কুরুক্ষেত্রের দিকে

লেখক:

সুদর্শন সেনশর্মা

 

গোপাল লাল কাঞ্জিলাল সবকিছু গুছিয়ে নিয়েছেন ততক্ষণে। তাঁকে অনেক দূরে ফিরতে হবে। বালিগঞ্জ সার্কুলার রোড থেকে বেহালা চৌরাসত্মা কম দূর নয়। ফাঁড়ির হাজরা রোডের মুখ থেকে অটো ধরে যতীন দাস পার্ক, তারপর মিনি বা বাস… পৌনে ন’টা বাজে… এ-সময় দরজায় জলতরঙ্গ বেজে উঠল… মহাবিষ্ণু অস্থির গলায় বললেন, গোপাল দেখুন তো আবার কে এলো?

দরজা খুলতেই স্টাডিরম্নমে বসে বসেই মহাবিষ্ণু শুনতে পেলেন, স্যার এই আমি এসেছিলাম, লেন্টু সারখেল স্যার… কাল দশটায় পুরনো বালিগঞ্জ দিশারী সংঘের খুঁটি পুজো স্যার… সভাপতি মহাশয়ের খুব ইচ্ছে… আপনি… স্যার…

ধোঁয়া-ওঠা পাইপটা নামিয়ে রেখে অ্যাটর্নি বললেন, লেন্টুবাবু সভাপতি মহাশয়কে বলবেন কাল আমার খুঁটিপুজোয় থাকার ইচ্ছে
থাকলেও উপায় নেই… কেননা, তাহলে বিপ ক্ষের ন্যায়াধীশ আমার বা আমার মক্কেলেরই খুঁটি উপড়ে নেবেন!

লেন্টুবাবু একটু শেষ চেষ্টা করলেন – স্যার, কাল তো রোববার!

উঠে দাঁড়িয়ে প্রস্থান দরজার দিকে ইঙ্গিত করে যেন অসীমে তাকিয়ে মহাবিষ্ণু বললেন, অ্যাটর্নিদের কোনো রোববার নেই… রিহার্সাল থাকে… ডিভিশন বেঞ্চ থাকে স্পেশাল… ওসব আপনাকে…

বিফল মনোরথ লেন্টুবাবু দরজা পেরিয়ে গেলেন। দরজা বন্ধ হলো… মহাবিষ্ণু বললেন – বাঁচা গেল, তারপর মুচকি হেসে বললেন, গোপালবাবু আজ একটু হবে নাকি?

গোপালও হেসে ফেললেন এবার!

– একি? হাসির কী হলো? গোপাল লালবাবু…!

গোপাল হাসি থামিয়ে বলল, গতকালের আদালতের কথা মনে করে হাসি এলো… আদালতের বাইরে রায়বর্মণ স্যার আপনাকে উইশ করলে আপনি বললেন, আপনি নিজেই এই কেসটায় জিততে চান না… আপনার মক্কেল যে ভালো লোক নয়, সেটা আপনি বিলক্ষণ জানেন…

আর আপনি! আদালতক ক্ষে একদম অন্য মানুষ। তবে স্যার যা-ই বলুন ভরা আদালত ক ক্ষে জজ সাহেবের সামনে সুর করে আপনার গান গেয়ে ওঠা ঠিক! আমার যেন কেমন লাগে… ঠিক বুঝে উঠতে পারি না…

– কেন আমি তো কোনো চটুল হিন্দি গান গাইনি, আমি রবীন্দ্রসংগীত গেয়েছি… আচ্ছা বেশ, গোপাল একটু রিপেস্নটা শুনি…

গোপাল লাল কাঞ্জিলালের একটা পকেট টেপরেকর্ডার আছে… ইম্পরট্যান্ট কেসের সওয়ালের ডিটেলস রেকর্ড করা থাকে… অ্যাটর্নি মহাবিষ্ণু বিষ্ণু কী বললেন… বিপ ক্ষের ন্যায়াধীশ কী বলছেন… এইসব আর কি!

গোপাল টেপরেকর্ডার অন করে বিষ্ণুর টেব্লে রাখলেন…

ধর্মাবতার… মহাবিষ্ণু বিষ্ণুর গলা তারপর সঠিক সুরে রবীন্দ্রগান আদালতকে একদম চমকে দিয়ে ‘আমি যে আর সইতে পারি নে’…

তখন রায়বর্মণ বলছেন, মাই লর্ড উনি নাটক করছেন… আমার অগ্রজ ধীমান সহযোদ্ধা একটা জাত খুনিকে আড়াল করতে রবিঠাকুরের ‘প্রেমে’র গান গেয়ে উঠলেন আদালতে… ওর মক্কেলের তো গুণের ঘাট নেই… এটাই প্রথম খুন নয়… আমি ঝাঁপি খুললেই উনি পালানোর পথ পাবেন না হয়তো… শেষ লাইন আগেই গেয়ে ফেলবেন ‘ঘরে যে আর রইতে পারি নে’ বদলে ওকে গাইতে হবে আদালতে… আর! সুর চড়ালেন মহাবিষ্ণু, ধর্মাবতার আমার কনিষ্ঠ সহযোদ্ধা বোধহয় পরের জিনিসগুলো বেশ একটু আগেই ভাবেন… ভেবে ফেলেন। যে-কোনো মৃত্যুই দুঃখের… আমার মক্কেলের কারখানায় এক কর্মীর মৃত্যু হয়েছে… বলা হয়েছে জনরোষ। পিটিয়ে মারা হয়েছে। মালিকের ইন্ধন ছিল বলা হচ্ছে পোস্টমর্টেম রিপোর্টে; কিন্তু কোনো ইনজুরির কথা লেখা নেই… পেটের ভেতরেও কিছু ফাটেনি… পাঁজরের হাড়ও ভাঙেনি… বুকেও কোনো রক্তক্ষরণ হয়নি… শুধু তার ডান হাতে… সুচ ফোটানোর জায়গায় একটা রক্তক্ষরণের কথা লেখা আছে… আর ডান গোড়ালিতে…

রায়বর্মণ কী বলতে যাচ্ছিলেন… জজ সাহেব তাকে থামিয়ে দিয়ে বললেন… ইউ পিস্নজ স্টপ নাউ! লেট হিম ফিনিশ। হতভাগ্য মৃতের বাবাই আমাদের বলেছেন… এর আগে একবার কারখানায় বিশ্বকর্মা পুজোর দিন ডাঁশা পেয়ারা খেয়ে দাঁতের ফাঁকে ছিবড়ে আটকে যায় ছেলেটির… দাঁত খোঁচাতে গিয়ে আচমকা প্রচুর রক্তক্ষরণ হয়… তখন আমার মক্কেলই তাকে হাসপাতালে নিয়ে যান… তাকে রক্ত জমাট বাঁধার… মাই লার্নেড কলিগ জানেন না… ওর মক্কেলের কোঅ্যাগুলোপ্যাথি ছিল… ফ্যাক্টর এইট ডেফিসিয়েন্সি… হিমোফিলিয়া… কারখানার একটা নিড্ল পায়ে ফুটে সেদিন… আনফরচুনেট গাই… আর আমার ছোট্ট বন্ধু বিটিং দা বুশ…

আগেরবারের হাসপাতালের কাগজপত্র জমা দেওয়া হলো… যেখানে পরিষ্কার বলা আছে হিমোফিলিয়া… মানিকতলা থেকে ফ্রেশ ফ্রোজেন পস্নাজমা, অ্যান্টি হিমোফিলিক গেস্নাবিউলিন পাওয়ার কাগজপত্র গোপাল দাখিল করে দিলো…

মহাবিষ্ণু এবার মাথা নাড়ছেন। গোপাল লাল টেপ থামাও… গীতা শুরম্ন হোক… যেখানে কুরম্ন ক্ষেত্রে বিপক্ষ শিবিরে নিজের আত্মীয়দের দেখে অর্জুন গা–ব রেখে দিয়ে কৃষ্ণকে অনুনয় করে বলছেন… এ-যুদ্ধ আমি চাই না শ্রীকৃষ্ণ… গোপাল লাল বলে, স্যার, কাল তো আবার সকালেই আসতে হবে… হাইকোর্টে রিট পিটিশন আছে তো…

অস্থির গলায় মহাবিষ্ণু বিষ্ণু বললেন থাক। কাল রোববার গোপালবাবু, কিন্তু আপনাকে আসতে হবে। আপনাকে আজ ড্রাইভার বেহালা চৌরাসত্মায় নামিয়ে দিয়ে আসবে…

তারপরেও স্যার দশ মিনিট… গোপাল লাল বলল।

– তথাস্ত্ত, বাড়ির দরজায় আপনাকে ড্রাইভার নামিয়ে দেবে…

গোপাল লাল কাঞ্জিলাল এবার হাসতে-হাসতে লাল হয়ে গেল – আমার খুব অবাক লাগে মাঝে-মাঝে স্যার… আপনি রায়বর্মণকে প্রায় লেজে খেলিয়ে রাসেত্মাগিদের বদ ছেলেটাকে বাঁচিয়ে দিলেন… ওর যাবজ্জীবন তো বাঁধা ছিল… গোড়ালিতে স্প্রিং ঢুকিয়ে দেওয়ার পস্ন্যানটা তো… ওরই ছিল… অসুখটার কথাও জানত…। (রাসেত্মাগির গোপন কারবার… সব বদামির হদিশ নিহত জেনে গিয়েছিল)

জানত, নিশ্চয়ই জানত… সেদিকে রায়বর্মণ গেলই না…

একটা খুনিকে বাঁচিয়ে এসে আপনি এখন গীতা শুনবেন… ?

অ্যাটর্নি বলতে হবে। অ্যাডভোকেট মহাবিষ্ণু বিষ্ণু বললে কর্তা রেগে যান। বিষণ্ণ গলায় মহাবিষ্ণু বললেন… রাসেত্মাগির কেসটা আমি নিতে চাইনি… ফিরিয়ে দিয়েছিলাম… বলেছিলাম রায়বর্মণের কাছে যেতে… রায়বর্মণের কাছে ততক্ষণে মৃতের পরিবার পৌঁছে গেছে… ওই-তো আমাকে বলল, দাদা ওরা এসেছিল… কিন্তু আমি তো প্রতিবাদী পক্ষ নিয়ে ফেলেছি… আপনি ওদের ফেরাবেন না… তবে কিন্তু দাদা এবার আমিই জিতব…

অ্যাঁ গোপাল… এবার দেরি কে করছে?

– স্যার, সাড়ে ন’টা অবধি কিন্তু…

– এবার আমি কিন্তু খুব রেগে যাব!

গোপাল লাল কাঞ্জিলাল একটু গলাখাঁকারি দিয়ে নিলো। পাইপটা আবার ঠোঁটের কোনায় ধরে অগ্নিসংযোগের চেষ্টা করছেন তখন মহাবিষ্ণু।

গোপাল লাল বলছেন তখন – সীদমিত্ম মম গাত্রাণি মুখং চ পরিশুষ্যতি/ বেপথুশ্চ শরীরে মে রোমহর্ষশ্চ জায়তে অর্থাৎ স্যার, অর্জুন বলছেন কৃষ্ণ, যখন আমি নিজেদের লোকজন  আত্মীয়-পরিজনদের দেখছি যুদ্ধের জন্য অস্ত্রসজ্জিত হয়ে প্রচ- লড়াইয়ের জন্য মুখিয়ে আছেন, তখন আমার হাত-পা ক্রমশ নিসেত্মজ হয়ে আসে, মুখম-ল তপ্ত ও শুষ্ক হয়ে ওঠে, আমার শরীর কম্পিত ও শিহরিত হয়ে ওঠে এবং… আমার তীর গা–ব আমার হাত থেকে পিছলে পড়ে, আমার ত্বকে জ্বলন-পীড়ন শুরম্ন হয়, আমার সকল মন যেন সক্লেশে… ঘুরতে থাকে।

টুংটুং ডিংডং টংটং… আবার দরজার ডাক-ঘণ্টা বাজছে… অ্যাটর্নি মহাবিষ্ণু বলে উঠলেন, মহাজ্বালাতন তো, দেখ তো আবার কে? গোপাল লাল তখন বলে চলেছেন, ও জনার্দন কী আর এমন সুখানুভূতি হবে আমাদের ধৃতরাষ্ট্রের এই ছেলেদের হত্যা করে! এই কর্কটদের মেরে আমরা শুধুই পাপ লাভ করব।

ও মধুসূদন আমার মোটেই হত্যার ইচ্ছা নেই। যদিও তারা আমাকে মারতে পারে স্বর্গ,  মর্ত্য, পাতালে রাজত্ব লাভের আশায়…

ও কৃষ্ণ আমার জয়লাভের আকুল কেন, কোনো আকাঙ্ক্ষাই নেই, রাজ্যলাভের বাসনাও নেই বা আনন্দ এমনকি জীবনেও…

টুংটুং ডিংডং টংটং

হে কৃষ্ণ, অতএব এটা ঠিক নয় যে, আমরা ধৃতরাষ্ট্রের পুত্রদের হত্যা করি – আমাদের আত্মীয়, ওহে মাধব আমরা কেমন করে সুখী হব, আনন্দিত হব আমাদের নিজেদের লোকজনকে হত্যা করে? যদিও এইসব লোকের বুদ্ধি লোভের মেঘাচ্ছন্ন, তাই তারা কোনোই ভুল দেখতে পাচ্ছে না একই সমাজের পরিজনদের ধ্বংসে লিপ্ত হওয়ায় এবং আশ্চর্য তাদের কোনো পাপবোধও নেই অমত্মরে, বন্ধুদের সঙ্গে চরম বিশ্বাসঘাতকতায়! আচ্ছা জনার্দন, আমরা কেন এই পাপ থেকে সরে আসব না যখন পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছি ভুলটা, পরিবারে ধ্বংস ডেকে আনার… ?

টুংটুং ডিংডং টংটং

এইবার মহাবিষ্ণু হাসতে শুরম্ন করেছেন। ওহে গোপাল লালবাবু আপনাতে কী অর্জুন ভর করিয়াছেন… দেখুন আবার কে এলেন… এইবার ড্রাইভারকে ডাকুন কলিংবেল বাজছে…

দরজা খুলতেই ফের লাখোটিয়া। ধ্যান ভেঙে গোপাল বলে, পুরম্নষোত্তমবাবু আপনি? ফিরে এলেন! কী হলো… বাড়ি গেলেন না?

ধরা গলা লাখোটিয়ার – সাহেব এখানে আছেন… নাকি উপর মে…

– কী হলো আবার লাখোটিয়াজি… মহাবিষ্ণু জি-টা বেশ খেলিয়ে বললেন…

একদম সত্য নাশ হইয়ে গেছে… বোলেন কী কা-… স্ত্রী ফোন করেছিলেন… হাজরা থেকে ফিরে আসলাম…

আরে আপনি এমন করে বলছেন লাখোটিয়া যেন এইমাত্র সত্য নাশ হলো? সত্য ছিল কবে? এলো কবে? গেল কবে?

আরে বোলেন কী, বোলাই বোস বলে একটা ছেলে খু-উ-ব বায়না ধরল, বউবাজারের অফিসে সেলে রেখেছিলাম… অফিস থেকে এটা-ওটা চুরি যাচ্ছিল… না ঝুট বলব না, এখন অবধি কোনো মোবাইল চুরি যায়নি…

– মোবাইল ফোন এলো কী করে…

আসে মহাবিষ্ণুজি আসে… অফিস থেকে ম্যানেজার ফোন করে বলল যে, আজ বাবা মুসত্মাফাপাড়া থানার ওসি অফিসে এসে সবাইকে খুব বকাবকি করে বোলাই বোসকে তুলে নিয়ে গেছে… ওর আসলি নাম নাকি মোবলাই বোস… কী সোববনাশ! এক মিনিটেই নিমেষে নাকি মোবাইল তুলে নেয়…

এই গোপাল তৈজস সিংকে শিগগির ডাকুন… এরপর তৈজস সিং পদবি পাল্টে আফিং হয়ে গেলে কিন্তু আমি জানি না… বাড়ি যাবেন না… এই তো বেহালা চৌরাসত্মা শোনাচ্ছিলেন… এমন ভাব করছিলেন যেন জায়গাটা গেস্নাবের উল্টোদিকে…

স্যার খোঁড়াখুঁড়িতে এখন সত্যিই তাই… গোপাল বললেন; কিন্তু লাখোটিয়াজি আমি কী করব… পুলিশের আর খেয়েদেয়ে কাজ নেই পুকুর চোরদের বাদ দিয়ে মোবাইল চোরদের ধরছে… ওদের তো কোমর ভেঙেছে – এখন এইসব।

গোপাল লাল হঠাৎ বলে উঠলেন, মাছের রাজা ইলিশ চোরের রাজা পুলিশ…

মি. বিষ্ণু বললেন সর্ব ধর্মান্ পরিত্যাজ্য, মামেকং শরণং ব্রজ…

মি. কাঞ্জিলাল আমি ওপরে যাচ্ছি… আপনি তৈজসকে ডেকে বেরিয়ে যান…

লাখোটিয়া হাত জোড় করে বললেন, মহাবিষ্ণু বিষ্ণুজি… আমার পুলিশ টানাপোড়েন হবে না তো… না বুঝে একটা চোরকে…

ধুত্তরি… নাকে তেল দিয়ে ঘুমোন গে যান…

মুকুল এলে, ওকে বসিয়ে রেখে আমায় ফোন করবেন…

দুটি চোখ উদ্ভাসিত করে লাখোটিয়া লাখ টাকার হাসি হেসে বললেন, ওই ওসিকে ভি আপনি চেনেন… আগেই বলছি আপনাদের অভ্যেস তো খুব খারাপ… বিষ্ণু বললেন, ওকে ঘুষ দিতে যাবেন না… আপনাকে কিন্তু তালে সঙ্গে নিয়ে যাবে… শুধু বলবেন, আপনি রবীন্দ্রসংগীতের খুব ভক্ত…

টেগোরের গানের দুটো ক্যাসেট দেব ওনাকে?

– সেই ঘুষই তো হলো… ইনকরিজিবল লাখোটিয়া।

তৈজস সিং সেলাম ঠুকে দাঁড়াল… নিজে পাইপটি ধরিয়ে ছড়া কাটলেন মহাবিষ্ণু, তৈজস সিং আজ মাতলে না আফিং – রাইট? লালজি কো ছোড় না হায় আজ। মেরা বরকন্দাজ – মি. তৈজস সিং থুরি আফিং!

 

দুই

লেন্টু সারখেল আবার সকালবেলায় চলে এলেন। তখন সকাল সাড়ে আটটা। ডাক-ঘণ্টা বাজল। তখনো কাঞ্জিলাল পৌঁছননি। তৈজস সিং দরজা খুলে দিলো। স্টাডির বাইরে ওয়েটিংরম্নমে বসিয়ে তৈজস ভেতরে গেল… বলল সাব লেন্টুবাবু আয়া –

অ্যাটর্নি বললেন বোগাস…

দুমিনিট বাদে আবার তৈজস সিং ভেতরে ঢুকে একটা চিঠি দিলো অ্যাটর্নির হাতে এক কাউন্সিলরের লেখা, পত্র-শিরে নাম লেখা আছে মুকুন্দ মুৎসুদ্দি, পৌর পিতা ওয়ার্ড নং…

তৈজস চিঠিটা কে দিলো?

ওই তো লেংটুবাবু…

মহাবিষ্ণু বিষ্ণু হেসে ফেললেন… বেড়ে বলেছ তৈজস… লেংটু নয় লেন্টু…

তৈজস বলল, জি সাব লেন্টু নয় লেংটু… মহাবিষ্ণু হাসছেন… আচ্ছা তোমার লেংটুবাবুকে আসতে বলো…

লেন্টু সারখেল ঢুকলেন, একগাল হেসে বললেন, স্যার যাক আপনি এখনো বেরোননি!

মহাবিষ্ণু বললেন, এই তো গোপালবাবু এলেই… বেরিয়ে গেলে তো আর পেতেন না, যাক মুকু মুখশুদ্ধি কে বলবেন…

লেন্টু আকর্ণ হেসে বললেন, স্যার মুকু নয় মুকুন্দ, মুখশুদ্ধি নয় মুৎসুদ্দি।

ওই হলো… এই কাউন্সিলর তো খুব সুন্দর করে কথা বলেন, তাই না? খুব ভালো-ভালো কথা বলেন… হ্যাঁ কাগজে পড়েছি… আজকাল তো ভালো কথা কেউ বলে না, সবাই গাল দেয়… কেউ-কেউ আবার ছেলেদেরও বলে বসেন পেট ফাঁসিয়ে বাচ্চা বের করে দেবেন… এর শুদ্ধ মুখ তো – তাই মুখশুদ্ধি বলেছি…

লেন্টু সারখেল গলা নিচু করে বলল, স্যার আপনার কিছু ভুল হচ্ছে… এ-মোটেই মুখশুদ্ধি নয়… মুৎসুদ্দিই… এও-তো খুব বাজে-বাজে গাল দেয়… আপনাকে বলছি… বলে দেবেন না যেন… এই তো সেদিন অন্য দলের এক মহিলা নেত্রীকে ড্যাকরা-মাকড়া… কত কি বলল… সেই নিয়ে লেন্টু গলা আরো নামিয়ে বলল,   কাগজে-কাগজে তোলপাড় আপনি দেখেননি?

মহাবিষ্ণু গলা নামিয়ে আকাশ থেকে পড়ার ভান করে বললেন তাই নাকি? তবে ভাই মুকুন্দ মুৎসুদ্দিকেই বলো আমি আজ যেতে পারছি না…

আচ্ছা লেন্টুবাবু কিছু মনে করবেন না? দেখুন, লেন্টু নামটা তো খুব কমন নয়… মহাবিষ্ণু ঘড়ি দেখেন এখনো কাঞ্জিলাল এলেন না, মুহুরি মতি মতিলালেরও খবর নেই… ততক্ষণ একে নিয়ে একটু খেলা যাক… লেন্টুবাবু আপনার নামটা কে রেখেছেন? বাবা না মা?

চোখ ছোট করে লেন্টু সারখেল কী যেন ভাবেন। স্যার এবার আমাকে কালচার করবেন। করম্নন। স্যার প্রথমেই বলে দেই যেমন নাগতলা থেকে নাকতলা… তেমনি স্যার আমি লেংটু থেকে লেন্টু। হাওড়া বিদ্যাপীঠের হেড স্যার পরমানন্দবাবু হায়ার সেকেন্ডারির আগে আমাকে লেংটু থেকে লেন্টুতে পরিবর্তন করেছেন।

মাকে তো দেখিইনি। আমাকে জন্ম দিতে গিয়েই নাকি ইহলোক থেকে ট্রান্সফার সার্টিফিকেট নিয়েছেন। আর বাবা! তাঁর আগেই ফিটিং ছিল আমায় ঠাম্মার জিম্মায় রেখে দুবছর বয়সেই আমায় ছেড়ে…

এখন খুব বাজে অবস্থায় রসপুরের ওইদিকে আছেন। অবশ্য রসেবসে আর নেই… একবার মনে হয় যাই বুড়োকে ছেনতাই করে নিয়ে এসে কলকাতায় আমার কাছে রাখি… জন্মদাতা পিতা বলে কথা… দায়িত্ব পালন করেনি… মাফ করে দিয়েছি – স্যার অপুষ্টিতে ভুগেছি… কাকারা দায়িত্ব নেয়নি… এক মামা আসতেন… তার পরে সেই নতুন মামি আমায় নিয়ে গেল… আপনাকে বলি, আমার এই জীবন নিয়ে একবার এক গল্পকারকে সিটিং দিয়েছিলাম… পুজোর সময় এরা সরি স্যার, এত গল্প পয়দা করে যে, গল্পের মশলায় টান পড়ে তো… উনি বড় কাগজে উপন্যাসের বরাত পেয়ে ছুটে এসেছিলেন, আমায় নিয়ে পড়েছিলেন… রসপুর নিয়ে গেলাম, বাগনান নিয়ে গেলাম, আমার স্কুলে নিয়ে গেলাম…

পাঁচশো পেয়েছিলাম… পরে আরো দেবেন বলেছিলেন। দেননি… উপন্যাস লিখে আমি খোঁজ নিয়েছি উনি পঁচিশ হাজার পেয়েছিলেন… তারপর বইমেলায় এই জ্যামত্ম আমি বই হয়ে গেলাম। স্টলে-স্টলে ঘুরলাম লেংটু কেন… ?

অনাথের আবার নাম… ? আসলে বুঝলেন গাঁয়ের পড়শিরা আমায় খুব আদর করতেন।  নিঃসমত্মান অনেকে আমায় দত্তকও নিতে চেয়েছিলেন… ঠাম্মা শেষদিন অবধি কাউকে দিতে চাননি… আমার মামা… সেই মামি… তারাও তো আর নেই…

লেন্টু সারখেল হাসলেন… বছর দশ অবধি আমার নাম ছিল খাউ… এটা ঘাউয়ের অপভ্রংশ… আমার চামড়া খুব খারাপ ছিল… খুব খোসপাঁচড়া হতো… সব জায়গায় চুন লাগানো থাকত অস্থানেও… ঘাউও বলত কেউ-কেউ। ভাগ্যিস ঘাউটা নাম হয়ে যায়নি। স্যার, আমি তো কোনো মহাপুরম্নষ নই… আমার নাম নিয়ে কালচার করছেন কেন?

কোনো চাকরি করেন?

না স্যার, এদিকে এই কলকাতায় এসেছি বছরসাতেক। এখন এই পুজোয় আছি। সব পুজোয়, শনি থেকে সত্যনারায়ণ। রাজনীতিতে আছি। দুই-একটা মিছিলে কখনো-সখনো হাঁটি। তবে স্যার গোলাম হইনি… আর স্যার জলসা করি… মানে প্রমোট করি… ফাংশন…

– পড়াশুনো?

– বিএ পাশ করেছি…

– চাকরি করবেন?

– আপনি তো আমায় চেনেন না! চাকরি দেবেন?

– যদি দেই? সার্টিফিকেটটা নিয়ে আসবেন? কিছুটা চিনলাম। বাকিটাও হয়ে যাবে।

– আনব স্যার!

– আপনার বাবার দ্বিতীয় সংসারে কে কে আছেন?

– একটা দজ্জাল বিধবা বোন। একটা অপদার্থ ভাই। ম্যাট্রিকটাও পাশ করেনি…

– বাবাকে কলকাতায় আনার ইচ্ছে হয়… ?

– স্যার, মাইরি বলছি, অমত্মত কলকাতায় এনে একবার চিকিৎসা করাতে চাই…

মহাবিষ্ণু বিষ্ণু ড্রয়ারটা খুললেন ডান দিকের। হঠাৎ দুশো টাকা বের করলেন। বললেন এই জামা-কাপড়ে নয় কিন্তু… একটা পরিষ্কার শার্ট-প্যান্ট পরে বুধবার আড়াইটায় দুনম্বর ওল্ড কোর্ট হাউস স্ট্রিটে আমার চেম্বারে আসবেন…

লেন্টু সারখেল হঠাৎ ঝুঁকে অ্যাটর্নির দিকে এগিয়ে গেল… আমি জানতাম, আপনি একটু অন্যরকম… বিশ্বাস করম্নন এতটা ভাবিনি… পায়ের ধুলো দিন পিস্নজ!

থাক থাক… হ্যাঁ এই দুশো টাকা রাখুন…

– স্যার এটা আবার কেন?

এটা খুঁটিপুজোর চাঁদা ধরে নিন। মহাবিষ্ণু হো-হো করে হেসে উঠলেন…

টুংটুং ডিংডং টংটং

ওই আমার স্যারেরা বোধহয় এলেন…

লেন্টুবাবু একটু তৈজস সিংকে বলুন দরজাটা খুলে দিতে… ভেতরে আছে?

 

দরজা খোলার আওয়াজ এবং কাঞ্জিলাল ও মতিলালের যুগল কণ্ঠস্বর শোনা গেল।

আচ্ছা একটা কথা লেন্টু, আপনার বাবার সংসার কী করে চলছে…

– চলে না তো…

– তবে?

– ও স্যার আপনি ভাববেন না। প্রতি মাসে আমি একবার করে যাই তো বাবার ওখানে…

 

তিন

মহিলা অসামান্যসত্মনা। বুকে দুই গন্ধমাদন পর্বত নিয়ে যেন তার রাসত্মা পার হতে, হাঁটতে বড় কষ্ট। আর গন্ধমাদন পর্বত বলেই বোধহয় বিশল্যকরণীর খোঁজে তিনটি হনুমান তার পিছু নিয়েছে, একটি হনুমানের ঘষা জিন্স, চোখে গগলস…

আর একটি অাঁতেল হনুমান কাঁধে ঝোলাব্যাগ, ধুতি-পাঞ্জাবি… তার চোখও পরিষ্কার সত্মন্যমান… তৃতীয়জন বোধহয় একটু ভীতু প্রকৃতির, তিনি একটু পশ্চাতে ইতসত্মত হাঁটছেন… জেরক্স সেন্টারের দিক থেকে তিনি…

বালীগঞ্জ সার্কুলার রোডের চারতলার এই জানলা থেকে ওপারের হাজরা রোডটা পরিষ্কার দেখা যায়। সামনের বাড়িটা প্রমোটার দখল নিয়ে ভেঙে ফেলেছে, দেড়তলা উচ্চতা পর্যমত্ম টিন, ফ্লেক্স দিয়ে ঘেরা… চারতলা থেকে এদিকের অনেকটাই তাই ফাঁকা… হাজরা রোডের ফাঁড়ির মুখটাও দেখা যাচ্ছে… মন্দিরটাও… এ-সময়টায় পাইপ ধরিয়ে একটু জানলায় দাঁড়িয়ে রাসত্মা, লোকজন দেখা মহাবিষ্ণুর অভ্যেস…

হাসতে-হাসতে মহালক্ষ্মী বিষ্ণু তখন এ-ঘরে ঢুকলেন। ঢুকেই ভ্রূকুঞ্চন করে বললেন, ও বাববা এই ব্যাপার… ওই পাহাড়বুকো মেয়েটাকে অ্যাটর্নিও দেখি চোখে হারাচ্ছে… কাগজে স্কুপ করে  দেবে কিন্তু বিখ্যাত অ্যাটার্নি মহাবিষ্ণু বিষ্ণু তার বৈষ্ণবধর্ম ছেড়ে সাত-সকালে আড়ি পেতে…

ওই মহিলার জানো ‘গীতাটা’ পুরো মুখস্থ…

– ওই গীতার টানেই বুঝি তিনটে হনুমান…

– না, ওটা বিশল্যকরণীর টানে…

– আচ্ছা বিশল্যকরণীতে কী কী ছিল?

হ্যাভ ইউ এনি আইডিয়া অ্যাবাউট ফার্মাকোলজি?

লক্ষ্মণের বুকে শক্তিশেল ঝেড়ে ছিল তো… রাবণ মহারাগে…

আমি বরম্নণ ডাক্তারকে জিজ্ঞেস করেছিলাম… ও কার্ডিওথোরাসিক সার্জন তো…

বলেছিল… লক্ষ্মণ ওয়াজ ইন শক… ফ্রম হেমোরেজ…

বুকে রক্তক্ষরণ নিশ্চয়ই হয়েছিল… ডানদিকের ফুসফুস? হার্ট? বিশল্যকরণীতে পেইনকিলার, অ্যান্টি-হেমোরেজিক,… অ্যানালেপটিক স্টিমুল্যান্ট কিছু থাকবে? আসলে লক্ষ্মণের ভেতরে, বুকের ভেতরে হয়তো কিছুই হয়নি… সীতার জন্য হাহাকার ছাড়া… বিশল্যকরণীর ব্যাপারটা হয়তো মিথ, ভাঁওতা… বা পস্ন্যাসিবো…

 

এ ক্ষেত্রে ব্যাপারটা অন্যরকম… গন্ধমাদন পর্বত দুটোই তো… হনুমানগুলোর বুকে শক্তিশেলের মতো বাজছে…

পাইপটা ঠোঁট থেকে সরিয়ে মহাবিষ্ণু ভ্রূকুটি করলেন… ম্যাডামের ব্রার সাইজটা কত হবে… আন্দাজ আছে?

ছিঃ

– ভালো লক্ষণ কিন্তু এগুলো মোটেই নয় অ্যাটর্নি?

তোমার পিএসএ-টা আরেকবার করাবে তো? অবশ্য ফোরটি টু এক্স… এল এও অাঁটবে বলে মনে হচ্ছে না… পরের দিন ক্লাবে এলে রিডাকসন ম্যামোপস্নাস্টির প্রসত্মাবটা বাতাসে ছেড়ে দিতে হবে। দেবও… পস্নাস্টিক সার্জন তো তোমার হাতেই রয়েছে।

তৈজস সিং এ-সময়ে কড়া নাড়ল…

সাব… মতিলাল সাব বোলাতা হায়। রাসেত্মাগি সাব আপকা ইমেত্মজার কর রহা হায়। মহালক্ষ্মী বিষ্ণু হেসে উঠলেন, বললেন তৈজস সিং তুমহারা বাবু তো বাচগায়া… লে যাও উসে… কর্তা-গিন্নি দুজনেই হেসে উঠলেন। মহাবিষ্ণু বললেন, ওই মহিলার নাম গীতা বশিষ্ঠ, কলেজের দিদিমণি – আমার মক্কেল সুস্থিত ওর স্বামী… ডিভোর্স চাইছে…

 

চার

অনমত্ম রাসেত্মাগি টেবিলের ওপর অ্যাটাচিটা রেখে একটু কায়দা করে খুলছিলেন… মহাবিষ্ণু যাতে একটা আন্দাজ পান। গলাকাটা কিন্তু সফল ন্যায়াধীশ হিসেবে মহাবিষ্ণুর বেশ নাম হাইকোর্ট চত্বরে। রাসেত্মাগি বাক্সভর্তি করে আজ সাজিয়ে টাকা এনেছেন… নিম্ন আদালতে যে-ছেলের যাবজ্জীবন হয়েছিল চার বছরের মাথাতেই হাইকোর্টে চক্কর দিয়ে বিষ্ণুজির কৃপায় একদোম বেকসুর…

চোখ সরিয়ে নিতে-নিতে মহাবিষ্ণু জটিল হাসি হেসে বললেন, রাসেত্মাগি চিট ফান্ডের টাকা এখনো সব শেষ হয়নি! তাই না… !

রাসেত্মাগি আকর্ণ হাসি বিছিয়ে বলে আপনি কী যে বোলেন স্যার… মাঝে-মাঝে আমি…

– আচ্ছা রাসেত্মাগি এ-শহরে আপনারা কতদিন আছেন?

– একথা কেন বলছেন স্যার… তিন পুরম্নষ ধরে আমরা পুরো কেলকাটান…

– কেলকাটান?

– হু!

আচ্ছা বিদ্যাসাগর কে জানেন? ঈশ্বরচন্দ্র…

রাসেত্মাগি হো-হো করে হাসি শুরম্ন করেন… দ্যাট শর্ট হাইট বিগ হেডেড ম্যান… রাইট… এখোন হলে কিন্তু স্যার উনি একদোম পাত্তা লাগাতে পারতেন না… কমন ম্যান রিচ্ করতে হলে এখন তো লোকাল কোমিটি লাগে… সিন্ডিকেট ভি লাগে… তোবে আই মাস্ট অ্যাডমিট উনি কোলেরা সোমন্ধে অনেক জানতেন… কোলেরার চিকিৎসা ভি করেছেন… কোতবার… কিন্তু নিজের একবার ভি হলো না… কি রেজিস্ট্যান্স…

অবাক চোখে তাকিয়ে আছেন মহাবিষ্ণু… রাসেত্মাগিকে দেখছেন… বললেন… বিদ্যাসাগর কোলেরা ভ্যাকসিন আবিষ্কার করেননি… ? করেছেন তো…

ওটা সাচ্ বলতে পারব না। নো আইডিয়া… তোবে স্যার আমি শুনেছি সোববাইকে দয়া করলেও নিজের পরিবারকে উনি কিন্তু একদম দয়া দেখাননি…

এ-সময়ে আসেত্ম, খুব আসেত্ম চিবিয়ে-চিবিয়ে কিছু একটা বলে ওঠেন মহাবিষ্ণু…

– কিছু বোললেন স্যার? বোলেন না, আমার বিদ্যাসাগর সোমন্ধে কিছুটা অ্যাকলোলেজমেন্ট তো আছে… খানিকটা তো জানি বোলেন?

– বলি? আপনি ভুল জানেন… আমি অ্যাটর্নি আপনাকে তো চার অক্ষরের গাল দিতে পারব না… আপনাকে আসেত্ম করে একবার ঢ্যামনা বলেছি কেমন! ঢ-এ য-ফলা আকার তারপর শুধু ম-না!

গলত বাত কিছু হয়েছে স্যার! সরি স্যার… আর হ্যাঁ, আমি কিন্তু আজ পুরা দেড় নিয়ে এসেছি… এটা কিন্তু স্যার আজ অবশ্যই লিবেন…

মহাবিষ্ণু বিষ্ণু বেশ গম্ভীর এখন। বললেন গলত বাত তো জরম্নর হয়েছে। আপনি আমাদের নাইনটিন্থ সেনচুরির মনীষী সম্পর্কে কিছুই জানেন না।

অ্যাটাচিটা আগে বন্ধ করম্নন। তারপর আপনাকে আরো কিছু কথা বলব। সং ক্ষেপেই বলব, নয় তো আমার দেরি হয়ে যাবে…

বিদ্যাসাগর সম্পর্কে একটি আকরগ্রন্থ আছে। নাম করম্নণা সাগর বিদ্যাসাগর। লেখক ইন্দ্র মিত্র। বইটির বেশ বিক্রি। কিন্তু লেখক জানিয়েছেন বিদ্যাসাগরকে নিয়ে লিখে, সেই বইয়ের বিক্রির রয়্যালটি তিনি নিতে পারবেন না… কেননা এটা বিদ্যাসাগর বেচে পয়সা হবে… (লেখকের) রয়্যালটি রামকৃষ্ণ মিশন পায়… তাঁর তেমনই ইচ্ছা।

বিশোয়াস করম্নন, মাঝে-মাঝে আমি আপনার কথা কুছু বুঝতে পারি না… বুঝে উঠতে পারি না…

পারার দরকার নেই। অর্ডারের কপি নিয়ে দুই-তিনদিন বাদে আসুন… তারপর অ্যাটর্নি আসেত্ম বললেন টেরটি পাবেন –

স্যার, গদগদ গলা রাসেত্মাগির… স্যার টাকা লিবেন না!

– না

– কিন… ও

– টাকাটা তুলে রাখুন… পরে অন্য কাজে লাগবে…

– কিনো, লিবেন না কিন… ও?

মি. রাসেত্মাগি আপনি ওই হাসপাতালের মর্গের ডোমকে কত ঘুষ দিয়েছিলেন? আপনি কত দিয়েছিলেন… আজ বাড়ি যান… ও-টাকায় রক্ত লেগে আছে রাসেত্মাগি!

চোখ বড়-বড় করে রাসেত্মাগি মহাবিষ্ণুর দিকে তাকিয়ে আছেন এখন… বলছেন আপনাকে বোঝা যায় না, কুছু বোঝা যায় না…

মহাবিষ্ণু বললেন… একটু অপেক্ষা করতে হবে… আপনাকে আমি আগে পুরোটা বুঝি… তারপর না-হয় আপনি আমাকে…

 

পাঁচ

দর্শনের অধ্যাপক সুস্থিত বশিষ্ঠর স্ত্রী গীতা বশিষ্ঠ আদালতে স্বামীর বিরম্নদ্ধে একটি চমকপ্রদ এবং অনির্বচনীয় নালিশ ঠুকেছিলেন। মাই প্রফেসর হাজব্যান্ড ইজ টোটালি ম্যাড, দো লার্নড ফিলোসফি মাচ মোর দ্যান আদার সাবজেক্টস, হিজ ওউন ফিলোসফি অব লাইফ ইজ ক্রিপল্ড ডিসটরটেড অ্যান্ড অ্যামিউজিং। হোয়াট হেল ক্যান দ্য বুক গীতা টেল টু এ ম্যান অব থার্টি-টু টু মেক হিম অ্যাকটিভ অ্যান্ড প্রোডাক্টিভ ইভেন হোয়েন এ বিউটিফুল মাস অব সেফলি ফ্লেস ইজ লাইং নেকেড বিসাইড হিম : মাইসেল্ফ হিজ ওয়াইফ গীতা অব টোয়েন্টি ফাইভ। হিজ ফিলোসফি নাইদার ক্যান অফার পিস টু মাই স্টরমি হার্ট নর ক্যান অ্যাপিজ মাই হাঙ্গার অব ইউথ। উইথ প্যাসেজ অব টাইম ইট ইজ বিকামিং ইনক্রিজিংলি ডিফিকাল্ট টু স্টে উইথ হিম। পিস্নজ হেল্প মি টু গেট রিড অব হিম উইথ এ ডিক্রি অব ডিভোর্স… অ্যাজ ইট ইজ রিভিল্ড বিয়ন্ড ডাউট দ্যাট হি ইজ গ্রস্লি ইন কম্পিট্যান্ট অ্যাজ এ হাজব্যান্ড ইন বোথ ওয়েস। দিস ইজ হোয়াই গার্লস আর ইউজিং মোর অ্যান্ড মোর লুক থ্রু ট্রান্সপারেন্ট ড্রেসেস অর পিঞ্চড অব টর্ন অব টপস অ্যান্ড ট্রাউজারস অ্যাট ইম্পরট্যান্ট অ্যানাটমিকাল সাইটস টু ইগনাইট ডরম্যান্ট মেল ভলক্যানোস…

 

সওয়ালের সময় হাসির হিলেস্নাল উঠেছিল কোর্টে…

গীতা বশিষ্ঠর ন্যায়াধীশ ব্রজসুন্দর ব্যানার্জি প্রথম দিন মহাবিষ্ণুর অনুপস্থিতিতে ফাঁকা মাঠে বেশ খেলেছিলেন…

মহাশয়ের কী নাম… ?

সুস্থিত বশিষ্ঠ…

কী বললেন অতিষ্ঠ বশিষ্ঠ…

না সুস্থিত…

সুস্থিত না ছাই… আপনার স্ত্রীর জীবন তো অতিষ্ঠ করে তুলেছেন! আপনার গীতার নাকি সব শেস্নাক মুখস্থ…

– সেটা কি অন্যায়?

– না অন্যায় কেন হবে! পাগলামি হবে। শ্রাদ্ধবাড়িতে গীতা পড়তে যান না? ভালো-ভালো সারাদিন চৌকো গীতা নিয়ে শুয়ে-বসে কাটান… ধর্মাবতার একটা ‘বই’ যে-কোনো মহিলার নিরবচ্ছিন্ন সতীন হয়ে উঠতে পারে… দর্শনের এই পাগলা অধ্যাপককে না-দেখলে আমরা বিশ্বাসই করে উঠতে পারতাম না…

পরের সওয়ালের দিন সুস্থিতর হয়ে আদালতে দাঁড়িয়ে মহাবিষ্ণু প্রথম রাউন্ডেই ব্রজসুন্দরকে নকআউট করে দিলেন… অদ্ভুত-অদ্ভুত দৃষ্টামত্ম তুলে গীতা বশিষ্ঠকে প্রায় যৌন বিকারগ্রসত্ম প্রমাণ করে তিনিও বললেন… হ্যাঁ, আমার মক্কেলও এর সঙ্গে থাকলে মারা পড়ে যাবেন… আর ওর পীড়নশৈলীর জন্য আমার মক্কেলকে মানসিকভাবে বিপর্যসত্ম হতে হয়েছে। কেসটা এখনো চলছে… প্রায় চার বছর হতে চলল… সুস্থিত এখনো গীতাকে ভালোবেসে চলেছে… ছাড়তে পারি কিন্তু কেন ছাড়ব… গোছের ব্যাপার চলছে… আর দুই ন্যায়াধীশ মনের আনন্দে যুগলি গেলে চলেছেন… গীতা বশিষ্ঠও ভাবছেন যেতে পারি; কিন্তু কেন যাব… তার আগে বাপু আরো কিছু মালস্নু খসাবো…

ফোনের ওপরে এখন সুস্থিত বশিষ্ঠর অস্থির গলা…

– হ্যালো

– ইয়েস অ্যাটর্নি বিষ্ণু স্পিকিং।

– স্যার, আমি আপনাদের বশিষ্ঠ বলছি… একটা অনুরোধ

আছে স্যার…

– মনস্থির করেছেন কী করবেন ঠিক!

– স্যার, ওটা নিয়ে এখন কিছু বলছি না। স্যার আমার একটা অনুরোধ আছে। গুঞ্জনটা আজ স্রেফ সুইসাইড করল স্যার –

– হোয়াট! কে?

– মাই পেট স্যার, গুঞ্জন!

– ওহ, তাই বলুন, আপনার ওই বাঘের মতো কুত্তাটা!

– স্যার, ওভাবে কেন বলছেন! ওর তো একটা নাম আছে স্যার ও আমার ফ্রেন্ড…

স্যার আপনি দয়াপরবশ… আমরা একটা কুকুরাধিকার কমিশন গড়ব স্যার… এ-অনাচার সহ্য হচ্ছে না স্যার। কুকুর প্রভুভক্ত নয়? মাস্টার তার চিকিৎসা হসপিটালে করতে পারে না, পারবে না এ স্যার কেমন নিয়ম। সিটিস্ক্যান হতে পারে… আর বৃক্কের গোলমাল হলেই সব গোলমাল…

– এই বশিষ্ঠ আমার সময় বড় কম… আটটার পরে আসুন…

স্যার আপনি তো শুনলেনই না, স্যার আমার একামত্ম ইচ্ছা ডগ রাইটস কমিশনের আপনি প্রেসিডেন্ট হন যদি…

– হোয়াট? আর ইউ ক্রেজি? হিউম্যান রাইটসই এখন…

বশিষ্ঠবাবু, আমি এখন ছেড়ে দিচ্ছি…

শুনে ভালো লাগল কুকুররাও আত্মহত্যা করছে… এবার শুধু আপনার ‘ইনার্ট’ ড্রাই গীতার শেস্নাকই শুধু থাকছে, আপনার সঙ্গে আর রক্ত-মাংসের গীতা… আপনার জন্য আমার গীতার খটমট শেস্নাক মুখস্থ করতে হয়েছে। এরপর আবার ডগশো…

– স্যার, পিস্নজ শুনুন। ফোনটা কেটে গেল। ডগশো তো নয়…

 

ছয়

মৃদঙ্গ মৌলিকের কলকাতার ট্যাক্সি ড্রাইভারদের ওপর একটা পূর্ণাঙ্গ উপন্যাস লেখার ইচ্ছে বহুদিনের। রোটারি সদনে মহাবিষ্ণু ফ্যান ক্লাবের অনুষ্ঠানের ব্যাপারে কথা বলতে এসেছিল সে… ফেরার সময় হাত তুলে ট্যাক্সি দাঁড় করাতে গিয়ে দেখল, প্রায় এক সপ্তাহ আগের ঘটনার অ্যাকশন রিপেস্ন – পাশে একটা চেনা প্রোফাইল – তাঁরও ওই ট্যাক্সিটাই প্রয়োজন। মৃদঙ্গ বোসদার দিকে না তাকিয়েই বলল, আমি আগে ডেকেছি – বোসদা বললেন, আরে মৃদঙ্গ তুই!

মৃদঙ্গ হেসে বলল, যাচ্ছেন কোথায়?

যাক দেখা হয়ে গেল… আমি ভাবছিলাম রোটারিতে এলাম… আর প্রেসিডেন্টের সঙ্গেই দেখা হলো না… চল্ আমি তোর সঙ্গে গিরীশ পার্ক অবধি যাই… বোসদা বললেন, আমার ড্রাইভারটা আর আজ এলো না, কিন্তু ট্যাক্সিটা দুজন দেখেই বোধহয় স্পিড বাড়িয়ে চলে গেল…

দ্বিতীয় ড্রাইভারের নাম বিজয় যাদব। প্রথম ট্যাক্সির            পেছন-পেছন সে আসছিল। মৃদঙ্গ সোদপুর বলতেও পালিয়ে গেল না। বোসদাও উঠলেন।

– তুই কি আমাকে দেখেছিলি আগেই মৃদঙ্গ?

– অফকোর্স

– তবে ও-কথা বললি কেন আমি আগে ডেকেছি…

মৃদঙ্গ হেসে বলল, ঠিক এক সপ্তাহ আগে আমার…

– আমার কী, চেপে যাচ্ছিস কেন বল…

– সেদিন বালীগঞ্জ ফাঁড়ির কাছে ট্যাক্সি হাত দেখিয়ে দাঁড় করালাম… সে একটু দূরে দাঁড় করাল… আর টুকুস করে তাতে বছর কুড়ি-পঁচিশের একটি মেয়ে উঠে গেল…

শেয়ালদার দিকেই সে যাবে, ট্যাক্সিওয়ালা আমি ছুটে গিয়ে সামনে দাঁড়াতেই বলল, এই বাবু আগে হাত দেখিয়েছেন…

আমিও এন্টালি যাব শুনে… বলল তার তাড়া আছে – শেয়ালদায় স্টেশনে ছেলে, কাজের মাসি ওয়েট করছে… নর্থবেঙ্গলের ট্রেন ধরবে…

ডা. বোস হাসছেন… মৃদঙ্গ মেয়ে দেখেই অমনি মৃদঙ্গ     বাজাতে-বাজাতে মেয়েটার পাশে গ্যাট হয়ে বসে গেলি…

– আমার লইয়ারও প্রথমে আমাকে তোমার মতোই বলেছিলেন…

– এই ব্যাটা এর মধ্যে লইয়ার আসছে কেন…

তাকে বলবি কেন কিছু হয়েছে…

– পরে বলছি তার আগে তোমার কথা বলো। কেমন আছ!

– এই চলছে। এখন একটা বাচ্চাকে দেখতে মাতৃমঙ্গল যাচ্ছি… হ্যা রে সুস্থিতর কী খবর রে!

– সে খুব মুষড়ে পড়েছে…

– কেন!

তার কুকুর আত্মহত্যা করেছে বাড়ির পেছনের পুকুরে…

– কুকুরের আত্মহত্যা? খুলে বল…

– আরে দাদা বাইরের একটা কুকুর কামড়ে দিয়েছিল তাকে… ভ্যাকসিন দেওয়া হলো… অ্যান্টি-বায়োটিক দেওয়া হলো… পারভোভাইরোসিস হলো বোধহয় পেছনের পাটা পড়ে গেল, সারাশরীরে অসহ্য যন্ত্রণা… পেইনকিলার দেওয়া হলো… যে-সুস্থিতকে দেখলেই সে কোলে উঠে পড়ত… চিৎকার করতে-করতে রাসত্মায় নেমে এলো সে – একটা ফোন ধরতে ভেতরে ঢুকেছিল সুস্থিত… আর সুযোগ পেয়ে থ্রি লেগ রেস দিয়ে একদম ওর বাড়ির পেছনের পুকুরে ঝাঁপিয়ে পড়ল… ব্যাটা আর উঠল না… খুব খোঁজা হলো… পাওয়া গেল না… দুদিন বাদে অন্যপাড়ে ভেসে উঠল সে।

মৃদঙ্গ বলে সুস্থিত একটা কুকুরাধিকার কমিশন বানাবে। আমি সই দিয়েছি…

বোসদা বললেন… আমি সইটা করব কোথায়? তোর পিঠে করে দি…

আরে শোন না আমার ল্যাব্রাডরটা শসা খায় জানিস তো… হঠাৎ সেদিন একটা শসা নজর করি নি দুজনের কেউই হঠাৎ গিলে ফেলেছিল। ব্যস তারপর পায়খানা বন্ধ, বমি… অন্ত্র অবরোধ…

‘অবলা জীবন’ নার্সিংহোমে নিয়ে গিয়ে ল্যাপারোটমি করলুম… ইলিয়াম কেটে শসা বের করলুম… সেলাই দিলুম… বেঁচে গেল, বাড়ি নিয়ে গেলুম।

তিনদিন বাদে ওরা আবার ডাকল… একটা কুকুরের হিসি আটকে গেছে… ওরা পেচ্ছাপের থলির পাথর ভেঙে দিয়েছিল… নিচে নেমে নালি আটকে দিয়েছিল… সুপ্রাপিউবিক… করলুম…

বাহ্ দাদা টু-ইন-ওয়ান। মানবশিশু শল্যচিকিৎসক পস্নাস  বড়কুত্তার ভেটেরিনারি সার্জন…

ডা. বোস হাসছেন…

তৃতীয় দিন ডাকতে বললাম… আর যাব না…

… আমি তো কুকুরের সার্জন নই। আমি কুকুরের কোয়াক… (এরপর সবাই কুত্তার সার্জন বলবে রোটারিয়ানকে ইগোতে লাগবে… মনে-মনে ভাবছি) আর হাসছি…

সেন্ট্রাল অ্যাভিনিউর দিককার রবিঠাকুরের বাড়ির রাসত্মার মহাতোরণের সামনে অশোকদা নামতেই… আমি বললাম, দাদা সাবধানে যাবেন… রাসত্মা ভুল করবেন না… ঠিকমতো বাড়ি ফিরে যাবেন… আমি ফোন করব…

বোসদা বললেন… তুই সাবধানে যা…

তুই কিন্তু লইয়ারের ব্যাপারটা চেপে গেলি… সেই ট্যাক্সির মেয়েটা… ?

– পরে তোমায় সব বলব… খুব চিমত্মায় আছি, টিভির খবরে জেনেছি মেয়েটা মিসিং আমি যতটা জানি… সেটা যদি কোনো কাজে লাগে ওদের –

ডা. বোস বললেন… সে কী রে… মেয়েটা শেয়ালদায় নামেনি…?

– জানা যায়নি এখনো… ট্যাক্সির নম্বরটা জানানো হয়েছে… ড্রাইভারকে পেলে হয়তো একটা আন্দাজ পাওয়া যাবে…

– আমি যাচ্ছি, সাবধানে থাকিস – কী যে হচ্ছে চতুর্দিকে…

 

সাত

মহাবিষ্ণু ফ্যান ক্লাবের অনুষ্ঠানে আজ অনেক রথী-মহারথী আসার কথা। আজ অ্যাটর্নি মহাবিষ্ণু বিষ্ণুর সত্তরতম জন্মদিন সাড়ম্বরে পালিত হবে। স্বভাবতই বিষ্ণুর গুণমুগ্ধরা বৈষ্ণব বলে পরিচিত। ব্রজসুন্দর ব্যানার্জি, রামসহায় রায়বর্মণদেরও আসার কথা। এমন মজা হয়েছে সুস্থিতকে ভার দেওয়া হয়েছে ব্রজসুন্দরকে নিয়ে আসার। মতি মতিলাল রাসেত্মাগিকে বলেছিলেন রায়বর্মণকে সঙ্গে করে নিয়ে আসতে… রাসেত্মাগি কিছুতেই রাজি হলো না… শেষমেশ পুরম্নষোত্তম লাখোটিয়া রায়বর্মণকে নিয়ে আসবেন ঠিক হয়েছে। রায়বর্মণ এবং মহাবিষ্ণু বিষ্ণু সেবার একসঙ্গে লাখোটিয়ার কেসে দাঁড়িয়ে ছিলেন তো জালানদের বিরম্নদ্ধে। মহাবিষ্ণু যথারীতি গোপাল এবং মতিকে খুব বকাঝকা করেছেন… না না, এসবের দরকার নেই।

গোপাল লাল কাঞ্জিলাল এবং মতি মতিলাল দায়সারা হেসে তখন জবাব দেয় – আমরা আছি নাকি… আপনার মক্কেলদের বলুন।

লেন্টু সারখেল গতকালও এসেছিলেন। তার খুব আনন্দ। এই অনুষ্ঠানে সেও শামিল হতে চায়। সাহেব মনে হয় এক কথায় তাকে ব্যাংকশাল কোর্টের কাজটা পাইয়ে দিয়েছেন… হঠাৎ কী হলো কে জানে, সাহেবের মাথায় কখন যে হঠাৎ দয়ার পোকা কিলবিল করে ওঠে… এভাবে যাকে-তাকে…

লেন্টুর হয়ে সাহেবকে ক্যাচটা কে দিলো! মহালক্ষ্মী বউদি? তাই হয়তো হবে লেন্টু সারখেলরা হলো ভুঁইফোঁড় ধান্ধাবাজ বউদির ফ্রি মেডিক্যাল ক্যাম্পে সেঁটে গিয়ে বোধহয়…

ওই রামসহায় রায়বর্মণ আসছেন। গোপাল এগিয়ে গেল, নমস্কার করল। আসুন স্যার, সাহেব পাশের ঘরে চায়ের আসরে তদারকি করতে গেছেন… একটু পরেই মতি মতিলালকে ফিসফিস করে রায়বর্মণকে কীসব বলতে শোনা গেল…

মৃদঙ্গ মৌলিক অনেক দূরে থাকেন। একটু আগেই সাহেবকে ফোন করে কী যেন বলছিলেন। হ্যালো রায়বর্মণ…

মহাবিষ্ণু এগিয়ে এলেন… রাসেত্মাগিটাকে ছেড়ে দিলে?

– কী আর করব দাদা… আপনি এমন নাটক করে জজ সাহেবকে ভড়কে দিলেন…

– শ্যোন অর্ডারের দিন আইমিন টু সে, ভারডিক্ট-এর দিন তুমি যাও আমি আর যাব না… একটা পিটিশন করো, করে বলো… স্যার আমার নিহত মক্কেলের নাবালক ছেলেটার কী হবে? বহুদূরে দাদামশায়ের কাছে সে আছে… ছেলেটার মায়েরও তো রহস্যজনক মৃত্যু হয়েছে… বিষপ্রয়োগ? অথচ ভিসেরাতে, স্টমাকে কোনো বিষ নেই… চেঞ্জ নেই… জেলা হাসপাতাল মর্গেতে… ডোম ফিট করা কিছুই নয়… আমি জানি…

দাদা সে কি?

রাসেত্মাগির বদ ছেলেটা বেঁচে গেল… আই ওয়াজ কমপেল্ড টু স্ট্যান্ডবাই হিস সাইড…

রাসেত্মাগি এমন একজনকে দিয়ে বলিয়ে ছিল…

রায়বর্মণ তুমি যে মাঝে-মাঝে এমন করো না, সমানে-সমানে লড়বে তো… ?

রায়বর্মণ হাসছেন। দাদা, আপনার ‘আমি যে আর সইতে পারিনে’র গুঁতোয় আমি আর কিছু যে কইতে পারিনে…

আমি টাকা নেইনি এখনো… স্কাউনড্রেলটার বাবা ব্যাগভর্তি করে টাকা এনেছিল… ওর ছেলের হাজতবাস রদের বিনিময়ে তোমার মক্কেলের অনাথ ছেলেটার ভবিষ্যৎ সিকিউরড হোক এটাই আমি চাই…

রায়বর্মণ আশ্চর্য গলায় বলল – দাদা!

মহাবিষ্ণু বললেন, নাও সণ্যাক্স নাও…

ব্রজসুন্দর ব্যানার্জি বললেন – হাই দাদা!

মহাবিষ্ণু হাসতে-হাসতে বললেন, এই তোমার মক্কেল গীতা সুন্দরীকে নিয়ে এসেছ?

ফর্টি টু এক্স এল… তাকে আমার পাশের রাসত্মায় মাঝে-মাঝে দেখি…

আমার মক্কেলের তো ভালোবেসে ‘বুকচাপা’ পড়ে মরার কথা ছিল… তা না শুকনো গীতা পড়ে-পড়ে মরল। দর্শনের পাগলা অধ্যাপক আবার নাকি কুকুরাধিকার কমিশন গড়বে? বোঝো ঠেলা। বলছে, ওর কুকুরও নাকি বুঝতে পেরেছিল ওর মনিব প্রতাপশালী, প্রভাবশালী… পারভোভাইরোসিসে শরীরময় জ্বালায় সে ছোটাছুটি করতে-করতে নাকি বুঝতে পেরেছিল তার মাস্টারও বোধহয় হাসপাতালে তাকে ভর্তি করে আবার একটা বিতর্ক সৃষ্টির তালে আছে… তাই সে ছুটে গিয়ে বাবুর পুকুরে ডুবে মরেছে…

সেরেছে ব্যানার্জি প্রথমেই ড্রিঙ্কস নিচ্ছ… শোন না, আমার গীতা ফ্যানাটিক অধ্যাপকটাকে এবার নিষ্কৃতি দাও আমার মক্কেলটাকে অনেক দুয়েছ ভাই…

এ-সময়েই হমত্মদমত্ম গোপাল লাল কাঞ্জিলাল এ-ঘরে ঢুকলেন… মতি মতিলালের মুখ-চোখেও চাপা উত্তেজনা…

ব্যানার্জি বললেন – হোয়াট হ্যাপেনড?

মহাবিষ্ণু বললেন – ও কিছু না, দুজনে তো আজ উচ্চিংড়ের মতো নাচছেন… মহালক্ষ্মী বিষ্ণুর ঝাড় খেয়েছেন নিশ্চয়ই!

আপনাদের ম্যাডাম আজকে আসবেন না বলে দিয়েছেন তো… ভালোই হলো… কী বলো ব্যানার্জি, রায়বর্মণ…

দাদা মাঝে-মাঝে কী যে বলেন… বউদি ছাড়া আসর হবে!

গোপাল লাল মলিস্নক, মতি মতিলাল দুজনে সমস্বরে বলল, স্যার ওসব কিছু না, কেলেংকারি হয়েছে –

গড়িয়াহাট থেকে পার্ক সার্কাস অবধি অবরোধ শুরম্ন হয়েছে… স্যার লেন্টু সারখেল আর নেই… তাকে একটু আগে ব্রড স্ট্রিটের মুখটাতেই… মলিস্নকদের মিষ্টির দোকানের সামনে… মোটরসাইকেল থেকে গুলি করে… কারা ঝাঁঝরা করে পালিয়ে গেছে…

 

আমায় একটু জল দেবেন মতি… ? গোপাল আমি এই চেয়ারটায় বরং একটু বসি। বুঝলে ব্যানার্জি, দিস গাই ওয়াস এ গুড ফাইটার… ব্যাংকশাল কোর্টে ওর চাকরিটাও হয়ে যেত… বাবা মুসত্মাফাপাড়া থানায় আমাদের পাঠানো অবজারভার বল রিসিভার বল মিস সোনালি মান্নার সঙ্গে আমি মনে-মনে…

সোনালি বাকিটা ওকে গড়েপিটে নিত।

উৎসবের আনন্দ এখন বেসুরো বাজছে বিষণ্ণ বীণায়! অ্যাটর্নি বলে উঠলেন হঠাৎ ও কৃষ্ণ, হোয়েন আই সি মাই ওউন পিপল আর রেডি ফর ওয়ার অ্যান্ড ইগার টু ফাইট মাই লিম্বস কোয়েইল, মাই মাউথ ইজ পার্চড, মাই বডি কুইভারস অ্যান্ড…

ঘেমে নেয়ে বিধ্বসত্ম দর্শনের অধ্যাপক সুস্থিত এ-সময়েই গেট পেরিয়ে ঢুকতে-ঢুকতে বললেন… এদিকে নিশ্চয়ই কিছু একটা হয়েছে…  ব্রড স্ট্রিট, বন্ডেল রোডের দিকটায় পুলিশে-পুলিশে ছয়লাপ…

পার্ক সার্কাস থেকে হেঁটে আসছি ঘুরে-ঘুরে… তারপরই বিভ্রামত্ম হেসে বললেন… ও স্যার, এ তো গীতার ওই জায়গাটা… সীদমিত্ম মম গাত্রানি,

মুখং চ পরিশুষ্যতি বেপথুশ্চ শরীরে মে…

শেয়ার করুন

Leave a Reply