গোলাপ নির্মাণের গাণিতিক

লেখক:

আবু হেনা মোস্তাফা এনাম

গোলাপ পুষ্পকুঞ্জ রক্তিম হয়ে উঠবার আগেই আমরা, যে প্রতীক্ষা আর বিস্ময়ের ভেতর উন্মীলিত, গোলাপ ভালোবেসেছিলাম; আর গোলাপের দ্যুতিময় অভ্যুদয়। গোলাপের জন্য আমাদের প্রতীক্ষা, গোলাপের উন্মুখতার ভেতর অপার বিস্ময়। আমরা আমাদের অস্তিত্বের স্তব্ধতা এবং কখনো চাপা উলস্নাসের ভেতর নীল আলোর ঐকতানে চোখ মেলে দেখি, আর অভূতপূর্ব রোমাঞ্চে শিহরিত নিশ্বাসের গণিতে মেশে নিগূঢ় চন্দ্রদগ্ধ গোলাপের ঘ্রাণ। কীভাবে আমরা এবং আমাদের একক জীবন গোলাপের ঘ্রাণের ছায়ার ভেতর ঘ্রাণের বিস্ময়ে গোলাপের জ্যামিতির ভেতর লালের নিঃশব্দ তিলোত্তমায় অদ্বিতীয় লৌকিক হয়ে উঠল – তা আমাদের গাণিতিক ও প্রকৌশলবিদ্যা আয়ত্ত করতে পারেনি, আমাদের রাষ্ট্রবিদ্যা এবং অর্থবিজ্ঞানও আবিষ্কারে ব্যর্থ। কেবল, উৎফুলস্ন ঘুমের নীলকুঞ্জে নৈশফুলের কুহেলিকায় আমাদের শরীর আবৃত হয়ে যায়, তখন গোলাপনিকুঞ্জ আমাদের হৃৎপি– আর রক্তের ছায়ার ভেতর গন্ধগ্রাহী মর্মরিত মেঘশাবকের উৎফুলস্ন আকাশ দেখে, কুয়াশার হৃদয় দেখে, বাতাসের সবুজ দেখে। অতঃপর আমরা দেখি গোলাপপ্রতিবিম্বিত উজ্জ্বল একটি সূর্যের সূচনা, সময়ের সূচনা দিকচক্রবালের নির্লিপ্ত হৃদয়ে, বৃক্ষির হৃদয়ে; গ্রামের ধূলিপথের জ্ঞান ও পৌরাণিকের ভেতর আজো একটি দিন, এখনো দিন। হরিৎ নীহারিকা মস্নান হয়ে এলে তখন দিনের আকাশ, আকাশের মর্মরিত কুয়াশাপ্রস্ত্ততির ভেতর আমাদের গৃহপ্রাঙ্গণে আচমকা একটা গোলাপের চারা অঙ্কুরিত হয়ে ওঠে। তখন দিনের ভেতর কত-কত বিস্ময়; দিনের প্রাচীনতার ছায়ায় একটি নদীর প্রজ্ঞা, সূর্যের মিতাক্ষরা গুঞ্জরন; দিনের ভগ্নাংশে রাতের নিভৃতি এবং গোলাপের নিঃশব্দ লাল দীপান্বিত। আমরা এই জ্ঞানের ধারাপাত এবং মেঘের প্রাচীন তিলোত্তমার ভেতর ফুলের প্রহেলিকা নিয়ে গ্রাম নির্মাণ; আমাদের জলাধারে, ধূলিপথে, নির্জনতায়, বৃক্ষি, পাখির শিল্পে, গৃহের শিল্পে, জানালা-দরজায়, পোশাকের শিল্পে, উঠোনের শিল্পে, কথার শিল্পে, কবিতার শিল্পে, চিত্রাঙ্কনে গোলাপ নির্মাণের নিষ্কলুষ পরিসীমা।

 

আমাদের নিদ্রা ও জাগরণে দিনের এসব বিস্ময় অঙ্কুরিত হতে থাকে; কেননা আমরা দেখি কুয়াশার গোপন অভিনিবেশে রাত প্রস্ফুটিত, ঋতু প্রস্ফুটিত, নদী প্রস্ফুটিত, বৃক্ষ প্রস্ফুটিত, আলো প্রস্ফুটিত, শস্য এবং পতঙ্গ প্রস্ফুটিত, জন্ম প্রস্ফুটিত, মেঘ প্রস্ফুটিত – এসব বিবিধ প্রস্ফুটনে আমাদের বিদ্যালয়গামী জ্ঞান মেঘের জন্মবৃত্তান্ত মুখস্থ করে। বহমান সময়কে নদীর স্রোতের সঙ্গে তুলনা করে আমরা গ্রামের চতুর্দিকে নদী রচনা করি; নদীর প্রজ্ঞা, নদীর স্মৃতিলিপি, নদীর নির্লিপ্ত কণ্ঠস্বরের ভেতর যাপন করি আর মেঘদল নদীর হৃদয়ে বিবিধ রং বিন্যাস করলে মেঘের জ্যোতির্জ্ঞান আবিষ্কৃত হয়; আমরা নদীর অমত্মঃশীলায় দেখি নক্ষত্রের পদধ্বনি, দেখি নিদ্রাশিকারি কুয়াশাগুঞ্জন, দেখি বৃক্ষির শৈশব, দেখি মাটির শৈলী। নদীর প্রব্রজ্যায় উলস্নসিত মেঘে আমরা যাপন করি, নদীর প্রতীক্ষায় যখন আমাদের বৃক্ষশৈশবের উদ্ভাস – মেঘের গ্রীবায় আমরা রঙের বিপ্রলুব্ধ প্রমিতি দেখি; আমাদের দিকচক্রবালে পুষ্পের মন্থরতা, ঘাসের ব্যঞ্জনা; তখন আমাদের পুষ্পের অনুধ্যান, পুষ্পের জন্য প্রতীক্ষা, পুষ্পের জন্য ধূলিজীবনের চর্চা। এই জীবনী-জ্ঞানের সাধনায় আমরা আমাদের গৃহকুঞ্জবাসী শিশুদের বর্ণমালা পরিচয় পুস্তকে রঙিন পুষ্পচিত্র হৃদয়ে ধারণ করি। এসব পুষ্পধ্যান এসব পুষ্পবর্ণমালা পরিব্যাপ্ত ও মর্মরিত মেঘের ভেতর রাতের বেগুনি

নিভৃতি; মেঘ যদি প্রত্যুষের নীল অভ্যুদয়, সেখানে আমাদের বালকবেলার জ্যোতির্ময় গল্পের চঞ্চলতা উন্মুখ। এসব বালকিত চঞ্চলতার ভেতর আমরা মেঘ ও নদীর কাছে অঙ্কুরিত বীজের জ্ঞান রপ্ত করি; যেখানে বৃক্ষির বাস্ত্ততন্ত্র, বৃক্ষির উন্মীলন, বৃক্ষির শিল্প, বৃক্ষির দিনপঞ্জি। আর বৃক্ষির বিবিধ দিনপঞ্জির প্রতীক্ষা ও প্রজ্ঞার ভেতর পাখি এবং পতঙ্গের ভ্রমণশিল্প গাণিতিক হয়ে ওঠে – এই ভ্রমণ মেঘ ও নদীর ছায়াগন্ধগ্রাহী পরিপ্রেক্ষিত, এই ভ্রমণ প্রসূনপ্রহেলিকাময় শিল্পের প্রতিবিম্ব; কেননা এসব পাখি এবং কুয়াশার নির্লিপ্ত নৈশজোনাকিদের হাড়ে, মৃত আলোর বিষণ্ণ স্পন্দনে আমাদের বালকগ্রামে ভেসে ওঠে মুকুলকুসুমিত পথ।

যদিও আমাদের গ্রামের পাখি ও পতঙ্গ জানে না রাষ্ট্রতন্ত্র, জানে না অর্থতন্ত্র, বয়নতন্ত্র বা জানে না পরমাণুতন্ত্রের জ্ঞান; পাখিরা জেনেছিল নদীর জীবনী, মেঘের জীবনী, আকাশের জীবনী, খড়ের জীবনী, বৃক্ষির জীবনী; কেননা যখন খড় মৃত এবং সোনালি, তার হৃদয়ে মেঘ ও নদীর সবুজ কুহেলিকা অমোঘ; তখন পাখি ও পতঙ্গ জানে বৃক্ষকুঞ্জে ছায়া গুঞ্জরিত গৃহবৃত্তান্ত, দর্পিত উলুখড়ের নিঃশব্দ। পাখি ও পতঙ্গের এই জ্ঞানের মর্মার্থ ও পৌরাণিকের ভেতর আমাদের শরীর হৃদয় ও বাক্যকে আচ্ছন্ন ও রোমাঞ্চে শিহরিত করে। আমাদের কৈশোরক বাক্যের উদগ্রীব প্রতীক্ষার ভেতর একটা মৃদু অথচ তীব্র রূপান্তর – পাখির বৃক্ষজ্ঞান, পাখির গৃহজ্ঞান, শিল্পজ্ঞান, পুষ্পজ্ঞান, ঋতুজ্ঞান আমাদের বাক্যে প্রবেশ করে, নিশ্বাসে প্রবেশ করে, দৃশ্যে প্রবেশ করে, পাঠ্যপুস্তকে প্রবেশ করে, রন্ধনশিল্পে প্রবেশ করে, নিদ্রায় প্রবেশ করে, জাগরণে প্রবেশ করে, সূর্যে প্রবেশ করে, নক্ষত্রে প্রবেশ করে, আমাদের যৌনতায় প্রবেশ করে, আমাদের জন্মে প্রবেশ করে, আমাদের মৃত্যুর আলোয় প্রবেশ করে। তখন আমাদের রক্ত ও শীতে, দিবস ও উৎফুলস্ন ঘুমের নীলকুঞ্জে ঢুকে পড়ে গোলাপ ফুলের লাল গন্ধ। সময়ের গাণিতিকে সেই নির্দোষ নিষ্কলুষ জন্ম, কত না ঐন্দ্রজালিক বিস্ময়ে মোড়া, আর নির্ভয়-নির্ভরতা, আনন্দ ও বেদনার মুহূর্ত, আচমকা কত পরিবর্তন, কত স্মৃতিকাতর উপলব্ধি, কত অশ্রম্নর প্রতিধ্বনি – এমন গোলাপজন্মের আচ্ছন্নতা কী যে অমস্নান; ক্রমেই সমূহ লৌকিকতা থেকে দূরে তার পরিত্রাণ – এবং এমনই যে গৃহ ও গ্রামজীবনের যাবতীয় সবুজতা, নদী ও মেঘের নীলাভ্রবিকিরণকে গোলাপের হৃদয় জয় করেছিল। ফলে আমাদের বালকরক্তের ছায়া গোলাপের নিঃশব্দ লাল তথা মাটির ছায়ামর্মরিত বৃক্ষসূচিস্বভাব; এই তবে – দিনের গ্রামশিল্পে, রাতের গ্রামশিল্পে, গ্রামের অর্থশিল্পে, অনর্থশিল্পে, পোশাকশিল্পে, গৃহশিল্পে অঞ্জলিবদ্ধ গোলাপের জ্ঞান আমাদের ভেতর তখন বিনয়ের প্রজ্ঞাময়তা বিস্তার করে চলে।

এমন যে, গোলাপের লালের ছায়ায় আমাদের হৃদয় রূপায়িত, গোলাপের ইশারায় তিলোত্তমা চন্দ্রালোক, গোলাপের ঘ্রাণে আমাদের যাবতীয় শরীর চিত্রকল্প – এমত গোলাপ পাঠের ভঙ্গিতে আমরা পাখিদের আত্মজীবনী আবৃত্তি করি; দেখি গোলাপের দিনপঞ্জি, দেখি গোলাপের রাতপঞ্জি, গোলাপের ভূগোলপঞ্জি; দেখি কুয়াশায় গোলাপের জন্মপ্রস্ত্ততি, ছায়াপ্রস্ত্ততি, বয়ঃসন্ধিপ্রস্ত্ততি। আমাদের বিস্ময় রূপায়িত যে – আমাদের মেঘ, নদী, বৃক্ষ, পাখি, পতঙ্গ, গৃহবিন্যাস এমন আশ্চর্যে প্রতিবিম্বিত যে – আমাদের গ্রামের এসব ভূগোল ও প্রাকৃতিকে আমরা গোলাপের চাষ করি। আর, ক্রমেই এমন যে, আমাদের গ্রাম হয়ে ওঠে গোলাপের গ্রাম, গোলাপের পর্যটন। তখন, আমাদের হৃদয়ে বাক্যপ্রস্ত্ততি চলে, যখন, পৃথিবীকে অন্ধকারে অযাচিত করেছিল; আমরা গোলাপের সেই গোধূলিবাক্যের স্বরলিপি বীক্ষার ভেতর পুষ্পগুঞ্জরনে প্রবেশ করি।

এখন, এমন উন্মুখতা যে, আমাদের গ্রামের গল্প ছড়িয়ে পড়ে গ্রামের পর গ্রাম, এবং গল্প ছড়িয়ে পড়ে নগর থেকে পৃথিবীর সহস্র গ্রামে ও নগরে, অতিক্রান্ত জনপদে। আমাদের গৃহের দেয়ালচিত্রে গোলাপের বিন্যাস, পাপড়ির গেস্নসিয়ার গৃহের জানালার আয়নায়, অথবা জলাধারে বিচূর্ণ গোলাপের গন্ধে পৃথিবীর বিবিধ প্রান্তের লোক আসে। এসব আগন্তুককে পেয়ে আমরা উলস্নসিত হই, আমাদের রক্তের ভেতর ছায়াগন্ধগ্রাহী গোলাপের নিঃশব্দ অভিনিবেশ দীপান্বিত হয়ে ওঠে। আমাদের প্রপিতামহের প্রপিতামহ অথবা এসব বিবিধ প্রাচীনদের সমাধিফলকে গোলাপের এপিটাফ পড়ে আমরা ছায়ার অন্তরে প্রবেশ করি, গ্রামের হৃদয়ে প্রবেশ করি, বৃক্ষির জ্ঞানে প্রবেশ করি। এসব ছায়াকর্ম, গ্রামকর্ম, বৃক্ষকর্ম আর বনস্পতির ঐশ্বর্যে গোলাপের কণ্ঠস্বর ছুঁয়ে আমরা পৃথিবী ও গোলার্ধের জ্ঞান লাভ করি, আমরা পাতালপুঞ্জ ও জ্যোতিষ্কম-লীর ভাবুকতা লাভ করি; এবং আমাদের এই জ্ঞান হয় যে, আমাদের গ্রামেরও আছে পাতালপুঞ্জ, আছে নীহারিকাদৃশ্য, আছে বৃক্ষির অভিজ্ঞান, আছে ভাষার মনস্বিতা ও দর্শন। আমরা নদীর কাছে গমন করি, দেখি নদীর হৃদয়ে সহস্র নৌকায় বয়ে চলেছে গোলাপের পাপড়ি। আমরা মেঘের উপকণ্ঠে বর্ণনা করি গোলাপের জীবনী, যেন আমাদের গ্রামের সকলেই আরিস্ততল আর পৃথিবীর সমস্ত মানুষ মুগ্ধ থিওফ্রেস্টাস। আর আকাশে ভেসে বেড়ায় গনগনে কয়লার আগুনে পোড়ানো গোলাপপাপড়ির ধোঁয়া। অথবা আমাদের যকৃতে ব্যামো হলে, আমাদের গৃহের নারীরা চিনিমিশ্রিত গোলাপের চূর্ণপাপড়ি খেতে দেয়, আর গোলাপজলে শরীর রূপায়িত হলে আমাদের রন্ধনশিল্পে গোলাপের পরিচর্যা। ফলে আমাদের ঘাম ও নিশ্বাস গোলাপগন্ধে ভরপুর।

তখন, ঋতুতে-ঋতুতে যখন বৃষ্টিপ্রস্ত্ততি, রৌদ্রের উজ্জ্বল, মেঘপুঞ্জ অথবা ছায়াগুঞ্জরিত; নদীর গর্ভকোষ আর প্রত্নসভ্যতার প্রকীর্তি ছুঁয়ে-ছুঁয়ে, আগন্তুকেরা আসে আমাদের গ্রামে। তারা মেঘের জ্যামিতি দেখে, বৃক্ষির কৈশোর দেখে, পতঙ্গের যৌনতা দেখে। আগন্তুকেরা আমাদের গ্রামে অতিথি হলে আমরা তাদের বসতে দিই গোলাপবিছানায়। তারা দেখে তাদের রাতের আহারে চূর্ণ পাপড়ির নন্দন, দিনের আহারে চূর্ণ পাপড়ির পৌরাণিক। আগন্তুকেরা আমাদের গ্রীষ্মের গল্প শোনে, আমরা শরতের গল্প বলি; আগন্তুকেরা আমাদের বর্ষার গল্প শোনে, আমরা হেমন্তের ধ্যান করি; তারা আমাদের শীতের সংগীত শোনে, আমরা বসন্তের বিহঙ্গগান সন্ধ্যাপ্রসূনে উড়িয়ে দিই। এভাবে আগন্তুকেরা আমাদের যাবতীয় ঋতুর পরিচয় পেলে তারা আমাদের মেঘের অন্তরের সন্ধান করে, তারা আমাদের নদীর গ্রন্থ পাঠ করে, মাটির নির্মাণশৈলী খোঁজে; পাখি, পতঙ্গ, বৃক্ষির জীবনী পাঠে তাদের অন্ধকারকে অযাচিত করে। তাদের মনে হয় – আমাদের গ্রামের হৃদয় গোলাপের ঐশ্বর্যে জ্যোতির্ময়, গ্রামের রং গন্ধ ছায়া আর আমাদের শরীরের সমস্ত রূপায়ণ গোলাপের পৌরাণিক শেস্নাক। আর, তারা বলে – আমরা লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি অথবা রাফায়েল অথবা মিকেল অ্যাঞ্জেলো অথবা বোতিচেলিস্ন। আমরা বলি – আমাদের রয়েছে কাংড়া কলমের শিল্প অনুধ্যান, আমাদের আছে প্রাচীন মেঘের পুরস্কার, আছে অষ্টসাহস্রিকা প্রজ্ঞাপারমিতা। আগন্তুকেরা, অতঃপর, আমাদের গোলাপ বিনিময় করতে চায়। তারা বলে, গোলাপ তাদের মনোরঞ্জন; তারা বলে, পাতালপুঞ্জে সমস্ত গোলাপের পরমাণুবিদ্যা তাদের ঐশ্বর্য; তারা বলে, তাদের আবিষ্কার ও যুদ্ধের বাণিজ্যে গোলাপ নতুন এক দার্শনিকতা; তারা বলে, গোলাপই একমাত্র কাঁটার সম্প্রসারণ; তার রয়েছে সভ্যতাহন্তারক, তার রয়েছে স্বপ্নহন্তারক, তার রয়েছে প্রজ্ঞাহন্তারক, শস্যহন্তারক, স্মৃতিহন্তারক। তাদের একটি আকাঙক্ষা আমাদের গ্রামের নদী, সমুদ্র, বনস্থালির দিকে; তাদের একটি ভালোবাসা আমাদের গ্রামের মেঘ, বিদ্যুৎ, নক্ষত্রের দিকে; তাদের একটি কামনা আমাদের গ্রামের পাখি, পতঙ্গ, বৃক্ষির দিকে; তাদের একটি প্রত্যাশা আমাদের গ্রামের মাটি, বাতাস, বৃষ্টির দিকে; তাদের একটি অগ্নিদৃশ্য আমাদের গ্রামের পাতাল প্রণালীর দিকে; তাদের একটি মুঠি আমাদের গ্রামের ঋতুর দিকে; তাদের একটি শ্রম্নতি আমাদের গ্রামের শস্যের নামতার দিকে; তাদের একটি পা আমাদের গ্রামের বীজের ছায়ার দিকে; তাদের একটি কণ্ঠ আমাদের গ্রামের নারীর উন্মুখতার দিকে; তাদের একটি রাষ্ট্রতন্ত্র আমাদের গ্রামের আলোকসম্ভাবনার দিকে; তাদের একটি অভিনিবেশ আমাদের গ্রামের পুষ্পবিদ্যার দিকে – আগন্তুকদের এসব বিবিধ আকাঙক্ষার অনুবাদ আমাদের আনন্দপ্রস্ত্ততি এবং সহজতা দ্বিধান্বিত করে, আমরা সংশয়ে যাপন করি।

এসব দ্বিধা ও সংশয়ে আমাদের গোলাপগ্রাম পৃথিবীর রাষ্ট্রতন্ত্র এবং সমাজের ভৌগোলিক থেকে বিচ্যুত হয়ে পড়ে। তবু আমরা গোলাপবিদ্যা এবং গোলাপের জীবনবৃত্তান্ত কখনো প্রকাশ করি না, অথবা আমাদের পরস্পরের মধ্যে সন্দেহ সূচিত হয় – কেউ হয়তো গোপন অভিলাষে গোলাপের সহস্র ব্যঞ্জনা, সহস্র নিগূঢ়তা বিষয়ে পরিহাস করে, অথবা আমাদের বাক্য ও বৃষ্টি বিষয়ে; শস্য ও পতঙ্গ বিষয়ে; নদী ও পাখি বিষয়ে আমাদের জ্ঞানহীনতার কথা বলে। কিন্তু এসব বিষয়ে অজ্ঞতা হলে আমাদের প্রেম থাকে না, প্রজ্ঞা থাকে না, পুরাণ থাকে না, প্রাচীন থাকে। আমাদের এই বোধ জাগ্রত হয় যে, গোলাপ না থাকলে আমাদের ঘুমের নীলকুঞ্জ থাকে না; গোলাপ না থাকলে আমাদের শরীর থাকে না; গোলাপ না থাকলে শরীরের আকাঙক্ষা থাকে না, শরীরের গ্রীষ্ম থাকে না, গ্রীষ্মের প্রস্ত্ততি থাকে না; শীত থাকে না, শীতের অধীর ওষ্ঠস্মৃতিশাস্ত্রের ভেতর অজস্র পুষ্পঅভিনিবেশ দ্বিধান্বিত হয়। তখন আমরা গোলাপের ঘামের ভেতর যৌনপ্রস্ত্ততির গন্ধে সকল সম্ভাবনা নিদ্রার অতলে পরিত্রাণহীন; তখন আমরা গোলাপের ত্বক, ঊরু, জঙ্ঘা, স্তন, চিবুক হারিয়ে ফেলার শঙ্কা; তখন রক্ত ও মগজের ভেতর ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ গোলাপের বাক্যস্রোত ছুটে চলে, মগজের মধ্যে অমোচনীয় গোলাপবিদ্যুৎ জ্বলে ওঠে আর করোটিউৎসারিত স্বতঃস্ফূর্ত উলস্নাসে অবিরল বাক্যস্রোত পরিহাসিত গুহার স্তব্ধ অন্ধকার চিরে উৎক্ষিপ্ত হয় হরিৎ নীহারিকায়। তখন, আমাদের মধ্যে যারা চিরস্থায়ী বন্দোবসেত্ম সহস্র নৌকায় বিপণন করতে চেয়েছিল গোলাপের সমূহ, আমরা দেখি তারা গোলাপবিদ্যা জানে না। আমরা জানি যে – আমাদের গোলাপ, নদী, মেঘ, পাখি, পতঙ্গ, বৃক্ষ এবং বাক্যের মনস্বিতা রাষ্ট্রতন্ত্রের পরিপ্রেক্ষিতে অবাঞ্ছিত, সমাজ ও গণিতশাস্ত্রে অচ্যুত, বাণিজ্য ও গৃহের ব্যাকরণের বাইরে। তখন আমাদের বাক্য ও শব্দপুঞ্জের ভেতর বাক ও বাক্যশূন্য আগন্তুকের দল গোলাপ কিনতে এলে আমরা গোলাপের ভেতর। আমাদের শরীর আর বাক্যের বৈদূর্য গোলাপ হয়ে এলে গোলাপের লালের ভেতর আমাদের মুখ হারিয়ে যায়।

আর আগন্তুকের দল দেখে মাঠের পর মাঠ গোলাপবাগান দুমড়েমুচড়ে একটি বিকট কালো গহবরের অধঃক্ষিপ। দেখে গোলাপসূর্য মানুষের জাগতিক স্মৃতি এবং ভবিষ্যৎ থেকে সমস্ত মাঠ এবং গোলাপবাগানের চিহ্ন বিলুপ্ত করে দিচ্ছে। দেখে ধু-ধু কৃষ্ণগহবরে পড়ে রয়েছে কেবল বাতাসের করোটি, একটি উজ্জ্বল আলোর অস্থি আর এক মুঠো দোআঁশ মাটি।

অতঃপর আগন্তুকেরা গ্রামের পথের ভেতর প্রবেশ করে, গ্রামের ছায়ার ভেতর প্রবেশ করে। কিন্তু পথই তাদের বিস্ময়, ছায়াই তাদের বিস্ময়! তখন আগন্তুকেরা দেখে গোলাপবাগান সারি-সারি বৃক্ষির আড়ালে, গৃহের আড়ালে, অনুরণিত বাতাসের আড়ালে, নদীর আড়ালে, মেঘের আড়ালে। কিন্তু সমস্ত আড়াল তাদের বিস্ময়, সমস্ত আড়াল তাদের দুঃপ্রবেশ্য, সমস্ত আড়াল তাদের বিভ্রম। কেননা আগন্তুকেরা দেখে গ্রামের সকল পথ একই রকম প্রশস্ত, একই বৃক্ষশোভিত, সকল পাখির একই উড়াল, একই বাতাসের দীর্ঘশ্বাস, সকল পথে একই গৃহশৈলী, গৃহের অভিন্ন দরজা-জানালা। অথবা আগন্তুকেরা কোনো গোলাপবাগান দেখে না; দেখে পথের অনতিক্রম্য চক্রব্যূহ; দেখে গ্রামের গল্পের টুকরো-টুকরো বাক্য ও চাপা হাসির ধ্বনি; দেখে একই রঙের বস্ত্রশিল্প, একই রঙের সুতাশিল্প, একই রঙের কথাশিল্প; দেখে প্রতিটি মানুষ সমান বয়সী, সকলেই যৌবনের আশ্চর্যে; প্রতিটি মানুষের চোখ-মুখ-চুল-যমজ সাদৃশ্যে উৎকীর্ণ। তখন আগন্তুকেরা ভুল কোনো গ্রামে পৌঁছেছে – এই সংশয় অতিক্রম করতে সকলকে গ্রামের পরিচয় জিজ্ঞেস করে। তাদের আশ্চর্য এই যে –  এখানে গ্রামের পরিচয়, পথের পরিচয়, বৃক্ষির পরিচয়, পাখির পরিচয়, পতঙ্গের পরিচয়, নদীর পরিচয়, মেঘের পরিচয়, ছায়ার পরিচয় একই বর্ণমালায় রূপায়িত। মানুষ, বৃক্ষ, পতঙ্গ, মেঘ, পুষ্পের প্রপিতামহ, পিতামহ অথবা মাতামহ এবং বর্তমানের যাবতীয় পরিচয় প্রতিভাত হয় সংগীত ও সুরের ধ্রম্নপদে; ঘ্রাণ ও রঙের প্রাকৃতিকে পরিচয়ের দাঁড়ি কমা সেমিকোলনের সমূহ যতিচিহ্ন প্রচ্ছন্ন ছায়ার প্রব্রজ্যা। অথবা গ্রামে কেউ ছিল না, কখনো, একদা হয়তো ছিল, এখন নেই। ভয়াবহ শূন্যতা – ঘ্রাণশূন্যতা, সুরশূন্যতা, বৃক্ষশূন্যতা, পতঙ্গশূন্যতা, নদীশূন্যতা, মেঘশূন্যতা, বাক্যশূন্যতা। এসব বিবিধ শূন্যতার ভেতর কণ্ঠস্বরের অস্ফুট গুঞ্জন গ্রামের আত্মার ভেতর নড়েচড়ে ওঠে, তারই মৃদু ইশারা – আগন্তুকেরা তখন ধন্ধে পড়ে; সূর্য জ্বলছে, তবু তাদের উৎকণ্ঠা ও হৃৎস্পন্দনের ভেতর সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসে। আগন্তুকেরা তবু পথের দূরত্ব অতিক্রম করতে পারে না – একবার গোলাপবাগান নিকটে চলে আসে, পুনরায় দূরে। তারা গোলাপের নিশ্বাস পায়, নিঃশব্দ পায়। তারা গোলাপের ঘুম পায়, দৃশ্য পায়। এভাবে নিকট ও দূরের দ্বিধা, নিশ্বাস ও নৈঃশব্দ্যের সংশয় তাদের ক্রমাগত উৎকণ্ঠিত আকাঙক্ষার ভেতর নৈরাশ্যের ভেতর প্রতীক্ষার ভেতর ছুড়ে ফেলে; পুনরায় তারা গোলাপের রাষ্ট্রতন্ত্রে প্রবেশ করে, গোলাপের যুদ্ধে প্রবেশ করে, গোলাপের উত্তেজনায় ডুবে যায়। তাদের স্মৃতি ও স্বপ্নের

শিরায়-শিরায় লোভী উলস্নঙ্ঘনের ভেতর ঢুকে যায় গোলাপের অমীমাংসিত গাণিতিক। তখন তাদের মনে হয়, গ্রামে কোনো পথ ছিল না, অথবা পথশূন্য কোনো গ্রাম পৃথিবীতে ছিল না। অথবা আগন্তুকেরা গ্রামটাই আর খুঁজে পেল না। পুরো গ্রাম নিশ্চিহ্ন। দিগন্ত পরিব্যাপ্ত কুয়াশার অস্ফুট ধ্বনির ভেতর তারা গোলাপের বাক্যে পৌঁছানোর ইচ্ছা নিয়ে পথের একটি বিন্দুতে ঘুরপাক খায় অনন্তকাল। তখন পথবিন্দুর বাতাসে বাহিত হয়ে আসে ধাবমান সুর ও সংগীতের উৎরোল তরঙ্গ, কোথাও এসব পুষ্পবিদ্যা আমাদের বাক্য ও গৃহনির্মাণের অন্যতর সংকল্প প্রাকৃতিক করে তোলে।

সোশ্যাল মিডিয়া

নিউসলেটার