একটি কুকুর ও যুধিষ্ঠির

লেখক:

উৎপলকুমার দত্ত

রাত যখন নিশুতি হয় তখন আকাশের তারারা কেমন মিটিমিটি কাঁপে। ছাতুবাবু লেনের জরাজীর্ণ মেসবাড়িটার হাতায় অযত্নে বেড়ে ওঠা সবেধন নীলমণি পেয়ারা গাছটার সবুজ পাতায় জ্যোৎস্নার আলো চিকচিক করে। আর সন্ধের মুখে জ্বালানো ধূপের কাঠিটা অনেকক্ষণ আগেই নিভে গিয়েও একটা হালকা সুগন্ধ ধরে রাখে দেয়াল আর মশারির চালে। তখনই, এসব সময়েই, যুধিষ্ঠিরের মনটা যে কী খারাপ হয়ে যায়। কী খা-রা-প হয়ে যায়! সে কেবলই ভাবে তার সদ্য বিয়ে করা বউটার কথা, দেবীর কথা, বারবার মনে পড়ে তার আয়ত চোখ দুখানার কথা। বিয়ের ঠিক সাতদিন পর গ্রামের বাড়িতে তাকে ফেলে রেখে কলকাতার এই তার কাজের জায়গায় চলে আসা, এই একা একা মেসবাড়িতে যে কী দুঃসহ যন্ত্রণা কাকে সে বলে বোঝাবে? যাব যাব করেও আর ছুটি পাচ্ছে না। বইয়ের দোকানের মালিক নৃসিংহবাবুটা পিশাচ লোক। মাইনে তো মোটেই ভালো দেয় না। তারপর একদম ছুটি দিতে চায় না। তবে হ্যাঁ, যুধিষ্ঠিরের ওপর মালিকের অগাধ বিশ্বাস। সব দায়-দায়িত্ব দোকানের যুধিষ্ঠিরেরই কাঁধে। বইয়ের স্টল মেলানো, কাগজের অর্ডার দেওয়া, প্রুফ রিডারকে তাগাদা, প্রেসে যাতায়াত, ক্যাশ মেলানো সব – সব কাজে যুধিষ্ঠিরকে না হলে যেন চলবেই না নৃসিংহবাবুর।

অতএব বুভুক্ষু হৃদয় নিয়ে একা একা পড়ে থাকা আর দিন গোনা ছাড়া যুধিষ্ঠিরচন্দ্র দাসের আর কী বা করবার আছে? এই নিশুত রাতে তাই ছাতুবাবু লেনের অন্ধকার মেসবাড়ির ঘুপচি ঘরে বসে নিঃসঙ্গ যুধিষ্ঠির লুঙির কষি আলগা করে তার গোপন অঙ্গটি নিয়ে নাড়াচাড়া করেই মনের দুঃখ ভোলার চেষ্টা করে।

নৃসিংহবাবু স্কুল-কলেজের পাঠ্যপুস্তক নোটবই ছাপেন। তাঁর অথররা সব স্কুলমাস্টার। তাঁদের সঙ্গে মান্য করে কথা বলতে হয়। বইয়ের ঠিকঠাক হিসাবসমেত রয়্যালটির চেক হাতে সময়মতো পৌঁছে দিতে হয়। দিনভর নিশ্বাস ফেলার ফুরসত পায় না সে। তখন দেবী ঘুমিয়ে থাকে বুকের মধ্যে সোনার কৌটোয়। তারপর মেসে ফিরে দুটিখানি ডাল ভাত আর মৌরলা মাছের চ্চচড়ি খেয়ে নিজের সাত নম্বর ঘরখানায় এসে রাতে বুকের সিন্দুকের ডালাটা খুলে দেয় যুধিষ্ঠির। যেন তখন নাচতে নাচতে বেরিয়ে আসে তার ভীষণ আদরের, তার অগ্নিসাক্ষী করা বউ, তার একান্ত আপনজন দেবী। পরণে তার বিয়ের সেই আগুনরঙা বেনারসিটা। সিঁথির নিচে ঝুলে আছে সোনার টিকলি। নাকে সোনার নাকফুল।

সে মানবী নয়, সে মানবী নয়। সে মায়াবী হরিণ। সে যেমন নিজে নাচে, তেমন যুধিষ্ঠিরকেও নাচায়। দিনের বেলায় যে-জীবনটা একঘেয়ে, যে-পৃথিবীটা রসকষহীন, মালিকের বকাঝকা আর গালমন্দ খাওয়ারই শুধু, রাতে সে-জীবনটারই রং যেন একেবারে বদলে যায়। হয়ে ওঠে স্বপ্নময়।

– পাগলি মেয়ে, একা একা আমারও বুঝি নষ্ট হয় না? আমি বুঝি খুব সুখে আছি এই কলকেতায়?
– বোঝোই যদি এতো, তবে আসো না কেন? কতদিন তোমায় দেখিনি বলো তো?
– অমন করে বলো না বউ। ওতে আমার কষ্ট বাড়ে। একটু সবুর করো দেখি। ইস্কুল-কলেজের ভর্তির দিনটা অবধি যা কাজের চাপ, তারপরই বাবুকে বলে ছুটি নিয়ে চলে যাব আমি। আর গিয়ে কী করব জানো?
– কী?
– তোমাকে নিয়ে কলকাতায় চলে আসব। কাছেই ঝামাপুকুর লেনে একটা বাসা দেখে রেখেছি। বেশ আলো-হাওয়া। তোমাতে আমাতে থাকব দুজনে। কেমন, এইবার খুশি তো?
– সত্যি? কলকেতায় থাকব আমি!
– সত্যি। সত্যি। সত্যি।
– তাহলে একটু নাচি আরো? কী যে আনন্দ হচ্ছে আমার, কী বলব তোমাকে।
– হ্যাঁ নাচো দেখি, আর সেই সঙ্গে একটা গানও ধরো না গো। চোখ দুটো আমার বুঁজে আসবে তাহলে, একা ঘুম আসে না যে।

সন্ধেবেলায় জ্বালানো পোড়া ধূপের গন্ধ ফিকে হয়ে আসে ক্রমে। আকাশের জ্যোৎস্না হয়ে ওঠে আরো ম্লান। নিশুতি রাতেরা তারারা কখনো টিপটিপ করে দূর-দূরান্তে। ঘুমিয়ে পড়ে যুধিষ্ঠির। তার ঘুমের মধ্যে মায়াবী হরিণেরা ঘোরাফেরা করে চারপাশে। যাতায়াত করে। তারপর ভোররাতে ফিরে যায়।

আয় রে ভুলু আয় সকালবেলায় উঠে কেরোসিন স্টোভে পাউডার মিল্ক দিয়ে গোলা খানিকটা দুধ ফোটায় যুধিষ্ঠির। ঘরে স্টোভ জ্বলছে দেখলে মেস ম্যানেজার পানুবাবু চেঁচামেচি করে অনর্থ করবে। তাই লুকিয়ে লুকিয়ে।

তারপর একটা সবুজ প্লাস্টিকের বাটিতে একটু দুধ-মুড়ি মেখে আর টিনের কৌটো থেকে দুটো বিস্কুট বের করে হাতে নিয়ে সামান্য গলা উঁচু করে ডাকে যুধিষ্ঠির, আয় ভুলু তু-তু আয় আয় –

বারান্দার কোণে উৎকর্ণ হয়ে অপেক্ষা করে থাকা ভুলু চকিতে লেজ নাড়াতে নাড়াতে দৌড়ে আসে। একটু লাফিয়ে যুধিষ্ঠিরের হাতে ধরা বিস্কুট দুটো খপ করে মুখে নিয়ে চিবোতে থাকে ভুলু। মুখ থেকে মাটিতে ফেলে ছড়ায়-ছিটোয়। আবার মুখে নিয়ে চিবোয়। এবং তারপর তৃপ্তির সঙ্গে প্লাস্টিকের দুধের বাটিটায় জিভ ডুবিয়ে ডুবিয়ে চকচক শব্দে দুধ-মুড়িটুকু নিমেষে নিঃশেষ করে দেয়, খাওয়ার উত্তেজনায় প্লাস্টিকের বাটিটা কাত হয়ে উলটে পড়ে যায় আর কী।

তবে খাওয়া শেষ হয়ে গেলেও ভুলু কিন্তু কখনো চৌকাঠ ভিঙিয়ে ভুলেও যুধিষ্ঠিরের ঘরে ঢোকে না। বাইরে দাঁড়িয়ে কুঁইকুঁই শব্দে লেজটা নাড়াতে থাকে অনবরত। সেটার অর্থ কৃতজ্ঞতা হতে পারে, আবার হতে পারে আরো একটু প্রাপ্তির দাবি।

যুধিষ্ঠির অবশ্য এই সকালবেলাটায় ভুলুকে মোটেও আর পাত্তা দেয় না। এখন কাজে যাওয়ার বড় তাড়া। সময়মতো হাজিরা দেয় বলেই না সে নৃসিংহবাবুর অতো বিশ্বস্ত। বইয়ের দোকানে ভিড় থাকে সকালেই। দরজার তালা ঝুলিয়ে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে আসে যুধিষ্ঠির। ওকে পেছনে ফেলে তরতরিয়ে ভুলুও। নিচে অফিস ঘরে বসে পানুবাবু এ-সময়টা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দৈনিক কাগজটা পড়েন। ওঁর ঘরের সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় এই ধরনের একটা ডায়ালগ প্রায়ই শোনে যুধিষ্ঠির।

– বউ বলেছেন ধম্মপুত্তর যুধিষ্ঠির। মহাপেরেস্থানের পথে যাচ্ছেন যেন বাবু। শালা ওই কুকুরটার পাছায় এক লাথি মেরে বিদেয় করে দেব একদিন। বুধন জমাদার রোজ রোজ ওর গু-মুত পরিষ্কার করবে, আর তার দরুন পয়সা দেব আমি। শালা রে!

যুধিষ্ঠির বুঝতে পারে না মেস ম্যানেজারের কেন তাকে নিয়ে এতো সমস্যা। সে তাসের আড্ডায় থাকে না; রবিবারের ফিস্টে যোগ দেয় না বলে অন্য বোর্ডাররা তাকে দেখতে পারে না। তারাই মিথ্যে কথাটথা বলে পানুবাবুর কান ভাঙিয়েছে নিশ্চয়ই। সে তো কারো পাকা ধানে মই দেয় না, তবু এতো শত্রুতা কেন? মানুষজন যে কী জটিল।

ভুলুকেও সে নিজে নিয়ে আসেনি ডেকে। সে আগে থেকেই থাকত মেসের উঠোনে একতলায়। যুধিষ্ঠির তাকে ভালোবেসে একটু খাবার-টাবার দেয় বলে দোতলায় উঠে প্রভুভক্ত হয়ে পড়েছে। যুধিষ্ঠিরও আগে ওকে দূর-দূর করে তাড়িয়ে দিত, এখন কেমন মায়া পড়ে গেছে।

গলির মুখ পর্যন্ত পিছু পিছু আসে ভুলু একান্ত বশংবদের মতো। তারপর যুধিষ্ঠির রাস্তা পার হয়ে ওপারে গেলেই সে ফিরে যায় মেসবাড়ির দিকে। আবার আশ্চর্য, সন্ধেবেলায় ঠিক এসে গলির মুখে চুপ করে বসে থাকে যুধিষ্ঠিরের না-ফেরা পর্যন্ত। প্রতিদিন। ছুটির দিনটা বাদে। এতো যে টানে, তাকে ফেলে সরিয়ে দেওয়া যায়?

আগাগোড়া বাদামি গায়ের রং। শুধু গলার নিচের খানিকটা অংশ আর লেজটা পুরো সাদা। প্রথম প্রথম খাবার খেত খানিকটা, আর বাকিটা পড়ে থাকত যেটা সেটা খেতে হয়তো ভুলে যেত। তাই ওর নাম রাখল যুধিষ্ঠির আদর করে ভুলু।

– কী হে ভুলু দাস। নাম পছন্দ হয়েছে তো? জিজ্ঞেস করেছিল সস্নেহে যুধিষ্ঠির ভুলুকে।

উত্তরে মুখ তুলে খুব লেজ নেড়েছিল ভুলু। তারপর আহ্লাদে উঁচু হয়ে উঠে সামনের দুটো পা দিয়ে যুধিষ্ঠিরের কোমরে বেড় দিয়ে গদগদ হয়ে লেজ নেড়েছিল বেশ খানিকক্ষণ। অর্থাৎ পছন্দ হয়েছে।

গলির মুখ থেকে রাস্তা পার হলে ওপাশের যে দেশটা যে জগৎটা রোজ শুরু হয় সকাল নটা থেকে – সেখানে শুধু কাজ, শুধু ধড়ফড়, শুধু লেনদেন। শুধু হাড়ভাঙা পরিশ্রম। শুধু বিরক্তি আর টেনশন। আর আছে এ ওকে ল্যাং মারামারি। ওখানে ভালোবেসে কেউ লেজ নাড়ে না, কেউ অপেক্ষা করে থাকে না কারো জন্য।

ওখানে কখনো হুরপরীরা নামে না। আসে না ঘাই হরিণের দল। আকাশের তারা আর চাঁদ নিভে নিভে যায়। বাতাস থমকে থাকে। ওখানে ভুলু নেই। নেই আগুনরঙা বেনারসি গায়ে তার ছোট সেই একরত্তি বউ দেবী। যার সারা গায়ে গয়না। নাকে সোনার নাকফুল।

দেয়ালে ঘুণপোকা, পায়ের তলায় নেংটি ইঁদুর নৃসিংহবাবু একদিন খুব রাগমাগ করে দাঁত-মুখ খিঁচিয়ে বলেন, হ্যাঁ রে তোর কী হয়েছে রে যুধিষ্ঠির? কাজেকর্মে একদম মন নেই। ভাউচার আর ব্যাংকের অ্যাকাউন্টে গরমিল, কাগজের অর্ডার সময়মতো যায়নি বলে প্রফেসর শ্যাম হালদারের ‘জীববিজ্ঞান’ দ্বিতীয় সংস্করণ ছাপতে দিতে পারলুম না। অথচ প্রেস খালি পড়ে আছে। হয়েছেটা কী তোর?

যুধিষ্ঠির একটু বেজার মুখ করে বলে, আমায় এক সপ্তাহ ছুটি দিতেই হবে কত্তা। মন বড় উচাটন হয়ে রয়েছে।

নৃসিংহবাবু চোখ বড় বড় করে বলেন, ছুটি! এই তো বিয়ে করতে গিয়ে একবার ছুটি নিলি। আবার কিসের ছুটি! কাজকর্ম সামলাবে কে?
নৃসিংহবাবু এবার একটু যেন নরম হয়ে বলেন, সে তোকে বিশ্বেস করি বলেই তো। তোর ওপর সব দায়-দায়িত্ব দিয়ে নিশ্চিন্ত হওয়া যায়। তবে ছুটির কথা কী বলছিলি রে যুধিষ্ঠির?

– আজ্ঞে কর্তা, বিয়েতে তো দুদিনের বেশি ছুটি পাইনি। এবার দশ-পনেরো দিনের জন্য একবার যদি ছুটি মঞ্জুর করতেন তো সব ব্যবস্থা-ট্যবস্থা করে বউটাকে দেশ থেকে এনে একটা ভাড়া বাসায় তুলতুম।
– সে বেশ কথা। তবে তার জন্য দশ-পনেরো দিনের ছুটি কী হবে?
– ওই যে বললুম ঘরদোর দেখতে হবে। নতুন সংসার গোছগাছ করতে হবে। দেশে যাতায়াত আছেই, তারপর বউকে নিয়ে আসতে হবে।
– আচ্ছা সে না হয় হবেখন। বিক্রিবাটার সিজনটা শেষ হোক, তারপর। যা এখন মৃণালবাবুর জন্য পাঁচ-দশ কপি ‘উচ্চ মাধ্যমিক রসায়ন’ বের হবে আন দেখি, অধ্যাপক মানুষ, ওঁকে বসিয়ে রাখা উচিত হবে না। এই এক্ষুনি এসে পড়লেন বলে। যা ছুটির জন্যে ভাবিসনি, হয়ে যাবে।
বই আনতে যুধিষ্ঠির পেছনের দেয়ালের তাকগুলো ঘাঁটে। ঘুপচি অন্ধকার জায়গাটা। ঠান্ডা ঠান্ডা স্যাঁতসেঁতে ভাব। সিলিং থেকে টিমটিম করে কম পাওয়ারের একটা হলুদ বাতি ঝুলে আছে। দেয়াল নোনাধরা হলুদ। ঘুণপোকার দৌরাত্ম্য। মেঝেতে সারি সারি বইয়ের স্তর। আঠার গন্ধ আসছে। হাত দিয়ে বই সরাতেই একটা নেংটি ইঁদুর দৌড়ে পালিয়ে যায় তার পায়ের পাশ দিয়ে।

ওপাশে মৃণালবাবু তত্ত্বকথা বলছেন। রসায়ন শাস্ত্রের রূপ-বর্ণ-বৈচিত্র্যের মধ্যে খুঁজছেন জীবনদর্শন। শুনতে শুনতে যুধিষ্ঠিরের মনে হয়, সত্যি এমনসব মানুষ আছেন বলেই না পৃথিবীটা এখনো মানুষের বাসযোগ্য।

নৃসিংহবাবু ছুটি মঞ্জুর করেছেন বলে যে কী আনন্দ হচ্ছে যুধিষ্ঠিরের তা মুখে বোঝানো যাবে না। দেবীকে নিয়ে এসে তুলবে সে ঝামাপুকুর লেনের নতুন বাসায়। ঘরখানা খালি আছে এখনো।

একটা রোগাপাতলা মেয়ে, মুখে খুব রং মাখা, চুলে বাঁধা লাল রিবনের ফিতে। ঝামাপুকুর লেনের থেকে একটু দূরে আর একটা অন্ধকার গলির মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকে রোজ। চোখাচোখি হলে হাসে। ইশারা করে এমনভাবে যে, সেটা বুঝতে ভুল হয় না যুধিষ্ঠিরের। তখন তার প্রিয় প্রাণাধিক প্রিয়তমা বউ দেবীর মুখটা মনে করে নিজেকে সংবরণ করে নেয় সে। দেবীর স্বামী সে, কোনো পাপ কাজ, কোনো অন্যায় ব্যাপার সে করতে পারে না। করবেও না। ভালোবাসার কাছে সব প্রলোভন সব ছলনা ম্লান হয়ে যায়। তাই সে দেবী দেবী করে মনে মনে বিড়বিড় করতে করতে রাস্তাটা পেরোয়। তারপর কী ভেবে ঘাড় ঘুরিয়ে একবার তাকায় রোজ। অতল জলের আহবান কী বস্ত্ত, তার মর্ম কী তা যুধিষ্ঠির জানে না। মেয়েটা খিলখিল করে হাসে। হেসে ওঠে। বেকুব যুধিষ্ঠির উলটোবাঁকে পথ হাঁটা দেয়।

পৃথিবীর সব রং নিভে গেলে

প্রায় সন্ধের মুখে কাঞ্চনপুরে পৌঁছয় যুধিষ্ঠির। স্টেশনে নেমে একটা রিকশা ধরে তাঁতিপাড়ার দিকে এগোয় সে। প্রায় তিন মাস পরে দেবীর সঙ্গে দেখা হবে। ভাবতে উত্তেজনায় বুকে যেন ঢেঁকির পাড় পড়ছে। খবর না দিয়ে আসা। দেবী এখন হয়তো গা ধুয়ে পাটভাঙা একখানা ধনেখালি শাড়ি পরে জানালার ধারে বসে ভাবছে তার কথা। দেখা হলে কী দিয়ে কথা শুরু করবে ভেবে ঠিক করতে পারছে না যুধিষ্ঠির।

নৃসিংহবাবু আসলে মানুষটা খুব খারাপ নন। সঙ্গে বেশ মোটা অঙ্কের কিছু টাকা দিয়ে বলেছেন, রেখে দে এটা। কাজে লাগবে নতুন সংসার পাততে। হিসেব দিতে হবে না।

চোখে জল এসে গিয়েছিল যুধিষ্ঠিরের। মানুষের ভালোমন্দ বিচার বড় সহজ কাজ নয় হে।
যুধিষ্ঠির নৃসিংহবাবুর পায়ের ওপর উপুড় হয়ে কেঁদে পড়েছিল। হুজুর মা বাপ। ক্ষমা করে দেবেন এই অধমকে।
মনে আজ খুব আনন্দ। ট্রেনে জানালার ধারে বসে যুধিষ্ঠির দেখছিল চারপাশে কত ফুলের ওড়াউড়ি, শুনেছিল কত মৌমাছির গুনগুন, আকাশ পৃথিবীর রং বদলে গিয়েছিল যেন। মন উঠছিল নেচে।

কিন্তু বাড়ি ঢুকতেই যেন মাথায় বজ্রপাত হলো যুধিষ্ঠিরের। দেবী নাকি আজ দিন পনেরো হলো শ্বশুরবাড়ি ছেড়ে চলে গিয়েছে। পিসির সঙ্গে ধুন্ধুমার বেধেছিল একদিন।

– কেন বাধবে না? পিসি গজগজ করতে করতে বলে, তোর বিছানায় মুকুন্দ নাপিতকে নিয়ে শুয়েছিল একদিন ভরদুপুরবেলায়। যেই হাতেনাতে ধরেছি অমনি কী চোপা! অমনি কী দাঁতের বাদ্যি!
– তারপর পিসি?
– তারপর আর শুনে কী করবি! ওই বদমাস বউয়ের পায়ে ধরে সেধে বাড়ি নিয়ে আসবি বুঝি? আমি বেঁচে থাকতে সেটি হচ্ছে না। আমি আবার তোর বিয়ে দেব, পাপ বিদেয় হয়েছে, আর নয়।

পাড়া-প্রতিবেশীদেরও সেই একমত। ও-মেয়ে ঘরে না তোলাই ভালো। হাড় ভাজাভাজা করে দেবে সকলের। পঞ্চায়েত প্রধানও সে বিধান দিলেন। দুষ্টু গরুর চেয়ে শূন্য গোয়াল ভালো রে যুধিষ্ঠির –
সে কলকাতায় এসে কেঁদে পড়েছিল নৃসিংহবাবুর কাছে। তিনি সান্ত্বনা দিয়েছিলেন, বুঝিয়েছিলেন। বকেওছিলেন একটু। ওঁর গুরুদেব বলেছিলেন নাকি, যুধিষ্ঠিরের শনি তুঙ্গি, তোলা বক্রী, গোমেদ কিংবা পোখরাজে সব বাধামোচন হয়ে যাবে। ইত্যাদি ইত্যাদি।
মেসের তার ঘরে একজন নতুন রুমমেট এসেছে। অল্পবয়সী কলেজে-পড়া ছোকরা। রোগাভোগা, থুঁতনিতে দাড়ি। কণ্ঠার হাড় উঁচু।
যুধিষ্ঠিরকে সে পাত্তা দেয় না। সেটা অবশ্য ভালো। যুধিষ্ঠির এখন একাই থাকতে চায়। কারো সঙ্গে কথা বলার মতো মনমেজাজ নেই আর।
ভুলু এসে আগেকার মতো দরজার কাছে আদরের কুঁইকুঁই শব্দ করে। সামনে দুটো পা ছড়িয়ে পাহারা দেওয়ার মতো ভঙ্গিতে শরীরটা মাটিতে রেখে বসে থাকে চৌকাঠের কাছে। তার রোজকার বরাদ্দ দুধ-মুড়ি আর বিস্কুট দিতে অবশ্য যুধিষ্ঠিরের ভুল হয় না।
দুধ-মুড়ি খেয়ে খুব আনন্দে লাফায় ভুলু। গলায় গরগর শব্দ করে। তার এই আদিখ্যেতা এখন যুধিষ্ঠিরের ভালো লাগে না।
সে তাড়া দেয়, যা দেখি ভুলু। এখন দেয়ালা করিস না। মনমেজাজ ভালো নেই আমার, যা –
যুধিষ্ঠিরের এহেন আচরণ ভুলুর কাছে অপ্রত্যাশিত। একটু থমকে গিয়ে তাই সে যুধিষ্ঠিরের পায়ে মুখ ঘষে। রাবারের চটির ফাঁক-ফোকর দিয়ে যুধিষ্ঠিরের পা-টা চেটে দেয়। যুধিষ্ঠিরকে খুশি করার জন্য ব্যাকুল হয়ে ওঠে ভুলু।
যুধিষ্ঠিরের মনটা যেন একটু তরল হয় এখন। এই কুকুরটা তাকে ছেড়ে যাবে না। নিত্যসকালে পেছন পেছন গলির মুখ পর্যন্ত গিয়ে পৌঁছে দিয়ে আসবে। ছলছল করবে চোখ দুটো। সন্ধেবেলা অপেক্ষা করে বসে থাকবে রোজ তার ফেরার জন্য। রোজ। এ-ই তার পৃথিবীতে আপনজন। এ-ই তার চিরসাথি।


পাতাল প্রবেশের আয়োজন
মনের অস্থিরতা নিয়ে কাজে মন বসানো ভারি কঠিন। তবু বসাতে হয়, কাজ করতে হয় সব ভুলে। রাতে ঘুম আসে না। তবু ঘুমাতে হয়। দাঁতে কাটতে হয় খাবার। তবে দেবীর জন্য মন খারাপ করে থাকা যে বোকামি সেটা ধীরে ধীরে সে বুঝতে পারছে।
দিনের বেলায় ঘুণধরা দেয়ালের পাশে বসে, বইয়ের আঠা আঠা গন্ধের ঘ্রাণ, আর পায়ের ওপর দিয়ে হেঁটে যাওয়া নেংটি ইঁদুর দেখতে দেখতে সময় ফুরোয় যুধিষ্ঠিরের। কাজের পাহাড় অবশ করে দেয় তার শরীর ও মন। আর ফেরার পথে সেই রংমাখা মেয়েমানুষটা তাকে দেখে মুখ টিপে হাসে। তাকিয়ে থাকে। যুধিষ্ঠরও হাসে। তাকায়। এই হাসি। এই তাকিয়ে থাকার মধ্যে ছিটেফোঁটা ভালোবাসাও হয়তো নেই, কিন্তু আছে অগাধ পাপ।
রাতটা রোজ বড় দিল্লাগি করে যুধিষ্ঠিরকে নিয়ে। ঘুম আসে না। ঘুমোতে দেয় না শরীরের জ্বালা।
পাশের খাটে ঘুমিয়ে আছে কলেজের সেই ছোকরা। সুদর্শন, চোখ দুটো বেশ বড় বড়। একজন সঙ্গী, একটু শরীরের স্পর্শের জন্য লালায়িত হয়ে থাকে মন। তারপর সেই তাড়নায় একদিন তাই গভীর রাতে মশারি সরিয়ে খাট থেকে নেমে আসে যুধিষ্ঠির। তারপর মশারি তুলে ছেলেটার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। হতচকিত ছেলেটি কিছু বোঝবার আগেই চুম্বনে ভরে তোলে ওর ওষ্ঠ আর অধর। এবার একটা ধাক্কা দিয়ে যুধিষ্ঠিরকে খাট থেকে সজোরে মাটিতে ফেলে দেয় ছেলেটি।
দাঁতে দাঁত চেপে বলে, শালা স্কাউন্ড্রেল। কাল সকালেই মেস ম্যানেজারকে রিপোর্ট করে দেব। বিয়ে করিসনি শালা? ঘরে বউ নেই?
রিপোর্ট করা হোক না হোক, কথাটা কিন্তু মেসে চাউর হয়ে যায়। তাসের আড্ডায় রসালো মন্তব্য শোনা যায়। শোনা যায় মেস ম্যানেজারের টীকা-টিপ্পনী।
যুধিষ্ঠিরের পিঠ এখন দেয়ালে গিয়ে ঠেকেছে।
সন্ধেবেলায় টিউবলাইটের আলোয় দাঁড়িয়ে রোজকার মতো মেয়েটা আজও ডাকে। ওর খুব কাছে ঘেঁষলে সস্তা পারফিউমের গন্ধ নাকে আসে।
তোর নাম কী? একা একা এখানে দাঁড়িয়ে থাকিস যে রোজ বড়?
শরীর দুলিয়ে হাসে মেয়েটি খুব। তারপর হাসি থামিয়ে বলে, তোমার জন্য গো, চলো না কোথাও একটু বসি। আমার নাম বিউটি। চলো না –
যুধিষ্ঠির গম্ভীরভাবে বলে, না ওসব একটু-আধটু নয়। থাকবি আমার সঙ্গে সর্বক্ষণ? সোয়ামির মতো দেখবি আমাকে?
বিউটি নামের মেয়েটা বলে, কেন তোমার কেউ নাই? সর্বক্ষণ রাখবে? আমার খরচ জোগাতে পারবে? আই অ্যাম কস্টলি।
– ও বাবা, ইংরেজিও জানিস দেখছি যে।
– জানব না কেন? মাধ্যমিক পরীক্ষা দিয়ে তবে না লাইন ধরেছি। কী ভেবেছিলে আমাকে, বেওয়ারিশ মাল?
ওর হাসির মধ্যে চুম্বক। ওর শরীর থেকে ছড়াচ্ছে বিদ্যুৎ। ওর ছলাকলা নেশা ধরিয়ে দেয়।
বিউটি নামের এই মেয়েটা আর কিছু না দিতে পারুক, সব তো দিতে পারবে। দেবীকে ভুলিয়ে দিতে তো পারবে। বুকের ক্ষতটা লুকিয়ে দিতে পারবে, পারবে হয়তো এক অতল শূন্যতার গহবরকে আবার ভরাট করে দিতে।
এই বোধ জাগে মনের মধ্যে। এইভাবেই মন্দ টানে ভালোকে। ইচ্ছে হারিয়ে দেয় যুক্তিতর্ককে। অন্ধকার গ্রাস করে নেয় আলোর বর্ণচ্ছটাকে।
নৃসিংহবাবু আগে কিছু টাকা দিয়েছিলেন। চাইতে আবারও দিলেন। যুধিষ্ঠির সত্যবাদী নয়। সে দেবীর ফিরে আসা নিয়ে একটা বানানো কাহিনি ফেদে বসেছিল নৃসিংহবাবুর কাছে। আর সেটা বিশ্বাস করে নৃসিংহবাবু গলেও গেলেন। অনর্থক প্রশ্ন করে সত্যটা যাচাই করলেন না। দেবী যে কলকাতার কথা শুনে আসবার জন্য রাজি হয়েছে আবার, সেটাই ভালো মনে নিলেন কর্তাবাবু, শুধু জিজ্ঞেস করছিলেন, সব যাচাই করে দেখে নিয়েছিস তো রে? যা করছিস, সঠিক হলেই হলো, বুঝলি? সঠিক কী বেঠিক তা জানে না যুধিষ্ঠির। একটা মেয়েমানুষের জন্য জোয়ান মরদ মানুষের বুকের ভেতরে সর্বদা রক্তক্ষরণ হয়। কেউ একজন তাই এলেই হলো, সে পারবে মলম লাগিয়ে দিতে ব্যথার জায়গায়। দেবীর জায়গাটা হয়তো বা এখন দখল করে নিয়েছে বিউটি বলে এই মেয়েটি। তো সে-ই না হয় আসুক।
অফিস থেকে বেরিয়ে সে একদিন একা একা গঙ্গার ধারে এসে বসল। হাওড়া ব্রিজের ওপর চলন্ত আলোর মালা। নিচে জলরাশি। আর তার মনে নানান ভাবনার বুদ্বুদ। কাজটা ঠিক হচ্ছে না – এ বিচার করতে মন এখন চাইছে না, ইচ্ছের জোয়ারে বিচারবুদ্ধি সব ভেসে গিয়েছে তার। ইচ্ছে থেকে উঠে আসছে একটা বড় রকমের দুঃসাহস। ওই গঙ্গার ওপরে আলোর মালা, মোটর লঞ্চ, ঝলমলে হাওড়া ব্রিজ, জনস্রোত – ওসব থেকে দূরে এক অন্ধকার জীবন এখন তাকে প্রবলভাবে টানছে। আরো টাকার যদি দরকার হয় অভাব হবে না। নৃসিংহবাবুর সই করা ব্ল্যাঙ্ক চেকগুলো যুধিষ্ঠিরের জিম্মায় থাকে, সর্বদা হিসাবও চান না।
তার মন ভেঙে গেছে। শরীর নয়, প্রতিবন্ধী তার মন। আর তার এই ভাঙা মন জোড়া দিতে স্বর্গের অপ্সরা নয়, পাতাল কন্যা বিউটি উঠে এসেছে বিষের পাত্র হাতে।

মহাপ্রস্থানের সঙ্গী
তাকে দেখলেই আজকাল কলেজের সেই ছোকরা রুমমেটটি ঘৃণায় মুখ ফিরিয়ে নেয়। শুধু সে কেন, গোটা মেসবাড়িটাই যেন একঘরে করে রেখেছে তাকে। দেবী চলে গেছে তাকে ছেড়ে। সরে গেছে রুমমেটটি অন্য আরেকটা ঘরে। মেস ম্যানেজার পানুবাবুও কথা বলে না। এরপর বিশ্বাসভঙ্গের দায়ে একদিন নৃসিংহবাবুও ভবিষ্যতে নিশ্চিত যুধিষ্ঠিরকে দূর-দূর করে হটিয়ে দেবেন। আর জানে যুধিষ্ঠির যে, বর্তমানের খেলা ফুরোলে বিউটিও একদিন নতুন দোসর খুঁজে নেবে তারপর চলে যাবে তাকে ছেড়ে।
তখন শুধু একা একা এই ভুলুকে নিয়ে পথ হাঁটতে হবে। সর্বনাশের পথ ধরে বিসর্জনের দিকে। নিঃশেষ হয়ে যাবার পথে।
– কী রে ভুলু, তুই থাকবি তো আমার সঙ্গে?
দুধ-পাউরুটি একটু বেশি করেই মেখে দেয় ভুলুকে যুধিষ্ঠির। কৃতজ্ঞতায় আর খুশিতে তার বাটি ধরা হাতটা চেটে দেয় একটু ভুলু। লাফায় আনন্দে।
মেস ম্যানেজার পানুবাবুকে সব হিসাব বুঝিয়ে দেয় যুধিষ্ঠির। যাওয়ার সময় মনে হয়, পানু হালদারেরও চোখের কোণে জল চিকচিক করছে। আসলে চলে যাওয়ার সময় কেউ পুরনো কথা আর মনে রাখে না। মানুষ যে পুরোপুরি খারাপ নয়, সেটা মনে করে বুকটা টনটন করে ওঠে যুধিষ্ঠিরেরও।
হাতে একটা পুরনো সুটকেস। কাঁধে একটা কিটস ব্যাগ। কথা নেই মুখে কারো। সবাই দেখছে চোরাচোখে তাকে। আজ রবিবার ছুটির দিন। সবাই মেসে।
সিঁড়ি দিয়ে লাফাতে লাফাতে নেমে এসেছে ভুলু। যুধিষ্ঠির ধরা গলায় বলে, চল রে ভুলু। বেলা হয়ে এলো অনেক। চল – আজ রবিবার মেসে ফিস্ট হবে, তাস খেলা হবে। দুপুরে সবাই মজা করে চৌকিতে শুয়ে দেবে লম্বা একটা ভাতঘুম। স্বাভাবিক এই জীবনযাত্রার সে আর কেউ নয়। সে এখন মরণ ঝাঁপ দেওয়ার জন্য প্রস্ত্তত।

মেসবাড়ির দরজা পেরিয়ে যুধিষ্ঠির বাইরের গলিতে পা রাখে। পেছনে পেছনে বশংবদ চিরসাথি ভুলু। গলির মোড়ে এসে একটা রিকশার জন্য এপাশ-ওপাশ তাকায় যুধিষ্ঠির। ভুলুকে নিয়ে তো আর ট্রামে-বাসে ওঠা যাবে না। ওকে থামতে দেখে ভুলুও থেমে মুখ তুলে ওর দিকে তাকায়।
– কী রে বেটা, পুরনো আস্তানা ছেড়ে যেতে কষ্ট হচ্ছে তো? হবেই, আমারও কি হচ্ছে না? কী করব বল, আমি যে নিরুপায়।
ভুলু কী বোঝে কে জানে। সে তার লম্বা লাল টুকটুকে চিকন জিভখানা দাঁতের ওপর দিয়ে সামনে অনেকটা ঝুলিয়ে মুখ হাঁ করে হাঁফায়। তার বেশ উত্তেজনা হয়েছে মনে হচ্ছে।
– ওই একটা রিকশা আসছে। আয় আমার সঙ্গে।
যুধিষ্ঠির দ্রুতপদে রিকশাটার দিকে এগিয়ে যায়। পেছনে পেছনে ভুলুও। রিকশা থামিয়ে যুধিষ্ঠির তাতে উঠে বসে। তারপর হাত বাড়িয়ে সস্নেহে ডাকে, আয় – আয় রে ভুলু। উঠে পড় দেখি চটপট। দেরি করিস না – আয় – এইবার দুমিনিট মুখ তুলে অপলকে যুধিষ্ঠিরের দিকে চেয়ে থাকে ভুলু। তখন যুধিষ্ঠিরের মনে পড়ে যায়, এই মাত্র কয়েকমাস আগে দেশে যাবার দিনটায় গলির মুখে এইখানটায় দাঁড়িয়ে ভুলুর চোখ দুটো ছলছল করে উঠেছিল। কণ্ঠ থেকে বেরিয়ে এসেছিল অব্যক্ত গোঙানির মতো একটা আওয়াজ। কিন্তু আজ সে নীরব। ওর চোখ দুটো শুষ্ক। ভাবলেশহীন।
যুধিষ্ঠিরের ওই ভাবনার মধ্যেই হঠাৎই আচমকা ভুলু একটা রাগের ঘেউ ঘেউ শব্দ তুলে পেছন ফিরে দৌড় মারে মেসবাড়ির দিকে। তারপর নিমেষের মধ্যে নির্জন সুনসান গলিটা বেয়ে সে একেবারেই অদৃশ্য হয়ে যায় মেসবাড়ির অভ্যন্তরে। সেদিকে মিনিটখানেক সতৃষ্ণ নয়নে চেয়ে অপেক্ষা করে যুধিষ্ঠির। ওই বুঝি ফিরে এলো। ওই বুঝি। কিন্তু ভুলু আর ফিরে আসে না। অতএব একা একাই রিকশা নিয়ে এগিয়ে যায় যুধিষ্ঠির। তার যাত্রাপথে। ঝামাপুকুর লেনের সেই রঙিন মেয়েমানুষটির জন্য।

শেয়ার করুন

Leave a Reply