কালিকাপ্রসাদ বন্ধু আমার

লেখক:

আশিস গোস্বামী

এটা কী হলো! কালিকা! কালিকাপ্রসাদ! এ-বছর আনন্দসভার আয়োজনে পার্বতী বাউলের অনুষ্ঠানে এলে না। গুচ্ছের টিকিট বিক্রির দায়িত্ব ঋতচেতার ঘাড়ে চাপিয়ে তুমি ব্যস্ত থাকলে তোমার কাজে। যাকে পারছ বলে বেড়িয়েছ, পার্বতীর গানের অনুষ্ঠান এত ছোট হলে কেন করছে আনন্দসভা? পার্বতীর গান শোনার মানুষ তো অনেক। আর তুমিই প্রথম চিনিয়েছিলে আমাকে পার্বতীকে। বিশ্বাস করতে, পার্বতীর গান শুনলে ঈশ্বরদর্শন হয়। তুমি কি সেই ঈশ্বরের কাছে চলে গেলে এমন অকস্মাৎ! তোমার চলে যাওয়া কোন শব্দ দিয়ে নথিবদ্ধ করব বলো? আমি তো গান জানি না। গানবিশারদ বন্ধু আমার। তুমিই বলে দাও কোনো এক চিরায়ত শব্দ, যে-শব্দ দিয়ে তোমার জন্য শোক প্রকাশ করব। তুমি আপামর মানুষের সেলিব্রিটি। কিন্তু আমার আর আমাদের বন্ধুদের শুধুই বন্ধু। বিশ্বনাথ, গৌতম, দেবু, রাজীব, বিমল, সামমত্ম, রূপক বসু এদের কারো আম জনতার সেলিব্রিটি কালিকাপ্রসাদের সঙ্গে কোনো যোগ ছিল না; কিন্তু খুব, খুব ভালোবাসে তোমাকে সবাই, বেসেও যাবে চিরদিন। তুমি আর কোনোদিন গান গাইবে না। অসতর্কতার খেসারতে চিরকালের জন্য বন্ধ হয়ে গেছে কণ্ঠ গত ৭ মার্চ, ২০১৭-র সকালে। ভেসে-আসা খবরকে অবিশ্বাস করছিলাম তখন। বসমত্মবাতাসে এ যে রক্তের গন্ধ, মৃত্যুর স্বাদ বয়ে নিয়ে আসছে। একে অপরকে ফোন করে যাচ্ছি আর বেলা বাড়তে বাড়তে তোমার মরণ যেন থিতু হলো আমাদের জীবনে। সম্বিত ফিরতে আমরা ঠিক করলাম বর্ধমান মেডিক্যাল কলেজে যাওয়ার। গাড়ি নিয়ে ছুটল সবাই। আমি কেমন চুপ মেরে গেলাম। কথা বলতে ইচ্ছা করছে না। আমি ওভাবে তোমাকে দেখব না, তাও ঠিক করলাম। অন্যরা ছুটল, কোন সকালে লোপামুদ্রা ছুটে গেছে। ওর যে আরো অনেক আগের বন্ধুতা। কিছুটা যাওয়ার পর আর যেতে হলো না কাউকে। তুমিই ফিরে আসছ শব হয়ে, নিরাকার কালিকাপ্রসাদ হয়ে।

কী করছে ঋতচেতা? তোমার স্ত্রী? কার কাছে আছে তোমার মেয়ে? আশাবরী? মেয়েটা আমার খুব ন্যাওটা বলে আশ্চর্য হতে তুমি? না, না ওদের সামনে যাওয়ার সাহস নেই আমার। এ-শূন্যতা পূরণের কোনো মন্ত্র আমি জানি না। কী বলব ওদের? কেমন আছো ঋতচেতা? মেয়েটাকে বলব, চল খেলি গে একটু! এখন কি সেই সময় কালিকা! রবীন্দ্রসদনের সামনে দাঁড়িয়ে গর্বে ফুলে উঠছিল আমাদের বুক। একজন লোকশিল্পীর জন্য এত মানুষ! এত যুবক- যুবতী, মাঝবয়সী মানুষের ভিড়। ওই মুহূর্তে হুঁশ হলো, তুমি তো ‘সেলিব্রিটি’। রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় শায়িত তোমার দেহ। দূর থেকে দেখলাম শায়িত আমার বন্ধুকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে শ্রদ্ধাশয্যায়। অপেক্ষমাণ মানুষ অধীর তখন। নির্বাক এক দেহ ঘিরে শুধুই মানুষ। দূরে দেখলাম শুভেন্দু মাইতি, স্বপন বসু, শ্রীকামত্ম আচার্য, আরো কত চেনা-অচেনা শিল্পীকেও। আমি যাইনি। যাব না বলে যাইনি তোমার কাছে। রাজীব চক্রবর্তী আর শ্রীজাত দেখে এলো তোমায়। আমাকেও বলল, যাবেন না? চলুন। আমি বললাম, নাহ! থাক। আমি। তরুণকামিত্ম বারিক আর সুমন্ত্র সেনগুপ্ত কেউ গেলাম না ফুল চড়াতে। ফুলকে দিয়ে মিথ্যে বলতে। তুমি নেই এটা তো মিথ্যা আমার কাছে, তুমি আছো। আমার স্ত্রী যাকে বউদি বলে ডাকত, মজা করত, সে এখনো রোজ কাঁদে। যত বলি, তুমি আছো, তত কান্না বাড়ে। এখনো ঘুমের বড়ি খাইয়ে ঘুম পাড়াতে হচ্ছে। আর আমি তোমাকে চিঠি লিখছি। না-জানা ঠিকানায়।

গত ৭ মার্চ বিকেলে বিশ্বনাথ দে সারাক্ষণ আমাদের তিনজনের আড্ডার স্মৃতি আউড়ে গেল। ও তো ভীষণ কম কথা বলে, সেদিন কথা বলছিল। ‘আনন্দসভা’ ঠিক করেছিল, তোমার সংগীত-জার্নি নিয়ে একটা অনুষ্ঠান করবে। এর আগে কবির সুমনের খেয়াল, পার্বতীর একক অনুষ্ঠানের পর ঠিক হলো দোহারের গান নয়, কালিকাপ্রসাদের সংগীতজীবনের পথ খোঁজাটা একটা অনুষ্ঠানের থিম হোক। সঙ্গে সঙ্গে খারিজ করে দিলে। বলেছিলে, ‘সুমনদা-পার্বতীর পরে আমি! এ হয় নাকি! না-না, এসব খ্যাপামি ছাড়ুন।’ অনেক সময় লেগেছিল তোমায় রাজি করাতে। আর রাজি হয়েছিলে একটিই শর্তে, কোনো রেমুনারেশন যেন অফার করা না হয়। তুমি জানতে এ আমাদের অদ্ভুত এক পাগলামো। আমরা কেউ গানের মানুষ নই, গান বুঝিও না, তবু গান নিয়ে খ্যাপামো করি। কোনোভাবেই লাভজনক হয় না কোনো অনুষ্ঠান, তবু করি। কবির সুমন কোনোদিন টাকা নেননি আনন্দসভা থেকে, পার্বতীও তথৈবচ। তুমি এসব জানতে। তাই প্রথম দিন শর্ত আরোপ।

এরপর আমি, তুমি আর বিশ্বনাথ। কোনোদিন গৌতম ঘোষ বা দেবজ্যোতি জানা থাকত। বসতাম অনুষ্ঠানের একটা শিরোনাম আর কীভাবে সাজানো হবে প্রোগ্রামটা তার পরিকল্পনা করতে। বসতাম গড়িয়াহাটের দক্ষিণ ভারতীয় এক হোটেলের বাইরের বারান্দায়। বারান্দার মেঝেতে। ঘরের মধ্যে অনেকক্ষণ চেয়ার আটকে বসা যাবে না, ঘণ্টাদুয়েকের আড্ডার অনুমতি নেই বলে বাইরেটা আমাদের। প্রায় দিনতিনেক বসেও কোনো পথ মিলল না। চতুর্থ দিন তুমিই প্রসত্মাব দিলে, আজ একটু ভালো কোথাও বসি, হোক না লোকসংগীত নিয়ে আড্ডা। ভালো কোনো ক্যাফেতে বসব আজ। গড়িয়াহাটের ‘ইন্ডথালি’তে ঢুকে পড়লাম তিনজন। ওয়েটার আসতেই তুমি প্রায় সাজানো সংলাপের মতো হাসি হাসি মুখে বলে গেলে – ‘শুনুন, কতক্ষণ বসা যাবে আপনাদের এখানে? আমরা শুধু চা নেব। ঘণ্টাদুয়েক বসব।’ ওয়েটার প্রায় থতমত খেয়ে বলল, ‘বসুন না’। তোমার আরো স্পষ্ট ভাষণ, ‘আমরা দুবার চা নেব। দুঘণ্টা বসব। এখন তিনটে চা আনুন।’ প্রশ্নও তোমার, উত্তরও তুমিই দিলে। আমরা দুঘণ্টার বেশি বসে চতুর্থ দিনেও অনুষ্ঠানের শিরোনাম ও অনুষ্ঠানবিন্যাস সাজাতে পারিনি। পঞ্চম দিনের পর সিদ্ধামত্ম নিলাম আর বসব না আমরা। কালিকার অনুষ্ঠান, সে যা খুশি করুক। আমরা তো মঞ্চে থাকব না। আমরা সেদিন একটিই সিদ্ধামত্ম নিয়েছিলাম, একক কালিকার কথা হলেও দোহারের সকলে থাকবে মঞ্চে। কালিকা তার কথার মাঝে এক-একজনকে ডেকে নেবে। শুরুতে মঞ্চে একা কালিকাপ্রসাদ। অনুষ্ঠান শুরু হবে গান দিয়ে, কথা দিয়ে নয়। আর কোনো সিদ্ধামত্ম নিতে পারিনি আমরা। সেদিন রাতেই তোমার টেক্সট পেলাম মোবাইলে, ‘অনুষ্ঠানের নাম হোক প্রসাদ কহে’, আরো একটা পরামর্শ দিলে, দোহারের নামটা টিকিটে থাক। তাতে আপনার টিকিট বিক্রির সুবিধা হবে। শেষে অনুষ্ঠানের শিরোনাম হলো : ‘প্রসাদ কহে, সংগে দোহার’। রাজীব চক্রবর্তী টিকিটের ডিজাইন করে দিলো। নিশ্চয়ই মনে আছে তোমার কালিকা!

খুব বেশিদিন আগের কথা নয়। ২৯ নভেম্বর, ২০১৪। সেদিন ‘প্রসাদ কহে’ অনুষ্ঠানের পর মানুষের উচ্ছ্বাসের কথা মনে আছে কালিকা? কেউ বলল, এমন একটা লোকশিল্পের আসর যে হতে পারে সে-সম্পর্কে কোনো ধারণাই ছিল না তাদের। কেউ বললেন, জীবনে ভুলব না এই প্রোগ্রামটার কথা। আসলে তোমার মধ্যে গান  ছাড়াও থিয়েটারের প্রতি একটা দুর্বলতা আছে। লোকগানকে একটু থিয়েট্রিক্যালি রিপ্রেজেন্ট করতে চাও। তাতে মানুষের কাছে আরো আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে গান – এটা তুমি বিশ্বাস করতে। দোহারের উপস্থাপনায় গান ছাড়াও খোলে এবং ঢোলের একক ব্যবহার। ধুনুচি নাচ, নাটকীয়ভাবে কথা আর গানে উপস্থাপনা এক চমকপ্রদ শিল্প উপহার দিত। এমন গান তো শুধু শোনার বিষয় নয়, দেখারও বিষয়, এটা তুমি মানতে। সংগীতের ধর্মকে এতটুকু বিকৃত না হতে দিয়ে গানের খ- খ- দৃশ্য উপস্থাপনায় তোমার বিশেষত্ব। সেদিন জ্ঞানমঞ্চে পলে পলে আমরা অনুভব করেছিলাম সেসব। পুরো প্রেক্ষাগৃহ মিউজিক ইনস্টল করা হয়েছিল, সঙ্গে গৌতম ঘোষের আলো আর বিশ্বনাথের মঞ্চ। প্রেক্ষাগৃহের নানা কোণ থেকে ট্র্যাডিশনাল বাজনা, সেইসঙ্গে বহুবর্ণ আলো, তোমার আহবানে এক-একজন শিল্পী মঞ্চে উঠে আসছেন নানা দিক থেকে – সে এক অসম্ভব বর্ণিল আনন্দসন্ধ্যা, যার স্রষ্টা ছিলে তুমি। আমাদের আলোচনায় এই দৃশ্যকল্প উঠে আসেনি কখনো। তাই আজ আর তোমার কৃতিত্বের ভাগ নিতে চাই না, অংশীদার ভেবে এখন স্মৃতি তর্পণ করে যাব।

তুমি এখন মনে রাখার অতীত কিন্তু আমরা মনে রাখবই। মরতে দেব না তোমাকে। আমরা তোমার অতিক্ষুদ্র বন্ধুরা মনে করি, সেদিনের অনুষ্ঠান তোমার সংগীতজীবনের এক নতুন অধ্যায় রচনা করেছিল। পরবর্তীকালে একটি জনপ্রিয় টেলিভিশন চ্যানেলের অতিজনপ্রিয় অনুষ্ঠানে লোকসংগীত প্রসারের যে-সুযোগ তুমি পেয়েছিলে তাকে পুরোপুরি সদ্ব্যবহারের সাহস জুগিয়েছিল সেদিনের ‘প্রসাদ কহে’র উপস্থাপনা। তুমি অমন একটি নন-ফিকশনকে আগাপাশতলা বদলে দিয়েছিলে। কে কবে ভাবতে পেরেছে কীর্তন আর পটগান উঠে আসবে ওই অনুষ্ঠানে? তুমি করিয়েছিলে। আর সেই ইনস্টলেশন। টেলিভিশন একটি দৃশ্যমাধ্যম। তাই তোমার বাছাই করা গানগুলোতে আমরা দেখতাম গানের সেই দৃশ্যরূপ ভেসে উঠছে পর্দায়। মানুষ সহজে গ্রহণ করতে পেরেছে সেই গান। আমাদের রাজ্যে ভালো লোকশিল্পীর অভাব নেই। শুভেন্দু মাইতি, স্বপন বসু, অভিজিৎ বসু – এঁরা সব অসম্ভব গুণী। হয়তো তোমার চেয়েও গুণী; কিন্তু ওই যে গান পরিবেশনার মুন্শিয়ানা। গানকে দৃশ্যোপযোগী করে তোলা আর এককভাবে নয় – দোহারকে সঙ্গে নিয়ে চলাই তোমাকে অন্যদের তুলনায় সাহসী করেছে, জনপ্রিয় করেছে। টেলিভিশন মিডিয়াকে দারুণভাবে ব্যবহার করতে পেরেছ। টেলিভিশন মিডিয়া তোমার পরিকল্পনা তখনই গ্রহণ করেছে, যখন বুঝেছে এতে দর্শক কমন নন বরং এমন দর্শকও দেখবেন সে-অনুষ্ঠান, যারা কস্মিনকালে এই রিয়্যালিটি শো দেখতেন না। লোকগান দিয়ে এমন প্রলুব্ধ করার গল্পই বা কে কবে শুনেছে? লাভজনক না হলে তোমাকে অমন মাথায় তুলে রাখত তারা? তুমি বাধ্য করিয়েছিলে। অন্যদের চাইতে এখানেই তোমার জিত। তাই আজ যেখানেই বাঙালি, তারাই চেনেন কালিকাপ্রসাদকে; আজ যেখানেই বাঙালি, তাদেরই চোখে অশ্রম্নজল। তোমার শূন্যতায় মলিন তারাও।

এখন লোকগানের ‘অথেনটিসিটি’ আর ‘বাজারীকরণ’ নিয়ে অনেক চর্চা হচ্ছে, হয়েই চলেছে। ‘বড় মাছ’ গিলে ফেলছে ‘ছোট মাছ’কে, এমনতর সতর্কবাণী আবারো উচ্চারিত হচ্ছে। পুঁজিবাদ লোকসংস্কৃতিকে তার ছাঁচে ফেলে গড়ে নেয় – আরো নানাবিধ সতর্ক উচ্চারণ। কালিকা, তুমি কি জানতে না এসব! তুমি কি নিজেকে বাজারীকরণ করে ফেলার উলস্নাসে মেতে উঠেছিলে! তুমি আমার বন্ধু, এ-সময়ের আবেগ কি আমাকে বলিয়ে নিচ্ছে, তুমি সচেতন ছিলে এই পুঁজিবাদ, অর্থবান সংস্কৃতির রাহুগ্রাস সম্পর্কে! লোকশিল্পে দুই জাতের শিল্পী থাকেন। বরাবর থেকেছেন। একদল নিভৃতকারী, শিল্পের জাত ধর্ম রক্ষায় আত্মত্যাগী স্রষ্টা। আর একদল লোকশিল্পের প্রসারে সমসাময়িকের চাহিদা মেনে নিয়ে এগোয়। এ ফিউশনিস্ট নন, এরাও লোকশিল্পী। তারা কেউ কেউ জনপ্রিয় হন, কেউ সেই মাপকাঠিতে আসতে পারেন না। এভাবে লোকশিল্প বেঁচে আছে এবং প্রসার ঘটছে। সাধনদাস বাউলের সঙ্গে পার্বতী বাউল কি তুলনাযোগ্য? একজনকে সাধক বললেও পারফরমার পার্বতীর গানেও যে ঈশ্বরদর্শন হয়। কালিকা সেই ঈশ্বরদর্শনে বিশ্বাসী শিল্পী ছিলেন। এ-কথা কোনো আবেগ থেকে লিখছি না, এটাই সত্য বলে মানি, মানব।

মনে আছে কালিকা, ‘প্রসাদ কহে’ অনুষ্ঠানের পর তুমি আমাদের অনুরোধ করেছিলে, নবদ্বীপের সরস্বতীর কীর্তন গানের একটা অনুষ্ঠান করার। গানের ঈশ্বরদর্শনের আর এক উদাহরণ দিয়েছিলে তুমি। সরস্বতীর কীর্তন। বলেছিলে, এ-কাজ করলে আপনারাই করতে পারবেন। বিশ্বনাথের সঙ্গে বসে মঞ্চটা কেমন হবে, দর্শক কীভাবে বসবে, কোন জায়গায় সরস্বতী (গায়িকা) দাঁড়াবেন, এসব আলোচনাও হয়েছিল। তারপর তোমার ব্যস্ততায় হয়ে ওঠেনি কাজটা। তুমি বলেছিলে, সরস্বতীকে কেউ জানলই না। ঠিক এই জানান দেওয়ার তাড়নাতেই তুমি অস্থির ছিলে। শিল্পী গাইবেন আর তার দৃশ্যনন্দন পরিবেশ রচনায় তোমার ব্যস্ততা। এই তো তুমি। তাই টেলিভিশনের কাজটা পেয়েই লেগে পড়েছিলে ‘চেনানোর’ কাজে, পরিবেশনার ব্যস্ততায়। এই যে সবাইকে নিয়ে বাঁচা, সবাই ভালো থাকলে তুমিও ভালো থাকবে, লোকগানও থাকবে – এই তো তোমার স্বপ্ন ছিল।

শিল্পী লোপামুদ্রা বলছিলেন তোমার আর এক স্বপ্নের কথা। ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডে শিল্পীদের সমাবেশের স্বপ্ন দেখতে তুমি। তাই ‘সহজ পরবে’র মতো অনুষ্ঠানের কথা ভাবতে পেরেছিলে। লোপামুদ্রা প্রোডাকশন আর দোহারের যৌথ প্রযোজনা ‘সহজ পরব’ তো এখন আমাদের প্রতীক্ষিত এক উৎসব। প্রতিবছর অপেক্ষা করে থাকি আমরা। এবারও হবে সে-উৎসব। শুধু তুমি থাকবে মালায় আর চন্দনে শোভিত ছবি হয়ে। আনন্দসভা আবারো করবে পার্বতী বাউলের গানের অনুষ্ঠান। সেখানেও শুধু তুমি থাকবে মালায় আর চন্দনে শোভিত ছবি হয়ে। এ-দৃশ্য দেখেও স্বাভাবিকতার ভান করব, বলব ‘সত্যেরে লও সহজে’।

কালিকা, আমার আর কখনো যেতে ইচ্ছা করবে না শিলচরে, তোমার বাড়িতে। একসঙ্গে নিয়ে যাবে বলেছিলে ১৯ মের বাংলা ভাষা দিবসে। সে-কথা না রেখে কি এভাবে চলে যাওয়া ঠিক হলো তোমার! কেন গেলে! কত লোকশিল্পী তোমার জন্য পথ চেয়ে বসে আছে জানো? তুমিই বলো, ঋতচেতা কী নিয়ে বাঁচবে! আশাবরী খেলবে কার সঙ্গে? আমরা শোক সরিয়ে কাজের মধ্যে, দৈনন্দিনতার মধ্যে ডুবে যাব ঠিকই। কিন্তু গড়িয়াহাটের দক্ষিণ ভারতীয় হোটেলের সামনে গেলে মনে আসবে কালিকাপ্রসাদ, শিলচর মনে হলেই ভাবব কালিকাপ্রসাদ, সহজ পরবের মাঠে দাঁড়িয়ে মনে হবে কালিকাপ্রসাদ, নতুন কোনো লোকশিল্পীর গান ভালো লাগলেও মনে হবে কালিকাপ্রসাদ, আনন্দসভার কোনো অনুষ্ঠান মানেই কালিকাপ্রসাদ…। কোনো দৈনন্দিনতা এর ব্যত্যয় ঘটাতে পারবে না। তুমি, বন্ধু আমার, কালিকাপ্রসাদ নও, শুধুই কালিকা। দোহারকে মঞ্চে দেখলেই খুঁজব তোমাকে, কই তুমি! ঋষভ কী লিখেছে জানো? সুদূর ম্যারিল্যান্ড থেকে? Kalika kaku, how can it possible! r

সোশ্যাল মিডিয়া

নিউসলেটার