঙ্কুর তৈরি করে, আবার শরীরের আর্টারিতে জমে থাকা পস্নাকও মিলিয়ে দেয়।

কিন্তু তুমি যে টেলিভিশনে বলো, তুমি কসমিক রে টেনে নিয়ে রোগীর শরীরে প্রবাহিত করো, সেটা তাহলে মিথ্যে বলো।

– হ্যাঁ স্যার। বিশ্বাস তৈরি করার জন্য বলতে হয়। নইলে পস্নাসিবো হবে কী করে?

– এই যে মিথ্যে বলা – এটা প্রতারণা নয়? তোমার মনে হচ্ছে না তুমি লোক ঠকাচ্ছো?

– অনেকে তো ভালো হচ্ছে। তাছাড়া বিশ্বাস তৈরি করাটাই থেরাপি। পলিটিশিয়ানরাও তো বিশ্বাস তৈরি করে। বিশ্বাস ম্যানুফ্যাকচার করে স্যার। এই যে আমার মেসোমশাই, আপনার বন্ধু, মার্কসবাদ মার্কসবাদ করে, ওটাও তো ওনার বিশ্বাস। ভেবেছিলেন এই পথেই মুক্তি। কিন্তু সেটা তো হয়নি। ওনার পার্টির নেতারা কি ভাবেন যে ওরা প্রতারণা করেছেন? কী আশ্চর্য! কী বলছে মেয়েটা? কদিন আগেই তো টেলিভিশনে অসীম চট্টোপাধ্যায় আর আজিজুল হককে দেখেছিলেন, মানবাধিকার নিয়ে আলোচনায়। ঠিক এই কথাই তো মনে হয়েছিল দেবকিঙ্করের। দেবকিঙ্কর ওদের মনে মনে প্রশ্ন করেছিলেন, তোমাদের ক্ষমাপ্রার্থনা করতে ইচ্ছে করে না? ওইসব পরিবারের কাছে, যারা ওদের সমত্মান হারিয়েছে। তোমাদের কথাতেই তো ওরা ঘর ছেড়েছিল…।

তবে তো বলতে হয় আরো অনেককেই ক্ষমাপ্রার্থনা করা উচিত। জ্যোতিবাবু-হরেকৃষ্ণ কোঞার হয়ে নেহরু হয়ে গান্ধী জিন্না পর্যন্ত চলে যাবে। মেয়েটা বলল, স্যার, বাবার চাকরি চলে গেল, ভাই তখনো পড়ছে, তার ওপর বাবার স্ট্রোক হয়ে গেল। কিছু তো করতে হবে। সংসারকে বাঁচাতে হবে। শুনলাম ছ-মাসের মধ্যেই রেইকি শিখে রেইকি চিকিৎসা শুরু করা যায়। তাই করলাম। এখন তো ভালোই চলছে।

কত রোজগার জিজ্ঞাসা করা শোভন নয়। তাই জিজ্ঞাসা করা হলো না। কিন্তু সব মিলিয়ে মেয়েটিকে বড় ভালো লাগল। অসহায়ের মতো সত্যি কথা বলে।

কিন্তু তান্ত্রিক প্রক্রিয়াগুলো, তাবিজ, কবচ, বশীকরণ, জলপড়া রেইকি, বাস্ত্তবিদ্যা – ফেংসুই নাকি যেন – যা চলছে সব তো মিথ্যার বেসাতি। তুমিই বলো একটা কবচ কী করে মামলা জিতিয়ে দেবে, একটা কাচের খেলনা কী করে সোকলড অশুভ শক্তি শুষে নেবে। যারা এসব করছে, মানুষের টাকাই তো লুটছে। ওই চিটফান্ড সারদা-টারদার মতোই তো।

মেয়েটি মাথা নিচু করে। বলে, স্যার, রেইকিটা ঠিক ওরকম নয়। গ্রহশান্তি-গৃহশান্তি মোকদ্দমা হয় এসব করি না। সামান্য কয়েকটা ব্যাধি নিয়ে ডিল করি।

দেবকিঙ্কর বলেন, বুঝলাম। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। মাইকেল মধুসূদনের পিতা রাজনারায়ণও এরকমই একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলেছিলেন যখন স্থির করেছিলেন বিধর্মী ছেলেকে ত্যাজ্য করবেন। পরে চিন্ময়ীকে বলেছিলেন, মেয়েটি মন্দ না। জীবুর যদি পছন্দ হয়, বউ হয়ে আসতে পারে, কিন্তু বিয়ের পরে এসব রেইকি-ফেইকি চলবে না।

চিন্ময়ী বলেছিলেন, জীবুর বোধহয় মেয়েটাকে পছন্দই হয়েছে। অনেকক্ষণ ধরে ওরা বাগানে গিয়ে কথা বলছিল।

 

বিজনেস মানেই সাইকোলজিক্যাল প্রেসার তৈরি করা। যেটা কেনার দরকার নেই সেটাও কিনিয়ে নাও। নানারকম টেকনিক। ভয় দেখিয়েও কাজ হয়, জীবক যেটা দিলিস্নতে শিখেছিল। বিশ্বাস বানিয়েও কাজ হয়, মুনমুন যেটা করে। জীবক ভাবল, বিশ্বাস বানানোর টেকনিকটাও কালচার করে দেখবে। নিজেকে ধন্বন্তরী প্রমাণ করতে পারলে মুখে মুখে রটে যায়। কয়েকজন চামচে ফিট করতে হয়। যারা বলে বেড়াবে আমার রক্ত পায়খানা হচ্ছিল, ভেলোর গিয়েও লাভ হলো না, জীবক সেনের চেম্বারে গেলাম ছ-টাকা দামের কুড়িটা ট্যাবলেট খেলাম, দুটো করে দশ দিন। মানে একশ কুড়ি টাকায় কিওর। এই টাইপের প্রপাগান্ডা চাই। এরকম দু-চারজনকে ফিট করতে হবে। এদিকে অর্জুনপুরে, যেখানে বাজারের কাছেই চেম্বারটা, কয়েকজন এসেছিল, ব্যবসায়ী সমিতির সেক্রেটারি বাপি সাহাও ছিল, বলেছিল মেম্বার হতে হবে। বছরে তিন হাজার টাকার মেম্বারশিপ। বছরে একবার হরিসংকীর্তন হয়, তখন খিচুড়ি ভোগ, একবার কালীপূজা, এছাড়া দুস্থদের কম্বলদান আছে শীতকালে। এছাড়া পার্টিকে কিছু দিতে হয়। থানার জন্য খরচ আছে, মাসে মাত্র একশ টাকা করে চাঁদা। ভেরি নমিনাল।

জীবক বলেছিল, ডাক্তারের চেম্বার কি দোকানঘর নাকি যে, ব্যবসায়ী সমিতিকে… আরে ডাক্তারবাবু… কথা কেড়ে নেয় বাপি সাহা। চেম্বারই দোকান, দোকানই চেম্বার। ওই যে ভোডাফোনের দোকান, জুয়েলারি দোকান ওগুলো চেম্বারের মতোই তো। ডাক্তারের চেম্বারও দোকান। হোমিওপ্যাথি ডাক্তার বিজয় বারুই, সে তো হালখাতা করে। চেম্বারে গণেশ রাখে। আপনি যতই বলেন ডাক্তারখানার মালিক ব্যবসায়ী নয়, আমরা মানব না। আপনি কি বিনা পয়সায় চিকিৎসা করেন?

কথা বাড়ায়নি জীবক। মেম্বার হয়ে গিয়েছিল। বাপি সাহার খুব প্রভাব। ওর অনেক লোকজন। ওর বাবা ভূদেব সাহার এধারে বিঘেখানেক জমি ছিল। ওখানেই বাজারটা হয়েছে। বাপি সাহারা তিন ভাই তিনটে আলাদা পার্টি করত। কিন্তু একসঙ্গে খেতো। ওদের বড় বাড়ি। সাহাবাড়ি। সদর দরজার দুপাশে দুটো ময়ূর আঁকা, পেখমে নীল সবুজ হলুদ রং। ময়ূরের গায়ে কেউ পোস্টার মারে না।

সাহাদের ছোট ছেলেটা চেম্বারে এলো। মুখে দাড়ি। পাজামা-পাঞ্জাবি। ও একটা স্কুলের শিক্ষক। এদিকের
রবীন্দ্র-নজরুল উৎসবে খুব ছুটোছুটি করতে দেখেছিল ওকে। ওর নাম তমাল সাহা। ওদের মেজোভাইকে দামুদা, দামুবাবু এসব বলে ডাকে। দামালও বলে। বাপি সাহার একটা পোশাকি নাম আছে, জীবক জানে না। তমাল এলো। আগে এ-অঞ্চলের বাম বুদ্ধিজীবী ছিল। এখন আনুগত্য পালটেছে। বলল, ডাক্তারবাবু, এমন হয়ে গেলাম যে শিরদাঁড়া সোজা করে দাঁড়াতেই পারছি না। জীবক বলল, তবে তো পারফেক্ট বুদ্ধিজীবী হয়ে গেছেন, একদম ঠিকঠাক বুদ্ধিজীবী। মনে মনে বলল। নিঃশব্দে। শব্দ করে যেটা বলল, ডেঙ্গি তো এরকমই উইক করে দেয়। আসেত্ম আসেত্ম ঠিক হয়ে যাবে। ওষুধ দিচ্ছি। হিমোগেস্নাবিন বাড়াতে হবে। ফলিক অ্যাসিডের বড়ি, ভিটামিন ক্যাপসুল, টনিক এসব বিক্রি করার এগুলোই তো সুযোগ। সান ফার্মার টার্গেটটা রিচ করলেই পাতেয়া-ব্যাংকক-ফুকেট। ডেঙ্গিটেঙ্গি বেশি হলে এই দিকটা ওপেন হয়ে যায়। তা আপনাদের সাংস্কৃতিক কাজকর্ম কেমন চলছে – জিজ্ঞাসা করল জীবক। এমন সময় ফোনটা এলো। মুনমুন।

তমাল সাহার কথা শোনা হলো না। কিছু ওষুধ লিখে দিলো, দশ দিনের। একটা হিমোগেস্নাবিনসহ রক্তপরীক্ষা।

মুনমুন বলল, কাল ওদিকেই যাচ্ছি। এয়ারপোর্টের কাছে কইখালিতে। একটা বুড়ো পেশেন্ট আছে, রেইকি দিতে যাব। দুপুরে কী করা হচ্ছে?

এরকম একটা সুযোগের অপেক্ষায় ছিল জীবক। কয়েকবার দেখা হয়েছে আগে, কিন্তু একসঙ্গে বেশি সময় কখনো কাটায়নি।

কটার সময় আসবে এধারে?

এগারোটায় পৌঁছে যাব। বারোটায় ফ্রি। সঙ্গে গাড়ি আছে। ভাড়ায় নিয়েছি। দুপুরে তো সাধারণত বাড়িতে খেতেই যাই। যদি তেমন পেশেন্ট না থাকে। একটু চিমত্মা করল জীবক। খারাপ পেশেন্ট কেউ নেই। একটা অ্যাডাল্ট সারকামসিসন কেস, একটা
অ্যাজমা-অক্সিজেন নিচ্ছে। দুটো ইনস্যুরেন্সের টাকায় ঢপের অসুখ দেখিয়ে সব মেডিক্যাল চেকআপগুলো করে নিচ্ছে। একটা অ্যাপেনডিক্স অপারেশন হয়ে গেছে, একদিন থাকবে আর গোটাদুই ডেলিভারি কেস। সবাই ওকে। একটা হাইপো-গস্নাইসিমিয়া। একটা বার্ন কেস…। জীবক বলল, এক কাজ করো। কইখালি থেকে আমার হসপিটাল পাঁচ মিনিটের পথ। কাজ হয়ে গেলে এখানে চলে এসো, তারপর একসঙ্গে যাব। আমার সঙ্গে লাঞ্চ করবে। বলেই মনে হলো, দুপুরে বাড়ি নিয়ে যাওয়াটা বুচুনদাকে না জানানোই ভালো। জীবক জিজ্ঞাসা করল, বুচুনদা কি জানে তুমি এধারে আসছ?

– না বলিনি কিছু। মুনমুন বলল।

– যাক। বলতে হবে না। তুমি এক কাজ করো। ওদের কাছে আর একটু সময় বেশি কাটাও। এক ঘণ্টার বদলে দেড় ঘণ্টার রেইকি করো, পার্টি খুশি হবে। আমি কইখালির মোড়ে চলে যাব, তারপর আমার বাড়িতে গিয়ে লাঞ্চ। ভালো কইমাছ উঠছে। মামিকে ফুলকপি দিয়ে রান্না করতে বলব, আর মিষ্টিদই। ব্যস।

ও বলল, বিরিয়ানি-টিরিয়ানি আনাতে হবে না কিন্তু।

জীবক বলল, ওকে ডান।

মনটা খুশি খুশি লাগছে। মেয়েটার মুখে কী একটা বেশ ক্রিম ক্রিম ভাব আছে। দুধের সর দুধের সর। এটাকে কী যেন বলে…কমনীয়তা।

ভালোই তো রোজগারপাতি করছে। ইনভেস্টমেন্ট অনুপাতে টার্নওভার বেশ ভালো। রেইকি শিখতে কত খরচ হয়েছিল? ম্যাক্সিমাম বিশ হাজার? এখন মাসে তিরিশ-চলিস্নশ হাজার করে মিনিমাম কামাচ্ছে। আর জীবকের প্রাইভেট মেডিক্যাল কলেজে ডাক্তারি পড়তে হোস্টেল খরচটরচ নিয়ে পঁয়তালিস্নশ থেকে পঞ্চাশ লাখ খরচ হয়ে গেছে। মাসে কত কামাই হচ্ছে? সবকিছু নিয়ে দেড় লাখ? কোনটা লাভ হলো? একদম ঠিক লাইন চয়েস করেছে। মেয়ে ইন্টেলিজেন্ট আছে। গুরুপদ জেঠু বিয়েটা করিয়ে দিতে চাইছেন কারণ মেয়েটার বাবা নেই, ওর তো দায়িত্ব থাকছেই, একটা ডাক্তার ছেলেকে গছাতে পারলে তো ওর সুবিধে। আরে হোক প্রাইভেট মেডিক্যাল কলেজ, ডাক্তার তো। নিজের ছেলেকে তো ডাক্তার বানাতে পারেননি।

রাত্রেই বাজার থেকে বেশ বড় বড় কইমাছ, ফুলকপি, কস্ত্তরি থেকে কষা মাংস, দই এনে ফ্রিজে রাখে। ফুরফুরে ভাত দিয়ে খুব জমবে।

সবে শীতটা পড়তে শুরু করেছে। এখন ফুলকপির স্বাদ খুব ভালো। ছুনুমুনু করতে করতে খাইয়ে দেবে ও।

বিয়ে? এখানেই করতে হবে এমন কোনো কথা আছে নাকি? পাত্র ডাক্তার, গত তিন পুরুষ চিকিৎসক, বনেদি ঘর… বিজ্ঞাপন দিলে ডাক্তার পাত্রীও পাওয়া যেতে পারে। সেটা পরে দেখা যাবে। এখন শীতের দুপুরটা তো সুযোগ এলো যখন জম্পেশ কাটানো যাক।

সকালবেলা সাহাবাড়ির মেজোছেলে এলো সঙ্গে ওর স্ত্রী, পেট উঁচু, সঙ্গে বোধহয় ওদের মা। ব্যথা উঠেছে।

ভর্তি হলো। সকালেই ভিজিটিং গাইনি ছিল। জিজ্ঞাসা করল ফার্স্ট ইস্যু কিনা। বয়স্ক মহিলা বললেন, হ্যাঁ, প্রথম পোয়াতি। পাঁচ বছর বিয়ে হয়েছে। এ্যাদ্দিনে। গাইনি অর্চনা সেনগুপ্ত। নাম আছে। ভালো হাত। বেলা নটায় ভর্তি হয়েছিল। বাংলায় যাকে বলে জলভাঙা, ওটা হয়ে গেল, ডেলিভারি টেবিলে নিয়ে যাওয়া হলো। এগারোটা বেজে গেল, ডেলিভারি হলো না। আরো কিছুক্ষণ অপেক্ষা করা যেত, কিন্তু তা করা হয় না। পেশেন্ট পার্টিকে বলা হলো – আর অপেক্ষা করলে সমত্মানের রিস্ক আছে। সুতরাং সিজার। সিজার হলেই বেশি টাকা, নরমাল ওয়েট। সিজার হয়ে গেল, বেবি বেশ ভালো। ছেলে। সুসংবাদটা জীবকই দিলো। দামু সাহা বলল, মিষ্টি পাওনা আছে।

অর্চনা সেনগুপ্ত চলে গেলেন। অন্য নার্সিং হোমে যাবেন এবার।

পেশেন্টরা সবাই ভালো আছে। বাচ্চার মায়ের জ্ঞান এসে গেছে। ড্রিপ চলছে। অ্যানেসথেসিয়া করা হয়েছিল বলে বিকেলের আগে কিছু  খেতে দেওয়া হবে না।

মনে মিউজিক। এবার কইখালির মোড়। নার্সিং হোমটায় একটি নতুন ছেলে এসেছে। গতবার এমবিবিএস পাশ করেছে বিকেসি থেকে। ওটা যাদবপুরের প্রাইভেট হসপিটাল। ও রইল। জীবক খেতে গেল।

ফোন হয়ে গেছে। কইখালির মোড়। শীতের হাওয়ার লাগল নাচন। আয় মুনমুন আয়। পৌষ তোদের ডাক দিয়েছে আয় রে চলে আয় আয় আয়।

গাড়িটা থামল। ভেতরে মুনমুন। ঘড়িতে একটা পনেরো। জিজ্ঞাসা করল, অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে? না মিনিটপাঁচেক।

– বাড়িতে গিয়ে বেশিক্ষণ থাকব না কিন্তু।

– কেন, বিকেলে কাজ আছে?

– পাঁচটায়।

– সে তো অনেকক্ষণ।

– কিন্তু এতক্ষণ থাকব কেন? একটু দেখা হলো, গল্প হলো, ব্যস…। সে দেখা যাবে।

আমাকে তাড়াতাড়ি ছেড়ে দিতে হবে কিন্তু। ড্রাইভারের বিকেলে কাজ আছে।

মুন এখনো তুমি বলতে পাচ্ছো না। কখনো আপনি, কখনো ভাববাচ্য।

ঘরে ঢুকেই মিউজিক চালিয়ে দিলো। একটা পারফিউম স্প্রে করে দিলো। বলল, এই আমার ঘর।

মুনমুন বলল, ভালোই তো।

কোল্ড ড্রিংকস? ছোট করে?

ঘাড় নাড়ে মুনমুন।

জীবক ওর গস্নাসে লিমকার সঙ্গে একটু ভদকা নিল।

বলল, আমি আজ হাতে চাঁদ পেয়েছি। মুন। মুনমুন। মুনু মুনু মুনু মুনু। এই শব্দটা করে যা করে, তাই করল জীবক।

মুনমুন বলল, বাবার সঙ্গে কথা হয়েছে? কী নিয়ে?

এই আমাদের ব্যাপারটা…

ও হয়ে যাবে। নাও, ফ্রেশ হও।

শার্ট খুলল, একটা বারমুডা পরল জীবক। মুনমুন বলল, খেতে বসবে? বলো কোথায় কী আছে। আমি গরম করে বেড়ে দি।

জীবক বলল, এত ব্যস্ত হচ্ছো কেন? বাইরে থেকে এলে, একটু ফ্রেশ হয়ে নাও, একটু গল্পগাছা করি, তারপর খাব। মুনমুন ফ্রেশ হয়ে আসে। সোফায় বসে। জীবক বলে, এখানে এসো পিস্নজ। আমাকে একটু রেইকি করে দাও। একটু মাথাটাও ধরে আছে।

বিছানায় শুয়ে পড়ে জীবক।

রেইকি ব্যাপারটা কী একটু দেখাবে না?

মুনমুন বলে, ও-কে দেন। সাতটা পয়েন্ট আছে ভাবা হয়। ক্রাউন, থার্ড আই, থ্রোট, হার্ট, ম্যাফ্রাল…। ক্রাউন হলো মাথা। এই দেখো মাথার দুপাশে আমি দুটো হাত দিলাম। একটু চাপ দিলাম।

দারুণ লাগছে – জীবক বলে।

চাপের তারতম্য আছে। আমার আঙুলের মাধ্যমে আমার স্টোর করা এনার্জি তোমার শরীরে যাচ্ছে।

হাত বাড়িয়ে মোবাইল ফোনটা টানে জীবক। সাইলেন্ট করে রাখে।

এবার হাতদুটো তোমার গলার দুপাশে আনছি। থাইরয়েড কিন্তু এনার্জাইস্ড হচ্ছে।

তুমি কি বিশ্বাস করো সত্যি সত্যি আমার থাইরয়েড এনার্জাইস্ড হচ্ছে? জীবক জিজ্ঞাসা করে।

মুনমুন বলে, প্রফেশনের খাতিরে বিশ্বাস করি। করতে হয়। এটাই শিখেছি।

জীবক বলে, থাইরয়েড হচ্ছে কিনা জানি না, আমি এনার্জাইস্ড হচ্ছি। আমার পিটুইটারি এনার্জাইস্ড হচ্ছে। এড্রানালিন, টেস্টাস্টেরনের সিক্রিয়েশন বেড়ে গেছে, তুমি তোমার আঙুল দিয়ে নয়, সারাশরীর দিয়ে রেইকি দাও।

মুনমুন বলে, এখন এরকম কোরো না বি চিল।

জীবক বলে, একদম কিছু হবে না তা হয় নাকি? তুমি কি জানতে না একা ঘরে আছি, শুধু কইমাছ-ভাত খাব, ব্যস? চুমুও খাবো না? তাহলে শুধু চুমু, কেমন?

চুমু দিয়েই শুরু হলো। তাই তো হয়। হঠাৎই চোখ পড়ল মোবাইলে ১২টা মিস কল। হাসপাতাল থেকে, বাপি সাহা, আরো অচেনা কিছু নম্বর। কিছু একটা হয়েছে। খারাপ অবস্থায় ছিল। সে-অবস্থাতেই ফোন। ডিউটি নার্স বলো, সি-এইট, কুহু সাহা সিরিয়াস, ভিগোরাস বিস্নডিং। আপনি ফোন ধরেননি, অর্চনাদি অন্য একটা নার্সিং হোমে অন্য একটা অপারেশনে আছেন।

বেবি ঠিক আছে? আর্তনাদের মতো গলাটা শোনাল।

লাঞ্চে এসেছিলাম তো, ফোনটা সাইলেন্টে রেখে চার্জ দিচ্ছিলাম। তো বিস্নডিংটা কখন শুরু হলো? ভ্যাজাইনাল বিস্নডিং?

– হ্যাঁ। পেশেন্টের রাইগার হলো হঠাৎ। খিঁচুনি। মুখ দিয়ে ফেনা। সেলাই ছিঁড়ে গেল। আবার সেলাই করার মতো কেউ নেই।

নতুন ছেলেটা কোথায়? অমিতাভ? ও খেতে গেছে। অনেকক্ষণ। ওর টেবিলে মোবাইল ফেলে গেছে।

এক্ষুনি আসছি।

মিসড কলগুলো চেক করে। প্রথম কলটা এসেছিল আধঘণ্টা আগে। বেশি দেরি হয়নি।

জীবক বলল, এক্ষুনি হাসপাতালে যেতে হবে আমাকে। তুমি বেরিয়ে যাও। সরি। খাওয়াটা হলো না তোমার। অসহায়ের মতো তাকায় মেয়েটার দিকে। মেয়েটা তখন ওর জামাকাপড় ঠিকঠাক করছিল। ঠিক এই সময় বেজে উঠল কলিংবেল।

একবার ডিংডং করেই থামল না, চলতেই থাকল। সঙ্গে দরজায় ধাক্কা।

নিশ্চয়ই ওরা।

বাথরুমে ঢুকে যাও, বাথরুমে, সিটকিনি… শব্দগুলোকে মু-মালার মতো পরিয়ে দিলো জীবক।

দরজা খুলল ও। বারমুডা আর গেঞ্জিটা পরে নিয়েছিল তাড়াতাড়ি। এ কী? পেশেন্ট মরে যাচ্ছে এখানে, গাড় মারাচ্ছিলেন? জীবক বলল, পেশেন্ট তো ভালো ছিল, খুব ভালো। ভালো দেখেই দুটো খেতে এসেছিলাম।

খেতে কতক্ষণ লাগে, এ্যাঁ বলতে বলতে হুড়মুড় করে ঘরের ভেতরে দুজন ঢুকে পড়ল।

ফোন ধরেননি কেন?

একটু চোখ লেগে এসেছিল, ফোন সাইলেন্টে ছিল, বেশিক্ষণ নয়, মিনিটকুড়ি?

– এ কী? এখানে ওড়না কেন? বিছানায়? এই তো লেডিস ব্যাগ। তুই না শালা ব্যাচেলার? এই তো লেডিস চপ্পল। বাথরুম বন্ধ কেন? বাথরুমে কে? মাগিবাজি? পেশেন্টকে ফেলে রেখে মাগিবাজি?

গাড়িতে ওঠার আগে একদলা থুথু পড়েছিল জীবকের গায়ে। ও রুমালে মুখ মুছে তখনই ফেলে দিতে পারেনি রাস্তায়। হাতের মুঠিতে ছিল থুথু-মাখা রুমাল। মুনমুন মাথা নিচু করে গাড়িতে ওঠে। ফ্ল্যাটবাড়ির লোকজন জড়ো হয় চেঁচামেচিতে। জীবকের ঠোঁট থেকে রক্ত পড়ছে। রক্ত চেটে নিল জিভে। সামনের একটা দাঁতও নড়ে গেছে। ওদের কারোর বাইকের পেছনে চাপিয়ে ম্যাডোনা নার্সিং হোম ইতোমধ্যেই একজন সার্জনকে নিয়ে এসেছিল। তিনি কাজ শুরু করে দিয়েছেন। কিন্তু তার আগেই ম্যাডোনার কাচের দরজাটা ভাঙা হয়ে গেছে। পুষ্পসজ্জা তছনছ। সি.ই.ও. সামনে এসে হাতজোড় করে বলেছে, যারা গাফিলতি করেছে, ওদের চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হবে।

সার্জন তুষার চক্রবর্তী এখানে অপারেশন করে থাকেন। তিনি বললেন, পেশেন্টের এপিলেপটিক শক হয়েছিল। কাঁচা সেলাই তখন ছিঁড়ে গেছে। জীবককে জিজ্ঞাসা করল – পেশেন্টের কেস হিস্ট্রি নেননি?

জীবক বলে, নেওয়া হয়েছিল তো, পেশেন্টের লাস্ট বস্নাডসুগার, বিলিরুবিন কাউন্ট, বস্নাড গ্রম্নপ সবই ফাইলে আছে। ইসিজিও।

এক বোতল বস্নাড দিতে হবে। আছে স্যার। সিজারের আগেই আনা হয়েছিল, লাগেনি। জীবক সহজে ওর সিনিয়রদের স্যার বলে না। এখন বলে ফেলল।

সব দিক গার্ড দিয়েই কাজটা করেছিলাম… যেন কৈফিয়ত দিচ্ছে জীবক।

বুচুনদা এসে জীবকের পা থেকে মাথা পর্যন্ত একবার মেপে নিল।

পেশেন্ট স্টেবল তো স্যার? সার্জনকে জিজ্ঞাসা করল সি.ই.ও.।

ঠিক আছে এখন। বি.পি. বেড়েছে। বস্নাডটা গেলেই ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু এটা হলো কেন? পেশেন্টের কি এপিলেপসির হিস্ট্রি ছিল?

জীবকের দিকে তাকাল দুজনই। তীব্র চিহ্নের ছুরিতে ছিন্ন হয়ে যাচ্ছে জীবক।

ফাইলে তো কিছু নেই তেমন… জীবক বলে। পুরনো প্রেসক্রিপশন চাওয়া হয়েছিল? জীবক বলে, অ্যাডমিশনের সময় আমি তো ছিলাম না ডিউটিতে…। আমার ডিউটি শুরু হওয়ার আগেই তো…। নিচে লোকজন ছিল। জীবককে নিয়ে গেলেন নিচে। ওরা গেল। বলল, পেশেন্ট ভালো আছে।

সার্জন তুষার চক্রবর্তী জিজ্ঞাসা করেছিলেন – পেশেন্টের কি মৃগী ছিল? ফিট হয়ে যেত? দামু সাহা বলল, বছরতিনেক আগে দুবার হয়েছিল। তখন ডাক্তার দেখানো হয়েছিল।

তারপর?

আর কখনো কিছু ওসব হয়নি।

ওষুধ খেতে হতো তো রোজ?

– হ্যাঁ হ্যাঁ। একটা করে বড়ি খেতে হতো রোজ। একসঙ্গে একশটার শিশি এনে রাখতাম।

এ-কথা কি বলা হয়েছিল ভর্তি হওয়ার সময়? বলা হয়নি। ওষুধ পড়েনি, তাই ওরকম খিঁচুনি হয়ে সেলাই ছিঁড়ে গেছে।

দামু সাহা বলে, আপনারাও জিজ্ঞাসা করেননি। কিন্তু আমাদের প্রশ্ন, অপারেশনের পর ডাক্তার কেন এখানে না থেকে মেয়েছেলে করতে গেল। আমার ওয়াইফের কিছু হয়ে গেলে ওকে আমরা দুনিয়ায় রাখব না।

ভালোয় ভালোয় বাড়ি ফিরে গিয়েছিল সাহাবাড়ির মেজোবউ কুহু সাহা। পরে জানা গিয়েছিল, মৃগীর ওষুধটা টানা খেয়ে যেতে হবে, ডাক্তার বলেছিলেন; কিন্তু দিনসাতেক আগেই ফুরিয়ে গিয়েছিল, আর আনতে বলেনি।

ব্যাপারটা নিয়ে থানাপুলিশ হয়নি। ভাঙচুরের জন্য ডায়েরি হয়নি। মিডিয়াও খবর পায়নি।

জীবককে তাড়ানো হয়নি, অসুস্থ বাবা-মায়ের দেখাশুনো করতে হবে বলে চাকরি ছাড়ার দরখাস্ত করতে হয়েছিল। ম্যাডোনা নার্সিং হোমই বলেছিল, আপনাকে আর রাখা যাবে না।

দেবকিঙ্করের কিছু করার ছিল না। এখানেই বিয়েটা দিতে হয়েছিল। যে-মেয়েটির শরীরে অচেনা মানুষের থুথু, সেটাই চেটে নিয়েছিলেন দেবকিঙ্কর। মেয়েটির কী দোষ? দোষ তো জীবকের। কিন্তু জীবক! সুশ্রম্নতের শিষ্য জীবক ছিল বৈদ্যশ্রেষ্ঠ। নাম রাখার সময় একটা স্বপ্ন ছিল। স্বপ্ন ভেঙেছে। স্বপ্নের চরিত্রই তাই। স্বপ্ন ভাঙে, আবার তৈরি হয়। নতুন নতুন স্বপ্ন তৈরি হয়। স্বপ্ন নির্মাণই সভ্যতা। জীবক স্বপ্ন ভেঙেছে। কিন্তু জীবক তো ওর সমত্মান। নিজের চেম্বারের পাশেই জীবককে একটা চেম্বার করে দেবেন ভেবেছিলেন দেবকিঙ্কর। কিন্তু পরে মনে হলো, দেবকিঙ্কর থাকলে রোগীরা ওর কাছেই যাবে। জীবকের কাছে যাবে না। তাছাড়া এত কম ফি নিতে
জীবকই-বা রাজি থাকবে কেন? ও তো আজকালকার ছেলে। বরং পাশের চেম্বারে জীবকের স্ত্রী রেইকি করুক।

তবে কি হেরে গেলেন দেবকিঙ্কর? দেবকিঙ্কর ঠিক করেছেন তিনি চলে যাবেন হাড়িভাঙ্গা। চপলা হাড়ির ওই বিবেকানন্দ হাসপাতালে।

স্বপ্ন নিয়ে লড়াই চলছে বিশ্বজুড়ে। স্বপ্ন ভাঙছে, আবার ভাঙা স্বপ্নের ধ্বংসসত্মূপের ওপর নতুন স্বপ্ন গড়ে উঠছে। স্বপ্ন থামে না। নালান্দা-আলেকজেন্দ্রিয়া-তক্ষশীলার লাইব্রেরি ধ্বংস হয়েছে, কিন্তু উত্তরপাড়ার রাজবাড়িতে, কৃষ্ণনগরের ভাদুড়ি বাড়িতে, আরবেড়িয়ার জমিদার বাড়িতে নতুন লাইব্রেরি গড়ে উঠেছে। গ্যালিলিও হেরেছে কিন্তু ডারউইন জিতেছে। ইতিহাস যেন পানকৌড়ির ডুবসাঁতার। এখানে ডোবে, অন্য এক জায়গায় উঠে যায় ঠিক। দেবকিঙ্কর হেরে গেলেন। কিন্তু অন্য জায়গায় তো জিতে যাচ্ছে – চপলা হাড়ি। গ্রামের মানুষ ইট দান করেছে, শ্রম দান করেছে। বাড়ি তৈরি হয়ে গেছে। দুটো এনজিও পাশে দাঁড়িয়েছে। নিজের ছেলেটি ডাক্তার হয়ে ওখানেই কাজ করবে ঠিক করেছে। দেবকিঙ্করও সাহায্য করেছেন নানাভাবে। কুড়ি কিলোমিটার দূরে ওই হাসপাতাল। দেবকিঙ্কর যাতায়াত করবেন ওখানে। এখানে চেম্বার করবেন না। ছেলেই বসুক এই চেম্বারে।

লড়াই তো চলছে। ওই তো পুরুলিয়ার ছেলে সুজিত, কলকাতায় নামি ডাক্তার। প্রতি শনিবার চলে যাচ্ছে পুরুলিয়ায় ওর গ্রামের বাড়িতে। রোগী দেখছে বিনে পয়সায়। সঙ্গে নিয়ে যাচ্ছে বিশ-পঁচিশ হাজার টাকার ওষুধও। দিয়ে দিচ্ছে ওর একদিনের রোজগার। ঠাকুরপুকুরের সুবাসিনী মিস্ত্রী হাসপুকুরে একটা হাসপাতাল তৈরি করলেন। খবর কাগজে উঠেছিল। সুবাসিনী বাজারে শাকসবজি বিক্রি করতেন। ওর স্বামী বিনাচিকিৎসায় মারা গেলে ওর প্রতিজ্ঞার স্বপ্নবীজ তৈরি হয়। সেই বীজ থেকে বৃক্ষ হয়েছে তো…। তৈরি হয়েছে হাসপাতাল। হাসপাতাল তৈরি হয়েছে বেলুড়ে, শ্রীরামপুরে…। নাম হয়েছে শ্রমজীবী হাসপাতাল। বিলেতে চাকরি করে কিছু ডাক্তার টাকাপয়সা জমিয়ে হাসপাতাল তৈরি করছে ফুলেশ্বরে। এখানে দেবকিঙ্কর হেরেছেন কিন্তু কত জায়গায় তো অন্য দেবকিঙ্কররা জিতছে।

থাক। এই চেম্বারে ওর ছেলেই থাক। বাপ তো, ছেলের ওপর একটা কর্তব্য আছে তো…। এটাও একটা কর্তব্য… হিপোক্রিতিক ওথটা সবসময় ওর চোখের সামনে রেখে দেওয়া। ডাক্তারি শুরুর আগে একটা শপথ নিতে হয়। সেবাধর্মের শপথ। সেটাকে ছাপিয়ে বাঁধিয়ে চেম্বারে ঝুলিয়ে রাখতে হবে। এটাও শপথ নিয়ে কাজ শুরু করতে হয় চিকিৎসক এবং জনপ্রতিনিধিদের। কিন্তু কাজ শুরু করার পর শপথের কথা মনে থাকে না ওদের।

সেই শপথটা মনে করিয়ে দেওয়াটা একটা টাস্ক। কাজটা করতে হবে। টু-ডু।

কিন্তু ঢোঁড়া সাপের বিষ হারানোর গল্পটা আজো বলা হলো না ছেলেকে। সময়-সুযোগই পাওয়া গেল না। ওই গল্পটা তো জানাতে হবে। সারা পৃথিবীকেই জানাতে হবে।

শেয়ার করুন

Leave a Reply