খেলা

আহমাদ মোস্তফা কামাল

কোত্থেকে উদয় হলেন তিনি, কেউ জানে না। হ্যাঁ, উদয় হলেনই বলতে হবে, কারণ দুদিন আগেও যার অসিত্মত্ব সম্পর্কে কারো কিছু জানা ছিল না, সেই তিনিই হঠাৎ আলোর ঝলকানির মতো আবির্ভূত হয়ে অদ্ভুত-অচিন্তনীয় সব কর্মকা–র মাধ্যমে শহরবাসীকে হতবুদ্ধি-বিমূঢ়-বিস্মিত করে তুললেন এবং অল্প কিছুদিনের মধ্যেই সবাইকে জানিয়ে দিতে সমর্থ হলেন যে, যা ইচ্ছা তাই করার ক্ষমতা আছে তার। দিনকে রাত করতে পারেন, রাতকে দিন; কালোকে সাদা করতে পারেন, সাদাকে কালো; মুহূর্তের মধ্যে কারো সাদাকালো জীবনকে রঙিন করে তুলতে পারেন, কারো রঙিন জীবনকে করে তুলতে পারেন বর্ণহীন – সাদাকালো বা শুধুই কালো। এতসব কারিশমা দেখিয়ে অচিরেই তিনি পরিণত হলেন শহরের সবচেয়ে আলোচিত ব্যক্তিত্বে। তার ক্ষমতার উৎস সম্পর্কে ধারণা করা মুশকিল, কারণ সবকিছুই রহস্যের চাদরে ঘেরা, সেই রহস্যের আড়াল থেকে কখনো বেরোন না তিনি, কাউকে কিছু বলেনও না। এতকিছু তিনি কীভাবে করছেন তা নিয়ে শহরজুড়ে জল্পনা-কল্পনা চলে, কিন্তু কোনো কূলকিনারা পাওয়া যায় না। তার হয়তো প্রচুর টাকা আছে, হয়তো কেন, নিশ্চয়ই আছে। টাকাই তো ঈশ্বর। টাকাওয়ালারাই তো প্রভু হয়ে উঠতে পারে; নইলে কোত্থেকে এলেন তিনি, আসার আগে কোথায় ছিলেন, সেখানে কী করতেন, এত ক্ষমতার প্রয়োগ কীভাবে ঘটাতেন – এসবের কোনোকিছুই মুখফুটে কেউ জিজ্ঞেস করল না কেন? জিজ্ঞেস তো করলই না, বরং শহরের মশহুর ব্যক্তিরা তার কাছে ভিড় জমালেন, তার অনুগ্রহ পাওয়ার জন্য বিনয়ে গলে গিয়ে এমনভাবে হাত কচলাতে লাগলেন যেন তিনি দয়া না করলে তাদের জীবনই ব্যর্থ হয়ে যাবে। অভিজাতদের এ-দশা দেখে
গরিব-দুঃখীরাও যে তার দয়ার কাঙালে পরিণত হবে, এ আর আশ্চর্য কী? ফলে মাস-কয়েকের মধ্যে প্রায় সবাইকে তিনি দাসানুদাসে পরিণত করে ফেলতে সমর্থ হলেন।

কিছুদিন একের-পর-এক চমক দেখিয়ে একসময় তিনি ঘোষণা করলেন – তার কার্যাদি সম্পাদন এবং সেগুলোর ফলাফল পর্যবেক্ষণের জন্য একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা হবে। কীসের প্রতিষ্ঠান, কেমন প্রতিষ্ঠান, প্রতিষ্ঠানটির সম্ভাব্য কাজের ধরন কী হবে – এসব সম্পর্কে কিছুই বলা হলো না, এমনকি কেউ কিছু জিজ্ঞেসও করল না। তবু এই ঘোষণায় শহরে সাড়া পড়ে গেল, লাখ লাখ দরখাস্ত পড়তে লাগল – সবাই তার সঙ্গে কাজ করে জীবন ধন্য করতে চায়, যদিও কোন ধরনের কাজ যে করতে হবে তা কেউই জানে না! এত লোক হয়তো তার দরকার নেই, এবং তিনি বিজ্ঞ ও বিচক্ষণ বলেই জানেন – লোকসংখ্যা যত বাড়বে, কাজের কোয়ালিটি তত কমবে, যদিও কোয়ান্টিটি বাড়ানোর জন্য অধিকসংখ্যক লোকের প্রয়োজন অনস্বীকার্য। তিনি হয়তো কোয়ালিটির ব্যাপারেই অধিক আগ্রহী, অন্তত এতদিন পর্যন্ত তার নিখুঁত কাজকর্ম দেখে সেরকমই মনে হয়। এসবই নিছক অনুমান, ঠিক কী ধরনের কাজ তিনি করতে চান বা করাতে চান সেটি না জেনেই কোয়ালিটি-কোয়ান্টিটির প্রশ্ন তোলা অবান্তর। তবে তার যে সত্যিই অত লোকের দরকার নেই, সেটি বোঝা গেল বাছাই প্রক্রিয়া দেখেই। দরখাস্তগুলো তিনি একাই খুঁটিয়ে দেখতে লাগলেন। একা এই বিপুল পরিশ্রমের কাজটি করা প্রায় অসম্ভব। কীভাবে সেটি তিনি সম্পাদন করলেন কে জানে, প্রায় যান্ত্রিক দক্ষতায় কয়েক লাখ থেকে কয়েক হাজারে নামিয়ে আনলেন আবেদনকারীর সংখ্যা। এই বাছাইয়ের প্রক্রিয়া সম্পর্কেও কেউ কিছু জানতে পারল না, অনেক মাথা ঘামিয়েও কেউ তা বুঝতে পারল না। দেখা গেল – এমন অনেকেই বাদ পড়েছেন যাদের বাদ পড়ার কথা নয়, আবার এমন অনেককেই নির্বাচিত তালিকার প্রথমদিকে রাখা হয়েছে যাদের কোনোভাবেই ওখানে থাকার কথা নয়। এরকম জগাখিচুড়ি তালিকার মানে বোঝা সাধারণের কর্ম নয়। তিনি অসাধারণ বলেই এবং রহস্যের আড়ালে নিজেকে সরিয়ে রাখতে চান বলেই ব্যাপারটা রহস্যময়ই রয়ে গেল। অবশ্য এই তালিকাটিও প্রাথমিক। সবাইকে জানানো হলো যে, সাক্ষাৎকারপর্বের পর এটি চূড়ান্ত করা হবে। আজকাল তার সঙ্গে দেখা করা প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। অভিজাতদের উৎপাতে আর স্বেচ্ছাসেবী নিরাপত্তাকর্মীদের যন্ত্রণায় কাছে ভেড়াই দুঃসাধ্য। সুতরাং যারা সাক্ষাৎকারের জন্য ডাক পেল, তারা তার সাক্ষাৎ লাভের উত্তেজনায় কাঁপতে লাগল। সাক্ষাৎকারপর্বটিও হলো দারুণ রহস্যময়। তিনি কারো সঙ্গে দীর্ঘ সময় নিয়ে কথা বললেন, কারো সঙ্গে প্রায় বললেনই না; কাউকে প্রশ্নবাণে জর্জরিত করলেন, কাউকে কথা বলার অবারিত সুযোগ দিয়ে নিজে রইলেন চুপ করে। তিনি একাই নির্বাচক, ফলে তার চিমত্মাপ্রক্রিয়া এবং নির্বাচন-পদ্ধতিও অজানাই রয়ে গেল এবং চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশিত হওয়ার পর দেখা গেল, তিনি এমন অনেককেই রেখেছেন যাদের সঙ্গে প্রায় কথাই বলেননি বা যাদের কোনো প্রশ্নই করেননি; আবার যাদের সঙ্গে দীর্ঘ সময় নিয়ে আলাপ করেছেন বা যাদের কথা দীর্ঘক্ষণ ধরে শুনেছেন তাদের অনেকেই বাদ পড়েছে! অবশ্য এভাবে বলাও কঠিন, কারণ তিনি যে কাকে রেখেছেন আর কাকে বাদ দিয়েছেন, কে কোন যোগ্যতায় নির্বাচিত হয়েছে আর কে কোন ব্যর্থতায় বাদ পড়েছে, এটা আসলে কোনো সূত্রের মধ্যেই পড়ে না। অনেকটা র‌্যান্ডম সিলেকশনের মতো ব্যাপার, যদিও তার তরফ থেকে এ-ধরনের নির্বাচন বেশ ঝুঁকিপূর্ণ ও অস্বাভাবিক।

আবদুর রব নামে যে-লোকটি প্রধান সহকারী হিসেবে নির্বাচিত হলো, তার সঙ্গে আমরা পরিচিত হতে পারি। অবশ্য এটি তার প্রকৃত নাম নয়, এই প্রতিষ্ঠানে যোগদানের পর সবার নামই বদলে গেছে, নতুন নামকরণ হয়েছে এবং সব নামই অতি সাধারণ – আবদুর রহিম, আবদুর রহমান, আবদুল লতিফ, আবদুল মালেক, আবদুল আজিজ, আবদুল ওয়াহাব, আবদুল বারি, আবদুল কাহহার – এই ধরনের। নাম পরিবর্তনের কী প্রয়োজন ছিল, আর করলেনই যদি তাহলে এই আধুনিক যুগেও তিনি এরকম প্রাচীনপন্থী নাম বেছে নিলেন কেন, তারও কোনো ব্যাখ্যা পাওয়া গেল না। সত্যি কথা বলতে কী, তার কাজকর্মের ব্যাখ্যা কেউ আর জানতেও চায় না, চাইলেও তিনি নীরব থাকেন, কিংবা উপেক্ষা করেন। তিনি যে প্রশ্ন পছন্দ করেন না, খেয়ালখুশিমতো চলেন, ইচ্ছা হলে নিজে থেকে কথা বলেন, নইলে জিজ্ঞাসিত হয়েও নিরুত্তর থাকেন – এই ব্যাপারগুলো সবার আগে বুঝতে পেরেছিল আবদুর রব। আজ পর্যন্ত সে কোনো প্রশ্ন উত্থাপন করেনি, কোনো কথা জানতে চায়নি, বরং গভীর অভিনিবেশ সহকারে তার কর্মকা- পর্যবেক্ষণ করেছে। দরিদ্র ঘরের সমত্মান আবদুর রব, বেশিদূর পড়াশোনাও করতে পারেনি, কিন্তু প্রখর বুদ্ধিমত্তা, মানুষের মন বোঝার অবিশ্বাস্য ক্ষমতা এবং সে-অনুযায়ী নিজের কর্মপদ্ধতি ঠিক করা, নিজের সম্পর্কে সততা ও সত্যবাদিতার মিথ তৈরি করার কৌশল, ইত্যাদি কারণে সে এই প্রতিষ্ঠানে আসার আগেই শহরবাসীর কাছে পরিচিত হয়ে উঠেছিল। সে জানত, যথার্থ সুযোগ পেলে নিজেকে শ্রেষ্ঠ মানুষের কাতারে দাঁড় করাতে তেমন বেগ পেতে হবে না। এখানে সে সেই সুযোগটি পেয়েছে। এমন একজনের সান্নিধ্যে তার কাজ করার সুযোগ ঘটেছে যিনি একই সঙ্গে ক্ষমতাবান ও রহস্যময়, দয়ালু ও কঠোর, আকর্ষণীয় ও ভীতিকর। ফলে তার প্রতি মানুষের এক মিশ্র অনুভূতি কাজ করে। শহরবাসী কখনো তাকে ভালোবাসে, কখনো ঘৃণা করে, কখনো ভয় পায়, কখনো বিমূঢ় হয়; তার সম্পর্কে অদম্য কৌতূহলটি ক্রমশ জোরালো হয়ে ওঠে এবং তাকে বোঝার জন্য জন্ম নেয় অজস্র গবেষক দল। আর তার প্রধান সহকারী হিসেবে আবদুর রবই হয়ে ওঠে সকল তথ্যের আধার। আবদুর রব নিজেও সবকিছু জানে না, জানার প্রশ্নই ওঠে না, কারণ তিনি নিজে থেকে যেটুকু জানতে দেন শুধু সেটুকুই জানার সুযোগ আছে। এ ছাড়া তার চিমত্মাপ্রক্রিয়া সম্পর্কে আন্দাজ করাও কারো পক্ষে সম্ভব নয়, তবু গবেষকরা কিংবা কৌতূহলী লোকেরা যখন আবদুর রবের কাছে তার সম্পর্কে জানতে চায় এবং সে অবলীলায় সব প্রশ্নের উত্তর দেয়। এমন দৃঢ়ভাবে দেয় যেন কিছুই তার অজানা নেই, কিছুই তার অগোচরে ঘটছে না। ফলে তাকে না পেয়ে আবদুর রবই হয়ে ওঠে তাকে জানার একমাত্র মাধ্যম এবং সে পরিণত হয় মুখপাত্রে। শুধু সাদামাটা মুখপাত্র নয়, ক্ষমতার দক্ষিণহস্তরা যেমন হয় তেমনি শ্রদ্ধা ও ভয়ের পাত্রও। আবদুর রবের একটি বিরল গুণ হলো এই যে, সে তার কাজকর্মগুলো নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করে এবং সেখান থেকে ইঙ্গিত ও ইশারাগুলো বুঝে নেওয়ার চেষ্টা করে। তারপর বিষয়গুলো সাধ্যমতো বিশেস্নষণ করে তার পছন্দ-অপছন্দ, তার সুখ ও আনন্দ, তার দুঃখ ও বেদনা, তার করুণা ও ক্রোধের কারণগুলো জনসমক্ষে ব্যাখ্যা করে। হয়তো এই নীরব চিমত্মাশীলতার কারণেই আবদুর রব তার প্রধান সহকারী হয়ে উঠতে পেরেছিল, নইলে শহরে
জ্ঞানী-গুণী-উচ্চশিক্ষিত-অভিজাত লোকজন তো আর কম ছিল না; এই পদে অধিষ্ঠিত হওয়ার জন্য তাদের চেষ্টারও কমতি ছিল না। আবদুর রবের এসব কর্মকা- তিনি কৌতূহলী দৃষ্টিতে পর্যবেক্ষণ করতেন – তার স্বভাবচরিত্র আদৌ সঠিকভাবে প্রচারিত হচ্ছে কি না তাও একমাত্র তিনিই জানতেন, ভুল হচ্ছে না শুদ্ধ হচ্ছে, এ নিয়েও তিনি কোনো মন্তব্যই করতেন না। কারণ তিনি দেখতে পাচ্ছিলেন – প্রতিদিন-প্রতিমুহূর্তে আবদুর রব একটু একটু করে তাকে নির্মাণ করছে; কাজটি তার ভালো লাগত, অন্যের কাছে নিজের বিনির্মাণ দেখতে কে না ভালোবাসে! তাছাড়া সৃজনশীলতা তিনি পছন্দ করেন, আবদুর রবের সৃজনশীলতার আনন্দটিই তার কাছে হয়তো মুখ্য হয়ে উঠেছিল। ফলে সে পেল আরো ক্ষমতা, এমনকি নিয়ম তৈরি করার ক্ষমতাও, যদিও এতদিন পর্যন্ত একচ্ছত্রভাবে তিনি তা নিজের হাতে ধরে রেখেছিলেন। তার নিজের সাম্রাজ্যে তিনি ছিলেন একচ্ছত্র অধিপতি, কিন্তু তার অধীনস্থ কেউ তার কর্তৃত্ব মেনেই যদি একটি বিকল্প সাম্রাজ্য তৈরি করতে চায় তাহলে সেটি কেমন হতে পারে তা দেখার আনন্দ থেকে সম্ভবত বঞ্চিত হতে চাইছিলেন না।

তার প্রায় সব কাজকর্মের দেখভাল করার প্রধান দায়িত্বটিও আবদুর রবই পেয়েছিল। যদিও কবে কোন কাজটি হবে, সেটি তাকে আগে জানানো হতো না। দু-একটি বিবরণ দিলে ব্যাপারটা হয়তো খানিকটা পরিষ্কার হয়ে উঠতে পারে। প্রথমেই তার দয়ালু-কোমল চরিত্রের পরিচয় পাওয়া যায় এমন একটি কাজের কথা বলা যাক। প্রতিষ্ঠানটি চালু করার পর তিনি কর্মীদের নির্দেশ দিলেন – সারা শহরে যত সমত্মানসম্ভবা নারী আছে তাদের নাম-ঠিকানা-বয়স-স্বাস্থ্য-আর্থিক অবস্থা ইত্যাদি সব তথ্য নিয়ে একটা ডাটাবেজ তৈরি করতে। কাজটি কঠিন। এত বড় শহর, বিপুল লোকসংখ্যা, ভোটার তালিকা তৈরির মতোই এটা এক বিশাল কর্মযজ্ঞ, ঘরে ঘরে না গিয়ে এই তালিকা তৈরি করা অসম্ভব, মাত্র কয়েক হাজার কর্মী এরকম দুরূহ কাজ সম্পাদন করবে কীভাবে? কিন্তু তার অভিধানে অসম্ভব বলে কোনো শব্দ নেই, তিনি যেহেতু ইচ্ছে প্রকাশ করেছেন সেটি হতেই হবে। হলোও তাই। কর্মীদের বাড়ি বাড়ি যেতে হলো না, খবরটি প্রচার হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সমত্মানসম্ভবা নারীদের স্বজনরা স্বেচ্ছাপ্রণোদিত হয়ে তথ্য দিয়ে যেতে শুরু করল। যদিও কেউ জানে না, এ-তালিকা দিয়ে তিনি কী করবেন; কিন্তু যেহেতু এরই মধ্যে তিনি শহরের সবচেয়ে প্রভাবশালী ব্যক্তিত্বে পরিণত হয়েছেন তাই সম্ভাব্য অনুগ্রহ লাভের আকাঙ্ক্ষা সকলেরই ছিল, তা সে অট্টালিকাবাসী হোক আর বসিত্মবাসীই হোক। এই সহজে প্রাপ্ত তালিকা দেখে তিনি অবশ্য সন্তুষ্ট হলেন না, কর্মীদের নির্দেশ দিলেন দ্বিতীয়বার খুঁজে দেখার জন্য, বিশেষ করে বসিত্মবাসী ও দরিদ্ররা এসব ঘোষণা না-ও শুনে থাকতে পারে এবং হয়তো তারা সবাই নাম জমা দেয়নি বলে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করলেন। তার ধারণাই সত্য বলে প্রমাণিত হলো এবং অবশেষে দীর্ঘ অনুসন্ধান ও পরিশ্রমলব্ধ তথ্য দিয়ে তৈরি হলো একটি পূর্ণাঙ্গ তালিকা। অতঃপর তিনি প্রত্যেকের ঠিকানায় অনাগত শিশুর জন্য তার বাবা-মাকে শুভেচ্ছা জানিয়ে চিঠি ও উপহার পাঠালেন এবং এও জানালেন যে, এখন থেকে শুরু করে সমত্মান ভূমিষ্ঠ হওয়া এবং প্রথম কয়েক বছর তার দেখাশোনার দায়িত্ব তার প্রতিষ্ঠান গ্রহণ করছে। শহরের সব হাসপাতালে নির্দেশ পৌঁছে গেল, ডাক্তার-নার্স-আয়াদের বিশেষ প্রশিক্ষণের জন্য অর্থ বরাদ্দ করা হলো এবং বলা হলো – একজন গর্ভবতী নারীও যেন চিকিৎসাসেবার আওতার বাইরে না থাকে, যেন যথার্থ যত্ন, সেবা ও নির্দেশনা পায়। শিশুরা জন্ম নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তিনি উৎসবের ব্যবস্থা করলেন, প্রায় সারাবছরই উৎসব লেগে রইল শহরজুড়ে, শিশুর জন্ম যে বিশেষ এক ঘটনা, হেলাফেলা করে একে দেখার সুযোগ নেই সেটি তিনি বুঝিয়ে দিতে সমর্থ হলেন। বলা বাহুল্য, এ এক চলমান প্রক্রিয়া। এমন তো নয় যে, ডাটাবেজে সংরক্ষিত নারীরাই কেবল সমত্মান জন্ম দেবে, বরং অনেক নারীই নতুন করে গর্ভবতী হয়, তরুণীদের বিয়ে হওয়ার পর তারাও একসময় সমত্মানসম্ভবা হয়ে ওঠে, ডাটাবেজে তাদের তথ্যসমূহও জড়ো হতে থাকে, সেবা পৌঁছে যায় তাদের দোরগোড়ায়। শিশুদের আগমন নিয়ে এত আনন্দ, এত উৎসব, মায়েদের এত সম্মান দেখে শহরবাসী হকচকিত হয়ে যায় – এ যে তারা কখনো কল্পনাও করেনি! আর সমত্মান জন্মদানের বিষয়টি দম্পতিদের কাছে বিশেষ একটি আনন্দদায়ক ঘটনা বলে চিহ্নিত হতে থাকে।

শিশুদের প্রতি তার এই অপার মমতা ও অযাচিত কর্তব্যবোধে মুগ্ধ হতে-না-হতেই শহরবাসী টের পেল – তিনি শুধু শিশুদের দিকেই নয়, নানা রকম মানুষের প্রতি প্রসারিত করেছেন তার সহায়তার হাত, তার কল্যাণস্পর্শ পেয়ে একজনের জীবন আলো ও আনন্দে ভরে উঠছে। শুধু কি মানুষ, তার প্রেম ও মমতায় মাত্র কয়েক বছরেই এই রুক্ষ শহরটিও হয়ে উঠেছে সবুজ ও মায়াময়। বাড়ির আঙিনায়, ছাদে বা ব্যালকনিতে, রাস্তার পাশে বা মাঝখানের আইল্যান্ডে রোপণ করা হয়েছে ফুল ও ফলের গাছ, কোথাও বা ছায়াবৃক্ষ, কোথাও ঔষধি গাছ। সেখানে কোত্থেকে যেন অজস্র পাখি এসে বাসা বেঁধেছে, সারাদিন তাদের কলকাকলিতে মুখর হয়ে থাকে শহর। তাছাড়াও আরো কত কাজ! সূর্য ওঠার আগেই যেন পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা শহরকে সম্পূর্ণ আবর্জনামুক্ত করে ফেলে, সেটি নিশ্চিত করেছেন তিনি; এই শহরের বাসিন্দারা বড্ডো অসচেতন, যেখানে-সেখানে ময়লা-আবর্জনা ফেলে, নোংরা করে রাখে, কারো কোনো মমতা নেই, ভালোবাসাও নেই; অথচ প্রতিদিন ভোর হওয়ার আগেই সেই বিপুল আবর্জনা দূর হয়ে যায়। রাস্তার ছোটখাটো মেরামতের জন্যও কেউ আর অনন্তকাল ধরে শহর-কর্তৃপক্ষের দিকে তাকিয়ে থাকে না, তার প্রতিষ্ঠানের সহায়তায় নিজেরাই ঠিক করে ফেলে। বিশুদ্ধ পানির সরবরাহ আর বর্জ্য নিষ্কাশনের ব্যবস্থাও সুচারুভাবে সম্পাদন করেছে তার প্রতিষ্ঠান। শহরে ছোটখাটো অপরাধের পরিমাণও কমে গেছে অনেক; চুরি-ডাকাতি-ছিনতাই ইত্যাদি প্রায় নেই বললেই চলে। যেন চিরচেনা এই শহরটির রুক্ষ-নির্দয়-অপরিকল্পিত রূপটিই পালটে গেছে।

তার জনকল্যাণমুখী কাজের বিবরণ দিয়ে শেষ করা যাবে না আর এসব কাজের মাধ্যমেই তিনি হয়ে উঠেছিলেন শহরের অঘোষিত সম্রাট। কিন্তু পর্দার আড়ালে ঘটতে লাগল সম্পূর্ণ বিপরীতধর্মী আরো কিছু ঘটনা, তারই ইচ্ছায়, কেউ তা বুঝেও উঠতে পারল না। সেই ঘটনাগুলো তার নিষ্ঠুরতা আর নির্মমতার স্বাক্ষর হয়ে থাকতে পারত; কিন্তু ভুক্তভোগীরা এমনকি কল্পনাও করতে পারল না যে, এসবই তার সাজানো ঘটনার পরম্পরা। তার প্রতি সবাই প্রশ্নহীন আনুগত্য প্রকাশ করেছিল, অকুণ্ঠ বিশ্বাস স্থাপন করেছিল। ফলে তিনি যে তাদের জন্য ক্ষতিকর কিছু করতে পারেন ভুলেও কারো মনে আসত না, নিজেদের ভোগান্তির জন্য তারা দায়ী করত নিজেদেরই দুর্ভাগ্যকে। কাজগুলো তিনি করতেন সুকৌশলে, উপকার করার ছলে, আর ভোগান্তির জন্য তিনি প্রথমত বেছে নিয়েছিলেন তার প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের, তারপর নিজের সাফল্যে চমৎকৃত হয়ে তা ছড়িয়ে দিয়েছিলেন শহরজুড়ে। উদাহরণ হিসেবে আবদুল বারির ঘটনাটিই বলা যাক। প্রতিষ্ঠানের সবচেয়ে সৎ, সাহসী, নিবেদিতপ্রাণ কর্মী সে। খুবই দায়িত্ববান যুবক এই আবদুল বারি – যেমন কর্মক্ষেত্রে, তেমনি নিজ পরিবারে। বৃহৎ পরিবার তার। অনেকগুলো ভাইবোন, সে সবার বড়, বাবা নেই, দুশ্চিমত্মা আর অনিশ্চয়তার কবলে পড়ে মা-ও বুড়িয়ে গেছেন এই বয়সেই। আবদুল বারি তাদের সবার দায়িত্ব একা কাঁধে তুলে নিয়েছে। শুধু নিজের মা-ভাই-বোন নয়, নানা সমস্যায় আক্রান্ত আত্মীয়-স্বজন এবং প্রতিবেশীদেরও সে যথাসম্ভব সহায়তা করে বিভিন্নভাবে। মা-অন্তপ্রাণ ছেলে সে, মাকে খুশি করার জন্য তার চেষ্টার শেষ নেই, আর এরকম এক অনুগত-বাধ্য-দায়িত্ববান সমত্মানের মা হিসেবে সেই নারীরও গর্বের শেষ নেই, হাজার সমস্যার মধ্যে থেকেও পরিবারটি তাই হাসি-আনন্দে মেতে থাকে আবদুল বারির একক প্রচেষ্টায়। তার প্রতিষ্ঠানে যোগ দেওয়ার পর এই হাসিখুশি-বিনয়ী-পরোপকারী-কর্মচঞ্চল যুবকটি সবার প্রিয় হয়ে উঠেছিল অচিরেই। সহকর্মীদের ধারণা ছিল, তিনিও বোধহয় আবদুল বারিকেই সবচেয়ে বেশি পছন্দ করেন। এর হয়তো কারণও ছিল। প্রতিষ্ঠানে কয়েক মাস পরপর আনন্দ-অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। কর্মীরা নিমন্ত্রণ পায় তাদের পরিবার-পরিজনসহ, খাওয়া-দাওয়া তো চলেই, সেইসঙ্গে চলে কর্মীদের নানাবিধ প্রতিভা প্রদর্শনের সুযোগ। কেউ গান গায়, কেউ নাচে, কেউ পড়ে শোনায় নিজের লেখা কবিতা, কেউ শোনায় গল্প, কেউ ছবি আঁকে, কেউ অভিনয় করে দেখায়। পারফরম্যান্স যথেষ্ট ভালো হলে তাকে পুরস্কৃতও করা হয়। একটা প্রতিষ্ঠানে আর কতই বা প্রতিভাবান লোক থাকে, সংখ্যায় তারা সবসময়ই অল্প, মানে সংখ্যালঘু, ওই একটি দিনে তারা বিশেষ হয়ে ওঠে, কিন্তু ঘুরেফিরে তারাই সবগুলো অনুষ্ঠানে অংশ নেয়। একবার তার ইচ্ছে হলো – নতুন কেউ কেউ অংশগ্রহণ করুক এবং অজানা কারণে আবদুল বারিকে বলা হলো বিশেষ কোনো প্রতিভা প্রদর্শনের জন্য। আবদুল বারি সলজ্জ হেসে জানাল – তার তেমন কোনো গুণই নেই। ছোটবেলা থেকে সংগীতের দিকে ঝোঁক ছিল, তবে সুযোগের অভাবে তেমন শিখে উঠতে পারেনি। বেহালা তার প্রিয় বাদ্যযন্ত্র, বেশ কিছুদিন চেষ্টা করেছে বাজাতে, কিন্তু একসময় মনে হয়েছে – সুর তাকে ধরা দিচ্ছে না। তিনি এত কথা পছন্দ করেন না, তবু মন দিয়ে শুনলেন, বললেন – পরের অনুষ্ঠানে তুমি বেহালা বাজাবে। তার নির্দেশ অমান্য করার উপায় নেই। ধুলোপড়া বেহালাটি ঝেড়েমুছে কয়েকদিন একটু রেওয়াজ করল সে, তারপর অনুষ্ঠানের দিন সত্যিই মঞ্চে উঠল। দীর্ঘক্ষণ বাজাল আবদুল বারি। সে যে এত সুন্দর বাজায়, কারো ধারণাই ছিল না। স্তব্ধ হয়ে বসে রইল কয়েক হাজার কর্মী আর তাদের পরিবারের সদস্যরা। এমনকি তার সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ সহচর আবদুর রব অবাক বিস্ময়ে দেখল, তিনি গোপনে-আলগোছে নিজের চোখ মুছে নিচ্ছেন। বাজনা শেষ হলে কোনো কথা না বলে উঠে চলে গেলেন তিনি। এরপর আর কিছু ভালো লাগবে না বুঝেই হয়তো অন্যরাও আর কিছু করতে রাজি হলো না, অনুষ্ঠান শেষ হয়ে গেল। এমনকি অনুষ্ঠান শেষে নৈশকালীন ভোজেও সবাই যেন এক অজানা বিষণ্ণতায় নীরব হয়ে রইল। একটুও কোলাহল হলো না অন্যান্য দিনের মতো, কোথাও শোনা গেল না একটুকরো হাসির শব্দ। তিনি তার মুগ্ধতার কথা জানতে দিলেন না, আবদুর রবও বলল না কিছু কাউকে, তবে সে নিজের চোখে যা দেখেছে তাতে তার বুঝতে বাকি নেই যে, যে শিল্পী তার মতো এরকম নির্বিকার-নির্লিপ্ত-নিরাসক্ত মানুষের চোখ এমনভাবে অশ্রম্নসজল করে তুলতে পারে, সে কত বড় শিল্পী! এরপর থেকে আবদুল বারির কাজের পরিধি বাড়িয়ে দেওয়া হলো। একটি বিশেষ প্রকল্পের প্রধান হিসেবে নিযুক্ত করা হলো তাকে। প্রকল্পের জন্য অর্থ বরাদ্দও বাড়ানো হলো অনেক। কিন্তু বিস্ময়কর ব্যাপার হলো – তার সহযোগী হিসেবে নিয়োগ পেল এমন কিছু কর্মী যারা প্রতিষ্ঠানের সবচেয়ে অসৎ, দুর্নীতিপরায়ণ, ধান্ধাবাজ ও কূটিল ষড়যন্ত্রকারী হিসেবে পরিচিত। একাধিকবার তাদের কুকীর্তি ধরা পড়ার পরও কেন তিনি তাদের রেখে দিয়েছেন সে-রহস্য এখনো কেউ উদ্ঘাটন করতে পারেনি, তার ওপর এই স্পর্শকাতর জায়গায় তাদের পদায়ন! বিস্ময়করই বটে! এদের সামলাতে গিয়ে হিমশিম খেতে লাগল আবদুল বারি, তার সহজ-সুন্দর-শান্তিময় জীবন প্রায় অতিষ্ঠ হয়ে উঠল নতুন দায়িত্বের চাপে। সেখানেই থামলেন না তিনি, নিজে উদ্যোগী হয়ে আবদুল বারির বিয়ের ব্যবস্থাও করলেন। পাত্রীও পছন্দ করলেন তিনি নিজেই। এই প্রতিষ্ঠানের সবচেয়ে সুন্দরী; কিন্তু ভয়াবহ বদমেজাজি, রগচটা, হিংসুটে আর পরশ্রীকাতর এক মেয়ে সে। এই দুজনের স্বভাবে দূরতম মিলও নেই, তবু কেন তাদের জোড় বেঁধে দিলেন তিনি, তাৎক্ষণিকভাবে তা বোঝা গেল না, তবে বছরখানেকের মাথায় ফলাফল দেখা গেল। আবদুল বারির পারিবারিক বন্ধন ভেঙে তছনছ হয়ে গেল। তার মাকে পাঠানো হলো বৃদ্ধাশ্রমে; ছোট ভাইবোনগুলোও টিকতে না পেরে কে কোথায় ছিটকে পড়ল, ঠিক-ঠিকানা রইল না। বন্ধুদের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করতে হলো আবদুল বারিকে, আত্মীয়স্বজন হয়ে গেল বহু দূরের মানুষ। মেয়েটা দেখতে সুন্দর, কিন্তু মনটা ক্লেদাক্ত, কাউকেই সে সহ্য করতে পারে না, তার মেজাজও সবসময় উঁচুতে বাঁধা থাকে। শান্ত-সৌম্য আবদুল বারিকে সবসময়ই তটস্থ থাকতে হয়, এই বুঝি আগুন জ্বলে উঠল! সে যখন পারিবারিক এই দুর্যোগ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছিল, তখন তার অধীনস্থ প্রকল্পে আর্থিক অনিয়ম ধরা পড়ল এবং তাকে তহবিল তসরুফের অপরাধে দোষীসাব্যস্ত করা হলো। ঘরে-বাইরে চূড়ান্তভাবে অপদস্থ হতে লাগল সে। এতসব ঘটনা যে ঘটছিল, আবদুল বারি সেসবের  জন্য কখনো তাকে দায়ী করেনি। সে জানতই না – সবই ঘটছে তার জ্ঞাতসারে, তার ইচ্ছায়, এমনকি তার পরিকল্পনামাফিক! প্রতিষ্ঠানে অনেক বিভাগের মতো একটি গোপন বিভাগ ছিল এসব ভোগান্তি তৈরি করা এবং সেগুলোকে চূড়ান্ত মাত্রায় নিয়ে যাওয়ার জন্য। আবদুল কাহহার নামে একজন নিষ্ঠুর প্রকৃতির লোককে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল এই বিভাগের। গোপনীয় বিভাগ বলেই কাজগুলো সে কীভাবে করত, কেউ জানত না। তবে শলাপরামর্শ যে তার সঙ্গেই হতো, তার অনুমোদন ছাড়া নির্বিঘ্নে মানুষের সর্বনাশ করার সাহস সে নিশ্চয়ই পেত না, এটা সন্দেহাতীতভাবে সত্য। শুধু আবদুল বারিই নয়, প্রতিষ্ঠানের আরো বহু কর্মী এবং শহরের আরো অগণিত লোক এই কার্যক্রমের আওতায় এসেছিল; তাদের জীবনেও নেমে এসেছিল চরম দুর্যোগ।

আবদুর রব এসব নেতিবাচক কাজের কোনো মানে খুঁজে পেত না, তার কল্যাণকামী-দরদি চরিত্র আর ধ্বংসকামী-নির্মম চরিত্রের মধ্যে কোনো মিলও খুঁজে পেত না। মানুষের মন বোঝার যে অবিশ্বাস্য ক্ষমতা আবদুর রবের ছিল, এই একটি জায়গায় এসে যেন তা হারিয়ে গেছে। তার মনে বহু প্রশ্নের জন্ম হচ্ছিল, তার বিপরীতমুখী কাজকর্ম বোঝার চেষ্টায় গলদঘর্ম হচ্ছিল; কিন্তু তিনি প্রশ্ন পছন্দ করেন না বলে জিজ্ঞেস করতে সাহস পাচ্ছিল না। এমনকি তার প্রচারক হিসেবে এতদিন সে যেরকম দৃঢ়তার সঙ্গে বিবরণ দিয়ে আসছিল, এখন তাও প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। কোমল-মায়াময়-দয়ালু হিসেবে তার ভাবমূর্তি তৈরি করার জন্য যে-গল্পগুলো সে এতদিন ধরে বলে আসছিল, তার বাইরেও যে তার অত্যন্ত কঠোর-নির্মম-নির্দয় একটি রূপ আছে, সেটি কীভাবে মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্যরূপে উপস্থাপন করবে বুঝে উঠতে পারছিল না। এই বিপরীতধর্মী কাজকর্মের কোনো ব্যাখ্যা পেলে সে হয়তো কিছু একটা বলতে পারত। গল্প বানানোর ব্যাপারে নিজের সামর্থ্যের ওপর যথেষ্ট আস্থা আছে তার; কিন্তু জানার কোনো উপায়ই তো নেই! বহুদিন অপেক্ষার পর অবশ্য সেই সুযোগ একদিন ঘটে গেল আবদুল বারিকে কেন্দ্র করেই।

আবদুল বারির জীবনের যাবতীয় দুর্যোগ ক্রমশ বেড়ে চললেও প্রতিটি অনুষ্ঠানের আগে তাকে বাজাতে বলতেন তিনি। কোমল-মায়াময়-হাস্যোজ্জ্বল যুবকটি এখন পরিণত হয়েছে ক্লান্ত-বিষণ্ণ এক অকালবৃদ্ধতে, তবু তার অনুরোধ সে উপেক্ষা করত না। এবং কী আশ্চর্য, এত দুর্যোগ সত্ত্বেও ক্রমশ তার বাজনার সুর হয়ে উঠতে লাগল আরো হৃদয়গ্রাহী, আরো বেদনার্ত, আরো রোদনভরা! যখন সে বাজায়, মনে হয় বেহালাটি যেন কথা বলছে তার সঙ্গে অথবা সে বলছে বেহালার সঙ্গে, আর তার সেই অকথিত-অপ্রকাশ্য বেদনাগুলো কান্না হয়ে ঝরছে সুরের ভেতর দিয়ে। সুরের আবেশে স্তব্ধ হয়ে যেত শ্রোতাসকল, চোখ শুকনো রাখা কঠিন হয়ে পড়ত এমনকি আবদুল কাহহারের মতো নির্মম লোকদের পক্ষেও। ঠিক এরকম একটি সময়ে তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন, আগামী অনুষ্ঠানে শহরবাসীকে নিমন্ত্রণ জানানো হবে এবং সেখানে আবদুল বারির বেহালা-বাদন ছাড়া আর কিছু থাকবে না। এতদিন পর্যন্ত ব্যাপারটা ছিল অভ্যন্তরীণ, সহকর্মী আর তাদের স্বজনরাই ছিল তার শ্রোতা, এখন এই অজস্র অচেনা শ্রোতার সামনে বাজাবে কী করে, ভেবে চিমত্মায় পড়ে গেল আবদুল বারি। যদিও এই প্রতিষ্ঠানের কর্মী ও তাদের স্বজন জড়ো হলে শ্রোতার সংখ্যা হাজার ছাড়িয়ে যেত; কিন্তু এবার যে অন্তত কয়েক লাখ মানুষ জড়ো হবে! তাদের স্থান সংকুলানই বা হবে কীভাবে? সেই ভাবনাটা অবশ্য তার নয়, বিশাল মিলনায়তনে এমনিতেই কয়েক হাজার লোক বসতে পারে, আর প্রতিষ্ঠানের সামনে যে বিশাল উদ্যান, সেটার ওপরে রাতারাতি আচ্ছাদন দিয়ে বসার ব্যবস্থা হলো অগণিত অতিথির। বিভিন্ন জায়গায় বসানো হলো বিশালায়তনের প্রজেক্টর, শক্তিশালী-নিখুঁত সাউন্ড সিস্টেম দিয়ে কাভার করা হলো পুরো জায়গাটিকে যেন দেখতে বা শুনতে কারো অসুবিধা না হয়। নির্ধারিত দিনে বিপুলসংখ্যক মানুষ এলো মজা দেখতে! হ্যাঁ, মজাই তো! নাচ নয়, গান নয়, নাটক-সিনেমা নয়, বেহালার মতো একটা স্বল্প-প্রচলিত বাদ্যযন্ত্রের বাজনা শোনানোর জন্য তিনি নিমন্ত্রণ করেছেন শহরের সব শ্রেণি-পেশার মানুষকে, সেটি বাজাবে আবার এমন এক বাজনদার যার নামই কোনোদিন কেউ শোনেনি! এর কোনো মানে হয়! ঠোঁটে বিদ্রম্নপের হাসি ঝুলিয়ে এলো কুটিল লোকজন, সরল মানুষ এলো কৌতূহলভরা চোখ নিয়ে। এত ধরনের লোক, বোধগম্য কারণেই কোলাহল হতে লাগল বেশ, মনে হলো – এই পরিবেশে অনুষ্ঠান করা আদৌ সম্ভব হবে না। তবে, হঠাৎই ভেসে এলো তার ভরাট-গম্ভীর-গমগমে কণ্ঠস্বর – ‘সবার কাছে নীরবতা প্রত্যাশা করছি, এখনই শুরু হতে যাচ্ছে শিল্পী আবদুল বারির বেহালা-বাদন।’ ছোট্ট একটি বাক্য, কোনো সম্বোধন নেই, কোনো আবেদন-নিবেদন-অনুরোধ-আদেশ নেই, তবু ভোজবাজির মতো কাজ হলো। সত্যি কথা বলতে কী, অধিকাংশ লোকই তাকে কোনোদিন দেখেনি, তার কণ্ঠস্বরও কখনো শোনেনি, ফলে এমন জাদুমাখা সম্মোহনী কণ্ঠস্বরের ঘোষণাটি সকলকেই চুপ করিয়ে দিলো। মঞ্চ প্রস্ত্তত। উঠে এলো গম্ভীর-বিষণ্ণ-আত্মমগ্ন শিল্পী আবদুল বারি। আসন বিছিয়ে বসল, হাতে তুলে নিল বেহালা। গভীর মনোযোগ দিয়ে কতক্ষণ কী যেন নাড়াচাড়া করল, তারপর শুরু করল তার বাজনা। যারা আগে তার বাজনা শুনেছে তারা জানত কী ঘটতে চলেছে; কিন্তু এই বিপুলসংখ্যক মানুষ আসলে ধারণাই করতে পারেনি যে, তারা এমন এক অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতে যাচ্ছে যা আমৃত্যু তাদের কাছে এক অবিস্মরণীয় স্মৃতি হয়ে থাকবে। কিছুক্ষণের মধ্যেই লাখো শ্রোতার সব মনোযোগ কেড়ে নিতে সমর্থ হলো আবদুল বারি, তার কিছুক্ষণ পর এক এক করে শ্রোতাদের চোখ অশ্রম্নসজল হয়ে উঠতে লাগল, তারও কিছুক্ষণ পর তাদের চোখ ও মনের সামনে থেকে সমস্ত জগৎ বিলুপ্ত হয়ে কেবল জেগে রইল আবদুল বারি আর তার বেহালার ছবি এবং তার বাজনার সুর, আর তারপর প্রায় সবার চোখে নেমে এলো অশ্রম্নধারা।

বাজনা শেষ হওয়ার আগেই আবদুর রবকে ইশারা দিয়ে উঠে পড়লেন তিনি, তাকে অনুসরণ করে তার খাস কামরায় পৌঁছে গেল সে। আবদুর রবকে বসতে বলে নিজেও বসলেন তিনি, তারপর জিজ্ঞেস করলেন –

আবদুর রব, কিছু বুঝলে?

জি, বোঝার চেষ্টা করেছি।

কতটুকু বুঝেছ, বলো।

মনে হলো, আবদুল বারি তার শিল্পীসত্তার শিখরে আরোহণ করতে পেরেছে।

হ্যাঁ, ঠিকই বুঝেছে। অলৌকিক ক্ষমতা নিয়ে জন্মেছে আবদুল বারি, মানুষকে সম্মোহিত করে ফেলার অলৌকিক ক্ষমতা, যে-কোনো মানুষকে কেবল সুরের জাদুতে কাঁদানোর ক্ষমতা। বলো, এখন আমাদের করণীয় কী?

জি?

আমরা এখন তাকে নিয়ে কী করব?

আবদুর রব এ-বিষয়ে কিছুই ভাবেনি, অথচ তার প্রশ্নের উত্তর দিতে সে বাধ্য, বলল – আপনি যা ভালো মনে করেন…

ওকে থামিয়ে দিতে হবে! – তিনি তাঁর সিদ্ধান্ত জানালেন।

জি!

বুঝতে পারছ না আমার কথা? ওকে থামিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করো।

কিন্তু কেন? – আবদুর রব এই প্রথম প্রশ্ন করল। সে এতকাল কেবল নির্দেশ পালন করে এসেছে, যতই কৌতূহল হোক, যতই প্রশ্ন জাগুক মনে, কখনো প্রকাশ করেনি। কিন্তু এই উদ্ভট সিদ্ধান্তটি তাকে এতটাই বিস্মিত ও বিমূঢ় করে তুলল যে, প্রশ্নটি মনে আটকে রাখতে পারল না।

তিনি সরাসরি উত্তর না দিয়ে আরেকটি প্রশ্ন করলেন – মানুষকে যদি সুখী করতে চাও, যদি চাও তারা আনন্দময় জীবন যাপন করুক, তাহলে কী করবে?

তাদের যন্ত্রণা লাঘব করতে হবে।

হ্যাঁ, যারা দুঃখী তাদের যন্ত্রণা লাঘব করতে হবে। নিরবচ্ছিন্ন দুঃখ মানুষের প্রাপ্য নয়, দুঃখী মানুষের জীবনে নানা আনন্দময় ঘটনার জন্ম দিয়ে মাঝে মাঝে তাদের সুখী করে তুলতে হয়। কিন্তু যারা সুখী তাদের?

যারা সুখী তারা তো এমনিতেই সুখী, তাদের জন্য কী করতে হবে সে-কথা তো কখনো ভাবেনি আবদুর রব, এবার তাই আর কোনো উত্তর জোগাল না তার মুখে।

একটুক্ষণ অপেক্ষা করে তিনিই বললেন – তাদের ব্যস্ত রাখো। যথাসম্ভব ব্যস্ত রাখো। নিরবচ্ছিন্ন সুখ তাদের ভোগ করতে দিয়ো না। কোনো-না-কোনো সমস্যা-যন্ত্রণা-দুর্ভোগ দিয়ে তাদের কিছুদিনের জন্য ভারাক্রান্ত করে রাখো। যাদের সহ্যক্ষমতা বেশি তাদের জন্য অধিক যন্ত্রণার ব্যবস্থা করো, তাদের জীবনে দুর্যোগ নামিয়ে আনো। নিরবচ্ছিন্ন সুখী মানুষের ভেতরে দুঃখবিলাস জন্মাবে। প্রকৃত দুঃখী মানুষের দুঃখকে তারা বুঝতে অপারগ হবে। সবচেয়ে বেশি ব্যস্ত রাখো শিল্পীদের। সংগীতশিল্পী, কবি, চিত্রশিল্পী বা লেখক – সবার জন্য তৈরি করো অকথ্য যন্ত্রণা। শত দুঃখের মধ্যেও তারা অলৌকিক সৃষ্টি উপহার দেয়, তাদের যদি ব্যস্ত রাখা না হয় তাহলে ধীরে ধীরে তারা আবিষ্কার করে ফেলবে জগতের সমস্ত রহস্যের উৎসকে, তখন আর মানুষের জীবনে প্রশ্ন থাকবে না, কৌতূহল থাকবে না, জীবন নিয়ে হাহাকার থাকবে না, আনন্দও থাকবে না। মানুষ যাপন করবে একটি ঘোরগ্রস্ত-সম্মোহিত-অলৌকিক জীবন। অথচ জীবন খুবই লৌকিক ব্যাপার, খুবই সাদামাটা-সামান্য ব্যাপার। জগৎ এক বিভ্রমজাগানো ক্রীড়াভূমি, এখানে খেলা চলছে অনন্তকাল ধরে, বিশুদ্ধ খেলা। মানুষ যাকে মনে করে জীবন, তা আসলে একটা বিরাট খেলারই সামান্য অংশ। এই সত্যটি জেনে গেলে তারা আর খেলার অংশ হয়ে থাকতে চাইবে না, এক অলৌকিক জীবনের সন্ধানে নেমে পড়বে, আর সেই জীবনের সন্ধান দিতে পারেন কেবলমাত্র শিল্পীরাই। শিল্পীদের এই অলৌকিক জীবন রচনা করতে দিয়ো না, তাদের একটা নির্দিষ্ট সীমা পর্যন্ত যেতে দাও, তারপর আর এগোতে দিয়ো না। জীবনযন্ত্রণায় তাদের অতিষ্ঠ করে তোলো, তাদের সহ্যের শেষ সীমায় নিয়ে যাও যেন তারা আত্মহত্যা করে অথবা ক্লান্ত হয়ে শিল্পচর্চাকে বিসর্জন দিয়ে বসে।

আবদুর রব অবাক হয়ে শোনে আর এতকাল পর তার এসব স্ববিরোধী কর্মকা–র ব্যাখ্যা খুঁজে পায়। কিন্তু কীভাবে এই শিল্পীদের স্তব্ধ করে দেবে সে? নিশ্চয়ই তাদের হত্যা করার মাধ্যমে নয়! তাহলে কী উপায়? তিনি তো কোনো পথ বাতলে দিলেন না! অনেক ভেবেচিন্তে, তার কোনো পরামর্শ বা নির্দেশনা না নিয়েই, আবদুর রব তার মুখপাত্র হিসেবে অতঃপর নিজ উদ্যোগেই সমস্ত ধরনের শিল্পচর্চাকে নিষিদ্ধ করার জন্য একটা জুতসই ঘোষণাপত্র তৈরি করার কাজে নেমে পড়ে। r

শেয়ার করুন

Leave a Reply