কিংবদন্তি ও সমকালীন

ইব্রাহিম ফাত্তাহ

ঢাকার গুলশানের সার্কেল ১-এর ২৭ সংখ্যক সড়কের বাড়ি ৬৯-এ গ্যালারি কারিকর নামে নতুন একটি চিত্রশালার সূচনা হলো। গাছপালার ছায়াঘেরা বাড়িটির নিচের তলার দুটি ঘরে গ্যালারি, একটি উঠান আর ওপরতলায় রেস্তরাঁ। এটির উদ্যোক্তা তরুণ ব্যবসায়ী জিন্নাতুল করিম, তাঁর স্ত্রী শিল্পী শাহানা মজুমদার, শিল্পী রেজাউল হক ও শিল্পী জামিল আকবর শামিম। শতাধিক শিল্পী ও শিল্পরসিকের উপস্থিতিতে গত ১৬ অক্টোবর ২০১৭ গ্যালারিটি উদ্বোধন করেন সংস্কৃতিমন্ত্রী বরেণ্য নাট্যজন আসাদুজ্জামান নূর।

গ্যালারি কারিকরের সূচনা প্রদর্শনীতে আমাদের চারুশিল্পের প্রথম প্রজন্মের দুজন গুণী চিত্রকর অশীতিপর শিল্পী মুর্তজা বশীর (১৯৩২) ও সৈয়দ জাহাঙ্গীর (১৯৩৫) আছেন – তাঁদের অাঁকা চিত্রকর্ম নিয়ে। বাংলাদেশের চারুশিল্পকে আধুনিক ও মননশীলতার পথে নিয়ে যেতে তাঁদের অবদান স্মরণীয় হয়ে থাকবে। ভাষা-আন্দোলন থেকে শুরু করে বাঙালির সে-সময়ের নানা প্রগতিশীল সংগ্রামে সক্রিয় অংশগ্রহণ ছিল বশীরের। ফ্লোরেন্সের অ্যাকাদেমিয়ায় চিত্রকলায় উচ্চশিক্ষা গ্রহণকালে পাশ্চাত্য শিল্পের সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়। সেই সূত্রে বশীরের কাজে পাশ্চাত্যশিল্পের প্রভাব দেখা দেয়। আশির দশকে তাঁর চিত্রপটে মধ্যবিত্ত বাঙালির আদর্শ অবয়ব স্থান পায়। পাখা হাতে রমণী সিরিজ এক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য।

এ-প্রদর্শনীতে এই সিরিজের একটি কাজ দিয়েছেন শিল্পী। এটি কাগজে রঙিন কলমে অাঁকা। এছাড়া কাগজে কলম চালিয়ে স্বচ্ছন্দ রেখায় ভিন্ন তিন নারীর অবয়ব এঁকেছেন। অন্য তিনটি কাজ এচিং অ্যাকুয়াটিন্ট মাধ্যমের ছাপচিত্র। এগুলোর শিরোনাম টেস্টপ্রিন্ট-১ ও ৩ এবং ইমেজ-৭। টেস্টপ্রিন্ট শিরোনামের দুটি চিত্রপটের ওপরের অংশটা যেন আকাশ, আর নিচে জমিন – এভাবে স্পেস গঠন করেছেন শিল্পী। আকাশের নিটোল জমিনে সূর্যবলয় কিংবা জলের বুদ্বুদের মতো ফর্ম ইঙ্গিত করছে অশরীরী কোনো শক্তির অসিত্মত্ব।

বাঙালির বাঙালি হয়ে-ওঠার সংগ্রামের সূচনাকালের এক প্রত্যক্ষদর্শী সৈয়দ জাহাঙ্গীর। তাঁর চেতনার ভেতর এ-বাঙালিয়ানার জীবনধারা যেন লুকিয়ে ছিল এতকাল। নববইয়ের দশকে তাঁর চিত্রপটে বাংলার ভূদৃশ্য ও প্রান্তিক মানুষ আসতে থাকে। তারপর এ-ধারায় থিতু হয়েছেন তিনি। এ-প্রদর্শনীতে তাঁর দুটি কাজ স্থান পেয়েছে। ক্যানভাসে অ্যাক্রিলিক রঙে চারটি নারী অবয়ব এঁকেছেন, এর শিরোনাম – তাঁরা চারজন। শিল্পী পদ্মানদীকে এঁকেছেন কালি ও তুলিতে।

এ-প্রদর্শনীতে আছেন বাংলাদেশের সমকালীন চারুশিল্পের বিশিষ্টজন, গত শতকের ষাটের দশকের শিল্পী সমরজিৎ রায় চৌধুরী (১৯৩৭), রফিকুন নবী (১৯৪৩), মনিরুল ইসলাম (১৯৪৩), হামিদুজ্জামান খান (১৯৪৬), ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণী (১৯৪৭), সৈয়দ আবুল বারক আলভী (১৯৪৯), শহিদ কবীর (১৯৪৯), সত্তরের শিল্পী  শাহাবুদ্দিন আহমেদ (১৯৫০) ও ফরিদা  জামান (১৯৫৩)।

সমরজিৎ রায় চৌধুরী তাঁর চিত্রপটকে জ্যামিতিক বিভাজনে ভাগ করে মানুষ ও নিসর্গরূপকে অতুলনীয় নান্দনিকতায় তুলে ধরে আমাদের সমকালীন চিত্রকলায় একটি স্বতন্ত্র অবস্থান নির্মাণ করেছেন। এ-প্রদর্শনীতে শিল্পী তিনটি চিত্রকর্ম দিয়েছেন – নিঃসঙ্গ পাখি, দিনশেষে ও জেলে। তিনি এঁকেছেন ক্যানভাসে অ্যাক্রিলিক রঙে নিজের মতো করে চিত্রপটকে জ্যামিতিক বিভাজনে ভাগ করে।

রফিকুন নবী মফস্বলের মধ্যবিত্ত পারিবারিক সুখীজীবনের নিবিষ্ট এক রূপকার। গ্রামীণ জীবন ও বাংলার ভূদৃশ্য অাঁকাতেও তাঁর জুড়ি নেই। স্বাধীন  বাংলাদেশ অভ্যুদয়ের পর রফিকুন নবী গ্রিস সরকারের বৃত্তি নিয়ে এথেন্সে উচ্চশিক্ষা নেন। সেখানে তিনি ছাপচিত্রের আধুনিক করণকৌশল শেখেন। পত্র-পত্রিকায় কার্টুন-ক্যারিকেচার-ইলাস্ট্রেশন অাঁকা, পুস্তক প্রকাশনা শিল্পে প্রচ্ছদ ও অঙ্গসজ্জায় সিদ্ধি অর্জন করে তিনি এদেশের জনপ্রিয়তম শিল্পীর মর্যাদা পেয়েছেন। কলমে অাঁকা তাঁর তিনটি ড্রয়িং প্রদর্শিত হয়েছে। দুটি চিত্রে নারী ও পুরুষ অবয়ব, অন্যটিতে নারী-অবয়ব। শিল্পী যেন ষাটের দশকের রোমান্টিক মন নিয়ে বেশ দরদ দিয়ে ছবিগুলো এঁকেছেন।

শিল্পী মনিরুল ইসলাম ছবি অাঁকেন – বাংলার নদীজল ভালোবেসে, হৃদয় দিয়ে। শিল্পীজীবনের দীর্ঘ একটা সময় স্পেনে কেটেছে তাঁর। সেখানকার জাতীয় পুরস্কার অর্জন করে বাংলাদেশের চারুশিল্পের সম্মান বাড়িয়েছেন। তাঁর অাঁকার ধরনে বাংলাদেশের বিষয়াবলিতে ইউরোপীয় করণকৌশলের সার্থক সমন্বয় ঘটেছে। এ-প্রদর্শনীর জন্য তিনি এঁকেছেন – নগর, কৃষ্ণদেবীকে অনুসরণ, কসমিক পৃথিবী, জীবন ও মৃত্যুর মাঝখানে, সান্ধ্যভ্রমণ ও মাহীর শব্দ। মনির ছবি অাঁকেন বিমূর্ত ধরনের, তবে তাঁর অাঁকার কৌশল যেন বাস্তবতাকে ঘিরেই!

হামিদুজ্জামান খান একাধারে ভাস্কর ও চিত্রকর। রাষ্ট্রীয় জীবনে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা যখন প্রায় নির্বাসিত, সে-সময় তিনি একাত্তর স্মরণে ভাস্কর্য গড়ে মানুষকে মুক্তিযুদ্ধের অনন্য গৌরবের কথা মনে করিয়ে দিয়েছেন। জলরঙে বাংলা প্রকৃতির বৈচিত্র্যময় সৌন্দর্যকে তিনি বর্ণপ্রয়োগের কুশলতায় তুলে ধরেন। এ-প্রদর্শনীতে তাঁর চারটি কাজ। দুটি পেইন্টিং, অন্য দুটি ভাস্কর্য। সূর্যাস্ত ও বুদ্ধের ইমেজ এঁকেছেন শিল্পী ক্যানভাসে অ্যাক্রিলিক রঙে। আর মার্বেল স্টোনে গড়েছেন পাখি ও একতারা।

সৈয়দ আবুল বারক আলভী বাংলার নিসর্গের রং ও ফর্মকে বিমূর্ততার আবরণে নন্দিতভাবে তুলে ধরেন। চারুশিল্পীদের মধ্যে যে কজন মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছেন আলভী তাঁদের অন্যতম। এচিং মাধ্যমে তাঁর অাঁকা তিনটি চিত্রকর্ম প্রদর্শিত হয়েছে। এগুলো হচ্ছে – গ্রে ও গ্রিন এবং গঠন-১ ও ২।

শহিদ কবীর আবেগময়তার ঐশ্বর্যে ছবি অাঁকেন। তিনিও শিল্পীজীবনের বড় একটা সময় কাটিয়েছেন স্পেনে। নগরপ্রান্তে ইটের ভাটা, নদীবক্ষে নৌকাভরা ছাগল, ফুটন্ত ভাতের হাঁড়ি, নগরবসিত্মর ছিন্নমূল নারীর ছবি, পায়ে-পেষা রক্তজবা ফুলের অতিকায় অবয়ব এসব সাদামাটা বিষয়কে তিনি দারুণ সৌকর্যে তুলে ধরেন। এ-প্রদর্শনীতে দুটি কাজ তাঁর। প্রদর্শনীতে তাঁর দুটি এচিং মাধ্যমের ছাপচিত্রকর্ম – মার্গারিটা ও সড়ক সার্কাস দর্শকদের আকৃষ্ট করেছে। বিশেষ করে শেষোক্তটি। পথের পাশে বাঁশের উঁচু কাঠামোর ওপর এক ক্যামেরাপারসনের লম্বা চিকন ছবি দর্শকদের কাছে মজাদার অনুভূতি তুলে ধরেছে।

আমাদের চারুশিল্পভুবনে নববইয়ের দশকে আভির্ভূত হন মুক্তিযোদ্ধা শিল্পী ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণী। অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কাটুমকুটুমের ধারণা নিয়ে গাছের কুড়ানো ডালপালা, বাকল, শেকড় এসব ঘষেমেজে, যোগ-বিয়োগ করে নানা আকৃতি গড়ে নান্দনিক রূপ ফুটিয়ে তুলে তিনি আলোচনায় এসেছেন। গাছের ডাল দিয়ে তিনি তৈরি করেছেন স্বপ্নঘোড়া ও পথের পাশে। তাঁর এ দুটি কাজ এ-প্রদর্শনীতে স্থান পেয়েছে।

শাহাবুদ্দিন আহমেদ আমাদের আরেক স্বনামধন্য চিত্রকর। শিল্পের রাজধানীখ্যাত প্যারিসে থাকেন। বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের এক যোদ্ধা তিনি। তাঁর অাঁকার প্রিয় বিষয় গতিময় ধাবমান মুক্তিযোদ্ধা ও স্বাধীনতার মহান নেতা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। এছাড়া তাঁর চিত্রপটে মহাত্মা গান্ধীর নানারকম অবয়ব, বাঙালি নারীর জলকেলি, স্নানশেষে ভেজা শাড়িতে বাড়ির পথে যাত্রা – এসব বিষয় প্রত্যক্ষ করি। এ-প্রদর্শনীতে স্থান পেয়েছে লিথোগ্রাফে অাঁকা তাঁর চারটি চিত্রকর্ম – ঘোড়া ১ ও ২, দৌড় ও মুক্তি।

ফরিদা জামান মাছধরার জাল, জলের বুদ্বুদ আর আলোছায়ার দুর্দান্ত প্রয়োগে ছবি এঁকে সুপরিচিতি পেয়েছেন। এখন একদিকে দারিদ্রে্যর কশাঘাতে জর্জরিত হীনস্বাস্থ্যের জেলেনারী সুফিয়া এবং অন্যদিকে মৎস্যশিকারি বিড়ালের ছবি অাঁকছেন। সুফিয়াকে দেখে মনে হয় তাঁর পৃথিবীর রং এতটুকু বদলায়নি। এ-প্রদর্শনীতে তাঁর তিনটি কাজ ক্যানভাসে অ্যাক্রিলিক রঙে অাঁকা। শিরোনাম – আমার দেশ-১, ২ ও ৩।

এই শিল্পীরা বাংলাদেশের সমকালীন চারুশিল্পের প্রধানধারার উল্লেখযোগ্য একটি অংশ। পর্যায়ক্রমে নিশ্চয়ই আমাদের অন্যান্য গুণীশিল্পীসহ প্রতিশ্রম্নতিশীল শিল্পীরাও এখানে স্থান লাভ করবেন।

শিল্পী ও শিল্পের স্বার্থে আমরা গ্যালারি কারিকরের সাফল্য ও দীর্ঘায়ু কামনা করি।

উল্লেখ্য যে, কারিকরের এই সূচনা প্রদর্শনী শেষ হয়েছে গত ৩১ অক্টোবর ২০১৭, মঙ্গলবার। r

শেয়ার করুন

Leave a Reply