একটি কাব্য : পাঠ ও বিবেচনা

লেখক:

আমীর খসরু স্বপন

 

বিবরের গান

বিমল গুহ

আজমাইন পাবলিকেশনস

ঢাকা, ২০১৫

১৫০ টাকা

 

আলোচনার শুরুতেই বলতে চাই, ‘জনপ্রিয়’ কবিদের ক্ষেত্রে যেটা হয়ে থাকে, সেরূপ ‘নির্জনতা প্রিয়’ শব্দটা বিমল গুহ সম্পর্কে বেশ আক্ষরিকভাবেই প্রযোজ্য। কেননা, রচনা ও প্রকাশের গতানুগতিক পথে তিনি হাঁটেননি। কথাটা স্পষ্ট হবে, তাঁর কাব্য-জীবনের ঘটনাবলি তুলে ধরা হলে। এখানে সে-সুযোগ নেই বললেই চলে। আমি মনে করি, শুরু থেকেই পত্রপত্রিকায় তাঁর লেখালেখি প্রকাশিত হলেও এই ভূমিকা বোধহয় একেবারেই অবান্তর নয়। যদিও আমরা যারা বাংলাদেশের বাঙালি পাঠক তারা জানি, বিংশ শতাব্দীর সত্তরের দশকে বাংলা কবিতায় যাঁরা নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছেন এবং কবিতার জন্য নিজেকে অনিবার্য করে তুলেছেন সেই গুটিকয়েক কবির মধ্যে বিমল গুহ একজন। কবিতার জন্য যিনি যশ বা নামডাকের কোনো ধার ধারেন না এবং এত বছর পরেও তিনি সামান্য আক্ষেপ ছাড়াই কবিতা লিখছেন। তবে বলা যায়, গোনাগুনতি পাঠকের খাসকামরা থেকে বিমল গুহ কবিতাকে এনে হাজির করেছেন বোধের স্বচ্ছ আলোছায়ার ওপর। যে-চেষ্টা নামী কবিরাও সবসময় করেছেন। স্মরণযোগ্য যে, সত্তরের দশকে বাংলাদেশে অনেক বড় বড় ঘটনা ঘটেছিল। তার একটি মুক্তিযুদ্ধ ও অপরটি স্বাধীনতার স্থপতিকে হত্যা করা, যা ছিল অকল্পনীয়। ফলে অলস কবিতার সংকলন ও কবি প্রসিদ্ধির ভাবনা কবিদের কারো ছিল না বা সস্তা জনপ্রিয়তার ভাবনা তাঁদের স্পর্শ করেনি। গোটা সময়টাই ছিল জনপ্রিয়তার বিরুদ্ধে, ব্যক্তির অবসরের বিরুদ্ধে এবং এ-সময়টা সবার জন্যই ছিল সেনাজীবনের প্রকোষ্ঠে বন্দি।

আর এমনই যখন অবস্থা, তখন ১৯৮২-তে প্রকাশিত হলো বিমল গুহর প্রথম কাব্যগ্রন্থ অহংকার তোমার শব্দ। এর পরবর্তী বছরগুলোতে তাঁর বেশ কয়েকটি কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়। তাঁর সর্বশেষ কাব্যগ্রন্থ বিবরের গানে একটা বিষয় খুব সহজেই চোখে পড়বে, তা হলো, বিমল গুহের বর্ণনার আঙ্গিক, শব্দচয়ন একেবারে অভূতপূর্ব। কবিতায় কি তিনি চান মর্মভেদী হতে? তিনি সেদিক দিয়ে হাঁটেন না, তাহলে কী আশা করতে পারি আমরা? স্যাটায়ার? না, তাও নয়। গোটা কাব্যগ্রন্থেই নিভৃত অনুভূতির সংবেদী বর্ণনা তিনি দেন, যেখানে মনের নেপথ্যে কী চলছে, তার সবই আমরা কল্পনা করে নিতে পারি। শৈশব থেকে লিখতেন বলেই বোধহয় বর্ণনার এ-ধারা এমন অনায়াসে এসেছে তাঁর কলমে।

উলেস্নখ্য, বিমল গুহের সর্বশেষ কবিতাগ্রন্থ বিবরের গান প্রকাশ করেছে আজমাইন পাবলিকেশনস। এ-গ্রন্থের অধিকাংশ কবিতাকে ইতিহাসবোধ ও তার নান্দনিক সম্প্রসারণ বলা যায়। কখনো-কখনো তা পাঠককে দার্শনিকতার দিকেও প্রলুব্ধ করে।

বিমল গুহ মূলত স্বপ্নকল্পনা বা ফ্যান্টাসিনির্ভর কবিতাচর্চাতে নিমগ্ন থাকতে চান না – আলোচ্য গ্রন্থের কবিতাগুলো সেটাই প্রমাণ করে। যদিও তা অনেকরকম ফলাফলই তুলে ধরে আমাদের কাছে। এক্ষেত্রে নান্দনিকতার বহিঃপ্রকাশ যেমন ঘটেছে, একইভাবে বলা যায়, দুর্বল বিষয়েরও জন্ম হয়েছে কিছু-কিছু কবিতায়। প্রশ্ন হলো, একজন মহৎ কবি সময় ও বাস্তবতাকে তুলে আনতে ভাষার ক্ষেত্রে কতটা ছাড় দিতে পারেন, সেটা অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় কবিতার ক্ষেত্রে।

তাৎক্ষণিকতা ও তার প্রয়োজনীয়তাকে অনুভবযোগ্য করে তোলার প্রশ্নে এর আবশ্যিকতা থাকলেও কখনো কখনো তা গুরুত্বপূর্ণ মনে নাও হতে পারে। এক্ষেত্রে মানবিকতাকে আলোড়িত করার মতো শক্তি ভাষার অবস্থান জুড়ে থাকাটাই স্বাভাবিক। বিমল গুহের কবিতায় সেটা যথেষ্ট। এরপরেও বলা যায়, তা আমাদের সুবিধাবাদী মানসিকতাকে আঘাত করে বা ভেঙে ফেলার জন্য কতটুকু ভূমিকা রাখে! গ্রন্থভুক্ত কবিতাগুলো পাঠের সময় এসব প্রশ্ন সামনে এসে যায়। যদিও বিবরের গান দেশ ও সমাজকেই তার সব চিহ্নায়কসহ ভেতর ও বাইরে থেকে তুলে ধরে এবং একজন কবির দীর্ঘ-সাধনাকে স্থায়ী হতে দেখা যায় এর অনুভবযোগ্যতার ভেতর।

বলা যায়, বিবরের গান দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা ও তার সময়কালকে ঘিরেই নির্মিত। গ্রন্থের কবিতাগুলো তা-ই বলে। কবিতার কিছু অংশ উদ্ধৃতির ভেতর পরিবেশন করা যাক :

অস্থির সময় যাপন করি রোজ

মরা ঘাসে ভরে গেছে ফসলের মাঠ

এই দুর্দিনে নির্বাক তাকিয়ে কবি দেখে মৃতবৎ

ঘরের মেঝেয় পড়ে থাকা কাগজের সত্মূপ

বিপর্যস্ত ঝরনা কলম। পত্রিকার পাতা জুড়ে

শোকাহত নারী ও পুরুষ

আগুনে দগ্ধ মৃত্যু –

…   …   …

বাংলাদেশ দাঁড়াও আরবার এই

নিগৃহীত মানুষের পাশে ধীর বেশে

(‘সময় ২০১৫’)

এ কবিতার অর্থ ও চিত্রকল্পের ব্যবহারই বলে দেয় কবি বিমল গুহ বিষয়-ভাবনাকে হালকা করে দেখেন না বা পরিহার করে চলতে চান না। বরং অত্যন্ত জোরালোভাবেই ছড়িয়ে দিতে চান এর প্রয়োজনীয় ও যৌক্তিক দিকগুলো সবার কাছে। এটাকে দায়বদ্ধ কবির ইচ্ছাকৃত মনোভাব বলা ছাড়া অন্য কিছু ভাবা যায় না। বিমল গুহ এখানে দায়বদ্ধ বা মানুষের কাছে শিল্পের প্রয়োজন নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকেন।

ফলে সমাজকে ক্রমাগত এগিয়ে দেওয়ার প্রয়োজন অথবা সমাজের অগ্রসরমান চিন্তাকে তুলে ধরার বাসনা থেকেই কবিকে বারবার নৈর্ব্যক্তিকতা থেকে মূর্ততার দিকে ফিরতে হয়। যেমন :

সময় মন্থন করে সামনে দাঁড়ায় কাজী নজরুল

ইতিহাসও থমকে দাঁড়ায়

…     …     …

একবিংশ শতাব্দীতে আকাশে কিসের সুর বাজে

কারা আজ বিভেদের রেখা টানে মানুষের মাঝে?

(‘চুরুলিয়া নামে গ্রাম’)

এরকম অসংখ্য উদ্ধৃতি ব্যবহার করা যায়। লক্ষণীয়, ব্যাকরণগত দিক থেকে এ-গ্রন্থের কাব্যভাষাকে ত্রম্নটিহীন বলেই মনে হয়। আর এমন শব্দ তিনি ব্যবহার করেননি, যে-শব্দগুলোকে মেনে নেওয়া যায় না। গ্রন্থে কবির মানবিক বোধই ব্যক্তিকে দিয়ে অনেক কথা, অনেক ভাবনা ও অনেক চিন্তার প্রকাশ ঘটায়। আর এর সমগ্র অবস্থান নানা কারণেই অস্থির পরিণতির দিকে এগিয়েছে। যে-কারণে ‘শিউলির বনে করুণ বেহাগ’কে মেনে নেওয়া যায় না। কিংবা স্বেচ্ছাচারী হয়ে উঠলে সব অশুভই যে দীর্ঘস্থায়ী হয়ে পড়বে, সে-শঙ্কা কবিকে শব্দ-সঞ্চালনে সতর্ক করে তোলে। ফলে নির্দ্বিধায় বলা যায়, সময়ের ও বাস্তবতার মাঝে সংগতিপূর্ণ একটা ভ্রমণই কবি এখানে সম্পন্ন করেন।

উলেস্নখ্য, বিমল গুহ যথেষ্ট ব্যতিক্রম তাঁর সময় থেকে। কেননা শুরু থেকে তিনি নিজেকে রোমান্টিকতার ভেতর আবিষ্ট রাখলেও সেই রোমান্টিক বোধই তাঁকে পরবর্তীকালে নৈরাজ্যিক – ভাঙচুর প্রতিচ্ছায়া ও বিচূর্ণ-ভাবনার উত্তেজনা নতুন করে নির্মাণ করে। আর এরই ক্রমধারায় নিজেকে পালটাতে-পালটাতে এগিয়ে যান তিনি এবং এগিয়ে দেন কবিতার সুর, স্বর ও চিন্তাকে। সবশেষে এ-কথা বলাই যথেষ্ট যে, কবি বিমল গুহ সময়-দেশ-সমাজ সম্পর্কে এতটুকু নির্লিপ্ত নন। বিবরের গানে এসে তারই পর্যাপ্ততা ও অনিবার্যতা তিনি তুলে ধরেন।

শেয়ার করুন

Leave a Reply