গৃহ ও গৃহীর স্থপতি

লেখক:

বুলবন ওসমান

মজুভাই, স্থপতি মাজহারুল ইসলাম, আমার চেয়ে এক প্রজন্ম বড় হবেন; কিন্তু দেশ বিভাগের ঘটনাচক্রে তিনি ভাই হয়ে গেছেন। ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগ হলে বাবা শেখ আজিজুর রহমান ওরফে সাহিত্যিক শওকত ওসমান কলকাতা ত্যাগ করে যোগ দেন চট্টগ্রাম সরকারি কমার্স কলেজে। আর মজুভাইয়ের বাবা চট্টগ্রামবাসী অধ্যাপক ওমদাতুল ইসলামকে বাবা ডাকতেন ভাইসাহেব, তাই মাজহারুল ইসলাম হলেন ভাই – আর তিনিও বাবাকে চাচা বলেই সম্বোধন করতেন, যদিও তাঁদের বয়সের খুব বড় একটা পার্থক্য ছিল না।
চট্টগ্রামে আমরা থাকতাম ৩৪বি চন্দনপুরায়। একটি দোতলা ভবনে। এখান থেকে বেরোলেই রাস্তার ওপাশে পড়ত একটি চালকল। তার পাশ দিয়ে একটি গলি চলে গেছে পশ্চিমদিকে চন্দনপুরা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সামনে দিয়ে চট্টগ্রাম কলেজের প্রবেশপথের পাশে। চট্টগ্রাম কলেজের বিপরীতে সরকারি এম ই স্কুল ও নর্মাল স্কুল (শিক্ষক প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান), তারপর একটি গলি – এটি পড়েছে সোজা দেবপাহাড়ে। এই দেবপাহাড়ে ওমদাতুল চাচার আবাস। এই বাড়ির ধাপের পর পাহাড়শীর্ষ। এখানে একটি মন্দির ছিল। মন্দিরের প্রৌঢ় পূজারি আমাদের বাসায় প্রতি মাসে আসতেন, আর বাবা পূজারিকে পাঁচ টাকা করে দিতেন। মন্দির সংলগ্ন অঞ্চলে পাহাড়ের ওপর ছিল একটি বড় কনকচাঁপার গাছ, এটা ছিল আমাদের অন্যতম আকর্ষণ। দেবপাহাড়ে গিয়ে আমরা ফুল পাড়তাম আর মনে হতো রবীন্দ্রনাথের ‘ছুটি’ কবিতার কথা।
মাখব গায়ে ফুলের রেণু
চাঁপার বন…
লুটি আহা হা হা হা…
ভাইবোন মিলে আমাদের শৈশবের সেই দিনগুলো এই দেবপাহাড়কে ঘিরে প্রতি সপ্তাহে স্কুল ছুটির দিন সকাল ছটা থেকে প্রায় নটা, সাড়ে নটা পর্যন্ত কাটত। আর বাবা মজুভাইদের বাড়িতে আমাদের পরিচয় করিয়ে দেওয়ার ফলে আমরা এখানে কোনো নিরাপত্তার অভাব বোধ করতাম না। মাঝে মাঝে চাচি আমাদের ডেকে মা ও বাবার কুশল জিজ্ঞেস করতেন। মজুভাইয়ের ছোটবোন এমি আমার সমবয়সী, এছাড়া মঈনভাই ছিলেন (মজুভাইয়ের ছোটভাই) আমার চেয়ে কিছুটা বড়। এয়ারফোর্সে পড়ার জন্যে পাকিস্তান চলে যান, যিনি পরে বাংলাদেশের এয়ার কমডোর হন।
আরো মনে পড়ে, দশম শ্রেণিতে কলেজিয়েট স্কুলে পড়ার সময়ে স্কুল থেকে জুনিয়র ক্যাডেট কোরের ট্রেনিং উপলক্ষে আমরা যাই রাঙামাটি… তখনো কাপ্তাই বিদ্যুৎ বাঁধ হয়নি। রাঙামাটি সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ছিলেন হেদায়েতুল ইসলাম, ওমদাতুল চাচার ছোটভাই। ওখানে গিয়ে তার বড় মেয়ে আইভির সঙ্গে আলাপ হয়। আইভি ছিল আমার সমবয়সী। পরবর্তীকালে ঢাকা চারুকলা প্রতিষ্ঠানে ওকে পাই ছাত্রী হিসেবে। বিয়ের পর ওর পড়াশোনা কিছুটা পিছিয়ে যায়। এমি, আইভি ওরা সবাই আমার সহপাঠী ছিল, যখন আমি চট্টগ্রাম কলেজে পড়ি। আমি ছিলাম আর্টসে, ওরা বিজ্ঞানে। বাংলা আর ইংরেজি ক্লাস একসঙ্গে করতে হতো। কলেজে ঢুকেই বাঁদিকে ছিল বাঁশের দুই কামরার একটা ছোট চালাঘর – ওটা মেয়েদের কমনরুম। এই ছোট ঘরটি ছাত্রদের আকর্ষণের জায়গা ছিল।
দেবপাহাড় আর কলেজের মাঝখানে অবস্থিত টিলায় থাকতেন নর্মাল স্কুলের সুপারিনটেন্ডেন্ট বগুড়ার জসীমউদ্দীন চাচা। আমার সমবয়সী ছিল চাচার দ্বিতীয় সন্তান নার্গিস। এই পরিবারের সঙ্গে আমাদের ছিল খুবই ঘনিষ্ঠতা, যেমন ছিল মজুভাইদের পরিবারের সঙ্গে।
জসীমউদ্দীন চাচার বড় ছেলে নান্নাভাই মঈনভাইয়ের সমবয়সী ছিলেন। তিনিও এয়ারফোর্সে শিক্ষা নেওয়ার জন্যে পাকিস্তান যান। ১৯৭১-এ মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে একটি প্লেন নিয়ে ডিফেক্ট করার সময় দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান। আজো এটা আমাদের মর্মবেদনার কারণ হয়ে রয়েছে।
দেবপাহাড়ের শেষ ধাপে মজুভাইয়ের নকশায় গড়া তাঁদের একটি ছোট বাড়ি ছিল। মোট চারটি কামরা। লম্বাটে। ওপর ধাপে একটি শোবার ঘর। তার পরের ধাপের শুরুতে বসার ঘর। দুই ধারের পুরোটা কাচের জানালা দেওয়া। খুব আলোকোজ্জ্বল। পরে পাশাপাশি দুটি শোবারঘর। এই বাড়িতে ভাড়া থাকতেন চৌধুরী মঞ্জুর মোর্শেদ। তখন তিনি অক্সিজেন কোম্পানির ম্যানেজার ছিলেন। স্বাধীনতার পর গণচীনে ছিলেন রাষ্ট্রদূত। তাঁদের বাড়ি ছিল বর্ধমান। খুবই শিল্পপ্রেমী চৌকস ব্যক্তিত্ব। অনর্গল বিবিসি শৈলীতে ইংরেজি বলে যেতে পারতেন। তাঁর ছোটবোন হামিদা কলেজে আমার সহপাঠী ছিল। লেখাপড়া নিয়ে এ-বাড়িতে প্রচুর আলোচনা চলত। অনেক সময় কেটেছে।
মজুভাইয়ের বাড়ির এ-নকশাটি আমাদের খুব পছন্দের ছিল। তাই ১৯৫৪ সালে কেনা আমাদের ঢাকার মোমেনবাগের (রাজারবাগ) বাড়ি তৈরির সময় বাবা মজুভাইকে এরকম একটি কম খরচের শোভন বাড়ির নকশা করে দিতে বলেন। বাড়ির কাজ শুরু হয় ১৯৫৯ সালে। বাবা তখন ঢাকা কলেজে বদলি হয়ে এসেছেন। আমি ভর্তি হয়েছি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সমাজতত্ত্বে। বাকি পরিবার তখনো চট্টগ্রামে, চন্দনপুরায়।
দশ কাঠা জায়গার মধ্যে বাড়ি। আয়তাকার জায়গাটি। বাড়ি যেহেতু একতলা হবে এবং এটার কোনো বর্ধন হবে না, তাই খরচ কমানোর জন্যে মজুভাই অভিনব সব পন্থা বের করতে লাগলেন। দরিদ্র লেখক শিক্ষকচাচার খরচ বাঁচানোর দিকে তাঁর ছিল প্রখর নজর। বাড়িটির অবস্থান করলেন একেবারে সামনে। পরে যদি নতুন বাড়ি হয় তার জন্যে পেছনে যথেষ্ট ফাঁকা জায়গা ছাড়লেন। সামনের বারো ফুট রাস্তার পর পাঁচ ফুটের মতো ফাঁকা। তারপর প্রায় পাঁচ ফুটের মতো লন। এই লন আবার জমির তল থেকে আড়াই-তিন ফুট উঁচু, যা মাটি দিয়ে ভরানো হয়। এই মাটি আসে দেয়ালের জন্যে কাটা খাতের মাটি থেকে অর্থাৎ ভিত থেকে। বাড়ির পশ্চিমে চৌহদ্দির চার ফুট রেখে কুড়ি ফুট দৈর্ঘ্য ও দশ ফুট প্রশস্ত একটি টানা কামরা, এটি বসার ঘর। পুবমুখী। আর শোবারঘর, দক্ষিণমুখী দুটি কামরা, প্রায় এই কামরার সমতুল্য। মাঝখানে তিন ফুট বারান্দা। পশ্চিমের কামরাটি পশ্চিমে উঁচু, পুবে ঢালু – আর শোবারঘর পুবে উঁচু, পশ্চিমে নিচু। মাঝখানে একটা টিনের ডোঙা দিয়ে বৃষ্টির জল বের করে দেবার ব্যবস্থা। পাকা ছাদের খরচ বাঁচানোর জন্যে ওপরে টিনের চালা। আর এই স্থাপত্যরীতি বাংলায় প্রায় সর্বজনীন অবস্থার সামান্য উন্নতি হলেই নিুবিত্ত মানুষ এ-রীতি অনুসরণ করে। বিশেষ করে গ্রামবাংলায় এবং শহরের নিুমধ্যবিত্ত পড়ে এই পর্যায়ে।
বসার ও শোবারঘরের পর প্রয়োজন রসুইঘর। দুই ঘরের মাঝের বারান্দা টানা এগিয়ে গেল উত্তরে প্রায় আট-দশ ফুট, তারপর তৈরি হলো রান্নাঘর। এখানে ছাদটি পাকা এবং ছাদ নিচের দিকে হেলানো, অর্থাৎ পশ্চিমদিকে ঢালু। আর এর পরের শোবারঘরটির ছাদ হলো পুবদিকে ঢালু। এখানে কনসেপ্টটা এরকম যেন দুটি পায়রা – একটি ওড়ার জন্যে পাখা মেলছে শূন্যে… অন্যটি মাটিতে পাখা গুটিয়ে অবস্থান নিয়েছে। অর্থাৎ একটি সচল, অন্যটি নিশ্চল। জীবনের গতিময়তা ও স্থিরতার প্রতীক। বাড়ি তৈরির পর পুরো পাড়ায় এই বাড়ির নাম হয়ে গিয়েছিল আয়নাবাড়ি। কারণ সারা দেয়ালজুড়ে শুধু জানালা, পুরো কামরা আলোয় ভরে দেওয়া যায়। আবার ইচ্ছা হলে পর্দা টেনে আঁধার বা আলো-আঁধারি। অনেকে অবশ্য আমাদের এ-বাড়ির নাম দিয়েছিল ‘ওটেন সাহেবের বাংলো’ – বাবার প্রথম প্রকাশিত ছোটদের গল্পগ্রন্থের নাম ছিল ওটা। খরচ কমানোর জন্যে মজুভাই আরো একটা ব্যবস্থা নিলেন গাঁথুনির ক্ষেত্রে : পিলার বা থাম করা হলো দশ ইঞ্চির, আর দেয়াল হলো তিন ইঞ্চি। অর্থাৎ ইট আড়ে খাড়াইভাবে স্থাপিত হলো। এরকম গাঁথুনি আমরা আগে কখনো দেখিনি। এখানে আরো একটা তথ্য দেওয়া ভালো, এই বাড়ি তৈরির পুরো ইট উপহার দিয়েছিলেন জাফরচাচা, কবি সিকান্দার আবু জাফর। তাঁর তখন ইটের ব্যবসা ছিল। ইটের গায়ে ছাপ ছিল এবিসি – ইংরেজিতে। ইট ছিল এক নম্বর – নিটোল, ভালো পোড়ানো। সব ইটই দেখেছি নিখুঁত। টিনের চালার খরচ ঠেকাতে ভেতরে ছিল হার্ডবোর্ডের সিলিং। গরিবিহালে অত্যন্ত রুচিকর একটি ঘর। মোমেনবাগে ঢুকলেই আমাদের ঘরটি সবার নজর কাড়ত।
ছাদের টিনের চালাটি ছিল দুই ইঞ্চি পুরু কাঠের তক্তার ওপর। এই তক্তা ছিল পিলারে বোল্ট দিয়ে আটকানো, কিন্তু চালাটি বাঁধা ছিল তুলনামূলকভাবে দুর্বল তার দিয়ে। আমি আর মা বাবাকে একদিন বললাম যে, বাঁধনটা কি একটু দুর্বল নয়? বাবা জবাবে বললেন, মজুচাচা বলেছেন ঝড়ে যদি কখনো ছাদ উড়ে যায়, তখনো দেয়ালের কিছু হবে না, শুধু ছাদ উড়ে যাবে। কথাটা যথার্থ। কিন্তু স্থায়িত্বের কথা চিন্তা করলে বাধে।
ষাটের দশকে ঢাকায় খুব সাইক্লোন হতো। ১৯৬৬-র দিকের কথা। বর্ষার এক রাতে খুব জোর সাইক্লোন বয়ে যেতে লাগল। সন্ধ্যা থেকে ঝড়ের বেগ ধীরে ধীরে বাড়ছে। রাত ১১টার দিকে ঝড় প্রবল বেগ ধারণ করল। ছাদ থরথর করে কাঁপছে। ভেতরে আমরাও কাঁপছি ভয়ে। মা তো প্রায় কান্নাই জুড়ে দিলেন : আজ আর কোনো উপায় নেই, ছাদ উড়ে যাবে। আমি সাহস দিই, ভয় পাবেন না, একটু পর ঝড় কমে যাবে। মায়েদের মনে বিপদের আভাস মনে হয় সবসময় আগে আগে পৌঁছোয়। আমাদের কথোপকথন শেষ হওয়ার পাঁচ মিনিটের মধ্যেই ঘটল ব্যাপারটা। হঠাৎ প্রবল ঝাঁকুনি দিয়ে পুবদিকে উঁচু হয়ে থাকা ছাদ উড়ে গেল। পাশের বাড়ির লনে পড়ল প্রবল শব্দে। আমরা পাশের বসারঘরে সরে যাই। মাথার ওপর হার্ডবোর্ডের ছাউনি আছে। তাই তখনই টের পাওয়া যায়নি। কিন্তু মজুভাইয়ের কথাই ফলল। ছাদ উড়লেও দেয়ালের কিছু হয়নি। আর সত্যি বলতে কী, পালকের মতো উড়ে গেছে ছাদ। পরদিন সকালে দেখলাম বাড়ির সবকিছু ঠিক আছে, শুধু টিনের ছাদটি পাশের বাড়ির লনে দুমড়ে-মুচড়ে পড়ে আছে। টিনগুলো খুলে আর পুনঃস্থাপন করাও যাবে না, এমনভাবে মুচড়েছে।
বাবা তখন লন্ডনে। আমরা এই ছাদে আর টিন ব্যবহার করার ভরসা পাইনি। ঢালু আকার রেখেই পাকা ছাদ করে নিই। এই সময় বাবা ও মজুভাইয়ের বন্ধু প্রকৌশলী মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ সাহেব, সব ব্যবস্থাপনা নিজ হাতে তুলে নেন। আমি তখন হেনরি লুইস মর্গানের অ্যানসিয়েটি সোসাইটি বইটি অনুবাদরত… বাংলা একাডেমীর কাজ… এর পারিশ্রমিকের অনেকটা আবু জাফর শামসুদ্দীনচাচা ব্যবস্থা করে দেন। বিপদের সময় সবাই সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন। আমরা মজুভাইয়ের নকশার কোনো রদবদল করিনি। অনেকে বলেছিল, পাকা করছই যখন সমতল করে নাও, পরে দোতলা করতে পারবে। আমরা মজুভাইয়ের কাজে হাত দিতে চাইনি। তিনি আমাদের দেশে স্থাপত্যের আধুনিক রীতির রচয়িতা, তাঁর প্রতি আমাদের শ্রদ্ধা অপরিসীম। তাছাড়া বাবার অনুপস্থিতিতে এটা করাও শোভন হবে না ভেবে পরিবর্তন থেকে বিরত হই। তাই আমাদের মূল বাড়িটি দুটি উপাদানের নির্মাণ নিয়ে টিকে রইল। শোবারঘর পাকা, দক্ষিণমুখী, বসারঘর টিনের চালা, পুবমুখী। দেখতে দেখতে সয়ে গিয়েছিল বলে কখনো কেউ প্রশ্ন তোলেনি, দুটি চাল দুরকম কেন?
তিন ইঞ্চির দেয়াল আর দশ ইঞ্চির থাম, এই ছিল আমাদের ঘরের কাঠামোগত বৈশিষ্ট্য। আর দরজা ছিল গামারি কাঠের একপাল্লার। কয়েক বছর পর দরজা সামান্য নিচু হয়ে যাওয়ায় মেঝে ছোঁয়। এটা নিয়ে আমি ইত্তেফাকে একটি ব্যক্তিগত রস-রচনা লিখি। তাতে মজুভাইয়ের একপাল্লার দরজার কথা ছিল। লেখাটা তাঁর চোখে পড়ে। তিনি খুব ক্ষুব্ধ হন। বাবা আমাকে বলেন, এ-কথা কেন লিখতে গেলে! মজুচাচা বলেছেন, এ-বাড়িতে আর আসবেন না। আমি আত্মপক্ষ নিয়ে বলি, এটা তো একটা রস-রচনা… আসলে মিস্ত্রি ভুল করেছে। আমরা তো আর জানি না যে একপাল্লার দরজায় তিনটি কব্জার জায়গায় ওপরে দিতে হবে দুটি কব্জা, মোট চারটে কব্জা থাকলে পাল্লা নিচু হওয়ার সম্ভাবনা কমে। দরজায় ছিল তিনটি কব্জা। পরে এটি সংশোধন করা হয়। কিন্তু তীর বেরিয়ে গেছে।
এর কিছুদিন পর পহেলা বৈশাখে রমনায় মজুভাইয়ের সঙ্গে দেখা। মিষ্টি হাসলেন। বলি, মজুভাই কেমন আছেন? তিনি তাঁর স্মিত হাসিটি আরো দীর্ঘ করে বললেন, রসিকতাসহ, আপনি কেমন আছেন স্যার? তারপরই বললেন, আপনারা তো স্যার নন, ষাঁড়… তাঁর রসিকতায় বোকার হাসি হাসতে হলো।
এরপর শাহবাগে অবস্থিত চারুকলায় আমার চাকরি হলো। প্রবেশ করি মজুভাইয়ের নকশায় করা সবচেয়ে আলোচিত ভবনে। পাশে পাবলিক লাইব্রেরি, ওদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠাগার… একসময় এখানে নভেরা আহমদের ভাস্কর্যের প্রদর্শনী হয়েছিল… জায়গাটা আধুনিক স্থাপত্য ও ভাস্কর্যের সম্মিলনে বাংলাদেশের আধুনিক শিল্পকলার আঁতুড়ঘরে পরিণত হয়। ওদিকে টিএসসি, পারমাণবিক কেন্দ্র, বাংলা একাডেমী… সবটা নিয়ে এ-অঞ্চলটি ঢাকার সাংস্কৃতিক বলয়ের প্রধান অঙ্গ। এর বিপরীত দিকে ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন, তারপর সড়ক ভবনের পর শিল্পকলা একাডেমী কমপ্লেক্স। মাঝখানে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান, মহান মুক্তিযুদ্ধের স্মারক শিখা অনির্বাণ ও নির্মাণরত বিজয়ের ইতিহাসভিত্তিক কমপ্লেক্স… যেখানে কাচনির্মিত বিশাল স্তম্ভ অবস্থান করবে। এই অঞ্চল স্বাধীনতাযুদ্ধের যৌথ কমান্ড ও শত্রুসেনাদের আত্মসমর্পণের দলিলে দস্তখত-সমৃদ্ধ। নানা কারণে এই অঞ্চল ইতিহাসের অঙ্গ। এই জায়গায় বঙ্গবন্ধু তাঁর ঐতিহাসিক ৭ই মার্চের (১৯৭১) ভাষণ দেন। স্বাধীনতার পর এখানে তৈরি করা হয় কাঠের নৌকোর আদলে ইন্দিরামঞ্চ, যেখানে ইন্দিরা গান্ধী ১৯৭২ সালে ভাষণ দেন। এই অঞ্চলকে ইতিহাসের ক্রম অনুযায়ী সাজালে সেই ঘোড়দৌড় মাঠ থেকে শুরু করে শেষ ঘটনা পর্যন্ত বিন্যস্ত করলে অপূর্ব এক শিক্ষণীয় স্থান হয়ে দাঁড়াবে। বিশেষ করে স্বাধীনতা-উত্তর প্রজন্মের জন্যে।
শুনেছি, চারুকলা ভবন নির্মাণকালে অধ্যক্ষ জয়নুল আবেদিনের সঙ্গে ছোটখাটো সব ব্যাপার নিয়ে মজুভাইয়ের কিছু দ্বিমত হতো। প্রথমত, দোতলায় ওঠার সিঁড়িটা নিয়ে। মজুভাইয়ের মূল পরিকল্পনা ছিল এটা সোজা উঠিয়ে দেওয়া। আবেদিন সাহেব এটিকে পিলার ধরে বাঁকিয়ে দিতে বলেন, বর্তমান রূপটি আবেদিন সাহেবের সাজেশন অনুযায়ী নির্মিত। মূল ভবনের সঙ্গে যা মোটেই বেমানান হয়নি। বরং একটা স্বাচ্ছন্দ্য ও সাযুজ্য পাওয়া যায়।
শুনেছি, প্রশাসনিক ব্লকের পর শ্রেণিকক্ষের ভবনটি ছিল পৃথক। অর্থাৎ প্রতিটি ভবন এক একটি ব্লক। আবেদিন সাহেব দোতলার বারান্দাটি যুক্ত করে দিতে বলেন। এটি না হলে দোতলা থেকে একজনকে নেমে তবে আবার সিঁড়ি ভেঙে পাশের  শ্রেণিকক্ষের দোতলায় পৌঁছতে হতো। মজুভাই এই কাজটা  করে দিয়েছেন। তাঁর ঝোঁক ছিল আকার বা ফর্মের দিকে। আর আবেদিন সাহেব গ্রামীণ পটভূমিতে বেড়ে ওঠা মানুষ, জোর দিয়েছেন সহজিয়া কাজ উপযোগিতা বা ফাংশনের দিকে। এই দুই প্রতিভার মেলবন্ধে চারুকলা ভবনটি যথেষ্ট দর্শনীয় ও কার্যকারিতা পেয়েছে।
পরবর্তী স্থপতি-প্রজন্মের সবাই এটি পাঠ করতে আসত। আর এখনো স্থাপত্য অনুষদের ছাত্রছাত্রীরা এটা পাঠ করতে আসে। তবে এই দুই প্রতিভার পরস্পর লেনদেনের ইতিহাস তাদের নিশ্চয়ই জানা নেই।
এই ভবনের প্রশস্ত বারান্দা গ্রীষ্মপ্রধান দেশ ও ছাত্রদের চলাচলের সুবিধার জন্যে সুন্দর ব্যবস্থা। কিন্তু শ্রেণিকক্ষে শুধু উত্তরদিকে জানালা রাখায় চারুকলার অঙ্কনের বিষয়টিতে শুধু একদিক থেকে আলো আসার ব্যবস্থা করা হয়েছে। দক্ষিণ দিকে আছে দেয়াল ও খড়খড়ি দিয়ে বায়ু চলাচলের ব্যবস্থা, আলো চলাচল বন্ধ। তাই বিষয়বস্তুকে প্রাকৃতিক ভিন্ন আলোকে দেখানো সম্ভব হয় না, যা শিক্ষার্থীদের জন্যে অতটা স্বাচ্ছন্দ্যের নয়। তবে আজকাল কৃত্রিম আলোকে এই অবস্থার পরিবর্তন করার ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে।
এছাড়া দেয়ালের জানালাগুলো মানুষের মাথার ওপরে অবস্থিত। অঙ্কন বিভাগের নিচতলাতেও সেই একই অবস্থা। হঠাৎ ঝড়-বৃষ্টি এলে বন্ধ করা মুশকিল। একজনকে চেয়ার বা টুল এনে উঠে তবে বন্ধ করতে হবে। মজুভাই আবেদিন সাহেবের সাজেশনগুলো মেনেছেন, যদিও খুব একটা সহজভাবে নিতেন না।
চারুকলা ভবনটি রকফেলার ফাউন্ডেশনের অনুদানে নির্মিত। তাই সবকিছুতে মূল্যবান উপাদান ব্যবহার করা হয়েছে। একপাল্লার সেগুন কাঠের বড় বড় দরজা। জানালায় পেতলের প্রায় তিন ফুট দীর্ঘ ছিটকিনি। কোথাও কোনো কার্পণ্য করা হয়নি।
১৯৪৮ সালে চারুকলার ক্লাস শুরু হয় পুরনো ঢাকায় জনসন রোডে ন্যাশনাল মেডিকেল কলেজের মাত্র দুটি কামরায় ১২ জন ছাত্র নিয়ে। তাঁদের মধ্য থেকে যাঁরা পরবর্তীকালে অধ্যক্ষ হয়েছিলেন তাঁরা হলেন সৈয়দ শফিকুল হোসেন ও আমিনুল ইসলাম। শাহবাগে নতুন ভবনটির নির্মাণ শেষ হয় ১৯৫৭ সালে।
১৯৫৭ সালের জানুয়ারি থেকে পাঠ শুরু হয় এ-ভবনে। আমি যখন ১৯৬৬ সালে শিক্ষকতায় যোগ দিই তখন এই ভবনের বয়স এক দশক। বলতে গেলে তখনো নতুনই। এতো চমৎকার একটি আধুনিক ভবনে চাকরি করার সুযোগ পেয়ে নিজেকে ধন্য মনে হয়।
১৯৬০-এর দশকে রাষ্ট্রীয় সফরে পৃথিবীর নামি সব রাষ্ট্রপ্রধানের প্রোগ্রামে দর্শনীয় বস্তুর মধ্যে ঢাকার চারুকলা সব সময় ছিল অপরিহার্য। মজুভাই তৈরি করে দিয়ে গেছেন আমাদের সেই গর্বের ভবনটি।
পাজামা-পাঞ্জাবিপরিহিত একহারা চেহারার মজুভাই ছিলেন একজন নিপাট বাঙালি। মৃদুভাষী, কিন্তু যা বলার বলতে একটুও কুণ্ঠা করতেন না। নিজ সম্প্রদায়ের পশ্চাৎপদতা তাঁকে খুব পীড়িত করত। তাই শেষজীবনে ‘চেতনা’ বলে একটি ফোরাম করেছিলেন। দেশের মানব-উন্নয়ন ছাড়া যে দেশকে এগিয়ে নেওয়া যাবে না, এটা পরিষ্কার বুঝেছিলেন। তাই শুধু স্থপতিশিল্পী হয়ে মন ভরত না, মানুষ গড়ার জন্যে সচেষ্ট ছিলেন সবসময়। ক্ষুদ্র  পরিসরে তাঁর সম্বন্ধে কতটুকু বলা যায়! বারান্তরে আরো কথা বলার আছে।

শেয়ার করুন

Leave a Reply