কথোপকথনে স্থপতি মাজহারুল ইসলাম

লেখক:

জায়নাব ফারুকী আলী শামা

যুক্তরাষ্ট্র থেকে ফিরে স্থপতি হিসেবে চাকরি খুঁজছি। মা বললেন, এদেশের সবচেয়ে শ্রদ্ধেয় স্থপতি মাজহারুল ইসলামের উপদেশ নেওয়ার জন্য।

আমি তাই গেলাম সেই ঐতিহাসিক লাল ইটের বাসায় তাঁর সঙ্গে দেখা করার জন্য। আমরা বসলাম সামনের বারান্দার শান্ত, ঠান্ডা পরিবেশে। আলোচনার শেষে গুরু হেসে বললেন, ‘বাঙালি হতে হবে, মনে, প্রাণে, পুরোমাত্রায়।’ আমার বুঝতে অসুবিধা হলো না যে, মন্তব্যটা কিছুটা আমার পরা নীল সালোয়ার-কামিজকে নিয়ে। অনেকদিন দেশের বাইরে থাকাতে শাড়ি পরার জন্য আমি উদ্গ্রীব হয়ে ছিলাম; আর এ-মন্তব্যটা ম্যাজিকের মতো কাজ করল। সেদিন থেকে শাড়ি এবং শুধু শাড়িই পরতে শুরু করলাম।

অনেক বছর পর যখন মাজহারুল ইসলামের ওপর বই লেখার জন্য গবেষণা করছি, তখন তাঁর সঙ্গে বেশ কয়েকবার বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা করতে হয়েছে। যেসব বিষয়ে তিনি বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেছিলেন সেগুলো হচ্ছে – বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে তৎকালীন স্থাপত্য, দেশের উন্নতিতে স্থপতিদের ভূমিকা এবং স্থাপত্য শিক্ষার কার্যক্রম কী হওয়া উচিত। এই লেখাটি তাঁর এসব চিন্তাধারার প্রকাশ। নিচে স্থপতি মাজহারুল ইসলামের বক্তব্য হুবহু তুলে ধরা হলো।

স্থাপত্য শিক্ষা

প্রতিবেশ, পরিবেশ, শহর, পাড়া, পথচারী, বিল্ডিং কোড, গাছপালা ও জলাধার সংরক্ষণ, সুদূরপ্রসারী প্ল্যানিং, সামগ্রিক প্রেক্ষাপট – এ সবকিছুই স্থাপত্য শিক্ষার আওতায় থাকতে হবে, যাতে শিক্ষার্থীরা শুরু থেকেই দেশের সার্বিক পরিস্থিতি সম্পর্কে অবহিত থাকে এবং এসব জ্ঞান এই বয়সে যেন তাদের ওপর একটা ভালো ছাপ ফেলতে পারে। শিক্ষার শুরু থেকে তারা যেন সম্পূর্ণ ও সামগ্রিকভাবে চিন্তা করতে শেখে।

ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থাপত্য বিভাগের ‘কারিকুলাম ডেভেলপমেন্ট কমিটি’র সদস্য হিসেবে বলছি :

১) শিক্ষার্থীরা ভালোভাবে জানবে আমাদের আবহাওয়া, জলবায়ু, আমাদের সূর্যকে।

২) স্থাপত্যের সঙ্গে অন্যান্য শিল্পকলা যেমন – চিত্রাঙ্কন, ভাস্কর্য এবং ললিতকলা যেন ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে থাকে।

৩) ‘ফ্যাকাল্টি অব ভিসুয়াল আর্টস’ হয়তো ভালো একটা নাম হবে, ‘স্থাপত্য বিভাগে’র পরিবর্তে।

৪) গৎবাঁধা পড়াশোনার সঙ্গে সঙ্গে অন্যান্য কার্যক্রমেও জড়িত থাকতে হবে ছাত্রদের। এর ফলে স্থাপত্যশিক্ষা অন্যান্য শিল্পকলাকে অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ হিসেবে নেবে। এভাবে অন্তর এবং বহির্মুখী জ্ঞান অর্জনে তারা সমর্থ হবে।

 

স্থাপত্য শিক্ষকদের প্রতি

আপনাদের দায়িত্ব অসীম। শিক্ষার্থীদের অবহিত করবেন :

০ স্থাপত্য শিল্প কী।

০ স্থাপত্য শিল্পের সঙ্গে স্থাপত্য শিক্ষার সম্পর্ক কেমন।

০ স্থাপত্যবিদ্যায় ডিগ্রি পেয়ে তারা কীভাবে স্থাপত্য পেশাকে গ্রহণ করবে।

০ এদেশের সামগ্রিক প্রেক্ষাপটে তারা কীভাবে ডিজাইন করবে যাতে বাংলাদেশি স্থাপতি হিসেবে তারা গর্বিত হতে পারে।

কাজেই বুঝতে পারছেন যে, শিক্ষাক্রম তাদের ভালো শিক্ষা দেবে এবং সঙ্গে সঙ্গে হাতে-কলমে শিক্ষা ও একটি ভবন কীভাবে নির্মিত হয় সে বিষয়ে তাদের অবহিত করাটা অত্যন্ত জরুরি। ছাত্রদের ভালোভাবে জানতে হবে দেশে এবং পৃথিবীতে কী ধরনের স্থাপত্য তৈরি হচ্ছে। আমি ভালো স্থাপত্যের কথা বলছি। ইতিহাসের কথা বলছি। স্থপতিদের এবং একই সঙ্গে শিক্ষার্থীদের জানতে হবে আমরা কী করতে পারতাম বা এখনো পারি ঢাকা শহরে সুষ্ঠু পরিবেশ তৈরি করার জন্য। শিক্ষার্থীদের বোঝাতে হবে যে, স্থপতিদের একটি বিশাল সামাজিক দায়িত্ব আছে। আপনার সুন্দর বাড়িটি আপনার পাড়ার পরিবেশের প্রতি দায়িত্ব বহন করে।

ছাত্রদের বলছি, দেশকে ভালোবাসুন; আমাদের দেশ ইতিহাস ও সংস্কৃতিতে সমৃদ্ধ। পুরনো ভালো নির্দশন দেখুন, – এর রীতিনীতি, এর দৃশ্যমান সৌন্দর্য, এর নির্মাণসামগ্রী ও কৌশল সম্পর্কে ভালোভাবে জানুন।

স্থাপত্য শিক্ষার কার্যক্রম সম্পর্কে আরো বলছি :

ক) হাতে-কলমে শিক্ষা স্থাপত্যশিক্ষার অবিচ্ছেন্দ্য অঙ্গ হবে।

১। ইটের দেয়াল তৈরি করা জানতে হবে একেবারে শুরু থেকে – ইট তৈরি করা, তেঁতুল পানিতে ডুবিয়ে রাখা। এর আগে ইটভাটায় গিয়ে জানা একটা ভালো ইট কীভাবে তৈরি হয় – এতে কী কী বিষয়ে গুরুত্ব দিতে হয়। তারপর ইটের দেয়াল তৈরি করবেন অভিজ্ঞ মিস্ত্রির সাহায্যে।

২। মোজাইক ফ্লোর (টেরাজ্জো মেঝে) ঢালাই করাও ছাত্ররা শিখতে পারেন।

৩। কাঠের আসবাবপত্র বানানো, এর ডিটেইল জয়েনারি (detailed joinery) সম্পর্কে শিক্ষাগ্রহণ করবেন।

৪। গ্রামে শিক্ষাসফরে যাবেন আর মাটির দেয়াল তৈরি করবেন। কিংবা বাঁশের বোনা দেয়াল তৈরি করবেন – জানবেন কত রকমের বাঁশের দেয়াল তৈরি হচ্ছে এবং এসব দিয়ে পরিশেষে বাড়ি বানাবেন।

৫। অন্যান্য কাজের মধ্যে আসতে পারে বৃক্ষরোপণ এবং এর পরিচর্যা করা – ফুল ফোটা পর্যন্ত। বিদেশের বিভিন্ন দেশে বাগান করা এবং সেটা শেখা স্থাপত্য শিক্ষার অংশ হিসেবে আছে। আমরাও সেটা করতে পারি।

খ) বিখ্যাত কবি, সাহিত্যিক, ভাস্কর, সংগীতশিল্পীকে ক্লাসে শিক্ষক হিসেবে কিংবা অতিথি শিক্ষক (guest lecturer) হিসেবে আনতে হবে, যাতে স্থাপত্যশিক্ষা আরো পরিপূর্ণ হয়।

১। মূল বিষয় কিংবা অপশনাল (optional) হিসেবে সংগীত, চিত্রাঙ্কন, সাহিত্য, বাদ্যযন্ত্রশিল্প এসব আসতে পারে এবং শ্রেষ্ঠ শিল্পী-সাহিত্যিককে এসব পড়ানোর দায়িত্ব দেওয়া উচিত।

গ) প্রাকৃতিক সৌন্দর্য সকল শিল্পকলাকেই প্রেরণা জুগিয়েছে যুগ যুগ ধরে।

১। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য অবলোকনের শিক্ষাসফর স্থাপত্য শিক্ষার সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত থাকবে।

 স্থাপত্য ও নগর পরিকল্পনা

আধুনিক স্থাপত্যধারাগুলোতে আমরা শুনি শুধু কয়েকজন স্থপতির নাম; কিন্তু বেশি শুনছি অনেক স্থাপত্যধারার নাম। অনেক রাস্তা খোলা আছে, আপনার যা পছন্দ সেমতো ডিজাইন করতে পারেন। ‘ভবনটি কি দেখতে আকর্ষণীয় হয়েছে?’ এটাই তার মূল বক্তব্য হওয়া উচিত নয়।

আমাদের শিক্ষা, অভিজ্ঞতা, আমাদের নান্দনিক বোধ ও সৃজনশীলতা দিয়ে তৈরি করতে হবে ভালো বিল্ডিং, যেগুলোর নান্দনিক গুণাগুণ এবং সুষ্ঠু ব্যবহারযোগ্যতা থাকবে এবং সর্বোপরি সুন্দর ও পরিকল্পিত শহর গড়তে সক্রিয় ভূমিকা রাখবে।

স্থাপত্য কী? এটা শুধুই একটা দৃশ্যশিল্প নয়, এটা নগরের একটি অংশ, পরিবেশের একটি অংশ। আমরা যা-ই তৈরি করি না কেন, এটা পরিবেশের ওপর প্রভাব ফেলবে। স্থপতিদের অবশ্যই মনে রাখতে হবে যে, তাদের সমাজের প্রতি গুরুদায়িত্ব রয়েছে।

স্থাপত্যশিল্পে দুটো জিনিস আছে :

১। পেশা

২। শিক্ষা

সত্যতা জড়িয়ে আছে উভয় বিষয়েই। কী শিখব? উত্তর হচ্ছে, ভালো এবং সৎ স্থাপত্যকলা। এটাই পরে সৎ স্থাপত্যপেশা গড়তে প্রেরণা জোগাবে। ৬৫০ বর্গমাইলের ঢাকার জন্য ভবন, পার্ক, রাস্তা ও utilities-এর সুষ্ঠু নীতিমালা, কোড ইত্যাদি কেমন হতে পারে? খুব কঠিন কাজ নয় এটি। কলকাতার উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে যেখানে এসব ভালোভাবে কাজ করছে। অন্যদিকে দুঃখজনক উদাহরণও আছে যেমন- হংকং বস্তির অমানুষিক পরিবেশ।

 স্থাপত্যকলা সম্পর্কে গণসচেতনতা

স্থাপত্যকলা সম্পর্কে গণসচেতনতা জাগ্রত করার জন্য প্রোগ্রাম করা যেতে পারে দুভাবে – পেশাজীবীদের জন্য এবং জনগণের জন্য। বিষয়গুলো হতে পারে : ঢাকা শহরের বর্তমান স্থাপত্য ও পরিকল্পনার বর্তমান অবস্থা

কিংবা

এখানে এখন কী ধরনের স্থাপত্য গড়া যেতে পারে?

কিংবা

স্থাপত্য কী এবং বর্তমান বাংলাদেশের স্থাপত্য কোথায় দাঁড়িয়ে আছে? আবার শুধু জনগণের সচেতনতার জন্য দুভাবে এই প্রোগ্রামের উদ্যোগ নেওয়া যায় :

স্থাপত্য শিক্ষা কী? এবং

স্থাপত্য পেশা কী?

 ঢাকা শহর এবং বাংলাদেশ

বর্তমানে স্থাপত্য পেশায় একটি বিভ্রান্তি বিরাজ করছে। বাংলাদেশ প্রাক-শিল্প বিপ্লব থেকে সরাসরি কম্পিউটার বিজ্ঞানে প্রবেশ করেছে, এটা একটা অতি দ্রুত পরিবর্তন। এই পরিবর্তনটা আরো ধীরে ধীরে সুষ্ঠুভাবে হওয়া উচিত ছিল।

এখন টাকার বিষয়টা স্থাপত্যে খুব বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে।

উঁচু অট্টালিকা তৈরি হচ্ছে আদর্শ zoning কিংবা পরিকল্পনা ছাড়াই, যেটা সমগ্র পরিবেশ বা নগর পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর। আমাদের শহরগুলোও এলোপাতাড়িভাবে গড়ে উঠছে।

এমনকি সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনাতেও সামগ্রিক চিন্তাধারার অভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে। চট্টগ্রাম থেকে উত্তরবঙ্গ পর্যন্ত শুধু একটিই বড় হাইওয়ে, যা ট্রাফিক ঝঞ্ঝাট ও দুর্ঘটনা সৃষ্টি করে প্রায়শই।

বলছি ভবনের নিচতলা সম্পর্কে – আমি জোর দিয়েছি নিচতলা পুরো ভবন থেকে একটু ভেতরে ঢোকানো থাকবে, যেটা নাকি পথচারীকে সূর্য ও বৃষ্টি থেকে রক্ষা করতে সাহায্য করবে। বিশেষ করে মতিঝিল ধরনের জায়গার জন্য। এটা ভবন বিধিমালার অংশ করা যেতে পারে।

 সৌরশক্তি ইত্যাদি (Renewable Energy)

ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থাপত্য বিভাগে একটি সৌরশক্তি বিভাগ থাকা উচিত। ব্র্যাক যেহেতু এসব নিয়ে অনেক কাজ করছে, আপনারা সহজেই গবেষণা এবং স্থাপত্যে এর প্রয়োগে তৎপর হতে পারেন। সৌরশক্তি, বায়ুশক্তি (wind power), বায়োগ্যাস ইত্যাদির গবেষণা ও শিক্ষা সহজেই স্থাপত্য শিক্ষাক্রমের অন্তর্ভুক্ত হতে পারে।

 আমার স্থাপত্য

আমি যে-ভবনগুলো ডিজাইন করেছি, তাতে নিচতলা ছিল খোলা, জনগণের ব্যবহারের জন্য, সহজেই এ-জায়গায় আসা যায় বাইরে থেকে। প্রকৃতির সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ক এ জায়গার, যেমন আর্ট কলেজ ও তৎকালীন পাবলিক লাইব্রেরি। কিন্তু আজকালকার স্থাপত্যে দেখা যায় নিচতলা রাখা হয় গাড়ি পার্কিংয়ের জন্য।

আর্ট কলেজটি তৈরি হয়েছে একটি বাগানের মধ্যে। সেই পরিবেশ ঠিক রেখে গুছিয়ে ভবনটি তৈরি করেছি যেন প্রকৃতির সঙ্গে সহজ, সুন্দর সম্পর্ক বজায় থাকে। আর্ট কলেজের ভেতরে আমি চলাচলের পথ (circulation) খুব স্বাভাবিক ও স্বচ্ছন্দ রাখতে চেয়েছি। এখানে বিল্ডিংটি যেন প্রকৃতিকে সম্মান করে দাঁড়িয়ে থাকে; প্রকৃতিকে ছাপিয়ে যেন না যায়।

বকুলতলা এবং তার নিচের বাঁধানো বেদি একটা সুন্দর পরিবেশ তৈরি করে, বিশেষ করে যখন বকুল ফোটে। এটা বিল্ডিংয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে তৈরি করা। স্টুডিও বা ক্লাসরুমের মতো এটাও একটা জমায়েত হওয়ার জায়গা। তফাৎটা হচ্ছে, এটা বাইরে, প্রকৃতির মাঝে। ছাত্ররা এর পরিবেশটা উপভোগ করে এবং প্রকৃতি থেকেও শেখে। বকুলতলাটিও ছাত্রদের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে ব্যবহার হতে পারে।

পাবলিক লাইব্রেরির (বর্তামানে ঢাকা ইউনিভার্সিটি লাইব্রেরি) মাস্টারপ্ল্যানে সুপরিকল্পিত বাগান এবং গাড়ির রাস্তা ইত্যাদি দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু সেভাবে তা করা হয়নি। ওপরের তলা একটু বার করে দেওয়া হয়েছিল নিচতলায় ছায়ার জন্য। ওপরের তলার ছায়ার জন্য ‘জালি’ ডিজাইন করা হয়েছিল কাঠ দিয়ে। পরে তা কংক্রিটে করা হয় খরচ ও মেরামতের কথা ভেবে।

আমি আধুনিক নির্মাণসামগ্রী যেমন স্টিল, কংক্রিট – এসব ব্যবহার করেছি, কিন্তু অনেকটা ঐতিহ্যবাহী রীতি মেনে। যেমন ‘জালি’ বা perforated screen, পুরনো দিনের আদলে করা লুভারড জানালা সেখানে লুভারগুলো বিভিন্নভাবে সাজানো যায়।

বৈজ্ঞানিক কুদরত-এ-খুদা আমাকে সম্পূর্ণভাবে সহায়তা করেছিলেন BCSIR ভবনটির ডিজাইনে।

‘জীবন বীমা ভবনে’ ছায়াঢাকা করিডোর দেওয়া হয়েছে নিচতলায় পথচারীদের জন্য। দোতলা সমান ছাদ এই ছায়াঢাকা নিচতলায়। উঁচু টাওয়ারটির ডিজাইন ছিল ‘পিন-হুইল’ ধরনের, এর প্রতিটি কোনার দেয়াল বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে ছায়ার জন্যে। সারাদিনের সূর্যের অবস্থান মেপে এই বাড়তি দেয়ালের ডিজাইন করা হয়েছিল। স্বাধীনতার পরে ডিজাইনটি অন্য একটি অফিসকে দেওয়া হয় এবং এই পুরো ডিজাইনটি তারা বদলে দেন। সাইনবোর্ডগুলোও সদর দরজার মুখে সুচিন্তিতভাবে লাগানো হয়নি।

NIPA ভবনে স্পেসগুলোর সঙ্গে স্ট্রাকচারের সম্পর্ক এবং বাইর থেকে সেমি-আউটডোর, তারপর ভেতরে আসার ডিজাইনটি উল্লেখযোগ্য। বাগান তৈরি করা হয়েছিল মৌসুমি ফুল ইত্যাদি চিন্তা করে; কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত বাগানটি সেভাবে তৈরি করা হয়নি। এখানে exposed concrete আমি প্রথম ব্যবহার করি। লুভারগুলোও exposed concrete দিয়ে তৈরি। দ্বিতীয়তলা একটু বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে নিচতলায় ছায়া ফেলার জন্য।

ধানমন্ডির নিজ বাড়িতে আমি এমনভাবে দেয়াল ও ছাদ ডিজাইন করেছি যেন মনে হয় ছাদটি ভাসছে। এটার জন্য সরু জানালা ব্যবহার করেছি দেয়ালের ওপর। আমার পরিবার ও আমার থাকার জন্য আমি চেয়েছি একটি আরামদায়ক ও সুন্দর বাড়ি। আলো-বাতাস নিয়েও অনেক চিন্তাভাবনা এখানে রয়েছে। তৃতীয়তলায় আমার স্টুডিও। কোনার দিকে বড় জানালাগুলো প্রচুর আলো ও বাতাস নিয়ে আসে।

‘বিশ্বব্যাংক’ ভবনটিতে ১২ ফুট x ১৬ ফুট কামরার মাপটি কাঠামোর স্ট্যান্ডার্ড হিসেবে ধরে কাজ করতে হয়েছে। ভবনটির ডিজাইন অন্তর্মুখী হওয়া প্রয়োজনীয় ছিল। কারণ কর্মকর্তারা চেয়েছিলেন সুষ্ঠু কাজের পরিবেশ, যা নাকি বাইরের শহরের শব্দ, দৃশ্য ইত্যাদি দিয়ে প্রভাবিত হবে না। সেজন্যে ভেতরে বড় উঠোন তৈরি করেছি যাতে আলো, বাতাস ও দৃশ্য সবকিছু এই উঠোন থেকে পাওয়া যায়। পশ্চিম দিকের দেয়ালে বেশ কিছুটা ভেতরে ঢুকিয়ে দেওয়া জানালাগুলো হচ্ছে ডিরেক্টরদের অফিস।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরো জায়গাটা ছিল প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরা – বাগান, টিলা, জলাধার, আর মৌসুমি ফুলের বাহার। আমি এমনভাবে ডিজাইনটি করলাম যাতে এসব টিলা, বাগান ও জলাধারের কোনো ক্ষতি না হয়।

মাস্টারপ্ল্যানটি উত্তর-দক্ষিণমুখী করা হয়েছে বাতাস পাওয়ার জন্য। ভুলে গেলে চলবে না যে, আমাদের দেশে যে কোনো ভবনের জন্য ভেতরে বাতাস খেলে যাওয়াটা জরুরি। এখানে উঠোনগুলো অনেক বড় করা হয়েছে ভবনের সব অংশে বাতাস বয়ে যাওয়ার তথা আরামের জন্য। শিক্ষাভবনগুলো মাঝখানে রেখে ছাত্রনিবাস পশ্চিমে এবং শিক্ষকদের নিবাস আরো পশ্চিমে দেওয়া হয়েছে। ছাত্রনিবাসের কোনাগুলোতে বাথরুম দেওয়া হয়েছে। ছাত্রনিবাসের বাইরে কিছু লম্বা গাছ ছিল। সেগুলোর সঙ্গে মিলিয়ে ছাত্রনিবাসের (dormitory) বাইরের দেয়ালেও ‘verticality’ প্রাধান্য পেয়েছে। এখানে জানালা ডিজাইন করা হয়েছে বিশেষভাবে যাতে বাতাস আসতে পারে ভালোভাবে।

ন্যাশনাল আর্কাইভস ও লাইব্রেরিতে (National Archives and Library) ৪০ ফুট স্প্যানের ওয়াফ্ল্ স্ল্যাব (waffle slab) করা হয়েছে। আমার সম্মানী চেয়েছিলাম বিল্ডিং তৈরির খরচের ছয় শতাংশ। কিন্তু আলোচনার পর সেটা পাঁচ শতাংশে দাঁড়ায়। দু’রকম কাজের দুটো ভবন একটি মানানসই বাগান দিয়ে একত্র করা হয়েছিল। ভবনগুলোর বাইরে দৃশ্যমান হয়েছে এর কৌণিক ও শুদ্ধ জ্যামিতিক ডিজাইন। বাইরে থেকে দেখলে এতে কিছুটা scaleless ব্যাপার ও monumentality পাওয়া যায়। ‘সানশেড’গুলো যত্ন করে ডিজাইন করা হয়েছে যাতে মনে হয়, এটা বাইরের দেয়ালের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ – আলাদা করে লাগানো হয়নি। লবিতে ওপর থেকে আলো আসে skylight দিয়ে এবং দেয়ালের বড় ম্যুরালকে (mural) আলোকিত করে। দরজা, জানালার ডিটেইল (detail) নিখুঁতভাবে করা হয়েছিল নান্দনিক ও আরামদায়ক সুফলের জন্য। ৪৫০টি ড্রইং তৈরি করা হয়েছিল, যা সেসব দিনে বিরল ছিল।

BADC ভবনে কলাম বসানো হয়েছিল ২০ ফুট অন্তর-অন্তর। এটা in-situ কংক্রিট ভবন যার বাইরে exposed concrete রয়েছে। আমি বিল্ডিংয়ের স্ট্রাকচারটা প্রকাশ করতে চেয়েছিলাম যতটুকু সম্ভব। আমি চেয়েছিলাম যেন লোকে দেখে বুঝতে পারে বিল্ডিংটি কীভাবে তৈরি হয়েছে।

আমি বাংলাদেশের সব জায়গায় ঘুরেছি – গ্রামে, গঞ্জে, প্রত্যন্ত অঞ্চলে, চট্টগ্রামের পার্বত্য এলাকায়। পার্বত্য এলাকার বাড়িগুলো মালয় অঞ্চলের আদলে করা। তারা যুগযুগ ধরে এভাবেই বাড়ি তৈরি করছে – নিচতলা খোলা, যাতে ভেজা বাতাস খেলে যেতে পারে নিচে, আর এতে পোকামাকড় থেকেও বাড়িটা মুক্ত থাকে। এই বাড়িগুলো ‘visual composition’-এর সুন্দর উদাহরণ।

দেশপ্রেম

দেশপ্রেম একটা বড় জিনিস বাঙালিদের জন্য। ২৬ মার্চ ’৭১-এ আমার বাসায় বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করা হয়েছিল। এর কিছুদিন পরেই আমাদের সবাইকে ভারতে চলে যেতে হয়েছে। স্বাধীনতা যুদ্ধের নয় মাসই আমি জড়িয়ে ছিলাম আন্দোলনে। একটা ঘটনা। যুদ্ধ চলাকালে লুই কানের সংসদ ভবন ডিজাইনের কাজে যে কজন বাঙালি স্থপতি কাজ করছিলেন, তাঁরা প্রতিবাদস্বরূপ এক সপ্তাহ কাজ করলেন না। ফলে তাঁদের মাসিক বেতন থেকে ওই সপ্তাহের টাকাটা কেটে রাখে অফিস। আমি লুই কানের সঙ্গে এ ব্যাপারে কথা বলি এবং কান তাঁদের এই বেতনগুলো ফেরত দেওয়ার ব্যবস্থা করেন।

 স্থাপত্যে শ্রদ্ধা

স্বাধীনতার পর আমাকে কোনো বড় সরকারি ডিজাইনের কাজ দেওয়া হয়নি। কেন? কারণ আমি কিছুতেই আমার স্থাপত্যের প্রতি (ও দেশের প্রতি) যে শ্রদ্ধা রয়েছে তার অবমাননাকর কোনো কাজে বা শর্তে রাজি হইনি।

সোশ্যাল মিডিয়া

নিউসলেটার