কাকতালীয়

লেখক:

বিকাশ কান্তি মিদ্যা

কাকতালীয় ব্যাপারটা কেবল মানুষের ক্ষেত্রে ঘটে, এমনটা ভাবার কোনো যুক্তি নেই। যদি কেবল মানুষের ক্ষেত্রে ঘটবে, তাহলে কাকতালীয় হবে কেন, বলুন? নিশ্চয়ই কাকের ক্ষেত্রে ঘটার সম্ভাবনা আছে, আছে বলেই নাকি, কাকিটা সেদিন সকাল সকাল উঠে, হাতের কাছে কিছু না পেয়ে, যখন কী খাই, কী খাই ডাকছিল, রতিকান্ত তরফদারের বাচ্চা মেয়েটা তখন টলমল পায়ে গিয়ে দাঁড়িয়েছিল ব্যালকনির কোণে।
সচরাচর খুকি এতো তাড়াতাড়ি ওঠে না। কিন্তু সব যদি নিয়ম মেনে হবে, তাহলে
আর কাকতালীয় দিয়ে গল্প শুরু হবে কেন?
ছুটির সকাল। সরকারি বাবুদের আজ সকাল একটু দেরিতেই হয়, এ আর এমন কী? সেই মতো রতিকান্ত শুয়েছিল, বধূটিও ছিল; কিন্তু গোলমাল বাধালো যত আড়াই বছরের
খুকি। কী দরকার বাবু তোর, এই সাতসকালে জাগার? তা জাগলি যদি জাগ, চুপচাপ শুয়ে থাক মাকে জড়িয়ে; কিন্তু জড়ানো তো দূরে থাক, ওঠাই লাগলো তার। কী জানি কখন কী যে হয়, এই শিশুদের মনে, বোঝা বড় দায়। কিন্তু এভাবে পাশ কাটালে হবে না –
ঘটনা যখন ঘটে, তখন কিছু বোঝা যায় না; কিন্তু ঘটে যখন যায়, ভেবে দেখবেন, তার পিছনে একটা সিঁড়ি ভাঙা অঙ্ক থাকে। চোর যেদিন চুরি করে, রাস্তায় যেদিন বিপদ ঘটে, যেদিন আপনার পকেটটা ফাঁকা করে দেয় কেউ – দেওয়ার সময় কিছুই বুঝবেন না; তবে ঘটে গেলে পর, দেখবেন, হলফ করে বলছি, দেখবেন, কার্যকারণের একটা অপূর্ব মালা, মালা ঠিক না, চেইন, মনে পড়ে যাবে, ওই ঘটনার পেছনে।
না হলে আজ দরজার পাশে টুলটা ওভাবে রাখা থাকবে কেন? শেষ রাতে কেনই বা রতিকান্ত-দম্পতি ঘুমিয়ে পড়বে? ঘুমিয়েই যদি পড়বে, তার আগে একটু সতর্ক হবে না কেন? কেন, প্রতিদিনই তো সরিয়ে রাখে, হয় রতিকান্ত নিজে, নয় বনানী। তারপর কোনো এক ফাঁকে, দুজনের কেউ একজন ফ্ল্যাটের পিছনের কচু আর কলা ফুলে ঢাকা চওড়া ওই নালাটায় ফেলে দিলে, কাগজ জড়ানো বস্ত্তটা ছোটবেলায় ভাসানো কাগজের নৌকোর মতো ভাসতে ভাসতে কখন যেন গিয়ে পড়ে বাগজলা খালে, খাল থেকে ভাসতে ভাসতে ভাঙড়ের স্লুইস গেটের ফাঁক গলে গিয়ে পড়ে বিদ্যাধরীর জলে, সেখান থেকে সাগরে। সাগরে না কোথায়? কে অত দেখতে যায়? নজরের বাইরে গেলে হলো।
তবে জীবনে ঘটনা কিন্তু এভাবেই ঘটে। ছোট থেকে মাঝারি, মাঝারি থেকে বড়, বড় থেকে বিশাল। তাকে যদি আপনারা কাকতালীয় বলেন, আমার কিছু বলার নেই।
এই যেমন কাকিটা। থাকিস তোরা দুই লোকে নালার পাশে জারুলের গাছটায়। তোরও বাপু বলিহারি যাই, প্রতিদিন ভোরে উঠে খিদে পায়। খিদে পায় তো মানুষকে এতো জ্বালাস কেন? রতিকান্তের ব্যালকনির কোণটা কি লক্ষ্মীর ভাঁড়ার নাকি? প্রতিদিন এসে কা-কা!
তা রতিকান্ত-বনানী মানুষ খারাপ না। দয়া আছে, মায়া আছে, হুঁশ কান্ডও।
তবে আজ কেন যে এমন হলো – এমন ঘুম ঘুমিয়ে পড়লো যে, ঘুমানোর দোষটা বা কোথায়? বছরে না হোক মাসে, মাসে না হলে সপ্তাহে ছুটির দিন এক-আধবার এরকমই হতে পারে। তাই বলে দুধের বাচ্চা মেয়েটা ওভাবে ওঠে? উঠে টুল টেনে ছিটকানি খোলে? খুললি যদি তো ব্যালকনির কোণটায় গেলি কেন? গেলি যদি তো মা-বাবার মাথার কাছে কী পড়ে আছে, না আছে, অত কিছুতে তোর জমা-খরচের কী দরকার? সেটাতে তোকে হাত দিতে কে বলেছে/ হাত দিয়েছিস, রেখে দিবি – ফোপর দালালি করে কেউ তোকে কাকের মুখে ছুড়ে দিতে দিবিব দিয়েছে?
দিয়েছিস, বেশ করেছিস। ও খেয়েছে, রয়ে গেছে। এখন অত জ্বালাস না তো বাপু।
কিন্তু ঘটনা তো আর দূরদর্শনের কোনো খেলা নয় যে রিপ্লে করা যাবে। ছোড়া ঢিলের মতো সামনে এগোবেই। পেছানোর কোনো সুযোগ নেই।
এ-বাড়ি থেকে খাওয়ার জিনিস প্রতিদিন কিছু না কিছু পায় কাকি। হয় রতিকান্ত দেয়, নয় বনানী। আজ না হয় তাদের বাচ্চা মেয়েটা দিয়েছে। তাই খাওয়ার জিনিস ভেবে খেয়েছে সে। কোনোদিন মুড়ি পায়, কোনো দিন বিস্কুট বা রুটি। আজ বেলুন বেলুন বস্ত্তটা দেখে খিদের মুখ না করেনি কাকি। কেয়ারটেকার শিবুর কফে যদি ঘেন্না না থাকে, তো বাচ্চা মেয়ে ভালোবেসে, ভক্তি করে দিচ্ছে দেখে, কাকি কি আর না করতে পারে? তার ওপর হাবড়ি-জাবড়ি খাওয়ার বিষয়ে মেয়েদের মতো বদনাম কাকিরও ছিল। তবে বদনাম বলে গালি দেওয়া ঠিক কি? খেয়ে যদি সামলে যায়, কাউকে না জ্বালাতে হয়, তো সেসব আবার হাবড়ি-জাবড়ি কেন, খাদ্যবস্ত্ত বলেই বিবেচ্য। কিন্তু মুশকিল হয়েছে এবারটাতে এসে…
টুক্ করে দরজা বন্ধের আওয়াজ পেয়ে ধড়ফড় করে ঘুম ভেঙে উঠে বনানী দেখে, ওইটুকু মেয়ে, তাদের না ডেকে ব্যালকনি থেকে ঘরে এসে ঢুকছে। মেয়ের কান্ড দেখে মায়ের তো চক্ষু স্থির, কিন্তু চক্ষু স্থিরের বোধ করি কিছু বাকি ছিল।
হঠাৎ ভূত দেখলে মানুষ যেমন অাঁতকে ওঠে, ঝটিতে ব্যালকনিতে গিয়ে তাদের দাম্পত্যের গোপনীয়তাটুকু কাকের মুখে দেখে, কেমন যেন ভূত দেখে বনানী।
ঘুম ভেঙে শুয়ে শুয়ে ব্যাপারটা রতিকান্ত অনুভব করে। তারপর আড়মোড়া ভেঙে বলে – নাও ঠ্যালা সামলাও। কতবার হাতে-পায়ে ধরে বলি, ওগো আড়াই-তিনের ব্যবধানটা সবচেয়ে আইডিয়াল। যা দিনকাল, আমরা চোখ বুজলে মেয়েটার আপন বলে আর কে থাকবে? তাছাড়া আমার বড় ইচ্ছা, ঘরেই তো থাকো। ছেলে হোক, মেয়ে হোক, আর একটা আসুক। না! বিবিজানের ঝামেলা পোষায় না। একটাই ভালো। এখন একটাই তো আছে, দুটো তো হচ্ছে না। উদ্বেগের কারণ কী অত?
– না না, উদ্বেগের কী থাকবে? তোমার শত সন্তানের জননী হই। অাঁতুড়ঘরে শুয়ে থাকি। …সাধের আর অন্ত নেই।… এখন একটু দয়া করে ভাববে, মেয়েটা ওটার কথা জিজ্ঞেস করলে কী বলা হবে?
– কী আবার? ওষুধ। বাবার ওষুধ। খুব সাংঘাতিক জিনিস। বাচ্চাদের ওতে হাত দিতে নেই।
– ওষুধ বললে শুনবে?
– ক্যানো নয়? আগে ড্রয়ার টেনে বের করা কি দেখেনি, না জিজ্ঞেস করেনি; তখনো তো ওষুধ বলা হয়েছে। অত ভাবার দরকার কী? দেখে ফেলেছে, হঠাৎ ঘটে গেছে। আমরা ফেলতে ভুলে গেছি, ও ঘুম থেকে উঠে সেটাই দেখতে পেয়ে কাককে দিয়েছে। এ আর কী? কাকতালীয় –

দুই
কিন্তু ওই যে বলেছিলাম, কাকতালীয় শুধু মানুষের পৈতৃক সম্পত্তি নয়, কাকজাতিরও তাতে কিছু অধিকার আছে। সেই অধিকারবোধে, নাকি ক্ষুধার তাড়সে, কাকি সেদিন প্রচুর কিছু খায়। যা পায় সামনে, খায়, না, নস্যির মতো টেনে নেয়, সে নিজেই বোঝে না। খুশিতে সেদিন কাকের সোহাগও লুটে নেয় এন্তার।
এমনিতে ব্যাপারটা মিটে যাওয়ার পর, পরিমাণ বুঝে বস্ত্তটাকে একটা গিঁট দিয়ে রাখাটা রতিকান্তের অভ্যাস, না বদরোগ, বলা মুশকিল। তবে এতেও যে তার কিছু কামনা সঞ্চিত থাকে, সে কেবল সে-ই জানে। আজ যেমন গিঁট তেমন থাকে, ঠোঁট দিয়ে একটা ঠোকর দিয়ে রতিকান্তের সেই কামনাটুকু পান করতে কাকির কিন্তু বেশি সময় লাগে না।
আপনারা হাসবেন। হেসে বলবেন যে, পানের সঙ্গে পোয়াতির সম্পর্কটা কোথায়! আমি যদি বলি কাকতালীয়। বলবেন, কাকতালীয়রও কি মা-বাপ নেই? মানুষের বীর্য খেয়ে কাকি আবার পোয়াতি! যত্তসব উজবুকি। ফিজিওলজি সম্পর্কে কোনো ধারণা নেই।
অবিশ্বাস করি না, কিন্তু কাকতালীয় হলে আমি কী করতে পারি! শুনি তো লোকে বলে, যে নারীর জীবনে একটাই সন্তান হয়, তাকে বলে কাকবন্ধ্যা। কারণ কী? না, কাকি নাকি সারাজীবনে একটাই ডিম পাড়ে, তার বেশি পাড়ে না; তাই এক সন্তানের জননী কাকবন্ধ্যা। যত্তসব গাঁজাখুরি গল্প। কলকাতা থেকে তাহলে কাক কবে উঠে যেতো। রতিকান্তের ব্যালকনিতে কাকভোর থেকে এত উৎপাত হতোই না। রতিকান্তকেও প্রতিসকালে তাহলে বলতে শুনতেন না, শালিরা কটা করে বিয়োয়? একদিন তো বুঝি কাকেই ছেয়ে যাবে কলকাতা, মানুষ পালাবে। – এভাবে কাকির ছানাদের কথা ভাবতে ভাবতে তাদের আর একটি সন্তানের ভাবনায় কাকিটার গলায় কখন যেন ভোরের রং খুঁজে পেত রতিকান্ত, ভাবতো, যতই বলুক লোকে, ঠিকমতো তাকালে, কাকের বিশেষ করে কাকিরও কিন্তু বিউটি কম নয়। যা তা খায় বলে লোকে খারাপ ভাবে। আরে বাবা, নোংরা নিতে আসা বউটি খারাপ দেখতে নাকি? নোংরা পোশাকে থাকে, নোংরার বালতি নির্বিকারভাবে টানে, তাই। এক-আধবার সাবান-শ্যাম্পু মেখে চান করলে, ওরা অত খারাপ থাকবে নাকি!
তা ঠিক।
কিন্তু হচ্ছিল তো কাকির কথা, কোকিলা ধরে টানার দরকার কী?
যদি বলি কাকতালীয়। আপনাদের মনে হবে জটপাকানোর ধান্দা।
আরে বাবা, জীবন তো জটিল। মানুষের মন আবার কবে থেকে একমাত্রিক হলো? কাকি ছিল ঝাড়ুদার, কোকিলা এখন তাই। কাকির খাওয়া বস্ত্তটা কত টানলো কোকিলার বালতি। সেসব বস্ত্ত কি আর এমনি যেত নাকি?
যেত না ভেবেই তো বাক্সো বদল হলো। প্রথম প্রথম ফেলার দায়িত্ব বনানীরই ছিল; কিন্তু খুকি আসার পর, সেই যে রতি ভার নিল, বনানীর আর হুঁশ রইলো না ক’দিন। তবে কোকিলার বালতি চালু হতে, বনানী যেন জেগে উঠলো হঠাৎ। তারপর বলা নেই, কওয়া নেই, একদিন – শোনো, হরচিৎ ওটা আর কোকিলার বালতিতে ফেলবে না।
– ক্যানো?
– ক্যানো কথার মানে নেই… আমি জানি তোমার ইচ্ছার যা ঝাঁজ, একদম ফেলবে না বালতিতে। মাগির চোখ-মুখ, তাকানো আমার একদম ভালো লাগে না।
– তাহলে কি জলে ফেলবো নাকি?
– জলে হোক, জঙ্গলে হোক, যেথায় ফ্যালো, ফ্যালো। কোকিলার বালতিতে নয়।
সেই থেকে ব্যালকনির নিচের নালা হলো ভেলা ভাসানোর নদী। দুজনার কেউ না কেউ ফেলে।

তিন
প্রথম প্রথম কদিন গা করেনি কেউ। কাক না, কাকিও না, রতিকান্তর মেয়ের কথা তো ছেড়েই দিলাম – দুধভাত – বনানী বা রতিকান্তও না। হাস্যকর মজার একটা ব্যাপার – মেয়ের তরফ থেকে তারপর আর কোনো প্রশ্ন না ওঠায়, বনানীও ভুলে যায় সংসারের চাপে। রতিকান্তরও চাপ কম নাকি! অফিস-কাছারি, বাজার-হাট, আড্ডা-ক্লাব, টিভি-কাগজপড়া – সেও বেমালুম ভুলে যায়। তবু এর মাঝে রাতে শোয়ার পর সতর্কভাবে বস্ত্তটাকে কাগজ মুড়ে ফেলে – বেহুলার ভেলা যেন গাঁঙুড়ে যায় ভেসে। ক’দিন পর ছুটির সকালে একদিন, ভেলা ভাসাতে গিয়ে, রতিকান্তের চোখে পড়ে, কাকিটা কেমন যেন মনমরা বসে তার ব্যালকনির কোণে। চিনতে ভুল হয় না, প্রতি বছরই তো বাসা বাঁধে, টব বসাতে তৈরি করা লোহার বেড়টাতে। কোথা থেকে ছোট্ট একটা শিক-জড়িয়ে আসা পা – ওটাই বেচারীর চিহ্ন।
কাকতালীয় আর কাকে বলে – মান্ডু পাগলিকে দুপুরবেলায় এলোখোঁপায় পুকুরঘাটে দেখে, রতন তাঁতি যদি প্রেমে পড়তে পারে। ভোরের রংমাখা গলা তোলা আনমনা কাকিকে দেখে রতিকান্তর ভালোবাসতে অপরাধ কোথায়? কী মনে করে, কৌটো খুলে, দুটো মেরি বিস্কুট ছুড়ে দেয় সে; কিন্তু নিরাসক্তি দেখে তার ভাবতে ইচ্ছা করে, রুচবে না জানি, কিন্তু এ সময় একটু প্রোটিন খাওয়া ভালো। অগত্যা এক মুঠো মুড়ি এনে ছড়িয়ে দিতে, কাকটা এবার কোথায় ছিল, এক উড়ালে ঝাঁপিয়ে পড়ে মেরি দুটো তো বটেই, মুড়িগুলোও সাবাড় করে, কাকি তবু নড়ে না, আনমনা হয়। আর তার আনমনার এই ডানায় চেপে উড়তে ভালো লাগে রতির। উড়তে উড়তে কখন যেন রত্নাকরদার কথা তার মনে পড়ে যায়। বায়ো-সায়েন্সের রত্নাকরদার সঙ্গে মেসে যখন থাকতো সে, চাকরি জীবনের প্রথম ধাপে – বাড়ি থেকে ঘুরে এসে রত্নাকরদা জিজ্ঞেস করতো, কি হে রো-তি-কান-তো – বাথরুমের পিছন থেকে বাবা ডাক শুনতে পাও? – প্রথম প্রথম বুঝতো না সে। ভাঙলেই হাসি পেতো – তুমি তো আড়াই প্যাঁচ মেরে খুশি, কিন্তু দ্রব্যটা কোথায় যায়, কে খায়, সে খবর তো রাখো না। মঙ্গলকাব্য পড়েছো? মনসামঙ্গল? মনসার জন্মবৃত্তান্ত জানো? – কমার্সের স্টুডেন্ট। ডেবিট-ক্রেডিট বোঝে,, মনসার জন্মবৃত্তান্তে তার কী যায়-আসে? তাই যখন শোনে, বিশ্বাস করে না। কিন্তু অবিশ্বাসগুলোই তো সন্দেহ হয়ে জমা হয় আমাদের মনে। কবে, কখন, কীভাবে নাড়া পেয়ে তলার থেকে তারা আবার উঠে আসে, কে বলতে পারে? কাকিটার অরুচি দেখে, মনসা-বৃত্তান্তের বীজটা যেন নাড়া খেয়ে ওঠে – কাকতালীয় তো হতেই পারে। – আরে বাবা, কাকতালীয় কি সে-কালেও ছিল না নাকি, তবে? শুনেছিলাম তো, কোন এক পাখি প্রথম খেয়েছিল, কাকি না কে? রাখতে পারেনি। এখনকার কাকি কি আর অত বোকা? এরা সব কায়দা-কানুন জানে… ঢং-বং এদের সব আলাদা।
রোজ সকালে কাকিটা আসতো, কিছু না কিছু খেতে দিলে, খেয়ে চলে যেত। কিন্তু কদিন ধরে কাকিটার মনমরা ভাবে তাকানো দেখে, আর ব্যালকনির গ্রিল ছেড়ে উড়ে যাওয়ার অনীহা দেখে, রতিকান্ত ভাবে, এ আবার ওই ঢং না তো?
ঢং হতে যাবে কেন? ও তো আর কাকটার মতো খাওয়ার ধান্দায় আসে না। খেয়েই তো ছুট লাগায় না! তাহলে কি ডিমের সময় হলো বলে টবের রিংটা ছাড়তে মায়া হচ্ছে? তাও কী? বাসা বাঁধার তো তেমন তোড়জোড় দেখি না। – সব কেমন গুলিয়ে যায় রতিকান্তর। সামান্য একটা কাকি কেমন গোল পাকিয়ে দেয় চিন্তায়।
কিন্তু অফিস ঘুরে বাড়ি ফিরে পরদিন সকালে, তার দিকে তাকিয়ে কাকিটার করুণ করুণ তাকানো দেখে, ওসব চিন্তা আর থাকে না রতিকান্তর। তার চেয়ে, না চাইলেও সকাল সকাল ঘুম ভেঙে যায় তার। ঘুম ভেঙে উঠে কোনোদিন মুড়ি, কোনোদিন ভাত, রাতে রাঁধা মাংসের টুকরো কোনো দিন দেয়। আগে দিত মুড়ি-বিস্কুট; কিন্তু তাতে ছিল দয়া। এ ক’দিনে দেওয়ায় কেমন যেন একটা দায় তৈরি হয়ে যায়। শুধু খেয়াল রাখে, বনানীর চোখে পড়ে কিনা।
কিন্তু কোথায় কাকি! কাকটা এসে এক ছোঁতে মাংস নিয়ে চলে গেলে রতির যেন আনমনা লাগে। আনমনে বাথরুমে কিংবা বিছানায় শুয়ে শুয়ে তলপেটে হাত বুলায় সে।
দেখতে পেয়ে বনানী বলে, কী গো, পেটে কী হলো, জ্বালা, ব্যথা, না গ্যাস? তেমন তো মন পেতে খাও না আজকাল। যাবে নাকি ডা. দত্তর কাছে একদিন?
– ধ্যাৎ! ছাড়ো তো। এমনি ক’দিন ভালো লাগছে না।
– কিসে যে ভালো লাগে তোমাদের, বুঝি না বাবু। অফিসে কোনো ঝামেলা?
– না রে বাবা না! এমনি কি ভালো না লাগতে নেই?
– কী জানি বাবু। তোমাদের মনে মনে কী যে গুজগুজি – অত আমার ভালো লাগে না।
বনানীর ভালো লাগে না বলে, নাকি, রতিকান্ত, যে কোনোদিন বাপ-মা মরলেও সেইভাবে কাঁদল না কোনোদিন, তার কেমন যেন কান্না পায়। এর মধ্যে কাকতালীয় কোনো ব্যাপার আছে কিনা জানি না। তবে অফিসফেরত কুকুর-পাখির খাবার পাওয়া যায় যে দোকানে, সেখানে গিয়ে পোয়াতি কাকের কোনো খাবার মেলে কিনা জিজ্ঞেস করে।
শুনে দোকানি হাসে। আবেগ বুঝে কিছু একটা গছিয়ে দেয়। কিন্তু সেও কাকি খায় না দেখে অস্থিরতা বাড়ে।
রতিকান্ত কোনোমতে খায়-দায়, স্নান করে, ভদ্রলোকের পোশাক না পরলে নয়, তাই পরে; কিন্তু বাইরে থেকে দেখলে তাকে ঝড়ো কাকের মতো লাগে – উসকোখুসকো – কালবৈশাখী ঝড়ে পড়া কাক, ভিজে গেলে যেমন ভবঘুরের চেয়েও ভয়ঙ্কর লাগে, তেমন।
এর মাঝে হঠাৎ একদিন অফিসের অর্ডার আসে, কম্পিউটার ট্রেনিং নিতে যেতে হবে পাটনা। দেড় মাসের মোকদ্দমা – খাওয়া-থাকা ফ্রি; তবে বাড়ি আসা বারণ।
বিনা মেঘে বাজ পড়লে যেমন লাগে, রতিকান্তর ভেতরটা যেন তেমন হয়ে যায়। বাড়ির জন্য ভাবে না – বনানী একা সামলে নেবে। ভাবনা শুধু কাকিটার, কী হয় ভেবে। টেনশন হয়, টেনশনে যা যা হয়। কিন্তু বনানী যখন নার্সিংহোমে – সিজার না নরমালের পাল্লায় – বাথরুম তখন এত ঘন হয়েছিল বলে মনে পড়ে না রতিকান্তর।
কিন্তু বউ-মেয়ে পারবে, কাকির জন্যে কামাই, শুনলে রাস্তার কুকুরগুলোও তো হাসবে।
অগত্যা তাই যেতে হয় তার; কিন্তু মনটা পড়ে থাকে ব্যালকনির কোণে।
এর মধ্যে একদিন খবর য়ায় ফোনে – ডিম পেড়েছে কাকি। তিনটে ডিম ছিটছিট, একটা ডিম সাদা।
সাদাটা একটু বড় শুনে, পাগল লাগে রতির। ট্রেনিং তো নয়, হাজত-খাটা।
তারপর হাজত যখন শেষ। গাড়ি থেকে নেমে আর হাত-পা ধোয় না সে। খুকি তো খুকি। বাক্যালাপ স্থগিত রেখে, ব্যাগটা ফেলে ব্যালকনিতে ছুটে যাবে কী, বনানীর বাক্য যেন চাবুক মেরে ফেরায় – শোনো, সর্বনাশ যা করার করে কাকির জন্যে পাগলামো?
আকাশ থেকে পড়ে যেন রতি – মানে?
– মানে? – এতদিনের অদর্শন, তবু মুখটা কেমন খিঁচিয়ে ওঠে বউর। – দেড় মাস হলো, আমারটা আটকেছে, ঠ্যালা এবার সামলাও।
কাকতালীয়!

শেয়ার করুন

Leave a Reply