একটি প্রদর্শনী সম্পর্কিত কিছু বাস্তবতা

লেখক:

জাফরিন গুলশান

বাংলাদেশের সমসাময়িক শিল্পচর্চার ধারাবাহিকতায় নানা দিক থেকে বেশ গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রদর্শনী শিল্পকলা একাডেমিতে হয়ে গেল। সম্ভবত সর্বশেষ ১৯৮২ সালের পর ২০১৪-তে জাতীয় ভাস্কর্য-প্রদর্শনী আয়োজিত হলো গত ১১ থেকে ২০ মে পর্যন্ত। প্রায় দুই দশকে আর কোনো ভাস্কর্য-প্রদর্শনী জাতীয়ভাবে আয়োজিত হয়নি। এত বছর পর এ-উদ্যোগ গ্রহণ করা হলো – এ-বিষয়ে সকলের জিজ্ঞাসা জাগা খুব স্বাভাবিক। ক্যাটালগে শিল্পকলার আয়োজকদের কেউ এ-প্রসঙ্গে কোনো বাণী দেননি। কিংবা শিল্প-সমালোচক জাহিদ মুস্তাফাও এ-বিষয়ে প্রদর্শনী নিয়ে তাঁর নিবন্ধে কিছু লিখেননি। তিনি অবশ্য আমাদের দেশের ভাস্কর্যচর্চার ধারাবাহিকতাকে সংক্ষেপে তুলে ধরেছেন।

প্রদর্শনীতে অধিক অংশ নিয়েছেন মূলত নবীন প্রজন্মের শিল্পীরা। অধিকাংশই প্রাতিষ্ঠানিকভাবে ভাস্কর্যের ওপর লেখাপড়া করেছেন বা করছেন। আবার চারুকলার বিভিন্ন মাধ্যমে নিয়মিত কাজ করেন এমন শিল্পীরাও ভাস্কর্য করেছেন। সুতরাং এ-প্রদর্শনীটি ভাস্কর্যবিষয়ক প্রদর্শনী, যেখানে সব শিল্পীই চাইলে অংশগ্রহণ করতে পারছেন। ফলে সমন্বিতভাবে বিষয়গত, আঙ্গিকগত, কৌশলগত স্থানে নানামুখী চর্চার প্রবণতা উপস্থিত। বর্তমান প্রদর্শনীকে বুঝতে হলে মাথায় রাখতে হবে এ-অঞ্চলের বহুপ্রাচীন ভাস্কর্যচর্চার ইতিহাস এবং নানা পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে বর্তমান বিশ্বায়ন ও পুঁজিবাদী সমাজব্যবস্থায় বাংলাদেশের অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সামাজিক সম্পর্কায়ন ও এর গতিপ্রকৃতি। আমাদের এ-অঞ্চলের ইতিহাস মানে হিন্দু, বৌদ্ধ ও সনাতন ধর্মনির্ভর শাসনব্যবস্থার অধীনে গড়ে ওঠা সংস্কৃতি এবং পরবর্তীকালে মুসলিম শাসন। ধর্মনির্ভর সংস্কৃতিতে টেরাকোটা ও ভাস্কর্যের প্রচলন থাকায় পুরো ভারতবর্ষে এর উৎকর্ষ ঘটে এবং এর প্রভাব এ-অঞ্চলেও পড়ে। ভারতের পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশ মিলে এক বিশাল এলাকা বাংলা অঞ্চল। এ-অঞ্চল দিয়ে তৎকালীন সময়ে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার উপকূলীয় অঞ্চলের সঙ্গে বাণিজ্য গঠনের ক্ষেত্রে এবং কুমিল্লা, চট্টগ্রাম থেকে দক্ষিণ সাগরের দিকে বৌদ্ধ ও ব্রাহ্মণ্য ধর্মের পরিব্যাপ্তির কেন্দ্র হিসেবে প্রমাণ মেলে। আবার উত্তরবঙ্গে বৌদ্ধধর্মের প্রসারকে হিমালয়ের দিকে প্রচারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ছিল। মহাস্থানগড়, পাহাড়পুর, ময়নামতি প্রভৃতি বৌদ্ধবিহার প্রমাণ হিসেবে রয়ে গেছে। খ্রিষ্টপূর্ব তৃতীয় শতকে মৌর্য যুগ এবং পরবর্তী শুঙ্গা, কুশান, গুপ্ত, পাল ও সেন যুগে বাংলায় প্রচুর টেরাকোটা ও ভাস্কর্যের নিদর্শন মিলেছে। মুসলিম যুগে অর্থাৎ দ্বাদশ শতকে বখতিয়ার খিলজির বঙ্গ বিজয়ের পর ভাস্কর্যচর্চা সীমিত হয়ে এলেও টেরাকোটা মাধ্যমে কাজ হতো। এভাবে শাসক শ্রেণির ধর্মবিশ্বাস বর্তমান সময়ের মতো আগেও শিল্পচর্চার গতিবিধিকে সবসময় নিয়ন্ত্রণ করেছে। গৌতম বুদ্ধ, বিভিন্ন দেবদেবী, সম্রাটের যুদ্ধবিজয়ের গল্পই মূলত বিষয় হিসেবে ঘুরেফিরে এসেছে। এর সঙ্গেই উন্মোচিত হয়েছে সাধারণ লোকসংস্কৃতির কিয়দংশ।

শিল্পকলা একাডেমীতে ছিয়াত্তরজন শিল্পীর অংশগ্রহণে জাতীয় ভাস্কর্য প্রদর্শনীর শিল্পকর্মগুলোর জন্ম ও বেড়ে-ওঠা বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় চেতনার বুনিয়াদি উত্তরের সঙ্গে সম্পর্কিত। অধিকাংশ শিল্পীরই রয়েছে অ্যাকাডেমিক শিক্ষার অভিজ্ঞতা। এদেশের যেসব শিল্পশিক্ষা প্রতিষ্ঠান রয়েছে, প্রায় সবকটিরই সিলেবাস একই রকম। বর্তমান সময়ে ইন্টারনেটের ব্যবহার বিশ্বের শিল্পচর্চার রুচিবোধের সঙ্গে আমাদের শিল্পীদের পরিচয় ঘটাচ্ছে এবং বাংলাদেশ সাংবিধানিকভাবে গণপ্রজাতন্ত্রী হলেও সংখ্যাগরিষ্ঠের ধর্ম ইসলাম। বখতিয়ার খিলজির সময়ের মতোই ভাস্কর্যচর্চার স্বাধীনতা ক্ষুণ্ণ হচ্ছে এখনো। এই শর্ত অবশ্য চিত্রকলার বা অন্যান্য শিল্পমাধ্যমের জন্যও কার্যকর সত্য। কিন্তু ভাস্কর্য শিল্প নয়, এখনো মূর্তিনির্মাণ হিসেবেই বহুল প্রচলিত। ফলে দেখা যাচ্ছে, ভাস্কর্য মাধ্যম হিসেবে সরকারি ও বেসরকারি কিংবা সামাজিকভাবে বেশ কোণঠাসা হয়ে থাকে এবং কোনো ধরনের সহযোগিতাও পাচ্ছেন না শিল্পীরা। এ-কারণে চিত্রকলাচর্চা যতটা নানাবিধ পরীক্ষার ভেতর দিয়ে বিকশিত হচ্ছে, ভাস্কর্য ততটাই পিছিয়ে রয়েছে। ভাস্কর্য নির্মাণের ব্যয়বহুল দিকটিও এর সঙ্গে জড়িত। ব্যয় বেশি হওয়ায় এর মূল্য বেশি এবং অনেক ক্ষেত্রেই শিল্পরসিক ক্রেতারা এ-ব্যাপারে অনুৎসাহী হন। এ-ধরনের সংকটে নিমজ্জিত শিল্পমাধ্যমের শিল্পীদের প্রয়োজন সরকারি-বেসরকারি ও ব্যক্তিপর্যায়ের পৃষ্ঠপোষকতা। এদেশে যেসব ভাস্কর্য দেখা যায়, সেগুলো পৃষ্ঠপোষকতার অধীনেই নির্মিত। জয়দেবপুর চৌরাস্তায় আব্দুর রাজ্জাকের ‘জাগ্রত চৌরঙ্গী’, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলাভবনে সৈয়দ আবদুল্লাহ খালিদের ‘অপরাজেয় বাংলা’, সিলেট ক্যান্টনমেন্টে হামিদুজ্জামানের ‘হামলা’, নিতুন কুন্ডের ‘সাবাস বাংলাদেশ’, শামীম সিকদারের ‘স্বোপার্জিত স্বাধীনতা’ প্রভৃতি ভাস্কর্য মুক্তিযুদ্ধের চেতনাভিত্তিক। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা মানেই যেন মুক্তিযুদ্ধের চেতনাই একমাত্র বিষয়। এক্ষেত্রে নভেরা আহমেদের কাজগুলো (যেগুলো জাতীয় জাদুঘরের সামনের বাগানে সংরক্ষিত) গুরুত্বপূর্ণ। উল্লেখযোগ্য যে, নভেরার এ-কাজগুলো ব্যক্তিগত খরচে নির্মিত। শিল্পকলার প্রদর্শনীটি তাই নানাদিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য হওয়া উচিত। প্রচুর সংগ্রাম ও পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে এদেশের শিল্পীরা বর্তমানে অনেক আধুনিক ভাস্কর্য করছেন। প্রদর্শনীতে সমাজের বিভিন্ন অসংগতিকে সমালোচনা করে যেমন কাজ করেছেন শিল্পীরা, তেমনি বর্ণনামূলক কিংবা পদ্যধর্মী কাজও বিদ্যমান। লক্ষণীয় বিষয় হলো, অনেক প্রবীণ ও পথপ্রদর্শক ভাস্করই অংশগ্রহণ করেননি। যেমন – হামিদুজ্জামান খান, লালারুখ সেলিম, অলক রায়, আইভি জামান, তৌফিকুর রহমান প্রমুখ। স্বনামধন্য এসব গুরুত্বপূর্ণ শিল্পীর অনুপস্থিতির কারণ শিল্পীমহলের প্রায় সবারই জিজ্ঞাস্য। তরুণদের উপস্থিতি প্রশংসনীয়। কিন্তু সবার অংশগ্রহণ নিশ্চিত না করার দায়দায়িত্ব শিল্পকলার, নাকি অন্য কোনো ভিন্ন সুর বেজেছে ইতোমধ্যে?

নানা সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও ভাস্কর্যের জাতীয় পর্যায়ের প্রদর্শনীর এ-উদ্যোগে অংশগ্রহণকারী শিল্পীরা আনন্দিত। প্রতিবছর আয়োজন করার আশ্বাস দিয়েছেন শিল্পকলার মহাপরিচালক। হ্যাঁ, প্রতিবছর আয়োজন করলে দর্শকের মধ্যে, সমাজের অভ্যন্তরে এর গ্রহণযোগ্যতা বাড়বে। ভাস্কর্য মাধ্যম হিসেবে এতটাই শক্তিশালী যে, সমাজের শুভ প্রবৃত্তিগুলোকে অধিকতর প্রগতিশীলতার দিকে ধাবিত করতে শক্তিশালী হাতিয়ার হিসেবে কাজ করবে।

শেয়ার করুন

Leave a Reply