গল্পের দেশ

লেখক: সাত্যকি হালদার

সাত্যকি হালদার

এবার পুজোয় আমরা কোথায় যাব বাবা?

– কেন, রাজস্থান। রাজস্থান তো প্রায় বুক হয়ে গেছে।

– তার মানে! পুরো রাজস্থানকেই বুক করে দিয়েছ নাকি!

– না, তা কেন। ওখানে বেড়ানোর যেসব জায়গা, জয়সলমির, উদয়পুর, সেসব জায়গায় চেষ্টা করা হচ্ছে।

– শেষ পর্যন্ত পাওয়া হবে তো এবার!

– কেন হবে না। বুকিং পাওয়া গেলে দশ দিনের ছুটিতে ঘুরে আসার অসুবিধা কোথায়!

কিছুক্ষণ আগে কমলেশবাবু অফিস থেকে ফিরেছেন। বসার ঘরে সবাই। দুই মেয়ে, স্ত্রী অরুণা। টিভিতে খানিক আগে খবর হয়ে গেছে। এখন সিরিয়াল। কমলেশবাবুর জামাকাপড় ছাড়া হয়নি। প্রতিদিনই তিনি অফিস থেকে ফিরলে এরকম একটু বসা হয়। সঙ্গে চা, হালকা জলখাবার, সারাদিনের জমে থাকা কথাবার্তার টুকরো। পুজোর কাছাকাছি বলে এখন বেড়ানোর আলোচনা।

গত বছর পরিকল্পনা ছিল দক্ষিণ ভারতের। পুরো দক্ষিণ ভারত। কুড়ি দিনের কনডাক্টেড প্রোগ্রাম। যাওয়ার টিকিট কাটা হয়ে গিয়েছিল। তেরো দিন পর ফেরার টিকিট। তাও কাটা। দু-মেয়ের টুকিটাকি কেনা সারা। অরুণা কী নিতে হবে না নিতে হবে তার তালিকা বানাচ্ছিলেন প্রতিদিন। কমলেশবাবু অফিসে ছুটির দরখাস্তও জমা দিয়ে ফেলেছেন। অথচ সেই ট্যুর শেষ মুহূর্তে ক্যানসেল। বেরোনোর আগের দিন কমলেশবাবুর হঠাৎ শরীর অস্থির। মাথা ঝিমঝিম, গা বমি, উঠে দাঁড়াতে গেলেই টলে পড়ার ভয়। শেষ পর্যন্ত ডাক্তার এবং লো প্রেসার। ওই অবস্থায় আর যা হোক দূরে যাওয়া যায় না। ট্রেনের ভাড়া গচ্চা দিয়ে সবাইকে থেকে যেতে হয়েছিল।

তবে শরীর ঠিক হওয়ার পর কমলেশবাবু অন্য একটা আশ্বাস দিয়েছিলেন মেয়েদের। কাছাকাছির আশ্বাস। মালদা এবং বহরমপুর। বাঙালির নবাব আর সুলতানদের রাজ্য-রাজধানী। থাকা, যাতায়াত নিয়ে সাড়ে তিনদিন। কিছু না হওয়ার থেকে অল্প হওয়া ভালো।

মালদা-বহরমপুরে তত লাগেজ লাগে না। তাছাড়া দিনতিনেকের ব্যাপার। মন খারাপ করে দুই মেয়ে জামাকাপড় কমিয়েছে দক্ষিণ ভারতের ব্যাগ থেকে। সোনালির কিছু প্রসাধন তখনো কেনা বাকি। সেসব ছেড়ে দিলো ও। আর রুপালির অনিচ্ছা বাসে যেতে হবে বলে। তবু যাওয়া, এই যা। পুজোর ছুটিতে তো ঘরে বসে থাকা যায় না।

কিন্তু সেই ট্যুরও শেষমেশ বাতিল। সে এক বাজে ব্যাপার। যাওয়ার আগে আবার চাগাড় দিয়ে উঠল কমলেশবাবুর ব্যামো। সেই দুর্বলতা, মাথা ঘোরা। তখনো অবশ্য বাসের টিকিট কাটা হয়নি। টাকাটা বাঁচল এই যা। তবে অস্থির হয়ে উঠল মেয়েরা। সোনালির তো প্রায় বিদ্রোহ। – তোমাকে আর কোথাও নিয়ে যেতে হবে না। বেরোনোর কথা হলেই মাথা ঘুরতে থাকে।

অরুণা ওকে সামলান। বলেন, বাবাকে তো চিনিস। অফিস ছাড়া কোথাও তেমন যেতে চায় না। এমনিতেই একটু ভীতু মানুষ।

তবু মানতে চায় না সোনালি। বন্ধুদের কাছে এর মধ্যে গল্প হয়ে গেছে। বহরমপুরও নাকচ হওয়া প্রেস্টিজের ব্যাপার। সোনালি বলে, তাহলে আগ বাড়িয়ে অত পস্ন্যান না করলেই হয়। রিজার্ভেশন, কেনাকাটা, হোটেল বুক, এসবের আগেই তো তোমরা বলতে পারো।

শরীর সামান্য ভালো বোধ হওয়ায় বিছানা থেকেই প্রতিবাদ করেন কমলেশবাবু। – কেন তোমাদের পুরী নিয়ে যাইনি! সেবার কেমন বৃষ্টি, তার মধ্যে তবু তো রওনা হয়ে গেলাম।

– দিদি আবার সেই পুরী, সেই দশ বছর আগের। আমার সাত আর তোর নয়। ছোট করে ফোড়ন কাটে রুপালি। সোনালি তখনো কথা বলে চলেছে। – পুরীতে গিয়ে কী দেখেছিলাম আমরা! না মন্দির, না সমুদ্র। মার কাছে শোনা ভয়ে তুমি হোটেল থেকে বের হতে চাওনি।

ভেতরের ঘর থেকে অরুণা দুই মেয়েকে তাড়া দেন। – চুপ করবি এবার। বাবাকে তো সুস্থ হতে দিবি!

দু-মেয়ের অস্থিরতা তখনকার মতো চাপা পড়ে যায়। কমলেশবাবু বিছানা থেকে বিড়বিড় করে বলেন, ওদের বা দোষ কী। গত বেশ ক-বছর তো কোথাও বেরোতে পারেনি…।

তবে কমলেশবাবুর অসুখ দীর্ঘস্থায়ী হয় না। মালদা-বহরমপুর বাতিল হয়ে যাওয়ার পরদিনই আবার তিনি স্বাভাবিক। আগের মতো জীবন। দশটা-পাঁচটা অফিস। বাড়ি ফিরে মেয়েদের সঙ্গে গল্প। আর মেয়েদের সঙ্গে গল্প মানেই নতুন নতুন জায়গা।

নতুন জায়গায় যাওয়ার পরিকল্পনা। অফিস থেকে ফিরে সেসব আবার শুরু করেন তিনি। চায়ে প্রথম চুমুকটা দিয়ে মুখ তুলে বলেন, আমাদের অফিসের সুজাতের কথা বলেছি তো। খুব ঘোরে। বউ-ছেলেকে নিয়ে অচেনা এক জায়গা থেকে ঘুরে এলো। জোড়াইবাড়ী। কার্শিয়াং থেকে হাঁটাপথে দু-মাইল। ছবি দেখাল। চমৎকার এক পাহাড়ি গ্রাম।

বেড়ানোর কথা উঠতে আপত্তি করে ওঠে সোনালি। বলে, বাবা পিস্নজ অন্য কিছু বলো। তুমি আর কোনো নতুন জায়গার কথা বোলো না। আমরা তো কখনো যেতে পারব না ওসব জায়গায়।

– কে বলেছে যেতে পারব না? কমলেশবাবু চা শেষ করে কাপ নামান। সোজা হয়ে বসে বলেন, শিলিগুড়ি থেকে কার্শিয়াং ঘণ্টাখানেকের পথ। জোড়বাংলো হয়ে গেলে সময় আরো কম। সুজাত বলেছিল কী নাকি একটা পয়েন্ট আছে, ওখান থেকে ওপরের পথে হাঁটতে থাকলেই জোড়াইবাড়ী।

কমলেশবাবুর গল্প বলার ধরন আলাদা। বিশেষ করে বেড়ানোর গল্পের। এমনভাবে বলবেন যেন ওসব জায়গা অনেক দিনের চেনা। নিজে বেশ কবার যেন ঘুরে এসেছেন। ওনার বলার ধরনে আটকা পড়ে যায় মেয়েরা। সোনালি চুপ হয়ে শোনে। রুপালি চোখ গোলগোল করে বলে, হেঁটে যদি যাই মা কি পারবে!

কমলেশবাবুর গলার স্বরে ছড়িয়ে দেওয়া মুগ্ধতা। বাড়ির সবাইকে নিয়ে যেন ধীরে ধীরে পাহাড়ের পথে হাঁটছেন। রুপালির কথার উত্তরে বলেন, পাহাড়ে হাঁটা তো কষ্টেরই। তবে আমরা
যে-পথে যাব সেখানে তত কষ্ট নেই। সুগতের তোলা ছবিগুলো দেখলে মন অন্যরকম হয়ে যায়। চলার পথের পুরোটা রডোডেনড্রন বনের পাশ দিয়ে। দূরে ঝরনার মতো নদী। কুয়াশা কেটে রোদ উঠলে জায়গাটা ছবির মতো। কষ্ট মনে হলে তোদের মা না-হয় ঝরনার ধারে বসবে।

– তাহলে কবে যাব বাবা? গল্প শুনতে শুনতে ছটফট করে ওঠে রুপালি।

– একসঙ্গে দিনসাতেকের ছুটি নিলেই হলো। তাহলে সবাই ঘুরে আসা যায়। কমলেশবাবুর গলায় আশ্বাস।

– সুগত বলছিল জোড়াইবাড়ী এখনো তেমন কেউ চেনে না। মোটামুটি ফাঁকা, বুকিং না হলেও চলে। এনজেপি পর্যন্ত ট্রেনের টিকিট কনফার্ম করে নিলেই হলো।

অনেকক্ষণ চুপ করে থেকে সোনালিও আশ্বাসটা জড়িয়ে নিতে চায়। বলে, তবে একটু চেষ্টা করে দেখ। কতদিন কোথাও যাওয়া হয়নি না!

– ঠিকই, বহুদিন তোমাদের কোথাও নিয়ে যাওয়া হয়নি। খানিকটা অন্যমনস্ক হয়ে যান কমলেশবাবু। দেয়ালের গায়ে টিভিতে সিরিয়ালের শেষে নামগুলো দেখাচ্ছিল। চেয়ারে গা এলিয়ে তিনি চোখ রাখেন সেদিকে। বলেন, কলকাতা থেকে শিলিগুড়ি এমন কী দূর। ট্রেন বুক না হলেও বাস সার্ভিস রয়েছে। তারপর গাড়িতে চাপলেই কার্শিয়াং। ছুটি ম্যানেজ করতে পারলেই তোমাদের নিয়ে যাওয়া যায়।

সেবার ছুটির ব্যবস্থাও হয়ে যায়। কিন্তু কমলেশবাবুর যাওয়া হয়ে ওঠে না। একদিন সন্ধেবেলা বাড়ি ফিরে মন খারাপ করে বসে থাকেন। বিড়বিড় করে বলেন, না, এবারেও হলো না। আমাদের বেড়ানোর কপালটাই খারাপ। পাহাড়ে বৃষ্টি শুরু হয়ে গেছে। বেশ বৃষ্টি। আর পাহাড়ে বৃষ্টি মানে তো ধস।

সোনালি-রুপালি ক্রমশ চিনে ফেলেছে বাবাকে। ওরা আর তত অভিযোগ করে না। বরং দুজনে মায়ের সামনে বসে বলে, বাবার গল্পগুলো সত্যিই বেশ ভালো। প্রতিদিন বাবাকে গল্প বলতে বলব। তাতেই আমাদের দূরে দূরে ঘোরা হবে।

পরদিন বাড়ি ফিরে কমলেশবাবু শুরু করেন শান্তিনিকেতনের কাহিনি। রবীন্দ্রনাথের দেশ শান্তিনিকেতন, বর্ষায় নাকি অসাধারণ। সম্প্রতি টিভিতে কোনো চ্যানেলে নাকি দেখিয়েছে। শালের কচি পাতায় টুপটাপ ঝরে পড়তে থাকে বৃষ্টি। খোয়াইয়ের মাঝে গেরুয়া জলের স্রোত। আর বাতাসে সারাদিন গান – বাদল-দিনের প্রথম কদম ফুল…

শান্তিনিকেতনের কথা বলতে বলতে কমলেশবাবু নিজেই কেমন ঘোরে চলে যান। কোনো এক বর্ষার দুপুরে সেখানে যেন হারিয়ে যাচ্ছেন তিনি। লাল মাটিতে জলের ধারা দেখছেন। সঙ্গে মেয়েরা, অরুণা। কলকাতা থেকে বোলপুর মাত্র চার ঘণ্টার পথ।

তিনি বলে যান। শুনতে থাকে মেয়েরা। যেমন এতকাল সব গল্প শুনেছে। কার্শিয়াংয়ের পর ওরা শোনে শান্তিনিকেতনের গল্প। কদিন পর শান্তিনিকেতনও শেষ হয়ে যাবে। তখন আসবে গিরিডি আর মধুপুর। তারপর সেটা শেষ হলে বাবা হয়তো নিয়ে যাবে মানালি আর দেরাদুনের গল্পে।

এভাবেই চলে যাচ্ছিল দিন-মাস-বছর। বেড়ানো নয়, বেড়ানোর পরিকল্পনায়। কিন্তু এসবের মাঝেই একটা গোল বেধে যায়। অফিস থেকে কর্মী প্রশিক্ষণের শিবির বসে পুরুলিয়ায়। আগেও দু-দুবার এমনটা হয়েছে। কমলেশবাবুর নাম থাকা সত্ত্বেও বিভিন্ন অজুহাতে কাটিয়ে আসতে পেরেছেন। কিন্তু এবার আর কোনো উপায় নেই। অফিসের বাকি সবার এর আগে প্রশিক্ষণ নেওয়া সারা। একমাত্র তিনিই বাকি। অফিসের ব্যবস্থাপনায় যাতায়াতের টিকিট কেটে দিনসাতেক আগে ওনার হাতে ধরিয়ে দেওয়া হলো।

গম্ভীর মুখে কমলেশবাবু অফিস থেকে ফিরে আসার পর বাড়িতে উদ্বেগ। অরুণার পাশাপাশি রুপালি, সোনালিও চিমত্মায় পড়ে যায়। অফিসের আর কেউ যাবে না, ওনাকে একাই ট্রেনে চেপে যেতে হবে। পুরুলিয়া প্রায় ঘণ্টাছয়েকের পথ। সবার সঙ্গে বেরোতেও যার ভয় তিনি একা কীভাবে যাবেন! হোক না মোবাইল ফোনের যুগ। অরুণা মন খারাপের গলায় বলেন, দ্যাখো না অন্য কাউকে রাজি করানো যায় কিনা। তাতে কিছু টাকা-পয়সা যায় তো যাবে।

কমলেশবাবু হতাশ। চেয়ারে গা এলিয়ে বলেন, সে-চেষ্টা কি করিনি ভাবছ। জনে জনে বলেছি। দিনপ্রতি তিনশো টাকা করে নগদ দেবো বলেছি। কিন্তু একজনও রাজি নয়। সবাই আসলে ভীতুর ডিম। কিংবা আমাকে একা পাঠিয়ে মজা দেখতে চায়।

সোনালি বলে, কিন্তু ট্রেনে তোমার যদি কিছু হয়ে যায়!

-সে-ভাবনা কি কারো মাথায় আছে? সামান্য বিরক্ত কমলেশবাবু। বলেন, বেড়ানো ক্যানসেল হলে তোমরা কি আমাকে কথা শোনাতে ছাড়। তারা তো অফিসের লোক।

সন্ধেবেলা হাওড়া থেকে ট্রেন। কমলেশবাবু দুপুর থেকে ব্যাগ গোছান। অরুণা ছোট ছোট প্যাকেটে খাবার গুছিয়ে কাছে এনে রাখেন। কোনোটায় চিড়ে ভাজা, কোনোটায় মুড়ি-বাদাম। একটা ছোট প্যাকেটে দুটো গন্ধলেবু, ট্রেনে হঠাৎ মাথা ঘোরা শুরু হলে নাকি শুঁকে নিতে হবে। যাতায়াত মিলিয়ে সাড়ে তিনদিনের ব্যাপার। অথচ ব্যবস্থাপনায় এমন যেন কমলেশবাবু বহুদিনের জন্য বিদেশে যাচ্ছেন। সোনালি ও রুপালি তো মন খারাপের জন্য বাবার কাছাকাছি আসতে পারল না। পাশের ঘরে জানালায় বসে দুজন। সোনালি একসময় বলে, বাবাকে আমরা কত কষ্ট দিয়েছি তাই না!

রুপালি বলে, তাও তো ভালো যে মোবাইল রয়েছে। চাইলেই বাবা আমাদের সঙ্গে কথা বলতে পারবে।

আর সেই মোবাইল হলো কাল। তাড়াহুড়োয় কমলেশবাবু সব কিছু গোছালেন, ফেলে গেলেন তার মোবাইল ফোনটা। ট্রেন ধরার তখন শেষ মুহূর্ত, সন্ধেবেলা হ্যারিসন রোডে জ্যাম। ফেরার উপায় নেই। কথা বলার জন্য বুথও আর পাওয়া যায় না।

অরুণা স্থির জানত, হাওড়া থেকে তিনি আবার ফিরে চলে আসবেন। যেমনটি তিনি এতকাল করেছেন। পরদিন অফিসে বকা খাবেন বিস্তর। ডাক পড়তে পারে বড় সাহেবের ঘরে। কমলেশবাবু করুণ মুখে সেসব শুনলেও বাড়িতে এসে যথারীতি উপভোগ করবেন না যাওয়া। রাতে মেয়েদের আবার বলবেন আর কোনো পরিকল্পনার কথা।

অথচ রাত দশটাতেও ফিরে এলেন না তিনি। পুরুলিয়া যাওয়ার সন্ধের ট্রেন না ধরলে তার মধ্যে তার বাড়ি আসার কথা। কিন্তু তিনি এলেন না। রাত বাড়তে থাকে। বাড়ে উদ্বেগ। তবে কি শরীর খারাপ হলো লোকটার! অফিসের চাপ সইতে না পেরে স্টেশনেই মাথা ঘুরে…। মা আর দুই মেয়ে সারারাত জেগে কাটায়। পুরুলিয়ার ট্রেন ধরে বাবা চলে গেছে, দু-মেয়ে কিছুতে যেন ভাবতে পারে না। সকালেও ফিরে আসতে পারেন তিনি।

কমলেশবাবু ফিরলেন। ফিরলেন ঠিক সাড়ে তিনদিনের মাথায়। বাড়ির সবার তখন মাথা খারাপ অবস্থা। একটা ফোন আসেনি কিছু না। মোবাইলের যুগে নম্বর টুকে রাখে না কেউ, ফোন ফেলে গেলে ফোন করা যায় না। কিন্তু কমলেশবাবু বাড়ি ঢুকলেন হাসিমুখে। হাতে একটা মিষ্টির প্যাকেট, কাঁধে চওড়া ব্যাগ। বসার ঘরে সোফার পাশে সেসব নামিয়ে রেখে বললেন, যা ভেবেছিলাম ঠিক তার উলটো। একবার বেরোতে পারলেই হলো। অসুবিধার কোনো তো ব্যাপারই নেই…।

শেষ পর্যন্ত তুমি পুরুলিয়ায় পৌঁছলে! কমলেশবাবুর স্ত্রীর চোখে বিস্ময়।

– তা পৌঁছব না কেন। অফিসের কাজ, যেতে তো হবেই। তবে ওসব প্রশিক্ষণ নামে, আসলে সকাল-বিকেল বেড়াও। ঘুরে দেখো। আমি তো টুক করে একবেলায় জয়চ-ী পাহাড় ঘুরে এলাম।

এবার অভিযোগ সোনালির গলায়। – তবে তো তুমি বেশ পার। যত অসুবিধে আমরা যাব বললে!

চেয়ারে আবার গা এলিয়ে হেসে ফেলেন কমলেশবাবু। – পুরুলিয়া গিয়ে আমার সাহস হয়ে গেছে। মাথা ঘোরাটোরা কিচ্ছু হয়নি এবার। তোদের নিয়েও এভাবে বেরিয়ে পড়তে হবে।

–  কোথায় বাবা কোথায়! হঠাৎই উৎসাহিত হয়ে পড়ে রুপালি।

– কোথায় আবার, জয়চ-ী পাহাড়ে। পুরুলিয়া আমায় সাহস জুগিয়েছে। তোদের নিয়ে আগে ওখানেই যেতে হবে কবার। চেয়ার ছেড়ে উঠে পায়চারি শুরু করেন কমলেশবাবু। – তারপর সাহস আরো বাড়লে দূরে যাব। ঘাটশিলা, গৌহাটি, কাশ্মির, ভূস্বর্গকে একবার তো দেখতেই হবে। তারপর পেস্ন­ন, পেস্ননে চড়ে দেশের বাইরে। নায়াগ্রা, হনলুলু, শেষে আফ্রিকার জঙ্গল। ন্যাশনাল জিওগ্রাফিতে দেখিসনি!

পাশের ঘরে গিয়ে দুই বোন হাসতে শুরু করে। অরুণা মুখ টিপে চা বানান। তিনদিন পর ফিরে এসেছেন তিনি। ভালো লাগছে সবার। ঘর আবার ভরে উঠছে রং-বেরঙের বেড়ানোর গল্পে।

শেয়ার করুন

Leave a Reply