কলকাতার নাট্যধারা প্রসঙ্গে অরুণ মুখোপাধ্যায়

লেখক:

সাজেদুল আউয়াল
[১৯৮৫ সালের জুন মাসে কলকাতার নাট্যদল নান্দিকারের আমন্ত্রণে ঢাকা থিয়েটার কিত্তনখোলা নিয়ে ওখানে যায়। দলের সদস্য হয়ে আমিও যাই। সে-সময় নাটক ও নাট্য আমার আগ্রহের প্রধান আঙিনা। সেখানে অবস্থানকালে কলকাতার বিখ্যাত নাট্যদল ‘চেতনা’র অধিকর্তা নাটককার, নির্দেশক, অভিনেতা ও সংগঠক অরুণ মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে এক সাক্ষাৎকার গ্রহণ করি এবং তাঁর দল ও কলকাতার নাট্যধারার তৎকালীন অবস্থা সম্পর্কে জানার চেষ্টা করি। দীর্ঘদিন পর তা ছাপা হলো। আমার প্রতি আতিশয্যের কারণে প্রথমবার ১৯৯২ সালে সাক্ষাৎকারের কিছু অংশ তরুণ কবি শ্যামল যাকারিয়া ক্যাসেট থেকে কাগজে নামায়। বাকি অংশ ২০১৫ সালে আমার চাপে ঘরের মানুষ নাজনীন শামীম নামায়। শ্রুতিলিখনের মতো কষ্টকর কাজটি করার জন্য দুজনের কাছেই ঋণী থেকে গেলাম।]
সাজেদুল আউয়াল : ‘চেতনা’ কবে প্রতিষ্ঠিত হয় এবং এ পর্যন্ত কোন কোন নাটক মঞ্চস্থ করেছেন?
অরুণ মুখোপাধ্যায় : ‘চেতনা’ প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৭২ সালের ২২ নভেম্বর। প্রথম নাটক মারীচ সংবাদ নামালাম ১৯৭৩-এর ১৬ জানুয়ারি। চেতনার বেশির ভাগ সদস্য রাজ্য কো-অর্ডিনেশন কমিটি মানে আমাদের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকারি কর্মচারীদের যে প্রধান সংগঠন আছে, সেই সংগঠনের সাংস্কৃতিক শাখার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ১৯৭০-৭১-এ এখানকার রাজনৈতিক অবস্থা টালমাটাল ছিল। সে-সময়ে সাংস্কৃতিক কাজকর্ম করাই যাচ্ছিল না। সেজন্য একটা দল তৈরি করে নাটক করার কথা ভাবলাম। এই ভাবনা থেকেই চেতনার জন্ম। প্রথম নাটকটিই দর্শকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করল এবং এক বছরের মধ্যেই চেতনা গ্রুপ থিয়েটার হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেয়ে গেল। তারপরে করলাম ব্রেশটের গুড ওমেন অব সেটজোয়ানের অ্যাডাপ্টেশন – ভালোমানুষের পালা। একই নাটক কিছুদিন বাদে ‘নান্দিকার’ করে ভালোমানুষ নামে। ওদেরটা বেশি অ্যাক্সেপ্টেড হয়েছিল। আমাদেরটা বেশ কিছুদিন করেছি, তবে জনপ্রিয় হয়নি। তারপর আমরা করলাম স্পার্টাকাস। হাওয়ার্ড ফাস্টের উপন্যাসের নাট্যরূপ, আমার দেওয়া। তারপরে করলাম আরেকটা মৌলিক নাটক Ñ মারীচ সংবাদের সিক্যুয়েল হিসেবে যাত্রা। সে-নাটকটাও জনপ্রিয় হয়েছিল। ৭০টি মঞ্চায়ন হয়েছিল। ভালোমানুষের পালা ও স্পার্টাকাস করতে গিয়ে মারীচ সংবাদ থেকে যে-অর্থ সংগৃহীত হয়েছিল তার সবটাই খরচ হয়ে গিয়েছিল। মারীচ সংবাদ খুব জনপ্রিয় ছিল। নতুন নাটক করার সঙ্গে-সঙ্গে ওটাও চালিয়ে গেছি। তারপর ১৯৭৭ সালে করলাম জগন্নাথ।
সা. আ. : এ পর্যন্ত মারীচ সংবাদের কতটা শো হয়েছে?
অ. মু. : পাঁচশো হয়ে গেছে গত বছর, এখন পাঁচশো তিরিশ-টিরিশ হবে। নিজেরা মারীচ সংবাদ নাটকটা বেশি করি না; আমন্ত্রণ পেলে করি। জগন্নাথের পাশাপাশি ব্রেশটের মেজারস টেকেনের বাংলা ভার্সন সমাধান করেছি। জগন্নাথের কথায় আসি। জগন্নাথ নামার তিন মাসের মধ্যে কলকাতায় অসম্ভব আলোড়ন তুলল। জগন্নাথ আমাদের নাম, পয়সা সবই দিলো।
সা. আ. : জগন্নাথও তো আপনার নিজের…।
অ. মু. : না। জগন্নাথ ল্যু স্যুনের অ্যা ট্রু স্টোরি অব আকিউ গল্প অবলম্বনে লেখা, আমি অনুপ্রাণিত বলি। ল্যু স্যুন ১৯১১-এর বিপ্লবের ব্যর্থতার পরে এ-গল্পটা লেখেন। এ-গল্পে তিনি বলতে চেয়েছিলেন যে, বিদেশি শাসনে থাকার ফলে একটা দেশের সাধারণ মানুষের মধ্যে ডিফিটিস্ট অ্যাটিচ্যুড গ্রো করে এবং সাধারণ মানুষ তার ভিকটিম হয়ে পড়ে। তারা একটা নিজস্ব জগৎ তৈরি করে…।
সা. আ. : তার মধ্যে বাস করে।
অ. মু. : বাস করার চেষ্টা করে। প্রটেস্ট করে না, বাস্তবের মুখোমুখি দাঁড়ায় না, একটা মেক বিলিফ জগৎ তৈরি করে, একটা জিতে যাওয়ার মনোভাব তৈরি করে। সেটাকেই ‘আকিউজম’ বলে এবং সেটাকেই উনি স্ল্যাশ করেছিলেন। ‘আকিউজমে’র প্রবণতাটা আমাদের দেশেও গ্রো করেছে, ব্রিটিশ শাসনে থাকার ফলে। স্বাধীনতার এতদিন পরেও লক্ষ করি যে, এই ধরনের মনোভাব আমাদের দেশের পিছিয়ে থাকা মানুষদের মধ্যেও আছে। আমি সন্ত্রাসবাদী আন্দোলনের পটভূমিতে জগন্নাথ লিখেছি, ব্রিটিশ শাসনের সময়টা ধরেছি কিন্তু আজকের দৃষ্টিভঙ্গিতে। আমার বক্তব্য এটাই যে, এই মানুষ নিজের অধিকারবোধ, নিজের অস্তিত্ব সম্পর্কে যতদিন না খুব সজাগ-সচেতন হচ্ছে ততদিন সত্যিকার কিছু হবে না। জগন্নাথ অবশ্য লোকের মন জয় করেছিল অন্য কারণে। এর রাজনৈতিক বক্তব্য যতখানি ছিল, ততখানি লোকের কাছে পৌঁছায়নি। জগন্নাথে নতুনত্ব ছিল আঙ্গিক এবং অভিনয়ে, ফ্যান্টাসিরও কিছু অংশ ছিল। বিশেষ করে মাইম অ্যাকটিং, ফিজিক্যাল অ্যাকটিং এবং সাইলেন্সকে মঞ্চে কীভাবে কাজে লাগানো যায় তা আমি এতে দেখিয়েছি – এগুলো দর্শকদের বেশি ভালো লেগেছে। এর আগেও বড় নির্দেশকরা সাইলেন্সকে মঞ্চে এনেছেন। ভালো নির্দেশক সাইলেন্সকে ব্যবহার করতে জানেন। কিন্তু নতুনত্বটা নাটকের একটা মেজর পার্ট হয়ে দাঁড়াল এবং জগন্নাথকে লোকে অসম্ভব ভালোবেসে ফেলল। একটা হেরে যাওয়া মানুষের প্রতি যে-সমবেদনা নাটকে দেখানো হয়েছিল, তার সঙ্গে দর্শক মিশে গিয়েছিল। তবে সেইটেই আমার উদ্দেশ্য ছিল না। আমি ক্রিটিক্যাল ছিলাম এবং এতে ব্রেশটের দ্বারা আমি খুবই প্রভাবিত। আমি চেয়েছিলাম দর্শক জগন্নাথকে চিনুক, বুঝুক এবং তার মানসিক অবস্থার সঙ্গে নিজেদের মিল খুঁজে পাক। কিন্তু দেখলাম এই যে হেরে-যাওয়া একটা মানুষ, পোড়-খাওয়া একটা মানুষ, বারবার মার খাচ্ছে, সেটাই লোকের মনে বেশি ধরল এবং অভিনয়ের চমৎকারিত্বটাও আকর্ষণ করল।
সা. আ. : জগন্নাথের কতগুলো শো হয়েছে?
অ. মু. : চারশোর ওপরে হয়ে গেছে।
সা. আ. : তারপরে আপনারা কোন নাটকটা করলেন?
অ. মু. : জগন্নাথের পর আবার ভালো মানুষের পালা করেছি। নতুন করে স্ক্রিপ্ট তৈরি করে করেছি। ব্রেশটের নাটকে যেটা একই চরিত্র প্রথমে মহিলা, তারপরে পুরুষ সেজে আসছে, সেটা আমি দুজনকে দিয়ে অভিনয় করালাম। মহিলা চরিত্রে মহিলা, পুরুষ চরিত্রে পুরুষ, একই চরিত্র কিন্তু দুটো লোক অভিনয় করছে। তবে এবারো ২০-২২টা শো হলো। দর্শক গ্রহণ করল না।
সা. আ. : কেন?
অ. মু. : আমার মতে, ভালো নাটক রিয়ালিটির কাছাকাছি যায় এবং খুব ডায়ালেক্টিক্যালি বাস্তবকে বিশ্লেষণ করার চেষ্টা করে। সেটা গ্রহণ করার মতো মানসিকতা-অভ্যাস এখনো আমাদের দর্শকদের মধ্যে গড়ে ওঠেনি। তারপরে করি ব্রেশটেরই মা। এটা উনার বার্নিং ক্রেজের মধ্যে অন্যতম। মা নাটকটা আমি করে খুব আনন্দ পেয়েছিলাম এবং ওটা যখন করতাম তখন ঘোষণাও দিয়েছিলাম যে, এটা আমরা কম খরচে বেশি করে অভিনয় করতে চাই। ইন্ডাস্ট্রিয়াল বেল্টে করতে চাই। শ্রমিকদের শিক্ষার জন্য করতে চাই। কিন্তু অসুবিধাটা কোথায় – দর্শক তো আমাদের হাতে নেই। চ্যানেলটা তো আমরা তৈরি করতে পারিনি।
সা. আ. : নাটকটা শ্রমিক বেল্টে করেছিলেন?
অ. মু. : করতে পারিনি। আমরা চাইলেই তো হবে না। ব্রেশটের সমাধান নাটকটাও তেমনভাবে শ্রমিক এলাকায় করতে পারিনি। সমাধান নাটকটা হচ্ছে মার্কসীয় তত্ত্বের ওপরে খুবই ভালো নাটক। তবে এটা সবার নাটক নয়, কথাটা ব্রেশট নিজেই লিখেছেন। বলেছেন যে, যারা মার্কসীয় আইডিওলজিতে বিশ্বাস করেন, সেই সমস্ত ক্যাডারের ট্রেনিংয়ের জন্য এটা লেখা হয়েছে। আমরা বিনা খরচে করার কথাও ঘোষণা করেছিলাম। কিন্তু ওটারও প্রোপার অ্যাপ্রিসিয়েশন হয়নি। টাকা না নিয়ে করেছি বলে বেশকিছু শো হয়েছিল । বিভিন্ন অফিসে টিফিন আওয়ারে করার কথা ভেবেছিলাম কিন্তু তেমন সাড়া পাইনি। ৪০ মিনিটের নাটক, বাদ্যযন্ত্র-পোশাক কিছু লাগে না। ফাঁকা জায়গাতে হলঘরে করা যায়, সেইভাবে তৈরিও করেছিলাম। মাটাও আমরা একটু বড় আকারে করতে চাইলাম এবং আমাদের দলের এখন যা সুনাম, আমরা একটা নাটকের জন্য যে টাকা নিয়ে থাকি তার কিছুই নেব না বলে পত্রপত্রিকায় ঘোষণা দিলাম। একটা লিফলেটও করলাম কিন্তু রেসপন্স পেলাম না। রেসপন্স না-পাওয়ার কারণ মা নাটকটা অ্যাকাডেমিতে মানে কলকাতার বুকে তেমন দর্শক টানেনি। যে-নাটকটা কলকাতায় জনপ্রিয় হচ্ছে না, নামটা ছড়াচ্ছে না, সে-নাটকটা কম পয়সায় নিয়ে যাওয়ার মতো সংগঠন বা চ্যানেলও মফস্বলে তৈরি হয়নি।
সা. আ. : তারপর কোন নাটকটা করলেন?
অ. মু. : মার পরে করেছি রোশন। রোশনটা নিয়ে আমি প্রায় তিন বছর কাজ করেছি। হিন্দি উপন্যাস অবলম্বনে নাটকটা লিখেছি। উপন্যাসটা উনি যখন লিখছেন তখন আমিও ডিক্টেশন নিতে থেকেছি। উপন্যাসটার শেষ পরিচ্ছেদ লেখার আগেই আমি নাটক করে ফেলেছি। সেটা উনার সঙ্গে আলোচনা করেই করেছি। গত ছ-মাসে রোশনের ২২টা শো হয়েছে। এর মধ্যে কিছু সিকোয়েন্স বাদ দিয়ে নতুন সিকোয়েন্স ঢুকিয়েছি। আরেকটু হিউম্যান টার্মসে করা যায় কিনা তা নিয়ে নিরীক্ষা করেছি। রোশনের সামাজিক প্রেক্ষাপট ১৯৪০ থেকে ১৯৬২ সালের পশ্চিমবাংলা। এই ২২ বছরে দেশের অবস্থা, শ্রমিকশ্রেণির অবস্থা, ইউনিয়নের অবস্থা, এর সঙ্গে বামপন্থী পার্টি মিলিয়ে ব্যাপারটা এত বিশাল, সেখানে দর্শকের কাছে বিষয়গুলো অনেক দূরের মনে হতে পারে। এখন ছোট ছোট ঘটনা এনে দর্শকের কাছে রোশনকে আরেকটু কাছের মানুষ করে তোলা যায় কিনা, সে চেষ্টাটা চালিয়ে যাচ্ছি। যাই হোক জগন্নাথের কথায় ফিরে আসি। আগেই বলেছি, এতে দর্শকদের ইমোশনাল ইনভলভমেন্টটা বেশি হয়ে গেছে। আমি সেটা চাইনি । আমি বলছি না ইমোশনাল ইনভলভমেন্টের পক্ষপাতী আমি নই। আমাদের দেশে নাটক দেখার যে-অভ্যাস তার একদম বাইরে গিয়ে তো আর কাজ করা যাবে না।
সা. আ. : তা ঠিক।
অ. মু. : তবে চেষ্টা করতে হবে। জগন্নাথ আমি গ্রামে-গঞ্জেও করেছি। মুগ্ধ বিস্ময়ে লোক দেখেছে, যাদের যাত্রা দেখার অভ্যেস আছে আর কি। আমাদের যাত্রার এখন যা অবনতি হয়েছে, অবনতি বলতে এই থিয়েটার দ্বারা অত্যন্ত প্রভাবিত মেলোড্রামা এবং বস্তাপচা ভাবাবেগ আর পুরনো সমস্ত কাজ-কারবার ঢুকে গেছে। কয়েকটি দল আছে যারা অন্তত ভালো করার চেষ্টা করছে। কিন্তু টোটাল কারেন্টটা হচ্ছে কমার্শিয়াল কারেন্ট। ফলে গ্রামে গিয়ে দর্শকের মেজর অংশকে ভালো নাটকের বাস্তবতা ধরানো কঠিন ব্যাপার।
সা. আ. : সব শুনে মনে হচ্ছে যে, আপনাদের নির্দিষ্ট একটা নাট্যাদর্শ আছে?
অ. মু. : হ্যাঁ।
সা. আ. : সে আদর্শটা কী?
অ. মু. : আমরা ‘ঠিক নাটক’ বলে ঘোষণা করেছিলাম। শ্রেণিবিভক্ত সমাজে একটা শ্রেণি আরেকটা শ্রেণিকে শোষণ করে। ‘ঠিক নাটক’ শোষিত মানুষের স্বপক্ষে কথা বলবে। শোষিত মানুষের স্বপক্ষে যে-নাটক ঠিক জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকবে আমরা সেই নাটক করব এবং আমরা মনে করি এ পর্যন্ত যতগুলো নাটক আমরা করেছি Ñ ‘ঠিক নাটকে’র দৃষ্টিভঙ্গি বজায় রেখেই করেছি। সব নাটক সমান সফল হয়নি কিংবা কোনো কোনো নাটকে হয়তো আমি আদর্শটা ঠিকভাবে তুলেও ধরতে পারিনি। ‘ঠিক নাটক’ সেটাকে বলব যে-নাটক পলিটিক্যাল শ্রেণিসংগ্রামে যে শ্রেণি লড়ছে, যে-শ্রেণি আগামীদিনের নায়ক হবে, সমাজ বদলে যারা অংশ নেবে তাদের পাশে দাঁড়ায়।
সা. আ. : অন্যান্য গ্রুপ থিয়েটারের মতাদর্শের সঙ্গে আপনাদের আদর্শগত মিল-অমিল দুটিই আছে, নয় কি?
অ. মু. : হ্যাঁ, দুটিই আছে।
সা. আ. : কোন কোন ক্ষেত্রে মিল-অমিল আছে?
অ. মু. : মিলটাই বেশি। কলকাতার নাট্যদলগুলোকে ‘গ্রুপ থিয়েটার’ নামটা কে দিলো এর কোনো পরিষ্কার ইতিহাস লেখা হয়নি। গ্রুপ থিয়েটার নামটা আমার কাছে অনেক ইয়ে লাগে, ‘থিয়েটার গ্রুপ’ বললে ভালো হয়। গ্রুপ থিয়েটার আমেরিকাতে হয়েছিল একটা বিশেষ সময়ে একটা বিশেষ উদ্দেশ্য নিয়ে। সেটা আমাদের ওপরে চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। গ্রুপ থিয়েটার বলতে কী বোঝানো হয়, মানে যদি ডেফিনেশন চাওয়া হয় সেটাও আমরা স্পষ্ট করে বলতে পারবো না। গ্রুপ থিয়েটার কনসেপ্টের নামে দেখা যাচ্ছে গণনাট্য যে ঘোষণাগুলো করেছিল, সেগুলোই আমরা রিপিট করে যাচ্ছি! গণনাট্যের আদর্শেই কাজ করে আসছে বেশির ভাগ দল। তার মধ্যে কিছু দল আবার এর বাইরে, কী বলব, ইউনিভার্সেল একটা জিনিসে বিশ্বাস করে। তারা এই শ্রেণিতত্ত্বে বিশ্বাস করে না। তারা মনে করে যে, শিল্প সবার জন্য। শিল্পের মধ্যে শ্রেণিবিভাগ করা উচিত নয়। সেরকম কিছু দল আছে কলকাতায়। তারাও নাটকটা ভালোই করে। তবে আমাদের মতাদর্শে বিশ্বাসী বা গণনাট্যের মতাদর্শে বিশ্বাসী দলই বেশি। গণনাট্য তো এখনো রয়েছে। তাহলে আমরা গণনাট্য করি না কেন? এ-প্রশ্ন আসে। গণনাট্যকে আবার পার্টির খুব কাছাকাছি দেখা যাচ্ছে। আমি গণনাট্য করেছি পাঁচ বছর…।
সা. আ. : কোন্ সময়টায়?
অ. মু. : গণনাট্য করেছি ’৬৬ থেকে ’৭০-৭১ পর্যন্ত, কো-অর্ডিনেশন ও গণনাট্য একসঙ্গে করেছি। গণনাট্যে থাকার সময় আমি কয়েকটা নাটকও লিখেছিলাম। ‘হারানের নাতজামাই’ প্রথম আমি ওয়ান অ্যাক্ট হিসেবেই লিখি। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের গল্প, গণনাট্যের জন্যই। তারপর আমি সেটাকেই পূর্ণাঙ্গ যাত্রা আকারে লিখেছিলাম। সেটা আমাদের কো-অর্ডিনেশন কমিটির সম্মেলনে হয়েছিল। সেই স্ক্রিপ্টটাই থিয়েটার হিসেবে কলকাতায় করেছে কিছু দল এবং যাত্রা হিসেবেও গণনাট্যের দল করেছে – অসম্ভব জনপ্রিয় হয়েছিল। শয়ে শয়ে অভিনয় হয়েছে। মানিকবাবু খুব সরলভাবে একটি বৈপ্লবিক বক্তব্য এনেছিলেন সে-গল্পে। যাক, গ্রুপ থিয়েটার প্রসঙ্গে ফিরে আসি – কলকাতায় ‘অন্য নাটক’, ‘সৎ নাটক’ বলে কিছু টার্ম চালু হয়েছিল। এসব টার্ম সম্পর্কে আমার মন্তব্য করার কোনো ইচ্ছে নেই – নাটক যদি আমার মিডিয়া হয়, নাটকটা ঠিকমতো করতে পারায় আমার দায়িত্ব আছে – এটা আমি বিশ্বাস করি। এটা গণনাট্যের তত্ত্বেরই একটা অংশ। কলকাতার অনেক দল মনে করে, বক্তব্যের জোর থাকলেই হলো, তাহলেই আমরা শ্রেণিসংগ্রামের স্বপক্ষে আছি! তারা মনে করে, যাদের পক্ষে আছি তারা আগামীদিনের নায়ক। আমাদের বক্তব্য অনেক জোরালো। আমাদের বক্তব্য অনেক সঠিক – সেজন্যই আমরা জিতে যাব। নাটকটা নাটক না হলেও চলবে, এরকম একটা ধারণা – সবার নয়, একাংশের এমনই মনোভাব। এটার প্রমাণ মেলে তাদের প্রযোজনায়। আমরা মনে করি দুটোকেই মেলাতে হবে, নাটকটাকে শিল্প হয়ে উঠতে হবে। এবং তার জন্য আলো কীভাবে করতে হয় শিখতে হবে, একটা টোটাল থিয়েটারের যে কনসেপ্ট সেটার সবকিছু জেনে কাজ করতে হবে। অভিনয়ের মাধ্যমে রসসৃষ্টি করতে হবে। রসসৃষ্টির শাস্ত্র রয়েছে। দর্শককে এন্টারটেইন করা এবং রসের মাধ্যমে পরিতৃপ্ত করার দায়িত্ব আমাদের। বক্তব্য যত জোরালোই হোক, রাজনৈতিক তাগিদ যত জরুরিই হোক – এটা আমরা বিশ্বাস করি। বিরোধ তো সেখান থেকেই শুরু হয়েছিল। কিন্তু সেই বিরোধের সুযোগ নিয়ে আবার শিল্পের দিকে বেশি ঝুঁকে পড়েছেন কেউ কেউ, বক্তব্যটা অত প্রধান হয়ে দাঁড়ায়নি – এমন দলও অনেক আছে কলকাতায়।
সা. আ. : আপনার কথার সূত্র ধরে বলা যায়, যারা কলাকৈবল্যবাদকে নাটকে বেশি প্রশ্রয় দিয়ে থাকেন এবং নান্দনিকতাকে নাটকের একটা অপরিহার্য অঙ্গ বলে ভাবেন, তারা আসলে এস্টাবলিশমেন্টের তল্পিবাহক…।
অ. মু. : নিশ্চয়ই। কেউ কেউ সচেতনভাবেই সেই তল্পি বহন করেন।
সা. আ. : তাহলে বলা যায় কলকাতায় অনেকগুলো নাট্যধারা আছে, নাকি?
অ. মু. : তা তো বটেই। আসলে এর মধ্যে একদল রাজনৈতিক নাটক করছেন। কলকাতা এবং মফস্বলে রাজনৈতিক নাটকের বেশ জোরালো কারেন্টও রয়েছে। অনেক রাজনৈতিক নাটক দেখে বুঝতে পারি সেগুলো রাজনৈতিক নাটক হচ্ছে না। তারা কিন্তু বিশ্বাস করছে আমরা রাজনৈতিক নাটক করছি – আমরা মানুষের কথা বলছি – শোষিত মানুষের স্বার্থে বলছি। কিন্তু দেখা যাচ্ছে, দর্শকের ওপর তার প্রতিক্রিয়া ভালো হচ্ছে না। একটা স্টেরিওটাইপ… কী বলব, মানে জোতদার হত্যা করা হলো বা সংঘবদ্ধ একটা কিছু হলো, শেষে একটা বৈপ্লবিক সেøাগান এলো! সেটা নাটকও হলো না, তার কোনো প্রতিক্রিয়াও হলো না। সেটা আলটিমেটলি আমাদের কোনো ক্ষেত্রেই হেল্প করে না। যদিও তারা বিশ্বাসের দিক দিয়ে আমাদের কাছাকাছি। একটা মেজর অংশ, একটা ইয়ং সেকশন এর মধ্যে রয়েছে। এটা একটা ধারা। আরেকটা ধারা হচ্ছে – শিল্প বেশি হবে না, রাজনীতি বেশি হবে Ñ এটা নিয়ে টানাপড়েনের মধ্যে আছে। রাজনৈতিক নাটক করে এমন দলও কলকাতায় আছে যারা বিশ্বাস করে, আমার নাটকের মাধ্যমে আমি যে স্ট্যান্ডপয়েন্ট নিয়ে আছি, সেটাই ঠিক। কিন্তু তার রাজনৈতিক শিক্ষাটা হয়নি। রাজনৈতিক শিক্ষা তো গ্রহণ করতে হবে। থিউরিটিক্যালি গ্রহণ করতে হবে এবং কোনো আন্দোলনের সঙ্গে জড়িত থেকে
ডে-টু-ডে যেসব সংগ্রাম চলছে তার সঙ্গে যোগাযোগ রেখে শিক্ষাটা নিতে হবে। শিক্ষা না নিয়ে আমি শুধু মানুষের পক্ষে কথা বলব, তা তো হতে পারে না। সেই ভুল জায়গায় কেউ কেউ আছে Ñ সেটা ঠিক সচেতনভাবে না। সে বিশ্বাস করছে যে, আমি মানুষের কথা বলছি। কিন্তু যেহেতু রাজনৈতিক শিক্ষা তার সম্পূর্ণ হয়নি তাই কোথাও ফাঁক থেকে গেছে। রাজনৈতিক নাটক বললেই বাইরের প্রদেশে, আমাদের বাংলা নাটক সম্পর্কে খুব হালকা চালে আইরোনোক্যালি তারা বলে থাকে, আরে মশাই আপনারা রাজনীতির মাল খেয়েছেন। অনেকদিন অবধি এটাকে আমি ফাইট আউট করেছি; কিন্তু কখনো কখনো আমার নিজের মনেও প্রশ্ন হয় : রাজনীতির মাল খেয়েছি বলতে কী বোঝাচ্ছে? রাজনীতি বোঝা এবং নাটকটা বোঝা যদি দুটোই সমান তালে না এগোয়, তাহলে একটা নাট্য পরিচালকের সততা থাকলেও, ইচ্ছা থাকলেও – সে-নাটককে সেইভাবে প্লেস করতে পারবেন না। এইটা আরেকটা ধারা। আরেকটা ধারা হচ্ছে তারা স্পষ্টতই জোরালোভাবে বিশ্বাস করে, শিল্প এসবের ঊর্ধ্বে যেটাকে আপনি কলাকৈবল্যবাদ বলছেন – সচেতনভাবে তারা তা করে। কলাকৈবল্যবাদী যারা, তারা নান্দনিক মূল্যটা খুব বেশি দিলেও তারা যে বিষয়টাকে নান্দনিক করতে পারছে, তা-ও নয়। এরকম অনেক দৃষ্টান্ত আপনাকে দেখাতে পারি যারা রাজনীতিকে অ্যাভয়েড করে নান্দনিক মূল্যটাকে বেশি দিতে চায়। আসলে তারা শিল্পের দিক দিয়ে অনেক পিছিয়ে আছে। শিল্পটাও তারা বোঝেন না।
সা. আ. : আরেক ধরনের নাটক হয় স্টার, বিশ্বরূপা, সার্কারিনায় – যেগুলোতে চটুল নাচগান বা ক্যাবারে ড্যান্স ইত্যাদি থাকে। ওখানে কিছু নাটক দেখেছি – যেমন কড়ি দিয়ে কিনলাম, অশ্লীল বারবধূ, বিবর, প্রজাপতি Ñ এগুলোও তো একধরনের ট্র্যাডিশনাল ওয়ে অব থিয়েট্রিক্যাল প্র্যাকটিস। এটাও তো একটা নাট্যধারা?
অ. মু. : ধারা মানে কী – এটাকে অস্বীকার যারা করে তারা তো ভুল করে। এটাকে প্রফেশনাল থিয়েটার বললে ভুল হবে। এটার নাম আমরা কমার্শিয়াল থিয়েটার দিয়েছি Ñ বাণিজ্যিক থিয়েটার। আপনি বাংলাদেশের ছেলে বলে বাণিজ্যিক থিয়েটার বলতে ঠিক কী বোঝায় তা হয়তো বুঝবেন না। আপনাদের ওখানে তো প্রফেশনাল থিয়েটার বা কমার্শিয়াল থিয়েটার কোনোটাই নেই…।
সা. আ. : না।
অ. মু. : কিন্তু এখানে অন্যচিত্র। আমাদের গ্রুপ থিয়েটারের মেইন ড্রব্যাক্টা তো এখানেই। আমরা কমার্শিয়াল থিয়েটারের পাশাপাশি প্রফেশনাল থিয়েটারকে তৈরি করতে পারলাম না। এখন পর্যন্ত পারিনি। এইটেই আমাদের মেইন লিমিটেশন, যার ফলে কমার্শিয়াল থিয়েটারকে যদি আমরা গাল দিই তাতে ওদের কিছু যায়-আসে না। বহু দর্শক Ñ যারা আমাদের থিয়েটারে আসার কথা, তারাই সেখানে যাচ্ছে। সমস্ত মিডিয়া পাবলিসিটি, সমস্ত কিছুর ভিকটিম হয়ে পড়ছে এই দর্শকরা। কমার্শিয়াল থিয়েটারের নাটকগুলো হাউসফুল হচ্ছে, আমাদের চেয়ে অনেক বেশি দর্শক তারা পায়। এটাকে অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। ব্যবসাদাররা যেরকম কাটা কাপড়ের ব্যবসা করছে, কি লোহার ব্যবসা করছে, কমার্শিয়াল থিয়েটারের মালিকরাও নাট্যশিল্প নিয়ে ব্যবসা করছে। এতে তাদের কোনো ভণিতাও নেই।
সা. আ. : কোনো ক্রিটিক্যাল অ্যাপ্রিসিয়েশনও নেই।
অ. মু. : না। তারা বলছে আমরা ইনভেস্ট করি, ইনভেস্ট করে কিছু ট্যালেন্ট কিনে নিই। একটা ডিরেক্টর বাছি, একটা নাট্যকারকে বাছি, কিছু অভিনেতা-অভিনেত্রী – সে ফিল্মস্টার হোক, যাই হোক নিয়ে আসি। নিয়ে এসে যতরকম মালমশলা আছে সেসব দিয়ে একটা নাটককে যত সেলঅ্যাবল্ করা যায়, করি। যত বেশি বাজারে কাটতি হয় ততই তাদের লাভ। প্রত্যেক বিজনেসের যা নিয়ম আর কী। হ্যাঁ, সেখানে কিছু কিছু মাল, মালই বলছি কথাটা কমোডিটি অর্থে আর কী Ñ কিছু কিছু মাল ভালো হয়ে যায়। এক-আধটা ভালো হয়, কেননা বিজনেস ওয়ার্ল্ডেও তো প্রতিযোগিতা আছে। সেখানে ভালো অভিনেতা কিছু পাওয়া যায় এবং ভালো কিছু বক্তব্যও থাকে; কিন্তু একেবারে সেটা নেগলেজিবল Ñ কনটেন্টের দিক দিয়ে। তারা এমন পচাবস্তার মধ্যে আবদ্ধ থাকে, ভালো অভিনেতাও সেখানে গিয়ে ওয়েস্টেজ অব এনার্জির শিকার হয়। সৌমিত্রবাবুও সেখানে গেছেন। তিনি তাঁর নিজের দুটো নাটক নিয়ে ওই কমার্শিয়াল থিয়েটারে গিয়ে চেষ্টা করেছেন। তার আগে গেছেন আমার গুরু উৎপল দত্ত । উৎপল দত্ত মিনার্ভায় দাপটের সঙ্গে কাজ করেছেন। নান্দিকার খুব সচেতনভাবে কয়েক বছর ধরে ওখানে সংগ্রাম করেছে এবং তাদের ক্ষমতাও দেখিয়েছে; কমার্শিয়াল পাড়ায় থেকেও তারা ভালো মান ষের মতো নাটক চালিয়েছে এবং দর্শক দেখেছে। দেখেনি তা না, কিন্তু আলটিমেটলি দেখা গেল আমরা পিছু হটছি।
সা. আ. : এই পিছু হটার নিশ্চয়ই নানাবিধ কারণ আছে। যেগুলো পরে হয়তো আমাদের আলোচনায় এসেও যাবে। আপনি নাট্যধারা নিয়ে বলছিলেন – কয়েকটি ধারার কথা বলেছেনও Ñ এগুলো ছাড়াও তো থার্ড থিয়েটার বলে নতুন একটা ধারা তৈরি হয়েছে?
অ. মু. : থার্ড থিয়েটারকে থিয়েটারের এক্সপেরিমেন্ট হিসেবে প্রথম দিকে সবাই স্বাগত জানিয়েছিলাম।
সা. আ. : থার্ড থিয়েটার সম্পর্কে কিছু বলুন।
অ. মু. : এখানে যেটা থার্ড থিয়েটার নামে চালু সেটা খুব মিসনোমার, মানে থার্ড থিয়েটার কথাটা আসলে বিদেশি একটা আন্দোলনের নাম। বার্গস্টাইন এই নামটা দিয়েছিলেন। সেই আন্দোলনটা কিসের? কমার্শিয়াল থিয়েটার এবং এক্সপেরিমেন্টাল থিয়েটারের মাঝামাঝি একটা থিয়েটারের কথা বার্গস্টাইন বলেছিলেন। তাঁর বিবেচনায়, এক্সপেরিমেন্টাল থিয়েটার ভয়ংকর ড্রাই-স্টিফ এবং হাই স্ট্যান্ডার্ডের হয়ে যাচ্ছে, দর্শক পাচ্ছে না এবং কমার্শিয়াল থিয়েটার বাজে, মানে বস্তাপচা জিনিস চালাচ্ছে। উনি চেয়েছিলেন থার্ড থিয়েটার হবে কমার্শিয়াল এবং এক্সপেরিমেন্টালের মাঝামাঝি কিছু একটা Ñ সেখানে এন্টারটেইনমেন্টও থাকবে, শিক্ষাও থাকবে। অ্যাকচুয়ালি আমরাও মঞ্চে সেটাই কিন্তু করি। আজকের গ্রুপ থিয়েটার মোটামুটি এটাই করতে চায়। কারণ আমাদের পপুলার হতে হয়। পপুলার হওয়া আমাদের দায়িত্ব। শুধু বুদ্ধিজীবীদের নাটক দেখালে তো আমরা যে উদ্দেশ্যের কথা বলছি তার সঙ্গে বেইমানি করা হয়।
সা. আ. : অধিক সংখ্যক দর্শকদের সঙ্গে যোগাযোগ থাকছে না।
অ. মু. : থাকতেই হবে। অধিকাংশ দর্শকের সঙ্গে যদি যোগাযোগ না থাকে তবে আমাদের পারপাসটাই তো সার্ভ হচ্ছে না! থিয়েটার করার কোনো মানেই তো দাঁড়াচ্ছে না। আপনি থার্ড থিয়েটার সম্পর্কে জানতে চাচ্ছিলেন Ñ বাদল সরকার এর প্রবক্তা। আমাদের যে ট্র্যাডিশনাল থিয়েটার, তার সঙ্গে উনি একটা মেলবন্ধন ঘটাতে চাইলেন থার্ড থিয়েটার দিয়ে। বাদলবাবু আগে প্রসেনিয়াম থিয়েটার করেছেন। প্রসেনিয়াম থিয়েটার করতে করতে উনি বললেন, প্রসেনিয়াম থিয়েটার শহরের বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে আটকে আছে। সেটার থেকে মুক্তির জন্য উনি থার্ড থিয়েটার বেছে নিলেন।
সা. আ. : কবে থেকে এই নাট্যচর্চা শুরু করলেন?
অ. মু. : বছর দশেক হবে। ‘শতাব্দী’ নামে উনার একটা দল ছিল। কয়েকটি নাটক প্রসেনিয়াম থিয়েটারে করেছেনও। থার্ড থিয়েটার প্রথম চোটে সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল দুটি কারণে : এক. গ্রোটস্কি যে কাজটা করেছেন অর্থাৎ অভিনেতাকে ভীষণভাবে প্রেফারেন্স দেওয়া, সেটা উনি দিলেন; দুই. প্রসেনিয়াম থিয়েটারের এই যে আলো, টেপরেকর্ডার, মিউজিক, পোশাক সব বাদ দিলেন। অভিনয় এবং দর্শকের মাঝে আর কিছু রাখলেন না। এই কনসেপ্ট থেকে গ্রোটস্কির ‘পুওর থিয়েটারে’র কনসেপ্ট শুরু হয়েছিল এবং সেদিক থেকে যদি কেউ থিয়েটারকে এইভাবে করতে চায়, তাকে স্বাগত না-জানানোর কোনো কারণ নেই।
সা. আ. : থার্ড থিয়েটারের মাধ্যমে খুব বেশি দর্শককে টানা সম্ভব বলে আপনি মনে করেন কী?
অ. মু. : বেশি দর্শক টানার দরকার নেই। বাদলবাবু যেটা বলছেন তার মধ্যেও যথেষ্ট যুক্তি আছে। বাদলবাবু বলছেন যে, আমরা চাই একসঙ্গে একশ দর্শক নাটকটা দেখবেন এবং সেটা নিয়ে কথা বলবেন। তাতে নাটকের বিষয়বস্তুর ইনডেপ্থ একটা স্টাডিও হবে। এটাই থার্ড থিয়েটারের উদ্দেশ্য।
সা. আ. : সেখানে শিক্ষাটাই প্রধান হয়ে যাচ্ছে।
অ. মু. : এবং তার সঙ্গে একটা অ্যাসেসমেন্টও থাকে।
সা. আ. : শিল্পসম্মতভাবে শিক্ষা দেওয়া আর কি। আচ্ছা, ফিজিক্যাল থিয়েটারের বিষয়টা থার্ড থিয়েটারে এলো কীভাবে?
অ. মু. : যেহেতু উনি অন্য সব অনুষঙ্গ বাদ দিচ্ছেন সেজন্যই ফিজিক্যাল থিয়েটারের কনসেপ্টটা এসে গেল। নাটকের অন্যান্য আকর্ষণগুলো যখন বাদ দিচ্ছেন, তখন অভিনয়টাকে অনেক বেশি জোরালো করতে হচ্ছে। শুধু ভোকাল অভিনয় করলে তো হচ্ছে না, তাই তিনি শরীরটাকে কাজে লাগানোর কথা ভাবলেন। সবটাই ভালো ছিল কিন্তু পরবর্তীকালে আমরা দেখলাম যে থার্ড থিয়েটারের নামে যে জিনিসগুলো হচ্ছে, সেখানে বক্তব্যের ব্যাপারটাতে উনি আর বেশি জোর দিচ্ছেন না। বক্তব্যটা যে খুবই জরুরি। আপনি যা-ই করুন আমার আপত্তি নেই। এমনকি তাত্ত্বিকরা যদি বলে যে, এটা থিয়েটার হলো না, এটাকে আমরা থিয়েটার মনে করি না, তাতেও কিছু যায়-আসে না। আপনি যদি এন্টারটেইনিং ওয়েতে, ইন্টারেস্টিং ওয়েতে দর্শকদের কাছে আপনার বক্তব্যটা পৌঁছতে পারেন Ñ আমি সেই থিয়েটারকে স্বাগত জানাব। সেই হিসাবে আমি প্রথম দিকে থার্ড থিয়েটারের কনসেপ্টটাকে ভালো চোখেই দেখেছি। পরের দিকে দেখা গেল বিগ প্রেস (নরম ঢ়ৎবংং) খুব মদদ দিচ্ছে। তখন খটকা লাগল, একটা বিগ প্রেস কেন এত মদদ দিচ্ছে! তারপর দেখা গেল, বাদলবাবু এবং আরো কিছু কিছু গ্রুপ তারা সব কথাই বলছেন কিন্তু রাজনীতির সঙ্গে শিল্প ও শিল্পীর যোগাযোগ যে কত ঘনিষ্ঠ হওয়া উচিত সে-ব্যাপারে নীরব থাকছেন। তারা বলছেন, সামাজিক অবিচার-অন্যায়ের বিরুদ্ধে আমরা কথা বলব কিন্তু সামাজিক অন্যায়-অবিচার তো ভেইগ (াধমঁব) কথা। আলটিমেট অ্যানালাইসিসে তো রাজনৈতিক পার্টিজানশিপটা এসে যাবেই। আপনার নিজের সেই বিশ্বাসের জায়গাটা থাকা চাই যে, আমি রাজনৈতিক এই স্ট্যান্ডপয়েন্টে আছি। সেটা দেখলাম ঝাপসা হতে থাকছে। তবে বেশকিছু ইয়ং ছেলেকে এটা অ্যাট্রাক্ট করল প্রথম চোটেই।
সা. আ. : জি।
অ. মু. : খুবই স্বাভাবিক। কারণ খুব সহজেই এটা করা যায়। আট-দশটা ছেলে হলে, কোনোরকম একটা স্ক্রিপ্ট পেলে, মাঠে-ঘাটে ছোট একটা হলঘরে নাটক করা যায়। তখন থার্ড থিয়েটার আর গ্রুপ থিয়েটারের মধ্যে একটা বিরোধ তৈরি হয়ে গেল এবং সেখানে থার্ড থিয়েটারের পক্ষে কিছু সাংবাদিক যোগ দিলেন। তাঁরা বলতে শুরু করলেন, গ্রুপ থিয়েটার অলরেডি এস্টাবলিশমেন্টের পার্ট হয়ে গেছে।
সা. আ. : আচ্ছা।
অ. মু. : তাদের মতে, থার্ড থিয়েটারই একমাত্র বিপ্লবী থিয়েটার। এই কনসেপ্টটা আসার পরে গ্রুপ থিয়েটারের মধ্যে স্বভাবতই একটা রেজিস্টেন্স গ্রো করল। আমরা তখন ক্রিটিক্যালি নিজেদের অবস্থানটা অ্যানালাইসিস করি এবং স্বীকার করি যে, এই যে কমোডিটি ওরিয়েন্টেড সোসাইটি, সেখানে আমরাও কমোডিটির মতোই ব্যবহৃত হচ্ছি। আমরাও এই এস্টাবলিশমেন্টের ফাঁদে পড়ে যাচ্ছি। বিপ্লবী চরিত্র খুইয়ে ফেলছি। তাই বলে প্রসেনিয়াম থিয়েটার-টোটাল থিয়েটারের কনসেপ্টটাই বাজে, এটা করার আর দরকার নেই, এটা একদম ছেড়ে দিতে হবে – এই ভাবনাটা আমার কাছে একদম অবৈজ্ঞানিক মনে হয়। কমার্শিয়াল থিয়েটারের যে কথাটা আপনি বললেন Ñ আমরা যদি কলকাতার মঞ্চ ছেড়ে দিয়ে চলে যাই তবে সবকটাই কমার্শিয়াল থিয়েটার দখল করে নেবে। যা-ই হোক, থার্ড থিয়েটারকে গ্রামে নিয়ে যাওয়া অনেক সহজ। মোবিলিটি অনেক বেশি। বিভিন্ন মেট্রোপলিটন সিটিতে থার্ড থিয়েটারের একটা বিশেষ কদর তৈরি হচ্ছে এবং বিগ প্রেস বেশ মদদ দিচ্ছে। তখন আমরা বুঝতে পারলাম যে, থার্ড থিয়েটার করার পেছনে রাজনীতি আছে, ইন্টারন্যাশনাল পলিটিক্স চলছে।
সা. আ. : থার্ড থিয়েটারের বাইরে আর কোনো ধরনের নাট্যধারা তৈরির কথা কী কেউ ভাবছেন?
অ. মু. : গ্রুপ থিয়েটার করতে করতেই আমাদের অনেকের মনে হয়েছে যে, আমরা যাত্রায় ফিরে যাই না কেন। যাত্রার নিজস্ব কিছু বৈশিষ্ট্য আছে। বিশেষ করে এলিয়েনেট করার ক্ষমতার কথা বলা যায়। ব্রেশটের নাটকে এলিয়েনেশন তত্ত্বের ব্যবহার যেভাবে আছে, সেভাবে আমাদের দেশের যাত্রাতে নেই বটে, তবে এলিয়েনেশনের কিছু কিছু ব্যাপার আমাদের যাত্রার মধ্যেও আছে।
সা. আ. : বিবেক চরিত্রের মাধ্যমে এলিয়েশনের কাজটি করা…।
অ. মু. : শুধু বিবেক চরিত্র নয়, আরো অনেক ব্যাপার আছে। যাত্রার মধ্যে গানের প্রয়োগ আছে। যাত্রায় লোকশিক্ষার যে ব্যাপারটা একসময় ছিল সেইটে কিছুটা চলে গেছে। কমার্শিয়াল ফাইন্যান্সারের হাতে যাত্রা তার ঐতিহ্য হারিয়েছে। এটাও আমাদের অক্ষমতা বলব যে, আমরা যাত্রাকে ইউটিলাইজ করতে পারিনি। এখন যে চেহারা নিয়ে যাত্রা আছে, আমি যদি যাত্রার সঙ্গে লড়তে যাই, পারব না। যেমন কমার্শিয়াল থিয়েটারের সঙ্গে লড়তে পারছি না। তবুও আমার যাত্রার প্রতিই নজরটা বেশি Ñ আমি মফস্বলের ছেলে বলে, যাত্রা দেখেছি-করেছি বলে, যাত্রাপালা লিখেছি বলে। মারীচ সংবাদে যাত্রা ও মফস্বলের নাট্যচর্চার বেশকিছু প্রভাব আছে। মারীচ সংবাদে এলিয়েনেশনটা আমি আমার নিজস্ব পদ্ধতিতে ব্যবহার করেছি তবে ব্রেশটের প্রভাব অবশ্যই আছে। আমার সব নাটকেই ওনার প্রভাব আছে।
সা. আ. : তাহলে বলা চলে যে, এই যে এতসব নাট্যধারা কলকাতায় এখন দেখা যাচ্ছে, এই ধারার বাইরেও যাত্রাকে কেন্দ্র করে একধরনের ধারা আছে।
অ. মু. : প্রচ-ভাবে। প্রচ-ভাবে কলকাতাকেও তারা গ্রাস করছে, কলকাতায় আজকে একটা বড় যাত্রা অপেরা দল অ্যাকাডেমিতে বলুন, মহাসদনে বলুন, রবীন্দ্র সদনে বলুন, যদি শো করে, আমাদের চেয়ে অনেক আগে তাদের হাউসফুল হয়ে যায়।
সা. আ. : যারা যাত্রা করছেন তারা কি সবাই যাত্রারই লোক নাকি…।
অ. মু. : বেশকিছু গ্রুপ থিয়েটারের ছেলেকে তারা ভালো পয়সার অফার দিয়ে টেনে নিয়েছে। আমাদের অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায়ও যাত্রায় চলে গিয়েছিলেন। অবশ্য তিনি মোটেও সেখানে খুশি ছিলেন না। খুব যন্ত্রণার মধ্যে ছিলেন। ফিরেও এসেছিলেন। তারপর তো হঠাৎ মারা গেলেন। কমার্শিয়াল ট্র্যাপ তো পাতাই রয়েছে। যাত্রা কেন, ফিল্মেই বা কী হচ্ছে? উৎপলদার অনেক এনার্জি তো ফিল্মে ওয়েস্টেজ হয়ে যাচ্ছে।
সা. আ. : এবার দর্শক সম্পর্কে প্রশ্ন করব। আমার কথা হচ্ছে, অ্যাকাডেমিসহ অন্যান্য মঞ্চে যাঁরা নাটক দেখে থাকেন তাঁরা আসলে ৩, ৫ বা ১০ টাকার বিনিময়ে তাঁদের উদ্বৃত্ত সময়টুকুই উপভোগ করেন। কথাটা…।
অ. মু. : কথাটা পুরোপুরি মানব না। কেননা, এখানে কারা আসছে? এখানে মূলত আসছে যারা নি¤œমধ্যবিত্ত, ছাত্র, কেরানিকুল। তারাই আমাদের পৃষ্ঠপোষক। আর একটা নাটক যদি জমে যায় তখন সবধরনের দর্শকই আসে। যেমন জগন্নাথ যখন খুব জমে গেল, নাম কামাল, তখন দেখা গেল প্রথমদিকের বেশি দামের টিকিট আগে বিক্রি হচ্ছে, বড়লোকেরা কিনছে। সেটা একটা ক্রেজ তৈরি হয়ে যায়, একটা প্যাশন তৈরি হয়ে যায় যে, নাটকটা দেখতে হবে, এখন ওই নাটকটা একটা কারেন্ট ইনটেলেকচ্যুয়াল ইভেন্ট ইত্যাদি। এটা হয়, কিন্তু দর্শকের যে শ্রেণিচরিত্রের কথা আপনি বললেন, আমরা সেটা নিয়েও ভেবেছি। মারীচ সংবাদ দেখে যে দর্শক হাসছে বা এর যে কদরটা করছে, বিত্তের দিক দিয়ে এরা কারা? দেখা গেছে ডাক্তার বা মার্চেন্ট অফিসের বড় বড় এক্সিকিউটিভ পোস্টে যাঁরা আছেন, তাঁরা আমাদের দর্শক; এরাও গ্রুপ থিয়েটারের ভালো পৃষ্ঠপোষক। তাঁরা টিকেট কেটে নাটক দেখেন, বিজ্ঞাপনের জন্য গেলে তা দেন এবং সমঝদারির দিক দিয়েও খুব একটা পিছিয়ে নেই। তাঁদের মোটামুটি শিক্ষাদীক্ষা আছে। সাহিত্যচর্চা করেন। কিন্তু যে প্রশ্নটা আপনি করলেন – সেই প্রশ্নটা শেষপর্যন্ত এসে যায়। আমরা যেখানে বলছি শ্রেণিবিভক্ত সমাজে বিপ্লব করবে শ্রমিকশ্রেণি, কৃষকশ্রেণি, তাদের আমরা কতটুকু ইনভল্ভ করতে পারলাম, কতটুকু শিক্ষা দিতে পারলাম, এ-প্রশ্ন এসে গেলেই কিন্তু…।
সা. আ. : হ্যাঁ, এ প্রশ্নটাতে…।
অ. মু. : আসতে হবেই।
সা. আ. : এখন যে মধ্যবিত্ত-মধ্যউচ্চবিত্ত দর্শক দু-চার-পাঁচ টাকার বিনিময়ে নাটক দেখছে, এদের শ্রেণিচরিত্রটা তো আমরা জানি। যাদের কথা আপনি বললেন – শ্রমিক-কৃষক শ্রেণির ঐক্য, যে-ঐক্যের মাধ্যমে সমাজ পরিবর্তিত হবে, তাদের কাছে পৌঁছানো সম্ভব হচ্ছে কী?
অ. মু. : এক্কেবারে সম্ভব হচ্ছে না তা বলব না। আমরা যে আমন্ত্রিত অভিনয়গুলো করি, তার ধরুন ৫০ ভাগ মফস্বলে হয়। মফস্বল শহরে আবার মিক্সড দর্শক আসে। বেশকিছু জায়গায় দেখেছি, আশেপাশের কৃষকরা এসে পড়ে; ইন্ডাস্ট্রিয়াল বেল্টে গেলে শ্রমিকরা এসে পড়ে। এই যে শ্রমিক এলাকা দুর্গাপুর, যেখানে আমরা নাটক করেছি – সেখানে যে-শ্রমিকশ্রেণি তারা তো মধ্যবিত্ত থেকে তফাৎ কিছু নয়। দুর্গাপুরে যে নতুন শ্রমিকশ্রেণি তৈরি হয়েছে বা বোকারোয় যেসব স্টিল সিটিগুলোতে আমরা গিয়েছি, সেখানে দেখেছি কলকাতার মধ্যবিত্ত বা বুদ্ধিজীবী শ্রেণির সঙ্গে তাদের খুব একটা তফাৎ নেই। শিক্ষাদীক্ষা সব দিক দিয়ে। যে-শ্রমিকদের কথা আপনি বলছেন Ñ ধরুন চটকলের শ্রমিক। হাজার হাজার চটকলের শ্রমিক, তারা শিক্ষার দিক দিয়ে পিছিয়ে আছে। চেতনার দিক দিয়ে পিছিয়ে আছে, তাদের লিভিং কন্ডিশনও ভীষণ খারাপ। তাদের কাছে পৌঁছানোর যে-ব্যাপারটা বলছেন Ñ গ্রুপ থিয়েটার আন্দোলন করে তাদের কাছে আমরা পৌঁছতে পারিনি। আমরা দু-একবার চেষ্টা করেছি, তাতেও পারিনি। তার প্রধান কারণ হচ্ছে, আমি মনে করি – সাংস্কৃতিক আন্দোলন রাজনৈতিক দলের সরাসরি সহায়তা ছাড়া কিছুতেই তার প্রাপ্তিতে পৌঁছতে পারে না। ধরুন আমি একটা নাটক নামালাম চটকলের শ্রমিকদের সমস্যা নিয়ে। কলকাতায় দশ-বারোটা শো হলো, বেশ। তারপরে যাদের কাছে পৌঁছলে নাটকটা সম্পর্কে একটা রায় পাওয়া যাবে যে, এটা তাদের পারপাস সার্ভ করছে কি করছে না, সেই টেস্টই তো হচ্ছে না। দুটো বাধা এখানে – রাজনৈতিক দলগুলো তেমনভাবে মদদ দিচ্ছে না। আরেকটা আমাদের সীমাবদ্ধতা। আমরা গ্রামে যেতে চাইলেই তো পারব না। যদি বলা হয় যে, চলুন স্টিল সিটিতে, ওখানে গিয়ে বিভিন্ন বস্তিতে আপনাদের শো করতে হবে, সেটা কি সম্ভব? নাটকগুলোই তো আমরা সেভাবে তৈরি করি না!
সা. আ. : এবার জানতে চাইব, এই যে শ্রমিকশ্রেণি বা
কৃষকশ্রেণি, এদেরও তো একটা উদ্বৃত্ত সময় আছে। অর্থাৎ একজন শ্রমিক যদি কল-কারখানায় কাজ করে, তাহলে সে ৮ ঘণ্টা কাজ করে। তো তার ২৪ ঘণ্টার মধ্যে আট ঘণ্টা চলে গেলে, তার আরো ১৬ ঘণ্টা থাকে। ১৬ ঘণ্টার মধ্যে সে যদি ছয় ঘণ্টা ঘুমায় তাহলে তার আরো ১০ ঘণ্টা থেকে যায়। এই ১০ ঘণ্টা সে…।
অ. মু. : বাজে হিন্দি-বাংলা সিনেমা দেখে বা অন্যভাবে কাটিয়ে দেয়। হিন্দি সিনেমা থেকে বাংলা সিনেমা অনেক সস্তা। প্রচুর বাংলা ছবি হয় যেগুলো হিন্দির চেয়ে কোনো অংশে কম বাজে নয়।
সা. আ. : এই যে ৮-১০ ঘণ্টা উদ্বৃত্ত সময় এই সময়টুকুতে যদি তাকে নাটক দেখানো সম্ভব হয় – আমার তো মনে হয় সে তার চেতনার একটা স্তারিক উন্নতি ঘটাতে পারে। এবং সে ঐতিহাসিকভাবে তার জন্য নির্ধারিত যে দায়িত্বটা আছে অর্থাৎ সমাজ-পরিবর্তনে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করা, সেটা পালন করা তার পক্ষে সহজতর হয়। নানা আঙ্গিকে নাটক হতে পারে : আমাদের এখানে সংস্কৃত নাটকের গোলাকার বৃত্তাবদ্ধ একটা আঙ্গিকগত ধারা ছিল বা বৌদ্ধ নাটকের একটা ধারা ছিল বা গ্রামবাংলার লোকজ ধারা যেমন গাজীর গান, পালা গান ইত্যাদি আছে। নাটকটাকে আঙ্গিকগত দিক থেকে সহজতর করে তাদের কাছে নেওয়া যায়। এই প্রসঙ্গে কিছু বলুন।
অ. মু. : এ প্রসঙ্গে বলতে গেলে অনেক কথা বলতে হয়। তবে এটুকু বলতেই হবে যে, যে-ধারার নাট্যপ্রচেষ্টার কথা আপনি বলছেন তার জন্য প্রফেশনাল থিয়েটারকর্মী হতে হবে Ñ কমার্শিয়াল নয়। প্রফেশনাল বলতে আমি বুঝি যে, কেরানি হিসেবে যে-টাকা রোজগার করছি, সেই টাকা নাটক করে আয় করব।
সা. আ. : জি।
অ. মু. : এর জন্য আমরা চেষ্টা যে করিনি তা নয়। বিক্ষিপ্তভাবে কিছু চেষ্টা হয়েছে। যাই হোক, এই যে দর্শকের কথা আপনি বলছেন – প্রথমত আমাদের যে ড্রামা-টেস্ট অর্থাৎ আমি যে নাটকটাকে ভালো মনে করছি, দেখা যাচ্ছে, সে-নাটকটা যে-দর্শকদের কথা আপনি বলছেন, তারা ভালো বলছে না। প্রসেনিয়াম ছেড়ে দিন আপনি – আমি মাঠেও যদি করি, সে-নাটকের যা গঠনভঙ্গি হবে, সে-নাটকের কনফ্লিক্টের যে-সূত্র হবে, তা কি তারা গ্রহণ করবে? বৈদেশিক নাটক পড়ে, থিওরি পড়ে বা কলকাতায় নাটক করতে করতে, বুদ্ধিজীবীদের সন্তুষ্ট করতে করতে নাটক সম্পর্কে আমার যে ধ্যানধারণা তৈরি হয়েছে, সেটা কী তারা নিজেদের মনে করবে? যেখানে এসে আমি আজ দাঁড়িয়েছি, সেখানে যে-নাটকটা করলে আমি শিল্পী হিসেবে তৃপ্ত হবো, সে-নাটক কী কৃষক-শ্রমিককে
তৃপ্তি দেবে? এই গ্যাপ কিন্তু আছে। তারা কী দেখছে? তারা বাজে সিনেমা দেখছে আর যাত্রা দেখছে। যাত্রাটা যদি আমরা দখল করতে পারতাম, তাহলেও হয়তো অনেকটা কাজ হতো। যাত্রাটা এখন একেবারে হাতের বাইরে চলে গেছে। সিনেমাও ইন্ডাস্ট্রিয়াল প্রোডাক্ট হিসেবে গ্রো করে গেছে, মানে আর্টের চেয়ে ইন্ডাস্ট্রি সেখানে বড় হয়ে গেছে। যাত্রাও এখন তাই হয়ে গেছে। আমরা কতদিন আর আফসোস করব? আমরা বুঝতে পারছি এটা একটা ভিশাস সার্কেলের (ারপরড়ঁং পরৎপষব) মতো হয়ে গেছে। আমরা ভাবছি যে, কোনো একটা জায়গা থেকে আমন্ত্রণ আসলে তারপর আমরা করব। আবার অন্যরা অভিযোগ আনছেন এই বলে যে, মশাই আপনারা ঘোষণা রাখছেন বাইরে যাওয়ার আর কলকাতায় থিয়েটার করে যাচ্ছেন; যাদের জন্য নাটক করছেন তারা তো দেখছে না! সে-কারণেই অভিযোগ ওঠে যে আমরা এস্টাবলিশমেন্টের পার্ট হয়ে যাচ্ছি বা কমোডিটি হয়ে যাচ্ছি। অভিযোগটা একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। ঠিকমতো অ্যানালাইসিস করলে এইটেই দাঁড়ায়। সত্যিকথা বলতে কী, আমাদের সীমাবদ্ধ ক্ষমতায় আমরা কতটুকুই বা করতে পারি? ধরুন ২০-২৫-৩০ বৎসরের মধ্যে বাংলার
নাট্য-আন্দোলনে যে প্রচ-, কী বলব…।
সা. আ. : শক্তিধর নাট্যশিল্পীরা এসেছে।
অ. মু. : হ্যাঁ। তার মধ্যে বেশকিছু বড় ট্যালেন্ট আমরা পেয়েছি। যেমন শম্ভু মিত্র, উৎপল দত্ত, অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায় Ñ এই তিনটে নাম আমি বলছি। নাট্যকার হিসেবে আমি বিজন ভট্টাচার্যের নাম বলছি। আরো অনেক নাম করা যায় Ñ যাঁরা যথেষ্ট ক্ষমতাসম্পন্ন। কিন্তু এই তিনজন, যাঁদের নাম করলাম, তাঁরা প্রযোজক হিসেবে, অভিনেতা হিসেবে ওয়ার্ল্ড স্ট্যান্ডার্ডের বলে মনে করি। তারাও তো কিছু করতে পারলেন না। শম্ভু মিত্র কিছুদিন ফাইট করে, মতাদর্শগত বিরোধ বলুন বা যা-ই বলুন, বসে গেলেন। তাঁর কর্মক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও তিনি কাজ করা ছেড়ে দিলেন। আরেকজনকে কী দেখলাম, প্রচ- তার ভাইটালিটি, প্রচ- তার ক্ষমতা Ñ উৎপল দত্তের কথা বলছি। তিনি হঠাৎ হিন্দি ফিল্ম করতে আরম্ভ করলেন। একটা বিশেষ সময়ে কিছুদিন করলেন, ঠিক আছে। কিন্তু তিনি তো আর সেখান থেকে ফিরতেই পারছেন না! মঞ্চে নাটকও করছেন, কিন্তু নাটকের সেই স্ট্যান্ডার্ড, সেই মান দিতে পারছেন না। উনাকে অনেকে ক্যারিয়ারিস্ট বলেন। আমি এটাকে কোনো ইনডিভিজ্যুয়াল দিক থেকে দেখছি না। আমি একটা সোশ্যাল ইস্যু হিসেবে, ফেনোমেনন হিসেবে দেখছি। অজিতেশবাবুও তাই। উনি মাস্টারি করতেন। অজিতেশবাবু প্রথমে আক্ষেপ করতেন যে, আমার সবটা সময় ইউটিলাইজ হচ্ছে না; আমি চাকরি ছেড়ে হোল টাইমার হলাম কিন্তু ‘নান্দীকার’ আমাকে ইউটিলাইজ করতে পারছে না। তারপর ধরুন এর মধ্যে আমাদের মধ্যবিত্ত দলের ভাঙন-টাঙন অনেক ব্যাপার আছে। সো মেনি ক্রস কারেন্টস আর দেয়ার। অজিতেশবাবু শেষপর্যন্ত যাত্রায় গেলেন। অনিচ্ছাসত্ত্বেও গেলেন। গিয়ে সেখানে শরীর খারাপ করলেন, ফিরেও এলেন। যাওয়ার আগে যখন আমাদের ঘরে অজিতেশবাবু এসেছিলেন, তখন আমি একটা কথা বলেছিলাম : আপনি যাচ্ছেন, ফিরে আসবেন ঠিকই, কিন্তু আপনি যে জায়গাটা ছেড়ে চলে যাচ্ছেন, সে জায়গাটা তো আরো কমজোরি হয়ে যাচ্ছে। কাউকে তো রেখে যাচ্ছেন না। এই ট্যালেন্টগুলোর ছত্রছায়ায় আমরা বড় হয়েছি। আমরা নিজেদের মনে করি মাঝারি ক্ষমতার লোক। আমরা আরম্ভ করলাম চাকরিবাকরি সব বজায় রেখে। নাট্যপ্রীতি থেকেই। কিন্তু শুধু প্রীতি দিয়ে তো হয় না। গত কয়েক বছর যাবৎই আমার মনে হয়েছে যে, প্রফেশনাল হওয়া দরকার। কিন্তু প্রফেশনাল হতে গেলেই যে ভয়টা প্রথমেই দেখা যায় সেটা হচ্ছে যে, অনেকেই তো প্রফেশনাল হতে চেয়েছেন। যাঁদের কথা বললাম এনারাও। ইনডিভিজ্যুয়ালি প্রফেশনাল হয়েছেনও। তার পরে দেখা গেছে যে, কমার্শিয়াল ট্র্যাপে গিয়ে পড়েছেন। তাঁদের যা ক্ষমতা ওরাই তা ব্যবহার করছে। তাহলে আমাদেরও মোর অর লেস তাই হবে। আমাদের ক্ষমতা আরো কম Ñ আমরা তো আরো পড়ে যাব। এই ভয়টা আছে। সেইখানে কোথাও একটা থিওরি উদ্ভব হওয়া দরকার, সিস্টেমের বিরুদ্ধে। শিল্পী হলেই এই বুর্জোয়া সিস্টেম শিল্পীকে একটা আলাদা মর্যাদা দেয়। মানে একটা প্রিভিলেজ্ড ক্লাস, একটা স্ট্যাটাস দেয়, একটা গাড়ি না হলে চলে না, বেশি খাই Ñ এই মনোভাব সিস্টেমের দান।
সা. আ. : জি।
অ. মু. : প্রশ্ন হচ্ছে সরকারি কর্মচারী হিসেবে যে মায়নাটা পাই সে মায়নাটা পেলে আমি সারাসময় ধরে থিয়েটারটা করব না কেন? থিয়েটারশিল্পী বলেই কি আমার চারগুণ মায়না চাই, চারগুণ টাকা চাই, কেন? কথা হচ্ছে আমরা যারা গ্রুপ থিয়েটার করছি Ñ তারা এখনো একটা প্রফেশনাল প্লাটফর্ম তৈরি করতে পারিনি। আমার কাছে তো চয়েজ নেই Ñ ওই অ্যাকাডেমিতে এসে নাটক করে যাওয়া ছাড়া। বছরে খুব বেশি হলে ১২০-১৩০ দিন। বাকি কয়েকদিন কী করব না করব এই ভাবতে ভাবতে কেটে যাওয়া বা কিছু বইটই পড়া। আর করব কী? না হলে ওই ফিল্ম, টিভি বা রেডিওতে একটু গলা দিয়ে এলাম। প্লাটফর্ম তো নেই। চয়েজ তো নেই।
সা. আ. : যাক, আমরা আবার মূল আলোচনায় ফিরে আসি। আপনি প্রথমেই বলেছেন আপনাদের নির্দিষ্ট একটা রাজনৈতিক মতাদর্শ আছে। সেই রাজনৈতিক মতাদর্শ নাটকে প্রতিফলিত করতে গেলে নাটকের যে দুটো দিক আছে : আঙ্গিক ও বিষয় Ñ দুটো দিকেই আপনাকে লক্ষ রাখতে হয়। আঙ্গিকগত যে সীমাবদ্ধতা, সেটা তো আপনি বললেনই। যে-শ্রেণির কাছে আপনি নাটক নিয়ে যাওয়ার কথা ভাবছেন তারা অনেকটা আঙ্গিকগত বাধার কারণেই নাটক দেখতে পারছেন না। আঙ্গিকের মধ্যে পরিবর্তন আনতে গেলে বিষয়ের মধ্যেও তো ভিন্নতা আনতে হয়, যে বিষয়ের ভেতর দিয়ে আপনার মতাদর্শটা প্রতিফলিত হবে। সেই বিষয় সম্পর্কে কিছু বলবেন কী?
অ. মু. : আমি মনে করি শ্রমিক-কৃষকদের মাঝে না থাকলে তাদের বিষয় নিয়ে নাটক করা অসম্ভব না হলেও ঠিক না। আমার অবস্থানটা যদি গ্রামে হতো, গ্রামের মানুষ-কৃষক আন্দোলনের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ থাকত, তাহলে হয়তো পথটা আমি বার করতে পারতাম। এখান থেকে তো আমি পথটা বার করতে পারছি না।
সা. আ. : তার মানে শহরে বসে গণনাট্য করা যায় না। তবে ওদের সঙ্গে যোগাযোগের প্রয়োজন তো অনুভব করেন?
অ. মু. : যোগাযোগ তো ইনডিভিজ্যুয়ালি করলে হবে না। ওখানে আপনার একটা অবস্থান থাকতে হবে।
সা. আ. : গত কয়েকদিনে কলকাতায় বেশ কয়েকটা নাটক দেখলাম। তার মধ্যে চেতনা মানে আপনার দলের রোশন নাটকটা অত্যন্ত ভালো লাগল। এতে শ্রমিকদের কথা আছে এবং শ্রমিকরাই যে সমাজ-পরিবর্তনে অংশ নেবে Ñ এই সত্যটাও এই নাটকে সুনির্দিষ্টভাবে বলা হয়েছে। তবে নাটকটা শহুরে দর্শকরাই দেখছে। এর যে জনপ্রিয়তা তা মধ্যবিত্তের মধ্যে সীমাবদ্ধ এবং যারা শ্রমিক তারা কিন্তু এই নাটকটা দেখছেন না।
অ. মু. : না। আমার দলকে যদি শ্রমিক বেল্টে এক্সটেন্সিভলি রোশন অভিনয় করার একটা সুযোগও কেউ দেয়, তাহলেও বাধা থাকবে বলে আমার মনে হয়।
সা. আ. : আঙ্গিকগত কোনো বাধা আসতে পারে কী?
অ. মু. : আঙ্গিকগত বাধা থাকলে সেটা দূর করার চেষ্টা করা যায়।
সা. আ. : নাটকে যে ফ্লাশব্যাকটা আছে ওটা ওভাবে আপনারা দেখাতে পারবেন কি?
অ. মু. : না। আলোর কাজগুলোকে অনেক সহজ করে দেখানোর চেষ্টা করব। আমি বাধার কথা বলছিলাম Ñ ব্যাপার হচ্ছে নাটকটা শ্রমিক বেল্টে করার ব্যাপারে আমি এবং আমার দলের মধ্যে চার-পাঁচজন হয়তো উৎসাহী হলাম, বাকি যারা আছে তাদের পক্ষে উৎসাহী হওয়া সম্ভবই নয়। দলে ছাত্র আছে, ফ্যাক্টরিতে-অফিসে কাজ করা ছেলে আছে যাদের পাঁচটার আগে বের হওয়াই মুশকিল। শনিবার-রবিবার গ্রামে-ইন্ডাস্ট্রিয়াল বেল্টে গিয়ে একটা শো করে দিয়ে এলাম, ঠিক আছে Ñ কিন্তু যখনই আমাকে এক্সটেনসিভলি অভিনয় করতে বলা হবে তখনই মুশকিলটা দেখা দিবে। কিন্তু এক্সটেনসিভলি অভিনয় না করলে তো আপনি ফাইট আউট করতে পারছেন না। এখানেই নাট্যশিল্পীদের প্রফেশনাল হওয়ার বিষয়টা এসে পড়ে।
সা. আ. : এবং রাজনৈতিক আন্দোলনের সঙ্গে এই সংস্কৃতিচর্চাকে জড়িত করার একটা প্রশ্নও আসে।
অ. মু. : তাই। দায়িত্বটা নাট্যশিল্পী ও রাজনৈতিক দল উভয়কেই নিতে হবে। দলগুলোই তো আমাদের শো করতে ডাকবে।
সা. আ. : তাহলে আপনি মনে করেন রাজনৈতিক আন্দোলনের সঙ্গে সংস্কৃতিকর্মী হিসেবে সম্পর্ক তৈরি করার প্রয়োজনীয়তা আছে?
অ. মু. : প্রচ-ভাবে আছে এবং সেই আন্ডারস্ট্যান্ডিং যে আমাদের এখানে নেই, তা না। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আছে। তবে কোনোরকম অস্পষ্টতা না রেখেই আমি বলব, সাংস্কৃতিক দলগুলোকে যতখানি গুরুত্ব দেওয়া উচিত, তা এ-পর্যন্ত আমাদের কোনো রাজনৈতিক দলই দেয়নি।
সা. আ. : এ প্রসঙ্গে আমি একটি সম্পূরক প্রশ্ন করছি। বামফ্রন্ট সরকার গত আট বছর ধরে ক্ষমতায় আছে। প্রশ্নটা হলো, আট বছর পূর্বে বামফ্রন্ট সরকার আসার আগে কী ধরনের নাট্যচর্চা ছিল, আট বছরে কী ধরনের নাট্যচর্চা হয়েছে এবং এখন আট বছর পরে আপনারা কী ধরনের নাট্যচর্চার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করছেন?
অ. মু. : খুবই ভাইটাল একটা প্রশ্ন। বামফ্রন্ট সরকার একটা অগ্রসর রাজনৈতিক মতাদর্শ দ্বারা চালিত। তারাও সংস্কৃতিকে যতটুকু গুরুত্ব দেওয়া উচিত ততটুকু গুরুত্ব দেয়নি।
সা. আ. : তারা আসার আগের অবস্থা কী ছিল?
অ. মু. : ১৯৭০ থেকে ১৯৭৭ সাল পর্যন্ত নাট্যচর্চার একটা জোশ বা জৌলুস ছিল। বামফ্রন্ট ১৯৭৭ সালে ক্ষমতায় আসে। আমরা দেখছি ’৭৭ থেকে ’৮৫ – এই আট বছরে তার জৌলুস বাড়েনি তো বটেই, বরং কমেছে।
সা. আ. : কারণগুলো বলবেন কী?
অ. মু. : বহু নাট্যদল Ñ তারা প্রত্যাশা করেছিল, বামফ্রন্ট সরকার এসে এমন পথের দিকনির্দেশ করবে যাতে নাট্যচর্চায় শুধু স্ফূর্তি আসবে তা নয় – ওই যে নতুন পথের কথা আমরা আলোচনা করছি, সেই পথটাও কোনো-না-কোনোভাবে খুলে যাবে। এই প্রত্যাশাটা ছিল। সেই প্রত্যাশা সবটা পূর্ণ হয়নি। তবে কিছু যে হয়নি তা নয়। গ্রুপ থিয়েটার আন্দোলনকে আগেকার সরকার, মানে কংগ্রেস সরকার কোনো স্বীকৃতিই দিত না। সংস্কৃতিমন্ত্রীর সঙ্গে আমাদের যোগাযোগই কোনোদিন ছিল না। কিন্তু বামফ্রন্ট সরকারের প্রথম যে সংস্কৃতিমন্ত্রী ছিলেন তিনি নিজে সংস্কৃতির ব্যাপারে খুব আগ্রহী ছিলেন। তার ধ্যানধারণাও খুব পরিষ্কার ছিল এবং তিনি এসে গ্রুপ থিয়েটারকে দারুণ সম্মান এবং মর্যাদা দিলেন। আমরা এতে খুব উল্লসিত বোধ করলাম এবং নাটকের উন্নতির জন্য কী করা যায় এ নিয়ে প্রচুর আলোচনা হলো। কিন্তু আলটিমেটলি দেখা গেল কিছুই হচ্ছে না।
সা. আ. : আমার মনে হয় কংগ্রেসের সময় নানামুখী নাট্যচঞ্চলতা ছিল। বামফ্রন্ট সরকার আসার পর তা কিছুটা ঝিমিয়ে পড়েছে।
অ. মু. : ঝিমিয়ে পড়ার কারণটা বলছি। প্রত্যাশাগুলো পূরণ হলো না। সেই একই ট্র্যাকেই রয়ে গেলাম। বামফ্রন্ট সরকার অনেক কিছু করেছে। অনুদান দিয়েছে, বহু দলকে পুরস্কার দিয়েছে, মর্যাদা তো দিয়েছেই। কিন্তু তারা সিনেমার জন্য যা করেছে এই আট বছরে, তার তুলনায় নাটকের জন্য সামান্যই করেছে। সিনেমার জন্য করার ফলে বেশকিছু নতুন পরিচালক উঠে এসেছে। কনসিডারেশনটা ছিল এই যে, সিনেমা ইন্ডাস্ট্রি হিসেবে মৃতপ্রায়, তাকে বাঁচানো দরকার। সিনেমার উন্নতির জন্য তারা লাখ লাখ টাকা ব্যয় করেছে, ডেভেলপমেন্ট করপোরেশন করেছে, ল্যাবরেটরি নির্মাণের কথা ভেবেছে। সেই তুলনায় নাটক সম্পর্কে কম ভেবেছে। তাদের ধারণা যে, নাটক তো আমাদের পাশেই রয়েছে। নাটক বেশ জোরদার, তাদের খুব একটা মদদ না দিলেও চলবে। পার্টির মধ্যে গ্রাম পঞ্চায়েতে কাজ করা বা গ্রামের মধ্যে সংগঠন তৈরি করার ক্ষেত্রে যে কতগুলো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে তা ভালো উদ্যোগ – কতখানি সার্থক হয়েছে জানি না। সেই তুলনায় সংস্কৃতিকে গ্রামমুখী করা, সংস্কৃতিকে জনমুখী করার জন্য যে একটা ব্লুপ্রিন্ট দরকার, একটা দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা দরকার…।
সা. আ. : সেটা তারা কী গ্রহণ করেছেন?
অ. মু. : না, গ্রহণ করেননি। করেননি বলেই তো আমাদের প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। আগে কারো কাছে প্রত্যাশা করার কিছু ছিল না। আমরা জানতাম, নানা ধরনের সীমাবদ্ধতার মধ্যেই নাটক করে যেতে হবে। কিন্তু প্রত্যাশা যখন তৈরি হলো এবং প্রত্যাশাগুলো যখন মিটল না, তখন সেটা একধরনের স্পেইডব্যাক (ংঢ়ধফব নধপশ) হলো।
সা. আ. : এই পরিপ্রেক্ষিতে কী ধরনের কার্যক্রম হাতে নিয়েছেন?
অ. মু. : আমাদের এখানে ‘গণতান্ত্রিক লেখক শিল্পী কলাকুশলী সংঘ’ বলে একটা সংগঠন আছে। তাদের সেমিনারে যে-কথাটা বলেছি, সেটাই রিপিট করব। আমি এ-কথাটাই বলেছি যে, আমি চাকরি করে, সবকিছু করে শুধু সন্ধ্যাবেলাটা নাটকের জন্য রেখেছি। তাতে আমার পক্ষে যতটুকু অবদান রাখা সম্ভব ততটুকুই রেখেছি। এর বেশি আমি আর পারছি না। এটাকে ইউটিলাইজ করা যাদের দায়িত্ব ছিল, তারা দায়িত্ব পালন করেনি।
সা. আ. : তারা কারা?
অ. মু. : পার্টি। গণসংগঠনগুলোও রয়েছে। অলটারনেটিভ ফোর্স তো আমরা পাইনি। হয়তো নাটক করতে করতেই পথ বেরোবে বা কেউ হয়তো নিজেরাই এগিয়ে যাবে; বসে তো আর মানুষ চিরকাল থাকবে না। তবে মদদ দেওয়ার মতো বিকল্প শক্তি এখনো পাইনি যারা আমাদের নাটককে কাজে লাগানোর জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নেবে। বামফ্রন্ট ইচ্ছে করলে পারবে। সেরকম সাংগঠনিক ক্ষমতা তাদের আছে। বামফ্রন্ট থেকে গ্রামীণ সংগঠন তৈরি করার জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে, রাজনৈতিক শিক্ষা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তার সঙ্গে সাংস্কৃতিক শিক্ষাটাও তো দিতে হবে। অর্থাৎ যে লোকটা ট্রেড ইউনিয়ন ফ্রন্টে খুব জঙ্গি সে সন্ধ্যাবেলা গিয়ে আবার যে বাজে সিনেমার খপ্পরে পড়ছে, সেটা আমি নজরে রাখছি না। এটা আলটিমেটলি আমার অ্যাগেইনস্টে যাবে, সেটাই আমি ভাবলাম না। ওদেরও যে সন্ধ্যাবেলাটায় আমাকে ভালো সংস্কৃতি দিয়ে জাগিয়ে রাখতে হবে, সেই পরিকল্পনাটা নেওয়া হয়নি।
সা. আ. : সরকার কোন ধরনের উদ্যোগ নিলে শ্রমিকদের উদ্বৃত্ত সময়টুকু কাজে লাগাতে পারবে বলে আপনি মনে করেন?
অ. মু. : না, আমি এ সরকারের ওপর বিশ্বাস হারিয়েছি, একথা বলব না। বিশ্বাস আছে। আমি এই সরকারের নাট্য উপদেষ্টা কমিটির সদস্য হয়ে এখনো আছি।
সা. আ. : এ সরকারের প্রতি আপনার কোনো সাজেশন আছে?
অ. মু. : সাজেশন আমি দিয়েওছি কিন্তু নানান কারণে সেগুলো ইমপ্লিমেন্ট করতে পারছে না।
সা. আ. : সাজেশনগুলো কী ধরনের ছিল?
অ. মু. : আমি ডালহৌসির উদ্যানে ওপেন সাজেশন রেখেছি। পুরো সিস্টেম বদলানোর কথা বলেছি। উদাহরণ দিয়ে বলেছি যে, আমি সমাধান নাটকটা তৈরি করলাম, ঘোষণা দিলাম এটা আমরা পার্টির ক্যাডারদের দেখাব, পয়সা লাগবে না। ইউটিলাইজ্ড হলো না। মা করলাম। ইন্ডাস্ট্রিয়াল বেল্টে দেখাব, ইউটিলাইজ্ড হলো না। এখানে সিস্টেমটা কি রয়ে গেছে দেখুন Ñ মফস্বলে আমাদের যারা নিয়ে যাচ্ছে, তারা ওই যে কমার্শিয়াল থিয়েটারের বারবধূর কথা বললেন, সেইটা না নিয়ে আমাদের নিয়ে যাচ্ছে, তারা পয়সার দিকে নজর না দিয়ে ভালো সংস্কৃতি প্রসারের চেষ্টা করছে। কিন্তু এইরকম সংগঠনকেও আমি যদি বলি যে জগন্নাথ আমি পাঁচ হাজার টাকা নেব; মাতে আমি দুহাজার নেব। আপনি মাটা নিয়ে যান। তারা বলছে মাটার টিকেট বিক্রি হবে না। তাদের তো টাকাটা তুলতে হবে। অর্থাৎ সেখানে কিন্তু বুর্জোয়াদের সিস্টেমটা চলছে, সেই সিস্টেমে অঙ্গীভূত হয়ে আছি আমরা। কলকাতাতেও একই সিস্টেম চলছে – অ্যাকাডেমির কথা বলছি আমি। এখন সব সিগারেট কোম্পানিরা বেশ বিজ্ঞাপন দিচ্ছে; তারা ভালো করে বিজ্ঞাপন দিয়ে একটা নাটক, সেই নাটকের কোয়ালিটি যা-ই হোক, যদি ধরিয়ে দিতে পারেন, তাহলে হয়তো, কী বলব, লেগে গেল। যেই কলকাতাতে একটা নাটক লাগল, মফস্বলের যারা অর্গানাইজার, যারা আমাদের নিয়ে যান, তারা দেখলেন যে, এ-নাটকটার পাবলিসিটিটা খুব বেশি হয়েছে, লোক টেনেছে, এটাকে আনলে টিকেট বিক্রি করতে সুবিধা হবে। কলকাতায় বিভিন্ন ব্যাংক, মার্চেন্ট অফিস আমাদের নিয়ে যান। তাদের ক্ষেত্রে বলছি, রিসেন্ট এক্সপেরিয়েন্স থেকে বলছি, রোশনটা দেখে তাদের ভালো লেগেছে। কিন্তু তারা একটা হিসেব করছে যে, তাদের বাড়ির লোকের কাছে ওটা ভালো লাগবে কিনা, এতে একটু বেশি রাজনীতি আছে Ñ না, রোশনটা সেফ না। অর্থাৎ তাকে এই শিক্ষা দেওয়া হয়নি যে, তাদেরকে ঝুঁকিটুকু-দায়িত্বটুকু নিতে হবে। আমরা যখন জগন্নাথ বা মারীচ করি তার যে টিকিট সেল হয়, রোশন সেরকম হচ্ছে না। তা সত্ত্বেও রোশন কেন আমরা চালিয়ে যাচ্ছি? আমরা এখানে একটা ঝুঁকি নিচ্ছি, দায়িত্ব নিচ্ছি। তাহলে যাঁরা আমাদের পৃষ্ঠপোষক হবেন, রাজনৈতিক দল থেকে আরম্ভ করে গণসংগঠন, বিভিন্ন ট্রেড ইউনিয়ন, বামফ্রন্টের বিভিন্ন সদস্য যেমন কো-অর্ডিনেশন কমিটি, মার্কেন্টাইল ফেডারেশন, সিটু (ঈবহঃৎব ড়ভ ওহফরধহ ঞৎধফব টহরড়হং-ঈওঞট), তাদেরও ঝুঁকি নিতে হবে, দায়িত্ব নিতে হবে। বিশ্বকর্মার পুজোর দিন শ্রমিকরা ফূর্তি করবে – একটা যাত্রাই নিয়ে আসুক। না, এ করলে হবে না। পৃষ্ঠপোষকতা যারা করবে তাদের নাটকের খোঁজও রাখতে হবে। তাদের জানতে হবে কলকাতায় কোন দল কোন নাটক করছে। সেটা জানতে গেলে তাদের নাটকগুলো দেখতে হবে। কিন্তু নাটক তো তারা দেখেন না! আমাদের রোশন নাটক এখনো ট্রেড ইউনিয়নের লিডাররা দেখেননি। অনেকে সময় পান না, তারা জরুরি মিটিং নিয়ে এত ব্যস্ত থাকেন যে, সাংস্কৃতিক ফ্রন্টে যারা কাজ করছে তাদের নিয়ে ভাবার ফুরসতই নেই! শ্রমিকদের সংগঠন যিনি করেন, শ্রমিকদের নিয়ে নাটক হচ্ছে – এ খবর দেওয়া মাত্র এসে তাঁর নাটকটা দেখা উচিত, সেটা হচ্ছে না। আমাদের দলের একটা পরিচিতি রয়েছে। আমরা যে ভালো নাটক করি তাঁরা তা জানেন। তা সত্ত্বেও তাঁদের সময় হয় না। তাদের কাজটা হয়তো তাঁরা নিষ্ঠার সঙ্গে করে যাচ্ছেন। কিন্তু সংস্কৃতিকে ভিতর থেকে গুরুত্ব না দিতে পারাটা পার্টির জন্য একটা মস্তবড় হ্যান্ডিক্র্যাপ্ড। সাম্প্রতিককালে এটা নিয়ে নানানভাবে বলার জন্য একটা ভাবনাচিন্তা হচ্ছে। তার প্রতিক্রিয়া নিশ্চয়ই সরকারের ওপর এসে পড়বে। গ্রুপ থিয়েটারের কিছু সদস্য মাঝে মাঝে বলে যে, সরকারের সঙ্গে থাকার কি সার্থকতা আছে। হ্যাঁ, কেউ কেউ অনুদান পাচ্ছে, কারো কারো কিছু সুবিধা হচ্ছে, সেগুলো খুব অ্যাডহক ব্যাপার, সেগুলো দিয়ে আলটিমেটলি কোনো ড্রাস্টিক পরিবর্তন হবে না। যেমন এরা ভূমিনীতির ক্ষেত্রে একটা চেষ্টা করেছে ‘অপারেশন বর্গা’ করে বা পঞ্চায়েত নিয়ে কাজ হচ্ছে, যাতে ভিতর থেকে সংগঠনগুলো উঠে আসে। চেষ্টাগুলো হয়েছে, সুফলও পাওয়া যাচ্ছে, আবার সেগুলো অনেক জায়গায় ফিউটাইল্ড (futiled) হয়েছে, ব্যর্থ হয়েছে। কিন্তু একটা চেষ্টা তো হয়েছে। তবে সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে একটা বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনার পরিকল্পনা এখনো নেওয়াই হয়নি! না নেওয়ার কারণ যেটা আমি আগে বললাম – ট্রেড ইউনিয়ন ফ্রন্টের লিডাররা শ্রমিকশ্রেণিকে নিয়ে নাটক নামালে দেখতেও আসেন না; বলা সত্ত্বেও আসেন না। তাদের মতামত তো আমাদের দরকার। আমরা এর মধ্যে তিতাগড়ে একটা শো করতে গেছিলাম, একেবারে হিন্দুস্তানি শ্রমিক এলাকা – সেখানে ভাষার ব্যবধানটা খুব বড় হয়ে দাঁড়াল। বিষয়টা আমি ধরতে পারলাম – এরকম যদি দশটা শো করার সুযোগ পাই, তাহলে বুঝতে পারব কোন কোন জায়গা তাদের টাচ্ করছে না। এখানে বসে তো তা বিচার করতে পারব না।
সা. আ. : জি, তার জন্য আপনাদের নাট্যনিরীক্ষা আরো বাড়াতে হবে।
অ. মু. : তখন আমার নাটক লেখার টেকনিকও বদলাবে।
সা. আ. : সেই নাটক দেখার অপেক্ষায় রইলাম। আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।
অ. মু. : কলকাতার নাট্য-আন্দোলন সম্পর্কে জানার উৎসাহের জন্য আপনাকেও ধন্যবাদ।

সোশ্যাল মিডিয়া

নিউসলেটার