কালি ও কলমের ‘ছোটগল্প সংখ্যা’ প্রসঙ্গে

লেখক:

ঈদ অবকাশে কালি ও কলম : ছোটগল্প সংখ্যা ২০১২ পড়ে ওঠা গেলো। এ থেকে প্রাসঙ্গিক কিছু ভাবনা আর এক বিস্মৃতি বয়ান কারণে এই চিঠি। বিগত শতকের পঞ্চাশের দশকে ছোটগল্প যাঁরা লিখছিলেন আর সেইসঙ্গে কবিতাও, এঁদের অন্যতম আবদুল গাফ্ফার চৌধুরীকে বেমালুম ভুলে যাই। প্রধানত মাত্রাবৃত্তেই তাঁর কবিতা আসতো – এ-ছন্দ অনেকের কাছেই তখন বেশ নিত্যনৈমিত্তিক ছিলো – আর গল্পে আসতো উঠতি ঢাকা ও সাগরছোঁয়া বরিশাল এলাকার মানুষ। ছোট একটা উপন্যাসও গাফ্ফার তখন লিখেছিলেন – চন্দ্রদ্বীপের উপাখ্যান। তাঁর গল্পের বই সম্রাটের ছবি প্রকাশ করেছিলেন সিকান্দার আবু জাফর। আর জহির রায়হানের কথাও দিব্যি ভুলে গিয়েছিলাম, তাঁর গল্পের বই সূর্যগ্রহণ প্রকাশ করেছিলেন রাবেয়া খাতুন-ফজলুল হক দম্পতি। বিস্মৃতির সাফাই হয়তো এটাই যে, গাফ্ফারের সাংবাদিকতা আর জহিরের চলচ্চিত্র-রচনা, এ দুয়ের বিপুল ও ব্যাপক খ্যাতির তীব্র দ্যুতিতে তাঁদের গল্পকার সত্তাটি ধাঁধানো আমার চোখে পড়তেই পায়নি!
তখনকার এও এক বিশেষ বলবার সংবাদ – আমাদের বই প্রকাশিত হয় সমসময়ের কোনো না কোনো কবি-লেখকেরই ব্যক্তিগত উদ্যোগে; আলাউদ্দিন আল আজাদের প্রথম গল্পের বই জেগে আছি প্রকাশ করেছিলেন হাসান হাফিজুর রহমান – হাসান তো তাঁর পারিবারিক উৎপাদন ধান-পাট পিতার অলক্ষ্যে বিক্রি করে দূরদর্শী দাঙ্গার পাঁচটি গল্প আর একুশের সংকলন প্রকাশ করেছিলেন। আমার তাস বইটির ধাত্রেয়ী ছিলেন ওই হাসান-ই আর আনিসুজ্জামান। প্রকাশক বিরল দেশে তখন আজাদের দ্বিতীয় গল্পসংকলন ধানকন্যারও অর্থলগ্নি ছিল হাসানেরই। বন্ধুজনের সমবায়ী উদ্যোগে সাহিত্যকে তখন যে আমরা পায়ের ওপর দাঁড় করাতে চেয়েছি, এমন নিঃস্বার্থকরণ ইতিহাসে সোনার অক্ষরে লিখে রাখতে হয়।
আপনাদের গল্পসংখ্যাটি পড়ে উঠে মনে হলো – এ বেশ হয়েছে! চমৎকার একটি মানচিত্র পাওয়া যাচ্ছে বাংলাদেশের গল্প-বিষয় ও শৈলী বৈচিত্র্যের, বেশ অনুপুঙ্খভাবেই। উপাদান হিসেবে এসেছে মানুষের অন্তর্গত জীবন, বৈধ ও অবৈধ প্রেম – অবৈধটাই যেন অধিক, নারী-পুরুষের দৈহিক ও মানসিক আকর্ষণের উত্তল-অবতল রূপ, দারিদ্র্য, মুক্তিযুদ্ধ, পরবাস এবং সমসময়ের যুবজীবন; পটভূমি ও মানুষগুলো কেবল স্বদেশের নগর শহর গ্রামেরই নয়, বিদেশেরও; কেবল কল্পিত মানুষই নয়, বঙ্গবন্ধুও এসেছেন গল্পের চরিত্র হয়ে। সরাসরি গল্প বলা থেকে রূপকথাতুল্য নির্মাণ – সংলাপকে প্রধান করা থেকে বর্ণনার ঠাসবুনোন রচা, উপস্থাপনার সম্ভব সব করণই দেখতে পাচ্ছি এ-সংখ্যার গল্পগুলোতে। ভাষা গঠনেও বৈচিত্র্য – গম্ভীর থেকে লঘু, স্বাদু ও রহস্যপ্রিয় গদ্য – আমি গল্পে গল্পে লক্ষ করেছি। বলতে পারি, এই একটি সংখ্যার ভেতরেই রয়েছে বাংলাদেশের লেখকদের সাম্প্রতিক গল্প-সৃজন-ভাবনার পুরো ছবিটা।
গদ্যের বৈচিত্র্য লক্ষ করেও বলি, কয়েকজনার গদ্যে আমি মৌখিক উচ্চারণের পদবিন্যাস ব্যবহৃত হতে দেখছি। মুশকিলটা হচ্ছে ভাষায় আমরা লিখি আর ভাষাতেই প্রতিদিনের জীবন নির্বাহ করি; কিন্তু ভাষাকে শিল্পে জুড়তে গিয়ে আমাদের অসাবধান কলমে এ দুয়ের গুলিয়ে ফেলাটা অনেক সময় হয় ও হচ্ছে। ক্রিয়াপদের ব্যবহার – তার বিভিন্ন কালরূপ কখন কোন প্রসঙ্গে – এ নিয়েও বেশখানিক অসতর্কতা চোখে পড়েছে; আবার কোনো কোনো লেখক আমাকে বেশ তৃপ্তও করেছেন তাঁদের ক্রিয়াপদ সচেতনতা দিয়ে। তবে, তিরস্কার করছি না! – আমরা লিখতে লিখতেই শিখি, শিখতে শিখতেই লিখি। শুধু একটি কথা, এ আমারই একান্ত চাওয়া – গল্পের গদ্যটিও যেন হাতের টানে মুখের টানে চলে আসা শাদা গদ্য না হয়ে ওঠে।
আরেকটি কথাও এই টানে বলি; দীর্ঘ অনুচ্ছেদ রচনার দিকে অনেকেরই ঝোঁক দেখছি – মনে হয় অনুচ্ছেদ বিভক্তির সাধারণ সুত্র ও স্বাভাবিক প্রবণতা উপেক্ষা করেই! অন্যত্র নানা প্রকাশনা থেকেও লক্ষ করছি গল্পে দীর্ঘ অনুচ্ছেদ রচনা করাটা যেন ব্যাপক ও সংক্রামক হয়ে পড়েছে। প্রায় ক্ষেত্রেই এটা থমথমে ভয়-দেখানোর মতো আমার কাছে ঠেকে; পড়ে উঠতেও নিরুৎসাহিত হই প্রথম নজরেই। এরকম দীর্ঘ অনুচ্ছেদ রচনার চূড়ান্ত করে ছেড়েছিলাম আমি নিজেই সেই ১৯৭৪ সালে দ্বিতীয় দিনের কাহিনী নামে উপন্যাসে – টানা একটি অনুচ্ছেদেই ছিল সোয়াশ’ পাতার পুরো লেখাটি! তবে – সচেতনভাবেই চেয়েছিলাম – করণ-কৌশলটা ছিল এ-কারণেই যে – মুক্তিযুদ্ধের মাসাবধিকাল পরেই যে-গল্প, সেটি পড়তে গিয়ে যেন একটা শ্বাসরোধক ব্যাপার ঘটে পাঠকের মনে। আঙ্গিকটা তো ওপর থেকে চাপানো যায় না, শাঁস বুঝেই খোসাটির গাত্র নির্মাণ করতে হয়।
কৌতূহল সঞ্চারিত হলো এ-সংখ্যার গল্পের শিরোনামগুলো লক্ষ করে। চৌত্রিশটির ভেতরে সাত-সাতটি গল্পেরই শিরোনাম দীর্ঘ, একটি তো আশ্চর্যবোধক ও প্রশ্নবোধক চিহ্ন এবং ড্যাশ সমেত: আবুবকর সিদ্দিকের ‘পায়রা হামার লদীটো! – কুথা কুন্ঠে বটে তু?’ আমার কাছে এ-সংখ্যার সবচেয়ে মর্মস্পর্শী ও কুশলী কলমের গল্প এটি। আরো আছে : বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীরের ‘হায় রে, ইলা মিত্র যদি এই সন্ধ্যাটা দেখে যেতে পারতেন’ : স্মৃতিবিষাদে এমন করুণ গল্প অনেকদিন পড়িনি। দীর্ঘ এমন শিরোনামের আরো দেখতে পাচ্ছি মঞ্জু সরকারের ‘দলেবলে এবং বিলবোর্ডেও হুমায়ুন’, নাসরীন জাহানের ‘একটি মৃত্যু – তার পরের অথবা আগের কথন’, সালেহা চৌধুরীর ‘ঢেউটিন পাকা বারান্দা বদনা চিলমচি মাছালো পুকুর’, হামিদ কায়সারের ‘চালককে সরিয়ে দেওয়ার পর’, রাশেদ রহমানের ‘একটি অশোকগাছ কিংবা কমলারঙের রোদ’। আবুবকর-বোরহানের মতো আদি লেখক থেকে শুরু করে মাঝ প্রজন্ম ছুঁয়ে একেবারে হালের লেখকও যখন গল্পের এমতো দীর্ঘ শিরোনাম দিচ্ছেন, তখন মনে হয় এ-ব্যাপারটিও সংক্রামক হয়েই পড়তে চলেছে। মনে পড়ে, আমি যখন সেই ১৯৮০ সালে ‘ভালো করে কিছু দেখা যাচ্ছে না বলে’ এক গল্পের শিরোনাম দিয়েছিলাম তখন কাইয়ুম চৌধুরীর চোখে পড়েছিল – এত লম্বা নাম অলংকরণ করতে গিয়ে তুলিতে গল্প ও লেখকের নাম লিখে ছবির জন্যে জায়গাই আর থাকছে না! তখন শিল্পীরা হাতে এঁকেই গল্পের নাম-লিখন করতেন; এখন দিন পালটেছে, কম্পিউটারেই নাম লেখার কাজ চলছে; চলুক! – আমি কিন্তু এ-ব্যাপারে পুরনো দিন ফিরে আসুক চাই। কাইয়ুম যে বাংলা লিপির নতুন নতুন আকার-উদ্ভাবনের অসামান্য এক কলমকার – সত্যজিৎ রায় আর কাইয়ুম চৌধুরীই তো এ পর্যন্ত এক্ষেত্রে দুই মহান – এরও সূচনা ওই বিগত শতকের পঞ্চাশের দশকের শুরু থেকে। সে একটা রেনেসাঁসেরই কাল ছিল বটে।
লেখার নামকরণের ব্যাপারে সর্বমনোযোগী রবীন্দ্রনাথের একটি মন্তব্য এই সুবাদে মনে পড়লো। তিনি বলতেন, নামটা হচ্ছে লাউয়ের বোঁটার মতো, ওটা খাওয়া যায় না, তবে লাউটাকে ধরবার সুবিধে হয়! আমরা বোধহয় বোঁটাটিকেও এখন পাচ্য করে তুলতে শুরু করেছি॥

ইতি, ২৪শে আগস্ট ২০১২
সৈয়দ শামসুল হক

সোশ্যাল মিডিয়া

নিউসলেটার