কথাসাহিত্যের শিল্পশৈলী : অ্যালিস মুনরোর সঙ্গে কথোপকথন

লেখক: ভাষান্তর : হোসেন আলমগীর

ভাষান্তর : হোসেন আলমগীর

 

কানাডার কথাসাহিত্যিক অ্যালিস মুনরো ২০১৩ সালে নোবেল পুরস্কার অর্জন করেন।তিনি মূলত ছোটগল্পকার।ছোটগল্প রচনায় অসাধারণ নৈপুণ্য তাঁকে এ-সম্মান এনে দিয়েছে।অবশ্য এর আগেও মুনরোর সাহিত্যকর্মের স্বীকৃতি এসেছে; নিজ দেশে তিনি তিনবার ‘Governor General Award’ লাভ করেছেন এবং ২০০৩ সালে তিনি Away From Her গল্পগ্রন্থের জন্য অর্জন করেছেন ‘Man Booker International Prize’।তাঁর ছোটগল্প The New Yorker, The Paris Review এবং The Atlantic Monthly-সহ অনেক গুরুত্বপূর্ণ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে।মুনরোর গল্পের প্রেক্ষাপট জুড়ে আছে অন্টারিওর একটি ছোট মফস্বল শহর ‘Huron County’, যেখানে তিনি তাঁর জীবনের বেশির ভাগ সময় কাটিয়েছেন।অনেক সমালোচক মুনরোর লেখনীকে স্মৃতিচারণের সঙ্গে তুলনা করছেন, কেননা তাঁর গল্পের বিষয়বস্তুতে প্রাধান্য পেয়েছে মুনরোর ব্যক্তিজীবনের নানাবিধ অভিজ্ঞতা।তিনি মূলত ১৯৫০ সাল থেকে ছোটগল্প রচনায় ব্যাপৃত এবং তাঁর প্রথম গল্প ছাপা হয় কলেজ শিক্ষার্থীদের সাহিত্যপত্রিকা Fliio-তে, শিরোনাম ছিল ‘The Dimension of Shadow’।

 

১৯৯৪ সালে তিনি জ্য ম্যাকক্যলকে প্যারিস রিভিউ পত্রিকার জন্য একটি সাক্ষাৎকার দিয়েছিলেন।উল্লেখ্য, প্যারিস রিভিউ পত্রিকার সাক্ষাৎকারগুলো একটি বিশেষ চরিত্র বহন করে; এখানে সাহিত্যিকরা তাঁদের রচনারীতি, অভ্যাস, সময়সূচি, লেখালেখির মূলমন্ত্র, দুর্বলতা, ব্যর্থতা এবং লেখালেখির সংকট ও উত্তরণের পন্থা নিয়ে খোলাখুলি আলাপ-আলোচনা করে থাকেন।মুনরোর এ-সাক্ষাৎকারে তার প্রমাণ মেলে।কেননা, এখানে উঠে এসেছে মুনরোর ব্যক্তিজীবন, পরিবার, সংসার, বিবাহ, প্রেম, প্রাত্যহিক সময়সূচি, লেখা নিয়ে সংকট এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে তাঁর শঙ্কা ইত্যাদি প্রসঙ্গ।

 

সাহিত্য রচনায় সাফল্য অর্জনের জন্য তিনি কয়েকটি সরল সত্য প্রকাশ করেছেন, যেমন : কেউ যদি প্রচণ্ড পরিশ্রম করে তাহলে সে সফল হতে পারবে।আরো কিছু অকপট সত্য তিনি স্বীকার করেছেন, যা আমরা সচরাচর এত বড়মাপের লেখকের কাছ থেকে শুনি না।যেমন – তিনি সবসময় সাহিত্য পরিমণ্ডল এড়িয়ে চলতেন এবং কারণটা ছিল ‘ভয়’।মুনরো স্বীকার করেছেন যে, অন্যান্য লেখকের কথাবার্তা এবং আলোচনা শুনে যদিও তাঁর মনে হতো যে, তারা তাঁর চেয়ে বেশি জানে কিংবা তাঁর চেয়ে দক্ষ, তাহলে সেটা তাঁকে মানসিকভাবে দুর্বল করে দিতে পারত।আরো একটি ব্যাপার নিয়ে তাঁর আতঙ্ক; বার্ধক্য।বার্ধক্য চলে এলে তখন তাঁর কী হবে, কিংবা লেখালেখির ক্ষমতা হারিয়ে ফেললে তাঁর কী করার থাকবে?  আদ্যন্ত তাঁর সাক্ষাৎকারটি পড়লে মনে হবে কোনো এক অনভিজ্ঞ সাহিত্যিকের মতামত শুনছি, জ্য ম্যাকক্যলকের কাছেও ব্যাপারটি সেরকমই মনে হয়েছে।পাঠকরা, বিশেষত তরুণ কথাসাহিত্যিকরা এ-কথোপকথন থেকে প্রেরণা পাবেন এমন প্রত্যাশায়।

– লেখক

 

নিউইয়র্ক সিটি থেকে অন্টারিওর ক্লিনটনে কোনো সরাসরি উড়োজাহাজ নেই, তিন হাজার বাসিন্দার একটি কানাডীয় শহর ক্লিনটন, যেখানে অ্যালিস মুনরো বছরের বেশির ভাগ সময় থাকেন।জুনের খুব সকালে, টরন্টোতে একটি গাড়ি ভাড়া করে, আমরা লাগার্দিয়া ছেড়ে তিন ঘণ্টার পথ পেরিয়ে এলাম, রাস্তা ক্রমশ সরু হয়ে অনেকটা গ্রামীণ রূপ নিচ্ছিল।সাঁঝের কাছাকাছি আমরা মুনরো যে-বাড়িতে তাঁর দ্বিতীয় স্বামী গ্যারি ফ্রেমলিনকে নিয়ে থাকেন তার কাছে থামলাম।বাড়িটার পেছনে একটি টানা উঠোন এবং একটি অগোছালো ফুলবাগিচা, এটাই হচ্ছে সেই বাড়ি, মুনরো খুলে বলেছিলেন, যেখানে গ্যারি জন্মেছিল।রান্নাঘরে তিনি সুবাসিত লতাপাতা দিয়ে একটি সাদামাটা পদ রাঁধছিলেন।খাবার ঘরের চাতাল থেকে মাচা পর্যন্ত বইয়ের সারি; একপাশে ছোট টেবিলের ওপর একটি সেকেলে টাইপরাইটার।মুনরো এখানেই কাজ করেন।

 

কিছুক্ষণ বাদে, তিনি আমাদের নিয়ে গেলেন একটি বড় শহর এবং প্রশাসনিক কেন্দ্র গদেরিচে, সেখানে আমাদের রাখলেন আদালত ভবন থেকে চত্বর বরাবর বেডফোর্ড হোটেলে।উনিশ শতকের একটি দালান, কামরাগুলো আরামদায়ক (দুটি বিছানা, কোনো শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা নেই)।দেখলে মনে হবে যেন মুনরোর একটি গল্পের গ্রন্থাগারিক কিংবা ইশকুলের কোনো পণ্ডিত থাকেন।পরের তিনদিন আমরা তাঁর বাড়িতে কথাবার্তা বলেছি – তবে কোনো টেপরেকর্ডার চালু না করেই।তাঁর সাক্ষাৎকারটি নিয়েছিলাম আমাদের হোটেলের ছোট কক্ষে, যেহেতু তিনি চেয়েছিলেন ‘ব্যাপারটা বাড়ির বাইরে থাকুক’।মুনরো এবং তাঁর স্বামী দুজনেই বেড়ে উঠেছেন এখন যেখানে থাকেন সেখান থেকে কুড়ি মাইলের আওতায়; এখানের প্রায় প্রতিটি দালানকোঠার ইতিহাস তাঁদের জানা, যেগুলো আমরা পেরিয়ে এসেছি, যেগুলোর তারিফ করেছি, কিংবা যেগুলোর ভেতরে আমরা খাওয়া-দাওয়া করেছি।জিজ্ঞেস করলাম আশপাশের সাহিত্য পরিমণ্ডলটা কেমন পাওয়া যাবে। ‘যদিও গদেরিচে একটি গ্রন্থাগার আছে’, আমাদের বলা হলো, ‘কাছাকাছি বইয়ের দোকান হলো স্ট্রাফোর্ডে, প্রায় ত্রিশ মাইল দূরে।’এখানে আর কোনো স্থানীয় লেখক আছেন কিনা যখন জানতে চাইলাম, তিনি আমাদের একটি জরাজীর্ণ বাড়ির পাশ কাটিয়ে নিয়ে গেলেন, পেছনের বারান্দায় একটি লোক উদোম গায়ে বসে একটা টাইপরাইটারে নুয়ে আছেন, তাঁর চারপাশে বিড়াল। ‘প্রতিদিন তিনি ওখানটায় এসে বসেন’, মুনরো বললেন, ‘রোদ হোক আর বৃষ্টি হোক।আমি ওনাকে চিনি না, তবে আমার সাংঘাতিক জানার আগ্রহ, তিনি কী লিখছেন।’

 

কানাডায় আমাদের শেষ সকালটিতে, পথঘাটের নির্দেশনা নিয়ে, আমরা সেই বাড়িটা খুঁজে বের করলাম, যেখানে মুনরো বড় হয়েছিলেন।বাড়িটা বানিয়েছিলেন তাঁর বাবা এবং সেখানে উদ পালন করতেন।অনেকগুলো কানাগলির পর, আমরা বাড়িটা খুঁজে পেলাম – গাঁয়ের পথের একেবারে শেষপ্রান্তে – একটা সুন্দর ছিমছাম ইটের বাড়ি, খোলা প্রান্তরমুখী, যেখানে একটি উড়োজাহাজ থেমে আছে, মনে হয় যেন সাময়িক অবতরণ করেছে।আমাদের অবস্থান থেকে বাতাসের মোহনীয় আমেজ সহজেই টের পাওয়া যাচ্ছিল।এক বৈমানিক গাঁয়ের বধূকে নিয়ে যাচ্ছিল, যেমনটি আছে, ‘White Dump’ গল্পে, কিংবা ‘How I Met My Husband’ গল্পের তরুণ, aviation stuntsman (যারা উড়োজাহাজের কসরত দেখায়) যে কিনা, এরকম একটি মাঠেই অবতরণ করেছিল।

যেমন বাড়িটি, যেমন অন্টারিওর দিগন্ত, যা আমেরিকার Midwest-এর অনুরূপ, মুনরো তেমন ভাবগম্ভীর নন, তিনি মার্জিত, যথেষ্ট রসিক।ছোটগল্পের সাতটি গ্রন্থেরলেখিকা, সঙ্গে আছে প্রকাশিতব্য Open Secrets এবং একটি উপন্যাস Lives of Girls and Women।অর্জন করেছেন গভর্নর জেনারেল পুরস্কার (কানাডার সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ সাহিত্য পুরস্কার) এবং নিয়মিত ছাপা হচ্ছে Best American Short Stories-এ (রিচার্ড ফোর্ড মুনরোর দুটি গল্প অন্তর্ভুক্ত করেছেন তাঁর সম্পাদিত খণ্ডে) এবং  Prize Stories : The O. Henry Awards; দি নিউইয়র্কার পত্রিকার নিয়মিত লেখিকা তো বটেই।এসব উল্লেখযোগ্য অর্জনসত্ত্বেও তিনি এখনো লেখালেখি সম্পর্কে কথা বলেন, গভীর শ্রদ্ধা আর অনিশ্চয়তার সঙ্গে, যা শোনা যাবে শিক্ষানবিশদের কাছে।তাঁর মধ্যে বিখ্যাত লেখকদের কোনো উচ্ছ্বাস, নৈপুণ্য বা হাঁকডাক নেই, তিনি যে কেউএকজন – সেটা সহজেই ভুলে যাওয়া যায়।

 

নিজের রচনা সম্পর্কে বলতে, তিনি যা সৃজন করেন তা যে খুব সহজ তা তাঁর মনে হয় না।তবে সম্ভব, যেন কেউ এটা করতে পারবে যদি যথেষ্ট খাটাখাটুনি করে।আমরা যখন ফিরে আসি তখন আমাদের মধ্যে সেই সম্ভাব্যতার সংক্রমণ ঘটছে মালুম হলো।মনে হবে সাদামাটা – কিন্তু তাঁর লেখায় আছে যথাযথ সারল্য, যা মকশো করতে বছরের পর বছর লেগে যাবে এবং দরকার হবে প্রচুর খসড়ার।সিনথিয়া ওজিক যেমন বলেছেন, ‘আমাদের চেখভ এবং তাঁর সমসাময়িকদের বেশির ভাগের তুলনায় তিনি অনেকদিন টিকে থাকবেন।’

 

-জ্য ম্যাকক্যলক, মোনাসিম্পসন, ১৯৯৪।

 

জ্য ম্যাকক্যলক : আপনি যে-বাড়িতে বড় হয়েছিলেন, আজ সকালে আমরা সে-বাড়িতে গিয়েছিলাম।আপনি কি আপনার পুরো শৈশবটা ওখানে কাটিয়েছেন?

 

মুনরো : হ্যাঁ, যখন বাবা মারা যান, তিনি তখনো ওই খামারবাড়িতেই থাকতেন, ওটা ছিল একটা শিয়াল আর উদ পালনের খামার।যদিও বাড়িটা অনেক বদলেছে।এখন ওটা বিউটি পার্লার, নাম Total Indulgence।আমার মনে হয় ওরা পার্লারটা করেছে পেছনের দিকটায়, আর রান্নাঘরটা পুরোপুরি ভেঙে ফেলেছে।

 

জ্য ম্যাকক্যলক : তারপর কি আপনি কখনো ভেতরে গেছেন?

 

মুনরো : না, যাইনি, যদি যেতাম তাহলে বৈঠকখানাটা দেখতে চাইতাম, সেখানে বাবার বানানো একটা ফায়ারপ্লেস ছিল, সেটা দেখতাম।মাঝেমধ্যে ভাবতাম, যাই, গিয়ে একটু ম্যানিকিউর করাই।

 

জ্য ম্যাকক্যলক : রাস্তার ওধারের মাঠে আমরা একটা উড়োজাহাজ দেখলাম, মনে পড়ল ‘White Dump’ এবং ‘How I Met My Husband’ গল্পের কথা।

 

মুনরো : হ্যাঁ, কিছুকালের জন্য ওটা একটা এয়ারপোর্ট ছিল।ওই খামারের যিনি মালিক তাঁর উড়োজাহাজ চালানোর শখ ছিল, এবং তাঁর নিজের একটা ছোট উড়োজাহাজ ছিল।তিনি কখনোই ক্ষেতখামারি পছন্দ করতেন না।ফলে ওসব ছেড়েছুড়ে উড়োজাহাজ চালানোর প্রশিক্ষক হলেন।এখনো বহাল তবিয়তে আছেন, এবং আমার এ-যাবৎ দেখা সুপুরুষদের অন্যতম।সম্ভবত অবসর গ্রহণের তিন মাসের মতো হবে, তিনি ভ্রমণে গিয়ে কিছুটা অস্বাভাবিক রোগে আক্রান্তহন, যা গুহায় থাকা বাদুড়ের মাধ্যমে হয়ে থাকে।

 

জ্য ম্যাকক্যলক : আপনার প্রথম বই Dance of the Happy Shades-র গল্পগুলোয় ওই এলাকার ছাপ লক্ষ করা যায়, আপনার শৈশবের জগৎ।আপনার জীবনের কোন সময়টায়এইগল্পগুলো লেখা?

 

মুনরো : এগুলো লেখার সময়ের ব্যাপ্তি পনেরো বছর। ‘The Day of Butterfly’ ছিল একেবারে গোড়ার দিকের।সম্ভবত লেখা হয়েছিল যখন আমার বয়স একুশ।খুব ভালোভাবে স্মরণকরতেপারি ‘Thanks for the Ride’ লেখার কথা, কেননা আমার প্রথম সন্তান আমার পাশে ওর ছোট শয্যায় শুয়ে থাকত।তখন আমি ছিলাম বাইশ বছরের।বেশ পরের দিকের গল্পগুলো লেখা হয়েছিল যখন আমার বয়স ত্রিশের কোঠায়। ‘Dance of the Happy Shades’ হলো একটি; আরেকটি ছিল ‘The Peace of Utrecht’। ‘Image’ হচ্ছে একদম সম্প্রতি। ‘Walker Brothers Cowboy’-ও লেখা হয়েছিল আমার ত্রিশের পরে।ফলে রচনার ব্যাপ্তিটা বেশ ছড়ানো।

 

জ্য ম্যাকক্যলক : ওই গল্পগুলো এখন আপনাকে কীভাবে আকর্ষণ করে? আপনি কি ওগুলো আবার পড়েন?

 

মুনরো : ওই সংকলনের শুরুর দিকের একটি গল্প, নাম ‘The Shinning House’ আমাকে টরন্টোর হার্বর ফ্রন্টে দু-তিন বছর আগে পড়তে হয়েছিল Tamarack Review-র ইতিহাস উদযাপনের একটি বিশেষ অনুষ্ঠানের সময়।যেহেতু গল্পটা ওই পত্রিকার প্রথম দিকের একটি সংখ্যায় ছাপা হয়েছিল; অতএব পড়ার জন্য আমাকেই উঠে দাঁড়াতে হলো, তবে কাজটা ছিল খুব কঠিন।মনে হয় আমি ওই গল্পটা লিখেছিলাম যখন আমার বয়স বাইশ।পড়ার সময়েই আমি কাটছাঁট চালিয়ে গেলাম, সে-সময়ের খাটানো সব ফন্দিফিকির ধরে ফেলতে ফেলতে, যা এখন মনে হয় খুবই সেকেলে।পরের অনুচ্ছেদ পড়ার আগেই আমি চোখ বুলিয়ে আগেভাগেই সেগুলো দ্রুত ঠিক করার চেষ্টা করছিলাম, কেননা আমি তো ওটা আগেভাগে পড়িনি।আমি কোনো লেখাই আগেভাগে পড়ি না।যখন আমি পুরনো গল্পগুলো পড়ি, তখন অনেক ব্যাপার আমার চোখে পড়ে, যা আমি এখন করতাম না, পঞ্চাশের দিকে লোকে যা করত।

 

জ্য ম্যাকক্যলক : ছাপা হওয়ার পরে আপনি কি কোনো গল্প পরিমার্জন করেছেন? প্রুস্ত যেমন মৃত্যুর আগে Remembrance of Things Past-এর প্রথম খণ্ড আবার লিখেছিলেন।

 

মুনরো : হ্যাঁ, হেনরি জেমস তাঁর সহজবোধ্য লেখাগুলো আবার লিখেছিলেন, ফলে সেগুলো জটিল আর দুর্বোধ্য হয়ে যায়।আসলে সম্প্রতি আমি এমনটি করেছি। ‘Carried Away’ গল্পটা Best American Short Stories ১৯৯১-এ অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল।আমি সংকলনের ভেতর থেকে এটা আবার পড়লাম, কেননা আমি দেখতে চেয়েছিলা মগল্পটা কেমন ছিল এবং একটা অনুচ্ছেদ খুঁজে পেলাম, যেটা মনে হয়েছে খুবই নাজুক।একটা গুরুত্বপূর্ণ ছোট অনুচ্ছেদ ছিল, দুটো বাক্যের মতো হবে।আমি শুধু কলমটা নিয়ে সংকলনের কিনারায় আবার লিখলাম এজন্য যে, যখন আমি গল্পগুলো বই আকারে প্রকাশ করব, তখন যেন এটা ওখানে উল্লেখ করার জন্য পাই।মাঝেমধ্যেই আমি পরিমার্জন করি ওই পর্যায়ে গেলে, যখন লেখায় ভুল ধরা পড়ে, এ-কারণে যে, আমি আসলেই গল্পের ছন্দের ভেতরে মোটেও ছিলাম না।কিছু কিছু লেখা দেখি যেগুলো মনে হয় খুব একটাকাজ করে না, যতটা করার কথা, এবং পড়া শেষ হলেই আমি তা পরিমার্জনের জন্য বেছে ফেলি।তারপর যখন আমি চূড়ান্তভাবে গল্পটি আবার পড়ি, তখন মনে হয় একটু খাপছাড়া লাগছে যেন।ফলে এ-ধরনের কাজে আমি যথেষ্ট নিশ্চিত নই।

 

জ্য ম্যাকক্যলক : আপনি না বলেছিলেন, আপনার চলতি লেখা কখনো বন্ধুদের দেখান না।

 

মুনরো : না।আমি কাউকেই কোনো চলমান লেখা দেখাই না।

 

জ্য ম্যাকক্যলক : সম্পাদকের ওপর আপনি কতখানি ভরসা করেন?

 

মুনরো : গুরুত্বপূর্ণ সম্পাদনার ক্ষেত্রে The New Yorker ছিল আমার প্রথম অভিজ্ঞতা।আমি কমবেশি পাঠ-সম্পাদনা করতাম, সঙ্গে বেশি না, সামান্য কিছু পরামর্শ থাকত।আমার এবং সম্পাদকের মধ্যে একটা বোঝাপড়া থাকতে হবে কী ধরনের ব্যাপার ঘটবে।ধরা যাক, একজন সম্পাদক যিনি ভাবলেন উইলিয়াম মাক্সওয়েলের গল্পে কোনো কিছুর দরকার হবে না, তিনি আমার ক্ষেত্রে কোনো কাজে আসবেন না।সম্পাদকের খুব প্রখর দৃষ্টি থাকতে হবে – আমি যেসব উপায়ে নিজেকে ফাঁকি দিতে পারি।The New Yorker-এর চিফ ম্যাকগ্রা ছিলেন আমার প্রথম সম্পাদক, তিনি খুব ভালো।আমি তাজ্জব হয়ে যেতাম যে কেউ অতটা গভীরভাবে নজর দিতে পারে, আমি যা করতে চাইতাম।কখনো কখনো আমরা খুব একটা কিছু করতাম না, তবে মাঝেমধ্যে তিনি আমাকে যথেষ্ট নির্দেশনা দিতেন।একটা গল্প আমি আবার লিখেছিলাম, শিরোনাম ছিল ‘The Turkey Season’, যে-গল্পটি তিনি ইতোমধ্যে কিনে ফেলেছিলেন।ভেবেছিলাম গল্পের নয়া সংস্করণটি তিনি অকপটে গ্রহণ করবেন, কিন্তু তিনি তা করলেন না।বললেন, উ-ম-ম-ম, নয়া সংস্করণে অনেক জিনিস আছে, যা আমার খুব ভালো লেগেছে, এবং আগের সংস্করণেও অনেক জিনিস আমার খুব ভালো লেগেছে।তো আমরা কেন সেটা দেখছি না? তিনি কখনো এমন করে বলতেন না যে, আমরা করব।অতএব, আমরা দুটোকে জুড়ে দিলাম, এবং সেভাবে একটা ভালো গল্প পেয়েছিলাম, মনে হয়।

 

জ্য ম্যাকক্যলক : ব্যাপারটা কীভাবে ঘটল? ফোনে, নাকি চিঠিতে? আপনি কি কখনো The New Yorker-এ গিয়েছিলেন এটা ঠিকঠাক করতে?

 

মুনরো : চিঠির মাধ্যমে।আমাদের মধ্যে ফোনে যোগাযোগের সম্পর্কটি খুব কার্যকর, তবে আমাদের মাত্র কয়েকবার দেখা-সাক্ষাৎ হয়েছে।

 

জ্য ম্যাকক্যলক : The New Yorker-এ কখন আপনার প্রথম লেখা প্রকাশিত হয়?

 

মুনরো : আমার প্রথম গল্প, ‘Royal Beatings’ ছাপা হয়েছিল ১৯৭৭ সালে।তবে আমি পঞ্চাশের দশকে আমার প্রথমদিকের সব গল্পই The New Yorker-এ পাঠিয়েছিলাম, এবং তারপর অনেকদিন আমি পাঠানো বন্ধ রাখি এবং শুধু কানাডার পত্রিকাগুলোতে পাঠাতাম।The New Yorker যদিও আমাকে সুন্দর সুন্দর চিরকুট পাঠাত – পেনসিলে লেখা, অনানুষ্ঠানিক বার্তা।তারা কখনো ওতে স্বাক্ষর করত না।চিরকুটগুলো মোটেও উৎসাহব্যঞ্জক ছিল না।একটার কথা আমার এখনো মনে পড়ে : লেখা অত্যন্ত চমৎকার, কিন্তু থিমটা হচ্ছে একেবারে সেকেলে।সেটা অবশ্য ছিলও বটে।দুজন বর্ষীয়ান মানুষের ভেতরে অনুরাগ – এক প্রবীণ আইবুড়ি ব্যাপারটা যে তার জন্য, সেটা জানল যখন এক বয়স্ক চাষি তাকে প্রেমের প্রস্তাব করল।আমার গল্পে প্রচুর আইবুড়ো-বুড়ি আছে।গল্পটার শিরোনামছিল, ‘The Day the Asters Bloomed’, সত্যিই ভয়াবহ ছিল।তাছাড়া যখন আমার বয়স ছিল সতেরো তখন তো আমি ওটা লিখিনি; আমি ছিলাম পঁচিশ।জানি না কেন যে আমি আইবুড়ো-বুড়িদের নিয়ে লিখতাম।

 

জ্য ম্যাকক্যলক : আপনার যখন বিয়ে হয় তখন তো আপনার অল্পবয়স।এমন তো নয় যে, আপনি একজন আইবুড়ির জীবনযাপন করছিলেন।

 

মুনরো : আমার ধারণা, মনের দিক থেকে আমি যে একজন আইবুড়ি সেটা জানতাম।

 

জ্য ম্যাকক্যলক : আপনি সবসময়ই লিখতেন?

 

মুনরো : সপ্তম বা অষ্টম শ্রেণি থেকেই লিখতাম।

 

জ্য ম্যাকক্যলক : যখন কলেজে ঢুকলেন তখন কি আপনি পুরোদস্তুর লেখক?

 

মুনরো : হ্যাঁ।আমার অন্য কিছু হওয়ার কোনো সুযোগ ছিল না, কেননা আমার কোনো টাকা-পয়সা ছিল না।আমি জানতাম যে, বিশ্ববিদ্যালয়ে দুবছর পড়তে পারব, কেননা সে-সময়ে যে-বৃত্তিটা দেওয়া হতো তার মেয়াদ ছিল দুবছর।আমার জীবনে এই দুবছর ছিল একটা স্বল্প ছুটি, খুব চমৎকার সময়।তেরো-চোদ্দ থেকেই আমার ওপর গৃহস্থালির দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল।যার ফলে বিশ্ববিদ্যালয়টা ছিল আমার জীবনের একমাত্র সময়, যখন আমাকে বাড়িঘর সামলানোর কাজ করতে হয়নি।

 

জ্য ম্যাকক্যলক : সেই দুবছরের পরপরই কি আপনি বিয়ে করেন?

 

মুনরো : দ্বিতীয়বর্ষের একদম পরেই আমি বিয়ে করি।আমার বয়স তখন কুড়ি।আমরা ভ্যানকুভার গেলাম।বিয়েটাই ছিল একটা বিশাল ব্যাপার – বিস্তর অ্যাডভেঞ্চার, ছুটে চলা।আমরা যতদূর যেতে পারতাম যেতাম এবং থাকতাম গাঁয়ের দিকটায়।তখন আমরা কেবল কুড়ি আর বাইশ।তাড়াতাড়িই আমরা নিজেদের যথাযথ মধ্যবিত্তের সংসারে থিতু করলাম।ভাবতাম একটা বাড়ি হবে, একটা বাচ্চা নেব, এবং এগুলো আমরা খুব তাড়াতাড়িই করে ফেললাম।আমার প্রথম সন্তান হয় একুশ বছরে।

 

জ্য ম্যাকক্যলক : এত কিছুর মধ্যেও কি আপনি লিখছিলেন?

 

মুনরো : গর্ভকালে আমি মরিয়া হয়ে লিখছিলাম, কেননা আমি ভাবতাম, পরে আর কখনোই লিখতে পারব না।প্রতিটি গর্ভধারণ আমাকে অনুপ্রাণিত করেছে সন্তান ভূমিষ্ঠ হওয়ার আগে বড় কিছু একটা করার।আসলে আমার বড় কোনো কিছুই করা হয়নি।

 

জ্য ম্যাকক্যলক : ‘Thanks for the Ride’ গল্পটি আপনি একটি শহুরে উদাসীন ছেলের দৃষ্টিভঙ্গিতে লিখছেন, যে একটি গরিব মফস্বলের মেয়েকে রাত কাটানোর জন্য নিয়ে আসে এবং তার সঙ্গে শোয় এবং তার দীনতায় যেমন কৌতূহল বোধ করে, তেমনি বিরক্তও হয়।এটা লক্ষণীয় যে, গল্পটা যখন এসেছে তখন আপনার জীবনটা ছিল একদম স্থির, পরিপূর্ণ।

 

মুনরো : আমার বড় মেয়ে যখন পেটে তখন আমার স্বামীর এক বন্ধু গ্রীষ্মে বেড়াতে এসেছিলেন।তিনি মাসখানেকের বেশি সময় আমাদের সঙ্গে ছিলেন।কাজ করতেন ন্যাশনাল ফিল্ম বোর্ডে (National Film Board), ওদিকে একটা চলচ্চিত্রের কাজ করছিলেন।তিনি আমাদের অনেক কাহিনি বলেছিলেন; আমাদের জীবনের ছোটখাটো মজার মজার ঘটনা নিয়ে আমরা – শুধু গল্পস্বল্প করতাম, আপনারা যেমন করছেন।সেই বন্ধুটি আমাদের ‘জর্জেনবে’র (Georgian Bay) একটি ছোট শহরে থাকাকালে একটি স্থানীয় মেয়েকে নিয়ে বেড়াতে যাওয়ার গল্প বলেছিলেন।একটা মধ্যবিত্ত ছেলের কিছু একটার মুখোমুখি হওয়া, যা আমাদের কাছে খুব পরিচিত, কিন্তু তাঁর কাছে নয়।ফলে তখনই আমি ওই মেয়েটি এবং তাঁর পরিবার-পরিস্থিতি গভীরভাবে চিহ্নিত করতে পেরেছিলাম।আমার ধারণা, খুব তাড়াতাড়িই গল্পটি লিখে ফেলেছিলাম।কেননা, আমার মেয়েটা তখন ওর শয্যা থেকে তাকিয়ে আমাকে দেখছিল।

 

জ্য ম্যাকক্যলক : প্রথম বই যখন বের হয় তখন আপনার বয়স কত হবে?

 

মুনরো : এই ছত্রিশের মতো।অনেক বছর ধরেই এই গল্পগুলো আমি লিখছিলাম এবং শেষমেশ রায়ারসন প্রেস, একটি কানাডীয় প্রকাশনা, যা কিনা তখন মাত্র ম্যাকগ্রহিল অধিগ্রহণ করেছে, এর সম্পাদক আমাকে লিখে জানালেন যে, একটা বইয়ের জন্য আমার যথেষ্ট গল্প আছে কিনা।আসলে তিনি একটি বইতে আরো দু-তিনজন লেখকের সঙ্গে আমার গল্প ছাপতে চেয়েছিলেন।সেটা হয়ে উঠল না, কিন্তু তখনো তাঁর কাছে আমার একগুচ্ছ গল্প ছিল।তারপর তিনি চাকরি ছেড়ে দিলেন, তবে আমাকে আরেক সম্পাদকের কাছে পাঠালেন, তিনি বললেন, আপনি যদি আরো তিনটি গল্প লিখতে পারতেন তাহলে আমাদের একটা বই হতো।অতএব বই প্রকাশের আগে আমি লিখলাম ‘Images’, ‘Walker Brothers Cowboy’ এবং ‘Postcard’।

 

জ্য ম্যাকক্যলক : পত্রিকায় ওই গল্পগুলো কি ছাপা হয়েছিল?

 

মুনরো : অধিকাংশই ছাপা হয়েছিল Tamarack Review-তে।চমৎকার ছোটকাগজ এবং খুব নির্ভীক।সম্পাদক আমাকে বলেছিলেন, কানাডায় তিনিই হচ্ছেন একমাত্র সম্পাদক, যিনি তাঁর সমস্ত পাঠককে মূল নামে চেনেন।

 

জ্য ম্যাকক্যলক : লেখালেখির জন্য আপনার কি বিশেষ কোনো সময় ছিল?

 

মুনরো : বাচ্চারা যখন ছোট তখন আমার লেখার সময় ছিল – যেই না ওরা স্কুলের জন্য বেরিয়ে যেত।ফলে আমি ওই

বছরগুলোতে অত্যন্ত কঠোর পরিশ্রম করেছি।আমার স্বামী আর আমার একটা বইয়ের দোকান ছিল এবং যখন আমি সেখানে কাজ করি তখনো আমি দুপুর পর্যন্ত বাসায় থাকতাম – গৃহস্থালির কাজ করতাম, আবার লেখালেখির কাজও করতাম।পরে যখন আমি নিয়মিত দোকানে কাজ করতাম না, তখন লিখতাম – যতক্ষণ না ওরা দুপুরের খাবার খেতে আসে এবং তারপর আবার ওরা চলে গেলে, সম্ভবত আড়াইটা পর্যন্ত আমি ঝটপট এক কাপ কফি খেয়ে ঘর গোছানোর কাজ শুরু করে দিতাম।চেষ্টা করতাম বিকেল নামার আগেই যেন সবকিছু গোছগাছ হয়ে যায়।

 

জ্য ম্যাকক্যলক : যখন মেয়েদের স্কুলের বয়স হয়নি তখন?

 

মুনরো : ওরা যখন তন্দ্রা যেত।

 

জ্য ম্যাকক্যলক : যখন ওরা তন্দ্রা যেত তখন লিখতেন?

 

মুনরো : হ্যাঁ, দুপুরে একটা থেকে তিনটে পর্যন্ত।প্রচুর লিখতাম, খুব একটা ভালো হতো না, কিন্তু আমার মস্তিষ্ক ছিল পুরোপুরি উর্বর।যে-বছর আমি আমার দ্বিতীয় বই Lives of Girls and Women লিখলাম তখন আমি ছিলাম যথেষ্ট উর্বর।চারটে বাচ্চা ছিল আমার, কেননা মেয়েদের একটি বন্ধুও আমাদের সঙ্গে থাকত, এবং আমি সপ্তাহে দুদিন দোকানে কাজ করতাম।রাত একটা পর্যন্ত সম্ভবত লিখতাম, এবং তারপর আবার ছটায় উঠতাম।জানেন, আমার মনে পড়ে, আমি কি ভাবতাম, আমি হয়তো মারা যাব, আমার হার্ট অ্যাটাক হবে, কী যে ভয়ানক।তখন আমার বয়স ছিল কেবল ঊনচল্লিশ বা এরকম, কিন্তু আমি এসব ভাবতাম।পরে ভাবলাম, বেশ, যদি তা-ই হয়, আমার এখনো অনেক পাতা লেখার আছে, ওরা দেখতে তো পাবে এগুলো কেমন হলো।ব্যাপারটা ছিল একধরনের মরিয়া হয়ে ছোটা।এখন আর তেমন হিম্মত নেই।

 

জ্য ম্যাকক্যলক : Lives লেখার ক্ষেত্রে কী ধরনের প্রক্রিয়া কাজ করেছে?

 

মুনরো : Lives লেখা শুরুর দিনটি মনে পড়ে।জানুয়ারিতে, দিনটা ছিল রোববার।আমি বইয়ের দোকানে গিয়ে, রোববারে খোলা থাকত না, ভেতর থেকে দরজা বন্ধ করে দিলাম।আমার স্বামী বলেছিল, ও ডিনারে আসবে, তো আমার হাতে বিকেলটা ছিল।মনে পড়ে, আমি আমার চারপাশের মহৎ সাহিত্যকর্মগুলো দেখছিলাম আর ভাবছিলাম ‘ওই গর্দভ! এখানে তুই কী করছিস?’ আমি তখন ওপরে অফিসে গিয়ে ‘Princess Ida’ অধ্যায়টি লিখতে শুরু করলাম, যা ছিল আমার মাকে নিয়ে।আমার মা-বিষয়ক উপাদানগুলো হচ্ছে আমার জীবনের মূল উপাদান, আর এগুলো সবসময় অত্যন্ত তৈরি অবস্থায়ই আমার কাছে আসে।আমি যদি কেবল আরামও করি, তাহলেও ওটা আসবে।তো, একসময় যেই না আমি লেখা শুরু করলাম, আমি খেই হারিয়ে ফেললাম।তারপর করলাম বড় একটা ভুল।লেখাটাকে একটা মামুলি উপন্যাসে রূপ দিতে চাইলাম, একটা সাদামাটা বালখিল্যগোছের উপন্যাস।মার্চের দিকে খেয়াল করলাম এটা কাজ করছে না।আমার কাছে যথাযথ মনে হলো না, অতএব ভাবলাম আমার এটা বাদ দিতে হবে।আমি খুব বিষণ্ণ হয়ে পড়লাম।পরে মনে হলো, আমার যা করতে হবে তাহলো, এটাকে কেটেছেঁটে গল্পের কাঠামোয় দাঁড় করানো।তখন আমি এটা সামলাতে পারলাম।সেই তখনই বুঝতে পেরেছিলাম যে, আমি কখনো সত্যিকারের উপন্যাস লিখতে পারব না।কেননা আমি ওভাবে ভাবতে পারি না।

 

জ্য ম্যাকক্যলক : ‘The Beggar Maid’ তো হচ্ছে একরকমের উপন্যাস, কেননা গল্পগুলো তো আন্তঃসম্পর্কিত।

 

মুনরো : ভবিষ্যতে কী হবে তা নিয়ে খুব ভাবি না, তবে মাঝেমধ্যেই আরেকটি গল্প পরম্পরা তৈরি করতে ইচ্ছা হয়।আমার নতুন বই Open Secret-এ অনেক চরিত্র আছে, যেগুলো আবার ফিরে আসে। ‘Vandals’-এর ‘Bea Doud’-এর উল্লেখ আছে ‘Crried Away’-তে একটি বাচ্চা মেয়ে হিসেবে, সংকলনের জন্য প্রথম গল্প ছিল ওটি ‘Billy Doud’ হলো গ্রন্থাগারিকের ছেলে, তারা সবাই ‘Spaceship Have Landed’-এ উপস্থিত।তবে এ-ধরনের পরিকল্পনা আমার গল্পকে গ্রাস করুক, তা হতে দিই না।একটা গল্প দাঁড় করাতে গিয়ে আমি যদি দেখি যে, এটা আরেকটি গল্পের সঙ্গে মিল খেয়ে যাবে, তার অর্থ আমি সম্ভবত কিছু একটা ভুল করছি, এটার ওপর জোর খাটাচ্ছি, যা অনুচিত।অতএব, আমি জানি না ওরকম ধারাবাহিক গল্পের পরম্পরা আবার সৃষ্টি করতে পারব কিনা।যদিও ধারণাটা আমার ভালো লাগে।ক্যাথরিন ম্যান্সফিল্ড তাঁর একটি চিঠিতে এমনটি বলেছিলেন যে, ‘ইস, আমার ইচ্ছে একটা উপন্যাস লিখি, আশা করি আমি কেবল এসব ছোটখাটো জিনিস রেখে মরে যাব না।নিজেকে এই ‘ছোটখাটো’র অনুভব থেকে মুক্তি দেওয়া অত্যন্ত কঠিন, যদি আপনি কেবল ইতস্তত বিক্ষিপ্ত গল্প রেখে মরে যান।আমি নিশ্চিত, আপনি ভাবছেন চেখভের কথা কিংবা অন্য কারো কথা ভাবছেন, তবে এখনো মুশকিল।’

 

জ্য ম্যাকক্যলক : চেখভ তো সবসময় একটা উপন্যাস লিখতে চাইতেন।তার শিরোনাম দিতে চেয়েছিলেন ‘Stories from the Lives of My Friends’।

 

মুনরো : জানি।সবকিছু একটার মধ্যে সন্নিবেশ ঘটিয়ে যে কাজ সম্পন্ন করা যায়, ওই অনুভূতিটাও আমার জানা আছে।

 

জ্য ম্যাকক্যলক : যখন আপনি কোনো গল্প আরম্ভ করেন, আপনার কি জানা থাকে গল্পটা কোথায় গিয়ে ঠেকবে? গাঁথুনিটা কি আগেভাগেই ঠিক হয়ে যায়?

 

মুনরো : পুরোপুরি নয়।কোনো গল্পের ভালো গল্প হতে হলে সচরাচর পরিবর্তন থাকবেই।এখন আমি একটা গল্প লেখা শুরু করেছি, এবং সেটা আহামরি কিছু নয়।রোজ সকালে আমি গল্পটা নিয়ে কাজ করছি, এবং গল্পটা বেশ নাজুক।আমার আসলে ওটা ভালো লাগছে না, তবে আমার ধারণা হয়তো কোনো একপর্যায়ে আমি এটার ভেতরে ঢুকতে পারব।সচরাচর, কোনো গল্প লেখা শুরুর আগে এটার ব্যাপারে যথেষ্ট জানাশোনা থাকে, লেখার জন্য যখন আমার নিয়মিত সময় থাকে না, তখন গল্পগুলো আমার মাথায় অতটা সময় কাজ করতে থাকবে যে, যেই না আমি লেখা শুরু করব, এর গভীরে ডুবে যাব।এখন আমি সে-কাজটা করছি খেরোখাতা ভরে ফেলে।

 

জ্য ম্যাকক্যলক : আপনি খেরোখাতা ব্যবহার করেন?

 

মুনরো : আমার খেরোখাতার টাল হয়ে গেছে, যার ভেতরে আছে এই সাংঘাতিক হিবিজিবি লেখাজোখা, আসলে সবকিছু টুকে রাখা আর কী।যখন আমি এই প্রাথমিক খসড়াগুলোয় চোখ বুলাই তখন মাঝেমধ্যেই ভেবে অবাক হই এজন্য যে, এগুলো লেখার আদৌ কোনো প্রয়োজন আছে কিনা।জানেন, আমি সহজাত প্রতিভাবান লেখকদের ঠিক উলটো, যারা কিনা এগুলো অনায়াসেই ভেতরে নিতে পারে।কোনো গল্প আমি একদম তৈরি অবস্থায় মোটেও উপলব্ধি করি না, গল্পটা হচ্ছে তা-ই, যা আমি করতে চাচ্ছি।আমি হরদম বিপথে চলে যাই এবং নিজেকে আবার আগের পথে ফিরিয়ে আনতে হয়।

 

জ্য ম্যাকক্যলক : কীভাবে টের পান যে আপনি বিপথে চলে গেছেন?

 

মুনরো : একদিন লিখতে লিখতে আমি হয়তো ভাবলাম বেশ ভালোই তো করলাম, সচরাচর যা লিখি তারচেয়ে তো বেশি পৃষ্ঠা লিখে ফেলেছি।পরের দিন সকালে উঠে আমার মনে হলো এটার ওপর আর কাজ করার ইচ্ছা নেই।যখন সাংঘাতিক অনীহা এটার ধারেকাছে যেতে, যখন নিজেকে লেখালেখি চালিয়ে যাওয়ার জন্য চাপ দেব, আমি সচরাচর বুঝি যে কিছু একটা গড়বড় হচ্ছে।মাঝেমধ্যে কোনো লেখার চার ভাগের তিন ভাগ কাজ হয়ে গেলেই, কোনো একটা লক্ষ্যে কিছুটা আগেভাগেই হয়তো পৌঁছলাম, তখন মনে হবে যে গল্পটা বাদ দিই।দু-একদিন আমার খুব মন খারাপ লাগে, গড়গড় করে বেড়াই, ভাবি অন্য কিছু লেখা যাক।ব্যাপারটা একরকম প্রেম-পরিণয়ের মতো আরকি; আপনি সবরকমের বিরক্তি এবং যাতনা থেকে মুক্তি পেতে কোনো নয়ামানুষের সঙ্গে বেরোতে চাইছেন, যাকে আপনার মোটেও পছন্দ নয়, কিন্তু সেটা এখনো আপনি খেয়াল করেননি।তখন হঠাৎ করে পরিত্যক্ত গল্পটা সম্পর্কে আমার ভেতরে একটা কিছু চলে আসবে; দেখতে পাব কীভাবে কাজটা করতে হবে।তবে ব্যাপারটা মনে হয় শুধু তখনই ঘটে যখন বলি, না, এটা কাজ করছে না, বাদ দেওয়া যাক।

 

জ্য ম্যাকক্যলক : ব্যাপারটা কি সবসময় করতে পারেন?

 

মুনরো : কখনো কখনো পারি না, এবং পুরো দিনটা খারাপ মেজাজে কাটাই।কেবল ওই সময়টাতেই আমি খিটখিটে হয়ে যাই, গ্যারি যদি আমার সঙ্গে কথা বলে কিংবা রুমের ভেতরে আসা-যাওয়া করে, অথবা যথেষ্ট শব্দ করে, আমার তখন রেগে যাওয়া বাকি।যদি গান গায় বা ওরকম কিছু করে, তাহলে তো কথাই নেই।আমি কিছু একটা ভেবে বের করার চেষ্টা করছি, আর গিয়ে মুখ থুবড়ে পড়ছি পাথুরে দেয়ালে, বের হতে পারছি না।সাধারণত বাদ দেওয়ার আগে কিছুকালের জন্য আমি এটা করি।এই পুরো প্রক্রিয়াটায় সপ্তাহখানেক লেগে যায় – এটা নিয়ে ভাবা, ফিরে পাওয়ার চেষ্টা করা, তারপর হাল ছেড়ে দেওয়া এবং অন্য কিছু নিয়ে ভাবার সময়, এবং একদম অপ্রত্যাশিতভাবে ফিরে পাওয়া – এই যখন আমি মুদিখানায়, কিংবা গাড়ি চালাতে বাইরে বেরিয়েছি।তখন ভেবে নিই, বেশ তো, আমি এই এই দৃষ্টিভঙ্গিতে লিখব, এই চরিত্র ছেঁটে ফেলব, এবং এ-মানুষগুলো অবিবাহিত, কিংবা যা-ই হোক না কেন।ব্যাপক রদবদল ঘটে, যা সচরাচর আসলে মৌলিক রদবদল।

 

জ্য ম্যাকক্যলক : এতে কি গল্পটা ঠিকঠাক হতো?

 

মুনরো : এতে গল্পের মানোন্নয়ন ঘটল কিনা এমনকি তাও জানি না।তবে যা হয় তাহলো, আমার লেখালেখি সচল রাখা সম্ভব হয়।তার অর্থ এই বলছি না যে, আমার পর্যাপ্ত জিনিস আছে যা বেরিয়ে এসেছে এবং আমাকে পথের দিশা দিচ্ছে।মনে হয় আমি শুধু একটা চেতনা লাভ করি যে, যে-লেখাটা নিয়ে খুব জটিলতায় পড়েছি সেটায় কী লিখতে চাই।এবং এটা কদাচিৎ ঘটে।

 

জ্য ম্যাকক্যলক : আপনি কি সচরাচর গল্পের পরিপ্রেক্ষিত কিংবা ধরনটা বদলান?

 

মুনরো : ও হ্যাঁ, কখনো কখনো আমি বুঝে উঠতে পারি না।আমি ফার্স্ট পারসন থেকে থার্ড পারসনে বারবার চলে যাই।আমার অন্যতম সমস্যাগুলোর ভেতরে এটা একটা।আমি মাঝেমধ্যে ফার্স্ট পারসনে বর্ণনা দিই নিজেকে গল্পের ভেতরে প্রবেশ করানোর জন্য।এবং তারপর মনে হয় কোনো কারণে এটা কাজ করছে না।ও ব্যাপারটায় কিছু করতে বললে আমি একেবারে ক্ষেপে যাই।আমার প্রতিনিধির ‘The Albanian Virgin’ গল্পটি ফার্স্ট পারসনে বর্ণনা ভালো লাগেনি, তিনি আমাকে দিয়ে এটা বদলালেন, হয়তো আমি সঠিকভাবে নিশ্চিত ছিলাম না বলেই।কিন্তু পরে আমি আবার আগের সেই ফার্স্ট পারসনেই ফিরে এসেছি।

 

জ্য ম্যাকক্যলক : কতটা সচেতনতার সঙ্গে আপনি যা করছেন, থিমের স্তরটায়, তা বুঝতে পারেন?

 

মুনরো : উম, খুব একটা সচেতনভাবে নয়।একটা গল্পের বিচ্যুতির রাস্তাগুলো আমি দেখতে পাই।ইতিবাচকের চেয়ে নেতিবাচক জিনিসগুলো খুব সহজেই দেখি।কিছু কিছু গল্প অন্যগুলোর মতো কাজ করে না।আবার কিছু কিছু গল্প থিমের দিক থেকে অন্যগুলোর চেয়ে ঠুনকো।

 

জ্য ম্যাকক্যলক : ঠুনকো?

 

মুনরো : সেগুলো আমার কাছে ঠুনকো মনে হয়।ওগুলোর প্রতি যে খুব একটা নিষ্ঠা ছিল, তা মনে করি না।মুরিয়েল স্পার্কের আত্মজীবনী পড়ছিলাম।তাঁর ধারণা, যেহেতু তিনি খ্রিষ্টান, ক্যাথলিক, ঈশ্বরই হচ্ছেন আসল লেখক।এবং এটা আমাদের সেই মাতববরিটা নিজের হাতে নেওয়ার চেষ্টা থেকে বিরত রাখে, বিরত রাখে জীবনের মর্মকথা নিয়ে কল্পকাহিনি লিখতে; যে-কাহিনি অনুধাবনের চেষ্টা করে একমাত্র ঈশ্বর যা উপলব্ধি করে।তাই তো কেউ কেউ চিত্তবিনোদন নিয়ে লেখে।মনে হয় তিনি এটাই বলেছেন।আমার ধারণা, আমিও কখনো কখনো গল্প লিখি বিনোদনের লক্ষ্যেই।

 

জ্য ম্যাকক্যলক : একটা উদাহরণ দিতে পারবেন?

 

মুনরো : উম, মনে হয় ‘The Jack Randa Hotel’ আমার খুব পছন্দ, বিনোদনের কাজটাই করে।আমি অবশ্য তাই-ই চাই।যদিও ‘Friend of My Youth’ গল্পটি বিনোদন জোগায় না, কিছুটা অন্যভাবে কাজ করে, কাজ করে আমার অন্তস্তল থেকে।

 

জ্য ম্যাকক্যলক : যে-কাজগুলো আপনি বিনোদন বিবেচনা করেন সেগুলো নিয়ে কি আপনি উদ্বিগ্ন থাকেন, যতটা থাকেন আপনার কেন্দ্রীয় উপাদানগুলো নিয়ে?

 

মুনরো : হ্যাঁ, তা তো বটেই।

 

জ্য ম্যাকক্যলক : এমন কোনো গল্প কিআছে, যা লিখতে কোনো ঝামেলা পোহাতে হয়নি?

 

মুনরো : ‘Friends of My Youth’ আসলে খুব দ্রুত লিখেছিলাম।একটা ছোট্ট ঘটনা থেকে।আমি এক যুবককে চিনি, যে গদেরিচ লাইব্রেরিতে কাজ করে এবং আমার জন্য তথ্য-উপাত্ত ঘাঁটাঘাঁটি করে।একরাতে ও আমাদের বাড়িতে ছিল এবং ওদের বাড়ির পড়শিদের ব্যাপারে বলতে শুরু করল, ওদের পাশের খামারবাড়িতে যে পড়শিরা থাকত।তারা নাকি এমন ধর্মাবলম্বী যে তাদের তাস খেলা বারণ ছিল, তাই তারা খেলত ক্রোকিনলে, একধরনের বোর্ড গেম।ও শুধু আমাকে এটুকুই বলেছিল, তারপর আমি ওকে সেই পড়শিদের ব্যাপারে জিজ্ঞেস করলাম; পরিবার, ধর্ম, তারা দেখতে কেমন ছিল।ও সেই মানুষগুলোর ব্যাপারে বর্ণনা দিলো এবং তারপর আমাকে বলল বিয়ে নিয়ে একটি রটনার কথা : এক যুবক, তাদের গির্জার একজন সদস্য, বড় মেয়েটির বাগদত্তা হয়।তারপর, কী আশ্চর্য, ছোট মেয়েটা হয়ে যায় গর্ভবতী, অতএব বিয়েটা অদলবদল হয়, এবং ওরা তিনজন একই বাড়িতে একসঙ্গে থাকতে শুরু করে।বাড়িঘর মেরামতি, এটাকে রং দেওয়া, এসব সত্যিই বটে।বিবাহিত দম্পতিরা তাদের বাড়িটার অর্ধেক রং করে আর ওই বড় বোনটা বাকি অর্ধেক করে না – অর্ধেক বাড়ি রাঙানো থাকে।

 

জ্য ম্যাকক্যলক : ওখানে কি সত্যিই একজন নার্স ছিলেন?

 

মুনরো : নার্স আমার আবিষ্কার, তার নামটা আমাকে দেওয়া হয়েছিল।এখন থেকে মাইল দশেক দূরে, আমাদের ‘Blyth Theatre’-এ তহবিল সংগ্রহের একটা অনুষ্ঠান ছিল।টাকা ওঠানোর জন্য সবাই কিছু না কিছু একটা দান করছিল নিলামে তোলার জন্য।তখন একজনের মাথায় একটা ধারণা এলো যে, আমি সফল নিলাম ক্রেতার নামটা আমার পরের ছোটগল্পের একটা চরিত্রে ব্যবহার করব এই স্বত্বটাও নিলাম করতে পারি।টরন্টোর একজন নারী চারশো ডলার দিলো গল্পের চরিত্র হওয়ার জন্য।ওনার নাম ছিল অদ্রে আটকিন্সন।আমি সঙ্গে সঙ্গে ভাবলাম তিনিই তো নার্স! তার সঙ্গে আমার আর কোনো কথা হয়নি।আশা করি তিনি (ওই চরিত্রে) মনোক্ষুণ্ণ হননি।

 

জ্য ম্যাকক্যলক : গল্পটার সূচনা কীভাবে ঘটল?

 

মুনরো : শুরুর সময়টায় আমরা একটি ভ্রমণে অন্টারিও থেকে ব্রিটিশ কলম্বিয়া যাচ্ছিলাম : ফি বছর গ্রীষ্মে আমরা বেরিয়ে পড়তাম, আর ফিরে আসতাম বসন্তে।আমি যদিও তখন লিখছিলাম না, কিন্তু রাতে মোটেলে আমি এই পরিবার নিয়ে ভাবছিলাম, তারপর আমার মায়ের পুরোকাহিনিটা এটাকে ঘিরে ধরে, এবং তখন আমি মাকে ঘিরে আমার গল্পটা বলতে থাকি, তারপর গল্পটা যা দাঁড়াল তাহলো ওই।আমি বলব যে, ওই গল্পটা খুব সহজেই এসেছে।কোনো কাঠখড় পোড়াতে হয়নি।মাঝেমধ্যেই আমি মায়ের চরিত্র নিয়ে কাজ করেছি, এবং তাঁর প্রতি আমার যে-অনুভূতি, সেগুলো আমাকে হাতড়াতে হয়নি।

 

জ্য ম্যাকক্যলক : আপনার লেখায় একাধিক মা রয়েছেন।সেই বিশেষ মাকে অন্য গল্পগুলোতেও দেখা গেছে এবং তাকে খুব বাস্তব মনে হয়, যেমন ‘The Beggar Maid’ গল্পে রোজের সৎমা ফোলো।

 

মুনরো : কিন্তু ফোলো বাস্তব কোনো মানুষ নন।তিনি হলেন আমার পছন্দের একজনের খুব কাছাকাছি।তবে তিনি ছিলেন এই এক গুচ্ছ চরিত্রের মাঝে একজন যাদের নিয়ে লেখকরা কথাবার্তা বলে থাকেন।আমি মনে করি, ফোলো হচ্ছে একটা শক্তি – কেননা ওই গল্পটা যখন লিখি তখন আমি মাত্র এখানে বাস করার জন্য এসেছি, তেইশ বছর দূরে থাকার পর।এখানের সামগ্রিক আচার-বিধি আমাকে সাংঘাতিক নাড়া দিয়েছিল।মনে হয়েছিল, যে-জগৎ নিয়ে আমি লিখছি, আমার শৈশবের জগৎ, তা ছিল স্মৃতির ঝাপসা জগৎ, আমি তা বুঝতে পারলাম যেই না ফিরে এসে আসল জিনিসের মুখোমুখি হলাম।বাস্তব জীবনের একটা প্রতিরূপ হচ্ছে ফোলো, আমার স্মরণে যা ছিল তারচেয়ে অত্যন্ত কঠিন বাস্তব।

 

জ্য ম্যাকক্যলক : আপিনি নিশ্চয়ই যথেষ্ট ঘুরে বেড়িয়েছেন, কিন্তু আপনার কাজের মৌলিকত্বে গ্রামীণ সংবেদনশীলতার ছাপ।আপনার কি ধারণা, এখানে চারপাশে যে-কাহিনিগুলো শোনেন সেগুলো আপনাকে বেশি প্রণোদনা জোগায়? নাকি, যখন আপনি শহরে থাকতেন তখন আপনার জীবনের ঘটনাগুলোকে যথাসম্ভব উপাদান হিসেবে ব্যবহার করেছেন?

 

মুনরো : ছোট শহরে থাকলে আপনি হরেকরকম মানুষের ব্যাপারে অনেক জানতে-শুনতে পারবেন।বড় শহরে আপনি মূলত আপনার মতো মানুষদের কাহিনি শুনবেন।নারী হলে তো বন্ধুদের কাছে প্রচুর শুনবেন।ভিক্টোরিয়ায় থাকাকালে আমার ‘Differently’ গল্পটি এসেছে, পেয়েছি ‘White Dump’-এর অনেক কিছু। ‘Fits’ গল্পের কাহিনি এসেছে এখানে ঘটা একটি ভয়াবহ বাস্তব ঘটনা – ষাটোর্ধ্ব এক দম্পতির আত্মহত্যা থেকে।বড় শহরে থাকলে আমি সব সূত্র তুলে আনতে পারতাম না।

 

জ্য ম্যাকক্যলক : ঘটনা উদ্ভাবন আপনার জন্য সহজ, নাকি বিভিন্ন ঘটনা জুড়ে দেওয়ায়?

 

মুনরো : একটা সহজ এবং সুস্পষ্ট কারণে এখন আমি আগের চেয়ে ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে কাহিনি কম লিখছি।আপনার শৈশবকে আপনি ব্যবহার করবেন, যদি না সমর্থ হন, উইলিয়াম ম্যাক্সওয়েলের মতো, অতীতে ফিরে যেতে এবং এতে চমৎকার নতুন একটা মাত্রা দিতে।আপনার জীবনের শেষ অর্ধেকটায় আপনার গভীর ব্যক্তিগত উপাদান হলো আপনার সন্তানরা।আপনি আপনার পিতা-মাতাকে নিয়ে লিখতে পারেন তাঁরা প্রয়াত হলে, কিন্তু আপনার সন্তানরা এখনো এখানে আসছে, আপনি চান ওরা নার্সিংহোমে আপনাকে দেখতে আসুক।উচিত ওইসব গল্প লেখায় মনোনিবেশ করা, যা বেশিরভাগ পর্যবেক্ষণলব্ধ।

 

জ্য ম্যাকক্যলক : আপনার পারিবারিক গল্পগুলোর মতো অনেক গল্পকে ঐতিহাসিক বলা যেতে পারে।এ-ধরনের উপাদানের জন্য আপনি কি কখনো ঘাঁটাঘাঁটি করেন, নাকি কেবল বেরিয়ে আসার অপেক্ষায় থাকেন?

 

মুনরো : উপাদান খুঁজে পেতে আমার কোনো সমস্যা হয় না।আমি ওগুলো বেরিয়ে আসার অপেক্ষায় থাকি এবং ওগুলো সবসময় বেরিয়ে আসে।সমস্যা তৈরি হয় তখন, যখন উপাদানে সয়লাব হয়ে যায়।ঐতিহাসিক গল্পগুলোর জন্য আমাকে অনেক ঘাঁটাঘাঁটি করতে হয়।মনে পড়ে অনেক বছর ধরে আমি ভিক্টোরিয়া লেখিকাদের একজনের ওপর একটি গল্প লিখতে চেয়েছিলাম, এই এলাকার একজন লেখিকা।কেবল খুঁজে পাচ্ছিলাম না সম্পূর্ণ পদ্যগুলো, যা আমার দরকার; এর সবটাই এতটা খারাপ ছিল যে হাস্যকর।আমি এর চেয়ে কিছুটা ভালো পেতে চেয়েছিলাম।ফলে ‘আমি’গল্পটা লিখলাম।তো ওই গল্পটা লেখার সময় আমি প্রচুর সংবাদপত্র ঘেঁটেছি, আমার স্বামীর কাছেই ওগুলো আছে – ও Huron County, অন্টারিওর আমাদের এলাকাটা, নিয়ে একটা ঐতিহাসিক গবেষণা করছে।গ্যারি অবসরপ্রাপ্ত ভূগোলবিদ।অতএব আমি শহরটা সম্পর্কে খুব পোক্ত ধারণা পেলাম, যাকে আমি বলি ‘ওয়ালি’।পত্রিকার ক্লিপিং থেকে আমি বলিষ্ঠ ধারণা পাই।পরে যখন আমার বিশেষ কিছু জিনিসের দরকার পড়ল, মাঝেমধ্যে লাইব্রেরির ওই ভদ্রলোককে বলতাম বের করে দিতে।পুরনো গাড়ি কিংবা অমন কিছু, কিংবা ১৮৬০ সালের প্রেসবিটারিয়ান গির্জার ব্যাপারে খোঁজখবর করা।তিনি এসব ঘাঁটতে ভালোবাসেন, অমায়িক মানুষ।

 

জ্য ম্যাকক্যলক : ওই খালা-ফুফুদের ব্যাপারগুলো, চমৎকার খালা-ফুফুরা, যারা গল্পে আছে?

 

মুনরো : আমার দাদিমা (দাদার বোন) আর দাদি ছিলেন আমাদের জীবনে খুব গুরুত্বপূর্ণ।মোটের ওপর আমার পরিবার এই পড়তি ব্যবসা, ওই শিয়াল আর উদের খামারের বাড়িতে থাকত, শহরের একেবারে কুখ্যাত এলাকার ওপাশটায়।আর ‘ওনারা’সত্যিকার অর্থেই শহরে সুন্দর বাড়িতে বাস করতেন এবং যুগের সঙ্গে তাল মেলাতেন।ফলে তাঁদের বাড়ি আর আমাদের বাড়ির মধ্যে সবসময় একটা টানাপড়েন ছিল, তবে এটা খুব গুরুত্বপূর্ণ যে, আমার ওই টানাপড়েনটা ছিল।যখন আমি ছোট ছিলাম তখন ভালো লাগত।পরে যখন আমি কিশোরী তখন এতে অনেকটা চাপ অনুভব করতাম।সে-সময়ে মা আমার জীবনে কেন্দ্রীয় নারীর ভূমিকায় ছিলেন না, যদিও ছিলেন যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি, তিনি মোটেও ওখানে ‘একজন’ছিলেন না, যিনি ‘মানদণ্ড’ ঠিক করবেন।ফলে এই বৃদ্ধ নারীরা সে-ভূমিকা নিয়ে নিলেন, যদিও তারা কোনো ‘মান’ঠিক করেননি, যার ব্যাপারে আমি আগ্রহী ছিলাম, তবে সেখানে একটা চলমান অস্থিরতা ছিল, যা আমার কাছে তাৎপর্যপূর্ণ ছিল।

 

জ্য ম্যাকক্যলক : তখন তো আপনি আসলে শহরে চলে যাননি, যেমন ‘Lives of Girls and Women’ গল্পে মা ও মেয়ে করেছিল?

 

মুনরো : একটা শীত কাটানোর জন্য আমরা গিয়েছিলাম।মা ঠিক করেছিলেন একটা শীতকালের জন্য তিনি শহরে একটা বাসা ভাড়া করবেন, এবং তিনি তা করলেন, এবং ভদ্রমহিলাদের দুপুরে খেতে নেমন্তন্ন করলেন।চেষ্টা করলেন সমাজে অনুপ্রবেশ করার, তাঁর কাছে যা ছিল পুরোপুরি অচেনা।কিন্তু তিনি তা পারলেন না।ওখানে কোনো পারস্পরিক সমঝোতা ছিল না।মনে পড়ে খামারবাড়িতে ফিরে আসার কথা, দেখি পুরুষদের রাজত্ব; আমার বাবা, ভাই, আর মেঝের আস্তরে কোনো নকশা দেখা গেল না।মনে হলো যেন মেঝেতে মাটির ঢল বয়ে গেছে।

 

জ্য ম্যাকক্যলক : আপনার পছন্দের কোনো গল্প আছে, যা অন্যদের ভালো লাগেনি? যেমন, কোনো গল্প আছে যা আপনার স্বামীর ভালো লাগেনি? এমন উদাহরণ কি আছে?

 

মুনরো : ‘Moon in the Orange Street Skating Ring’ গল্পটা আমার খুব পছন্দ ছিল, তবে গ্যারি ওটা পছন্দ করেনি।গ্যারি তাঁর শৈশবের ছোট ছোট যেসব কাহিনি আমাকে বলেছিল, গল্পটা ছিল তার ভিত্তিতে লেখা।আমার ধারণা, ও আশা করেছিল ওই ঘটনাগুলো ভিন্নভাবে উপস্থাপন হবে।যেহেতু আমি ভেবেছিলাম গ্যারি এটা পছন্দ করবে, তাই আমার ভেতরে কোনো দ্বিধাদ্বন্দ্ব ছিল না।আর তারপর ও কিনা বলল, হুম তোমার সেরা গল্পগুলোর একটা নয়।ওই মাত্র একবারই লেখা নিয়ে আমাদের মাঝে খটোমটো লাগা।তখন থেকেই ও খুব সাবধান, আমি বাইরে না যাওয়া পর্যন্ত ও কিছু পড়ত না।এবং লেখাটা ভালো লাগলে ও বলবে, না হলে কিছুই বলবে না।আমি মনে করি, ওই পথেই আপনি বৈবাহিক সম্পর্কটা চালিয়ে যেতে পারেন।

 

জ্য ম্যাকক্যলক : গ্যারি এখানকার সন্তান, যেখানে আপনি বেড়ে উঠেছেন সেখান থেকে কুড়ি মাইলের কম দূরত্বে।তাঁর ছোটখাটো ঘটনা এবং স্মৃতি কি আপনার কাছে আপনার প্রথম স্বামী জিমের ঘটনাবলির চেয়ে বেশি দরকারি?

 

মুনরো : না, জিম তো এসেছিল টরন্টোর কাছাকাছি থেকে, ও এসেছিল একেবারে ভিন্ন একটা পরিবেশ থেকে।জিম থাকত কিছুটা উচ্চ-মধ্যবিত্তের শহরে, যেখানে বেশিরভাগ পুরুষ ছিল পেশাদার এবং কাজ করত টরন্টোয়।চিভার নিউইয়র্কের চারধারে এরকম শহরগুলো নিয়ে লিখেছিলেন।আগে আমি এই শ্রেণির মানুষের ব্যাপারে জানতাম না, জানতাম না এটা-সেটার ব্যাপারে ওদের ভাবনার ধরনটা, যা ছিল সাংঘাতিক কৌতূহলোদ্দীপক, কিন্তু টুকরো টুকরো কাহিনির মতো করে নয়।আমার মনে হয়, মেনে নেওয়ার আগ পর্যন্ত এগুলোর প্রতি আমার অনেকদিনের বিরাগ ছিল।তখন আমি ছিলাম অনেকটা বামঘেঁষা।ওদিকে গ্যারি আমাকে যে ব্যাপারগুলো বলত সেগুলো হচ্ছে আমার বাড়ন্তকালের স্মরণ করা ঘটনাবলির বাড়তি অংশ – যদিও সেখানে একটা শহুরে ছেলের জীবন আর খামারে বেড়ে ওঠা মেয়ের জীবনের ভেতরের ফারাকটা পুরোপুরি ছিল।গ্যারির জীবনের শ্রেষ্ঠতম অংশ ছিল সম্ভবত সাত থেকে পনেরো বছরের ভেতরে, যখন ছেলেরা দলবেঁধে শহরে টো-টো করে বেড়াত।ওরা বখাটে বা তেমন কিছু ছিল না, তবে কমবেশি যা ইচ্ছা তাই করত, যেন শহরের মাঝে একটা পৃথক সংস্কৃতি।মেয়েরা ওসবের অংশ ছিল না, আমার তো মনে পড়ে না।আমাদের মেয়েবন্ধুদের মাঝে কমবেশি একটা বন্ধন ছিল, ছিল না কেবল স্বাধীনতা।ফলে এসব ব্যাপার জানাটা ছিল কৌতূহলের।

 

জ্য ম্যাকক্যলক : এই এলাকার বাইরে আপনি কতটা সময় ছিলেন?

 

মুনরো : ১৯৫১-র শেষের দিকে আমার বিয়ে হয়, চলে যাই ভ্যানকুভারে।১৯৬৩ সাল পর্যন্ত সেখানে থাকি, এবং তারপর আমরা ভিক্টোরিয়ায় চলে যাই, যেখানে আমরা বইয়ের দোকান ‘মুনরো’স শুরু করি।এবং আমি ফিরে আসি – মনে হয় এটা হবে ১৯৭৩-র গ্রীষ্মে।ফলে আমি দশ বছর ছিলাম ভিক্টোরিয়ায়।বিবাহিত ছিলাম কুড়ি বছর।

 

জ্য ম্যাকক্যলক : পুবে চলে এলেন কি গ্যারির দেখা পেলেন বলে, নাকি কাজের খাতিরে?

 

মুনরো : কাজের জন্য।এবং যেহেতু আমি আমার প্রথম স্বামীর সঙ্গে দশ বছর ভিক্টোরিয়ায় বাস করেছিলাম, সেজন্যও।এক-দু বছরের মতো বিয়েটা পাক খেয়ে গিয়েছিল।এটা একটা ছোট শহর, আপনার বন্ধুমহলে একজন আরেকজনকে চেনে, আর আমার মনে হয়েছে একটা বিয়ে যদি ভেঙে যেতে থাকে, তাহলে একই পরিবেশে থাকাটা কঠিন।ভাবলাম এটাই আমাদের জন্য মঙ্গল, তবে ও ছেড়ে যেতে পারল না, কেননা বইয়ের দোকানটা ছিল ওর।আমি টরন্টোর বাইরে ইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্রিয়েটিভ রাইটিং পড়ানোর জন্য একটা চাকরির প্রস্তাব পেলাম, কিন্তু ওই চাকরিতে মোটেও থাকিনি।বিশ্রী লাগত, এবং যদিও আমার টাকা-কড়ি ছিল না, আমি ছেড়ে দিলাম।

 

জ্য ম্যাকক্যলক : কারণ আপনি ফিকশন পড়ানোটা পছন্দ করতেন না?

 

মুনরো : না।ওটা তো সাংঘাতিক ব্যাপার।১৯৭৩ সালে।ইয়র্ক ছিল অত্যন্ত সনাতনী বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর একটি, আর আমার ক্লাসে সবাই ছিল ছেলে, মেয়ে কেবল একটি, ও আবার খুব একটা কথা বলত না।ওই সময়ে যা প্রচলন ছিল ওরা তাই-ই করত, যেমন বুঝতে পারা যেত না, তেমনি কাজ-কারবার ছিল গতানুগতিক জিনিস নিয়ে, মনে হতো ওরা অন্য কিছু করার ব্যাপারে নারাজ।আমার জন্য ভালোই ছিল।লেখালেখির বিষয়ে কিছু ধ্যানধারণা নিয়ে গলাবাজি করা, যা আগে কখনো আমি ঝালাই করিনি।কিন্তু ওদের ভেতরে কীভাবে ঢুকতে হয় তা আমি জানতাম না, জানতাম না কীভাবে ওদের পক্ষে যেতে হয়।হয়তো এতদিনে আমি তা জেনে যেতাম, কিন্তু এতে তো লেখালেখির সঙ্গে কোনো কিছু করার আছে বলে মনে হয় না – অনেকটা এই যেমন টেলিভিশনে অংশ নেওয়ার জন্য ভালো প্রশিক্ষণ কিংবা অন্য কিছু।গতানুগতিক জিনিসের সঙ্গে খাপ খাওয়ানো, ওগুলো আমার বদলাতে পারা উচিত ছিল, কিন্তু পারিনি।এক ছাত্রী, আমার ক্লাসের নয়, আমাকে একটা গল্প এনে দেখাল।মনে পড়ে আমার চোখ ফেটে জল বেরিয়ে আসছিল, কেননা গল্পটা ছিল অত্যন্ত চমৎকার, তাছাড়া অনেকদিন আমি শিক্ষার্থীদের মাঝে কোনো ভালো লেখা দেখিনি।ও জানতে চাইল, ‘কীভাবে তোমার ক্লাসে ভর্তি হতে পারি’, আর আমি বলেছিলাম, ‘না না আমার ক্লাসের ধারে-কাছে এসো না, শুধু তোমার লেখা আমার কাছে নিয়ে আসতে থাকো।’এবং ও লেখক হয়েছিল, একমাত্র ও-ই পেরেছিল।

 

জ্য ম্যাকক্যলক : কানাডায় কি আমেরিকার মতো ক্রিয়েটিভ রাইটিং স্কুল দ্রুত বাড়ছে?

 

মুনরো : সম্ভবত পুরোমাত্রায় না।আইওয়ার মতো কোনো কিছু আমাদের এখানে নেই।কিন্তু রাইটিং বিভাগে পড়িয়ে চাকুরে তৈরি করা হচ্ছে।একটা সময় পর্যন্ত আমি এদের জন্য করুণা বোধ করতাম।কেননা ওদের লেখা ছাপা হতো না।সত্যটা হলো এই যে, তারা আমার চেয়ে তিনগুণ বেশি টাকা রোজগার করত, যা আমি কখনো দেখিনি যে আমার কাছে এসেছে।

 

জ্য ম্যাকক্যলক : আপনার সিংহভাগ গল্প অন্টারিওকে ভিত্তি করে লেখা।আপনার এখন এখানে বসবাস করাটা কি বেছে নেওয়া, নাকি এটা ছিল ঘটনাক্রমে?

 

মুনরো : এখন আমার এখানে থাকাটা বেছে নেওয়া।ওই বাড়িটা হলো গ্যারির মায়ের, আর গ্যারি এখানে আছে মাকে দেখভাল করার জন্য।আর আমার বাবা এবং সৎমাও এ-অঞ্চলেই বাস করেছে; আমরা উপলব্ধি করেছিলাম যে, একটা নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত এসব বৃদ্ধ-বনিতার যত্ন-আত্তির কাজে আসি, এবং আমরা তাই করতে চলে এসেছিলাম।পরে অবশ্য নানাবিধ কারণে সেটা হয়ে ওঠেনি; তাঁরা অনেক আগেই চলে গেছেন, আর আমরা এখনো এখানে আছি।এখানে থাকার আরেকটা কারণ হলো দিগন্ত, যা আমাদের দুজনের কাছে গুরুত্বপূর্ণ।এই চমৎকার ব্যাপারটায় আমাদের মিল।গ্যারিকে ধন্যবাদ, আমি এ-দিগন্ত একটু আলাদাভাবে উপভোগ করি।অন্য কোনো দিগন্ত, গ্রাম, হ্রদ বা শহর এভাবে পেতাম না, এবং এখন আমি তা অনুভব করি, অতএব আমি কখনোই এ-জায়গাটা ছেড়ে যাব না।

 

জ্য ম্যাকক্যলক : গ্যারির সঙ্গে কীভাবেসাক্ষাৎ হলো?

 

মুনরো : বিশ্ববিদ্যালয়ে একত্রে যখন পড়তাম তখন থেকেই গ্যারিকে চিনতাম।ও ছিল সিনিয়র আর আমি সদ্য ঢুকেছি।গ্যারি ছিল দ্বিতীয় মহাযুদ্ধফেরত সৈনিক, অর্থাৎ আমাদের মধ্যে সাত বছরের ফারাক।যখন আমার বয়স আঠারো তখন আমি ওর প্রতি সাংঘাতিক প্রেমাসক্ত ছিলাম।কিন্তু ও আমাকে মোটেও পাত্তা দিত না।ওর মনোযোগ ছিল অন্যদের দিকে।ছোট একটা বিশ্ববিদ্যালয়, ফলে আপনি সবাইকে চিনতেন তারা কারা।এবং ও ছিল ওইদলের একজন যারা – মনে হয় আমরা ওদের ভবঘুরে বলতাম – তখন ওদের ভবঘুরেই তো বলা হতো।সাহিত্যপত্রিকার জন্য ওরা কবিতা লিখত, এবং ওরা ছিল সাংঘাতিক, মাতাল হতো, এবং এসব আরো কী কী যেন করত।তো ভেবেছিলাম, ও তো পত্রিকার সঙ্গে যুক্ত, আর আমি তখনই প্রথম গল্পটা লিখি।আমার পরিকল্পনার একটা অংশ ছিল যে, ওকে নিয়ে খসড়াটা দেখানো, তারপর আমরা আলোচনায় মশগুল হবো, এবং ও আমার প্রেমে পড়বে এবং সবকিছু ওখানে থেকে চলতে থাকবে।তো গল্পটা নিয়ে আমি ওর কাছে গেলাম, আর ও কিনা বলল, সম্পাদক হচ্ছেন জন কেয়ার্ন, তিনি বসেন হলের ওধারে।ওটাই ছিল আমাদের একমাত্র কথোপকথন।

 

জ্য ম্যাকক্যলক : কলেজের ওই বছরগুলোয় ওটাই ছিল আপনার একমাত্র কথাবিনিময়?

 

মুনরো : হ্যাঁ। তবে পরে গল্পটা ছাপা হলো, গ্যারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বেরিয়ে গেল।এবং আমি যখন প্রথম এবং দ্বিতীয় বর্ষের মাঝখানটায় বেয়ারার চাকরি করছি, তখন গ্যারির কাছ থেকে একটা চিঠি পেলাম, অত্যন্ত চমৎকার চিঠি ছিল।আদ্যন্ত আমার গল্পটা নিয়ে লেখা।ওটাই ছিল কোনো ভক্তের আমাকে লেখা প্রথম চিঠি।তবে চিঠিটা মোটেও আমাকে নিয়ে নয়, এতে আমার রূপের কোনো কথা ছিল না, কিংবা লেখা ছিল না যে দেখা হলে ভালো হতো বা ওরকম কিছু।ওটা ছিল একটা সাহিত্য মূল্যায়নধর্মী চিঠি।ফলে, চিঠিটা অন্য কারো কাছ থেকে এলে আমার যতটা ফুলে ওঠার কথা ছিল, এক্ষেত্রে ততটা উঠলাম না, কেননা আমি আশা করেছিলাম এটা আরো বেশি কিছু হবে।তারপর আমার লন্ডনে ফিরে যাওয়া এবং ওয়েস্টার্নে (বিশ্ববিদ্যালয়ে) চাকরি পাওয়ার পর কোনোভাবে ও আমাকে রেডিওতে শুনেছিল।আমি একটা সাক্ষাৎকার দিয়েছিলাম।তাতে আমি নিশ্চয়ই বলেছিলাম কোথায় থাকতাম এবং ধারণা দিয়েছিলাম যে, আমি তখন আর বিবাহিত নই, আর তাই তো তখন ও আমার সঙ্গে দেখা করতে এসেছিল।

 

জ্য ম্যাকক্যলক : এবং ঘটনাটা ছিল প্রায় কুড়ি বছর পর?

 

মুনরো : নিঃসন্দেহে।কুড়ি বছরেরও বেশি পরে, আর এর মধ্যে আমাদের মাঝে দেখা-সাক্ষাৎ হয়নি।ও মোটেও ফিরে তাকায়নি, আমি যেমনটি আশা করেছিলাম।তো, ও শুধু ফোন করে আমাকে বলল, গ্যারি ফ্রেমলিন বলছি, আমি ক্লিনটনে আছি, ভাবছিলাম কোনো একটা সময়ে যদি একসঙ্গে দুপুরে খাওয়া-দাওয়া করা যেত।আমি জানতাম ওর বাড়ি ক্লিনটনে, এবং ধরে নিয়েছিলাম, ও বাড়িতে এসেছে বাবা-মাকে দেখতে।মনে হয় এ-যাত্রা আমি জানতাম ও অটোয়ায় কাজ করত; কার কাছ থেকে যেন শুনেছিলাম।ধরে নিয়েছিলাম ওর স্ত্রী এবং সন্তানরা অটোয়ায় থাকে, আর ও বাড়িতে এসেছে বাবা-মাকে দেখতে এবং ভেবেছে পূর্বপরিচিত একজনের সঙ্গে দুপুরে খাওয়া যাক।সাক্ষাৎ হওয়ার আগে পর্যন্ত আমি এমনটাই আশা করছিলাম, তবে পরে আমি জানলাম ও ক্লিনটনেই থাকে আর কোনো বউ-বাচ্চা নেই।আমরা ফ্যাকাল্টি ক্লাবে গিয়ে লাঞ্চের সময় একেকজন তিনটি করে মার্টিনি খেলাম।মনে হয় আমরা কিছুটা নার্ভাস ছিলাম।তবে তাড়াতাড়িই আমরা খুব ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠলাম।সম্ভবত বিকেল যখন পড়ন্ত তখন আমরা একসঙ্গে থাকার আলোচনা করছিলাম।খুব দ্রুতই ঘটল ব্যাপারটা।আমার মনে হয়, আমি ওয়েস্টার্নে সে-টার্মে পড়ানোর পাঠ চুকিয়ে ক্লিনটনে চলে আসি, এবং ওই বাড়িতে একসঙ্গে থাকা শুরু করলাম, যেখানে গ্যারি ফিরে এসেছিল মায়ের দেখাশোনার জন্য।

 

জ্য ম্যাকক্যলক : লেখালেখির জন্য এখানে আসার সিদ্ধান্ত নেননি?

 

মুনরো : আমি লেখালেখির চিন্তা মাথায় নিয়ে কখনো কোনো সিদ্ধান্ত নিইনি, কখনো ভাবিওনি যে লেখা ছেড়ে দেব।আমার ধারণা, হয়তো আমি বুঝিনি যে লেখালেখির জন্য আমার কোন অবস্থাটা থাকতে হবে, যা হতে হবে অন্য কোনো অবস্থার চেয়ে উত্তম।একমাত্র একটা ব্যাপারই আমার লেখালেখি থামাতে পেরেছিল, তাহলো লেখকের চাকরি।যখন আমি সাধারণের মধ্যে একজন লেখক হিসেবে চিহ্নিত হলাম এবং লেখার জন্য আমাকে একটা অফিস দেওয়া হলো।

 

জ্য ম্যাকক্যলক : ব্যাপারটা তো আপনার শুরুর দিকের গল্প ‘The Office’-কে স্মরণ করিয়ে দেয়; এক নারী যিনি লেখার জন্য একটা অফিস ভাড়া করেন, আর বাড়িওয়ালার কারণে তাঁর এতটাই বিঘ্ন ঘটে যে, তাকে বাড়ি ছেড়ে চলে যেতে হয়।

 

মুনরো : গল্পটা লেখা হয়েছিল বাস্তব অভিজ্ঞতার কারণে।আমি একটা অফিস পেয়েছিলাম, আর সেখানে আমি কোনো কিছুই লিখতে পারিনি – কেবল ওই গল্পটা বাদে।বাড়িওয়ালা আমাকে বিরক্ত করত।তবে সে যখন থামল, তখনো আমি লিখতে পারিনি।যখনই আমার লেখালেখির জন্য একটি অফিস ছিল তখনই ব্যাপারটা ঘটেছে।যখন আমি ‘Writer in Residence’ হয়ে কুইন্সল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে কাজ করছিলাম, তখনো সেখানের ইংরেজি বিভাগে আমার একটা অফিস ছিল, বেশ ছিমছাম আর পরিপাটি অফিস।ওখানে আমার কথা কেউ জানত না, তাই কেউ আমার সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎ করতে আসেনি।অবশ্য ওখানে কেউ লেখক হওয়ার চেষ্টা করত না।ওটা ছিল ফ্লোরিডার মতো, মেয়েরা সবসময় বিকিনি পরে এদিক-সেদিক ঘুরে বেড়াত।ফলে পুরো সময়টা ছিল আমার, আর আমি ওই অফিসে বসে বসে শুধু ভাবতাম।কোনো কিছুই মাথায় আনতে পারিনি।আমি বলব, ওটা ছিল নিষ্ফলা সময়।

 

জ্য ম্যাকক্যলক : উপাদানের জন্য ভ্যানকুভার কি খুব দরকারি ছিল না?

 

মুনরো : আমি থাকতাম শহরতলিতে, প্রথমে উত্তর ভ্যানকুভার, পরে পশ্চিম ভ্যানকুভারে।উত্তরের ছেলেরা সব সকালবেলা কাজে যেত এবং ফিরে আসত রাতে; সারাদিন থাকত কেবল গৃহিণীরা আর বাচ্চাকাচ্চা।ওখানে খুব ঘরোয়া একাত্ম বোধ ছিল, তাছাড়া একা থাকাটা ছিল কঠিন।ভ্যাকুয়াম করা আর উলের কাপড়চোপড় ধোয়ামোছা নিয়ে যথেষ্ট খোশগল্প হতো; কে বেশি, কে কম করল, আর আমি খুব চটে যেতাম।যখন আমার একটি সন্তান হলো, তখন আমি ওকে স্ট্রোলারে বসিয়ে মাইলের পর মাইল হাঁটতাম কফির দাওয়াত এড়াতে।ব্যাপারটা ছিল, আমি যে-সংস্কৃতির আবহে বেড়ে উঠেছি তার তুলনায় অত্যন্ত সংকীর্ণ এবং বাজে।অনেক কিছুতেই বিধিনিষেধ ছিল যেমন, কোনো কিছু গুরুত্বের সঙ্গে নেওয়া।জীবন খুব আঁটসাঁটভাবে চালানো হতো, অনুমোদিত বিনোদন, অনুমোদিত মতামত এবং অনুমোদিত পন্থায় নারী হওয়ার মতো।একমাত্র স্থান ছিল, আমার মনে হয়, অন্যের স্বামীদের সঙ্গে দাওয়াতে টাংকি মারা; আপনার মাথায় কিছু একটা আসার সেটাই ছিল আসলে একমাত্র সময়, যা মনে হতো বাস্তব।যেহেতু পুরুষদের সঙ্গেই আপনি শুধু যোগাযোগ করতে পারতেন, এর ভেতরে কিছুটা বাস্তবতা ছিল এবং আমার কাছে মনে হতো সেটা যৌনতা বিষয়ে।অন্যথায়, পুরুষরা আপনার সঙ্গে সচরাচর কথা বলত না, কিংবা যদিও বলত, বলত যথেষ্ট উঁচু থেকে নিচুতে।কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক কিংবা কারো সঙ্গে আমি দেখা করব, এবং তিনি যা জানতেন তা যদি আমি জানি, তাহলে সেটা কোনো গ্রহণযোগ্য কথোপকথন বিবেচিত হতো না।পুরুষরা চাইত না আপনি কথা বলুন, আর নারীরা তো নয়ই।তো আপনার জগৎ বলতে ছিল মেয়েলি প্যাঁচাল; সবচেয়ে ভালো খাবার কিংবা উলের কাপড়চোপড়ের যত্ন নেওয়ার ভালো উপায় কী।আমি থাকতাম উচ্চাভিলাষী মানুষদের স্ত্রীদের সঙ্গে।এতটাই ঘৃণা করতাম যে, এসব নিয়ে আমি কখনো কিছু লিখতে পারিনি।তারপর পশ্চিম ভ্যানকুভার, শহরটা ছিল আবাসিক এবং অনাবাসিক, সবাই তরুণ দম্পতি ছিল না, আর আমি সেখানে অনেক ভালো বন্ধু জুটিয়েছিলাম।আমরা বইপত্র এবং রটনা নিয়ে কানাঘুষা করতাম আর উচ্চমাধ্যমিক স্কুলের ছাত্রীদের মতো সবকিছুতেই হাসতাম।তার কিছুটা নিয়ে আমি লিখতে চেয়েছি, তবে এখনো লিখিনি – অল্পবয়সী নারীদের সুখবিনাশী জগৎ, সবাই একে অন্যকে চালিয়ে নিচ্ছে।কিন্তু ভিক্টোরিয়ায় যাওয়া এবং একটা বইয়ের দোকান খোলা ছিল এ-যাবতকালের সবচেয়ে চমৎকার ঘটনা, এজন্য যে, শহরের সব উৎসাহী ব্যক্তি দোকানে আসত, আমাদের সঙ্গে কথা বলত।

 

জ্য ম্যাকক্যলক : বইয়ের দোকান খোলার ধারণাটা আপনাদের মধ্যে কীভাবে এলো?

 

মুনরো : জিম ‘ইটনের’ (শহরের বড় মুদি-মনিহারি দোকান) চাকরি ছাড়তে চাচ্ছিল।আমরা আলাপ করছিলাম কীভাবে ও কোনো একটা ব্যবসায় ঢুকতে পারে, আর আমি বললাম, দেখো, যদি আমাদের একটা বইয়ের দোকান থাকে তাহলে আমি তোমাকে সাহায্য করতে পারব।সবাই ভেবেছিল যে আমরা লাটে উঠব, অবশ্য প্রায় উঠেও ছিলাম।খুবই দরিদ্র ছিলাম, তাছাড়া আমার বড় সন্তান দুটি স্কুলে পড়ছে, তাই আমি সবসময় দোকানে কাজ করতে পারতাম, এবং করেছিও।আমার প্রথম বিয়ের ওটাই ছিল সুখের কাল।

 

জ্য ম্যাকক্যলক : আপনার ভেতরে সবসময়ই কি এ-ধারণাটি ছিল যে বিয়েটা টিকবে না?

 

মুনরো : আমি ছিলাম ভিক্টোরীয় মেয়েদের মতো – বিয়ের জন্য চাপ আসাটা খুব ভালোই ছিল – ভাবতাম বেরোনোর একটা উপায় তো হোক, বিয়ে না হয় করলাম, তাহলে এটা নিয়ে তারা তো আমাকে আর বিরক্ত করবে না।এবং তারপর আমি একজন প্রকৃত মানুষ হবো এবং আমার জীবনের যাত্রা শুরু হবে।মনে হয় লিখতে পারার জন্যই বিয়েটা করেছিলাম; থিতু হওয়া এবং দরকারি জিনিসগুলোয় আবার মনোনিবেশ করা।এখন মাঝেমধ্যে যখন আমি ওই পুরনো দিনগুলোয় ফিরে যাই, ভাবি আমি ছিলাম কঠিন হৃদয়ের একটি মেয়ে, সে-তুলনায় এখন আমি অনেক সাদাসিধে নারী।

 

জ্য ম্যাকক্যলক : তরুণ শিল্পীদের, কোনো একটা পর্যায়ে কঠিন হৃদয়ের হতে হয় না?

 

মুনরো : নারী হলে তো সেটা খুবই খারাপ।আমি আমার সন্তানদের গুনগুন করে গান শোনাতে চাই এবং বলতে চাই তোমরা কি সত্যিই ভালো আছ? আমি বোঝাতে চাই না যে, এমন একজন হওয়া… যা অবশ্য ওদের আতঙ্কিত করত, কেননা এতে মনে হতো ওরা কোনো ধরনের ফালতু জিনিস।সন্তানদের জন্য আমার কিছু অংশ সাড়া দেয় না এবং ওরা ব্যাপারগুলো খেয়াল করে।এ তো নয় যে, আমি ওদের অবহেলা করতাম, কিন্তু পুরোপুরি মগ্ন ছিলাম না।যখন আমার বড় মেয়ের বয়স দু-বছরের মতো, তখন আমি যেখানে টাইপরাইটারের কাছে বসতাম, ও সেখানে আসত, আর আমি ওকে এক হাত দিয়ে চাপড়ে দিতাম আর অন্য হাতে টাইপ করতাম।আমি ওকে তা বলেছি।বলা উচিত হয়নি, কেননা কোনটা বেশি দরকারি ছিল সেটা ওকে ক্ষুব্ধ করেছে।মনে হয় আমি সবকিছু করেছি স্রোতের উলটোদিকে।পুরোপুরি লেখালেখিতে মগ্ন একজন লেখক – এমন একটা সময়, যখন বাচ্চারা ছিল ছোট এবং আমাকে পেতে মরিয়া।আর এখন আমি ওদের যথেষ্ট ভালোবাসি, যখন আমাকে ওদের একদম দরকার নেই।আমি এখন বাড়ির চারধারে ঘুরি আর ভাবি, অনেক ফ্যামিলি ডিনার হওয়া উচিত।

 

জ্য ম্যাকক্যলক : আপনার প্রথম বইয়ের জন্য আপনি গভর্নর জেনারেল পুরস্কার পেয়েছিলেন, যা কিনা বলতে গেলে আমাদের দেশের ‘পুলিৎজার’পুরস্কারের সমমানের।আমেরিকায় এটা খুব কদাচিৎ ঘটে যে, কোনো প্রথম বই এমন একটা বড় পুরস্কার অর্জন করল।যখন এমন ঘটে তখন লেখকদের ভবিষ্যৎ পেশা সচরাচর ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

 

মুনরো : উম, একটা ব্যাপার হলো আমি অল্পবয়সী ছিলাম না।তবে ব্যাপারটা কঠিন ছিল।প্রায় এক বছর আমি কোনো কিছু লিখতে পারিনি, কেননা এই ভেবে ব্যস্ত ছিলাম যে, আমি একটি উপন্যাস নিয়ে কাজ করব।কোনো ইয়া বড় বেস্টসেলার সৃষ্টি করার মতো কোনো চাপ আমার ছিল না, সবাই সেটা নিয়ে আলাপ-আলোচনা করবে, উদাহরণস্বরূপ অ্যামিট্যান যেমন তাঁর প্রথম বই নিয়ে করেছিলেন।এ-বইটির কাটতি খুব খারাপ ছিল, এবং কেউ এর কথা শোনেনি – যদিও এটা গভর্নর জেনারেল পুরস্কার পেয়েছিল।আপনি বইয়ের দোকানে গিয়ে এটার কথা বলতেন, ওদের কাছে থাকত না।

জ্য ম্যাকক্যলক : লেখার সমালোচনা কি আপনার কাছে খুব একটা ব্যাপার? ও থেকে কোনো কিছু শিখেছেন বলে মনে হয়? কখনো কি সমালোচনায় মর্মাহত হয়েছেন?

 

মুনরো : হ্যাঁ, আবার না, কেননা সমালোচনা থেকে আসলে কিছু শিখতে পারবেন না।কিন্তু সমালোচনায় আপনি সাংঘাতিক মর্মাহত হতে পারেন।একটা বাজে সমালোচনা আমজনতার হাতে নাকাল হওয়ার মতো লাগে।অবশ্য যদিও এটা আপনার কাছে খুব একটা ব্যাপার না, তবে আপনাকে দূরদূর করে তাড়িয়ে দেওয়ার চেয়ে বরং বাহবা দেওয়া উচিত।

 

জ্য ম্যাকক্যলক : বাড়ন্তকালে আপনি কি খুব পড়ুয়া ছিলেন? কোনো লেখা যদি থাকে, যার দ্বারা আপনি প্রভাবিত?

 

মুনরো : বস্তুত ত্রিশ পর্যন্ত পড়াশোনা ছিল আমার জীবন।বইয়ের মধ্যেই থাকতাম।প্রথমত দক্ষিণের সাহিত্যিকরা আমাকে চালিত করেছেন, কেননা তাঁরাই আমাকে দেখিয়েছেন যে, আপনি ছোট শহর, গাঁও-গেরামের মানুষদের নিয়ে লিখতে পারেন, আর ওই জীবনাচরণে আমি যথেষ্ট ওয়াকিবহাল ছিলাম।তবে দক্ষিণের লেখকদের যে-বিষয়টা আমাকে আগ্রহী করেছিল, আমার অবচেতনে, দক্ষিণের লেখকরা যাঁদের আমি খুব পছন্দ করতাম, তাঁরা সবাই ছিলেন নারী।আমি আসলে ফকনার অতটা পছন্দ করতাম না।আমার ভালো লাগত ইউডোরা ওয়েলডি, ফ্লেনারি ও’কনার, ক্যাথরিন অ্যানপোর্টার, কার্সন ম্যাকুলার্স।একটা ধারণা ছিল যে, নারীরা অনাকাঙ্ক্ষিত, প্রান্তজনদের নিয়ে লিখতে পারে।

 

জ্য ম্যাকক্যলক : আপনি সচরাচর যেটা করছেন।

 

মুনরো : হ্যাঁ।আমি বুঝতে শিখেছিলাম ওটা আমাদের জমিন।অন্যদিকে মূলধারার বাস্তব জীবনভিত্তিক মোটামোটা উপন্যাসের জমিনটা ছিল পুরুষদের।জানি না কীভাবে যে আমি ওই প্রান্তজনদের একজন হওয়ার উপলব্ধিটা পেলাম।এটা তো নয় যে, আমাকে ওদিকে ঠেলে দেওয়া হয়েছে।হয়তো-বা আমি নিম্নবর্গেই বেড়ে উঠেছি বলে।আমার মনে হয়েছে, বড়বড় লেখকের মধ্যে কিছু একটা আছে, যা থেকে নিজেকে দূরে রাখি, কিন্তু আমি মোটেও জানতাম না যে সেটা কী ছিল।ডি. এইচ. লরেন্স যখন প্রথম পড়ি, আমি সাংঘাতিক হোঁচট খেয়েছিলাম।কখনো কখনো নারীর যৌনতা বিষয়ে লেখকদের দৃষ্টিভঙ্গি দেখে আমার মন খারাপ হয়ে যেত।

 

জ্য ম্যাকক্যলক : একটু নির্দিষ্ট করে বলবেন, সেটা কি যা আপনাকে বিচলিত করত?

 

মুনরো : ব্যাপারটা ছিল, আমি কীভাবে একজন লেখক হতে পারি, যখন আমি অন্য লেখকদের উদ্দিষ্ট বস্তু!

 

জ্য ম্যাকক্যলক : জাদুবাস্তবতা সম্পর্কে আপনার প্রতিক্রিয়া কী?

 

মুনরো : One Hundred Years of Solitude আমার ভালো লেগেছে।আমি পছন্দ করতাম।তবে এটা অনুকরণ করা যায় না।মনে হতো খুব সহজ, কিন্তু এটা তা নয়।চমৎকার লাগে যখন পিঁপড়েরা সন্তান বয়ে চলে, আকাশে দৃশ্যমান কুমারী, গোত্রপতির মৃত্যু এবং সেজন্য পুষ্পবৃষ্টি।কিন্তু থামাটা যেমন কঠিন, তেমনি উইলিয়াম ম্যাক্সওয়েলের So Long See You Tomorrow-টাও চমৎকার, যেখানে কুকুরটা হচ্ছে গিয়ে একটা চরিত্র।তিনি অত্যন্ত মামুলি একটি বিষয় নিয়ে কাজ করেছেন, যা খুব কার্যকর এবং লেখাটিকে করেছে অসাধারণ।

 

জ্য ম্যাকক্যলক : আপনার নতুন কিছু গল্পে বাঁক পরিবর্তন লক্ষণীয়।

 

মুনরো : প্রায় পাঁচ বছর আগে যখন Friend of My Youth সংকলনের গল্পগুলো নিয়ে কাজ করছিলাম, তখন আমি বিকল্প বাস্তবতা নিয়ে একটি গল্প লিখতে চেয়েছিলাম।চিন্তাটা মাথা চাপা দিলাম, এজন্য উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছিলাম যে, শেষ অবধি এটা না আবার ‘Twilight Zone’ ধরনের কিছুতে গিয়ে ঠেকে।জানেন তো, আসলেই রদ্দি জিনিস।আমি এতে আতঙ্কিত হয়ে পড়েছিলাম, কিন্তু আমি ‘Carried Away’ লিখেছি এবং আহাম্মকের মতো এটাকে নিয়ে পড়ে থেকে একটা আজগুবি সমাপ্তি টেনেছি।

হয়তো-বা এটা বয়সের একটা ব্যাপার।উপলব্ধিতে পরিবর্তন আনা সম্ভব ততটুকু, যতটুকু ঘটেছে – যা ঘটতে পারে কেবল তা নয়, যা আসলেই ঘটেছে।আমার নিজের জীবনে এসব বিচ্ছিন্ন বাস্তবতা রয়েছে আর সেগুলো আমি অন্য মানুষদের জীবনেও খেয়াল করি।ওটাই ছিল সমস্যাগুলোর একটা যে – কেন আমি উপন্যাস লিখতে পারিনি, আমি কখনো কোনো কিছু খুব ভালোভাবে একত্রিত হতে দেখিনি।

 

জ্য ম্যাকক্যলক : আপনার আস্থা সম্পর্কে বলুন, এত বছরে কি কোনো পরিবর্তন হয়েছে?

 

মুনরো : লেখালেখিতে আমার সবসময়ই যথেষ্ট আস্থা ছিল, সঙ্গে আতঙ্কও ছিল, এজন্য যে, এই আস্থা পুরোপুরি টলে যাবে।আমি অনেকটা মনে করি যে, আমার আস্থা এসেছে নীরবতা থেকে, কেননা, আমি মূলধারার অনেক বাইরে বাস করেছি।মাথায়ই আনিনি যে, নারীরা লেখিকা হতে পারবে না, পুরুষরা অনায়াসে যেভাবে পারে।আর নিম্নবর্গের মানুষের পক্ষে তো নয়ই।ধরুন, আপনি যে-শহরে থাকেন সেখানে যদি কদাচিৎ দু-একজনের দেখা মেলে যারা পড়াশোনা করে, সেখানে আপনি যদি ভাবেন খুব ভালোভাবে লেখালেখি করতে পারবেন, তাহলে নিশ্চয়ই ধরে নিতে পারেন যে, এটা একটা দুষ্প্রাপ্য গুণ।

 

জ্য ম্যাকক্যলক : সাহিত্য পরিমণ্ডল এড়িয়ে থাকায় আপনি সিদ্ধহস্ত।এটা কি সচেতনভাবে, নাকি মূলত অবস্থানের কারণে?

 

মুনরো : অনেক দিন ধরে ব্যাপারটা নিঃসন্দেহে অবস্থানগত কারণে, কিন্তু পরে এটা পছন্দের ব্যাপার হয়ে গেছে।মনে হয় আমি একজন বন্ধুবৎসল মানুষ, তবে খুব একটা সামাজিক নই।মূলত নারী, গৃহিণী এবং একজন মা হওয়ার কারণেই আমি যথেষ্ট সময় পেতে চেয়েছি।এটার অর্থ দাঁড়িয়েছে, আমি ওই ব্যাপারটায় স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করি না।আমি আমার আত্মবিশ্বাস হারিয়ে ফেলতে পারতাম, যথেষ্ট কথাবার্তা শুনতাম, যা বুঝতাম না।

 

জ্য ম্যাকক্যলক : তাহলে আপনি মূলধারার বাইরে থেকে খুশি?

 

মুনরো : এটাই হয়তো আমি বলতে চাচ্ছি।অন্যথায় খুব ভালোভাবে আমি হয়তো টিকতে পারতাম না।এমনও হতে পারত যে, আমি আমার আস্থা হারিয়ে ফেলতাম, আমি যাদের সঙ্গে মিশতাম তারা যে-কাজগুলো করছে সে-ব্যাপারে তারা আমার চেয়ে বেশি জানত বলেই।এবং এ নিয়ে অনেক কথাবার্তা বলত, আর এমন আত্মবিশ্বাস থাকত যে, তার ভিত্তিটা মনে হতো আমার থেকে বেশি পোক্ত।কিন্তু তারপরও, লেখকদের বেলায় এটা বলাশক্ত – কে আত্মবিশ্বাসী।

 

জ্য ম্যাকক্যলক : যে সমাজে আপনি বেড়ে উঠেছেন তারা কি আপনার পেশায় সন্তুষ্ট ছিল?

 

মুনরো : ওখানে ওরা জানত যে, আমার গল্প এদিক-সেদিক ছাপা হয়।তবে আমার লেখাগুলো তো খুব একটা আহামরি ছিল না।আমার নিজের শহরে খুব একটা ভালো যায়নি – যৌনতা, অশালীন ভাষা, দুর্বোধ্যতা।স্থানীয় পত্রিকা আমাকে নিয়ে একটা সম্পাদকীয় লিখেছিল : জীবনের অন্তর্মুখী নিরানন্দ দৃষ্টিভঙ্গি এবং একটি অস্বাভাবিক ব্যক্তিত্ব ফুটে উঠেছে, যখন এটা বের হয় ততদিনে আমার বাবা মারা গেছেন, বাবা বেঁচে থাকতে তারা এটা করেনি, কেননা সবাই তাঁকে সত্যিই পছন্দ করত।তিনি এতই পছন্দনীয় এবং সম্মানিত ছিলেন যে, সবাই চুপ হয়ে যেত।কিন্তু তাঁর মৃত্যুর পরে পরিস্থিতি ছিল ভিন্ন।

 

জ্য ম্যাকক্যলক : তিনি আপনার লেখা পছন্দ করতেন?

 

মুনরো : তিনি আমার লেখা পছন্দ করতেন কিনা, হ্যাঁ, এবং এ নিয়ে বাবার খুব গর্ব ছিল।বাবা অনেক পড়তেন, তবে সবসময় পড়ার ব্যাপারে অপ্রস্তুত বোধ করতেন।পরে, ঠিক তার মৃত্যুর আগেভাগে একটা বই লিখেছিলেন, বইটা মৃত্যুর পর প্রকাশিত হয়েছিল।একটা উপন্যাস, দক্ষিণ-পশ্চিমের অভ্যন্তরে অভিযাত্রী পরিবারগুলো নিয়ে।কাহিনির ব্যাপ্তি ছিল তাঁর জীবনের ঠিক আগে, শেষ হয়েছে যখন তিনি শিশু।বাবার মধ্যে প্রকৃত লেখকদের সহজাত গুণটি ছিল।

 

জ্য ম্যাকক্যলক : একটা উল্লেখযোগ্য অংশ উদ্ধৃত করতে পারবেন?

 

মুনরো : একটা অধ্যায়ে এক বালকের কাছে, বাবার জন্মের কিছুটা আগে, স্কুল দেখতে কেমন ছিল তার বর্ণনা দিয়েছেন : দেয়ালে ছিল রংচটা বাদামি মানচিত্র।তাতে আকর্ষণীয় স্থান, যেমন মঙ্গোলিয়া দেখানো হয়েছে, যেখানে বিক্ষিপ্ত বাসিন্দারা ভেড়ার চামড়ার কোট পরে ছোট ছোট টাট্টুঘোড়ায় চড়ে বেড়ায়।আফ্রিকার কেন্দ্রস্থল ছিল একটি শূন্যস্থান, কেবল চিহ্নিত হা-করা কুমির আর সিংহে, কালো মানুষদের ধরে আছে বিশাল থাবার নিচে।একদম মাঝখানটায় মিস্টার স্টানলি মি. লিভিংস্টোনকে স্বাগত জানাচ্ছেন, দুজনের মাথায় সনাতনী টুপি।

 

জ্য ম্যাকক্যলক : তাঁর উপন্যাসে আপনি কি আপনার ব্যাপারে কোনো কিছু লক্ষ করেছেন?

 

মুনরো : আমার জীবনের কোনো কিছু নয়, তবে আমি আমার রচনাশৈলীর বেশ খানিকটা আভাস পেয়েছি।দৃষ্টিভঙ্গিটা আমাকে অবাক করেনি, কেননা, আমি জানতাম এটা ছিল আমাদের এজমালি ব্যাপার।

 

জ্য ম্যাকক্যলক : আপনার মা কি তাঁর মৃত্যুর আগে আপনার কোনো লেখা পড়েছিলেন?

 

মুনরো : মা এসব পছন্দ করতেন না।তাঁর ভালো লাগত না।আমার তো মনে হয় না – যৌনতা আর অশালীন শব্দগুচ্ছ।মা সুস্থ থাকলে তো আমার সঙ্গে তাঁর ধুন্দুমার ঝগড়া লেগে যেত, এবং আমি বাড়ি ছেড়ে চলে যেতাম, যা ইচ্ছা তাই ছাপানোর জন্য।

 

জ্য ম্যাকক্যলক : আপনি কি তাই করতেন মনে হয়?

 

মুনরো : আমার তাই মনে হয়, হ্যাঁ, কেননা বলেছিলাম না আমি তখন অত্যন্ত কঠিন হৃদয়ের ছিলাম।এখন আমি মায়ের জন্য যে মায়া অনুভব করি তা অনেকদিন অনুভব করিনি।জানি না, যদি আমার কোনো মেয়ে আমাকে নিয়ে লেখে তাহলে কেমন লাগবে।এখন ওদের যে বয়স তাতে তো ওদের বাল্যকাল নিয়ে প্রথম উপন্যাস বেরিয়ে যাওয়া উচিত।নিজের সন্তানের উপন্যাসের একটা চরিত্র হলে ভয়াবহ অভিজ্ঞতা হতো।অনেকের খামখেয়ালি সমালোচনার ব্যাপারগুলো কষ্ট দেয় যেমন এই যে, আমার বাবা ছিলেন একজন অপরিচ্ছন্ন শিয়ালের খামারি, দারিদ্র্যের প্রতিফলন ঘটেছে, ইত্যাদি ইত্যাদি।একজন নারীবাদী লেখিকা ব্যাখ্যা দিলেন, ‘Lives of Girls and Women’ হচ্ছে আমার বাবার সরাসরি আত্মজীবনীর পুনঃউপস্থাপন।তিনি আমাকে বানিয়েছেন এমন একজন, যে কিনা এই দুর্বিষহ অতীত থেকে এসেছে, কেননা, আমার বাবা ছিলেন অসমর্থ।তিনি কানাডার একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষিকা, আর আমি এতটাই রেগে গিয়েছিলাম যে, ভাবছিলাম কীভাবে তাঁর বিরুদ্ধে মামলা ঠুকে দেওয়া যায়।সাংঘাতিক চটে গিয়েছিলাম, জানতাম না কী করা যায়, কেননা ভাবলাম আমার কাছে এটা কোনো ব্যাপার নয়, আমার এত এত সাফল্য আছে; কিন্তু বাবার সবকিছু বলতে ছিল এটাই, যে তিনি আমার বাবা।তিনি এখন প্রয়াত।আমি তাঁকে যেভাবে উপস্থাপন করেছি তাতে কি তিনি একজন অসমর্থ বাবা হিসেবে পরিচিতি পাবেন? পরে আমি উপলব্ধি করলাম, তিনি একটা তরুণ প্রজন্মের প্রতিনিধি, যারা সম্পূর্ণ ভিন্ন একটা অর্থনৈতিক জগতে বেড়ে উঠেছে।তারা বলতে গেলে একরকম কল্যাণমুখী রাষ্ট্রে বাস করে – এই যেমন মেডিকেয়ার।তারা জানে না যে, অসুস্থতা একটা পরিবারের ধ্বংসের কারণ হতে পারে।ওরা কখনো কোনো ধরনের বাস্তব অর্থসংকটের ভেতর দিয়ে যায়নি।ওরা কোনো পরিবারের দিকে তাকায় যেটা দরিদ্র আর ভাবে এটা অনেকটা ইচ্ছা করেই।নিজের উন্নতি না চাওয়াটা তো দুর্বলতা, এটা নির্বুদ্ধিতা বা অন্যকিছু।আমি যে-বাড়িতে বড় হয়েছি সে-বাড়ির ভেতরে কোনো পায়খানা ছিল না এবং এটা তো এ-প্রজন্মের কাছে খুব জঘন্য, আসলে এটা তো সেরকম ছিল না, এ তো ছিল আকর্ষণীয়।

জ্য ম্যাকক্যলক : লেখালেখির দিন-ক্ষণ নিয়ে আমরা কোনো প্রশ্ন করিনি, সপ্তাহে আসলে কতদিন আপনি লেখেন?

 

মুনরো : সাতদিনই – রোজসকালে।লেখা শুরু হয় সকাল আটটার দিকে – শেষ হয় বেলা এগারোটায়।বাকি দিনটা আমি অন্য কাজ করি, যদি না আমার চূড়ান্ত খসড়ার কাজ কিংবা অন্য কিছু একটার ওপর কাজ করার দরকার পড়ে, তাহলে সামান্য বিরতি দিয়ে আমি সারাদিন কাজ করব।

 

জ্য ম্যাকক্যলক : এই সময়সূচির ব্যাপারে কি আপনি কঠোর, এমন কি বিয়ে বা অন্য কোনো দরকারি অনুষ্ঠান থাকলেও?

 

মুনরো : আমার পৃষ্ঠা বাঁধা থাকে এবং আমি সেক্ষেত্রে অত্যন্ত বাধ্য।যদি জানি যে, কোনো একটা বিশেষ দিনে কোথাও যাচ্ছি তাহলে আগেভাগেই আমাকে অতিরিক্ত পৃষ্ঠাগুলো লিখতে হয়।এটা একদম বাধ্যতামূলক, এটা হতেই হবে, কী সাংঘাতিক! তবে আমি লেখার কাজ অনেকদিন ফেলে রাখি না এজন্য যে, আমি কোনোভাবে লেখাটা থেকে দূরে সরে যেতে পারি।এটা আসলে বয়সের কারণে।এভাবেই লোকজন কাজকর্মে নাছোড়বান্দা হয়ে যায়, আমি আজকাল রোজ কতখানি হাঁটলাম তা নিয়েও নাছোড়বান্দা।

 

জ্য ম্যাকক্যলক : হাঁটেন কতদূর?

 

মুনরো : প্রতিদিন তিন মাইল।অতএব, যদি আমি জানি যে একটা দিন বাদ যাবে, তাহলে আমাকে সেটা পুষিয়ে নিতে হয়।খেয়াল করেছি আমার বাবাও একই কাজ করতেন।নিজেকে আপনি সুরক্ষা করুন এই ভেবে যে, আপনার যদি এসব আচারবিধি আর এবং সময়সূচি থাকে, কোনোকিছুই আপনাকে ছুঁতে পারবে না।

 

জ্য ম্যাকক্যলক : একটা গল্প শেষ করতে পাঁচ মাস কিংবা তার বেশি সময় ব্যয় করার পর আপনি কি বিরতি নেন?

 

মুনরো : খুব অল্পতেই আমি পরেরটায় চলে যাই।যখন আমার বাচ্চারা ছিল এবং দায়িত্বটাও ছিল বেশি তখন এতটা করতাম না।তবে বিরতি দেওয়া নিয়ে আমি কিছুটা শঙ্কিত, যদি আমি থামি, যেন থামি মঙ্গলের জন্য।প্রচুর ভাবনা জমা হয়ে আছে, কিন্তু এটা তো কেবল ভাবনাই নয়, যা আপনার দরকার।আবার শুধু কৌশল বা দক্ষতাও নয়।এটা একধরনের তাড়না এবং বিশ্বাস, যা ছাড়া আমি কাজ করতে পারি না।একটা সময় আমার এটা কখনো হারাত না, তখন তাড়না আর উদ্দীপনা ছিল অফুরন্ত।এখন মাঝেমধ্যে আমি বিচ্যুত হয়ে যাই তখনই, যখন মনে হয় বিচ্যুতি ঘটলে কেমন লাগবে, আর আমি ভালো করে বলতেও পারছি না যে এটা কেমন লাগবে।আমি ভাবি যে, এ-গল্পটা যা নিয়ে তা সম্পূর্ণ বাস্তব।এমনকি এতে সাংঘাতিক কিছু যে যোগ করতে হবে, গল্পটা দাঁড়াবে কিনা, তাও নয়।বয়সকালে যা হতে পারে তা হলো, আপনার অজান্তে কোনো না কোনোভাবে আগ্রহটা মিইয়ে যেতে পারে।কেননা এটা ঘটে ওইসব মানুষের বেলায়, যাদের জীবনের প্রতি প্রচুর আগ্রহ আর দায়বদ্ধতা থাকে।কিছুটা ওই পরের বেলার খাবারের জন্য অপেক্ষা করার মতো আর কি।চলতে-ফিরতে আপনি রেস্তোরাঁয় মাঝবয়সী মানুষদের চেহারায় দেখবেন, আমার বয়সী-মাঝবয়সের শেষে এবং বৃদ্ধবয়সের শুরুতে – দেখবেন অথবা ধীরে ধীরে অনুভব করবেন, চোখের নজরের দিকে তাকালে দেখবেন – ‘হয়েছে আর নয়’ধরনের ভাব।মনে হবে যে, তাদের জিনিসের প্রতি সাড়া দেওয়ার ক্ষমতা কোনো না কোনো ভাবে লোপ পেতে যাচ্ছে।এখন আমি ভাবি এটার সম্ভাবনা আছে।এখন মনে হয় আমার বাতজ্বর হওয়ার সম্ভাবনা আছে, অতএব ব্যায়াম করা তাহলে আর হবে না।এখন আমি অতিরিক্ত সচেতন এই আশঙ্কা নিয়ে যে, সবকিছু হারিয়ে যেতে পারে, আগে আপনার জীবনে যা পূর্ণ হয়েছিল।হয়তো-বা স্রোতের সঙ্গে চলার অর্থ হচ্ছে, আসলে আপনি যা করেন তাহলো এটাকে রুখে দেওয়া, যেন না ঘটে।একটা গল্পের অনেক অংশ থাকে এবং অংশবিশেষে গল্পটা ব্যর্থ, আমি কিন্তু সেটা নিয়ে বলছি না।গল্প ব্যর্থ হোক, কিন্তু আপনার গল্পসৃজনের আস্থাটা যেন নিঃশেষ না হয়, তাহলে সেটা হতে পারে বিপজ্জনক।এটা সম্ভবত শ্বাপদ, যা বৃদ্ধ বয়সে ছোটঘরের ভেতরে ওঁৎ পেতে থাকে – কাজগুলো যে গুরুত্বপূর্ণ সে-অনুভূতিটা হারিয়ে ফেলতে।

 

জ্য ম্যাকক্যলক : অনেকে অবশ্য ভাবে শিল্পীরা মনে হয় আমরণ কাজ করে।

 

মুনরো : আমার মনে হয় আপনি চাইলে এটা সম্ভব।হয়তো আপনার একটু বেশি হুঁশিয়ার হতে হবে।বিশ বছর আগে আমি ভাবতে পারিনি যে কখনো আস্থা, বাসনা এবং উদ্দীপনা হারিয়ে ফেলব।মনে হয় ব্যাপারটা এমন; যখন আপনি আর মোটেও প্রেমে পড়েন না।তবে আপনি সে-ব্যাপারটা সইতে পারেন, কেননা প্রেমে পড়াটা আসলেই খুব একটা দরকার নেই এরকম কোনো ব্যাপারে।আমার অনুমান, সে-কারণেই আমি লেখালেখি চালিয়ে যাচ্ছি।হ্যাঁ, একদিনের জন্যও থামি না।এটা আমার দৈনন্দিন হাঁটার মতো।এখন আমার দেহের আভা সপ্তাখানেকের ভেতরে ম্লান হয়ে যায়, যদি আমি ব্যায়াম না করি।সার্বক্ষণিক সতর্ক থাকতে হবে।আপনি লেখা ছেড়ে দিলে কার কী আসে-যায়, কোনো ব্যাপার নয়।লেখালেখি ছেড়ে দেওয়াটায় আমার ভয় নেই, ভয় হলো যে প্রণোদনা – এমন কিছু একটা, যা আপনি মনে করেন আপনাকে দিয়ে লেখায় – সেটা ছেড়ে যাওয়ার।আমি ভাবি, সার্বক্ষণিক কাজ করার প্রয়োজনীয়তা ফুরিয়ে গেলে বেশির ভাগ মানুষ কী করে? অবসরপ্রাপ্ত মানুষরাও প্রশিক্ষণ নেয়, শখ থাকে কিছু একটা খুঁজে ফেরে – এ-শূন্যতা পূরণের জন্য।আর আমার ক্ষেত্রে এমনটি ঘটা এবং ওরকম জীবনে প্রবেশ করার আতঙ্কে আছি আমি।জীবন পূর্ণ করার জন্য আমার একমাত্র জিনিস হচ্ছে লেখালেখি।ফলে যথেষ্ট বৈচিত্র্যময় জীবন কীভাবে যাপন করতে হয় তা আমি শিখিনি।একমাত্র ভিন্ন জীবন আমি কল্পনা করতে পারি তাহলো পাণ্ডিত্যের জীবন, সেটাই সম্ভবত আমার আদর্শ।

 

জ্য ম্যাকক্যলক : সেটা তো অত্যন্ত ভিন্ন জীবনও বটে, এক লক্ষ্যে ছুটে চলার জীবন হচ্ছে ধারাবাহিকতার বিপরীত।

 

মুনরো : আপনি গিয়ে গলফ খেললেন এবং আপনার ভালো লাগল, তারপর আপনি বাগান করলেন এবং তারপর আপনার নৈশভোজে অনেকে এলো।তবে মাঝেমধ্যে আমি ভাবি, লেখা বন্ধ হয়ে গেলে কী হবে? কী হবে যদি এটা একেবারে নিঃশেষ হয়ে যায়? বেশ তো, তখন আমাকে কিছু একটা শেখা শুরু করতে হবে।

গল্প-উপন্যাস লেখা ছেড়ে আপনি তো নন-ফিকশন লিখতে পারেন না।আমি তা মনে করি না, নন-ফিকশন তো খুব কঠিন, সেটা করতে গেলে পুরোপুরি নতুন জিনিস শিখতে হবে।তবে আমি হয়তো তা করার চেষ্টা করব।একটা বই লেখার জন্য আমি  দু-একবার চেষ্টা করেছিলাম, সবাই যে-ধরনের বই লিখছে তাদের পরিবার-পরিজন নিয়ে।কিন্তু এর জন্য আমি কোনো অবকাঠামো, কোনো কেন্দ্রবিন্দু খুঁজে পাইনি।

 

জ্য ম্যাকক্যলক : The Ground Street Reader-এ ‘Working for Living’ শিরোনামে যে-প্রবন্ধ বেরিয়েছিল সেটা কী? পড়লে তো ওটাকে স্মৃতিকথা মনে হয়।

 

মুনরো : একটা প্রবন্ধ সংকলন করার ইচ্ছা আছে, সেখানে ওই প্রবন্ধটা অন্তর্ভুক্ত থাকবে।

 

জ্য ম্যাকক্যলক : উইলিয়াম ম্যাক্সওয়েল Ancestors-এ সে-রীতিতে তাঁর পরিবার নিয়ে লিখেছেন।

 

মুনরো : ওই বইটা আমার পছন্দ।হ্যাঁ, তাঁকে আমি এ-ব্যাপারে জিজ্ঞেস করেছিলাম।লেখার জন্য তাঁর নিজের যথেষ্ট উপকরণ ছিল।আপনার যা করার তিনি তা করেছেন; পারিবারিক ইতিহাসকে সে-সময়ের ঘটমান বড় একটা কিছুতে আবদ্ধ করা, তার ক্ষেত্রে ছিল আঠারো শতকের গোড়ার দিকে সম্পূর্ণ ধর্মীয় পুনরুত্থান, যে-ব্যাপারে আমি কিছুই জানতাম না।জানতাম যে, আমেরিকা বাস্তবিকভাবেই একটা ঈশ্বরবিহীন রাষ্ট্র ছিল এবং আচমকাই দেশব্যাপী লোকজন ধর্মের ওপর মূর্ছা খেতে শুরু করল।চমৎকার লেগেছে।যদি আপনি এরকম কোনো কিছু পেয়ে যান তাহলে তো আপনার বই হয়ে গেল।কিছুটা সময় লাগবে।ভেবেছি ওরকম কিছু একটা করব, আর তারপরই আরেকটা গল্পের ভাবনা মাথায় আসে, আর ওই আরেকটি গল্পই সবসময় মনে হয় অন্য কাজের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।যদিও এটা কেবল একটা ছোটগল্পমাত্র।দি নিউইয়র্কার পত্রিকায় উইলিয়াম ট্রেভরের একটা সাক্ষাৎকার পড়েছিলাম, তিনি তখন কিছু একটা এমনই বলেছিলেন, এবং তারপর আরেকটা ছোটগল্প এসে হাজির – আর সেটাই সমাধান দেয় জীবনটা কেমন হবে।

 

(প্যারিস রিভিউ, ইস্যু ১৩১, ১৯৯৪)

শেয়ার করুন

Leave a Reply