কমলকুমারের চিঠি

লেখক:

স্নেহের সন্দীপন,

তোমার চিঠি অনেকদিন পাইয়াছি, কিন্তু শারীরিক অসুস্থতাবশত উত্তর দেওয়া ঘটিয়া উঠে নাই। আর ইদানীং কলিকাতার তথা পূর্ববঙ্গের অবস্থা আমাকে একাধারে বিচলিত ও বিমর্ষ করিয়াছে; নিশ্চয় তোমাকেও স্তম্ভিত করিয়া থাকিবে। যদিও তুমি বা আমি কেহই বাঙাল নহি; এখন শহরের বাঙালত্ব জাগ্রত হইয়াছে, সকলেই বিশেষত পূর্ববঙ্গজরা এ হেন হতভাগ্য সময় লইয়া কিছু রোজগার করিতেছে : আর্থিক ও জনপ্রিয়তা! কাহারও মনে দুঃখের লেশমাত্র নাই, পদ্মার ওইদিকে ভারী মজা হইতেছে, এই সুযোগ! প্রতিটি দৈনিকে মুরগার মাংস খাওয়ার গপ্প; মনুষ্যত্ব যে কবে ছেনতাই হইয়াছে তাহা ভগবান জানেন। একবার ভাব, লক্ষ লক্ষ লোক প্রাণ হারাইতে আছে – শিশুরা হত্যা, রমণীরা ধর্ষিতা, নিরীহ মূঢ় তাবিজ পরা হাত মাটিতে লুটাইয়া পড়িতেছে। কত,  ‘বাঁচান’ ‘বাঁচান’ বলিয়া ক্রন্দন রোল সেখানকার আকাশ বাতাসকে মথিত করিতেছে – কততে ‘আল্লারে!’ বলিয়া শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করিতেছে। ইহা ধর্মযুদ্ধ।

সেই ধর্মযুদ্ধ লইয়া আমরা কি করিতেছি?

বঙ্কিমবাবুর ছাঁদে বলিতে ইচ্ছা হয়, ধন্য মুজিবর১ তোমাকে ধূলা ছোঁওয়া কুর্ণিশ জানাইতেছি, তুমি আমাদিগকে তলে দিয়াছ – তোমার লোকেদের মরিতে বল আমরা দারুণভাবে পদ্য ছড়া ইত্যাদি লিখিব – (আজিকার এক ‘ছড়ায়’ আছে – পাকিস্তান ভাঙিতেছে তাই এই হরির নুট আ. বা. দেখ-৩১.৩) ইস্কুলে ছুটি পাইব রেডিওতে গলা কাঁপাইব কাগজে হাতে-কাটা খবর প্রস্ত্তত করিতে আমরা কি পর্য্যন্ত দড় তাহা বুঝাইব, আমরা সেনসেসন তুলিব – মুজিবর, তোমার লোকদের দাঁত ছ্যাৎরাইয়া মরিতে বল – আমরা বগলে ইঁট লইয়া ফিরিতেছি – শহীদ পাঁজা করিব (জনান্তিকে, বেশ হইয়াছে! শালা মোছলমানরা মরিতেছে!) আমরা আধুনিক স্বাধীন বাঙালী – আমরা রবিঠাকুরের ব্রাহ্মসঙ্গীত গাহিব – ইহাতে মৃতদেহের কোন গুণা হইবে না! বেহেস্তে যাইবে। আল্লার কিরে মুজিব যুদ্ধ থামাইয়ো না!

যাহারা আমার মত বয়সী যাহারা জীবনে কোন রাজনীতি  অথবা গণতন্ত্রে বিশ্বাসী নহে তাহারা নিশ্চয়ই উপলব্ধি করিতেছে – কলিকাতায় ক্রন্দনের স্থান নাই – ক্রন্দন প্রবণতা খবরের কাগজ শুষিয়া লইয়াছে – পূর্ববঙ্গে কি যে হইতেছে তাহা যাহারা ৪২ রায়েট মন্বন্তর দেখিয়াছে তাহারা কিছু অাঁচ করিতেছে; কি ভয়াবহ কি বুক-অাঁচড়ান ব্যাপার। আমরা এদিকে পয়সা রোজগারের সুযোগ দেখিতেছি – ‘‘পূর্ববঙ্গের পরিপ্রেক্ষিতে ভিয়েনাম যুদ্ধ পড়ুন,’’ ‘‘অমুক থিয়েটার দেখুন’’ কি নিষ্ঠুর পরিহাস! ‘‘আমি কি দারুণ পদ্য লিখিয়াছি!’’ রামপ্রসাদের ঢঙে কেহ লিখিয়াছিলেন, একবার ওলট পালট করে দে মা লুটে পুটে খাই – ঐ সূত্র এখানে কাজ আশ্চর্য্যভাবে করিতেছে।

কি ভাগ্যে হিঁদু শালারা আজ পাকিস্তানের মানে পূর্ববঙ্গের অধিবাসী নহে, ভগবানের কি অপার করুণা যে দ্যাশের লোকদের উহারা তাড়াইয়াছে – তাহা না হইলে, মুজিবর কবে রসাতলে যাইত। হিঁদুরা মানে উচ্চবর্ণের যাহারা ঝপ করিয়া রাজা রাজবল্লভ হইত। ইয়াহিয়া খাঁকে জান কবুল রাখিত। চাকরী পাইত। আমার কথায় নিশ্চয় তুমি সায় দিবে। এবং আমাদের সরকার তাহা ভালভাবে জানে, নানাবিধ গোলমাল থামাইতে ধামা ভরিয়া চাকুরী আনিতেছে – তাহারা জানিয়া লইয়াছে বিড়ি খরচা পাইলেই বাঙালী পুঙ্গব সব বিদ্রোহ ছাড়িয়ে দিবে – তাহার পর যে বেটারা রাস্তায় ভিক্ষা করিয়া খাইত তাহারা তেমনই চলিবে। সরকারের মতন বিদ্রোহকে এরূপ শ্রেণীগত ব্যক্তিগত ব্যাপারে পরিণত করা কোন ধূর্তরাও জানে নাই। অবশ্য নেপোলিয়ান Subversive youngman-দের তকমা দেওয়ার প্রবর্তন করেন। দেখ, ঐ ভয়ঙ্কর যুদ্ধ লইয়া কি ছিনিমিনি! ইন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় লেখেন, কোন সাহেব epic লিখিবে বলিয়াই আফগান যুদ্ধ ঘটে।

এই চশমখোর যুদ্ধ ব্যাপারে নিশ্চয়ই তুমি কিছু মারাত্মক যুদ্ধ লিখিতেছ না (ঠাকুরকে ধন্যবাদ!), বুক-ফাটা ব্যাপার লইয়া ছেলেখেলা করার জন্য বঙ্গদেশের আজ এই দশা!

নির্লজ্জতার একটা সীমা আছে, তাহা আমরা ছাড়াইয়া গিয়াছি, যে কোন উপায়ে পয়সা! বাঃ! যমুনালাল বাজাজ আর গান্ধী মিলিয়া স্বদেশী আন্দোলনে কোটি টাকার তুলা বেচিয়া লাভ করে।

মনে কর পূর্ববঙ্গের কোথাও পশু পাখী নাই, গুলির আওয়াজে অন্যত্র পালাইয়াছে, কোথাও অন্ধ, বৃদ্ধ পথ খুঁজিতেছে – কোথাও খাদ্য নাই – জল নাই (বার্মার রিফিউজীদের দেখিয়াছিলাম) বালিকারা আপন জন্মকে ধিক্কার দিতেছে কেননা তাহারাও জানিল তাহারা রমণী। সৈন্যরা যে কি তুমি বোধহয় জান না, রণাধ্যক্ষ মন্টি ভারতীয় সেনাবাহিনীর প্রশংসা যদিও করেন – নৈতিক বলের – অনিরুদ্ধ২ বলিল, ইতালীতে ভারতীয়রা মেমসাহেব দেখিয়া ঘাবড়াইয়া যায়। রায়েট ১৬০ নং হ্যারিসন রোডে – ইস! মেদিনীপুরে ইংরাজদের কথা মনে কর। একটা মেয়েকে লইয়া কি ছেঁড়াছেঁড়ি। গুলিতে শিশুকে রাস্তায় সত্যি মরিয়া লুটাইতে দেখিয়াছ! তাহা হইলে আমার কথা বুঝিবে।

ভাল, এখন নিজের চরিত্র প্রতিফলিত দেখিয়া বড় ক্ষোভে আছি – শুধু নিয়ত ঠাকুরকে ডাকি – বলি ঠাকুর পূবর্ববঙ্গের নিরীহদের রক্ষা কর উহাদের তুমি ছাড়া কেহ যে নাই। আর আমার দ্বারা কিছু সম্ভব নয়।

আমি হতচকিত হইয়া আছি লেখা একেবারে বন্ধ। মনে হয় আমার রক্ত শুকাইতেছে – আমি রেডিও শুনিতে পারি না – বারবার মনে হয় ‘হায় বেচারা’ মধ্যে মধ্যে রাত্রে ঘুম ভাঙ্গিয়া যায় – ‘বাজান’ ‘বাজান’ শুনি। আমার একমাত্র রোদনের ছাড়া আর কিসেই বা অধিকার থাকিতে পারে।

ঠাকুরের কে জানে কি ইচ্ছা।

ইতি

কমলকুমার মজুমদার

 

১ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান

২ অনিরুদ্ধ লাহিড়ী। প্রাবন্ধি

শেয়ার করুন

Leave a Reply