খোয়াবনামার কবিতাগুচ্ছ

লেখক:

ইমরুল চৌধুরী

এক
ছেলেবেলায় আমার যখন গলা সাধবার বয়স
সকাল-সন্ধ্যা হারমোনিয়ামের রিড চেপে
কত না বেসুরো গলা সেধেছি।
কিন্তু গান আমার শেখা হয়নি।
সেই থেকে আমি গানের পেছন পেছন ছুটছি
রাত জেগে অ্যালকোহলিক টেলিভিশনে প্রিয়শিল্পীর
লাইভ শো দেখি
কখনো বা সরগম নিয়ে সরাসরি কথা বলি
কত না বাদ্যযন্ত্রের ডামাডোলে ফকির আলমগীর
কোনো একটা চুরি করা গান আমার মাথায়
ভূতের মতন চেপে বসে থাকে
কী গান?
ওই যে রাতেরবেলা বেদনা-বিধুর বেহাগ বাঁশরী
আর দিনভর দুঃসহ গরমের জগাখিচুড়ি
কাকতালীয়ভাবে
একদিন হরতালে আমাকে বেধড়ক পেটালো
খাকি পোশাক পরা মারমুখো পুলিশ
কেন?
জানতে চাইলে আত্মপক্ষ সমর্থনে ব্যস্ত থানার ওসি
ঠোঙাভর্তি ঝালমুড়ির প্যাকেট ধরিয়ে দেয় আমার হাতে
আমি শুকনো বাদামের খোসা যত্রতত্র হাওয়ায়
উড়িয়ে উড়িয়ে
বাড়ি ফিরেছি কত না রাত
কত না রাত হরতালের লাগাতার জ্যোৎস্নায়
নগরকান্দার টার্মিনাল থেকে
লোহা-লক্কড়ের যে-বাস ভেঁপু বাজিয়ে রওনা হয়েছিল
ডোরাকাটা হলুদ বাঘের পায়ের ছাপ যার পায়ের তলায়
ভোরবেলার আনন্দবার্তায়
আগুনে পুড়ে ছাই
এসব নিয়ে আমাদের রকমারি এইসব দিন রাত্রি
নাটক তো নাটক, নাটকে কত কিছুই না হয়
মিশ্র মালকোশ রাগে প্রিয় শিল্পীর যে গান
আমি এতকাল লুকিয়ে রেখেছিলাম
ফুল-হাতা সিল্কের পাঞ্জাবির পকেটে
তা এখন রেডিও স্ফূর্তির শর্টওয়েভ ফ্রিকোয়েন্সিতে
বেজে চলেছে… বেজেই চলেছে

দুই
শিলাইদহে লোটাকম্বলসর্বস্ব এক মেসবাড়িতে
তিনদিন ছটফটা রাত্রিযাপনের পর
অবশেষে কুঠিবাড়ির কুয়াশা কাটিয়ে দেখা দিলেন    রবীন্দ্রনাথ
তাঁর কণ্ঠে তাঁর কবিতার জয়গান
‘না জানি কেন রে এতদিন পর জাগিয়া উঠিল প্রাণ’
তাহলে কি মঙ্গাপীড়িত এই জনপদজুড়ে
আবারো কবিতার দুর্ভিক্ষ
এখনো তো ভোরবেলার আচমকা বাতাসে
ঘাসের গালিচায় ঝরেপড়া শেফালির
খুশবুতে মাতোয়ারা তল্লাটের লোকজন
কী আশ্চর্য আমাদের এই ভুবনডাঙা
সার্ধশত বছর পর আরো দেড় লাখ বছর
হাড়ের মাংস থেকে বেরিয়ে আসছে কঙ্কাল
নাকি কবিতা?
তবে কি রবীন্দ্রনাথ কবিতার
ডাইনোসর?
এখনো কি একাই তবে কবিতার লড়াই
যারা বক্সিং রিংয়ের ভিতর
অবসরের তালিকায় তাদের নাম
ইট-পাটকেল, রাবার বুলেট আর ছেঁড়া চটির
বিক্ষিপ্ত মিসাইল ছুড়ে দেওয়ার পরও
থামতে চায় না জনস্রোত
নদীর উৎসমুখে কাঁটাতার ব্যারিকেড
এক্সিট পয়েন্টে ডগস্কোয়াড পুলিশের তল্লাশি
‘হরতাল-হরতাল’ বলে চেঁচাচ্ছে গোটাকয়েক
টোকাই মাস্তান
ছেঁড়া পাৎলুন ময়লা কামিজে নকল ছবির ‘হিরো’
মুখে কর্ণবিদারী ভুভুযল বাঁশি
শহরময় খেলনা পিস্তলে কি না দৌরাত্ম্য তাদের
প্ল্যাকার্ড ফেস্টুনে কবিতার নিরাময় ট্যাবলেট
সুগন্ধি চন্দন ধূপ আগরবাতির শোকার্ত শবযাত্রায়
যখন কবিতার জয়
রবীন্দ্রনাথ অন্তিম শয়ানে
সার্ধশত বছর

তিন
আমার বুকের উপর এতকাল জগদ্দল
একটা পাথর চেপে বসেছিল
তারপরও কেটে গেছে এই গ্রহলোকের
সাড়ে তিন কোটি বছর
আগুনের মৌতাতে যখন গলতে শুরু করলো বরফ
না-না সে সময় নয়
ঠিক যে-মুহূর্তে এভারেস্টের চূড়ায় পা রাখলেন
নিশাত মজুমদার
কথায় বলে ‘কামারের ঠুকঠাক কুমারের এক ঘা’
অমনি গলতে শুরু করলো পাথর
পাথরের পর পাথর

পাথর গলে গেলেও বুক থেকে রক্ত
বেরোলো না
এতদিন অ্যান্টিবায়োটিক খেয়ে যা হয়নি
ডাক্তারের পরামর্শ, হোমিওপ্যাথি ডোজ আর
তেতো কবিরাজি জোলাপ যখন নিষ্ফল
জয়তু
নিশাত মজুমদার
এখন আমি সান্ধ্য পত্রিকার চটকদার শিরোনাম
পিরের দোয়া তাবিজ তুকতাক ঝাড়ফুঁকের
কেরামতি দেখে হতবাক
এই নাগরদোলার কত না উৎফুল্ল মানুষ
পাঁচবিবি থেকে ঘর্মাক্ত কলেবরে টেম্পোর পেট্রোলের
গন্ধ ছড়িয়ে সর্বস্ব খোয়ালো
বর্ষীয়ান রাহেলা খাতুন
বুকে পাথরচাপা কান্না সে কী আহাজারি তার
সুধারামপুরে অশীতিপর সগীর আলী মৃধা
দুই যুগ তার জবান বন্ধ
গলব্লাডার স্টোন আর বুকের পাথর
যে সমার্থক দুটি শব্দ নয়
এ বিষয়ে তাদের জ্ঞানগম্যি
‘ক অক্ষর গো মাংস’ হলেও
আমার বুকের ওপর চেপে বসা জগদ্দল পাথর
সে তুলনায় কত যে তুচ্ছাতিতুচ্ছ
পারতপক্ষে আমারও কোনো সম্যক ধারণা ছিল না

সোশ্যাল মিডিয়া