কাগজের কফিন

লেখক:

জয়দীপ দে

কাজ ওই একটাই। সারাদিন বুকের ভেতরে কথার ওল পাকানো। তার ধারণা, পুরো জগৎসংসার তার বিপক্ষে চলে গেছে। কাঠগড়ায় দাঁড়ানোর আগেই তাকে দোষীসাব্যস্ত করে ফেলেছে সবাই। মুখের ওপর যে যার দরজা ভিজিয়ে দিয়েছে। এখন তার দিকে ফিরে তাকানোর ফুরসত নেই কারো। তারও যে কিছু বলার থাকতে পারে, তা কারো মাথায় নেই। মাথায় থাকলেও শোনার আগ্রহ নেই। ভাবখানা এমন, পাপিষ্ঠা আর বলবে কী -। পুরো পৃথিবী তাকে একঘরে করে দিয়েছে। তার কিছুই যেন এই পৃথিবী গ্রহণ করতে রাজি নয়। এমনকি কণ্ঠ থেকে বেরিয়ে আসা ধ্বনি-স্বর পর্যন্ত। মাঝে মাঝে পাগলের মতো চিৎকার করে। কখনো কাজের ঠিকে-ঝিটাকে লক্ষ করে, কখনো আবার অলক্ষই লক্ষ। একটা শব্দও জানালার শার্সি গলে বাইরে যেতে পারে না। খোঁয়াড়ের পশুর মতো দেয়ালে দেয়ালে ঘোঁত-ঘোঁত করে দ্বিগুণ আক্রোশে ফিরে আসে তার কানে। শব্দগুলো তখন ভৌতিক শোনায়। ভয়ে তখন সে দুকান চেপে ধরে। নিজে নিজের কাছেই পরাজয় মেনে নেয়। বিনা বিচারে এই শাস্তি দেওয়ার প্রতিকার চায় সে মনে-মনে। কিন্তু আরেক মন বলে ওঠে, ঠিকই তো আছে, যার স্বামী বউয়ের ওড়না গলায় পেঁচিয়ে ফ্ল্যাটের ব্যালকনিতে ঝুলে পড়ে, তার আবার বিচার কী? আজ থেকে শখানেক বছর আগে হলে লোকে হয়তো তোকে নিয়ে ভালো করে মহুয়ার মদ খাইয়ে স্বামীর চিতায় নিয়ে চড়াত। তিন প্রজন্ম আগে তো রাহেলারা হিন্দুই ছিল। তার প্রপিতামহের নাম দলিল-দস্তাবেজে নিরঞ্জন সূত্রধর লেখা আছে। এখনো গ্রামের বাড়িতে চালার ঘরে বড়ো বড়ো কাঁসার ডেকচি আছে।

ডোর বেলের আওয়াজ হলেই সারাদিনের পাকানো কথার বলগুলো আনন্দে লাফালাফি শুরু করে বুকের ভেতরে। ইচ্ছা করে, একটা পাখির মতো উড়ে গিয়ে দরজা খুলতে। পরক্ষণেই তার শ্রেণিচেতনা টনটন করে ওঠে। লাফিয়ে ওঠার চেয়ে সুন্দর করে চেয়ারে বসার প্রতি তার আগ্রহ বাড়ে। এক হাতে আলগোছে ওড়নাটা টেনে নিয়ে বুকে জড়ায়। বাইরে যেমন নিজেকে সাজায়, তেমনি ভেতরেও। ও-বাড়ির কেউ এলে বুনো আবেগের স্রোতে নিজেকে ভাসিয়ে দেওয়া যাবে না। ওটা প্রকারান্তরে দুর্বলতা হিসেবেই গণ্য হবে। হয় করুণা দেখাবে, নইলে বিজয়ীর হাসি হেসে ঠোঁট মুছে চলে যাবে। এর কোনোটাই রাহেলার পছন্দ নয়। রাহেলা নিজের অবস্থান ক্লিয়ার করতে চায়। এর বেশি কিছু নয়। সে চায় না, কেউ তার অশক্ত জীবনের ঠেসান হয়ে দাঁড়াক কিংবা নিঃসঙ্গ ভুবনের ছায়াসঙ্গী হোক। সে চায় পুরো পৃথিবীর নিস্পৃহতাকে ভেঙেচুরে দিতে। সবাই ঘাড় ফিরিয়ে তাকাক তার দিকে; ক্ষণিকের তরে স্তব্ধ হয়ে বলুক – ও তাই!

উপর্যুপরি তিন-চারটা আওয়াজের পর অসহিষ্ণু হয়ে ওঠে রাহেলা। কাজের বুয়াটার ভেতরে একটা অগ্রাহ্যের ভাব দিন দিন দানা বাঁধছে। শুনেও না শোনা, দেখেও না দেখা। বুয়া বুঝে গেছে, তাকে আর ছাড়ানো সম্ভব নয়। এই মড়াবাড়িতে কেউ এসে আর কাজ করবে না। রাহেলা বুয়ার নাম ধরে ডাকে। বুয়া মালগাড়ির মতো ধীরেসুস্থে এগিয়ে আসে। রাহেলার অস্থিরতার ভুটভুটানি বাড়তে থাকে। তাকে তাড়া দেয় ছুটে যেতে। রাহেলা নিজেকে নিজে গ্যাস বেলুনের মতো অাঁকড়ে ধরে বসে থাকে। মনে মনে ভাবে,            ও-বাড়ির লোক নাও হতে পারে। সেই কবে থেকে সে ডোরবেলের প্রতীক্ষায় কাঠ হয়ে আছে। আওয়াজ পেলেই অস্থির হয়ে ওঠে, এই বুঝি ও-বাড়ির কেউ এলো। কই কেউ তো আসে না। বুয়া গিয়ে দরজা খুললে দেখা যায় হয় ভিক্ষুক, হকার, নয়তো জরিপের মেয়েরা। ‘বেইমানের রক্ত’, এই বলে রাহেলা তার প্রতীক্ষার সাময়িক যবনিকা টানেন। কিছুক্ষণ অতীতচারিতায় মগ্ন হোন। কী না করেছে সে সংসারের জন্য। হ্যাঁ, একসময় সে যখন পেরে উঠতে পারছিল না, দেখছিল সবদিকে অন্ধকার, তখনই সে বাধ্য হয়ে পিঠটান দিয়েছে। তারই তো সুফল আজকের সচ্ছলতা। কী সুন্দর লেকের কোল ঘেঁষে একটা কর্নার প্লট। ব্যাংকে মোটা অঙ্কের এফডিআর। এ দিয়ে কয়েক প্রজন্ম আরামছে শুয়ে-বসে খেতে পারবে। কিন্তু প্রজন্ম আর পেল কই। ছত্রিশ বছর বন্ধ্যার অপবাদ মাথায় নিয়ে এখন হন্তারকের -। জীবন কতভাবে যে একজন মানুষকে বিপর্যস্ত করতে পারে তারই নমুনা রাহেলা। একজীবনে যেসব উপাদানের পেছনে ধাওয়া করে মানুষ তার সমস্ত সত্তাটাকে খুইয়ে ফেলে, তার সবই পেয়েছিল রাহেলা আর তার হাজব্যান্ড। সরকারের সর্বোচ্চ কর্মকর্তার পদে আসীন হওয়া চাট্টিখানি কথা নয়। রাহেলাও তার ব্যাংকের দ্বিতীয় শীর্ষ কর্মকর্তা। পর্বতের একেবারে চূড়ায় আরোহণ করে রাহেলা আজ নিজেই স্তম্ভিত। এই আরোহণের অর্থ কী,                        যে-বিজয়কেতন শৈলচূড়ার হিমশীতল বক্ষে গেঁথে দেওয়ার কথা ছিল তা তো সে অজান্তেই ফেলে এসেছে মাটির পৃথিবীতে।

 

দুই

দরজাটা খুলতেই রহিমার বুকটা হিংসায় মোচড় দিয়ে উঠল। বিড়বিড় করে বলল, ‘মাগির ভাইগ্য দেখো।’ ঘরভর্তি দামি আসবাব। ঝালর লাগানো পর্দা। ঝকঝকে সিনথেটিক কার্পেট। দেয়ালের  এ-মাথা থেকে ও-মাথা জুড়ে ল্যাপ্টে থাকা টিভি। এতকিছুর মালিক এক বন্ধ্যা নারী। কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছে না রহিমা। রহিমার ছয় সন্তান। মেয়ে দুটোকে সময় থাকতে সুপাত্রের হাতে গছিয়ে দিয়েছে। এখন চার পুত্র নিয়ে তার সংসার। বড়টা গদিতে বসে। তাকে নিয়ে কোনো চিন্তা নেই। তার উপার্জনেই সংসারের চাকা ঘুরছে। মেজোটা ঠিক কোথায় আছে কেউ জানে না। দু-চারটা মামলার চক্করে পড়ে এলাকাছাড়া। সেজোটা তিনবারে বিএ পাশ করে চাকরির ধান্ধায় আছে। প্রাইমারির রিটেনে টিকেছে। এখন ভাইভার ঘাট পেরোনোর পথ করতে ঢাকায় আসা। এমপি সাহেব বলছে, ‘চিন্তা কইরেন না খালা।’ তার পরও তার মনে উৎকণ্ঠার চোরাকাঁটাটা ক্ষণে ক্ষণে ঘাই মারে। তখনই রাহেলার কথা তার মনে পড়ল। এত বড় অফিসারের বউ। নিশ্চয়ই তার অনেক জানাশোনা আছে। ভাগ্যিস রাহেলার স্বামী বেঁচে নেই। হতে পারে, তার আপন খালার পেটের ভাই। কিন্তু বেঁচে থাকলে এই বাড়ির চৌহদ্দিতে পা রাখার সাহস হতো না তার। হয়তো গেট থেকেই দারোয়ান বিদেয় করে দিত। আর যদি ভাইয়ের সঙ্গে চোখাচোখি হয়েই যেত, পাঁচশো টাকার একটা নোট দিয়ে মিসকিন খেদাত। তার ভাইয়ের অপমৃত্যুর কারণে রাহেলা অনেকটাই মজে গেছে। শ্বশুরবাড়ির লোকজন তার সঙ্গে স্থায়ীভাবে সম্পর্ক ছিন্ন করেছে। আগে যে খুব একটা ছিল বলা মুশকিল। কালেভদ্রে ভাইবোনদের খোঁজ নিতেন রাহেলার হাজব্যান্ড। সে-সূত্রে তারাও ঈদ নববর্ষে নতুন পোশাকে ঘুরে যেত একবার। তবে সেই সম্পর্কের মিষ্টি বাতাস রহিমা পর্যন্ত বিস্তৃত হতো না। নেহাত মায়ের পেটের ভাই, বোন ছাড়া অন্যদের প্রতি তেমন উৎসাহ ছিলেন না রাহেলার হাজব্যান্ডের। এই শূন্যতার নিম্নচাপকে ভর করে খরবায়ুর মতো ছুটে এসেছে রহিমা। আপাতত তার চাওয়া সেজো পুত্রের একটা চাকরি; কিন্তু এটা একটা ছলমাত্র। এই সুযোগে চল্লিশ চোরের গুহায় ঢুকে পড়ো; তারপর সুযোগমতো যা পারো হাতিয়ে নাও।

রাক্ষসীর রূপ যেন ফুটছে। তেত্রিশ বছর পর রাহেলাকে দেখে রহিমার প্রথম প্রতিক্রিয়া ছিল এই। কিন্তু সবকিছু ভালোমানুষি হাসির আভরণে ঢেকে গেল। কত কালের স্বজনের মতো ছুটে গেল ‘ভাবি গো কেমন আছেন’ বলে জড়িয়ে ধরতে।

কিন্তু রাহেলা খুব সচেতনভাবে আলিঙ্গন এড়াতে দুহাত ধরে ফেলল রহিমার, বিধবা মানুষের আর থাকা।

রহিমা রাহেলার এই পিছলে-যাওয়া সচেতনভাবে পর্যবেক্ষণ করল। ধরা না দেওয়ার মতো করে বলল, কী যে কন না ভাবি।

– তা তোমরা কেমন আছ?

উত্তর করার সময় নেই রহিমার। শোকেস-ভর্তি তৈজসপত্র দেখে সে আত্মহারা। আরো দূরে অ্যাকুরিয়ামে সোনালি মাছের পাখনা নাড়ানোর প্রদর্শনী। ‘ইশ কার লাইগ্যা এতকিছু রাইখ্যা গেল ভাইজান’, রহিমার মনে আফসোসের তুষ ধিকধিক করে। তখনি সেই জ্বলুনিতে হাঁপরের বায়ু দিতে কাজের বুয়াটা ধুমধাম জানালা লাগিয়ে দিয়ে এসি ছেড়ে দেয়। ‘এই বাজা বেটি, কী করব এত কিছু দিয়া -’, স্বগতে সংলাপ বুনে রহিমা।

 

তিন

রহিমাকে দেখে ত্রিভুবন জয়ের আনন্দ পেয়ে বসল তাকে। রহিমা যদিও তার আপন ননদ নয়। ওর হাজব্যান্ডের খালার ঘরের বোন। কোনো একটা অনুষ্ঠান হলেই রাজহংসীর মতো একসারি সন্তান নিয়ে প্যাক-প্যাক করে চলে আসত রাহেলার শ্বশুরবাড়িতে। সঙ্গে থাকত সদা ভীত পলায়নপর এক পুরুষ। তার বর। সারাদিন লোকটার কোনো অস্তিত্ব টের পাওয়া যেত না। রাত হলে কাশির আওয়াজে বাড়ির কুকুরগুলো পর্যন্ত শান্তিতে ঘুমুতে পারত না। এই রহিমাকে রাহেলার শাশুড়ি বিশেষ গুরুত্ব দিত। যতদিন সে বাড়িতে থাকত, তার শাশুড়ির ছায়া পড়ত না মাটিতে। কারণ রহিমাই তখন তার শাশুড়ির ছায়া হয়ে ঘুরে বেড়াত বাড়িময়। গোয়ালের গরুর দুধ চুরি থেকে শুরু করে রাহেলা হাজব্যান্ডের লুকিয়ে আনা শাড়ির খবর সে আয়নবায়ুর মতো বয়ে নিয়ে যেত শাশুড়ির কর্ণকুহরে। তারপর নিম্নচাপ। খর বায়ু। ঘূর্ণিঝড়। প্রতিটি পর্বে সে তার নিজের সাধ্যমতো ভূমিকা রাখার চেষ্টা করত। তাই তাকে পেলে রাহেলার শাশুড়ি রণমূর্তি রূপ ধারণ করত।

সেই রাজহংসী রহিমা আজ একটা মাত্র ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে এসেছে রাহেলার ফ্ল্যাটে। ছেলেটা বয়সের তুলনায় অসম্ভব রোগা। হয়তো বাবার মতো তারও শ্বাসকষ্টের সমস্যা আছে। শার্ট-প্যান্ট ইন করে যথাসম্ভব পরিপাটি। কিন্তু পায়ে সস্তা চপ্পলটা তার সকল প্রচেষ্টাকে ধূলিসাৎ করে দিয়েছে। ছেলেটাকে দেখে রাহেলার মায়াই হলো। শুধু ছেলেটা – মাকে দেখেও। কী রাহেলা কী হয়ে গেছে। বয়স তার মুখের প্রতিটি ভাঁজে পরাজয়ের স্বাক্ষর রেখে গেছে। এই রহিমার সামনে বিগত দিনের হিসাবের খেরোখাতা খুলে বসা অর্থহীন। রহিমার জন্য মনটা আর্দ্র হয়ে উঠল রাহেলার।

সেদিন যদি সাহস করে স্বামীকে নিয়ে ঘর ছেড়ে চলে না আসত তার অবস্থা হয়তো রহিমার কাছাকাছিই হতো। না না, সেটা কী করে হয়। নিজেকে নিজে শুধরে নেয় রাহেলা। তার স্বামী এতবড় চাকুরে ছিল। তাদের এলাকার ভাষায়, হাতি ল্যাটলেও (বসলেও) গাধার চেয়েও উঁচু। তবে এটা ঠিক, আজ যে ঐশ্বর্য ও প্রতিষ্ঠা তাকে ঘিরে রেখেছে তা হয়তো থাকত না যেমন, এই একাকিত্বও তেমনি তার নাগাল পেত না। ‘কী ভাবছি এসব’ – রাহেলা তার ভাবনার গতিপ্রবাহ দেখে  নিজেই বিস্মিত হয়। ওই রাবণের চিতার চেয়ে এই একাকিত্ব ঢের মনোরম। তার জীবনের সবচেয়ে করোজ্জ্বল সময়গুলোই তার কেটে গেছে শ্বশুরবাড়ির স্যাঁতসেঁতে ঘরগুলোতে। ফজরের আজান দেওয়ার পরপর উঠে পড়তে হতো। ধোয়াপুছা, রান্নাবান্না সব সেরে ৮টার ভেতর রওনা দিতে হতো কলেজের পথে। সবার খাবার সাজানো থাকত টেবিলে; শুধু তারটা ছাড়া। রান্না করতে করতে এক টুকরো রুটি কখনো মুখে পুরেছে, কখনোবা তাও হয়নি, তা-ই নিয়ে বেরিয়ে পড়েছে বাসা থেকে। কই কেউ তো খোঁজটাও নিত না। অথচ তার বাবা ম্যাজিস্ট্রেট পাত্র দেখে আহ্লাদে আটখানা হয়ে মেয়ে বিয়ে দিয়েছিল। সেই ম্যাজিস্ট্রেট পয়সা খরচের ভয়ে দুমাসে একবার আসত বাড়িতে। কখনো আরো দীর্ঘ বিরতিতে। কী পেয়েছে সে তার শ্বশুরবাড়ির তিন বছর সময়কালে? বরং সিরিঞ্জ দিয়ে রক্তচোষার মতো তার সর্বসত্তা বিলীন করে নিয়ে যাচ্ছিল বাড়ির সকলে। অনার্স ফাইনালটা দেওয়ার পর সে চাপ দিতে শুরু করে তার হাজব্যান্ডকে। সাময়িক মনোমালিন্যের শেষে আসে সেই মুক্তির মাহেন্দ্রক্ষণ। চাঁদপুরে মেঘনার পাড়ে ছোট্ট একটা কোয়ার্টারে শুরু হয় তাদের টুনাটুনির সংসার। এর মধ্যে হয়ে গেল তার কৃষি ব্যাংকের চাকরি। জীবনের পালে গতির দমকা হাওয়া এসে লাগতে লাগল। তার পর শুধু এগিয়ে যাওয়া। একসময় রাহেলার হাজব্যান্ডও রিয়েলাইজ করল, মাটি কামড়ে পেছন পড়ে থাকার কোনো মানে নেই। ততদিনে শাশুড়িও গত হয়েছেন। ফলে সব সম্পর্কের জাল তারা গুটিয়ে নিতে থাকে ধীরে ধীরে।

রহিমাকে হাত ধরে টেনে বসায় রাহেলা।

– তা ইসমাইল মিয়া কেমন আছে?

রহিমা কথাটা কানে যেতে চমকে ওঠে। রাহেলা আগে তো তার স্বামীকে ইসমাইলভাই ডাকত, এখন মিয়া! মাগির ফুটানি কমেনি। তারপর বিনয়াবত ভাব করে বলে, আর কইয়েন না ভাবি, বিছানার লগে ল্যাইটা গেছে গো। বড়ো কষ্ট পাইতাছে মানুষটা। দুদিন পর মওলানা আইনা তওবা পড়াই, কিন্তু কিয়ের কী –

– তোমার পোলাপাইন কে কী করতেছে?

সংক্ষেপে তার সন্তানদের ইতিবৃত্ত তুলে ধরে রহিমা। শেষাংশে সেজো পুত্রের চাকরির তদ্বিরের প্রসঙ্গটি পেশ করে।

রাহেলা মনে মনে হাসে, তার ধারণাই সঠিক। কোনো ধান্ধা না থাকলে কেবল সহানুভূতি জানানোর জন্য আট ঘণ্টার ট্রেন জার্নি করে এদের আসার কথা নয়। কী সামান্য এদের চাওয়া? এরা তো ভালো করে চাইতেও জানেন না। সামান্য একটা প্রাইমারি স্কুলের চাকরির জন্য তার কাছে আসার মানে কী? ছেলেটা যেহেতু ডিগ্রি পাশ, চাইলে তো সে ব্যাংকেই একটা ছোটখাটো চাকরি নিয়ে দিতে পারে, যা দিয়ে স্কুলের চাকরি থেকে কয়েকগুণ বেশি পয়সা কামাতে পারবে।

– ভাবি সারা জীবনে কখনো আপনার কাছে কিছু চাই না …

– আচ্ছা ঠিক আছে রহিমা, ওর দায়িত্ব আমি নিলাম।

আশ্বস্ত এক মায়ের উজ্জ্বল মুখ দেখে রাহেলার ভালো লাগে। এভাবে কাটাকুটি খেলেই তাকে এগিয়ে যেতে হবে। তবে এত            সস্তায় সে একটা ঘুঁটি জিতে নেবে ভাবতেও পারেনি।

 

চার

ট্রলিভর্তি খাবার এলো। চিকেন ফ্রাই, পুডিন, মোরববা, ফল, পানীয়, বিস্কিট। আনন্দে রহিমার চোখের কোণ চকচক করে ওঠে। মনে মনে ভাবে, রাতের খাবারের আমন্ত্রণও নিশ্চয়ই পাওয়া যাবে।

– ভাবি এতবড় বাসায় একলা থাকতে আপনার ডর লাগে না।

– ডর লাগে না, তবে বড়ো একা লাগে।

রহিমা মনে মনে বলে, একাই তো থাকতে চাইছি লা, এহন ঠ্যালা সামলাও।

– ঢাকায় এলে তোমরা এখন থেইক্যা এইখানে উইঠ্যো, কেমন –

– জে ভাবি। তা ভাবি ভাইজানের পয়সাকড়ির কী করবেন ভাবছেন কিছু। তিনি তো আর –

– হ্যাঁ রে রহিমা, তোমার ভাইয়ের ইচ্ছা ছিল মানুষের জন্য কিছু করে যাওয়ার। আমি ভাবছি তার ফিক্সডের টাকা দিয়ে একটা ট্রাস্ট খুলব। গরিব বাচ্চাকাচ্চাদের…

রহিমা মনে মনে বলে, আপন আত্মীয়স্বজনের জন্য কিছু করবেন না, করবেন গিয়া মানুষের জন্য, যতসব ভাওতাবাজি। চাইলে তো নুরুভাইরে কিছু টাকা দিয়ে সাহায্য করতে পারো। বেচারার দুইটা কিডনিই নষ্ট হইয়া গেছে। থাউক তোমার জামাইর টাকা। তুমি যা ইচ্ছা তাই করো, আমার কী? এখন এসব নিয়া কথা বলতে গেলে পোলাটার চাকরিটা ফসকাইয়া যাইতে পারে, থাক।

রহিমা যখন চিন্তার পুকুর থেকে ডুব মেরে উঠে আসে, তখন দেখে  চোখের সামনে তার মৃত ভাইয়ের সারি সারি হাস্যোজ্জ্বল।

এই দেখো, তোমার ভাই যখন ডিসি ছিল… রাহেলা ফ্যামিলি অ্যালবামের পাতাগুলো উলটে রহিমাকে দেখায়। রহিমা যত না জ্বলে-পোড়ে, তার চেয়ে বেশি জ্বলে তার সেজো ছেলে। এতবড় একটা মানুষ তার মামা ছিল; কিন্তু সে কখনো তাকে সামনাসামনি দেখতে পারল না। আফসোস। সব নষ্টের গোঁড়া তার মায়ের বাচালতা। একটু সবার সঙ্গে ম্যানেজ করে চললে এই মামার থেকে কতই না সুযোগ-সুবিধা নেওয়া যেত, একবার ভেবেছ? নিজেকে নিজে প্রশ্ন করে মৃত মামার হতভাগ্য ভাগ্নে।

– এই ছবিটা তোমার ভাই যখন ফিশারিজ মিনিস্ট্রিতে ছিল -। নরওয়েতে গিয়েছিল।

– মামি এটা তো প্যারিসের ছবি। আইফেল টাওয়ার।

– হুম। তোমার মামা তখন কালচারাল মিনিস্ট্রির জেএস।

রহিমার ছেলে প্রয়াত মামার ছবি দেখে আর অবাক হয়। কী এক চাকরি করত তারা মামা – সকল বিষয়ে ছিলেন পন্ডিত। সব মন্ত্রণালয়ে সব বিষয়ে সরকারকে মন্ত্রণা দিত। এর বিনিময়ে সরকার খুশি হয়ে তাকে পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে নিয়ে বেরাত। কী মহিমাময় চাকরি! মামি তার আগ্রহ দেখে ওয়ারড্রোব থেকে ঢাউস ঢাউস একেকটা অ্যালবাম বের করে। মামি একা টেনে বের করতে পারে না। রহিমার ছেলে তাকে সাহায্য করে। রাহেলার কান্ডকারখানা দেখে রহিমার ভেতরটা জ্বলে জ্বলে ওঠে। যেন কেউ কার্বলিক অ্যাসিড দিয়ে তার বুকে যন্ত্রণার উল্কি ফুটাচ্ছে। অ্যালবাম নয় যেন একেকটা ভারী ভারী কাগজের কফিন নামাচ্ছে রাহেলা। যেখানে তার মৃত ভাইয়ের খন্ড খন্ড জীবন পোরা আছে। রহিমার মনটা বিদ্রোহী হয়ে ওঠে। তার ভাইকে এভাবে ঢং করে পুষে রাখার মানে কী? যখন বেঁচে থাকতে মানুষটা এক রত্তি শান্তি দিলে না, বাধ্য হলো সুইসাইডের পথ বেছে নিতে। সে তার বিরক্তি আর চেপে রাখতে পারে না। কখন যেন অবচেতনেই বলে ওঠে – ‘মানুষটারে যহন বাচাইতে পারলা না, এহন কফিন টাইন্যা কী অইব।’

সোশ্যাল মিডিয়া

নিউসলেটার