ক্লাউনের মতো কাঁদছি

লেখক:

বো র হা ন উ দ্দি ন খা ন জা হা ঙ্গী র

পারভীন ওয়াইন সিপ করতে করতে গান শুনছে। এই গান আমাকে ও পারভীনকে পেছনের দিনগুলোতে ফিরিয়ে নিচ্ছে।
পেছনের দিন। হায়রে পেছনের দিন। আমি ওয়াইন সিপ করতে থাকি, আর পারভীনকে দেখতে থাকি। আমার বন্ধু পারভীন, বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার বন্ধু পারভীন। বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়া শেষ করে পারভীন সিভিল সার্ভিসে যোগ দিয়ে ফরেন সার্ভিস পেয়ে যায়। আর আমি ইংল্যান্ডে পড়াশোনা শেষ করে ইংল্যান্ডের এক বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসেবে যোগ দিই। এক হিসেবে দুজনেরই বিদেশবাস। পারভীনকে মধ্যে মধ্যে জিজ্ঞেস করি, কেন বিয়ে করছ না?
পারভীন হেসে বলে, যে-কারণে তুমি করছ না। পারভীন কয়েক লহমা চুপ থেকে ফের বলে, বিয়ের মধ্যে নানান ঝামেলা।
তা ঠিক।
এই তো বেশ আছি।
কখনো কখনো নিঃসঙ্গ বোধ করি।
নিঃসঙ্গতার জবাব?
কে জানে।
বিয়ে?
বোধহয় না।
আমরা চুপ হয়ে যাই। গান শুনতে থাকি। সোফায় পিঠ ঠেকিয়ে আরাম করে বসি। ওয়াইন সিপ করতে আরো ভালো লাগে।
তুমি আরো সুন্দর হয়েছ।
তুমিও।
অনেকগুলি বছর কেটে গেল।
মানুষ বদলায়।
পারভীন একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে। ফ্রেঞ্চ ডোর খুলে বারান্দায় চলে যায়। আমিও পিছে পিছে আসি। হঠাৎ পারভীনের দিকে তাকাই। পারভীনের চোখ পানিভরা।
পারভীন আস্তে আস্তে বলে, কিছু মনে করো না। নিজেকে আমি ভুলে গিয়েছিলাম।
ফের একটা দীর্ঘশ্বাস তার ভেতর থেকে উঠে এসে আমাকে জড়িয়ে ধরে। যেন স্মৃতি, অনেক অনেক স্মৃতি।
পারভীন থেমে থেমে বলে, আমরা আর তরুণ নই।
আমিও থেমে থেমে বলি, আমরা আর তরুণ নই।
কয়েক মিনিট পারভীন ওয়াইন সিপ করতে থাকে, আর গান শুনতে থাকে।
তারপর পারভীন বলে, জানো সাজ্জাদ, তুমি যখন কোনো পার্টিতে থাকো, নাচের মধ্যে থাকো। খুব সম্ভব একটা সেøা ডান্স, সেই মানুষটার সঙ্গে তুমি নাচছ, যার সঙ্গে নাচতে চাও, বাকি রুমটা মিলিয়ে গেছে। সত্যি সত্যি মিলিয়ে যায় না। মিলিয়ে যায় না। তুমি জানো কোনো লোকই যে-মানুষটা তোমার হাত ধরে আছে, তার মতো নয়। তবু কোনো লোকই, তোমাকে ছেড়ে দিতে চায় না। কেউ তোমাকে একা ছাড়তে চায় না। তারা চিৎকার করছে, তোমার চোখে চোখ চেয়ে হাসছে। সব ব্যাপারটা কেমন যেন। তুমি একা তোমার মানুষটার সঙ্গে নাচতে পারছ না। বুঝতে পারছ কি আমি বলতে চাচ্ছি। একেই বলে নিঃসঙ্গতা।
আমি না বলে পারি না, সত্যি সত্যি কঠিন কোথাও থিতু হয়ে থাকা।
আমি ফের বলি, কোথায় থিতু হওয়া। কোথাও না।
পারভীন আমার দিকে পিছন ফিরে বাইরে তাকিয়ে থাকে। অনেকক্ষণ কথা বলে না।
আচমকা বলে ওঠে, এই গানটা আমার পছন্দ : এপ্রিল ইন প্যারিস।
এই গানটা আমারও পছন্দ।
তারাগুলোর দিকে তাকিয়ে পারভীন বলে, এই রেকর্ডটা তুমি আমাকে প্রেজেন্ট করেছিলে।
পারভীন ফের বলে, তুমি আমার সঙ্গে নাচতে চাও?
হ্যাঁ।
আগের মতো?
হ্যাঁ।
আমরা ওয়াইন গ্লাসগুলো ভেতরে টেবিলের ওপর রাখি। তারপর নাচতে শুরু করি। সেøা নাচ। শব্দগুলো সেøা নাচের সঙ্গে মেলানো। আমি পারভীনকে আমার সঙ্গে জড়িয়ে রাখি। আমার অনুভূতিগুলো তার শাড়ির গন্ধ, তার চুল, তার ত্বকের উদাস করা উচ্ছ্বাসে ভরে যায়।
পারভীন আমার চোখে চোখ রেখে বলে, ভালো লাগছে, না?
আমি চোখ বুজে দূরে উড়ে যাই, হ্যাঁ।
কথা পালটানো দরকার। নয়তো পুরনো গল্প ঘিরে ধরবে। সেটা মারাত্মক হবে।
আমরা কেউই পুরনো গল্পে ফিরে যেতে চাই না। আমিও না। পারভীনও না।
পুরনো গল্পে ফিরে গিয়ে কী হবে। যে-গল্প একবার শেষ হয়েছে, সেখানে ফিরে গিয়ে কী হবে। না-ফেরাটা ভালো।
আমি আচমকা বলে বসি, তুমি কাজু ইসিওরোর লেখা পড়েছ?
সব না, কিছু কিছু।
নকটার্ন পড়েছ? গল্পের বই।
গান ও রাত আসার পাঁচটা গল্প।
আমি ভুলতে পারি না।
পারভীন ফের আস্তে আস্তে বলে, আমাদের জীবনে রাত্রি এসে গেছে। এই রাত্রির দিকে তাকালে তারা দেখা যায় না।
আমি বলে উঠি, তুমি তারা দেখতে চাও?
না।
অনেক রাত্রে ডিনার শেষ করে পারভীনের অ্যাপার্টমেন্টে ফিরে আসি।
পারভীনের বসবার ঘরটা সাজানো। ঢাকা থেকে পারভীন একজন বাবুর্চি নিয়ে এসেছে। বাবুর্চি রান্নাবান্না করে, ঘর মোছামুছি করে আর পারভীনের যতœ করে। বাবুর্চি বাপের বাড়ির পুরনো লোক।
পারভীন সোফায় গা এলিয়ে দিয়ে বলে, বিছানায় যাবার আগে একটু রেড ওয়াইন খাবে?
আমি বলি, মন্দ হয় না।
দুটো গ্লাসে পারভীন ওয়াইন নিয়ে আসে। পারভীন আমার গ্লাসে ওয়াইন ঠেকিয়ে বলে, সুন্দর হোক জীবন।
আমিও বলি, সুন্দর হোক জীবন।
ছোট টেবিলের ওপর একটি চিঠি পড়ে আছে। পারভীন চিঠিটা তুলে নিয়ে বলে, পড়ি?
আমি বলি, স্বচ্ছন্দে।
পারভীন বলে ওঠে, চিঠিটা আমার এক ডাচ বন্ধুর। আমার খুব ঘনিষ্ঠ।
ঘনিষ্ঠতা ভালো।
চিঠিটা দু-লাইনের।
‘আমি আমার সবচেয়ে সুন্দর চিন্তা তোমার জন্য পাঠাচ্ছি। আমার বিশ্বাস জবাব দিতে দেরি করবে না।
তোমার বন্ধু, তোমার আপনজন।
ডেলাম।’
পারভীন বলে, পড়বে?
তোমার চিঠি। আমার পড়া তো উচিত নয়।
ওই যে আমরা কথা বলছিলাম : নিঃসঙ্গতার। তার জবাব। নিঃসঙ্গতার কোনো জবাব হয় না।
ডেলাম তো সাজ্জাদের জবাব না।
জানি। তবু।
পারভীন আস্তে আস্তে বলে, অনেক রাত হয়েছে। ঘুমুতে চল।
ওয়াইন গ্লাসটা নাড়াচাড়া করে আমি বলি, চল যে যার বিছানায় যাই।
এক বিছানা তো হয়নি।
তার জন্য অনুতাপ নেই।
আমি বলে উঠি, পারভীন পারভীন।
পারভীন বলে ওঠে, সাজ্জাদ সাজ্জাদ।
একটা শান্তির মধ্যে আমি আস্তে আস্তে ঘুমিয়ে যাই। আমার ঘুম ভাঙে ভোরের আগে, এখন আকাশ মুক্তোর মতো শাদা। যখন পাখিরা গা-ঝাড়া দিয়ে ওঠা শুরু করেছে। একটা জেট প্লেন খুব নিচু দিয়ে উড়ে চলেছে। কোথাকার একটা চাঁদ প্রতিবেশীর মেপল গাছটার আড়ালে ডুবতে চলেছে। হায় রে পারভীন, হায় রে আমি কোথায়।
জানি পাশের রুমে পারভীন শুয়ে আছে। ওর ভালোবাসার বেড়ালটা ওর হাতের ওপর ঘুমিয়ে।
নাস্তার টেবিলে পারভীনকে দেখি চোখ ফোলা ফোলা। হয়তো ভালো ঘুম হয়নি।
ঘুমোওনি।
ঘুম হয়নি ভালো।
আমার উচিত তোমার ভালোবাসার বেড়াল হওয়া।
হলেও, ঘুম হবে তা ঠিক না।
শরাফত বলে ওঠে, টেবিলে একটা চিঠি রেখে দিয়েছি।
দেখেছি।
ভদ্রলোক ভালো বাংলা বলেন।
বাংলা শুনে তোমার পছন্দ হয়েছে।
আপা।
কি রে।
আজ আপনার বড়ো ম্যাডাম আসবেন না?
আসবেন।
রাত্রে খাবেন। স্পেশাল কিছু রাঁধব?
না। বাইরে খাওয়াতে নিয়ে যাব।
আমার বস, পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে শরাফত, বড়ো ম্যাডাম বলে।
বড়ো ম্যাডামকে শরাফত ভয় পায়।
পারভীন বলে ওঠে, আমাকে একবার অফিসে যেতে হবে।
তা যেও।
আমরা একসঙ্গে এয়ারপোর্টে যাব। মন্ত্রীকে আমি রিসিভ করব। আর তোমাকে বিদায় জানাব।
মন্ত্রী ঢাকা থেকে আসছেন, না?
হ্যাঁ।
তোমার মন্ত্রী অধিকাংশ সময় ঢাকার বাইরে থাকেন।
তা ঠিক।
মন্ত্রীদের চলাফেরার ব্যাপারে কিছু বলতে নেই। আমি কখনো বলি না।
পারভীন ফের বলে ওঠে, অফিসে টেলিফোন করে বলে দিয়েছি।
কী বলেছ।
একটার মধ্যে আমি নিজের গাড়িতে এয়ারপোর্টে রওনা হব।
আর।
সেকেন্ড সেক্রেটারি অফিসের গাড়ি নিয়ে এয়ারপোর্টে চলে যাবেন। ম্যাডামের জিনিসপত্র তুলে নিতে।
তোমার ভালো লাগে এসব কাজ করতে।
ব্যাপারটা ভালো লাগা কিংবা ভালোলাগা না।
তাহলে।
এটা চাকরি, চাকরির ধরন।
আমি হেসে ফেলি।
এয়ারপোর্টের কাছে এসে পারভীন গাড়ি সেøা করে।
তোমার মনে আছে একটা সিনেমার কথা।
কোনটা বলো তো।
আমরা দুজন লন্ডনে দেখেছিলাম।
মনে পড়েছে।
যেদিন ক্লাউন…
সিনেমাটার নাম। যেদিন ক্লাউন কেঁদেছে।
পারভীন গাড়ি থামায় এয়ারপোর্ট পার্কিংয়ে।
পারভীন বলে ওঠে, আমরা দুজনই ক্লাউনের মতো জীবন কাটাচ্ছি।
তোমার তাই মনে হয়?
হ্যাঁ তাই।
যেদিন ক্লাউন কেঁদেছে : আমরা দুজনই ক্লাউনের মতো জীবন কাটাচ্ছি।
পারভীনের হাত ধরে আমি এয়ারপোর্টে প্রবেশ করি। তারপর দুজন দুদিকে চলে যাই।
পারভীন তার বসকে রিসিভ করতে, আর আমি পারভীনকে ছেড়ে লন্ডন ফ্লাইটের দিকে।
যেদিন ক্লাউন কেঁদেছে : আমরা দুজন ক্লাউনের মতো কেঁদেছি। আমাদের দুজনের তাই মনে হয়।
আমাদের বুকের মধ্যে খুবসম্ভব কান্না।
বুক খুলে কান্না কে দেখাতে চায়।
ক্লাউনের কান্নাও কেউ দেখতে চায় না।

শেয়ার করুন

Leave a Reply