একটি মেয়ে

লেখক:

আফসার আমেদ

॥ ২৪ ॥

কালং-এ বাসটি ঠিকঠাক নামিয়ে দিলো। এবার তমোঘœর বাসস্থান খুঁজতে হবে। সামনেই ছিল একটা পান-গুটকার দোকান। সে দোকানের পাটায় স্থানীয় এক মাঝবয়সী মহিলা বসেছিলেন। রাস্তাটা উঁচুতে, বাড়ি-ঘরদোর অনেকটা নিচু পর্যন্ত। তারপর নদী। বস্তির মতো চেহারা। হয়তো এটাকে গ্রাম বলে। মহিলার কাছে এগিয়ে যায় সেঁজুতি।
‘তমোঘœ কোথায় থাকে বলতে পারেন?’
মহিলা বাংলা বোঝেন, বললেন, ‘কে? ও-নামে কেউ তো থাকে না এ-মহল্লায়।’
‘মাস্টার। এখানের স্কুলে পড়ায়।’
‘কতদিন এসেছে?’
‘আড়াই বছর।’
‘বাচ্চা আছে?’
‘না। বাংলা পড়ায়।’
‘মণ্ডল মাস্টার নয় তো?’
‘হ্যাঁ, তমোঘœ মণ্ডল।’
‘ওই তো বাঁকের মুখে, বাঁহাতি বাড়ি, ওখানে থাকে। – এই সাথি, যা তো মণ্ডল স্যারের ডেরাটা দেখিয়ে দিতে।’
সোয়েটার পরা রুক্ষ শুষ্ক চেহারার এক বালিকা বেরিয়ে এলো, ‘চল, এই তো কাছে।’ সঙ্গে করে নিয়ে যেতে লাগল সাথি। ঠিকঠাক দরজার সামনে বালিকাটি পৌঁছে দিয়ে ছুটে গেল বালিকাটি।
দরজায় কড়া নাড়তে কিছুক্ষণ পরে দরজায় তমোঘœর মুখ। ‘আরে, কে?’
‘বিশ্বাস হচ্ছে না দেখছি।’
ভেতরে আলমকে নিয়ে ঢুকে যায়।   ডাইনিংয়ে সোফা ছিল, তাতে বসে পড়ে সেঁজুতি।
‘আরে তুমি তো জানিয়ে আসবে। অ্যাটলিস্ট বেরোনোর সময় একটা ফোন।’
‘তোমাকে মোবাইলে ধরা যায় না।’
‘সিম চেঞ্জ হয়েছে।’
‘তাহলে? তুমি তো আমার নম্বর জানতে।’
‘এখানে নেটওয়ার্ক থাকেই না।’
‘এ হচ্ছে আলম, আমার ভাইয়ের মতো। একা আসতে সাহস পেলাম না, তাই একে সঙ্গে করে এসেছি।’
‘কিন্তু আজকেই, আজকে আমার ভীষণ কাজ।’
‘আমি এসেছি, তোমার কাজ থাকতেই পারে না।’
‘আজ এখানে লেপচাদের বড়ো উৎসব, সন্ধ্যায়। এখন বিকেল চারটে। একটু পরেই বেরিয়ে যেতাম। আমাকে পেতে না।’
‘পেয়েছি তো, এবার ঘাড় থেকে নামাও দেখি। তুমি কি এই ঘরে একা থাকো?’
‘না।’
আরেকজন মাস্টার?’
‘না।’
‘আমরা কষ্ট করে না-হয় থেকে যাব, আরেকজন থাকলে ক্ষতি কী?’
‘না, আমরা কেউই আজ রাতে থাকব না। দূরের গ্রামে চলে যাব।’
‘সেটা কোথায়?’
‘বিন্দুর কাছে। আগে তোমাদের চা বানিয়ে দিই। নোরবু চলে গেছে, আমার এক্ষুনি চলে যাওয়ার কথা।’
‘তোমার যাওয়া হবে না।’
‘উপায় নেই।’
রান্নাঘরে গিয়ে গ্যাসের উনুনে চা বানাতে থাকে তমোঘœ।
সেঁজুতি কাছে যায়। ‘তোমাকে যেতেই হবে?’
‘যেতেই হবে।’
‘আমি তো তোর কাছে এসেছি।’
‘কালকে তো আমি থাকব।’
‘আমার হাতে সময় নেই।’
‘যেতেই হবে।’
‘কথা ছিল তোমার সঙ্গে। তোমাকে ফিরিয়ে নিতে এসেছি।’
‘আমি তো আর ফিরব না জীবনে।’
‘এখানেই থেকে যাবে?’
‘সেটাই আমার ইচ্ছা। নোরবুকে পেয়েছি।’
‘তোমরা কি গে-কাপল?’
‘আরে না না, নোরবু তো লেপচা মেয়ে, আমার বউ। ওকে তিন মাস হলো বিয়ে করেছি।’
‘মানে? তুমি মিথ্যে কথা বলছ।’ চায়ের গ্লাস নিয়ে সোফায় বসে পড়ে সেঁজুতি। তারপর উঠে দাঁড়িয়ে একটি ঘরে যায়, দেখতে থাকে ঘরের ভেতরের দাম্পত্য যাপনের চিহ্ন। এক মহিলার সঙ্গেই বসবাস করে তমোঘœ এ-ঘরে। চায়ের গ্লাস নিয়ে পিছু এসে দাঁড়ায় সেঁজুতির পাশে তমোঘœ।
সেঁজুতি বলল, ‘বা বেশ, ভালোই তো।’ তারপর বিছানায় বসে পড়ল।
তমোঘœ বলল, ‘আমি কাউকে জানাতে চাইনি, তুমি এলে, জানলে। আমি এভাবে থাকলে সুখে থাকব।’
হাততালি দেয় সেঁজুতি। ‘বেশ, বেশ। তা নোরবু মেয়েটি এখানের কোনো বস্তির মেয়ে?’
‘একটা গ্রামেই তার ঘরবাড়ি আত্মীয়-পরিজন। খুব মিষ্টি স্বভাবের মেয়ে। গ্র্যাজুয়েশন করেছে। ওদের সমাজে আলোকপ্রাপ্তা। লেপচা জনজাতির সমাজ-সংস্কৃতি নিয়ে কাজ করছে। আমি আকৃষ্ট হয়ে তার সঙ্গে কাজে যোগ দিই। লেপচা লোক-কবিতা, গান, প্রবাদ-প্রবচন, গল্প সংগ্রহ করা হয়ে গেছে। বই হিসেবে বেরোবে শিগগির। আমরা দুজনে এখন লেপচা ভাষার একটা অভিধান রচনা করার কাজে ব্যস্ত। কোনোদিকে তাকাবার সময় নেই। তোমার কথা আমার মনে থাকে; কিন্তু আমার ফিরে তাকাবার ফুরসত নেই।’
সেঁজুতির বলতে ইচ্ছে করল, ‘কুত্তা’। কিন্তু বলতে পারল না। ‘চলো, আমাদের বাসে তুলে দাও, ফিরে যাই।’
‘বাস কোথায়? সেই ছটায় লাস্ট বাস চলে গেছে। এ কি যাদবপুর গড়িয়া সিঁথি শ্যামবাজার? দিশি মুরগির মাংস পাঠিয়ে দিচ্ছি, রান্না করে দুজনে খেও। ভুটানি রাম আছে এক বোতল, সদ্ব্যবহার করতে পারো। আমরা সকালেই ফিরে আসব।’
‘তুমি ভালো থাকবে?’
‘খুব ভালো।’
‘কলকাতায় কোনোদিন ফিরবে না?’
‘না।’
‘আমাকে দেখতে চাইবে না?’
‘তুমি এলে দেখা হবে।’
‘তুমি এভাবে হারিয়ে গেলে?’
‘হারিয়ে যাব কেন?’
‘তুমি নোরবুকে কোনো একদিন ডিভোর্স করবে হয়তো। এ তোমার ক্ষণিকের মোহ হয়তো।’
‘দেখো, এই জনজাতির সরলতা-সততাকে আমি ভালোবাসি। হিংসাও নেই। ডিভোর্স হয় না এ-সমাজে। সে-সমাজে আমি মিশে যেতে চাই। তাদের মধ্যে কাজ করি। এখানেই আমার মুক্তি খুঁজে নিয়েছি। সিএসসি-এসএসসির ইঁদুরদৌড়, গডফাদারদের গুডবুকে আমার চেষ্টা করে যাওয়া Ñ ওসব নোংরা অভিজ্ঞতা আর পুঁজি করতে চাই না। আমরা দুজনেই প্রাইভেট স্কুলে পড়াই, একসঙ্গে থাকি আর কাজ করি।’
‘তুমি পারবে, এভাবে থেকে যেতে?’
‘খুব পারব।’
‘তোমার মা-বাবা, বাড়ির লোকজন?’
‘ওদেরও তেমন বলেছি। মাকে খুব মিস করি। মাও আমাকে Ñ’
‘জীবনে তোমার সঙ্গে পরিচয় হওয়া এক অভিশাপ।’
‘নিজেকে এভাবে ছোটো করো না।’
‘জীবন খরচ করে তুমি মহত্ত কিনে যাও। পণ্ডিত, বিশেষজ্ঞ হতে থাকো। আমার সেসবের কিছু প্রয়োজন ছিল না। শুধু তোমাকে পেতে চেয়েছিলাম।’
‘প্লিজ, আমি খুব অসহায় সেঁজুতি। তুমি না-হয় আমার বন্ধু হয়েই থাকলে।’
‘বন্ধু হওয়ার যোগ্যতা তুমি হারিয়েছ।’
‘তুমি আমাকে যা খুশি বলো।’
‘মেয়েটি তোমার মাথা খেয়েছে।’
‘ও তেমন নয়। খুব ভালো মেয়ে।’
তোতলাতে থাকে সেঁজুতি। কোনো কথা বলতে পারে না। বিছানার চাদর আঁকড়ে ধরে। তারপর একটা সিগারেট ধরায়। তমোঘœ যাওয়ার জন্য পোশাক বদলায়। ধীরে ধীরে শ্বাস ফেলে। তমোঘœকে শূন্য করার জন্য ভাবনা আনে, কোনোদিন কোনোভাবে তারা ঘনিষ্ঠ হয়নি। একটু স্বস্তি পেতে চায়, নিশ্চিন্ত হতে চায়। তার জন্য এই অন্তর্ঘাত লুকিয়েছিল আগে থেকে বুঝতে পারেনি। তৈরি ছিল না সে। অনেক আশা-উৎসাহ নিয়ে এসেছিল তমোঘœর কাছে। এখন সেসব চুরমার হয়ে গেছে। এখন তমোঘœর মুখোশ পড়ে আছে, মুখ সরিয়ে নিয়েছে।
জীবনে আর কাউকে কোনোদিন ভালোবাসবে না। বিয়েও করবে না। একা একা কাটাবে। প্রহরদের মতো বন্ধুদের সমাগমে থাকবে, কাটাবে। রবি ব্যানার্জি আরো ভালো বন্ধু হবে। পথশিশুরা আরো প্রিয় হয়ে উঠবে। আলমকে আরো কৃপাপ্রার্থী করে তুলবে।
নিষ্ঠুরের মতো তমোঘ্ন বেরিয়ে গেল।
তমোঘœর যাওয়ার পর থেকে জোর বৃষ্টি শুরু হলো। পাহাড়ের বৃষ্টির শব্দ জোর হয়। কাঠের বাড়ি, অ্যাসবেশটরের ছাদ। বেশ শব্দ বাজে। যেহেতু পাথরের বুকে বৃষ্টির কণা নেমে এসে আঘাত করে, তাই ধাতব শব্দ তোলে। চারপাশে বড়ো বড়ো গাছ, পাহাড়জুড়ে চারপাশে বুনোলতা পাতা ঝোপঝাড়। অদ্ভুত মিষ্টি বুনো গন্ধ। ঠাকুমার পান-খাওয়া মুখের গন্ধের মতো। পাশেই পাহাড়ি নদী, খরস্রোতা। ওপারে পাহাড়, জঙ্গল। নদীতে একটা কাঠের সেতু দেখা যাচ্ছে।
যে মুরগির মাংস দিতে এলো, তার কাছ থেকে  জানতে পারল, নদীর ওপারটা ভুটান। সে-লোকটা আবার সেঁজুতির সিগারেট কিনে দিয়ে গেল। ফেরানো টাকা নিতে গিয়ে দেখল দু-একটা ভুটানি টাকা। জানা গেল, এখানে ভারতীয় টাকা ও ভুটানি টাকা মিলেমিশে একাকার। দুটোই চলে। এপারের মানুষ ওপার থেকে দিব্যি শুকনো কাঠ কুড়িয়ে আনে। ওখানের মানুষ এখানে এসে কেনাকাটা করে যায়। ভুটানি রাম তো এখানে জনপ্রিয়। নাকি খুবই ভালো স্বাদ। দামেও শস্তা।
সন্ধ্যা নামল। একটু তাড়াতাড়িই সন্ধ্যা নামল। জানালায় অঝোর ধারার বৃষ্টি। ঠান্ডাও ভালো।
আলম রান্না করছে।
সেঁজুতি বিছানায় বসে পায়ের ওপর কম্বল-চাপা দিয়ে সিগারেট খায়। মদ খাবে কিনা ভাবে।
আলম চা বানাল। তো চা-ই খায় সে।
অনেকক্ষণ দুঃখযাপন অর্থাৎ শোকযাপন করার পর সেঁজুতি নিজেকে গুছিয়ে নিতে থাকে দ্রুত। সে ভোগ ছাড়বে কেন? আলম মাংস বানাচ্ছে, তার গন্ধ পায়। গেলাসে রাম ঢেলে নিয়ে এসে বিছানায় বসে। ধীরে ধীরে চুমুক দেয়। বেশ ভালো স্বাদ।
আলম বুঝতে পেরেছে, এসে বলল, ‘তোমাকে কি একটু মাংস কষা দেব।’
‘দে, তবে নরম দেখে।’
আলম একটা ছোটো প্লেটে একটু মাংস এনে দেয়।
‘আরে, তুই খাবি না?’
‘পরে।’
‘মাংস বলছি না, রাম?’
‘ও আমি খাই না।’
‘কেন?’
‘গন্দা।’
‘তো আমিও গন্দা তাহলে?’
‘তুমি কেন, ওটা গন্দা।’
‘ভোগের জিনিসে তোর এতো আপত্তি কেন, তুই তো আমার হাতে খুন হয়ে যেতে পারিস।’
‘আমার হাতে ও-লোকটা খুন হতো।’
‘কোন লোকটা।’
‘যার কাছে তুমি এসেছ। তোমার লাভার।’
‘ও মা, তুই চটছিস কেন? এ তো আমার ব্যক্তিগত ম্যাটার?’
‘তুমি আমার কেউ নও?’
‘এই রে, নেশা হয়ে যাচ্ছে। তোর যা বলার আছে বলে যা।’
আলম ফিরে যায় রান্নাঘরে।
আরো মদ ঢালে সেঁজুতি। টুক টুক করে খায়। মাংসটা ভালোই করেছে আলম। চাপাটিও বানাবে। সে কিছু করবে না। আজ সব দায়িত্ব আলমের। পাহাড়ের ঘরটা খুবই উপভোগ্য। চারপাশে এই পাহাড়ি বন্য পরিবেশ চমৎকার। এখন নদীটার বহে যাওয়ার শব্দ পাওয়া যায়। কাছাকাছি কোথাও ঝরনা নেমে যাওয়ার শব্দ বাজে। প্রকৃতির নানা শব্দে মাতাল করে তোলার মতো পরিবেশ।
আলম আরো একটু মাংস দিয়ে যায়। আরো একটু মদ ঢেলে নিয়ে বিছানায় বসে সেঁজুতি। খেতে খেতে সেটুকুও শেষ হয়ে যায়। আবার মদ নিতে ওঠে সেঁজুতি।
আলম এসে বলল, ‘আর একটুও নেবে না তুমি।’
‘তুই না নিতে বলার কে রে?’
‘মাতাল হয়ে পড়বে।’
‘মাতাল হতেই চাই।’
‘রোটি খাবে কখন?’
‘আগে বোতলটা শেষ করি। তুই যদি আমার লাভার হতিস, কী যে ভালো হতো, যা বলতাম, তা-ই শুনতিস।’
‘বকবাস বন্ধ্ কিজিয়ে।’
‘লজ্জা পেলি?’
‘খানা লাগাব, খাবে?’
‘না। আরো মদ খাব।’
‘আমি পাশের ঘরে চলে যাচ্ছি, শুয়ে পড়ব।’
‘আয়, কাছে এসে বোস।’
আলম কথা শোনে না। কিন্তু স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। সেঁজুতি বুঝতে পারে তার চোখ বন্ধ হয়ে আসছে, জোর করে তাকাতেও পারে না। যা কিছু দেখে সব আবছা। মনের চোখে যাসব দেখে, সেসব বানানো। আলমকে কামনা করছে, আলম তার নাগালের মধ্যে চলে আসছে; কিন্তু বুঝতে পারে, সেসব তার কল্পনা, বিভ্রম। সে বিছানায় মদের গ্লাস উলটে দিয়ে শুয়ে পড়ছে, ঘুমিয়ে পড়ছে। প্রায় এক লিটার মদের অর্ধেকের বেশি খেয়ে ফেলেছে। মনের খুব ত্রাসে কাটাচ্ছিল। আরাম পেয়েছে। আলমকে তার খুব কাছের মনে হয়েছিল। কল্পনার আলমের কাছে তার ক্ষণিক পদস্খলন হয়েছিল, বাস্তবে আলম সৎ এবং ভীরুও। সে পাশের ঘরে চলে গেছে। হয়তো একা একা রুটি-মাংস খেয়েছে। সেঁজুতি বিছানায় শুয়ে একা একা শুধু কেঁদেছে, হয়তো ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে, হয়তো মদের নেশায়।
দূরে কোথায় ড্রিম ড্রিম ঢোলকের শব্দ, বাঁশির সুর। লেপচা জনজাতির আজ উৎসব। দেবতা দেবুর কাছে তারা তাদের নিবেদন উৎসর্গ করছে। সারারাত তারা আনন্দে ভরে উঠবে। ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে সেই আনন্দে তমোঘœর সঙ্গে মাতাল হয় সেঁজুতি। কী অসহ্য উন্মাদনা। কী ধারালো বাঁশির শব্দ। পাথর বেজে উঠছে পায়ের তালে। সেও চি খেয়ে মাতাল হচ্ছে। তমোঘœ তাদেরই লোক, তাকে ফিরিয়ে আনা যাবে না।
অনেকক্ষণ আলমের বুকের কাছে শুয়েছিল সেঁজুতি। এখন খুব ভোরে ঘুম ভেঙে যেতে দেখে বিছানায় আলম নেই। মাথা ভরি হয়ে আছে, ঝিমঝিম করছে আর ঘুরছে। বিছানায় উঠে বসে। দেখে যে ঘরটায় আলম শুয়েছিল সেই বিছানায় এখন ছিল সে। মনে পড়ছে এক সময় আলমের বিছানায় এসে শুয়েছিল। বুঝতে পারছে আলম সরে গিয়েছিল তার আগে শোয়া বিছানায়। আলম নিজেকে রক্ষা করেছে। কিন্তু সেজুঁতির এখন খুব বিষাদ আসে, বেদনা হয়। যেন সেসব হারিয়ে ফেলেছে, জীবনের কিছুই তার আর অবশিষ্ট নেই। তমোঘœ নামটাই এখন তার কাছে বিভীষিকা। মাথা টলছে। এখনো ভালো করে হাঁটতে পারছে না। পা টলছে, সারা শরীর টলমল করছে। কোনোমতে ধরে ধরে বাথরুমে গেল। ডাইনিংয়ে ফিরে এসে একটা সিগারেট ধরাল। দেওয়ালঘড়িতে তখন ভোর চারটে পাঁচ।
বাইরে চোখ গেল। জানালার কাচের ভেতর থেকে একটা পাহাড় ফুটে উঠল অনেক গাছপালা শোভিত হয়ে। আর চারপাশে øিগ্ধ আলোময়তা। যেন ছবির দৃশ্য। বাইরেটা তাকে খুব আকর্ষণ করল। ধীরে ধীরে খিল খুলে বাইরে বেরিয়ে এলো। সেই বন্য গন্ধ আতত করছে আর কত রকমের পাখির ডাক। কান ঝালপালা করে দিচ্ছে।
বড়ো পাখির চেয়ে ছোটো পাখি বেশি। অচেনা অদ্ভুত সব ডাক। আকাশে মেঘ আছে। কিন্তু বৃষ্টি হচ্ছে না। নদী বয়ে যাচ্ছে শব্দ করে।
প্রায় টলতে টলতেই হাঁটতে লাগল সে। আর এই অমলিন প্রকৃতির ভেতর নিজেকে তুচ্ছ মনে হলো। কত ক্ষুদ্র ও হীন সে। স্বার্থরক্ষার জন্য সে কত মগ্ন ও উৎসাহী। তার নিজের কোনো উদারতা নেই, ব্যাপ্তি নেই, সৌন্দর্য নেই। নিজের জন্য মনস্তাপ হতে লাগল। বেঁচে থাকার প্রাণতা হারিয়ে ফেলতে লাগল। এই তুচ্ছ জীবন রেখে লাভ কী? ওই যে কাঠের সেতুটা আছে খরদ্রোতা নদীর ওপর, ওর মাঝখানে গিয়ে নিচে টুপ করে পড়ে যাওয়া যেতেই পারে। তুচ্ছ মানুষ এই বিশালতার সৌন্দর্যে হারিয়ে যাক না। বেঁচে থাকার শক্তিই সে হারিয়েছে। ভালো করে হাঁটতেই সে পারে না। মাথা টলছে। বৃষ্টিও ক্ষয়াটে।
ধীরে ধীরে সেতুর দিকে হাঁটতে লাগল। রাস্তায় লোকজনের খুব একটা যাতায়াত নেই। পিছু ফিরে দেখছে না সে, তার পিছে কেউ আসছে কি-না। সে চলেছে স্থির লক্ষ্যে সেতুটার দিকে। এখানে ছোটো ছোটো পাখি রাস্তার ধারে পায়ের কাছে কিচির-মিচির করে। নানা স্বরে ও সুরে ডাকে। আকাশ আরো আলোয় ভরে উঠছে।
সেতুটার নাগাল পায় সেঁজুতি। খুবই আটপৌরে দেশজ সেতু। এখানকার কাঠকুটো দড়িদড়া দিয়ে তৈরি। ক্যাঁচ-ক্যাঁচ শব্দ ওঠে আর দোলে। সবটাই খোলা আর বিপজ্জনক। লক্ষ্য, সেতুটার মাঝখানে যাওয়া। যেখানে নদীটার মাঝখান পাওয়া যাবে। টলছে সে। সেতু ভাঙতে কষ্ট হচ্ছে। শরীরজুড়ে অক্ষমতা। তবু সে সেতু ভাঙে। এগিয়ে যায় মাঝখানের দিকে।
মাঝখানে যেতেই নিচের দিকে ঝোঁকে। সিদ্ধান্ত নিয়েই ফেলেছিল, ঝাঁপ দেবে। তার আগে আলম তাকে ধরে ফেলে।
‘কী করছ কী, চলো চলো। মদ খেলে কেন?’
‘আমাকে পড়ে যেতে দিলি না কেন তুই?’
‘চলো, আমি তোমাকে হাত ধরে নিয়ে যাচ্ছি।’
‘তুই আমার কে রে?’
‘কেউ নই।’
‘বলছিস যখন চল। আরো মদ আছে, খাব।’
‘চলো আগে ঘর।’
‘ওটা তো আমার ঘর নয়। নোরবু লেপচারা থাকে। আর কে যেন ওর সঙ্গে থাকে? ও তমোঘœ লেপচা।’ বলে হো-হো করে হাসে সেঁজুতি।
আলমের কাঁধে ভর দিয়ে ফিরতে থাকে।
বুঝতে পারে, তার এখনো মাতালদশা যায়নি। আলমকে তার খুব মিষ্টি লাগে এখন।
একজন পকেটমার তাকে মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচাল। না-হয় বেঁচেই থাকল।
ঘরে নিয়ে গিয়ে তাকে বিছানায় উঠে বসায় আলম। শুইয়ে দিতে চায়। অমনি আলমের গলা জড়িয়ে আলমের গালে একটা চটাস করে চুমু খেয়ে নেয়। ‘তুই খুব ভালো রে! যা এবার আমাকে একটু ঘুমোতে দে।’
‘একটু পরে কিন্তু আমরা ফিরে যাব।’
‘কোথায়?’
‘কলকাতা।’
‘হ্যাঁ, ঠিক বলেছিস।’ দুম করে ঘুমিয়ে পড়ে সেঁজুতি। তার সব দুর্ভাবনা ধুয়েমুছে ফেলেছে। তমোঘœকে ভালোবেসে ত্যাগ করা উচিত হবে তার।  (চলবে)

শেয়ার করুন

Leave a Reply