কাজুও ইশিগুরো এবং ভাসমান পৃথিবীর সাহিত্য

লেখক: মোজাফ্ফর হোসেন

যথারীতি এবারো একটা চমক দেখাল নোবেল সাহিত্য কমিটি। তবে ইতিবাচক চমক বটে। বাজিকর ও নামিদামি পত্রিকা থেকে যে সংক্ষিপ্ত তালিকা ছড়িয়ে পড়েছিল বিশ্বমিডিয়া এবং সাহিত্যের পাঠক ও লেখকদের মুখে মুখে, সে-তালিকার প্রায় বাইরে থেকে সাহিত্যে নোবেল পেলেন জাপানি ব্রিটিশ লেখক কাজুও ইশিগুরো (জন্ম ১৯৫৪)। তবে গত বছর নোবেল সাহিত্য কমিটি সংগীতের মানুষ বব ডিলানকে এবং তার আগের বছর বেলারুশীয় সাংবাদিক-লেখক সভেতলানা আলেক্সিয়েভিচকে সাহিত্যে নোবেল প্রদানের পর এবার অন্তত ততবড় ‘বিস্ময়কর’ কোনো সিদ্ধান্ত যে তাঁরা নেননি, সেটা বলা চলে। কাজুও ইশিগুরো বাংলাদেশে তত পরিচিত ও পঠিত লেখক নন বটে, তবে পশ্চিমা সাহিত্যবিশ্বে সাম্প্রতিক আলোচিত সিরিয়াস ধারার লেখকদের ভেতর তিনি অন্যতম। ইশিগুরো একাধারে ঔপন্যাসিক, ছোটগল্পকার, চিত্রনাট্যকার, গীতিকার ও কলামলেখক। তাঁর একাধিক উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত চলচ্চিত্র বক্স অফিস হিট হয়েছে। নোবেল জয়ের আগে তিনি ব্রিটেনের গুরুত্বপূর্ণ সব পুরস্কার ও সম্মাননা পেয়েছেন। অফিসার অব দ্য অর্ডার অব দ্য ব্রিটিশ এম্পারার (OBE), ফেলো অব দ্য রয়েল সোসাইটি অব আর্টস (FRSA), ফেলো অব দ্য রয়েল সোসাইটি অফ লিটারেচারের (OBE) মতো নামকরা সব সম্মাননা। পেয়েছেন উইনিফ্রেড হল্টবি মেমোরিয়াল প্রাইজ (১৯৮২), হোয়াটব্রেইড প্রাইজ (১৯৮৬), বুকার প্রাইজ (১৯৮৯) স্যাভালি দ্যু লর্দে দে আর্টস এত্যুদেস লেটার (১৯৯৮) প্রভৃতি। ২০০৫ সালে টাইম ম্যাগাজিন তাঁর নেভার লেট মি গো উপন্যাসকে শ্রেষ্ঠ একশ ইংরেজি উপন্যাসের তালিকায় ঠাঁই দিয়েছে। ২০০৮ সালে দ্য টাইমস ম্যাগাজিন তাঁকে ব্রিটেনের সেরা ৫০ লেখকের তালিকায় রেখেছে।

জাপানে জন্ম হলেও ইশিগুরো ব্রিটিশ লেখক হিসেবেই পরিচিত। পাঁচ বছর বয়সে পরিবারের সঙ্গে ইংল্যান্ডের গিল্ডফোর্ডে আসেন। পরবর্তী ২৯ বছর তিনি জাপানে যাননি। জাপানি ভাষা ও সংস্কৃতির সঙ্গে তাঁর বিচ্ছেদই ঘটে একরকমের, যে-কারণে হয়তো জাপানি পাঠকদের কাছে স্বদেশি লেখক হিসেবে তিনি ততটা পরিচিত নন। সংবাদমাধ্যম রয়টার্স জানাচ্ছে, ‘Far from the super-star status that his erstwhile compatriot – and perpetual Nobel favorite – Haruki Murakami enjoys, Ishiguro is not a household name in Japan.’ [‘Who’s Kazuo Ishiguro?’ Japan asks, but celebrates Nobel author as its own] ওসাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক তমকি মাসুকা বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, ‘আমরা এই ধরনের সাহিত্যিকের নাম এবারই প্রথম শুনলাম। ছোটবেলা থেকে অনেক সাহিত্যিকের বই পড়া হলেও কাজুও ইশিগুরোর কোনো বই আমরা পাইনি।’ ওমেডা ‘নিহোন বুক স্টোরে’র কর্মকর্তা নিশিচি ওগামি এই অনলাইন সংবাদমাধ্যমকে জানান, ‘আমরা এখানে প্রায় ৫০ বছর ধরে বই বিক্রি করছি, কোনোদিন ইশিগুরো নামের কোনো লেখকের বই পাইনি।’ এই প্রতিবেদন থেকে আমরা আরো জানতে পারি, স্বদেশি লেখক হিসেবে মুরাকামি নোবেল না পাওয়ায় তাঁরা বরং অসন্তুষ্টই হয়েছেন।

 

দুই

২৭ বছর বয়সে ইশিগুরোর প্রথম উপন্যাস অ্যা পেইল ভিউ অব হিলস (১৯৮২) প্রকাশিত হয়। উপন্যাসটির সেটিং ইংল্যান্ড, কিন্তু প্রেক্ষাপট নাগাসাকি শহর। প্রধান চরিত্র ইতসুকো মধ্যবয়সী জাপানি নারী, একাকী বাস করছে ইংল্যান্ডে। মেয়ে নিকি তার কাছে বেড়াতে এসেছে। সম্প্রতি ইতসুকোর বড় মেয়ে কেইকো আত্মহত্যা করেছে। নিকিকে ইতসুকো শোনাচ্ছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরপর নাগাসাকিতে তার প্রথম স্বামীর সঙ্গে থাকার সময়কার কথা এবং এক ব্রিটিশ পুরুষকে ভালোবেসে দেশান্তরি হওয়ার গল্প। তখন সে অমত্মঃসত্ত্বা, জন্ম হয় কেইকোর। কেইকো বড় হয়ে একাকী এবং পরিণামে অসামাজিক হয়ে ওঠে। একপর্যায়ে আত্মহত্যা করে। অন্যদিকে ইংল্যান্ডে জন্ম হয় নিকির। আয়রনি হলো, ইতসুকো নিকির জন্য ব্রিটিশ কোনো নাম রাখতে চায়, কারণ সে জানে এই ভাসমান পৃথিবীতে পুরনো পরিচয় ঝেড়ে ফেলতে হবে, অন্যদিকে স্বামী ব্রিটিশ হয়েও জাপানি নাম রাখার পক্ষে অবস্থান নেয়। ইতসুকোর কাছ থেকে জানা যাচ্ছে, তার প্রতিবেশী বন্ধুনারী সাচিকো ও তার মেয়ে মারিকোর গল্পও। সাচিকো বিশ্বযুদ্ধে বিত্তশালী থেকে পথে বসে গেছে। সে আর স্বদেশে কোনো ভরসা খুঁজে পাচ্ছে না। নতুন জীবনের সন্ধানে চলে যাবে আমেরিকায়। জানায় : ‘Mariko would be happier there. America is a far better place for a young girl to grow up. Out there, she could do all kinds of things with her life. She could become a business girl. Or she could study painting at college and become an artist. All these things are much easier in America, Etsuko. Japan is no place for a girl.’ কিন্তু আমরা দেখি, শিশু মারিকো তার প্রিয় বেড়ালকে ছেড়ে আসতে চায় না। ভিনদেশে স্বপ্নপূরণের জন্য বেড়ালের বাচ্চাকে জলে ডুবিয়ে মারতে গিয়ে মারিকোকে সাচিকো এক হারিয়ে যাওয়া পৃথিবী থেকে কল্পজগতে জেগে ওঠা পৃথিবীর গল্প বোনে, ভরসা খোঁজে : ‘Aren’t you old enough yet to see there are other things besides these filthy little animals? You’ll just have to grow up a little. You simply can’t have these sentimental attachments forever’. কিন্তু শেষ পর্যন্ত একটা প্রশ্নই বড় হয়ে ওঠে – ইতসুকো ইংল্যান্ডে, সাচিকো আমেরিকায় এসে কি তাদের নিজেদের কোনো দেশ পেয়েছে? কিংবা ধরে রাখতে পেরেছে তাদের জন্মভূমিকে?

দ্বিতীয় উপন্যাস অ্যান আর্টিস্ট অফ দি ফ্লোটিং ওয়ার্ল্ড (১৯৮৬) দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর জাপানকে উপজীব্য করে লেখা। উপন্যাসটি ব্রিটেনের সম্মানজনক হুইটব্রেড বুক অব দ্য ইয়ার পুরস্কার পায়। উপন্যাসে বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী এক জাপানি রাজাকারের ভূমিকায় দেখি চিত্রশিল্পী মাসুজি ওনোকে। তার জীবনটা যুদ্ধের কারণে বদলে গেছে। যুদ্ধোত্তর জাপানে শিল্পের প্রতি মানুষের মমত্ববোধ কমে যায়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জাপানের পরাজয়ের পেছনে দায়ীদের ভেতর ওনো অন্যতম। ‘শিল্পী’ হিসেবে সে মানবতার পক্ষে না থেকে অশুভর পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। ওনো নিজের ছবি আঁকার কৌশলের কথা বলতে চায়, ছবির বিষয়বস্তু তার কাছে গুরুত্বপূর্ণ কোনো বিষয় হয়ে ওঠে না। কারণ তার ছবি যুদ্ধ ও নাৎসিদের পক্ষে কথা বলে।

এ-দুটি উপন্যাস প্রকাশের পরপরই ইশিগুরোর নিরেট বাস্তববাদিতা ও ব্রিটিশদের আচরণের নিরপেক্ষ বিশেস্নষণের কারণে অনেকে তাঁকে এ-যুগের জেন অস্টেন বলে আখ্যায়িত করেন। নিজের সাহিত্যশৈলী তৈরিতে অস্টেনের ভূমিকা তিনি স্বীকারও করেছেন। তিনি বলেন : ‘শার্লট ব্রন্টি’র ভিলেতে এবং জেন আয়ার, দস্তয়েভস্কির চারটি বড় উপন্যাস, শেখভের ছোটগল্প, টলস্টয়ের যুদ্ধ ও শান্তি, বস্ন্যাক হাউজ; আর জেন অস্টেনের কমপক্ষে পাঁচ থেকে ছয়টি উপন্যাস – আপনি যদি পড়ে ফেলেন তাহলে মনে করবেন আপনার একটি মজবুত ভিত্তি তৈরি হয়ে গেছে।’ [সাক্ষাৎকার : প্যারিস রিভিউ, সুসান হ্যানয়েল] তবে ইশিগুরোর সঙ্গে অস্টেনের পার্থক্য হলো, ইশিগুরোর গদ্য আরো সংযমী এবং বয়নরীতি অনেক বেশি সূক্ষ্ম। তাঁর চমৎকারিত্ব হলো দৈনন্দিন জীবনকে উপভোগ্য করে তোলার ভেতরে। তরঙ্গহীন স্থির গদ্যের সঙ্গে ন্যারেটিভ শক্তির মিশ্রণে এ-আবহ তিনি তৈরি করেন।

ইশিগুরো সবচেয়ে বেশি সফলতা পান তৃতীয় উপন্যাস দ্য রিমেইন্স অব দ্য ডেতে (১৯৮৯) এসে। দশ লাখেরও বেশি কপি বিক্রি হয়। তার চেয়ে বড় কথা, এ-উপন্যাস দিয়ে তিনি বুকার প্রাইজ জিতে নেন। উপন্যাসটি সেলুলয়েডের ফিতায় বন্দি হয়। প্রখ্যাত অভিনেতা অ্যান্থনি হপকিন্স মূল চরিত্রে অভিনয় করেন। আগের দুটি উপন্যাসের মতো এটিও প্রথম ব্যক্তির বয়ানে (First person narrative) লেখা। ইশিগুরোর অধিকাংশ লেখায় এই বর্ণনারীতি চোখে পড়ে।

চতুর্থ উপন্যাস আনকসোলড (১৯৯৫)। একজন পিয়ানো বাদকের তিনদিনের ইউরোপ সফর নিয়ে পাঁচশো পৃষ্ঠার এই উপন্যাস বিখ্যাত শৈলীর কারণে। অতিকথনে ভরা। কোথাও কোথাও অকারণ দীর্ঘ আলাপ। কয়েক সেকেন্ডের লিফটের যাত্রায় একজন কথা বলছে টানা চার পৃষ্ঠাজুড়ে। রহস্যময়তা ভাষার বিন্যাসে। স্বপ্নদৃশ্য হঠাৎ চলে আসছে। শৈশব বর্তমান ভেঙেচুরে মিশে যাচ্ছে অচেনা জগতে। চেতনার প্রবহমানতা উপন্যাসটির ভেতর ঘোর তৈরি করেছে। এই উপন্যাসের কারণেই হয়তো ইশিগুরোকে কাফকা ও অস্টেনের মিশ্রণ বলে মন্তব্য করেছে নোবেল কমিটি।

এরপর প্রকাশিত হয় আরো দুটি উপন্যাস : হোয়েন উই অয়্যার অরফানস (২০০০) এবং নেভার লেট মি গো (২০০৫)। এ-দুটিও পাঠকপ্রিয়তা অর্জন করে। তবে হোয়েন উই অয়্যার অরফানস উপন্যাসটিকে ইশিগুরোর দুর্বলতম উপন্যাস বলে মনে করা হয়। ইশিগুরো নিজেও এটা তাঁর সেরা কাজ নয় বলে ঘোষণা দিয়েছেন। ডিটেকটিভধর্মী এই উপন্যাসে দেখা যায় ক্রিস্টোফার ব্যাংকস ব্রিটিশ হলেও তার শৈশব কেটেছে চীনে। বাবা ছিল আফিম ব্যবসায়ী। কয়েকদিনের ব্যবধানে তার বাবা-মা দুজনেই নিখোঁজ হন। ক্রিস্টোফার ইংল্যান্ডে চলে আসে। বড় হলে সে গোয়েন্দাগিরি শুরু করে। মা ও বাবার খোঁজে আসে সাংহাইতে। এখানে সে খুব কাছ থেকে যুদ্ধ-আর্তনাদ দেখে। ক্রিস্টোফার জানতে পারে, ওর মাকে অপহরণ করে নিয়ে যায় এক চীনা দস্যু। ওর মায়ের অপরাধ ইংরেজদের আফিম কারবারের বিরোধিতা করা। অপহরণের পর চলে অকথ্য অত্যাচার। আত্মহত্যা করে এড়াতে পারত এসব, কিন্তু শিশু ক্রিস্টোফারের ভবিষ্যতের কথা ভেবে রাজি হয়ে যান এক চুক্তিতে, যেখানে ওর বন্দিত্বের বিনিময়ে ওই দস্যু বহন করবে শিশুটির শিক্ষা ও জীবিকা নির্বাহের যাবতীয় ব্যয়। অন্যান্য উপন্যাসের মতো এই উপন্যাসেরও স্মৃতিসিক্ত হওয়ার বিষয়টি নানাভাবে আছে। ইশিগুরো নিজেও জানাচ্ছেন সে-কথা : নস্টালজিয়া মানুষের মনের এক প্রবল শক্তি। আমার বইগুলোতে নস্টালজিয়া ভর করে আছে, শেষ বইটিতে, হোয়েন উই ওয়্যার অরফানসে, একজন লোক নস্টালজিয়ায় আক্রান্ত হতে থাকে; বিষণ্ণ হতে থাকে। [সাক্ষাৎকার : এশিয়াটিক সোসাইটি, জোয়ান একোসেলা]

নেভার লেট মি গো ইশিগুরোর ডেসটোপিয়ান কল্পকাহিনি। উপন্যাসটি টাইম ম্যাগাজিনে বছরের শ্রেষ্ঠ উপন্যাস হিসেবে খেতাব পায়। বিংশ শতকের ইংরেজি ভাষায় লেখা শ্রেষ্ঠ একশ উপন্যাসের তালিকায় রাখা হয়। উপন্যাসটিকে এক মার্কিন সমালোচক কাফকা এবং বেকেটের কাজের সঙ্গে তুলনা করেছেন শুনে ইশিগুরো বলেন, ‘তিনি সম্ভবত এই ব্যাপারটি চিহ্নিত করতে চেয়েছেন – বিমূর্ততা; আমার লেখালেখির মধ্যে কাফকা ও বেকেটের মতো যে ব্যাপক বিমূর্ততা আছে তা যেন কেউ এড়িয়ে না যায়। আর এক্ষেত্রে তিনি সঠিক তুলনাটিই টেনেছেন। আমার সারা জীবনের লেখালেখিকে পাঠকদের আমি চূড়ান্ত রূপকের স্তর থেকে পড়তে বলেছি। রূপকের বাইরে গিয়ে আমি উপন্যাসের বিন্যাস ঠিক করতে পারি না, এরকম আরো লেখক আছেন, যেমন – সল বেলো। আমার কাছে বিন্যাস হচ্ছে উপন্যাস লিখবার কয়েকটি কৌশলের একটি। আমি শেষ পর্যন্ত বিন্যাসকেই বেছে নিই।’ [সাক্ষাৎকার : প্যারিস রিভিউ, অনুবাদ : এমদাদ রহমান]

তাঁর শেষ উপন্যাস দ্য বেরিড জায়ান্ট (২০১৫)। এটি ফ্যান্টাসি উপন্যাস। প্রেক্ষাপট পনেরোশো বছর আগের মিথিক ইংল্যান্ড। ড্রাগন, দৈত্য, দুঃসাহসিক অভিযান, বিশ্বাসঘাতকতা, তলোয়ার যুদ্ধ ও জাদুবিদ্যার কারণে কিশোরদের জন্য উত্তেজক গল্প হলেও ইশিগুরো খুব কৌশলে তাঁর অন্যান্য উপন্যাসের মতো এখানেও স্মৃতি এবং অনুশোচনার বিষয়টি তুলে এনেছেন। দ্য গার্ডিয়ানের রিভিউতে বইটির প্রশংসা করে আলেক্স প্রিস্টন লেখেন, ‘Focusing on one single reading of its story of mists and monsters, swords and sorcery, reduces it to mere parable; it is much more than that. It is a profound examination of memory and guilt, of the way we recall past trauma en masse. The Buried Giant is Game of Thrones with a conscience, The Sword in the Stone for the age of the trauma industry, a beautiful, heartbreaking book about the duty to remember and the urge to forget.’ ইশিগুরো নিজেও বলেছেন, ‘আমি স্মৃতির ঘোরে আচ্ছন্ন এক লেখক। পরবর্তীকালে আমি যার মুখোমুখি হবো তা হচ্ছে একটি পুরো জাতি কীভাবে কোনো কিছুকে স্মরণ করে কিংবা বিস্মৃত হয়; কিংবা কখন স্মরণ করা ভালো, কখন ভালো ভুলে যাওয়া!’ [সাক্ষাৎকার : প্যারিস রিভিউ, অনুবাদ : ওই]

ছোটগল্পকার হিসেবেও ইশিগুরোর পরিচিত ও খ্যাতি আছে। ২০০৯ সালে তাঁর প্রথম গল্পসংকলন নকটার্নস : ফাইভ স্টোরিজ অব মিউজিক অ্যান্ড নাইটফল প্রকাশিত হয়। সংকলনে স্থান পাওয়া গল্পগুলো এর আগে বিভিন্ন সময়ে নানা সংকলন ও পত্রিকায় মুদ্রিত হয়। শিরোনামে যেমনটি উলেস্নখ আছে, গ্রন্থের প্রতিটি গল্পে মিউজিক প্রসঙ্গ এসেছে এবং নাইটফলের আক্ষরিক না হলেও মেটাফরিক্যাল একটা অর্থ আছে। উপন্যাসের মতো গল্পেও আমরা মিশ্র সংস্কৃতি (Cross Culture) ও স্থানচ্যুতির (Displacement) বিষয়টি লক্ষ করি। চরিত্রগুলো নিজ দেশ ছেড়ে অন্য দেশে ক্যারিয়ার গড়ার স্বপ্নে বিভোর। ‘ক্রুনার’ গল্পে ভেনিস শহরে এক আমেরিকান কণ্ঠশিল্পী একজন পোলিশ ক্যাফে শিল্পীর সহগায়ক হিসেবে কাজ করছে। ‘কাম রেইন অর কাম শাইন’ গল্পের প্রেক্ষাপট লন্ডন শহর। ‘মেলভার্ন হিলস’ গল্পে এক গিটারবাদক-কণ্ঠশিল্পী রক সংগীতের জগতে ব্যর্থ হয়ে লন্ডন ছেড়ে মফস্বল শহরের এক ক্যাফেতে গিয়ে গান করছে। সেখানে তার সঙ্গে এক সুইস পর্যটকের সাক্ষাৎ হয়। ‘নকটার্ন’ গল্পের দুজন প্রধান চরিত্র পস্নাস্টিক সার্জারি করে নিজেদের চেহারা পরিবর্তন করে – একজন খ্যাতনামা হতে, অন্যজন খ্যাতি ধরে রাখতে। ‘সিলিস্টস’ গল্পটি এক হাঙ্গেরীয় ও এক আমেরিকান সিলো বাদকের। উপন্যাস-ছোটগল্পের বাইরে ইশিগুরো চিত্রনাট্য, টেলিভিশন নাটক এবং গান লিখেছেন। খ্যাতিমান আমেরিকান জ্যাজ গায়িকা স্টেসি কেন্টের সঙ্গে করা তাঁর গানের সিডি ‘ব্রেকফাস্ট অন দি মর্নিং ট্রাম’ ফ্রান্সে সবচেয়ে বেশি বিক্রীত জ্যাজ অ্যালবাম হিসেবে তালিকাভুক্ত হয়েছে।

 

তিন

ইশিগুরো ডায়াস্পোরা লেখক। বর্তমানে ইউরোপ এবং আমেরিকায় ডায়াস্পোরা লেখকদের রাজত্ব চলছে বলা চলে। ভারতীয় বংশোদ্ভূত শক্তিশালী দুই লেখক সালমান রুশদি ও ভিএস নাইপলের কথা আমরা জানি। আফ্রিকা, অস্ট্রেলিয়া এবং ভারতসহ এশিয়ার অন্যান্য দেশের ইংরেজি ভাষাভাষী অনেক লেখক ইউরোপ এবং আমেরিকায় বসে লিখছেন। ইশিগুরোর সমসাময়িক চীনা বংশোদ্ভূত আমেরিকান কথাসাহিত্যিক অ্যামি তানের (জন্ম ১৯৫২) কথাও স্মরণ করা যেতে পারে। তাঁর বাবা জন তান চীনা গৃহযুদ্ধ থেকে বাঁচতে পরিবার নিয়ে আমেরিকায় চলে যান। পঁয়ত্রিশ বছর বয়সে তান প্রথমবারের মতো চীন সফর করেন। প্রথম উপন্যাস দ্য জয় লাক ক্লাব লেখেন তাঁর মায়ের চীন-জীবনের গল্প নিয়ে। পরবর্তীকালে প্রকাশিত তাঁর প্রায় সব লেখাতেই নানাভাবে চীন উঠে এসেছে। মিশ্র সংস্কৃতির উপস্থিতি ঘটেছে।

ডায়াস্পোরা লেখকদের ক্ষেত্রে আমরা দেখছি তাঁদের স্বদেশ বা পিতৃমাতৃভূমের চেয়ে ইউরোপ-আমেরিকায় গ্রহণযোগ্যতা বেশি। ডায়াস্পোরা লেখকদের এই গ্রহণযোগ্যতা তৈরির কারণ দর্শিয়ে ইশিগুরো বলছেন : ‘Part of the reason that I was able to make my career as a novelist very rapidly in Britain in the 1980s was because there was – just at the time when I started to write – a great hunger for this kind of new internationalism…publishers in London and literary critics and journalists in London suddenly wanted to discover a new generation of writers who would be quite different from your typical older generation of English writers…And I think I was almost kind of allowed onto the literary scene because I seemed to be an international writer’.

ডায়াস্পোরা লেখকদের লেখায় আমরা দেখি নিজের ইতিহাস অন্বেষণ বা আত্মপরিচয় সংকটের বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে ফুটে ওঠে। ব্রিটিশ বাংলাদেশি নৃত্যশিল্পী আকরাম খান তাঁর দেশ নাটকে বলেছিলেন, ‘বাংলাদেশ আর আমার দেশ নয়, আর ইংল্যান্ড কখনোই সেটা হবে না।’ সংকটটা এখানেই। স্থানচ্যুতির সঙ্গে সঙ্গে অতীত থেকে সরে আসা। এই সংকট থেকেই হয়তো ইশিগুরোর সাম্প্রতিকতম উপন্যাস দ্য বেরিড জায়ান্টে বলা হচ্ছে, ‘She went on speaking, about how this land had become cursed with a mist of forgetfulness,’ Beatrice tells us of this woman. ‘And then she asked me: ‘How will you and your husband prove your love for each other when you can’t remember the past you’ve shared?’ And I’ve been thinking about it ever since. Sometimes I think of it and it makes me so afraid.’

স্বদেশ থেকে দূরে অবস্থান করে লেখার আবার একটা সুবিধাও আছে। ডায়াস্পোরা লেখকদের যেমন স্বজাতির কাছে জবাবদিহি করতে হয় না, তেমনি জাতীয়তাবাদী চেতনার জায়গা থেকে দায়বদ্ধতা থাকে না যে-দেশের পরিচয়ে থাকছেন সে-দেশের কাছেও। ফলে তাঁরা পাশ্চাত্যের প্রাধান্যের বিরুদ্ধে অকপটে লড়াই করতে পারেন। যেটা রুশদি তাঁর The Empire writes back with a vengeance-এ করেছেন। আবার পিতৃদেশের শাসকগোষ্ঠীর বিপক্ষেও তাঁদের লিখতে সমস্যা হয় না। রুশদি যেমন বলছেন, দূর থেকেই স্বদেশ নিয়ে নির্মোহভাবে লেখা সম্ভব। প্রকৃত ইতিহাস আবেগ থেকে আসে না, আসে ঐতিহাসিক বিচ্ছিন্নতা থেকে। যেমন ইশিগুরো বলছেন, ‘My very lack of authority and lack of knowledge about Japan, I think, forced me into…thinking of myself as a kind of homeless writer. I had no obvious social role because I wasn’t a very English englishman and I wasn’t a very Japanese either. And so I had no clear role, no society or country to speak for or write about. Nobody’s history seemed to be my history.’ (Ishiguro, quoted in Oe and Ishiguro)

আবার কারো কারো ক্ষেত্রে উলটোটাও ঘটার সম্ভাবনা থাকে – পিতৃমাতৃদেশ এবং নিজের বর্তমান দেশ দুটোর কাছেই নিজেকে প্রমাণ করতে হয় তাদের আপনজন হিসেবে। প্রতিনিয়ত এই প্রমাণ করার বিষয়টি থাকে, কেননা পিতৃমাতৃদেশের জনগণ এবং নিজ দেশের জনগণ উভয়েই তাঁকে সন্দেহের চোখে দেখে। ফলে একটা মনস্তাত্ত্বিক এবং অসিত্মত্বগত সংকট তৈরি হয়, যার প্রভাব তাঁদের লেখালেখিতে গিয়ে পড়ে। যেটা পরিষ্কারভাবে ইশিগুরোর লেখায় পড়েছে। বিল অ্যাশক্রফট ও সহযোগীরা The Empire writes back গ্রন্থে লিখছেন : A characteristic of dominated literatures is an inevitable tendency towards subversion, and a study of the subversive strategies employed by post-colonial writers would reveal both the configuration of domination and the imaginative and creative responses to this condition.

তবে সকলের ক্ষেত্রে বিষয়টা আসে নিজের একটা অতীত এবং তার পরিপ্রেক্ষেতেশক্ত করে একটা বর্তমানকে দাঁড় করানোর প্রয়াস থেকে। যেমন, মিডনাইটস চিলড্রেন লেখার প্রেক্ষাপট হিসেবে সালমান রুশদি তাঁর ‘ইমেজারি হোমল্যান্ডস’ গদ্যে জানাচ্ছেন, ‘আমি কতখানি আমার অতীতকে ফিরে পেতে চাই, ফ্যামিলি অ্যালবামের আবছা হয়ে আসা ধূসর ছবিগুলোর অতীত নয়, সম্পূর্ণটা, সিনেমাস্কোপে এবং বর্ণাঢ্য টেকনিকালারে। বম্বে শহরটা বিদেশিদের তৈরি, জমি অধিগ্রহণ করে, বসতের উপযুক্ত করে নিয়ে ওরা শহরটা বানিয়েছিল। এতদিন দূরে দূরে থেকে প্রায় ওই একই অভিধা আমাকেও দেওয়া যায়, এবং দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতে শুরু করলাম যে, আমারও একটা শহর, একটা ইতিহাস আছে, যা আমি ফের অধিগ্রহণ করতে পারি। যেসব লেখকের পরিস্থিতি আমারই মতো, দেশান্তরিত, হয় পাড়ি জমিয়েছে, নতুবা সেখানকার অভিবাসী, তাদের হয়তো মাঝেমাঝেই কিছু একটা হারানোর বোধ ফিরে ফিরেই হয়, কিছু একটা ফিরে পাওয়ার ইচ্ছা হয়, ফিরে দেখার ইচ্ছা হয়, অথচ সেগুলো নেহাতই মূল্যহীন বলে সাব্যস্ত হওয়ার ঝুঁকিও থাকে। যদি পেছন ফিরে তাকাতেই হয়, এটা জেনে রেখে তা করাই ভালো যে, অবশ্য তাতে আরো গভীর অনিশ্চয়তার সৃষ্টি হয় – এই যে আমরা সশরীরে ভারতে এখন নেই, অনিবার্যভাবে এর অর্থ হলো, ঠিক যে-জিনিসটা আমরা হারিয়েছি সেটা আর ফিরে পাওয়া সম্ভব নয়; এককথায়, আমরা তৈরি করে বসব কাহিনি, সত্যিকারের শহর বা গ্রাম নয়, বরং এমন শহর বা গ্রাম যা কোথাও দেখা যায় না, কল্পনায় স্বদেশ, অনেকগুলো মনগড়া ভারত।’ [কল্পনায় স্বভূমি, অনুবাদ : অভিজিৎ মুখার্জি]

উক্তিটা একটু দীর্ঘ হলেও ইশিগুরোকে বা ভাসমান পৃথিবীর সাহিত্য-প্রবণতা বোঝার জন্য জরুরি। ইশিগুরো নিজেও বলছেন, ‘…প্রথমদিকে যখন আমি উপন্যাস লিখতে শুরু করি, জাপানের পটভূমিতেই শুরু করেছিলাম; এটা করার পেছনে কিছু ব্যক্তিগত কারণও ছিল; আবেগের তাড়নায় আমি চাইতাম আমার নিজস্ব জাপানকে আমি আমার মতো করে নির্মাণ করব; এবং তাই করতে চেয়েছি।’ [সাক্ষাৎকার : গাবি উড, দ্য টেলিগ্রাফ]

তবে রুশদির সঙ্গে ইশিগুরোর ইতিহাস-চেতনায় একটু ফারাক থাকা স্বাভাবিক। কেননা পাশ্চাত্যের উপনিবেশ হয়ে জাপানকে তত দীর্ঘ সময় কাটাতে হয়নি। তাছাড়া জাপান আজ নিজেই বিশ্বের অন্যতম ক্ষমতাধর রাষ্ট্র। যদিও সাংস্কৃতিক কেন্দ্রটা জাপানের দখলে নেই। ইংরেজি ভাষার দাপটের জন্য শিল্প-সাহিত্যচর্চার তীর্থভূমি ইউরোপ-আমেরিকা। যে-কারণে জাপানের অনেক লেখক আজ ইংরেজিতে সাহিত্যচর্চা করছেন। কিংবা হারুকি মুরাকামির মতো কেউ কেউ জাপানি ভাষায় লিখলেও অনেক সময় মূলভাষার আগেই ইংরেজি সংস্করণটা বের হচ্ছে আন্তর্জাতিক বাজারে। ফলে ঔপনিবেশিকোত্তর ভারতীয় কিংবা আফ্রিকার লেখকদের, যাঁরা ইংরেজিতে লেখেন, তাঁদের সঙ্গে জাপানের ইংরেজি লেখা লেখকদের কিছুটা পার্থক্য আছে। ইশিগুরোর সঙ্গে যে-কারণে নাইপল-রুশদি-আচেবেদের একটা সরল পার্থক্য চোখে পড়ে।

ইশিগুরো স্মৃতি থেকে জাপানের নানা অনুষঙ্গ তুলে ধরছেন। সবসময় সেটি চিনুয়া আচেবেদের মতো সচেতন ইতিহাস নির্মিতি নয়। আচেবে বলছেন – ‘আমি বুঝতে পারলাম আমাকে লেখক হতে হবে। আমাকে ঐতিহাসিক হতে হবে।’ [তর্জমায় : বিদ্যুত খোশনবীশ, সূত্র : দৈনিক অর্থনীতি প্রতিদিন] অর্থাৎ তিনি নিজেকে তাঁর জাতির মুখপাত্র হিসেবে গণ্য করছেন। তিনি লিখেছেন তাঁর জনগোষ্ঠীর প্রকৃত ইতিহাস। আচেবে এমন এক জনগোষ্ঠীর লেখক, যাদের ইতিহাস লেখা হয়েছে ইউরোপীয়দের দৃষ্টি দিয়ে। অর্থাৎ শোষকশ্রেণির হাত দিয়ে তা রচিত। কাজেই প্রকৃত ইতিহাস সেখানে নেই। থাকার কথাও নয় – সেই কথাই বলছেন চিপিউয়া এলডাল – ‘When other people tell your story, it always comes out crooked.’ এখানে ইতিহাস মানে শুধু রাজনৈতিক ব্যাপার নয়, সঙ্গে শিল্প-সাহিত্য ও সংস্কৃতি জড়িত। কিন্তু ইশিগুরো সেই দায়িত্ব নিয়ে লিখতে আসেননি। কারণ তিনি নিজেই নিজের ইতিহাস বর্ণনার নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে সন্দিহান। তিনি বলছেন, ‘Memory can be an unreliable thing’. অন্যত্র বলছেন, ‘As I say, I am sure these impressions are not accurate, but that is how the evening remains in my mind.’ আর এজন্যই তাঁকে তুলনা করা হচ্ছে মার্সেল প্রম্নসেত্মর সঙ্গে। যতটুকু স্মৃতি আছে, সেটা বাঁচিয়ে রাখা প্রয়োজন, নিজের বেঁচে থাকাটা অর্থপূর্ণ করে তুলতে; না পারলে উপভোগ্য করে তুলতে। যে-কারণে ইশিগুরোর অধিকাংশ লেখায় স্মৃতি মূল চালিকাশক্তি হিসেবে ঘুরেফিরে আসে। আসে জাপানের অনুষঙ্গ। ফলে রুশদি যেমন বলেন, ‘আমি যেটা লিখছি সেটা স্মৃতি থেকে লেখা একটা উপন্যাস, স্মৃতি নিয়েও বটে, যাতে করে এই উপন্যাসের ভারত হলো, নেহাতই ‘আমার’ ভারত, আমার বয়ানে, এরকম যে কোটি কোটি বয়ান হওয়া সম্ভব, নেহাতই তার মধ্যে একটা।’ [কল্পনায় স্বভূমি, অনুবাদ : অভিজিৎ মুখার্জি] সেই কথার সূত্র ধরে বলা যেতে পারে, ইংল্যান্ডে বসে ইশিগুরো যে জাপানের চিত্র আঁকেন, সেটা তাঁর জাপান। আর কারো নয়।

ইশিগুরোর অ্যান আর্টিস্ট অফ দি ফ্লোটিং ওয়ার্ল্ড এক স্মৃতিভ্রষ্ট শিল্পীর গল্প। সে নিজের স্মৃতির সত্যতা সম্পর্কে নিশ্চিত না হয়েই তার গল্প বলছে। দ্য বেরিড জায়ান্টে এই কারণেই বলা হচ্ছে, ‘How will you and your husband prove your love for each other when you can’t remember the past you’ve shared?’ ভাসমান পৃথিবীতে এই বুদ্বুদসদৃশ স্মৃতিটুকু ধরার জন্য ইশিগুরো বারবার তাঁর উপন্যাসে জাপানে ফিরে যাচ্ছেন, যে-জাপানকে তিনি ঠিকমতো জানতে-চিনতে পারেননি, যে-জাপানের সাহিত্য-ঐতিহ্য থেকে কিছু শেখেননি উলেস্নখ করে তিনি বলছেন, ‘…জাপানি লেখকদের কোনো প্রভাব আমার ওপর নেই।… আমি যখনই অনুবাদে জাপানি বইগুলি পড়ি তখন ধাঁধায় পড়ে যাই, হতবুদ্ধি হয়ে পড়ি।’ [সাক্ষাৎকার : প্যারিস রিভিউ] এখান থেকে জন্ম নিচ্ছে একটা চতুর্থ বিশ্বের আখ্যান, যে-বিশ্বে সীমারেখা বলে কিছু থাকছে না, তৈরি হচ্ছে একটা ভাসমান পরিস্থিতি। ইউরোপ, আমেরিকা, এশিয়া, আফ্রিকা – সব কেন্দ্রচ্যুত হয়ে মিশে যাচ্ছে একে অন্যের ভেতর, তৈরি হচ্ছে অন্য এক আন্তর্জাতিকতা। সেখান থেকে জন্ম নিচ্ছে Transfictional identity। সেই অবস্থান থেকেই ইশিগুরো এক সাক্ষাৎকারে বলছেন, ‘I think I kind of unnecessarily put myself in the position of being a kind of international, if you like, quote-unquote writer. That’s how I kind of branded myself right from the start : as somebody who didn’t know Japan deeply, writing in English, whole books with only Japanese characters in. Trying to be part of the English literary scene like that…I kind of thought that was the role I was supposed to play. That’s why I was there. And so I think for that reason I perhaps am very conscious of the whole international thing.’ [সাক্ষাৎকার : লিন্ডা রিচার্ডস, জানুয়ারি ম্যাগাজিন]

আবার অন্যত্র বলছেন, ‘বর্তমানে ইংল্যান্ডই আমার দেশ, কিন্তু আমার বাবা-মা এখনো সুস্থভাবে বেঁচে আছেন। যখনই ফোনে তাদের সঙ্গে জাপানি ভাষায় কথা বলি, শুনলে মনে হবে সদ্য কথা বলতে শিখেছি। এখন এটাই আমার একমাত্র ভাষা, যা দিয়ে তাদের সঙ্গে আজো আমার সম্পর্ক অটুট আছে।’ [প্যারিস রিভিউ] এই ভাসমান পৃথিবীর লেখকদের ভাষা ও সাহিত্যশৈলী কোনো নির্দিষ্ট জাতিগোষ্ঠীর সাহিত্যের ঐতিহ্যের ভেতর থেকে তৈরি হয় না। প্রথম কথা হচ্ছে তাঁরা স্বদেশি ভাষা জানেন না, জানলেও সেটি সাহিত্য-উপযোগী জানা নয়; দ্বিতীয়ত, তাঁরা যে ইংরেজি ভাষায় লিখছেন সেটি নির্দিষ্ট করে ইউরোপ বা আমেরিকার কোনো নির্দিষ্ট অঞ্চলের ভাষা হিসেবে চেনার উপায় নেই। একইভাবে তাঁদের সাহিত্যিক-প্রবণতা স্বদেশি সাহিত্য-ঐতিহ্য থেকে আসে না। আসে বিশ্বের বিভিন্ন মহান লেখকের কাছ থেকে। যেটা ইশিগুরোর ক্ষেত্রে ঘটেছে বলে ইতিপূর্বে আলোচনা করেছি। এই কারণে ইশিগুরোর মতো লেখকের আন্তর্জাতিক লেখক হিসেবে বিবেচনা করতে সমস্যা থাকে না। তাঁদের এই আন্তর্জাতিকতা আসে স্বদেশের সঙ্গে বিচ্ছিন্নতাবোধ ও যে-দেশে থাকছেন সে-দেশের সঙ্গে পুরোপুরি একাত্ম হতে না পারার হতাশা থেকে। একটা বিকল্প সন্তুষ্টির জায়গা হিসেবে তাঁরা বেছে নেন বিশ্বজনীনতা বা বিশ্বনাগরিকতা (Cosmopolitanism), যাকে আমরা বলতে চাচ্ছি ভাসমান পৃথিবী বা চতুর্থ বিশ্বের সাহিত্য। এই নতুন বিশ্বের সাহিত্যে লেখক আর কারো মুখপাত্র হিসেবে বিবেচিত হচ্ছেন না। ভাসমান বিশ্বের আরেক কথক চেক বংশোদ্ভূত ফরাসি কথাসাহিত্যিক মিলান কুন্দেরা বলছেন, ‘ঔপন্যাসিক কারোরই মুখপাত্র নন। এমনকি নিজের ভাবনারও মুখপাত্র নন।’ [তর্জমায় : দুলাল আল মনসুর, দ্য আর্ট অব নভেল, কাগজ প্রকাশন, ২০০৭] কুন্দেরা নিশ্চয় তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোর ঔপন্যাসিকদের এর ভেতর ঢালাওভাবে বেঁধে নেননি। এখানে লেখকরা এখনো জাতির বিবেক বলে বিবেচিত হন। একসময় ইউরোপেও ডিকেন্স, দস্তয়েভস্কি এবং তলস্তয়রা লিখেছিলেন উঠতি মধ্যবিত্ত শ্রেণির মুখপাত্র হিসেবে। কিন্তু সময় বদলেছে, প্রযুক্তি ও মিডিয়ার বিপস্নবের ফলে লেখক আর ঘটমান বা ঘটিত ঘটনার বর্ণনাকারী নন। তাঁরা এখন ঘটনার কতগুলো সম্ভাব্যতা নিয়ে কথা বলছেন, যেটি ঘটতেও পারে, নাও পারে। ইউরোপ-আমেরিকায় অভিবাসী মানুষের সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নেটিভনেস বা স্থানীয়তার ধারণা বদলে যাচ্ছে – সাহিত্যকে যে সামাজিক বয়ান থেকে কাফকা অন্তর্বয়ানের দিকে টেনেছিলেন, সেটিকে এখন বিশ্ববয়ানের দিকে টানছেন এই ভাসমান পৃথিবীর লেখকরা।  r

শেয়ার করুন

Leave a Reply