ক্ষরণ

লেখক:

হরিশংকর জলদাস

দেবর্ষির শাশুড়ি আজ মারা গেলেন। মিত্রা দত্তের মৃত্যু বড় ধন্দে ফেলে দিলো দেবর্ষিকে। সবে ক্লাসটি শেষ করে ডিপার্টমেন্টে এসে বসেছে, অমনি রিংটোনটা বেজে উঠল। বিরক্তিতে তার চোখ-মুখ কুঁচকে উঠেছিল – আহ, এই সময়ে আবার কে ফোন করল? ধরব, ধরছি করে ফোনটা ধরল না দেবর্ষি।

আজকে ক্লাসটা বড় বাজেভাবে নিতে হলো। একাদশ শ্রেণির ক্লাস। সবে ভর্তি হয়েছে ওরা। ‘এ’ সেকশনের স্টুডেন্টগুলো নাকি খুব বেয়াড়া, কথা শোনে না, পড়াবার সময় পেছনের বেঞ্চি থেকে আওয়াজ দেয় – বলেছেন শাহনাজ ম্যাডাম। গত পরশু ক্লাস থেকে ফিরে প্রায় কেঁদেই দিয়েছিলেন তিনি। বয়সী মহিলা, অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসর। জানাশোনাও প্রচুর তাঁর। বইটই পড়েন। তাঁর যদি এই অবস্থা হয়, তাহলে তার কী অবস্থা হবে – ক্লাসে যাওয়ার আগে ডিপার্টমেন্টে বসে ভাবছিল দেবর্ষি। ওই বেয়াড়া ক্লাসেই যে আজ তার পড়ানো। ভর্তির পর ওদের ক্লাসে আজকেই প্রথম যাবে দেবর্ষি।

দেবর্ষির মধ্যে একটা ভরসা আছে, সে তার ব্যক্তিত্ব। প্রয়োজনে সে তার চোখে-মুখে এমন কাঠিন্য আনতে পারে যে, যে-কোনো কঠিন ধাঁচের ছাত্রও ভড়কে যায়। শাহনাজ ম্যাডাম তার মতো নয়। স্নেহপ্রবণ, মায়াবতী চেহারা।

রূঢ় একটা মানসিকতা নিয়ে ক্লাসে গিয়েছিল দেবর্ষি। রোলকল শেষ করার পর ‘সাহিত্যপাঠ’টি হাতে তুলে নিয়েছিল সে। সে ঠিক করে এসেছে – মোপাসাঁর ‘নেকলেস’ গল্পটিই পড়াবে। ছাত্রছাত্রীদের সামনে দাঁড়িয়ে মনটি আপনাতেই শান্ত হয়ে এলো দেবর্ষির। রোলকল করতে-করতে কখন যে তার ভেতরের ক্রোধ কমতে শুরু করেছিল, টের পায়নি দেবর্ষি। বইটি হাতে নিয়ে সে টের পেল – সে যেন এক হেমন্তের সকালে মেটে পথ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে। পথের দুধারের ঘাসে আবছা শিশির বিন্দু, গাছের পাতায় মিষ্টি রোদের খেলা। সে যেন শুনতে পাচ্ছে জসীম উদ্দীনের কবিতাটি – রাখাল ছেলে, রাখাল ছেলে বারেক ফিরে চাও…। হঠাৎ দেবর্ষি সংবিতে ফিরল। জানালার ওপাশে গাছের ডালে একটি কাক কর্কশ কণ্ঠে তখন কা-কা করছে।

ডানে-বাঁয়ে মৃদু মাথা ঝাঁকাল দেবর্ষি। শিশিরে সবুজে-আলোতে মাখা মন নিয়ে পড়াতে শুরু করল সে। বলল, ‘আজ তোমাদের এমন একটি গল্প পড়াব, যেটার লেখক একজন বিদেশি এবং সে-গল্পটির নাম নেকলেস। নেকলেস শব্দটির অর্থ জানো তো? নেকলেস মানে হার।’

শান্ত ক্লাসটির পেছন বেঞ্চি থেকে হঠাৎ আওয়াজ ভেসে এলো, ‘হার মানে পরাজয় ম্যাডাম?’

 

দেবর্ষির চট করে পেছনের বেঞ্চিতে চোখ চলে গেল। ছেলেটাকে রিকগ্নাইজ করতে পারল সে। কিন্তু তখন কিছু বলল না তাকে। নিজেকে শান্ত রেখে বলল, ‘না। এই হার মানে পরাজয় নয়। এই হার মানে এক ধরনের অলংকার। মেয়েরা গলায় পরে।’

‘পুরুষরা পরে না?’ আগের ছেলেটার পাশের জন হাইবেঞ্চে মাথা ঠেকিয়ে বলে উঠল।

দেবর্ষির মাথাটা কি একটু গরম হয়ে উঠছে? শান্ত থাক, শান্ত থাক দেবর্ষি – নিজেকে বোঝাল। ছেলেটির দিকে তাকিয়ে বলল, ‘তোমার বাবাকে দেখে বোঝনি, পুরুষরা হার পরে কিনা?’ তারপর ক্রোধকে মাথা থেকে হৃদয়ের দিকে ঠেলে দিয়ে বলল, ‘নেকলেস নারীরই ভূষণ’। পেছনের বেঞ্চির তিন-চারজন একসঙ্গে বলে উঠল, ‘ঠিক, ঠিক’। তারপর একজন বলল, ‘ভূষণ মানে কী ম্যাডাম?’

মনটা খিচড়ে গেল দেবর্ষির। চেহারায় গাম্ভীর্য ঢেলে ইয়ার্কি মারা ছাত্রগুলোর দিকে তাকিয়ে থাকল কিছুক্ষণ। এর পর তাদের দিকে ধীরপায়ে হেঁটে গেল। কাছে গিয়ে বলল, ‘তোমরা আমার পেছন-পেছন আসো।’

ডায়াসের কাছে এসে সামনের বেঞ্চের সুবোধ ছাত্রদের বলল, ‘তোমরা পেছনের বেঞ্চিতে গিয়ে বস। আমার অনুরোধ।’

আর বেয়াড়াদের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘আজ থেকে তোমরা এই বেঞ্চিতে বসবে।’

এরপর ক্লাস একেবারে শান্ত হয়ে গেল। কিন্তু দেবর্ষি আর আগের অবস্থায় ফিরে যেতে পারল না। বিক্ষুব্ধ মনটাকে সে আর বাগে আনতে পারল না। কোনোরকমে ক্লাসটি শেষ করে ডিপার্টমেন্টে ফিরে এলো। বসতে না বসতেই ওই ফোন। বিক্ষিপ্ত মন নিয়ে তাই প্রথমবার ফোনটি ধরল না।

কিন্তু দ্বিতীয়বার রিংটোন বাজতেই আলতো হাতে মোবাইলটি অন করল দেবর্ষি। ওপার থেকে কে যেন বলল, ‘দেবর্ষি না? দেবর্ষিই তো? আজ সকাল নটার দিকে তোমার শাশুড়ি মারা গেছে।’ দেবর্ষির উত্তর শোনার জন্য মোবাইলের ওপারে প্রবীণাটি অপেক্ষা করছিল।

দেবর্ষি মহিলাটির কথার খেই ধরতে পারল না। ক্লাসের অস্থিরতা তার মধ্যে তখনো কাজ করছিল। ওই অবস্থাতেই দেবর্ষি বলল, ‘কে বলছেন? কোন শাশুড়ি? কার মৃত্যুর কথা বলছেন?’ কণ্ঠটি তার একটু উঁচু গ্রামেই উঠে গিয়েছিল। ভাগ্যিস আশপাশে কেউ ছিলেন না তখন। সবাই ক্লাস নিতে গেছেন।

ওপার থেকে কণ্ঠ আবার ভেসে এলো, ‘তোমার কজন শাশুড়ি? কবারই বা বিয়ে হয়েছে তোমার?’

নিজের অজান্তেই যেন ফোনটা কেটে দিলো দেবর্ষি। যে-জীবনকে ভুলে থাকার জন্য অবিরাম নিজের সঙ্গে যুদ্ধ করে গেছে দেবর্ষি, সে-জীবনটা আবার সামনে এসে দাঁড়াল আজ। কে এই প্রবীণা? কেন এই মহিলা তাকে কুরুক্ষেত্রের মাঝখানে দাঁড় করিয়ে দিলো? যে-বেদনাকে চার-চারটি বছর মনের ভেতর পাথরচাপা দিয়ে রেখেছিল দেবর্ষি, সেই বেদনা আবার দাঁত-মুখ খিঁচিয়ে তাকে ভেংচি কাটতে শুরু করল।

কী অসাধারণভাবেই না সুরজিত দত্তের সঙ্গে জীবনটা শুরু হয়েছিল তার। বছর দেড়েক অপার আনন্দে কেটেছিলও

দাম্পত্য-জীবনটা। একটা সময়ে এই মিত্রা দত্ত তার জীবনে কাঁটা ছড়াতে শুরু করলেন। কাঁটার খোঁচা সইতে-সইতেও দত্ত পরিবারটিকে আঁকড়ে রেখেছিল সে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ওই সংসারে আর টিকে থাকতে পারল না দেবর্ষি। মায়ের সঙ্গে সুরজিত দত্তও মিশেছিল।

 

দুই

নলিনী দাস রোডের ৪৭ নম্বর বাড়িতে এসে উঠেছিল দেবর্ষিরা। দেবর্ষিরা মানে – দেবর্ষি, বাবা, মা আর একমাত্র ভাই অরিন্দম। তেতলা বাড়ির দোতলায় থাকত দেবর্ষিরা। বাড়ির মালিক সুরঞ্জনবাবু নির্ঝঞ্ঝাট ফ্যামিলি চাইছিলেন। দেবর্ষির বাবার সঙ্গে কথা বলে ভালো লেগে গিয়েছিল সুরঞ্জনবাবুর। সোমনাথবাবুর অবসরে আসতে তখনো অনেক দেরি। ওই সময় দেবর্ষি নাইনে আর অরিন্দম ফাইভে। দেবর্ষির স্পষ্ট মনে আছে, এক শীতসকালে ও-বাড়িতে এসে উঠেছিল ওরা। ব্রিকফিল্ড রোডের বাড়িটা ছেড়ে আসতে মোটেই কষ্ট লাগেনি ওদের। বাড়ির মালিকান নূরজাহান খাতুন বড় কষ্ট দিত তাদের। নির্ধারিত সময়ে পানি দিত না, রাত দশটার পরে মেইন গেট বন্ধ করে দিত। সোমনাথবাবুর সওদাগরি অফিসে চাকরি। ফিরতে-ফিরতে প্রায়ই দশটা পেরিয়ে যেত। মেইন গেট খুলে দিতে বড়ই খিটিমিটি করত নূরজাহান খাতুন। নতুন কোনো অতিথি এলে কে এলো, কেন এলো – এসবের হিসাব দিতে হতো তাকে। শেষ পর্যন্ত বাবা-মা অতিষ্ঠ হয়ে নলিনী দাস রোডের এই বাড়িটি বেছে নিয়েছিলেন।

সুরঞ্জনবাবুর স্ত্রীকে নিয়ে বড় ভয় ছিল দেবর্ষির মায়ের মনে। যদি উনি নূরজাহানের মতো হন। কিন্তু প্রথম দিনেই সেই ভুলটা ভাঙিয়ে দিলেন অলকা জেঠিমা। হ্যাঁ, জেঠিমাই ডাকতে বলেছিলেন মা, সুরঞ্জনবাবুর স্ত্রী অলকা দেবীকে। নিচতলায় থাকেন জেঠা আর জেঠি। দুজন ছেলে তাঁদের। একজন আমেরিকায়, অন্যজন কানাডায় থাকে। বয়সও কম নয় তাঁদের। সিঁড়ি বেয়ে ওঠা-নামার ঝক্কি থেকে বাঁচার জন্য নিচতলাটাই বেছে নিয়েছেন তাঁরা। তাতে বাড়িটাও পাহারা দেওয়া হয়। তাঁদের বাড়িটার নাম অলকানন্দা। দেবর্ষিরা যেদিন অলকানন্দায় ঢুকল, সেদিন হাসিমুখে মূল দরজায় দাঁড়িয়ে ছিলেন জেঠি। দেবর্ষি আর অরিন্দমের চিবুকে সোহাগের ডান হাতটা ছুঁইয়ে ছিলেন। মাকে দাঁড় করিয়ে বলেছিলেন, ‘আজকে দুপুরে আবার রাঁধতে যেও না তুমি। বাসাবদলের ঝামেলাটা আমি বুঝি। কোথায় ডেকচি-পাতিল, কোথায় মশলা-আনাজ! তুমি দুপুরে কর্তা আর ছেলেমেয়ে নিয়ে আমাদের এখানে খাবে।’ দেবর্ষির মা কী একটা যেন বলতে চেয়েছিলেন। জেঠিমা ডানহাত তুলে বলেছিলেন, ‘প্রথমদিন। আমার অনুরোধটা ফেলে দিও না।’ বলে মাকে জড়িয়ে ধরেছিলেন অলকা জেঠি। দেবর্ষি পরে বুঝেছিল – কন্যা বা পুত্রবধূদের জন্য তাঁর বুকে খালি একটা অতৃপ্তির জায়গা ছিল। মাকে দিয়ে সেই জায়গাটা পূরণ করতে চেয়েছিলেন জেঠি। সেদিন দেবর্ষির মা পা ছুঁয়ে অলকা দেবীকে প্রণাম করেছিলেন।

অলকা দেবী আর সুরঞ্জনবাবু সত্যি সোমনাথবাবুর পরিবারটিকে বড় ভালোবেসে ফেলেছিলেন। যেদিন পোয়াতি দেবর্ষি শ্বশুরবাড়ি থেকে শেষবারের মতো চলে এলো, সেদিন কী কান্নাটাই না কেঁদেছিলেন অলকা জেঠি। সে পরের কথা।

সুরঞ্জনবাবুর বাড়িটা পূর্বমুখী। পুরনো দিনের ধাঁচে করা বাড়িটা। বিশাল-বিশাল থাম, বড় বারান্দা। সামনে একচিলতে উঠোন। উঠোনের পর বাউন্ডারি ওয়াল। ওয়াল ঘেঁষেই উত্তরে-দক্ষিণে একটা ছোট রাস্তা চলে গেছে। এই রাস্তাটার নামই নলিনী দাস রোড। এই রোডের দুপাশে নানারকমের বাড়ি –

ছোট-বড়, রংদার, ম্যাড়ম্যাড়ে। নলিনী দাস রোডের মাথার বাড়িটা মিহির দত্তের। বাড়িটি যেমন প্রকা-, তেমনি এর শানশওকতও

চোখ-ধাঁধানো। মিহির দত্ত হিলিস্নদিলিস্ন করা লোক। আজকে লন্ডনে তো কালকে ব্যাংককে। দুপুরে টোকিওতে লাঞ্চ করেন তো ডিনারটা সারেন পিয়ংইয়ংয়ে। বিশাল ব্যবসা মিহিরবাবুর, গাড়ি বেচাকেনার। ঢাকা-চট্টগ্রামে তাঁর অনেকগুলো সেলস সেন্টার। এ ছাড়া আরো

কিসের-কিসের যেন বিজনেস আছে, সাধারণ মানুষ তা জানে না। তবে সাধারণ মানুষ এটা জানে যে, চট্টগ্রামের সেরা পাঁচজন ধনীর একজন এই মিহির দত্ত।

মিহির দত্তের বাড়িটা পেরিয়েই মেইন রোডে উঠতে হয়। ও-পথেই দেবর্ষির স্কুলে যাওয়া-আসা। খাস্তগীর বালিকা বিদ্যালয় মাইলখানেকের পথ। অলকানন্দার গেটে যেদিন রিকশা মিলত না, সেদিন মেইন রোড পর্যন্ত হেঁটে যেতে হতো দেবর্ষিকে। অরিন্দমের স্কুলটা উল্টোপথে। সময়টাও ভিন্ন। অরিন্দমের মর্নিং স্কুল আর দেবর্ষির দশটায়।

সেদিন সকালে টিপটিপ বৃষ্টি হচ্ছিল, বাড়ির মুখে রিকশাও পাওয়া গেল না। ছাতা মাথায় একপা-দুপা করে এগিয়ে গিয়েছিল দেবর্ষি। মিহির দত্তদের গেট বরাবর পৌঁছাতেই শাঁ করে একটা গাড়ি বেরিয়ে এসেছিল ভেতর থেকে। গেটের সামনে গর্তমতন জায়গায় পানি জমেছিল। ধাঁ করে এক ঝটকা ময়লা পানি এসে দেবর্ষির স্কুল ড্রেসটা ভিজিয়ে দিয়েছিল। চোখ ফেটে অশ্রম্ন বেরিয়ে এসেছিল সেই  সকালে। ঠিক ওই সময় ঝট করে গাড়ির দরজাটা খুলে সুরজিত বেরিয়ে এসেছিল। ঝমঝমিয়ে বৃষ্টিপড়া শুরু হয়েছিল তখন। ওই বৃষ্টিতে ভিজতে-ভিজতে দেবর্ষির দিকে এগিয়ে এসেছিল সুরজিত। কাকুতিভরা দৃষ্টিতে দেবর্ষির দিকে তাকিয়ে বলেছিল, ‘সরি। ড্রাইভারটা বুঝতে পারেনি। আপনি কাঁদবেন না।’

দেবর্ষি হাসবে না কাঁদবে বুঝে উঠতে পারছিল না। তরুণটি বলে কী? আপনি? সবাই তাকে তুই-তুমি বলে। মা-বাবা তুই করে বলে, জেঠা-জেঠিমা – টিচাররা তুমি সম্বোধন করে। এ পর্যন্ত কেউ তাকে আপনি বলেছে কিনা, মাথায় ঝমাঝম বৃষ্টি নিয়ে, পরনে ময়লা ড্রেস নিয়ে মনে করতে পারছে না দেবর্ষি। কী আশ্চর্য, তরুণটি তার সামনে দাঁড়িয়ে কাঁচুমাচু মুখ করে বলল কিনা – সরি, আপনি কাঁদবেন না। ওইটুকু বলেই সুরজিত গাড়িতে ফিরে যায়নি। সে আরো বলেছিল, ‘আজ আমার ফাইনাল পরীক্ষার শেষ দিন। দশটায় শুরু। আর দাঁড়াতে পারছি না।’ দুকদম সামনে গিয়ে আবার পেছন ফিরেছিল সুরজিত। বলেছিল, ‘ভেরি সরি’। বলে ধীরপায়ে গাড়ির পেছনের দরজার দিকে এগিয়ে গিয়েছিল।

সেদিন আর স্কুলে যাওয়া হয়নি দেবর্ষির। কাকভেজা দেবর্ষি বাড়িতে ফিরে এসেছিল। ‘স্কুলে যাসনি?’ মায়ের অবাক-হওয়া প্রশ্নের উত্তরে দেবর্ষি বলেছিল, ‘মা বাইরে ঝুম বৃষ্টি। জামাজোড়া ভিজেটিজে একাকার। ভিজে-পোশাকে স্কুলে যাই কী করে মা!’

মা বলেছিলেন, ‘ভালো করেছিস। ভিজে পোশাকে গেলে জ্বরজারি হয়ে যেত।’

 

তিন

সুরজিত তখন ইন্টারমিডিয়েট পড়ছিল। কমার্স কলেজে। ওই দিন অ্যাকাউন্টিং সেকেন্ড পেপারের পরীক্ষা ছিল। পরীক্ষার প্রশ্নোত্তর লিখতে-লিখতে বারবার দেবর্ষির কথাই মনে পড়ছিল সুরজিতের। ভাবছিল – আজ যদি তার মতো মেয়েটিরও পরীক্ষা থাকে তাহলে কী হবে? ওই ভিজে-পোশাকে পরীক্ষা দিতে যাবে? আর যদি না যায়, তাহলে তো তার মস্তবড় সর্বনাশ হয়ে যাবে! এই সবকিছু ছাপিয়ে দেবর্ষির জলভরা চোখদুটো বারবার সুরজিতের চোখের সামনে ভেসে উঠছিল। কী মোহময় চোখদুটো! হরিণের মতো চোখ কি একেই বলে?

এসব কথা দেবর্ষির জানার কথা নয়। জেনেছিল পরে, সুরজিতের মুখ থেকে। যখন ওরা কাছাকাছি এসেছিল। তবে তার জন্য আরো দুবছর অপেক্ষা করতে হয়েছিল। সুরজিত তখন ইন্ডিপেন্ডেন্ট ইউনিভার্সিটিতে অনার্স থার্ড ইয়ারে।  আর দেবর্ষি চট্টগ্রাম কলেজে, ইন্টারমিডিয়েটে।

একটা সময়ে সুরজিত পড়া থামিয়ে দিয়েছিল। বড়লোকের ছেলেরা যা করে। কিছুদূর পড়াশোনা করা, তারপর পড়াশোনা

থামিয়ে দিয়ে বাবার ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে বড় একটা চেয়ার নিয়ে বসতে শুরু করা। সুরজিতও তা-ই করা শুরু করেছিল।

এর মধ্যে অবশ্য দেবর্ষির সঙ্গে সুরজিতের সম্পর্কটা নিবিড় হয়ে এসেছে। প্রথম-প্রথম যে দেবর্ষি তেমন সাড়াটাড়া দিয়েছিল এমন নয়। একটু আড়চোখে তাকানো, একটু মিষ্টি করে হাসা – এসবের বাইরে তেমন কিছু ঘটেনি দেবর্ষির জীবনে। প্রেমট্রেমের বিষয়টা ভালো করে বুঝত না দেবর্ষি। কোনো-কোনো দিন দেখত – সুরজিত নিজেদের পকেট গেটের পাশে চুপটি করে দাঁড়িয়ে আছে। কী রকম, কী রকম চোখ করে যেন তাকিয়ে আছে দেবর্ষির দিকে। তবে সেই চোখের রং দেখে মোটেই ভয় লাগত না দেবর্ষির। এক ধরনের মায়া হতো সুরজিতের জন্য। কখনো আড়চোখে তাকাত, কখনো-বা একটু করে হাসত। ওই তাকানো আর হাসির ভঙ্গি দিয়ে সুরজিত বুঝে গিয়েছিল – দেবর্ষি তাকে পছন্দ করে।

এরপর দেবর্ষি কলেজে ভর্তি হলো, সুরজিত ইউনিভার্সিটিতে গেল। উভয়ের মধ্যে নানা কারণে, নানা ভাবে দেখা-সাক্ষাৎ হতে লাগল। একদিন দুজনে বুঝে গেল – উভয়ে উভয়কে ভালোবাসে। তারপর পতেঙ্গার সি বিচ, নানা রেস্টুরেন্টের কোনা ঘেঁষা টেবিল, ফয়’স লেক – এসব।

দেবর্ষি তখন অনার্স ফোর্থ ইয়ারে, এক দুপুরে সুরজিত বলল, ‘মা-বাবা মেয়ে খুঁজছে। আমি বলেছি – তোমাকেই বিয়ে করব।’

দেবর্ষি অবাক-চোখে জিজ্ঞেস করেছিল, ‘এখনই বিয়ে! না না। এখনই বিয়ের কথা বলছ কেন?’ তারপর একটু থেমে বলেছিল, ‘তাছাড়া তোমার পড়াশোনাও তো এখনো কমপিস্নট হয়নি। তোমার মা-বাবা এত তাড়াতাড়ি তোমাকে বিয়ে করাতে চাইছেন কেন?’

সুরজিত দেবর্ষির চোখ এড়িয়ে আলতো একটা ঢোক গিলে বলেছিল, ‘পড়াশোনা শুরু করেছি যখন, একদিন শেষ হবে। বিয়ে করাতে চাইছে যখন, না করিনি। তোমার কথা বলার পরও মা-বাবা গাঁইগুঁই করেনি।’ তারপর নিচুস্বরে বলেছিল, ‘তোমাকে একান্তে পাওয়ার লোভটা সামলাই কী করে।’ ও যে অনেক আগে পড়াশোনা ছেড়ে দিয়েছে, এখন যে বাবার অফিসে বসে – সবটা চেপে গিয়েছিল সুরজিত। দেবর্ষি জানে – সুরজিতের  মাস্টার্স ফাইনাল পরীক্ষা সামনে।

দেবর্ষি হঠাৎ প্রশ্ন করে, ‘আচ্ছা সুরজিত, শুনেছি তোমার একজন বড়দা আছেন, তো উনি কোথায়?’

চমকে দেবর্ষির দিকে তাকিয়েছিল সুরজিত। অল্প সময়ের মধ্যে নিজেকে সামলে নিয়েছিল সে। তারপর চেহারাটাকে করুণ করে বলেছিল, ‘ও অরিজিতদার কথা বলছ? ও তো বউ নিয়ে কলকাতায় থাকে।’

‘কেন, কলকাতায় কেন? তোমাদের বড় বাড়ি, এত-এত ব্যবসা! এসব বাদ দিয়ে কলকাতায় থাকেন কেন?’

কী একটা বলতে গিয়ে চেপে গেল সুরজিত। বলল, ‘কলকাতাতেও বাবার ছোটখাটো ব্যবসা আছে। ওসব সামাল দেয় অরিজিতদা।’ এরপর অনেকটা স্বগত কণ্ঠে বলল, ‘অ্যাডজাস্টমেন্টের অভাব ছিল।’

দেবর্ষি বলল, ‘কী বললে?’

‘ও কিছু না।’ তারপর গলায় উচ্ছ্বাস ঢেলে বলল, ‘তা হলে ওই কথা। তোমার আমার বিয়ে হচ্ছে। বাবার প্রস্তাবকে যেন ফিরিয়ে না দেন তোমার মা-বাবা।’

সত্যি সোমনাথবাবু প্রথমে রাজি হননি। দেবর্ষির মাকে বলেছিলেন, ‘এত অল্প বয়সে কী বিয়ে? মাত্র তো ফোর্থ ইয়ারে।’

মা অবাক হয়ে বলেছিলেন, ‘অল্প বয়স! কী বলছ তুমি! ফোর্থ ইয়ার কি অল্প! দেবর্ষির কত বয়স হলো জান?’

‘তারপরও…।’ আমতা-আমতা করে আরো কী যেন বলতে চেয়েছিলেন সোমনাথবাবু। মুখের কথা কেড়ে নিয়ে দেবর্ষির মা সবিতা দেবী বলেছিলেন, ‘কোনো তারপর-টারপর নয়। সুরজিতের বাপের ধনসম্পত্তির হিসাব রাখ তুমি? ঘরটা দেখেছ না? রাজপ্রাসাদই তো বলে বোধহয় ওই ধরনের বাড়িকে?’ তারপর সারা মুখে উচ্ছ্বাস ছড়িয়ে বলেছিলেন, ‘দেবর্ষির ভবিষ্যৎ বলে তো একটা কথা আছে, নাকি? ধনেজনে এরকম ঘর পাবে কোথায় তুমি?’

সোমনাথবাবু অতি মৃদুকণ্ঠে বলেছিলেন, ‘তা তো বুঝলাম। কিন্তু শ্বশুরবাড়িতে গেলে মেয়েদের পড়ালেখা আর হয় না। দেবর্ষি এমএ করার পর বিয়েটা দিলে ভালো হয়।’

‘দেবর্ষির ভালোটা নিয়ে তুমি যেমন ভাবছ, আমিও তো ভাবছি।

তবে আমার ভাবনার সঙ্গে তোমার ভাবনার মিল নেই। তুমি ভাবছ বিদ্যা নিয়ে, আমি ভাবছি ঐশ্বর্য নিয়ে। রাজরানি হয়ে থাকবে আমার মেয়ে ওঘরে গেলে।’ তারপর একটু দম নিয়ে গলাটা একটু উঁচুতে চড়িয়ে সবিতা দেবী বলেছিলেন, ‘আমার এককথা, দেবর্ষির বিয়ে ও-বাড়িতেই হবে।’

এরপরও হাল ছাড়েননি সোমনাথবাবু। বলেছিলেন, ‘আমার ভয় ওখানেই। ওই টাকাপয়সা আর ধনদৌলতকে ভয় পাই আমি। অধিক সহায়সম্পত্তি মানুষকে অমানুষ করে। ওই বাড়িতে গিয়ে দেবর্ষির কোনো ক্ষতি হবে না তো!’

‘এটা তোমার মনের খুঁতখুঁতানি। সব ধনী অমানুষ নয়। দেবর্ষি লেখাপড়া জানা মেয়ে। ও নিশ্চয় শ্বশুরবাড়ির সঙ্গে অ্যাডজাস্ট করে নেবে।’

‘একটু শাশুড়ি সম্পর্কে খোঁজখবর নিলে হয় না? সুরজিত সম্বন্ধেও তো তেমন কিছু জানি না আমরা।’ অভিভাবকের কণ্ঠে বললেন সোমনাথবাবু।

এবার চাপাস্বরে সবিতা দেবী বললেন, ‘তোমার ওই একটা বদ অভ্যাস। মানুষকে সন্দেহ করার অভ্যেসটা তোমার গেল না। মিহির দত্ত বলে কথা! তাঁর স্ত্রী কি কখনো এলনাফেলনা হতে পারেন? ওঁদের কোনো মেয়ে নেই। আমি তো মনে করি – দেবর্ষি কন্যার স্নেহই পাবে শাশুড়ির কাছ থেকে।’ থামলেন একটু। মুখে মিষ্টি একটা হাসি ফুটিয়ে তুললেন। তারপর বললেন, ‘সুরজিতের কথা আমরা কী জানব, যা জানার, যতটুকু জানার নিশ্চয় কবছরের পরিচয়ে দেবর্ষি তা জেনে নিয়েছে।’ ও-বাড়ি থেকে প্রস্তাবটা আসার পর দেবর্ষি তার মাকে সুরজিত সম্পর্কে পূর্বাপর সব খুলে বলেছিল।

সোমনাথবাবুর চুপ থাকা ছাড়া আর কোনো উপায় থাকল না। দেবর্ষি রাজি। সবিতা একপায়ে খাড়া। অরিন্দমের কোনো ভূমিকা নেই। বিয়ের প্রস্তাবটা শেষ পর্যন্ত গ্রহণই করলেন সোমনাথবাবু।

বিয়েটা হয়েও গেল।

 

চার

বেশ কিছুদিন খুব আনন্দে কাটল দেবর্ষির। সুরজিত তাকে যথেষ্ট সময় দেয়। গাড়ি নিয়ে লং ড্রাইভে যায়। দামি-দামি রেস্টুরেন্টে খাওয়ায়। এর মধ্যে অবশ্য দেবর্ষি জেনে গেছে – সুরজিত অনার্সটা কমপিস্নট করেনি। ভীষণ মন খারাপ হয়েছিল তার। সুরজিত বুঝিয়েছিল – বাবা একা আর পারছিল না। বাবা তো বেশিরভাগ সময় দেশের বাইরে থাকে। দেশের ব্যবসার হালটা তো কাউকে না কাউকে ধরতে হবে। বাধ্য হয়ে পড়াটা ছেড়ে দিতে হলো। তুমি দুঃখ পেয়ো না দেবু। বলে সুরজিত দেবর্ষিকে বুকের কাছে টেনে নিয়েছিল।

তারপর মৃদুগলায় বলেছিল, ‘তাছাড়া এত পড়ালেখারই বা দরকার কী। মানুষ পড়ালেখা করে টাকা কামানোর জন্য। আমাদের তো টাকার অভাব নেই।’

‘আমার কিন্তু লেখাপড়ার দরকার আছে। সামনে এমএ ফাইনাল। ফার্স্ট ক্লাসটা পেতে হবে আমার। আর হ্যাঁ, তোমাকে বলে রাখছি – এমএ-টা করে আমি কিন্তু চাকরি করব।’ দেবর্ষি বলেছিল।

‘চাকরি করবে!’ বিস্মিত চোখে দেবর্ষির দিকে তাকিয়েছিল সুরজিত।

‘কেন, আমার চাকরিতে তোমার আপত্তি আছে?’ দেবর্ষির উষ্ণকণ্ঠ।

এর মধ্যে সুরজিত নিজেকে সামলে নিয়েছে। নরম কণ্ঠে বলেছে, ‘ঠিক আছে, ঠিক আছে। এমনি-এমনি বললাম আর কি। সময় আসুক, এমএ পাশ করো আগে। তারপর না হয় চাকরি নিয়ে ভাবা যাবে।’ দেবর্ষি আর কথা বাড়ায়নি সে-রাতে।

দেবর্ষির শাশুড়ি মিত্রা দত্ত দেবর্ষির সঙ্গে বউমা ছাড়া কথা বলেন না। অতিথি-অভ্যাগতদের সঙ্গে মেয়ে বলে পরিচয় করিয়ে দেন। বলেন, ‘আমার তো মেয়ে নেই। দেবর্ষি আমার ছেলের বউ নয়, মেয়ে।’

চাকর-বুয়ারা দূরে দাঁড়িয়ে বিনীতভাবে কথা বলে, মুখ থেকে কথা বেরোবার আগেই আদেশ তামিল করে ওরা। গাড়িতে ওঠার সময় ড্রাইভার দরজা খুলে দেয়। নানা সামাজিক অনুষ্ঠানে জবরজং শাড়ি-গয়না পরে না গেলে শাশুড়ি খুব মাইন্ড করেন। বলেন, ‘বউমা, সবসময় মনে রাখবে তুমি কোন বাড়ির বউ। এই বাড়ির একটা স্ট্যাটাস আছে। তুমি যেখান থেকেই আস, এখন কিন্তু তুমি দত্তবাড়ির পুত্রবধূ।’ বলে মিষ্টি করে একটু হাসেন মিত্রা দেবী।

শাশুড়ির কথা শুনে একটু খটকা লাগে দেবর্ষির। দত্তবাড়ির বউ বুঝলাম। দত্তবাড়ির একটা মানগরিমা আছে – তাও বুঝলাম। কিন্তু ‘যেখান থেকেই আস’ কথাটার মানে কী? তার বাবা শ্বশুরের তুলনায় অনেক গরিব, নিতান্ত একজন ছাপোষা মানুষ। বাবার দারিদ্র্য নিয়ে কোনো কটাক্ষ করছেন না তো শাশুড়িমাতা! ‘ধুর! নাহ্! কটাক্ষ করবেন কেন। তাকে কত ভালোবাসেন তিনি!’ মনে-মনে বলে দেবর্ষি। বলেই ডানে-বাঁয়ে মাথা ঝাঁকায়। যেন মাথা ঝাঁকিয়ে বাজে কথাটিকে মাথা থেকে বের করে দিতে চায় সে।

বাপের বাড়িতে যখন বেড়াতে আসে দেবর্ষি শাশুড়ির প্রশংসাই করে বেশি। শ্বশুরকে তো তেমন করে পায় না সে। দেশে থাকলে অফিস-মিটিং – এগুলো নিয়ে সময় কাটে তাঁর। গভীর রাতে যখন তিনি বাড়ি ফেরেন, তখন দেবর্ষিদের রাতের অর্ধেক ঘুম হয়ে যায়।

দেবর্ষি মাকে বলে, ‘জান মা, আমার শাশুড়ির হাতের লেখা যা সুন্দর! পাকিস্তান আমলের ম্যাট্রিক পাশ।’

সবিতা দেবী চোখ বড়-বড় করে বলেন, ‘তাই নাকি!’ বলবার সময় তিনি যে ডিগ্রি পাশ সেটা ভুলে যান। অথবা মেয়েকে খুশি করবার জন্য ভুলে থাকার অভিনয় করেন। মেয়ের আনন্দে সবিতা দেবীর আনন্দের আর সীমা থাকে না। সেই আনন্দ সবিতা দেবী থেকে সোমনাথবাবুতে ট্রান্সফার্ড হয়। আনন্দের ঝলমলে আলো অরিন্দমের ওপরও পড়ে।

এভাবে দিন বয়ে যেতে লাগল আরেকটা দিনের দিকে, সন্ধ্যা থেকে রাত হলো। রাত হাঁটল সকালের দিকে। এভাবে মাস, বছর অতিক্রান্ত হলো। দেবর্ষি গর্ভবতী হলো। উভয় পরিবারের আনন্দের সীমা থাকল না। জাঁকজমকের সঙ্গে দেবর্ষিকে স্বাদভক্ষণ করানো হলো।

একদিন শাশুড়ি গোঁ ধরলেন – দেবর্ষির আলট্রাসনোগ্রাম টেস্ট করাতে হবে। ছেলে হবে না মেয়ে হবে, তা আগাম জানা চাই তাঁর। মিহিরবাবু বললেন, ‘ওসব আগাম জেনেটেনে কী হবে? ছেলে হোক বা মেয়ে হোক আমাদের বংশধর তো।’

মিত্রা দত্ত বললেন, ‘তোমার মান্ধাতা আমলের কথা এই আধুনিক যুগে চলে না। এখন সবাই আগাম জেনে নেয়। আর শোনো, আমার কিন্তু নাতি চাই।’ মিহিরবাবু অনেকটা আকাশ থেকে পড়ে বলেন, ‘ও কী বলছ তুমি! মেয়ে হলে ক্ষতি কী!’

‘রাখো তোমার লাভ-ক্ষতির কথা। ছেলে হোক – এটাই আমি চাই।’ উঁচু-গলায় বললেন মিহির গিন্নি।

মিহিরবাবু বদ্ধ দরজার দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘আসেত্ম-আসেত্ম। সুরজিতরা এখনো ঘুমায়নি। বউমা শুনতে পাবে।’

‘শুনতে পেলে পাক। আমার নাতিই চাই।’

কিন্তু আলট্রাসনোগ্রাম টেস্টের পর ডাক্তার বললেন – দেবর্ষির কন্যাই হবে। সংবাদটা শুনে মিত্রা দত্ত কী রকম যেন ঝিম মেরে গেলেন। দেবর্ষির সঙ্গে কথা কমিয়ে দিলেন। সুরজিতকে নিয়ে

ফুসুর-ফাসুর শুরু করলেন। সুরজিতকে মিত্রা দেবী কী বোঝালেন কে জানে, সুরজিতও কেন জানি দেবর্ষির সঙ্গে হুঁ-হ্যাঁ করে কথা বলতে শুরু করল।

একরাতে দেবর্ষি সুরজিতকে বলল, ‘একটা কথা বলি।’

‘বলো।’ নিস্পৃহ কণ্ঠে সুরজিত বলল।

‘তোমার মা যেন আজকাল কী রকম কী রকম করে কথা বলছেন আমার সঙ্গে। কেন বলতে পার?’

‘আমার মা তোমার কী হয়?’ দেবর্ষির প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে পাল্টা প্রশ্ন করে সুরজিত।

‘কেন, শাশুড়ি। মানে শাশুড়িমা।’

‘তা হলে তোমার মা বললে যে!’

সুরজিতের কথা শুনে একটু ভড়কে গেল দেবর্ষি। সুরজিতের খোঁচাটা বুঝতে দেরি হলো না তার। তাড়াতাড়ি নিজেকে শুধরে নিয়ে বলল, ‘সরি, ভুল হয়ে গেছে। আমি আমার শাশুড়িমায়ের কথাই বলতে চেয়েছিলাম তোমাকে।’

এবার হঠাৎ ধমকের সুরে সুরজিত বলে উঠল, ‘কী রকম করে কথা বলছে মা তোমার সঙ্গে? আর কী রকম করে কথা বললে তুমি খুশি হবে?’

‘কী আশ্চর্য! সুরজিত তুমি এরকম করে কথা বলছ কেন? তুমি কি আমাকে ধমক দিচ্ছ?’

‘ধমক না দিয়ে কি কোলে বসিয়ে কথা বলব?’

সুরজিতের কথা শুনে হঠাৎ চুপসে গেল দেবর্ষি। আসেত্ম করে চেয়ার থেকে উঠে ধীরপায়ে ওয়াশরুমের দিকে এগিয়ে গেল। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের দিকে স্পষ্ট চোখে তাকাল দেবর্ষি। কই তার চেহারায় তো কোথাও টোল খায়নি। তার ঠোঁট, তার কপোল, তার চোখ এখনো তো আগের মতো আছে। শুধু পেটে সন্তান আসার কারণে শরীরটা একটু ভারী হয়েছে – এই যা। তাহলে সুরজিত এরকম করে কথা বলল কেন? সে কি কোনো ভুল করেছে, বা অন্যায়? নিজের ভেতরে চোখ রেখে আঁতিপাঁতি করে খুঁজে দেখল। কিন্তু সেখানে শাশুড়ি বা সুরজিতের মনে কষ্ট দেওয়ার মতো কোনো স্মৃতি খুঁজে পেল না দেবর্ষি। তাহলে শাশুড়ি বা সুরজিতের এ রকম ব্যবহারের কারণ কী?

ওই সময় ঘরের ভেতর থেকে সুরজিতের কণ্ঠ ভেসে এলো, ‘মেয়ে বিয়োবে আর আমরা তাকে মাথায় তুলে রাখব।’

দেবর্ষির মাথাটা হঠাৎ চক্কর খেল। চট করে দেয়ালটা আঁকড়ে না ধরলে হয়তো ঘুরে পড়েই যেত।

ও -। তাহলে এই কথা! মেয়ে জন্ম দিতে যাওয়ার অপমান! মনটাকে সুস্থির করল দেবর্ষি। তারপর ভাবতে শুরু করল – দত্ত পরিবারে তো কোনো কন্যাসন্তান নেই। সুরজিতরা দুই ভাই, কোনো বোন নেই তাদের। এই পরিবারে কন্যাসন্তানকে তো স্বাগত জানানোরই কথা। তার শাশুড়িও তো একজন নারী। নারী হয়ে কন্যাসন্তানের প্রতি অবহেলা দেখাচ্ছেন কেন? এটা কি অবহেলা? ঘৃণাই তো করছেন তিনি তার অনাগত কন্যাসন্তানটিকে। যদি ঘৃণা না করতেন, তাহলে সুরজিতকে নিয়ে এত ফুসফাস করতেন না। ওই রাতের কথা মনে পড়ে গেল দেবর্ষির। হঠাৎ জলের বড় তেষ্টা পেয়েছিল তার। দেখল – জলপাত্রে জল নেই। জল দিতে ভুলে গেছে বোধহয় কাজের মাসি। দরজা খুলে সে কিচেনের দিকে যাচ্ছিল। শ্বশুর-শাশুড়ির বেডরুম পেরিয়েই কিচেনে যেতে হয়। দরজার সামনে দিয়ে যেতে-যেতে হঠাৎ শাশুড়ির ঝাঁঝালো কণ্ঠ তার কানে এসে ধাক্কা মেরেছিল – শুনতে পেলে পাক। আমার নাতিই চাই। ঘুমঘোরে শোনা কথাটিকে তেমন পাত্তা দেয়নি দেবর্ষি, সে-রাতে। আজ সেই কথাগুলোই তার কানে সিসা ঢেলে দিচ্ছে। আর সুরজিত! সে কি মায়ের এই অন্যায়কে সাপোর্ট দিচ্ছে? দিচ্ছে তো বটেই। নইলে কেন তার এই অভব্য আচরণ। দেবর্ষি স্পষ্টত সুরজিতের আচরণে তার মায়ের প্রভাব দেখতে পাচ্ছে। তার মা না হয় সেকেলে, না হয় কন্যাসন্তান-বিদ্বেষী, না হয় কন্যাসন্তান প্রসব করার দায় তার ওপর চাপাতে চাইছে। কিন্তু সুরজিত কি জানে না কন্যাসন্তান প্রসব করার জন্য সে মোটেই দায়ী নয়? শুধু কন্যাসন্তান কেন, পুত্রসন্তান প্রসব করার জন্যও মায়ের কোনো দায় নেই। সন্তান কন্যা হবে, না পুত্র হবে – তার জন্য তো সম্পূর্ণত জন্মদাতাই দায়ী। ডাক্তাররা তো তা-ই বলেন। আধুনিক চিকিৎসাশাস্ত্রগুলোতে এই বিধান স্পষ্টভাবে লেখা আছে – শুনেছে দেবর্ষি। সুরজিত তো লেখাপড়া জানা মানুষ। হোক না সে বিশ্ববিদ্যালয়ের চৌহদ্দি ডিঙায়নি, পড়েছে তো ইউনিভার্সিটিতে। আধুনিক দাম্পত্য জীবনযাপনের রীতিপদ্ধতি তো তার অজানা নয়। সেই সুরজিত আজ একজন অনাধুনিক নারীর সঙ্গে কণ্ঠ মেলাল? মায়ের বক্তব্যকে নীতিহীন জেনেও আজ তার সঙ্গে বিরূপ আচরণ করল? মাথার দুপাশে ধপধপ করতে শুরু করল দেবর্ষির।

চোখে-মুখে জলের ঝাপটা দিলো একবার, দুবার, বহুবার। যতক্ষণ-না তার মনটা শীতল হয়ে না এলো ততক্ষণ জলের ঝাপটা দিয়ে গেল চোখে-মুখে।

একটা সময়ে মনটা শীতল হয়ে এলো দেবর্ষির। ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে দেখল – বিছানায় সুরজিত ঘুমাচ্ছে, ওপাশ ফিরে।

সে-রাতে সুরজিতের উল্টোদিকে মুখ করে শুয়ে পড়েছিল দেবর্ষি।

সে-রাতের ঘটনার পরও দেবর্ষি সবার সঙ্গে স্বাভাবিক আচরণ করে গেছে। সুরজিতের সকাল-সন্ধ্যার খাবার-দাবারের তদারক করেছে, শাশুড়ির চায়ের বন্দোবস্ত করেছে। মুখে হাসিটা ঝুলিয়ে রেখে এঘর-ওঘরের টুকটাক কাজগুলো করে গেছে।

পেটে সন্তান আসার পর আলট্রাসনোগ্রাম টেস্টের আগে শাশুড়ি বারবার সংসারের কোনো কাজ না করার জন্য নিষেধ করেছেন। বলেছেন, ‘ঘরভর্তি কাজের লোক। তোমার কী দরকার কাজ করার? কী লাগবে শুধু মুখ দিয়ে উচ্চারণ করবে – ওরাই করে দেবে সব।’ তারপর গলা উঁচিয়ে কিচেনের দিকে মুখ করে বলেছেন, ‘কাজলির মা, ও কাজলির মা।’ কাজলির মা দত্তবাড়ির প্রধান দাসী। তার আন্ডারে অন্যান্য দাসী-চাকর। কাজলির মা কাছে এলে মিত্রা দত্ত বলেছেন, ‘দেখছ তো এই দত্ত পরিবারে নতুন অতিথি আসছে। বউকে যাতে কোনো কাজ করতে না হয়। বউ যখন যা চায়, তা সঙ্গে-সঙ্গে পূরণ করবার ব্যবস্থা নেবে।’ তারপর গলাকে নিচে নামিয়ে দেবর্ষির পেটের দিকে তাকিয়ে বলেছেন, ‘এই সময়ে বউয়ের কিছু হলে আমি কাউকে ছাড় দেব না কিন্তু।’

কাজলির মা দেবর্ষির দিকে তাকিয়ে মিষ্টি হেসে বলেছে, ‘শুনলে তো বউদি, গিন্নিমার আদেশ। আমাদের সঙ্গে কাড়াকাড়ি করে কাজ করতে গেলে এবার থেকে কিন্তু গিন্নিমাকে বলে দেব।’

সেই দেবর্ষি এখন শাশুড়ির সামনে নানা সাংসারিক কাজ করে। মিত্রা দেবী দেখেও না দেখার ভান করেন। কাজ করতে নিষেধ করা তো দূরের কথা, দেবর্ষিকে শুনিয়ে-শুনিয়ে বলেন, ‘ও কাজলির মা, আমাকে আরেক কাপ চা দাও তো।’

দেবর্ষি নিজ হাতে চা বানিয়ে শাশুড়ির সামনে ট্রেটি এগিয়ে ধরে। মিত্রা দেবী বাম হাতে ট্রে থেকে কাপটি তুলে নেন।

দেবর্ষি নিজেকে বোঝায় – সব ঠিক হয়ে যাবে একদিন। টুনটুনি পাখিটা যেদিন এই পৃথিবীতে আসবে, সেদিন তার মুখ দেখে সকল অবহেলা-ঘৃণার চিহ্ন শাশুড়ির মুখম-ল থেকে উবে যাবে। দেবর্ষি মনে-মনে ঠিক করে রেখেছে – অন্যরা যে নামেই ডাকুক, তার মেয়েটাকে সে টুনটুনি পাখি বলেই ডাকবে। এই পাখিটি যখন এঘর-ওঘর হামাগুড়ি দেবে, আধো বোলে মাম্মা, ডিড্ডি ডাকবে, তখন কি শাশুড়ি তার মুখটা নাতনির দিক থেকে ফিরিয়ে নিতে পারবেন? কিছুতেই না। আর এই যে সুরজিত, যে মায়ের কথা শুনে তার সঙ্গে অগোছালো কথাবার্তা বলছে, তার সঙ্গে কী রকম কী রকম যেন ব্যবহার করছে, সে বাববা ডাক শুনে সবার আগে টুনটুনিকে কোলে তুলে নেবে। তখন দু-চারটি কথা শুনিয়ে দেওয়া যাবে সুরজিতকে। বলা যাবে – সুরজিতবাবু, আজ যাকে কোলে তুলে নিয়েছ, পরম ভালোবাসায় যার গালে মুখ ঘষছ, তার আগমনকে তো স্বাগত জানাওনি তুমি! কী অপমানজনক ব্যবহারটাই না করেছ আমার সঙ্গে। আজ তোমার সেই দুর্ব্যবহার কি তোমার দিকে বুমেরাং হয়ে ফিরে যাচ্ছে না? এসব দেবর্ষি মনে-মনে ভাবে আর জানালার ওপারে দীর্ঘ নারকেল গাছটির মাথার ওপর দৃষ্টি ফেলে বিষণ্ণ হাসে।

 

পাঁচ

এক সন্ধ্যায় অরিন্দম এলো দিদিকে দেখতে। সে এখন একাদশে পড়ে, চট্টগ্রাম কলেজে। ভাইকে দেখে ভীষণ উৎফুলস্ন হয়ে উঠল দেবর্ষি। দীর্ঘদিন দেবর্ষি বাপের বাড়িতে যায়নি। যায়নি মানে যেতে পারেনি। সন্তান গর্ভে, আসার পর শাশুড়ি বলেছেন, ‘এই অবস্থায় বাপের বাড়িতে যাওয়ার দরকার নেই বউমা। তোমার বাপের বাড়িতে যথাযথ কেয়ার নেওয়া হবে কিনা জানি না। তোমার গর্ভে আমাদের ভবিষ্যৎ জেনারেশন। আছাড়-টাছাড় খেয়ে কোনো দুর্ঘটনা ঘটালে ভীষণ ক্ষতি হয়ে যাবে আমাদের।’

সেই থেকে বাপের বাড়িতে যাওয়া বন্ধ দেবর্ষির। আজ প্রায় সাত মাস হতে চলল ভাই-বাপের মুখ দেখেনি। মা মাঝেমধ্যে আসেন, দেবর্ষির সঙ্গে একবেলা-আধবেলা কাটিয়ে যান। তাই বহুদিন পর অরিন্দমকে কাছে পেয়ে দেবর্ষির আনন্দের সীমা থাকল না।

বাজার সরকার নিত্যানন্দ হোড়কে দিয়ে হাইওয়ে সুইটস থেকে একটা চিকেন বার্গার আনাল দেবর্ষি। ছোটবেলা থেকে চিকেন বার্গার খেতে বড় ভালোবাসে অরিন্দম। ঘরে দুরকম মিষ্টি ছিল, আপেল ছিল। বিস্কুট, চানাচুর, মিষ্টি, আপেল, বার্গার – এসব খেতে দিলো ভাইকে। ড্রইংরুমে দুই ভাইবোনে বসে নানা কথায় মশগুল হলো। ওই সময় মিত্রা দত্ত ঘরে ঢুকলেন। গোল পাহাড়ের শ্মশানকালী মন্দিরে পুজো দিতে গিয়েছিলেন তিনি। ড্রইংরুম দিয়েই তাঁর বেডরুমে যেতে হয়। ড্রইংরুমে ঢুকে হঠাৎ থমকে দাঁড়ালেন তিনি। রুক্ষ একটা আভা শাশুড়ির চেহারায় ঝিলিক দিয়ে উঠল কি – বুঝতে পারল না দেবর্ষি। তবে তিনি যে চিকন চোখে একবার অরিন্দমের দিকে আর একবার খাবারের পেস্নটের দিকে তাকালেন, সেটা বুঝতে কষ্ট হলো না দেবর্ষির। শাশুড়ির দিক থেকে চোখ ফিরিয়ে অরিন্দমের দিকে তাকিয়েছিল দেবর্ষি। অরিন্দম তখন মিত্রা দেবীকে প্রণাম করার জন্য সোফা থেকে ওঠার উদ্যোগ নিচ্ছিল। তাই শাশুড়ির কড়া চোখের চাহনি অরিন্দমের চোখ এড়িয়ে গেছে। শাশুড়ি ‘থাক থাক। নমস্কার করতে হবে না’ বলে সামনের দিকে এগিয়ে গিয়েছিলেন। কয়েক কদম যাওয়ার পর মিত্রা দত্ত চাপা কণ্ঠে গরগরে গলায় বলেছিলেন, ‘মহাভোজ’।

‘মহাভোজ’ শব্দটি দশ কেজি পাথরের মতো দেবর্ষির কানে এসে আঘাত করেছিল। চোখে আঁধার-আঁধার ঠেকেছিল তার। খাবারের খোঁটা! কত খাবার এবাড়ির এধার-ওধার পড়ে থাকে! কত পরিচিত-অপরিচিত মানুষ এ-বাড়ি থেকে নানারকম খাবার খেয়ে যায়। তার ভাই তো এই দত্তবাড়ির দূরের কেউ নয়। স্বজন যাকে বলে সেরকমই তো। মিষ্টি আর আপেলগুলো তো ফ্রিজেই পড়ে ছিল অনেকদিন। বার্গারটা তো তার নিজের টাকা দিয়েই কিনে আনা। এই সামান্য খাবারের জন্য শাশুড়ি এরকম কথাটি বলে গেলেন? ভাবতে-ভাবতে ভাইয়ের দিকে তাকাল দেবর্ষি। অরিন্দমের মুখ দেখে বোঝা যাচ্ছে না – সে শাশুড়ির কথা শুনতে পেয়েছে কিনা। এমনিতেই খুব চাপা ধরনের ছেলে অরিন্দম, বুদ্ধিমানও। দেবর্ষি দেখল – অরিন্দম আপন মনে বার্গার খেয়ে যাচ্ছে। অরিন্দম যদি শাশুড়ির কথা শুনেও থাকে দেবর্ষিকে কিছুতেই বুঝতে দেবে না।

সেই সন্ধ্যায় বেশ হাসি-খুশিতেই বিদায় নিয়েছিল অরিন্দম। বলেছিল, ‘মনটা ফুর্তিতে রেখো দিদি। নিজেকে কষ্ট দিয়ো না দিদি।’ বলে একটু করে করুণ হেসেছিল অরিন্দম। তারপর গলায় আনন্দ ঢেলে বলেছিল, ‘আমি আবার আসব। তোমার মেয়েকে কোলে নিতে চাইলে আবার রে-রে করে উঠতে পারবে না কিন্তু।’ বলেই সিঁড়ি দিয়ে নামতে শুরু করেছিল। একটিবারের জন্যও পেছন ফিরে তাকায়নি অরিন্দম। তাকালে দেবর্ষি দেখতে পেত – প্রচ- একটা বিষণ্ণতায় অরিন্দমের চোখ-মুখ ভেসে যাচ্ছিল।

সে-রাতে সুরজিতের সঙ্গে দেবর্ষির বেশ একটা ঝগড়া হয়ে গেল। এমনিতে ইদানীং দেরিতে ঘরে ফেরা শুরু করেছে সুরজিত। এসেই হয়তো খাটের ওপর ঝিম মেরে বসে থাকে, না হয় বাথরুমে ঢুকে জোরে শাওয়ার ছেড়ে দিয়ে স্নান করে। দেবর্ষির সঙ্গে খুব বেশি কথাটথা বলে না। সে-রাতে অনেকটা দেরিতে বাড়ি ফিরল সুরজিত। বিয়ের পর থেকে রাতের খাবারটা একসঙ্গেই খায় সুরজিত আর দেবর্ষি। শ্বশুর-শাশুড়ি খেয়ে উঠে গেলে কাজলির মা ডাকতে আসে। বলে, ‘বউদি দাদাকে নিয়ে খেতে আস। রাত কম হলো না।’ আজকেও একসঙ্গে খাবে বলে দেবর্ষি বসে আছে। কাজলির মা বারদুয়েক তাগিদ দিয়ে গেছে, ‘বউদি, অনেক রাত হয়ে গেল। দাদা ফিরতে আজ বুঝি দেরি হবে। এই অবস্থায় বেশিক্ষণ না খেয়ে থাকা ভালো না। তুমি খেয়ে নাও। দাদা এলে আপনাতে খাবে।’

কাজলির মায়ের কথা কানে তোলেনি দেবর্ষি। নোটটা হাতে তুলে নিয়ে পড়তে শুরু করেছিল। দিন কুড়ি পরে এমএ ফাইনাল। রবীন্দ্রনাথকে তেমন করে কব্জা করতে পারছে না দেবর্ষি। এই পড়ছে, এই ভুলছে। বিশেষ করে কবিতার কোটেশনগুলো।

একসময় সুরজিত বাড়ি ফিরল। কোথায় দেরি হওয়ার জন্য এক্সকিউজ চাইবে, তা না, ঘরে ঢুকেই বলল, ‘বিদ্বান দেখাও!

বই-খাতা নিয়ে আমাকে বোঝাও যে, তুমি মস্তবড় প–ত?’

দেবর্ষি সুরজিতের আচমকা এধরনের কথা শুনে স্তম্ভিত হয়ে গেল। বিস্ফারিত চোখে সুরজিতের দিকে তাকিয়ে থাকল কিছুক্ষণ। তারপর বলল, ‘বই-খাতা নিয়ে আমি প–তি দেখাতে যাব কেন? তুমি আমার সঙ্গে কম কথা বলছ বলে অথবা এখন তুমি আগের সুরজিত নাই বলে দিন কুড়ি পরে যে আমার এমএ ফাইনাল, কথাটি তোমাকে বলতে পারিনি।’

‘এত গিট্টু দেওয়া কথা বলছ কেন?’ আগের কণ্ঠে সুরজিত বলে।

যেন সুরজিতের কথা শুনতে পায়নি এরকম করে দেবর্ষি বলল, ‘আর হ্যাঁ, মেয়েদেরকে বিদ্বান বলে না বিদুষী বলে।’

এবার তেড়ে উঠল সুরজিত। ‘আমি যে তোমার মতো পড়াশোনা করিনি, সেটাই বোঝাতে চাইছ! ভুল ধরে হেডমাস্টার সাজতে চাইছ?’

‘একই ভুল আবার করলে। হেডমাস্টার নয়, হেডমিস্ট্রেস।’ কেন জানি এই দুঃখের মধ্যেও হাসিটা ভেতরে দাবিয়ে রাখতে পারল না দেবর্ষি। ফিক করে হেসে দিলো।

দেবর্ষির এই হাসিটাকে সুরজিত হালকাভাবে নিল না। তার মনে হলো – তাকে ব্যঙ্গ করছে দেবর্ষি। বারবার ভুল ধরিয়ে দিয়ে সে যে মূর্খ, তা-ই প্রমাণ করতে চাইছে। বরফশীতল কণ্ঠে সুরজিত বলল, ‘তোমার আর লেখাপড়া করার দরকার নেই।’

‘মানে!’

‘মানে তুমি আর পড়বে না।’

‘পড়ব না মানে!’

‘পড়বে না মানে তুমি এমএ পরীক্ষা দেবে না।’

‘এসব কী বলছ তুমি? সামনে আমার ফাইনাল! পরীক্ষা দেব না তো দেবটা কী?’

সুরজিতের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে একটা গভীর হীনম্মন্যতা কাজ করছিল। সে ইন্টারমিডিয়েট পাশ আর দেবর্ষি বিএ অনার্স। তার ওপর এমএ পরীক্ষা দিতে যাচ্ছে। এমএ-টা পাশ করলে বিদুষী মেয়ের মূর্খ স্বামী হবে সে। এমনিতে বন্ধুবান্ধব-আত্মীয়স্বজন দেবর্ষির পড়ালেখার কথা জিজ্ঞেস করলে প্রসঙ্গান্তরে যায়। মাস্টার্স পাশ করলে তার লজ্জার আর অবধি থাকবে না। প্রথম-প্রথম এরকম করে ভাবেনি সুরজিত। একদিন তার কানে বিষ ঢাললেন মিত্রা দেবী।

বললেন, ‘দেখ সুরজিত, লেখাপড়াটা তুমি করলে না। কাউকে কিছু না বলে হঠাৎ পড়ালেখা থামিয়ে দিলে তুমি।’

সকালে চায়ের টেবিলে মুখোমুখি বসেছিলেন দুজনে। মায়ের কথা শুনে হেসে দিলো সুরজিত। বলল, ‘পড়া থামিয়েছি সে তো আজ নয়। আজ এতদিন পরে হঠাৎ পড়ালেখার কথা তুললে যে মা!’

‘আমাদের অনেক টাকাপয়সা। মা লক্ষ্মীর আশীর্বাদে ধনদৌলতেরও অভাব নেই। এই পরিবারের ছেলে তো আর

বিএ-এমএ পাশ করে চাকরি করবে না।’

‘তা-ই যদি হয় মা, তাহলে হঠাৎ করে আমার লেখাপড়ার কথা তুললে কেন?’

‘তুলতে বাধ্য হলাম, তাই তুললাম।’

‘তোমার কথা বুঝতে পারলাম না মা। দেবর্ষি বিদ্যার গরিমা দেখিয়েছে নাকি? আমার লেখাপড়া নিয়ে কোনো খোঁটা দিয়েছে নাকি?’

‘না, ও খোঁটা দেয়নি। গরিবঘরের মেয়ে। ওর অত সাহস

কোথায় যে, বিদ্যার অহংকার দেখায় আমার সামনে!’

‘তা হলে?’

‘খোঁটা নয়, মোক্ষম খোঁচাটা দিয়েছে ওই সেনগুপ্ত গিন্নি। তুমি তো জানো, খুলশির সেনগুপ্ত পরিবারের সঙ্গে তোমার বাবার ব্যবসায়িক কারণে রেষারেষি। সেদিন লালাবাবুর নাতির অন্নপ্রাশনে সেনগুপ্ত গিন্নির সঙ্গে দেখা। একথা-ওকথা বলার পর বলল – তা দিদি, আপনার ছোট ছেলের বউ নাকি এমএ ফাইনাল দেবে। আমার উত্তরের অপেক্ষা না করে আবার বলল – তা ভালো, তা ভালো। ছেলেটা তো ইউনিভার্সিটির সিঁড়িই ভেঙেছে, গ– তো পেরোতে পারেনি। তারপর কৃত্রিম দীর্ঘশ্বাস ফেলে আরো বলল – দেখেন বউটা এমএ পাশ করে ছেলের মুখটা উজ্জ্বল করতে পারে কিনা। বলেই আমার দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল সেনগুপ্ত গিন্নি। কী যে অপমান লেগেছিল সেদিন, তোমাকে বলে বোঝাতে পারব না।’

মায়ের কথার মাহাত্ম্যটুকু ধরতে সুরজিতের খুব বেগ পেতে হলো না। সত্যি তো, দেবর্ষির অত লেখাপড়া করার দরকার কী? লেখাপড়া করে তো সে আর চাকরি করতে যাবে না। এতদিন যে রকম করে ভাবেনি সুরজিত, মায়ের কথা শুনে সেরকম করে ভাবতে শুরু করল। ঠিক করল – দেবর্ষিকে আর এমএ-টা দিতে দেবে না সে।

কিন্তু সিদ্ধান্ত অনুসারে কাজ করতে পারল না সুরজিত। মায়ের সামনে বসে যেরকমই সিদ্ধান্ত নিক সুরজিত, দেবর্ষিকে সরাসরি নিষেধ করতে পারল না। আগে যেই দেবর্ষির সঙ্গে সহজ ভঙ্গিতে কথা বলত, মায়ের কথার পর সেই দেবর্ষির সামনে গেলে নিজেকে বড় অশিক্ষিত বলে মনে হতে লাগল। একটা সংকুচিত ভাব তাকে বিব্রত করা শুরু করল।

আজ মওকা এসে গেল সুরজিতের হাতে। সুযোগ পেয়ে সে বলল – ‘তোমার আর পড়ালেখার দরকার নেই।’ দেবর্ষিও দমবার পাত্রী নয়। ভাবে-অভিব্যক্তিতে জানিয়ে দিলো – এমএ ফাইনাল পরীক্ষা সে দেবেই। দেবর্ষির অভিব্যক্তি দেখে সুরজিতের মনে একটা কূটবুদ্ধি খেলে গেল। সে ব্যবসায়ীদের মতো কৌশলী গলায় বলল, ‘তাছাড়া…।’ বলে সে ইচ্ছে করে থেমে গেল। দেবর্ষি কিছু বলে কি না তা শোনবার জন্য অপেক্ষা করতে লাগল।

কিন্তু দেবর্ষি কোনো কথা না বলে সটান সুরজিতের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকল।

সুরজিত কণ্ঠকে নরম করে বলল, ‘তোমার শরীরের এই অবস্থা। এই সময় তোমার শরীরটা পড়াশোনার ধকলটা সইবে কেন?’ তারপর কণ্ঠকে আরো নামিয়ে দরদি গলায় সুরজিত বলল, ‘আমি বলি কি, এবার পরীক্ষাটা তুমি ড্রপ কর। সামনের বার দেখা যাবে।’

দেবর্ষি সুরজিতের কথায় কিসের যেন একটা গন্ধ পেল। এটা কি ষড়যন্ত্র? তাকে থামিয়ে দেওয়ার কূটকৌশল? নাকি অন্য কিছু?

কণ্ঠে জোর ঢেলে দেবর্ষি বলল, ‘শোনো, লেখাপড়া আমার প্রাণ। বিয়ের আগে তোমাকে বলেছিলাম – আমি এমএ পাশ করবই। তুমি কী বলেছিলে মনে আছে? বলেছিলে – আরে, তুমি এমএ পাশ করবে না তো কে করব? আজ সেই সুরজিত বলছ – পরীক্ষা ড্রপ দিতে?’

‘আমি তোমার শরীরের কথা চিন্তা করে বলছি।’

‘কথাটা সত্যি নয়। তুমি আমার শরীরের কথা চিন্তা করে বলছ না। বলছ – তোমার মায়ের কান ফুসলানিতে বিভোর হয়ে।’ ব্যঙ্গ ফুটে উঠল দেবর্ষির চোখে-মুখে।

আসলে সেদিনের কথাগুলো আড়াল থেকে শুনে ফেলেছিল দেবর্ষি। এমনিতে সকাল-সকাল ওঠে সে। সুরজিত তার পরে বিছানা ছাড়ে। কেন জানি চোখদুটো ঘুমে জড়িয়ে গিয়েছিল সেদিন সকালের দিকে। হঠাৎ ঘুম ভাঙার পর দেখেছিল – পাশে সুরজিত নেই। বাথরুম চেক করে সুরজিতের খোঁজে ড্রইংরুমের দিকেই গিয়েছিল দেবর্ষি। গিয়েই শাশুড়ির-সুরজিতের বাক্যালাপ শুনতে পেয়েছিল সে।

দেবর্ষির কথা শুনে চমকে উঠলেও দ্রম্নত নিজেকে সামলে নিয়েছিল সুরজিত। খোলনলচে ছেড়ে বাইরে বেরিয়ে এসেছিল সে। ধুম করে কণ্ঠ চড়িয়ে বলেছিল, ‘তুমি আর পড়তে পারবে না। পড়ার আর দরকার নেই তোমার।’

‘আমি পড়বই। যে-কোনো মূল্যে এমএ ফাইনালটা দেবই আমি।’ হাতের নোটটি উঁচিয়ে ধরে বলেছিল দেবর্ষি।

সুরজিত আচমকা দেবর্ষির দিকে এগিয়ে গিয়েছিল। চট করে হাত থেকে নোটটা কেড়ে নিয়ে কুচি-কুচি করে ছিঁড়তে শুরু করেছিল। ছেঁড়া শেষ করে দেবর্ষির মুখের ওপর ছুড়ে দিয়ে তীব্র কণ্ঠে বলে উঠেছিল, ‘দেখি তুমি কেমন করে এমএ পরীক্ষা দাও।’

তীব্র একটা কান্না দেবর্ষির গলাকে ফালাফালা করে দিয়ে বেরিয়ে এসেছিল। আকুল কান্নায় ভেঙে পড়েছিল দেবর্ষি। অনেকক্ষণ কাঁদার পর চোখ-মুখ মুছে দৃঢ়কণ্ঠে বলেছিল, ‘তুমি শুনে রাখো সুরজিত, আমি আবার বলছি যে-কোনো মূল্যে আমি এমএ পরীক্ষা দেবই।’

ওদের বেডরুমের পাশেই শ্বশুর-শাশুড়ির বেডরুম। ওদের কথা কাটাকাটি আর দেবর্ষির আকুল কান্নার শব্দ ওঁদের না শোনার কথা নয়। শুনেছিলেনও।

শ্বশুর বলেছিলেন, ‘সুরজিত কি বউয়ের সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করছে? বউটা কাঁদছে কেন? তুমি গিয়ে দেখে আস, সমস্যাটা কী।’

মিত্রা দেবী সোহাগি গলায় বলেছিলেন, ‘আরে রাখো তো। স্বামী-স্ত্রীতে কত রকম খুনসুটি হয়। সব তাতে কান দিলে হয় নাকি! নিজেদের সমস্যা নিজেরা মিটিয়ে নেবে। শুয়ে পড়ো। কাল সকালেই তো তোমার ফ্লাইট।’

সুরজিত-দেবর্ষির ঝগড়াটা ওই রাতে ওখানেই থেমে গেলে ভালো হতো। দেবর্ষি থেমে গেলেও সুরজিত থামেনি। বলেছিল, ‘কথা না শুনলে চড়িয়ে দাঁত ফেলে দেবে।’

‘দাঁত ফেলে দেবে!’

কেন জানি সুরজিতের মস্তিষ্ক আরো উষ্ণ হয়ে উঠেছিল। ক্ষুব্ধ কণ্ঠে বলে উঠেছিল, ‘বিয়োচ্ছিস তো মেয়ে। এত চেটাং চেটাং কথা কিসের? পরীক্ষা না দিতে বলছি, দিবি না। ব্যস।’

এবার কণ্ঠে মনের সমস্ত জোর ঢেলে দেবর্ষি বলল, ‘পরীক্ষা আমি দেবই।’

সুরজিত তেড়ে দেবর্ষির কাছে গেল। ডান পা-টা দেবর্ষির পেট বরাবর উঁচিয়ে মুখে বলল, ‘লাত্থি মেরে পেট ফাটিয়ে দেব হারামজাদি।’

একেবারেই শান্ত হয়ে গিয়েছিল দেবর্ষি। সুরজিতের জন্য তার বড় করুণা হতে লাগল। ওয়াশরুম থেকে হাতে-মুখে জল দিয়ে এসেছিল। তার পর বিছানায় শুয়ে পড়েছিল।

 

ছয়

পরদিনই বাপের বাড়িতে চলে এসেছিল দেবর্ষি। সকালেই মিহির দত্ত এয়ারপোর্টের উদ্দেশে বেরিয়ে পড়েছিলেন। সাড়ে নয়টার দিকে

সুরজিত অফিসে চলে গেল। যাওয়ার আগে দুজনের মধ্যে কোনো কথা হলো না। কাজলির মা নাশতা খাওয়ার জন্য দেবর্ষিকে ডাকতে এসে দেখল – দেবর্ষি ব্যাগ গোছাচ্ছে। একটু অবাক হয়ে কাজলির মা জিজ্ঞেস করল, ‘কী ব্যাপার বউদি? ব্যাগ গোছাচ্ছ যে?’ প্রথমে কাজলির মাকে এড়িয়ে যেতে চাইল দেবর্ষি। বলল, ‘এমনিতে।’

কাজলির মা রাতের ঘটনার কিছুই জানে না। তারপরও তার পাকা চোখ। সে বলল, ‘না তো বউদি, তুমি তো এমনি-এমনি ব্যাগ গোছাচ্ছ বলে মনে হচ্ছে না। তোমাকে বড় মন খারাপ দেখাচ্ছে। তুমি কি বাপের বাড়িতে যাচ্ছ?’

‘হ্যাঁ, কাজলির মা। আমি বাপের বাড়িতে যাচ্ছি। এখানে আমার দম বন্ধ হয়ে আসছে।’

দেবর্ষির কথা শুনে মূল দরজার দিকে হেঁটে গিয়েছিল কাজলির মা। দরজাটা বন্ধ করে দিয়ে দেবর্ষির নিকটে এসে দাঁড়িয়েছিল। চাপাস্বরে বলেছিল, ‘বউদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করা এই পরিবারের আদত।’

‘মানে? কী বলতে চাইছ কাজলির মা!’ বিস্মিত চোখ দুটো কাজলির মায়ের দিকে তুলেছিল দেবর্ষি।

‘আর বলো না বউদি। ওসব তুমি জানতে চেও না। তাতে তোমার দুঃখ বাড়বে।’

দেবর্ষি কাপড় গোছানো থামিয়ে দিলো। স্থির চোখে কাজলির মায়ের দিকে তাকাল। বলল, ‘দুঃখ বাড়বে! তোমার কথা তো ঠিকঠাক মতো বুঝতে পারছি না কাজলির মা। সবকিছু খুলে বলো না।’

প্রথম দিনই দেবর্ষিকে কেন জানি ভালো লেগে গিয়েছিল কাজলির মায়ের। শান্ত চোখ, মায়াময় চেহারা দেবর্ষির। এ রকমই চেহারা ছিল কাজলির। পুকুরে ডুবে না মরলে আজ হয়তো এত বড়ই হতো, এ রকম চেহারাই হতো। হয়তো কাজলির মায়ের ধারণা ঠিক নয়, কিন্তু দেবর্ষিকে ভালোবাসবার জন্য একটা কারণ তো চাই। কাজলির সঙ্গে দেবর্ষির চেহারার সাযুজ্যতার সন্ধান করা কাজলির মায়ের হয়তো সেরকমই একটা অনুসন্ধান। প্রথম দিনের ভালোবাসা দিনদিন গাঢ় হয়েছে। সে অল্পশিক্ষিত, কিন্তু মানুষকে চেনার অভিজ্ঞতা তার প্রচুর। সেই অভিজ্ঞতা থেকে সে বুঝেছে – মিত্রা দেবী দেবর্ষিকে যথাযথ মর্যাদা দিতে নারাজ। কথায় আর আচরণে মিত্রা দেবী যে দেবর্ষিকে তা বুঝিয়ে দেন – তাও খেয়াল করে কাজলির মা। ইদানীং যে মিত্রা দেবী বউদির পেছনে লেগেছেন, সুযোগ বুঝে সুরজিত দাদার কানে বিষ ঢালছেন, তাও কাজলির মায়ের চোখ এড়িয়ে যাচ্ছে না। গতরাতে সে

খাওয়ানো-দাওয়ানোর পাট চুকিয়ে ঘুমাতে চলে গিয়েছিল। নিচতলার সিঁড়িঘরে তার থাকবার ব্যবস্থা। সেখান থেকে দোতলার ঘটনা তার জানতে পারার কথা নয়। জানেও নি। কিন্তু বউদির চোখ-মুখ দেখে কাজলির মা নিশ্চিত হয়েছে যে, গতরাতে এই দোতলায় সাংঘাতিক কিছু একটা ঘটে গেছে। সেই ঘটনার শিকার যে দেবর্ষি বউদি, তা বুঝতে কাজলির মায়ের বিলম্ব হয়নি। আর বউদের নিয়ে এই বাড়িতে কী ঘটে, তা তো কাজলির মা জানেই। সেই জানা কথাগুলো এতদিন দেবর্ষি বউদির কাছ থেকে লুকিয়ে রেখেছিল সে। একই ঘটনা দ্বিতীয়বার ঘটতে যাচ্ছে ভেবে কাজলির মা নিজেকে আর সংযত রাখতে পারল না।

চাপাস্বরে বলল, ‘এই মিত্রা দেবীর জন্য বড় বউটিও শ্বশুরবাড়িতে থাকতে পারেনি বউদি।’

‘মানে!’দেবর্ষি বলে।

‘গরিব মানুষের মেয়ে ছিল বড় বউদি, কিন্তু সুন্দরী ছিল। ওই সৌন্দর্যের জন্যেই বড় বউদিকে কর্তামশাই বড় ছেলের বউ হিসেবে বেছে নিয়ে ছিলেন। বড় বউটি গরিবঘরের মেয়ে হলে কী হবে এমএ পাশ ছিল, ইংরাজিতে। আর বড়দা বিএ ফেইল। একদিন বউটি যখন চাকরি করতে চাইল, প্যাঁচটা লাগাল তোমার শাশুড়ি। দত্তবাড়ির মান-ইজ্জত নিয়ে কথা তুলল। কিন্তু বড়দা মায়ের ব্যাপারটা গোড়াতেই বুঝে গেল। মায়ের কথা কানে তুলল না। তোমার শাশুড়ি কর্তামশাইয়ের কান ভারি করতে চাইলেন। তিনি তো হিলিস্নদিলিস্ন করা লোক। বিদ্যার মূল্য আর চাকরির গুরুত্ব তিনি বোঝেন। শাশুড়ির কথার উত্তরে তোমার শ্বশুর বলেছিলেন – শিক্ষিত মেয়ে, চাকরি করলে অসুবিধা কী? ও তো আর দত্তবাড়িতে রান্নাবান্না করতে আসেনি। মুখ বেজার করে কর্তামশাইয়ের পাশ থেকে সরে গিয়েছিলেন মিত্রা দেবী। বড় ছেলে আর স্বামীর কাছে সুবিধা করতে না পেরে সুরজিতদাকে দলে টেনেছিলেন তোমার শাশুড়ি।’ দম ফেলবার জন্য একটু থেমেছিল কাজলির মা।

দেবর্ষি বাহ্যজ্ঞানশূন্য হয়ে কাজলির মায়ের কথাগুলো শুনে যাচ্ছিল। কাজলির মা থামতেই দেবর্ষি প্রশ্ন করল, ‘দলে টেনেছিলেন মানে!’

‘কলেজ পাশ করে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছে তখন

সুরজিতদা।’

‘আসল কথাটা বলো না কাজলির মা।’

‘বলছি। এক দুপুরে বউ-শাশুড়িতে কথাকাটাকাটি।’

‘কেন?’

‘তোমার শাশুড়ি তো অহংকারী মহিলা। খুব জেদিও।’

‘তারপর?’ অধৈর্য দেবর্ষি জিজ্ঞেস করে।

‘স্বামী পুত্র তাকে পাত্তা না দিলে তাঁর জেদ আরো বেড়ে গেল। জেদের বসে বউয়ের ওপর নানারকম অত্যাচার করতে শুরু করলেন।’

‘কী রকম?’

‘এই যেমন অতি সকালে ঘুম থেকে উঠবার জন্য বললেন। রান্নাঘরের কাজে হাত লাগাবার আদেশ দিলেন। আমাকে আড়ালে ডেকে বললেন – রান্নাবান্নার কাজ বউকে বুঝিয়ে দাও।’

‘তুমি দিলে?’

‘না। আমার কথা শেষ হয়নি এখনো। আমি বললাম – তা কী করে হয় গিন্নিমা! এই বাড়ির বউ বলে কথা। দত্তবাড়ির বউ হয়ে রান্নাঘরে ঢুকবে?’

‘উনি কী বললেন?’

‘উনি ক্ষিপে গেলেন। চোখ রাঙিয়ে বললেন – যা বলছি, তা করো। আমার আদেশ না মানলে এ-ঘরের ভাত ফুরাবে তোমার।’

‘তুমি কী করলে?’

‘আমি তো নিরুপায়। বউটা ডাল রাঁধতে গিয়ে হাতে ছ্যাঁকা খেতে লাগল। মাংস রাঁধতে গিয়ে গরম তেলে হাতে ফোসকা পড়তে লাগল।’

‘বউদি কিছু বলল না?’

‘না। দাঁতে দাঁত চেপে সংসারের ঘানি টেনে যেতে লাগল।’

‘বড়দা কিছু বলল না?’

‘বড়দা বলল – ধৈর্য ধরো ঊর্মি। একদিন সব ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু একদিন সব ঠিক হয়ে গেল না। বরং উল্টাটা ঘটল।’

‘কী রকম?’

‘সকাল দশটা-টশটা হবে বোধহয়। এই কিছুক্ষণ আগে চা খেয়েছেন তোমার শাশুড়ি। সবাইকে খাইয়ে বেচারি বড়

বউদি পরোটাটা মুখে দিতে যাচ্ছিল, অমনি হাঁক দিলেন – বউমা, আমাকে এক কাপ চা দাও তো। আমি তাড়াতাড়ি কাছে এসে বললাম।’

‘কী বললে তুমি?’

‘বললাম। বড় বউদি তো নাশতা খেতে বসেছে। চা-টা আমি বানিয়ে আনি। উনি বললেন – নাশতা খেতে এতক্ষণ লাগে। জীবনের খাওয়া খেয়ে নিচ্ছে নাকি। আর কাজলির মা, তোমাকেও বলি বউ থাকতে তুমি দেবে কেন চা?’

‘তারপর?’

‘তারপর আর কী। নাশতা খাওয়া ফেলে রেখে বড় বউদি হেঁশেলে ঢুকল। চা বানিয়ে দ্রম্নত শাশুড়ির কাছে নিয়ে এলো। কিন্তু দুর্ভাগ্য, চা নিতে গিয়ে তোমার শাশুড়ির হাত থেকে কাপটি পড়ে গেল। পরনের শাড়িটা নষ্ট হয়ে গেল তাঁর।’

‘চায়ের কাপ পড়ে গেল, না ইচ্ছে করে ছেড়ে দিলেন?’

‘তা বলতে পারব না বউদি। ঈশ্বর জানেন আর মিত্রা দেবী জানে।’

‘তারপর কী করলেন তিনি?’

‘বললে কি তুমি বিশ্বাস যাবে?’

এবার কোনো কথা বলল না দেবর্ষি। জিজ্ঞাসু চোখে কাজলির মায়ের দিকে তাকিয়ে থাকল শুধু।

কাজলির মা বলল, ‘কী আর বলব বউদি। তেড়ে উঠলেন তিনি। যে-কথা এ-বাড়িতে কোনোদিন শুনিনি, সেরকম কথাই বললেন।’

‘কী বললেন?’

‘বললেন – বান্দির বাইচ্চা বান্দি। ইচ্ছে করে চা ঢেলে দিলি আমার গায়ে! হায় হায়, আমার এত দামি শাড়িটা নষ্ট হয়ে গেল!’

‘শুনে বড় বউদি কী বলল?’

‘কী আর বলবে? হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে থাকল। তোমার শাশুড়ি কাপটি কুড়িয়ে নিয়ে ফ্লোরে জোরসে ছুড়ে মারল। খান খান হয়ে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ল কাপের টুকরাগুলো।’

‘তখন ঘরে তুমি ছাড়া আর কেউ ছিল না?’

‘ছিল। সুরজিতদা ছিল। বড়দা আর কর্তামশাই তো তখন অফিসে চলে গেছেন।’

‘তো সুরজিত কী করল?’

‘তাড়াতাড়ি তার ঘর থেকে বেরিয়ে এলো সুরজিতদা। মায়ের কাছে এসে জিজ্ঞেস করল  –  কী হয়েছে? কী হয়েছে মা? মা তো সুযোগ পেয়ে গেলেন। হাহাকার করতে-করতে বললেন  –  এই দেখ, আমার গায়ে চা ছুড়ে দিয়েছে অরিজিতের বউটি।’

‘সুরজিত বিশ্বাস করল মায়ের কথা?’

‘শুধু বিশ্বাস করল কিনা জিজ্ঞেস করছ? ঘটনাও ঘটাল।’

‘কী ঘটনা?’

‘জঘন্য ঘটনা।’

‘আহ্ কাজলির মা, বেদনার মধ্যে আমার কষ্টটা আর বাড়াইও না। কী জঘন্য ঘটনা বলো।’

‘সুরজিতদা ঠাস করে বড় বউদির গালে চড় বসিয়ে দিলো একটা। মুখে বলল – আমার মাকে অপমান করস?’

‘বউদি কী করল?’

‘কেন জিজ্ঞেস করছ – বউদি কী করল? কী করল তুমি বুঝতে পারছ না?’ দেবর্ষির গলা শুকিয়ে গেছে। সকল শিরায় যেন রক্ত চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে তার। ঢোক গিলবার চেষ্টা করল। কিন্তু গালের ভেতর কোনো থুতু পেল না গিলবার জন্য। আসেত্ম করে বলল, ‘তখন তুমি কী করলে কাজলির মা।’

‘আমরা গরিব মানুষ বউদি। স্বামীটা খাতুনগঞ্জের একটা সওদাগরির অফিসে চাকরি করত। ক্যাশিয়ার ছিল। ব্যাংকে টাকা জমা দিতে গিয়ে ছিনতাইয়ের কবলে পড়ল। পেটে ছুরি চালিয়েছিল ওরা। হাসপাতালে যমে-মানুষে টানাটানি হলো কদিন। মারা গেল একদিন। কাজলিও তখন পুকুরে ডুবে মরেছে। নিরুপায় হয়ে অভাবের তাড়নায় গ্রাম ছাড়লাম একদিন। একসময়ের

ইন্টারমিডিয়েট পাশ কাজলির মা এই দত্তবাড়িতে ঝি-গিরি শুরু করলাম।’

একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে কাজলির মা আবার বলল, ‘সুরজিতদার কা- দেখে আমার মাথাটা ঘুরে গেল। পড়ে যেতে-যেতে ডাইনিং টেবিলের চেয়ার আঁকড়ে ধরলাম।’ থামল কাজলির মা। দেবর্ষি কোনো কিছু জিজ্ঞেস করে কিনা তার জন্য অপেক্ষা করতে লাগল। কিন্তু দেবর্ষি কিছু জিজ্ঞেস করল না। বিস্ফারিত চোখে শুধু কাজলির মায়ের দিকে তাকিয়ে থাকল।

কাজলির মা ধীরে-ধীরে বলল, ‘এরপর থেকে বড় বউদি একেবারে বোবা হয়ে গেল। ঘরের সব কাজকর্ম করে কিন্তু যেন নিষ্প্রাণ পুতুল। এমনভাবে আচরণ করল, যেন কিছুই হয়নি। অরিজিতদা কিছুই বুঝল না। কিন্তু যিনি বোঝার তিনি বুঝে গেলেন।’

‘কে বুঝে গেলেন?’

‘কর্তামশাই। এক শুক্রবার বিকেলে তোমার শাশুড়ি গোল পাহাড়ের মন্দিরে গেছেন, কর্তামশাই আমাকে ডাকলেন। তিনি সরাসরি জিজ্ঞেস করলেন  – বড় বউয়ের কী হয়েছে কাজলির মা? আমার ভেতরে কষ্টটা এতদিন গুমরে মরছিল। সুযোগ পেয়ে সব ঘটনা উগরে দিলাম।’

‘শুনে শ্বশুর কী বললেন?’

‘বলছি। তিনি বেশ কিছুদিন চুপচাপ থাকলেন। একদিন অরিজিতদাকে ডেকে বললেন, তোমার শাশুড়িও উপস্থিত ছিলেন সেখানে, এ-মাসের শেষের দিকে তুমি কলকাতায় চলে যাবে। সেখানে আমার ব্যবসা মার খাচ্ছে। তুমি গিয়ে হাল ধরো। আর শোনো, বিধাননগরে আমাদের যে-ফ্ল্যাটটা আছে, সেখানে উঠবে তুমি। ও হ্যাঁ, তোমার বউও তোমার সঙ্গে যাবে।’

‘তারপর?’

‘তারপর বড়দা বউ নিয়ে কলকাতায় চলে গেল। মাঝে-মাঝে বড়দা আসে। কিন্তু বউটি আর কোনোদিন এই বাড়িতে পা রাখেনি।’

একটুক্ষণ পর কাজলির মা আবার বলল, ‘তাই বলছিলাম বউদি, বউদের অপমান করা এই বাড়ির রীতি। গতরাতে কী হয়েছে জানি না, যদি তোমার মন বলে – এই বাড়ি থেকে চলে যাওয়া উচিত, তাহলে চলে যাও।’ বলে আর দাঁড়ায়নি কাজলির মা। দরজার দিকে এগিয়ে গিয়েছিল।

 

সাত

দরজায় দেবর্ষিকে দেখে ভীষণ ভড়কে গিয়েছিলেন সবিতা দেবী। প্রথমে তাঁর মুখ দিয়ে কোনো কথাই বেরোয়নি। পরে বলেছিলেন, ‘কী মা! কী ব্যাপার মা! কোনো কিছু হয়েছে? তোমাকে এরকম দেখাচ্ছে কেন?’

বিষণ্ণ একটু হেসে দেবর্ষি বলেছিল, ‘কিছু না মা। দুদিন তোমাদের এখানে থাকতে এলাম।’

‘মানে! কোনো কিছু হয়েছে? সুরজিতের সঙ্গে ঝগড়া-বিবাদ?’

আগের হাসিটা মুখে ছড়িয়ে রেখে দেবর্ষি বলল, ‘মা, তোমাদের সঙ্গে কি আমার দুটা দিন থাকতে নেই?’

দেবর্ষিকে বুকের কাছে টেনে নিয়ে সবিতা দেবী বললেন, ‘কী যে বলো না মা! এ-তো তোমারই বাড়ি। তুমি বাপের বাড়িতে এসে কয়েকটা দিন থাকবে, তাতে আমাদের আপত্তি থাকবে কেন?’

ব্যাগটা দেবর্ষির বেডরুমে রেখে এসে সবিতা দেখলেন – বিপর্যস্ত চেহারায় দেবর্ষি সোফায় বসে আছে। সবিতা দেবী কাছ ঘেঁষে বসলে দেবর্ষি বলল, ‘মা, বড় খিদে পেয়েছে। কিছু খেতে দেবে?’

 

‘দিচ্ছি, দিচ্ছি মা। তুমি তোমার রুমে যাও। হাত-মুখ ধোও। পাঁচ মিনিটের মধ্যে আমি তোমার খাবার বানিয়ে আনছি।’

মা রান্নাঘরের দিকে চলে গেলে দেবর্ষির চোখে শাশুড়ির ভেংচিকাটা মুখটি ভেসে উঠল। কাজলির মা চলে গেলে মাথায় একটু চিরুনি বুলিয়ে ব্যাগটা হাতে নিয়ে ড্রইংরুমে গিয়েছিল দেবর্ষি। মিত্রা দেবী তখন দেবর্ষির বাপের বাড়ি থেকে দেওয়া টিভিতে নিউজ দেখছেন। হাতে তাঁর চায়ের কাপ।

দেবর্ষি শাশুড়ির সামনে গিয়ে বলেছিল, ‘আমি বাপের বাড়ি যাচ্ছি মা। কদিন থাকব ওখানে। পরীক্ষাটাও ওখান থেকে দেব।’

দেবর্ষির কথা শুনে মিত্রা দেবীর হাতের চা ছলকে কি পিরিচে পড়েছিল – তেমন করে খেয়াল করেনি দেবর্ষি। শুধু শাশুড়ির

কথাগুলো খেয়াল করেছিল।

শাশুড়ি বলেছিলেন, ‘কেন আমাদের বাড়ি থেকে পরীক্ষা দেওয়া যায় না?’

‘যায় না। এখানে পরিবেশ নেই। ’ কণ্ঠটা রূঢ় হয়ে উঠেছিল দেবর্ষির।

নাক-চোখ কুঁচকে বিরাট একটা ভেংচি কেটেছিলেন মিত্রা দেবী। সেই ভেংচিতে ঘৃণা, তিরস্কার বিস্ময় মিলেমিশে ছিল।

ভেংচির কোনো জবাব না দিয়ে পেছন ফিরেছিল দেবর্ষি।

‘কী মা, এখনো বেডরুমে যাওনি?’

‘যাচ্ছি মা।’ বলে সোফার হাতল ধরে উঠতে যাচ্ছিল দেবর্ষি। মা দ্রম্নত তার কাছে এগিয়ে গিয়ে হাত ধরেছিলেন।

সন্ধ্যায় মা-বাপের কাছে সব খুলে বলেছিল দেবর্ষি।

সোমনাথ-দম্পতি অবাক বিস্ময়ে তার কথাগুলো শুনে গিয়েছিলেন।

সব শুনে বাবা বলেছিলেন, ‘জানি না মা এ তোমার জীবনের পরীক্ষা কিনা। এসে ভালো করেছো। ওখানে থাকলে পরীক্ষাটা ভালো হতো না।’

‘কন্যাসন্তান হওয়ার জন্য কি আমার মেয়ে দায়ী?’  হাহাকার করে উঠলেন সবিতা দেবী। তারপর ক্ষুব্ধ কণ্ঠে বললেন, ‘শুনেছি বড় ছেলের ঘরেও মেয়ে। একটা মাত্র মেয়ে। ওই বউ নাকি বলেও দিয়েছে – আর সন্তান নেবে না।’

‘আজ থাক ওসব কথা। তুমি শুধু দেবর্ষির যত্ন নাও, ও যাতে পরীক্ষাটা ভালোমতো দিতে পারে।’ তারপর কন্যার দিকে ফিরে জিজ্ঞেস করলেন, ‘বই খাতাপত্র এনেছ তো মা?’

দেবর্ষি আসেত্ম করে ডান দিকে মাথা কাত করেছিল।

দিন সাতেক পরে অফিসে গিয়ে মিহিরবাবুর সঙ্গে দেখা করেছিলেন সোমনাথবাবু। গতদিনই কেবল বিদেশ থেকে ফিরেছেন মিহির দত্ত। বেহাইকে দেখে চঞ্চল হয়ে উঠেছিলেন মিহিরবাবু। বলেছিলেন, ‘আরে বেহাই যে! আসুন আসুন।’ বলে ইন্টারকমে দুকাপ কফির অর্ডার দিয়েছিলেন মিহিরবাবু।

কপি খেতে-খেতে প্রসঙ্গটা তুলেছিলেন সোমনাথবাবু। তবে শাশুড়ি-সুরজিতের প্রসঙ্গটা চেপে গিয়েছিলেন। বলেছিলেন, ‘মেয়ের পরীক্ষাটা সামনে। শরীরটাও ভালো না। বেয়ানেরও বয়স হয়েছে। আমাদের এখানে একটু বাড়তি যত্ন পাবে বলে দেবর্ষি আমাদের বাড়িতে চলে এসেছে। পরীক্ষা শেষে ফিরে যাবে।’

গতকাল বিকেলের দিকে ফিরলেও বেয়াড়াপনা দেখিয়ে বউয়ের বাপের বাড়িতে চলে যাওয়ার ব্যাপারটি স্বামীর কানে তুলে দিতে বিলম্ব করেননি মিত্রা দেবী। এবারের বিদেশ সফরে ব্যবসায়িক যে-লাভটা হওয়ার কথা ছিল, তা হয়নি মিহিরবাবুর। এমনিতে মনটা খিচড়ে আছে। স্ত্রীর কান ফুসলানো কথা শুনে তাঁর সেই বিরক্তি আরো বেড়ে গেল। পঁয়ত্রিশ বছর ঘর করছেন, স্ত্রীকে তার না চেনার কথা নয়। তার পরও বেশ কদিন পর বাহির থেকে ফিরেছেন, তাই স্ত্রীর মনে কষ্ট দিতে চাইলেন না তিনি। বিরক্তিটা ভেতরে চালান করে দিলেন। মুখে হাসি ঝুলিয়ে বললেন, ‘সবেমাত্র বিদেশ থেকে ফিরলাম। একটু বিশ্রাম নিতে দাও। ব্যাপারটা আমি দেখছি।’

বেহাইয়ের কথা শুনে হাসতে-হাসতে মিহিরবাবু বললেন, ‘বউমা আপনাদের বাড়িতে গেছে তো গেছে। ভালো কাজের জন্যই তো গেছে। আর আমি তো জানি – শাশুড়ির চেয়ে মায়ের দরদ কত বেশি। এই কথা বলার জন্যই আপনার আমার অফিস পর্যন্ত আসা উচিত হয়নি বেহাই। আপনার মেয়ে এমএ পাশ করলে সবচাইতে বেশি সুনাম হবে তো দত্তবাড়ির।’ তারপর চেয়ারে হেলান দিয়ে বললেন, ‘পরীক্ষা শেষ হলে বউমা যখনই আসতে চাইবে, ফোন করবেন আমাকে। গাড়ি পাঠিয়ে দেব।’ সোমনাথবাবু হাঁফ ছেড়ে বাঁচলেন। বেহাইয়ের কথা শুনে বড় আনন্দ লাগল তাঁর। সেই আনন্দ তাঁর চোখে-মুখে ফুটেও উঠল। উচ্ছ্বসিত গলায় বললেন, ‘গাড়ি লাগবে না বেহাই। আমি নিজেই পৌঁছে দেব।’

‘কেন, বেহাই কেন? দত্তবাড়িতে কি গাড়ির অভাব হয়েছে? আপনার কোনো কথা শুনব না। শুধু ফোন করবেন, বউ নিয়ে যাওয়ার দায়িত্ব আমার।’

বড় তৃপ্তি নিয়ে সেদিন বেহাইয়ের অফিস থেকে বেরিয়ে এসেছিলেন সোমনাথবাবু।

 

আট

পরীক্ষা শেষে বাবার অনুরোধ আর মায়ের কাকুতিতে দেবর্ষি শ্বশুরবাড়িতে ফিরে গিয়েছিল। যাওয়ার আগে বলেছিল, ‘তোমরা আমাকে ওখানে পাঠাচ্ছ ঠিকই, তবে আমার মন বলছে – খুব সুখের হবে না আমার ওই জীবন।’

বাবা বলেছিলেন, ‘তুমি শক্ত ধাঁচের মেয়ে দেবর্ষি। সেই মেয়ের অল্পতে ভেঙে পড়লে চলবে কেন? দেখে নিও সব ঠিক হয়ে যাবে।’

‘সব ঠিক হয়ে যাবে না বাবা। মা নিষ্ঠুর। ধনের অহংকারে অন্ধ। ছেলে তাঁর দ্বারা প্রভাবিত। শ্বশুরও সাংসারিক ভেজাল এড়িয়ে চলেন। কী করে সব ঠিক হয়ে যাবে বল?’

সবিতা দেবী বললেন, ‘সংসারে ওরকম ভাঙচোর একটু হয়ই মা। ধৈর্য ধরে থাকো মা। সামনে তোমার দুঃসময়। নাতনিটা আসুক আগে। নাতনির মুখ দেখলে বেয়ানের সকল রাগ-ক্ষোভ মিইয়ে যাবে। আর সুরজিত তো বাবাই। সন্তানের মুখ দেখে তার মুখ প্রশান্তিতে ভরে উঠবে।’

‘কী যে বলো না মা। যে বাবা গর্ভবতী মায়ের পেটে লাথি মারতে চায়, তার হবে পরিবর্তন!’

সোমনাথবাবু বললেন, ‘আজ যাওয়ার দিনে ওসব কথা থাক মা। তোমার শ্বশুর ভালো লোক। খুব করে মনে কষ্ট পেলে শ্বশুরকে বোঝাইও।’

‘তাঁকে পাই কোথায় যে, বোঝাব। তাছাড়া, শেষ বিচারে স্ত্রীরই জয় হবে তাঁর বিচারালয়ে।’

সোমনাথবাবু আর কিছু বলেননি সেদিন। শুধু দেবর্ষির দিকে করুণ চোখে তাকিয়ে ছিলেন।

স্বামীর করুণ মুখ দেখে সোমনাথগিন্নি বলে উঠেছিলেন, ‘স্নানঘরে যাও মা। দুমুঠো মুখে দাও। চারটার দিকে দত্তবাড়ি থেকে গাড়ি আসবে বলেছে।’ দেবর্ষি মস্নান একটু হেসেছিল।

সুরঞ্জনবাবু আর জেঠিমা কিছু একটা আঁচ করেছিলেন। একদিন অলকা জেঠিমা দেবর্ষির মাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, ‘দেবর্ষির কোনো কিছু হয়েছে?  তাকে খুব মনমরা দেখছি।’

সবিতা দেবী তাড়াতাড়ি বলে উঠেছিলেন, ‘না না দিদি। কই তেমন কিছু তো হয়নি। প্রথম বাচ্চা হবে তো। ভয়ে হয়তো কুঁকড়ে আছে।’ সোমনাথবাবু বলে দিয়েছিলেন – দেবর্ষির ব্যাপারটা যাতে নিচতলা পর্যন্ত না পৌঁছায়। বয়স্ক মানুষ। দেবর্ষিকে খুব ভালোবাসেন দুজনে। ওর কষ্টের কথা শুনলে ভীষণ ভেঙে পড়বেন। স্বামীর কথা মনে পড়ে যাওয়ায় অলকা দেবীকে এই মিথ্যে কথাটুকু বলতে হলো দেবর্ষির মাকে।

‘কিছু না হলেই মঙ্গল। দেবর্ষির প্রতি ভালো করে নজর রেখো। প্রথম পোয়াতি।’ চিন্তিত মুখে বলেছিলেন অলকা দেবী।

সে-রাতে অনেক দেরি করে ফিরল সুরজিত। সংসারে যতই অশান্তি হোক না কেন, আটটার মধ্যে ঘরে ফিরেছে সুরজিত। কিন্তু আজ দশটা পেরিয়ে গেলেও বাড়িতে ফিরল না। পোয়াতি শরীর। মনটাও দ্বিধাদ্বন্দ্ব-বেদনা-বিমর্ষতায় আবৃত। দশটা নাগাদ নিজেকে আর ধরে রাখতে পারেনি দেবর্ষি। কাজলির মা বারবার তাগিদ দিয়েছে, ‘তুমি অত রাত পর্যন্ত জেগে থেকো না বউদি। এতক্ষণ না খেয়ে থাকলে ভেতরের শিশুটা কষ্ট পাবে। তুমি খেলেই ও খাবে।’ কাজলির মায়ের চাপাচাপিতে দুমুঠো নাকে-মুখে দিয়েছিল দেবর্ষি। তারপর মশারির নিচে চলে এসেছিল।

 

বিছানায় চিৎ হয়ে শুয়ে পড়তেই তার চোখে ভেসে উঠেছিল শাশুড়ির মুখ। হাঁড়িমুখ করেই ড্রইংরুমের সোফাতে বসেছিলেন তিনি। পৃথুলা শরীর। কোমরের কাছে মাংসের সত্মূপ। চামড়া দুভাঁজ হয়ে শরীরের বেশকিছু অংশ আবৃত করে রাখে। ঘরের বাইরে যাওয়ার সময় শরীরটা রেখেঢেকে রাখলেও ঘরে তিনি অনেকটা বে-আব্রম্ন। শাড়ির আঁচলটা বেশিক্ষণ গায়ে রাখেন না তিনি। কোমরে শাড়ির কাছাটা গুঁজে রাখার ব্যাপারে তাঁর যত বে-খেয়াল। তো ওই অবস্থাতেই বসেছিলেন তিনি। দেবর্ষি তাঁর সামনে গিয়ে যতটুকু নিজেকে বাঁকানো যায়, ততটুকু বাঁকিয়ে শাশুড়িকে প্রণাম করেছিল। অন্য সময় হলে ‘থাক মা, থাক মা। শাশুড়িকে প্রণাম করতে নেই’ বলে বুকে জড়িয়ে ধরতেন, আজ কিন্তু কিছু বললেন না, কিছু করলেনও না। বেজার মুখে একপলক দেবর্ষির দিকে তাকিয়ে টেলিভিশনে চোখ গেঁথে দিলেন মিত্রা দেবী।

এসবের জন্য মনে-মনে প্রস্ত্ততি নিয়েই এসেছিল দেবর্ষি। কিন্তু মনকে যত শক্ত করে আসুক না কেন, শাশুড়ির মুখভঙ্গি দেখে তার অন্তরটা বিষণ্ণতায় ভরে উঠতে শুরু করল। বিষণ্ণতা তাকে পুরোপুরি গ্রাস করার আগে শাশুড়ির সম্মুখ থেকে সরে এসেছিল দেবর্ষি।

সুরজিতের জন্য অনেকটা আবেগ নিয়ে অপেক্ষা করে ছিল দেবর্ষি। এ কদিন একটা ফোন না করলেও সুরজিত তো তাকে উপেক্ষা করতে পারে না। প্রেম করেই তো তাদের বিয়ে হয়েছিল। রাগের বশে সে দেবর্ষির সঙ্গে দুর্ব্যবহার করেছে। কিন্তু তার তো বিবেক আছে। সে যখন বাপের বাড়িতে চলে গেছে, তখন নিশ্চয় তার প্রয়োজনীয়তাটা সুরজিত অনুভব করেছে। ওই সময় নিশ্চয় তার মধ্যে শুভবুদ্ধি জেগেছে। নিজের ভুলটা বুঝতে পেরেছে সে। ফোনটা করেনি হয়তো লজ্জায়। বাড়িতে গিয়ে তার খোঁজখবর নিতে পারত। কিন্তু সুরজিত হয়তো ভেবেছে – যে-পরিবারের মেয়ের সঙ্গে এমন খারাপ ব্যবহার করেছে, সেই পরিবারে গিয়ে মুখ দেখাবে কী করে। কিন্তু নিশ্চয় সে মনে-মনে ঠিক করে রেখেছে – দেবর্ষি এলেই তার মান ভাঙাবে, শত অনুরোধে আর উপরোধে তার মনের গস্নানি দূর করে দেবে। কিন্তু সে সুরজিতকে অনুরোধের সুযোগ দেবে না। তার আগেই তার বুকে ঝাঁপিয়ে পড়বে। বলবে  –  কিচ্ছুটি বলার দরকার নেই লক্ষ্মীটি। যা হবার হয়ে গেছে। চল, আমরা অতীত ভুলে যাই। আবার নতুন করে জীবন শুরু করি।

ভাবতে-ভাবতে চোখ লেগে এসেছিল দেবর্ষির। কখন সুরজিত এসে পাশে শুয়ে পড়েছে টের পায়নি।

যখন টের পেল, তখন ঘড়ির ছোট কাঁটাটি দুটো ছুঁই-ছুঁই। পাশ ফিরতে গিয়ে সুরজিতের গায়ে হাতটা লেগেছিল দেবর্ষির। তার ঘুম টুটে গিয়েছিল। টেবিল ল্যাম্পের আলোয় দেয়ালঘড়ির দিকে তাকিয়ে ছিল সে। সুরজিতের দিকে পলকহীন চোখে তাকিয়ে থেকেছিল অনেকক্ষণ। সুরজিতের নাক মৃদু ডাকছিল।

এরপর অনেকক্ষণ ঘুমাতে চেষ্টা করেছে দেবর্ষি। কিন্তু কিছুতেই ঘুম আসছিল না চোখে। গোলাপি রঙের মশারির ঘেরাটোপে ফুরফুর করে বাতাস ঢুকছিল। শোয়ার আগে সুরজিত বোধহয় ফ্যানের স্পিড বাড়িয়ে দিয়েছে। টেবিল ল্যাম্পের মৃদুনীল আলোতে ঘরে একটা মোহময় পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে। হঠাৎ সুরজিতের জন্য মনটা কেমন-কেমন করে উঠল দেবর্ষির। সুরজিতকে জড়িয়ে ধরতে ইচ্ছে করল তার। কিন্তু ডান হাতটা বাড়াতে গিয়ে থমকে গেল দেবর্ষি। যদি সুরজিত ঝাঁঝিয়ে ওঠে, যদি এতদিনের জমানো রাগ-ক্ষোভ গলা দিয়ে বেরিয়ে আসে সুরজিতের? তাহলে অপমানের অবধি থাকবে না। তার চেয়ে এই-ই ভালো। সুরজিত ঘুমাক। সকালে বলা যাবে তাকে – কী মশাই, এতদিন পরে এলাম, কই কিছু তো বললে না? জাগালেও না আমাকে! জড়িয়ে-টড়িয়ে তো ধরলে না আমায়? পাশ ফিরল দেবর্ষি। চেষ্টা করল ঘুমাতে। কিন্তু কিছুতে ঘুম আসছে না। এরপর চিৎ হয়ে সিলিংফ্যানের দিকে তাকিয়ে থাকল। নাহ্, আজ বুঝি আর ঘুম আসবে না। একটুও শব্দ না করে বিছানা থেকে নেমে এলো দেবর্ষি। সাইড টেবিলে জলের বোতলটা রাখা আছে। আধাগস্নাস জল ঢালল। ঢকঢক করে সমস্ত জল এক নিশ্বাসে খেয়ে ফেলল দেবর্ষি। তার পর জানালার দিকে মৃদুপায়ে এগিয়ে গেল। দক্ষিণের খোলা জানালার সামনে দাঁড়িয়ে রাস্তার দিকে দৃষ্টি ছড়িয়ে দিলো সে।

সারা শহর সুনসান। শুধু দূরের কোনো ডাস্টবিন থেকে কুকুরের কামড়াকামড়ির শব্দ ভেসে আসছে মাঝেমধ্যে। লাইটপোস্ট থেকে ক্ষীণ আলো বেরিয়ে চারদিকের পরিবেশকে ভৌতিক করে তুলছে। হঠাৎ বহুদূর প্রসারিত বড় রাস্তাটির প্রতি নজর পড়ল দেবর্ষির। দেবর্ষির মনে হলো – রাস্তাটি যেন বিশাল মরা অজগরের মতো নিশ্চল শুয়ে আছে শহরের মাঝখান বরাবর। রাস্তা থেকে ফুটপাতের দিকে নজর ফেরাল দেবর্ষি। দেখল – দুজন মানুষ সারা দেহে কাপড় মুড়িয়ে কুকুর-কু-লী পাকিয়ে শুয়ে আছে। এই গরমের দিনে মানুষগুলো সারাগায়ে কাপড় জড়িয়ে ঘুমাচ্ছে কেন? ওরা যে নিতান্ত দরিদ্র মানুষ, তাদের যে রাতে শোবার মতো ঠাঁইটুকু সেই, তা বুঝতে কষ্ট হচ্ছে না দেবর্ষির। কিন্তু কাপড় মুড়িয়ে শুয়েছে কেন? এই গরমে লুঙ্গি অথবা কাঁথা জড়িয়ে কেন শুয়েছে লোকগুলো? তার উত্তর দেবর্ষির মাথায় খেলে গেল হঠাৎ। নিশ্চয় খুব মশা ফুটপাতে। মশার হাত থেকে বাঁচবার জন্য কাপড় মুড়ি দেওয়া ওই মানুষদুটোর।

ভোরের দিকে চোখদুটো লেগে এসেছিল একটু। হঠাৎ সুরজিতের কাঁৎ কুঁৎ করে কফ ঝাড়ার শব্দে ঘুম ভেঙে গেল দেবর্ষির। ধড়ফড়িয়ে বিছানায় উঠে বসল সে। দুচোখ রগড়িয়ে বাথরুমের দিকে তাকাল। দিনের আলো তখন স্পষ্ট। দেখল – বাথরুমের দরজা খোলা রেখেই নাক-গলা ঝাড়ছে সুরজিত। সে কাশছে আর কফ ফেলছে আর বড়-বড় শ্বাস নিচ্ছে।

আর ঘুমাতে ইচ্ছে করল না দেবর্ষির। সুরজিতের কি কোনো

অসুখ-বিসুখ হয়েছে? গেল কবছরের বৈবাহিক জীবনে সুরজিতের এরকম অবস্থা তো কখনো দেখেনি দেবর্ষি! কখনো তো একদলা কফ জোর আওয়াজ তুলে ফেলেও নি সুরজিত। তাহলে? তাহলে আজ কী হলো সুরজিতের? এই কদিনে তার কোনো কি অসুখ ধরা পড়েছে?

ভাবতে-ভাবতে খাট থেকে নামল দেবর্ষি। মশারির কোনাগুলো খাটের স্ট্যান্ড থেকে ছাড়িয়ে নিল। ধীরে-ধীরে বিছানাটা গুছিয়ে ফেলল দেবর্ষি। হঠাৎ সিঙ্গেল সোফার ওপর সুরজিতের প্যান্টটার প্রতি নজর পড়ল দেবর্ষির। কোনোরকমে পাজামাটা গলিয়ে প্যান্টটা সোফার দিকে ছুড়ে মেরে শুয়ে পড়েছিল সুরজিত – ভাবল দেবর্ষি। সুরজিত তো এমন নয়। গোছানোর দিকে খেয়াল তার। নিজের কাপড়-চোপড় নিজে গুছিয়ে রাখতে পছন্দ করে সে। কখনো অগোছালোভাবে ঘরের জিনিসপত্রও রাখতে পছন্দ করে না সুরজিত। নিশ্চয় তার শরীর খারাপ। নইলে কেন প্যান্টটাকে ছড়িয়ে রেখেছে ওরকম বিশ্রীভাবে! ভাবতে-ভাবতে প্যান্টটার দিকে মৃদুপায়ে হেঁটে গিয়েছিল দেবর্ষি।

প্যান্টটা হাতে নিয়ে ঝাড়তে গিয়ে পুরিয়া মতন একটা কী যেন টুপ করে প্যান্টের পকেট থেকে নিচে পড়ে গেল। বাঁ-হাতে প্যান্টটা ধরে রেখে অতিকষ্টে পুরিয়াটা ফ্লোর থেকে কুড়িয়ে নিল

দেবর্ষি। নাকের কাছে পুরিয়াটা নিয়ে এলে বিদ্ঘুটে একটা গন্ধ তার নাকে এসে ঝাপটা মারল। কখন তার বাঁ-হাত থেকে প্যান্টটা পড়ে গেছে, সেদিকে খেয়াল নেই দেবর্ষির। দুহাত দিয়ে পুরিয়াটা খুলে দেখল – গাছের শিকড় আর ফুলের মরা পাপড়ির মতো কী কতগুলো যেন। কী হতে পারে এগুলো? গাঁজাটাজা নয়তো? হ্যাঁ গাঁজাই তো! এগুলোকেই তো গাঁজা বলে। সেদিন কোনো একটা চ্যানেলে মাদকাসক্তদের নিয়ে একটা প্রতিবেদন দেখেছিল দেবর্ষি। সেদিন গাঁজা বলে রিপোর্টার যা দেখিয়েছিলেন, এগুলো তো হুবহু সেরকমই।

 

তা হলে গাঁজা ধরেছে সুরজিত? তাই এরকম বিশ্রীভাবে গলা ঝাড়ছে? মাথাটা হঠাৎ ঘুরে গেল দেবর্ষির। খাটের পায়াটা আঁকড়ে না ধরলে পড়েই যেত দেবর্ষি। খুব দ্রম্নত নিজেকে সামলে নিল সে। প্যান্টটা যেরকম ছিল, সে রকম সোফার ওপর রেখে বালিশের নিকটে দ্রম্নত হেঁটে এলো। গাঁজার পুরিয়াটা বালিশের নিচে

চাপাদিয়ে বারান্দায় গিয়ে দাঁড়াল দেবর্ষি।

কেন জানি সুরজিতের দিকে তাকাতে ইচ্ছে করল না দেবর্ষির। সুরজিতও বাথরুম থেকে ফিরে একটিবারের জন্যও দেবর্ষির দিকে তাকাল না। হাত-মুখ মোছার কাজে ব্যস্ত হয়ে থাকল। দেবর্ষি ধীরপায়ে বাথরুমের দরজার দিকে হেঁটে গেল। দরজায় খিল তুলে সটান আয়নার দিকে তাকাল। দেখল – সারাটা মুখম-লে কী রকম কান্নার ছায়া। জোরে-জোরে চোখে-মুখে জলের ঝাপটা দিতে শুরু করল দেবর্ষি।

প্রয়োজনের চেয়েও অতিরিক্ত সময় নিল দেবর্ষি, বাথরুমে। ফিরে দেখল – সুরজিত ঘরে নেই। একপা-দুপা করে সামনে এগিয়ে দেখল – মা আর ছেলে মুখোমুখি ব্রেকফাস্ট সারছেন। রুমে ফিরে বালিশের তলা থেকে গাঁজার পুরিয়াটা হাতে নিয়ে শাশুড়ির সামনে গিয়ে দাঁড়াল দেবর্ষি।

দেখতে পেয়ে কাজলির মা বলল, ‘আরে বউদি, জেগে গেছ দেখছি! বসো বসো, এই চেয়ারে বসো।  আমি তোমার জন্য নাশতা নিয়ে আসি।’

কাজলির মায়ের কথার কোনো জবাব দিলো না দেবর্ষি। পুরিয়াটা শাশুড়ির চোখের সামনে এগিয়ে ধরে বলল, ‘এটা কী মা?’

মিত্রা দেবী যেন কিছুই শুনতে পাননি, এমন করে চায়ের কাপে চুমুক দিতে লাগলেন।

‘মা, আপনাকে বলছি – এটা কী?’

এবার পুরিয়াটার দিকে না তাকিয়ে তাচ্ছিল্যভরে বললেন, ‘আমি কী জানি ওটা কী?’

‘আপনি জানেন না? পুরিয়াটির দিকে না তাকিয়েই বলছেন –  আপনি জানেন না এটা কী?’

মুখটাকে আরো বিকৃত করে মিত্রা দেবী ধমকে উঠলেন, ‘বললাম তো আমি জানি না।’

‘তাহলে আমি বলছি – এটা গাঁজার পুরিয়া।’

‘কী! কী বলছ? গাঁজার পুরিয়া? গাঁজার পুরিয়া এই দত্তবাড়িতে এলো কী করে?’

‘অভিনয় করছেন মা? আপনার অভিনয় ঠিকঠাক মতন হচ্ছে না।’ তার পর জোরে শ্বাস টেনে বুকে বাতাস ভরে নিল দেবর্ষি। গলায় জোর ঢেলে বলল, ‘আপনার ননীর পুতুলের পকেটে পাওয়া গেছে এই গাঁজার পুরিয়াটি। গাঁজা ধরেছে সুরজিত।’

এবার সুরজিত গর্জে উঠল, ‘খবরদার।’

‘চোখ রাঙিয়ে আমাকে হয়তো চুপ করাতে পারবে তুমি। কিন্তু গাঁজার পুরিয়ার প্রমাণটাকে কী করবে তুমি?’

হঠাৎ চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন মিত্রা দেবী। দেবর্ষির দিকে তর্জনী বাড়িয়ে বললেন, ‘চোপরাও মেয়ে। আর একটি শব্দও করবে না। বেশি হাউকাউ করতে গেলে বিপদে পড়বে।’

এই সময় কাজলির মা কথা বলে উঠল। এই বাড়ির কাজের মাসি হলেও দীর্ঘদিন এই বাড়িতে থাকার অধিকারেই হয়তো কাজলির মা কথা বলল, ‘থাক গিন্নিমা। পোয়াতি মেয়ে। বেশি উত্তেজিত হয়ে পড়লে বাচ্চাটার ক্ষতি হয়ে যাবে।’ তার পর দেবর্ষির দিকে মুখ ঘুরিয়ে বলল, ‘ধৈর্য ধরো বউদি। কর্তামশাই আজ সকালেই বিদেশ চলে গেছেন। উনি ফিরুন। মনের কষ্টটা না হয় তাঁকেই বুঝাইও।’

এই সময় সুরজিত রাগে গরগর করতে-করতে বলল, ‘তুমি রান্নাঘরে যাও কাজলির মা। আর শোন দেবর্ষি, আমি গাঁজা খাব কি মদ খাব তোর কীরে? তুই তো শ্বশুরবাড়ি-পালানো বউ। তোর তো এই বাড়িতে গলা উঁচিয়ে কথা বলার অধিকার নেই।’

ঠিকঠাক শুনছে তো দেবর্ষি? সুরজিতই তো বলল কথাগুলো! তুই বলল তাকে? নিজেকে আর ঠিক রাখতে পারল না দেবর্ষি। চিৎকার করে বলল, ‘তুমি আস্ত একটা মাদকাসক্ত। গেঁজেল।’

‘শোন বেটি – আমি গাঁজা খাব, হেরোইন খাব। ইয়াবা খাব। তাতে তোর কীরে বেটি! নিজে সেধে আসছস এই দত্তবাড়িতে, বান্দির মতো থাকবি।’

‘সেধে এসেছি? এই বাড়িতে?’ নিজেকে আর ধরে রাখতে পারল না দেবর্ষি। বলল, ‘তোমার বাপ মাথায় তুলে এনেছেন আমাকে। আর আমি বান্দি নই। অল্প কদিনের মধ্যে এমএ পাশের সার্টিফিকেটটা আমার হাতে এসে পৌঁছাবে। আর নিজের দিকে তাকিয়ে দেখো, তুমি ইন্টারমিডিয়েট পাশ ছাড়া আর কিছুই নও। অফিস-আদালতের সুইপার-পিয়নরাও আইএ পাস হয়।’

হঠাৎ সুরজিত দেবর্ষির দিকে তেড়ে এলো। দেবর্ষির ডান কান বরাবর জোরসে একটা থাপ্পড় কষাল সে।  মেঝেতে ঘুরে পড়ে গেল দেবর্ষি। পায়ের স্যান্ডেল তখন মিত্রা দেবীর হাতে। দেবর্ষির মুখের কাছে স্যান্ডেলটি বাগিয়ে বললেন, ‘হাভাইত্যার মাইয়া রঙঢঙ করে আমার আলাভোলা ছেলেটাকে বাগিয়েছিলি। ভাগ্য ভালো সুরজিত দেরিতে হলেও তার ভুলটা বুঝতে পেরেছে। আর হ্যাঁ, আর একটা শব্দ করেছিস তো স্যান্ডেল দিয়ে পিটিয়ে তোর থোতা-মুখ ভোঁতা করে দেব হারামজাদি।’

দেবর্ষির কান দিয়ে তখন দরদর করে রক্ত গড়াচ্ছে। কানের পর্দা ফেটে গিয়েছে দেবর্ষির। গ- বেয়ে রক্ত কাঁধে পড়ছে।

শাড়ি-বস্নাউজ ভিজে ফ্লোরে পড়ছে রক্ত। কাজলির মা হা-হা করে দেবর্ষির দিকে এগিয়ে এলো। নিজের ময়লা শাড়ির আঁচল দিয়ে দেবর্ষির ডান কানটা চেপে ধরে আসেত্ম-আসেত্ম বেডরুমের দিকে নিয়ে গেল কাজলির মা।

এর পর একটি কথাও বলেনি দেবর্ষি। অনেকক্ষণ পর রক্ত পড়া ধরে এলে এক কাপড়ে বেরিয়ে পড়েছিল দত্তবাড়ি থেকে।

সেই থেকে বাপের বাড়িতে দেবর্ষি। টুনটুনি হয়েছে। দেবর্ষি বিসিএস দিয়েছে। সিলেকশন পেয়ে এই কলেজে পোস্টিং পেয়েছে সে। তার পর জীবনটাকে আপন শক্তিতে টেনে-টেনে এই পর্যন্ত এসে পৌঁছেছে। মা-বাবা সহযোগিতা না করলে সে কোথায় হারিয়ে যেত কে জানে।

 

নয়

সেই মিত্রা দেবীর মৃত্যু-সংবাদ বলল আজ কে একজন। নিজের ভেতর দিকে দৃষ্টি ফেলল দেবর্ষি। সেখানে সে দয়ামায়াহীন, পক্ষপাতী একজন রমণী ছাড়া আর কাউকে খুঁজে পেল না সে। কিন্তু সংস্কার বলে একটা কথা আছে। ওই যে টুনটুনি, তার শিরায় তো দত্তবাড়ির রক্ত। সে তো নিজের মধ্যে ওই দত্তগিন্নির ধারা বয়ে বেড়াচ্ছে। তার তো অধিকার আছে তার ঠাকুরমার মৃত মুখটা শেষবারের মতো দেখার।

কী করবে এখন দেবর্ষি? শাশুড়ির মৃত মুখ দেখতে যাবে, না একদলা ঘৃণার থুতু মাটিতে ছিটাবে?

ভেবে কূল পায় না দেবর্ষি।

শেয়ার করুন

Leave a Reply