খেলাধুলা

ওয়াসি আহমেদ

দোতলার টু/ বি-র শামত্মা, চারতলার ফোর/ এ-র কণা ও ফোর/ ডি-র টক্কা ওরফে শিবলি আর ছয়তলার সিক্স/ সি-র মৌ এই সকাল সাড়ে দশটায় শূন্য ফ্ল্যাটটাকে ভরিয়ে রেখেছে। আজ কার পালা কে জানে! মনে হচ্ছে মৌর। ওকে দেখা যাচ্ছে না। শামত্মা ড্রইংরুম ও গেস্টরুমে চক্কর দিয়ে পা টিপে কিচেনে ঢুকছে। কণা পুবদিকের বড় ব্যালকনিতে ছিল এতক্ষণ, এবার ড্রইংরুমে সোফার পেছনের ভারী পর্দাগুলো ঠেলেঠুলে সরিয়ে ফের ব্যালকনির দিকেই ছুটছে, ওখানে ওয়াশিং মেশিনের পাশে কয়েকটা বড় টবে ঝোপানো লতাপাতায় জঙ্গুলে পরিবেশ। সবার ছোট শিবলি – ছয়-সাড়ে ছয় বছর হয় কিনা – একা একা খোঁজাখুঁজিতে যাবে, না অন্যদের পিছু নেবে – এ-দোটানায় আটকে গিয়েই যেন ডাইনিং স্পেসে ঠায় দাঁড়িয়ে।

ছোটাছুটির বিরাম নেই, আবার হঠাৎ করেই একেক সময় সবকিছু নীরব-নিঝুম, যেন ওরা কেউ কোথাও নেই, ছিলও না। একসময় চাপা গলার ফিসফাস সাপের মতো এঘর থেকে ওঘরে যায়, পাক খেয়ে প্যাসেজে, টেবিল-চেয়ারের তলায় হিসহিসিয়ে চরে ফেরে। আবার দুম করেই সব তছনছ করে কচি চেরা গলার হাঁকডাক।

সপ্তাহিক ছুটির দুটো দিন কয়েক ঘণ্টার জন্য শূন্য ফ্ল্যাটটা বাচ্চাদের আনাগোনায় এভাবে জমে উঠতে পারে মোর্শেদ কী করে ভাববে! একটা বড়সড় ফ্ল্যাটে একা একা টানা মাসখানেক থাকতে হবে ভেবে মন খারাপ হলেও বন্ধু মুনীর আর তার বউ দিতির মুখ চেয়ে নিমরাজি থেকে শেষমেশ রাজি হয়ে এই ভেবে সান্তবনা খুঁজেছিল ছুটির দিন ছাড়া সপ্তার অন্য দিনগুলো তো বাইরে বাইরেই কেটে যাবে। সমস্যা ছুটির দিন দুটো। কী আর করা! বই-টই পড়ে, ঘুমিয়ে, টিভি দেখে টেনেটুনে পার করে দেবে – এরকমই সে ভেবেছিল।

মুনীর ও দিতি যাবে জিম্বাবুয়ে, ওখানে মুনীরের বড়ভাইয়ের ব্যবসাপাতি – স্ত্রী-ছেলেমেয়ে নিয়ে কুড়ি-বাইশ বছরের মোটামুটি পাকাপোক্ত শেকড়, সেখানে সপ্তা-দুই থেকে সাউথ আফ্রিকায় দিতির স্বপ্নের সাফারি ট্যুর সেরে ফেরার পথে সিঙ্গাপুরে কম করে হলেও চার-পাঁচ দিন না থেকে কি পোষাবে! সব মিলিয়ে মাসখানেকের ব্যাপার। এদিকে তাদের অনুপস্থিতিতে সদ্যকেনা উত্তরার চার নম্বর সেক্টরে সাড়ে বাইশশো এসএফটির ফ্ল্যাটটা তালাবন্ধ পড়ে থাকবে, এতে দুজনেরই ঘোর আপত্তি। পাহারাদার হিসেবে প্রথমেই তাদের মাথায় এসেছে মোর্শেদের কথা। একে তো সে ব্যাচেলর, তার ওপর থাকে এক পরিবারের সঙ্গে পেইংগেস্ট হয়ে, বাড্ডা না কোথায়। মোর্শেদ যুক্তি দেখিয়েছে তাকে দিয়ে আর যা হোক, বাড়ি পাহারার কাজ হবে না। সকাল সকাল বেরিয়ে সন্ধ্যা পর্যন্ত তো অফিসেই পার করবে, রাতে বাইরে থেকে খেয়েদেয়ে ফিরে কতক্ষণই-বা জেগে থাকবে! যুক্তি যথেষ্ট মজবুত হলেও টেকাতে পারেনি। মুনীরের তো বটেই, দিতিরও রীতিমতো গোঁ – থাকতে তাকে হবেই, এত সাধের ফ্ল্যাট খালি ফেলে তারা যাবে না। মুনীর অবশ্য তার থাকার পক্ষে অন্য একটা যুক্তিও দেখিয়েছে – থাকিস তো পেইংগেস্ট, নিশ্চয়ই ক্যাঁচমেচের মধ্যে কোনো সংগ্রামী মধ্যবিত্তের আড়াই কামরার বাসায়, সারারাত গরম আর ছারপোকার কামড়, সকালে বাথরুম খালি পাবি কিনা, এ দুশ্চিমত্মায় শেষরাত থেকেই ঘুম বরবাদ। তারচেয়ে বারোতলার ওপরে এরকম একটা কোজি ফ্ল্যাটে একা একা রাজত্ব করবি, এসি ছেড়ে মহা আরামে ঘুমাবি – আমার তো ভাবতেই নিজেকে বেশ আনসেলফিশ, এমনকি সাম্যবাদী সাম্যবাদীও মনে হচ্ছে।

মুনীর যত ঠাট্টাই করুক, এরকম একটা আনকোরা ঝকমকে ফ্ল্যাটে মোর্শেদের থাকার অভিজ্ঞতা নতুন বলেই রীতিমতো অস্বসিত্ম হয়েছে প্রথম কয়েক দিন। রাতে ঘুম ভেঙে চমকে ভেবেছে কার না কার বিছানায় জুন মাসের ভ্যাপসা গরমেও শীত শীত আরামে চাদর মুড়ে সে শুয়ে। তিন-চার দিনে মোটামুটি নিজেকে রপ্ত করার পর সাপ্তাহিক প্রথম ছুটির দিনটা এসে যেতে যখন ভাবছিল কী করে, তখনি দরজায় কলিংবেলের টিংটং।

খুলে দিতে চার-চারজনের বহর। বয়স আন্দাজ ছয়-সাড়ে ছয় থেকে দশ বছর। দরজার মুখে অকারণে উঁকি দিতেই যে তারা হাজির হয়নি বোঝা গেল এক এক করে সবাই ভেতরে ঢোকার পর। তারা জানাল, এ-ফ্ল্যাটে তারা খেলে, আঙ্কেল-অ্যান্টি থাকলে প্রতি শুক্রবার ও শনিবার সকালে। এখন আঙ্কেল-অ্যান্টি নেই, তাই বলে খেলা হবে না!

কী খেলা? জবাবে এ-ওর মুখে তাকাল। রহস্যটা ভাঙার চেষ্টা না করে মোর্শেদ যখন বলল – আচ্ছা বলতে হবে না, দেখি তোমরা কী খেলো, তারা তখন এক এক করে মুখ খুলল। আমি শামত্মা টু/ বি, আমি কণা ফোর/ এ, আমি টক্কা, না না শিবলি (ফ্ল্যাট নম্বর বলতে কণার দিকে তাকাল, কণা বলল ফোর/ ডি), আমি মৌ ফোর/ সি, ক্লাস ফাইভ। নিজেকে আলাদা করে চেনাতেই মৌর ক্লাস ফাইভ। অন্যরা তো ক্লাস টু, থ্রি আর টক্কা ওরফে শিবলি নার্সারি পার হয়ে সবে কেজি ওয়ানে। তবে পরে মোর্শেদ যা দেখেছে, বয়সে বড় আর উঁচু ক্লাসের হলেও নেতৃত্বটা মৌর হাতে নেই, ওটা কণার দখলে। কণার কথায়ই বাকিরা মাথা দোলায়। কণার ক্লাস থ্রি।

সেদিন অবশ্য খেলা তেমন জমেনি। একটা কারণ হতে পারে মোর্শেদের চাপা কৌতূহল, যা সে চেষ্টা করেও আড়াল করতে পারেনি। চারজন ড্রইংরুমের মেঝেতে গা-ঘেঁষাঘেঁষি গোল হয়ে মাথা ঝুঁকিয়ে বসে একটা কাগজে কিসের ছক কাটতে লেগে যেতে মোর্শেদ নিজেকে অনাহূত ভেবে সরে গিয়েছিল।

বেশ কিছু সময় যেতে বাচ্চাগুলোর সাড়াশব্দ না পেয়ে সে অবাক হয়ে ভাবল, তবে কি নিঃশব্দে কাগজে আঁকজোঁকই ওদের খেলা? উঠে গিয়ে আরো অবাক হলো ড্রইংরুম ফাঁকা, কেউ নেই। গেল কোথায়, তাও এত চুপিসারে, সে টেরও পেল না!

এঘরে-ওঘরে উঁকি দিয়ে যখন ফিসফিসানি কানে এলো, সে মনে মনে হাসল। বাচ্চারা তো বাচ্চাই, ওরা লুকোচুরি খেলছে। কেউ একজন লুকিয়েছে কোথাও, অন্যরা তাকে খুঁজছে, তবে প্রায় নিঃশব্দে। খুঁজে যখন পাবে, তখন নিশ্চয় হইচই জুড়বে। সেরকমই হওয়ার কথা। হলোও তাই, তবে পরিচিত, সনাতন ঢঙে না। লুকিয়েছিল শামত্মা, কিচেনের পাশে স্টোররুমে চালের ড্রামের পেছনে। শোরগোল করে তাকে টেনে বের করা হলো ঠিকই, কিন্তু এমন ঘটনায় যে আনন্দের ছটা তাদের চোখে-মুখে খেলার কথা, তার বদলে সব কটা বাচ্চার চেহারাই আশ্চর্য গম্ভীর। শামত্মার হাতদুটো পেছন থেকে পলকা সুতোয় বেঁধে তিনজন তাকে নিয়ে গেল যেখান থেকে খেলাটা তারা শুরু করেছিল সেই ড্রইংরুমের মেঝেতে। এবার আর আগের মতো গোল হয়ে না, তিনজন পাশাপাশি গা-ঘেঁষে বসলেও যাকে তারা পাকড়াও করে এনেছে সেই শামত্মা হাঁটু গেড়ে তাদের মুখোমুখি একা; এদিকে মাথাটা ঝুঁকিয়ে রাখায় তার ছোট শরীরটা কুঁজো হয়ে হাঁটুর ওপর পড়ো পড়ো।

আড়াল থেকে দেখে মোর্শেদ মনে মনে আবার হাসল। কী কা-! খেলাটা তাহলে সাধারণ লুকোচুরি নয়। ওরা নিজেরা মাথা খাটিয়ে লুকোচুরির সনাতন খেলাটাকে লম্বা করেছে, কতটা লম্বা কে জানে!

তো সেদিন যে-কারণেই হোক খেলার শেষটুকু বাকি রেখেই তারা চলে যাবে বলে এক জায়গায় জড়ো হতে মোর্শেদ বলেছিল, আর কবে আসবে, খেলতে? আমাকে সঙ্গে নেবে? শামত্মা, কণারা এ-কথায় কিছু বলেনি, যেন ভেবে দেখবে নেওয়া যায় কিনা।

বাচ্চাদের আচরণ খানিকটা অন্যরকম মনে হলেও মোর্শেদ তাদের কল্পনাশক্তির প্রশংসা না করে পারেনি। আর তা করেছে রানা নামের এক সহকর্মীর কাছে। রানা তার চেয়ে বয়সে খানিকটা ছোট, প্রেম করে অফিসেরই রিসেপশনের অপর্ণার সঙ্গে। শুনে রানা বলেছে, দেখতে যেতে হবে তো। মোর্শেদ মাথা নেড়ে জানিয়েছে, তা হবে না। এটা ওদের খেলা, নিজেরা মাথা খাটিয়ে বের করেছে আর খেলে যখন, মনে হয় না খেলা, খেলাটার প্রতি ওরা এতটাই নিবেদিত। রানা গলা খুলে হেসেছে। নিবেদিত, ভালো বলেছ।

 

দুই

দিনপনেরো যেতে মোর্শেদ যখন পুরোদস্ত্তর মুনীর-দিতির ফ্ল্যাটে গেড়ে বসেছে, আবার ভয়ে ভয়েও আছে কদিন বাদে বাড্ডায় তার পেইংগেস্টগিরিতে ফিরে গিয়ে না মনে হয় এক অচেনা বসিত্মতে এসে উঠেছে, তখন এক সকালে অফিসে যাবে বলে লিফট থেকে সবে বাইরে পা ফেলেছে, পার্কিংলটে বেশ হইচই। ঘটনা শুনে সে হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল। টু/ বি-র শামত্মাকে পাওয়া যাচ্ছে না। স্কুল-ইউনিফর্ম পরে, ব্যাগটেগ গুছিয়ে হঠাৎ কোথায় যে গেল, তার মা মেয়েকে নিজের ফ্ল্যাট তো বটেই, আশপাশে খোঁজ লাগিয়েও না পেয়ে ঘরে অজ্ঞান হয়ে পড়ে রয়েছেন। মোর্শেদ ভেবে পেল না এ-অবস্থায় তার কী করা উচিত। এই অ্যাপার্টমেন্ট বিল্ডিংয়ে সে অপরিচিত, এখানকার সে কেউ না, সিকিউরিটি গার্ডরাই তাকে যা চেনে, আর সে চেনে চারটা বাচ্চাকে। চারটার মধ্যে একটা নেই। নেই কথাটা ভাবতেই তার খটকা লাগল। কেন জানি মনে হলো ব্যাপারটা অসম্ভব। কথাটা কেন মাথায় এলো সে বলতে পারবে না, তবে একবার মাথায় টোকা দিয়ে যেতে সে ভাবল, কী করে হয়! ছোট হলেও চারটা বাচ্চাই বুদ্ধিমান, সেইসঙ্গে এও ঠিক তারা তাদের বয়সীদের চেয়ে বেশ অন্যরকম। এছাড়া এই সকালবেলা স্কুলে যাওয়ার সময় শামত্মা যাবেটা কোথায়! স্কুলে তো যায় মায়ের সঙ্গে। লিফটে করে নিচে নামতেও তাকে কেউ দেখেনি। মোর্শেদ কী করবে, দাঁড়িয়ে থেকে ঘটনাটাকে অসম্ভব, অবাস্তব যা-ই ভাবুক, কাজের কাজ কিছু হবে না। যাবে কি একবার টু/ বি-তে? কিন্তু নিজে সে অচেনা-অপরিচিত বলে যাওয়াটা কতটা সংগত চিমত্মা করে অনিচ্ছা সত্ত্বেও অফিসের পথে রওনা হলো।

অফিসে কাজকর্মে মন বসাতে পারল না। বারবার শামত্মার মুখটা চোখে ভেসে উঠতে অস্থিরতার মধ্যেও সে সেই পুরনো কথাই ভাবল… কী করে হয়!

আশ্চর্য ব্যাপার, অন্যান্য দিনের তুলনায় সেদিন কিছুটা আগে বাসায় ফিরে যা শুনল তাতে তার ধারণাই সত্যি হলো। শামত্মাকে পাওয়া গেছে। কেউ তাকে খুঁজে বের করেনি, সে নিজেই বেরিয়ে এসেছে – তার লুকানো জায়গা থেকে। কেন লুকিয়েছিল, এর জবাবে নাকি সে পরিষ্কার করে কিছু বলেনি। বড়রা তাকে জেরা করতে গিয়ে একটা বিষয়ই জানতে চেয়েছে… সে কি স্কুলে না যাওয়ার জন্য কা-টা করেছিল? কিন্তু স্কুলে যেতে তো বরাবরই তার প্রবল উৎসাহ। তাহলে? রাতে ব্যাপারটা নিয়ে মোর্শেদ ওলটপালট এটা-ওটা ভাবল। হতে কি পারে, নিজেকে কয়েক ঘণ্টা লুকিয়ে রেখে শামত্মা কারো ওপর প্রতিশোধ নিয়েছে? হতে পারে কোনো অজ্ঞাত কারণে তার মায়ের ওপরই। তাই যদি হয় তাহলে মাকে অজ্ঞান করে সে যেমন চেয়েছিল তেমন প্রতিশোধই কি নিয়েছে? এভাবে চিমত্মা করলে ব্যাপারটা যত সোজাসাপটা মনে হয়, এর চেয়েও সরল-সোজা ব্যাখ্যা হতে পারে… লুকোচুরি খেলাটা তাকে এমনভাবে পেয়ে বসেছে, দিন-রাত এ নিয়ে মেতে থেকে খেলার সময়জ্ঞান গুলিয়ে ফেলেছে।

মোর্শেদ এই কদিনে যতটা দেখেছে, খেলাটা শামত্মা, মৌ, কণা, শিবলিরা নিছক খেলা হিসেবে খেলে না। যদিও সে কোনোদিন খেলাটা শেষপর্যন্ত কোথায় গিয়ে গড়ায় জানতে পারেনি। তবে আন্দাজ করতে পারে, লুকিয়ে থাকা সঙ্গীকে বের করার পর তাকে যেভাবে কপট বা সত্যি সত্যি রাগী-গম্ভীর মুখ করে তারা বেঁধে নিয়ে চলে তাতে খেলাটা আরো অনেকদূর গড়ানোর কথা। ব্যাপারটা তার জানা হয়নি।

আজ কি জানতে চাইবে? সপ্তার আজ প্রথম ছুটির দিন। মোর্শেদ অপেক্ষায় রইল। বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হলো না, অন্যান্য দিনের মতো পরপর দুবার কলিংবেল শুনে উঠে গিয়ে দরজা খুলতে চারজন ভেতরে এলো। আগে থেকেই প্রস্ত্তত ছিল বলে মোর্শেদ ডাইনিংটেবিলে পটেটো ক্রিপস, কাজুবাদাম এমনকি একটা মাঝারি চিজকেকও সাজিয়ে রেখেছিল। বাচ্চাদের টেবিলে আহবান জানাতে প্রথমে কিছুটা থতমত খেলেও এ-ওর দিকে চেয়ে টেবিলের দিকে এগোল। টক্কা ওরফে শিবলিকে কেক কাটতে ছুরি বাড়িয়ে দিতে সে সাগ্রহে কেকে ছুরি বসাল। মুখটাও হাসি হাসি করল। কিন্তু উপলক্ষহীন কেক কাটায় উৎসাহ জোগাতে মোর্শেদ বা অন্য তিনজনের কেউই হাততালি দিলো না। মোর্শেদের মনে হলো, শিবলি হয়তো তালি আশা করেছিল। মৌ, কণা, শামত্মারা কেক খেল। কণা সবচেয়ে বড় টুকরোটা শিবলিকে দিলো, আবার ভেঙে ছোট একটুকরো তার মুখেও পুরল। সে যে দলনেতা তার প্রমাণ দিতে পেস্নটে করে একটুকরো কেক মোর্শেদের দিকে এগিয়ে দিতে সে পেস্নটটা নিতে গিয়ে কাজের কথা পাড়ল – সেদিন তো বলোনি আমাকে তোমাদের খেলায় নেবে কিনা।

অবাক হলো কেকমুখে শিবলির জবাবে – নতুন কাউকে আমরা খেলায় নিই না।

তাই? কেন নাও না?

খেলাটা গোপন। কাউকে শেখাতে নেই। – জবাব এলো কণার মুখ থেকে।

গোপন তা তো বুঝি। খেলার নিয়মটা তাই এতদিনে জানতে পারলাম না। বলতে নেই, না?

কণা মাথা দোলাল।

আপনি ভয় পাবেন। – বলল মৌ।

ভয় পাবো? তোমরা পাও না?

চট করে কেউ কথা বলল না। তবে দলনেতার মনে হয়তো খানিকটা দয়ার সঞ্চার হলো, হতে পারে চিজকেকের সৌজন্যে। সে বলল, কাউকে বলবেন না তো?

মোর্শেদ দ্রম্নত মাথা নেড়ে জানাল, কাউকে না। মৃদু আশার আলো আঁচ করে সে জানতে চাইল – তোমরা প্রথমে কাগজে দাগ কেটে কী করো?

কাটাকুটি খেলি। বারো ঘরের কাটাকুটি। যে হেরে যায় সে গুম হয়।

লুকিয়ে থাকাকে তোমরা গুম বলো?

এবারো কোনো জবাব নেই। চারজনের মুখই যেন ছিপি-আঁটা। কিছুক্ষণ পর জবাব এলো, তাও শিবলির মুখ থেকে – আমরা গুম হই, আর গুমও করি।

মোর্শেদ কী বলবে ভেবে পেল না। তার মোটেও মনে হচ্ছে না এটুকু বাচ্চাদের সঙ্গে তাদেরই একটা অভিনব খেলার নিয়মকানুন নিয়ে সে কথা বলছে। এও মন হচ্ছে না, সে তাদের চেয়ে অনেক বড়, যে-কারণে পূর্ণ মনোযোগেই তাদের সঙ্গে কথা বলছে আর তাদের প্রতিটা কথা শুনে মানে বোঝার চেষ্টা করছে। তার এমনও মনে হলো, এরা কি সত্যিই বাচ্চা! একবার ভাবল শামত্মাকে জিজ্ঞেস করে, সে কেন সেদিন সকালে লুকিয়েছিল, তখন তো খেলার সময় ছিল না, খেলার সঙ্গীরাও তার সঙ্গে ছিল না। আর লুকিয়েই-বা ছিল কেন… ভয় দেখাতে? কৌতূহলটা দমাতে হলো, কারণ তার মনে হলো এমন ছেলেমানুষি কৌতূহলকে এরা প্রশ্রয় দেবে না। তারচেয়ে যদি নিজেদের খেলা নিয়ে তারা আরো কিছু বলে। আমরা গুম হই, গুমও করি – বলেছে দলের সবচেয়ে ছোটজন।

কয়েক মিনিট চুপচাপ। কী বলবে ভাবতে গিয়ে মোর্শেদ পটেটো ক্রিপসের প্যাকেট ছিঁড়ে এক এক করে চারজনের সামনে ধরতে তারা খুব যে আগ্রহী হলো বলা যাবে না, তবে শামত্মা বাদে বাকিরা আলগোছে একটা-দুটো তুলে নিল। কিছুক্ষণ পর দেখা গেল চারজনই কণার ইশারায় এক জায়গায় জড়ো হয়ে কী নিয়ে নিজেদের মধ্যে ফিসফাস জুড়ে দিয়েছে। কয়েকটা মুহূর্ত, তারা আলগা হয়ে মোর্শেদের মুখোমুখি দাঁড়াল। শামত্মা, যে এতক্ষণ একটা কথাও বলেনি, বলল – খেলায় নিতে পারি যদি আপনি গুম হতে রাজি হন। আপনাকে কিছু করতে হবে না, আমরা আপনাকে গুম করব।

ভাবাভাবিতে না গিয়ে মোর্শেদ দ্রম্নত মাথা নাড়ল, সে রাজি।

রীতিমতো উত্তেজনা হচ্ছে। এই চারজন তাকে গুম করবে। মোর্শেদ বলল – আমাকে কী করতে হবে?

জবাব দিলো কণা। কিছু না। এই চেয়ারে চুপ করে বসেন। আমরা আপনার চোখ বাঁধব, হাত-পা বাঁধব, মুখও বাঁধব। তারপর…

ঠোঁটের কোণে হাসি উঁকিঝুঁকি দিলেও মোর্শেদ হাসিটা গিলে ফেলল। কণার ইশারায় চারজন এদিকে-ওদিকে ছড়িয়ে পড়তে চেয়ারে বসতে বসতে মোর্শেদ ভাবল, শেষ পর্যন্ত সে বাচ্চাদের আস্থা অর্জন করতে পেরেছে, যদিও ভেবে পাচ্ছে না বেঁধে-ছেঁদে তারা তাকে নিয়ে কী করবে! গুম বলতে কি তারা চোখ-হাত-পা-মুখ বাঁধাই বোঝাচ্ছে! টেলিভিশনে কি এরকম কিছু দেখেছে – সিনেমায়-নাটকে?

সিনেমা-নাটক বা তাদের মনগড়া যা-ই হোক, প্রথমে যখন চোখের ওপর কালো কাপড়ের ঢাকনা পড়ল, মোর্শেদ অবাক হলো এমন ঘোর কালো কাপড় এরা কোথায় পেল? ফ্ল্যাটটা অবশ্য তাদের মুখস্থ, কোথায় কী সব জানা, তারপরও চোখ বাঁধার জন্য জুতসই এমন আলকাতরা-রং কাপড় চট করে কোথা থেকে নিয়ে এলো? ম্যাজিশিয়ানরা এমন কুচকুচে কাপড়ে চোখ বেঁধে ভয়-ধরানো সব খেলা দেখায়। সেসবে নিশ্চয় ফাঁকিজুঁকির কারবার থাকে। কণাদের এ-কাপড়ে যা নেই। চোখদুটো ঘের দিয়ে কাপড়টা মাথার পেছনে নিয়ে গিঁটটা যে দিচ্ছে, তার হাতে যথেষ্ট জোর। ভাবতে কষ্ট হলো বাচ্চাদের কারো হাত। মৌর কি? ও তো সবার বড়। গিঁটটা কষে আটকাতে যেই কাপড়ে হ্যাঁচকা টান পড়ল, মোর্শেদ চমকে উঠল – এতটা শক্তিধর হাত এদের কারো হয় কী করে!

চোখবাঁধা সারা, এবার হাত। হিসহিসে গলায় নির্দেশ এলো হাতদুটো যেন সে পেছনে নেয়। কার গলা? কণার না। ও-ই তো নেতা, এমন কড়া হুকুম আর কার গলা থেকে বেরোবে! তবে কি শামত্মার? না। মৌরও না। টক্কা ওরফে শিবলির তো হতেই পারে না। হাতদুটো পিছমোড়া করে কি সুতো দিয়ে বাঁধবে?

কব্জিতে পাকানো রশির কঠিন ঘর্ষণে মোর্শেদ অদ্ভুত কথা ভাবল – খেলাটা ওদের হয়ে অন্য কেউ খেলে দিচ্ছে না তো! হাতের পর পা। সেই একই রকম পাকানো শক্তপোক্ত রশি। গিঁট দিয়ে ঝোলানো পাদুটো ছেড়ে দিতে মোর্শেদ টের পেল রশির বাঁধন আঁটসাঁটই না, জোর খাটালে চামড়া কেটে হাড়-মাংসে গেঁথে বসবে। একই অবস্থা পিছমোড়া হাতদুটোর। এদিকে চোখের ওপর কালো কাপড়টা এত চেপে বসেছে, যন্ত্রণায় টনটন করছে চোখদুটো।

চারপাশ স্তব্ধ, নিঝুম। তাকে ঘিরে বাচ্চাদের ফিসফাস বা নড়াচড়ার সামান্যতম আওয়াজও নেই। এ কি সত্যিই খেলা? বাচ্চারাই খেলছে তাকে নিয়ে? মোর্শেদ হঠাৎ টের পেল শিরদাঁড়া কাঁপিয়ে একটা হিম শিউরানি লেজ আছড়ে নিচ থেকে ওপরে উঠছে। হঠাৎ মনে হলো ঘাড়-পিঠ অবশ অবশ। সে আঁতকে উঠল। এরা কারা? নিজেকে সে আর সময় দিলো না। চিৎকার করে উঠবে এই তোমরা কারা, তখনি গুটলি পাকানো কাপড়ের ঢেলা আধখোলা মুখে ঠেসে ঢুকিয়ে দেওয়া হলো। মোর্শেদের বুঝতে বাকি রইল না তাকে নিয়ে কণা, মৌ, শামত্মা, শিবলিরা খেলছে না। সে নিশ্চিত ওরা এখানে নেই, খেলছে অন্যরা। কিন্তু অন্যরা এ-ফ্ল্যাটে ঢুকল কী করে!

হাত-পা-গা মুচড়ে যতই সে এ-কথা ভাবল, তার মনে পড়ল, মৌ বলেছিল তাদের সঙ্গে খেলতে গেলে সে ভয় পাবে। তার মানে কী দাঁড়াল? যত অবিশ্বাস্যই মনে হোক, খেলাটা ওরাই তাকে নিয়ে খেলছে। খেলতে নেমেই কি বাচ্চাগুলো বদলে গেছে – গায়ের জোরে, নিষ্ঠুরতায়, ক্রূরতায় একেকটা দানব হয়ে উঠেছে?

কতক্ষণ কেটেছে মোর্শেদ বলতে পারবে না। হতে পারে, ঘাড়-পিঠের অবসন্ন ভাবটা একসময় তার গোটা শরীরে ছড়িয়ে পড়েছিল, যার ফলে জ্ঞান হারিয়ে ফেলাও বিচিত্র নয়। সে কি অজ্ঞান হয়ে পড়েছিল? কী করে বলবে! একসময় সে আবিষ্কার করল, সে যে-অবস্থায় ছিল তার পরিবর্তন ঘটেছে। ভাঁজ করা হাঁটুতে মাথা গুঁজে সে বসে আছে স্যাঁতসেঁতে ঠান্ডা মেঝেতে। নাকটা খোলা থাকায় হারপিক, সাবান, ওডোনিলের জট পাকানো গন্ধে আন্দাজ করতে অসুবিধা হলো না জায়গাটা বাথরুম। এখানে কণা, শামত্মারা তাকে নিয়ে এলো কী করে! কী করেই-বা সম্ভব ওদের পক্ষে!

গোটা ব্যাপারটা দুঃস্বপ্ন ছাড়া কী! কিন্তু বাস্তব তো এই – ঘুমিয়ে সে নেই, স্বপ্ন-দুঃস্বপ্নের প্রশ্নই ওঠে না। সম্পূর্ণ সজাগ – যদিও হাত-পা নাড়াতে পারছে না, চোখ-মুখ খুলতে পারছে না। অসহ্য ব্যথায় কনকন করছে, বিশেষ করে চোখদুটো। তবে মাথা কাজ করছে। নাকে বাথরুম-বাথরুম গন্ধটায় কোনো ভুল নেই। কিন্তু ওরা কোথায়? পরপরই সে চমকে উঠল। ওরা বলতে সে কণা, শামত্মা, মৌ, শিবলিদের বোঝাচ্ছে? ছয়-সাড়ে ছয় থেকে দশ বছরের চারটা বাচ্চাকে?

যতই ভাবতে চেষ্টা করছে অবস্থাটা আদৌ কতটা বাস্তব, খেই তো পাচ্ছেই না বরং এক ঘোর ঘোর আচ্ছন্নতা বুঝি ভূতের মতো তাকে জাপটে ধরে আছে। কতক্ষণ সে এ-অবস্থায় তাও ঠাহর করতে পারছে না। কেন জানি মনে হচ্ছে, এখান থেকে তাকে উদ্ধার করতে কেউ আসবে না। বেশি সময় লাগবে না, ভয়ে দম আটকে এমনিতেই মরে যাবে। মরতে কি শুরু করেছে? অনেক কিছুর মতো মরারও শুরু আছে?

ভাবতে ভাবতে কি ঘুমিয়ে পড়েছিল? কানের গোড়ায় হঠাৎ ফিসফিসানি। আশ্চর্য, এই তো ওরা। মানে কণা, শামত্মা, মৌ, শিবলি। এদিকে তার চোখ খোলা, মুখ খোলা, হাত-পা রশিমুক্ত, খোলা। আর বসে আছে সেই চেয়ারেই, যেখানে ছিল। সামনে টেবিলে ক্রিপসের ছেঁড়া প্যাকেট, খানিকটা কেক এখনো পড়ে আছে পেস্নটে।

প্রথমে মৌ মুখ খুলল – বলেছিলাম না ভয় পাবেন।

কণা কোত্থেকে মলম জাতীয় কী একটা এনে তার কব্জিতে ঘষতে লাগল। কষে বাঁধা রশির দাগ ফুটে উঠে দুই হাতের কব্জির আশপাশ নীলচে কালো। শামত্মা একই কায়দায় পায়ে মলম ঘষে উঠে দাঁড়াতে না দাঁড়াতে শিবলি ডিঙি মেরে তার চোখের চারপাশে নিজের তুলতুলে আঙুল বোলাতে লাগল। মৌ এক গস্নাস ঠান্ডা পানি মুখে ধরতে সে এক টানে শুখা, খরখরে জিভ-টাকরা ভাসিয়ে পানিটুকু খেল।

ঘড়ি দেখল মোর্শেদ। ঘণ্টাচারেক তো হবেই। এবার? চারজন তাকে ঘিরে দাঁড়িয়ে। মনে হলো ওরা এখন চলে যাবে, যাওয়ার আগে কি তাকে কিছু বলবে? যদি বলে, মোর্শেদ জানে কী বলবে। ভুল হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই, সে নিশ্চিত। আর জানে যখন, ওরাই-বা কেন তা বলতে যাবে? জানা কথা বলার মতো অবুঝ তারা নয়। মোর্শেদ আগেই কথা দিয়েছিল কাউকে কিছু বলবে না, তখন অবশ্য কিছু না বুঝেই বলেছিল। এখন তো মুখ খোলার প্রশ্নই ওঠে না। কুলুপ এঁটে যত দিন… r

শেয়ার করুন

Leave a Reply