গৃহবধূ

লেখক:

ইসমত চুঘতাই
অনুবাদ : আন্দালিব রাশদী

যেদিন মির্যার নতুন কাজের মেয়েটি ধীরগতিতে তার বাড়িতে ঢুকল, প্রতিবেশীদের মধ্যে সাড়া পড়ে গেল। যে-সুইপার বরাবর কাজ ফাঁকি দিতে অভ্যস্ত, সে রয়ে গেল এবং গায়ের শক্তি খাটিয়ে ঘষে-ঘষে মেঝেটা পরিষ্কার করল। যে-গোয়ালা দুধে ভেজাল দেওয়ার জন্য কুখ্যাত, সেও নিয়ে এলো মাখন-ভাসা দুধ।
কে তার নাম দিয়েছে লাজো – লাজুক মেয়ে?
লজ্জা পাওয়ার ব্যাপারটা তো লাজোর পুরোপুরিই অজানা। কেউ জানে না, কে এ-মেয়েটির জন্ম দিয়েছে আর নিঃসঙ্গ, ক্রন্দনরত, শৈশবে কে-ই বা তাকে রাস্তায় ফেলে রেখে গেছে।
ভিক্ষা করে, অনাহারে দিন কাটিয়ে সে বেঁচে থাকার জন্য কেড়ে নেওয়ার বয়সে পৌঁছেছে। যৌবন তার শরীরে স্পর্শ দিয়ে গেছে, শরীরে মূর্ত হয়ে উঠেছে বিস্ময়কর বাঁক। রাস্তাই তাকে জীবনের রহস্যময় পথ দেখিয়ে দিয়েছে।
লাজো কখনো দরকষাকষি করেনি। টাকা দাও, ফুর্তি করো – তার বেলায় প্রস্তাবটা ঠিক এরকম নয়। যৌনতার ব্যাপারটা বাকিতেও হতে পারে, যদি মানুষটি তার ভালোবাসার হয়, যদি তার অর্থকড়ি না থাকে তাহলে সে নিজেকে বিনে পয়সায় তুলে ধরতে রাজি।
মানুষ জিজ্ঞেস করে, ‘তোর কি কোনো লজ্জাশরম নেই?’
‘আমার!’ বেহায়ার মতো লাজো ঝলসে ওঠে।
‘একদিন তুই পস্তাবি।’
‘আমি থোড়াই পরোয়া করি।’
কেমন করে সে পরোয়া করবে? চেহারাটা কী যে নিষ্পাপ, কালো একজোড়া চোখ, সুন্দর করে বসানো দাঁত, কোমল শরীর, সুমিষ্ট বর্ণ, শরীরে বোল দিয়ে হেঁটে যায় – বড্ড প্ররোচনাদায়ক।
মির্যা অবিবাহিত। প্রতিদিন রুটি বেলতে আর সেঁকতে তার জীবনটাই চ্যাপ্টা হয়ে যাচ্ছে। তার নিজের একটা মুদিদোকান; সোহাগ করে বলে, ‘জেনারেল স্টোর’। দোকানের কারণে মির্যার কোনো জুটি নেই, এমনকি নিজের জন্মশহরে গিয়ে যে বিয়ে করবে সে-সময়টুকুও নেই।
মির্যার বন্ধু বকশি লাজোকে বাসস্টপ থেকে তুলে নেয়। বকশির স্ত্রীর গর্ভাবস্থায় পুরো নয় মাস চলছে, তাদের একটি কাজের মেয়ে দরকার। পরে যখন লাজোর প্রয়োজন ফুরিয়ে যায়, বকশি তাকে তার বন্ধু মির্যার কাছে জমা রাখে। বকশি ভাবে, মির্যা বেশ্যাপাড়ায় গিয়ে টাকা ওড়ায়, তার চেয়ে বরং বিনে পয়সার খাবার হিসেবে লাজোকেই ভোগ করতে থাকুক।
সতর্ক স্বরে মির্যা বলল, ‘দোহাই খোদার! আমার বাড়িতে একটা বেশ্যাকে রাখতে চাই না। তুই এটাকে ফিরিয়ে নিয়ে যা।’
কিন্তু লাজো ততক্ষণে নিজেকে মির্যার বাড়ির সঙ্গে মানিয়ে নিয়েছে। স্কার্ট উঁচিয়ে এমন ভাব করল, যেন সে ডায়াপার পরে আছে, ঝাঁটা হাতে নিয়ে আন্তরিকভাবে ঘর পরিষ্কারে মন দিলো। বকশি এসে লাজোকে বলল মির্যা তাকে চাচ্ছে না, কথাটা সে কানেই নিল না। উলটো সে তাকে আদেশ করল, যেন রান্নাঘরে কড়াইগুলো সাজিয়ে দেয়। তারপর পানি আনতে বেরিয়ে গেল। বকশি বলল, ‘যদি যেতে চাস, আমি তোকে বাড়ি নিয়ে যেতে পারি।’
লাজো চেঁচিয়ে বলল, ‘বেরিয়ে যা এখান থেকে। তুই কি আমার স্বামী নাকি যে, আমাকে আমার মায়ের বাড়িতে দিয়ে আসবি? ভাগ। মিয়াকে কীভাবে সামলাতে হবে, আমি জানি।’
বকশি বিদায় হয়ে যাওয়ার পর মির্যা অসহায় অবস্থায় পড়ে। ঘর থেকে দ্রুত বেরিয়ে এসে মসজিদে ঢুকে পড়ে। এরকম একটি বাড়তি খরচের ভার সে নিতে চায় না। তাছাড়া লাজো যে-ধরনের মেয়ে, চুরি আর প্রতারণা তো করবেই। বকশি যে কী একটা লণ্ডভণ্ড অবস্থার সৃষ্টি করল!
কিন্তু বাড়ি ফেরার পর তার নিশ্বাস আর পড়ে না। যেন তার মৃত জননী বি আম্মা ফিরে এসেছেন! বাড়ি ঝকমক-তকতক করছে।
‘মিয়া সাহেব, রাতের খাবার বেড়ে দেব?’ একবার জিজ্ঞেস করেই লাজো আবার রান্নাঘরের দিকে বিলীন হয়ে গেল।
শাক, আলু তরকারি, পেঁয়াজ-রসুন দিয়ে ভাজা মুগের ডাল। আম্মাজি যেভাবে রান্না করতেন, ঠিক তা-ই।
এত খাবার দেখে হতবাক মির্যা জিজ্ঞেস করল, ‘এত কিছু করলে কেমন করে?’
‘দোকান থেকে বাকিতে এনেছি।’
‘দেখো মেয়ে, আমি তোমার ফেরার ভাড়া দিয়ে দিচ্ছি। একজন কাজের মেয়ে রাখার সামর্থ্য আমার নেই।’
‘মিয়া সাহেব, আপনার কাছে কে টাকা চেয়েছে?’
‘কিন্তু…’,
মির্যার প্লেটে সদ্য চুলা থেকে তুলে আনা একটি চাপাতি উঠিয়ে দিয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘খাবারটা গরম তো?’
‘খাবারের কথা যাক, আমি নিজেই পা থেকে মাথা পর্যন্ত ক্ষেপে গরম হয়ে আছি।’ নিজের রুমে শুতে যাওয়ার আগে মির্যা চেঁচিয়ে এ-কথাগুলো বলল।
পরদিন সকালে মির্যা যখন আবার প্রসঙ্গটা টেনে আনল, লাজো তাকে রীতিমতো হুমকি দিলো, ‘না, মিয়া সাহেব, আমি চিরদিনের জন্য এখানে চলে এসেছি।’
‘কিন্তু…’,
‘আমার রান্নার খাবার পছন্দ হয়নি?’
‘ব্যাপারটা খাবার নয়।’
‘আমার হাতে ঘষে ধোয়া মেঝে ভালো পরিষ্কার হয়নি?’
‘এটা ঠিক তা নয়…।’
‘তাহলে এটা কী?’ লাজো উলটো রেগেমেগে জিজ্ঞেস করল।
লাজো প্রেমে পড়েছে। মির্যার প্রেমে নয়, তার বাড়ির।
হারামজাদা বকশি একবার তার জন্য একটি রুম ভাড়া করেছিল। এই রুমে আগে থাকত নন্দী – নন্দী একটা মহিষ। মহিষটা মরে নরকে গেছে; কিন্তু পেছনে ফেলে রেখে গেছে তার দুর্গন্ধ। আর বকশিও তার সঙ্গে ভালো ব্যবহার করেনি। এখন সে মির্যার বাড়িতে – লাজো এ-বাড়ির অপ্রতিদ্বন্দ্বী মিসট্রেস। মির্যা কুটিল মানুষ নয়। চুপচাপ আস্তে করে শান্তভাবে এসে বসে, যা-ই পরিবেশন করা হয় খেয়ে নেয়।
মির্যা নিজে কয়েকবার টাকা-পয়সার হিসাব পরীক্ষা করে সন্তুষ্ট হয় – লাজো কোনোরকম প্রতারণা করেনি। একটুখানি গল্প-গুজবের জন্য লাজো কখনো কখনো রামুর দিদিমার কাছে যায়। রামু মির্যার অপচিত বয়ঃসন্ধির সহায়ক একজন। মির্যা যে মাঝে মাঝে বাইজিবাড়িতে যায়, এ-তথ্যটি সে-ই লাজোকে দেয়।
শুনে লাজো মনে কষ্ট পায়। তাহলে তার কী দরকার? যেখানেই সে কাজ করেছে, যে-অবস্থানে থেকে হোক লাজো সাধ্যমতো সেবা করেছে। আর এখানে একটা সপ্তাহ চলে গেল – কোনোরকম যৌন-সংসর্গ ছাড়াই। এর আগে সে জীবনে এতটা অবাঞ্ছিত কখনোই বোধ করেনি। এর মধ্যেও তার কাছে অনেক প্রস্তাব এসেছে। কিন্তু সে তো মির্যার বাড়ির কাজের মেয়ে। লাজো একে একে সব প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে –  সে তো মির্যাকে হাসির পাত্রে পরিণত করতে পারে না। এখানে মির্যা যেন আইসবার্গ – ভাসমান বরফের পাহাড় – এমনই মনে হয়েছে লাজোর। মির্যার ভেতরে আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত সে দেখেনি। মির্যা ইচ্ছা করেই বাড়ি থেকে দূরে দূরে থাকছে।
লাজোর নাম সবার মুখে মুখে – আজ গোয়ালাকে চড় দিয়েছে, গতকাল দোকানদারের মুখ লক্ষ করে চুলোয় আগুন দেওয়ার গোবরদলা ছুড়ে মেরেছে – এমন আরো অনেক কিছু। স্কুলমাস্টার পীড়াপীড়ি করেছেন, মেয়েটা  একটু পড়াশোনা শিখুক। মসজিদের মোল্লাজি তাকে দেখেই আসন্ন বিপদ থেকে আল্লাহ যেন তাকে রক্ষা করেন সেজন্য আরবিতে বিনীত প্রার্থনা শুরু করে দিয়েছেন।
বিরক্ত মির্যা বাড়ি ফিরে আসে। লাজো কেবল গোসল সেরে এসেছে। কাঁধে ছড়ানো তার ভেজা চুলের গুচ্ছ। রান্নাঘরে চুলোর আগুনে ফুঁ দিতে দিতে গাল লালচে হয়ে উঠেছে, চোখ ভরে উঠেছে পানিতে। অসময়ে মির্যাকে আসতে দেখে দাঁত ঘষটায়।
তাকে দেখে মির্যা প্রায় বেসামাল হয়ে পড়ে যাচ্ছিল। নীরবে অস্বস্তির মধ্যে খাবারটা শেষ করে তার ওয়াকিং স্টিকটা হাতে নিয়ে দ্রুত বাসা থেকে বেরিয়ে গেল। মসজিদে ঢুকে কিছুক্ষণ বসে রইল; কিন্তু গা এলিয়ে দেওয়ার মতো অবস্থার সৃষ্টি হলো না। বাড়ির অন্যান্য নিরন্তর চিন্তা তাকে অস্থির করে তোলে। নিজেকে আর ধরে রাখতে না পেরে আবার বাড়িতে ফিরে গেল। দেখল, লাজো ঘরের চৌকাঠে দাঁড়িয়ে একজন পুরুষ মানুষের সঙ্গে ঝগড়া করছে। মির্যাকে দেখামাত্র লোকটি চোরের মতো সটকে পড়ল।
সন্দেহবাতিকগ্রস্ত স্বামীর যে-স্বর, সে-স্বরে মির্যা জিজ্ঞেস করল, ‘লোকটা কে?’
‘রাঘব!’
‘রাঘব।’ মির্যা বছরের পর বছর এ-লোকটির কাছ থেকে দুধ কিনছে, কিন্তু কখনো তার নাম জানা হয়নি।
লাজো বিষয় বদলে জিজ্ঞেস করল, ‘মিয়া সাহেব আপনার জন্য হুঁক্কা ধরিয়ে দিই?
‘না! ওই লোকটি এখানে কী চায়?’
‘জিজ্ঞেস করতে এসেছে, এখন থেকে কতটুকু দুধ দেবে।’
‘তুমি তাকে কী বলেছ?’
‘বলেছি – তোর মরণ এগিয়ে আসে না কেন – আগে যা দিতি, এখনো তা-ই দিবি।’
‘তারপর!’ মির্যা সত্যি ক্ষেপে গেছে।
‘তারপর আমি তাকে বললাম, যা বেজন্মা, তোর বাড়তি দুধ তোর মাকে আর বোনকে খাওয়া গে।’
‘বদমাশ! তাকে আর এখানে আসতে দেবে না। ফেরার সময় আমি নিজেই দোকান থেকে দুধ নিয়ে আসব।’
সে-রাতে, রাতের খাবারের পর মির্যা সদ্য লন্ড্রি থেকে আনা মাড় দেওয়া কুর্তা পরল, তুলোর বলে সুগন্ধি মাখিয়ে এক কানে ঢুকাল, নিজের ওয়াকিং স্টিক তুলে নিয়ে ধীরে ধীরে বেরিয়ে গেল।
লাজোর অন্তরে ঈর্ষা জেগে উঠল। বাইজিকে অভিশাপ দিতে দিতে হতবাক হয়ে বসে রইল। মির্যা কি তার ব্যাপারে সত্যিই নির্বিকার। বিস্মিত লাজো জিজ্ঞেস করে, ‘তা কেমন করে সম্ভব?’
বাইজি একজন খদ্দেরের সঙ্গে দরকষাকষি করছিল। দেখে মির্যা মুষড়ে পড়ে। সে ফিরে আসে, লালার দোকানে বসে। সেখানে মুদ্রাস্ফীতি, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি এবং জাতীয় রাজনীতি – তার সব ক্রোধ বাড়তে থাকে। জীবনীশক্তি ঝেড়ে গালাগাল দিয়ে বিরক্ত মির্যা মধ্যরাতে বাড়ি ফিরে আসে। প্রচুর ঠাণ্ডা পানি খায়; কিন্তু ভেতরের আগুন জ্বলতেই থাকে।
খোলা দরজা দিয়ে লাজোর মসৃণ সোনালি গা দেখা যায়। ঘরের মধ্যে অসচেতন এপাশ-ওপাশে টুং করে পায়ের মল বেজে ওঠে। মির্যা আরো এক গ্লাস পানি খেয়ে নিজের খাটে গুটিসুটি মেরে শোয় এবং চাঁদের নিচে যা কিছু আছে সবকিছুকে অভিশাপ দিতে থাকে। বিছানায় অবিরাম নড়াচড়া শরীরে যন্ত্রণা দিতে থাকে। গ্লাসের পর গ্লাস পানি ঢুকে পাকস্থলি ফুলিয়ে দেয়। দরজার পেছনে উন্মুক্ত পেলব পায়ের আকর্ষণ অপ্রতিরোধ্য। অজানা আতঙ্ক তার গলা টিপে ধরে; কিন্তু শয়তানও তাকে প্ররোচনা দিতে থাকে। বিছানা থেকে রান্নাঘর পর্যন্ত কতবার সে আসা-যাওয়া করেছে, মাইলের পর মাইল সে পা চালিয়ে হাঁটতে পারে। কিন্তু এখন যে তার পা এতটুকুও নড়ছে না।
তারপর একটি নিষ্পাপ পরিকল্পনা তার মাথায় এলো। যদি লাজোর পা এতটা নির্বসন না হতো, তাহলে তার অস্বস্তির কোনো কারণই ঘটত না। এ-ধারণাটি ধীরে ধীরে বলবান হয়ে ওঠে; শক্তি সঞ্চিত হয় মির্যারও। যদি তার ঘুম ভেঙে যায়, যদি সে উঠে পড়ে, তাহলে কী হবে? তবু তাকে ঝুঁকি নিতেই হবে – নিজের নিরাপত্তার খাতিরেই।
যাতে শব্দ না হয় চটিজোড়া খাটের নিচে ফেলে। শ্বাস ফেলে আঙুলে ভর দিয়ে এগিয়ে যায়। দাঁত-মুখ খিঁচিয়ে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে লাজোর পোশাকের ঝালর নিচে টেনে এনে পা ঢেকে দেয়। কিছুক্ষণ সিদ্ধান্তহীন অবস্থায় দাঁড়িয়ে থাকে, তারপর ফিরে যাওয়ার জন্য ঘুরে দাঁড়ায়।
হঠাৎ এক পলকে লাজো তাকে আঁকড়ে ধরে। মির্যার মুখ দিয়ে কথা সরে না। জীবনে এমন ভুল বোঝাবুঝির শিকার আর কখনো হয়নি। মির্যা জোর খাটিয়ে চলে আসতে চাইল, অনুনয়-বিনয় করে ছেড়ে দিতে বলল; কিন্তু লাজো তাকে যেতে দেবে না।
পরদিন সকালে যখন মির্যা ও লাজো চোখাচোখি হলো, লাজো নবধূর মতো লাজরাঙা হয়ে উঠল। বিজয়িনী লাজো সাহসের সঙ্গে গুনগুন করে কাজরি গাইতে গাইতে ঘরের কাজ করতে থাকল। রাতের ঘটনার সামান্যতম ছায়াও তার চোখে ঝিলিক দিয়ে ওঠেনি। মির্যা যখন নাস্তা খেতে বসেছে, বরাবরের মতো দরজার কাছে বসে সে মাছি তাড়াতে থাকে।
সেদিন দুপুরে যখন খাবার নিয়ে দোকানে গেল, মির্যা লক্ষ করল লাজোর হাঁটার ভঙ্গিতে নতুন এক ছন্দ। লাজো যখন দোকানে আসে, মানুষ দোকানে এসে দাঁড়িয়ে যায়। জিনিসপত্রের দাম জিজ্ঞেস করে। মির্যা সারাদিনেও যা বেচতে পারে না, লাজো কিছুক্ষণেই তা ছাড়িয়ে যায়।
মির্যাকে এখন আগের চেয়ে ভালো দেখায়। মানুষ তার কারণ জানে আর ঈর্ষায় জ্বলতে থাকে। মির্যা বিচলিত ও অস্বস্তি বোধ করতে থাকে। লাজো তাকে যতই দেখভাল করছে, ততই সে তার প্রেমমুগ্ধ হয়ে উঠছে; প্রতিবেশীদের ব্যাপারে ততই বাড়ছে তার ভয়; কিন্তু লাজো যে পুরো বেহায়া। যখন সে তার খাবার নিয়ে আসে, তার উপস্থিতিতে গোটা বাজারই ধুকপুক করতে থাকে।
একদিন সে লাজোকে বলে, ‘দুপুরে আর খাবার এনো না।’
‘কেন আনব না?’ লাজোর মুখমণ্ডল বিষণœ হয়ে ওঠে। সারাদিন একা একা বাসায় থাকা তার জন্য খুবই বিরক্তিকর। বাজারটি তার জন্য এক আকর্ষণীয় স্থান এবং একঘেয়েমি থেকে মুক্তি।
লাজোর দোকানে আসা বন্ধ হলো, মির্যার মনে ঢুকল হাজারো সন্দেহ। তার ওপর গোয়েন্দাগিরি করতেই অসময়ে হঠাৎ বাড়িতে হাজির হয় আর লাজোও মির্যার এই মনোযোগের জন্য তাকে তৃপ্ত করতে বাড়িতে থাকে।
একদিন মির্যার কাছে ধরা পড়ল, লাজো রাস্তার ছোকরাদের সঙ্গে কাবাডি খেলছে; রাগে তার ফেটে পড়ার অবস্থা।  লাজোর স্কার্ট বাতাসে ওপরে উঠে যাচ্ছে, বালকদের দৃষ্টি স্কার্টের ওপর। মির্যা মাথা উঁচু করে কৃত্রিম এক নির্বিকার ভাব ধরে মাথা উঁচু করে পাশ দিয়ে চলে যায়। তার অস্বস্তি পথচারী দর্শকদের আমোদিত করে।
লাজোকে মির্যার পছন্দ বেড়েই যাচ্ছে। লাজোর সঙ্গে বিচ্ছেদের চিন্তাটাই এখন তাকে পাগল করে তোলে। দোকানের কাজে তার মন বসে না। তার মনে ভয় ধরেছে, লাজো একদিন তাকে নিঃসঙ্গ অবস্থায় ফেলে রেখে চলে যেতে পারে।
মিরন মিয়া পরামর্শ দিলো, ‘কী মিয়া, মেয়েটাকে বিয়ে করছ না কেন?’
মির্যা চিৎকার করে উঠল, ‘আল্লাহ মাফ করুন।’ এমন একজন বেশ্যার সঙ্গে বিয়ের মতো একটা পবিত্র সম্পর্ক কেমন করে স্থাপন করবে?
ঠিক সেদিন সন্ধ্যায় মির্যা বাড়ি ফিরে দেখল, লাজো ঘরে নেই। মির্যার চিন্তা খেই হারিয়ে ফেলল। তালগোল পাকানো লালা তো অনেকদিন ধরে অপেক্ষায় আছে। সে লাজোকে একটি বাংলো দেখার প্রস্তাব করেছে। যে-কোনো বিচারেই হোক মিরন মিয়া তার একজন ভালো বন্ধু, সেও গোপনে তাকে প্রস্তাব দিয়ে চলেছে।
মির্যা যখন তার আশা প্রায় ছেড়েই দিচ্ছিল, হঠাৎ লাজোর অভ্যুদয় ঘটল। সে রামুর দিদিমার কাছে গিয়েছিল।
সেদিনই মির্যা সিদ্ধান্ত নিল পরিবারের গর্ব ও মর্যাদা ধুলায় লুটিয়ে হলেও সে লাজোকে বউ হিসেবে বরণ করবে। বিস্মিত লাজো জিজ্ঞেস করে, ‘কিন্তু কেন, মিয়া সাহেব?
‘কেন নয়?’ রূঢ়ভাবে মির্যা জিজ্ঞেস করল, ‘তা হলে অন্য জায়গায় প্রেম চালিয়ে যাবে?’
‘আমি প্রেম করব কেন?’
‘রাওজি তোমাকে একটা বাংলো দেবার প্রস্তাব করছে।’
‘তার বাংলোয় আমি থুতুও ফেলি না।’
কিন্তু লাজোর যে বিয়ের আয়োজন সম্পূর্ণভাবে ফুরিয়ে গেছে। সে মির্যারই ছিল, মির্যারই থাকবে। তার মতো একজন মালিক পাওয়া সহজ কোনো ব্যাপার নয়। লাজো জানে, মির্যা এক দুর্লভ রতœ। তার আগের সব মালিক অনিবার্যভাবে তার প্রেমিকে পরিণত হয়েছে। তারা আগে নিজেদের আয়েশ মিটিয়েছে, তারপর তাকে পিটিয়েছে, সবশেষে তাকে লাথি মেরে বের করে দিয়েছে; কিন্তু মির্যা সবসময়ই তার সঙ্গে কোমল আচরণ করেছে, তাকে প্রিয় মনে করেছে। সে তাকে কয়েক প্রস্ত পোশাক কিনে দিয়েছে, একজোড়া সোনার চুড়িও দিয়েছে। লাজোর পরিবারে সাতজন্মেও কেউ খাঁটি সোনার অলঙ্কার পরেনি।
মির্যা যখন তার এ-প্রস্তাবটি নিয়ে রামুুর দিদিমার সঙ্গে আলাপ করল, সেও বিস্মিত হলো।
জিজ্ঞেস করল, ‘কী মিয়া, গলায় ঘণ্টা বাঁধার কোনো দরকার আছে? বেশ্যাটা কি কোনো ফন্দি এঁটেছে? ভালো করে একটা প্যাদান দিলে সব ঠিক হয়ে যাবে। পিটিয়ে যেখানে সামলে নিতে পারছ, সেখানে বিয়ে করার দরকারটা কী?’
কিন্তু বিয়ের ভাবনা তো মির্যার। তাকেই পেয়ে বসেছে।
রামুর দিদিমা এবার লাজোকে জিজ্ঞেস করল, ‘তুই না করছিস, কেন, মিয়া ভিন্ন ধর্মের সে-কারণে?’
‘না তো, আমি সবসময়ই তাকে আমার স্বামী মনে করেছি।’
লাজোকে মনে করে সাময়িক প্রেমিকা, সাময়িক স্বামীকে সাধ্যমতো সেবা করে যাচ্ছে। তার ওপর কখনো বিত্তের বর্ষণ হয়নি। তবু লাজো উজাড় করেই নিজেকে দিয়েছে – দেহ ও মন সকলই। মির্যা অবশ্যই একজন ব্যতিক্রম। কেবল লাজোই জানে, তার সঙ্গে দেওয়া-নেওয়ার খেলাটা কত আনন্দের। তার সঙ্গে তুলনা করলে লাজোর আর সব পুরুষ শূকরছানার তুল্য।
তাছাড়া বিয়ে তো অক্ষতযোনি নারীর ব্যাপার। সে নিজেকে কীভাবে ‘কনে’র যোগ্য করে তুলবে? লাজো বিতর্ক করল, হাতে-পায়ে ধরে করুণা ভিক্ষা চাইল – বিয়ে করবে না; কিন্তু মির্যা জীবনপণ করে নেমেছে নিকাহর একটি বৈধ চুক্তি সম্পাদন করবেই।
সেদিন, সান্ধ্য নামাজের পর নিকাহ পড়ানো হলো। প্রতিবেশী তরুণীরা এসে বিয়ের গান গাইল। মির্যা তার বন্ধুদের খাওয়াল। লাজোর নতুন নাম হলো কানিজ ফাতিমা, মির্যা ইরফান আলী বেগের স্ত্রী।
মির্যা নিষেধাজ্ঞা আরোপ করল, তার স্ত্রী লেহেঙ্গা পরতে পারবে না। তার জন্য নির্ধারণ করল চুড়িদার পাজামা। কিন্তু লাজো যে তার দুপায়ের মাঝখানে কেবল খোলা পরিসরে অভ্যস্ত। এই নতুন ফরমান তাকে বড় বিরক্ত করল। নতুন পোশাকে কখনোই অভ্যস্ত হয়ে উঠতে পারল না।
একদিন সুযোগ পেয়েই পাজামা খুলে ফেলল; যখন লেহেঙ্গা পরতে যাচ্ছে, মির্যা হাজির। বিচলিত লাজো কোমরে স্কার্ট গুঁজতে ভুলে গিয়েছিল, স্কার্ট মেঝেতে পড়ে যায়।
মির্যা বজ্রকণ্ঠে তার ওপর ধর্মীয় অভিশাপ ছুড়ে দেয় – ‘তোকে শয়তান নিয়ে যাক।’ দ্রুত একটি বিছানার চাদর তার নগ্নতা ঢাকার জন্য ছুড়ে দেয়।
লাজো আর বিরক্তির কারণ বুঝতে পারে না, তারপর কেনইবা ভাবগম্ভীর এ-উচ্চারণ। সে কোথায় ভুল করেছে? এ-ঘটনাটিতে মির্যার নিশ্বাস বন্ধ হয়ে আসে, এমন আরো হয়েছে। মির্যা ভয়ংকররকম মুষড়ে পড়েছে। লেহেঙ্গাটা তুলে সত্যি সত্যিই আগুনে জ্বালিয়ে দেয়। দুর্বোধ্য এক আঘাত ও স্তব্ধতায় লাজোকে ফেলে রেখে মির্যা চলে যায়। চাদর ছুড়ে ফেলে লাজো নিজের শরীর পরীক্ষা করে। হয়তো রাতারাতি তার শরীরে বীভৎস কোনো চর্মরোগ ছড়িয়ে পড়েছে।
খোলা জায়গায় ট্যাপের পানিতে যখন গোসল করছে, লাজো একইসঙ্গে কান্নাও মুছে চলেছে। রাজমিস্ত্রির ছেলে মিঠুয়া ঘুড়ি উড়াবার অজুহাতে প্রতিদিনই দেয়াল বেয়ে ওপরে উঠে তার দিকে তাকিয়ে থাকে। কিন্তু লাজো আজ এতই দুঃখী যে, সে তাকে বুড়ো আঙুলও দেখায়নি, তার দিকে বঁটিও ছুড়ে মারেনি। শরীরটাকে চাদরে পেঁচিয়ে ঘরের ভেতর ঢুকে পড়ে।
বিষণœমনে লম্বা পাজামার ভেতর পা গলিয়ে দেয় – এত লম্বা যেন শয়তানের খাদ্যনালি। তার কষ্ট আরো বাড়িয়ে দেয় সেখানে হারিয়ে যাওয়া কোমরবন্ধ – পাজামা ভেতরে ঢুকে যায়, সে সাহায্যের জন্য চেঁচায়। প্রতিবেশীর কন্যা জুল্লু হাজির হয়। ফিতেটা বের করে দেয়। লাজোর বিস্ময়ভরা প্রশ্ন : মেয়েদের পোশাকের নামে রাইফেলের এই খোল বানিয়েছে কোন মহাকামী পুরুষ?
মির্যা যখন বাড়ি ফিরে আসে, ফিতেটা আবার ঝামেলা করে। লাজো আঙুল দিয়ে ফিতে টেনে বার করার আপ্রাণ চেষ্টা করে। তার বিচলিত অবস্থা মির্যার ভালো লাগে। দুজনের সম্মিলিত ও একাগ্র চেষ্টার পর ফিতেটা বেরিয়ে আসে।
কিন্তু মির্যার জন্য একটি কূটকচালে সমস্যা দেখা দেয়। একসময় যা ঠিক লাজোর মাতালকরা ছেনালি এখন তা তারই স্ত্রীর বেহায়াপনা হয়ে উঠেছে। ফষ্টিনষ্টির এই নোংরা পথ তো ভদ্র ও সম্মানিত মেয়েলোকদের বেলায় মানানসই নয়। মির্যার স্বপ্নের কনে হতে ব্যর্থ হলো লাজো। যেখানে মির্যার সে-সময় পদক্ষেপ লাজোর শয়নে লাল হয়ে যাওয়ার কথা তার পীড়াপীড়িতে বিরক্ত হয়, নির্বিকার হয়ে পড়ে থাকে। লাজো তো ছিল রাস্তার এক চিলতে স্ল্যাবের মতো।
প্রতিটি পদক্ষেপে লাজোর ওপর নজরদারি করে মির্যা তার বাড়াবাড়ি সীমিত করে আনে, তার ভেতরের বন্যতাকে পোষ মানায় – সে অন্তত তা-ই ভেবেছে। এখন আর সন্ধ্যা হতে না হতে বাড়ি ফেরার জন্য সে আর অস্থির হয়ে ওঠে না। স্ত্রৈণ হয়ে গেছে এ-বদনাম এড়াতে আর সব স্বামীর মতো সে নিজেও অধিকাংশ সময় বন্ধুদের সঙ্গে কাটাতে শুরু করেছে।
হামেশাই তার এই অনুপস্থিতির খেসারত হিসেবে একটি কাজের মেয়ে নিয়োগের প্রস্তাব করে। লাজো ভয়ংকর ক্ষেপে যায়। মির্যার বাইজিবাড়িতে যাওয়া-আসার ব্যাপারটা তো তার জানাই। সে আরো জানে, প্রতিবেশী পুরুষেরা সবাই সেখানে যায়। কিন্তু তার নিজের বাড়িতে সে অন্য কোনো মেয়েমানুষ সহ্য করবে না। কেউ একবার তার রান্নাঘর-ঘর দেখুক, তার চকচকে বাসন-কোসনের শব্দ করুক, সে তাকে ছিঁড়ে টুকরো টুকরো করে ফেলবে। মির্যার ভাগ অন্য কোনো মহিলাকে দিতে তার আপত্তি নেই; কিন্তু ঘরের ভাগ অবশ্যই কাউকে দেবে না। মনে হয় যেন মির্যা তাকে বাড়িতে স্থাপন করেছে, তারপর তার কথা ভুলেই গেছে। কয়েক সপ্তাহ ধরে মির্যা একা একা কথা বলে চলেছে। লাজো যখন তার মিসট্রেস ছিল তখন তার ওপর নজর ছিল সব পুরুষের। কিন্তু বিয়ে করে এখন যেহেতু সে মর্যাদাবান হয়ে উঠেছে, এখন সে মা, বোন কিংবা কন্যা। কেউ এখন আর আড়চোখে চটের পর্দার দিকেও তাকায় না – ব্যতিক্রম কেবল বিশ্বাসী মিঠুয়া। এখনো সে ছাদে ঘুড়ি উড়ায়, যখন মির্যা দূরে কোথাও এবং যখন লাজো আঙিনায় গোসল করে।
এক রাতে মির্যা বাড়ির বাইরে, বন্ধুদের সঙ্গে … (নবরাত্রি) উদযাপনে ব্যস্ত। পরদিন সকালে বাড়ি ফেরে, দ্রুত গা ধুয়ে দোকানে চলে যায়। লাজো বিরক্ত হয়। লাজো যখন গোসল করছে, তার চোখ ওপরের দিকে যায়, কিংবা মিঠুয়ার দৃষ্টি অনেকগুলো বল্লমের মতো তার ভেজা শরীরে বিঁধে যায়।
হঠাৎ তার ঘুড়ি ভেঁকাট্টা হয়ে যায়। ছেঁড়া সুতো তার গা ছুঁয়ে যায়। লাজো চমকে ওঠে, দ্রুত ঘরের ভেতর ঢুকে যায়। অন্যমনস্কতার কারণেই হোক কী ইচ্ছাকৃতভাবে, তোয়ালেতে শরীর পেঁচাতে ভুলে যায়।
তারপর থেকে মিঠুয়া সবসময়ই মির্যার বাড়ির আশপাশে ঝুলে থাকছে। যখন লাজোর কোনোকিছু বাজার থেকে আনা দরকার, চটের পর্দা সরিয়ে সজোরে ডাক দেয়, ‘মিঠুয়া গোবরের স্তূপের মতো কোথায় পড়ে আছিস। আমার জন্য কটা কচুরি নিয়ে আয় তো।’
তার গোসলের সময় যদি মিঠুয়াকে চোখে না পড়ে, গোসলখানায় তার উপস্থিতির কথা জানাতে এমন জোরে বালতিতে শব্দ করে যে, তা কবরের মরাকেও জাগিয়ে তুলবে। যে ভালোবাসা এতদিন সে অকাতরে দিয়ে গেছে, এখন তা সে মিঠুয়ার কাছে চায়। মির্যা যদি খেতে না আসে, খাবারটা সে কখনো নষ্ট করে না, দরিদ্র ও ক্ষুধার্তকে খাইয়ে দেয়। মিঠুয়ার চেয়ে ক্ষুধার্ত আর কে আছে?
মির্যার বিশ্বাস জন্মেছে যে, বিয়ের বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে লাজো সত্যিকার একজন গৃহবধূ হয়ে উঠেছে। কিন্তু নিজে না দেখলে এটা সে কখনো বিশ্বাস করত না। অকস্মাৎ দরজায় অপ্রত্যাশিত মির্যাকে দেখে লাজো প্রচণ্ড শব্দে হেসে ওঠে। সে কখনো স্বপ্নেও ভাবতে পারেনি এতে মির্যা এতটা অপদস্ত হবে।
কিন্তু মিঠুয়া জানত, এক হাতে ধুতি ধরে সে দ্রুত পালিয়ে গেল এবং টানা তিনটি গ্রাম ছাড়িয়ে যাওয়ার পর তবে থামল। মির্যা লাজোকে এমন চাবকালো যে, কোমল দ্রব্য দিয়ে তৈরি না হলে তার মৃত্যুই ঘটত।
মির্যা যে তার স্ত্রী আর মিঠুয়াকে হাতেনাতে ধরে ফেলেছে এই সংবাদ সারাগ্রামে ছড়িয়ে পড়ল। মজা দেখার জন্য দলে দলে মানুষ ছুটে  এলো। এসেই তারা পুরো হতাশ –  নায়ক মিঠুয়া পালিয়ে গেছে আর বউটা মাটিতে পড়ে আছে। রামুর দিদিমা এসে লাজোকে বাঁচিয়ে তুলতে চেষ্টা করছে।
কেউ কেউ ভাবতে পারেন এমন চাবকানোর পর বিক্ষত লাজো নিশ্চয়ই মির্যার বিরুদ্ধে চলে যাবে। মোটেও তা নয়। বিয়ে যা করতে পারেনি, বেদম মারই তা করে দিলো। তাদের বন্ধন আরো দৃঢ় হলো। যখনই তার জ্ঞান ফিরল লাজো মির্যার কথা জিজ্ঞেস করল। তার সব মালিকই শেষ পযন্ত প্রেমিকে পরিণত হয়েছে। আচ্ছামতো একটা মার দেওয়ার পর বিনিময়মূল্যের বিষয় একেবারে খারিজ হয়ে যায়। লাজো মাঝে মাঝে মার খেতে থাকে। কিন্তু মির্যাকে বরাবরই তার ভালো মনে হয়েছে। অন্য মালিকরা বন্ধুদের সম্ভোগের জন্য লাজোকে ধার দিত। কিন্তু মির্যার প্রথম থেকেই মনে করেছে লাজো তারই। বাই তাকে পরামর্শ দিয়েছে – পালিয়ে গিয়ে গা বাঁচা, কিন্তু সে একটুও নড়েনি।
মির্যা কেমন করে এ-পৃথিবীর সামনে মুখ দেখাবে? নিজের সম্মান তুলে ধরার জন্য তাকে মেরে ফেলা ছাড়া আর কোনো পথই খোলা নেই। মিরন মিয়া তাকে পেছনে টেনে ধরেছে : একটা কুত্তি মাগির জন্য আপনি কেন ফাঁসিতে ঝুলতে চাইছেন? তার চেয়ে বেশ্যাটাকে তালাক দিয়ে বিদায় করে দিন।’
মির্যা তখনই সেখানেই তাকে তালাক দিলো। যৌতুকের বত্রিশ টাকা মোহরানা, লাজোর কাপড়ে-চোপড়ে এবং  আর যা কিছু ছিল রামুর দিদিমার কাছে পাঠিয়ে দিলো।
লাজো যখন তালাকের কথা শুনল, স্বস্তির নিশ্বাস ফেলল। তার কাছে প্রমাণিত হয়েছে, নিকাহ তার জন্য শুভ কিছু নয়। এজন্যই যতকিছু অঘটন ঘটেছে।
সে রামুর দিদিমাকে জিজ্ঞেস করল ‘মিয়া সাহেব কি এখনো রেগে আছেন?’
‘তোর দিকে আর চোখ তুলে তাকাবে না। সে চায় তুই যেখানে ইচ্ছে সেখানে চলে যা। গিয়ে…।
মির্যার তালাকের সংবাদে গোটা গ্রাম ঝাঁকি খেল। লালা শূন্যস্থান পূরণের প্রস্তাব পাঠাল : ‘বাংলো এখন প্রস্তুত।’ লাজো চটে গিয়ে বলল : ‘বাংলোতে তোর মা-কে ঢুকিয়ে রাখ।’
একপক্ষকাল শয্যাশায়ী থাকার পর লাজো আবার নিজের পায়ে উঠে দাঁড়াল। মির্যার চাবকানো যেন তার শরীরে বসন্তের ছোঁয়া ধুইয়ে দিয়েছে। ঔজ্জ্বল্য আগের চেয়েও অনেক বেড়েছে। যখন সে পান কিংবা কচুরি কিনতে বাজারে ঢুকছে, গোটা বাজারে সে ঝড় তুলছে। ফলে একবার নয়, মির্যা হাজারবার মরেছে। একবার লাজোকে দেখতে পেলো বানিয়ার দোকানে, কিছু একটা নিয়ে তর্ক করে চলেছে। বানিয়া তার সঙ্গে ঠাট্টা-তামাশা করছে, মির্যা যেন দেখেইনি এমন ভাব করে ঘটনাস্থল থেকে দ্রুত সটকে পড়ল।
মিরন মিয়া তাকে বলল, ‘আপনি একটা পাগল কিছিমের মানুষ মিয়া সাহেব! সে কী করে না করে এসব নিয়ে আপনার মাথাব্যথা কিসের? আপনি তাকে তালাক দিয়েছেন। দেননি?’
‘কিন্তু সে তো একসময় আমার স্ত্রী ছিল।’
‘যদি সত্যি কথা শুনতে চান তাহলে বলি, সে কখনোই আপনার স্ত্রী ছিল না।’
‘কেন? নিকাহ যে করলাম তার কী হবে?’
‘বিয়েটা সম্পূর্ণ অবৈধ।’
‘কেন?’
‘বললাম তো, এটা বৈধ ছিল না। কে তার জন্ম দিয়েছে কেউ জানে না। আর আমি জানি জারজ সন্তানের সঙ্গে বিয়ে কখনো বৈধ হয় না।’ মিরন মিয়া রায় দিয়ে দিলো।
মির্যা জিজ্ঞেস করল, ‘তাহলে বিয়েটা কখনো কার্যকর হয়নি?’
মিরন মিয়া নিশ্চিত করল, ‘কখনো না।’
তার কথায় মির্যা ঢের স্বস্তি বোধ করল, দায় কেটে গেল তার। উদ্বিগ্ন হয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘তাহলে তালাকের কী হবে?’
‘মিয়া সাহেব আপনার নিকাহও হয়নি, তালাকও না।’
দুঃখভরাকণ্ঠে মির্যা বলল, ‘তাহলে আমার বত্রিশ টাকা মার গেল।’
চারপাশে প্রতিবেশীদের মধ্যে এ-কথা রটতে আর সময় লাগেনি যে, তার স্ত্রীর সঙ্গে মির্যার কখনো বিয়ে হয়নি, আর নিকাহ এবং তালাক দুটোই বেআইনি হয়েছে।
কথাটা যখন লাজোর কানে পৌঁছল, সে আনন্দে নাচানাচি শুরু করে। বিয়ের এবং তালাকের দুঃস্বপ্ন শেষ হয়ে গেছে। তাকে সবচেয়ে খুশি করেছে যে-বিষয়টি, তা হলো মিয়া সাহেবের মুখরক্ষা হয়েছে। তার কারণে মির্যা যে-সম্মান হারিয়েছে, সেজন্য লাজো আন্তরিকভাবেই দুঃখিত। জারজ সন্তান হওয়া তাহলে কী যে ভাগ্যের ব্যাপার।’ সে ভাবতে থাকে। ঈশ্বর না করুন, সে যদি বৈধ সন্তান হয়ে থাকে … এমনকি এই সম্ভাবনা নিয়ে ভাবতে গিয়েও লাজো কেঁপে ওঠে। রামুর দিদিমার সঙ্গে থাকতে তার শ্বাসরুদ্ধ হয়ে আসছে। বাড়ির চিন্তা তাকে উদ্বিগ্ন করে তোলে। মিয়া সাহেব তো চুরি হওয়ার ভয়ে বাড়ি পরিষ্কার করত না, ধুলোও ঝাড়ত না। জায়গাটা কী যে হতশ্রী হয়ে থাকবে!
একদিন মির্যা তার দোকানে যাচ্ছে। পেছন থেকে এসে লাজো তাকে জিজ্ঞেস করল, ‘মিয়া সাহেব, কাল থেকে আমি আবার কাজ শুরু করি?’
‘ধ্যাৎ!’ বলে মির্যা দ্রুত পা চালাল। একই সঙ্গে এটাও ভাবল, ‘কিন্তু একটা কাজের মেয়ে তো আমার লাগবেই – দুদিন আগে হোক কি দুদিন পরে। এই বেচারি হোক কি অন্য কেউ।’
মির্যা কী মনস্থির করবে সেজন্য লাজো বসে থাকার নয়। ছাদের ওপর থেকে লাফিয়ে ঘরের ভেতর ঢুকল, লেহেঙ্গা শক্ত করে বেঁধে কাজে নেমে গেল।
সেদিন সন্ধ্যায় বাড়ি ফেরার পর মির্যার আর নিশ্বাস পড়ে না। যেন প্রয়াত বি আম্মা ফিরে এসেছেন। ঘরটা ঝকঝকে পরিষ্কার। ধূপের হালকা গন্ধে বাতাস ভরে আছে। কলসি পানিতে ভরা, কলসিতে রাখা ভালো করে ঘষা একটি বাটি।
পুরনো স্মৃতিতে মির্যার হৃদয় ভরে ওঠে। চাপা নির্জনতার মধ্যে খাসির রোস্ট আর পরোটা খেয়ে নিলো। বরাবরের মতো লাজো দরজায় বসে মাছি তাড়াতে থাকে।
রাতের বেলা লাজো রান্নাঘরের মেঝেতে চট বিছিয়ে যখন শুতে গেল, মির্যার আরেককবার প্রচণ্ড পানির পিপাসা পেল। লাজোর পায়ের মলের প্ররোচক টুংটুং শব্দে মির্যা একবার আসে, আবার ফিরে যায়। আতঙ্ক তার হৃৎপিণ্ড চেপে ধরে, সেইসঙ্গে তাকে আঁকড়ে ধরে একটি অপরাধবোধ। তার মনে হয়, মেয়েটির প্রতি বড় বেশি অবিচার করে ফেলেছি এবং ভয়ংকর রকম ছোট করে দরিদ্র এ-বেচারিকে দেখেছে। গভীর এক অপরাধবোধ তাকে ছেয়ে ফেলে। সে নিজেকে অভিশাপ দিতে থাকে।
তারপর হঠাৎ ‘কোনো কিছুর তোয়াক্কা করি না’ এমনি একটি অনুভূতি নিয়ে জাগ্রত হয়ে দ্রুত রান্নাঘরে ছুটে গিয়ে মাদুর থেকে তার গৃহবধূকে তুলে নিল।
[ইসমত চুঘতাই প্রখ্যাত ভারতীয় উর্দু কথাসাহিত্যিক। জন্ম ১৯১৫ সালে উত্তর প্রদেশে। মৃত্যু ২৪ ডিসেম্বর ১৯৯১ মুম্বাইয়ে। তাঁর একাধিক রচনা বিভিন্ন সময় নিষিদ্ধ করেছে। তাঁর গল্প ও কাহিনি অবলম্বনে নির্মিত হয়েছে জুনুন, জিদ্দি, আরজু, গরম হাওয়ার মতো চলচ্চিত্র।]

সোশ্যাল মিডিয়া

নিউসলেটার