কথা-কাহিনির গ্রাফিক শৈলী

লেখক:

জাহিদ মুস্তাফা

একেবারে সাধারণ অর্থে কার্টুন বা ব্যঙ্গচিত্র হিসেবেই লোকে জানে – এমন কিছু নিয়েই একটি দলগত প্রদর্শনীর আয়োজন হয়েছিল ঢাকার গুলশানে বেঙ্গল আর্ট লাউঞ্জে। এটি বাংলাদেশের শিল্প-সংস্কৃতির অন্যতম পীঠস্থান বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের নতুন এক সাংস্কৃতিক কেন্দ্র। ঢাকার ব্রিটিশ কাউন্সিল এবং বেঙ্গল আর্ট লাউঞ্জের যৌথ আয়োজন। যুক্তরাজ্য ও বাংলাদেশের পনেরোজন শিল্পীর অংশগ্রহণে এ-দলগত প্রদর্শনীর শিরোনাম – ‘Very Graphic : The Art of Storytelling in Graphic Detail’। অর্থাৎ এমন এক গ্রাফিক শিল্প, যার মাধ্যমে গল্প পরিবেশন করা যায়। স্টোরিটেলিং গ্রাফিক্সের আরেক নাম ‘কমিক্স’। ছোটবেলা থেকে আমরা একে এ-নামেই জানি। কৈশোরে আমরা প্রথম কমিক্স দেখেছি, পড়েছিও বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনের পর। ভারতীয় কমিকসের বইপত্র তখন আসা শুরু হয়েছে মাত্র – সে-সময়ে। ছবি এঁকে আর তার বর্ণনা লিখে ঘটনার পরম্পরা সাজানো। ডিজনিল্যান্ডের অ্যানিমেশন চলচ্চিত্রের এ যেন বিকল্প এক পদ্ধতি। ভাবতে অবাক লাগে – এখনো কমিক্স জনপ্রিয়। পত্রপত্রিকার পাতায় একটার পর একটা ছবি ও লেখা সাজিয়ে মজার মজার ঘটনায় নানা বিনোদন ও শিক্ষামূলক বিষয় এখনো সব বয়সী মানুষের কাছে কদর পাচ্ছে।

‘ভেরি গ্রাফিক’ প্রদর্শনীতে অংশ নিয়েছেন যুক্তরাজ্যের দুজন ও বাংলাদেশের নবীন-প্রবীণ তেরোজন শিল্পী। এ-তালিকায় অগ্রজদের মধ্যে আছেন আমাদের শিক্ষক, দেশের বরেণ্য চিত্রকর অধ্যাপক রফিকুন নবী, গুণীশিল্পী ও খ্যাতিমান কার্টুনিস্ট শিশির ভট্টাচার্য। যুক্তরাজ্যের দুজন শিল্পী আছেন এই শিল্পী-তালিকায় – তারা হলেন, কেরি ফ্রান্সম্যান ও স্টিভেন হ্যারিস। বাংলাদেশের বাকি এগারোজন শিল্পীর মধ্যে আছেন – সৈয়দ রাশাদ ইমাম তন্ময়, সব্যসাচী মিস্ত্রী, মেহেদি হক, কাজী ইস্তেলা ইমাম, আনিকা মারিয়াম আহমেদ, সালজার রহমান, নুহাশ হুমায়ূন, আসিফুর রহমান, রিও শুভ, ফরিদুর রহমান রাজীব এবং জিশান খান। প্রদর্শনীর পাশাপাশি ২১ থেকে ২৩ নভেম্বর অর্থাৎ বৃহস্পতিবার থেকে শনিবার পর্যন্ত তিনদিন ধরে আয়োজন করা হয়েছিল আগ্রহী শিশু ও শিল্পীদের নিয়ে অঙ্কন কর্মশালা, আইসক্রিম প্রতিযোগিতা, অ্যানিমেশন প্রদর্শনী এবং আরো অনেক মজার বিষয়।

পৃথিবী-বিখ্যাত চিত্রকর সালভাদর দালি বলেছিলেন – ‘৩৭৯৪ সালে কমিকস হবে সংস্কৃতি।’ দালি হয়তো মজা করেই তাঁর স্বভাবসুলভ রহস্যে বলেছিলেন, কিন্তু এ-মন্তব্যের মাহাত্ম্য যে আছে, তার কিছু প্রমাণও পাওয়া যাচ্ছে। বেঙ্গল আর্ট লাউঞ্জের ক্যাথেরিন ডন – ‘ভেরি গ্রাফিকে’র ব্রোশিওরে যে-ভূমিকা লিখেছেন, তাতে কমিক্স অর্থাৎ গল্পবলার গ্রাফিক নিয়ে অনেক তত্ত্ব ও তথ্যের সমাহার আছে।

একটি শিশুর পাঠ শুরু হয় ছবিঅলা বই দিয়ে। শিশুশিক্ষাকে আনন্দদায়ক করতে এই ব্যবস্থা চলে আসছে পুস্তক প্রকাশনার প্রায় শুরু থেকে। টেলিভিশন বিপস্নব আর ইন্টারনেট বিপস্নবের পর এখনো এমন প্রকাশনার গুরুত্ব কমে যায়নি। জানলে অবাক হতে হয় – আজকাল গ্রাফিক উপন্যাস প্রকাশিত হচ্ছে, যার উচ্চমানের জন্য স্বীকৃতিও মিলছে। লেখক ক্রিস ওয়ার ২০১১ সালে জিতেছেন ‘গার্ডিয়ান ফার্স্টবুক অ্যাওয়ার্ড’ – কোরিগান : দ্য স্মার্টেস্ট কিড অন আর্থের জন্য। এমন প্রকাশনার জন্য আছে আরো অনেক সাফল্য।

গ্রাফিক গল্পবলার ধরন এসেছে অনেক আগে। সেই যে পশুশিকারি মানুষের গুহাচিত্র, গল্প-বর্ণনার স্ক্রলচিত্র, গ্রিক মৃৎপাত্রের ছবি পটচিত্র, ইলাস্ট্রেশন এসব তুলে ধরার চিত্র প্রকরণ থেকে এই পদ্ধতির আবির্ভাব। আমরা লেখা শেখার আগে অাঁক কষি, দাগ দিই, গল্প শুনি। এ-বিষয়টিকে সংগঠিত করে শুরু হয়েছিল ছবিসহ গল্পের বই। সেই থেকে জন্ম হয়েছে কমিকসের। কমিক্স আমাদের দেশেও হয়। পত্রিকার পাতায় শিশু-কিশোরসহ সব বয়সীর বিনোদনের খোরাক হিসেবে কমিকস ছাপা হচ্ছে নিয়মিত। যেমন – ‘বেসিক আলী’ নামের কমিক্স বেশ জনপ্রিয়তা পেয়েছে। লেখক ও কার্টুনিস্ট আহসান হাবীবের কার্টুন-কমিক্স দারুণ জনপ্রিয়। তাঁর-সম্পাদিত উন্মাদ পত্রিকায় এ-ধরনের মজার মজার কার্টুন-কমিক্স ছাপা হয়; যাতে আমাদের চলমান রাজনীতি ও সমাজের নানা অসংগতি মজাদারভাবে ফুটে ওঠে।

আমাদের উপমহাদেশ পরিপ্রেক্ষিতে ব্যঙ্গচিত্র বা কার্টুনের প্রয়োগ প্রধানত রাজনৈতিক বিষয় ও সামাজিক বিষয় নিয়ে হয়ে আসছে। ব্রিটিশ শাসনামলে কলকাতার পত্রিকায় ব্যঙ্গচিত্র এঁকে সুনাম অর্জন করেছিলেন আবুল কাশেম। তাঁকে আমরা এদেশের ব্যঙ্গচিত্রের পুরোধা বলতে পারি। পটুয়া কামরুল হাসান, শিল্পী কালাম মাহমুদ একসময় প্রচুর কার্টুন এঁকেছেন, ইলাস্ট্রেশন এঁকেছেন। অগ্রজ শিল্পী কাইয়ুম চৌধুরী এখনো প্রচুর ইলাস্ট্রেশন অাঁকছেন বিভিন্ন পত্রপত্রিকায়। কমিক্স বইয়ে আমরা কার্টুন ও ইলাস্ট্রেশনের মিশ্র অবয়ব পাই। তিতু নামে শিল্পী-অভিনেতা আফজালও কার্টুন এঁকেছেন আশির দশকে।

১৯৭১ সালে আমাদের মুক্তিযুদ্ধকালে কামরুল হাসান-অঙ্কিত পাকিস্তানি প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের রক্তখেকো অবয়ব আমাদের মুক্তিযুদ্ধের জন্য প্রবল প্রেরণাদায়ক কাজ। এ-প্রসঙ্গটি সচিত্র আনা হয়েছে ‘ভেরি গ্রাফিকে’র প্রদর্শনীর ব্রোশিওরে। আরো এসেছে ১৯৭০ সালে অাঁকা রনবীর এক কার্টুনচিত্র। যেখানে  মুজিব-ভুট্টোর নির্বাচনী কৌশল তুলে ধরা হয়েছে। এরপর শিশির ভট্টাচার্যের অাঁকা সংবাদপত্রে ছাপা-হওয়া কয়েকটি রাজনৈতিক কার্টুনের ছবি ছাপা হয়েছে এবং রাজনৈতিক কার্টুনের ইতিবৃত্ত তুলে ধরা হয়েছে। এরপর এসেছে আহসান হাবীব এবং উন্মাদ ম্যাগাজিন প্রসঙ্গ।

প্রদর্শনীতে বাংলাদেশের সমকালীন ব্যঙ্গচিত্রের প্রামাণ্য হিসেবে প্রথিতযশা তিনজন শিল্পীর চিত্রকর্ম স্থান পেয়েছে। রফিকুন নবীর টোকাই শিল্পীর অনবদ্য এক সৃষ্টি। টোকাই প্রসঙ্গে মনে পড়ে অকালপ্রয়াত শিল্পী ও বিচিত্রা সম্পাদক শাহাদত চৌধুরীর কথা। তাঁর তাগিদেই তাঁর বন্ধুশিল্পী রনবী এ-চরিত্রটি সৃজন করেছিলেন।

টোকাই এমন একটি চরিত্র – যে পথে জন্মেছে, পথে বেড়ে উঠেছে, পথেই শিখেছে বেঁচে থাকার উপায়, শিখেছে কথা বলার ধরন। এই শিশুটি রুগ্ণ, কিন্তু পেটফোলা। অপুষ্ট শিশুর প্রতীক। যার বয়স বড়জোর দশ বছর। তার মুখ দিয়ে শিল্পী রনবী সরল সোজাসাপ্টা অনেক সত্য বলিয়েছেন – যা অনেক রাজনীতিক ও বুদ্ধিজীবীর বক্তব্যকেও হার মানায়। টোকাই বাংলাদেশের কার্টুনের ক্ষেত্রে সবচেয়ে সফল একটি চরিত্র।

প্রদর্শনীতে টোকাইয়ের তিনটি কার্টুন স্থান পেয়েছে। এর দুটি ১৯৮৩ সালের। একটি ১৯৮১ সালে সাপ্তাহিক বিচিত্রায় প্রকাশিত। এই কার্টুনত্রয়ী শিল্প-সংগ্রাহক দুর্জয় রহমানের সংগ্রহ থেকে নেওয়া।

প্রদর্শনীতে আরেক খ্যাতনামা কমিক্স শিল্পী ও লেখক আহসান হাবীবের অাঁকা ‘উন্মাদ’ চরিত্র স্থান পেয়েছে। উন্মাদও টোকাইয়ের মতো আগ্রহোদ্দীপক চরিত্র। কুশাসন ও দুর্নীতিতে যে মানবাধিকার বিপন্ন – এ-বিষয়টি দারুণ দক্ষতায় তুলে এনেছেন শিশির ভট্টাচার্য। বাংলাদেশের পত্রিকায় কার্টুনকে শিল্পের মর্যাদায় তুলে আনতে তাঁর বিশেষ অবদান স্বীকৃত। তাঁর পরবর্তী প্রজন্মের অনেক কার্টুনিস্ট, যাঁরা নানা পত্রপত্রিকায় কার্টুন অাঁকেন তাঁদের নামের উলেস্নখ আছে এতে।

অপেক্ষাকৃত তরুণ ও নবীন আঁকিয়েদের উলেস্নখ করা হয়েছে – এঁরা ভবিষ্যতের কার্টুনিস্ট কিংবা গল্পকথন অঙ্কনের শিল্পী। এ-দলে আছেন – সৈয়দ রাশাদ ইমাম তন্ময়, আনিকা মারিয়াম আহমেদ, কেরি ফ্রান্সম্যান, স্টিভেন হ্যারিস ও নুহাশ হুমায়ূন। তাঁদের কমিক্সগুলোর অংশবিশেষ প্রদর্শিত হয়েছে।

আর শিল্পী হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে তন্ময়, আনিকা, কেরি, হ্যারিস, নুহাশ, সব্যসাচী, মেহেদি, সমির আসরান রহমান, সালজার রহমান, কাজী ইস্তেলা ইমাম, রিও শুভ, ফরিদুর রহমান রাজীব, জিশান খান ও আশিকুর রহমানকে। তন্ময় ডেইলি ঢাকা ট্রিবিউনের কার্টুনিস্ট। পটচিত্রীদের অঙ্কনশৈলীতে তিনি এঁকেছেন ‘পরাজয়’ শিরোনামে গ্রাফিক কাহিনি-স্ক্রল। ব্রিটেনের কেরি ফ্রান্সম্যান একজন গ্রাফিক ঔপন্যাসিক ও কমিক স্রষ্টা। তাঁর সৃজনের রসবোধ দর্শকদের আকৃষ্ট করেছে। স্টিভেন হ্যারিস ব্রিটেনের তরুণ কার্টুনিস্ট। তাঁর কমিকের বিষয়, ভাষা ও পোশাক পুরনো চলচ্চিত্রের মতো, অঙ্কনশৈলী অনেকটা শিশুতোষ।

আনিকা মারিয়াম-অঙ্কিত গল্পটি বলা যাক। তিনি এঁকেছেন এক বাঙালি তরুণীর ভাবনা ও সমাধান। তরুণী ভাবছে – দুনিয়াটাকে সে রক্ষা করবে। কিন্তু কীভাবে? তার তো কোনো ক্ষমতা নেই, যা দিয়ে সে শত্রুর সঙ্গে লড়াই করে ভালোবাসা ও শান্তি প্রতিষ্ঠা করবে। তার আত্মদান কিংবা রক্তেও সমাধান হবে না। তখন তার মনে হলো, তার সামনে তো কয়েকজন আদর্শ মানুষ আছেন। আছেন রবীন্দ্রনাথ, জর্জ হ্যারিসন, সিমোন দ্য বোভোয়ার, বব মার্লে, ক্যাথিকলউইটজ। শিল্পীর হাতিয়ার তুলি। এই হাতিয়ার দিয়েই তো পৃথিবীকে বদলে দেওয়া সম্ভব। সহজ, কিন্তু চমৎকার বোধের প্রকাশ, যা নবীনদের জন্য অনুপ্রেরণাদায়ী।

প্রয়াত কথাশিল্পী হুমায়ূন আহমেদ-তনয় নুহাশ হুমায়ূন পৃথিবীর উষ্ণতা বৃদ্ধির বিপদ নিয়ে বক্তব্যধর্মী ধারাবাহিক চিত্র বা কার্টুন এঁকেছেন। জোয়ারে ভেসে আসা এক তিমিকে বাঁচাতে এক শিশুর আর্তি ফুটে উঠেছে এতে। অল্পদিনে সুপরিচিত হয়ে-ওঠা শিল্পী সব্যসাচী মিস্ত্রীর অাঁকা ‘মানুকাকু’ সিরিজের কমিক্স প্রদর্শিত হয়েছে। প্রদর্শনীতে আরো ছিল মেহেদি হকের কাজ। মেহেদি নিউ এজ নামের ইংরেজি দৈনিকের কার্টুনিস্ট। পাঁচটি কমিক বই প্রকাশ পেয়েছে তাঁর। এছাড়া পঁচিশটি শিশুগ্রন্থের অাঁকিয়ে তিনি। এক কমিক্স গ্রন্থ প্রকাশনা সংস্থার দায়িত্বেও আছেন।

মানুষের প্রয়োজনেই পেইন্টিং-নির্ভর চিত্রকলা অথবা ভাস্কর্য, ছাপচিত্র, স্থাপনা ছাড়াও যে শিল্পের নানা কৃতি-আকৃতি আছে – তার প্রদর্শনীর বাইরেও যে বক্তব্যনির্ভর শিল্প-প্রয়াসের এরকম দলগত প্রদর্শনী হতে পারে – তার এক উৎকৃষ্ট নমুনা  দেখা গেল। শিল্পের সীমানা বিরাট। সেই পুরনো ধ্যান-ধারণা যে পালটে গেছে তারই উজ্জ্বল উদাহরণ ‘ভেরি গ্রাফিক’। প্রদর্শনী চলেছে গত ১৬ নভেম্বর শনিবার থেকে ৭ ডিসেম্বর ২০১৩ শনিবার পর্যন্ত।

শেয়ার করুন

Leave a Reply