কবির রাণু, নাটকে নন্দিনী

লেখক:

তরুণ মুখোপাধ্যায়

 

বিতর্ক থাকলেও দ্বিমতের তেমন অবকাশ নেই যে, রবীন্দ্রনাথ তাঁর রক্তকরবী নাটকের নন্দিনী চরিত্রটিকে রাণু ভেবেই লিখেছিলেন। সদ্যকিশোরী প্রাণোচ্ছলা রাণু কবির মনে যে-দোলা দিয়েছিল, তাতে শুধু নাটক নয়, কবিতা, গান ও উপন্যাস লেখা হয়। মহুয়া কাব্য, শেষের কবিতা উপন্যাসে রাণুর ছায়া দুর্লক্ষ্য নয়। তবে রক্তকরবী নাটকে রাণুকে সর্বতোভাবে পাওয়া যায়। যদিও কবি রাণুর প্রত্যক্ষ প্রভাব এড়াতে রক্তকরবী নাটকটির দশটি খসড়া তৈরি করেছিলেন। খঞ্জনা, সুনন্দা থেকে নন্দিনী নামে পৌঁছেছিলেন। রক্তকরবী রচনা ও তার প্রস্ত্ততি সম্পর্কে জানা যায় –

১. কবি গ্রীষ্মাবকাশে শিলংয়ে থাকার সময় এই নাটকটি লেখার প্রস্ত্ততি নেন। কবি অমিয় চক্রবর্তীকে ১৯২৩-এর মে মাসে লেখেন, ‘একটা নাটক গোছের কিছু’ লিখছেন।

২. ১৯২০ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ঐশ্বর্যের দানবপুরীতে গিয়ে কবি ক্ষুব্ধ হন। যন্ত্র ও ঐশ্বর্য মনুষ্যত্ব ক্ষুণ্ণ করে এই ধারণা পোষণ করেন।

৩. রাধাকমল মুখোপাধ্যায়ের কাছে শ্রমিক-অসমেত্মাষ আর বঞ্চনা-পীড়নের খবর শুনে ব্যথিত, উদ্বিগ্ন হন।

৪. সুইডিশ নাট্যকার অগাস্ট স্ট্রিন্ডবার্গের The Dream Play (১৯০২) নাটকটির প্রচ্ছন্ন-প্রেরণা আছে, কেউ-কেউ মনে করেন।

নাটকটি যতই লেখায় পূর্ণতা পায়, কবি জানান, (১৯২৩-এর ১১ অক্টোবর) –

নন্দিনী নাটকটার উপর ক্ষণে ক্ষণে প্রায়ই তুলি বুলোচ্চি – তাতে তার রং ফুটচে বলে বোধ হচ্চে।

প্রথমে নাটকটির নাম দেননি। ‘যক্ষপুরী’ নাম ভাবলেও দেননি। ‘নন্দিনী’ নামটি তাঁর পছন্দ। তবে অষ্টম খসড়ায় এলো চূড়ামত্ম বদল। নাম দিলেন, রক্তকরবী। খসড়া নাটক এখন পূর্ণাঙ্গ। বাকি পরিমার্জনার খসড়ায় সংলাপের পরিমার্জনাই দেখা যায়।

ইংরেজি অনুবাদে (Red Oleanders) কৈফিয়ত দিতে গিয়ে কবি বলেছিলেন,

  1. Nandini is a real woman who knows that wealth and power are Maya, and that the highest expression of life is in love;…
  2. The portrait of Nandini as the bearer of the message of reality, the saviour through death.

(The Visva-Vharati Quarterly, Oct. 1925)

রাণুর চাপল্য, হৃদয়বত্তা কবিকে উদ্বুদ্ধ করেছিল। তাই নন্দিনীতে তার ছায়া পড়ে। রাণুকে তিনি এও বলেন, ‘নাটক লিখছি, তোকে অভিনয় করতে হবে।’ মৈত্রেয়ী দেবীর স্মৃতিচারণে জানা যায়, কবি যখন রক্তকরবী নাটকটি পাঠ করতেন, তখন, ‘নন্দিনী নন্দিনী নন্দিনী’ নামের মধ্যে যেন আনন্দের উৎস ঝরে পড়েছিল। (স্বর্গের কাছাকাছি)।

রাণুকে জীবনের অন্যতম অংশ রূপেই কবি কিন্তু গ্রহণ করেছিলেন। একদিন যা ছিল কন্যাস্নেহ, এখন তা সত্যকার প্রেমের মঞ্জিষ্ঠায় প্রগাঢ়। কথা প্রসঙ্গে এ-কথাও কবি বলেন, ‘রাণু নন্দিনী, তিনি রাজা ও লেনার্ড রঞ্জন’ (রবিজীবনী, প্রশামত্মকুমার পাল)।’ এলম্হার্স্টকেও বলেছিলেন, ‘the human relationship between himself and myself and w.’ কবি এলম্হার্স্টকে Red Oleanders উৎসর্গ করেন। রাণু দাবি করে, রক্তকরবী নাটকটি তাকেই উৎসর্গ করতে। কবি আপত্তি জানান, বলেন, এই নাটকের সবটুকু কৃতিত্ব রাণুর নয়। তবে

But she knew, and I know

that she is the figure around

whom the whole theme

revolves.

এই তথ্য পাই কৃষ্ণ কৃপালনীর রবীন্দ্রজীবনী গ্রন্থে। কবির একদা সচিব অমিয় চক্রবর্তীও বলেন, ‘রক্তকরবীর নায়িকা – আমার মনে হয় – শ্রীমতী রাণু অধিকারী।’ ভাইপো শিল্পী গগনেন্দ্রনাথকে রবীন্দ্রনাথ একবার বলেছিলেন, এই নাটকের নেপথ্য রহস্য সে যেন তার স্ত্রীকেও না বলে। সত্য জানা গেলে কলকাতাজুড়ে wildfire ছড়িয়ে পড়বে এবং ‘They are all abusing me’. কাজেই  রূপকে-সাংকেতিকতায় নাটকটিকে তিনি আড়াল করেন। নারীর প্রবর্তনা তিনি পুরম্নষের জীবনে খুব প্রয়োজনীয় ভাবেন। তবে সেই চাওয়া জৈবিক নয়। নারীর তেমন চাওয়া নেই বলে তাঁর সত্তার সম্পূর্ণ উদ্বোধন হলো না বলেও খেদ প্রকাশ করেন।

১৯১৮ খ্রিষ্টাব্দের ২৫ জুলাই কবি রাণুকে চিঠিতে লিখেছিলেন –

আমি ভিতরের সৌন্দর্য্যকে সবচেয়ে ভালোবাসি – যাদের স্নেহ করি তাদের মধ্যে সেই সৌন্দর্য্যটি দেখবার জন্যে আমার সমসত্ম মনের তৃষ্ণা। মেয়েদের মধ্যে এই সৌন্দর্য্যটি যখন দেখা যায় তখন তার আর তুলনা কোথাও থাকে না।

(‘পত্রসংখ্যা ১৪’)

প্রসঙ্গত এও বলেন, যেখানে মেয়েরা ‘কেবল সংসারে জড়িয়ে থাকে’ বা ‘নিজের ছোট ছোট সুখদুঃখকে নিয়ে’ মহৎ লক্ষ্যকে আড়াল করে, লোকের মন ভোলাতে ব্যসত্ম থাকে, তখন বাইরে সুন্দরী হলেও ‘সে সৌন্দর্য মায়ামাত্র’ তাঁর কাছে। অন্যদিকে তাঁর টীকা-ভাষ্যে রক্তকরবী এমন ‘পালা’ (তথাকথিত নাটক নয়), যার মর্মোদ্ধার বা নিহিতার্থ সকলের ‘দমত্মস্ফুট’ করা অসম্ভব। প্রথমত, রবীন্দ্রনাথ দেশীয় নাট্যকলা যাত্রাপালা ভেবে ‘পালা’ বলতেই পারেন। কেননা, তাঁর নাটকে শেক্পিয়রীয় রীতির অঙ্ক-দৃশ্য বিভাজন নেই। প্রায় সবই পথের ধারে বিচিত্র ঘটনার অভিনয়। পট তোলা-ফেলার সুযোগ নেই। এছাড়াও কবি তাঁর জীবনের দ্বন্দ্বময় রূপকে ‘পৌষফাগুনের পালা’ বলেন, এও জানি। যেখানে তিনি কান্নাহাসির গঙ্গাযমুনায় ডুব দেন, ঘট ভরেন। যে-কান্নাহাসির প্রামেত্ম থাকে তাঁর ‘দুঃখজাগানিয়া’। যাকে ঘিরে আবর্তিত হয় তাঁর সব চিমত্মা, কথা। বিচিত্ররূপিণী সেই নারী এক ও অনেক। তবু এই সময়ে যে বিশেষ, তাকে নির্বিশেষ করতে কবিকে যন্ত্র ও প্রাণ, কৃষি ও শিল্পের দ্বান্দ্বিকতা দেখাতে হয়। তারই অমত্মরালে ফল্গুস্রোতের মতো বয়ে যায় প্রাণের ধারা, গানের ধারা – ‘মাটির উপরিতলে যেখানে প্রাণের, যেখানে রূপের নৃত্য, যেখানে প্রেমের লীলা, নন্দিনী সেই সহজ সুখের, সেই সহজ সৌন্দর্য্যের।’

আমরা জানি, বালিকা ও কিশোরী রাণু কেমন চঞ্চল প্রকৃতির। লাফ-ঝাঁপ-দৌড় তার সহজাত প্রবৃত্তি। অসংকোচ তার আচরণ। নাটকে তাই সে খঞ্জন পাখি হতেই পারে। আনন্দ দেয় বলে, কন্যাসমা বলে নন্দিনীও বটে। রাণুর মা ও ভাবী শাশুড়িকে কবি চিঠিতে এই প্রাণচাপল্যের ও সারল্যের কথা স্বীকার করেছেন।

১. ওর মধ্যে দুর্দ্দামতা আছে তার সম্বন্ধেও অসহিষ্ণু হবে না।

(১৩ মার্চ, ১৯২৪)

২. সে এমনি শিশুর মতো কাঁচা যে তাহার কথাবার্তা ও

(ক) আচরণ অনেক সময় হাস্যকর হইত।…

(খ) বুদ্ধিতে সকল বিষয়েই তাহার আশ্চর্য্য তীক্ষনতা – কিন্তু তাহার চেয়ে বড় কথা তাহার মনের নিষ্কলুষ সরলতা। ঠিক এমনটি আর কোথাও দেখি নাই।

(৩ মার্চ, ১৯২৫)

রক্তকরবী তাই রূপক নয়; নন্দিনী abstract নয়, বাসত্মব। শ্রেণিগত অপেক্ষা এই নাটক অনেকটাই ‘ব্যক্তিগত মানুষের’ – যেমন, রাজা, বিশু, কিশোর ও রঞ্জন। আর আছে নারীশক্তির নিগূঢ় প্রবর্তনা, যাতে পুরম্নষ তার স্বরচিত জালের কারাগার ছিঁড়ে ভেঙে বেরিয়ে আসার সাহস ও শক্তি পায়। ভানুদাদা তাঁর চিঠিতে দুভাবে দেখেছেন নিজেকে – একদিকে বিশ্ববিখ্যাত রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর; অন্যদিকে কিশোরীর প্রতি স্নেহে-অনুরাগে অমত্মরঙ্গ এক রক্তমাংসের মানুষ ভানু। রাণুর সঙ্গে মিলিয়ে যিনি নামটা পছন্দ করেন। ২৩ সেপ্টেম্বর ১৯১৮-তে চিঠিতে লেখেন।

ভানু নামটা যদিও খুব সুশ্রাব্য নয় তবু ওটা আমি একদা নিজেই গ্রহণ করেছিলুম – ওর আর একটুখানি সুবিধা আছে – ওটা ‘‘রাণু’’-র সঙ্গে মিলে যায় –

এক যে ছিল রাণু

তার দাদা ছিল ভানু!

জালছেঁড়া প্রসঙ্গে পড়তে পারি ৪ ফেব্রম্নয়ারি ১৯২৪-এর চিঠি –

আমার পক্ষে তুমি যে বন্ধন হয়ে আসবে এ কিছুতে হতেই পারে না,… তুমি আমার জীবনের প্রাঙ্গণে ফুল-ফোটা লতার মতই এসেচ, বেড়ার মত আস নি। তোমার সেই ফুলের গন্ধ আমার মনে লেগেচে।  তারই আনন্দ আমার কাজের অনেক ক্লামিত্ম দূর করে, এবং অবকাশের মধ্যে গানের সুর লাগায়।

আমরা স্মরণ করতে পারি, যক্ষরাজও মাঝে মাঝে অবসন্ন হন; ক্লামত্ম পাহাড়ের সঙ্গে নিজেকে তুলনা করেন। ছোট্ট সবুজ ঘাসের দিকে, নন্দিনীর দিকে হাত বাড়িয়ে দগ্ধ মরম্নভূমির মতো তৃষার্ত স্বরে বলেন, ‘আমি তপ্ত, আমি রিক্ত, আমি ক্লামত্ম।’ ভাবেন, নন্দিনী যদি কোনোদিন তাঁর মাথায় রক্তকরবীর মঞ্জরি পরিয়ে দেয়, ‘তাহলে হয়তো আমি সহজে মরতে পারব।’ যেখানে তিনি ‘মরণের মাধুর্যে’ ডুবে খুঁজে

নেবেন ঘুম। ক্লামিত্ম মুছে হবেন নতুন রাজা। হৃদয়সম্পদে ধনী যে-নারী সে-ই কবির আরাধ্যা। মৃত্যু নয়, জীবন আর ভালোবাসার দানে যে-নারী মহীয়সী এবং বাসত্মব : real woman.

রাণুকে লেখা ভানুর চিঠিপত্র থেকে এবার কিছু অংশ পুনরম্নদ্ধার করা যায়, যাতে বুঝতে পারি রক্তকরবী ও রাণু অসম্পৃক্ত নয়।

পরিহাসছলে একবার রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, রক্তকরবীর রাজা তিনি, রঞ্জন এলম্হার্স্ট ও রাণু নন্দিনী। আমরা জানি, রবীন্দ্রনাথ যতই রূপক-প্রতীক বা অন্য মুখচ্ছদ ব্যবহার করম্নন, তাঁর অনেক লেখায় তাঁর প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার ছাপ আছে। তাঁর চেনা মানুষেরাই অন্য রূপে, অন্য নামে হাজির হন, যার জ্বলমত্ম দৃষ্টামত্ম পঞ্চভূত গ্রন্থের পাঁচটি ভূত। এঁরা কেউ বায়বীয় নন। অনুরূপভাবে রক্তকরবী নাটকেও কিছু বিশিষ্ট চরিত্রকে মনে হয় চোখে দেখা মানুষের আদল দিয়ে তৈরি। রবীন্দ্রনাথ পঞ্চভূত গ্রন্থে যেমন ভূতনাথ, তেমনি বাকি চরিত্রেও তাঁর ভাবনা সঞ্চারিত করেছেন। এই নাটকে রাজার অপ্রাপ্তির যন্ত্রণা, আত্মপ্রকাশের ব্যাকুলতা হতেই পারে রবীন্দ্রনাথের। কিন্তু তিনি বিশ্বপাগলও বটেন। আবার রঞ্জনের কিছু কণা, অধ্যাপকের অনুরাগ তাঁর মধ্যে খোঁজা নিরর্থক নাও হতে পারে। এসব যদি অনুমান বলি, তবে ‘সম্ভাব্য সত্য’ ভাবতেও পারি।

রবীন্দ্রনাথের চিঠিপত্র বা অন্যদের স্মৃতিকথার সূত্রে ব্যক্তিগতভাবে আমার মনে হয়েছে, গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুর যেন বিশু; এলম্হার্স্ট রঞ্জনের প্রতিকল্প হতে পারেন। পাথুরিয়াঘাটা ঠাকুরবাড়ির পূর্ণেন্দুনাথ যেন কিশোর। পুরাণবাগীশ চরিত্রে কি রাণুর দার্শনিক পিতা ফণীভূষণ অধিকারীর ছায়া পড়েছে? রাজা ও নন্দিনী যে রবীন্দ্রনাথ ও রাণু তা তাঁরাই স্বীকার করেছেন। এবার চিঠিপত্রের সাক্ষ্য নিই।

রক্তকরবী নাটকের সূচনায় নন্দিনীকে কিশোর ‘তুই’ ও ‘তুমি’ দুই সম্বোধন করেছে, একটি সংলাপ এইরকম – ‘শুন্তে পাস জানি, কিন্তু আমার যে ডাকতে ভালো লাগে। আর ফুল চাই তোমার?’ রাণুকে কন্যাসমা জেনেও রবীন্দ্রনাথ প্রীতি-অনুরাগে আপস্নুত হয়েছেন। কিন্তু যেই রাণুর বিবাহ স্থির হয়, রাণুকে নিয়ে কুৎসা জাগে, তখনি রবীন্দ্রনাথের সম্বোধনে দ্বিধা, অস্বস্তি স্পষ্ট হয়ে যায়। ৪ এপ্রিল ১৯২৫-এ ভানুদাদা লেখেন, ‘রাণু, তুমি যে দুঃখ পেয়েছ তাতে তোমার কোনো ক্ষতি হবে না – ভালোই হবে।’ আর ৫ এপ্রিল, ১৯২৫-এ লিখছেন, ‘রাণু, তুই মনে করিসনে তোকে কেউ আমার স্নেহ থেকে বঞ্চিত করতে পারে।’ ধরা যাক ‘তুই’ বলে কবি বাইরের চোখে রাণুর প্রতি তাঁর নিষ্কলুষ স্নেহ প্রকাশ করতে চান। অথচ ভিতরে যে কান্না, অনুরাগ সে তো ‘তুমি’র মধ্যে স্বস্তি খোঁজে। কাজেই পরবর্তী চিঠিগুলিতে তিনি কিশোরের মতো তুই ও তুমির দ্বন্দ্বে বিচলিত হন। ১৫৯ থেকে ১৬১-সংখ্যক পত্রে ‘তুই’ থাকলেও ১৬২-সংখ্যক পত্রে ১৯২৫-এর মে মাসে লিখছেন, ‘রাণু, তোমাকে কাল জন্মদিনের বিবরণ দিয়ে চিঠি পাঠিয়েছি।’ ১৬৩-সংখ্যক পত্রে (১৫ মে, ১৯২৫) আবার লিখছেন – ‘তোকে তো আগেকার চিঠিতেই লিখেচি’ ইত্যাদি।

রাণুকে কবির ভালো লাগার সর্বজনবোধ্য কারণটি এই, তাঁর কন্যা বেলার মৃত্যুদিনে তিনি রাণুর কাছে যান। তাঁরই ভাষায় –

আমার খুব দুঃখের সময়েই তুমি আমার কাছে এসেছিলে;… আমার মনে হল যেন এক স্নেহের আলো নেবার সময় আর এক স্নেহের আলো জ্বালিয়ে দিয়ে গেল।

(পত্র সংখ্যা ১৫, ২৭ জুলাই ১৯১৮)

২৮-সংখ্যক পত্রে জানতে পারছি, কবি স্যার ওয়াল্টার স্কটের জীবনীতে পড়েছিলেন, ‘একটি ছোট মেয়ের সঙ্গে তাঁর খুব ভাব ছিল।’ মেয়েটির বয়স মাত্র সাত বছর। তার নাম Marjorie Fleming. ঠাট্টা করে লিখেছেন, ‘এবার তোমার সঙ্গে দেখা হলেই তোমাকে মার্জ্জরী বলে ডাকব।’ এই চিঠিতেই রাণুর একাধিক নাম তিনি ভেবেছেন।

‘রক্তকরবী’ ফুলই কেন কবির পছন্দ হলো? ভাঙা আবর্জনার সত্মূপ ভেদ করে ওঠা করবী ফুলের প্রাণের ঘোষণা, বহুশ্রম্নত কথা। নাটকে অধ্যাপক জানতে চেয়েছেন, ‘মালতী ছিল, মলিস্নকা ছিল, ছিল চামেলি; সব বাদ দিয়ে এ ফুল কেন বেছে নিলে?’ রাণুকে লেখা চিঠিপত্র থেকে কবির রক্তিম পুষ্পপ্রীতি ও রাণুর সঙ্গে তাকে একাত্ম করে দেখার ইঙ্গিত পাই।

১. তোমার চিঠি সেখানকার লাল ফুলের পাপড়িতে রাগ-রক্ত হয়ে  আমার হাতে এসে পৌঁচচ্চে।  সেখানকার ফুলে যে রক্তিমা দেখতে  পাচ্চি – তোমার গালে সেই রক্তিমা  সংগ্রহ করে আন্বে এই আশা করে  আছি। (২৮ আগস্ট ১৯১৮)

২. তুমি যে লাল ফুল পাঠিয়েচ ঐ লাল রং আমার ভালো লাগে।… নভেম্বর মাসের মধ্যে তোমার গালে যেন ঐরকম লাল ফুল ফুটে ওঠে। (৬ সেপ্টেম্বর, ১৯১৮)

এবার রাণুর চিঠি পড়ি। (পত্র সংখ্যা ৩০ ও ৩১)।

১. যদি আসেন তো আমি আপনাকে অনেক লাল ফুল এনে দেব। (আগস্ট ১৯১৮)

২. আমি সে চিঠি শেষ করে তাতে ফুল দিয়ে, তাকে বন্ধ করে আপনাকে পাঠালাম। (ঐ)

নন্দিনী নামটি নির্বাচনের আগে কবি খঞ্জনি, সুনন্দা নাম গ্রহণ করেছিলেন। রঞ্জন ও খঞ্জন, ভানু ও রাণু নামের এই সর্বানুপ্রাস বোধহয় লিরিক-কবিকে প্রলুব্ধ করেছিল। এমনকি রাণুর সঙ্গে একাত্ম হতে তিনি ভানু নামের বর্ণবিপর্যয়ও ঘটাতে চেয়ে বলেছেন, ‘আমি মস্ন­vন হয়ে পড়েচি বলেই কি ভানু না বলে নিজেকে ভাণু বলব?’ (নভেম্বর, ১৯২৩)। অন্যত্র রাণুর স্বভাব, গতিপ্রকৃতি অনুসারে এক-একটি নাম রাখতে চেয়েছেন। কারণ

মানুষের মেজাজ তো সবসময়ে একরকম থাকে না, অথচ নামটা একই থাকে এটা অসঙ্গত কৃপণতা।  (৬ সেপ্টেম্বর, ১৯১৮)

এদিকে রাণু তার বিচিত্র নামের তালিকা দেখে (সুরবালা, জগদম্বা, খগেন্দ্রমোহিনী, কানুবিলাসিনী) বিরক্ত হয়ে বলেছে, ‘ওর চাইতে রাণু নামটা ঢের সুন্দর।’ (অক্টোবর, ১৯১৮)। রাণু এও জানিয়েছে এই ‘নামেতেই ভানুর সঙ্গে মেলে’। একদা দুঃখরাতের ধন বলে যাকে কবি গ্রহণ করেছিলেন, তার সঙ্গে তাঁর জন্মামত্মরের সম্পর্ক এটাও বলেন। ৯ অক্টোবর ১৯১৮ -তে লেখা চিঠির কিয়দংশ –

তুমি যে ভানুটিকে পেয়েচ সে সন্ধ্যাবেলাকার ভানু – তার হাসি রঙিন কিন্তু উগ্র নয়,… যখন তুমি আমাকে প্রথম চিঠি লিখেছিলে… বোধহয় পূবর্বজন্মে যেসব চিঠি লিখতে সে চিঠিটা তারই অনুবৃত্তি…। এক জন্মের সঙ্গে আর এক জন্মে দৈবাৎ এক এক সময় ঠিক জোড়া লেগে যায় –

রাণুর পিতা অধ্যাপক ফণীভূষণ অধিকারীকে তিনি একটি চিঠিতে স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, ‘আমার প্রতি ওর ‘‘জননামত্মর সৌহৃদানি’’-র দাবি আছে।’ (২১ এপ্রিল, ১৯২৩)

এই দাবি কত গভীর ও অধিকারবোধে উজ্জীবিত, তার প্রমাণ কবিকে লেখা রাণুর চিঠি। নভেম্বর ১৯২৪-এ রাণু বড়ো বেদনায় ভানুদাদাকে লিখেছিল, তাকে কবি আর চিঠি দেবেন না জানিয়েছেন। তবু চিঠি লেখার জন্য, উত্তর পাওয়ার জন্য সে ব্যাকুল হয়। বলে, ‘ভানুদাদা, আপনার একটুখানি হাতের লেখা দেখতে আমার ভারী ইচ্ছে করে।’ কখনো অভিমানে লেখে, ‘আমি আপনার কে ভানুদাদা যে আপনি তখন আমাকে মনে করবেন? আমি সে আশাও করি না।’ বলে, ‘ভালোবাসায় কি একটা দাবি নেই?’ রাণুর একা লাগে, ‘বুকে কষ্ট হয়।’ এরপর লেখে,

ভানুদাদা, আপনিই ত কতবার বলেছেন যে আমাদের সত্যিকারের বিয়ে হয়ে গেছে। তবে আপনি কি বলে আমাকে এমনভাবে অপমান করছেন? (পত্রসংখ্যা ৬৫)

বুড়ো ওরফে পূর্ণেন্দুর সঙ্গে প্রণয়পর্বে ইতি টেনে, ভুল স্বীকার করে রাণু আরো বলে, ‘আমি কাউকেই বিয়ে করব না – আপনার সঙ্গে ত বিয়ে হয়ে গেছে। ভানুদাদা, আপনি হয়ত মানবেন না কিন্তু আমি মানি।’ এও সে জানায়, ‘মনে মনে জানব যে একদিন আমি ভানুদাদার সমসত্ম আদর পেয়েছি। আমার সমসত্ম শরীর ছেয়ে সে আদর আমার মনকে ভরে দিয়েছিল…।’

তবু রাণুর মনে দ্বিধা, জয় করে ভয় যায় না। বলে, ‘আমার এমন কোনো গুণ নেই যার জন্যে আপনার ভালোবাসার যোগ্য হতে পারি।’ তবু সে বলে, ‘আপনি ছাড়া আমি কাউকে কখন ভালোবাসতে পারব না।’ কখনোবা অভিযোগ জানায়,

ভানুদাদা, আপনি আমাকে misunderstand করলেন আর এমন করে ফেলে চলে গেলেন যেন আমি একটা পথের কুকুর। একটুখানি চিঠি লিখে খবর অবধি জানালেন না। সত্যি যদি না ভালোবাসতুম তাহলে আপনার খবর জানবার আমার দরকার কি?

চিঠির ছত্রে-ছত্রে রাণুর কান্নার দাগ, ক্ষমার জন্য আকুলতা ফুটে ওঠে। সে বলে – ‘আপনি না ভালোবাসলে আমি বাঁচব কি করে?’ জানায়,

আমি কিচ্ছু চাই না কেবল আপনার ভালোবাসা। ভানুদাদা, আমার ভারী মন কেমন করে।… আমাকে দয়া করে একলাইনও খবর দেবেন যে, কেমন আছেন।

রবীন্দ্রনাথ বরাবরই মনের দিক থেকে নিস্পৃহ। কোনো বন্ধনকেই চরম ভাবেন না। নিজের সৃজনকর্মই তাঁর কাছে শেষ কথা। তবে এখানে তাঁর রোমান্টিক মন আহত বলেই দূরত্ব রেখেছিলেন।

রক্তকরবী নাটকে নন্দিনীকে অধ্যাপকের মনে হয় ‘আচমকা আলো’; চমক লাগিয়ে যাওয়া নারী। সে যেন ‘সুন্দরের হাতে রক্তের তুলি’। রাজাও বলেন, ‘রূপের মায়ার আড়ালে অপরূপ’ এই নারী যেন ‘বিশ্বের বাঁশিতে নাচের যে ছন্দ বাজে সেই ছন্দ’। রাণু প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথ চিঠিতে লঘুচালে যা লিখেছেন, তা এইরকম –

…লক্ষ্মী মেয়ে হয়ে প্রসন্ন হাসি হেসে ঘর উজ্জ্বল করে থাকবে। সকলেই বল্বে রাণু এমন সোনে কি তরহ্ হাসি পেয়েচে কোন্ পারিজাতের গন্ধ থেকে, কোন্ নন্দনবীণার ঝঙ্কার থেকে, কোন্ প্রভাততারার আলোক থেকে, কোন্ সুরসুন্দরীর স্বপ্ন থেকে, কোন্ মন্দাকিনীর চলোর্ম্মি কলেস্ন­vল থেকে,…         (১৮ নভেম্বর, ১৯১৮)

এমন রাণু বা নন্দিনী যে ‘মনটাকে নাড়া দিয়েই’ যাবে, এতে সন্দেহ কি?

রাজা সুন্দরকে পাননি, তাই বীণার তার ছিঁড়ে ফেলেছেন, যদিও নন্দিনীর ছুটি যে রঞ্জনই মধুতে ভরে দেয় এতে তাঁর রাগ, ঈর্ষা, কৌতূহল সবই প্রকাশ পায় যখন বলেন, ‘তুমি তো আমাকে ফাঁকা ছুটির খবর দিলে, মধু কোথায় পাব?’ এলম্হার্স্টকে ঘিরে রাণু একসময় কিছু উতলা হয়েছিল। রবীন্দ্রনাথ প্রথমে কৌতুক বোধ করলেও, পরে মানসিকভাবে উদ্বিগ্ন হন। তাঁর সেই মনোভাব ১০৬-সংখ্যক পত্রে (২৮ সেপ্টেম্বর, ১৯২২) পাই –

তোমার গেল চিঠিতে এলম্হর্স্টকে তোমার ভালোবাসা জানাতে বলেছিলে, আমি যথাসময়ে যথাবিধি তাঁকে তোমার প্রিয়সম্ভাষণ নিবেদন করেচি, তার থেকে এক কণামাত্রও গোপনে আমার নিজের জন্যে অপহরণ করিনি। এর থেকে আমার আশ্চর্য ঔদার্য্যের পরিচয় পাবে।

রাণুর দাম্পত্য জীবন যখন পূর্ণ, তখন ১ আগস্ট ১৯৩৮-এ অস্তাচলযাত্রী কবি চিঠিতে লিখেছেন, ‘কোনো কাজ করতে একটু ইচ্ছে করে না।’ অথচ ‘অবকাশ ফাঁদতে’ পারছেন না। কারণ

সেই অবকাশটাকে রসে ভর্তি করতে পারে এমন মানুষেরও প্রয়োজন। কোনোমতে অবকাশ যদি বা জোটে মানুষ জোটে না।

সুন্দরী রাণুকে ও নন্দিনীকে সবাই কামনা করে। রবীন্দ্রনাথও জানতেন। রাণুর ছেলেমানুষি তার পক্ষে বিপজ্জনক। যেজন্য পূর্ণেন্দু বা বুড়োর সঙ্গে প্রণয়পর্ব শুভঙ্কর হয়নি। রবীন্দ্রনাথ সতর্ক করে চিঠিও দিয়েছেন –  ‘তোমার সম্বন্ধে বুড়োদের বাড়িতে কুশ্রীরকম অপমানজনক কথাবার্তা চলচে।’ (২৪ ফেব্রম্নয়ারি, ১৯২৪)। যার জেরে রাণুর বিয়ে ভ-ুল হতে চলেছিল। রাণুও ভুল বুঝে কবিকে চিঠিতে লেখে ‘আপনার পায়ে ছুঁয়ে বলেছি যে তাদের কোনো খবর নেব না। আমি বিয়ে করব না।’ (নভেম্বর, ১৯২৪)। এরই পাশে গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুরও রাণুর প্রতি কখন যেন দুর্বল হয়ে পড়েছেন। বিশেষত বিসর্জন নাটকে অপর্ণা চরিত্রে রাণুকে দেখে অনেকেই পাণিপ্রার্থী হয়। ২ মার্চ ১৯২৪-এর চিঠিতে কবি জানাচ্ছেন

মাঝে মাঝে গগনবাবু এসে দেখা করে যান, – প্রায়ই একজন বিশেষ লোকের কথা, তিনি আলোচনা করেন – আমার বিশ্বাস সেই আলোচনা করবার জন্যেই তিনি আসেন, আমাকে দেখবার জন্যে না। তিনি ওই ব্যক্তির অনেক গুণ আবিষ্কার করেছেন –

৮ আগস্ট ১৯২৩-এর চিঠিতে আভাস পাই ‘তোমাকে ছাড়া গগনের আর কাউকে পছন্দ হয় না’। অর্পণা চরিত্রে অভিনয় দেখে রাণুর প্রতি বহুজনের অনুরাগ নিয়ে রবীন্দ্রনাথের প্রতিক্রিয়া, রাণু বিসর্জনে খুব ভালো অভিনয় করেছে শুনে এলম্হার্স্ট দীর্ঘশ্বাস ফেলেছেন। তারপর পরিহাসের সুরে বলেন, ‘তোমার সাধকদের মধ্যে ইদানীং কার কি দশা ঘটেছে তার হালখবর কিছুকাল পাইনি… কিন্তু আন্দাজ করতে পারচি।’ (১৩ নভেম্বর, ১৯২৩)। আবার ১৯২৪-এর ফেব্রম্নয়ারিতে লেখা চিঠিতে কবির রাণুর জন্য আগ্রহ কৌতুকের ভঙ্গিতে লিপিবদ্ধ

হয়েছে। কাশী থেকে এলম্হার্স্ট এলে তাঁর কাছে কবি রাণুর খবর জানতে চাইলে শোনেন,

‘‘বন্ধু She looked very happy’’ ভানুদাদা সত্মব্ধ হয়ে বসে ভাবতে লাগলো, হঠাৎ এত happiness-এর কারণ কী ঘট্ল?

এরপর আরো রসিকতা করলেও বোঝা যায়, বুকের মধ্যে কবির কোথাও ঈর্ষার সামান্য জ্বালা লেগেছে। যেমন ভাবে রাজা

নন্দিনীর কাছে রঞ্জনের কথা শুনে ক্ষুব্ধ, বিচলিত হন। জানতেও চান, ‘বলো আমাকে তোমার ভালো লাগে কি না।’ রাণুর প্রতি তাঁর গভীর অনুরাগ বিসর্জন নাট্যাভিনয়েই প্রকাশিত, যেজন্য বাষট্টি বছর বয়সী কবি রঘুপতির ভূমিকা ছেড়ে যুবক জয়সিংহ সাজেন অপর্ণার তথা রাণুর সঙ্গ পাবেন বলে। এটা অনুমান নয়। ১১৮-সংখ্যক পত্রে কবি লিখেছেন,

এই সেদিন যে আমি রঙ্গমঞ্চ ’পরে দাঁড়ায়েছি গর্বভরে, সাথে লয়ে অভিনেত্রী সখী মোর! আমার মনে হল যেন তারই কণ্ঠ আমাকে বলতে লাগল, ‘ভানুদাদা, এস যাই এ নাটমন্দির ছেড়ে।’ আমি তার জবাবে বল্লুম, ‘‘যাব যাব, তাই যাব, হায় রাণু, তাই যেতে হবে হবে!’’

আত্মবিলোপী এই ভাবনা অসত্য ও অসঙ্গত নয়। ব্যক্তিগত স্মৃতিচারণা থেকে বলি, আমার বাবা একবার শিশিরকুমার ভাদুড়ী-অভিনীত সীতা নাটক দেখেছিলেন। সেখানে রামরূপী শিশিরবাবু সীতা বিসর্জনের আবেগার্ত মুহূর্তে বলে উঠেছিলেন, ‘আজি মোর সীতারে, প্রাণের কঙ্কারে দিব বিসর্জন।’ সীতা চরিত্রের অভিনেত্রী কঙ্কাবতী ছিলেন তাঁর শেষ বয়সের প্রিয়া। রাণুকে ঘিরে রবীন্দ্রনাথ কতখানি সংসক্ত ছিলেন, আমার বলার কথা সেটাই। এখানে কোনো যৌনবাসনা ও তাড়না নেই। আছে ভালোবাসার উষ্ণতা – ‘একটুকু ছোঁয়া লাগে, একটুকু কথা শুনি’। তাঁর কবিপ্রাণ সেই সুরেই ফাল্গুনী রচনা করতে চান। প্রথম যৌবনে আন্না তড়খড় নামের কিশোরীও তাঁর মনের তারে ঝংকার দিয়েছিল, যাকে কবি ‘নলিনী’ বলে অমর করেছেন। শেষ বয়সে রাণুকেও দেখি তিনি ‘হেমনলিনী’ বলেন; স্বর্ণপদ্মের মতো যার রূপ ও বিভা। ২২ ফেব্রম্নয়ারি ১৯২২-এ রাণুকেই বলেছেন, ‘লেভি সাহেব আমার বন্ধু হয়েও তোমার কাছে হেমনলিনীর কথাটা ফাঁস করে দিয়েচেন এতে আমি মনে বড় দুঃখ পেয়েচি।’ মাদাম লেভির ডায়েরি থেকে জানা যায়, রাণুকে দেখে তাঁর মনে হয়েছিল, ‘অপরূপ লাবণ্যের সঙ্গে মিশেছে হরিণীর স্বচ্ছন্দ চঞ্চলতা’। শামিত্মনিকেতনের জন্য অর্থ সংগ্রহ তথা লক্ষ্মীর সাধনা ও হেমনলিনীকে একাত্ম করে দ্ব্যর্থবোধক ভাষায় কবির স্বীকারোক্তি – ‘এ কথা সত্য যে, আমি তারই সাধনায় প্রবৃত্ত আছি’ (পত্রসংখ্যা ৯৪)। আমরা জানি, রক্তকরবীর নন্দিনী ঐশ্বর্যকে তুচ্ছ করেছে; ভালোবাসাই তার অন্বিষ্ট। ধনী স্বামীর ঐশ্বর্যের যক্ষপুরীতে রাণু মনের আরাম পায়নি, এটাই সত্য।

 

শেষ কথা

রাণুকে ঘিরে কবির আবেগ বোঝা যায় অজস্র চিঠি লেখায়। কর্মব্যসত্মতা সত্ত্বেও প্রায় নিয়মিত চিঠি লিখতেন প্রিয় নারীটিকে। অথচ সেই রাণুর বিয়ে হলে কবি মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন। নিঃসঙ্গ হয়ে যান। এরপর রাণুকে দেখার জন্য উৎসুক ও প্রতীক্ষাতুর হয়ে থাকেন। রাণু তাঁর অস্তিত্বের কতখানি অধিকার করেছিল তা ১৯২৮-৪০ সময়সীমায় লেখা চিঠিগুলিতে ধরা পড়ে। যেখানে বয়সে বৃদ্ধ, মনে যুবক চিরপ্রেমিক কবির আকুলতা এইভাবে প্রকাশ পেয়েছে –

১. শরীরটা খুব ক্লামত্ম। তোকে দেখবার জন্যে ইচ্ছে করে।

(পত্র ১৭৪)

২. আমার শারীরিক অবস্থা অনুকূল হয় তাহলে তোকে দেখে আসব।  (পত্র ১৭৮)

৩. তুই কেমন আছিস শোন্বার জন্য উদ্বিগ্ন রইলুম। (পত্র ১৮৯)

৪. রাধিকা যেমন পায়ের শব্দ শুনলেই চমকে উঠতেন আমারও সেই দশা।            (পত্র ১৮৭)

৫. রাণু, তুই নিশ্চয় আসবি। ইতিমধ্যে আবার মন বদলাস নে। (পত্র ১৯৩)

৬. বহুকাল তোকে দেখিনি।

(পত্র ১৯৬)

৭. অনেকদিন দেখা হয়নি – তোকে দেখতে ইচ্ছে করে। কবে হয়ত দেখবার দিন হঠাৎ যাবে শেষ হয়ে।     (পত্র ১৯৯)

এই চিঠি লেখার পাঁচ বছর পরেই কবির জীবনাবসান ঘটে। মহুয়া কাব্যের ‘প্রত্যাশা’ কবিতায় কবির অপেক্ষাক্লামত্ম মনের ছবিটি পাওয়া যায়। প্রাঙ্গণে ফুলস্ন­ শিরীষ তাকে প্রশ্ন করে, ‘এসেছে কি?’ তারপর নিজের মুখোমুখি হন কবি –

হায় গো আমার ভাগ্যরাতের তারা,

নিমেষ গণন হয়নি কি মোর

সারা।

প্রত্যহ বয় প্রাঙ্গণময় বনের বাতাস

এলোমেলো,

‘সে কি এলো?’

কবির জীবনে পাকাপাকিভাবে রাণু আসেনি। কিন্তু তাঁর সাহিত্যে, বিশেষত রক্তকরবী নাটকে নন্দিনী হয়ে এসেছে। ‘রাণুই নন্দিনী’ তাই মিথ্যা নয়। r

 

 

এক জীবনে বহু জীবনের কাজ : বঙ্গীয় শব্দকোষ

সুভাষ ভট্টাচার্য

 

কথামুখ

 

বিংশ শতকের দুটি বৃহত্তম বাংলা কোষ বা অভিধান হলো জ্ঞানেন্দ্রমোহন দাসের বাঙ্গালা ভাষার অভিধান আর হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের বঙ্গীয় শব্দকোষ। প্রকাশকালের দিক থেকে জ্ঞানেন্দ্রমোহন একটু এগিয়ে। তাঁর অভিধানের প্রথম প্রকাশ ১৯১৭ সালে। হরিচরণেরটি খ—খ– প্রকাশ শুরম্ন ১৩৩৯-৪০ বাংলা সনে অর্থাৎ ১৯৩২-৩৩ সালে। তবু ১৩৪৩ সালে সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় বঙ্গীয় শব্দকোষ সম্পর্কে লিখলেন – ‘এই বিরাট শব্দকোষ আপনার পা–ত্যের, অধ্যয়ন ও অভিনিবেশের এবং গবেষণা ও প্রকাশ-শক্তির পরিচায়ক,… সহস্রবর্ষব্যাপী একটি বিশাল সাহিত্যের শব্দাবলীর এই বৃহত্তম ভা-ার আপনার পক্ষে এবং সঙ্গে সঙ্গে বাঙ্গালী জাতির পক্ষে একটি কীর্তিসত্মম্ভবিশেষ।’

জ্ঞানেন্দ্রমোহনের অভিধানও বিপুলায়তন; উপরন্তু সেটি আগেই প্রকাশিত হয়েছে। তবু হরিচরণের শব্দকোষ সম্বন্ধে সুনীতিকুমারকে একটু বেশিই উচ্ছ্বসিত মনে হচ্ছে আমাদের। তার কারণ সহজেই অনুমান করতে পারি। হরিচরণ শুধু যে প্রগাঢ় পা–ত্যের সমুজ্জ্বল এক মনীষী, তা নয়, শব্দবিদ্যায় তাঁর নৈপুণ্য বিস্ময়কর, স্বয়ং সুনীতিকুমার লিখছেন – ‘শ্রীযুক্ত হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় যেভাবে ব্যুৎপত্তি প্রদর্শন করিয়াছেন, সাধারণতঃ তাহা ভাষাতত্ত্বানুমোদিত রীতিতেই করিয়াছেন।’ হরিচরণের সংস্কৃত বিদ্যাবত্তাও ছিল ঈর্ষণীয়। ‘জ্ঞানতাপস’ কথাটা বহুব্যবহারে জীর্ণ হয়ে গেছে একথা ঠিক। তবু তাঁর সম্পর্কে ওই অভিধাটি এতটাই জুতসই যে, তা কলমের ডগায় এসে যায় অপ্রতিরোধ্যভাবে। বলতে গেলে জ্ঞানচর্চা ছাড়া তাঁর সুদীর্ঘ জীবনকালে আর কিছুই করেননি তিনি, করে উঠতে পারেননি। এমনকি, বিদ্যার আত্মবিশ্বাসজনিত অহঙ্কারও ছিল না এই জ্ঞানবান কর্মিষ্ঠ মানুষটির। তাই তিনি অনায়াসে বলতে পেরেছিলেন – ‘আমার জীবনে অসাধারণ কিছুই নাই, আমার জীবনস্মৃতির তাই কিঞ্চিৎমাত্র মূল্যও আছে, তা আমি কখনো মনে করতে পারিনি।’

হরিচরণ জন্মেছিলেন ১৮৬৭-র ২৩ জুন তাঁর মাতুলালয়ে। কি শিশুকালে কি কিশোরকালে আর্থিক অসচ্ছলতা ছিল তাঁদের পরিবারের নিত্যসঙ্গী। প্রাথমিক শিক্ষার সত্মরে দু-তিনবার নানা কারণে তাঁকে স্কুল বদল করতে হয়েছিল। তবে মেধাবী হরিচরণ ছাত্রবৃত্তি পরীক্ষায় বৃত্তি পেয়ে উত্তীর্ণ হয়েছিলেন। তিনি অবশ্য স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে লিখেছিলেন ওই ছাত্রবৃত্তির চেয়ে অনেক বড়ো বৃত্তি তাঁর পাওয়া হয়ে গিয়েছিল রবীন্দ্রনাথের কাছ থেকে। অর্থকষ্টে তাঁর লেখাপড়া যাতে ব্যাহত না হয়, তাই রবীন্দ্রনাথ তাঁকে নিয়মিত অর্থসাহায্য করেছিলেন। রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে সেই তাঁর সংযোগের শুরম্ন। এর পরের যোগাযোগ অনেক পরে যখন ১৯০১-০২-এ রবীন্দ্রনাথেরই নির্দেশে হরিচরণ পতিসরে এস্টেটের কাজে নিযুক্ত হন। ইতিমধ্যে সংস্কৃতবিদ্যায় নিজের বিদ্যাবত্তার পরিচয় দিয়েছেন হরিচরণ এবং কিছুকাল কলকাতার টাউন স্কুলে প–তের চাকরি করেছেন। সংস্কৃতজ্ঞ পণ্ডিত এবার কাছারিতে সামান্য লেখালেখির কাজ করতে থাকেন। কিছুদিনের মধ্যেই রবীন্দ্রনাথ তাঁকে ডেকে নেন শামিত্মনিকেতনে। ব্রহ্মচর্যাশ্রমে সংস্কৃতের শিক্ষক হয়ে গেলেন হরিচরণ। এতটাই মজে গেলেন যে, রবীন্দ্রনাথ যখন তাঁর কাছে জানতে চাইলেন, তিনি এ-কাজই করবেন, নাকি ফিরে যাবেন পতিসরে, তখন মুহূর্তকাল দ্বিধা না করে বলেছিলেন, আশ্রমে সংস্কৃতই শেখাবেন। আর পতিসরে ফেরা হলো না হরিচরণের। তবে শুধু ছাত্রদের সংস্কৃতি শেখানোই তো নয়, জটিলতা এড়িয়ে ছাত্রদের জন্য সংস্কৃত পাঠ্যপুসত্মক রচনা করলেন – সংস্কৃত প্রবেশ আর শিশুরঞ্জন সংস্কৃত প্রবেশ

 

দুই. বঙ্গীয় শব্দকোষ : রচনা ও মুদ্রণ

নিজেকে ভালোমতন প্রস্ত্তত করে নিয়ে ৩৫-৩৬ বছর বয়েসে (১৩১২ বঙ্গাব্দ নাগাদ) হরিচরণ হাত দিলেন তাঁর শব্দাভিধানের রচনায়। সংস্কৃতের শিক্ষক হরিচরণ ছাত্রদের জন্য যে সংস্কৃত-পুসত্মক রচনা করেছিলেন তার গুণমান আর অভিনবত্ব দেখে রবীন্দ্রনাথের মনে হয়েছিল বাংলা ভাষার একখানি প্রামাণিক অভিধান রচনার ইনিই উপযুক্ত ব্যক্তি। তাঁরই উৎসাহ আর নির্দেশনায় হরিচরণ অভিধান রচনায় হাত দিলেন। একক প্রচেষ্টায় এমন অভিধান রচনা সহজ কাজ ছিল না। যেভাবে যখন পেরেছেন বইপত্র সংগ্রহ করেছেন। হরিচরণ নিজেই লিখেছেন – ‘নিজেই গ্রন্থাগারে প্রাচীন ও আধুনিক বাংলার পুসত্মক যাহা-কিছু পাইয়াছিলাম, তাহা পড়িয়া শব্দ, বাক্যাংশ (Phrase) সংগ্রহ করিয়া সংগৃহীত শব্দসমূহ সংস্কৃত শব্দের সহিত মাতৃকাবর্ণানুক্রমে সাজাইয়া অভিধান আদ্যোপামত্ম নিজের হাতেই লিখিয়াছি। ইহাতে কাহারো এক বর্ণেরও সাহায্য পাই নাই।’

১৩৩০ বঙ্গাব্দে অর্থাৎ ১৯২২-২৩ সাল নাগাদ হরিচরণ তাঁর সুবিপুল অভিধানের কাজ প্রাথমিকভাবে শেষ করেন। পরিমর্জিনা সংশোধন ইত্যাদি অবশ্য চলতেই থাকল। কয়েক মাস পরে ১৯২৪-এর ১৭ সেপ্টেম্বর রবীন্দ্রনাথ বাংলার পাঠকসমাজ ও বিদ্বৎসমাজের কাছে একটা আবেদন করেন – ‘শ্রীযুক্ত হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় গত বিশ বছর ধরিয়া বাংলা অভিধান রচনায় নিযুক্ত। সম্প্রতি তাঁহার কার্য্য সমাপ্ত হইয়াছে। এরূপ সর্বাঙ্গসম্পূর্ণ অভিধান বাংলায় নাই। এই পুসত্মক বিশ্বভারতী হইতে আমরা প্রকাশ করিবার উদ্যোগ করিতেছি। এই বৃহৎ কর্ম্ম সুসম্পূর্ণ করিবার জন্য প্রকাশ সমিতি স্থাপিত হইয়াছে। বাংলাদেশের পাঠক সাধারণ এই কার্য্যে আনুকূল্য করিয়া বাংলা সাহিত্যের গৌরব বৃদ্ধি করিবেন একামত্ম মনে ইহাই কামনা করি।’

এর আগে ১৯১১ সালের ১০ মে তারিখে যখন হরিচরণের অভিধান-রচনা মাঝপথে, তখন রবীন্দ্রনাথ রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদীকে লিখেছিলেন – ‘আমাদের অধ্যাপক হরিচরণ একখানি বাংলা অভিধান রচনায় নিযুক্ত হইয়াছেন – আপনারা যাহা চান ইনি তাহাই করিয়া তুলিতেছেন। ব্যাপারটি প্রকা- হইবে। একবার দেখিয়া দিবেন। বাংলা সাহিত্যে যে সকল সংস্কৃত শব্দ ব্যবহার হয় না এমন শব্দও ইহাতে স্থান পাইয়াছে। সেইটে আমার কাছে সঙ্গত বোধ হয় না। মোটের উপর এ গ্রন্থখানি রচিত ও প্রকাশিত হইলে দেশের একটি মহৎ অভাব দূর হইবে।’ হরিচরণ লেখা শেষ করার পরে বহু জায়গায় সংশোধন ও পরিমার্জনা করেন। পরে রামেন্দ্রসুন্দর ও সুনীতিকুমার অভিধানটির উৎকর্ষ বিষয়ে তাঁদের অকুণ্ঠিত অভিমত জানান। তাঁদের মতে এটি অপ্রতিম।

কিন্তু গোল বাধল এবার মুদ্রণ নিয়ে। রবীন্দ্রনাথ চেয়েছিলেন এই অভিধান বিশ্বভারতী থেকেই প্রকাশিত হোক। কিন্তু তখন বিশ্বভারতীর আর্থিক সঙ্গতি ছিল না একেবারেই। এমনকি সুনীতিকুমার বা বিষ্ণুশেখর শাস্ত্রীও আমত্মরিক ইচ্ছা সত্ত্বেও তেমন সাহায্য করতে পারেননি। কোনো দিকেই আশার আরো দেখা যাচ্ছিল না। এবার নিজেই উদ্যোগী হলেন হরিচরণ। তিনি প্রথমে দীনেশচন্দ্র সেনের শরণাপন্ন হলেন। তাঁরই পরামর্শে হরিচরণ আবেদন করলেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে। তাঁর আবেদনের ভিত্তিতে একটি কমিটি গঠিত হলো। সেই কমিটির সদস্যরা হলেন সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়, দীনেশচন্দ্র সেন ও শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়। যখন জানা গেল যে, ও-বই ছেপে বার করতে খরচ হবে প্রায় পঞ্চাশ হাজার টাকা, তখন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় পিছিয়ে গেল। অত টাকা খরচ করার মতো সম্পন্নতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছিল না তখন। এমনকি শ্যামাপ্রসাদও খুব-একটা ভরসা দিতে পারলেন না, যদিও অভিধানটি সম্পর্কে তিনি যথেষ্টই উচ্ছ্বসিত হয়েছিলেন। এর পরে হরিচরণ বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষতের দ্বারস্থ হন। তবে সেখানেও তেমন আশাব্যঞ্জক কিছু ঘটল না।

এমন সময় হরিচরণের মনে পড়ল বিশিষ্ট লেখক, প্রকাশক ও কোষপ্রণেতা নগেন্দ্রনাথ বসুর কথা। তাঁকে বলতেই সাগ্রহে রাজি হলেন। তবে ছাপার খরচ আর কাগজের দাম দিতে হবে হরিচরণকে। নিদারম্নণ কষ্টে নানাভাবে টাকা জোগাড় করা গেল। ১৩৩৯-৪০-এ অভিধানের প্রথম ও দ্বিতীয় খ- প্রকাশিত হলো। শেষ খ- প্রকাশিত হয় ১৩৫২-তে। অনেক পরে সাহিত্য অকাদেমি থেকে দুই খ– (১৯৬৬, ১৯৬৭) প্রকাশিত হয় বঙ্গীয় শব্দকোষ। গত পঞ্চাশ বছর ধরে এই সংস্করণই শিক্ষিত বাঙালির দাবি মিটিয়ে এসেছে। সাহিত্য অকাদেমির এই সংস্করণে মুদ্রিত হয়েছে রবীন্দ্রনাথের ১৩৩৯-এর ৮ আশ্বিনে লেখা আশীর্বচন, আর রয়েছে সুনীতিকুমারের লেখা একটি অমূল্য ভূমিকা।

 

তিন. শব্দসম্ভার

বঙ্গীয় শব্দকোষে বিপুলসংখ্যক শব্দ গৃহীত হয়েছে। সংস্কৃতের প–ত হরিচরণ। কাজেই তৎসম শব্দের প্রতি তাঁর একটা দুর্বলতা বা পক্ষপাত থাকারই কথা। এতে অবশ্য অন্যায় বা ভুল কিছু নেই। ১৩৩৮ সালে সংস্কৃত কলেজের এক অভিভাষণে রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন – ‘বাংলাকে সংস্কৃত ভাষার দানসত্র ও অন্নসত্র থেকে দূরে নিয়ে এলে তাতে গুরম্নতর ক্ষতি ঘটবে।… সংস্কৃত ভাষায় ভারতীয় চিত্তের যে আভিজাত্য, যে তপস্যা আছে, বাংলা ভাষায় তাকে যদি গ্রহণ না করি তবে আমাদের সাহিত্য ক্ষীণপ্রাণ ও ঐশ্বর্যভ্রষ্ট হবে।’ হরিচরণ তাঁর অভিধানে প্রচুর সংখ্যায় তৎসম শব্দ বিবৃত করেছেন। তবে তিনি যেহেতু মূলত মুদ্রিত সাহিত্য থেকে শব্দ আহরণ করেছেন, তাই তাঁর শব্দসম্ভারে ফর্মাল বা তথাকথিত আচারিক বা ‘শিষ্ট’ শব্দেরই আধিক্য দেখতে পাই। একে অস্বাভাবিক বলতে পারি না। বাংলা ভাষায় তৎসম শব্দ বেশ একটা বড়ো জায়গা অধিকার করে আছে। উনিশ শতকের শেষ

থেকে বিংশ শতকের গোড়ার দিকে সর্বত্র বাংলা সাহিত্যে তৎসম শব্দের নিঃসংশয়িত প্রাধান্য ছিল। কিন্তু প্রশ্ন ওঠে অন্য একটা বিবেচনা নিয়ে। ভাষায় কদাচিৎ ব্যবহৃত হয় এমন তৎসম শব্দের অমত্মর্ভুক্তি সমীচীন কিনা, সংগত কিনা, তা ভাবতেই হয়। অভিধানকে সত্যিই যদি ভাষার দর্পণ হতে হয়, তাহলে যেসব শব্দকে গ্রহণ করছি তাদের ব্যবহারযোগ্যতা ও ব্যবহারের পৌনঃপুনিকতা অবশ্যই সামান্য পাওয়া উচিত। হরিচরণের শব্দকোষে এমন অনেক শব্দই আছে যা হয়তো লেখার ভাষায় আর প্রায় দেখাই যায় না, আর মুখের ভাষায় তো তা আরো সুদুর্লভ। ‘অন্নাশন’ শব্দটি কঠিন নয় বটে, তবে নয় বটে তবে নিঃসন্দেহে বিরল ব্যবহার। ‘অন্নপ্রাশন’ যেখানে বহুল ব্যবহৃত, সেখানে ‘অন্নাশন’ দুর্লভদর্শন। ‘কর্মসংন্যাস’ বা ‘অনুপদীনা’র মতো শব্দ ভাষায় কতবার ব্যবহৃত হয়েছে বা হয়? নিশ্চয় বহুবার নয়। এমনও দেখছি, এই ধরনের শব্দের প্রয়োগ বাংলা সাহিত্য থেকে প্রায় দেখানোই যায়নি। হরিচরণ অনেক ক্ষেত্রে সংস্কৃত থেকেই দৃষ্টামত্মবাক্য তুলে এনেছেন। এমন রক্ষণশীলতার চিহ্ন হরিচরণের অভিধানে মাঝে মাঝেই চোখে পড়ে। একজন সংস্কৃত প–তের পক্ষে তা হয়তো ছিল অপ্রতিরোধ্য।

এমনসব শব্দ হরিচরণ কেন অমত্মর্ভুক্ত করলেন? হরিচরণের যুক্তি – ‘সংস্কৃত পাঠার্থীরও বিশেষ উপকার হইবে এবং এই উদ্দেশ্যেই ঐ সকল সংস্কৃত শব্দ সঙ্কলিত হইয়াছে’ (সঙ্কলয়িতার নিবেদন)। অথচ সাহিত্য পরিষৎ থেকে প্রকাশিত নির্মলকুমার নাগ-কৃত জীবনী থেকে জানতে পারি, রবীন্দ্রনাথ ১৯১১-তে রামেন্দ্রসুন্দরকে এ কথাই লিখেছিলেন যে, বিরল প্রয়োগ সংস্কৃত শব্দের অমত্মর্ভুক্তি তাঁর সংগত মনে হয়নি। এর উলেস্নখ আমরা আগেই করেছি। রাজশেখর বসু অবশ্য হরিচরণের ‘প্রাচীন ও আধুনিক সংস্কৃতেতর’ শব্দের অমত্মর্ভুক্তির প্রশংসা করেছেন বিশেষভাবে। একটু বেশি মাত্রায় সংস্কৃত তথা তৎসম শব্দের অমত্মর্ভুক্তিতে তাঁর আপত্তি বিশেষ শুনতে পাই না।

এ কথাও ঠিক যে, তৎসম শব্দের চাপে ‘সংস্কৃতেতর’ শব্দ যাতে যথাযথ গুরম্নত্ব থেকে বঞ্চিত না হয়, সেদিকে নজর ছিল হরিচরণের। তদ্ভব শব্দ, দেশি শব্দ, প্রতিবেশী ভাষার শব্দ, আরবি-ফারসি মূল শব্দ যতদূর সম্ভব গ্রহণ করেছেন তিনি। গ্রহণ করেছেন চর্যাগীতি, শ্রীকৃষ্ণকীর্তন, মঙ্গলকাব্য, বৈষ্ণব সাহিত্য প্রভৃতিতে ব্যবহৃত শব্দ। গ্রহণ করেছেন ইজের, উচক্কা, গেঁড়া, দেঁতোর মতো শব্দ। বিংশ শতকের গোড়ার দিকে প্রচলিত-স্বল্প প্রচলিত প্রায় কোনো শব্দই অলব্ধপ্রবেশ থাকেনি হরিচরণের শব্দকোষে। এখনকার ভাষাতত্ত্বে ‘রেজিস্টার’ কথাটার বেশ চল হয়েছে। যে-কোনো সমাজে নানা ধরনের ভাষার ব্যবহার হয়, যেমন, আইনের ভাষা, সংবাদপত্রের ভাষা, বিজ্ঞানের ভাষা, ধর্মকর্মের ভাষা। ‘রেজিস্টার’ কথাটার সঙ্গে হরিচরণের পরিচয় ছিল না, থাকার কথাই নয়। কিন্তু তিনি সাধ্যমতো এবং তাঁর বিবেচনামতো ওপরের প্রত্যেকটি রেজিস্টার থেকে শব্দ নিয়েছেন, বিজ্ঞানবিষয়ক শব্দই যা-একটু কম। বহু আঞ্চলিক শব্দেরও দেখা পাই বঙ্গীয় শব্দকোষে।  কোনো অভিধানেই ভাষার সমসত্ম শব্দ অমত্মর্ভুক্ত করা সম্ভব নয়। ব্যবহার-যোগ্যতা বা প্রচলন অনুসারে যতদূর সম্ভব বেশি শব্দ একটা বড় অভিধানে গ্রহণ করাই রচয়িতা বা সংকলকের উদ্দেশ্য হবার কথা। আর সেদিক থেকে হরিচরণ সম্পূর্ণ সফল।

 

চার. বর্ণক্রম ও বানান

বিংশ শতকের মাঝামাঝি বা এমনকি শেষ পাদ পর্যমত্ম বাংলা অভিধানে বর্ণক্রমের পুরনো রীতিই বজায় ছিল। যা-কিছু পরিবর্তন, তা এসেছে নববইয়ের দশক থেকে। নিমণমধ্য সম্মুখ (lowmid front) অ্যা-ধ্বনিযুক্ত বিদেশি শব্দে বা নবাগত শব্দে অ্যা বানান লেখা তখনো চালু হয়নি। ইংরেজি শব্দও তেমন আসেনি বাংলা অভিধানে। অ্যাটম, অ্যালকেমি, অ্যালবাম, অ্যাশট্রে, অ্যাসিড – এগুলো বঙ্গীয় শব্দকোষে নেই। ম্যাজম্যাজকে মেজমেজ লেখা হয়েছে যদিও পাশে ঊর্ধ্বকমার মধ্যে ‘ম্যাজম্যাজ’ দেখছি। রাখা হয়েছে, তৃতীয় স্থানে – মেজিষ্টার, মেজেষ্টর-এর পরে। এগুলো ব্যতিক্রমই, নিয়ম হিসেবে আসেনি। অমত্মঃস্থ ব-ওয়ালা শব্দকে বর্গীয় ব-য়ের মতোই গণ্য করে বিবৃত করা হয়েছে। এখন ড় ঢ়-কে ড ও ঢ-য়ের পরে নিয়ে আসা হয়। হরিচরণ এনেছেন আগে, তখনকার দস্ত্তর হিসেবে। তাই ‘বড়’ আগে, ‘বড্ড’ পরে। খ–ৎ এসেছে পরে, ত আগে। ‘মতিলাল’ ‘মতীয়া’ আগে, ‘মৎকুণ’ পরে। এখন যেমন ও-দুইয়ের মধ্যে তফাৎ করা হয় না, অমত্মত বর্ণক্রমের ক্ষেত্রে। তাই অভিধানে ‘মৎকুণ’ আগে আসে, ‘মতগ্রহণ’ পরে।

এবারে বানানের প্রসঙ্গ। বিংশ শতকের প্রথমদিকে বাংলা ভাষার বানানে যে-রীতিগুলোর ব্যাপক প্রচলন ছিল, হরিচরণের শব্দকোষে তারই প্রতিফলন দেখতে পাই। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের বানান-সংস্কারের প্রস্তাবগুলো প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৩৬ সালে। তার তিন বছর আগেই বঙ্গীয় শব্দকোষের কাজ শেষ হয়ে গেছে। কাজেই সেসব সংস্কার-প্রস্তাব হরিচরণের পক্ষে হয়তো আন্দাজ করা সম্ভব ছিল না। তিনি রেফ-এর নিচে ব্যঞ্জনের দ্বিত্ব ব্যবহার করেছেন – অর্চ্চনা, অর্জ্জন, বর্জন, গর্দ্দভ, আর্য্য। অসংস্কৃত শব্দের স্ত্রীলিঙ্গে তখনকার রীতি মেনে বহু ক্ষেত্রেই দীর্ঘ-ইকার রেখেছেন – বাঘিনী, রাণী/রানী। তবে এও লক্ষ করি যে, কতকগুলো ক্ষেত্রে এ-ধরনের শব্দে তিনি বিকল্প হিসেবে হ্রস্ব-স্বর রেখেছেন – বাঙ্গালি/ বাঙালি, বিলিতি/ বিলাতি; মূর্ধন্য-ষ এর বদলে তালব্য-শ – পোশাক, পোশাকি, ফরাশ, ফরমাইশ। এসব তো তখনকার প্রবণতা থেকে অনেকটাই এগিয়ে।

বানানে হরিচরণের একটা ব্যতিক্রমী নীতিও দেখতে পাই। মধ্যবাংলায় এবং প্রাক-আধুনিক বাংলায় শব্দের যেসব বানান মুদ্রিত সাহিত্যে পেয়েছেন, সেগুলো তিনি বিকল্প হিসেবে রেখেছেন তাঁর অভিধানে। বহু ক্ষেত্রেই অ-মান্য বা অধোমান্য বানান পাশাপাশি রয়েছে বঙ্গীয় শব্দকোষে। আফিঙ্গ, কউতুক  (কৌতুক), কউতর, কৌতর (কবুতর), মহরী, মোহরি (মুহুরি) ইত্যাদি বানান প্রচুর জায়গা পেয়েছে তাঁর অভিধানে। মোটের ওপর প্রাচীনরীতির প্রতি আনুগত্য আর নতুন প্রবণতাকে আবাহন – এই দুইয়ে মিলে হরিচরণের বানানে একটা যে বিশিষ্ট চরিত্র তৈরি হয়েছে তা অনস্বীকার্য। কেবল একটা ব্যাপারে প্রশ্ন থেকেই যায়। বিকল্প বানানের ক্ষেত্রে প্রায় সর্বত্রই হরিচরণ সম্ভবত সংস্কৃত অভিধানের রীতি মেনে শব্দগুলোকে বর্ণনানুক্রম অনুসারে আগে-পরে সাজিয়েছেন। বিজুরি, বিজুরী; বিজলি, বিজলী, মাটি, মাটী, সাথি, সাথী ইত্যাদি। ফলে কোন বিকল্পটি তাঁর পছন্দের তা স্পষ্ট হয় না। যদি ধরে নিই হ্রস্বস্বর আগে আছে, অতএব হ্রস্বস্বরযুক্ত বানানই তাঁর পছন্দ, তাহলে ভুলই হবে। কেননা ব্যাখ্যায় দীর্ঘস্বর অনেক ক্ষেত্রেই ব্যবহার করা হয়েছে। ‘সাথি, সাথী’-ই ধরা যাক। এর ব্যাখ্যায় পাচ্ছি এইরকম – ‘১ সাথী, সহচর…’।

 

পাঁচ. অর্থ নির্দেশ

অভিধানে অর্থ নির্দেশের একাধিক রীতি আছে। (এক) সবচাইতে প্রচলিত অর্থ আগে, আর অপেক্ষাকৃত কম প্রচলিত অর্থ পরে
একে- একে আসবে; (দুই) মূল অর্থ বা আদি অর্থ অর্থাৎ ব্যুৎপত্তিগত অর্থ প্রথমে দেওয়া হবে। পরে একে-একে পরিবর্তিত অর্থগুলো আসবে। অনেক ক্ষেত্রে ব্যুৎপত্তিগত অর্থ অচলিত হয়ে যায়। সেক্ষেত্রে অভিধানকার সেই আদি অর্থ শেষেও এনে থাকেন। অধিকাংশ অভিধানে গোণার্থ বা রূপকার্থের বিবৃতি আসে একেবারে শেষে। অর্থাৎ সাধারণ অর্থ আগে, বিশেষ অর্থ পরে। তখনকার অভিধানে সচরাচর প্রতিশব্দ বা সমার্থশব্দ দিয়েই অর্থ দেখানো হতো। এখন অবশ্য অভিধানে অর্থ ব্যাখ্যা করার রীতি একটু-একটু করে চালু হচ্ছে।

হরিচরণ তৎসম শব্দের বেলায় ব্যুৎপত্তিগত অর্থই প্রথমে দিয়েছেন। বিশেষ বাংলা অর্থ এসেছে শেষে। তাঁর অভিধানে ‘ফুলস্ন’ শব্দের অর্থগুলো কী কী দেখা যাক – (১) বিকসিত, বিকচ, (২) বিকসিত, পুষ্পিত, (৩) ব্যায়ত, বিস্ফারিত; (৪) প্রফুলস্ন, প্রসন্ন, স্মের; (৫) স্ফীত; (৬) [বাঙ্লায়] পুষ্পিত, সুশোভিত। দেখা যাক কী অর্থ দিয়েছেন রাজশেখর বসু – প্রস্ফুটিত (ফুলস্ন কুসুম); বিকশিত (ফুলস্ন জ্যোৎসণা); প্রফুলস্ন (ফুলস্ন আনন)। রাজশেখর স্ফীত, ব্যায়ত বা বিস্ফারিত অর্থ দেননি, কেননা আধুনিক বাংলায় শব্দটির ওইসব অর্থ আদৌ আর সুলভ নয়। হরিচরণের উদ্দেশ্য ছিল সুলভ-দুর্লভ সব অর্থই নির্দেশ করা। তবে ক্রমাগত প্রতিশব্দ  বা সমার্থক শব্দের বিবৃতি দেওয়ার যে একটা অসুবিধেও আছে, তা স্পষ্ট হয়ে যায় ওই ‘স্মের’ কথাটিতে। যে-কোনো সাধারণ পাঠককে ওই শব্দটির মানে বুঝে নেওয়ার জন্য আবার অভিধানের অন্যত্র খুঁজে দেখতে হবে।

লৌকিক অর্থের বেলায় হরিচরণ কখনো উদার, কখনো তা থেকে তাঁকে দেখি মুখ ফিরিয়ে নিতে। ‘হাঁড়িয়া’ শব্দের হাঁড়ি-সম্পর্কিত নানা অর্থ দিলেও তিনি বিশেষ লৌকিক অর্থটা দিলেন না – চাল সিদ্ধ করে তৈরি মদ। অথচ এই অর্থটা অনেককাল ধরেই আছে। আবার দেখি, ‘ভেজাল’ শব্দের আঞ্চলিক অর্থ যে ঝামেলা বা ঝঞ্ঝাট, তা বিবৃত করেছেন হরিচরণ।

 

ছয়. ব্যুৎপত্তি-নির্দেশ

হরিচরণ তাঁর শব্দকোষে যেভাবে শব্দের ব্যুৎপত্তি নির্দেশ করেছেন, তা এক কথায় অসাধারণ। বাংলা অভিধানে এমন বিশদ ব্যুৎপত্তি নির্দেশ দেখাই যায় না। কোনোরকম শর্টকাট না করে শব্দের ব্যুৎপত্তি ব্যাখ্যা করেছেন তিনি। ব্যুৎপত্তি সম্বন্ধে তাঁর উদ্দেশ্য ও নীতি তিনি নিজেই বলেছেন তাঁর ‘সঙ্কলয়িতার নিবেদন’ অংশে –

‘সংস্কৃত শব্দের অর্থ মূলত বুঝিতে হইলে, উপসর্গ ধাতু ও বাক্যবোধক প্রত্যয়ের অর্থ জানা একামত্ম প্রয়োজন; সুতরাং কৃদমত্ম ও তদ্ধিতসিদ্ধ শব্দের ব্যুৎপত্তি অপরিহার্য। এহেতু শব্দের পরেই […] এই বন্ধনীর মধ্যে পাণিনি-অনুসারে, ক্বচিৎ মুগ্ধাবোধমতে, বাচ্যসহ ব্যুৎপত্তি প্রদর্শিত হইয়াছে। শব্দ সম্বন্ধে যাহা কিছু বক্তব্য, তাহাও ব্যুৎপত্তির পরে ওই বন্ধনীর মধ্যেই দিয়াছি। ইহার পরে ব্যুৎপত্তিগত মুখ্যার্থ পরে গৌণার্থ প্রদত্ত হইয়াছে। যেখানে বাচ্যানুসারে অর্থ পরিবর্ত্তন হইয়াছে, সেই স্থানেই প্রত্যয়ের সহিত বাচ্য নির্দেশ করিয়াছি।’

আপাতভাবে বাংলা ভাষার অভিধানে এমন বিশদ ব্যুৎপত্তি প্রয়োজনাতিরিক্ত মনে হতে পারে। তবে এ-কথাও ঠিক যে, ব্যুৎপত্তির ব্যাখ্যা থেকেই শব্দের অর্থবোধ হতে পারবে, এই ছিল হরিচরণের অভিপ্রায়। সময়ের সঙ্গে-সঙ্গে বহু শব্দের অর্থ ব্যুৎপত্তিগত অর্থ থেকে দূরে সরে যায়। হরিচরণ তেমন প্রসারিত অর্থও নির্দেশ করেছেন।

ব্যুৎপত্তি-ব্যাখ্যায় হরিচরণ পাণিনি-নির্দেশিত, কখনো-বা মুগ্ধবোধ-অনুসারী প্রত্যয় দেখিয়েছেন, সেসব প্রত্যয়ের সরল রূপের পরেই। যেমন অ (অণ্), অ (ঘঞ), য (যৎ), ঈয়স্ (ঈয়সুন্), ইত (ইতচ্) ইত্যাদি। সব ক্ষেত্রেই বাচ্য নির্দেশিত হয়েছে – ক (কর্তৃবাচ্য), র্ম্ম (কর্ম্মবাচ্য)। একই ধাতু, একই প্রত্যয়। কেবল পৃথক বাচ্যের জন্য মানে আলাদা হয়ে গেল। হরিচরণ নিখুঁতভাবে দেখিয়েছেন তাও।

 

সাত. দৃষ্টামত্মবাক্যের সমাহার

বঙ্গীয় শব্দকোষে দৃষ্টামত্মবাক্যের যে বিপুল সমাহার দেখা  গেছে, অদ্যাবধি আর কোনো বাংলা অভিধান তার কাছাকাছি পৌঁছাতে পারেনি। মুদ্রিত সাহিত্য থেকে প্রয়োজনীয় দৃষ্টামত্মবাক্য বা বাক্যাংশ তুলে আনা যেমন শ্রমসাধ্য, তেমনি দুরূহ। আর শুধু বাংলা সাহিত্যই তো নয়, হরিচরণ যেসব সংস্কৃত-উদ্ধৃতি সংগ্রহ করেছেন, তার সংখ্যাও সুবিপুল। তাঁর অভিধানের প্রারম্ভিক ‘সঙ্কেত-সূচী’ দেখলেই একটা পরিষ্কার ধারণা হতে পারবে কতখানি কষ্ট করতে হয়েছে হরিচরণকে। সংস্কৃতের জন্য যেমন আছে অমরকোষ, হরিবংশ, ভট্টিকাব্য, গীতগোবিন্দ, বাচস্পত্য অভিধান, বৃহৎসংহিতা ইত্যাদি প্রাচীন গ্রন্থ, তেমনি আছে মধ্যবাংলার চৈতন্যভাগবত, শ্রীকৃষ্ণকীর্তন, শূন্যপুরাণ, আছে তাঁর সমকালের চয়নিকা, কুহু ও কেকা, প–তমশাই ইত্যাদি। সাধারণ পাঠকেরা সংস্কৃত দৃষ্টামত্মবাক্য না বুঝতেও পারেন, তবে যাঁদেরই সংস্কৃতের বিদ্যে কিছুমাত্র আছে, তাঁরা সেগুলি খুবই উপভোগ করবেন। প্রকৃতই উজ্জ্বল উদ্ধার সেগুলি। কেবল এই প্রশ্ন উঠতে পারে – বাংলা অভিধানে শব্দের অর্থ বোঝাতে সংস্কৃত-সাহিত্য থেকে উদ্ধৃতি কেন? এর উত্তর দিয়েই রেখেছেন হরিচরণ – ‘এই অভিধানে সংস্কৃতপাঠার্থীরও বিশেষ উপকার হইবে।’ এই কৈফিয়ত সত্ত্বেও একালের কোনো-কোনো পাঠক সংশয়ান্বিত হতেই পারেন।

 

আট. কথা শেষ

হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর শব্দকোষে শব্দের উচ্চারণ দেননি। না-দেবার যে-যুক্তি তিনি দেখিয়েছেন তাও যে খুব জোরালো, তা মনে হয় না। সংস্কৃত কোষগুলোতে উচ্চারণ দেখাবার রীতি ছিল না, নেই। হরিচরণও দেখালেন না। সংস্কৃত শব্দের প্রতি তাঁর পক্ষপাত নিয়েও একালের অনেক পাঠক অনুযোগ করবেন নিশ্চয়। কথ্য ও লৌকিক-আঞ্চলিক শব্দ তাঁর অভিধানে একটু কমই। অনুযোগের এও তো কারণ হতে পারে।

এর কোনোটাই ভিত্তিহীন নয়। কিন্তু এসব সত্ত্বেও এই প্রশ্ন মনে জাগবেই – কেন রবীন্দ্রনাথ মনে করেছিলেন, হরিচরণের অভিধান অসামান্য, অভূতপূর্ব? কেন বলেছিলেন, ‘এরূপ সর্বাঙ্গসম্পূর্ণ অভিধান বাংলায় নাই’? কেন বলেছিলেন, এই অভিধান এক মহৎ কর্ম? অভিধান ভাষার-শব্দের যে-অর্থ প্রকাশ করে, তার বাইরেও থাকে অর্থ, অন্য অর্থ, অর্থের ‘আলো-িআঁধারি’, যা কবিতায় প্রকাশ পায় বারবার, বহুবার। এ কথা রবীন্দ্রনাথের চেয়ে আর কে-ই বা ভালো জানতেন। এ-সত্ত্বেও মানতেই হবে যে, একটি ‘সম্পূর্ণ’ অভিধান ভাষার জানালা খুলে দেয়। হরিচরণের ওই ‘সর্বাঙ্গসম্পূর্ণ’ বঙ্গীয় শব্দকোষ ঠিক সে-কাজটিই করে। তাঁর অভিধানে রক্ষণশীলতার কিছু চিহ্ন নিশ্চয় আছে। তবে বিশেস্নষণের গভীরতায়, তথ্য সমাবেশের বিপুলতায় এই অভিধান এগিয়ে আছে অন্যসব বাংলা অভিধান থেকে। এমনভাবে পাঠকের জ্ঞানবুদ্ধিকে উদ্বোধিত আর কোন অভিধান করে?

 

পাঠপঞ্জি

১. চিত্তরঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়, বাংলা অভিধান, কোরক অভিধান সংখ্যা।

২. জ্ঞানেন্দ্রমোহন দাস, বাঙ্গালা ভাষার অভিধান, দুই খ- (সাহিত্য সংসদ) ১৯৭৯।

৩. নির্মলকুমার নাগ, হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়, বঙ্গীয়-সাহিত্য- পরিষৎ, ১৪১০।

৪. পবিত্র সরকার, অভিধানের সীমা ও সম্ভাবনা, কোরক অভিধান সংখ্যা।

৫. প্রমথনাথ বিশী, পুরানো সেই দিনের কথা, মিত্র ও ঘোষ, ১৯৮৫।

৬. প্রশামত্ম কুমার দাশগুপ্ত, বঙ্গীয় শব্দকোষ ও হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়, কোরক অভিধান সংখ্যা।

৭. সুশীল রায়, শ্রী হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়, মনীষী জীবনকথা, ওরিয়েন্ট বুক কোম্পানি, ১৯৬৭।

৮. হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়, বঙ্গীয় শব্দকোষ, প্রথম খ-, ১৯৬৬, দ্বিতীয় খ-, ১৯৬৭, সাহিত্য অকাদেমি।

শেয়ার করুন

Leave a Reply